📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 রুকানার সাথে কুস্তি

📄 রুকানার সাথে কুস্তি


রাসূলুল্লাহর আরেকটি অলৌকিক ঘটনা হলো রুকানার সাথে কুস্তি। রুকানা ছিল মক্কার সবচেয়ে শক্তিশালী কুস্তিগীর, কখনও কোনো কুস্তিতে পরাজিত হয়নি। সে নবীজিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল, 'আপনি আমার সাথে কুস্তি লড়বেন?' সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাসূলুল্লাহ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। একজন কাফির হিসেবে রুকানার ইচ্ছা ছিল, রাসূলুল্লাহকে লাঞ্ছিত করা-কুস্তি করতে গিয়ে মুহাম্মাদকে এক হাত দেখে নেওয়া যাবে। পুরস্কার হিসেবে ঠিক হলো একশ ভেড়া। বাজি ধরা তখনও হারাম করা হয় নি। তারা লড়াই করা শুরু করলেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাসূলুল্লাহ রুকানাকে ওপর থেকে নিচে ধরে মাটিতে ছুঁড়ে মারলেন। রুকানা বিশ্বাসই করতে পারছিল না এসব কী ঘটছে! সে উঠে দাঁড়িয়ে আবার লড়াই করতে চাইলো, রাসূল পুনরায় তাকে হারিয়ে দিলেন। রুকানা তৃতীয়বার চেষ্টা করলো, সেবারও পরাজিত হলো।

নবীজি শর্তে জিতে গেলেন। কিন্তু শর্তে জেতার চেয়েও অসামান্য ব্যাপার ছিল রুকানার ইসলাম গ্রহণ। রুকানা বললো, 'হে মুহাম্মাদ, আপনার আগে কেউ আমার পিঠ মাটির সাথে লাগাতে পারেনি। আর এটাও সত্যি, এর আগে আপনার চেয়ে বেশি আর কেউ আমার চোখে এতটা ঘৃণিত ছিল না। কিন্তু এখন আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মা'বুদ নেই এবং আপনি আল্লাহর নবী।' রাসূল শর্ত মোতাবেক একশ ভেড়া পেলেন কিন্তু তিনি সেগুলো রুকানাকে ফেরত দিয়ে বললেন, 'ভেড়াগুলো রেখে দাও।'

টিকাঃ
40 আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৯৯।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 চন্দ্র বিদীর্ণ হলো

📄 চন্দ্র বিদীর্ণ হলো


কাছে কুরাইশের লোকেরা নিদর্শন দেখানোর জন্য রাসূলুল্লাহকে বারবার চাপাচাপি করছিল। কুরআন তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল না, যদিও কুরআনের চেয়ে বড় অলৌকিক বিষয় আর কিছুই নেই। আল্লাহ তাআলা জিবরীলের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহর ওয়াহী পাঠালেন, 'যদি তারা নিদর্শন দেখতে চায়, আমরা তাদের জন্য চাঁদকে দুইভাগ করে দেব।' রাসূলুল্লাহ কাফিরদের ডেকে বললেন, 'চাঁদ দুই ভাগ হয়ে যাবে।' রাতের বেলা কাফিররা সবাই একত্রে জড়ো হলো। তারা সবাই তাদের চোখের সামনে দেখলো চাঁদ দুইভাগ হয়ে আবার জোড়া লেগে গেল। এটা ছিল একটা অদ্বিতীয় অলৌকিক ঘটনা। এই ঘটনা বুখারি, মুসলিম এবং কুরআনে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন, "কেয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে। তারা যদি কোনো নিদর্শন দেখে তবে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, এটা তো চিরাগত জাদু।” (সূরা কমার, ৫৪: ১-২)

তারা অপবাদ দিল, রাসূলুল্লাহ তাদেরকে জাদু করেছে, কিন্তু আদতে এটি কোনো দৃষ্টিবিভ্রম ছিল না। সংশয়বাদীরা এই ঘটনা নিয়ে নানারকম সন্দেহ তুলে এই ঘটনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। যেমন তারা বলে, "চাঁদ দুই ভাগ হলে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষরা কীভাবে এই ঘটনা দেখলো না?” বিভিন্নভাবে এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া যায়:
১। পৃথিবীটা বিভিন্ন সময়ের বলয়ের মধ্যে আছে; অর্ধেক পৃথিবীতে সে সময় দিন ছিল, আর বাকি অর্ধেকের ক্ষেত্রে এটা সম্ভবত অনেক রাতে ঘটেছিল তাই অনেকেই এটা দেখেনি।
২। অথবা হতে পারে বিশেষ বিশেষ এলাকাতে চাঁদটা তাদের কাছে দৃশ্যমান ছিল না কারণ সেটা ততক্ষণে অস্ত চলে গেছে। তাই যেখানে রাত ছিল সেখানের সবাই এটা দেখতে নাও পেতে পারে।
৩। সাধারণত মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে না। তাদের উপরে আকাশে কী ঘটছে তারা সাধারণত খেয়াল করে দেখে না, যদি না তাদের উপরে তাকিয়ে দেখতে বলা হয়। তাই অনেকে হয়তো চন্দ্র বিদীর্ণ হওয়ার এই ঘটনা দেখেনি কারণ তারা উপরে কী হচ্ছে সে খেয়ালই রাখেনি।
৪। তখনকার দিনে দলিল লিখে রাখার চল ছিল না। ইতিহাসের অনেক ঘটে যাওয়া ঘটনা কেউ লিখে রাখেনি। তাই এই সম্ভাবনাও থেকে যায় যে, কিছু মানুষ এটা দেখেছে ঠিকই কিন্তু তারা সেটা লিখে রাখেনি। কিছু আলিম বলেছেন, ভারত এবং চীনে এই ঘটনা লিখে রাখা হয়েছিল। তারা বলেন, চীনের কিছু পুরনো দলিলে চাঁদ দু'ভাগ হওয়ার ঘটনা লিখে রাখা হয়েছিল। তারা এই ঘটনাকে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার কাজে প্রাসঙ্গিক ঘটনা হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন।
৫। কিছু জ্যোতির্বিদ উল্লেখ করেছেন, চাঁদের মাঝ বরাবর একটা লম্বা দাগ কেটে গেছে, এ তথ্য যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে এটা চাঁদ বিভক্ত হওয়ার স্পষ্ট নিদর্শন হিসেবে দেখানো যায়, যদিও এই তথ্যটি যাচাইয়ের প্রয়োজন আছে।

প্রথম যুগের একজন আলিম আল খাত্তাবি বলেন, 'চাঁদ বিভক্ত হওয়ার ঘটনাটি ছিল পূর্ববর্তী নবীদের নিদর্শনের তুলনায় একটা বড় মাপের নিদর্শন। এর কারণ ছিল, এটা বিশাল এলাকা জুড়ে দৃশ্যমান হয়েছিল এবং এটি ছিল প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রম একটি ঘটনা। এর মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বার্তার সত্যতা প্রমাণিত হয়।'

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 সূরা আর রুম

📄 সূরা আর রুম


রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিরাজমান ছিল। তারা ছিল সে সময়ের পরাশক্তি। ইরান, ইরাক, আফগানিস্তান, সম্ভবত পাকিস্তানের কিছু অংশ এবং এর উত্তর দিক ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। আর তুরস্ক, পূর্ব-দেশীয় ইউরোপ, আজারবাইজান এবং আর্মেনিয়া ছিল বাইজেন্টাইন বা রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। রোমানদের অবস্থা তখন বেশ শোচনীয়, পারস্য একের পর এক যুদ্ধে তাদের পরাজিত করতে থাকে। এরই মধ্যে সিরিয়ায় পারস্য ও রোমানদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে সংগঠিত হয় এবং তাতে রোমানরা পরাজিত হয়। মক্কার মানুষ এই খবর শুনে খুব খুশি হয়, আর মুসলিমরা দুঃখ পায়। কারণ, ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে পারস্যরা ছিল মক্কার পৌত্তলিকদের আপন, যেহেতু তারা অগ্নিপূজা করতো। অপরদিকে রোমানরা ছিল খ্রিস্টান বা আহলে কিতাব, তাদের বিশ্বাস মুসলিমদের কাছাকাছি ছিল। এই ঘটনার পর মুশরিকরা মক্কার চারদিকে ঘুরে ঘুরে মুসলিমদের বলতে লাগল, 'যেভাবে পারস্যরা রোমানদের হারিয়েছে, আমরাও সেভাবে তোমাদের হারাবো।' আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তখন একটি আয়াত নাযিল করেন,
"আলিফ-লাম-মীম। রোমকরা পরাজিত হয়েছে নিকটবর্তী এলাকায় এবং তারা তাদের পরাজয়ের পর অতিসত্বর বিজয়ী হবে কয়েক বছরের মধ্যে। অগ্র-পশ্চাতের কাজ আল্লাহর হাতেই। সেদিন মু'মিনগণ আনন্দিত হবে আল্লাহর সাহায্যে। তিনি যাকে ইচ্ছা সাহায্য করেন এবং তিনি পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু।” (সূরা আর-রুম, ৩০: ১-৫)

এখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ওয়াদা করেছেন যে রোমানরা দশ বছরের মধ্যে বিজয়ী হবে। আবু বকর এই আয়াত শুনে আবু জাহেলের কাছে গেলেন। তাকে বললেন, 'তোমার সাথে বাজি ধরতে চাই যে, রোমানরা বিজয়ী হবে।' আবু জাহেল বললো, 'কত সময়ের মধ্যে বিজয়ী হবে?' আবু বকর বললেন, 'দশ বছরের কম সময়ে।' বাজির পুরস্কার ঠিক হলো একশ উট। আবু বকর যেকোনো কিছুর ওপর বাজি ধরতে রাজি, কেননা তিনি কুরআনের উপর ভরসা করে বাজি ধরেছেন।

সূরা আর রুমের এই আয়াতটি বলছে রোমানরা বিজয়ী হবে এবং মুসলিমরা সেদিন খুশি হবে কারণ আল্লাহ তাদের বিজয় দেবেন। আট বছর পর রোমানরা সত্যিই বিজয়ী হলো, অথচ মুসলিমদের কাছে রোমানদের বিজয় সেদিন খুবই গৌণ বিষয়। মুসলিমদের জন্য সেটি খুশির দিন ছিল সত্যি, কিন্তু সেটা রোমানদের কারণে নয়, অন্য কোনো কারণে। আসল ঘটনা হচ্ছে, যেদিন তারা রোমানদের বিজয়ের খবর পেলো, সেই দিনটি ছিল বদরের যুদ্ধে বিজয়ের দিন, কাফেরদের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধ বিজয়ের প্রথম ইতিহাস। বলা বাহুল্য বদরের বিজয়ের সামনে অন্য সবকিছু ম্লান হয়ে যায়।

পৌত্তলিকরা বলতো তারা মুসলিমদের সেভাবেই পরাজিত করবে যেভাবে পারস্যরা রোমানদের পরাজিত করেছে, কিন্তু ঠিক উল্টোটাই ঘটল। রোমানরা বিজয়ী হলো এবং একই দিনে মুসলিমরাও বিজয়ী হয়। তবে অলৌকিকতার শেষ এখানেই নয়, এই আয়াতে বলা হয়েছে, বাইজেন্টাইন অর্থাৎ রোমানরা "আদনাল আরদ' এ পরাজিত হয়েছে। আদনা শব্দটির আরবিতে দুইটি অর্থ আছে, একটা অর্থ হলো সবচেয়ে কাছে আর আরেকটা অর্থ হলো সর্বনিম্ন। পূর্ববর্তী আলিমরা মূলত এই শব্দের অর্থ গ্রহণ করেছিলেন 'সবচেয়ে কাছে', কারণ আরবের সবচেয়ে কাছের দেশ ছিল আশ-শাম আর সেখানেই রোমানরা পরাজিত হয়েছিল। আবার অনেকে মনে করেন এই আয়াতের অর্থ সর্বনিম্ন, কেননা যে স্থানে এই যুদ্ধ হয়েছিল তা পৃথিবী পৃষ্ঠের সর্বনিম্ন স্থান। আল্লাহই ভালো জানেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px