📄 দুঃখের বছর
মাক্কী জীবনের দশম বছরকে বলা হয় আমুল হুযন বা দুঃখের বছর। কুরাইশ কর্তৃক আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার প্রায় ছয় মাস পরের ঘটনা, যে মানুষটি এতদিন ধরে রাসূলুল্লাহর সুখে-দুঃখে তাঁর পাশে ছিলেন, সেই আবু তালিব মৃত্যুশয্যায় শায়িত। রাসূলুল্লাহ আবু তালিবের পাশে বসে তাকে বললেন,
'চাচা, আপনি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলুন। আপনি স্বীকার করে নিন আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। আপনি আমাকে এ কথাগুলো বলে যান যেন আমি শেষ বিচারের দিন আপনার পক্ষ হয়ে আল্লাহর কাছে সাক্ষ্য দিতে পারি, আপনার শাস্তি মওকুফের জন্য আমার রবের কাছে আবেদন করতে পারি। আপনি শুধু বলুন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, এ ছাড়া আমি আপনার কাছে আর কিছুই চাই না।'
রাসূলুল্লাহ যখন কথাগুলো বলছিলেন তখন আবু তালিবের অপর পাশে বসা ছিল আবু জাহেল। পিছে লেগে থাকা বলতে যা বোঝায়, আবু জাহেল রাসূলুল্লাহর সাথে ঠিক তাই করতো, ইসলামের বিরোধিতায় সে ছিল আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান। সমস্ত ইসলামবিরোধী কাজ ও ষড়যন্ত্রের মূল হোতা ছিল এই আবু জাহেল। রাসূলুল্লাহর বিরোধিতায় আবু জাহেল ছিল অদ্বিতীয়। সে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আল্লাহর রাসূলের বিরোধিতা করে কাটিয়েছে।
আবু তালিবের এক পাশে রাসূল এবং আরেকপাশে আবু জাহেল ও আবদুল্লাহ ইবন আবি উমাইর বসে আছে। আবু জাহেল বলে উঠল, 'আবু তালিব, তুমি কি আবদুল মুত্তালিবের দ্বীন ছেড়ে অন্য দ্বীনের ওপর মারা যেতে চাও? শেষ পর্যন্ত তুমি বাপের দ্বীন ত্যাগ করবে?' সে আবু তালিবকে 'ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল' করার চেষ্টা করলো। রাসূলুল্লাহ যতই আবু তালিবকে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলার জন্য অনুরোধ করতে লাগলেন, আবু জাহেল ততই বাধা দিতে লাগল। আবু তালিব তাঁর জীবনের শেষ কথা বলার আগ পর্যন্ত এভাবেই চলতে লাগল। অবশেষে আবু তালিব বললেন, 'আমি আমার পিতা আবদুল মুত্তালিবের দ্বীনের ওপরই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবো।' এটিই ছিল মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ কথা।
আবু তালিব মারা গেলেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, 'আমি আল্লাহর কাছে তাঁর জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে যাবো।' কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁকে এরূপ করতে নিষেধ করলেন। বিষয়টি ছিল রাসূলুল্লাহর জন্য খুবই কষ্টকর। রাসূলুল্লাহর আট বছর বয়স থেকে আবু তালিব তাঁর দেখাশোনা করেছেন, নিজের কাছে রেখে বড় করেছেন, তাঁর ভরণপোষণ করেছেন। আবু তালিবের কাছেই রাসূলুল্লাহর শৈশবকাল কেটেছে, বড় হওয়ার পরেও আবু তালিব রাসূলুল্লাহর পাশে ছিলেন। বিয়াল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি রাসূলুল্লাহকে সাহায্য করে গেছেন, কুরাইশদের ষড়যন্ত্র থেকে তাঁকে রক্ষা করেছেন। রাসূলুল্লাহর আট বছর বয়সে আবু তালিব সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন। নবীজির পঞ্চাশ বছর পর্যন্ত সে হাত সেভাবেই তাঁকে আগলে রাখে। আবু তালিব তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় রাসূলুল্লাহকে রক্ষা করার জন্য ব্যয় করেছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ যখন দেখলেন তাঁর প্রিয় চাচা কাফের হিসেবে মারা যাচ্ছে তখন তা মেনে নেওয়া তাঁর জন্য বেশ কষ্টকর ছিল। তিনি যখন আবু তালিবের জন্য দুআ করতে মনঃস্থির করলেন, তখন আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করেন,
'নবী ও মুমিনের উচিত নয় মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, যদিও তারা আত্মীয় হোক-একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামী।' (সূরা তাওবা, ৯:১১৩)
রাসূলুল্লাহকে আবু তালিবের জন্য দুআ করতে নিষেধ করা হলো। রাসূলুল্লাহ তাঁর চাচাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার জন্য বারবার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর চাচার কথা ছিল, 'কুরাইশরা যদি আমাকে এ ব্যাপারে অপমান না করতো, তারা যা বলতো যে আমি মৃত্যুর ভয়ে কালিমা পাঠ করেছি, তবে তোমাকে খুশি করার জন্য আমি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলতাম।' আবু তালিব জানতেন কালিমা পাঠ করলে মুহাম্মাদ খুবই খুশি হবেন। কাফের হিসেবে নিজের প্রিয় চাচাকে মৃত্যুবরণ করতে দেখা নবীজির জন্য কতটা কষ্টকর ছিল তা আবু তালিব বেশ ভালোভাবেই জানতেন। আবু তালিব শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। কিন্তু তাঁর কালিমা পাঠ না করার কারণ ছিল কুরাইশদের কাছে মানসম্মান হারানোর ভয়। তখন আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করলেন,
'আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে সৎপথে আনতে পারবেন না, তবে আল্লাহ তাআলাই যাকে ইচ্ছা সৎপথে আনয়ন করেন। কে সৎপথে আসবে, সে সম্পর্কে তিনিই ভাল জানেন।' (সূরা কসাস, ২৮: ৫৬)
হিদায়াত শুধুমাত্র আল্লাহর হাতে। কে হেদায়েত পাবে তা শুধু তিনিই নির্ধারণ করেন। এমনকি রাসূলুল্লাহরও এ ব্যাপারে কিছুই করার ছিল না। তাঁর কাজ ছিল কেবল আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কোনো মানুষের পক্ষে এটা সম্ভব নয়। এ কারণে ঈমান আনার ব্যাপারে কারো ওপর কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা ইসলাম সমর্থন করে না।
'দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। নিঃসন্দেহে হিদায়েত গোমরাহি থেকে পৃথক হয়ে গেছে। অতএব, যে ব্যক্তি তাগূতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, সে এমন রজ্জুকে আঁকড়ে ধরলো যা কখনও ছিন্ন হওয়ার নয়, আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন।' (সূরা বাকারাহ, ২: ২৫৬)
কারোর অন্তরে কোনো কিছু জোর করে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। কে কোন ধর্ম গ্রহণ করবে সে ব্যাপারে প্রত্যেককে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দেওয়া হয়েছে আর এই ইচ্ছাশক্তিকে কে কীভাবে ব্যবহার করলো তার জন্য সবাইকে আল্লাহ তাআলার সামনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
আবু তালিবের মৃত্যুতে যখন নবীজি শোকাহত, তার মাত্র দুই মাস পরে মারা গেলেন তাঁর স্ত্রী খাদিজা। এক মৃত্যুশোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যুর মতো আরও একটি দুঃখময় ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় প্রিয় নবী মুহাম্মাদকে। তাই এই বছরকে বলা হয় শোকের বছর। এই বছরটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কষ্টকর বছর, কারণ ওই সময় তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রিয় দুইজন মানুষকে হারিয়েছেন। তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে রাসূলুল্লাহকে তাঁর দায়িত্ব পালনে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করে আসছিলেন। খাদিজা রাসুলুল্লাহকে যেমন মানসিকভাবে সমর্থন যুগিয়েছেন ঠিক তেমনি নিজের ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে তাঁকে সাহায্য করেছেন। অন্যদিকে, আবু তালিব রাসূলুল্লাহকে কুরাইশদের অত্যাচার ও ষড়যন্ত্র থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন, তাঁকে নিরাপত্তা প্রদান করেছেন। যে দু'জন মানুষ সুখে-দুখে, বিপদে-আপদে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে, তাঁকে সমর্থন দিয়েছেন, তাঁরা হঠাৎ করেই চলে গেলেন এই দুনিয়া থেকে। শুধু তাই নয়, সে বছরে কুরাইশদের ইসলামবিরোধিতার মাত্রাও বেড়ে গেলো।
আবু তালিব যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন রাসূলুল্লাহ তেমন গুরুতর কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই ইসলাম প্রচার করতে পেরেছিলেন। কিন্তু আবু তালিবের মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহর পক্ষে আগের মতো দাওয়াতের কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। কুরাইশদের বিভিন্ন কটূক্তি ও অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে তিনি যখন ক্লান্ত অবস্থায় বাড়ি যেতেন, তখন তাঁর পাশে থাকতেন খাদিজা। তিনি তাঁকে সাহস ও স্বস্তি দিয়েছেন, জীবনের কঠিনতম মুহূর্তগুলোতে রাসূলুল্লাহর প্রিয় স্ত্রীকে পাশে পেয়েছিলেন। কিন্তু খাদিজার মৃত্যুর পর তিনি একেবারেই একা হয়ে পড়েন। খাদিজার মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ প্রায় দুই-তিন বছর পর্যন্ত বিয়ে করেননি। তখন তিনি বেশ কঠিন সময়ের মধ্যে ছিলেন।
কেন এই পরিস্থিতিতে রাসূলকে পড়তে হলো- এ প্রশ্নের উত্তরে কেউ কেউ বলেন, একসাথে এতগুলো ঘটনা ঘটার পেছনে আল্লাহ তাআলার হিকমাহ রয়েছে। তা হলো মুসলিমরা যেন আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করতে শেখে। আল্লাহ চেয়েছেন ইসলামের আহ্বানকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য মুসলিমরা যেন আবু তালিব বা খাদিজার এ দিকে চেয়ে না থাকে, বরং তারা যেন তাদের এই সংগ্রামে কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা ও আল্লাহর সাহায্যের দিকে চেয়ে থাকতে শেখে। সে কারনেই আল্লাহ তাআলা নবীজিকে এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করেন যে পরিস্থিতিতে তাঁকে সাহায্য করার কেউ ছিল না।
📄 ইয়াসরিব হলো মদীনা
'আমাকে স্বপ্নে হিজরতের ভূমি দেখানো হয়েছে। সেটি ছিল খেজুরগাছ পরিবেষ্টিত, দু'টি পাথুরে অঞ্চলের মাঝে অবস্থিত।'
এই হাদীসটি মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে। বুখারিতে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেন, 'আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি মক্কা থেকে এমন এক দেশে হিজরত করছি যা খেজুর গাছ দ্বারা পরিবেষ্টিত। আমি ধারণা করলাম যে, এলাকাটি হবে ইয়ামামা বা হিজর, কিন্তু পরে দেখা গেল যে তা ইয়াসরিব।'
মদীনার পূর্ব নাম ছিল ইয়াসরিব। রাসূলুল্লাহ এই নাম পরিবর্তন করে ইয়াসরিব নামটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। শুধু তাই নয়, রাসূলুল্লাহ বলেন, 'যদি কেউ মদীনাকে 'ইয়াসরিব' বলে ডাকে তাহলে তাঁকে ইস্তিগফার করতে হবে।' রাসূলুল্লাহ এই শহরটির পরিচয়কে সম্পূর্ণ বদলে দিতে চেয়েছিলেন। ইয়াসরিবের ইতিহাস ছিল শত্রুতা আর যুদ্ধ-বিগ্রহে ভরপুর, তাই রাসূলুল্লাহ একে একটি নতুন পরিচয়ে পরিচিত করতে চাইলেন। ফলে এটির নতুন নাম হলো মদীনা, মদীনাতুর রাসূলুল্লাহ বা রাসূলুল্লাহর শহর। মদীনা শব্দের আক্ষরিক অর্থ শহর, তবে মদীনা বলতে এখন রাসূলুল্লাহর শহরকেই বোঝানো হয়।
📄 হিজরতের আহ্বান
“বলুন, হে আমার বিশ্বাসী বান্দাগণ। তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়াতে সৎকাজ করে, তাদের জন্যে রয়েছে পুণ্য। আল্লাহর পৃথিবী প্রশস্ত। যারা সবরকারী, তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই।” (সূরা আয-যুমার, ৩৯: ১০)
এই আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা হিজরতের দিকে ইঙ্গিত করছেন। 'ওয়া আরদুল্লাহী ওয়াসি'আহ' — আল্লাহ তাআলার জমিন প্রশস্ত। আল্লাহ মুসলিমদের বলছেন, যদি মক্কায় তোমাদের উপর জুলুম করা হয় তাহলে তোমরা অন্যত্র চলে যেতে পারো যেখানে আল্লাহ তাআলার দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারবে। মুফাসসির মুজাহিদ (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, 'শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলার দ্বীনের জন্য হিজরত করো ও জিহাদ করো এবং মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাকো।' উম্মাহর প্রাথমিক যুগের প্রখ্যাত আলিম আতা বলেন, 'যদি তোমাকে কোনো পাপের দিকে আহ্বান করা হয় তাহলে তুমি পালিয়ে যেয়ো।'
“আর যারা হিজরত করেছে আল্লাহর রাস্তায় অত্যাচারিত হওয়ার পর, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম আবাস দান করবো। আর আখিরাতের প্রতিদান তো বিশাল, যদি তারা জানতো।” (সূরা নাহল, ১৬: ৪১)
যারা আল্লাহ তাআলার জন্যে হিজরত করে এবং নিপীড়িত হয় তাদেরকে আল্লাহ আযযা ওয়াজাল এই দুনিয়ার বুকে উত্তম আবাস দেওয়ার ওয়াদা করেছেন। এই আয়াতের সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন মুহাজিরগণ। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সময় তাঁরা ছিলেন নিঃস্ব। কিন্তু এই মানুষগুলোই পরবর্তী সময়ে কেউ হন আমীর, কেউ বা সেনাপতি। দুনিয়ার বুকেই আল্লাহ তাদেরকে নিঃস্ব অবস্থা থেকে উন্নীত করে সম্মান ও ইজ্জতের আসনে আসীন করেছেন। এটাই হলো এই আয়াতে বর্ণিত 'উত্তম আবাস'। যদিও তাঁরা দুনিয়ার বুকে পুরস্কার পেয়েছেন, আল্লাহ আযযা ওয়াজাল বলছেন, 'কিন্তু পরকালের পুরস্কার তো সর্বাধিক।' আর তাই উমার ইবন খাত্তাব খলীফা হওয়ার পর যখন মুহাজিরদের টাকাপয়সা অথবা উপহার দিতেন তখন তিনি বলতেন, 'এটি হচ্ছে এই দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে তোমাদের জন্যে উপহার কিন্তু আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য আখিরাতে এর চেয়েও অনেক বেশি বরাদ্দ করে রেখেছেন।' যখন কেউ আল্লাহ তাআলার জন্য কিছু ত্যাগ করে, আল্লাহ তাদেরকে তার চেয়েও ভালো প্রতিদান দিয়ে পুষিয়ে দেন।
“যারা দুঃখ-কষ্ট ভোগের পর দেশত্যাগী হয়েছে অতঃপর জিহাদ করেছে, নিশ্চয় আপনার পালনকর্তা এসব বিষয়ের পরে অবশ্যই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা নাহল, ১৬: ১১০)
হিজরত একটি ইবাদাত। ইসলামে এই ইবাদাতের মর্যাদা অনেক বেশি। যেখানেই হিজরত আছে, সেখানেই আছে নুসরাত। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করা মুহাজিরগণ মদীনায় কোনো হোটেল বা উদ্বাস্তুশিবিরে জড়ো হননি। তাঁরা মদীনায় যাদের বাসায় উঠেছেন তাদেরকে বলা হয় আনসার। তাদেরকে আনসার বলার কারণ, তাঁরা আল্লাহ তাআলার দ্বীন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা (নুসরাহ) দিয়েছেন এবং জয়ী করতে সাহায্য করেছেন। তাদের ছোট্ট গৃহ তাঁরা মুহাজিরদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন।
মদীনার ঘরগুলো কেমন ছিল? আল-হাসান আল বসরীর একটি বর্ণনা এখানে উল্লেখ্য, তিনি বলেন, 'আমি রাসূলুল্লাহর ঘরগুলো দেখেছি। সেগুলো এত ছোট ছিল যে, আমি আমার হাত দিয়ে ঘরের ছাদ ধরতে পারতাম। রাসূলুল্লাহ যখন আ'ইশার ঘরে সালাত আদায় করতেন, ঘর ছোট হওয়ার কারণে আ'ইশাকে তাঁর পা সরিয়ে রাখতে হতো যাতে রাসূলুল্লাহ ঠিকমতো সিজদাহ দিতে পারেন।' রাসূলুল্লাহর প্রত্যেক স্ত্রীর জন্য একটি করে ঘর ছিল। কিন্তু সেগুলোর সাথে আলাদা করে কোনো রান্নাঘর, বসার ঘর অথবা বারান্দা বলে কিছু ছিল না। শুধুমাত্র একটি করে ঘর আর প্রতিটি ঘরই ছিল অনেক ছোট।
তালহা ইবন উবাইদুল্লাহ ও তাঁর মা এবং সুহাইব ছিলেন হাবিব ইবন উসার বাড়িতে। হামযা উঠেছিলেন সাদ ইবন যুরায়রার বাড়িতে। সাদ ইবন খাইতানের বাড়িকে বলা হতো "ব্যাচেলর হাউজ", কারণ সেখানে অবিবাহিত মুহাজিররা থাকতেন। উবাইদা ইবনু হারিস ও তাঁর মা, তুফাইল ইবন হারিস, তুফাইল ইবন আমর, আল হুসসাইন ইবন হারিস — তাঁরা সবাই থাকতেন আবদুল্লাহ ইবন সালামার বাসায়। এক মুসলিমের আরেক মুসলিমের প্রতি উদার হওয়া এবং তাকে সাহায্য করা মুসলিমের ঈমানের চিহ্ন। এটা ছিল আনসারদের একটি বৈশিষ্ট্য।
সেই সময়ে মুসলিমদের কেউ মদীনায়, আবার কেউ হাবশায় হিজরত করেছিলেন। এই দুই হিজরতের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য আছে। হাবশায় হিজরতের ঘটনার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় যে, তাঁরা সেখানে হিজরত করলেও সেখানকার সমাজের উপর তেমন একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। সেখানে তাঁরা সমাজ থেকে অনেকটাই আলাদা থাকতেন। তাঁরা সেখানে উদ্বাস্তুর মতো অবস্থান করেছিলেন। আর এ কারণেই আবিসিনিয়া ত্যাগ করার সময় তাঁরা সেখানে ইসলামের তেমন কোনো প্রভাব রেখে আসতে পারেননি। কিন্তু মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার উদ্দেশ্য ছিল ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। আর সে উদ্দেশ্য সফলও হয়েছিল।
মদীনাকে তাঁরা এত ভালোবেসেছিলেন যে মক্কা বিজয়ের পরও তাঁরা মদীনায় থেকে গেলেন। আবু বকর, উমার, উসমান, বিলাল - তাঁদের কেউই মক্কায় ফেরত যাননি। মু'মিনদের অন্তরে মদীনার প্রতি ভালোবাসা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এখনও মুসলিমরা যখন রাসূলুল্লাহর শহরে প্রবেশ করে তখন তাদের মধ্যে একটি বিশেষ অনুভূতি তৈরি হয়। মক্কায় প্রবেশ করলে বিশাল বিশাল স্তম্ভে দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদ-উল-হারামের দিকে তাকালে বিশালতার একটি অনুভূতি তৈরি হয়, কিন্তু মদীনায় মক্কার মতো পাহাড়-পর্বত নেই, সেখানে সমতল, সেখানে একধরনের প্রশান্তি অনুভব হয়। রাসূলুল্লাহর দুআর বরকতেই মদীনা মুসলিমদের কাছে অতি প্রিয় একটি স্থান।
📄 ইসলামে মদীনার তাৎপর্য
# রাসূলুল্লাহ আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করেছিলেন আল্লাহ তাআলা যেন তাদের অন্তরে মদীনার জন্য ভালোবাসার সৃষ্টি করে দেন। তিনি দুআ করেছেন, 'হে আল্লাহ, মদীনাকে আমাদের চোখে মক্কার মতো বা তার চেয়েও প্রিয় বানিয়ে দাও।' নবীজি মদীনার বরকত বৃদ্ধির জন্য আল্লাহ আযযা ওয়াজাল-এর কাছে দুআ করতেন, 'হে আল্লাহ! মক্কায় তুমি যে পরিমাণ বরকত দান করেছো, মদীনাতে তার দ্বিগুণ বরকত দাও।'
# দাজ্জাল মদীনাতে প্রবেশ করতে পারবে না। নবীজি বলেন, দাজ্জালের কাছ থেকে মদীনাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য এর প্রতিটি প্রবেশমুখে ফেরেশতারা পাহারারত রয়েছে।
# মদীনায় কষ্টকর জীবনে ধৈর্যধারণের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে বিশেষ পুরস্কার রয়েছে। মদীনায় তখন প্রচণ্ড গরম ছিল এবং পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল প্রতিকূল, তাই নবীজি বলেছেন, 'মদীনার কষ্টকর অবস্থায় যে ধৈর্য ধারণ করবে, আমি শেষ বিচারের দিন তার শাফাআতকারী হবো। শেষ বিচারের দিন আমি তার হয়ে মধ্যস্থতা করবো।'
# মদীনায় মৃত্যুবরণকারীর জন্য রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। নবীজি বলেছেন, 'যে মদীনায় মৃত্যুবরণ করবে, আমি তার জন্য শেষ বিচারের দিন মধ্যস্থতাকারী হবো।' উমার ইবন খাত্তাব খলীফা হওয়ার পর থেকে চাইতেন তিনি মদীনায় শহীদ হবেন। তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে এই বলে দুআ করতেন, 'হে আল্লাহ! আমি তোমার রাসূলের শহরে শহীদ হিসেবে মরতে চাই।' এই দুআ শুনে তাঁর কন্যা হাফসা বললেন, "আব্বা, আপনি কীভাবে মদীনায় শহীদ হবেন? মদীনা তো নিরাপদ শহর, মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজধানী। আপনি যদি শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে চান তাহলে আপনাকে ইরাক বা সিরিয়া যেতে হবে, মদীনায় নয়।" এরপর উমার ইবন খাত্তাব বললেন, 'যদি আল্লাহ তাআলা কোনো কিছু ঘটাতে চান, তাহলে তিনি তা অবশ্যই ঘটাবেন।' পরবর্তীতে দেখা যায়, উমার মদীনাতেই শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছিলেন এবং সে সময় তিনি রাসূলুল্লাহর মসজিদে ইবাদতরত অবস্থায় ছিলেন।
# মদীনা হলো ঈমানের আশ্রয়স্থল। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'ঈমান মদীনাতে ফিরে আসবে সেভাবে, যেভাবে সাপ তার গর্তে ফিরে আসে।' মদীনা শহরে কোনো অপবিত্রতা নেই। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'সেই সত্ত্বার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, মদীনাকে পছন্দ হয় না বলে কেউ মদীনা ত্যাগ করে না, বরং আল্লাহ তাআলাই তাদের চেয়েও উত্তম কাউকে দ্বারা তাদেরকে প্রতিস্থাপন করে দেন।' রাসূলুল্লাহ আরো বলেন, 'মদীনা অপবিত্র ও খারাপ লোকদের বহিষ্কার করে দেয়।' তিনি আরো বলেন, 'শেষ বিচারের দিন ততক্ষণ পর্যন্ত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না মদীনা সমস্ত খারাপ লোকদের ঠিক সেভাবেই বের করে দেয়, যেভাবে আগুন লোহার মরিচাকে দূর করে দেয়।'
# স্বয়ং আল্লাহ আযযা ওয়াজাল মদীনাকে রক্ষণাবেক্ষণ করেন। রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'যে কেউ মদীনাবাসীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে, সে সেভাবে বিলীন হয়ে যাবে যেভাবে লবণ পানিতে বিলীন হয়ে যায়।'
# মদীনা হলো পবিত্র নগরী। নবীজি এর পবিত্রতা সম্পর্কে বলেছেন, 'মদীনা পবিত্র, এখানে তোমরা গাছ কাটবে না, শিকার করবে না, অস্ত্র বহন করতে পারবে না।'