📄 মক্কার জন্য মুহাজিরদের কাতরতা
মুহাজিরগণ মক্কার জন্য কাতরতা অনুভব করতেন। তাঁরা সেখানে ফিরে যেতে চাইতেন। বিলাল প্রায়ই বলতেন, 'উতবা ইবন রাবিআ, শায়বা ইবন রাবিআ ও উমাইয়া ইবন খালাফের উপর আল্লাহর লা'নত পড়ুক; তাদের জন্যই আমাদেরকে মক্কা ছেড়ে এ রোগ-শোকের দেশে আসতে হয়েছে।' মদীনায় জলাবদ্ধতা থাকার কারণে সেখানে ম্যালেরিয়া, জ্বর প্রভৃতি রোগ একটি সাধারণ ব্যাপার ছিল।
মুয়াত্তা ইবন মালিকে একটি হাদীস আছে যেটি বর্ণনা করেছেন আ'ইশা। তিনি বলেন, 'যখন রাসূলুল্লাহ মদীনায় আগমন করলেন, তখন আবু বকর ও বিলাল ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। আমি তাদেরকে দেখতে গেলাম এবং বললাম, বাবা, কেমন আছেন আপনি? বিলাল, আপনি কেমন আছেন? আমার বাবা আবু বকর জ্বরাক্রান্ত হলেই এ পংক্তিগুলি আবৃত্তি করতেন প্রতিটি মানুষ রোজ সকাল তার আপনজনদের মাঝে কাটায়, অথচ মৃত্যু তার জুতার ফিতার চাইতেও নিকটবর্তী। আর বিলাল গলার স্বর উঁচু করে আবৃত্তি করতেন: হায়, আমি যদি জানতাম আমি কি মক্কার সেই উপত্যকায় আর একটি রাত হলেও কাটাতে পারবো, আমার চারপাশ জুড়ে থাকবে ইযখির আর জলীল ঘাস। হায়, আমার ভাগ্যে কি মাজান্না কূপের পানি জুটবে? আমি কি আর কখনো শামা আর তাফিল পাহাড়ের দেখা পাব?'
আ'ইশা বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহর নিকটে গিয়ে এ সংবাদ জানালাম। তখন তিনি এ দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ! মদীনাকে আমাদের ভালোবাসার শহর বানিয়ে দাও যেমন ভালোবাসার ছিল মক্কা, অথবা মদীনাকে মক্কা থেকেও প্রিয় করে দাও। আমাদের জন্য মদীনাকে স্বাস্থ্যকর বানিয়ে দাও। মদীনার সা ও মুদ্দার মাঝে বিশেষ বরকত দান করো (অর্থ-সম্পদে বরকত দান করো)। এখানের জ্বর রোগকে সরিয়ে জুহফায় নিয়ে যাও।'
যখন আ'ইশা জ্বরে আক্রান্ত আমর ইবন ফুহাইরাকে দেখতে গেলেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করলেন তখন আমর ইবন ফুহাইরা উত্তর না দিয়ে বলতে লাগলেন, "মৃত্যু হওয়ার আগেই আমি মৃত্যুর স্বাদ পেয়েছি, কাপুরুষের মৃত্যু পেছনে লেগেই থাকে।"
টিকাঃ
৭৯. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, অধ্যায় ৪৫, হাদীস ১৪।
📄 ইসলামের প্রথম সন্তান
হিজরতের পর মদীনায় প্রথম শিশু জন্ম নেয় আসমা বিনত আবু বকরের কোলে। এই সন্তান হলো আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের। আসমা তাঁর সন্তানকে নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে যান এবং তাঁর কোলে তুলে দেন। রাসূলুল্লাহ একটি খেজুর চিবিয়ে সেটিকে আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের মুখে ঢুকিয়ে দেন। তারপর রাসূলুল্লাহ তাঁর জন্য দুআ করেন। আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের ছিলেন মুহাজিরদের প্রথম সন্তান।
পুরো ঘটনাটি আসমা বিনত আবু বকর নিজ মুখে বর্ণনা করেছেন:
'আমি এমন সময় হিজরত করি যখন আমি সন্তানসম্ভবা। আমি মদীনায় এসে কুবাতে থাকলাম, সেখানেই আমি আমার পুত্র সন্তানকে প্রসব করি। এরপর আমি তাঁকে নিয়ে নবীজির কোলে তুলে দিলাম। তিনি একটি খেজুর আনিয়ে তা মুখে দিলেন, চাবালেন এবং সেই খেজুরের রস আমার বাচ্চার মুখে ঢেলে দিলেন। তারপর নবীজি চিবানো খেজুরের সামান্য অংশ নবজাতকের মুখের ভিতরের তালুতে লাগিয়ে দিলেন। এরপর তার জন্য দুআ করলেন এবং বরকত কামনা করলেন। তিনিই ছিলেন ইসলামের প্রথম সন্তান।'
এ হাদীসটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে ইঙ্গিত করে, সাহাবাদের কাছে ইসলামের সূচনাবিন্দু ছিল মদীনা। কারণ সেখানেই প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মক্কায় অতিবাহিত ১৩টি বছর যেন এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার, প্রস্তুতিকাল ছিল। আসমা এখানে বলেননি যে হিজরতের পর জন্ম নেওয়া প্রথম শিশু অথবা মদীনায় জন্ম নেওয়া প্রথম শিশু; বরং তিনি বলেছেন "উলিদা ফীল ইসলাম" – অর্থাৎ, ইসলামের প্রথম সন্তান। মুসলিমরা যখন আল্লাহ তাআলার হুকুম-আহকাম মেনে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে একমাত্র তখনই ইসলাম পরিপূর্ণ হয়েছে। সাহাবিদের এই দৃষ্টিভঙ্গিটি দেখিয়ে দেয় বর্তমানের মুসলিমরা ইসলামের অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হয়ে আছে।
টিকাঃ
৮০. সহীহ বুখারি, অধ্যায় আনসারদের মর্যাদা, হাদীস ১৩৬।
৮১. সহীহ বুখারি, অধ্যায় আকীকা, হাদীস ৩।
📄 ইহুদি পণ্ডিত থেকে মুসলিম: আবদুল্লাহ ইবনে সালাম ؓ
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মদীনার ইহুদিদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী পণ্ডিত বা রাবী ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে সালাম। নবীজির আগমনের খবর শুনে তিনি তাঁর সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ইমাম আহমেদ থেকে জানা যায়, আবদুল্লাহ ইবন সালাম যখন রাসূলুল্লাহকে দেখলেন, তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তা কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। আল্লাহর রাসূলের চেহারা থেকেই যেন সত্যের আলো উদ্ভাসিত হতো। আবদুল্লাহ ইবন সালাম একজন ইহুদি পণ্ডিত ছিলেন, তাই তিনি মুহাম্মাদকে পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন যে তিনি আসলেই রাসূল কি না। ইহুদি পণ্ডিতরা সর্বশেষ রাসূলের আগমনের নিদর্শন সম্পর্কে অবগত ছিলেন। আনাস এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন:
আবদুল্লাহ ইবন সালামের কাছে নবী করীমের আগমনের সংবাদ এসে পৌঁছলে তিনি এসে তাঁকে কয়েকটি প্রশ্ন করেন। তিনি বললেন, "আমি আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করছি। এগুলোর সঠিক উত্তর একজন নবী ব্যতীত অন্য কেউ জানে না। (১) ক্বিয়ামতের সর্বপ্রথম লক্ষণ কী? (২) জান্নাতবাসীদের সর্বপ্রথম খাবার কী? (৩) কী কারণে সন্তান আকৃতিতে কখনো পিতার মতো কখনো বা মায়ের মতো হয়?"
নবীজি উত্তরে বললেন, "এ বিষয়গুলি সম্পর্কে এই মাত্র জিবরীল আমাকে জানিয়ে গেলেন"। আবদুল্লাহ ইবন সালাম একথা শুনে বললেন, "তিনিই ফেরেশতাদের মধ্যে ইহুদীদের শত্রু।" নবীজি বললেন, '(১) কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সর্বপ্রথম লক্ষণ হলো লেলিহান আগুন যা মানুষকে পূর্বদিক থেকে পশ্চিম দিকে ধাওয়া করে নিয়ে যাবে এবং সবাইকে সমবেত করবে। (২) জান্নাতবাসীদের সর্বপ্রথম খাবার হলো মাছের কলিজার বাড়তি অংশ। (৩) যদি নারীর আগে পুরুষের বীর্যপাত ঘটে তবে সন্তান পিতার অনুরূপ হয় আর যদি পুরুষের আগে নারীর বীর্যপাত ঘটে তবে সন্তান মায়ের অনুরূপ হয়।'
আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই এবং নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল। হে রাসূলুল্লাহ, ইহুদীরা এমন একটি জাতি যারা অন্যের কুৎসা রটনায় অত্যন্ত পটু। আমার ইসলাম গ্রহণের খবর প্রকাশ পাবার আগে আমার ব্যাপারে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে দেখুন তারা কী বলে। নবী করীম তাদেরকে ডাকলেন, তারা হাজির হলো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "তোমাদের মাঝে আবদুল্লাহ ইবন সালাম কেমন লোক?” তারা বললো, "তিনি আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি এবং সর্বোত্তম ব্যক্তির সন্তান। তিনি আমাদের সবচেয়ে মর্যাদাবান এবং সবচেয়ে মর্যাদাবান ব্যক্তির সন্তান।” রাসূলুল্লাহ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা বল তো, যদি আবদুল্লাহ ইবন সালাম ইসলাম গ্রহণ করে তবে কেমন হবে? তোমরা তখন কী করবে?” তারা বললো, "আল্লাহ তাকে এ কাজ থেকে রক্ষা করুন।” রাসূলুল্লাহ আবার একথাটি জিজ্ঞেস করলেন, তারা একই উত্তর দিল। তখন আবদুল্লাহ ইবন সালাম বেরিয়ে আসলেন এবং বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।” এ কথা শুনে ইহুদীরা বলতে লাগল, "সে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বাজে লোক এবং খারাপ লোকের সন্তান।" অতঃপর তারা তাঁকে অপমান করে আরো অনেক কথাবার্তা বললো। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, “হে রাসূলুল্লাহ! আমি এমন কিছুরই আশংকা করছিলাম।"
যখন আবদুল্লাহ ইবন সালাম জিবরীল ফেরেশতাকে ইহুদিদের শত্রু বলে উল্লেখ করেন তখন রাসূলুল্লাহ তাঁর সামনে সূরা আল-বাক্বারাহর একটি আয়াত তিলাওয়াত করেন,
“যে শত্রু হবে আল্লাহর, তাঁর ফেরেশতাদের, তাঁর রাসূলগণের, জিবরীলের ও মীকাঈলের – তবে নিশ্চয় আল্লাহ সেসব কাফিরদের শত্রু।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:৯৮)
আল্লাহ তাআলা সব ফেরেশতাকে সৃষ্টি করেছেন আর সব ফেরেশতাই আল্লাহকে সম্মান করেন। কোনো নির্দিষ্ট ফেরেশতাকে বন্ধু বা শত্রু ভাবার কোনো কারণ নেই। রাসূলুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবন সালামের এই ভুল ধারণাটিকে সংশোধন করে দিলেন।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ যা বলেছেন তাতে আরেকটি লক্ষ্যণীয় ব্যাপার আছে। এই দুনিয়াতে মাছের কলিজা হয়তো খুব জনপ্রিয় কোনো খাবার নয়, কিন্তু জান্নাতের সবকিছুই দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। নাম শুনে একই রকম মনে হলেও জান্নাতে সবকিছু পুরোপুরি ভিন্ন হবে। আর তৃতীয় প্রশ্নের যে উত্তর আল্লাহর রাসূল দিয়েছেন তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বিজ্ঞান বলে যে, যদি পিতার জিন (Gene) সন্তানের উপর প্রভাব বিস্তার করে তবে সন্তান পিতার অনুরূপ হবে আর একইভাবে যদি মায়ের জিন সন্তানের উপর প্রভাব বিস্তার করে তবে সন্তান মায়ের অনুরূপ হবে। এখানে রাসূলুল্লাহ ঠিক এ কথাটিই বলেছেন, কারণ বীর্যের মাধ্যমে পুরুষের জিন এবং ডিম্বাণুর মাধ্যমে মহিলার জিন প্রবাহিত হয়।
ইহুদিরা মুখের উপরে যেভাবে আবদুল্লাহ ইবন সালাম সম্পর্কে মিথ্যে বলেছে – তা দেখে বোঝা যায় তারা মিথ্যাচারে কতটা পারদর্শী। এই ধরনের ছোট ছোট ঘটনাগুলো মুসলিম ও ইহুদিদের সম্পর্কে ভাঙনে প্রভাবক হয়ে দাঁড়ায়। ইহুদিরা কোনোভাবেই মুহাম্মাদকে রাসূল হিসেবে এবং ইসলামকে একমাত্র সত্য ও শেষ দ্বীন হিসেবে মেনে নিতে পারছিল না। তারা আড়ালে থেকে প্রায়ই ইসলামি রাষ্ট্রের ব্যাপারে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করতো।
অন্য এক বর্ণনায় ইবন আব্বাস বলেছেন, যখন আবদুল্লাহ ইবন সালাম, সালাবা ইবন সা'ইয়া, উসাইদ ইবন সা'ইয়া, আসাদ ইবন উবাইদসহ আরও কিছু ইহুদি মুসলিম হয়ে গেল তখন ইহুদিদের আলিমরা বলতে লাগলো, "যারা মুহাম্মাদের দ্বীনের অনুসারী হয়েছে তারা আমাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ লোক।" তারা মনে করতো যদি এই লোকগুলো আসলেই ধার্মিক হতো তারা তাদের পূর্বপুরুষদের দ্বীন ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করতো না।"
"তারা সবাই সমান নয়। আহলে কিতাবদের মধ্যে কিছু লোক এমনও আছে যারা অবিচলভাবে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে এবং রাতের গভীরে তারা সেজদা করে। তারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে এবং কল্যাণকর বিষয়ের নির্দেশ দেয়; অকল্যাণ থেকে বারণ করে এবং সৎকাজের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করতে থাকে। আর এরাই হলো সৎকর্মশীল। তারা যেসব সৎকাজ করবে, কোনো অবস্থাতেই সেগুলোর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হবে না। আর আল্লাহ মুত্তাকীদের বিষয়ে অবগত।” (সূরা আলে- ইমরান, ৩: ১১৩-১১৫)
টিকাঃ
৮২. সহীহ বুখারি, অধ্যায় নবীদের কাহিনী, হাদীস ৪।
📄 কিবলার পরিবর্তন
রাসূলুল্লাহর মদীনায় হিজরতের ১৪ মাস পরে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা ঘটে। তা হলো কিবলার পরিবর্তন। মক্কাতে থাককালীন সময়ে ক্বিবলা ছিল জেরুসালেম বরাবর; কিন্তু তখন কিবলা নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি, কারণ মক্কায় থাককালীন তিনি জেরুসালেম ও কাবা উভয়কে সামনে রেখে সালাত আদায় করতেন। এভাবে তিনি জেরুসালেম ও কাবা – উভয়য়ের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে পারতেন। কিন্তু মদীনায় হিজরতের পর দেখা গেল যে, সেখান থেকে মক্কা ও জেরুসালেমের অবস্থান পরস্পরের বিপরীত। রাসূলুল্লাহ কাবা বরাবর সালাত আদায় করতে চেয়েছিলেন কিন্তু তিনি আল্লাহকে জিজ্ঞেস করার সাহস পাননি। এরপর আল্লাহ আযযা ওয়াজাল ইবরাহীমের ক্বিবলা অর্থাৎ কাবাকে মুসলিমদের কিবলা বানানোর নির্দেশ দিয়ে আয়াত নাযিল করলেন। এ আয়াতটি মদীনাতে অবতীর্ণ হয়েছিল। এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ নতুন কিবলা বরাবর সালাত আদায় করলেন। এরই মধ্যে একজন সাহাবী মদীনার কয়েক মাইল দূরে তাঁর গোত্রকে কিবলা পরিবর্তনের খবরটি জানানোর জন্য বের হয়ে পড়েন। তিনি গিয়ে দেখলেন যে তাঁরা পুরনো ক্বিবলা অর্থাৎ জেরুসালেম বরাবর আসরের সালাত পড়ছে। ওই অবস্থাতেই সেই সাহাবী তাদেরকে বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আমি মাত্রই রাসূলুল্লাহর সাথে মক্কা বরাবর সালাত আদায় করেছি।' এ কথা শুনে তাঁরা তৎক্ষণাৎ সালাতের মধ্যেই নিজেদের ক্বিবলা মক্কার দিকে পরিবর্তন করে ফেললো। এ ঘটনা থেকে রাসূলুল্লাহর প্রতি সাহাবিদের প্রবল আনুগত্য যেমন বোঝা যায়, তেমনি বোঝা যায় সেই সমাজে একজন মুসলিমের কথার উপর সবাই কতটা আস্থা রাখত।
কিন্তু এ ঘটনাটি বেশ কিছু বিতর্কের জন্ম দেয়। শুধুমাত্র কিবলা পরিবর্তনের বিষয় নিয়েই আল্লাহ আযযা ওয়াজাল সূরা আল-বাক্বারাহর ৪০টি আয়াত নাযিল করেছেন। ইবনুল কায়্যিম বলেন যে এটি ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মুশরিকদের জন্য একটি পরীক্ষা। কাবা ছিল আরবের মুশরিকদের ক্বিবলা, তাই কিবলার দিক পরিবর্তনের পর তারা রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে বলতে শুরু করলো, "তিনি আমাদের কিবলার দিকে ফিরে এসেছেন, এখন তিনি আমাদের ধর্মের দিকেও ফিরে আসবেন।" ইবনুল কায়্যিম আরও বলেন, এই কিবলা পরিবর্তন ছিল মুনাফিকদের জন্যেও একটা পরীক্ষা ছিল যারা বলতো মুহাম্মাদ নিজেই জানে না সে কী করছে; সে বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছে। ক্বিবলার পরিবর্তন ইহুদিদের জন্যেও একটি পরীক্ষা ছিল। ইহুদিরা জেরুসালেমকে নবীদের ক্বিবলা বলে বিশ্বাস করতো। রাসূলুল্লাহ যখন ক্বিবলা পরিবর্তন করলেন, তখন তারা তাঁর সম্পর্কে বলতে শুরু করলো, 'তিনি পূর্বের নবীদের ক্বিবলা পরিত্যাগ করেছেন – এতেই প্রমাণিত হয় যে তিনি আল্লাহর রাসূল নন।' পাশাপাশি এটা মুসলিমদের জন্যও একটি পরীক্ষা ছিল – আল্লাহ দেখতে চাইছিলেন রাসূলুল্লাহর অনুসরণে তারা কতোটা দৃঢ় - তারাও কি রাসূলুল্লাহর সাথে কিবলা পরিবর্তন করছেন কি না। অর্থাৎ এই একটি ঘটনা ছিল মুসলিম-মুশরিক-ইহুদী-মুনাফিক সকলের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে একটি পরীক্ষা।
"এখন নির্বোধেরা বলবে, কীসে মুসলমানদের ফিরিয়ে দিল তাদের ওই কিবলা থেকে, যার উপর তারা ছিল? আপনি বলুনঃ পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথে চালান।” (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২: ১৪২)
কাবা, মক্কা কিংবা জেরুসালেম সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি, আর তাই মুসলিমরা কোন দিক বরাবর দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবে তা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ আযযা ওয়া জালের, তাই আল্লাহ বলছেন, "পূর্ব ও পশ্চিমের মালিক আল্লাহ।" ইবনে কাসীর বলেন, 'যদি আল্লাহ তাআলা প্রতিদিন নতুন একটি কিবলা নির্ধারণ করে দেন, তাহলে আমাদেরকে ঠিক সেই কিবলামুখি হতে হবে। আমরা তাঁরই বান্দা এবং তাঁরই অধীনস্থ।' ইহুদিরা মনে করতো আল্লাহ তাঁর সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন না, তাই দুটো কিবলার যেকোনো একটি ঠিক, আরেকটি ভুল। মুসলিমদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য তারা আরও বলতো, "যদি প্রথম ক্বিবলা ঠিক হয় তাহলে নতুন কিবলা বরাবর ইবাদত করে তোমাদের কোনো কাজে আসবে না। আর যদি দ্বিতীয় কিবলা ঠিক হয় তাহলে তো তোমাদের এতদিনের ইবাদত সব বিফলে গেল।" ইহুদিদের এ কথার জবাবে আল্লাহ তাআলা আরেকটি আয়াত নাযিল করেন।
"আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর। আপনি যে ক্বিবলার উপর ছিলেন, তাকে আমি এজন্যেই কিবলা করেছিলাম, যাতে একথা প্রতীয়মান হয় যে, কে রাসূলের অনুসারী থাকে আর কে পিঠটান দেয়। নিশ্চিতই এটা কঠোরতর বিষয়, কিন্তু তাদের জন্যে নয়, যাদেরকে আল্লাহ পথপ্রদর্শন করেছেন। আল্লাহ এমন নন যে, তোমাদের ঈমান (সালাত) নষ্ট করে দেবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ, মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, করুনাময়।” (সূরা বাক্বারাহ, ২: ১৪৩)
উম্মাতান ওয়াসাত মানে হলো উত্তম ও সম্মানিত উম্মত। ইবন কাসীর এই আয়াতের তাফসীরে বলেছেন,
"আল্লাহ তাআলা এই আয়াতের মাধ্যমে উম্মাতে মুহাম্মাদীকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, 'তোমাদেরকে এই পছন্দনীয় ক্বিবলার দিকে ফিরাবার কারণ এই যে, তোমরা নিজেরাও পছন্দনীয় উম্মাত। তোমরা কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মাতের উপর সাক্ষ্য দেবে, কেননা তারা সবাই তোমাদের মর্যাদা স্বীকার করে।"
ইহুদিদের একটি ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে, কোনো ব্যক্তি যদি ওয়াহীর আগমনের পূর্বে মারা যায় তবে তার সমস্ত ইবাদত বিফলে যাবে। আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, পূর্বের ক্বিবলা বরাবর মুসলিমদের ইবাদত আল্লাহ নষ্ট করে দিবেন না।
"নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কিবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। সুতরাং আপনি মসজিদুল-হারামের দিকে মুখ করুন এবং তোমরা যেখানেই থাক, সেই দিকেই মুখ করো। যারা আহলে-কিতাব, তারা অবশ্যই জানে যে, এটাই ঠিক পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আল্লাহ বেখবর নন, সে সমস্ত কর্ম সম্পর্কে যা তারা করে।"
সূরা আল বাক্বারাহর পরবর্তী আয়াতগুলোতে (১৪৪-১৫০) আল্লাহ তাআলা বলেন,
"যদি আপনি আহলে কিতাবদের কাছে সমুদয় নিদর্শন উপস্থাপন করেন, তবুও তারা আপনার কিবলা মেনে নেবে না এবং আপনিও তাদের কেবলা মানেন না। তারাও একে অন্যের কেবলা মানে না। যদি আপনি তাদের বাসনার অনুসরণ করেন, সে জ্ঞানলাভের পর, যা আপনার কাছে পৌঁছেছে, তবে নিশ্চয় আপনি অবিচারকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। আমি যাদেরকে কিতাব দান করেছি, তারা তাকে চেনে, যেমন করে চেনে নিজেদের পুত্রদেরকে। আর নিশ্চয়ই তাদের একটি সম্প্রদায় জেনে শুনে সত্যকে গোপন করে।
বাস্তব সত্য সেটাই যা আপনার পালনকর্তা বলেন। কাজেই আপনি সন্দিহান হবেন না। আর সবার জন্যই রয়েছে কেবলা একেক দিকে, যে দিকে সে মুখ করে (ইবাদত করবে)। কাজেই সৎকাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাও। যেখানেই তোমরা থাকবে, আল্লাহ অবশ্যই তোমাদেরকে সমবেত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।
আর যে স্থান থেকে আপনি বের হন, নিজের মুখ মসজিদে হারামের দিকে ফেরান নিঃসন্দেহে এটাই হলো আপনার রবের পক্ষ থেকে সত্য। বস্তুতঃ তোমার রব তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অনবহিত নন।
আর আপনি যেখান থেকেই বেরিয়ে আসুন এবং যেখানেই অবস্থান করুন, সেই দিকেই মুখ ফেরাও, যাতে করে মানুষের জন্য তোমাদের সাথে ঝগড়া করার অবকাশ না থাকে। অবশ্য যারা অবিবেচক, তাদের কথা ভিন্ন, তাদের আপত্তিতে ভীত হয়ো না। আমাকেই ভয় করো। যাতে আমি তোমাদের জন্যে আমার অনুগ্রহ সমূহ পূর্ণ করে দেই এবং তাতে যেন তোমরা সরলপথ প্রাপ্ত হও।”
"...তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, বরং আমাকেই ভয় কর...” – বর্তমান সময়ে ইসলাম যখন কাফির ও মুনাফিকদের কাছ থেকে প্রচণ্ড আক্রমণ ও সমালোচনার শিকার, সেই সময়ে এই আয়াত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষা দেয়। প্রতিটি যুগেই ইসলামবিদ্বেষী কিছু লোক থাকে। তারা ইসলামের বিভিন্ন দিক ও বিধানের দোষ খুঁজে বেড়ায়। যেমন এই যুগে তারা বলে, ইসলাম নারীদের শোষণ করে, অথচ তারাই একসময় মনে করতো ইসলাম নারীদেরকে বেশি-বেশি অধিকার দিয়েছে। ইসলাম সন্ত্রাসবাদের ধর্ম, অশান্তির ধর্ম – ইত্যাদি নানানরকমের প্রপাগান্ডা চালায়। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল ঈমানদারদের বলেছেন যে, তারা যেন ওইসব লোকদের ভয় না পেয়ে শুধুমাত্র আল্লাহকেই ভয় করে। কাজেই একজন মুসলিম এসব ইসলামবিদ্বেষীদের কথায় পাত্তা না দিয়ে শুধু তা-ই করবে যা আল্লাহ আযযা ওয়াজাল করতে বলেছেন। আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি বিধান, প্রতিটি আদেশ-নিষেধ মুসলিমদের জন্য একেকটি অনুগ্রহ।