📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 কা'ব ইবন মালিক ও বারা ইবন মা'রুরের ঘটনা

📄 কা'ব ইবন মালিক ও বারা ইবন মা'রুরের ঘটনা


সত্তর জন মুসলিমদের মধ্যে একজন ছিলেন কা'ব ইবন মালিক, তিনি তাদের হাজ্জ যাত্রার একটি ঘটনা বর্ণনা করেন।

'আমরা সেবার হাজ্জ করতে মক্কায় যাই, আমাদের মধ্যে কিছু লোক ছিল মুসলিম আর কিছু লোক অমুসলিম। আমাদের মুসলিম দলের নেতা ছিলেন বারা ইবন মা'রুর, তিনি ছিলেন একজন নেতৃস্থানীয়, প্রবীণ ব্যক্তিত্ব। তিনি আমাদের কাছে, অর্থাৎ মুসলিমদের কাছে এসে বললেন, আমি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এ ব্যাপারে তোমাদের মতামত জানতে চাই, তোমরা আমার সাথে একমত হবে কিনা আমি জানি না। আমার মতামত হলো, সালাতের সময় কাবাঘরকে পেছনে রাখতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না।'

বারা ইবন মা'রুর কাবাকে পেছনে রেখে সালাত আদায় করতে অস্বস্তিবোধ করছিলেন। সে সময় কা'বা মুসলিমদের কিবলা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি। মদীনায় বসে জেরুসালেমের আল-আকসা মসজিদের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে গেলে কাবাঘর মুসলিমদের পেছনে পড়ে যেতো। এ কারণে বারা ইবন মা'রুরের মধ্যে অস্বস্তি কাজ করছিল।

কা'ব তাঁকে বললেন, 'আল্লাহর রাসূল জেরুসালেমের দিকে মুখ করেই সালাত আদায় করেন, সুতরাং আমরা তাঁর বিপরীত কাজ করবো না।' বারা বললেন, "আমি কাবাঘরের দিকে মুখ করেই সালাত আদায় করবো।" এরপর থেকে তিনি কাবাঘরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে শুরু করেন। এরপর তাঁরা মক্কায় এসে পৌঁছালেন। বারা তাঁর ভাতিজা কা'ব ইবন মালিককে বললেন, 'ভাতিজা, আমাকে রাসূলুল্লাহর কাছে নিয়ে চলো। সফরে কিবলা পরিবর্তন করা ঠিক হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে আমি রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করবো। তোমরা তো আমার কাজকে অনুমোদন দিলে না, তাই আমার খটকা হচ্ছে। চলো, রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করে দেখি আমার কাজটা ঠিক হয়েছে কিনা।' কা'ব মক্কার এক লোকের কাছে রাসূলুল্লাহ কোথায় আছেন জানতে চাইলেন, সে বললো,
- আপনারা কি রাসূলুল্লাহকে চেনেন? কখনো তাঁকে দেখেছেন?
- না, তাঁকে আমরা চিনি না।
- আচ্ছা, তাঁর চাচা আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবকে চেনেন?
- হ্যাঁ তাঁকে আমরা চিনি।
- তাহলে আপনারা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলে দেখতে পাবেন যে, আব্বাসের সাথে একজন লোক বসে আছেন। তিনিই রাসূলুল্লাহ।

'আমরা মসজিদে প্রবেশ করে দেখলাম আব্বাস বসে আছেন, তাঁর সাথে রাসূলুল্লাহও বসে আছেন। আমরা সালাম দিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে বসলাম। আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে দেখে আব্বাসকে তাঁর কুনিয়া নামে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,
- আবুল ফাদল, আপনি কি এ দু'জন মানুষকে চেনেন?
- হ্যাঁ চিনি, ইনি হলেন বারা ইবন মা'রুর, তাঁর গোত্রের নেতা আর ইনি হচ্ছেন কা'ব ইবন মালিক।
- কবি কা'ব নাকি?'

কা'ব ইবন মালিক ছিলেন একজন কবি। এজন্য আব্বাস যখন কা'বকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন ইনিই কি কবি কা'ব কিনা।

এই ঘটনায় কা'ব তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন এই বলে, 'রাসূলুল্লাহর এই কথাটি আমি কখনো ভুলবো না!'

কা'ব ইবন মালিকের কাছে এটা বিশাল ব্যাপার ছিল যে রাসূলুল্লাহ তাঁকে আগে থেকে চিনতেন। রাসূলুল্লাহর সাথে এটি ছিল তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ, যে সাক্ষাতের এই মুহূর্তের জন্য এতদিন অপেক্ষা করে আসছিলেন, আর সেই সাক্ষাতেই আবিষ্কার করলেন তাঁর নেতা, তাঁর এত প্রিয় এই মানুষটি তাঁকে আগে থেকেই চেনেন! এ কথা ভেবেই কা'ব ইবন মালিক গর্ববোধ করছিলেন এবং খুব খুশি হয়েছিলেন। তিনি আরো আনন্দিত হয়েছিলেন এই ভেবে যে রাসূলুল্লাহ হয়তো তাঁর কিছু কীর্তির কথাও শুনে থাকবেন।

এরপর বারা ইবন মা'রুর তাঁর প্রশ্ন উত্থাপন করলেন, 'হে আল্লাহর নবী! আল্লাহ তাআলা আমাকে ইসলামের পথে হিদায়াত করেছেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমি যখন এই সফরে বের হই, তখন আমার মনে হলো, কাবাঘরকে পেছনে রাখা সমীচীন হবে না। তাই আমি কাবার দিকে মুখ করেই সালাত আদায় করেছি। কিন্তু আমার সাথীরা আমার বিরোধিতা করায় আমার মনে খটকা সৃষ্টি হয়েছে, যা করছি ঠিক করছি তো? এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?' মুহাম্মাদ বললেন, "তোমার আগে যে কিবলা ছিল তা বরারবই আদায় করা উচিত।" এরপর থেকে বারা তাঁর কিবলা পরিবর্তন করেন। যেহেতু রাসূলুল্লাহ তখন মক্কায় ছিলেন তাঁকে সালাত আদায়ের সময় কাবাকে পেছনে রাখতে হতো না। কাবাঘরকে সামনে রেখে তিনি জেরুসালেমের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে পারতেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো হিজরতের পর রাসূলুল্লাহরও ঠিক একই অনুভূতি হয়েছিল, যা হয়েছিল বারা ইবন মা'রুরের, তিনিও কাবাকে পেছনে রেখে সালাত আদায় করতে তখন অস্বস্তিবোধ করেছিলেন, এটা ঘটেছিল মদীনায়।

কা'ব বর্ণনা করেন, 'এরপর আমরা রাসূলুল্লাহর সাথে ওয়াদাবদ্ধ হলাম যে, আমরা আকাবায় আইয়ামে তাশরিফের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর সাথে সাক্ষাত করবো। এরপর আমরা হাজ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বিষয়টি আমরা গোপন রাখলাম, রাসূলুল্লাহর সাথে আমাদের গোপন বৈঠক সম্পর্কে আমাদের গোত্রের মুশরিক সাথীরা কিছুই জানতো না। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম আবু জাবির, তিনি ছিলেন আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ ও গোত্রনেতাদের একজন। আমরা তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, আবু জাবির! আপনি আমাদের অন্যতম নেতা এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। আপনি যে ধর্ম অনুসরণ করছেন তার কারণে আপনি আখিরাতে জাহান্নামের জ্বালানি হবেন— এটা আমরা চাই না।' আবু জাবির তখন ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁকে আসন্ন গোপন বৈঠক সম্পর্কে জানানো হয়। তিনি সেই শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ তাঁকে প্রতিনিধি হিসেবেও মনোনীত করেছিলেন। ইসলামে তাঁর বয়স ছিল অল্প, কিন্তু তাঁর নেতৃত্বের যোগ্যতার কারণে তিনি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব পেয়ে যান।

টিকাঃ
৫১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৩।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বাইয়াতের রাত

📄 বাইয়াতের রাত


অবশেষে সেই নির্ধারিত রাত এল। মুসলিমরা একজন-দুইজনের ছোট ছোট দলে আক্বাবায় যেতে শুরু করেন। তাঁরা চাচ্ছিলেন না কেউ তাদের দেখে ফেলুক। একসাথে সত্তর জন লোকের একটি দল রাসূলুল্লাহর সাথে দেখা করতে গেলে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এভাবে তাঁরা সবাই আকাবায় মিলিত হলেন। রাসূলুল্লাহ ছিলেন মক্কা থেকে আসা একমাত্র মুসলিম, তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর চাচা আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব। আব্বাস তখনো মুশরিক ছিলেন, এই বৈঠকে তিনিই ছিলেন একমাত্র অমুসলিম। তিনিই প্রথমে কথা শুরু করেন। তিনি বললেন,

'মুহাম্মাদ আমাদের মাঝে কেমন সম্মানের অধিকারী তা আপনাদের নিশ্চয়ই জানা আছে। আমাদের গোত্রের লোকদের হাত থেকে তাঁকে আমরা নিরাপত্তা দিয়েছি। তিনি তাঁর গোত্রের কাছে সম্মানিত এবং নিজ শহরে নিরাপদে অবস্থান করছেন। কিন্তু তিনি এখন আপনাদের সাথে এক হতে চান। আপনারা যদি মনে করেন, যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আপনারা মুহাম্মাদকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন, সে প্রতিশ্রুতি আপনারা পূরণ করতে পারবেন, তাঁর শত্রুদের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করতে পারবেন, তাহলে সিদ্ধান্ত নিন আপনারা তাঁর দায়িত্ব নেবেন কি না। আর যদি মনে করেন, শেষ পর্যন্ত আপনারা তাঁকে রক্ষা করতে পারবেন না এবং তাঁকে তাঁর শত্রুদের হাতে তুলে দেবেন তবে এখনই তাঁকে রেখে যান। কারণ তিনি নিজ গোত্রের মধ্যে নিজের শহরে সম্মান ও নিরাপত্তার মাঝে আছেন।'

আব্বাস ইবন মুত্তালিব আনসারদের দৃঢ়তা যাচাই করছিলেন। আনসাররা তাদের এই প্রতিশ্রুতির প্রতিটা কতো অনড় সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত হতে চাইছিলেন। কারণ তাঁরা এমন এক ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, যে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তাদেরকে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। চারদিক থেকে তাদের উপর চাপ আসতে পারে, তাদের উপর দুর্যোগ নেমে আসতে পারে এবং এ চাপ সামলানোর ক্ষমতা পরবর্তীতে নাও থাকতে পারে। এই ধরনের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া যে সহজ হবে না সে ব্যাপারটি তিনি আনসারদের জানিয়ে রাখছিলেন। রাসূলুল্লাহকে আশ্রয় দেওয়া নিঃসন্দেহে একটা বিরাট ঝুঁকি, আর সেই ঝুঁকি নিতে রাজি কিনা, তাঁরা তাঁকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেওয়ার সামর্থ্য রাখে কিনা - সে বিষয়টি যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই আব্বাস তাদের বলছিলেন, যদি তাদের এ সামর্থ্য না থাকে তাহলে তাঁরা যেন এই অঙ্গীকারে অংশ না নিয়ে আল্লাহর রাসূলকে মক্কাতেই রেখে যায়।

প্রশ্ন আসতে পারে অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও কেন আব্বাস সেখানে উপস্থিত ছিলেন? কারণ আব্বাস ইবন মুত্তালিব ছিলেন রাসূলুল্লাহর চাচা এবং বনু হাশিম গোত্রের একজন মুরুব্বি। মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি রাসূলুল্লাহর সাথে থাকতে পছন্দ করতেন এবং তার সকল কার্যকলাপের দিকে লক্ষ্য রাখতেন। আবু তালিবের মৃত্যুর পর মক্কায় রাসূলুল্লাহকে যারা নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন, আব্বাস ছিলেন তাদের একজন। তাই তিনি নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলেন যে, তাঁর ভাতিজা যখন মক্কা ত্যাগ করে যাবে তখন যেন সে নিরাপদে থাকে। আর এ কারণেই রাসূলুল্লাহ তাঁকে বৈঠকে অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়েছিলেন। বনু হাশিম গোত্রের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আব্বাস বৈঠকে উপস্থিত থেকে গোত্রের সন্তানদের নিরাপত্তার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন।

আরো প্রশ্ন আসতে পারে চাচা আব্বাসের নিরাপত্তা কি যথেষ্ট ছিল না, যেখানে আবু তালিবও তাঁর চাচা হিসেবে তাঁকে এতদিন নিরাপত্তা দিয়ে আসছিলেন? অনেকের মতে, নিজ গোত্রের লোকেদের কাছে আবু তালিব যেরূপ সম্মানিত ছিলেন, তাদের ওপর তাঁর যেমন প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল, তাঁর অন্য ভাইদের তেমনটা ছিল না। তাই বয়োজ্যেষ্ঠতার জন্য আবু তালিব যেভাবে মুহাম্মাদকে রক্ষা করতে পেরেছেন, নিশ্চিতভাবেই আব্বাস সেভাবে পারতেন না। তিনি ছিলেন যুবক। তবুও তিনি তাঁর সাধ্যমত চেষ্টা করে হিজরতের আগ পর্যন্ত নবীজিকে নিরাপত্তা দিয়েছিলেন।

আব্বাসের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর আনসাররা বললেন, 'আপনার কথা আমরা শুনেছি। হে আল্লাহর রাসূল, এবার আপনি কথা বলুন। বলুন আমাদের থেকে আপনি কী চান। আপনি নিজের এবং আপনার রবের জন্য আমাদের কাছ থেকে যা যা অঙ্গীকার নিতে চান, তা আমাদেরকে বলুন।' রাসূলুল্লাহ উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন,

'তোমরা অঙ্গীকার করো, ভালো-মন্দ সকল অবস্থায় আমার কথা শুনবে এবং মানবে। সচ্ছলতা, অসচ্ছলতা সর্বাবস্থায় আল্লাহর পথে ব্যয় করবে। সৎ কাজের আদেশ আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে। আল্লাহর পথে হক কথা বলে যাবে এবং এ ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে পরোয়া করবে না। আমি যদি তোমাদের কাছে আসি তাহলে আমাকে সাহায্য করবে। আমাকে হেফাযত করবে সেভাবে, যেভাবে তোমরা নিজেদেরকে, নিজেদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে হেফাযত করো।'

এই অঙ্গীকার ছিল আকাবার প্রথম বাইয়াতের অঙ্গীকারের চেয়ে একধাপ বেশি। তখন তারা কেবল মুসলিম হওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু এবার আরো একটি বিষয় যুক্ত হয়েছে, আল্লাহর রাসূলকে নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া। এটি ছিল আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধ।

রাসূলুল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টবাদী। তিনি যা চান তিনি তা পরিষ্কার ভাষায় আনসারদেরকে জানিয়ে দিলেন, কোনো অস্পষ্টতা তিনি রাখলেন না। তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিলেন তিনি শুধু নিরাপত্তার খাতিরে মদীনায় আসছেন না, বরং সবাই তাঁকে মেনে চলবে এবং একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করা চলবে না। তাঁরা যদি আল্লাহ ছাড়া আর অন্য কোনো কিছুকে ভয় করেন তাহলে তিনি তাঁর মিশন নিয়ে এগোতে পারবেন না। রাসূলুল্লাহ এমন একটি মিশনে নেমেছেন যে মিশন সফল করতে হলে নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থাকা চাই— আনসারদেরকে রাসূলুল্লাহ এই কথাটিই বুঝাতে চাচ্ছিলেন।

রাসূলুল্লাহর কথা শুনে বারা ইবন মা'রুর সবার প্রথমে উঠে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহকে বাইয়াত দিতে চাইলেন। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর শপথ, আমরা তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যোদ্ধা জাতি।' বারার কথা শেষ হতে না হতেই আবুল হাইসাম ইবন তাইহান উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের সাথে অন্যদের (অর্থাৎ ইহুদিদের) সন্ধি রয়েছে। আমরা যদি এই চুক্তি ভঙ্গ করি আর আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান করেন, তাহলে কি আপনি আমাদের ত্যাগ করে নিজ গোত্রে ফিরে যাবেন?'

আবু হাইসাম বলতে চাচ্ছিলেন, আপনার হাতে বাইয়াত করার অর্থ হচ্ছে, আমরা এমন লোকদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হতে পারি যাদের সাথে আমাদের সন্ধিচুক্তি রয়েছে। এ অবস্থায়, আপনি যদি বিজয় লাভ করেন, তখন কি আপনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন নাকি আমাদের সাথেই থাকবেন? দেখুন, আমরা কিন্তু সারাজীবনের জন্য স্বেচ্ছায় অঙ্গীকারাবদ্ধ হচ্ছি কিন্তু আপনি কি আমাদের সাথে থাকবেন? নাকি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন?

রাসূলুল্লাহ মুচকি হেসে উত্তর দিলেন,
'তোমাদের রক্তই আমার রক্ত। আর তোমাদের ধ্বংসই আমার ধ্বংস। আমি তোমাদের আর তোমরা আমার। তোমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করবো। তোমরা যাদের সাথে সন্ধি করবে, আমিও তাদের সাথে সন্ধি করবো।'

রাসূলুল্লাহ তাঁর এই ওয়াদা রেখেছিলেন। তাঁর আপন মাতৃভূমি মক্কা বিজয়ের পর তিনি সেখানে থেকে যাননি, বরং তিনি আনসারদের সাথে মদীনায় চলে যান এবং আমৃত্যু সেখানেই বসবাস করেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি আনসারদের সাথে অবস্থান করেন।

রাসূলুল্লাহর হাতে বাইয়াত করার জন্য আনসাররা যখন তাদের হাত এগিয়ে দিতে শুরু করেন, তখন আব্বাস ইবন উবাদা দাঁড়িয়ে তাদের বাধা প্রদান করেন। তিনি ছিলেন মদীনার প্রথম দিকের ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন। তিনি বলেন, 'একটু থামো।' তিনি তাঁর গোত্রের লোকদেরকে ব্যাপারটি সহজভাবে নিতে এবং ধীরেসুস্থে করার জন্য বললেন। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন,

'আমরা আজ তাঁর কাছে এ কারণেই সমবেত হয়েছি যে তিনি আল্লাহর রাসূল। তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার অর্থ হলো সমগ্র আরবের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি হওয়া। এর ফলে তোমাদের নেতাদের জীবন হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামা বাজবে। যদি তোমরা মনে করো, তোমরা এই ঝুঁকির ভার সইতে পারবে, তবেই তাঁকে নিজেদের কাছে নাও। তোমাদের এ কাজের বিনিময় আল্লাহর কাছে রয়েছে। আর যদি নিজেদের জান তোমাদের কাছে প্রিয় হয়ে থাকে, তবে এখনই তাঁকে ছেড়ে দাও, এটা হবে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য অজুহাত।'

তিনি তাদেরকে মনে করিয়ে দিলেন এই অঙ্গীকার কোনো সহজ অঙ্গীকার নয়— তোমরা কি বুঝতে পারছো, আমরা কীসের ব্যাপারে অঙ্গীকার করছি? যদি আমরা তাঁকে আশ্রয় দিই, তাহলে পুরো বিশ্বের সাথে আমাদের শত্রুতা তৈরি হবে। আমাদের দিকে তরবারি তাক করা হবে সবদিক থেকে। আমাদের নেতৃস্থানীয় লোকেরা মারা পড়তে পারে। আমাদের জান-মাল হুমকির মুখে পড়তে পারে, বিনষ্ট হতে পারে। কাজেই যদি তোমরা অঙ্গীকার করো, তবে বুঝেশুনে অঙ্গীকার করো। আর যদি তোমাদের অন্তরে কোনোরূপ ভয়-ভীতি থেকে থাকে তাহলে দেরি হওয়ার আগেই এ প্রতিশ্রুতি থেকে সরে পড়ো। তাঁরা আব্বাস ইবন উবাদাকে সরিয়ে দিয়ে বললেন, 'আমরা বাইয়াত করবো, এবং আমরা কখনই বাইয়াত ভঙ্গ করবো না।'

আনসাররা ছিলেন অসম্ভব দৃঢ়প্রত্যয়ী, তাঁরা প্রচণ্ড দৃঢ়তার সাথে অঙ্গীকার করেছিলেন। তাঁরা জানতে চাইলেন, 'আপনাকে রক্ষার বিনিময়ে আমরা কী পাবো?' তাঁরা বলতে চাচ্ছিলেন, নিজেদের জীবন ধনসম্পদ কুরবানি করে হলেও আমরা আপনাকে রক্ষা করে যাবো কিন্তু এর বিনিময়ে আপনি আমাদের কী দেবেন? এর বিনিময় কী? কোনো চুক্তিই একতরফা নয়। যেহেতু আমরা আপনাকে সাহায্য করতে যাচ্ছি সেহেতু নিশ্চয়ই এর বিনিময়ে আমরা কিছু পাবো, সেটা কী?

রাসূলুল্লাহ তাদের প্রশ্নের উত্তরে শুধু একটি শব্দই বললেন, ব্যস, 'আল জান্নাহ', এতটুকুই ছিল তাঁর ওয়াদা, আর কিচ্ছু না। তিনি তাদেরকে না মন্ত্রীত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, না দিয়েছেন বাড়িগাড়ি কিংবা টাকাপয়সার প্রতিশ্রুতি, তিনি শুধু তাদেরকে একটি জিনিসের ওয়াদা করেছেন, তা হলো জান্নাত।

আনসাররা দুনিয়ার সম্পদ কিংবা ক্ষমতা চাননি, তাঁরা শুধু জান্নাতের অঙ্গীকারে সন্তুষ্ট ছিলেন। তাদের চোখে এই বাইয়াত ছিল একটা লাভজনক ব্যবসা। তারা খুশিমনে নবীজিকে বাইয়াত দিলেন।

বাইয়াতের এই সংবাদটি কোনোভাবে কুরাইশদের কাছে পৌঁছে যায়। হাজ্জের মৌসুমে সত্তরের অধিক লোকের একটি বৈঠক গোপন রাখা খুব সহজ ব্যাপার না।

টিকাঃ
৫২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৭।
৫৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৮।
৫৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০১।
৫৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৪।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বাইয়াত থেকে শিক্ষা

📄 বাইয়াত থেকে শিক্ষা


১. কা'ব ইবন মালিক বলেন, 'মদীনা ত্যাগ করার পূর্বেই আমরা সালাত আদায় করতে শিখেছিলাম, আমাদের দ্বীনের জ্ঞান লাভ করেছিলাম।' এটি রাসূলুল্লাহর হিজরতের আগের ঘটনা। সুতরাং যেসব ভাইবোনেরা ইসলাম শিক্ষার ব্যাপারে বিলম্ব করছেন এ অজুহাতে যে তারা বিদেশে গিয়ে কোনো শাইখের কাছে পড়াশোনা করার সুযোগ পাচ্ছেন না বা কোনো ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পারছেন না, তাঁরা আসলে খোঁড়া যুক্তি দেখাচ্ছেন। দ্বীনের ব্যাপারে পড়াশোনা না করার ব্যাপারে এগুলো কোনো অজুহাত নয়। 'অনুকূল পরিস্থিতি'র আশায় বসে না থেকে প্রত্যেকের উচিত একটুও বিলম্ব না করে সাধ্যমতো দ্বীনের জ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়া। কা'ব ইবন মালিক এবং তাঁর সহযোগীরা যখন দ্বীনের বুঝ লাভ করেছেন, সালাত আদায় করা শিখে গেছেন, তখনো আল্লাহর রাসূল মদীনায় প্রবেশ করেননি। তাদের সাথে কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন মুসআব ইবন উমাইর। কিন্তু কা'ব ইবন মালিকের বক্তব্যের একটি অন্তর্নিহিত বার্তা রয়েছে, তা হলো আমরা প্রস্তুত, আমরা শিখছি। দ্বীনের জ্ঞানার্জন থেকে নিজেকে বিরত রাখা একেবারেই উচিত নয়, মুসলিম মাত্রই দ্বীন জানার ব্যাপারে সচেতন থাকবে।

যদি কোনো মুসলিম কোনো আলিম বা শাইখের দারস্থ হতে না পারে, তাহলে তার উচিত বসে না থেকে অন্তত এমন কারো সাথে সময় কাটানো যে তার থেকে বেশি জানে। তেমন কাউকেও যদি না পাওয়া যায়, নিদেনপক্ষে কোনো আলিমের বই পড়তে শুরু করে দেওয়া উচিত। দ্বীনি পড়াশোনার মধ্যে সবসময় ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। কালক্ষেপণ করা কোনো অজুহাত হতে পারে না। ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, কুরআনের আয়াতগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, জাহান্নামীদের বেশিরভাগ আর্তনাদের কারণ হবে তাদের গড়িমসি। তারা বলবে,
“হে আল্লাহ, আমাদের একবার ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিন, যাতে আমরা বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি। হে আল্লাহ, আমাদের একবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে নিয়ে যান, যেন আমরা দান করতে পারি। হে আল্লাহ, আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যান।”

কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যাবে, সুতরাং কখনই ভালো কাজের সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়।

২. যখন রাসূলুল্লাহ আনসারদের কাছে তাঁর চুক্তির শর্তগুলো সম্পর্কে বলেছিলেন, তখন তাদের প্রশ্ন ছিল, 'বিনিময়ে আমরা কী পাবো?' রাসূলুল্লাহ এক শব্দে উত্তর দিয়েছিলেন, জান্নাহ। এখানে থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, সকল ইসলামি কর্মকাণ্ডের একমাত্র উদ্দেশ্য শুধুমাত্র জান্নাত, আল্লাহ আযযা ওয়াজালকে সন্তুষ্ট করাই প্রতিটি কাজের মূল উদ্দেশ্য – খ্যাতির জন্য নয়, অর্থের জন্য নয়, সামাজিকতার জন্যেও নয়। প্রতিনিয়ত নিয়তকে পরিশুদ্ধ করে নিজেদের জিজ্ঞেস করা উচিত – ইসলামের জন্য যে ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করছি, তা কেন করছি? তা কি আসলেই আল্লাহর জন্য করছি?

এই দ্বীনের জন্য প্রয়োজন আত্মত্যাগ। এই আত্মত্যাগের বিনিময় হলো জান্নাত। একজন মুসলিম দ্বীনের জন্য ত্যাগ আর কষ্ট স্বীকার করলে তার বিনিময় এই দুনিয়াতে নাও পেতে পারে, কেননা দুনিয়া ত্যাগ করাই দ্বীনের দাবি। এটি এমন একটি দ্বীন যার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতে হতে পারে, কারণ এর বিনিময়ে রয়েছে জান্নাত। জান্নাতে যে প্রতিদান দেওয়া হবে তা যেকোনো আত্মত্যাগের তুলনায় বহুগুণে দামি। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ তোমাদেরকে যা দিবেন তা অনেক দামি। আল্লাহ তোমাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন। কাজেই জান্নাত পেতে চাইলে এই দুনিয়াতে তার জন্য চড়া মূল্যও দিতে হবে।

৩. রাসূলুল্লাহ অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তাদের কাছে উপস্থাপন করেছিলেন যে, তিনি তাদের কাছে কী আশা করছেন। রাসূলুল্লাহ কোনো লুকোছাপা রাখেননি, তিনি আনসারদের জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাদের এই কাজের জন্য তাদের ও তাদের পরিবারের জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে, আল্লাহর রাসূলকে আশ্রয় দেওয়ার অর্থ নিজেদের জীবনে যুদ্ধ ডেকে আনা। আর এই কাজের বিনিময় হিসেবে রাসূলুল্লাহ তাদেরকে দুনিয়ার প্রাচুর্য বা অর্থ-সম্পদের প্রতিশ্রুতি দেননি, ক্ষমতার প্রতিশ্রুতিও দেননি, তিনি তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা কোনো সহজ কাজ নয়, এর জন্য অনেক সংগ্রাম করতে হবে আর এর জন্য প্রয়োজন অনেক আত্মত্যাগ। উমার ইবন খাত্তাব বলেছিলেন যে, আয়েশের জীবন ছেড়ে দাও, আরামের জীবন চিরস্থায়ী হবে না। কাজেই যারা দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ করতে চায়, তাদের মনে রাখতে হবে, এই কাজের জন্যে দুনিয়াকে বিসর্জন দিতে হতে পারে। আর সে হিসেবেই নিজেদের প্রস্তুত করে নেওয়া জরুরি।

৪. আকাবার দ্বিতীয় বাইয়াতে আল্লাহর রাসূলের সাথে সত্তরের অধিক লোক সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। তাঁরা ছাড়াও আরও অনেকে মুসলিম ছিলেন যারা হয়তো সেখানে আসেনি। কিন্তু বাইয়াত গ্রহণ করা মাত্রই রাসূলুল্লাহ তাদেরকে বললেন ১২ জন নেতা (নুকাবা) মনোনীত করতে। অর্থাৎ তিনি তাদেরকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে তাদের জন্য একজন করে নেতা নিযুক্ত করেন। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, দ্বীন ইসলাম সংগঠিত ও সুসংবদ্ধ থাকার উপর জোর দেয়। আর এখানে যেহেতু মুসলিমদের একটি দল রাসূলের সরাসরি তত্ত্বাবধানে নেই, তাই রাসূলুল্লাহ চেয়েছিলেন, তারা যেন নিজস্ব কাঠামোর অধীনে দলবদ্ধ থাকে। তাই তিনি দেরি না করে ৭০ জনকে বিভিন্ন দলে ভাগ করে দেন এবং তাদের উপর বারোজন নেতা নিযুক্ত করেন। তাঁরা ছিলেন নকীব বা এক ধরনের প্রতিনিধি যারা রাসূলুল্লাহর কাছে রিপোর্ট করবেন এবং রাসূলুল্লাহ তাদের মাধ্যমে নির্দেশাবলি পাঠাবেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px