📄 হিজরতের আহ্বান
“বলুন, হে আমার বিশ্বাসী বান্দাগণ। তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়াতে সৎকাজ করে, তাদের জন্যে রয়েছে পুণ্য। আল্লাহর পৃথিবী প্রশস্ত। যারা সবরকারী, তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই।” (সূরা আয-যুমার, ৩৯: ১০)
এই আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা হিজরতের দিকে ইঙ্গিত করছেন। 'ওয়া আরদুল্লাহী ওয়াসি'আহ' — আল্লাহ তাআলার জমিন প্রশস্ত। আল্লাহ মুসলিমদের বলছেন, যদি মক্কায় তোমাদের উপর জুলুম করা হয় তাহলে তোমরা অন্যত্র চলে যেতে পারো যেখানে আল্লাহ তাআলার দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারবে। মুফাসসির মুজাহিদ (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার দ্বীনের জন্য হিজরত করো ও জিহাদ করো এবং মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাকো।' উম্মাহর প্রাথমিক যুগের প্রখ্যাত আলিম আতা বলেন, 'যদি তোমাকে কোনো পাপের দিকে আহ্বান করা হয় তাহলে তুমি পালিয়ে যেয়ো।'
“আর যারা হিজরত করেছে আল্লাহর রাস্তায় অত্যাচারিত হওয়ার পর, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম আবাস দান করবো। আর আখিরাতের প্রতিদান তো বিশাল, যদি তারা জানতো।” (সূরা নাহল, ১৬: ৪১)
যারা আল্লাহ তাআলার জন্যে হিজরত করে এবং নিপীড়িত হয় তাদেরকে আল্লাহ আযযা ওয়াজাল এই দুনিয়ার বুকে উত্তম আবাস দেওয়ার ওয়াদা করেছেন। এই আয়াতের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন মুহাজিরগণ। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সময় তাঁরা ছিলেন নিঃস্ব। কিন্তু এই মানুষগুলোই পরবর্তী সময়ে কেউ হন আমীর, কেউ বা সেনাপতি। দুনিয়ার বুকেই আল্লাহ তাদেরকে নিঃস্ব অবস্থা থেকে উন্নীত করে সম্মান ও ইজ্জতের আসনে আসীন করেছেন। এটাই হলো এই আয়াতে বর্ণিত 'উত্তম আবাস'। যদিও তাঁরা দুনিয়ার বুকে পুরস্কার পেয়েছেন, আল্লাহ আযযা ওয়াজাল বলছেন, 'কিন্তু পরকালের পুরস্কার তো সর্বাধিক।' আর তাই উমার ইবন খাত্তাব খলীফা হওয়ার পর যখন মুহাজিরদের টাকাপয়সা অথবা উপহার দিতেন তখন তিনি বলতেন, 'এটি হচ্ছে এই দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তোমাদের জন্যে উপহার কিন্তু আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য আখিরাতে এর চেয়েও অনেক বেশি বরাদ্দ করে রেখেছেন।' যখন কেউ আল্লাহ তাআলার জন্য কিছু ত্যাগ করে, আল্লাহ তাদেরকে তার চেয়েও ভালো প্রতিদান দিয়ে পুষিয়ে দেন।
“যারা দুঃখ-কষ্ট ভোগের পর দেশত্যাগী হয়েছে অতঃপর জিহাদ করেছে, নিশ্চয় আপনার পালনকর্তা এসব বিষয়ের পরে অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা নাহল, ১৬: ১১০)
হিজরত একটি ইবাদাত। ইসলামে এই ইবাদাতের মর্যাদা অনেক বেশি। যেখানেই হিজরত আছে, সেখানেই আছে নুসরাত। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করা মুহাজিরগণ মদীনায় কোনো হোটেল বা উদ্বাস্তুশিবিরে জড়ো হননি। তাঁরা মদীনায় যাদের বাসায় উঠেছেন তাদেরকে বলা হয় আনসার। তাদেরকে আনসার বলার কারণ, তাঁরা আল্লাহ তাআলার দ্বীন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা (নুসরাহ) দিয়েছেন এবং জয়ী করতে সাহায্য করেছেন। তাদের ছোট্ট গৃহ তাঁরা মুহাজিরদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
মদীনার ঘরগুলো কেমন ছিল? আল-হাসান আল বসরীর একটি বর্ণনা এখানে উল্লেখ্য, তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহর ঘরগুলো দেখেছি। সেগুলো এত ছোট ছিল যে, আমি আমার হাত দিয়ে ঘরের ছাদ ধরতে পারতাম। রাসূলুল্লাহ যখন আ'ইশার ঘরে সালাত আদায় করতেন, ঘর ছোট হওয়ার কারণে আ'ইশাকে তাঁর পা সরিয়ে রাখতে হতো যাতে রাসূলুল্লাহ ঠিকমতো সিজদাহ দিতে পারেন।' রাসূলুল্লাহর প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য একটি করে ঘর ছিল। কিন্তু সেগুলোর সাথে আলাদা করে কোনো রান্নাঘর, বসার ঘর অথবা বারান্দা বলে কিছু ছিল না। শুধুমাত্র একটি করে ঘর আর প্রতিটি ঘরই ছিল অনেক ছোট।
তালহা ইবন উবাইদুল্লাহ ও তাঁর মা এবং সুহাইব ছিলেন হাবিব ইবন উসার বাড়িতে। হামযা উঠেছিলেন সাদ ইবন যুরায়রার বাড়িতে। সাদ ইবন খাইতানের বাড়িকে বলা হতো "ব্যাচেলর হাউজ", কারণ সেখানে অবিবাহিত মুহাজিররা থাকতেন। উবাইদা ইবনু হারিস ও তাঁর মা, তুফাইল ইবন হারিস, তুফাইল ইবন আমর, আল হুসসাইন ইবন হারিস — তাঁরা সবাই থাকতেন আবদুল্লাহ ইবন সালামার বাসায়। এক মুসলিমের আরেক মুসলিমের প্রতি উদার হওয়া এবং তাকে সাহায্য করা মুসলিমের ঈমানের চিহ্ন। এটা ছিল আনসারদের একটি বৈশিষ্ট্য।
সেই সময়ে মুসলিমদের কেউ মদীনায়, আবার কেউ হাবশায় হিজরত করেছিলেন। এই দুই হিজরতের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। হাবশায় হিজরতের ঘটনার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় যে, তাঁরা সেখানে হিজরত করলেও সেখানকার সমাজের উপর তেমন একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। সেখানে তাঁরা সমাজ থেকে অনেকটাই আলাদা থাকতেন। তাঁরা সেখানে উদ্বাস্তুর মতো অবস্থান করেছিলেন। আর এ কারণেই আবিসিনিয়া ত্যাগ করার সময় তাঁরা সেখানে ইসলামের তেমন কোনো প্রভাব রেখে আসতে পারেননি। কিন্তু মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। আর সে উদ্দেশ্য সফলও হয়েছিল।
মদীনাকে তাঁরা এত ভালোবেসেছিলেন যে মক্কা বিজয়ের পরও তাঁরা মদীনায় থেকে গেলেন। আবু বকর, উমার, উসমান, বিলাল - তাঁদের কেউই মক্কায় ফেরত যাননি। মু'মিনদের অন্তরে মদীনার প্রতি ভালোবাসা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এখনও মুসলিমরা যখন রাসূলুল্লাহর শহরে প্রবেশ করে তখন তাদের মধ্যে একটি বিশেষ অনুভূতি তৈরি হয়। মক্কায় প্রবেশ করলে বিশাল বিশাল স্তম্ভে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদ-উল-হারামের দিকে তাকালে বিশালতার একটি অনুভূতি তৈরি হয়, কিন্তু মদীনায় মক্কার মতো পাহাড়-পর্বত নেই, সেখানে সমতল, সেখানে একধরনের প্রশান্তি অনুভব হয়। রাসূলুল্লাহর দুআর বরকতেই মদীনা মুসলিমদের কাছে অতি প্রিয় একটি স্থান।
📄 ইসলামে মদীনার তাৎপর্য
# রাসূলুল্লাহ আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করেছিলেন আল্লাহ তাআলা যেন তাদের অন্তরে মদীনার জন্য ভালোবাসার সৃষ্টি করে দেন। তিনি দুআ করেছেন, 'হে আল্লাহ, মদীনাকে আমাদের চোখে মক্কার মতো বা তার চেয়েও প্রিয় বানিয়ে দাও।' নবীজি মদীনার বরকত বৃদ্ধির জন্য আল্লাহ আযযা ওয়াজাল-এর কাছে দুআ করতেন, 'হে আল্লাহ! মক্কায় তুমি যে পরিমাণ বরকত দান করেছো, মদীনাতে তার দ্বিগুণ বরকত দাও।'
# দাজ্জাল মদীনাতে প্রবেশ করতে পারবে না। নবীজি বলেন, দাজ্জালের কাছ থেকে মদীনাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য এর প্রতিটি প্রবেশমুখে ফেরেশতারা পাহারারত রয়েছে।
# মদীনায় কষ্টকর জীবনে ধৈর্যধারণের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে বিশেষ পুরস্কার রয়েছে। মদীনায় তখন প্রচণ্ড গরম ছিল এবং পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল প্রতিকূল, তাই নবীজি বলেছেন, 'মদীনার কষ্টকর অবস্থায় যে ধৈর্য ধারণ করবে, আমি শেষ বিচারের দিন তার শাফাআতকারী হবো। শেষ বিচারের দিন আমি তার হয়ে মধ্যস্থতা করবো।'
# মদীনায় মৃত্যুবরণকারীর জন্য রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। নবীজি বলেছেন, 'যে মদীনায় মৃত্যুবরণ করবে, আমি তার জন্য শেষ বিচারের দিন মধ্যস্থতাকারী হবো।' উমার ইবন খাত্তাব খলীফা হওয়ার পর থেকে চাইতেন তিনি মদীনায় শহীদ হবেন। তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে এই বলে দুআ করতেন, 'হে আল্লাহ! আমি তোমার রাসূলের শহরে শহীদ হিসেবে মরতে চাই।' এই দুআ শুনে তাঁর কন্যা হাফসা বললেন, "আব্বা, আপনি কীভাবে মদীনায় শহীদ হবেন? মদীনা তো নিরাপদ শহর, মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজধানী। আপনি যদি শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে চান তাহলে আপনাকে ইরাক বা সিরিয়া যেতে হবে, মদীনায় নয়।" এরপর উমার ইবন খাত্তাব বললেন, 'যদি আল্লাহ তাআলা কোনো কিছু ঘটাতে চান, তাহলে তিনি তা অবশ্যই ঘটাবেন।' পরবর্তীতে দেখা যায়, উমার মদীনাতেই শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং সে সময় তিনি রাসূলুল্লাহর মসজিদে ইবাদতরত অবস্থায় ছিলেন।
# মদীনা হলো ঈমানের আশ্রয়স্থল। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'ঈমান মদীনাতে ফিরে আসবে সেভাবে, যেভাবে সাপ তার গর্তে ফিরে আসে।' মদীনা শহরে কোনো অপবিত্রতা নেই। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'সেই সত্ত্বার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, মদীনাকে পছন্দ হয় না বলে কেউ মদীনা ত্যাগ করে না, বরং আল্লাহ তাআলাই তাদের চেয়েও উত্তম কাউকে দ্বারা তাদেরকে প্রতিস্থাপন করে দেন।' রাসূলুল্লাহ আরো বলেন, 'মদীনা অপবিত্র ও খারাপ লোকদের বহিষ্কার করে দেয়।' তিনি আরো বলেন, 'শেষ বিচারের দিন ততক্ষণ পর্যন্ত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না মদীনা সমস্ত খারাপ লোকদের ঠিক সেভাবেই বের করে দেয়, যেভাবে আগুন লোহার মরিচাকে দূর করে দেয়।'
# স্বয়ং আল্লাহ আযযা ওয়াজাল মদীনাকে রক্ষণাবেক্ষণ করেন। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'যে কেউ মদীনাবাসীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে, সে সেভাবে বিলীন হয়ে যাবে যেভাবে লবণ পানিতে বিলীন হয়ে যায়।'
# মদীনা হলো পবিত্র নগরী। নবীজি এর পবিত্রতা সম্পর্কে বলেছেন, 'মদীনা পবিত্র, এখানে তোমরা গাছ কাটবে না, শিকার করবে না, অস্ত্র বহন করতে পারবে না।'
📄 রাসূলুল্লাহর ﷽ হিজরতের পটভূমি: গুপ্তহত্যার চেষ্টা
মুশরিকরা যখন দেখলো মুসলিমরা একে একে পরিবার-পরিজন নিয়ে ধন-সম্পদ ফেলে মদীনায় জমা হচ্ছে তারা অস্থির হয়ে গেল। মুসলিমদের মদীনায় হিজরতের ফলাফল কী হতে পারে তা তাদের অজানা ছিল না। তারা টের পেয়েছিল আওস এবং খাযরাজ গোত্র রাসূলুল্লাহর নেতৃত্বে এক হচ্ছে এবং তাদের মিলিত শক্তির সাথে পেরে ওঠা সহজ কথা নয়। মদীনায় মুসলিমদের ঘাঁটি গড়ার অর্থ হলো, তাদের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক পথ অনিরাপদ হয়ে যাওয়া, কেননা কুরাইশদের ব্যবসা ছিল ইয়েমেন থেকে সিরিয়া পর্যন্ত যে দীর্ঘ উপকূলীয় পথ রয়েছে সে পথেই কুরাইশদের কাফেলা চলাচলা করতো আর মদীনা থেকে সে পথ খুব দূরে নয়। কুরাইশরা দীর্ঘদিন ধরে আরবের একচ্ছত্র ক্ষমতার যে স্বপ্ন দেখে আসছিল, মদীনায় মুসলিমদের উত্থান হলে সে স্বপ্নে মুসলিমরা ব্যাঘাত ঘটাবে। অত্যাচার-নির্যাতন, প্রলোভন, সমঝোতা, মিডিয়া ক্যাম্পেইন, হত্যার হুমকি, বয়কট — কিছুই যখন কাজ হলো না তখন কুরাইশরা ক্ষুব্ধ ষাঁড়ের মতো ফুঁসলে উঠলো। ব্যর্থ, পরাজিত মানুষের মতো বেপরোয়া, মরিয়া, অস্থির-উন্মাদপ্রায় কুরাইশরা গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা করলো: মুহাম্মাদকে তারা মারবেই — যে করেই হোক।
দারুন নাদওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন বসলো, শিরোনাম: মুহাম্মাদকে কীভাবে থামানো যায়। কুরাইশদের বড় বড় নেতারা এ অধিবেশনে অংশ নিল। বেশ কিছু প্রস্তাব এলো। কেউ প্রস্তাব করলো তাঁকে কারাগারে আটকে রাখা হোক। কিন্তু এ প্রস্তাব খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। কারণ তারা খুব ভালো করে জানতো যে, রাসূলুল্লাহকে কারাগারে প্রেরণ করলে সাহাবীগণ তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে পারবেন, এমনকি তাঁরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করে বসতে পারেন। প্রস্তাব হলো, রাসূলুল্লাহকে মক্কা থেকে বের করে দেওয়া। কিন্তু এ প্রস্তাবও খুব একটা হালে পানি পেল না, কারণ রাসূলুল্লাহর কথাবার্তা ছিল খুবই চমৎকার, তাঁর সুন্দর কথা শুনে মক্কার বাইরের লোকেরা তাঁকে বিশ্বাস করে তাঁর দলে যোগ দিয়ে মক্কায় আক্রমণ চালাতে পারে।
সর্বশেষ এবং সবচেয়ে জঘন্য প্রস্তাব ছিল নবীজিকে হত্যা করা। এই প্রস্তাব আর কারো নয়, এই প্রস্তাব কুখ্যাত আবু জাহেলের।৫৯ সে প্রস্তাব করলো, প্রত্যেক শক্তিশালী অভিজাত বংশের একজন করে শক্তসমর্থ কাউকে পাঠানো হবে। তাদের সবার হাতে থাকবে একটি করে ধারালো তলোয়ার। তারা সবাই একযোগে রাসূলুল্লাহকে হত্যা করবে। ফলে হত্যার দায় নির্দিষ্ট কাউকে বহন করতে হবে না, মক্কার সমস্ত গোত্র এই হত্যার দায়ভার নেবে। সেক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহর পরিবার মক্কার সব গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াতে পারবে না, তারা রক্তপণ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য হবে। মুশরিকরাও খুশি মনে রক্তপণ দিয়ে দিবে। প্রস্তাবটি জঘন্য হলেও বেশ কার্যকরী ছিল, মক্কার সংসদে হত্যার বিল পাস হলো।
টিকাঃ
৫৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩২৩।
📄 শেষ কথা
ছয় বছর পর...
রাসূল মক্কায় প্রবেশ করছেন বিজয়ী হয়ে। তাঁকে কুচকাওয়াজের মাধ্যমে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে না, জাতীয় সঙ্গীত বাজছে না, নেই কোনো লাল গালিচা, আর তাঁর মাঝেও নেই কোনো অহংকারের ছাপ। তিনি বুক উঁচু করে, অবনত মস্তকে, আল্লাহর প্রতি বিনম্র চিত্তে সেখানে প্রবেশ করছেন। তিনি উটের পিঠে, ঢোকার সময় তিনি আল্লাহর কাছে সাজদারত, তিনি এতটাই নীচু হয়ে আছেন যে তাঁর দাড়ি উটের সাথে লেগে আছে। তাঁর মধ্যে ঔদ্ধত্য নেই, আছে নম্রতা, নেই উত্তেজনা, আছে সাকিনাহ, প্রশান্তি।
এভাবেই কাবাঘরের সামনে দাঁড়ালেন। তাঁর চারিদিক ঘিরে অসংখ্য মানুষ। মক্কার জনতার চোখেমুখে বিস্ময়, ভয়, কৌতূহল! তাদের ভাগ্য নির্ভর করছে একটি মানুষের সিদ্ধান্তের উপর—সেই মুহাম্মাদ, যাকে তারা অপমান করেছে, দিনের পর দিন অভুক্ত রেখেছে, দেশছাড়া করে ছেড়েছে—আজ তিনিই বীরের বেশে নেতা হয়ে ফিরে এসেছেন নিজের ঘরে। কুরাইশের লোকেরা আজ তাঁর তরবারীর নীচে।
রাসূলুল্লাহ তাদের জিজ্ঞেস করলেন,
—তোমাদের কী ধারণা? আজ তোমাদের সাথে আমি কেমন ব্যবহার করবো?
—আপনার কাছ থেকে এক মহৎ ভাইয়ের মতো আচরণ আশা করি।
রাসূল বললেন, আমি তোমাদের সেটাই বলবো যা ইউসুফ তাঁর ভাইদের বলেছিলেন, লা তাসরীবা 'আলাইকুমুল ইয়াওম — আজ তোমাদের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা মুক্ত, স্বাধীন।
মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে কীভাবে এই বিশাল পরিবর্তন রচিত হলো? মক্কার মেষ চরানো এক যুবক হয়ে গেলেন অসাধারণ এক নেতা, আরবের অধিপতি, সাহাবীদের কাঙ্ক্ষিত আশ্রয়। মৃত্যুর পরেও যাঁর ছায়া আমাদেরকে আগলে রেখেছে। কী ছিল সেই মহান পুরুষের যাত্রা, প্রতিকূলতা ও সংগ্রাম? উত্তরগুলো পরবর্তী পর্বে সম্পূর্ণতা পাবে ইন শা আল্লাহ। দ্বিতীয় খণ্ডে থাকছে তাঁর জীবনের বাকি অংশের কাহিনি। রাসূলুল্লাহর ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক, আমীন!
[পরবর্তী খণ্ডে সমাপ্য, ইন শা আল্লাহ]
আমি তাঁকে দেখেছি, উজ্জ্বলদীপ্ত চেহারা, সুন্দর তাঁর গড়ন, সুদর্শন তাঁর মুখশ্রী, ছিপছিপে তাঁর শরীর। মাথাটা খুব ছোট নয়, বরং দেখতে তিনি অভিজাত এবং সুপুরুষ। চোখদুটো তাঁর ঘনকালো, পাপড়িগুলো টানাটানা। বুদ্ধিদীপ্ত তাঁর চেহারা, ভরাট তাঁর কণ্ঠস্বর। ভ্রু-যুগল উঁচু আর ধনুকের মতো বাঁকানো, চুলগুলো পরিপাটি। তাঁর গ্রীবা বিস্তৃত এবং দাড়ি বেশ ঘন। তাঁর গাম্ভীর্য তাঁর আত্মমর্যাদা প্রকাশ করে, তাঁর কথা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বহন করে।
তাঁর কথাগুলো মনোমুগ্ধকর আর দৃঢ়, চটুল কিংবা ফেলনা নয়। তাঁর প্রতিটি শব্দ যেন সুতোয় গাঁথা মুক্তোর মতো মূল্যবান। দূর থেকে তাঁকে দেখতে যেমন উজ্জ্বল আর আকর্ষণীয়, কাছ থেকে দেখলেও তাঁকেই সবচেয়ে সুদর্শন লাগে। উচ্চতায় তিনি মাঝারি। খুব লম্বাও নন আবার খাটোও নন। বাকি দুইজনের মাঝে তিনি উঁচু বৃক্ষের শাখার মতো, তবে তিনজনের মাঝে তিনিই সবচেয়ে সুন্দর। তিনি ছিলেন তাঁর সঙ্গীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি যখন কথা বলতেন, তারা মন দিয়ে শুনতো, তিনি যখন কিছু আদেশ দিতেন তা পালন করতে তারা ছুটে যেতো। তিনি কখনও মুখ গোমড়া করেননি। আর কেউ একবারও তাঁর কথার বিরোধিতা করেনি।