📄 অর্থনৈতিক উন্নতি
হিজরতের ফলে অর্থনীতির ব্যাপক উন্নতি ঘটতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আন্দালুসিয়ার শেষ ইসলামি রাষ্ট্র গ্রানাডা। যখন স্পেনের খ্রিস্টান সৈন্যরা উত্তর দিক থেকে ইসলামি রাষ্ট্র দখল করা শুরু করে তখন মুসলিমরা দক্ষিণ স্পেনে চলে যায়। এতে দক্ষিণ স্পেনের জনসংখ্যা বেড়ে গিয়ে ২০ লক্ষে দাঁড়ায়, কিন্তু আগত অভিবাসীরা ছিল কাজেকর্মে দক্ষ ও অভিজ্ঞ, তাই তাদের দ্বারা গ্রানাডার ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। শেষ পর্যন্ত এটি সমগ্র ইউরোপের সবচেয়ে ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। যদিও বর্তমানের অবস্থা ভিন্ন, মুসলিমদের একটি বিরাট অংশ স্থায়ীভাবে থাকার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে, মুসলিম দেশগুলো তাদের দক্ষতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
📄 সতর্কতার মধ্যমপন্থা
হিজরতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রাসূলুল্লাহ সামান্যতম ছাড়ও দেননি। খুঁটিনাটি সব বিষয়ে তিনি সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন।
প্রথমত, রাসূলুল্লাহ মুখ ঢেকে দুপুর বেলা আবু বকরের বাসায় যান।
দ্বিতীয়ত, গোপনীয়তার স্বার্থে তিনি আবু বকরকে আলোচনার সময়ে বাড়িতে কে আছে সেটা জেনে নেন।
তৃতীয়ত, তিনি আলী ইবন আবু তালিবকে তাঁর বিছানায় শুয়ে থাকার নির্দেশ দেন যাতে শত্রুরা তাঁর চলে যাওয়ার ব্যাপারটি আঁচ করতে না পারে।
চতুর্থত, হিজরতের যাত্রার জন্য আগে থেকেই উট প্রস্তুত রাখা ছিল।
পঞ্চমত, চারপাশ অন্ধকার হলে রাসূলুল্লাহ আবু বকরকে সাথে নিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়েছিলেন।
ষষ্ঠত, তাঁরা একজন গাইড বা পথপ্রদর্শক ভাড়া করেছিলেন।
সপ্তমত, মদীনা ছিল মক্কার উত্তরে, কিন্তু শত্রুদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য তাঁরা প্রথমে দক্ষিণের দিকে যাত্রা শুরু করেন।
অষ্টমত, তাঁরা একটি গুহায় তিনদিন লুকিয়ে ছিলেন।
নবমত, আবদুল্লাহ দিনের বেলা তথ্য সংগ্রহ করার জন্য মক্কায় থেকে যেতেন আর রাতের বেলা গুহায় ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর কে সব জানাতেন।
দশমত, আমির ইবন ফুহায়রা তাদেরকে খাবার এনে দিতেন।
রাসূলুল্লাহ জানতেন যে আল্লাহ তাআলা তাঁকে রক্ষা করার ওয়াদা করেছেন এবং আল্লাহ তাআলার ওয়াদা সত্য। কিন্তু তারপরও তিনি মদীনাতে নিরাপদে পৌঁছানোর জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন। তিনি এর মাধ্যমে শিক্ষা দিলেন যে, মুসলিম হিসেবে জাগতিক প্রচেষ্টার সবটুকুই ঢেলে দিতে হবে। রাসূলুল্লাহর দেখানো পথ অনুসারেই সকল প্রকার ইসলামি কাজকর্মের পরিকল্পনা করতে হবে ও সর্বোচ্চ শ্রম দিতে হবে। বিপদের ভয়ে প্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা যাবে না বরং যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করে কাজ করে যেতে হবে।
📄 মুসলিম নারীদের সাহসী ভূমিকা
হিজরতের ঘটনার সিংহভাগ বর্ণিত হয়েছে আ'ইশার সূত্রে, পুরো ঘটনা তিনিই সংরক্ষণ করেছেন। আসমা বিনতে আবি বকরকে বলা হয়, 'যাতুন নিতাকাইন' বা দুই ফিতাওয়ালী। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সময় তিনি রাসূলুল্লাহ ও তাঁর বাবার জন্য থলেতে পাথেয় ও মশক গুছিয়ে দিচ্ছিলেন, কিন্তু মুখ বাঁধার জন্য কাছেধারে কোনো রশি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন নিজের কোমরের নিতাক বা বন্ধনী খুলে দু'টুকরো করে একটি দিয়ে থলে এবং অন্যটি দিয়ে মশকের মুখ বেঁধে দেন। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ তাঁর জন্য দুআ করেন আল্লাহ যেন এর বিনিময়ে জান্নাতে তাঁকে দুটি 'নিতাক' দান করেন, এজন্য তাঁর নাম হয় যাতুন নিতাকাইন।
হিজরতের পরে তাঁর উপর বেশ ঝড় যায়। আবু বকর চলে যাওয়ার পর আবু জাহেলসহ কুরাইশদের কিছু লোক তাঁর বাড়িতে আসে। আসমা দরজা খুলে দেন, আবু জাহেল আবু বকরের ব্যাপারে জানতে চায়। আসমা জবাব দিলেন তিনি জানেন না। এ কথা শুনে আবু জাহেল তাঁর গালে জোরে আঘাত করেন। কিন্তু তারপরও তিনি রাসূলুল্লাহ ও পিতা আবু বকরের নিরাপত্তার কথা ভেবে তা ধৈর্য ধরে সয়ে নেন। এখানে আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয় যে, তিনি সত্য গোপন করেছিলেন এবং মুসলিমদের নিরাপত্তার স্বার্থে মিথ্যা বলা যায়।
আবু বকরের পিতা, অর্থাৎ আসমা বিনত আবি বকরের দাদা ছিলেন অন্ধ, তিনি এসে বললেন, 'আমার ছেলে দেখছি তোমাকে ভালো ঝামেলার মধ্যে ফেলে চলে গেছে। তোমার জন্য কোনো টাকা-পয়সাও রেখে যায় নি।' আসমা ছিলেন বুদ্ধিমতী। তিনি একটি বস্তার মধ্যে কিছু পাথর ভরে নিয়ে এসে সেটা তাঁর দাদার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বুঝাতে চাইলেন যে তাঁর পিতা আবু বকর অনেক টাকাপয়সা রেখে গিয়েছেন। দাদা শুনে খুব খুশি হলেন। দাদাকে শান্ত রাখার জন্যই তিনি এই কাজটি করেছিলেন।
টিকাঃ
৬৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪৩।
📄 বন্ধু নির্বাচনের গুরুত্ব
রাসূলুল্লাহ তাঁর বন্ধু হিসেবে আবু বকর সিদ্দীককে বেছে নিয়েছিলেন। আবু বকর ছিলেন রাসূলুল্লাহর সবচেয়ে কাছের বন্ধু। তিনি যখন জানতে পারলেন তিনি রাসূলুল্লাহর সাথে হিজরত করার মতো সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন, তখন তিনি আনন্দে কেঁদেই ফেলেছিলেন। আবু বকর ছিলেন বুদ্ধিমান, আস্থাভাজন একজন মানুষ। গুহায় আশ্রয় নেওয়ার সময় তিনি রাসূলুল্লাহকে প্রথমে গুহায় ঢুকতে না দিয়ে নিজে আগে ঢুকে পরীক্ষা করে নেন বিপজ্জনক কিছু আছে কি না। অতঃপর নিশ্চিত হয়ে তিনি রাসূলুল্লাহকে ভেতরে ঢুকতে দেন।
উমার ইবন খাত্তাবের খিলাফতের সময়ের একটি ঘটনা, তিনি শুনতে পেলেন কিছু লোক আবু বকর আর উমারের মধ্যে কে উত্তম তা নিয়ে আলোচনা করছে। এটা শুনে তিনি তাদের কাছে ছুটে গিয়ে বললেন, 'তোমরা শুনে রাখো, আবু বকরের এক দিন উমার আর উমারের পুরো পরিবারের সারাজীবন অপেক্ষা দামি।' তারপর তিনি হিজরতের ঘটনাটি বর্ণনা করে বললেন যে, হিজরতের সেই দিনটি শুধু উমার নয়, বরং তাঁর পরিবারের পুরো জীবন থেকেও উত্তম। সাহাবারা আবু বকর সম্পর্কে কেমন উঁচু ধারণা পোষণ করতেন তা উমারের এই কথার মাধ্যমে বুঝা যায়।