📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বাইয়াতের প্রথম শপথ

📄 বাইয়াতের প্রথম শপথ


সেই ছয়জন পুণ্যবান লোক ইসলাম গ্রহণ করলো এবং তারা রাসূলুল্লাহকে বললো, 'আমরা দেশে ফিরে গিয়ে আমাদের লোকদের ইসলামের পথে আসার জন্য আহ্বান করবো।' মদীনায় ফিরে যাওয়ার আগে তারা রাসূলুল্লাহর সাথে পরের বছর হাজ্জের মৌসুমে দেখা করার কথা দিল। বছর ঘুরে আবার ফিরে এল হাজ্জের মৌসুম। এবার ছয়জনের পরিবর্তে এল বারোজন, ছয়জন ছিল আগের বছরের আর বাকি ছয়জন নতুন। প্রথম বছরে ইসলাম গ্রহণকারী ছয়জন ছিলেন আল খাযরাজ গোত্রের; অন্য আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে পাঁচজন ছিলেন আল খাযরাজ গোত্রের আর বাকি একজন এসেছিলেন আল আওস থেকে। দ্বিতীয় বছরে আল খাযরাজ থেকে ছিলেন দশজন এবং আল আওস থেকে দুইজন। তাঁরা রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বাইয়াত দিলেন। বাইয়াতের ভাষ্য ছিল এমন:

'আক্বাবার প্রথম বৈঠকের রাতে রাসূলুল্লাহর কাছে এই মর্মে বাইয়াত দেওয়া হয় যে, আমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবো না। আমরা ব্যভিচারের ধারে কাছে যাবো না, সন্তান হত্যা করবো না, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেব না এবং ভালো কাজে তাঁর বিরোধিতা করবো না। তিনি আমাদেরকে বলেছেন, যদি তোমরা এগুলো মেনে চলতে পার তাহলে জান্নাতে যেতে পারবে। আর যদি কোনো পাপ করে ফেল এবং সেই পাপের শাস্তি যদি এই দুনিয়াতেই দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে সেই পাপ মাফ করে দেওয়া হবে। কিন্তু যদি দুনিয়াতে পাপের শাস্তি না দেওয়া হয় তাহলে আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ওই পাপের জন্য শেষ বিচারের দিন শাস্তি দিতেও পারেন আবার ক্ষমাও করে দিতে পারেন।'

সাধারণত, মহিলারা এই মর্মে রাসূলুল্লাহর কাছে বাইয়াত করতেন। এই বাইয়াতে জিহাদের ব্যাপারে অঙ্গীকার ছিল না বলেই একে বাইয়াতুন নিসা বা মহিলাদের বাইয়াত বলা হয়।

এখানে একটি ফিকহী বিষয় লক্ষ্যণীয়: এই বাইয়াতে যেসব গুনাহ থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে সেগুলো সবই হলো কবীরা গুনাহ— ব্যভিচার, সন্তানদের মেরে ফেলা, কারো নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, ভালো কাজে আল্লাহর অবাধ্য হওয়া। এরপর রাসূলুল্লাহ বলেন যে এই দুনিয়াতে থাকতেই যদি গুনাহের শাস্তি দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে গুনাহকারীকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে আর যদি বেঁচে থাকতে শাস্তি দেওয়া না হয় তাহলে গুনাহকারীকে শেষ বিচারের দিন ক্ষমা করে দেওয়া হবে নাকি শাস্তি দেওয়া হবে তা আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করবেন।

রাসূলুল্লাহ মদীনার মুসলিমদেরকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য মুসআব ইবন উমাইরকে মনোনীত করেন। তিনি ছিলেন একজন প্রতিনিধি, শিক্ষক ও আলিম। মুসআব ছিলেন কুরাইশের এক ধনী পরিবারের সন্তান। মুসলিম হওয়ার পূর্বে তিনি ছিলেন মক্কার সবচেয়ে উচ্ছন্নে যাওয়া যুবক, তাঁর পরনে থাকতো সবচেয়ে দামি সব জামাকাপড়, শরীরে থাকতো নিত্যনতুন সুগন্ধির ঘ্রাণ। তাঁর মা ছিলেন অনেক ধনী। মুসআব ছাড়া তার আর কোনো সন্তান ছিল না, তাই একমাত্র ছেলেকে অনেক আদর করতেন। কিন্তু যখন মুসআব ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন তাঁর মা তাঁকে ত্যাগ করলেন, তাঁর বিরুদ্ধে চলে গেলেন। যে মুসআব শৈশব-কৈশোর-যৌবন কাটিয়েছিলেন প্রাচুর্যের মধ্যে, তিনিই হঠাৎ সহায়সম্বলহীন এক যুবকে পরিণত হলেন, জীবন হয়ে যায় রুক্ষ, কঠিন। মুসআব যখন উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন, তাঁকে দাফন করার জন্য পর্যাপ্ত টাকাপয়সাও তখন ছিল না। তাঁর গায়ে যে জামাটি ছিল তা দিয়ে তাঁকে ঠিকমত ঢেকে রাখা যাচ্ছিল না। উপস্থিত সাহাবীরা সেই দিনের কথা বর্ণনা দিয়েছেন, 'আমরা যখন তাঁর মুখ ঢাকার চেষ্টা করছিলাম তখন তাঁর পা বের হয়ে যাচ্ছিল, আবার পা ঢাকতে গেলে মুখ দেখা যেতো। আমরা রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে বললাম, এখন আমরা কী করবো?' রাসূলুল্লাহ তখন তাদেরকে কাপড় দিয়ে মুসআবের মুখ আর কিছু ঘাস দিয়ে পা ঢেকে দিতে বললেন।

মুসআব ইবন উমাইর ছিলেন রাসূলুল্লাহর মদীনার প্রতিনিধি, তাঁর উপর অর্পিত এই দায়িত্ব ছিল বেশ কঠিন। তিনি মদীনায় থাকার জন্য মক্কা ত্যাগ করলেন। আল আওস ও খাযরাজের মধ্যে শত্রুতা থাকায় তিনি সালাতের ইমামতি করতেন, কারণ দুই গোত্রের কেউই অন্য গোত্রের ইমামের পেছনে সালাত আদায় করতে চাইত না।

মুসআব মদীনায় আসআদ ইবন যুরারার সাথে থাকতেন। তাঁরা সেখানকার এক বাগানে অন্যান্য মুসলিমদের সাথে দেখা করতেন। তাঁরা সেখানে মুসলিমদের ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা দিতেন। মুসআব তাদের সাথে নিয়মিত হালাক্বা করতেন। তাঁরা বসতেন মদীনার আওস-অধীনস্থ একটি এলাকায়। তখন পর্যন্ত মুসলিমদের অধিকাংশই ছিল খাযরাজ গোত্রের, আওসের অল্পসংখ্যক লোকই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। মুসআব আওস গোত্রকে ইসলামের দিকে আগ্রহী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ কারণে তিনি আল আওসের এলাকায় গেলেন।

আওসের নেতাদের বিষয়টি পছন্দ হলো না। আওসের নেতা ছিলেন সাদ ইবন মুয়ায ও উসাইদ ইবন খুযাইর। মুসআব ও আসআদ ইবন যুরারাকে আওসের এলাকায় একসাথে দেখতে পেয়ে সাদ ইবন মুয়ায খুব বিরক্ত হয়ে তার বন্ধু উসাইদকে বললেন, 'তুমি ওই দুই লোকের কাছে গিয়ে বলো যে, আমরা চাইনা তাঁরা এখানে থেকে দুর্বল ও বোকা লোকদের বিভ্রান্ত করুক। আসআদ যদি আমার আত্মীয় না হতো তবে আমি নিজে গিয়েই এই কথা বলতাম।' আসআদের সম্মানে, নিতান্ত ভদ্রতার খাতিরে সাদ চুপ করে ছিলেন, নিজে না গিয়ে উসাইদকে পাঠালেন।

অন্যদিকে, আসআদ খাযরাজ গোত্রের হলেও তিনি ছিলেন আওসের নেতার মামাতো ভাই, সে সুবাদে তিনিই ছিলেন মুসআবকে মেহমানদারি করার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি। সাদের বিরক্তি দেখে উসাইদ ইবন খুযাইর বর্শা হাতে নিয়ে মুসআব ও আসআদের সাথে কথা বলার জন্য তাদের দিকে অগ্রসর হলেন। আসআদ মুসআবকে জানিয়ে দিলেন, 'যে লোকটা আসছে সে হলো উসাইদ, সে তার লোকদের নেতা। তাঁকে যতসম্ভব ইসলামের দিকে টানার চেষ্টা করো, সে যদি মুসলিম হয় তাহলে অনেকেই তার দেখাদেখি মুসলিম হবে।' মুসআব ইবন উমাইর বললেন, 'সে শুনতে চাইলে আমি অবশ্যই তাঁকে বুঝানোর চেষ্টা করবো।'

ইবন খুযাইর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে খুব রুক্ষভাবে কথা বলতে শুরু করলেন, 'দেখ, আমরা তোমাদের এই এলাকার আশেপাশে দেখতে চাই না। আমরা চাই না তোমরা এখানকার দুর্বল ও অজ্ঞ লোকদের বিভ্রান্ত কর। নিজেদের জীবনের মায়া থাকে তো এখান থেকে চলে যাও, না হলে এই হলো আমার বর্ণনা।' যখন তিনি তাদেরকে এভাবে হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন হালাকায় অংশগ্রহণকারী নও মুসলিমদের একজন বলে উঠল, 'ওরা নয়, বরং তুমিই আমাদেরকে বিভ্রান্ত করছ...' এই বলে সে উসাইদের সাথে তর্ক শুরু করে দিল।

পরিস্থিতি সামাল দিতে মুসআব শান্ত কণ্ঠে বললেন, 'আমরা যা নিয়ে কথা বলছিলাম তা কি আপনি একটু শুনে দেখবেন? যদি আপনার ভালো লাগে তাহলে আপনি তা গ্রহণ করবেন আর ভালো না লাগলে অগ্রাহ্য করবেন।' উসাইদ বললেন, 'ঠিক আছে শুনবো।' তিনি সেখানে বসলেন। মুসআব তাঁকে কুরআনের কিছু আয়াত পাঠ করে শোনালেন, ইসলামের দাওয়াত দিলেন, ইসলামের ব্যাপারে কথা বললেন। মুসআবের কথায় উসাইদের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা বর্ণনা করেছেন আসআদ, 'উসাইদ মুখে কিছুই বললো না, তাঁর চেহারাই বলে দিচ্ছিল ইসলাম তাঁর হৃদয় দখল করে নিয়েছে, তাঁর মুখে ছিল প্রছন্ন এক আভা – শান্ত, প্রসন্ন একটা ছাপ।'

মুসআবের বক্তব্য হলে উসাইদ তাঁকে বললেন, 'এ দ্বীনে প্রবেশ করতে হলে কী করতে হবে?' মুসআব তাঁকে বললেন, 'আপনি পবিত্র হয়ে আসুন, তারপর সালাত আদায় করুন।' পবিত্র হয়ে উসাইদ সালাত আদায় করলেন, এরপর মুসআবকে বললেন, 'আমি আপনার কাছে এমন এক ব্যক্তিকে পাঠাচ্ছি যিনি মুসলিম হলে তাঁর দলের সব লোকেরাও ইসলাম গ্রহণ করে ফেলবে।' এই বলে উসাইদ গেলেন সাদ ইবন মুয়াযের কাছে। উসাইদকে ফিরে আসতে দেখে সাদ বললেন, 'আল্লাহর কসম! যে চেহারা নিয়ে সে গিয়েছিল, ভিন্ন চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে।' এটিকে বলে ফিরাসা, ফিরাসা হলো কারো চেহারা দেখে তাঁর সম্পর্কে বলে দেওয়া, আরবদের মধ্যে এই রীতি ছিল।

সাদ ইবন মুয়ায জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হয়েছে?' উসাইদ বললেন, 'সব ঠিকঠাক আছে, তুমি চিন্তা কোরো না। আসলে একটু সমস্যা হয়েছিল, বনু হারিস (আল খাযরাজের একটি শাখা) যখন জানতে পারল যে আসআদ তোমার ভাই, তখন তারা শত্রুতাবশত তাকে খুন করতে চেয়েছিল।' পুরো ঘটনাটি উসাইদ বানিয়ে বললেন সাদ ইবন মুয়াযকে মুসআব ইবন উমাইরের কাছে পাঠানোর জন্য। উসাইদের মুখে এই কাহিনি কথা শুনে সাদ খুব রেগে গেলেন। তিনি বললেন, 'কী! তারা আমার ভাইকে খুন করতে চায়!' তিনি বর্শা নিয়ে ভাই আসআদকে রক্ষা করার জন্য চলে গেলেন এবং যাওয়ার সময় উসাইদকে বলে গেলেন, 'ধুর! তুমি আমার কোনো কাজেই আসলে না।' সাদকে আসতে দেখে আসআদ বললেন, 'মুসআব, যাকে আসতে দেখছ সে আওসের নেতা। তাকেও যতোটা পারো ইসলামের দিকে টানার চেষ্টা করো।' এদিকে সাদ ইবন মুয়ায তাদের দেখেই বুঝতে পারলেন যে উসাইদ ইচ্ছে করে গল্প ফেঁদেছেন, কারণ আসআদ বা মুসআব কাউকেই ভীতসন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল না।

আসআদকে উদ্দেশ্য করে সাদ ইবন মুয়ায বললেন, 'আসআদ! তুমি কেন আমার সাথে এরকম করছ? এই লোককে কেন আমার এলাকায় নিয়ে এসেছ? তুমি আমার সাথে তোমার সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে এসব করছো, তুমি কি এই অশিক্ষিত, সহজসরল, অসহায় লোকগুলোকে বিপথে নিয়ে যেতে চাও?'

মুসআব তখন বললেন, 'কিছু মনে না করলে আমি কিছু কথা বলতে চাই, আপনি কি তা শুনবেন? যদি আপনার ভাল লাগে তাহলে আপনি তা গ্রহণ করবেন আর ভাল না লাগলে মানবেন না।' সাদ ইবন মুয়ায এ কথায় রাজি হলেন এবং তাঁর কথা শোনার জন্য বসলেন। এখানে একটি ব্যাপার লক্ষ্যণীয় যে, মদীনাবাসীরা বেশ খোলা মনের ছিল, মক্কার লোকরা যেমন শত্রুভাবাপন্ন ছিল, মদীনাবাসীরা তেমন ছিল না। তারা অন্যের কথা শোনার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। তাই মুসআবের কথা শোনার ব্যাপারে সাদ ইবন মুয়ায রাজি হলেন। মুসআব তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন, সাদ ইবন মুয়ায ইসলাম গ্রহণ করলেন, ইসলাম লাভ করলো দূর্গের চাবি।

মুসলিম হওয়ার পর সাদ ইবন মুয়ায প্রথমে তাঁর লোকদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমার ব্যাপারে তোমাদের ধারণা কী?' তারা বললো, 'আপনি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী এবং আমাদের নেতা।' তারপর সাদ ইবন মুয়ায বললেন, 'তাহলে তোমরা মুসলিম না হওয়া পর্যন্ত কেউ আমার সাথে কথা বলবে না আর আমিও তোমাদের সাথে কথা বলবো না।'

এই কথার পর সন্ধ্যার মধ্যেই বনু আসআদ গোত্রের প্রতিটি ঘরের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে, আল আওসের এক বড় অংশের মাঝে ইসলামের আলো প্রবেশ করে।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আকাবার দ্বিতীয় শপথ

📄 আকাবার দ্বিতীয় শপথ


ইসলামের প্রথম বায়াত অনুষ্ঠিত হয়েছিল আল-আকাবায়, এই ঘটনা বায়াত আল উলা নামে পরিচিত। মদীনায় ইসলাম প্রচারে মুসআব ইবন উমায়ের অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে মানুষ সেখানে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে এবং পরবর্তী হাজ্জ মৌসুম চলে আসার আগে এমন অবস্থা হয় যে মদীনার প্রতিটি বাড়িতে একজন হলেও ইসলাম গ্রহণ করে। হাজ্জের সময় রাসূলুল্লাহর সাথে মদীনার নও-মুসলিমদের সাক্ষাতের নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে আসলো। সত্তরের অধিক মুসলিম নিজ গোত্রের লোকেদের সাথে হাজ্জের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। মদীনা থেকে আসা প্রতিনিধি দলটির সাথে মুসলিম ও অমুসলিম উভয়েই ছিল। যদিও গোপন বৈঠকটি ছিল শুধুমাত্র মুহাম্মাদ ও মুসলিমদের মধ্যে, কিন্তু তাঁরা মদীনা থেকে যাত্রা করার সময় তাঁরা তাদের গোত্রের অমুসলিম সদস্যদের সাথে একসাথে এসেছেন। রাসূলুল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে আসে সত্তরের অধিক মুসলিম পুরুষ ও দুইজন মুসলিম নারী।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 কা'ব ইবন মালিক ও বারা ইবন মা'রুরের ঘটনা

📄 কা'ব ইবন মালিক ও বারা ইবন মা'রুরের ঘটনা


সত্তর জন মুসলিমদের মধ্যে একজন ছিলেন কা'ব ইবন মালিক, তিনি তাদের হাজ্জ যাত্রার একটি ঘটনা বর্ণনা করেন।

'আমরা সেবার হাজ্জ করতে মক্কায় যাই, আমাদের মধ্যে কিছু লোক ছিল মুসলিম আর কিছু লোক অমুসলিম। আমাদের মুসলিম দলের নেতা ছিলেন বারা ইবন মা'রুর, তিনি ছিলেন একজন নেতৃস্থানীয়, প্রবীণ ব্যক্তিত্ব। তিনি আমাদের কাছে, অর্থাৎ মুসলিমদের কাছে এসে বললেন, আমি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এ ব্যাপারে তোমাদের মতামত জানতে চাই, তোমরা আমার সাথে একমত হবে কিনা আমি জানি না। আমার মতামত হলো, সালাতের সময় কাবাঘরকে পেছনে রাখতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না।'

বারা ইবন মা'রুর কাবাকে পেছনে রেখে সালাত আদায় করতে অস্বস্তিবোধ করছিলেন। সে সময় কা'বা মুসলিমদের কিবলা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি। মদীনায় বসে জেরুসালেমের আল-আকসা মসজিদের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে গেলে কাবাঘর মুসলিমদের পেছনে পড়ে যেতো। এ কারণে বারা ইবন মা'রুরের মধ্যে অস্বস্তি কাজ করছিল।

কা'ব তাঁকে বললেন, 'আল্লাহর রাসূল জেরুসালেমের দিকে মুখ করেই সালাত আদায় করেন, সুতরাং আমরা তাঁর বিপরীত কাজ করবো না।' বারা বললেন, "আমি কাবাঘরের দিকে মুখ করেই সালাত আদায় করবো।" এরপর থেকে তিনি কাবাঘরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে শুরু করেন। এরপর তাঁরা মক্কায় এসে পৌঁছালেন। বারা তাঁর ভাতিজা কা'ব ইবন মালিককে বললেন, 'ভাতিজা, আমাকে রাসূলুল্লাহর কাছে নিয়ে চলো। সফরে কিবলা পরিবর্তন করা ঠিক হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে আমি রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করবো। তোমরা তো আমার কাজকে অনুমোদন দিলে না, তাই আমার খটকা হচ্ছে। চলো, রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করে দেখি আমার কাজটা ঠিক হয়েছে কিনা।' কা'ব মক্কার এক লোকের কাছে রাসূলুল্লাহ কোথায় আছেন জানতে চাইলেন, সে বললো,
- আপনারা কি রাসূলুল্লাহকে চেনেন? কখনো তাঁকে দেখেছেন?
- না, তাঁকে আমরা চিনি না।
- আচ্ছা, তাঁর চাচা আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবকে চেনেন?
- হ্যাঁ তাঁকে আমরা চিনি।
- তাহলে আপনারা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলে দেখতে পাবেন যে, আব্বাসের সাথে একজন লোক বসে আছেন। তিনিই রাসূলুল্লাহ।

'আমরা মসজিদে প্রবেশ করে দেখলাম আব্বাস বসে আছেন, তাঁর সাথে রাসূলুল্লাহও বসে আছেন। আমরা সালাম দিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে বসলাম। আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে দেখে আব্বাসকে তাঁর কুনিয়া নামে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,
- আবুল ফাদল, আপনি কি এ দু'জন মানুষকে চেনেন?
- হ্যাঁ চিনি, ইনি হলেন বারা ইবন মা'রুর, তাঁর গোত্রের নেতা আর ইনি হচ্ছেন কা'ব ইবন মালিক।
- কবি কা'ব নাকি?'

কা'ব ইবন মালিক ছিলেন একজন কবি। এজন্য আব্বাস যখন কা'বকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন ইনিই কি কবি কা'ব কিনা।

এই ঘটনায় কা'ব তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন এই বলে, 'রাসূলুল্লাহর এই কথাটি আমি কখনো ভুলবো না!'

কা'ব ইবন মালিকের কাছে এটা বিশাল ব্যাপার ছিল যে রাসূলুল্লাহ তাঁকে আগে থেকে চিনতেন। রাসূলুল্লাহর সাথে এটি ছিল তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ, যে সাক্ষাতের এই মুহূর্তের জন্য এতদিন অপেক্ষা করে আসছিলেন, আর সেই সাক্ষাতেই আবিষ্কার করলেন তাঁর নেতা, তাঁর এত প্রিয় এই মানুষটি তাঁকে আগে থেকেই চেনেন! এ কথা ভেবেই কা'ব ইবন মালিক গর্ববোধ করছিলেন এবং খুব খুশি হয়েছিলেন। তিনি আরো আনন্দিত হয়েছিলেন এই ভেবে যে রাসূলুল্লাহ হয়তো তাঁর কিছু কীর্তির কথাও শুনে থাকবেন।

এরপর বারা ইবন মা'রুর তাঁর প্রশ্ন উত্থাপন করলেন, 'হে আল্লাহর নবী! আল্লাহ তাআলা আমাকে ইসলামের পথে হিদায়াত করেছেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমি যখন এই সফরে বের হই, তখন আমার মনে হলো, কাবাঘরকে পেছনে রাখা সমীচীন হবে না। তাই আমি কাবার দিকে মুখ করেই সালাত আদায় করেছি। কিন্তু আমার সাথীরা আমার বিরোধিতা করায় আমার মনে খটকা সৃষ্টি হয়েছে, যা করছি ঠিক করছি তো? এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?' মুহাম্মাদ বললেন, "তোমার আগে যে কিবলা ছিল তা বরারবই আদায় করা উচিত।" এরপর থেকে বারা তাঁর কিবলা পরিবর্তন করেন। যেহেতু রাসূলুল্লাহ তখন মক্কায় ছিলেন তাঁকে সালাত আদায়ের সময় কাবাকে পেছনে রাখতে হতো না। কাবাঘরকে সামনে রেখে তিনি জেরুসালেমের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে পারতেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো হিজরতের পর রাসূলুল্লাহরও ঠিক একই অনুভূতি হয়েছিল, যা হয়েছিল বারা ইবন মা'রুরের, তিনিও কাবাকে পেছনে রেখে সালাত আদায় করতে তখন অস্বস্তিবোধ করেছিলেন, এটা ঘটেছিল মদীনায়।

কা'ব বর্ণনা করেন, 'এরপর আমরা রাসূলুল্লাহর সাথে ওয়াদাবদ্ধ হলাম যে, আমরা আকাবায় আইয়ামে তাশরিফের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর সাথে সাক্ষাত করবো। এরপর আমরা হাজ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বিষয়টি আমরা গোপন রাখলাম, রাসূলুল্লাহর সাথে আমাদের গোপন বৈঠক সম্পর্কে আমাদের গোত্রের মুশরিক সাথীরা কিছুই জানতো না। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম আবু জাবির, তিনি ছিলেন আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ ও গোত্রনেতাদের একজন। আমরা তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, আবু জাবির! আপনি আমাদের অন্যতম নেতা এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। আপনি যে ধর্ম অনুসরণ করছেন তার কারণে আপনি আখিরাতে জাহান্নামের জ্বালানি হবেন— এটা আমরা চাই না।' আবু জাবির তখন ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁকে আসন্ন গোপন বৈঠক সম্পর্কে জানানো হয়। তিনি সেই শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ তাঁকে প্রতিনিধি হিসেবেও মনোনীত করেছিলেন। ইসলামে তাঁর বয়স ছিল অল্প, কিন্তু তাঁর নেতৃত্বের যোগ্যতার কারণে তিনি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব পেয়ে যান।

টিকাঃ
৫১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৩।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বাইয়াতের রাত

📄 বাইয়াতের রাত


অবশেষে সেই নির্ধারিত রাত এল। মুসলিমরা একজন-দুইজনের ছোট ছোট দলে আক্বাবায় যেতে শুরু করেন। তাঁরা চাচ্ছিলেন না কেউ তাদের দেখে ফেলুক। একসাথে সত্তর জন লোকের একটি দল রাসূলুল্লাহর সাথে দেখা করতে গেলে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এভাবে তাঁরা সবাই আকাবায় মিলিত হলেন। রাসূলুল্লাহ ছিলেন মক্কা থেকে আসা একমাত্র মুসলিম, তাঁর সাথে ছিলেন তাঁর চাচা আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব। আব্বাস তখনো মুশরিক ছিলেন, এই বৈঠকে তিনিই ছিলেন একমাত্র অমুসলিম। তিনিই প্রথমে কথা শুরু করেন। তিনি বললেন,

'মুহাম্মাদ আমাদের মাঝে কেমন সম্মানের অধিকারী তা আপনাদের নিশ্চয়ই জানা আছে। আমাদের গোত্রের লোকদের হাত থেকে তাঁকে আমরা নিরাপত্তা দিয়েছি। তিনি তাঁর গোত্রের কাছে সম্মানিত এবং নিজ শহরে নিরাপদে অবস্থান করছেন। কিন্তু তিনি এখন আপনাদের সাথে এক হতে চান। আপনারা যদি মনে করেন, যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আপনারা মুহাম্মাদকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন, সে প্রতিশ্রুতি আপনারা পূরণ করতে পারবেন, তাঁর শত্রুদের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করতে পারবেন, তাহলে সিদ্ধান্ত নিন আপনারা তাঁর দায়িত্ব নেবেন কি না। আর যদি মনে করেন, শেষ পর্যন্ত আপনারা তাঁকে রক্ষা করতে পারবেন না এবং তাঁকে তাঁর শত্রুদের হাতে তুলে দেবেন তবে এখনই তাঁকে রেখে যান। কারণ তিনি নিজ গোত্রের মধ্যে নিজের শহরে সম্মান ও নিরাপত্তার মাঝে আছেন।'

আব্বাস ইবন মুত্তালিব আনসারদের দৃঢ়তা যাচাই করছিলেন। আনসাররা তাদের এই প্রতিশ্রুতির প্রতিটা কতো অনড় সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত হতে চাইছিলেন। কারণ তাঁরা এমন এক ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, যে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তাদেরকে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। চারদিক থেকে তাদের উপর চাপ আসতে পারে, তাদের উপর দুর্যোগ নেমে আসতে পারে এবং এ চাপ সামলানোর ক্ষমতা পরবর্তীতে নাও থাকতে পারে। এই ধরনের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া যে সহজ হবে না সে ব্যাপারটি তিনি আনসারদের জানিয়ে রাখছিলেন। রাসূলুল্লাহকে আশ্রয় দেওয়া নিঃসন্দেহে একটা বিরাট ঝুঁকি, আর সেই ঝুঁকি নিতে রাজি কিনা, তাঁরা তাঁকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেওয়ার সামর্থ্য রাখে কিনা - সে বিষয়টি যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই আব্বাস তাদের বলছিলেন, যদি তাদের এ সামর্থ্য না থাকে তাহলে তাঁরা যেন এই অঙ্গীকারে অংশ না নিয়ে আল্লাহর রাসূলকে মক্কাতেই রেখে যায়।

প্রশ্ন আসতে পারে অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও কেন আব্বাস সেখানে উপস্থিত ছিলেন? কারণ আব্বাস ইবন মুত্তালিব ছিলেন রাসূলুল্লাহর চাচা এবং বনু হাশিম গোত্রের একজন মুরুব্বি। মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি রাসূলুল্লাহর সাথে থাকতে পছন্দ করতেন এবং তার সকল কার্যকলাপের দিকে লক্ষ্য রাখতেন। আবু তালিবের মৃত্যুর পর মক্কায় রাসূলুল্লাহকে যারা নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন, আব্বাস ছিলেন তাদের একজন। তাই তিনি নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলেন যে, তাঁর ভাতিজা যখন মক্কা ত্যাগ করে যাবে তখন যেন সে নিরাপদে থাকে। আর এ কারণেই রাসূলুল্লাহ তাঁকে বৈঠকে অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়েছিলেন। বনু হাশিম গোত্রের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আব্বাস বৈঠকে উপস্থিত থেকে গোত্রের সন্তানদের নিরাপত্তার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন।

আরো প্রশ্ন আসতে পারে চাচা আব্বাসের নিরাপত্তা কি যথেষ্ট ছিল না, যেখানে আবু তালিবও তাঁর চাচা হিসেবে তাঁকে এতদিন নিরাপত্তা দিয়ে আসছিলেন? অনেকের মতে, নিজ গোত্রের লোকেদের কাছে আবু তালিব যেরূপ সম্মানিত ছিলেন, তাদের ওপর তাঁর যেমন প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল, তাঁর অন্য ভাইদের তেমনটা ছিল না। তাই বয়োজ্যেষ্ঠতার জন্য আবু তালিব যেভাবে মুহাম্মাদকে রক্ষা করতে পেরেছেন, নিশ্চিতভাবেই আব্বাস সেভাবে পারতেন না। তিনি ছিলেন যুবক। তবুও তিনি তাঁর সাধ্যমত চেষ্টা করে হিজরতের আগ পর্যন্ত নবীজিকে নিরাপত্তা দিয়েছিলেন।

আব্বাসের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর আনসাররা বললেন, 'আপনার কথা আমরা শুনেছি। হে আল্লাহর রাসূল, এবার আপনি কথা বলুন। বলুন আমাদের থেকে আপনি কী চান। আপনি নিজের এবং আপনার রবের জন্য আমাদের কাছ থেকে যা যা অঙ্গীকার নিতে চান, তা আমাদেরকে বলুন।' রাসূলুল্লাহ উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন,

'তোমরা অঙ্গীকার করো, ভালো-মন্দ সকল অবস্থায় আমার কথা শুনবে এবং মানবে। সচ্ছলতা, অসচ্ছলতা সর্বাবস্থায় আল্লাহর পথে ব্যয় করবে। সৎ কাজের আদেশ আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে। আল্লাহর পথে হক কথা বলে যাবে এবং এ ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে পরোয়া করবে না। আমি যদি তোমাদের কাছে আসি তাহলে আমাকে সাহায্য করবে। আমাকে হেফাযত করবে সেভাবে, যেভাবে তোমরা নিজেদেরকে, নিজেদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে হেফাযত করো।'

এই অঙ্গীকার ছিল আকাবার প্রথম বাইয়াতের অঙ্গীকারের চেয়ে একধাপ বেশি। তখন তারা কেবল মুসলিম হওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু এবার আরো একটি বিষয় যুক্ত হয়েছে, আল্লাহর রাসূলকে নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া। এটি ছিল আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধ।

রাসূলুল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টবাদী। তিনি যা চান তিনি তা পরিষ্কার ভাষায় আনসারদেরকে জানিয়ে দিলেন, কোনো অস্পষ্টতা তিনি রাখলেন না। তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিলেন তিনি শুধু নিরাপত্তার খাতিরে মদীনায় আসছেন না, বরং সবাই তাঁকে মেনে চলবে এবং একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করা চলবে না। তাঁরা যদি আল্লাহ ছাড়া আর অন্য কোনো কিছুকে ভয় করেন তাহলে তিনি তাঁর মিশন নিয়ে এগোতে পারবেন না। রাসূলুল্লাহ এমন একটি মিশনে নেমেছেন যে মিশন সফল করতে হলে নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থাকা চাই— আনসারদেরকে রাসূলুল্লাহ এই কথাটিই বুঝাতে চাচ্ছিলেন।

রাসূলুল্লাহর কথা শুনে বারা ইবন মা'রুর সবার প্রথমে উঠে দাঁড়িয়ে রাসূলুল্লাহকে বাইয়াত দিতে চাইলেন। তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহর শপথ, আমরা তো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যোদ্ধা জাতি।' বারার কথা শেষ হতে না হতেই আবুল হাইসাম ইবন তাইহান উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের সাথে অন্যদের (অর্থাৎ ইহুদিদের) সন্ধি রয়েছে। আমরা যদি এই চুক্তি ভঙ্গ করি আর আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান করেন, তাহলে কি আপনি আমাদের ত্যাগ করে নিজ গোত্রে ফিরে যাবেন?'

আবু হাইসাম বলতে চাচ্ছিলেন, আপনার হাতে বাইয়াত করার অর্থ হচ্ছে, আমরা এমন লোকদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হতে পারি যাদের সাথে আমাদের সন্ধিচুক্তি রয়েছে। এ অবস্থায়, আপনি যদি বিজয় লাভ করেন, তখন কি আপনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন নাকি আমাদের সাথেই থাকবেন? দেখুন, আমরা কিন্তু সারাজীবনের জন্য স্বেচ্ছায় অঙ্গীকারাবদ্ধ হচ্ছি কিন্তু আপনি কি আমাদের সাথে থাকবেন? নাকি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন?

রাসূলুল্লাহ মুচকি হেসে উত্তর দিলেন,
'তোমাদের রক্তই আমার রক্ত। আর তোমাদের ধ্বংসই আমার ধ্বংস। আমি তোমাদের আর তোমরা আমার। তোমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করবো। তোমরা যাদের সাথে সন্ধি করবে, আমিও তাদের সাথে সন্ধি করবো।'

রাসূলুল্লাহ তাঁর এই ওয়াদা রেখেছিলেন। তাঁর আপন মাতৃভূমি মক্কা বিজয়ের পর তিনি সেখানে থেকে যাননি, বরং তিনি আনসারদের সাথে মদীনায় চলে যান এবং আমৃত্যু সেখানেই বসবাস করেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি আনসারদের সাথে অবস্থান করেন।

রাসূলুল্লাহর হাতে বাইয়াত করার জন্য আনসাররা যখন তাদের হাত এগিয়ে দিতে শুরু করেন, তখন আব্বাস ইবন উবাদা দাঁড়িয়ে তাদের বাধা প্রদান করেন। তিনি ছিলেন মদীনার প্রথম দিকের ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন। তিনি বলেন, 'একটু থামো।' তিনি তাঁর গোত্রের লোকদেরকে ব্যাপারটি সহজভাবে নিতে এবং ধীরেসুস্থে করার জন্য বললেন। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন,

'আমরা আজ তাঁর কাছে এ কারণেই সমবেত হয়েছি যে তিনি আল্লাহর রাসূল। তাঁকে আশ্রয় দেওয়ার অর্থ হলো সমগ্র আরবের সাথে শত্রুতা সৃষ্টি হওয়া। এর ফলে তোমাদের নেতাদের জীবন হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দামামা বাজবে। যদি তোমরা মনে করো, তোমরা এই ঝুঁকির ভার সইতে পারবে, তবেই তাঁকে নিজেদের কাছে নাও। তোমাদের এ কাজের বিনিময় আল্লাহর কাছে রয়েছে। আর যদি নিজেদের জান তোমাদের কাছে প্রিয় হয়ে থাকে, তবে এখনই তাঁকে ছেড়ে দাও, এটা হবে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য অজুহাত।'

তিনি তাদেরকে মনে করিয়ে দিলেন এই অঙ্গীকার কোনো সহজ অঙ্গীকার নয়— তোমরা কি বুঝতে পারছো, আমরা কীসের ব্যাপারে অঙ্গীকার করছি? যদি আমরা তাঁকে আশ্রয় দিই, তাহলে পুরো বিশ্বের সাথে আমাদের শত্রুতা তৈরি হবে। আমাদের দিকে তরবারি তাক করা হবে সবদিক থেকে। আমাদের নেতৃস্থানীয় লোকেরা মারা পড়তে পারে। আমাদের জান-মাল হুমকির মুখে পড়তে পারে, বিনষ্ট হতে পারে। কাজেই যদি তোমরা অঙ্গীকার করো, তবে বুঝেশুনে অঙ্গীকার করো। আর যদি তোমাদের অন্তরে কোনোরূপ ভয়-ভীতি থেকে থাকে তাহলে দেরি হওয়ার আগেই এ প্রতিশ্রুতি থেকে সরে পড়ো। তাঁরা আব্বাস ইবন উবাদাকে সরিয়ে দিয়ে বললেন, 'আমরা বাইয়াত করবো, এবং আমরা কখনই বাইয়াত ভঙ্গ করবো না।'

আনসাররা ছিলেন অসম্ভব দৃঢ়প্রত্যয়ী, তাঁরা প্রচণ্ড দৃঢ়তার সাথে অঙ্গীকার করেছিলেন। তাঁরা জানতে চাইলেন, 'আপনাকে রক্ষার বিনিময়ে আমরা কী পাবো?' তাঁরা বলতে চাচ্ছিলেন, নিজেদের জীবন ধনসম্পদ কুরবানি করে হলেও আমরা আপনাকে রক্ষা করে যাবো কিন্তু এর বিনিময়ে আপনি আমাদের কী দেবেন? এর বিনিময় কী? কোনো চুক্তিই একতরফা নয়। যেহেতু আমরা আপনাকে সাহায্য করতে যাচ্ছি সেহেতু নিশ্চয়ই এর বিনিময়ে আমরা কিছু পাবো, সেটা কী?

রাসূলুল্লাহ তাদের প্রশ্নের উত্তরে শুধু একটি শব্দই বললেন, ব্যস, 'আল জান্নাহ', এতটুকুই ছিল তাঁর ওয়াদা, আর কিচ্ছু না। তিনি তাদেরকে না মন্ত্রীত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, না দিয়েছেন বাড়িগাড়ি কিংবা টাকাপয়সার প্রতিশ্রুতি, তিনি শুধু তাদেরকে একটি জিনিসের ওয়াদা করেছেন, তা হলো জান্নাত।

আনসাররা দুনিয়ার সম্পদ কিংবা ক্ষমতা চাননি, তাঁরা শুধু জান্নাতের অঙ্গীকারে সন্তুষ্ট ছিলেন। তাদের চোখে এই বাইয়াত ছিল একটা লাভজনক ব্যবসা। তারা খুশিমনে নবীজিকে বাইয়াত দিলেন।

বাইয়াতের এই সংবাদটি কোনোভাবে কুরাইশদের কাছে পৌঁছে যায়। হাজ্জের মৌসুমে সত্তরের অধিক লোকের একটি বৈঠক গোপন রাখা খুব সহজ ব্যাপার না।

টিকাঃ
৫২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৭।
৫৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৮।
৫৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০১।
৫৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৪।

ফন্ট সাইজ
15px
17px