📄 রাসূলুল্লাহর ﷽ বর্ণনায় মিরাজের রাত
'আমি তখন আল হিজরে (কাবার নিকটে অর্ধগোলাকার একটি জায়গা), আমার কাছে আসলেন একজন ফেরেশতা। তিনি আমার বক্ষ উন্মুক্ত করলেন, তারপর হৃৎপিণ্ডকে বের করে এনে ঈমানে পরিপূর্ণ একটি স্বর্ণের পাত্রে রাখলেন। সেটিকে এই পাত্রে ধুয়ে আমার বক্ষে বসিয়ে দেওয়া হলো। এরপর আমার সামনে এমন একটি জন্তু (বুরাক) উপস্থিত করা হলো যা আকৃতিতে ঘোড়ার চেয়ে ছোটো কিন্তু গাধার চেয়ে বড়। এই জন্তুটি যতদূর সম্ভব দেখা যায় ততদূর পর্যন্ত এক লাফে চলতো।'
আল্লাহর রাসূল এই জন্তুটির অস্বাভাবিক দ্রুততা সম্পর্কে একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই জন্তুর দু'চোখ যতদূর যায়, সেই পরিমাণ দূরত্ব সে এক ধাপে অতিক্রম করে। অর্থাৎ এটি প্রচণ্ড দ্রুতগতিসম্পন্ন জন্তু ছিল। তার ওপর চড়লে মনে হবে পুরো পৃথিবীটা যেন গুটিয়ে ফেলা হচ্ছে।
'জিবরীল আমাকে সেই জন্তুর ওপর উঠতে বললেন। এরপর তিনি আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন। তিনি আমাকে জেরুসালেম নিয়ে গেলেন। সেখানে পৌঁছে আমি আমার বাহনটিকে মসজিদের গেটে বেঁধে ভিতরে প্রবেশ করলাম। তারপর সেখানে দুই রাকাত সালাত আদায় করলাম।'
সেখানে ওইসময় অন্যান্য নবী-রাসূলগণও সালাত আদায় করেছিলেন এবং এই জামাতের নেতৃত্বে ছিলেন রাসূলুল্লাহ, তিনি ইমামের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'এরপর জিবরীল আমাকে আসমানের দিকে নিয়ে গেলেন। আমরা সবচেয়ে নিচের আসমানের দরজায় পৌঁছলাম, জিবরীল দরজায় টোকা দিলেন। দরজার প্রহরীরা জিবরীলকে জিজ্ঞাসা করলো,
- আপনি কে?
- আমি জিবরীল।
- আপনার সাথে কে আছেন?
- মুহাম্মাদ।
- তাঁকে কি আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে?
- হ্যাঁ।
- তাঁকে স্বাগতম, তাঁর আগমনে আমরা আনন্দিত।'
প্রহরীরা আনন্দের সাথে গেট খুলে দিল। এখানে লক্ষণীয়, অনুমতি ছাড়া কেউ সেখানে ঢুকতে পারে না, এমনকি রাসূলুল্লাহও পারেননি। গেট খুলে দেওয়ার পর রাসূলুল্লাহ ভেতরে প্রবেশ করলেন।
'আমি ভেতরে প্রবেশ করে পিতা আদমকে দেখতে পেলাম। জিবরীল তাঁর সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। জিবরীল বললেন, ইনি আপনার পিতা আদম, তাঁকে সালাম দিন। আমি আসসালামু আলাইকুম বললাম। তিনি আমাকে ওয়া আলাইকুসসালাম বললেন। এরপর আদম বললেন, আমার পবিত্র পুত্রকে স্বাগতম। পবিত্র রাসূলকে স্বাগতম।'
আদম দেখা পেলেন তাঁর কোটি কোটি সন্তানদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ পুত্র মুহাম্মাদের। হাজার বছর পরে সর্বশ্রেষ্ঠ পুত্রের সাথে দেখা করার সুযোগ পাওয়া ছিল পিতা আদমের জন্য এক মহা আনন্দের ঘটনা। রাসূলুল্লাহর জন্যও সেই মুহূর্তটি অবশ্যই একটি অভূতপূর্ব আনন্দময় মুহূর্ত ছিল। কিন্তু তাদের আলাপচারিতার সময় ছিল বেশ অল্প, কেননা রাসূলুল্লাহর হাতে সময় ছিল কম, তাঁর জন্য আরো অনেক কিছু অপেক্ষা করছিল। এরপর জিবরীল রাসূলুল্লাহকে নিয়ে দ্বিতীয় আসমানের দিকে রওনা দেন। তাঁরা সেখানকার দরজায় পৌঁছলে আগের মতো প্রহরীরা তাদের পরিচয় জানতে চাইলো। পরিচয়পর্ব শেষে তারা দরজা খুলে দিল। নবীজি বলেন, 'আমি ভিতরে প্রবেশ করে ঈসা ও ইয়াহইয়ার দেখা পেলাম। তাঁরা দুইজন ছিলেন আত্মীয়।' রাসূলুল্লাহ বর্ণনা করেন, 'আমি তাদের সাথে সালাম বিনিময় করলাম।' অর্থাৎ নবীরা একে অপরকে 'আসসালামু আলাইকুম' বলে অভিবাদন জানাতেন।
'এরপর তৃতীয় আসমানের দিকে রওনা দিলাম। সেখানে পৌঁছে দেখা হলো ইউসুফের সাথে।' ইউসুফ সম্পর্কে রাসূল বলেছেন, 'তাঁকে দুনিয়ার সৌন্দর্যের অর্ধেক দেওয়া হয়েছিল।' চতুর্থ আসমানে গিয়ে রাসূলুল্লাহ দেখা করলেন নবী ইদ্রিসের সাথে। নবী করীম বর্ণনা করেন, 'আমরা এরপর পঞ্চম আসমানে গেলাম। সেখানে হারুনের সাথে দেখা হলো। মূসা ছিলেন ষষ্ঠ আসমানে। তাঁর সাথেও আমার সাক্ষাৎ হয়।'
রাসূলুল্লাহকে দেখে সালাম বিনিময় ও স্বাগত জানানোর পর মূসা কাঁদতে শুরু করলেন। কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, 'এক যুবককে রিসালাতের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমার পরে, কিন্তু জান্নাতে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা আমার চেয়ে বেশি হবে।' মুহাম্মাদের আবির্ভাবের আগে অন্য যে কোনো নবীর চেয়ে মূসার অনুসারীর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। বনী ইসরাইল ছিল সংখ্যার দিক থেকে অন্য সকল মুসলিম জাতি অপেক্ষা সর্ববৃহৎ। কিন্তু মুহাম্মাদের উম্মাতের সংখ্যা বনী ইসরাইল থেকেও বেশি। একারণেই মূসা কাঁদছিলেন। মূসা ও মুহাম্মাদের মধ্যে উম্মাতের সংখ্যা নিয়ে প্রতিযোগিতা বিদ্যমান ছিল কিন্তু এ প্রতিযোগিতার মধ্যে কোনোরকম ঈর্ষাবোধ বা হিংসা ছিল না। তাদের মধ্যে হৃদ্যতাপূর্ণ প্রতিযোগিতা ছিল, মূসা ও মুহাম্মাদের পরবর্তী কথোপকথন থেকে তা স্পষ্ট হয়।
রাসূলুল্লাহ বললেন, 'এরপর আমাকে নেওয়া হলো সপ্তম আসমানে। সেখানে আমি আমার পিতা ইবরাহীমের সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাঁর সাথে সালাম বিনিময় করলাম। তারপর আমাকে দেখানো হলো বাইতুল-মা'মুর।' অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে যে ইবরাহীম বাইতুল-মা'মুরে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। 'বাইতুল-মা'মুর' এর নাম কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বাইতুল-মা'মুরের শপথ নিয়েছেন। কাবাঘর যেমন আল্লাহ তাআলা ইবাদত করার জন্য দুনিয়ার বুকে প্রতিষ্ঠিত প্রথম ঘর, বাইতুল-মা'মুরও তেমন। তবে সেখানে ইবাদাত করে ফেরেশতারা। মুসলিমরা যেমন কাবার চারপাশে তাওয়াফ করে তেমনি ফেরেশতারা বাইতুল-মা'মুরে আল্লাহর ইবাদত করে। রাসূলুল্লাহ বলেছেন যে, প্রতিদিন বাইতুল-মা'মুরে সত্তর হাজার ফেরেশতা যায়। তারা আর কোনোদিনই সেখানে ফিরে আসে না।
বাইতুল-মা'মুরের ফেরেশতাদের সংখ্যার কাছে দুনিয়ার মানুষের সংখ্যা কিছুই না। মহাবিশ্বের সর্বত্র, চার আঙুল পরপর ফেরেশতারা ছড়িয়ে আছে। তারা রুকু অথবা সিজদায় আল্লাহর ইবাদাত করছে। এই সুবিশাল সৃষ্টির কাছে মানবজাতির সংখ্যা অতি নগণ্য।
ইবরাহীমের বাইতুল-মামুরে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নেওয়ার ঘটনাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তিনিই দুনিয়াতে কাবা নির্মাণ করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা যখন তাঁকে দুনিয়া থেকে নিয়ে গেলেন তখন তাঁকে ফেরেশতাদের ঘর বাইতুল-মা'মুরে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।
এরপর রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'আমি সেখানে সিদরাতুল মুনতাহা দেখেছি। আরো কিছু দূর গিয়ে আমি সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছলাম।' সিদরাতুল মুনতাহা একটি গাছ। এটি আসমানের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। এরপরেই শুরু রয়েছে আখিরাতের জীবন, জান্নাত, আল্লাহ তাআলার 'আরশ। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার সৃষ্ট এই বিশ্বের শেষ প্রান্ত হলো সিদরাতুল মুনতাহা। একটার পর একটা করে মোট সাত আসমান, সবশেষে রয়েছে সিদরাতুল মুনতাহা। এরপরেই শুরু হয়েছে অন্য একটি জগৎ, আখিরাতের আবাস।
রাসূলুল্লাহ মুনতাহায় পৌঁছে দেখলেন এর নিচ থেকে চারটি নদী প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি জিবরীলকে এ নদীগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। জিবরীল বললেন, 'দুইটি নদী দৃশ্যমান আর বাকি দুইটি নদী লুকোনো। যে দুইটি নদী দেখা যায় সেগুলো হলো নীলনদ ও ইউফ্রেটিস। আর লুকোনো নদীগুলো জান্নাতের নদী।' দুনিয়ার নীলনদ ও ইউফ্রেটিস এতটাই পবিত্র যে এই দুইটার সমতুল্য নদী আসমানে রয়েছে। আর এই গাছটি জান্নাতের এত কাছে যে জান্নাতের দুইটি নদী এর নিচ দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে।
এই সাত আসমানের আকার সম্পর্কে বলা আছে-প্রথম আসমান দ্বিতীয় আসমানের তুলনায় মরুভূমিতে পড়ে থাকা একটি ছোট্ট আংটির মতো, দ্বিতীয় আসমান তৃতীয় আসমানের তুলনায় মরুভূমিতে পড়ে থাকা আংটির মতো এবং এভাবে পরেরগুলোও। আর সপ্তম আসমান কুরসির তুলনায় মরুভূমিতে একটি ছোট্ট আংটির মতো।
সর্বনিম্ন আসমানের তুলনায় কুরসি কতটা বিশাল তার কোনো ধারণাই মানুষের নেই। আমরা যে দুনিয়ায় আছি তা সর্বনিম্ন আসমানের মধ্যে অবস্থিত, কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "আমরা সর্বনিম্ন আসমানকে নক্ষত্ররাজি দিয়ে সজ্জিত করেছি”, অর্থাৎ সমস্ত নক্ষত্ররাজি সর্বনিম্ন আসমানে অবস্থিত, আর সমস্ত নক্ষত্ররাজির সর্বশেষ সীমানায় মানুষ এখনো পৌঁছতে পারেনি। আর রাসূলুল্লাহ এই সুবিশাল সৃষ্টি দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। এটি ছিল অসাধারণ এক সফর। সিদরাতুল মুনতাহা অতিক্রম করে সামনে যাওয়ার পর তিনি আরো ওপরে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলার সাথে সাক্ষাৎ করেন। এটাই ছিল তাঁর ভ্রমণের চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে প্রতিদিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার নির্দেশ দিলেন। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'আমি ফিরে আসছিলাম, পথিমধ্যে মূসার সাথে দেখা। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ আপনাকে কী বলেছেন? আমি বললাম, আল্লাহ তাআলা আমার উম্মাতকে প্রতিদিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার হুকুম দিয়েছেন। মুসা বললেন, আপনার উম্মত তা পালন করতে পারবে না। আমি আপনার আগে অনেক লোককে দেখেছি এবং আমার কওম বনী ইসরাইলের সাথে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি। মানুষের ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা আছে। আপনি আল্লাহ তাআলার কাছে ফিরে যান, সালাতের সংখ্যা কমিয়ে দিতে বলুন যাতে আপনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন।' রাসূলুল্লাহ তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ রাসূলের কথা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলার কাছে ফিরে গিয়ে বললেন, 'সালাতের সংখ্যা কিছু কমিয়ে দিন।' আল্লাহ তাআলা সালাতের সংখ্যা দশ ওয়াক্ত কমিয়ে দিলেন। মুহাম্মাদ নতুন নির্দেশ নিয়ে নিচে নেমে আসছিলেন। তাঁর সাথে আবার মুসার দেখা হলো। মূসা জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হয়েছে?', রাসূলুল্লাহ তাঁকে খুলে বললেন। তখন মূসা বললেন, 'আবার ফিরে যান। সালাতের সংখ্যা আরও কিছু কমিয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলাকে বলুন।'
রাসূলুল্লাহ আবার আল্লাহ তাআলার কাছে গেলেন, আরও দশ ওয়াক্ত কমিয়ে দেওয়া হলো। ফিরতি পথে মূসা তাঁকে আবার জিজ্ঞেস করলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে জানালেন যে, আল্লাহ তাআলা সালাতের সংখ্যা কমিয়ে তিরিশ ওয়াক্তের নির্দেশ দিয়েছেন। মূসা সালাতের সংখ্যা আরও কমিয়ে আনার জন্য ফিরে যেতে বললেন। মুহাম্মাদ আবারও ফিরে গেলেন এবং আরও দশ কমিয়ে দেওয়া হলো। মূসা একথা শুনে আবারও ফিরে যেতে বললেন। এবার কমিয়ে দশ করা হলো। মূসার উপদেশ অনুযায়ী মুহাম্মাদ আবার গেলেন। এবার কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নির্ধারণ করা হলো। তিনি ফিরে এসে মূসাকে তা জানালেন। মূসা বললেন, 'মুহাম্মাদ, মানুষ সম্পর্কে আমার অনেক অভিজ্ঞতা আছে, আমি বনী ইসরাইলের সাথে ছিলাম। আপনার উম্মাতের জন্য এটাও কষ্টকর হবে। আপনি আবার ফিরে যান এবং আরও কমিয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলাকে অনুরোধ করুন।' মুহাম্মাদ বললেন, 'আবার অনুরোধ করতে আমি লজ্জাবোধ করছি। আমি আর পারব না।'
মুহাম্মাদ ও মূসার ব্যক্তিত্বের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্যগুলো আছে। মূসা সালাতের সংখ্যা কমানোর জন্য আল্লাহ তাআলাকে বারবার অনুরোধ করেছেন। মূসা-ই হচ্ছেন সেই নবী যিনি আল্লাহ তাআলাকে বলেছিলেন যে তিনি আল্লাহকে দেখতে চান। অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁর সাথে কথা বলেছিলেন যার সুযোগ অন্য নবীরা পাননি। তারপরও মূসা শুধু কথা বলেই ক্ষান্ত হলেন না, আল্লাহর সাথে দেখাও করতে চাইলেন! এর ফলে কী ঘটেছিল তা কুরআনে আছে, তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। আবার তিনিই মৃত্যুর ফেরেশতাকে ঘুষি মেরেছিলেন। এতে সেই ফেরেশতার চোখ ভালোভাবেই আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। আল্লাহ তাআলার প্রেরিত সমস্ত নবী-রাসূলগণের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একই ছিল। কিন্তু তাদের একেকজনের ব্যক্তিত্ব একেকরকম ছিল। এদিকে, মুহাম্মাদ সালাতের সংখ্যা কমানোর জন্য যেতে লজ্জা পাচ্ছিলেন। এসময় তিনি একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন, 'এটাই আপনার উম্মাতের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে হবে, তবে এর জন্য পঞ্চাশ ওয়াক্তের পুরস্কার দেওয়া হবে।'
সেই একই রাতে রাসূলুল্লাহ দুনিয়াতে ফিরে আসেন। এরপর তিনি উম্ম আয়মানের কাছে গিয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। তিনি বলেন, 'আমি রাতে জেরুসালেম গিয়ে ফিরে এসেছি।' উম্ম আয়মান বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, এ কথা আপনি কাউকে বলবেন না। কেউ আপনার কথা বিশ্বাস করবে না। সবাই বলবে যে এটা অবাস্তব ঘটনা।' উম্ম আয়মান রাসূলুল্লাহকে ঠিকই বিশ্বাস করেছিলেন, কিন্তু তিনি আশঙ্কা করছিলেন অন্য লোকেরা এই কথায় বিশ্বাস নাও করতে পারে। আর কুরাইশ মুশরিকরা তো এ কথা নির্ঘাৎ উড়িয়ে দিবে। যেখানে জেরুসালেমে যেতে প্রায় এক মাস সময় লাগে সেখানে রাসূলুল্লাহ এক রাতের মধ্যেই সে জায়গায় গিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, বরং ওই এক রাতেই সেখান থেকে মক্কায় ফিরে এসেছেন এবং এরই মধ্যে সাত আসমান ঘুরে দেখেছেন। তাই উম্ম আয়মান তাঁকে এ ঘটনা সবাইকে বলতে মানা করেছিলেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ বললেন, 'না, আমি এ ঘটনা সবাইকে জানাবো। লোকেরা যা-ই বলুক না কেন আমি সত্য ঘটনা প্রচার করতে পিছপা হবো না। এটা আমার ওপর অর্পিত দায়িত্বের একটি অংশ। আমার দায়িত্ব হচ্ছে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া।'
এ বিশাল ঘটনার তাৎপর্য ও এই ঘটনা নিয়ে লোকেদের প্রতিক্রিয়া সামলে নেওয়া কতটা কঠিন হবে সে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর ধারণা ছিল, তিনি জানতেন বিষয়টা সহজ হবে না। তিনি বেশ চুপচাপ ও চিন্তিত ছিলেন। কয়েকজনকে এ ঘটনাটি জানালেন। এক পর্যায়ে তা আবু জাহেলের কাছে পৌঁছে গেল। রাসূলুল্লাহ তখন মসজিদে, লোকজন কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা নিয়ে তিনি বেশ উদ্বিগ্ন। আবু জাহেল তাঁর কাছে এসে বললো,
- মুহাম্মাদ, কোনো নতুন সংবাদ আছে নাকি?
- হ্যাঁ, আছে।
- কী সেই খবর?
- আমি গত রাতে জেরুসালেম গিয়ে আবার সেই রাতেই ফিরে এসেছি।
- জেরুসালেম?
- হ্যাঁ, জেরুসালেম।
- মুহাম্মাদ, আমি যদি এখনই তোমার লোকদের এখানে ডেকে আনি তাহলে কি তুমি তাদের সামনে ঠিক এ কথাটাই বলতে পারবে যা আমাকে এইমাত্র বলেছো?
- হ্যাঁ, অবশ্যই পারবো।'
আবু জাহেল বেশ খুশি মনে কুরাইশদের ডাকতে লাগলো, এটা ছিল তার জন্য মুহাম্মাদকে পাগল প্রমাণ করার 'সুবর্ণ সুযোগ', সে সবাইকে ডাকলো, 'হে কুরাইশের লোকেরা, এদিকে এসো, শুনে যাও।' সবাই উপস্থিত হলে সে রাসূলুল্লাহকে বললো, 'হে মুহাম্মাদ, তুমি কিছুক্ষণ আগে আমাকে যা বলেছো তা তোমার লোকদেরকে শুনাও দেখি।' রাসূলুল্লাহ কোনোরকম দ্বিধা-দ্বন্দু বা অস্বস্তি ছাড়াই তাদেরকে বললেন, 'আমি গতরাতে জেরুসালেম গিয়ে ফিরে এসেছি।' উপস্থিত লোকেরা এ কথা শুনে হাসাহাসি করতে লাগলো, শিস বাজিয়ে, হাততালি দিয়ে অবজ্ঞা করতে লাগলো। এ ঘটনা তাদের জন্য নতুন এক 'বিনোদন' এর জন্ম দিল।
পরিস্থিতি খুব অস্বস্তিকর হয়ে উঠলো, চারপাশের মানুষেরা এ ঘটনা নিয়ে মজা করছে, হাসিঠাট্টা করছে, হাততালি দিচ্ছে। সেখানে তখন এমন কিছু লোক ছিল যারা নিয়মিত জেরুসালেমে যেতো। তারা রাসূলুল্লাহকে মসজিদের বর্ণনা দিতে বললো, জেরুসালেমের বর্ণনা দিতে বললো। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'আমি জেরুসালেমের বর্ণনা দেওয়া শুরু করলাম এবং একসময় আমি আটকে গেলাম।' রাসূলুল্লাহ সেখানে খুব বেশি সময় কাটাতে পারেননি। তাই তিনি ওই জায়গার খুঁটিনাটি বর্ণনা মনে করতে পারছিলেন না।
এরপর রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'তখন আল্লাহ তাআলা আমাকে জেরুসালেম দেখালেন এবং আমি এর বিস্তারিত বর্ণনা তাদেরকে শোনাতে লাগলাম, প্রতিটা পাথরের, প্রতিটা ইটের।' তখন লোকেরা অবাক হয়ে গেল, তারা স্বীকার করতে বাধ্য হলো যে, তিনি একেবারে নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন। তবে ইবন ইসহাকের আরেকটি বর্ণনায় অন্য একটি জিনিসও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যখন রাসূলুল্লাহ মক্কায় ফিরে আসছিলেন তখন তিনি কুরাইশদের একটি কাফেলা দেখতে পান। সেই কাফেলাটি তাদের একটি উট হারিয়ে ফেলেছিল। রাসূলুল্লাহ ভ্রমণকালে উপরে ছিলেন, তাই তিনি তাদের হারানো উটটি দেখতে পেয়ে তাদেরকে বলেছিলেন, 'তোমাদের হারানো উটটি এই জায়গাতে আছে।' কাফেলার লোকেরা বুঝতে পারছিল না যে এই আওয়াজ কোথা থেকে আসছে। এরপর তিনি নীচে নেমে তাদের পানির পাত্র থেকে পানি খেয়েছিলেন। এই কাফেলার বর্ণনা তাঁর মনে ছিল।
তাই রাসূলুল্লাহ প্রমাণস্বরূপ তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলেন, 'তোমাদের অমুক কাফেলাটি তমুক স্থানে আছে, তারা তাদের উট হারিয়ে ফেলেছিল। আমি তাদের পাত্র থেকে পানি পান করেছিলাম। কাফেলাটির সামনে একটি উট ছিল।' এরপর তিনি সেই উটের বর্ণনা দিলেন এবং উটের ওপর কী কী ছিল তাও বলে দিলেন। রাসূলুল্লাহর দেওয়া তথ্য যাচাই করার জন্য তারা তখনই কাফেলার কাছে কিছু লোক পাঠালো। এটি তখনো মক্কার বাইরে ছিল। পরে তারা মিলিয়ে দেখলো যে রাসূলুল্লাহ যা যা বলেছেন তার সবই সত্য। কাফেলার লোকেরা উট হারিয়ে ফেলেছিল এবং আকাশ হতে আগত একটি আওয়াজ শুনে তারা তা খুঁজে পেয়েছিল। এমনকি তাদের কাছে যে খাওয়ার পানি ছিল তার পরিমাণও কিছু কমে গিয়েছিল। এতসব নিদর্শন আর প্রমাণ তাদের সামনে উপস্থিত করা সত্ত্বেও তারা এ ঘটনায় বিশ্বাস স্থাপন করেনি। মিরাজের ঘটনাটি হজম করা সবার জন্য এতটাই কষ্টকর ছিল যে, বেশ কিছু দুর্বল ঈমানের মুসলিম মুরতাদ হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা এই ধরনের মু'জিযা তাঁর নবীদেরকেই দেখিয়ে থাকেন।
টিকাঃ
41 আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২২৪।
📄 আল ইসরা ওয়াল মিরাজের ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়
১. রাসূলুল্লাহর বক্ষ বিদীর্ণ করার ঘটনা দুইবার ঘটেছে। যখন তিনি হালিমা সাদিয়ার কাছে ছিলেন তখন প্রথমবার এ ঘটনা ঘটে। সে সময় তাঁর বয়স একদম কম ছিল। আর দ্বিতীয়বার ঘটে আল ইসরা ওয়াল মিরাজের সময়। এখানে ইসরা মানে হলো রাতের ভ্রমণ আর মিরাজ অর্থ আরোহণ করা।
২. মূসার সাথে রাসূলুল্লাহর কথোপকথন বেশ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে। আল্লাহ তাআলা যখন পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার নির্দেশ দিলেন তখন মুহাম্মাদ তা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে মুসার সাথে তাঁর দেখা হলে তিনি তাঁকে বলেছেন, 'আপনার উম্মত তা পালন করতে পারবে না।' মূসা এ তাঁর দীর্ঘদিনের নবুওয়াতের অভিজ্ঞতা থেকে এ উপদেশটি দিয়েছিলেন। এটাই অভিজ্ঞতার মূল্য, তাত্ত্বিক জ্ঞানই সবকিছু নয়। অভিজ্ঞতারও প্রয়োজন আছে। মূসা রাসূলুল্লাহকে বলেছিলেন, 'মানুষের ব্যাপারে আমার অনেক অভিজ্ঞতা রয়েছে, আপনি নতুন। কিন্তু আমি আমার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছি বনী ইসরাইলের মতো এক কওমের সাথে। তাই বলছি আপনার উম্মাত এত সালাত আদায় করতে পারবে না। আপনি গিয়ে তা কমিয়ে আনুন।' মূসা তাঁর অভিজ্ঞতা থেকেই রাসূলুল্লাহকে এরকম উপদেশ দিয়েছিলেন। মূসার নিজ জীবন থেকে বিষয়টি আরো স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
যখন মূসা তাঁর চল্লিশ দিনের সাওম শেষে আল্লাহ তাআলার সাথে কথা বলতে গেলেন, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে জানালেন যে তাঁর অনুপস্থিতিতে বনী ইসরাইলীরা বাছুরের উপাসনা করছে। এই কথা শুনে তিনি খুব তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেননি। কিন্তু যখন তিনি নিজ চোখে এই দৃশ্য দেখলেন, তখন তিনি রাগে ফেটে পড়েন আর আল্লাহর কাছ থেকে সদ্য পাওয়া ফলকগুলো হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলেন। এর কারণ হলো, কোনো কিছু শোনা আর দেখার মধ্যে পার্থক্য আছে।
আল্লাহ তাআলা যখন নবীজিকে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নির্ধারণ করে দিলেন তখনও মূসা বললেন যে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করাও এই উম্মাতের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়বে। মূসা আসলে ঠিকই বলেছিলেন। বর্তমানে মুসলিমদের অধিকাংশই প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাতও ঠিক মতো আদায় করে না। অনেকে নিজের ইচ্ছানুযায়ী সালাত আদায় করে, অর্থাৎ কিছু আদায় করে আবার কিছু বাদ দেয়। আল্লাহ মূসার ওপর রহম করুন যিনি মুসলিম উম্মাহর জন্য সালাতকে সহজ করে দিয়েছেন। যদি প্রতিদিন পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা লাগত তবে তা কতই না কষ্টকর হতো! প্রকৃতপক্ষে নবী-রাসূলদের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা বিদ্যমান ছিল তাতে কোনোরকম হিংসা-বিদ্বেষ ছিল না, বরং তাঁরা একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। রাসূলুল্লাহকে দেখে মূসার কেঁদে ফেলার কারণ ছিল তিনি জানতেন রাসূলুল্লাহর অনুসারীর সংখ্যা তাঁর অনুসারী থেকে অনেক বেশি হবে, কিন্তু তারপরও তিনি রাসূলুল্লাহকে তাঁর উম্মাতের সুবিধার জন্য উপদেশ দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহর প্রতিও তাঁর সহানুভূতিমূলক মনোভাব ছিল। আল্লাহ তাআলার সকল নবী একে অপরকে ভালোবাসেন। তাদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা ছিল একে অপরকে ভালোবাসার প্রতিযোগিতা।
শেষ বিচারের দিনে বিভিন্ন নবী-রাসূলদের অনুসারীর সংখ্যা হবে বিভিন্ন রকম। কারো সাথে দশ জন অনুসারী থাকবে, আবার কারো সাথে পাঁচ জন, কারো সাথে মাত্র একজন, আবার কোনো নবী উপস্থিত হবেন একা। এমন নবী থাকবেন যিনি সারা জীবন ধরে মানুষকে দ্বীনের পথে আহ্বান করেছেন কিন্তু কেউই তাদের এই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। এরপর রাসূলুল্লাহ কিয়ামতের দিন এক বিশাল জনসমুদ্র দেখে ভাববেন এটা তাঁর উম্মত, কিন্তু সেটি হবে মূসার উম্মাত, রাসূলুল্লাহর উম্মতের সংখ্যা হবে আরো বেশি।
৩. আল ইসরা ওয়াল মিরাজের ঘটনা থেকে আরেকটি শিক্ষণীয় বিষয় হলো সালাতের গুরুত্ব। ইসলামের সকল ইবাদাতের আদেশ নাযিল হয়েছে দুনিয়ার বুকে, জিবরীলের মাধ্যমে। কিন্তু একমাত্র সালাতের হুকুম আল্লাহ তাআলা সরাসরি দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহর সাথে একান্ত সাক্ষাতে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে। মূসা যখন তুর পর্বতের ওপর আল্লাহ তাআলার সাথে সরাসরি কথা বলেছিলেন তখন আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাইলের জন্য সালাতের বিধান নির্ধারণ করে দেন, অর্থাৎ এক্ষেত্রেও আল্লাহ তাআলা সালাতের নির্দেশ তাঁর রাসূলকে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছিলেন।
"আমিই আল্লাহ আমি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। অতএব আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর।” (সূরা ত্ব-হা, ২০: ১৪)
আর ওই সময়েই মূসা রিসালাতের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। চল্লিশ বছর বয়সে রাসূল হওয়ার পরপরই মূসাকে সালাতের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। প্রথমে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও পরে সালাতের নির্দেশ। এতেই বুঝা যায় যে, সালাত মুসলিমদের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'মু'মিন ও কাফিরদের মধ্যে পার্থক্য হলো সালাত আদায় না করা।' এমনকি ঠিক সময়ে সালাত আদায় না করাও একটি গুনাহ।
"তাদের পর তাদের অপদার্থ বংশধরেরা এল। তারা সালাত নষ্ট করলো এবং কুপ্রবৃত্তির অনুবর্তী হলো। সুতরাং তারা অচিরেই পথভ্রষ্টতা প্রত্যক্ষ করবে।" (সূরা মারইয়াম, ১৯: ৫৮)
যারা সালাতকে অবহেলা করেছে অর্থাৎ সালাত আদায় করেনি আল্লাহ তাআলা তাদের জন্য জাহান্নামের ওয়াদা করেছেন। ইবন আব্বাস এই আয়াতের ব্যাপারে বলেছেন যে, এখানে ওইসব লোকদের কথা বলা হয়নি যারা কিনা সালাত একদমই আদায় করে না, বরং সেসব লোকদের কথা বলা হয়েছে যারা অর্ধেক সালাত আদায় করে। ইবন খাত্তাব বলেছেন যে, যদি কোনো ব্যক্তি ফরয সালাত ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেয় তবে সে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল, যদিও এ ব্যাপারে আলিমদের মধ্যে মতভেদ আছে। কিন্তু এই ব্যাপারে সবাই একমত যে সালাত ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এ বিধান থেকে কেউই পার পাবে না। আর্থিক সামর্থ্য বা সাথে যাওয়ার মতো (নারীদের ক্ষেত্রে) কেউ না থাকলে হজ্ব মাফ করে দেওয়া হয়, অসুস্থতা বা বয়সজনিত সমস্যার কারণে সাওম মাফ করে দেওয়া হয়েছে আর নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ না থাকলে কাউকে যাকাত আদায় করতে হয় না, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই সালাত ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
কেউ যদি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে না পারে তবে বসে আদায় করবে, বসে আদায় করতে না পারলে শুয়ে আদায় করবে, শুয়ে আদায় করতে না পারলে আঙ্গুল দিয়ে ইশারায় সালাত পড়বে। আর যদি তাও করতে না পারে তাহলে চোখের ইশারায় সালাত আদায় করবে। অবস্থা যাই হোক না কেন সালাত আদায় করতেই হবে। যতক্ষণ জ্ঞান আছে সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই, এমনকি যুদ্ধ চলাকালীন সময়ও সালাত আদায় করতে হবে। সালাত হলো এমন একটি ইবাদত যা ছেড়ে দেওয়ার জন্য কোনো অজুহাতই কার্যকর হবে না। মুসলিম আলিমগণ বলেছেন যে শত্রুপক্ষের ওপর নজরদারি করার সময় আঙ্গুল দিয়ে ইশারায় সালাত আদায় করা যাবে।
৪. এ সফর আমাদেরকে পবিত্র ভূমি জেরুসালেমের গুরুত্ব জানিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা সূরা আল-ইসরা-তে বলেছেন,
"পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত - যার আশেপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাঁকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।” (সূরা ইসরা, ১৭: ১)
জেরুসালেমের কর্তৃত্বের ব্যাপারে মু'মিনদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা ইবরাহীমের কাছে ওয়াদা করেছিলেন যে, জেরুসালেমের অভিভাবকত্ব ইবরাহীমের উত্তরসূরিদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এই ওয়াদা বনী ইসরাঈলের বিভিন্ন নবী-রাসূলের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে। মূসাকেও জেরুসালেমের কর্তৃত্ব দেওয়ার ওয়াদা করা হয়েছিল, তবে তিনি সেটা তাঁর জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারেননি, তাঁর উত্তরসূরি ইউশা ইবন নুনের জীবদ্দশায় জেরুসালেমের কর্তৃত্ব মু'মিনদের হাতে দেওয়া হয়। বনী ইসরাঈল যতদিন পর্যন্ত সত্য পথের অনুসারী ছিল ততদিন পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এই পবিত্র ভূমিতে অবস্থান করতে দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন তারা আল্লাহ তাআলার দ্বীন থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ল, নবীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দিল, তাদেরকে খুন করতে লাগল, এমনকি ঈসাকে হত্যা করার চেষ্টা চালালো তখনই আল্লাহ তাআলা তাদের কাছ থেকে জেরুসালেম কেড়ে নিলেন এবং এই পবিত্র ভূমির দায়িত্ব ইসমাইলের উত্তরসূরিদের ওপর অর্পণ করলেন। আর এ কারণেই জেরুসালেম এখন মুহাম্মাদ ও তাঁর উম্মাতের ভূমি। যুগ যুগ ধরে নবী-রাসূলগণ যে বাণী প্রচার করেছেন, সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ সেই একই বাণীর বাহক। এখন তিনিই আদমের সমস্ত সন্তানের নেতা। যে কারণে বনী ইসরাইলকে জেরুসালেমের কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেই একই কারণে উম্মাতে মুহাম্মাদীকে জেরুসালেমের কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণটি হলো তাওহীদ।
মূসা যেমন তাঁর জীবদ্দশায় জেরুসালেম জয় করতে পারেননি কিন্তু তাঁরই অনুসারী ইউশার সময় তা মুসলিমদের কর্তৃত্বে আসে, ঠিক তেমনি মুহাম্মাদ তাঁর জীবদ্দশায় জেরুসালেম জয় করতে না পারলেও উমার ইবন খাত্তাবের শাসনামলে তা মুসলিমদের অধীনে চলে আসে। জেরুসালেমের তৎকালীন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার সাহস করেনি, তবে মুসলিমরা যখন জেরুসালেমের গেটে পৌঁছল তখন তারা বললো, 'আমরা মুসলিমদের খলিফা ছাড়া অন্য কারো কাছে আত্মসমর্পণ করব না। চাবি নেওয়ার জন্য তাঁকেই এখানে আসতে হবে।' এজন্য উমার ইবন খাত্তাব জেরুসালেমের চাবি নেওয়ার জন্য মদীনা থেকে জেরুসালেমে এসেছিলেন।
৫. নবুওয়াতের দশম বছর ছিল রাসূলুল্লাহর জন্য কষ্টের সময়, তাই এই সময়ে আল্লাহ তাআলা তাঁকে এই ভ্রমণের সুযোগ দিয়েছেন। এ ভ্রমণে জিবরীল ছিলেন তাঁর পথপ্রদর্শক। এ ভ্রমণে তিনি পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের সাথে দেখা করার সুযোগ পান। এ ভ্রমণ ছিল যেন সত্যিকারের এক বিস্ময়-রাজ্যে ভ্রমণ। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে শেষ পর্যন্ত তিনি জান্নাতে প্রবেশ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ আল-কাউসার নামে একটি নদী দেখেছিলেন। এটি তাঁকে দেওয়া হয়েছে। এই নদী ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহর প্রতি এক বিশেষ উপহার। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, "কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি”–এর মানে হলো, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কষ্টের জন্য উত্তম পুরস্কারের অঙ্গীকার করেছেন। একজন মুসলিম যত কষ্টের মধ্য দিয়েই থাকুক না কেন, আল্লাহ তাআলা প্রতিটি কষ্টের বিনিময়ে তার জন্য কিছু না কিছু বরাদ্দ করে রেখেছেন যা সে এই দুনিয়া অথবা পরকালে পাবে। সুতরাং একজন মুসলিমের কখনই ভেঙে পড়া উচিত না।
৬. আবু বকরের মর্যাদা: কুরাইশের লোকেরা যখন আল ইসরা ওয়াল মিরাজের ঘটনা নিয়ে হাসিঠাট্টা করছিল তখন আবু বকর সেখানে ছিলেন না। তিনি যখন মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন কেউ একজন তাঁর কাছে গিয়ে বললো, 'আপনি জানেন কী হয়েছে? মুহাম্মাদ দাবি করেছেন যে, তিনি এক রাতের মধ্যেই জেরুসালেম গিয়ে আবার ফিরে এসেছেন।' এরপর আবু বকর বলেছিলেন, 'যদি তিনি একথা দাবি করে থাকেন-তাহলে তা অবশ্যই সত্য।' এরপর আবু বকর যখন জানতে পারলেন যে মুহাম্মাদ আসলেই এ দাবি করেছেন, তখনই তিনি এ ঘটনাকে বিনা দ্বিধায় সত্য বলে মেনে নিয়েছিলেন।
লক্ষণীয় হলো আবু বকরের উক্তির প্রথম অংশ, 'যদি তিনি একথা বলে থাকেন...' –এই কথার মাধ্যমে হাদীসের সত্যতা যাচাইয়ের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। যে কেউ হাদীস বর্ণনা করলেই তা গ্রহণ করা যাবে না। বরং আমাদেরকে নিশ্চিত হতে হবে যে, মুহাম্মাদ আসলেই তা বলেছেন কি না। মুসলিম ও আহলে কিতাবদের মধ্যে মূল পার্থক্য আসলে এখানেই। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের যা বলা হতো তাই তারা কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়া গ্রহণ করতো, যদিও তাদের প্রকৃত কিতাব আগেই পরিবর্তন করে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু হাদীসের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য মুসলিমদের রয়েছে আলাদা এক শাস্ত্র, যেখানে হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে কার বর্ণনা বিশ্বাসযোগ্য তা বের করার জন্য হাজার হাজার ব্যক্তিদের জীবনী নিয়ে পড়াশোনা করা হয়।
৭. আবু বকরের উক্তির দ্বিতীয় অংশ, '...তাহলে তা সত্য', রাসূলুল্লাহর প্রতি আবু বকরের এমনই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে রাসূল যা-ই বলতেন তিনি তা-ই বিশ্বাস করতেন এবং এ কারণেই তাঁকে বলা হতো 'আস সিদ্দীক'।