📄 সুহাইব আর রুমী ؓ
সুহাইব আর রুমী রাসূলুল্লাহর পরে মদীনায় আসেন। রোমান ও আরবদের মধ্যকার একটি যুদ্ধে তিনি রোমান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী হন। পরবর্তীতে তিনি রোমানদের মাঝেই বেড়ে ওঠেন এবং তাদের ভাষা রপ্ত করে ফেলেন। তাই তিনি আরবিতে কথা বলার সময় তাতে রোমান টান থাকত। বিভিন্ন মনিবের হাত ঘুরে শেষ পর্যন্ত দাস সুহাইব আর-রুমী আবদুল্লাহ ইবন জুদানের হাতে গিয়ে পড়েন।
আবদুল্লাহ ইবন জুদান ছিলেন মক্কার এক ধনী ব্যক্তি। তিনি সুহাইবকে মুক্ত করে দেন। সুহাইব ছিলেন মেধাবী, বুদ্ধিমান ও কর্মঠ যুবক, তিনি নিজেই ব্যবসা শুরু করলেন এবং বেশ দ্রুত অনেক সম্পদের মালিক হয়ে যান। হিজরতের পূর্বে তিনি একটি গর্ত করে সেখানে তাঁর সম্পদ লুকিয়ে রাখেন এবং মক্কা ত্যাগের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। কুরাইশের কিছু লোক তাঁর পিছু নিয়ে তাঁর পথরোধ করলো এবং তাঁকে বললো, 'তুমি আমাদের মাঝে এসেছিলে ফকির হয়ে। এখানে এসে তুমি সম্পদ গড়েছ, প্রতিপত্তি লাভ করেছো, আর এখন তুমি সেসব নিয়ে চলে যেতে চাও? আল্লাহর শপথ, আমরা কখনোই তোমাকে যেতে দেব না।' সুহাইব তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'যদি আমি তোমাদেরকে টাকা দেই, তোমরা আমাকে যেতে দেবে?' তারা বললো, 'হ্যাঁ, তাহলে আমরা তোমাকে ছেড়ে দিব।'
অবশ্য সুহাইবের হিজরতের ঘটনা অন্য একটি বর্ণনায় খানিকটা ভিন্নভাবে এসেছে: সুহাইব যখন দেখলেন কুরাইশরা তাঁর পিছে পিছে আসছে, তখন তিনি ৪০টি তীর বের করলেন এবং তাদেরকে হুমকি দিলেন যদি তারা তাঁর পথ না ছাড়ে তাহলে তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে এই ৪০টি তীর ছুঁড়ে মারবেন, আর এই তীরগুলো শেষ হয়ে গেলে তিনি তরবারি দিয়ে হলেও তাদের সাথে লড়বেন এবং কুরাইশদের পৌরুষত্বের শিক্ষা দিয়ে ছাড়বেন। এরপর তিনি তাদেরকে বললেন তাঁকে যেন যেতে দেওয়া হবে, বিনিময়ে তিনি তাদের টাকা দেবেন। এরপর কুরাইশরা বাড়াবাড়ি না করে তাঁর এই প্রস্তাবে রাজি হয়।
টিকাঃ
৫৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৯।
📄 শিক্ষা
১. আল্লাহ ক্ষমাশীল। গুনাহ যা-ই হোক না কেন, কখনও হতাশ হওয়া উচিত নয়, হাল ছাড়া উচিত নয়, বরং আল্লাহর কাছে তাওবা করা উচিত। সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো শির্ক। সেই শির্ক করার পরেও যদি কেউ তওবা করে, আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকেও ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু তা করতে হবে আল্লাহর আযাব বা মৃত্যু আসার পূর্বেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
"তোমরা তোমাদের রবের অভিমুখী হও এবং তোমাদের উপর আযাব আসার পূর্বেই তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করো।" (সূরা আয-যুমার, ৩৯: ৫৪)
২. কাফেরদের ব্যাপারে সাবধান থাকা জরুরি, তাদের ব্যাপারে এতটুকু অসতর্ক হওয়া যাবে না। আইয়্যাশ ইবন আবি রাবিআ আবু জাহেলকে বিশ্বাস করে ভুল করেছিলেন। একজন মু'মিন শত্রুদের মিষ্টি কথায় প্রলুব্ধ হবে না। অনেকেই আছে সাদাসিধে ও সরলমনা। তারা এখানে-সেখানে 'ভালো ভালো' কথা শুনে বিশ্বাস করে ফেলে, রাজনীতিবিদদের সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করে ফাঁদে পড়ে যায়। যারা দীর্ঘদিন ধরে ইসলামের সাথে যুদ্ধ করে আসছে তাদের কথায় চট করে বিশ্বাস করা যাবে না।
নিজেদেরকে প্রতারিত হতে দেওয়া উচিত না। উমার আবু জাহেলের এই পরিকল্পনার কথা বুঝতে পেরেছিলেন। সেজন্যই তিনি আইয়্যাশকে বলেছিলেন, 'তাদেরকে বিশ্বাস কোরো না। তারা মিথ্যা বলছে। তোমার মায়ের মাথা উকুনে পরিপূর্ণ হয়ে গেলে তিনি অবশ্যই চুল আঁচড়াবেন। আর মক্কার প্রখর রোদে কেউ-ই বাঁচতে পারবে না, তাকে সরে ছায়াতে আসতেই হবে। মানত পূরণ করার জন্য তোমার যাওয়ার প্রয়োজন নেই।' আল্লাহ জানেন কারা মুসলিমদের শত্রু। তিনি এই উম্মাহকে তাদের শত্রু সম্পর্কে অবগতও করেছেন। তাই মুসলিমদের ধোঁকায় পড়া উচিত নয়। বরং শত্রুদের ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
৩. সুহাইব ছিলেন একজন অভিবাসী। তিনি মক্কায় গিয়ে সেখানে স্থায়ী হন, ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং সেখানকার সমাজে সম্মানিত একটি অবস্থান অর্জন করেন। কিন্তু সেই একই ব্যক্তি যখন আল্লাহ তাআলার রাস্তায় হিজরত করতে চাইলেন, তখন যে লোকগুলো তাঁকে সম্মান করতো, তারাই তাঁর হিজরতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমা দেশে বসবাসকারী মুসলিমদের জন্য সুহাইব একজন আদর্শ, যিনি দ্বীনের জন্য নিজের উন্নত ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে ঈমানের ভূমিতে হিজরত করতে উদগ্রীব ছিলেন।