📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 তায়েফের ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ

📄 তায়েফের ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ


১. রাসূলুল্লাহকে লক্ষ করে যখন তাইফের লোকেরা পাথর ছুঁড়ছিল তখন তাঁকে পাথরের আঘাত থেকে রক্ষা করছিলেন যাইদ ইবন হারিসা। নিজের শরীরকে তিনি বর্ম হিসেবে ব্যবহার করছিলেন। উহুদের যুদ্ধেও একই রকম ঘটনা দেখা যায়। সেই যুদ্ধে সাহাবীরা রাসূলুল্লাহকে পাথরের আঘাত নয়, বরং তীরের আঘাত থেকে বাঁচানোর জন্য নিজেদের পিঠ পেতে দিয়েছিলেন। এই হলো আল্লাহর রাসূলের জন্য সাহাবীদের ত্যাগ স্বীকারের দৃষ্টান্ত। আজকে রাসূলুল্লাহ নেই, নিজেদের শরীর আর রক্ত দিয়ে তাঁকে বাঁচানোর সুযোগ হয়তো নেই, কিন্তু তাঁর অবমাননার বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ানো, তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচারগুলোর জবাব দেওয়ার সুযোগ এখনো আছে। যে দ্বীন নিয়ে আগমন করেছেন, সেই দ্বীনকে রক্ষা করা, সেই দ্বীনের প্রচার ও শিক্ষাদানের মাধ্যমে তাঁর সম্মানে নিজেদেরকে বিলিয়ে দেওয়ার সুযোগ এখনো খোলা আছে। বিখ্যাত তাবেঈ আবু মুসলিম আল খাওলানি বলেছেন, 'সাহাবীরা কি মনে করেছেন রাসূলুল্লাহ শুধু তাদেরই, আর কারো নয়? রাসূলুল্লাহর ওপর অধিকার কেবল তাদেরই, আর কারো নয়? না, বরং আমরা তাদের সাথে পাল্লা দেব। রাসূলুল্লাহর ওপর আমাদেরও অধিকার রয়েছে আর আমরা তা আদায় করে নিতে চাই।'

রাসূলুল্লাহর জন্য যাইদ বা তালহা যা করেছিলেন আজ মুসলিমরা হয়তো সেইরকম ত্যাগ স্বীকার করতে পারবে না কিন্তু তাই বলে বসে থাকলে হবে না, অন্তত চেষ্টা করতে হবে। মুহাম্মাদের জীবন সম্পর্কে জানতে হবে এবং তা অন্যান্যদেরকেও জানাতে হবে, যাতে সবাই তাঁকে ভালোবাসে এবং তাঁর অনুসরণে আগ্রহী হয়।

২. রাসূলুল্লাহ যখন তাইফবাসীর কাছে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন তখন কেউ তাঁর ডাকে সাড়া দেয়নি, উল্টো তাঁকে বের করে দেয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ একটি কথা বলে গেছেন, 'ভালো কাজ করে যাও, কেননা তুমি কখনোই জানো না তোমার কাজের ফলাফল কী' – অর্থাৎ, একটি ভালো কাজ কারো চোখে হয়তো তুচ্ছ লাগতে পারে কিন্তু সেই কাজের ফলাফল হতে পারে অনেক বড় কিছু, আর সেটা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না, তাই কোনো সৎকাজকেই তুচ্ছ করা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহকে তাইফবাসী প্রত্যাখ্যান করেছিল, তা দেখে তিনি হয়তোবা ভেবে থাকতে পারেন যে তাঁর এই দাওয়াত লোকেদের ওপর কোনো প্রভাব বিস্তার করেনি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ যখন সেখানে দাওয়াহ দিচ্ছিলেন সেখানে খালিদ আল উদওয়ান নামে একটি ছোট্ট ছেলে ছিল, সে ছিল খাতীফ বংশের সন্তান। সেই খালিদ বহু দিন পর নিজের কাহিনী বর্ণনা করেছেন, 'তাইফের মেলা চত্বরে রাসূলুল্লাহ লোকদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন। আমি সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলাম এবং তাঁর কথা শুনছিলাম। আমি তাঁকে সূরা আত-তারিক তিলাওয়াত করতে শুনলাম। আমি তখনই এই সূরাটি মুখস্থ করে ফেলেছিলাম যদিও আমি তখন কাফির ছিলাম। পরবর্তীতে আমি ইসলাম গ্রহণ করি।' যেখানে উপস্থিত বয়স্ক লোকেরা রাসূলুল্লাহর কথায় কান দিচ্ছিল না সেখানে এক ছোট বাচ্চা তাঁর তিলাওয়াত শুনে শুনেই একটি সূরা মুখস্থ করে ফেলে! আর কয়েক বছর পরেই রাসূলুল্লাহ তাঁর আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ প্রচেষ্টার ফল দেখতে পেয়েছিলেন।

৩. রাসূলুল্লাহ ও খ্রিস্টান ক্রীতদাস আদ্দাসের মধ্যকার ঘটনাটি পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। একজন মুসলিমের সাদাসিধে একটি আমলও যে দাওয়াতের আমলে রূপান্তরিত হতে পারে- এই ঘটনা তার একটি চমৎকার উদাহরণ। রাসূলুল্লাহ খাওয়া শুরু করেছিলেন 'বিসমিল্লাহ' বলে, আর এই "বিসমিল্লাহ” শব্দটিই আদ্দাসের ইসলাম গ্রহণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আদ্দাস আগে এরকম কিছু শুনেনি, তাই সে রাসূলুল্লাহকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলো আর এই কথার সূত্র ধরেই রাসূলুল্লাহর সাথে তার আলাপচারিতা শুরু হয়। তাঁর কাছ থেকে আদ্দাস এমন কিছু জানতে পেরেছিলেন যা তাঁকে রাসূলুল্লাহর নবুওয়াতে বিশ্বাস স্থাপনের দিকে ধাবিত করে। সুতরাং ছোট ছোট কাজও মানুষকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করে। ফলে সে ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত অনেকেই এভাবে ইসলামের দরজা খুলে দ্বীনে প্রবেশ করে। সাহাবীদের কথাবার্তা, ব্যবহার ও চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করতো।

ফন্ট সাইজ
15px
17px