📄 উমার ؓ
উমার ইবন খাত্তাব কুরাইশদের বিন্দুমাত্র ভয় করতেন না। সবাই মদীনায় হিজরত করেছিলেন গোপনে, আর উমার রীতিমত ঢাক-ঢোল পিটিয়ে হিজরত করেন। তিনি হিজরতের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলেন, সাথে নিলেন তলোয়ার, কাঁধে ঝোলালেন তীর-ধনুক, লাঠি নিতেও ভুললেন না। তিনি কাবাঘরের দিকে গেলেন, সেখানে কুরাইশরা বসা ছিল, তাদের সামনে ধীরেসুস্থে সাতবার কাবাঘর তাওয়াফ করলেন। তারপর মাকামে গিয়ে আস্তেধীরে সালাত আদায় করলেন। তারপর জনসমাগমের দিকে গেলেন, এক এক করে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
'তোদের মুখে চুনকালি পড়ুক! আল্লাহ তোদের ওই নাক ধূলোয় গড়াগড়ি খাওয়াবেন। কে আছে বাপের ব্যাটা, বুকের পাটা থাকলে আয়! যদি স্ত্রীর বিধবা হওয়ার ভয় না করিস, সন্তানের এতিম হওয়ার ভয় না করিস, নিজের মাকে সন্তানহারা বানাতে ভয় না পাস, তাহলে এই পাহাড়ে আয়! আমার সাথে লড়ে দেখা।'
কেউ তাঁর সাথে লড়ার সাহস দেখালো না। বরং তিনি দলবল নিয়ে হিজরত করতে রওনা হলেন। উমার ইবনুল খাত্তাব বলেন, 'আমি, আইয়্যাশ ইবন আবু রাবিআ এবং হিশাম ইবন আস- আমরা পরিকল্পনা করলাম একসাথে মদীনায় হিজরত করবো। আমরা সারিফের উপর মিলিত হওয়ার জন্য একটি সময় নির্ধারণ করলাম। আমরা ঠিক করলাম যে, আমাদের মধ্যে যদি কেউ ভোরে উপস্থিত থাকতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ধরে নেওয়া হবে যে সে আটকা পড়েছে, সুতরাং বাকিরা তার জন্য অপেক্ষায় না থেকে মদীনায় যাত্রা শুরু করে দিবে।'
সারিফ মক্কার বাইরে একটি জায়গা, উমার ও আইয়্যাশ ভোরে সেখানে পৌঁছে গেলেন, কিন্তু হিশাম ইবন আসকে দেখা গেল না। তাই উমার আর আইয়্যাশ দুজন মিলেই যাত্রা শুরু করে মদীনায় পৌঁছে গেলেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহর পূর্বেই হিজরত করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ হিজরত করেছিলেন সবার শেষে। আবু জাহেল ছিল আইয়্যাশ ইবন রাবিআর সৎ ভাই। সে তার ভাই হারিসকে নিয়ে মদীনায় চলে গেল আইয়্যাশকে ফিরিয়ে আনতে। তারা আইয়্যাশকে প্ররোচিত করলো, 'তোমার মা প্রতিজ্ঞা করেছে তোমাকে না দেখা পর্যন্ত তিনি মাথার চুল আঁচড়াবেন না, রোদ ছেড়ে ছায়ায় বসবেন না। তুমি ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত মক্কার প্রখর রোদের নিচেই তিনি বসে থাকবেন।'
উমার ইবনুল খাত্তাব দূর থেকে তাদের কথা শুনছিলেন। তিনি আইয়্যাশকে গিয়ে বললেন, 'এই লোকগুলো তোমাকে ধোঁকা দিচ্ছে, তোমাকে পটানোর জন্য এসব বলছে, তারা তোমাকে মক্কায় ফিরিয়ে নিতে চায়। তোমার মায়ের শপথের কথা বলছো? উকুনের জ্বালায় ঠিকই তিনি চিরুনী ব্যবহার করবেন, আর মক্কার কড়া রোদ অসহ্য ঠেকলে তিনি নিশ্চয়ই ছায়াতে না বসে পারবেন না। তুমি এদের কথায় বিভ্রান্ত হয়ো না আর তাদের সাথে যেও না।'
উমার ইবন খাত্তাবকে শয়তানও ধোঁকা দিতে পারতো না। তিনি খুব ভালোই বুঝতে পারছিলেন এসব আবু জাহেলের ষড়যন্ত্র। এদিকে মায়ের কথা শুনে আইয়্যাশ অস্থির হয়ে গেলেন। তিনি উমারের উপদেশ না শুনে আবু জাহেলদের সাথে মক্কায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। উমার বললেন, 'ঠিক আছে, যেতেই যদি চাও, আমার উটনীটি সাথে নাও। এটা খুব শক্তিশালী আর দ্রুত দৌড়াতে পারে। পথিমধ্যে যদি সন্দেহজনক কিছু দেখ, চোখ বন্ধ করে সোজা উট নিয়ে পালিয়ে যাবে।'
এরপর আইয়্যাশ ইবন আবি রাবিআ, আবু জাহেল এবং হারিস ইবন হিশাম মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। প্রত্যেকেই নিজেদের উটের উপর বসে চলছে। পথিমধ্যে আবু জাহেল তার উটের ব্যাপারে অভিযোগ করা শুরু করে— 'কী অদ্ভুত উট রে বাবা! এত ধীরে চলে! এ তো মহা ঝামেলা।' তারপর সে আইয়্যাশকে বলে, 'আমার উটটি খুবই ঝামেলা করছে। তুমি কিছুক্ষণের জন্য তোমার উটকে আমারটার সাথে অদল-বদব করবে?' আইয়্যাশ ছিলেন সহজ-সরল মানুষ, তিনি রাজি হলেন, তারা এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল, আইয়্যাশের উট মাটিতে বসামাত্র তারা ছুটে তাঁকে আক্রমণ করে এবং বেঁধে ফেলে। তারপর টেনে-হিঁচড়ে মক্কায় নিয়ে যায়।
তারা আইয়্যাশের উপর প্রচণ্ড অত্যাচার চালালো। একই ঘটনা ঘটেছিল তার সাথী হিশাম ইবন আসের সাথে, তিনিও মক্কায় বন্দী হয়েছিলেন। উমার বলেন, 'আমরা মুসলিমরা নিজেদের মাঝে বলাবলি করতাম যে, যে ব্যক্তি পেছনে পড়ে রয়েছে, অর্থাৎ হিজরত করেনি এবং শত্রুদের ধোঁকায় পড়েছে, আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করবেন না।' যারা হিজরত করতে পারেনি তারাও ভাবতেন তাদের ক্ষমা পাওয়ার বুঝি আর কোনো আশা নেই। রাসূলুল্লাহ মদীনায় হিজরত করার আগ পর্যন্ত তাঁরা এমন ধারণাই রাখতেন। রাসূলুল্লাহ মদীনায় আগমন করলে আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করেন:
"বলোঃ হে আমার বান্দাগণ, তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছো, আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। তোমরা তোমাদের রবের অভিমুখী হও এবং তোমাদের উপর আযাব আসার পূর্বেই তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করো। তার পরে তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না। তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে উত্তম যা নাযিল করা হয়েছে তোমরা তার অনুসরণ করো, তোমাদের উপর অতর্কিতভাবে তোমাদের অজ্ঞাত অবস্থায় আযাব আসার পূর্বে, অথচ তোমরা উপলব্ধি করতে পারবে না।” (সূরা আযু যুমার, ৩৯: ৫৩-৫৫)
উমার আয়াতগুলো পড়ে সেগুলো লিখে হিশামের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। হিশাম বলেন, 'চিঠিটি আমার নিকট পৌঁছলে আমি তুয়া উপত্যকায় উঠে সেটি পড়লাম, আবার পড়লাম এবং বারবার তা পড়তে লাগলাম। টানা কয়েকদিন বারবার পাঠ করেও আমি এর মর্ম উদ্ধার করতে পারছিলাম না। আমি যতদিন বুঝতে পারিনি কেন উমার এটি আমার কাছে পাঠালেন, ততদিন আমি সেখানে গিয়ে চিঠিটি বারবার পড়তে থাকি। সবশেষে আমি বুঝতে পারলাম যে আমাদেরকে উদ্দেশ্য করেই আয়াতগুলো নাযিল হয়েছে।'
কেউ যত গুনাহের কাজই করুক না কেন, আল্লাহ তাআলা তারপরও তাকে ক্ষমা করতে পারেন, যদি সে তাওবা করে। কেউ যদি পেছনে পড়ে যায়, হিজরত করতে না পারে, কাফিরদের হাতে প্রতারিত হয়, তবু তার জন্য সুযোগ রয়েছে। হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হিশাম ইবন আস বলেন, আমি আল্লাহর কাছে তাওবা করলাম, এরপর উটের পিঠে চড়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
টিকাঃ
৫৭. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৬।
৫৮. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৭।
📄 সুহাইব আর রুমী ؓ
সুহাইব আর রুমী রাসূলুল্লাহর পরে মদীনায় আসেন। রোমান ও আরবদের মধ্যকার একটি যুদ্ধে তিনি রোমান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী হন। পরবর্তীতে তিনি রোমানদের মাঝেই বেড়ে ওঠেন এবং তাদের ভাষা রপ্ত করে ফেলেন। তাই তিনি আরবিতে কথা বলার সময় তাতে রোমান টান থাকত। বিভিন্ন মনিবের হাত ঘুরে শেষ পর্যন্ত দাস সুহাইব আর-রুমী আবদুল্লাহ ইবন জুদানের হাতে গিয়ে পড়েন।
আবদুল্লাহ ইবন জুদান ছিলেন মক্কার এক ধনী ব্যক্তি। তিনি সুহাইবকে মুক্ত করে দেন। সুহাইব ছিলেন মেধাবী, বুদ্ধিমান ও কর্মঠ যুবক, তিনি নিজেই ব্যবসা শুরু করলেন এবং বেশ দ্রুত অনেক সম্পদের মালিক হয়ে যান। হিজরতের পূর্বে তিনি একটি গর্ত করে সেখানে তাঁর সম্পদ লুকিয়ে রাখেন এবং মক্কা ত্যাগের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। কুরাইশের কিছু লোক তাঁর পিছু নিয়ে তাঁর পথরোধ করলো এবং তাঁকে বললো, 'তুমি আমাদের মাঝে এসেছিলে ফকির হয়ে। এখানে এসে তুমি সম্পদ গড়েছ, প্রতিপত্তি লাভ করেছো, আর এখন তুমি সেসব নিয়ে চলে যেতে চাও? আল্লাহর শপথ, আমরা কখনোই তোমাকে যেতে দেব না।' সুহাইব তাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'যদি আমি তোমাদেরকে টাকা দেই, তোমরা আমাকে যেতে দেবে?' তারা বললো, 'হ্যাঁ, তাহলে আমরা তোমাকে ছেড়ে দিব।'
অবশ্য সুহাইবের হিজরতের ঘটনা অন্য একটি বর্ণনায় খানিকটা ভিন্নভাবে এসেছে: সুহাইব যখন দেখলেন কুরাইশরা তাঁর পিছে পিছে আসছে, তখন তিনি ৪০টি তীর বের করলেন এবং তাদেরকে হুমকি দিলেন যদি তারা তাঁর পথ না ছাড়ে তাহলে তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে এই ৪০টি তীর ছুঁড়ে মারবেন, আর এই তীরগুলো শেষ হয়ে গেলে তিনি তরবারি দিয়ে হলেও তাদের সাথে লড়বেন এবং কুরাইশদের পৌরুষত্বের শিক্ষা দিয়ে ছাড়বেন। এরপর তিনি তাদেরকে বললেন তাঁকে যেন যেতে দেওয়া হবে, বিনিময়ে তিনি তাদের টাকা দেবেন। এরপর কুরাইশরা বাড়াবাড়ি না করে তাঁর এই প্রস্তাবে রাজি হয়।
টিকাঃ
৫৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৯।
📄 শিক্ষা
১. আল্লাহ ক্ষমাশীল। গুনাহ যা-ই হোক না কেন, কখনও হতাশ হওয়া উচিত নয়, হাল ছাড়া উচিত নয়, বরং আল্লাহর কাছে তাওবা করা উচিত। সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো শির্ক। সেই শির্ক করার পরেও যদি কেউ তওবা করে, আল্লাহর কাছে ফিরে আসে, আল্লাহ তাকেও ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু তা করতে হবে আল্লাহর আযাব বা মৃত্যু আসার পূর্বেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
"তোমরা তোমাদের রবের অভিমুখী হও এবং তোমাদের উপর আযাব আসার পূর্বেই তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করো।" (সূরা আয-যুমার, ৩৯: ৫৪)
২. কাফেরদের ব্যাপারে সাবধান থাকা জরুরি, তাদের ব্যাপারে এতটুকু অসতর্ক হওয়া যাবে না। আইয়্যাশ ইবন আবি রাবিআ আবু জাহেলকে বিশ্বাস করে ভুল করেছিলেন। একজন মু'মিন শত্রুদের মিষ্টি কথায় প্রলুব্ধ হবে না। অনেকেই আছে সাদাসিধে ও সরলমনা। তারা এখানে-সেখানে 'ভালো ভালো' কথা শুনে বিশ্বাস করে ফেলে, রাজনীতিবিদদের সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করে ফাঁদে পড়ে যায়। যারা দীর্ঘদিন ধরে ইসলামের সাথে যুদ্ধ করে আসছে তাদের কথায় চট করে বিশ্বাস করা যাবে না।
নিজেদেরকে প্রতারিত হতে দেওয়া উচিত না। উমার আবু জাহেলের এই পরিকল্পনার কথা বুঝতে পেরেছিলেন। সেজন্যই তিনি আইয়্যাশকে বলেছিলেন, 'তাদেরকে বিশ্বাস কোরো না। তারা মিথ্যা বলছে। তোমার মায়ের মাথা উকুনে পরিপূর্ণ হয়ে গেলে তিনি অবশ্যই চুল আঁচড়াবেন। আর মক্কার প্রখর রোদে কেউ-ই বাঁচতে পারবে না, তাকে সরে ছায়াতে আসতেই হবে। মানত পূরণ করার জন্য তোমার যাওয়ার প্রয়োজন নেই।' আল্লাহ জানেন কারা মুসলিমদের শত্রু। তিনি এই উম্মাহকে তাদের শত্রু সম্পর্কে অবগতও করেছেন। তাই মুসলিমদের ধোঁকায় পড়া উচিত নয়। বরং শত্রুদের ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
৩. সুহাইব ছিলেন একজন অভিবাসী। তিনি মক্কায় গিয়ে সেখানে স্থায়ী হন, ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং সেখানকার সমাজে সম্মানিত একটি অবস্থান অর্জন করেন। কিন্তু সেই একই ব্যক্তি যখন আল্লাহ তাআলার রাস্তায় হিজরত করতে চাইলেন, তখন যে লোকগুলো তাঁকে সম্মান করতো, তারাই তাঁর হিজরতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমা দেশে বসবাসকারী মুসলিমদের জন্য সুহাইব একজন আদর্শ, যিনি দ্বীনের জন্য নিজের উন্নত ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে ঈমানের ভূমিতে হিজরত করতে উদগ্রীব ছিলেন।