📄 আওস ও খাযরাজের ইসলামে প্রবেশ
ইবন ইসহাক আল-আনসারদের ইসলামে আসার কাহিনি বর্ণনা করেছেন। আল- আনসার ছিল দুটি গোত্র আল আওস এবং আল খাযরাজ। এ দুটো গোত্র ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে তাদেরকে একসাথে বলা হতো আল-আনসার, 'আনসার' মানে রক্ষক। এ দুটি আরব গোত্র মদীনায় থাকত, কাহতান শাখার বংশধর। আরবরা আদনান ও কাহতান নামক দুইটি অংশে বিভক্ত ছিল। ইয়েমেনের আরবদেরকে কাহতান বলা হতো, আর আদনান হলো ইসমাঈলের বংশধর। আওস ও খাযরাজ গোত্রের সাথে মদীনাতে তখন তিনটি ইহুদি গোত্র বাস করতো বনু নাযির, বনু কাইনুকা ও বনু কুরাইযা। মদীনা শহরটির ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান ছিল অন্যান্য শহর থেকে আলাদা, এর তিনদিক ঘেরাও ও নিরাপদ ছিল। পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ছিল পাথুরে রাস্তা। সেখান দিয়ে মদীনা আক্রমণ করা সম্ভব ছিল না, আর দক্ষিণ দিক কৃষিজমির গাছগাছালিতে ভরা ছিল। সুতরাং শুধুমাত্র উত্তর দিক থেকে শত্রুপক্ষ মদীনাকে আক্রমণ করতে পারত।
রাসূলুল্লাহ হাজ্জে আগত খাযরাজ গোত্রের ছাউনিতে গেলেন। ভেতরে ঢুকে তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন,
- আপনারা কারা?
- আমরা আল খাযরাজ গোত্র থেকে এসেছি।
- আপনাদের সাথে কি ইহুদিদের মিত্রতা আছে?
- হ্যাঁ, আছে।
- আচ্ছা, আমি কি আপনাদের সাথে কিছু কথা বলতে পারি?
তারা রাজি হলো। রাসূলুল্লাহ তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। রাসূলুল্লাহর কথা শোনার প্রতি তাদের খুবই আগ্রহ ছিল। তারা ইসলামের দাওয়াত পেয়েই তা গ্রহণ করলো এবং বললো, 'আমরা আমাদের দেশ ছেড়ে এসেছি কারণ তাদের মধ্যে প্রচণ্ড শত্রুতা আর রেষারেষি লেগেই আছে, এমনটি আর কোথাও পাবেন না। হয়তোবা আল্লাহ তাআলা আপনার মাধ্যমে তাদেরকে আবার একত্রিত করতে পারেন। আমরা তাদের কাছে গিয়ে এই দ্বীন ইসলামের কথা তাদের কাছে তুলে ধরব। যদি আল্লাহ আপনার মাধ্যমে তাদেরকে একত্রিত করে দেন, তাহলে আপনার চেয়ে প্রিয় মানুষ আমাদের চোখে আর কেউ হবে না।'
ছয়জনের এই ছোট্ট দলটি কোনো প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই ইসলামের দাওয়াত পাওয়া মাত্রই তা গ্রহণ করে নিয়েছিল যা অন্য আরব গোত্ররা করেনি। এর পেছনে কিছু কারণ আছে। সেগুলো হলো,
১. মদীনাবাসীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ সংঘাত চলছিল। আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে ক্রমাগত যুদ্ধ আর রক্তপাত হয়ে আসছিল, কিন্তু তারা চাচ্ছিল এর অবসান হোক। তাই যখন তারা রাসূলুল্লাহর কথা শুনল তখন এই ভেবে তারা আশান্বিত হলো যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলের মাধ্যমে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে দিতে পারেন।
২. ইহুদিরা তাদের প্রতিবেশী হওয়ায় তাওহীদ অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের ধারণার সাথে তারা পরিচিত ছিল এবং তাদের কাছে তাওহীদের ধারণার বিশেষ আবেদন ছিল। আরবরা সব সময় ইহুদিদের দ্বীনকে নিজেদের দ্বীনের চেয়ে শ্রেয় মনে করতো। এর কারণ, ইহুদিরা ছিল শিক্ষিত; তাদের কাছে কিতাব ছিল, দ্বীনের জ্ঞান ছিল। অন্যদিকে আরবদের দ্বীন বিভিন্ন উপকাহিনি আর পূর্বপুরুষদের রীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। তাদের মধ্যে জঘন্য কিছু রীতিনীতি প্রচলিত ছিল, যেমন: কন্যা সন্তান জীবন্ত হত্যা করা। ইহুদিরা যদি অহংকার ও পক্ষপাতী না হতো, তাহলে আরবরা হয়তোবা তাদের দ্বীন গ্রহণ করতো।
৩. আরব ও ইহুদিদের মধ্যে কোনো গণ্ডগোল হলেই ইহুদিরা তাদের হুমকি দিত, শীঘ্রই একজন রাসূলের আগমন ঘটবে। আর যখন তিনি আবির্ভূত হবেন তখন আমরা তাঁকে অনুসরণ করব এবং আদ জাতিকে যেভাবে শেষ করা হয়েছে আমরাও তোমাদেরকে সেভাবে শেষ করে দেব।' অর্থাৎ আরবদের জানা ছিল যে ওই সময়ে একজন রাসূলের আগমন ঘটবে। এভাবে নবুওয়াতের ব্যাপারে আওস ও খাযরাজ আগে থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল।
৪. রাসূলুল্লাহর হিজরতের কয়েক বছর পূর্বে আল আওস ও আল খাযরাজ গোত্রের মধ্যে বুয়াস নামে একটি ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে দুই গোত্রেরই অনেক নেতা মারা যায়। এর ফলে তাদের মধ্যে নেতৃত্বশূন্যতা সৃষ্টি হয়, যে কারণে তারা নতুন নেতৃত্বের সন্ধানে ছিল। তাই রাসূলুল্লাহর কথা জানামাত্র তেমন কোনো আপত্তি ছাড়াই তারা তাঁকে নিজেদের নেতা হিসেবে মেনে নেয়।
মূলত এসব কারণেই মদীনা ইসলামের প্রসারের জন্য উপযুক্ত ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। আ'ইশা বলেছেন, 'বুয়াসের যুদ্ধ ছিল আল্লাহ তাআলা কর্তৃক রাসূলুল্লাহর হিজরতের জন্য নির্ধারিত একটি প্রস্তুতি। এ যুদ্ধে তাদের প্রায় সব নেতা মারা পড়ে।' সাধারণত সমাজের নেতা ও ক্ষমতাসীন লোকেরা সত্যের বিপরীতে কট্টর অবস্থান নেয়। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আওস ও খাযরাজের নেতারা মারা যাওয়ায় ইসলামের পথে তাদের যাত্রা সুগম হয়। ইবন ইসহাক বলেছেন, 'ইহুদিদের সাথে একই ভূমিতে থাকার কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য ইসলাম গ্রহণ আরও সহজ করে দিয়েছেন। ইহুদিরা ছিল কিতাবের অনুসারী, তাদের অনেক জ্ঞান ছিল। অন্যদিকে আল আওস ও খাযরাজের লোকেরা ছিল মুশরিক এবং মূর্তিপূজারী। তারা এর আগে ইহুদিদের সাথে যুদ্ধ করে তাদের ভূমি কেড়ে নিয়েছিল। যখনই মুশরিকদের সাথে ইহুদিদের কোনো ঝামেলা বাঁধত তখন ইহুদিরা বলতো, একজন রাসূলকে পাঠানো হবে। তিনি আসছেন। আমরা তাঁকে অনুসরণ করবো এবং আদ জাতির ভাগ্যে যা ঘটেছিল তোমাদেরকেও সেই একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।'
আল্লাহ তাআলা সূরা আল বাক্বারার ২১৬ নাম্বার আয়াতে বলেছেন, "তুমি হয়ত কোনো জিনিস অপছন্দ কর, কিন্তু তাতেই তোমার জন্য ব্যাপক কল্যাণ রয়েছে।” আওস ও খাযরাজের মধ্যে সংঘটিত বুয়াসের যুদ্ধটি ছিল এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যদিও এ যুদ্ধে দুই গোত্রেরই অনেক ক্ষতি হয়, কিন্তু তা তাদের ইসলামে প্রবেশের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
টিকাঃ
৫০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৬।
📄 বাইয়াতের প্রথম শপথ
সেই ছয়জন পুণ্যবান লোক ইসলাম গ্রহণ করলো এবং তারা রাসূলুল্লাহকে বললো, 'আমরা দেশে ফিরে গিয়ে আমাদের লোকদের ইসলামের পথে আসার জন্য আহ্বান করবো।' মদীনায় ফিরে যাওয়ার আগে তারা রাসূলুল্লাহর সাথে পরের বছর হাজ্জের মৌসুমে দেখা করার কথা দিল। বছর ঘুরে আবার ফিরে এল হাজ্জের মৌসুম। এবার ছয়জনের পরিবর্তে এল বারোজন, ছয়জন ছিল আগের বছরের আর বাকি ছয়জন নতুন। প্রথম বছরে ইসলাম গ্রহণকারী ছয়জন ছিলেন আল খাযরাজ গোত্রের; অন্য আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে পাঁচজন ছিলেন আল খাযরাজ গোত্রের আর বাকি একজন এসেছিলেন আল আওস থেকে। দ্বিতীয় বছরে আল খাযরাজ থেকে ছিলেন দশজন এবং আল আওস থেকে দুইজন। তাঁরা রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বাইয়াত দিলেন। বাইয়াতের ভাষ্য ছিল এমন:
'আক্বাবার প্রথম বৈঠকের রাতে রাসূলুল্লাহর কাছে এই মর্মে বাইয়াত দেওয়া হয় যে, আমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবো না। আমরা ব্যভিচারের ধারে কাছে যাবো না, সন্তান হত্যা করবো না, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেব না এবং ভালো কাজে তাঁর বিরোধিতা করবো না। তিনি আমাদেরকে বলেছেন, যদি তোমরা এগুলো মেনে চলতে পার তাহলে জান্নাতে যেতে পারবে। আর যদি কোনো পাপ করে ফেল এবং সেই পাপের শাস্তি যদি এই দুনিয়াতেই দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে সেই পাপ মাফ করে দেওয়া হবে। কিন্তু যদি দুনিয়াতে পাপের শাস্তি না দেওয়া হয় তাহলে আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ওই পাপের জন্য শেষ বিচারের দিন শাস্তি দিতেও পারেন আবার ক্ষমাও করে দিতে পারেন।'
সাধারণত, মহিলারা এই মর্মে রাসূলুল্লাহর কাছে বাইয়াত করতেন। এই বাইয়াতে জিহাদের ব্যাপারে অঙ্গীকার ছিল না বলেই একে বাইয়াতুন নিসা বা মহিলাদের বাইয়াত বলা হয়।
এখানে একটি ফিকহী বিষয় লক্ষ্যণীয়: এই বাইয়াতে যেসব গুনাহ থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে সেগুলো সবই হলো কবীরা গুনাহ— ব্যভিচার, সন্তানদের মেরে ফেলা, কারো নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, ভালো কাজে আল্লাহর অবাধ্য হওয়া। এরপর রাসূলুল্লাহ বলেন যে এই দুনিয়াতে থাকতেই যদি গুনাহের শাস্তি দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে গুনাহকারীকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে আর যদি বেঁচে থাকতে শাস্তি দেওয়া না হয় তাহলে গুনাহকারীকে শেষ বিচারের দিন ক্ষমা করে দেওয়া হবে নাকি শাস্তি দেওয়া হবে তা আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করবেন।
রাসূলুল্লাহ মদীনার মুসলিমদেরকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য মুসআব ইবন উমাইরকে মনোনীত করেন। তিনি ছিলেন একজন প্রতিনিধি, শিক্ষক ও আলিম। মুসআব ছিলেন কুরাইশের এক ধনী পরিবারের সন্তান। মুসলিম হওয়ার পূর্বে তিনি ছিলেন মক্কার সবচেয়ে উচ্ছন্নে যাওয়া যুবক, তাঁর পরনে থাকতো সবচেয়ে দামি সব জামাকাপড়, শরীরে থাকতো নিত্যনতুন সুগন্ধির ঘ্রাণ। তাঁর মা ছিলেন অনেক ধনী। মুসআব ছাড়া তার আর কোনো সন্তান ছিল না, তাই একমাত্র ছেলেকে অনেক আদর করতেন। কিন্তু যখন মুসআব ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন তাঁর মা তাঁকে ত্যাগ করলেন, তাঁর বিরুদ্ধে চলে গেলেন। যে মুসআব শৈশব-কৈশোর-যৌবন কাটিয়েছিলেন প্রাচুর্যের মধ্যে, তিনিই হঠাৎ সহায়সম্বলহীন এক যুবকে পরিণত হলেন, জীবন হয়ে যায় রুক্ষ, কঠিন। মুসআব যখন উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন, তাঁকে দাফন করার জন্য পর্যাপ্ত টাকাপয়সাও তখন ছিল না। তাঁর গায়ে যে জামাটি ছিল তা দিয়ে তাঁকে ঠিকমত ঢেকে রাখা যাচ্ছিল না। উপস্থিত সাহাবীরা সেই দিনের কথা বর্ণনা দিয়েছেন, 'আমরা যখন তাঁর মুখ ঢাকার চেষ্টা করছিলাম তখন তাঁর পা বের হয়ে যাচ্ছিল, আবার পা ঢাকতে গেলে মুখ দেখা যেতো। আমরা রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে বললাম, এখন আমরা কী করবো?' রাসূলুল্লাহ তখন তাদেরকে কাপড় দিয়ে মুসআবের মুখ আর কিছু ঘাস দিয়ে পা ঢেকে দিতে বললেন।
মুসআব ইবন উমাইর ছিলেন রাসূলুল্লাহর মদীনার প্রতিনিধি, তাঁর উপর অর্পিত এই দায়িত্ব ছিল বেশ কঠিন। তিনি মদীনায় থাকার জন্য মক্কা ত্যাগ করলেন। আল আওস ও খাযরাজের মধ্যে শত্রুতা থাকায় তিনি সালাতের ইমামতি করতেন, কারণ দুই গোত্রের কেউই অন্য গোত্রের ইমামের পেছনে সালাত আদায় করতে চাইত না।
মুসআব মদীনায় আসআদ ইবন যুরারার সাথে থাকতেন। তাঁরা সেখানকার এক বাগানে অন্যান্য মুসলিমদের সাথে দেখা করতেন। তাঁরা সেখানে মুসলিমদের ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা দিতেন। মুসআব তাদের সাথে নিয়মিত হালাক্বা করতেন। তাঁরা বসতেন মদীনার আওস-অধীনস্থ একটি এলাকায়। তখন পর্যন্ত মুসলিমদের অধিকাংশই ছিল খাযরাজ গোত্রের, আওসের অল্পসংখ্যক লোকই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। মুসআব আওস গোত্রকে ইসলামের দিকে আগ্রহী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ কারণে তিনি আল আওসের এলাকায় গেলেন।
আওসের নেতাদের বিষয়টি পছন্দ হলো না। আওসের নেতা ছিলেন সাদ ইবন মুয়ায ও উসাইদ ইবন খুযাইর। মুসআব ও আসআদ ইবন যুরারাকে আওসের এলাকায় একসাথে দেখতে পেয়ে সাদ ইবন মুয়ায খুব বিরক্ত হয়ে তার বন্ধু উসাইদকে বললেন, 'তুমি ওই দুই লোকের কাছে গিয়ে বলো যে, আমরা চাইনা তাঁরা এখানে থেকে দুর্বল ও বোকা লোকদের বিভ্রান্ত করুক। আসআদ যদি আমার আত্মীয় না হতো তবে আমি নিজে গিয়েই এই কথা বলতাম।' আসআদের সম্মানে, নিতান্ত ভদ্রতার খাতিরে সাদ চুপ করে ছিলেন, নিজে না গিয়ে উসাইদকে পাঠালেন।
অন্যদিকে, আসআদ খাযরাজ গোত্রের হলেও তিনি ছিলেন আওসের নেতার মামাতো ভাই, সে সুবাদে তিনিই ছিলেন মুসআবকে মেহমানদারি করার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি। সাদের বিরক্তি দেখে উসাইদ ইবন খুযাইর বর্শা হাতে নিয়ে মুসআব ও আসআদের সাথে কথা বলার জন্য তাদের দিকে অগ্রসর হলেন। আসআদ মুসআবকে জানিয়ে দিলেন, 'যে লোকটা আসছে সে হলো উসাইদ, সে তার লোকদের নেতা। তাঁকে যতসম্ভব ইসলামের দিকে টানার চেষ্টা করো, সে যদি মুসলিম হয় তাহলে অনেকেই তার দেখাদেখি মুসলিম হবে।' মুসআব ইবন উমাইর বললেন, 'সে শুনতে চাইলে আমি অবশ্যই তাঁকে বুঝানোর চেষ্টা করবো।'
ইবন খুযাইর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে খুব রুক্ষভাবে কথা বলতে শুরু করলেন, 'দেখ, আমরা তোমাদের এই এলাকার আশেপাশে দেখতে চাই না। আমরা চাই না তোমরা এখানকার দুর্বল ও অজ্ঞ লোকদের বিভ্রান্ত কর। নিজেদের জীবনের মায়া থাকে তো এখান থেকে চলে যাও, না হলে এই হলো আমার বর্ণনা।' যখন তিনি তাদেরকে এভাবে হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন হালাকায় অংশগ্রহণকারী নও মুসলিমদের একজন বলে উঠল, 'ওরা নয়, বরং তুমিই আমাদেরকে বিভ্রান্ত করছ...' এই বলে সে উসাইদের সাথে তর্ক শুরু করে দিল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মুসআব শান্ত কণ্ঠে বললেন, 'আমরা যা নিয়ে কথা বলছিলাম তা কি আপনি একটু শুনে দেখবেন? যদি আপনার ভালো লাগে তাহলে আপনি তা গ্রহণ করবেন আর ভালো না লাগলে অগ্রাহ্য করবেন।' উসাইদ বললেন, 'ঠিক আছে শুনবো।' তিনি সেখানে বসলেন। মুসআব তাঁকে কুরআনের কিছু আয়াত পাঠ করে শোনালেন, ইসলামের দাওয়াত দিলেন, ইসলামের ব্যাপারে কথা বললেন। মুসআবের কথায় উসাইদের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা বর্ণনা করেছেন আসআদ, 'উসাইদ মুখে কিছুই বললো না, তাঁর চেহারাই বলে দিচ্ছিল ইসলাম তাঁর হৃদয় দখল করে নিয়েছে, তাঁর মুখে ছিল প্রছন্ন এক আভা – শান্ত, প্রসন্ন একটা ছাপ।'
মুসআবের বক্তব্য হলে উসাইদ তাঁকে বললেন, 'এ দ্বীনে প্রবেশ করতে হলে কী করতে হবে?' মুসআব তাঁকে বললেন, 'আপনি পবিত্র হয়ে আসুন, তারপর সালাত আদায় করুন।' পবিত্র হয়ে উসাইদ সালাত আদায় করলেন, এরপর মুসআবকে বললেন, 'আমি আপনার কাছে এমন এক ব্যক্তিকে পাঠাচ্ছি যিনি মুসলিম হলে তাঁর দলের সব লোকেরাও ইসলাম গ্রহণ করে ফেলবে।' এই বলে উসাইদ গেলেন সাদ ইবন মুয়াযের কাছে। উসাইদকে ফিরে আসতে দেখে সাদ বললেন, 'আল্লাহর কসম! যে চেহারা নিয়ে সে গিয়েছিল, ভিন্ন চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে।' এটিকে বলে ফিরাসা, ফিরাসা হলো কারো চেহারা দেখে তাঁর সম্পর্কে বলে দেওয়া, আরবদের মধ্যে এই রীতি ছিল।
সাদ ইবন মুয়ায জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হয়েছে?' উসাইদ বললেন, 'সব ঠিকঠাক আছে, তুমি চিন্তা কোরো না। আসলে একটু সমস্যা হয়েছিল, বনু হারিস (আল খাযরাজের একটি শাখা) যখন জানতে পারল যে আসআদ তোমার ভাই, তখন তারা শত্রুতাবশত তাকে খুন করতে চেয়েছিল।' পুরো ঘটনাটি উসাইদ বানিয়ে বললেন সাদ ইবন মুয়াযকে মুসআব ইবন উমাইরের কাছে পাঠানোর জন্য। উসাইদের মুখে এই কাহিনি কথা শুনে সাদ খুব রেগে গেলেন। তিনি বললেন, 'কী! তারা আমার ভাইকে খুন করতে চায়!' তিনি বর্শা নিয়ে ভাই আসআদকে রক্ষা করার জন্য চলে গেলেন এবং যাওয়ার সময় উসাইদকে বলে গেলেন, 'ধুর! তুমি আমার কোনো কাজেই আসলে না।' সাদকে আসতে দেখে আসআদ বললেন, 'মুসআব, যাকে আসতে দেখছ সে আওসের নেতা। তাকেও যতোটা পারো ইসলামের দিকে টানার চেষ্টা করো।' এদিকে সাদ ইবন মুয়ায তাদের দেখেই বুঝতে পারলেন যে উসাইদ ইচ্ছে করে গল্প ফেঁদেছেন, কারণ আসআদ বা মুসআব কাউকেই ভীতসন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল না।
আসআদকে উদ্দেশ্য করে সাদ ইবন মুয়ায বললেন, 'আসআদ! তুমি কেন আমার সাথে এরকম করছ? এই লোককে কেন আমার এলাকায় নিয়ে এসেছ? তুমি আমার সাথে তোমার সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে এসব করছো, তুমি কি এই অশিক্ষিত, সহজসরল, অসহায় লোকগুলোকে বিপথে নিয়ে যেতে চাও?'
মুসআব তখন বললেন, 'কিছু মনে না করলে আমি কিছু কথা বলতে চাই, আপনি কি তা শুনবেন? যদি আপনার ভাল লাগে তাহলে আপনি তা গ্রহণ করবেন আর ভাল না লাগলে মানবেন না।' সাদ ইবন মুয়ায এ কথায় রাজি হলেন এবং তাঁর কথা শোনার জন্য বসলেন। এখানে একটি ব্যাপার লক্ষ্যণীয় যে, মদীনাবাসীরা বেশ খোলা মনের ছিল, মক্কার লোকরা যেমন শত্রুভাবাপন্ন ছিল, মদীনাবাসীরা তেমন ছিল না। তারা অন্যের কথা শোনার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। তাই মুসআবের কথা শোনার ব্যাপারে সাদ ইবন মুয়ায রাজি হলেন। মুসআব তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন, সাদ ইবন মুয়ায ইসলাম গ্রহণ করলেন, ইসলাম লাভ করলো দূর্গের চাবি।
মুসলিম হওয়ার পর সাদ ইবন মুয়ায প্রথমে তাঁর লোকদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমার ব্যাপারে তোমাদের ধারণা কী?' তারা বললো, 'আপনি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী এবং আমাদের নেতা।' তারপর সাদ ইবন মুয়ায বললেন, 'তাহলে তোমরা মুসলিম না হওয়া পর্যন্ত কেউ আমার সাথে কথা বলবে না আর আমিও তোমাদের সাথে কথা বলবো না।'
এই কথার পর সন্ধ্যার মধ্যেই বনু আসআদ গোত্রের প্রতিটি ঘরের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে, আল আওসের এক বড় অংশের মাঝে ইসলামের আলো প্রবেশ করে।
📄 আকাবার দ্বিতীয় শপথ
ইসলামের প্রথম বায়াত অনুষ্ঠিত হয়েছিল আল-আকাবায়, এই ঘটনা বায়াত আল উলা নামে পরিচিত। মদীনায় ইসলাম প্রচারে মুসআব ইবন উমায়ের অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে মানুষ সেখানে ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে এবং পরবর্তী হাজ্জ মৌসুম চলে আসার আগে এমন অবস্থা হয় যে মদীনার প্রতিটি বাড়িতে একজন হলেও ইসলাম গ্রহণ করে। হাজ্জের সময় রাসূলুল্লাহর সাথে মদীনার নও-মুসলিমদের সাক্ষাতের নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে আসলো। সত্তরের অধিক মুসলিম নিজ গোত্রের লোকেদের সাথে হাজ্জের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। মদীনা থেকে আসা প্রতিনিধি দলটির সাথে মুসলিম ও অমুসলিম উভয়েই ছিল। যদিও গোপন বৈঠকটি ছিল শুধুমাত্র মুহাম্মাদ ও মুসলিমদের মধ্যে, কিন্তু তাঁরা মদীনা থেকে যাত্রা করার সময় তাঁরা তাদের গোত্রের অমুসলিম সদস্যদের সাথে একসাথে এসেছেন। রাসূলুল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে আসে সত্তরের অধিক মুসলিম পুরুষ ও দুইজন মুসলিম নারী।
📄 কা'ব ইবন মালিক ও বারা ইবন মা'রুরের ঘটনা
সত্তর জন মুসলিমদের মধ্যে একজন ছিলেন কা'ব ইবন মালিক, তিনি তাদের হাজ্জ যাত্রার একটি ঘটনা বর্ণনা করেন।
'আমরা সেবার হাজ্জ করতে মক্কায় যাই, আমাদের মধ্যে কিছু লোক ছিল মুসলিম আর কিছু লোক অমুসলিম। আমাদের মুসলিম দলের নেতা ছিলেন বারা ইবন মা'রুর, তিনি ছিলেন একজন নেতৃস্থানীয়, প্রবীণ ব্যক্তিত্ব। তিনি আমাদের কাছে, অর্থাৎ মুসলিমদের কাছে এসে বললেন, আমি একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এ ব্যাপারে তোমাদের মতামত জানতে চাই, তোমরা আমার সাথে একমত হবে কিনা আমি জানি না। আমার মতামত হলো, সালাতের সময় কাবাঘরকে পেছনে রাখতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না।'
বারা ইবন মা'রুর কাবাকে পেছনে রেখে সালাত আদায় করতে অস্বস্তিবোধ করছিলেন। সে সময় কা'বা মুসলিমদের কিবলা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়নি। মদীনায় বসে জেরুসালেমের আল-আকসা মসজিদের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে গেলে কাবাঘর মুসলিমদের পেছনে পড়ে যেতো। এ কারণে বারা ইবন মা'রুরের মধ্যে অস্বস্তি কাজ করছিল।
কা'ব তাঁকে বললেন, 'আল্লাহর রাসূল জেরুসালেমের দিকে মুখ করেই সালাত আদায় করেন, সুতরাং আমরা তাঁর বিপরীত কাজ করবো না।' বারা বললেন, "আমি কাবাঘরের দিকে মুখ করেই সালাত আদায় করবো।" এরপর থেকে তিনি কাবাঘরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে শুরু করেন। এরপর তাঁরা মক্কায় এসে পৌঁছালেন। বারা তাঁর ভাতিজা কা'ব ইবন মালিককে বললেন, 'ভাতিজা, আমাকে রাসূলুল্লাহর কাছে নিয়ে চলো। সফরে কিবলা পরিবর্তন করা ঠিক হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে আমি রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করবো। তোমরা তো আমার কাজকে অনুমোদন দিলে না, তাই আমার খটকা হচ্ছে। চলো, রাসূলুল্লাহকে জিজ্ঞেস করে দেখি আমার কাজটা ঠিক হয়েছে কিনা।' কা'ব মক্কার এক লোকের কাছে রাসূলুল্লাহ কোথায় আছেন জানতে চাইলেন, সে বললো,
- আপনারা কি রাসূলুল্লাহকে চেনেন? কখনো তাঁকে দেখেছেন?
- না, তাঁকে আমরা চিনি না।
- আচ্ছা, তাঁর চাচা আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবকে চেনেন?
- হ্যাঁ তাঁকে আমরা চিনি।
- তাহলে আপনারা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করলে দেখতে পাবেন যে, আব্বাসের সাথে একজন লোক বসে আছেন। তিনিই রাসূলুল্লাহ।
'আমরা মসজিদে প্রবেশ করে দেখলাম আব্বাস বসে আছেন, তাঁর সাথে রাসূলুল্লাহও বসে আছেন। আমরা সালাম দিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে বসলাম। আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে দেখে আব্বাসকে তাঁর কুনিয়া নামে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,
- আবুল ফাদল, আপনি কি এ দু'জন মানুষকে চেনেন?
- হ্যাঁ চিনি, ইনি হলেন বারা ইবন মা'রুর, তাঁর গোত্রের নেতা আর ইনি হচ্ছেন কা'ব ইবন মালিক।
- কবি কা'ব নাকি?'
কা'ব ইবন মালিক ছিলেন একজন কবি। এজন্য আব্বাস যখন কা'বকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন ইনিই কি কবি কা'ব কিনা।
এই ঘটনায় কা'ব তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন এই বলে, 'রাসূলুল্লাহর এই কথাটি আমি কখনো ভুলবো না!'
কা'ব ইবন মালিকের কাছে এটা বিশাল ব্যাপার ছিল যে রাসূলুল্লাহ তাঁকে আগে থেকে চিনতেন। রাসূলুল্লাহর সাথে এটি ছিল তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ, যে সাক্ষাতের এই মুহূর্তের জন্য এতদিন অপেক্ষা করে আসছিলেন, আর সেই সাক্ষাতেই আবিষ্কার করলেন তাঁর নেতা, তাঁর এত প্রিয় এই মানুষটি তাঁকে আগে থেকেই চেনেন! এ কথা ভেবেই কা'ব ইবন মালিক গর্ববোধ করছিলেন এবং খুব খুশি হয়েছিলেন। তিনি আরো আনন্দিত হয়েছিলেন এই ভেবে যে রাসূলুল্লাহ হয়তো তাঁর কিছু কীর্তির কথাও শুনে থাকবেন।
এরপর বারা ইবন মা'রুর তাঁর প্রশ্ন উত্থাপন করলেন, 'হে আল্লাহর নবী! আল্লাহ তাআলা আমাকে ইসলামের পথে হিদায়াত করেছেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমি যখন এই সফরে বের হই, তখন আমার মনে হলো, কাবাঘরকে পেছনে রাখা সমীচীন হবে না। তাই আমি কাবার দিকে মুখ করেই সালাত আদায় করেছি। কিন্তু আমার সাথীরা আমার বিরোধিতা করায় আমার মনে খটকা সৃষ্টি হয়েছে, যা করছি ঠিক করছি তো? এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?' মুহাম্মাদ বললেন, "তোমার আগে যে কিবলা ছিল তা বরারবই আদায় করা উচিত।" এরপর থেকে বারা তাঁর কিবলা পরিবর্তন করেন। যেহেতু রাসূলুল্লাহ তখন মক্কায় ছিলেন তাঁকে সালাত আদায়ের সময় কাবাকে পেছনে রাখতে হতো না। কাবাঘরকে সামনে রেখে তিনি জেরুসালেমের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতে পারতেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো হিজরতের পর রাসূলুল্লাহরও ঠিক একই অনুভূতি হয়েছিল, যা হয়েছিল বারা ইবন মা'রুরের, তিনিও কাবাকে পেছনে রেখে সালাত আদায় করতে তখন অস্বস্তিবোধ করেছিলেন, এটা ঘটেছিল মদীনায়।
কা'ব বর্ণনা করেন, 'এরপর আমরা রাসূলুল্লাহর সাথে ওয়াদাবদ্ধ হলাম যে, আমরা আকাবায় আইয়ামে তাশরিফের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর সাথে সাক্ষাত করবো। এরপর আমরা হাজ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বিষয়টি আমরা গোপন রাখলাম, রাসূলুল্লাহর সাথে আমাদের গোপন বৈঠক সম্পর্কে আমাদের গোত্রের মুশরিক সাথীরা কিছুই জানতো না। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন হারাম আবু জাবির, তিনি ছিলেন আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠ ও গোত্রনেতাদের একজন। আমরা তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, আবু জাবির! আপনি আমাদের অন্যতম নেতা এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। আপনি যে ধর্ম অনুসরণ করছেন তার কারণে আপনি আখিরাতে জাহান্নামের জ্বালানি হবেন— এটা আমরা চাই না।' আবু জাবির তখন ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁকে আসন্ন গোপন বৈঠক সম্পর্কে জানানো হয়। তিনি সেই শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ তাঁকে প্রতিনিধি হিসেবেও মনোনীত করেছিলেন। ইসলামে তাঁর বয়স ছিল অল্প, কিন্তু তাঁর নেতৃত্বের যোগ্যতার কারণে তিনি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব পেয়ে যান।
টিকাঃ
৫১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৯৩।