📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলিমদের থেকে কী শেখার আছে

📄 আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলিমদের থেকে কী শেখার আছে


১। সাহাবাদের মাঝে ছিল অবিচল নিষ্ঠা ও দৃঢ়তা। তারা তাদের নীতির উপর অটল ছিলেন। আদর্শের প্রশ্নে তারা কোনো আপস করেননি, যদিও তারা জানতেন এর ফলে তাদের বিপদ হতে পারে। আন-নাজ্জাশীর কাছে গিয়ে তাঁকে বলেন যে, তারা ঈসাকে আল্লাহর বান্দা বলেই বিশ্বাস করেন, আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) হিসেবে নয়। আদর্শবান, ব্যক্তিত্বশীল মানুষের পক্ষে এটাই শোভা পায়। ব্যক্তিগত স্বার্থের আশায় তারা সত্যকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলে না। সাবাহীরা দ্বীনের আদর্শ বুকে করে চলতেন, তারা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা কিছুই হোক-তারা সত্যটাই বলবেন। তাদের কাছে জীবনের চেয়েও দ্বীন ইসলামের মূল্য অনেক বেশি।

২। আবিসিনিয়ার সমাজ ও সংস্কৃতির যে রীতিগুলো ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক, সেগুলো সাহাবীরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে যেগুলো ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, সেগুলো গ্রহণ করেছেন। সে সময়ে আবিসিনিয়ানদের মধ্যে নাজ্জাশীকে সিজদা করা খুবই সাধারণ ও প্রচলিত ব্যাপার-যে লোকই তার সাথে দেখা করতে যাবে, সে-ই নাজ্জাশীকে সিজদা দিয়ে সম্মান জানাবে। আমর ইবন আস নাজ্জাশীকে বলে রেখেছিল, 'দেখবেন, এরা যখন আপনার সাথে দেখা করতে আসবে, তখন আপনাকে সিজদা করবে না।' আমর ইবন আস সঠিক বলেছিল, মুসলিমরা নাজ্জাশীর সাথে দেখা করতে এসে সিজদা করেন নি। আন-নাজ্জাশী খুব রেগে গেলেন, তাদের জিজ্ঞাসা করলেন সবার মতো তারা কেন সিজদা করলো না। তারা জবাব দিলেন, 'আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সিজদা করি না।'

এখন মুসলিমরা সামাজিকতা ও সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে বিভিন্ন হারাম ও বিদআতে অনাসায়ে লিপ্ত হয়। অথচ আবিসিনিয়ার সাহাবীরা ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে থেকেও ইসলাম নিয়ে সমঝোতা করেন নি, তারা অত্যাচারিত হয়েছেন, নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন, কিন্তু নবীজির শিক্ষা ও সুন্নাহ থেকে তাদেরকে কেউ সরাতে পারে নি। সবাই করছে, আমরা না করলে কেমন দেখায় এমনটা ভেবে সমাজের 'সামাজিকতা', 'প্রচলিত প্রথা' মেনে নেননি। একজন মুসলিমের এই শিক্ষাটাই বাস্তবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।

৩। আবিসিনিয়ার মুসলিমরা সংঘবদ্ধ ছিলেন এবং একক নেতার অধীনে ছিলেন। জাফর ইবন আবি তালিব এই দলটির নেতা। এখান থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, মুসলিমরা যেখানেই থাকুক তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবে। ইসলাম কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয় নয়, নিছক নামাজ-রোজা-হাজ্জ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ আধ্যাত্মিকতাসর্বস্ব ধর্ম নয় যে, যার যার খুশিমত ধর্ম পালন করবে। ইসলামের অনেক ইবাদতই সমবেতভাবে করতে হয় যা থেকে জামা'আতবদ্ধ থাকার গুরুত্ব বোঝা যায়।

৪। আবিসিনিয়ায় এই হিজরতের ঘটনা থেকে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণ ও সমাজের সাথে তাদের মেলামেশার ব্যাপ্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। দ্বীন ইসলামে মুসলিম নারীদের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দাবি রাখে। প্রথম মুসলিম ছিলেন একজন নারী এবং প্রথম শহীদও ছিলেন একজন নারী। জিহাদের ময়দান, জামা'আতে, শিক্ষাদীক্ষা ও প্রশিক্ষণে তাদের ভূমিকা ছিল। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় তখন, যখন বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি-এই দুই চরমপন্থা চলে আসে। এক পক্ষের মানুষ মনে করে, নারী-পুরুষের মেলামেশা এবং হাসি-তামাশা-গল্প-আড্ডা-গান-বাজনায় কোনো সমস্যা নেই। আবার অন্য পক্ষের মানুষ মনে করে, নারীদের গলার স্বরও কারো সামনে প্রকাশ করা যাবে না। একারণে, নবীজির সময়ে নারী-পুরুষের সম্পর্কের প্রকৃতির উপর আলোকপাত করা জরুরি।

এ ব্যাপারে আলোচনা করতে গেলে একটি ঘটনা বেশ উল্লেখযোগ্য। ঘটনাটি হাবাশায় হিজরতের সাথে সম্পর্কিত। সপ্তম হিজরীতে যখন মুসলিমরা আবিসিনিয়া থেকে মদীনাতে চলে আসেন, তখন জাফর ইবন আবি তালিবের স্ত্রী আসমা বিনত উমাইস একদিন হাফসার সাথে দেখা করতে তাঁর ঘরে যান। হাফসা ছিলেন উমার ইবন খাত্তাবের মেয়ে, রাসূলুল্লাহর স্ত্রী। উমার ইবন খাত্তাবও তখন তাঁর মেয়ের সাথে দেখা করতে এলেন। ঢুকে দেখলেন সেখানে একজন মহিলা বসে আছে, মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন,
- ইনি কে?
- উনি হচ্ছেন আসমা বিনত উমাইস, হাফসা উত্তর দিলেন।
- আচ্ছা, উনি কি সেই আবিসিনীয় মহিলা যিনি সাগর পাড়ি দিয়ে এসেছেন, উমার এটা জিজ্ঞেস করলেন কারণ আবিসিনিয়া থেকে মদীনা আসতে সমুদ্র পাড়ি দিতে হয়।
- হ্যাঁ, উনিই সেই মহিলা।

উমার ইবন খাত্তাব এরপর আসমাকে বললেন, 'আমরা আপনাদের আগে হিজরত করেছি তাই আমরা রাসূলুল্লাহর ওপর আপনাদের থেকে বেশি হকদার।'

এই কথায় আসমা কিছুটা রেগে গেলেন। পাল্টা জবাব দিয়ে বললেন, 'না, তা হতে পারে না, আপনারা আমাদের চাইতে রাসূলের বেশি ঘনিষ্ঠ নন। আপনারা তো আল্লাহর রাসূলের সাথে থাকতেন, তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের খাইয়ে দিতেন, মূর্খদের শিক্ষা দিতেন। আর আমরা ছিলাম বহুদূরে, অপ্রিয় এক রাজ্যে। আমি রাসূলুল্লাহর কাছে যাচ্ছি, আপনি যে কথা বললেন, সেটা আমি তাঁকে বলবো। দেখি উনি কী বলেন, আমি কিছুই বাড়িয়ে-চড়িয়ে বলব না।'

উমারের কথা আসমার পছন্দ হলো না। কেননা তাঁরা আল্লাহর রাসূল থেকে দূরে থেকেছেন, নবীজি তাদের আত্মীয়ের চেয়েও বেশি আপন, তাদের আশ্রয়স্থল, তাদের অভিভাবক, তাঁর থেকে দূরে যাওয়া তাদের জন্য কষ্টকর ছিল। অন্যদিকে উমার এবং অন্যরা অন্তত রাসূলুল্লাহর সঙ্গটা হলেও পেয়েছেন যা থেকে তারা বঞ্চিত ছিলেন। এই বিষয়ের দফারফা করতে তিনি রাসূলুল্লাহর কাছে গেলেন এবং বললেন, 'উমার আমাকে এই এই বলেছেন।' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তুমি উত্তরে কী বলেছো?' আসমা তাঁর দেওয়া উত্তরটি রাসূলুল্লাহকে শোনালেন। তা শুনে রাসূলুল্লাহ যেন ঠিক তাঁর মনের কথাটি বললেন। 'তুমি ঠিকই বলেছো আসমা, আমার প্রতি উমার আর তার সঙ্গীদের হক তোমাদের চেয়ে বেশি নয়। তারা একটি হিজরতের পুরস্কার পাবে আর তোমরা পাবে দুটি হিজরতের পুরস্কার।'

আসমা অত্যধিক খুশি হয়ে গেলেন, খুশি হলেন আবিসিনিয়ার সাহাবীরা। রাসূলুল্লাহর এই কথাটি যেন তাদের মন ভরিয়ে দিল। কতোটা খুশি হয়েছিলেন তারা? আসমা বলেন, 'রাসূলুল্লাহ আমাকে এই হাদীসটি বলার পর থেকে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী সাহাবারা দলে দলে আমার কাছে আসতেন শুধুমাত্র এই একটি হাদীস শিখতে। দুনিয়াতে এই হাদীসের চেয়ে প্রিয় তাদের আর কিছুই ছিল না।'

এই ঘটনা থেকে দেখা যাচ্ছে উমার ইবন খাত্তাব একজন মহিলার সাথে কথা বলছেন। তাদের মধ্যকার কথোপকথন ছিল সরলসোজা, সাদাসিধে, 'ফরমাল'। এছাড়াও, আসমা পরবর্তীতে অন্যান্য পুরুষ সাহাবাদেরকে এই হাদীস শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যকার সম্পর্কের ধরন ছিল চটুলতাবিবর্জিত, শিষ্টাচার সম্বলিত, সোজাসাপ্টা ও মার্জিত। তারা তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়ায় সর্বদা একটি গাম্ভীর্য বজায় রাখতেন। সস্তা কৌতুক বা হাসি-তামাশা করতেন না। পারস্পরিক সম্মান ও দূরত্ব বজায় রেখে পরস্পর কথা বলতেন।

আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী আরেক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উম্মে হাবিবা। তিনি ছিলেন আবু সুফিয়ানের মেয়ে। মক্কার বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে হাবাশায় হিজরত করা ছিল তাঁর জন্য একটা বড় ত্যাগস্বীকার। আবিসিনিয়া তার কাছে অচেনা, অজানা এক রাজ্য, তবু তিনি দ্বীনের জন্য সব ছেড়েছুঁড়ে সেখানে হিজরত করেন। স্বামী উবায়দুল্লাহ ইবন জাহাশ হিজরতের পর মুরতাদ হয়ে গেলো। ইসলামের পরিবর্তে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলো। উবায়দুল্লাহর জীবনে কখনোই তেমন স্থিরতা আসে নি, একবার এই ধর্ম, আরেকবার ওই ধর্ম, এভাবে তার জীবনের অনেকটা সময় পার হয়েছে। ইসলাম গ্রহণের পর কিছুটা স্থিরতা এলেও শেষপর্যন্ত সে হাবাশা গিয়ে খ্রিস্টান হয়ে যায়। একজন মহিলার সবচেয়ে আপনজন তার স্বামী, স্বামীর দ্বারাই স্ত্রীরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। উম্মে হাবিবার স্বামী মুরতাদ হয়ে যাওয়ায় তাকে কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি নিজের দ্বীনকে বিসর্জন দেন নি। শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়-সেটাই ছিল তাদের সংসারের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। উম্মে হাবিবা ছিলেন দৃঢ়চেতা, মানসিকভাবে শক্ত-সমর্থ-মজবুত একজন ব্যক্তিত্ব। শত বাধা সত্ত্বেও তিনি তাঁর দ্বীনকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকতে পেরেছিলেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 হিজরতের বিধান

📄 হিজরতের বিধান


১। যদি কোনো মুসলিম তার দেশে ইসলামের আবশ্যকীয় আহকাম যেমন সালাত, সাওম ইত্যাদি পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে সামর্থ্য থাকলে তার অন্য কোথাও চলে যাওয়া তার জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়।

২। যদি এমন হয় যে, কোনো দেশে বাস করতে গিয়ে একজন মুসলিমের এমন সব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় যা তার জন্য কষ্টকর, তখন সে চাইলে তার যন্ত্রণা লাঘব করার উদ্দেশ্যে অন্য ইসলামি ভূমিতে হিজরত করতে পারে, তবে সেটি বাধ্যতামূলক নয়।

৩। কোনো মুসলিমের হিজরতের কারণে যদি সে অঞ্চলে ইসলামের কোনো আনুষ্ঠানিক হুকুম বা দায়িত্ব পালনে অবহেলা ঘটে-যার দায়িত্ব সে ছাড়া অন্য কেউ পালনের ক্ষমতা রাখে না, তাহলে তার জন্য সে অঞ্চল ছেড়ে অন্যত্র হিজরত করা নিষিদ্ধ।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 অমুসলিম দেশে বসবাস করার ব্যাপারে বিধান

📄 অমুসলিম দেশে বসবাস করার ব্যাপারে বিধান


মুসলিম আলিমগণ এই ব্যাপারে একমত যে, কোনো মুসলিমের জন্য অমুসলিমদের মাঝে তাদের সমাজে বসবাস করা বৈধ নয়। একটি হাদীস এই ব্যাপারটি স্পষ্ট করে বলছে, 'আমি সেই মুসলিমদের ব্যাপারে কোনো দায়িত্ব নিব না, যারা মুশরিকদের মধ্যে বসবাস করে।'

এটি হচ্ছে সাধারণ বিধান, তবে এর কিছু ব্যতিক্রমও আছে। আলিমরা সেসব নিয়ে আলোচনা করেছেন। যেমন তারা বলেছেন, যদি কোনো মুসলিম অমুসলিম দেশে ইসলাম প্রচার করে এবং সেখানে স্বাধীনভাবে ইসলাম পালন করতে পারে, সেক্ষেত্রে তার জন্য অমুসলিম দেশে থাকা বৈধ হতে পারে। এছাড়া ব্যবসা অথবা জ্ঞানার্জনের জন্য অমুসলিম দেশে অস্থায়ীভাবে অবস্থান করা যায়। সাধারণভাবে দাওয়াতী কার্যক্রমে নিয়োজিত থাকা ছাড়া অমুসলিম পরিবেশে বসবাস করা মুসলিমদের জন্য বৈধ নয়, এর অন্যথা হলে গুনাহ হবে। তবে দাওয়াহ'র মানে এই নয় যে, প্রত্যেক ব্যক্তিকে একই কাজ করতে হবে। দাওয়াহর অর্থ ব্যাপক-যেকোনো কাজ, যেটা ইসলামের বার্তাকে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে, সেটাই দাওয়াহ। সেটা হতে পারে ত্রাণ, দান-সাদাকাহ, দাওয়াহ-সংক্রান্ত কাজকর্ম ইত্যাদি, মুসলিমদের শিক্ষা দেওয়াও দাওয়াতী কাজ হিসেবে গণ্য হতে পারে。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00