📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আহলুস-সুফফা

📄 আহলুস-সুফফা


যখন ক্বিবলা উত্তর দিক, অর্থাৎ জেরুসালেম বরাবর ছিল তখন মসজিদ-ই-নববীর পাশে ছায়ার জন্য একটি ছাউনি তৈরি করা হয়। সেই ছাউনিটি আস-সুফফা নামে পরিচিত ছিল। ইবন হাজর আস-সুফফা সম্পর্কে বলেছেন যে, মসজিদ-ই-নববীর পিছনের জায়গাটি আস-সুফফা নামে পরিচিত ছিল। এখানে ছিল একটি ছাউনি। এটি মূলত সেসব মানুষদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল যাদের কোনো পরিবার বা থাকার জায়গা ছিল না। সেখানে যারা থাকতেন তাদের বলা হতো আহলুস-সুফফা। আবু হুরাইরা ছিলেন একজন আহলুস-সুফফা। তিনি বলেছেন, আস-সুফফার অধিবাসীরা ছিলেন ইসলামের অতিথি। তাদের দেখাশোনা করার জন্য কোনো পরিবার অথবা সম্পদ ছিল না। তাই তাঁরা সেখানে থাকতেন। যারা সেখানে থাকতেন তাদের সবাই যে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে নিতান্তই বাধ্য হয়ে থাকতেন বিষয়টি তেমন নয়। কেউ কেউ স্বেচ্ছায় আহলুস-সুফফায় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এমন একজন সাহাবী ছিলেন আবু হুরাইরা। তাঁর সম্পদ ছিল কিন্তু তিনি পড়াশোনা করে দিন কাটাতে ভালোবাসতেন। তাই তিনি আস-সুফফায় অন্যান্যদের সাথে থাকতেন। আবু হুরাইরা প্রথমদিকের সাহাবী ছিলেন না। তিনি অনেক পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তারপরেও তিনি মুহাজির ও আনসারদের থেকে অনেক বেশি হাদীস বর্ণনা করেছেন। কীভাবে তা সম্ভব হলো? এই ব্যাপারে আবু হুরাইরা বলেছেন, মুহাজিররা যখন ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন তখন তিনি ক্ষুধা পেটে রাসূলুল্লাহকে অনুসরণ করতেন। তাঁর তেমন কিছুই ছিল না কিন্তু তারপরও তিনি রাসূলুল্লাহর সাথে সাথে থাকতেন। মুহাজিররা কিছু ভুলে গেলে তিনি সেগুলো মনে রাখতেন। অন্যদিকে আনসাররা তাদের ক্ষেতের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত। আনসাররা কিছু ভুলে গেলে তিনি সেগুলো মনে করিয়ে দিতেন।

আবু হুরাইরা তাঁর দ্বীনি পড়াশুনার জন্য 'ফুল টাইম' বরাদ্দ রেখেছিলেন বলেই রাসূলুল্লাহর হাদীস নিয়ে পর্যালোচনা করার মতো সময় পেতেন। তিনি রাতের সময়কে তিন ভাগে ভাগ করতেন: এক অংশ ছিল ঘুমানোর জন্য, আরেক অংশ ইবাদতের জন্য বরাদ্দ এবং অন্য অংশে সারাদিন তিনি রাসূলুল্লাহর যত হাদীস শুনেছেন তা নিয়ে পর্যালোচনা করতেন। যখন অন্যান্য মুহাজির ও আনসারগণ ব্যবসা ও ক্ষেতের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, তখন আবু হুরাইরা আহলুস-সুফফাতে সময় দিতেন এবং রাসূলুল্লাহর সাথে থেকে সারাদিন পড়াশোনা করতেন। আস-সুফফায় যারা থাকতেন তাদের ভরণপোষণের একটি উৎস ছিল রাসূলুল্লাহর পাঠানো সাদাকাহ। রাসূলুল্লাহ কোনো সাদাকাহ পেলে সেখানে পাঠিয়ে দিতেন। তিনি কোনো উপহার পেলে নিজের জন্য কিছু রেখে বাকিটুকু সুফফাবাসীদের জন্য পাঠিয়ে দিতেন। তিনি ধনী সাহাবীদের উৎসাহ দিতেন যেন তাঁরা আস-সুফফার অধিবাসীদের নিজেদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানায়। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'যদি কারো কাছে দুইজনের জন্য যথেষ্ট খাবার থাকে তাহলে সে যেন সেই খাবারে তৃতীয়জনকে আহ্বান করে। যদি কারো কাছে চারজনের জন্য যথেষ্ট খাবার থাকে তাহলে সে যেন আরো এক বা দুইজনকে সেই খাবারে শরীক করে। ' যেসব সাহাবা আহলুস-সুফফাদের নিমন্ত্রণ করতেন তাঁরা কোটিপতি ছিলেন এমন নয়। কিন্তু রাসূল তাদের বলেছেন যদি তাদের কাছে দুইজনের যথেষ্ট খাবার থাকে তাহলে যেন তৃতীয় আরেকজনকে নিয়ে খায়। উদারতা ও অন্যের জন্য নিজের জিনিস ছেড়ে দেওয়া - এই গুণগুলো ইসলামের একেবারে প্রাথমিক যুগ থেকে অনুশীলিত হয়ে আসছে। ইসলামের প্রথম প্রজন্মের মানুষগুলোর মধ্যে যে বন্ধন দেখা যায় তা আর কোনো যুগে দেখা যায় না। এতিম, গরিব, অভাবীদের প্রতি দয়া দেখানো, অতিথির সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করা - এ সকল ব্যাপারে আল্লাহ আযযা ওয়াজাল কুরআনের অনেক আয়াত অবতীর্ণ করেছেন। এ কাজগুলো কিন্তু ইবাদাতেরই অন্তর্ভুক্ত। কুরআন নাযিলর শুরু থেকে এসব ব্যাপারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। মুসলিম হওয়ার সাথে অন্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার জড়িত এবং এই ইবাদাত আল্লাহ তাআলার অনেক পছন্দের একটি ইবাদাত।

ফাতিমা ছিলেন রাসূলুল্লাহর মেয়ে। রাসূলুল্লাহ তাঁর এই মেয়েকে খুবই ভালোবাসতেন। ফাতিমা ঘরের সমস্ত কাজ নিজ হাতে করতেন, তাঁর হাতে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল। স্বামী আলী ইবন আবি তালিব তাঁকে জানালেন যে, রাসূলুল্লাহর হাতে কিছু দাস এসেছে, ফাতিমা যেন তাঁর পিতার কাছে গিয়ে একজন দাসের জন্য সুপারিশ করেন। ফলে, ফাতিমা তাঁর পিতার কাছে গিয়ে একজন দাসের জন্য অনুরোধ করলেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, 'আমি তোমাকে কোনো দাস দিতে পারছি না, কারণ আমি সুফফাবাসীদের খালি পেটে থাকতে দিতে পারি না। তাদের জন্য খরচ করার মতো টাকা আমার কাছে এখন নেই। আমি এই দাসদের বিক্রি করে দিব আর সেই টাকা তাদের জন্য ব্যয় করা হবে।' এ থেকে বোঝা যায় রাসূলুল্লাহ আহলুস-সুফফার জন্য কত চিন্তিত ছিলেন।

এমনটা ভাবা সমীচীন হবে না যে, আহলুস-সুফফারা বসে বসে বিনামূল্যে খাবার খেতেন আর কোনো কাজ করতেন না। বরং তাঁরা ছিলেন ইবাদাতগুজার লোক, তাঁরা ছিলেন সত্যিকারের আবেদ। তাঁরা দ্বীনের ব্যাপারে অনেক জ্ঞান রাখতেন। তাঁরা ছিলেন আলিম, মুজাহিদ। তাদের মধ্যে অনেকে শহীদও হয়েছেন। যেমন আবু হুরাইরা, তিনি আহলুস-সুফফার একজন সদস্য ছিলেন। তিনিই সবচেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আহলুস-সুফফার আরেকজন সদস্য হলেন হুযাইফা ইবন ইয়ামান তিনি শেষ যমানার অধিকাংশ হাদীস বর্ণনা করেছেন। আহলুস-সুফফার সদস্যদের মধ্যে হারিসা ইবন নু'মান, সালিম ইবন উমাই, খুনাইস ইবন হুদাইফাহ, সুহাইব ইবন সিনান বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। হানযালা শহীদ হয়েছিলেন উহুদের যুদ্ধে, ফেরেশতারা তাঁকে গোসল দিয়েছিলেন। আস-সুফফার অনেকেই হুদাইবিয়াহসহ অন্যান্য যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেছেন। তাদের অনেকেই জীবিকা নির্বাহের জন্য খেজুরের বীজ সংগ্রহ করে পশুপাখির খাবার হিসেবে বিক্রি করতেন। তাঁরা জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ কর্ম করার চেষ্টা করতেন কিন্তু মদীনার অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে, তাঁরা অন্যের দারস্থ হতে বাধ্য হয়েছিলেন।

অবস্থাভেদে আস-সুফফার অধিবাসীদের সংখ্যা উঠানামা করতো। গড়ে মোটামুটিভাবে ৭০জন সেখানে ছিলেন। তাঁরা মসজিদ-ই-নববীর পিছনেই দিনরাত ২৪ ঘণ্টা থাকতেন। তাঁরা পড়াশোনার দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন, কেননা তাঁরা সবসময় মুসলিমদের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র মসজিদ-ই-নববীর কাছাকাছি থাকতেন। আর এটি ছিল ইসলামের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। এ কারণেই তাঁরা অন্যান্যদের চেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনা করেছেন।

ইসলামের প্রথম প্রজন্মের সমাজটি ছিল খুব শক্তিশালী একটি সমাজ। কারণ তাঁরা একে অপরকে দেখে রাখতেন এবং কষ্ট লাঘব করতেন। স্বার্থপরতা সে সমাজে ছিল না বিধায়, কঠিন সময়েও তাঁরা একে অপরের পাশে থেকেছেন। আর তাই তাদের মাধ্যমে ইসলাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। মুনাফিকরা তাদের ভ্রাতৃত্বে কোনো চিড় ধরাতে পারেনি।

সে সময়টাতে মুসলিমদের সম্পদ খুব একটা ছিল না কিন্তু তারপরেও তাঁরা সমাজে কল্যাণমূলক সেবাগুলো চালু রেখেছেন। আস-সুফফায় যারা থাকতেন তাঁরা আল-আনসারদের বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করতেন। সমাজের মানুষদের বিভিন্ন প্রকার প্রয়োজন মেটানোও এক ধরনের দাওয়াত। উবাদাহ ইবনুস-সামিত বর্ণনা করেন, 'যখন রাসূলুল্লাহ খুব ব্যস্ত হয়ে পড়তেন তখন তিনি নওমুসলিমদের দায়িত্ব আমাদের কাঁধে ন্যাস্ত করতেন। যখন কোনো নওমুসলিম রাসূলুল্লাহর কাছে আসত তখন তিনি ব্যস্ত থাকলে আমাদের কাছে তাকে কুরআন শিক্ষা দেওয়ার জন্য পাঠিয়ে দিতেন। রাসূলুল্লাহ আমার কাছে এক ব্যক্তিকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি আমার বাড়িতে ছিলেন। আমরা তাকে পরিবারের সদস্যদের মতোই দেখাশোনা করেছিলাম আর তাকে কুরআন শিখিয়েছিলাম।'

আনসাররা এই ব্যাপারটি মনে রাখতেন যে, এই মুহাজিররা সবকিছু ছেড়েছুড়ে মদীনায় এসেছেন। তাই তাদের এখন সাহায্য দরকার। রাসূল মুসলিম সমাজকে একটি সুসংগঠিত ও সুসংবদ্ধ সমাজ হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি প্রতিটি দলের একজন করে নেতা নির্বাচন করে দেন। যেমন আবু হুরাইরা ছিলেন আহলুস-সুফফার আরীফ। আরীফ হলেন কোনো দলের প্রতিনিধি অথবা তাদের যাবতীয় প্রয়োজন মূল নেতাকে জানানোর ব্যবস্থাকারী। আবু হুরাইরা আহলুস- সুফফার প্রতিনিধি ছিলেন। রাসূলুল্লাহ আহলুস-সুফফাকে কোনো সংবাদ দিতে বা কিছু বলতে চাইলে আবু হুরাইরার কাছেই সংবাদ পাঠাতেন।

টিকাঃ
৭২. সহীহ বুখারি, অধ্যায় সালাতের ওয়াক্ত, হাদীস ৭৮।

ফন্ট সাইজ
15px
17px