📄 বাইয়াত থেকে শিক্ষা
১. কা'ব ইবন মালিক বলেন, 'মদীনা ত্যাগ করার পূর্বেই আমরা সালাত আদায় করতে শিখেছিলাম, আমাদের দ্বীনের জ্ঞান লাভ করেছিলাম।' এটি রাসূলুল্লাহর হিজরতের আগের ঘটনা। সুতরাং যেসব ভাইবোনেরা ইসলাম শিক্ষার ব্যাপারে বিলম্ব করছেন এ অজুহাতে যে তারা বিদেশে গিয়ে কোনো শাইখের কাছে পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছেন না বা কোনো ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পারছেন না, তাঁরা আসলে খোঁড়া যুক্তি দেখাচ্ছেন। দ্বীনের ব্যাপারে পড়াশোনা না করার ব্যাপারে এগুলো কোনো অজুহাত নয়। 'অনুকূল পরিস্থিতি'র আশায় বসে না থেকে প্রত্যেকের উচিত একটুও বিলম্ব না করে সাধ্যমতো দ্বীনের জ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়া। কা'ব ইবন মালিক এবং তাঁর সহযোগীরা যখন দ্বীনের বুঝ লাভ করেছেন, সালাত আদায় করা শিখে গেছেন, তখনো আল্লাহর রাসূল মদীনায় প্রবেশ করেননি। তাদের সাথে কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন মুসআব ইবন উমাইর। কিন্তু কা'ব ইবন মালিকের বক্তব্যের একটি অন্তর্নিহিত বার্তা রয়েছে, তা হলো আমরা প্রস্তুত, আমরা শিখছি। দ্বীনের জ্ঞানার্জন থেকে নিজেকে বিরত রাখা একেবারেই উচিত নয়, মুসলিম মাত্রই দ্বীন জানার ব্যাপারে সচেতন থাকবে।
যদি কোনো মুসলিম কোনো আলিম বা শাইখের দারস্থ হতে না পারে, তাহলে তার উচিত বসে না থেকে অন্তত এমন কারো সাথে সময় কাটানো যে তার থেকে বেশি জানে। তেমন কাউকেও যদি না পাওয়া যায়, নিদেনপক্ষে কোনো আলিমের বই পড়তে শুরু করে দেওয়া উচিত। দ্বীনি পড়াশোনার মধ্যে সবসময় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। কালক্ষেপণ করা কোনো অজুহাত হতে পারে না। ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, কুরআনের আয়াতগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, জাহান্নামীদের বেশিরভাগ আর্তনাদের কারণ হবে তাদের গড়িমসি। তারা বলবে,
“হে আল্লাহ, আমাদের একবার ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিন, যাতে আমরা বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি। হে আল্লাহ, আমাদের একবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে যান, যেন আমরা দান করতে পারি। হে আল্লাহ, আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যান।”
কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে, সুতরাং কখনই ভালো কাজের সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়।
২. যখন রাসূলুল্লাহ আনসারদের কাছে তাঁর চুক্তির শর্তগুলো সম্পর্কে বলেছিলেন, তখন তাদের প্রশ্ন ছিল, 'বিনিময়ে আমরা কী পাবো?' রাসূলুল্লাহ এক শব্দে উত্তর দিয়েছিলেন, জান্নাহ। এখানে থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, সকল ইসলামি কর্মকাণ্ডের একমাত্র উদ্দেশ্য শুধুমাত্র জান্নাত, আল্লাহ আযযা ওয়াজালকে সন্তুষ্ট করাই প্রতিটি কাজের মূল উদ্দেশ্য – খ্যাতির জন্য নয়, অর্থের জন্য নয়, সামাজিকতার জন্যেও নয়। প্রতিনিয়ত নিয়তকে পরিশুদ্ধ করে নিজেদের জিজ্ঞেস করা উচিত – ইসলামের জন্য যে ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করছি, তা কেন করছি? তা কি আসলেই আল্লাহর জন্য করছি?
এই দ্বীনের জন্য প্রয়োজন আত্মত্যাগ। এই আত্মত্যাগের বিনিময় হলো জান্নাত। একজন মুসলিম দ্বীনের জন্য ত্যাগ আর কষ্ট স্বীকার করলে তার বিনিময় এই দুনিয়াতে নাও পেতে পারে, কেননা দুনিয়া ত্যাগ করাই দ্বীনের দাবি। এটি এমন একটি দ্বীন যার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতে হতে পারে, কারণ এর বিনিময়ে রয়েছে জান্নাত। জান্নাতে যে প্রতিদান দেওয়া হবে তা যেকোনো আত্মত্যাগের তুলনায় বহুগুণে দামি। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ তোমাদেরকে যা দিবেন তা অনেক দামি। আল্লাহ তোমাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন। কাজেই জান্নাত পেতে চাইলে এই দুনিয়াতে তার জন্য চড়া মূল্যও দিতে হবে।
৩. রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তাদের কাছে উপস্থাপন করেছিলেন যে, তিনি তাদের কাছে কী আশা করছেন। রাসূলুল্লাহ কোনো লুকোছাপা রাখেননি, তিনি আনসারদের জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাদের এই কাজের জন্য তাদের ও তাদের পরিবারের জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে, আল্লাহর রাসূলকে আশ্রয় দেওয়ার অর্থ নিজেদের জীবনে যুদ্ধ ডেকে আনা। আর এই কাজের বিনিময় হিসেবে রাসূলুল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার প্রাচুর্য বা অর্থ-সম্পদের প্রতিশ্রুতি দেননি, ক্ষমতার প্রতিশ্রুতিও দেননি, তিনি তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা কোনো সহজ কাজ নয়, এর জন্য অনেক সংগ্রাম করতে হবে আর এর জন্য প্রয়োজন অনেক আত্মত্যাগ। উমার ইবন খাত্তাব বলেছিলেন যে, আয়েশের জীবন ছেড়ে দাও, আরামের জীবন চিরস্থায়ী হবে না। কাজেই যারা দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ করতে চায়, তাদের মনে রাখতে হবে, এই কাজের জন্যে দুনিয়াকে বিসর্জন দিতে হতে পারে। আর সে হিসেবেই নিজেদের প্রস্তুত করে নেওয়া জরুরি।
৪. আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াতে আল্লাহর রাসূলের সাথে সত্তরের অধিক লোক সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। তাঁরা ছাড়াও আরও অনেকে মুসলিম ছিলেন যারা হয়তো সেখানে আসেনি। কিন্তু বাইয়াত গ্রহণ করা মাত্রই রাসূলুল্লাহ তাদেরকে বললেন ১২ জন নেতা (নুকাবা) মনোনীত করতে। অর্থাৎ তিনি তাদেরকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে তাদের জন্য একজন করে নেতা নিযুক্ত করেন। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, দ্বীন ইসলাম সংগঠিত ও সুসংবদ্ধ থাকার উপর জোর দেয়। আর এখানে যেহেতু মুসলিমদের একটি দল রাসূলের সরাসরি তত্ত্বাবধানে নেই, তাই রাসূলুল্লাহ চেয়েছিলেন, তারা যেন নিজস্ব কাঠামোর অধীনে দলবদ্ধ থাকে। তাই তিনি দেরি না করে ৭০ জনকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে দেন এবং তাদের উপর বারোজন নেতা নিযুক্ত করেন। তাঁরা ছিলেন নকীব বা এক ধরনের প্রতিনিধি যারা রাসূলুল্লাহর কাছে রিপোর্ট করবেন এবং রাসূলুল্লাহ তাদের মাধ্যমে নির্দেশাবলি পাঠাবেন।