📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মদীনার আর্থসামাজিক কাঠামো

📄 মদীনার আর্থসামাজিক কাঠামো


সে সময় মদীনাতে পাঁচটি গোত্র ছিল। সেগুলোর মধ্যে তিনটি ছিল ইহুদিদের গোত্র এবং দুইটি ছিল আরবদের গোত্র। বনু নাযির, বনু কুরায়যা ও বনু কায়নুকা – এগুলো ছিল ইহুদি গোত্র। বনু কায়নুকার বসবাস ছিল মদীনার কেন্দ্রে, তারা অলংকারের ব্যবসা করতো। আগে তারা মদীনার উপকণ্ঠে বসবাস করতো। কিন্তু অন্যান্য ইহুদিদের সাথে তাদের যুদ্ধ হওয়ার পর তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। বনু নাযির ও বনু কুরায়যা উভয়ই মদীনার প্রান্তে বসবাস করতো। তাদের ছিল ৫৯টি দুর্গ। তাদের ছিল ২০০০ সৈন্যবিশিষ্ট সামরিক বাহিনী। অন্যদিকে আল-আওস ও আল-খাযরাজ ছিল আরব গোত্র। তাদের সামরিক বাহিনী ছিল ৪০০০ সৈন্যবিশিষ্ট। এদের মধ্যে একটি গোত্র মদীনার উত্তরে বসবাস করতো আর অন্য গোত্রটি দক্ষিণে। মদীনা ছিল অনেকগুলি এলাকার সমন্বয়ে গঠিত। একেক এলাকায় ছিল একেক গোত্রের বসবাস। মদীনাবাসীর জীবিকা ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। মদীনায় ছিল খেজুরের বাগান। সেগুলো চাষ করার জন্য কৃষকদের টাকা প্রয়োজন হতো, ফলনের সময় হলে তারা সে টাকা পরিশোধ করতো। ইহুদি গোত্রগুলো তাদেরকে সুদের বিনিময়ে এই টাকা ধার দিত। এ কারণে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে কিছু তিক্ততা বিদ্যমান ছিল।

এই ছিল মোটামুটিভাবে ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে মদীনার অবস্থা। ইসলাম আসার পর মদীনার বহুমাত্রিক সমাজে মুশরিক, ইহুদিদের সাথে নতুন যোগ হয় মুসলিমরা। তাই রাসূলুল্লাহকে খুব সাবধানতার সাথে সবাইকে সামাল দিতে হয়েছে।

কিন্তু মদীনার কিছু লোক রাসূলুল্লাহর আগমনে খুশি হতে পারেনি। বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠী একসাথে থাকার কারণে মদীনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কিছুটা জটিলতার সৃষ্টি হয়। একবার রাসূলুল্লাহ তাঁর গাধার পিঠে চড়ছিলেন। সে সময় একটি সমাবেশ দেখতে পেয়ে সেখানে গেলেন। সেই সমাবেশে আরব, মুসলিম, অমুসলিম ও ইহুদি- সবাই ছিল। তাঁর গাধাটি যেতে যেতে ধূলো উড়োচ্ছিল। তখন আবদুল্লাহ ইবন উবাই বললো, 'যান তো, আপনার ধূলো আমাদের কাছ থেকে সরিয়ে নিন।'

আবদুল্লাহ ইবন উবাই পরবর্তীতে মুনাফিকদের নেতা হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ তাঁর কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে উপস্থিত সবাইকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। দাওয়াত দেওয়া শেষ হলে আবদুল্লাহ ইবন উবাই বললো, 'দেখুন, আমাদের সমাবেশে এসে এভাবে বিরক্ত করবেন না। যেখানে উঠেছেন সেখানেই থাকুন আর আপনার এসব গল্প তাদের সাথে করুন যারা আপনার কাছে আসে। আগ বাড়িয়ে আমাদের সাথে এসব গল্প করবেন না।' সাথে সাথে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বলে উঠলেন, 'না! আমরা চাই তিনি আমাদের সমাবেশে আসবেন এবং কথা বলবেন।' উপস্থিত লোকেরা চিৎকার-চেঁচামেচি এবং কথা কাটাকাটি শুরু করে দিল। ব্যাপারটা এমন এক পর্যায়ে চলে গেল যেন যুদ্ধ বেঁধে যাবে। অবস্থা বেগতিক দেখে রাসূলুল্লাহ সবাইকে শান্ত করতে লাগলেন, পরে সবকিছু শান্ত হলো।

রাসূলুল্লাহ সাদকে জিজ্ঞেস করলেন, 'সাদ তুমি কি দেখনি আবদুল্লাহ ইবন উবাই কী করেছিল?' সাদ জানতে চাইলেন কী ঘটেছে। রাসূলুল্লাহর কাছে থেকে বিস্তারিত শোনার পর তিনি বললেন, 'আপনি আসার আগে আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে তার গোত্রের লোকেরা রাজা হিসেবে প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছিল। এজন্য সে আপনাকে তার প্রতিদ্বন্দী মনে করে।' খাযরাজ গোত্র আবদুল্লাহ ইবন উবাইকে তাদের নেতা বানানোর সবরকম প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল কিন্তু রাসূলুল্লাহ আগমনের কারণে সবাই রাসূলুল্লাহকে তাদের শাসক হিসেবে মেনে নেয়। এ কারণে উবাই আর রাজা হতে পারেনি। এরকমই একটি কঠিন জটিল পরিস্থিতিতে মদীনায় আল্লাহর রাসূলের আগমন ঘটে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px