📄 রাসূলুল্লাহর ﷽ ঘরে
রাসূলুল্লাহ জানতেন তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করছেন কুরাইশরা। সেই রাতে আলী ইবন আবু তালিবকে রাসূলুল্লাহ তাঁর কাছে রাখা কুরাইশদের আমানত বুঝিয়ে দিলেন এবং বললেন, 'তুমি আমার এই সবুজ হাদরামাউতি চাদর গায়ে দিয়ে আমার বিছানায় শুয়ে থাকো। ওদের হাতে তোমার কিছুই হবে না।' আলী নিজ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাসূলুল্লাহর কথামতো বিছানায় শুয়ে থাকলেন। সাহাবারা আগ্রহের সাথে তাদের এই দায়িত্বগুলো পালন করতেন। এমনকি নিজেদের জীবনের ঝুঁকিও নিয়েছেন খুশিমনে।
এদিকে কুরাইশরা ব্যস্ত নিজেদের মধ্যে ঠাট্টা-তামাশায়। আবু জাহেল তার সঙ্গীদের বললো, 'আরে তোমরা জানো মুহাম্মাদ কী বলে। সে বলে তার দ্বীন মানলে তোমরা নাকি আরব অনারবের বাদশাহ হবে! মরার পর তোমাদের নাকি বাগান থাকবে, জর্ডানের বাগানের মতো বাগান! আর তোমরা যদি তাকে না মানো, তাহলে তোমাদের মেরে ফেলা বৈধ হয়ে যাবে আর মরার পর তোমরা আগুনে পুড়বে!'
'হ্যাঁ, আমি এ কথাই বলেছি আর আগুনেই পুড়বে তুমি' – রাসূলুল্লাহ হাতে এক মুঠো মাটি নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন এবং তাদের দিকে নিক্ষেপ করলেন। দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন রাসূলুল্লাহ, কেউ তাঁকে আর দেখতে পেল না। সকলের অগোচরে তিনি ঘর ত্যাগ করলেন। রাসূলুল্লাহ তখন আবৃত্তি করছিলেন সূরা ইয়াসীনের আয়াত,
'আমি ওদের সামনে ও পেছনে প্রাচীর স্থাপন করে দিয়েছি এবং আবৃত করে দিয়েছি, ফলে ওরা দেখতে পায় না।” (সূরা ইয়াসিন, ৩৬: ৯)
এদিকে কুরাইশদের সেই এগারো জন মাথায় মাটি নিয়ে বসে থাকলো নির্ধারিত সময়ের আশায়। কিন্তু তারা তার আগেই জানতে পারলো আল্লাহর রাসূল বাসা ছেড়ে চলে গেছেন। তবু দুরাশা নিয়ে রাসূলুল্লাহর ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো কেউ একজন বিছানায় শুয়ে আছে। তারা ভাবলো বুঝি রাসূলুল্লাহ শুয়ে আছে। ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারা দেখলো শুয়ে আছে আলী। প্রচণ্ড হতাশ হয়ে আলীকে জিজ্ঞেস করলো, 'কোথায় মুহাম্মাদ?' আলী বললেন, 'জানি নাহ।'
টিকাঃ
৬০. সীরাত ইবন হিশাম, পৃষ্ঠা ১৫৬।
৬১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২৪।
📄 মদীনার পথে
রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর ইতিমধ্যেই মদীনা অভিমুখে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে বেশ অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ফেলেছেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর জন্মভূমি মক্কাকে খুব ভালোবাসতেন। তাই তিনি মক্কা ত্যাগ করার সময় বারবার পিছনে ফিরে তাকিয়ে বলেছিলেন, 'আল্লাহর নামে বলছি, মক্কা আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে প্রিয় নগরী। আমাকে যদি এখান হতে বের করে দেওয়া না হতো তাহলে আমি কখনো এ নগরী ছেড়ে যেতাম না। এখানে থেকে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকলে আমি মক্কা ত্যাগ করতাম না।'
মদীনা অভিমুখে তাদের যাত্রা শুরু হলো। কিছুক্ষণ পর রাসূলুল্লাহ খেয়াল করলেন আবু বকর কিছু সময় তাঁর আগে-আগে হাঁটছেন আবার কিছু সময় তাঁর পিছন- পিছন হাঁটছেন। তাই রাসূলুল্লাহ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন,
- কী ব্যাপার? কখনো তুমি আমার সামনে চলছো, আবার কখনো পিছনে চলছো, কেন?
- আমার যখন মনে হয় কেউ আপনাকে সামনের দিক থেকে হঠাৎ আক্রমণ করতে পারে তখন আমি আপনার সামনে চলে যাই। আবার যখন মনে হয় কেউ আপনাকে পেছন থেকে আক্রমণ করতে পারে তখন আমি আপনার পিছন-পিছন হাঁটি।
- আবু বকর, তুমি কোনটা চাও, আমার ক্ষতি নাকি তোমার ক্ষতি?
- আল্লাহর রাসূল, আমার ক্ষতি হলে হোক, কিন্তু আপনার ক্ষতি হোক এটা আমি হতে দিতে চাই না।
"এমন দু'জন সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যাদের তৃতীয় সঙ্গী হচ্ছেন আল্লাহ?"
এরপর তাঁরা একটি গুহার কাছে পৌঁছালেন। প্রথমে আবু বকর গুহার ভেতরে ঢুকে সবকিছু ভালোমতো পরীক্ষা করে দেখলেন যে, সেখানে কোনো সাপ, বিছা অথবা কোনো শত্রুদল ঘাপটি মেরে আছে কিনা। সবকিছু নিরাপদ দেখে তিনি রাসূলুল্লাহকে ভিতরে আসতে বললেন। কিন্তু কুরাইশ মুশরিকরা তাদের গতিবিধি নজরদারি করতে সক্ষম হয় এবং গুহার খুব কাছে চলে আসে। আবু বকর রাসূলুল্লাহকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, যদি মুশরিকদের কেউ মাথা নিচু করে পা বরাবর তাকায় তাহলে তারা আমাদের দেখে ফেলবে।' রাসূলুল্লাহ খুব নির্ভীক কণ্ঠে বললেন, 'আবু বকর, এমন দু'জন সম্পর্কে তোমার কী ধারণা, যাদের তৃতীয় সঙ্গী হচ্ছেন আল্লাহ? তুমি কি তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হবে?' গুহার খুব কাছে এসেও মুশরিকদের ফিরে যাওয়ার কারণটি ছিল খুবই অদ্ভুত। একটি অতি ঠুনকো মাকড়শার জাল।
"... আর সব ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই তো অধিক দুর্বল..." (সূরা আনকাবূত, ২৯: ৪১)
যে মাকড়শার জালকে একটি আঙ্গুল দিয়ে ছিঁড়ে ফেলা যায়, সেই দুর্বল মাকড়শার জালই হয়ে গেল এখানে আল্লাহ তাআলার সৈনিক। এটিই গুহায় মুশরিকদের সৈনিকদের ঢুকতে বিরত রেখেছিল। আল্লাহ যদি চান, তিনি তাঁর সুবিশাল সৃষ্টির মধ্য থেকে সবচেয়ে দুর্বলতম সৃষ্টিকেও সৈনিক হিসেবে কাজে লাগাতে পারেন। হিজরতের দিনে রাসূলুল্লাহর সঙ্গী হিসেবে ছিলেন শুধু আবু বকর, সাহাবাদের কেউই সেখানে ছিলেন না। তার উপর মুশরিকরা তাদের ঘিরে রেখেছিল, কিন্তু রাসূলুল্লাহকে সেই ভয়ানক পরিস্থিতি থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তাআলা নিজেই যথেষ্ট ছিলেন। এই ঘটনার পর আল্লাহ আয়াত নাযিল করলেন,
“যদি তোমরা তাঁকে (রাসূলুল্লাহকে) সাহায্য না কর তাহলে আল্লাহই তাঁকে সাহায্য করবেন যেমন তিনি তাকে সাহায্য করেছিলেন সেই সময়ে যখন কাফিরেরা তাঁকে দেশান্তর করেছিল। তিনি ছিলেন দু'জনের একজন, যখন তাঁরা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি তাঁর আপন সঙ্গীকে বলেছিলেন, বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর প্রতি তাঁর পক্ষ থেকে প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাঁর সাহায্যে এমন বাহিনী পাঠালেন, যা তোমরা দেখনি। বস্তুতঃ আল্লাহ কাফেরদের মাথা নীচু করে দিলেন আর আল্লাহর কথাই সদা সমুন্নত এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা তাওবাহ, ৯: ৪০)
আবু বকরের জন্য এই আয়াত একটি বিরাট সম্মান। কারণ এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা আবু বকরকে আল্লাহর রাসূলের সঙ্গী বা সাহাবি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রাসূলুল্লাহ আবু বকরের সাথে সেই গুহাতে তিনদিন অবস্থান করেন। আবু বকরের ছেলে আবদুল্লাহ তাদের সাথে রাতের বেলা গুহায় অবস্থান করতো কিন্তু দিনের বেলা মক্কায় গিয়ে খোঁজ নিত মুশরিকরা রাসূলুল্লাহর ব্যাপারে কী পরিকল্পনা করছে। মুশরিকরা যাতে আবদুল্লাহর গুহায় যাওয়া-আসার বিষয়ে টের না পায় এজন্য সে আবু বকরর আযাদকৃত দাস আমির ইবন ফুহাইরাহকে বলে দিত সে যেন তার ভেড়ার পাল নিয়ে আবদুল্লাহর অনুসরণ করে। এতে দুটো সুবিধা, প্রথমত, রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর ভেড়ার দুধ পান করতে পারতেন। এতে তাদের খাবারের প্রয়োজন পূরণ হতো। দ্বিতীয়ত, ভেড়ার পাল আবদুল্লাহ ও আমিরের যাত্রাপথে তাদের পায়ের ছাপ নষ্ট করে দিত, ফলে তাদের গন্তব্যস্থল সম্পর্কে কেউ আঁচ করতে পারতো না।
এভাবেই তিনদিন চলে গেল। তিনদিন পর সেখানে আবদুল্লাহ ইবন উরাইক্বাত নামের এক ব্যক্তি এলো। রাসূলুল্লাহ ও আবু বকরকে মক্কা থেকে মদীনায় নেওয়ার জন্য নবীজি তাকে ভাড়া করেছিলেন। সে ছিল মুশরিক। সাধারণত যে পথে সবাই মক্কা থেকে মদীনায় যায় আবদুল্লাহ ইবন উরাইকাত তাদেরকে সেই পথ দিয়ে না নিয়ে অন্য আরেকটি পথ দিয়ে নিয়ে যায়। মদীনা পৌঁছার আগ পর্যন্ত তাঁরা উপকূল ঘেঁষে চলতে থাকেন।
টিকাঃ
৬২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩০। তবে সনদের বিবেচনায় বর্ণনাটি তেমন শক্তিশালী নয়।
৬৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩১।
📄 হুলিয়া জারি ও মাথার দাম ঘোষণা
কুরাইশের মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ ও আবু বকরকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য একশো উট পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা করে। জীবিত অথবা মৃত। তারা মরুভূমির বেদুইন গোত্রসমূহের কাছে এই পুরস্কারের ঘোষণা জানিয়ে দেয়। তারা মরুভূমির পথঘাট সম্পর্কে দক্ষ ছিল। এমনই এক লোক ছিল সুরাকা ইবন মালিক। সে ছিল এক বেদুইন গোত্রের নেতা। হিজরতের একটি ঘটনা তার মুখে জানা যায়।
"আমি বন্ধুদের সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম। এমন সময় একজন এসে বললো, 'আমি দিগন্তের দিকে দুইজন লোককে দেখেছি। কুরাইশরা দুজনকে খুঁজছে। মনে হয় তারাই সেই লোক।' আমি তাকে বাধা দিয়ে বললাম, 'আরে না, তারা সেই লোক হতে পারে না। কিছুক্ষণ আগেও এই দুই লোক এখানে ছিল, এইমাত্র চলে গেছে।' আসলে আমি ঠিকই জানতাম যে ওই দুইজন লোক আসলে মুহাম্মাদ আর আবু বকর। কিন্তু আমি নিজেই একশ উট পাওয়ার লোভে তাদেরকে মিথ্যে বলি।'
এরপর সুরাকা সেখানে আরো কিছুক্ষণ বসে থাকলো। কারণ চট করে উঠে গেলে কেউ তাকে সন্দেহ করতে পারে। তারপর সে বাসায় গিয়ে তার চাকরকে বললো তার ঘোড়াটি প্রস্তুত করে লুকিয়ে রাখতে। কিছুক্ষণ পর সে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে যায়। সাথে নেয় একটি লম্বা বর্শা। কেউ যেন সেই বর্শা দেখতে না পায় এজন্য সে বর্শাটি মাটির সাথে ঘেঁষে ঘেঁষে নিয়ে গেল। তারপর ঘোড়ায় চড়ে সে রাসূলুল্লাহ ও আবু বকরকে ধরার জন্য রওনা দিল। কিছুক্ষণ পর আবিষ্কার করলো সে ওই লোকের দাবিই ঠিক। ওই দুই লোক আসলেই রাসূলুল্লাহ এবং আবু বকর।
কোটিপতি হওয়ার সুযোগ থেকে সুরাকা মাত্র অল্প কিছু হাত দূরে। অন্যদিকে, আবু বকর বারবার পিছনে ফিরে তাকাচ্ছিলেন আর রাসূলুল্লাহ নিশ্চিন্তমনে কুরআন পাঠ করছিলেন। তিনি একবারও পিছন ফিরে তাকাননি। তিনি নিশ্চিতভাবেই জানতেন যে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বিজয়ী হতে সাহায্য করবেন। আবু বকর নিজেকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন না, তিনি রাসূলুল্লাহর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। কিছুক্ষণ পর আবু বকর বুঝতে পারলেন কেউ একজন তাদের অনুসরণ করছে। তিনি রাসূলুল্লাহকে ব্যাপারটি জানালেন। রাসূলুল্লাহ আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। তৎক্ষণাৎ সুরাকা ঘোড়া থেকে পড়ে গেল আর ঘোড়াটি মাটিতে বসে গেল। লোভী সুরাকা আবার ঘোড়াটিকে সামলানোর চেষ্টা করলো কিন্তু সে আবার ঘোড়া থেকে পড়ে গেল। এমন ঘটনা তার জীবনে আর কখনো ঘটেনি। তৃতীয়বার যখন একই ঘটনা ঘটলো তখন সুরাকার চোখেমুখে একরাশ ধূলি এসে পড়ল। সুরাকা বুঝতে পারল যে এই লোকের সাথে আল্লাহর সাহায্য আছে। এরপর সে রাসূলুল্লাহকে অনুরোধ করলো যেন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ আগেও যে ব্যক্তি পুরস্কারের লোভে রাসূলুল্লাহকে কুরাইশদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য খুঁজছিল এখন সে নিজের বেঁচে থাকা নিয়েই চিন্তিত। সুরাকা বললো, 'আমার নিরাপত্তার জন্য একটি চিঠি লিখে দিন।' রাসূলুল্লাহ আমির ইবন ফুহাইরাহকে একটি নিরাপত্তাপত্র লেখার নির্দেশ দিলেন। পত্রটি লেখা হয়েছিল চামড়া অথবা হাড়ের উপর। সুরাকা এই পত্রটিকে স্মারকচিহ্ন হিসেবে নিজের কাছে রেখে দেয়। ৮-৯ বছর পরে নবীজির পারস্য অবরোধের সময় সুরাকা মুসলিমদের হাতে বন্দী হয়। সুরাকা তখন সেই নিরাপত্তাপত্রটি বের করে দেখালে মুসলিমরা তাকে ছেড়ে দেয়!
নিরাপত্তাপত্র যোগাড় করে সুরাকা মক্কায় ফিরে যায়। সেখানে গিয়ে সে রাসূলুল্লাহকে খোঁজাখুঁজি করার ব্যাপারে কুরাইশদের নিরুৎসাহিত করতে লাগল। রাসূলুল্লাহই তাকে এই কাজটি করতে অনুরোধ করেছিলেন। এভাবে সুরাকা হয়ে গেল রাসূলুল্লাহর পাহারাদার, অথচ কিছুক্ষণ আগেও সে পুরস্কারের লোভে রাসূলুল্লাহকে ধরার জন্য তৎপর ছিল।
টিকাঃ
৬৪. সীরাহ ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬১।
📄 যাত্রাবিরতি: উম্ম মা'বাদের তাঁবু
যাত্রাপথে রাসূলুল্লাহ ও আবু বকর খুযাআ গোত্রের উম্ম মা'বাদ নামক এক মহিলার তাঁবুর কাছে থামেন। উম্ম মা'বাদ ছিলেন একজন দানশীল মহিলা। তাঁবুর পাশ দিয়ে যাওয়া পথিকদের তিনি আপ্যায়ন করতেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ও আবু বকরকে উম্ম মা'বাদ কিছুই দিতে পারেননি। রাসূলুল্লাহ উম্ম মা'বাদের কাছে খাবারের খোঁজ করেন। উম্ম মা'বাদ বললেন যে যদি দেওয়ার মতো কিছু থাকতো তাহলে তাঁর কাছে চাওয়া লাগতো না, বরং তিনি নিজে থেকেই দিতেন। আসলে উম্ম মা'বাদের শুধু একটি দুর্বল বকরী ছিল। খরার কারণে সেটির দুধ শুকিয়ে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ বকরীর দুধ দোহানোর জন্য তাঁর কাছে অনুমতি চান। উম্ম মা'বাদ তাঁকে অনুমতি দেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর কাছ থেকে একটি বড় পাত্র চেয়ে নেন। তিনি বকরীটিকে স্পর্শ করামাত্রই বকরীটি দুধ দেওয়া শুরু করে। পাত্র না ভরা পর্যন্ত বকরীটি দুধ দিতে লাগল। পাত্রটি ভরে গেলে রাসূলুল্লাহ প্রথমে তা উম্ম মা'বাদকে দেন। এরপর একে একে সবাই তৃষ্ণা মিটিয়ে দুধ পান করেন।
রাসূলুল্লাহ সবার শেষে দুধ পান করেন। দুধ পান শেষে তিনি বলেন, 'ঘরের সেবকরা সবার শেষেই পান করে।' রাসূলুল্লাহ উম্ম মা'বাদের জন্য পাত্রে কিছু দুধ রেখে দেন। উম্ম মা'বাদের স্বামী বকরীর পাল নিয়ে বাড়িতে ফিরে এসে দুধ দেখে স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন, 'এই দুধ কোথা থেকে এল?' উম্ম মা'বাদ বললেন, 'এক বরকতময় লোক এসেছিলেন আজ। তিনি-ই বকরীর দুধ দোহন করেছেন।' আবু মা'বাদ স্ত্রীর কাছে সেই লোকের বর্ণনা শুনতে চাইলেন। উম্ম মা'বাদ রাসূলুল্লাহকে একবার মাত্র দেখেছিলেন। কিন্তু যে বর্ণনা তিনি দিয়েছেন তা এখন পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর সম্পর্কে দেওয়া শ্রেষ্ঠ বর্ণনা।
'আমি তাঁকে দেখেছি, উজ্জ্বলদীপ্ত চেহারা, সুন্দর তাঁর গড়ন, সুদর্শন তাঁর মুখশ্রী, ছিপছিপে তাঁর শরীর। মাথাটা খুব ছোট নয়, বরং দেখতে তিনি অভিজাত এবং সুপুরুষ। চোখদুটো তাঁর ঘনকালো, পাঁপড়িগুলো টানাটানা। বুদ্ধিদীপ্ত তাঁর চেহারা, ভরাট তাঁর কণ্ঠস্বর। ভু-যুগল উঁচু আর ধনুকের মতো বাকাঁনো, চুলগুলো পরিপাটি। তাঁর গ্রীবা বিস্তৃত এবং দাড়ি বেশ ঘন। তাঁর গাম্ভীর্য তাঁর আত্মমর্যাদা প্রকাশ করে, তাঁর কথা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে। তাঁর কথাগুলো মনোমুগ্ধকর আর দৃঢ়, চটুল কিংবা ফেলনা নয়। তাঁর প্রতিটি শব্দ যেন সুতোয় বাঁধা মুক্তোর মতো মসৃণ। দূর থেকে তাঁকে দেখতে যেমন উজ্জ্বল আর আকর্ষণীয়, কাছ থেকে দেখলেও তাঁকেই সবচেয়ে সুদর্শন লাগে। উচ্চতায় তিনি মাঝারি। খুব লম্বাও নন আবার খাটোও নন। বাকি দুইজনের মাঝে তিনি উঁচু বৃক্ষের শাখার মতো, তবে তিনজনের মাঝে তিনিই সবচেয়ে সুন্দর। তিনি ছিলেন তাঁর সঙ্গীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি যখন কথা বলতেন, তারা মন দিয়ে শুনতো, তিনি যখন কিছু আদেশ দিতেন তা পালন করতে তারা ছুটে যেতো। তিনি কখনও মুখ গোমড়া করেননি। আর কেউ একবারও তাঁর কথার বিরোধিতা করেনি।'
বর্ণনা শুনে আবু মা'বাদ বললেন, 'এই লোকটি নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ। তাঁকে তো কুরাইশরা খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি যদি তাঁর সাথে দেখা করতে পারতাম তাহলে তাঁর কাছে মুসলিম হওয়ার স্বীকারোক্তি দিতাম।' তাঁর স্ত্রী উম্ম মা'বাদ আগেই রাসূলুল্লাহর কাছে ইসলাম গ্রহণের স্বীকারোক্তি দিয়ে মুসলিম হয়েছিলেন।
টিকাঃ
৬৫. যাদুল মা'আদ, ২য় খণ্ড।