📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মদীনার সনদ: কিছু পর্যালোচনা

📄 মদীনার সনদ: কিছু পর্যালোচনা


বিশ্বাসভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিকত্বের ধারণা
মদীনায় রাসূলুল্লাহর আগমনের মাধ্যমে আক্বীদাহ বা ধর্মবিশ্বাসভিত্তিক একটি সমাজের গোড়াপত্তন ঘটে এবং গোত্রভিত্তিক শাসনব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। ধর্মবিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে সমাজ গড়ার এই ধারণাটি আরবদের জন্য নতুন ছিল। কারণ ইতিপূর্বে তাদের পরিচয় ছিল বংশ বা গোত্রভিত্তিক, রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে তারা ঐক্য বজায় রাখত। অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ নতুন একটি ধারণা নিয়ে আসেন। তিনি আরব থেকে "গোত্র” ভিত্তিক সমাজব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করে দিলেন "উম্মাহ" ভিত্তিক সমাজব্যবস্থা দিয়ে। তিনি বনু আওস ও বনু খাযরাজকে এক করলেন, নাম দিলেন আনসার। মদীনার আনসার ও মক্কার মুহাজিরদের এক করলেন এবং তাদের সাধারণ পরিচয় দিলেন মুসলিম এবং তারা প্রত্যেকে ইসলামি রাষ্ট্রের নাগরিক। এখানে কারো গোত্র-পরিচয় বা গায়ের রং বা জাতীয়তা প্রাধান্য পেল না, বরং যে বিষয়টি তাদের এক করলো সেটা হচ্ছে তাদের ধর্মবিশ্বাস। এমনকি যারা মক্কা-মদীনার বাইরে থেকে আগত, তারাও ইসলামি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করলো শুধু এই যোগ্যতায় যে তারা মুসলিম। তিনি সবাইকে জানিয়ে দেন যে, মুসলিমরা একে অপরের ভাই।

চুক্তিপত্রে বলা হয়েছে – "ঈমানদাররা একে অপরের সহযোগী"- এই কথার মাধ্যমে মুসলিমরা একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে পরিচয় লাভ করলো। সম্ভবত জাতি হিসেবে মুসলিমদের স্বকীয়তা বজায় রাখতেই রাসূলুল্লাহ এমন অনেক নির্দেশ দিয়ে গেছেন যেখানে ইহুদিদের কাছ থেকে মুসলিমদের স্বকীয়তা ও পার্থক্য বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। মক্কার মুশরিক ও মুসলিমদের মধ্যে অনেক বিষয়ে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান থাকলেও মদীনার আহলে কিতাব ও মুসলিমদের মধ্যে কিছু কিছু ব্যাপারে সাদৃশ্য বিদ্যমান ছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ মুসলিমদের মুসলিম পরিচয়কে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র রাখতে চেয়েছিলেন। এমন অনেক হাদীস রয়েছে যেখানে মদীনার মুসলিমদেরকে ইহুদিদের থেকে ভিন্নভাবে চলাফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যেমন: রাসূলুল্লাহ লক্ষ্য করলেন, মদীনার ইহুদিরা ইবাদাতের সময় চামড়ার মোজা পরে না, তাই তিনি মুসলিমদের ইবাদাতের সময় চামড়ার মোজা পরার অনুমতি দিলেন। আবার মদীনার ইহুদিরা মেহেদী দিয়ে চুল রঙ করতো না, তাই তিনি মুসলিমদেরকে মেহেদী দিয়ে চুল রঙ করার নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশটি ছিল পুরুষদের জন্য। এরকম আরো একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা আছে। ইবন আব্বাস এটি বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ একদিন দেখলেন মদীনার ইহুদিরা আশুরার দিনে, অর্থাৎ মুহাররামের ১০ তারিখ রোজা রাখে এবং তারা এই দিনের ব্যাপারে বলে, 'এইদিনে মূসা ফির'আউনকে পরাজিত করেছেন।' তখন রাসূলুল্লাহ তাঁর সাহাবাদের বললেন, 'তাদের (ইহুদিদের) চাইতে আমি মূসার বেশি আপন।' এরপর সাহাবারা সেদিন সাওম পালন করলেন।

এখানে রাসূলুল্লাহ বুঝিয়েছেন যে মূসা ছিলেন একজন মুসলিম, কিন্তু ইহুদিরা মুসলিম নয়, তাই সত্যিকারের মুসলিম হিসেবে তাঁর প্রতি আমাদের অধিকার সবচেয়ে বেশি, ইহুদিদের চেয়েও বেশি, যদিও বা তারা নিজেদের মূসার অনুসারী বলে দাবি করে। রাসূলুল্লাহ আশুরার দিন (১০ই মুহাররাম) রোজা রাখা শুরু করলেন এবং অন্যদেরকেও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি বলে গিয়েছিলেন যে তিনি যদি পরবর্তী বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকেন তাহলে ১০ই মুহাররামের সাথে ৯ই মুহাররামও রোজা রাখবেন। এভাবে তিনি আশুরার রোজা রাখার ব্যাপারে মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যে একটি পার্থক্য করে দিয়েছিলেন যেখানে মুসলিমরা ৯ই ও ১০ই মুহাররাম রোজা রাখত আর অন্যদিকে ইহুদিরা শুধু ১০ই মুহাররাম রোজা রাখত।

সনদ থেকে এটাও স্পষ্ট যে ইহুদিরা ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের নাগরিক। তারা নাগরিকত্বের সুবিধা লাভ করবে, নিরাপত্তা পাবে, শর্ত ছিল তারা ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকবে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে কোনো দলকে সাহায্য করবে না।

আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা
এই সনদ অনুসারে অর্থনৈতিক, রাজনৈতীক, ধর্মীয়, পারিবারিক বিরোধ, ফৌজদারি – সকল বিষয়ের নিষ্পত্তিতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের রায় চূড়ান্ত বলে গন্য হবে। সনদে পরিস্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, 'যে বিষয়েই মতভেদ হবে তা আল্লাহর সমীপে ও মুহাম্মাদের সমীপে উপস্থাপিত হবে।' অর্থাৎ মদীনার এই রাষ্ট্রটি হবে একটি শরীয়াহ শাসিত রাষ্ট্র এবং রাসূলুল্লাহ হচ্ছেন সেই রাষ্ট্রের প্রধান।

ইসলামের সাথে অন্যান্য ধর্মের পার্থক্য এখানেই, অন্য ধর্মগুলোতে 'ইবাদাত' করা হয় তাদের স্ব-স্ব উপাস্যের, কিন্তু জীবনের অন্যান্য দিক, যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালিত হয় তাদের নিজেদের ইচ্ছায় বা নিজেদের বানানো আইনে। কিন্তু ইসলাম ধর্মে 'ইবাদাত' যেমন আল্লাহর জন্য, তেমনি জীবনের অন্যান্য সকল বিষয় পরিচালিত হবে "শরীয়াহ" দ্বারা, অর্থাৎ সেই সকল আইন দ্বারা যেগুলো আল্লাহ কুরআনে নাযিল করেছেন, অথবা সুন্নাহর মাধ্যমে যে সকল আইনের বৈধতা দিয়েছেন।

"নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে দেখিয়েছেন।” (সূরা নিসা, ৪: ১০৫)

অর্থাৎ ইবাদাত বা ধর্মীয় বিষয় (Religious) পালনের জন্য যেমন কিছু বিধান আছে, তেমনি দুনিয়াবী (Worldly) বিষয় গুলোর জন্যও ইসলামে নির্দিষ্ট বিধান আছে। এছাড়া আল্লাহর দেওয়া দ্বীন নিরাপদভাবে পালনের জন্য আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করা একান্ত জরুরি। আধুনিক শাসন ব্যবস্থাকে যে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় – আইনবিভাগ (Legislative), বিচারবিভাগ (Judicial) ও কার্যনির্বাহী বিভাগ (Executive) – মদীনার সনদে প্রতিটি বিভাগের ব্যাপারে আল্লাহ ও রাসূলের সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত এবং ইহুদিরাও এটি মেনে নিয়েছিল। মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যে কোনো সমস্যা হলে সে ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত। অবশ্য ইহুদিদেরকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল যে তারা যদি চায়, তাহলে তারা নিজেদের মধ্যকার কোনো সমস্যা তাদের ধর্মীয় কিতাব অনুসারে ফয়সালা করতে পারবে, আবার তারা চাইলে তাদের নিজস্ব সমস্যা ফয়সালার জন্য আল্লাহর রাসূলের আদালতে দারস্থ হতে পারবে। রাসূলুল্লাহর স্বাধীনতা ছিল তিনি তাদের মামলা নিষ্পত্তি করে দেবেন অথবা তাদের মামলা তাদের আদালতে বিচার করতে ফিরিয়ে দেবেন। এছাড়াও মদীনাবাসীর কারো সাথে বহিরাগত কারো মতবিরোধ দেখা দেয় তাহলে সেই ব্যাপারে আল্লাহ আযযা ওয়াজাল ও তাঁর রাসূলের ফয়সালা সবাইকে মেনে নিতে হবে।

রাসূলুল্লাহর কর্তৃত্ব
এই চুক্তিপত্রের মাধ্যমে মদীনাতে রাসূলুল্লাহর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও তিনি মদীনাতে একজন অতিথি হিসেবে প্রবেশ করেছিলেন কিন্তু তিনি ছিলেন কার্যত তাদের নেতা। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল সূরা আন-নিসাতে বলেছেন,

"বস্তুত, আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়।” (সূরা আন-নিসা, ৪: ৬৪)

সনদে উল্লেখ করা হয়েছে: এই সনদভুক্ত পক্ষগুলোর মাঝে যদি কোনো সমস্যা বা বিবাদ সৃষ্টি হয়, যা থেকে হানাহানি বেধে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় তাহলে তার নিষ্পত্তিতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত এই ধারা থেকে রাসূলুল্লাহর কর্তৃত্বের বিষয়টি সুস্পষ্ট, সেখানে ভাগ বসানোর অধিকার কারো ছিল না।

সুতরাং আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহকে পাঠিয়েছেন যাতে মানুষ তাঁকে অনুসরণ করে। নবী হিসেবে রাসূলুল্লাহর কর্তৃত্ব আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন পন্থায় প্রতিষ্ঠা করেছেন আর সেসব পন্থার মাঝে মদীনার সনদ অন্যতম। মদীনায় এসে আল্লাহর রাসূল চারটি প্রকল্প হাতে নেন মসজিদ নির্মাণ, মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন, বিভিন্ন গোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্পর্ক নিরূপণ এবং সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠা। প্রতিটি কাজ রাসূলুল্লাহর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও স্থিতিশীলতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

সনদে শুধু একজন মানুষের নাম স্থান পেয়েছে আর তিনি হলেন মুহাম্মাদ। এভাবেই মদীনায় রাসূলুল্লাহর ক্ষমতা সুসংহত হয়। রাসূলুল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারো মদীনা ত্যাগ করা বা যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। কুরাইশ এবং কুরাইশদের কোনো মিত্রকে সাহায্য করা এই সনদে নিষিদ্ধ করা হয়।

ইহুদি ও মুসলিমদের সম্পর্ক
মদীনার সনদ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, রাসূলুল্লাহ তৎকালীন আহলে কিতাবদের প্রতি বেশ সহনশীলতা দেখিয়েছেন। এই চুক্তিপত্রে ইহুদিদেরকে মদীনার অর্থাৎ একটি ইসলামি রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। তারা নিজেদের ধর্মীয় রীতি পালন করার সুযোগ পেয়েছিল এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো এই যে তাদের নিরাপত্তা দেওয়ার যাবতীয় দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের ওপর। অন্যদিকে, ইহুদিদের উপর যে দায়িত্ব ও শর্ত আরোপ করা হয়েছিল, সেগুলো হলো:
• বহিঃশত্রু কর্তৃক মদীনা আক্রান্ত হলে ইহুদিরা মুসলিমদের পক্ষ নেবে।
• তারা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর মতামত প্রদান করবে এবং এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে না।
• মদীনার নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্য কারো কাছে প্রকাশ করবে না।
• রাসূলুল্লাহর নির্দেশ ব্যতিরেকে কেউ মদীনা ত্যাগ করবে না।

এরকম একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা থেকে মুসলিম ও ইহুদিদের সহাবস্থানের সূচনা হলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, বরং সম্পর্ক কেবল খারাপই হয়েছে। কেননা ইহুদিরা মদীনায় মুসলিমদের উপস্থিতি সহ্য করতে পারছিল না। রাসূলুল্লাহ শুরু থেকেই তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু ইহুদিরা তা হতে দেয়নি।

মদীনার পবিত্রতা বজায় রাখা
আরবদের কাছে মক্কা 'হারাম' বলে বিবেচিত ছিল, অর্থাৎ, সেখানে কোনো প্রকার রক্তারক্তি, অশান্তি বা বিশৃঙ্খলা করা নিষিদ্ধ ছিল, এটি ছিল তাদের কাছে একটি পবিত্র স্থান। মদীনার একটি নির্দিষ্ট বর্ডার বা সীমানা ছিল এবং মদীনার সনদে রাসূলুল্লাহ মদীনাকে সকলের জন্য নিরাপদ স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছেন। মদীনার পবিত্রতা বজায় রাখার জন্য সেখানে গাছকাটা, শিকার করা, যুদ্ধ ও অস্ত্র বহন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মক্কার জন্য মুহাজিরদের কাতরতা

📄 মক্কার জন্য মুহাজিরদের কাতরতা


মুহাজিরগণ মক্কার জন্য কাতরতা অনুভব করতেন। তাঁরা সেখানে ফিরে যেতে চাইতেন। বিলাল প্রায়ই বলতেন, 'উতবা ইবন রাবিআ, শায়বা ইবন রাবিআ ও উমাইয়া ইবন খালাফের উপর আল্লাহর লা'নত পড়ুক; তাদের জন্যই আমাদেরকে মক্কা ছেড়ে এ রোগ-শোকের দেশে আসতে হয়েছে।' মদীনায় জলাবদ্ধতা থাকার কারণে সেখানে ম্যালেরিয়া, জ্বর প্রভৃতি রোগ একটি সাধারণ ব্যাপার ছিল।

মুয়াত্তা ইবন মালিকে একটি হাদীস আছে যেটি বর্ণনা করেছেন আ'ইশা। তিনি বলেন, 'যখন রাসূলুল্লাহ মদীনায় আগমন করলেন, তখন আবু বকর ও বিলাল ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়লেন। আমি তাদেরকে দেখতে গেলাম এবং বললাম, বাবা, কেমন আছেন আপনি? বিলাল, আপনি কেমন আছেন? আমার বাবা আবু বকর জ্বরাক্রান্ত হলেই এ পংক্তিগুলি আবৃত্তি করতেন প্রতিটি মানুষ রোজ সকাল তার আপনজনদের মাঝে কাটায়, অথচ মৃত্যু তার জুতার ফিতার চাইতেও নিকটবর্তী। আর বিলাল গলার স্বর উঁচু করে আবৃত্তি করতেন: হায়, আমি যদি জানতাম আমি কি মক্কার সেই উপত্যকায় আর একটি রাত হলেও কাটাতে পারবো, আমার চারপাশ জুড়ে থাকবে ইযখির আর জলীল ঘাস। হায়, আমার ভাগ্যে কি মাজান্না কূপের পানি জুটবে? আমি কি আর কখনো শামা আর তাফিল পাহাড়ের দেখা পাব?'

আ'ইশা বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহর নিকটে গিয়ে এ সংবাদ জানালাম। তখন তিনি এ দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ! মদীনাকে আমাদের ভালোবাসার শহর বানিয়ে দাও যেমন ভালোবাসার ছিল মক্কা, অথবা মদীনাকে মক্কা থেকেও প্রিয় করে দাও। আমাদের জন্য মদীনাকে স্বাস্থ্যকর বানিয়ে দাও। মদীনার সা ও মুদ্দার মাঝে বিশেষ বরকত দান করো (অর্থ-সম্পদে বরকত দান করো)। এখানের জ্বর রোগকে সরিয়ে জুহফায় নিয়ে যাও।'

যখন আ'ইশা জ্বরে আক্রান্ত আমর ইবন ফুহাইরাকে দেখতে গেলেন এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করলেন তখন আমর ইবন ফুহাইরা উত্তর না দিয়ে বলতে লাগলেন, "মৃত্যু হওয়ার আগেই আমি মৃত্যুর স্বাদ পেয়েছি, কাপুরুষের মৃত্যু পেছনে লেগেই থাকে।"

টিকাঃ
৭৯. মুয়াত্তা ইমাম মালিক, অধ্যায় ৪৫, হাদীস ১৪।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 ইসলামের প্রথম সন্তান

📄 ইসলামের প্রথম সন্তান


হিজরতের পর মদীনায় প্রথম শিশু জন্ম নেয় আসমা বিনত আবু বকরের কোলে। এই সন্তান হলো আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের। আসমা তাঁর সন্তানকে নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে যান এবং তাঁর কোলে তুলে দেন। রাসূলুল্লাহ একটি খেজুর চিবিয়ে সেটিকে আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের মুখে ঢুকিয়ে দেন। তারপর রাসূলুল্লাহ তাঁর জন্য দুআ করেন। আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের ছিলেন মুহাজিরদের প্রথম সন্তান।

পুরো ঘটনাটি আসমা বিনত আবু বকর নিজ মুখে বর্ণনা করেছেন:
'আমি এমন সময় হিজরত করি যখন আমি সন্তানসম্ভবা। আমি মদীনায় এসে কুবাতে থাকলাম, সেখানেই আমি আমার পুত্র সন্তানকে প্রসব করি। এরপর আমি তাঁকে নিয়ে নবীজির কোলে তুলে দিলাম। তিনি একটি খেজুর আনিয়ে তা মুখে দিলেন, চাবালেন এবং সেই খেজুরের রস আমার বাচ্চার মুখে ঢেলে দিলেন। তারপর নবীজি চিবানো খেজুরের সামান্য অংশ নবজাতকের মুখের ভিতরের তালুতে লাগিয়ে দিলেন। এরপর তার জন্য দুআ করলেন এবং বরকত কামনা করলেন। তিনিই ছিলেন ইসলামের প্রথম সন্তান।'

এ হাদীসটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে ইঙ্গিত করে, সাহাবাদের কাছে ইসলামের সূচনাবিন্দু ছিল মদীনা। কারণ সেখানেই প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মক্কায় অতিবাহিত ১৩টি বছর যেন এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার, প্রস্তুতিকাল ছিল। আসমা এখানে বলেননি যে হিজরতের পর জন্ম নেওয়া প্রথম শিশু অথবা মদীনায় জন্ম নেওয়া প্রথম শিশু; বরং তিনি বলেছেন "উলিদা ফীল ইসলাম" – অর্থাৎ, ইসলামের প্রথম সন্তান। মুসলিমরা যখন আল্লাহ তাআলার হুকুম-আহকাম মেনে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে একমাত্র তখনই ইসলাম পরিপূর্ণ হয়েছে। সাহাবিদের এই দৃষ্টিভঙ্গিটি দেখিয়ে দেয় বর্তমানের মুসলিমরা ইসলামের অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হয়ে আছে।

টিকাঃ
৮০. সহীহ বুখারি, অধ্যায় আনসারদের মর্যাদা, হাদীস ১৩৬।
৮১. সহীহ বুখারি, অধ্যায় আকীকা, হাদীস ৩।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 ইহুদি পণ্ডিত থেকে মুসলিম: আবদুল্লাহ ইবনে সালাম ؓ

📄 ইহুদি পণ্ডিত থেকে মুসলিম: আবদুল্লাহ ইবনে সালাম ؓ


ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মদীনার ইহুদিদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী পণ্ডিত বা রাবী ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে সালাম। নবীজির আগমনের খবর শুনে তিনি তাঁর সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ইমাম আহমেদ থেকে জানা যায়, আবদুল্লাহ ইবন সালাম যখন রাসূলুল্লাহকে দেখলেন, তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তা কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। আল্লাহর রাসূলের চেহারা থেকেই যেন সত্যের আলো উদ্ভাসিত হতো। আবদুল্লাহ ইবন সালাম একজন ইহুদি পণ্ডিত ছিলেন, তাই তিনি মুহাম্মাদকে পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন যে তিনি আসলেই রাসূল কি না। ইহুদি পণ্ডিতরা সর্বশেষ রাসূলের আগমনের নিদর্শন সম্পর্কে অবগত ছিলেন। আনাস এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন:

আবদুল্লাহ ইবন সালামের কাছে নবী করীমের আগমনের সংবাদ এসে পৌঁছলে তিনি এসে তাঁকে কয়েকটি প্রশ্ন করেন। তিনি বললেন, "আমি আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করছি। এগুলোর সঠিক উত্তর একজন নবী ব্যতীত অন্য কেউ জানে না। (১) ক্বিয়ামতের সর্বপ্রথম লক্ষণ কী? (২) জান্নাতবাসীদের সর্বপ্রথম খাবার কী? (৩) কী কারণে সন্তান আকৃতিতে কখনো পিতার মতো কখনো বা মায়ের মতো হয়?"

নবীজি উত্তরে বললেন, "এ বিষয়গুলি সম্পর্কে এই মাত্র জিবরীল আমাকে জানিয়ে গেলেন"। আবদুল্লাহ ইবন সালাম একথা শুনে বললেন, "তিনিই ফেরেশতাদের মধ্যে ইহুদীদের শত্রু।" নবীজি বললেন, '(১) কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সর্বপ্রথম লক্ষণ হলো লেলিহান আগুন যা মানুষকে পূর্বদিক থেকে পশ্চিম দিকে ধাওয়া করে নিয়ে যাবে এবং সবাইকে সমবেত করবে। (২) জান্নাতবাসীদের সর্বপ্রথম খাবার হলো মাছের কলিজার বাড়তি অংশ। (৩) যদি নারীর আগে পুরুষের বীর্যপাত ঘটে তবে সন্তান পিতার অনুরূপ হয় আর যদি পুরুষের আগে নারীর বীর্যপাত ঘটে তবে সন্তান মায়ের অনুরূপ হয়।'

আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই এবং নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল। হে রাসূলুল্লাহ, ইহুদীরা এমন একটি জাতি যারা অন্যের কুৎসা রটনায় অত্যন্ত পটু। আমার ইসলাম গ্রহণের খবর প্রকাশ পাবার আগে আমার ব্যাপারে তাদেরকে জিজ্ঞেস করে দেখুন তারা কী বলে। নবী করীম তাদেরকে ডাকলেন, তারা হাজির হলো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "তোমাদের মাঝে আবদুল্লাহ ইবন সালাম কেমন লোক?” তারা বললো, "তিনি আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি এবং সর্বোত্তম ব্যক্তির সন্তান। তিনি আমাদের সবচেয়ে মর্যাদাবান এবং সবচেয়ে মর্যাদাবান ব্যক্তির সন্তান।” রাসূলুল্লাহ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, "আচ্ছা বল তো, যদি আবদুল্লাহ ইবন সালাম ইসলাম গ্রহণ করে তবে কেমন হবে? তোমরা তখন কী করবে?” তারা বললো, "আল্লাহ তাকে এ কাজ থেকে রক্ষা করুন।” রাসূলুল্লাহ আবার একথাটি জিজ্ঞেস করলেন, তারা একই উত্তর দিল। তখন আবদুল্লাহ ইবন সালাম বেরিয়ে আসলেন এবং বললেন, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।” এ কথা শুনে ইহুদীরা বলতে লাগল, "সে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বাজে লোক এবং খারাপ লোকের সন্তান।" অতঃপর তারা তাঁকে অপমান করে আরো অনেক কথাবার্তা বললো। আবদুল্লাহ ইবন সালাম বললেন, “হে রাসূলুল্লাহ! আমি এমন কিছুরই আশংকা করছিলাম।"

যখন আবদুল্লাহ ইবন সালাম জিবরীল ফেরেশতাকে ইহুদিদের শত্রু বলে উল্লেখ করেন তখন রাসূলুল্লাহ তাঁর সামনে সূরা আল-বাক্বারাহর একটি আয়াত তিলাওয়াত করেন,

“যে শত্রু হবে আল্লাহর, তাঁর ফেরেশতাদের, তাঁর রাসূলগণের, জিবরীলের ও মীকাঈলের – তবে নিশ্চয় আল্লাহ সেসব কাফিরদের শত্রু।” (সূরা বাক্বারাহ, ২:৯৮)

আল্লাহ তাআলা সব ফেরেশতাকে সৃষ্টি করেছেন আর সব ফেরেশতাই আল্লাহকে সম্মান করেন। কোনো নির্দিষ্ট ফেরেশতাকে বন্ধু বা শত্রু ভাবার কোনো কারণ নেই। রাসূলুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবন সালামের এই ভুল ধারণাটিকে সংশোধন করে দিলেন।

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে রাসূলুল্লাহ যা বলেছেন তাতে আরেকটি লক্ষ্যণীয় ব্যাপার আছে। এই দুনিয়াতে মাছের কলিজা হয়তো খুব জনপ্রিয় কোনো খাবার নয়, কিন্তু জান্নাতের সবকিছুই দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। নাম শুনে একই রকম মনে হলেও জান্নাতে সবকিছু পুরোপুরি ভিন্ন হবে। আর তৃতীয় প্রশ্নের যে উত্তর আল্লাহর রাসূল দিয়েছেন তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বিজ্ঞান বলে যে, যদি পিতার জিন (Gene) সন্তানের উপর প্রভাব বিস্তার করে তবে সন্তান পিতার অনুরূপ হবে আর একইভাবে যদি মায়ের জিন সন্তানের উপর প্রভাব বিস্তার করে তবে সন্তান মায়ের অনুরূপ হবে। এখানে রাসূলুল্লাহ ঠিক এ কথাটিই বলেছেন, কারণ বীর্যের মাধ্যমে পুরুষের জিন এবং ডিম্বাণুর মাধ্যমে মহিলার জিন প্রবাহিত হয়।

ইহুদিরা মুখের উপরে যেভাবে আবদুল্লাহ ইবন সালাম সম্পর্কে মিথ্যে বলেছে – তা দেখে বোঝা যায় তারা মিথ্যাচারে কতটা পারদর্শী। এই ধরনের ছোট ছোট ঘটনাগুলো মুসলিম ও ইহুদিদের সম্পর্কে ভাঙনে প্রভাবক হয়ে দাঁড়ায়। ইহুদিরা কোনোভাবেই মুহাম্মাদকে রাসূল হিসেবে এবং ইসলামকে একমাত্র সত্য ও শেষ দ্বীন হিসেবে মেনে নিতে পারছিল না। তারা আড়ালে থেকে প্রায়ই ইসলামি রাষ্ট্রের ব্যাপারে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করতো।

অন্য এক বর্ণনায় ইবন আব্বাস বলেছেন, যখন আবদুল্লাহ ইবন সালাম, সালাবা ইবন সা'ইয়া, উসাইদ ইবন সা'ইয়া, আসাদ ইবন উবাইদসহ আরও কিছু ইহুদি মুসলিম হয়ে গেল তখন ইহুদিদের আলিমরা বলতে লাগলো, "যারা মুহাম্মাদের দ্বীনের অনুসারী হয়েছে তারা আমাদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ লোক।" তারা মনে করতো যদি এই লোকগুলো আসলেই ধার্মিক হতো তারা তাদের পূর্বপুরুষদের দ্বীন ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করতো না।"

"তারা সবাই সমান নয়। আহলে কিতাবদের মধ্যে কিছু লোক এমনও আছে যারা অবিচলভাবে আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করে এবং রাতের গভীরে তারা সেজদা করে। তারা আল্লাহর প্রতি ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে এবং কল্যাণকর বিষয়ের নির্দেশ দেয়; অকল্যাণ থেকে বারণ করে এবং সৎকাজের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করতে থাকে। আর এরাই হলো সৎকর্মশীল। তারা যেসব সৎকাজ করবে, কোনো অবস্থাতেই সেগুলোর প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হবে না। আর আল্লাহ মুত্তাকীদের বিষয়ে অবগত।” (সূরা আলে- ইমরান, ৩: ১১৩-১১৫)

টিকাঃ
৮২. সহীহ বুখারি, অধ্যায় নবীদের কাহিনী, হাদীস ৪।

ফন্ট সাইজ
15px
17px