📄 মসজিদের জন্য জায়গা নির্বাচন
রাসূলুল্লাহ তাঁর উটে চড়ছিলেন আর লোকজন যার যার দিকে উটটিকে টানছিল। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, 'এটিকে ছেড়ে দাও, কারণ এটি আল্লাহর নির্দেশে চলছে।' উটটি মদীনার রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলো। এটি থামলো একটি শুকনো খেজুরের মাঠে। সেই মাঠের মালিক ছিল দুই এতিম ছেলে। উটটি থামলে রাসূলুল্লাহ বললেন, 'এটিই হলো আমাদের মসজিদের জায়গা।' অতঃপর সেই জায়গাটি মসজিদের জন্য এবং রাসূলুল্লাহর থাকার জায়গা হিসেবে নির্বাচন করা হলো।
রাসূলুল্লাহ জায়গাটি এতিম বালকদের কাছ থেকে কিনে নিতে চাইলেন। কিন্তু তারা বিক্রি করতে রাজি হলো না বরং তারা সেই জায়গাটি কোনো টাকা ছাড়াই রাসূলুল্লাহকে দিতে চাইল। অবশেষে মসজিদ-ই-নববীর নির্মাণ কাজ শুরু হলো। মসজিদের দেয়াল তৈরি করা হয়েছিল কাদামাটির ইট দিয়ে আর ছাদ নির্মাণ করা হয়েছিল তালপাতা দিয়ে। বৃষ্টি হলে পাতা চুইয়ে বৃষ্টির পানি তাদের মাথায় পড়তো, আর মেঝেতে ছিল শুধু বালি। মসজিদটি ছিল খুবই সাদামাটা কিন্তু এটি হলো ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে বরকতময় মসজিদ। এখানেই মুসলিমদের প্রথম ও সেরা প্রজন্মটি দ্বীনের শিক্ষা লাভ করেন। রাসূলুল্লাহ নিজেও সাহাবাদের সাথে মসজিদ নির্মাণে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি নিজ কাঁধে ইট বহন করেছিলেন।
📄 মসজিদ নির্মাণের ঘটনা থেকে শিক্ষা
# "তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শক্তি-সামর্থ, দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে..." (সূরা হাজ্ব, ২২: ৪১)
আল্লাহ আযযা ওয়াজাল মুসলিমদেরকে জমিনে কর্তৃত্ব দান করার পর তাঁরা প্রথমে যে কাজটি করেছেন তা হলো সালাত প্রতিষ্ঠা করা। সালাত প্রতিষ্ঠার এই কাজ শুরু হয়েছিল মসজিদ নির্মাণের মধ্য দিয়ে।
# মসজিদের নির্মাণকাজে রাসূলুল্লাহ স্বশরীরে শ্রম দিয়েছেন। আরামে বসে থেকে অন্যদের আদেশ দিয়ে কাজ করিয়ে নেননি। ইসলামে নেতৃত্ব মানে অন্যকে আদেশ দেওয়া নয়, ইসলাম নেতৃত্ব হলো অন্যের সেবা। আর এ কাজটি রাসূলুল্লাহ নিজ হাতে করে দেখিয়েছেন।
# ইসলাম মানুষের দক্ষতাকে মূল্যায়ন করে। মানুষ যে কাজে দক্ষ সেই কাজটাই তার করা উচিত। যেমন, মসজিদ-ই-নববীর নির্মাণকাজে রাসূলুল্লাহ ও সাহাবাদের সাথে বনু নজদের এক লোক ছিলেন। তিনি পেশায় ছিলেন একজন মিস্ত্রী। এই ব্যক্তি সকলের সাথে ইট আনা-নেওয়ার কাজে যোগ দিতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে এই কাজে নিয়োজিত না করে বরং ইটের মিশ্রণ তৈরি করার কাজে নিয়োগ দিলেন। রাসূলুল্লাহ এই নির্মাতা ব্যক্তিকে সেই কাজটিই করতে বলেছেন যে কাজে তিনি দক্ষ। দ্বীনের কাজে সবাই একই কাজ করবে – বিষয়টি তেমন নয়। সবাইকে যে একজন ভালো দাঈ, ইমাম বা আলিম হওয়া লাগবে ব্যাপারটি আসলে তা না। আল্লাহ তাআলা একেকজনকে একেক রকম দক্ষতা বা গুণ দিয়েছেন। আর এই দক্ষতাকে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগানোর জন্য সবার যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত। ভালো নেতার গুণ হলো তিনি তার কর্মীদের দক্ষতা কিসে তা খুঁজে নিতে পারেন এবং সেই দক্ষতাকে বিকশিত করে তুলতে সাহায্য করেন। তবে এসব দক্ষতা অবশ্যই ইসলামের স্বার্থে কাজে লাগাতে হবে।
📄 মসজিদের ভূমিকা
"আল্লাহ যেসব ঘরকে মর্যাদায় উন্নীত করা এবং সেগুলোতে তাঁর নাম উচ্চারণ করার আদেশ দিয়েছেন, সেখানে সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এমন লোকেরা, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় বিরত রাখে না আল্লাহর স্মরণ থেকে, সালাত কায়েম করা থেকে এবং যাকাত প্রদান করা থেকে। তারা ভয় করে সেই দিনকে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে। (তারা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে) যাতে আল্লাহ তাদের উৎকৃষ্টতর কাজের প্রতিদান দেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও অধিক দেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিযিক দান করেন"। (সূরা নূর, ২৪: ৩৬-৩৮)
বর্তমান সময়ে মসজিদকে শুধু মাত্র ইবাদাতের স্থান মনে করা হলেও, রাসূলুল্লাহর যুগে মসজিদকে শুধুই ইবাদাতের স্থান মনে করা হতো না। এটি ছিল ধর্মীয় ও সামাজিক স্থান। মসজিদ ছিল সমাজের ব্যস্ততম প্রাণকেন্দ্র।
# মসজিদ ইট-কাঠের নিছক একটি দালান নয়। মসজিদের প্রাণ হলো মসজিদের ভিতরে থাকা মানুষগুলো। কুরআনে সেই সব মানুষের প্রশংসা করা হয়েছে যারা আল্লাহ তাআলার ঘর মসজিদে অবস্থান করে এবং সেখানে শুধুমাত্র আল্লাহর কথা স্মরণ করে। তারা হয়তো ব্যবসা-বাণিজ্য করে, কিন্তু মসজিদে গেলে তারা সেসবের কথা স্মরণ করে না। আল্লাহ তাআলার ঘরে থাকা অবস্থায় তারা শুধুমাত্র আল্লাহকেই স্মরণ করে। মসজিদ হচ্ছে সালাত ও যিকরের স্থান। এটিই মসজিদের প্রথম ও প্রাথমিক ভূমিকা।
# মসজিদ মুসলিমদের জন্য শিক্ষাকেন্দ্র। মক্কায় মুসলিমদের শিক্ষাকেন্দ্র ছিল দার-উল-আরকাম, আর মদীনায় ছিল মসজিদ-ই-নববী। এখানেই রাসূলুল্লাহ খুতবা দিতেন, কথা বলতেন, আলোচনা করতেন। সাহাবাগণ মসজিদে একসাথে বসে আল্লাহ তাআলার কিতাব নিয়ে পড়াশোনা করতেন।
# রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'যদি মানুষ আল্লাহ তাআলার ঘরে (মসজিদে) একত্রে বসে আল্লাহ তাআলার কিতাব অধ্যয়ন করে এবং তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে, তাহলে আল্লাহ তাদেরকে চারটি জিনিস দেবেন: 'সাকিনা (প্রশান্তি), রাহমা (দয়া), ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখবে এবং আল্লাহ তাআলা আরও উন্নত জমায়েতে তাদের নাম উল্লেখ করবেন।'
# মসজিদ হলো মুসলিমদের একে অপরের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করার জায়গা। এটি তাদের সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেসব মুসলিমরা মসজিদে জামা'আতে সালাত এবং জুমু'আর সালাত আদায় করেন তারা দিনে পাঁচবার একে অপরের সাথে দেখা করার সুযোগ পান। এটি তাদের মধ্যকার ভ্রাতৃত্ববোধকে মজবুত করে দেয়।
# মসজিদ-ই-নববী ছিল পথিক ও গরিবদের জন্য থাকার জায়গা। এই মসজিদে আশ্রয় নেওয়া সাহাবীদের বলা হতো আহলুস-সুফফা।
# মসজিদ থেকেই তৎকালীন সময়ে সেনাদল জিহাদের জন্য যাত্রা আরম্ভ করতো। আমীরের হাতে জিহাদের পতাকা তুলে দেওয়া হতো মসজিদেই।
# মসজিদ হলো দাওয়াতের স্থান। ইয়েমেন থেকে আগত খ্রিস্টানরা মসজিদে অবস্থান করেছিল। তারা সেখানে অবস্থানকালে মুসলিমদের ইবাদতরত অবস্থায় দেখতে পেত এবং মুসলিমদের সাথে রাসূলুল্লাহর আলোচনাও শুনতে পেয়েছিল। এর থেকে বোঝা যায়, দাওয়াহর স্বার্থে অমুসলিমরা মসজিদে প্রবেশের অনুমতি পেতে পারে।
মসজিদ-ই-নববী খুবই সাদামাটা ছিল কিন্তু এখান থেকেই জ্ঞানার্জন করেছেন মুসলিমদের শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম, সাহাবাগণ। অথচ বর্তমান সময়ে অনেক বড় বড় মসজিদ থাকলেও এই মসজিদগুলো 'ইলমের প্রতীক নয়, বরং অর্থের শ্রাদ্ধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।