📄 উসমান ইবন মাযউন ؓ
তিনি ছিলেন একজন মুহাজির। প্রথম হিজরতের পর তিনি আবিসিনিয়া থেকে মক্কায় ফিরে আসতে চান। যেহেতু তিনি মক্কা ছেড়ে হিজরত করেছিলেন, তাই কারো পক্ষ থেকে নিরাপত্তার আশ্বাস ব্যতীত মক্কায় নিরাপদে প্রবেশ করতে পারছিলেন না। ওয়ালীদ ইবন মুগীরা তাঁকে নিরাপত্তা দান করলো। সে ছিল মক্কার বয়স্ক ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একজন। ওয়ালিদ ইবন মুগিরার নিরাপত্তায় উসমান ইবন মাযউন মক্কায় প্রবেশ করেন। মক্কায় ফিরে এসে আবিষ্কার করেন যে, তিনি ছাড়া অন্য সব মুসলিমরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে! নিজের নিরাপদ জীবন তাঁকে এতটুকু খুশি করলো না, মজলুম মুসলিমরা তাঁকে ঈর্ষান্বিত করে তুললো! তাঁর কাছে মনে হলো তিনি বাদে অন্য সবার গুনাহ মাফ হয়ে যাচ্ছে আর তিনি কিছুই করতে পারছেন না। তাই তিনি ওয়ালিদের কাছে ফিরে গিয়ে বললেন যে তাঁর নিরাপত্তার কোনো দরকার নাই, তিনি সেটা ফিরিয়ে দিতে এসেছেন। ওয়ালিদ বললেন,
- তুমি কেন এটা করছো?'
- আমি শুধু আল্লাহর নিরাপত্তা চাই, তোমার নিরাপত্তা চাই না।
- ঠিক আছে, যেহেতু আমি প্রকাশ্যে তোমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছি, সেহেতু এই নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেওয়ার ঘোষণাও প্রকাশ্যেই দিতে হবে।
তারা কাবাঘরে গেলেন। আল-ওয়ালিদ ইবন মুগীরা বললো, 'উসমান ইবন মাযউন আমার নিরাপত্তা আর চায় না, সে ফিরিয়ে দিয়েছে।' উসমান ইবন মাযউন বললেন, 'হ্যাঁ, আমি ওয়ালিদ ইবন মুগীরাকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও সৎ লোক হিসেবে পেয়েছি, কিন্তু আমি একমাত্র আল্লাহর নিরাপত্তার মধ্যে আসতে চাই।'
কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো উসমান ইবন মাযউন একটা জনসমাবেশে এসেছেন। সেখানে তখন আরবের বিখ্যাত কবি লাবীদ তার একটা কবিতা আবৃত্তি করছিল, 'আল্লাহ ছাড়া সবকিছুই অসার!' উসমান তাল মেলালেন, বললেন, 'ঠিক! ঠিক!' ওই সমাবেশে অনেক লোক জমা হয়েছিল। কবি বলে চললো, 'আর সব সুখ তো ম্লান হয়ে যাবে!' উসমান তার কবিতার মাঝপথে বাধা দিয়ে বললেন, 'না না, তুমি ভুল বলেছো, জান্নাতের সুখ কখনই ম্লান হবে না!'
কবি লাবীদ একটা ধাক্কা খেল। সে তার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না যে, তার শ্রোতাদের মধ্যে কেউ এভাবে তার ভুল ধরিয়ে দেবে! কুরাইশদের উদ্দেশ্যে বললো, 'কে এই লোক? তোমাদেরকে এভাবে হেয় করার সাহস সে কোথা থেকে পেল?' শ্রোতাদের মধ্যে কেউ একজন বললো, 'বাদ দিন, সে হচ্ছে এক মাথামোটা, মুহাম্মাদের ধর্ম অনুসরণ করে। এর কথায় আপনি কিছু মনে করবেন না।' উসমান ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন! তিনি এই কথার জবাব দিয়ে বসলেন। ব্যস, শুরু হয়ে গেলো তাদের মধ্যে হাতাহাতি-মারামারি। এক পর্যায়ে কুরাইশরা উসমানের চোখে ঘুষি মেরে বসে।
আল-ওয়ালিদ ইবন মুগীরা এই ঘটনা দেখলো। উসমানের কাছে এসে বললো,
- কী দরকারটা ছিল তোমার চোখের বারোটা বাজানোর? তুমি তো আমার নিরাপত্তার মধ্যেই ছিলে, কেন সেটা ফিরিয়ে দিতে গেলে?'
– ঈমানে বলীয়ান উসমান ইবন মাযউন তেজদীপ্ত গলায় বললেন,
- না, বিষয়টা তেমন না। আল্লাহর শপথ, আমি তো চাই আমার ভালো চোখটিও যদি আঘাত পাওয়া চোখের মতো হতো! সত্যি বলতে কী, আমি এমন একজনের নিরাপত্তায় আছি যিনি তোমার চেয়ে শক্তিশালী এবং ক্ষমতাবান।
- তুমি কি আমার নিরাপত্তার মধ্যে ফিরে আসতে চাও?
– নাহ, আমার প্রয়োজন নেই।³⁴
একজন কাফের বা মুশরিক কিছু হারালে সেটা ক্ষতির খাতায় ফেলে দেয়, কষ্ট-ব্যথা-বেদনাকে ক্ষতি বাদে অন্য কোনো নজরে দেখার ক্ষমতা তাদের নেই। কিন্তু একই ঘটনা একজন মুসলিমের জন্য সুসংবাদ। মার খেয়ে, ফোলা চোখ নিয়েও উসমান ইবন মাযউন ভাবছেন, ব্যথার বিনিময়ে কিছু গুনাহ মাফ হলো। এটাই মুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গী, ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গী।
টিকাঃ
৩৪. সীরাহ ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪১।
📄 আবু বকর ؓ
আবু বকর সিদ্দিক আবিসিনিয়ায় হিজরত করেননি। মক্কায় তাঁকে বেশ কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছিল। তাই তিনি রাসূলুল্লাহর কাছে হিজরতের অনুমতি চাইলেন। রাসূলুল্লাহ তাঁকে অনুমতি দিলেন। আবু বকর মক্কা ছেড়ে ইয়েমেন গেলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি সায়িদ আল হাবিশ গোত্রের কাছে যান। আল-হাবিশ মক্কার নিকটবর্তী একটা গোত্র। আবু বকর সেখানে ইবনে দুগায়নার সাথে দেখা করলেন। ইবন দুগায়না তাকে বললো,
- আবু বকর, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
- আমার স্বজাতির লোকেরা আমাকে কষ্ট দিয়েছে, খুব খারাপভাবে আঘাত করেছে, একারণে আমি চলে আসতে বাধ্য হয়েছি।
- তোমার মতো একজন মানুষ তো তাঁর স্বজাতির একটা সম্পদ। এভাবে তো তুমি চলে আসতে পার না। তুমি দুঃখীদের সাহায্য করো, গরিবদের প্রতি সহানুভূতিশীল। তারা তোমাকে তাড়িয়ে দিতে পারে না। তুমি মক্কায় ফিরে যাও, আমি তোমাকে নিরাপত্তা দেব।
তিনি আবু বকরকে সাথে করে মক্কায় আসেন এবং মক্কার সমস্ত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, 'আবু বকর আমার নিরাপত্তার মধ্যে আছেন। আমি বুঝি না এরকম একজন মানুষকে তোমরা কীভাবে দেশ থেকে তাড়িয়ে দাও? সে তোমাদের সম্পদ, তোমরা কীভাবে তাঁর মতো একটা মানুষকে তাড়িয়ে দিতে পারলে? আজকে থেকে তিনি এখানে থাকবেন এবং আমার নিরাপত্তার অধীনে থাকবেন।'
কুরাইশের লোকেরা ইবন দুগায়নার কাছে এসে বললো, 'ঠিক আছে আমরা তোমার নিরাপত্তা মেনে নিচ্ছি। কিন্তু আমরা চাই না আবু বকর প্রকাশ্যে ইবাদত করুক। সুতরাং দয়া করে এটা নিশ্চিত করো যে, সে এই কাজ করবে না।' ইবন দুগায়না আবু বকরের কাছে এসে বললো, 'তোমার স্বজাতির লোকেরা চায় না যে, তুমি তাদের কষ্ট দাও। সুতরাং প্রকাশ্যে সালাত আদায় কোরো না।' আগে আবু বকর ঘরের বাইরে সবার সামনে ইবাদত করতেন। আ'ইশা বলেন, 'আমার বাবা খুবই নরম মনের একজন মানুষ। কুরআন তিলাওয়াত করার সময় তিনি খুব কাঁদতেন।' নারী-পুরুষ-বালক সবাইকে আবু বকরের খুশু আকৃষ্ট করতো। এটা দেখে কুরাইশরা ক্ষেপে যায়। তাদের আশঙ্কা-আবু বকরের প্রকাশ্য সালাত আদায় দেখে লোকেরা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যাবে।
তাই ইবন দুগায়না আবু বকরকে প্রকাশ্যে ইবাদত করতে মানা করেন। আবু বকর রাজি হন। কিছুদিন আবু বকর তাঁর বাড়িতে গোপনে ইবাদত করেন। কিন্তু এরপর তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে। তিনি তাঁর বাড়ির উঠোনে একটা মুসল্লা বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তাই যদিও তিনি বাড়ির ভিতরেই ইবাদত করছিলেন, কিন্তু লোকজন সেটা বাইরে থেকে দেখতে পেত। আগের সেই সমস্যা আবার ফিরে এল। লোকজন জড়ো হয়ে তাঁর ইবাদত দেখতে লাগল। কুরাইশরা রেগেমেগে আবার ইবন দুগায়নার কাছে গেলো। বললো, 'আমরা তোমাকে বলেছি, আমরা চাই না সে প্রকাশ্যে ইবাদত করুক, কিন্তু সে তো সেটাই করছে!' ইবন দুগায়না আবু বকরের কাছে গিয়ে এ কথা তুললে আবু বকর বললেন, 'থাক, আমি আপনার নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিচ্ছি। আমার এর প্রয়োজন নেই। আমি আল্লাহর দেওয়া নিরাপত্তায় থাকব।' শেষ পর্যন্ত তিনি ইবন দুগায়নার নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিলেন।³⁵
টিকাঃ
৩৫. সীরাহ ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৭।
📄 আবু বকরের ؓ কাহিনি থেকে শিক্ষণীয় বিষয়
১। যখন ইবন দুগায়না তাঁকে জিজ্ঞেস করেন যে, কেন তিনি দেশান্তরিত হচ্ছেন, তখন আবু বকর বলেছিলেন, 'আমি আমার রবের ইবাদত করার জন্য হিজরত করতে চাই।' আবু বকর হিজরত করেছিলেন শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার জন্য, ব্যবসা বা অন্য কোনো দুনিয়াবী কারণে ভ্রমণ করেননি।
২। ইবন দুগায়না আবু বকর সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা রাখতেন। পুণ্যবান মানুষ হিসেবে আবু বকরের বিশেষ খ্যাতি ছিল, তিনি অভাবীদের যত্ন নিতেন, দরিদ্রদের দান করতেন, সত্যের পক্ষ নিতেন। পৃথিবীর যেকোনো বিবেকবান মানুষ আবু বকরের গুণগুলোর কদর করতে বাধ্য। মুসলিমদের চরিত্র এমনই হওয়া উচিত। তারা যে দেশেরই হোক না কেন, তাদের মধ্যে এমন কিছু গুণ থাকা চাই যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে কদর করবে। এ সমস্ত গুণাবলির কারণেই ইবন দুগায়না আবু বকর সিদ্দিককে নিরাপত্তার প্রস্তাব দিয়েছিল।
৩। আবু বকরের সালাত ছিল এক প্রকারের দাওয়াহ। প্রকাশ্যে ইসলামের আচার-অনুষ্ঠান পালন করা এক ধরনের দাওয়াহ। যেমন হাজ্জ, সালাত, সাওম ইত্যাদি প্রকাশ্যে করা। মানুষকে দেখতে দেওয়া উচিত মুসলিমরা কীভাবে ইসলাম পালন করে। কুরাইশরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এ কারণেই। তারা জানত যে, প্রকাশ্যে ইবাদত করলে সেটা মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করবে। কেননা আল্লাহ তাআলা ইসলামের যেসব ইবাদাত ও আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে হুকুম দিয়েছেন সেগুলো অনন্য, হৃদয়গ্রাহী।
৪। ইসলামের বার্তাকে প্রকাশ করে দেওয়া। মুসলিমরা যদি গোপনে ইবাদত করে তাতে আল্লাহর দুশমনদের কিছুই আসে যায় না। কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু ঘটতে দেখলেই তারা প্রতিরোধ করবে। তাই ঠিক সেটাই মুসলিমদের করা উচিত। এমন কাজ করা উচিত যাতে মানুষকে ভালো জিনিস দ্বারা আকৃষ্ট করা যায় যেন তারা মুসলিম হয়। আর ভালো অন্তর ভালো জিনিস দ্বারাই আকৃষ্ট হয়।
📄 হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব ؓ
হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব ছিলেন একজন শিকারী। প্রায়ই মরুভূমিতে শিকারে বেরিয়ে পড়তেন আর ফিরে এসে অন্যদের কাছে শোনাতেন অভিযানের রোমহর্ষক সব কাহিনি। একদিন তিনি শিকারের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন। সে সুযোগে আবু জাহেল রাসুলুল্লাহর ﷺ কাছে গিয়ে তাঁকে অতিশয় দিচ্ছিল। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিরুত্তর। তিনি সাধারণত মুর্খদের কথার জবাব দিতেন না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে মুর্খদের সাথে তর্ক না করার আদেশ করেছেন।
তুচ্ছ বিষয় নিয়ে পড়ে থাকা একজন মুসলিমের পক্ষে সাজে না। যে কথায় সাড়া দিতে গিয়ে দাওয়াহ আর দাওয়াহ থাকে না, ব্যক্তিগত রেষারেষিতে পরিণত হয়। প্রায়ই দেখা যায় যে, ইসলামের শত্রুরা ইসলামের ভুল-ত্রুটি খুঁজতে ব্যর্থ হয়ে দাওয়ার চারিত্রিক দোষত্রুটি উগরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সময় তাদের কথার জবাব দেওয়ার অর্থ হলো লক্ষ্য থেকে সরে যাওয়া, ইসলামের কথা বলার পরিবর্তে নিজের ব্যক্তিত্ব রক্ষা করতেই অধিক ব্যস্ত হয়ে পড়া। ফলে বক্তব্যের মূল বিষয় আর ইসলাম থাকে না। এ কারণে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে গিয়ে যদি কাউকে অপমানিত হতে হয়, তাহলে সেটা ব্যক্তিগতভাবে নেওয়া উচিত নয়। সেগুলো পাশ কাটিয়ে দাওয়াহ দিতে থাকতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
“তাদের কথাবার্তা আপনার যে দুঃখ ও মনকষ্ট হয় তা আমি খুব ভালভাবেই জানি। কিন্তু তারা তো নিশ্চয়ই আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে না, বরং এই জালিমরা আল্লাহর আয়াতকেই অস্বীকার করে।” (সূরা আনআম, ৬: ৩৩)
আবু জাহেল এর আচরণ সেদিন সীমা ছাড়িয়ে যায়। হামযা তখন মাত্র শিকার থেকে ফিরছিলেন। এক দাসীর মুখে শুনলেন, তাঁর ভাতিজাকে আবু জাহেল অপমানিত করেছে, ইসলাম নিয়েও আজেবাজে বকেছে। তাঁর খুবই মন খারাপ হলো, রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর আত্মীয়, তাঁর ভাতিজা। ভাতিজা মুহাম্মদের উপর আক্রমণকে হামযা নিজের অপমান হিসেবে নিলেন। দ্রুত হেঁটে আবু জাহেলের কাছে গেলেন। আবু জাহেল, তাঁর সাঙ্গপাঙ্গ কুরাইশের অন্য সব নেতার সাথে কাবার সামনে বসে ছিল।
হামযার হাতে তখনও শিকারের সরঞ্জাম। আবু জাহেলকে দেখামাত্র হাতের ধনুকটা দিয়ে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করে বললেন, ‘তোমার কত বড় সাহস তুমি আমার ভাতিজাকে আঘাত করো? শুনে রাখো, আমি মুহাম্মদের ধর্ম অনুসরণ করছি। সাহস থাকে আমাকে মারো!’
আবু জাহেলের মাথা থেকে রক্ত পড়তে থাকে, তা দেখে বনু মাখযুম হামযার গায়ে হাত তুলতে উদ্যত হয়। বনু হাশিম উঠে দাঁড়ায় হামযার পক্ষে। দুই গোত্রের লোকেদের মধ্যে মারামারি বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হলে আবু জাহেল মধ্যস্থতা করে। তাদেরকে থামিয়ে বলে, 'না, ছেড়ে দাও হামযাকে। আমিই তাঁর ভাতিজা মুহাম্মাদকে বিশ্রীভাষায় গালিগালাজ করেছি।'
হামযা তখনো ইসলামের ওপর সত্যিকারের ঈমান আনেননি, দৃঢ় বিশ্বাস থেকে তিনি ইসলামের ঘোষণা দেননি, আবু জাহেলকে ক্ষেপিয়ে দেওয়ার জন্য জিদ করে কথার কথা বলেছিলেন। হামযা বাড়ি ফিরলেন। হঠাৎ তাঁর হুঁশ হলো, 'আরে! এটা আমি কী করলাম! ইসলাম গ্রহণ করে ফেললাম!" কিছুক্ষণ পর যখন মাথা ঠাণ্ডা হয়ে আসলো, তিনি পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলেন এবং আবিষ্কার করলেন তিনি বেশ ভালো সমস্যার মধ্যেই পড়েছেন! তিনি মুসলিম হবেন নাকি কাফির থেকে যাবেন সেটা নিয়ে ভাবনায় পড়ে গেলেন। যদি তিনি তাঁর মুখের কথা ফিরিয়ে নেন, সেটা তাঁর জন্য অসম্মানজনক ব্যাপার, কেননা তিনি ইতোমধ্যে আবু জাহেলকে মুখের উপর বলে ফেলেছেন তিনি মুসলিম হয়ে গেছেন। চট করে মুখের কথা বদলে ফেলা সে সমাজে ভালো চোখে দেখা হতো না। অন্যদিকে তাঁর কথার ওপর স্থির থাকাও কঠিন, কারণ তিনি আগে কখনো ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটা মাথাতেও আনেন নি।
তিনি সারারাত আল্লাহর কাছে দুআ করলেন। বললেন, 'হে আল্লাহ, আমাকে সত্য পথ দেখান! আমাকে বলে দেন আমি সত্যের উপর আছি কি না।' কুরাইশরা মুশরিক হলেও আল্লাহর ইবাদত করতো। যখন তারা দুআ করতো, তারা তা আল্লাহর কাছেই করতো, কিন্তু যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হতো কেন তারা অন্য প্রভুদের ইবাদত করতো, তারা বলতো এই মূর্তিগুলো হলো মাধ্যম। তারা আল্লাহর কাছে ইবাদাত পৌঁছিয়ে দেয়। প্রকৃতপক্ষে তারা সংশয়ের মধ্যে ছিল।
পরদিন সকালের কথা, হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব বলেন, 'সকালে উঠেই অনুভব করলাম আমার অন্তর ইসলামের প্রতি ভালোবাসায় ভরে গেছে! তাই আমি রাসূলুল্লাহর কাছে গেলাম এবং তাঁকে বললাম, আমি একজন মুসলিম!' প্রিয় চাচাকে পাশে পাওয়া ছিল রাসূলুল্লাহর জীবনে সবচেয়ে অসাধারণ মুহূর্তের একটি! হামযা মুসলিম হলেন, মন থেকে মুসলিম হলেন। আবু জাহেল চেয়েছিল নবীজিকে কষ্ট দিতে, অথচ তার এই অপকর্মের সূত্র ধরে শেষ পর্যন্ত হামযা মুসলিম হয়ে গেলেন!
এটাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পরিকল্পনা। মানুষ কখনই জানতে পারবে না কোন কাজের পরিণতি ভালো আর কোন কাজের পরিণতি খারাপ। ইবনে ইসহাক্ব বলেন, 'হামযা জিদের বশে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি ইসলামের ব্যাপারে সত্যিই আন্তরিক হয়ে যান।'