📄 গোপনীয়তার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা
হিজরতের সময়ে এবং মাক্কী জীবনের শেষ দিকে রাসূলুল্লাহ প্রায় সব কাজেই অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে চলছিলেন। ইসলাম ও মুসলিমদের রক্ষা করার জন্যই তিনি গোপনীয়তা বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু গোপনীয়তা ও দাওয়াহর মধ্যে অবশ্যই ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। হিজরতের একটি ছোট্ট ঘটনা দেখিয়ে দেয় কীভাবে এই দুটো কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হয়।
রাসূলুল্লাহর মক্কা ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি খুব কম লোকই জানতো। আলী ইবন আবু তালিব, আবু বকর ও তাঁর পরিবার ছাড়া আর কেউই বিষয়টি জানতেন না। হিজরতের সময় রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর যখন বের হলেন, তখন তাদের কোনো কিছুর দরকার পড়লে আবু বকরের ব্যবসায়িক পরিচিতি বেশ কাজে লাগত। কারণ আবু বকর ব্যবসা সংক্রান্ত কাজের জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেতেন, তাই তিনি মক্কার বাইরের অনেক গোত্রের কাছে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে, মক্কার বাইরের লোকজন রাসূলুল্লাহর নাম শুনলেও তাঁকে সরাসরি খুব একটা চিনতো না। রাসূলুল্লাহ মূলত মক্কা আর মক্কার বাইরে শুধু তাইফে তাঁর দাওয়াহর কাজ করেছেন। অনেকেই তাঁর নাম শুনেছিল কিন্তু তিনি দেখতে কেমন ছিলেন সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না। আবু বকর বেশ পরিচিত থাকায় কেউ তাদেরকে দেখলে আবু বকরের সাথে কথা বলতে এগিয়ে আসতো। তারা আবু বকরকে জিজ্ঞেস করতো যে, তাঁর সাথে থাকা লোকটি কে অর্থাৎ তারা রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো। তখন আবু বকর জবাব দিতেন এভাবে, 'ইনি হলেন আমার পথপ্রদর্শক, আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।' এ কথা শুনে তারা মনে করতো, আবু বকরের সাথে থাকা এই লোক অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ আবু বকরকে মরুভূমির মধ্য দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যদিও আবু বকর বুঝিয়েছেন ভিন্ন কথা, তিনি বুঝিয়েছিলেন রাসূলুল্লাহকে আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত পথের অভিমুখে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। কিন্তু তিনি এটা এমনভাবে বলতেন যাতে রাসূলুল্লাহর আসল পরিচয় গোপন থাকে কেননা রাসূলুল্লাহর জীবন ছিল হুমকির মুখে। আবু বকর মিথ্যাও বলেননি, ঘুরিয়ে কথা বলেছেন। এটাকে বলা হয় তাউরী, গোপনীয়তা রক্ষা করা।
কিন্তু একই সাথে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার সময় নিজের পরিচয় প্রকাশ করে দেওয়াটাই হিকমাহ। তাই হিজরতকালে যখন রাসূলুল্লাহর সাথে আবু বুরাইদাহ আল আসলামির দেখা হয়, তখন তিনি নিজেকে সর্বশেষ রাসূল হিসেবেই নিজের পরিচয় দেন এবং তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দেন। এরপরে আবু বুরাইদাহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে বুরাইদাহ রাসূলুল্লাহর সাথে ১৯টি যুদ্ধের মধ্যে ১৬টি যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ হিজরতের সময়েই দুইজন চোরকে দাওয়াত দিয়েছিলেন, তারাও মুসলিম হয়ে যায়। তিনি তাদের নাম জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে, 'আমাদের নাম হলো আল মুহানান', আল মুহানান মানে হলো 'অসম্মানিত ব্যক্তি'। রাসূলুল্লাহ তাদের এ নাম বদলে দিয়ে তাদেরকে 'মুকরামান' বা 'সম্মানিত ব্যক্তি' হিসেবে ঘোষণা করেন।
মাক্কী জীবনেও এরকম আরেকটি ঘটনা রয়েছে। একবার রাসূলুল্লাহ একজন মেষপালককে দাওয়াত দিয়েছিলেন। তিনি সেই মেষপালকের কাছে দুধ খেতে চাইলেন। মেষপালক বললো, এই মুহূর্তে কোনো ছাগলের কাছেই দুধ নেই। এরপর রাসূলুল্লাহ তার কাছে ছাগলের দুধ দোহন করার অনুমতি চাইলেন। মেষপালকের অনুমতি পেয়ে রাসূলুল্লাহ দুধ দোহন করা শুরু করলেন, আর প্রচুর পরিমাণে দুধ বের হয়ে আসল। প্রথমে মেষপালককে দুধ পান করতে দেওয়া হলো, এরপরে রাসূলুল্লাহ ও তারপরে আবু বকর দুধ পান করলেন। তখন মেষপালক রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলো,
- আকাশের শপথ! সত্যি করে বলুন তো কে আপনি? আমি আপনার মতো কাউকে এখনো দেখিনি।
- আমি যদি আমার আসল পরিচয় তোমাকে দেই তাহলে তুমি কি তা গোপন রাখবে?
- হ্যাঁ, রাখবো।
- আমি মুহাম্মাদ, আল্লাহর রাসূল।
- তবে কি আপনিই সে ব্যক্তি যাকে কুরাইশরা সাবিঈ বলে সম্বোধন করে?
সাবিঈ একটি অবজ্ঞাসূচক শব্দ, কুরাইশরা ইচ্ছা করে মুসলিমদেরকে হেয় করার জন্য এই নামে ডাকতো। রাসূলুল্লাহ জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, তারা এই নামে ডেকে থাকে।' তারপর মেষপালক বললো,
- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি যা বলেছেন তা সত্য এবং আপনি মাত্র যা করলেন তা একজন রাসূলই করতে পারে। আমি এখন থেকে আপনার উপর অবতীর্ণ দ্বীনের অনুসারী।
- তুমি এখনই তা কোরো না। যখন তুমি দেখবে আমি প্রকাশ্যে নিজেকে ঘোষণা করছি, তখন তুমি এসে আমাদের সাথে যোগ দিও।
রাসূলুল্লাহ তাঁকে মুসলিম হতে মানা করেননি, তিনি তাঁকে মুসলিম জামা'আতে যোগ দিতে বারণ করেন। কারণ রাসূলুল্লাহ তখনও গোপনে দাওয়াহর কাজ করে যাচ্ছিলেন। এভাবেই রাসূলুল্লাহ একইসাথে দাওয়াহ করেছেন ও নিজের পরিচয়ও গোপন রেখেছেন। এসব ঘটনা থেকে বুঝা যায় কীভাবে দাওয়াহ ও গোপনীয়তা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ শুধুমাত্র সেসব ব্যক্তির কাছেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন যাদেরকে দেখে তাঁর মনে হয়েছে যে তারা তাঁর ডাকে সাড়া দিবেন।
📄 স্বাবলম্বী হওয়া
রাসূলুল্লাহ যখন আবু বকরকে হিজরতের ব্যাপারে জানান তখন আবু বকর যাত্রার জন্য দ্রুত প্রস্তুত হয়ে যান। তিনি রাসূলুল্লাহকে জানালেন, হিজরতের জন্য দুইটি উট প্রস্তুত করা আছে। রাসূলুল্লাহ তাঁর কাছ থেকে উটটি কিনে নেন। এখানে লক্ষণীয়, একজন দাঈর অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। যখন একজন আলিম সরকারী খরচে জীবনযাপন করেন, তখন সরকারি বিষয়ে ফতোয়া দেওয়ার প্রয়োজন হলে একটি দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। সরকার তার পক্ষে ফতোয়া দেওয়ার জন্য সেই আলিমের উপরে চাপ দেয়। সরকারের উপর নির্ভরশীল হয়ে সরকারের কোনো অন্যায়ের বিপক্ষে কথা বলতে বা তাদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিতে অনেকেই দ্বিধাবোধ করে। এ কারণে আলিম, দাঈ ও ইসলামি ব্যক্তিত্বদের অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হওয়া জরুরী।