📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 সতর্কতার মধ্যমপন্থা

📄 সতর্কতার মধ্যমপন্থা


হিজরতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাসূলুল্লাহ সামান্যতম ছাড়ও দেননি। খুঁটিনাটি সব বিষয়ে তিনি সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন।

প্রথমত, রাসূলুল্লাহ মুখ ঢেকে দুপুর বেলা আবু বকরের বাসায় যান।
দ্বিতীয়ত, গোপনীয়তার স্বার্থে তিনি আবু বকরকে আলোচনার সময়ে বাড়িতে কে আছে সেটা জেনে নেন।
তৃতীয়ত, তিনি আলী ইবন আবু তালিবকে তাঁর বিছানায় শুয়ে থাকার নির্দেশ দেন যাতে শত্রুরা তাঁর চলে যাওয়ার ব্যাপারটি আঁচ করতে না পারে।
চতুর্থত, হিজরতের যাত্রার জন্য আগে থেকেই উট প্রস্তুত রাখা ছিল।
পঞ্চমত, চারপাশ অন্ধকার হলে রাসূলুল্লাহ আবু বকরকে সাথে নিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়েছিলেন।
ষষ্ঠত, তাঁরা একজন গাইড বা পথপ্রদর্শক ভাড়া করেছিলেন।
সপ্তমত, মদীনা ছিল মক্কার উত্তরে, কিন্তু শত্রুদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য তাঁরা প্রথমে দক্ষিণের দিকে যাত্রা শুরু করেন।
অষ্টমত, তাঁরা একটি গুহায় তিনদিন লুকিয়ে ছিলেন।
নবমত, আবদুল্লাহ দিনের বেলা তথ্য সংগ্রহ করার জন্য মক্কায় থেকে যেতেন আর রাতের বেলা গুহায় ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর কে সব জানাতেন।
দশমত, আমির ইবন ফুহায়রা তাদেরকে খাবার এনে দিতেন।

রাসূলুল্লাহ জানতেন যে আল্লাহ তাআলা তাঁকে রক্ষা করার ওয়াদা করেছেন এবং আল্লাহ তাআলার ওয়াদা সত্য। কিন্তু তারপরও তিনি মদীনাতে নিরাপদে পৌঁছানোর জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। তিনি এর মাধ্যমে শিক্ষা দিলেন যে, মুসলিম হিসেবে জাগতিক প্রচেষ্টার সবটুকুই ঢেলে দিতে হবে। রাসূলুল্লাহর দেখানো পথ অনুসারেই সকল প্রকার ইসলামি কাজকর্মের পরিকল্পনা করতে হবে ও সর্বোচ্চ শ্রম দিতে হবে। বিপদের ভয়ে প্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা যাবে না বরং যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করে কাজ করে যেতে হবে।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 মুসলিম নারীদের সাহসী ভূমিকা

📄 মুসলিম নারীদের সাহসী ভূমিকা


হিজরতের ঘটনার সিংহভাগ বর্ণিত হয়েছে আ'ইশার সূত্রে, পুরো ঘটনা তিনিই সংরক্ষণ করেছেন। আসমা বিনতে আবি বকরকে বলা হয়, 'যাতুন নিতাকাইন' বা দুই ফিতাওয়ালী। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সময় তিনি রাসূলুল্লাহ ও তাঁর বাবার জন্য থলেতে পাথেয় ও মশক গুছিয়ে দিচ্ছিলেন, কিন্তু মুখ বাঁধার জন্য কাছেধারে কোনো রশি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন নিজের কোমরের নিতাক বা বন্ধনী খুলে দু'টুকরো করে একটি দিয়ে থলে এবং অন্যটি দিয়ে মশকের মুখ বেঁধে দেন। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ তাঁর জন্য দুআ করেন আল্লাহ যেন এর বিনিময়ে জান্নাতে তাঁকে দুটি 'নিতাক' দান করেন, এজন্য তাঁর নাম হয় যাতুন নিতাকাইন।

হিজরতের পরে তাঁর উপর বেশ ঝড় যায়। আবু বকর চলে যাওয়ার পর আবু জাহেলসহ কুরাইশদের কিছু লোক তাঁর বাড়িতে আসে। আসমা দরজা খুলে দেন, আবু জাহেল আবু বকরের ব্যাপারে জানতে চায়। আসমা জবাব দিলেন তিনি জানেন না। এ কথা শুনে আবু জাহেল তাঁর গালে জোরে আঘাত করেন। কিন্তু তারপরও তিনি রাসূলুল্লাহ ও পিতা আবু বকরের নিরাপত্তার কথা ভেবে তা ধৈর্য ধরে সয়ে নেন। এখানে আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয় যে, তিনি সত্য গোপন করেছিলেন এবং মুসলিমদের নিরাপত্তার স্বার্থে মিথ্যা বলা যায়।

আবু বকরের পিতা, অর্থাৎ আসমা বিনত আবি বকরের দাদা ছিলেন অন্ধ, তিনি এসে বললেন, 'আমার ছেলে দেখছি তোমাকে ভালো ঝামেলার মধ্যে ফেলে চলে গেছে। তোমার জন্য কোনো টাকা-পয়সাও রেখে যায় নি।' আসমা ছিলেন বুদ্ধিমতী। তিনি একটি বস্তার মধ্যে কিছু পাথর ভরে নিয়ে এসে সেটা তাঁর দাদার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বুঝাতে চাইলেন যে তাঁর পিতা আবু বকর অনেক টাকাপয়সা রেখে গিয়েছেন। দাদা শুনে খুব খুশি হলেন। দাদাকে শান্ত রাখার জন্যই তিনি এই কাজটি করেছিলেন।

টিকাঃ
৬৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৩।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বন্ধু নির্বাচনের গুরুত্ব

📄 বন্ধু নির্বাচনের গুরুত্ব


রাসূলুল্লাহ তাঁর বন্ধু হিসেবে আবু বকর সিদ্দীককে বেছে নিয়েছিলেন। আবু বকর ছিলেন রাসূলুল্লাহর সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তিনি যখন জানতে পারলেন তিনি রাসূলুল্লাহর সাথে হিজরত করার মতো সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন, তখন তিনি আনন্দে কেঁদেই ফেলেছিলেন। আবু বকর ছিলেন বুদ্ধিমান, আস্থাভাজন একজন মানুষ। গুহায় আশ্রয় নেওয়ার সময় তিনি রাসূলুল্লাহকে প্রথমে গুহায় ঢুকতে না দিয়ে নিজে আগে ঢুকে পরীক্ষা করে নেন বিপজ্জনক কিছু আছে কি না। অতঃপর নিশ্চিত হয়ে তিনি রাসূলুল্লাহকে ভেতরে ঢুকতে দেন।

উমার ইবন খাত্তাবের খিলাফতের সময়ের একটি ঘটনা, তিনি শুনতে পেলেন কিছু লোক আবু বকর আর উমারের মধ্যে কে উত্তম তা নিয়ে আলোচনা করছে। এটা শুনে তিনি তাদের কাছে ছুটে গিয়ে বললেন, 'তোমরা শুনে রাখো, আবু বকরের এক দিন উমার আর উমারের পুরো পরিবারের সারাজীবন অপেক্ষা দামি।' তারপর তিনি হিজরতের ঘটনাটি বর্ণনা করে বললেন যে, হিজরতের সেই দিনটি শুধু উমার নয়, বরং তাঁর পরিবারের পুরো জীবন থেকেও উত্তম। সাহাবারা আবু বকর সম্পর্কে কেমন উঁচু ধারণা পোষণ করতেন তা উমারের এই কথার মাধ্যমে বুঝা যায়।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 গোপনীয়তার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা

📄 গোপনীয়তার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা


হিজরতের সময়ে এবং মাক্কী জীবনের শেষ দিকে রাসূলুল্লাহ প্রায় সব কাজেই অত্যন্ত গোপনীয়তা রক্ষা করে চলছিলেন। ইসলাম ও মুসলিমদের রক্ষা করার জন্যই তিনি গোপনীয়তা বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু গোপনীয়তা ও দাওয়াহর মধ্যে অবশ্যই ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। হিজরতের একটি ছোট্ট ঘটনা দেখিয়ে দেয় কীভাবে এই দুটো কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হয়।

রাসূলুল্লাহর মক্কা ছেড়ে যাওয়ার বিষয়টি খুব কম লোকই জানতো। আলী ইবন আবু তালিব, আবু বকর ও তাঁর পরিবার ছাড়া আর কেউই বিষয়টি জানতেন না। হিজরতের সময় রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর যখন বের হলেন, তখন তাদের কোনো কিছুর দরকার পড়লে আবু বকরের ব্যবসায়িক পরিচিতি বেশ কাজে লাগত। কারণ আবু বকর ব্যবসা সংক্রান্ত কাজের জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেতেন, তাই তিনি মক্কার বাইরের অনেক গোত্রের কাছে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে, মক্কার বাইরের লোকজন রাসূলুল্লাহর নাম শুনলেও তাঁকে সরাসরি খুব একটা চিনতো না। রাসূলুল্লাহ মূলত মক্কা আর মক্কার বাইরে শুধু তাইফে তাঁর দাওয়াহর কাজ করেছেন। অনেকেই তাঁর নাম শুনেছিল কিন্তু তিনি দেখতে কেমন ছিলেন সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না। আবু বকর বেশ পরিচিত থাকায় কেউ তাদেরকে দেখলে আবু বকরের সাথে কথা বলতে এগিয়ে আসতো। তারা আবু বকরকে জিজ্ঞেস করতো যে, তাঁর সাথে থাকা লোকটি কে অর্থাৎ তারা রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো। তখন আবু বকর জবাব দিতেন এভাবে, 'ইনি হলেন আমার পথপ্রদর্শক, আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।' এ কথা শুনে তারা মনে করতো, আবু বকরের সাথে থাকা এই লোক অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ আবু বকরকে মরুভূমির মধ্য দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যদিও আবু বকর বুঝিয়েছেন ভিন্ন কথা, তিনি বুঝিয়েছিলেন রাসূলুল্লাহকে আল্লাহ তাআলার নির্দেশিত পথের অভিমুখে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। কিন্তু তিনি এটা এমনভাবে বলতেন যাতে রাসূলুল্লাহর আসল পরিচয় গোপন থাকে কেননা রাসূলুল্লাহর জীবন ছিল হুমকির মুখে। আবু বকর মিথ্যাও বলেননি, ঘুরিয়ে কথা বলেছেন। এটাকে বলা হয় তাউরী, গোপনীয়তা রক্ষা করা।

কিন্তু একই সাথে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার সময় নিজের পরিচয় প্রকাশ করে দেওয়াটাই হিকমাহ। তাই হিজরতকালে যখন রাসূলুল্লাহর সাথে আবু বুরাইদাহ আল আসলামির দেখা হয়, তখন তিনি নিজেকে সর্বশেষ রাসূল হিসেবেই নিজের পরিচয় দেন এবং তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দেন। এরপরে আবু বুরাইদাহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে বুরাইদাহ রাসূলুল্লাহর সাথে ১৯টি যুদ্ধের মধ্যে ১৬টি যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ হিজরতের সময়েই দুইজন চোরকে দাওয়াত দিয়েছিলেন, তারাও মুসলিম হয়ে যায়। তিনি তাদের নাম জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে, 'আমাদের নাম হলো আল মুহানান', আল মুহানান মানে হলো 'অসম্মানিত ব্যক্তি'। রাসূলুল্লাহ তাদের এ নাম বদলে দিয়ে তাদেরকে 'মুকরামান' বা 'সম্মানিত ব্যক্তি' হিসেবে ঘোষণা করেন।

মাক্কী জীবনেও এরকম আরেকটি ঘটনা রয়েছে। একবার রাসূলুল্লাহ একজন মেষপালককে দাওয়াত দিয়েছিলেন। তিনি সেই মেষপালকের কাছে দুধ খেতে চাইলেন। মেষপালক বললো, এই মুহূর্তে কোনো ছাগলের কাছেই দুধ নেই। এরপর রাসূলুল্লাহ তার কাছে ছাগলের দুধ দোহন করার অনুমতি চাইলেন। মেষপালকের অনুমতি পেয়ে রাসূলুল্লাহ দুধ দোহন করা শুরু করলেন, আর প্রচুর পরিমাণে দুধ বের হয়ে আসল। প্রথমে মেষপালককে দুধ পান করতে দেওয়া হলো, এরপরে রাসূলুল্লাহ ও তারপরে আবু বকর দুধ পান করলেন। তখন মেষপালক রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলো,
- আকাশের শপথ! সত্যি করে বলুন তো কে আপনি? আমি আপনার মতো কাউকে এখনো দেখিনি।
- আমি যদি আমার আসল পরিচয় তোমাকে দেই তাহলে তুমি কি তা গোপন রাখবে?
- হ্যাঁ, রাখবো।
- আমি মুহাম্মাদ, আল্লাহর রাসূল।
- তবে কি আপনিই সে ব্যক্তি যাকে কুরাইশরা সাবিঈ বলে সম্বোধন করে?
সাবিঈ একটি অবজ্ঞাসূচক শব্দ, কুরাইশরা ইচ্ছা করে মুসলিমদেরকে হেয় করার জন্য এই নামে ডাকতো। রাসূলুল্লাহ জবাব দিলেন, 'হ্যাঁ, তারা এই নামে ডেকে থাকে।' তারপর মেষপালক বললো,
- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি যা বলেছেন তা সত্য এবং আপনি মাত্র যা করলেন তা একজন রাসূলই করতে পারে। আমি এখন থেকে আপনার উপর অবতীর্ণ দ্বীনের অনুসারী।
- তুমি এখনই তা কোরো না। যখন তুমি দেখবে আমি প্রকাশ্যে নিজেকে ঘোষণা করছি, তখন তুমি এসে আমাদের সাথে যোগ দিও।

রাসূলুল্লাহ তাঁকে মুসলিম হতে মানা করেননি, তিনি তাঁকে মুসলিম জামা'আতে যোগ দিতে বারণ করেন। কারণ রাসূলুল্লাহ তখনও গোপনে দাওয়াহর কাজ করে যাচ্ছিলেন। এভাবেই রাসূলুল্লাহ একইসাথে দাওয়াহ করেছেন ও নিজের পরিচয়ও গোপন রেখেছেন। এসব ঘটনা থেকে বুঝা যায় কীভাবে দাওয়াহ ও গোপনীয়তা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ শুধুমাত্র সেসব ব্যক্তির কাছেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন যাদেরকে দেখে তাঁর মনে হয়েছে যে তারা তাঁর ডাকে সাড়া দিবেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px