📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বিভিন্ন গোত্রের প্রতি আহ্বান

📄 বিভিন্ন গোত্রের প্রতি আহ্বান


রাসূলুল্লাহ আবার মক্কায় ফিরে আসেন। মক্কায় প্রবেশ করা তাঁর জন্য সহজ ছিল না কারণ তাইফের কাহিনি মক্কাবাসীদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। ওই সময় একাকী মক্কায় প্রবেশ করা তাঁর জন্য নিরাপদ ছিল না। তাই তিনি নিজ শহরে প্রবেশ করার জন্য নিরাপত্তা চেয়ে উরাইক্বাতের মাধ্যমে আল আখনাস ইবন শুরাইকের কাছে সংবাদ পাঠালেন।

আখনাস ইবন শুরাইক ছিল মক্কার লোক, তার সাথে কুরাইশদের মিত্রতা ছিল যদিও সে তাদের গোত্রের ছিল না। রাসূলুল্লাহর কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে আল আখনাস বললো, 'আমি যেহেতু কুরাইশদের মিত্র, কুরাইশদের কথার বাহিরে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এমন কাউকে আমি আশ্রয় দিতে পারি না যে আমার বন্ধুর শত্রু।' সে রাসূলুল্লাহর অনুরোধ ফিরিয়ে দিল। রাসূলুল্লাহ সুহাইল ইবন আমরের কাছেও একই সংবাদ পাঠালেন। সুহাইল ইবন আমরও তাঁকে ফিরিয়ে দিল, 'আমি আপনাকে নিরাপত্তা দিতে পারবো না, কারণ আমর ইবন লুহাই বংশের হয়ে আমি এমন কাউকে নিরাপত্তা দিতে পারি না যে কা'ব ইবন লুহায়ের বংশভুক্ত।' এ দুই বংশের মধ্যে রেষারেষি ছিল। রাসূলুল্লাহ এবার মুতইম ইবন আদীর কাছে নিরাপত্তা চেয়ে সংবাদ পাঠালেন। মুতইম ইবন আদী এ অনুরোধ গ্রহণ করলেন এবং রাসূলুল্লাহকে নিরাপত্তা দিলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁর বাড়িতে গেলেন এবং সেখানেই রাতে অবস্থান করলেন।

আল মুতইমের ছিল ছয় বা সাত সন্তান। সে তাদেরকে আদেশ দিল যেন তারা পরের দিন সকালে বিশেষ পোশাক পরিধান করে প্রস্তুত থাকে। এরপর তারা বাবার নির্দেশক্রমে রাসূলুল্লাহকে বেষ্টনী দিয়ে কাবার দিকে নিয়ে যায়। সেখানে পৌঁছে রাসূলুল্লাহ তাওয়াফ করা শুরু করলেন। আল মুতইম ও তার ছেলেরা নির্দিষ্ট দূরত্বে বসে তাঁকে পাহারা দিতে থাকল। এসময় আবু সুফিয়ান মুতইমের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, 'তুমি কি তাঁকে শুধু নিরাপত্তা দিচ্ছ নাকি তাঁকে অনুসরণও করছ?' মুতইম বললো, 'আমি তাঁকে অনুসরণ করছি না, শুধু তাঁকে নিরাপত্তা দিচ্ছি।' এরপর আবু সুফিয়ান বললো, 'তাহলে ঠিক আছে, যদি শুধু নিরাপত্তা দিয়ে থাকো তাহলে আমাদের আপত্তি নেই।'

তখন রাসূলুল্লাহ মুতইমের আশ্রয়ে থেকে মক্কায় দাওয়াতের কাজ চালিয়ে গেলেন। আবু তালিব ও খাদিজার মৃত্যুর পরে রাসূলুল্লাহ লক্ষ্য করলেন যে, মক্কায় ইসলামের দাওয়াত স্তিমিত হয়ে পড়েছে। যদিও মানুষ ধীরে ধীরে ইসলামে প্রবেশ করছে কিন্তু সামগ্রিকভাবে মুসলিমরা মক্কায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। তাই রাসূলুল্লাহ এমন একটি ঘাঁটি বা কেন্দ্রীয় ভূমির প্রয়োজন অনুভব করলেন যেখানে তিনি স্বাধীনভাবে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে পারবেন। এই উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ হাজ্জের মৌসুমে মক্কায় আগত আরবের বিভিন্ন নেতার সাথে সাক্ষাৎ করা শুরু করলেন। তিনি তাদের ছাউনিতে গিয়ে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন, নিজের নবী-পরিচয় তুলে ধরতেন এবং তাঁকে আশ্রয় ও সমর্থন দেওয়ার জন্য আহ্বান করতেন। রাসূলুল্লাহ তাদেরকে বলতেন, 'আপনাদের উপর জোর খাটানোর কোনো ইচ্ছা আমার নেই। আপনারা চাইলে আমাকে সাহায্য করতে পারেন, তবে আপনাদের উপর কোনো জোরাজুরি করবো না। আমি শুধু আমার শত্রুদের আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চাই, আমি চাই আমার রব আমার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা পূরণ করতে পারি এবং তিনি আমার ও আমার অনুসারীদের ব্যাপারে যে ফয়সালা করেন তা মেনে নিতে পারি।'

কিন্তু সবাই তাঁকে ফিরিয়ে দিল, কেউই তাঁকে নিরাপত্তা ও সমর্থন দিতে রাজি হলো না। সবগুলো গোত্রের নেতা মোটামুটি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছালো, 'তার গোত্রের লোকেরাই তাঁকে সবচেয়ে ভালো চেনে। এমন লোককে আমরা কীভাবে আশ্রয় দিতে পারি যে তার নিজের গোত্রের বিরুদ্ধাচারণ করেছে এবং গোত্রের লোকেরাই তাঁকে বের করে দিয়েছে। যেহেতু তার স্বগোত্রীয়রাই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছে, নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। কাজেই আমরাও এই লোককে আশ্রয় দেব না।' মোটামুটিভাবে সবগুলো গোত্রই তাঁকে এভাবে ফিরিয়ে দিল।

রাসূলুল্লাহ কিন্দা বংশের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গেলেন কিন্তু তারা তা গ্রহণ করলো না। এরপর রাসূলুল্লাহ গেলেন বনু আবদুল্লাহর কাছে, তিনি তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করলেন এবং বললেন, 'দেখো, আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য কত সুন্দর একটি নাম ঠিক করেছেন, তোমরা হলে আবদুল্লাহর (আল্লাহর বান্দার) পুত্র।' কিন্তু অন্যান্যদের মতো তারাও তাঁকে ফিরিয়ে দিল। তারপর রাসূলুল্লাহ গেলেন বনু হানিফা গোত্রের কাছে। তারা তাঁর সাথে প্রচণ্ড বাজে ব্যবহার করলো, আয-যুহরি এ ব্যাপারে বলেছেন, 'বনু হানিফার মতো এত রুঢ় আচরণ আর কোনো গোত্র রাসূলুল্লাহর সাথে করেনি।' এই বনু হানিফা গোত্রই কয়েক বছর পরে রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়। রাসূলুল্লাহর মৃত্যুর কিছুদিন আগেই এ যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। এর পরিসমাপ্তি ঘটে আবু বকর সিদ্দীকের খিলাফতকালে। এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিল মুসাইলামাহ আল কাযযাব। সে নিজেকে নবী দাবি করেছিল।

এরপরে রাসূলুল্লাহ বনু আমর ইবন সাসা গোত্রের সেনাছাউনিতে গেলেন। এই গোত্রের নেতা ছিল বুহায়রা ইবন ফারাস। সে রাসূলুল্লাহর সাথে দেখা করলো এবং তাঁর কথা শুনে অভিভূত হয়ে গেল। সে বললো, 'আমি কসম খেয়ে বলছি, যদি কুরাইশের এই সাহসী যুবক আমার সাথে থাকত তাহলে আমি তাকে পুঁজি করে আরবদের শেষ করে দিতাম।' পুরো বিষয়টির মাঝে বুহায়রা ক্ষমতার গন্ধ পাচ্ছিল। সে দেখল যে মুহাম্মাদের মধ্যে এমন কিছু অসাধারণ গুণাবলি রয়েছে যার কারণে তিনি আর সবার থেকে আলাদা, তাঁর মতো লোককে নিজের পক্ষে পাওয়া গেলে পুরো আরব জয় করা সহজ হয়ে যাবে। বুহায়রা তাঁকে জিজ্ঞেস করলো, 'আচ্ছা, যদি আমরা আপনাকে মেনে চলি আর আল্লাহর ইচ্ছায় শত্রুদের বিপক্ষে আপনি জয়লাভ করেন, তাহলে কি আপনি মারা যাওয়ার পর আমরা ক্ষমতায় যাবো?'

আল্লাহর রাসূল এই প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, 'আল্লাহ তাআলা এই দুনিয়ার মালিক। তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তাকেই ক্ষমতা দেবেন।' রাসূলুল্লাহ বুঝিয়েছেন, ক্ষমতায় কে আছে তা আসল কথা নয়, আসল কথা হলো দ্বীনের বিজয়। আল্লাহ তাআলাই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এ কথা শুনে বুহায়রা বললো, 'তাহলে আমাদের কী দায় পড়েছে যে আমরা আরবদের বিরুদ্ধে গিয়ে আপনাকে নিরাপত্তা দেব? আমরা আপনার জন্য যুদ্ধ করবো আর আপনি বিজয়ী হলে অন্য কারো হাতে ক্ষমতা চলে যাবে আর আমরা বসে বসে দেখবো?' বুহায়রাও রাসূলুল্লাহর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল।

বনু আমর ইবন সাসা হাজ্জ থেকে নিজ দেশে ফিরে গেল। তাদের মধ্যে একজন জ্ঞানী বৃদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন যিনি বার্ধক্যের কারণে হাজ্জে যেতে পারতেন না, কিন্তু কেউ হাজ্জ থেকে ফিরে আসলে তিনি তাদেরকে হাজ্জে কী কী ঘটেছে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। তারা তাঁকে জানালো, 'এক যুবকের সাথে আমাদের দেখা হয়েছিল। তিনি হলেন কুরাইশের আবদুল মুত্তালিবের নাতি। তিনি নিজেকে আল্লাহর নবী হিসেবে দাবি করেছিলেন কিন্তু আমরা তাঁকে পাত্তা দিই নি।' এ কথা শুনে সেই বৃদ্ধ লোক মাথায় হাত দিয়ে বললেন, 'হায়! হায়! এ তোমরা কী করলে। যে ভুল করেছো তা শোধরাবার কোনো উপায় আছে কি? আছে কোনো উপায় বিষয়টি সমাধা করার? আমি কসম করে বলছি, ইসমাঈলের কোনো উত্তরসূরি আজ পর্যন্ত এরকম কোনো মিথ্যা দাবি করেনি। কুরাইশের সেই যুবক যা দাবি করেছে তা অবশ্যই সত্য। কোথায় গেল তোমাদের বিচারবুদ্ধি?'

এই বৃদ্ধ লোকটি বলেছিলেন, ইসমাঈলের বংশধরদের মধ্যে কেউই এ পর্যন্ত নবী হওয়ার দাবি করেনি – এর মানে হলো তৎকালীন আরবদের মধ্যে নবুওয়াতের প্রচলন ছিল না। রিসালাত সম্পর্কে তৎকালীন আরবদের কোনো ধারণাই ছিল না। তারা ছিল অশিক্ষিত জাতি। তাই তিনি বলেছিলেন যে মুহাম্মাদ যা দাবি করেছেন তা অবশ্যই সত্য।

আবু নাঈম, আবু হাকিম ও বাইহাকি থেকে আরেকটি বর্ণনা আছে। আবু বকর সিদ্দীকের সাথে এক বেদুইনের একটি মজার কথোপকথন আছে, সেটি বর্ণনা করেছেন আলী।

'যখন আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে আরবের বিভিন্ন গোত্রকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে নির্দেশ দিলেন তখন রাসূলুল্লাহ আমাকে ও আবু বকরকে সাথে নিয়ে মিনার উদ্দেশ্যে মক্কা ত্যাগ করেন।' হাজ্জে আগত ব্যক্তিদের থাকার যাবতীয় ব্যবস্থা মিনাতেই করা হয়। রাসূলুল্লাহ বিভিন্ন আরব গোত্রের সাথে দেখা করার জন্য এখানে এসেছিলেন। তিনি সবসময় আবু বকরকে সাথে নিয়ে বের হতেন। কারণ আবু বকর আরবদের বংশ ও পূর্বপুরুষদের বৃত্তান্ত খুব ভালো করে জানতেন। বিভিন্ন গোত্রের ইতিহাস, তাদের নাম, অতীত কাহিনি - এসব তথ্য ছিল তাঁর নখদর্পণে। এই কারণে আল্লাহর রাসূল তাঁকে এই কাজে সাথে রাখতেন, আবার আবু বকর বেশ সুপরিচিত ব্যক্তিও ছিলেন।

আবু বকর ছিলেন সবার সামনে। তিনি সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছিলেন। তিনি ছিলেন সকল ভালো কাজে অগ্রগামী, আর আরবদের বংশবৃত্তান্তের ব্যাপারেও তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল।' তাঁরা একটি গোত্রের কাছে গেলেন। আবু বকর তাদের স্বাগত জানালেন, তারপর তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন,
- আপনারা কোথা থেকে এসেছেন?
- আমরা এসেছি রাবিআ থেকে।

রাবিআ ছিল আরবের উত্তর-পূর্ব দিকের একটি গোত্র। এটি বেশ বড় গোত্র ছিল। তাই আবু বকর এ বংশ সম্পর্কে আরও তথ্য জানতে আগ্রহী হলেন। তিনি বললেন,
- তোমরা কি কপাল (উচ্চবংশ) থেকে এসেছ নাকি নীচ থেকে (নিম্নবংশ)?
- আমরা এই গোত্রের মূলধারার মধ্যে সেরা।

অর্থাৎ তারা ছিল পুরো গোত্রের মাঝে সেরা। আবু বকর তাদের এই দাবির সত্যতা যাচাই করার জন্য নিজেই তাদের সাথে আলাপ শুরু করলেন।
- আচ্ছা, আওফ কি তোমাদের সেই লোক যার সম্পর্কে বলা হয় যে তার উপত্যকায় কেউই স্বাধীন নয়?
- না।

এই আওফ লোকটি ছিল রাবিআ বংশের। সে ছিল প্রচণ্ড ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্ব, উপত্যকার লোকেরাও তার বশ্যতা স্বীকার করে চলত। এ কারণে লোকেরা বলতো যে 'তার উপত্যকায় কেউই স্বাধীন নয়'। এরপর আবু বকর তাদেরকে একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগলেন।
- আচ্ছা, তাহলে বুস্তান ইবন কাইস, আবুল লুওয়া এবং মুস্তাহিল আহইয়া – এরা কি তোমাদের লোক?
- না।
- তবে কি রাজাদের খুনি ও তাদের আত্মা হরণকারী – আল হাওফাযান ইবন শুরাইক তোমাদের জ্ঞাতি ভাই?
- না।
- ইজ্জতের রক্ষক ও প্রতিবেশীর বন্ধু - জাসসাস ইবন মুররা, সে কি তোমাদের গোত্রীয়?
- না।
- অনন্য পাগড়ীধারী সেই আল মুযদালাফ - সে কি তোমাদের কেউ?
- না।
- আচ্ছা ঠিক আছে, কিন্দার রাজাদের সাথে কি তোমাদের কোনো সম্পর্ক আছে?
- না।
- লাখামের রাজাদের সাথে?
- না।
- তার মানে বোঝা গেল তোমরা গোত্রের মূলধারার কেউ নও, তোমরা শাখাগোত্র থেকে এসেছ।

আবু বকরের প্রশ্নবাণে তারা রীতিমত কাবু হয়ে গেল। বাইরে থেকে কেউ একজন এসে তাদেরকে এভাবে অপদস্ত করবে তা রাবিআ গোত্রের মোটেও সহ্য হলো না। উঠে দাঁড়ালো তাদের এক যুবক। সবে মাত্র দাড়ি গজানো এই যুবকের নাম ছিল দারফাল। সে আবু বকরের উটের লাগাম ধরে বলে উঠল, 'যারা আমাদেরকে প্রশ্ন করে, আমরাও তাদের প্রশ্ন করবো। আর আমাদের কথার প্রমাণ দিতে আমরা বাধ্য নই। আপনি তো আমাদেরকে অনেক কিছুই জিজ্ঞেস করেছেন আর আমরা কোনো কিছুই গোপন করিনি, সবকিছুর উত্তর দিয়েছি। এখন আমরাও আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। বলুন, আপনি কে?'
- আমি কুরাইশের লোক।
- হুম, তাহলে আপনারা হলেন নেতৃত্বদানকারী ও অভিজাত সম্প্রদায়, আরবদের পথপ্রদর্শনকারী। তা আপনি কুরাইশের কোন অংশ থেকে এসেছেন?
- আমি এসেছি বনু তাইম ইবন মুররা থেকে।

বনু তাইম ছিল কুরাইশের ছোটোখাটো একটি গোত্র, তেমন নামডাক ছিল না। যুবকটি আবু বকরকে ঘায়েল করার সুযোগ পেয়ে খুশি হয়ে গেল, সে বললো,
- আপনি তো শিকারীকে তার লক্ষ্যস্থল দেখিয়ে ফেলেছেন! আচ্ছা বলুন তো, কুসাই ইবন কালাব কি আপনার গোত্রীয় লোক যে মক্কা বিজয় করে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে? সেই কুসাই যে সবাইকে বের করে দিয়ে নিজের লোকদের মক্কায় ঢুকিয়েছিল? মন্দির দখল করে সেখানে কুরাইশদের বসতি স্থাপন করেছিল এবং যাকে নাম দেওয়া হয়েছে 'ঐক্যবদ্ধকারী'। যার ব্যাপারে কবি কবিতা লিখেছিল - তুমি কি সেই পিতার পুত্র নও যিনি এক করেছিলেন ফিহরের গোত্রগুলো?
- না, আমরা আব্দে মানাফের লোক নই, তারা উপদেশ দানে সেরা।
- তবে কি আবুল ঘাদারে, মহানেতা, আবি আস সাক সে তোমাদের নেতা নয়?
- না।
- তবে কি আমর ইবন আবদুল মুনাফ হাশিম যিনি নিজের লোক ও মক্কাবাসীর জন্য রুটি ও গোশত তৈরি করেছিলেন, তিনি আপনার বংশীয় লোক নন? যার ব্যাপারে কবি বলেছেন- আমর আল উলা তার লোকেদের জন্য তৈরি করেছিলেন সারীদ, যখন মক্কার লোকেরা ছিল দুর্ভিক্ষগ্রস্ত ও অভাবী? যে ছিল শীত ও গ্রীষ্মের মুসাফির? কুরাইশরা যদি ডিম হয়, তবে সেই ডিমের কুসুম হলো আবদুল মানাফ। তাদের মতো সম্পদশালীও আর কেউ ছিল না আর তারা অতিথিদের কখনো ফিরিয়ে দিত না। তারা অপরাধীদের শায়েস্তা করতো আর নিরীহদের রক্ষা করতো নিজেদের তরবারির দ্বারা। আপনি যদি তাদের বাড়িতে থাকেন তবে তারা আপনার সাথে ভালো ব্যবহার করবে, আপনাকে নিরাপত্তা দিবে। সেই আমর কি আপনার গোত্রীয় ব্যক্তি নয়?
- না। আমর আমার গোত্রের নয়।
- তবে আপনি কি সেই আবদুল মুত্তালিবের আত্মীয়, যিনি ছিলেন সকলের শ্রদ্ধার পাত্র, মক্কার কাফেলার রক্ষক, আকাশের পাখি, বন্য পশু ও মরুভূমির সিংহের খাদ্যের যোগানদাতা? যার চেহারা জ্বলজ্বল করতো অন্ধকারে চাঁদের মতন?
- না।
- তাহলে নিশ্চয়ই আপনি ওই লোকদের মধ্য থেকে এসেছেন যারা ইফাদার সুযোগ পায়।
- না।
- তাহলে বোধ করি আপনি তাদের মধ্য থেকে এসেছেন যারা হিজাবার সুবিধা পায়।
- না।
- তা না হলে নিশ্চয়ই আপনি নাদওয়ার সুবিধা পাওয়া লোকদের একজন।
- না।
- তাহলে নিশ্চয়ই আপনি সিকায়ার সুযোগ পাওয়া ব্যক্তিদের একজন।
- না।
- আচ্ছা, তবে কি আপনি রিফাদা প্রদানকারীদের একজন?
- না।

তিনি সব প্রশ্নের উত্তরে না বলে যাচ্ছিলেন। যুবকটি তাঁকে এত প্রশ্ন করছিল যে তিনি বিরক্ত হয়ে আর কিছু না বলে সেখান থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। তিনি যুবকটির হাত থেকে উটের লাগাম টেনে নিলেন। তখন সেই যুবক একটি কবিতার লাইন আবৃত্তি করছিল, 'তোমার (প্রশ্নের) ঢেউ আরো বড় ঢেউয়ের মুখোমুখি। আমার এই ঢেউ তোমাকে প্রথমবার থামিয়ে দেবে, আর দ্বিতীয়বার ভাসিয়েই নিয়ে যাবে। আমি কসম খেয়ে বলছি আমার কুরাইশ ভ্রাতা, তুমি যদি আরেকটু দাঁড়িয়ে থাকতে, আমি প্রমাণ করে ছাড়তাম তুমি হলে কুরাইশদের সবচেয়ে নিম্নগোত্র থেকে উঠে আসা লোক!'

এই কথোপকথন শেষ হলে রাসূলুল্লাহ হাসতে হাসতে সেখান থেকে আসলেন। আলী আবু বকরকে বললেন, 'হায়! এই বেদুইন দেখি আপনার অবস্থা খারাপ করে ফেলেছে!' আবু বকর বললেন, 'হুম, দুর্যোগের পর আরেক দুর্যোগ, আর মানুষের মুখের কথা থেকে কতই না দুর্যোগের সৃষ্টি।'

আলী বর্ণনা করেন, 'এরপর আমরা একটি বৈঠকে গেলাম। সেখানের মানুষগুলো ছিল শান্ত প্রকৃতির ও গম্ভীর। আমরা তাদেরকে স্বাগত জানালাম। আবু বকর তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কোথা থেকে এসেছেন? তারা বললো, আমরা বনু শাইবান থেকে এসেছি। আবু বকর রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে জানালেন, এই লোকগুলো শক্তিশালী এবং যথেষ্ট অভিজ্ঞ। এরপর আবু বকর গোত্রের নেতাদের কাছে গেলেন। ওই দলের নেতৃত্বে ছিল মাফরুক ইবন আমর, হানি ইবন কুবাইসা, মুসান্না ইবন হারিস এবং নউমান ইবন শুরাইক। তাদের মধ্যে মুফরুক ইবন আমরের সাথে আবু বকরের আগে থেকেই ভালো পরিচয় ছিল। মুফরুকের চুলে ছিল দুটি বেণী, সেগুলো বুক পর্যন্ত নেমে এসেছিল।

আবু বকর তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন,
- আপনাদের লোকবল কেমন?
- আমাদের আছে এক হাজারেরও বেশি শক্তিশালী লোক, অল্পসংখ্যক লোক তাদেরকে হারাতে পারবে না, মাফরুক জবাব দিল।
- আপনাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা?
- আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে, যেমনটা অন্য সকলের থাকে।
- শত্রুদের সাথে যুদ্ধে তোমরা কেমন নৈপুণ্য দেখাও?'
- যুদ্ধের সময় আমরা থাকি ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ, যুদ্ধের ঘোড়া নিয়ে আমাদের যত গর্ব, আমাদের সন্তানদের নিয়ে ততটা নই। আমরা আমাদের তলোয়ারের যতটা যত্ন নিই, আমাদের উটের তত যত্ন নিই না। তবে হ্যাঁ, যুদ্ধে সফলতা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে, কখনো আমরা জয়ী হই, কখনো আমাদের শত্রুরা। আচ্ছা ভালো কথা, আপনাকে তো কুরাইশের লোক মনে হচ্ছে?
- হ্যাঁ, আমি কুরাইশের লোক। আপনারা কি আল্লাহর রাসূলের কথা শুনেছেন?
- হ্যাঁ, আমরা শুনেছি যে তিনি আল্লাহর রাসূল।

এরপর মাফরুক রাসূলুল্লাহর সাথে সরাসরি কথা বলতে চাইল। আবু বকর তাদের কথা বলার ব্যবস্থা করে দিলেন। রাসূলুল্লাহ আসলেন, মাফরুক বললো, 'হে কুরাইশের ভাই, আপনি আমাদের সামনে কী উপস্থাপন করতে চান?' রাসূলুল্লাহ বলতে শুরু করলেন,
'আমি আপনাদেরকে এই সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আহ্বান করছি যে, আল্লাহ ব্যতীত ইবাদতের যোগ্য অন্য কোনো ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমি হচ্ছি আল্লাহর রাসূল। আমি আপনাদের কাছে আমাকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি যতক্ষণ না আমি আল্লাহর দেওয়া আদেশ পালন করে যেতে পারি। কুরাইশরা আল্লাহ তাআলার আদেশের বিরুদ্ধাচারণ করেছে এবং তাঁর রাসূলকে অমান্য করেছে। তারা সত্যের পথ ছেড়ে দিয়ে মিথ্যাকে আঁকড়ে ধরেছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং তিনিই প্রশংসার যোগ্য।'

রাসূলুল্লাহর কথাগুলো মাফরুকের মনে ধরলো। সে রাসূলুল্লাহকে আরও কিছু বলার জন্য অনুরোধ করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সূরা আল আনআম থেকে কিছু আয়াত পাঠ করে শুনালেন। এরপর মাফরুক বললো, 'হে কুরাইশের ভাই, আপনি আমাদেরকে আর কী বলতে চান? আমি কসম করে বলছি, আপনি যা বললেন তা এই দুনিয়ার কোনো মানুষের বানানো কথা নয়, যদি তাই হতো তাহলে আমরা অবশ্যই জানতাম।' এরপর রাসূলুল্লাহ তাদেকে সূরা নাহলের কিছু আয়াত শোনালেন। তারপর রাসূলুল্লাহ তাদের কাছে ইসলামের কথা বললেন। এসময় হানি ইবন কুবাইসা বললো, 'আমরা তো একাকী এসেছি, আমাদের সাথে অনেকেই আসেনি, সুতরাং এ ব্যাপারে তাদের ছাড়া আমরা একাকী কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।' সে রাসূলুল্লাহর কথা পছন্দ করেছিল, কিন্তু গোত্রের অন্যান্যদের সাথে আলোচনা না করে সে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায়নি। মাফরুক আরো বলেছিল, 'আমি মনে করি, শুধুমাত্র একটা বৈঠকের উপর নির্ভর করে, কোনো ধরনের পূর্ব পরিচিতি বা পরবর্তী বৈঠকের তারিখ নির্ধারণ না করে, পুরো বিষয়টি আগপাশ এবং ভবিষ্যত চিন্তা না করে যদি আমরা আমাদের দ্বীন ত্যাগ করে আপনার দ্বীন গ্রহণ করি, তাহলে সেটা হবে তাড়াহুড়া ও অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত।'

এখানে লক্ষণীয়, একেক গোত্রের আচরণ একেক রকম। আনসারগণ ইসলাম গ্রহণ করা মাত্রই রাসূলুল্লাহর কথা মেনে নিয়েছিলেন, কারণ তারা প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু বনু শায়বার হানি বলেছিল, 'কোনো ধরনের পরিচিতি বা পরবর্তী সাক্ষাতের নিশ্চয়তা ছাড়া আমরা এখনই ইসলাম গ্রহণ করতে পারি না।' তাদের ধর্মীয় নেতা হারিসা বলেছিল, 'আমি আপনার কথা শুনেছি। আপনি যা বলেছেন তা আমার ভালো লেগেছে।' তারা সকলেই রাসূলুল্লাহর কথায় অভিভূত হয়েছিল। হারিসা বললো, 'আমি আপনার কথা শুনে বিমোহিত। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে হানি ইবন কুবাইসা যা বলেছে আমিও তার সাথে একমত। মাত্র একবার সাক্ষাতের উপর ভিত্তি করে নিজেদের দ্বীন ত্যাগ করে আপনাকে অনুসরণ করা বিষয়টাকে তুলনা করা যায় দুটো জলাবদ্ধ এলাকা - আল-ইয়ামামা ও আস-সামাওয়ার মাঝে নিজেদের ঠেলে দেওয়ার মতো।'

রাসূলুল্লাহ তার এই কথাটি বুঝতে পারেননি। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'দুটো জলাবদ্ধ এলাকা বলতে?' মুসান্না উত্তর দিল, 'একটি হলো আরব বিশ্ব, অপরটি হলো পারস্য ও কিসরার নদী। কিসরার সাথে আমাদের এই মর্মে চুক্তি আছে যে, আমরা তাদের সাথে কোনো ঝামেলা করবো না এবং ঝামেলা করতে পারে এমন কাউকে আশ্রয় দেব না। আপনি যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা পারস্যের রাজা পছন্দ করবে না। আরবের সীমান্তবর্তী ভূমিগুলোর ক্ষেত্রে এটা সমস্যা নয়। আপনাকে আশ্রয় দিলে তারা হয়তো ক্ষমা করে দেবে আর অজুহাতও গ্রহণযোগ্য হবে, কিন্তু এই কাজ যদি পারস্যের সাথে করা হয় তাহলে তারা মেনে নেবে না। আর যদি আপনি বলেন আমাদের এলাকার মধ্যে আপনাকে প্রতিরক্ষা দিতে হবে, তাতে কোনো সমস্যা নেই, আমরা তাতে রাজি আছি।'

বনু শাইবার এলাকা ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের সীমান্তে, তাদের মধ্যে কিছু চুক্তি হয়েছিল। মুসান্না এ ব্যাপারে বলেছিল, 'পারস্যের সাথে আমাদের চুক্তি হয়েছে যে সমস্যা-করতে-পারে এমন কাউকে আমরা আশ্রয় দেবো না। আর আপনি যে দ্বীনের কথা বলেছেন তা রাজার কাছে পছন্দনীয় হবে না।' সে রাসূলুল্লাহর কথা শুনেই বুঝতে পেরেছিল যে ইসলাম এমন দ্বীন যা রাজাদের অপছন্দের কারণ, কারণ বেশিরভাগ রাজা জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে চায় না, তারা চায় নিজেদের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে। কিন্তু ইসলাম এসেছে মানুষকে এই দুনিয়াবি দাসত্ব থেকে মুক্ত করে শুধু আল্লাহ তাআলার দাসত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। মুসান্না পারস্যের আক্রমণ থেকে নিরাপত্তা দিতে অপারগ ছিল তবে তারা আরবের দিক থেকে নিরাপত্তা দিতে রাজি ছিল।

রাসূলুল্লাহ সব শুনে বললেন, 'তোমরা খারাপ কিছুই বলোনি, কোনোকিছু গোপন করোনি, যা বলার তা সরাসরি ও সুন্দরভাবে বলেছো। কিন্তু আল্লাহ তাআলার এই দ্বীন তাদের হাতেই ন্যস্ত করা হবে, যারা সবদিক থেকে প্রতিরক্ষা করতে সমর্থ আছে।' রাসূলুল্লাহ অর্ধেক চুক্তি করতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন সামগ্রিক নিরাপত্তা, পরিপূর্ণ অঙ্গীকার।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় হলো, যেকোনো আলোচনা বা মীমাংসায় আল্লাহ তাআলার দ্বীনকে সব কিছুর উপরে স্থান দিতে হবে। ইসলামের ব্যাপারে কোনো ধরনের দরকষাকষি কিংবা আপোস করা যাবে না। যদি কোনো চুক্তি ইসলামি বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবে সেই চুক্তি করা যাবে না। এই ঘটনাটি এমন এক সময়ের যখন মক্কায় রাসূলুল্লাহ ও অন্যান্য মুসলিমদের অবস্থা খুবই শোচনীয় ছিল, সেখানে রাসূলুল্লাহর কোনো নিরাপত্তা ছিল না। তাঁর জন্য মক্কা ত্যাগ করা খুবই জরুরি ছিল, কিন্তু তারপরও তিনি বনু শায়বার আংশিক অঙ্গীকারের এই চুক্তিতে রাজি হননি। পরিস্থিতি যতই ভয়াবহ হোক না কেন তিনি আপসের চুক্তিতে রাজি হননি। আর এটাই হচ্ছে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কলের স্বরূপ।

টিকাঃ
৪৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৭।
৪৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬১।
৪৭. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬১।
৪৮. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৫।
৪৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৭।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 ইসলামের দুর্গ: আল-আনসার

📄 ইসলামের দুর্গ: আল-আনসার


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 আওস ও খাযরাজের ইসলামে প্রবেশ

📄 আওস ও খাযরাজের ইসলামে প্রবেশ


ইবন ইসহাক আল-আনসারদের ইসলামে আসার কাহিনি বর্ণনা করেছেন। আল- আনসার ছিল দুটি গোত্র আল আওস এবং আল খাযরাজ। এ দুটো গোত্র ইসলাম গ্রহণ করার পর থেকে তাদেরকে একসাথে বলা হতো আল-আনসার, 'আনসার' মানে রক্ষক। এ দুটি আরব গোত্র মদীনায় থাকত, কাহতান শাখার বংশধর। আরবরা আদনান ও কাহতান নামক দুইটি অংশে বিভক্ত ছিল। ইয়েমেনের আরবদেরকে কাহতান বলা হতো, আর আদনান হলো ইসমাঈলের বংশধর। আওস ও খাযরাজ গোত্রের সাথে মদীনাতে তখন তিনটি ইহুদি গোত্র বাস করতো বনু নাযির, বনু কাইনুকা ও বনু কুরাইযা। মদীনা শহরটির ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থান ছিল অন্যান্য শহর থেকে আলাদা, এর তিনদিক ঘেরাও ও নিরাপদ ছিল। পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ছিল পাথুরে রাস্তা। সেখান দিয়ে মদীনা আক্রমণ করা সম্ভব ছিল না, আর দক্ষিণ দিক কৃষিজমির গাছগাছালিতে ভরা ছিল। সুতরাং শুধুমাত্র উত্তর দিক থেকে শত্রুপক্ষ মদীনাকে আক্রমণ করতে পারত।

রাসূলুল্লাহ হাজ্জে আগত খাযরাজ গোত্রের ছাউনিতে গেলেন। ভেতরে ঢুকে তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন,
- আপনারা কারা?
- আমরা আল খাযরাজ গোত্র থেকে এসেছি।
- আপনাদের সাথে কি ইহুদিদের মিত্রতা আছে?
- হ্যাঁ, আছে।
- আচ্ছা, আমি কি আপনাদের সাথে কিছু কথা বলতে পারি?
তারা রাজি হলো। রাসূলুল্লাহ তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। রাসূলুল্লাহর কথা শোনার প্রতি তাদের খুবই আগ্রহ ছিল। তারা ইসলামের দাওয়াত পেয়েই তা গ্রহণ করলো এবং বললো, 'আমরা আমাদের দেশ ছেড়ে এসেছি কারণ তাদের মধ্যে প্রচণ্ড শত্রুতা আর রেষারেষি লেগেই আছে, এমনটি আর কোথাও পাবেন না। হয়তোবা আল্লাহ তাআলা আপনার মাধ্যমে তাদেরকে আবার একত্রিত করতে পারেন। আমরা তাদের কাছে গিয়ে এই দ্বীন ইসলামের কথা তাদের কাছে তুলে ধরব। যদি আল্লাহ আপনার মাধ্যমে তাদেরকে একত্রিত করে দেন, তাহলে আপনার চেয়ে প্রিয় মানুষ আমাদের চোখে আর কেউ হবে না।'

ছয়জনের এই ছোট্ট দলটি কোনো প্রকার দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই ইসলামের দাওয়াত পাওয়া মাত্রই তা গ্রহণ করে নিয়েছিল যা অন্য আরব গোত্ররা করেনি। এর পেছনে কিছু কারণ আছে। সেগুলো হলো,
১. মদীনাবাসীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ সংঘাত চলছিল। আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে ক্রমাগত যুদ্ধ আর রক্তপাত হয়ে আসছিল, কিন্তু তারা চাচ্ছিল এর অবসান হোক। তাই যখন তারা রাসূলুল্লাহর কথা শুনল তখন এই ভেবে তারা আশান্বিত হলো যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলের মাধ্যমে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে দিতে পারেন।
২. ইহুদিরা তাদের প্রতিবেশী হওয়ায় তাওহীদ অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের ধারণার সাথে তারা পরিচিত ছিল এবং তাদের কাছে তাওহীদের ধারণার বিশেষ আবেদন ছিল। আরবরা সব সময় ইহুদিদের দ্বীনকে নিজেদের দ্বীনের চেয়ে শ্রেয় মনে করতো। এর কারণ, ইহুদিরা ছিল শিক্ষিত; তাদের কাছে কিতাব ছিল, দ্বীনের জ্ঞান ছিল। অন্যদিকে আরবদের দ্বীন বিভিন্ন উপকাহিনি আর পূর্বপুরুষদের রীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। তাদের মধ্যে জঘন্য কিছু রীতিনীতি প্রচলিত ছিল, যেমন: কন্যা সন্তান জীবন্ত হত্যা করা। ইহুদিরা যদি অহংকার ও পক্ষপাতী না হতো, তাহলে আরবরা হয়তোবা তাদের দ্বীন গ্রহণ করতো।
৩. আরব ও ইহুদিদের মধ্যে কোনো গণ্ডগোল হলেই ইহুদিরা তাদের হুমকি দিত, শীঘ্রই একজন রাসূলের আগমন ঘটবে। আর যখন তিনি আবির্ভূত হবেন তখন আমরা তাঁকে অনুসরণ করব এবং আদ জাতিকে যেভাবে শেষ করা হয়েছে আমরাও তোমাদেরকে সেভাবে শেষ করে দেব।' অর্থাৎ আরবদের জানা ছিল যে ওই সময়ে একজন রাসূলের আগমন ঘটবে। এভাবে নবুওয়াতের ব্যাপারে আওস ও খাযরাজ আগে থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল।
৪. রাসূলুল্লাহর হিজরতের কয়েক বছর পূর্বে আল আওস ও আল খাযরাজ গোত্রের মধ্যে বুয়াস নামে একটি ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে দুই গোত্রেরই অনেক নেতা মারা যায়। এর ফলে তাদের মধ্যে নেতৃত্বশূন্যতা সৃষ্টি হয়, যে কারণে তারা নতুন নেতৃত্বের সন্ধানে ছিল। তাই রাসূলুল্লাহর কথা জানামাত্র তেমন কোনো আপত্তি ছাড়াই তারা তাঁকে নিজেদের নেতা হিসেবে মেনে নেয়।

মূলত এসব কারণেই মদীনা ইসলামের প্রসারের জন্য উপযুক্ত ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। আ'ইশা বলেছেন, 'বুয়াসের যুদ্ধ ছিল আল্লাহ তাআলা কর্তৃক রাসূলুল্লাহর হিজরতের জন্য নির্ধারিত একটি প্রস্তুতি। এ যুদ্ধে তাদের প্রায় সব নেতা মারা পড়ে।' সাধারণত সমাজের নেতা ও ক্ষমতাসীন লোকেরা সত্যের বিপরীতে কট্টর অবস্থান নেয়। রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আওস ও খাযরাজের নেতারা মারা যাওয়ায় ইসলামের পথে তাদের যাত্রা সুগম হয়। ইবন ইসহাক বলেছেন, 'ইহুদিদের সাথে একই ভূমিতে থাকার কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য ইসলাম গ্রহণ আরও সহজ করে দিয়েছেন। ইহুদিরা ছিল কিতাবের অনুসারী, তাদের অনেক জ্ঞান ছিল। অন্যদিকে আল আওস ও খাযরাজের লোকেরা ছিল মুশরিক এবং মূর্তিপূজারী। তারা এর আগে ইহুদিদের সাথে যুদ্ধ করে তাদের ভূমি কেড়ে নিয়েছিল। যখনই মুশরিকদের সাথে ইহুদিদের কোনো ঝামেলা বাঁধত তখন ইহুদিরা বলতো, একজন রাসূলকে পাঠানো হবে। তিনি আসছেন। আমরা তাঁকে অনুসরণ করবো এবং আদ জাতির ভাগ্যে যা ঘটেছিল তোমাদেরকেও সেই একই পরিণতি ভোগ করতে হবে।'

আল্লাহ তাআলা সূরা আল বাক্বারার ২১৬ নাম্বার আয়াতে বলেছেন, "তুমি হয়ত কোনো জিনিস অপছন্দ কর, কিন্তু তাতেই তোমার জন্য ব্যাপক কল্যাণ রয়েছে।” আওস ও খাযরাজের মধ্যে সংঘটিত বুয়াসের যুদ্ধটি ছিল এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যদিও এ যুদ্ধে দুই গোত্রেরই অনেক ক্ষতি হয়, কিন্তু তা তাদের ইসলামে প্রবেশের নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

টিকাঃ
৫০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৬।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 বাইয়াতের প্রথম শপথ

📄 বাইয়াতের প্রথম শপথ


সেই ছয়জন পুণ্যবান লোক ইসলাম গ্রহণ করলো এবং তারা রাসূলুল্লাহকে বললো, 'আমরা দেশে ফিরে গিয়ে আমাদের লোকদের ইসলামের পথে আসার জন্য আহ্বান করবো।' মদীনায় ফিরে যাওয়ার আগে তারা রাসূলুল্লাহর সাথে পরের বছর হাজ্জের মৌসুমে দেখা করার কথা দিল। বছর ঘুরে আবার ফিরে এল হাজ্জের মৌসুম। এবার ছয়জনের পরিবর্তে এল বারোজন, ছয়জন ছিল আগের বছরের আর বাকি ছয়জন নতুন। প্রথম বছরে ইসলাম গ্রহণকারী ছয়জন ছিলেন আল খাযরাজ গোত্রের; অন্য আরেকটি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে পাঁচজন ছিলেন আল খাযরাজ গোত্রের আর বাকি একজন এসেছিলেন আল আওস থেকে। দ্বিতীয় বছরে আল খাযরাজ থেকে ছিলেন দশজন এবং আল আওস থেকে দুইজন। তাঁরা রাসূলুল্লাহর কাছে এসে বাইয়াত দিলেন। বাইয়াতের ভাষ্য ছিল এমন:

'আক্বাবার প্রথম বৈঠকের রাতে রাসূলুল্লাহর কাছে এই মর্মে বাইয়াত দেওয়া হয় যে, আমরা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবো না। আমরা ব্যভিচারের ধারে কাছে যাবো না, সন্তান হত্যা করবো না, কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেব না এবং ভালো কাজে তাঁর বিরোধিতা করবো না। তিনি আমাদেরকে বলেছেন, যদি তোমরা এগুলো মেনে চলতে পার তাহলে জান্নাতে যেতে পারবে। আর যদি কোনো পাপ করে ফেল এবং সেই পাপের শাস্তি যদি এই দুনিয়াতেই দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে সেই পাপ মাফ করে দেওয়া হবে। কিন্তু যদি দুনিয়াতে পাপের শাস্তি না দেওয়া হয় তাহলে আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে ওই পাপের জন্য শেষ বিচারের দিন শাস্তি দিতেও পারেন আবার ক্ষমাও করে দিতে পারেন।'

সাধারণত, মহিলারা এই মর্মে রাসূলুল্লাহর কাছে বাইয়াত করতেন। এই বাইয়াতে জিহাদের ব্যাপারে অঙ্গীকার ছিল না বলেই একে বাইয়াতুন নিসা বা মহিলাদের বাইয়াত বলা হয়।

এখানে একটি ফিকহী বিষয় লক্ষ্যণীয়: এই বাইয়াতে যেসব গুনাহ থেকে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে সেগুলো সবই হলো কবীরা গুনাহ— ব্যভিচার, সন্তানদের মেরে ফেলা, কারো নামে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া, ভালো কাজে আল্লাহর অবাধ্য হওয়া। এরপর রাসূলুল্লাহ বলেন যে এই দুনিয়াতে থাকতেই যদি গুনাহের শাস্তি দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে গুনাহকারীকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে আর যদি বেঁচে থাকতে শাস্তি দেওয়া না হয় তাহলে গুনাহকারীকে শেষ বিচারের দিন ক্ষমা করে দেওয়া হবে নাকি শাস্তি দেওয়া হবে তা আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করবেন।

রাসূলুল্লাহ মদীনার মুসলিমদেরকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য মুসআব ইবন উমাইরকে মনোনীত করেন। তিনি ছিলেন একজন প্রতিনিধি, শিক্ষক ও আলিম। মুসআব ছিলেন কুরাইশের এক ধনী পরিবারের সন্তান। মুসলিম হওয়ার পূর্বে তিনি ছিলেন মক্কার সবচেয়ে উচ্ছন্নে যাওয়া যুবক, তাঁর পরনে থাকতো সবচেয়ে দামি সব জামাকাপড়, শরীরে থাকতো নিত্যনতুন সুগন্ধির ঘ্রাণ। তাঁর মা ছিলেন অনেক ধনী। মুসআব ছাড়া তার আর কোনো সন্তান ছিল না, তাই একমাত্র ছেলেকে অনেক আদর করতেন। কিন্তু যখন মুসআব ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন তাঁর মা তাঁকে ত্যাগ করলেন, তাঁর বিরুদ্ধে চলে গেলেন। যে মুসআব শৈশব-কৈশোর-যৌবন কাটিয়েছিলেন প্রাচুর্যের মধ্যে, তিনিই হঠাৎ সহায়সম্বলহীন এক যুবকে পরিণত হলেন, জীবন হয়ে যায় রুক্ষ, কঠিন। মুসআব যখন উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন, তাঁকে দাফন করার জন্য পর্যাপ্ত টাকাপয়সাও তখন ছিল না। তাঁর গায়ে যে জামাটি ছিল তা দিয়ে তাঁকে ঠিকমত ঢেকে রাখা যাচ্ছিল না। উপস্থিত সাহাবীরা সেই দিনের কথা বর্ণনা দিয়েছেন, 'আমরা যখন তাঁর মুখ ঢাকার চেষ্টা করছিলাম তখন তাঁর পা বের হয়ে যাচ্ছিল, আবার পা ঢাকতে গেলে মুখ দেখা যেতো। আমরা রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে বললাম, এখন আমরা কী করবো?' রাসূলুল্লাহ তখন তাদেরকে কাপড় দিয়ে মুসআবের মুখ আর কিছু ঘাস দিয়ে পা ঢেকে দিতে বললেন।

মুসআব ইবন উমাইর ছিলেন রাসূলুল্লাহর মদীনার প্রতিনিধি, তাঁর উপর অর্পিত এই দায়িত্ব ছিল বেশ কঠিন। তিনি মদীনায় থাকার জন্য মক্কা ত্যাগ করলেন। আল আওস ও খাযরাজের মধ্যে শত্রুতা থাকায় তিনি সালাতের ইমামতি করতেন, কারণ দুই গোত্রের কেউই অন্য গোত্রের ইমামের পেছনে সালাত আদায় করতে চাইত না।

মুসআব মদীনায় আসআদ ইবন যুরারার সাথে থাকতেন। তাঁরা সেখানকার এক বাগানে অন্যান্য মুসলিমদের সাথে দেখা করতেন। তাঁরা সেখানে মুসলিমদের ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা দিতেন। মুসআব তাদের সাথে নিয়মিত হালাক্বা করতেন। তাঁরা বসতেন মদীনার আওস-অধীনস্থ একটি এলাকায়। তখন পর্যন্ত মুসলিমদের অধিকাংশই ছিল খাযরাজ গোত্রের, আওসের অল্পসংখ্যক লোকই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। মুসআব আওস গোত্রকে ইসলামের দিকে আগ্রহী করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ কারণে তিনি আল আওসের এলাকায় গেলেন।

আওসের নেতাদের বিষয়টি পছন্দ হলো না। আওসের নেতা ছিলেন সাদ ইবন মুয়ায ও উসাইদ ইবন খুযাইর। মুসআব ও আসআদ ইবন যুরারাকে আওসের এলাকায় একসাথে দেখতে পেয়ে সাদ ইবন মুয়ায খুব বিরক্ত হয়ে তার বন্ধু উসাইদকে বললেন, 'তুমি ওই দুই লোকের কাছে গিয়ে বলো যে, আমরা চাইনা তাঁরা এখানে থেকে দুর্বল ও বোকা লোকদের বিভ্রান্ত করুক। আসআদ যদি আমার আত্মীয় না হতো তবে আমি নিজে গিয়েই এই কথা বলতাম।' আসআদের সম্মানে, নিতান্ত ভদ্রতার খাতিরে সাদ চুপ করে ছিলেন, নিজে না গিয়ে উসাইদকে পাঠালেন।

অন্যদিকে, আসআদ খাযরাজ গোত্রের হলেও তিনি ছিলেন আওসের নেতার মামাতো ভাই, সে সুবাদে তিনিই ছিলেন মুসআবকে মেহমানদারি করার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি। সাদের বিরক্তি দেখে উসাইদ ইবন খুযাইর বর্শা হাতে নিয়ে মুসআব ও আসআদের সাথে কথা বলার জন্য তাদের দিকে অগ্রসর হলেন। আসআদ মুসআবকে জানিয়ে দিলেন, 'যে লোকটা আসছে সে হলো উসাইদ, সে তার লোকদের নেতা। তাঁকে যতসম্ভব ইসলামের দিকে টানার চেষ্টা করো, সে যদি মুসলিম হয় তাহলে অনেকেই তার দেখাদেখি মুসলিম হবে।' মুসআব ইবন উমাইর বললেন, 'সে শুনতে চাইলে আমি অবশ্যই তাঁকে বুঝানোর চেষ্টা করবো।'

ইবন খুযাইর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে খুব রুক্ষভাবে কথা বলতে শুরু করলেন, 'দেখ, আমরা তোমাদের এই এলাকার আশেপাশে দেখতে চাই না। আমরা চাই না তোমরা এখানকার দুর্বল ও অজ্ঞ লোকদের বিভ্রান্ত কর। নিজেদের জীবনের মায়া থাকে তো এখান থেকে চলে যাও, না হলে এই হলো আমার বর্ণনা।' যখন তিনি তাদেরকে এভাবে হুমকি দিচ্ছিলেন, তখন হালাকায় অংশগ্রহণকারী নও মুসলিমদের একজন বলে উঠল, 'ওরা নয়, বরং তুমিই আমাদেরকে বিভ্রান্ত করছ...' এই বলে সে উসাইদের সাথে তর্ক শুরু করে দিল।

পরিস্থিতি সামাল দিতে মুসআব শান্ত কণ্ঠে বললেন, 'আমরা যা নিয়ে কথা বলছিলাম তা কি আপনি একটু শুনে দেখবেন? যদি আপনার ভালো লাগে তাহলে আপনি তা গ্রহণ করবেন আর ভালো না লাগলে অগ্রাহ্য করবেন।' উসাইদ বললেন, 'ঠিক আছে শুনবো।' তিনি সেখানে বসলেন। মুসআব তাঁকে কুরআনের কিছু আয়াত পাঠ করে শোনালেন, ইসলামের দাওয়াত দিলেন, ইসলামের ব্যাপারে কথা বললেন। মুসআবের কথায় উসাইদের কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা বর্ণনা করেছেন আসআদ, 'উসাইদ মুখে কিছুই বললো না, তাঁর চেহারাই বলে দিচ্ছিল ইসলাম তাঁর হৃদয় দখল করে নিয়েছে, তাঁর মুখে ছিল প্রছন্ন এক আভা – শান্ত, প্রসন্ন একটা ছাপ।'

মুসআবের বক্তব্য হলে উসাইদ তাঁকে বললেন, 'এ দ্বীনে প্রবেশ করতে হলে কী করতে হবে?' মুসআব তাঁকে বললেন, 'আপনি পবিত্র হয়ে আসুন, তারপর সালাত আদায় করুন।' পবিত্র হয়ে উসাইদ সালাত আদায় করলেন, এরপর মুসআবকে বললেন, 'আমি আপনার কাছে এমন এক ব্যক্তিকে পাঠাচ্ছি যিনি মুসলিম হলে তাঁর দলের সব লোকেরাও ইসলাম গ্রহণ করে ফেলবে।' এই বলে উসাইদ গেলেন সাদ ইবন মুয়াযের কাছে। উসাইদকে ফিরে আসতে দেখে সাদ বললেন, 'আল্লাহর কসম! যে চেহারা নিয়ে সে গিয়েছিল, ভিন্ন চেহারা নিয়ে ফিরে এসেছে।' এটিকে বলে ফিরাসা, ফিরাসা হলো কারো চেহারা দেখে তাঁর সম্পর্কে বলে দেওয়া, আরবদের মধ্যে এই রীতি ছিল।

সাদ ইবন মুয়ায জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হয়েছে?' উসাইদ বললেন, 'সব ঠিকঠাক আছে, তুমি চিন্তা কোরো না। আসলে একটু সমস্যা হয়েছিল, বনু হারিস (আল খাযরাজের একটি শাখা) যখন জানতে পারল যে আসআদ তোমার ভাই, তখন তারা শত্রুতাবশত তাকে খুন করতে চেয়েছিল।' পুরো ঘটনাটি উসাইদ বানিয়ে বললেন সাদ ইবন মুয়াযকে মুসআব ইবন উমাইরের কাছে পাঠানোর জন্য। উসাইদের মুখে এই কাহিনি কথা শুনে সাদ খুব রেগে গেলেন। তিনি বললেন, 'কী! তারা আমার ভাইকে খুন করতে চায়!' তিনি বর্শা নিয়ে ভাই আসআদকে রক্ষা করার জন্য চলে গেলেন এবং যাওয়ার সময় উসাইদকে বলে গেলেন, 'ধুর! তুমি আমার কোনো কাজেই আসলে না।' সাদকে আসতে দেখে আসআদ বললেন, 'মুসআব, যাকে আসতে দেখছ সে আওসের নেতা। তাকেও যতোটা পারো ইসলামের দিকে টানার চেষ্টা করো।' এদিকে সাদ ইবন মুয়ায তাদের দেখেই বুঝতে পারলেন যে উসাইদ ইচ্ছে করে গল্প ফেঁদেছেন, কারণ আসআদ বা মুসআব কাউকেই ভীতসন্ত্রস্ত দেখাচ্ছিল না।

আসআদকে উদ্দেশ্য করে সাদ ইবন মুয়ায বললেন, 'আসআদ! তুমি কেন আমার সাথে এরকম করছ? এই লোককে কেন আমার এলাকায় নিয়ে এসেছ? তুমি আমার সাথে তোমার সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে এসব করছো, তুমি কি এই অশিক্ষিত, সহজসরল, অসহায় লোকগুলোকে বিপথে নিয়ে যেতে চাও?'

মুসআব তখন বললেন, 'কিছু মনে না করলে আমি কিছু কথা বলতে চাই, আপনি কি তা শুনবেন? যদি আপনার ভাল লাগে তাহলে আপনি তা গ্রহণ করবেন আর ভাল না লাগলে মানবেন না।' সাদ ইবন মুয়ায এ কথায় রাজি হলেন এবং তাঁর কথা শোনার জন্য বসলেন। এখানে একটি ব্যাপার লক্ষ্যণীয় যে, মদীনাবাসীরা বেশ খোলা মনের ছিল, মক্কার লোকরা যেমন শত্রুভাবাপন্ন ছিল, মদীনাবাসীরা তেমন ছিল না। তারা অন্যের কথা শোনার ব্যাপারে আগ্রহী ছিল। তাই মুসআবের কথা শোনার ব্যাপারে সাদ ইবন মুয়ায রাজি হলেন। মুসআব তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন, সাদ ইবন মুয়ায ইসলাম গ্রহণ করলেন, ইসলাম লাভ করলো দূর্গের চাবি।

মুসলিম হওয়ার পর সাদ ইবন মুয়ায প্রথমে তাঁর লোকদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আমার ব্যাপারে তোমাদের ধারণা কী?' তারা বললো, 'আপনি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী এবং আমাদের নেতা।' তারপর সাদ ইবন মুয়ায বললেন, 'তাহলে তোমরা মুসলিম না হওয়া পর্যন্ত কেউ আমার সাথে কথা বলবে না আর আমিও তোমাদের সাথে কথা বলবো না।'

এই কথার পর সন্ধ্যার মধ্যেই বনু আসআদ গোত্রের প্রতিটি ঘরের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে, আল আওসের এক বড় অংশের মাঝে ইসলামের আলো প্রবেশ করে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px