📄 হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব ؓ
হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব ছিলেন একজন শিকারী। প্রায়ই মরুভূমিতে শিকারে বেরিয়ে পড়তেন আর ফিরে এসে অন্যদের কাছে শোনাতেন অভিযানের রোমহর্ষক সব কাহিনি। একদিন তিনি শিকারের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন। সে সুযোগে আবু জাহেল রাসুলুল্লাহর ﷺ কাছে গিয়ে তাঁকে অতিশয় দিচ্ছিল। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিরুত্তর। তিনি সাধারণত মুর্খদের কথার জবাব দিতেন না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে মুর্খদের সাথে তর্ক না করার আদেশ করেছেন।
তুচ্ছ বিষয় নিয়ে পড়ে থাকা একজন মুসলিমের পক্ষে সাজে না। যে কথায় সাড়া দিতে গিয়ে দাওয়াহ আর দাওয়াহ থাকে না, ব্যক্তিগত রেষারেষিতে পরিণত হয়। প্রায়ই দেখা যায় যে, ইসলামের শত্রুরা ইসলামের ভুল-ত্রুটি খুঁজতে ব্যর্থ হয়ে দাওয়ার চারিত্রিক দোষত্রুটি উগরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সময় তাদের কথার জবাব দেওয়ার অর্থ হলো লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়া, ইসলামের কথা বলার পরিবর্তে নিজের ব্যক্তিত্ব রক্ষা করতেই অধিক ব্যস্ত হয়ে পড়া। ফলে বক্তব্যের মূল বিষয় আর ইসলাম থাকে না। এ কারণে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে গিয়ে যদি কাউকে অপমানিত হতে হয়, তাহলে সেটা ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া উচিত নয়। সেগুলো পাশ কাটিয়ে দাওয়াহ দিতে থাকতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
“তাদের কথাবার্তা আপনার যে দুঃখ ও মনকষ্ট হয় তা আমি খুব ভালভাবেই জানি। কিন্তু তারা তো নিশ্চয়ই আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে না, বরং এই জালিমরা আল্লাহর আয়াতকেই অস্বীকার করে।” (সূরা আনআম, ৬: ৩৩)
আবু জাহেল এর আচরণ সেদিন সীমা ছাড়িয়ে যায়। হামযা তখন মাত্র শিকার থেকে ফিরছিলেন। এক দাসীর মুখে শুনলেন, তাঁর ভাতিজাকে আবু জাহেল অপমানিত করেছে, ইসলাম নিয়েও আজেবাজে বকেছে। তাঁর খুবই মন খারাপ হলো, রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর আত্মীয়, তাঁর ভাতিজা। ভাতিজা মুহাম্মদের উপর আক্রমণকে হামযা নিজের অপমান হিসেবে নিলেন। দ্রুত হেঁটে আবু জাহেলের কাছে গেলেন। আবু জাহেল, তাঁর সাঙ্গপাঙ্গ কুরাইশের অন্য সব নেতার সাথে কাবার সামনে বসে ছিল।
হামযার হাতে তখনও শিকারের সরঞ্জাম। আবু জাহেলকে দেখামাত্র হাতের ধনুকটা দিয়ে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করে বললেন, ‘তোমার কত বড় সাহস তুমি আমার ভাতিজাকে আঘাত করো? শুনে রাখো, আমি মুহাম্মদের ধর্ম অনুসরণ করছি। সাহস থাকে আমাকে মারো!’
আবু জাহেলের মাথা থেকে রক্ত পড়তে থাকে, তা দেখে বনু মাখযুম হামযার গায়ে হাত তুলতে উদ্যত হয়। বনু হাশিম উঠে দাঁড়ায় হামযার পক্ষে। দুই গোত্রের লোকেদের মধ্যে মারামারি বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হলে আবু জাহেল মধ্যস্থতা করে। তাদেরকে থামিয়ে বলে, 'না, ছেড়ে দাও হামযাকে। আমিই তাঁর ভাতিজা মুহাম্মাদকে বিশ্রীভাষায় গালিগালাজ করেছি।'
হামযা তখনো ইসলামের ওপর সত্যিকারের ঈমান আনেননি, দৃঢ় বিশ্বাস থেকে তিনি ইসলামের ঘোষণা দেননি, আবু জাহেলকে ক্ষেপিয়ে দেওয়ার জন্য জিদ করে কথার কথা বলেছিলেন। হামযা বাড়ি ফিরলেন। হঠাৎ তাঁর হুঁশ হলো, 'আরে! এটা আমি কী করলাম! ইসলাম গ্রহণ করে ফেললাম!" কিছুক্ষণ পর যখন মাথা ঠাণ্ডা হয়ে আসলো, তিনি পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলেন এবং আবিষ্কার করলেন তিনি বেশ ভালো সমস্যার মধ্যেই পড়েছেন! তিনি মুসলিম হবেন নাকি কাফির থেকে যাবেন সেটা নিয়ে ভাবনায় পড়ে গেলেন। যদি তিনি তাঁর মুখের কথা ফিরিয়ে নেন, সেটা তাঁর জন্য অসম্মানজনক ব্যাপার, কেননা তিনি ইতোমধ্যে আবু জাহেলকে মুখের উপর বলে ফেলেছেন তিনি মুসলিম হয়ে গেছেন। চট করে মুখের কথা বদলে ফেলা সে সমাজে ভালো চোখে দেখা হতো না। অন্যদিকে তাঁর কথার ওপর স্থির থাকাও কঠিন, কারণ তিনি আগে কখনো ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটা মাথাতেও আনেন নি।
তিনি সারারাত আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। বললেন, 'হে আল্লাহ, আমাকে সত্য পথ দেখান! আমাকে বলে দেন আমি সত্যের উপর আছি কি না।' কুরাইশরা মুশরিক হলেও আল্লাহর ইবাদত করতো। যখন তারা দুআ করতো, তারা তা আল্লাহর কাছেই করতো, কিন্তু যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হতো কেন তারা অন্য প্রভুদের ইবাদত করতো, তারা বলতো এই মূর্তিগুলো হলো মাধ্যম। তারা আল্লাহর কাছে ইবাদাত পৌঁছিয়ে দেয়। প্রকৃতপক্ষে তারা সংশয়ের মধ্যে ছিল।
পরদিন সকালের কথা, হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব বলেন, 'সকালে উঠেই অনুভব করলাম আমার অন্তর ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় ভরে গেছে! তাই আমি রাসূলুল্লাহর কাছে গেলাম এবং তাঁকে বললাম, আমি একজন মুসলিম!' প্রিয় চাচাকে পাশে পাওয়া ছিল রাসূলুল্লাহর জীবনে সবচেয়ে অসাধারণ মুহূর্তের একটি! হামযা মুসলিম হলেন, মন থেকে মুসলিম হলেন। আবু জাহেল চেয়েছিল নবীজিকে কষ্ট দিতে, অথচ তার এই অপকর্মের সূত্র ধরে শেষ পর্যন্ত হামযা মুসলিম হয়ে গেলেন!
এটাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পরিকল্পনা। মানুষ কখনই জানতে পারবে না কোন কাজের পরিণতি ভালো আর কোন কাজের পরিণতি খারাপ। ইবনে ইসহাক্ব বলেন, 'হামযা জিদের বশে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি ইসলামের ব্যাপারে সত্যিই আন্তরিক হয়ে যান।'
📄 উমার ইবন খাত্তাব ؓ
উমার ইবন খাত্তাব ছিলেন ইসলামের গোঁড়া শত্রু, কট্টর ইসলামবিদ্বেষী একজন মানুষ। অত্যন্ত নিষ্ঠা আর আন্তরিকতার সাথে তিনি মুসলিমদের নির্যাতন করতেন। একদিন আমর ইবন রাবিয়ার স্ত্রী লাইলার সাথে উমারের দেখা হয়, উমার তাকে বললেন, 'কোথায় চললে, উমো আবদুল্লাহ?'
- তোমরা আমাদের উপর অত্যাচার করেছো, তাই আমার রবের ইবাদত করার জন্য অন্য দেশে চলে যাচ্ছি।
- তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, তোমার ভ্রমণ নিরাপদ হোক।
উম্ম আবদুল্লাহ খুব অবাক হলেন উমার তো এমন সহানুভূতি নিয়ে মুসলিমদের সাথে কথা বলার পাত্র নন! ঘরে ফিরলে তাঁর স্বামীকে তিনি ঘটনাটি বললেন, তাঁর স্বামী হাসতে হাসতে বললেন,
- তুমি আশা করছো উমার মুসলিম হবে?
- হতেও তো পারে, কেন নয়?
- উমারের বাবার একটা গাধা আছে না? সেই গাধাটা মুসলিম হলেও হতে পারে কিন্তু উমার মুসলিম হবে না।³⁶
উমার সম্পর্কে কারোই উঁচু ধারণা ছিল না। জাহেলিয়াতের সময়ে উমার কেমন ছিলেন-সে বর্ণনা তিনি নিজেই দিয়েছেন:
"আমি মদ খেতে ভালবাসতাম। আমার কিছু মদ্যপায়ী সঙ্গী ছিল, তাদের সাথে প্রতি রাতে দেখা করতাম, আড্ডা মারতাম। এক সন্ধ্যায় বের হলাম, মদশালায় গিয়ে দেখি কেউ নাই। তখন রাত হয়েছে, ভাবলাম মদের দোকানে যাই, কিন্তু গিয়ে দেখি দোকানও বন্ধ। অনেক খুঁজেও সময় কাটানোর মতো কিছুই পেলাম না। তখন ভাবলাম, যাই দেখি, কাবাঘরে গিয়ে কাবার চারপাশে তাওয়াফ করি। তাওয়াফ করতে গিয়ে দেখলাম, সেখানে আমি বাদে আরও একজন আছেন-মুহাম্মাদ! আমি আর তিনি ছাড়া আর কেউ নেই। তবে তিনি আমার উপস্থিতি টের পাননি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ জেরুসালেমের দিকে মুখ করে কাবায় সালাত আদায় করছিলেন। আমি আস্তে আস্তে হেঁটে সামনের দিকে আসলাম। কাবার চাদরের আড়ালে চুপচাপ লুকিয়ে আছি। মুহাম্মাদ তখন আমার একদম সামনে দাঁড়িয়ে, কিন্তু চাদরের কারণে আমাকে দেখতে পান নি। আমি এত কাছে যে তাঁর তিলাওয়াত শুনতে পাচ্ছি। তিনি সূরা আল হাক্কাহ থেকে তিলাওয়াত করছেন-কুরআন শুনে আমার বুক ঠাণ্ডা হয়ে গেল। নিজেকে বোঝালাম, এগুলো নিশ্চয়ই কোনো কবির কথা। এ কথা ভাবার পরেই সূরা আল হাক্কাহর পরের যে আয়াতটি রাসূলুল্লাহ ﷺ তিলাওয়াত করলেন তা হলো,
"এগুলো কোনো কবির কথা নয়, তোমাদের খুব অল্প লোকই সেটা বিশ্বাস করে থাকো।” (সূরা হাক্কাহ:৪১)
আমি হতচকিত হয়ে গেলাম। নিজেকে বললাম, তাহলে নিশ্চয়ই কোনো গণকের কথা। আর এরপরের আয়াতেই ছিল,
"এগুলো কোন গণকের কথা নয়, খুব কমই তোমরা স্মরণ কর।” (সূরা হাক্কাহ: ৪২)"
একটি বর্ণনা অনুসারে এই ঘটনার পর উমার (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন।³⁷ অন্য মত অনুসারে, এই ঘটনা উমারকে খুব নাড়া দেয়, তার অন্তরে কুফরের ভিত দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর রাসূল ও মুসলিমদের প্রতি তাঁর ঘৃণা কমলো না। একদিন সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলেন, তিনি কুরাইশদের এই ঝামেলা দূর করবেন, দীর্ঘদিনের অনৈক্যের অবসান একমাত্র এক ভাবেই ঘটবে-যে করেই হোক, মুহাম্মাদকে হত্যা করতে হবে। মক্কাকে "সাবেইন” (মুসলিমদের) হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।
উমার বদ্ধপরিকর। নবীজির খোঁজ করা শুরু করলেন, খুঁজে পেলেই হত্যা। জানতে পারলেন দারুল আরকামে রাসূলুল্লাহ তাঁর চল্লিশ অনুসারীসহ আছেন। উমার একাই চললেন, হাতে উন্মুক্ত তলোয়ার। তিনি জানতেন মুহাম্মাদকে হত্যা করতে গেলে তাকেও মেরে ফেলা হতে পারে, কিন্তু তিনি সেসব পরোয়া করেন না। রাস্তায় তাঁর এক আত্মীয় নাঈমের সাথে দেখা। নাঈম গোপনে মুসলিম হয়েছিলেন, উমার ইবন খাত্তাবের চোখ দেখেই নাঈম বুঝে গেলেন উমার খুব রেগে আছেন, নিশ্চয়ই খারাপ কিছু ঘটাবেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,
- কোথায় যাচ্ছো উমার?
মুহাম্মাদকে হত্যা করতে যাচ্ছি, কোনো রাখঢাক না রেখে অকপটে নিজের উদ্দেশ্য জানিয়ে দিলেন উমার।
পরিস্থিতি গুরুতর দেখে নাঈম তৎক্ষণাৎ বুদ্ধি করে বললেন,
- আগে তোমার নিজের বাড়িরই খোঁজ নাও, তারপরে মুহাম্মাদ!
- কেন? কী হয়েছে! আমার বাড়িতে আবার কী সমস্যা? উমার জানতে চাইলেন।
- যাও খোঁজ নিয়ে দেখ, তোমার আপন বোন মুসলিম হয়ে গেছে।
এই কথা বলে নাঈম রাসূলুল্লাহকে বাঁচালেও উমারের বোন আর তাঁর স্বামীকে বিপদে ফেলে দিলেন। উমারের বোন ফাতিমা ছিলেন সাঈদ ইবন যায়িদ ইবন আমর ইবন নুফাইলের স্ত্রী। সাঈদ ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজনের একজন। উমার এবার তাঁর গন্তব্য পরিবর্তন করে বোনের বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। সেখানে তাঁর বোন ফাতিমা আর তাঁর স্বামী সাঈদকে কুরআন শিক্ষা দিচ্ছিলেন খাব্বাব ইবন আরাত। খাব্বাব তাদেরকে ভাঁজ করা একটি কাগজ থেকে সূরা ত্ব-হা পড়ে শুনাচ্ছিলেন।
উমার ইবন খাত্তাবের পায়ের শব্দ শুনে খাব্বাব লুকিয়ে পড়লেন। ফাতিমাও চট করে কাগজটি নিয়ে লুকিয়ে ফেলেন। উমার ভিতরে এসে বললেন,
- কী সব আবোল-তাবোল বকছিলে তোমরা শুনি?
- কই! আমরা তো কিছু শুনিনি।
- আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু একটা তিলাওয়াত করতে শুনেছি। বলো সেটা কী ছিল। আমি শুনলাম তোমরা নাকি মুসলিম হয়ে গেছো?
এই কথা বলেই তিনি হঠাৎ সাঈদ ইবন যায়িদকে আঘাত করে বসলেন আর তাঁকে ঘুষি মারতে গেলেন। ফাতিমা স্বামীকে বাঁচাতে ছুটে গেলেন, তাঁর মুখেও উমার ইবন খাত্তাব আঘাত করে বসলেন।
ফাতিমার মুখ থেকে রক্ত পড়তে লাগলো। এ দৃশ্য দেখে উমার অপ্রস্তুত হয়ে যান, তাঁর খারাপ লাগতে থাকে, তিনি অনুতপ্ত হয়ে বোনের কাছে মাফ চাইলেন। ফাতিমা বললেন,
- হ্যাঁ, আমি ও আমার স্বামী দুজনই মুসলিম হয়েছি। তুমি যা খুশি করো।
- তোমরা যে কাগজটি পড়ছিলে, সেটা আমাকে দাও, উমার বললেন।
- না, দেব না। তুমি মুশরিক, তুমি নাপাক।
- ঠিক আছে, আমি কথা দিচ্ছি, আমি সেটা নষ্ট করবো না।
উমার ইবন খাত্তাব নিজেকে পরিষ্কার করে ফিরে আসলে তাঁর বোন তাঁকে ভাঁজ করা কাগজটি দিলেন। উমার কাগজ থেকে সূরা ত্ব-হা'র প্রথম আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন।
"ত্ব-হা। আপনাকে ক্লেশ দেবার জন্য আমি আপনার প্রতি কোরআন অবতীর্ণ করিনি। কিন্তু তাদেরই উপদেশের জন্য যারা ভয় করে। এটা তাঁর কাছ থেকে অবতীর্ণ, যিনি ভূমন্ডল ও সমুচ্চ নভোমন্ডল সৃষ্টি করেছেন। তিনি পরম দয়াময়, আরশে সমুন্নত হয়েছেন। নভোমণ্ডলে, ভূমণ্ডলে, এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এবং সিক্ত ভূগর্ভে যা আছে, তা তাঁরই। যদি তুমি উচ্চকণ্ঠেও কথা বল, তিনি তো গুপ্ত ও তদপেক্ষাও গুপ্ত বিষয়বস্তু জানেন। আল্লাহ যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য ইলাহ নেই। সব সৌন্দর্যমন্ডিত নাম তাঁরই।" (সূরা ত্ব-হা, ২০: ১-৮)
উমার ইবন খাত্তাব তিলাওয়াত শেষ করে বললেন, 'কথাগুলো তো অসাধারণ!' খাব্বাব ইবন আরাত এতক্ষণ লুকিয়ে ছিলেন, উমারের এই কথা শুনে বের হয়ে এলেন, বললেন, 'উমার! আশা করি আল্লাহ আপনাকে বেছে নেবেন। গতকাল আমি শুনেছি আল্লাহর নবী দুআ করছিলেন, হে আল্লাহ! যেকোনো একজন উমারকে পথ দেখান-উমার ইবন খাত্তাব অথবা উমার ইবন হিশাম। আমি আশা করছি আপনাকেই আল্লাহ নির্বাচন করেছেন।'
রাসূলুল্লাহ ﷺ মাত্র একদিন আগেই আল্লাহর কাছে এই দুআ করেছিলেন যে, আল্লাহ যেন দুইজন উমারের মধ্যে একজনকে পথ দেখান-উমার ইবন খাত্তাব অথবা উমার ইবন হিশাম (আবু জাহেল)। নবীজি আল্লাহর কাছে এই দুইজনের একজনের মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করার জন্য দুআ করেছিলেন। উমার ইবন খাত্তাব খাব্বাবকে বললেন, 'আমি মুসলিম হতে চাই। আমাকে মুহাম্মাদের কাছে নিয়ে চলো।' খাব্বাব তাঁকে বললেন, 'আপনি দারুল আরকামে গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করুন।' উমার ইবন খাত্তাব দারুল আরকামে গিয়ে দরজার কড়া নাড়লেন। সেই সময়ে রাসূলুল্লাহ সাহাবাদের নিয়ে গোপন বৈঠক করছিলেন। সে সময় মক্কায় প্রকাশ্যে ইসলামের কোনো কার্যক্রম হতো না, তাই এই গোপন বৈঠকের আয়োজন।
সাহাবাদের মধ্যে একজন উঠে দরজার ওপাশে উঁকি দিয়ে দেখে রাসূলুল্লাহকে জানালেন উমার এসেছে। খানিকটা শঙ্কা, খানিকটা বিস্ময় মেশানো কন্ঠে সেই সাহাবা বললেন, 'উমার ইবন খাত্তাব বাইরে দাঁড়িয়ে! তাঁর সাথে তলোয়ার!' আরেকজন সাহাবী সাহস করে প্রস্তাব দিলেন দরজা খোলা হোক। কিন্তু উমার ইবন খাত্তাবের মুখোমুখি হওয়ার মতো সাহস সবার ছিল না। যার ছিল তিনি হলেন হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব। হামযা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, যদি উমার ভালো নিয়তে এসে থাকে তাহলে আমরা তাঁর সাথে সুন্দরভাবে বোঝাপড়া করে নেব। কিন্তু যদি সে খারাপ নিয়তে আসে, তাহলে তাঁর তলোয়ার দিয়েই তাকে মারবো।' রাসূলুল্লাহ হামযাকে বললেন, 'সমস্যা নেই, আমি নিজেই দরজা খুলে ব্যাপারটা দেখছি।' রাসূলুল্লাহ এগিয়ে গিয়ে দরজা খুললেন।
রাসূলুল্লাহ ছিলেন মাঝারী উচ্চতা ও মাঝারী গড়নের, অন্যদিকে উমার ইবন খাত্তাব ছিলেন দীর্ঘাকায়, সুঠামদেহী। বিশালদেহী উমারের পোশাক ধরে তাকে টেনে ভিতরে এনে রাসূলুল্লাহ বললেন, 'উমার! তুমি কবে এসব বন্ধ করবে? তুমি কি আল্লাহর পক্ষ থেকে আযাবের জন্য অপেক্ষা করছো?' উমার ইবন খাত্তাব বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি মুসলিম হতে এসেছি।'
রাসূলুল্লাহ বলেন উঠলেন, 'আল্লাহু আকবর!' ঘটনাটি ঘটছিল দরজার সামনে। সাহাবারা অন্য ঘরে থাকায় কিছুই দেখতে বা শুনতে পাননি। কিন্তু আল্লাহু আকবার শুনেই বুঝতে পারলেন যে, উমার মুসলিম হয়ে গেছেন। তাঁরা এই খবরে এত খুশি হলেন যে, জোরে জোরে তাকবীর দিতে লাগলেন - আল্লাহু আকবর! আল্লাহু আকবর!³⁸ মক্কার লোকেরা তাদের তাকবীর শুনে ফেললো, সেদিনের মত সভা ভেঙে সবাই তাড়াহুড়ো করে সরে পড়লেন।
'উমারের মুসলিম হওয়া ছিল বিজয়, তাঁর মদীনায় হিজরত ছিল ইসলামের সহায় আর তাঁর শাসন ছিল রাহমাহ।'
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের একটি কথায় বোঝা যায় উমার ইসলামের ইতিহাসে কতো উঁচু স্থান দখল করে আছেন। উমারের ইসলাম গ্রহণ ছিল ইসলামের ইতিহাসে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া একটি ঘটনা। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেন, 'উমার মুসলিম হওয়ার আগে আমরা কখনও কাবাঘরের সামনে প্রকাশ্যে সালাত আদায় করতে পারতাম না।' তাঁর ইসলাম গ্রহণ পুরো মুসলিম সমাজের পরিস্থিতি বদলে দেয়। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ আরও বলেন, 'উমার মুসলিম হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা আমাদের ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রাখতাম। তিনি মুসলিম হওয়ার পর আমরা গর্বের সাথে আমাদের ইসলামের কথা বলে বেড়াতাম।'
সীরাতের এক বর্ণনায় এসেছে, যখন উমার মুসলিম হন, রাসূল মুসলিমদের দুই সারিতে দাঁড় করান। এক সারির নেতা হামযা, আরেক সারির নেতা উমার, তাঁরা ইসলামের ঘোষণা দিতে দিতে মক্কার রাস্তায় প্রকাশ্যে হাঁটতে থাকেন, আর রাসূল এই দুই সারির মধ্য দিয়ে হেঁটে যান।
উমার ইবন খাত্তাব মুসলিম হওয়ার পর জানতে চান, 'মক্কার সবচেয়ে বড় মুখ কার? কে পারবে আমার ইসলাম গ্রহণের খবর সবার কাছে ছড়িয়ে দিতে?' উমার ইবন খাত্তাব এই খবর চুপিসারে প্রকাশ করতে চাননি, তিনি চেয়েছিলেন সবাই জানুক যে তিনি মুসলিম হয়েছেন। তাকে বলা হলো জামিল আজ-জুমাহির কথা, সে ছিল মক্কার মিডিয়া। মজার এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন উমারের ছেলে আবদুল্লাহ ইবন উমার, তাঁর ভাষায়:
'ঐসময় আমি বেশ ছোট, কিন্তু সেদিন যা দেখেছি তার সবই মনে করতে পারি। আমি বাবার পিছুপিছু গেলাম। বাবা জামিল আজ-জুমাহিকে বললেন,
- তুমি কি জানো আমি কী করেছি?
- কী করেছেন আপনি?
- আমি মুসলিম হয়েছি।
ব্যস, এতটুকুই। জামিল এই খবর শোনা মাত্র সাথে সাথে তার জোব্বা টেনে তুলে দৌড়ে কাবাঘরের দিকে গেল আর সবার সামনে গিয়ে তারস্বরে চিৎকার করে বলতে লাগলো, 'হে কুরাইশের লোকসকল! উমার সাবিঈন হয়ে গেছে। উমার সাবিঈন হয়ে গেছে!' সাবিঈন শব্দটা শুনে উমার তাকে শুধরে দিয়ে বললেন, 'আরে, সাবিঈন না, বলো আমি মুসলিম হয়েছি।' কিন্তু কে শোনে কার কথা! জামিল তখন এই 'তাজা খবর' প্রচার করতে চারিদিকে পাগলের মত ছুটছে।
এই খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে মানুষ সবদিক দিয়ে বাবাকে ঘিরে ধরলো। তারা তাঁকে মারতে লাগলো আর তিনিও তাদের সাথে মারামারি করতে লাগলেন। ঘন্টাখানেক ধরে এভাবে চললো। সূর্য যখন একেবারে মাথার উপরে, তখন তারা ক্লান্ত হয়ে ক্ষান্ত দিল।'
উমার ইবন খাত্তাব বাড়ি ফিরলেন, সেখানেও লোকজন তাঁর বাড়ি ঘেরাও করলো। তারা তাঁকে মেরেই ফেলবে। উমারের ইসলাম গ্রহণ ছিল তাদের জন্য বিরাট ধাক্কা, তারা সহ্যই করতে পারছিল না বিষয়টা। তাঁর ঘরে এক লোক আসলো, তিনি উমারকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হয়েছে?' উমার বললেন, 'এরা আমাকে মেরে ফেলতে চায়।' লোকটি বললো, 'বিষয়টা আমি দেখছি, তারা তোমাকে মারবে না।' এরপর তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'এই মানুষটিকে তোমরা একা ছেড়ে দাও। তাঁর কি নিজের পছন্দমতো ধর্ম গ্রহণ করার অধিকার নেই? আমি তাঁকে নিরাপত্তা দিচ্ছি।' এ কথা শুনে সবাই চলে গেল।
অনেকদিন পরের কথা, আবদুল্লাহ ইবন উমার তাঁর বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আচ্ছা বাবা, সেদিন আপনাকে যে লোকটা সাহায্য করেছিল তিনি কে ছিলেন?' উমার বললেন, 'তিনি হলেন আল আস ইবন ওয়াইল।' আল আস ইবন ওয়াইল ছিলেন আমর ইবন আসের পিতা, তিনি মুসলিম ছিলেন না। উমার ইবন খাত্তাবের গোত্র খুব একটা শক্তিশালী ছিল না, কিন্তু আল আস ইবন ওয়াইলের গোত্রের সাথে তাদের মিত্রতা ছিল।³⁹
টিকাঃ
৩৬. সীরাহ ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০১।
৩৭. সীরাহ ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৫।
৩৮. সীরাহ ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০০।
৩৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৬।
📄 উমার ইবন খাত্তাবের ؓ ইসলাম গ্রহণ থেকে শিক্ষা
১। রাসূলুল্লাহর জীবন থেকে একজন আদর্শ নেতৃত্বের গুণাবলি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ মানুষ চিনতেন, তাই তিনি উমার ইবন খাত্তাব অথবা আবু জাহেলের হিদায়াত চেয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করেছিলেন। উমার ইবন খাত্তাব এবং আবু জাহেলের এমন কিছু গুণ ছিল যে গুণগুলোর কারণে তারা বড় মাপের নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখতেন। আবু জাহেলকে তার গোত্রের লোকেরা আবুল হাকাম বলে ডাকত, এর মানে হলো জ্ঞানের পিতা। কিন্তু অনেক বড় বুদ্ধিজীবি হওয়া সত্ত্বেও সে ইসলামে প্রবেশ করেনি, আর এ কারণে রাসূলুল্লাহ তার নাম দিয়েছিলেন আবু জাহেল, যার মানে মূর্খের পিতা। এ দুজন মানুষ ছিলেন দৃঢ়চেতা, নিজেদের আদর্শ ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর। তারা যা বিশ্বাস করতেন, তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। তারা ছিলেন তেজী ও সাহসী, কঠিন পরিস্থিতিতে সবাইকে ছাপিয়ে উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাদের ছিল। আর তাদের মধ্যে এই গুণাবলির সমন্বয় দেখেই আল্লাহর রাসূল তাদের জন্য দুআ করেছিলেন।
২। রাসূলুল্লাহর চরিত্র থেকে নেতৃত্বের আরেকটি গুণ শেখার আছে। সেটি হলো মানুষ চিনতে পারা এবং তাদের সমস্যা বুঝে তাদের অন্তরের রোগের সঠিক চিকিৎসা করা। উমার ইবন খাত্তাবের অন্তর ছিল মুসলিমদের প্রতি ঘৃণায় পরিপূর্ণ। তাই যখন উমার মুসলিম হন, রাসূল জানতেন তাঁর সমস্যাটি আসলে কোথায় এবং সেই সমস্যার প্রতিকার কী। রাসূলুল্লাহ তাঁর হাত উমার ইবন খাত্তাবের বুকে রেখে একটি দুআ পড়েছিলেন, 'হে আল্লাহ, তার অন্তরকে আপনি ঘৃণা থেকে মুক্ত করে দিন'-দুআটি তিনি তিনবার পড়েন।
৩। রাসূল বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে যারা জাহেলিয়াতে শ্রেষ্ঠ, তারা ইসলামেও শ্রেষ্ঠ, যদি তাদের দ্বীনের বুঝ থাকে।' এই কথার দ্বারা রাসূলুল্লাহ বুঝাতে চেয়েছেন যে, ইসলাম গ্রহণের পূর্ব থেকে যারা ভালো গুণের অধিকারী হয়, ইসলাম গ্রহণের পরে তারাই সবচেয়ে ভালো মুসলিম হতে পারে, যদি তাদের দ্বীনের বুঝ থাকে।