📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 আবিসিনিয়ার হিজরত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়

📄 আবিসিনিয়ার হিজরত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়


এক. যেহেতু মুসলিমদের ওপর দ্বীন মেনে চলার কারণে শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছিল, তাই তারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জায়গা মক্কা থেকে পালিয়ে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তাদেরকে অত্যাচারের কবল থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যেই রাসূলুল্লাহ ﷺ হিজরতের অনুমতি দেন। ইমাম হাজম বলেন, 'যখন মুসলিমদের সংখ্যা আর তাদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেল, তখন আল্লাহ তাদের হিজরতের অনুমতি দেন।'

দুই. অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করার ক্ষমতা সবার থাকে না। চাপের মুখে কিছু মানুষ তাদের ঈমান ধরে রাখতে পারে না। বিলালের মতো মানসিক শক্তি সবার থাকে না, খাব্বাব ইবন আরাতের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সবাই যেতে পারে না। তাই কেউ যদি কোথাও তার দ্বীন নষ্ট হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ভয় করে, তাহলে তার উচিত অন্য কোথাও চলে যাওয়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'একজন ঈমানদারের পক্ষে এমন সাধ্যতীত কষ্ট নিজের ওপর চাপিয়ে নেওয়া উচিত নয়, যার কারণে তাকে লাঞ্ছিত হতে হয়।' যদি কারো জন্য কোনোকিছুর ভার বহন করা অসম্ভব হয়ে থাকে, তখন তার নিজেকে সেই পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেওয়া উচিত হবে না।

একবার এক লোক ডিমের আকারের এক খণ্ড খাঁটি সোনা নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে হাজির হয়ে বললেন, 'এটা আমার পক্ষ থেকে সাদাকাহ, আমার সহায়-সম্পদ বলতে এটুকুই আছে।' রাসূলুল্লাহ ﷺ মন খারাপ করে বললেন, 'তোমাদের কেউ কেউ তাদের সমস্ত সম্পদ সাদাক্বাহ করে ফেলো, তারপর বিপদে পড়ে আবার আমার কাছে সাহায্যের জন্য আসো।' রাসূলুল্লাহ চাননি এই মানুষটা তার সমস্ত দান করে পুরো নিঃস্ব হয়ে পড়ুক, বিপদে পড়ে সাহায্যের জন্য কারো কাছে হাত পাতুক। সামর্থ্য বুঝে দান করা উচিত। কিন্তু সীরাহ থেকে এটাও দেখা যায়, আবু বকর সিদ্দীক একবার তাঁর সমস্ত সম্পত্তি আল্লাহর রাসূলের কাছে দান করে দিয়েছিলেন আর রাসূল সেই কাজের প্রশংসা করেন। দুটো একই রকম কাজের প্রতি তাঁর আচরণ ভিন্ন হওয়ার কারণ হলো, রাসূল জানতেন যে, সবকিছু দান করে দিলেও আবু বকরের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষমতা আছে যা ওই লোকের ছিল না। আবু বকর তাঁর সমস্ত সম্পদ দান করে দেওয়ার পরেও কখনই ভিক্ষা চাওয়ার মতো পর্যায়ে নামবেন না।

সবাই আবু বকরের মতো নন। তাই যে কারো উচিত নয় নিজেদের এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দেওয়া যা সামাল দেওয়ার সামর্থ্য তারা রাখে না।

তিন. হিজরত প্রসঙ্গে সাইয়্যেদ কুতুবের একটা মন্তব্য আছে। তিনি বলেন, 'এটা বলা সমীচীন হবে না যে মুহাজিরদের সকলে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে হিজরত করেন। কেননা এই মুহাজিরদের মধ্যে খুব প্রভাবশালী পরিবার থেকে আগত ও বিপুল সম্পদের মালিক অনেক সাহাবী ছিলেন।' তাদের বেশিরভাগই ছিলেন কুরাইশ বংশের। জাফর ইবন আবি তালিব একজন কুরাইশ। আর তাদের কিছুসংখ্যক ছিলেন অল্পবয়স্ক যুবক, তারা নবী মুহাম্মাদকে নিরাপত্তা দিতেন। তারা কয়েকজন হলেন যুবাইর ইবন আওয়াম, আবদুর রহমান ইবন আউফ, উসমান ইবন আফফান প্রমুখ। মুহাজিরদের মধ্যে কুরাইশের অভিজাত পরিবারের কয়েকজন নারীও ছিলেন। যেমন উম্ম হাবিবা, তিনি ছিলেন আবু সুফিয়ানের মেয়ে। কুরাইশ নেতার কন্যা হিসেবে তিনি কখনও মক্কায় নির্যাতনের শিকার হননি, কেউ তার গায়ে স্পর্শ পর্যন্ত করার সাহস করেনি, তবু তিনি হিজরত করেছিলেন। কিন্তু কেন?

কারণ এই হিজরতের ঘটনা কুরাইশদের সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী পরিবারদের ধর্মীয় ও সামাজিক ভিত্তিতে ঝাঁকুনি দেয়। তাদের চোখের সামনে দিয়ে তাদের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ও সম্ভ্রান্ত ছেলেমেয়েরা বিবেক ও ধর্মীয় কারণে আপন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আর গোত্রীয় দেশকে পেছনে ফেলে চলে যাচ্ছিল। কুরাইশ রাজবংশের জন্য এর চেয়ে বড় অপমান কিছু হতে পারে না। এই ঘটনার কারণে কুরাইশরা খুব বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে। আরবে কুরাইশদের উঁচু অবস্থানের কারণ ছিল তাদের উচ্চ মর্যাদা, মূল্যবোধ ও কাবার অভিভাবকত্ব, এ কারণে নয় যে তারা সামরিকভাবে শক্তিশালী। তাই মানুষ যখন দেখল সম্ভ্রান্ত লোকজন তাদের জান-মাল ও দ্বীনের নিরাপত্তার জন্য মক্কা ছেড়ে চলে যাচ্ছে, বিষয়টা কুরাইশদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করলো।

চার. আরেকজন গ্রন্থকার মুনির আল গাদওয়ানের মতে, রাসূল মক্কার বাইরে দ্বিতীয় আরেকটি ঘাঁটি বানাতে চেয়েছিলেন। যদি মক্কায় কিছু ঘটে যায়, তাহলে অন্য কোথাও যেন মুসলিমরা তাদের দ্বীন নিয়ে টিকে থাকতে পারে। তাই যখন মুসলিমদের সংখ্যা বেড়ে গেলো, তখন থেকে মুসলিমরা দু'টো দলে আলাদা থাকতে শুরু করে। এক দল মক্কায় থেকে যায় আর আরেক দল হিজরত করে আবিসিনিয়ায়।

আল-হাবশার হিজরত ছিল এমন একটা হিজরত যেখানে খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠের মাঝে মুসলিম সংখ্যালঘুরা বসবাস করে। এটি ছিল একটা খ্রিস্টান-প্রধান দেশ। কিন্তু পশ্চিমের ইতিহাসে দ্বিতীয় আর কোনো আন-নাজ্জাশীর দেখা মেলেনি। পশ্চিমে তাঁর মতো ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিত্ব আর কখনো দেখা যায়নি। হয়ত এমন একটা সময় ছিল যখন পশ্চিমের আইন ও সংবিধান আন-নাজ্জাশীর ব্যক্তিত্বের কাছাকাছি ছিল, কিন্তু বর্তমানকালে পরিস্থিতি প্রায় পুরোটাই বদলে গেছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আল-হাবাশা এবং মক্কীযুগ নিয়ে খুব বেশি বর্ণনা নেই। এর কারণ হলো:
১। মদীনায় হিজরতের আগে হাদীসের দলীল রাখা মুসলিমদের জন্য বৈধ ছিল না। কারণ, মুহাম্মাদ চাইতেন না তাঁর কথাগুলো কুরআনের বাণীর সাথে মিশে যাক।
২। পূর্ববর্তী আলিমরা মদীনার ব্যাপারে যেরকম আগ্রহী ছিলেন সেই তুলনায় মক্কার ব্যাপারে খুব বেশী আগ্রহী ছিলেন না। কেননা ইসলামি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত আইন কানুন বিধি বিধানের বেশিরভাগই তারা মাদানী জীবন থেকে শিখেছেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে রাসূলুল্লাহর মক্কী জীবনের প্রথম তের বছরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা বেশি দরকার। কারণ আজকের বিশ্বে মুসলিমদের বড় একটা সংখ্যা সংখ্যালঘুদের মতোই বাস করছে। সংখ্যালঘুদের নিয়ে অনেক ফিকহ আছে যেগুলো মক্কী জীবনের প্রথম তের বছর থেকে শেখা প্রয়োজন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 কেন আবিসিনিয়া? ইরাক বা সিরিয়া কেন নয়?

📄 কেন আবিসিনিয়া? ইরাক বা সিরিয়া কেন নয়?


প্রথমত, কারণ, রাসূল নিজেই বলেছেন, 'আবিসিনিয়ায় যাও, সেখানে এক রাজা আছেন যিনি কাউকে অত্যাচার করেন না।' সুতরাং মুসলিমদের আল-হাবাশা যাওয়ার পিছনে একটা প্রধান কারণ ছিল আন-নাজ্জাশীর ন্যায়পরায়ণতা।

দ্বিতীয়ত, আল-হাবশার সাথে আরবদের ভালো সম্পর্ক ছিল। কুরাইশরা আবিসিনিয়ায় ব্যবসা করতো, তাই আরবদের সাথে আবিসিনিয়ার ইতিমধ্যে একটা ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আবিসিনিয়ার সংস্কৃতির সাথে রাসূলুল্লাহ অনেক আগেই পরিচিত ছিলেন, কেননা তাঁর প্রথম ধাত্রী উম্মে আইমান ছিলেন আল-হাবাশার। তিনি রাসূলুল্লাহর যত্ন নিতেন আর তাঁকে বুকের দুধ খাওয়াতেন। একটি বর্ণনায় এসেছে, উম্মে আইমান রাসূলের সামনে কিছু খাবার পরিবেশন করেন, তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন, 'এটা কী?' উম্মে আইমান জবাব দেন, 'এটা একটা আবিসিনিয়ান খাবার।'

উম্মে আইমানের সংস্কৃতি আর ভাষা ছিল আবিসিনিয়ান। তাঁর উচ্চারণ ছিল বিশুদ্ধ আবিসিনিয়ান। ইবন সাদের মতে, তিনি "সালাম ইলাহি আলাইকুম” বলতে চাইলে সেটা "সালাম উল্লাহি আলাইকুম” হয়ে যেতো। তাই রাসূলুল্লাহ তাঁকে শুধু 'সালাম' বলতে বলেন। রাসূলুল্লাহর পুরো জীবনে উম্মে আইমান তাঁর অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন। তিনি তাঁকে তাঁর পালক পুত্র যায়িদ ইবন হারিসার সাথে বিয়ে দেন।

তৃতীয়ত, আবিসিনিয়ানরা ছিল খ্রিস্টান আর মুসলিমরা তাদেরকে কুরাইশ মূর্তিপূজক বা পারস্যের অগ্নিপূজারীদের তুলনায় খ্রিস্টানদেরকে আপন মনে করতো।

চতুর্থত, আন-নাজ্জাশী ও জাফরের যোগাযোগ করার ভাষা ছিল সম্ভবত আরবী। কিছু বর্ণনায় এসেছে, আন-নাজ্জাশী হিজাজে কিছু বছর কাটিয়ে ছিলেন, তাই তিনি আরবীতে কথা বলতে পারতেন। যদিও তিনি আরবে থাকতেন না কিন্তু আরব ও আবিসিনিয়ানদের মধ্যকার ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে এটা অস্বাভাবিক নয় যে, আবিসিনিয়ানরা আরবী বলতে বা বুঝতে পারতো। যেহেতু নাজ্জাশী কুরআন তিলাওয়াতের সময় কুরআনের বাণী শুনে কাঁদছিলেন, তার মানে নিশ্চয়ই তিনি আরবী আয়াতের অর্থ বুঝতে পেরেছিলেন। একজন দোভাষী যদি আয়াতের অনুবাদ করে দিত তাহলে সেটা তার অন্তরে এতটা প্রভাব ফেলতে পারতো না।

আন-নাজ্জাশী মুসলিম হয়েছিলেন। তার ইসলামে প্রত্যাবর্তনের ঘটনা সবার কাছে গোপন রাখা হয়েছিল। তিনি জাফর ইবন আবি তালিব থেকে গোপনে ইসলাম শিখতেন। যখন আন-নাজ্জাশী মারা গেলেন, বুখারিতে বর্ণিত আছে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'আজকের দিনে আবিসিনিয়ার একজন পুণ্যবান মানুষ মারা গেছেন, আসো আমরা তাঁর জন্য দুআ করি।' রাসূলুল্লাহ তাঁর জন্য জানাজার সালাত পড়েছিলেন। আন-নাজ্জাশীর মৃত্যুর সঠিক দিন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ জানতেন, জিবরীল তাঁকে এই মৃত্যুর ব্যাপারে জানিয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে এটা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'আল্লাহর কাছে আন-নাজ্জাশীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো।'

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলিমদের থেকে কী শেখার আছে

📄 আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলিমদের থেকে কী শেখার আছে


১। সাহাবাদের মাঝে ছিল অবিচল নিষ্ঠা ও দৃঢ়তা। তারা তাদের নীতির উপর অটল ছিলেন। আদর্শের প্রশ্নে তারা কোনো আপস করেননি, যদিও তারা জানতেন এর ফলে তাদের বিপদ হতে পারে। আন-নাজ্জাশীর কাছে গিয়ে তাঁকে বলেন যে, তারা ঈসাকে আল্লাহর বান্দা বলেই বিশ্বাস করেন, আল্লাহর পুত্র (নাউযুবিল্লাহ) হিসেবে নয়। আদর্শবান, ব্যক্তিত্বশীল মানুষের পক্ষে এটাই শোভা পায়। ব্যক্তিগত স্বার্থের আশায় তারা সত্যকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলে না। সাবাহীরা দ্বীনের আদর্শ বুকে করে চলতেন, তারা আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা কিছুই হোক-তারা সত্যটাই বলবেন। তাদের কাছে জীবনের চেয়েও দ্বীন ইসলামের মূল্য অনেক বেশি।

২। আবিসিনিয়ার সমাজ ও সংস্কৃতির যে রীতিগুলো ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক, সেগুলো সাহাবীরা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে যেগুলো ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, সেগুলো গ্রহণ করেছেন। সে সময়ে আবিসিনিয়ানদের মধ্যে নাজ্জাশীকে সিজদা করা খুবই সাধারণ ও প্রচলিত ব্যাপার-যে লোকই তার সাথে দেখা করতে যাবে, সে-ই নাজ্জাশীকে সিজদা দিয়ে সম্মান জানাবে। আমর ইবন আস নাজ্জাশীকে বলে রেখেছিল, 'দেখবেন, এরা যখন আপনার সাথে দেখা করতে আসবে, তখন আপনাকে সিজদা করবে না।' আমর ইবন আস সঠিক বলেছিল, মুসলিমরা নাজ্জাশীর সাথে দেখা করতে এসে সিজদা করেন নি। আন-নাজ্জাশী খুব রেগে গেলেন, তাদের জিজ্ঞাসা করলেন সবার মতো তারা কেন সিজদা করলো না। তারা জবাব দিলেন, 'আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সিজদা করি না।'

এখন মুসলিমরা সামাজিকতা ও সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে বিভিন্ন হারাম ও বিদআতে অনাসায়ে লিপ্ত হয়। অথচ আবিসিনিয়ার সাহাবীরা ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে থেকেও ইসলাম নিয়ে সমঝোতা করেন নি, তারা অত্যাচারিত হয়েছেন, নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন, কিন্তু নবীজির শিক্ষা ও সুন্নাহ থেকে তাদেরকে কেউ সরাতে পারে নি। সবাই করছে, আমরা না করলে কেমন দেখায় এমনটা ভেবে সমাজের 'সামাজিকতা', 'প্রচলিত প্রথা' মেনে নেননি। একজন মুসলিমের এই শিক্ষাটাই বাস্তবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।

৩। আবিসিনিয়ার মুসলিমরা সংঘবদ্ধ ছিলেন এবং একক নেতার অধীনে ছিলেন। জাফর ইবন আবি তালিব এই দলটির নেতা। এখান থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, মুসলিমরা যেখানেই থাকুক তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবে। ইসলাম কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয় নয়, নিছক নামাজ-রোজা-হাজ্জ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ আধ্যাত্মিকতাসর্বস্ব ধর্ম নয় যে, যার যার খুশিমত ধর্ম পালন করবে। ইসলামের অনেক ইবাদতই সমবেতভাবে করতে হয় যা থেকে জামা'আতবদ্ধ থাকার গুরুত্ব বোঝা যায়।

৪। আবিসিনিয়ায় এই হিজরতের ঘটনা থেকে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে মুসলিম নারীদের অংশগ্রহণ ও সমাজের সাথে তাদের মেলামেশার ব্যাপ্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। দ্বীন ইসলামে মুসলিম নারীদের ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দাবি রাখে। প্রথম মুসলিম ছিলেন একজন নারী এবং প্রথম শহীদও ছিলেন একজন নারী। জিহাদের ময়দান, জামা'আতে, শিক্ষাদীক্ষা ও প্রশিক্ষণে তাদের ভূমিকা ছিল। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় তখন, যখন বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি-এই দুই চরমপন্থা চলে আসে। এক পক্ষের মানুষ মনে করে, নারী-পুরুষের মেলামেশা এবং হাসি-তামাশা-গল্প-আড্ডা-গান-বাজনায় কোনো সমস্যা নেই। আবার অন্য পক্ষের মানুষ মনে করে, নারীদের গলার স্বরও কারো সামনে প্রকাশ করা যাবে না। একারণে, নবীজির সময়ে নারী-পুরুষের সম্পর্কের প্রকৃতির উপর আলোকপাত করা জরুরি।

এ ব্যাপারে আলোচনা করতে গেলে একটি ঘটনা বেশ উল্লেখযোগ্য। ঘটনাটি হাবাশায় হিজরতের সাথে সম্পর্কিত। সপ্তম হিজরীতে যখন মুসলিমরা আবিসিনিয়া থেকে মদীনাতে চলে আসেন, তখন জাফর ইবন আবি তালিবের স্ত্রী আসমা বিনত উমাইস একদিন হাফসার সাথে দেখা করতে তাঁর ঘরে যান। হাফসা ছিলেন উমার ইবন খাত্তাবের মেয়ে, রাসূলুল্লাহর স্ত্রী। উমার ইবন খাত্তাবও তখন তাঁর মেয়ের সাথে দেখা করতে এলেন। ঢুকে দেখলেন সেখানে একজন মহিলা বসে আছে, মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন,
- ইনি কে?
- উনি হচ্ছেন আসমা বিনত উমাইস, হাফসা উত্তর দিলেন।
- আচ্ছা, উনি কি সেই আবিসিনীয় মহিলা যিনি সাগর পাড়ি দিয়ে এসেছেন, উমার এটা জিজ্ঞেস করলেন কারণ আবিসিনিয়া থেকে মদীনা আসতে সমুদ্র পাড়ি দিতে হয়।
- হ্যাঁ, উনিই সেই মহিলা।

উমার ইবন খাত্তাব এরপর আসমাকে বললেন, 'আমরা আপনাদের আগে হিজরত করেছি তাই আমরা রাসূলুল্লাহর ওপর আপনাদের থেকে বেশি হকদার।'

এই কথায় আসমা কিছুটা রেগে গেলেন। পাল্টা জবাব দিয়ে বললেন, 'না, তা হতে পারে না, আপনারা আমাদের চাইতে রাসূলের বেশি ঘনিষ্ঠ নন। আপনারা তো আল্লাহর রাসূলের সাথে থাকতেন, তিনি আপনাদের ক্ষুধার্তদের খাইয়ে দিতেন, মূর্খদের শিক্ষা দিতেন। আর আমরা ছিলাম বহুদূরে, অপ্রিয় এক রাজ্যে। আমি রাসূলুল্লাহর কাছে যাচ্ছি, আপনি যে কথা বললেন, সেটা আমি তাঁকে বলবো। দেখি উনি কী বলেন, আমি কিছুই বাড়িয়ে-চড়িয়ে বলব না।'

উমারের কথা আসমার পছন্দ হলো না। কেননা তাঁরা আল্লাহর রাসূল থেকে দূরে থেকেছেন, নবীজি তাদের আত্মীয়ের চেয়েও বেশি আপন, তাদের আশ্রয়স্থল, তাদের অভিভাবক, তাঁর থেকে দূরে যাওয়া তাদের জন্য কষ্টকর ছিল। অন্যদিকে উমার এবং অন্যরা অন্তত রাসূলুল্লাহর সঙ্গটা হলেও পেয়েছেন যা থেকে তারা বঞ্চিত ছিলেন। এই বিষয়ের দফারফা করতে তিনি রাসূলুল্লাহর কাছে গেলেন এবং বললেন, 'উমার আমাকে এই এই বলেছেন।' রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তুমি উত্তরে কী বলেছো?' আসমা তাঁর দেওয়া উত্তরটি রাসূলুল্লাহকে শোনালেন। তা শুনে রাসূলুল্লাহ যেন ঠিক তাঁর মনের কথাটি বললেন। 'তুমি ঠিকই বলেছো আসমা, আমার প্রতি উমার আর তার সঙ্গীদের হক তোমাদের চেয়ে বেশি নয়। তারা একটি হিজরতের পুরস্কার পাবে আর তোমরা পাবে দুটি হিজরতের পুরস্কার।'

আসমা অত্যধিক খুশি হয়ে গেলেন, খুশি হলেন আবিসিনিয়ার সাহাবীরা। রাসূলুল্লাহর এই কথাটি যেন তাদের মন ভরিয়ে দিল। কতোটা খুশি হয়েছিলেন তারা? আসমা বলেন, 'রাসূলুল্লাহ আমাকে এই হাদীসটি বলার পর থেকে আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী সাহাবারা দলে দলে আমার কাছে আসতেন শুধুমাত্র এই একটি হাদীস শিখতে। দুনিয়াতে এই হাদীসের চেয়ে প্রিয় তাদের আর কিছুই ছিল না।'

এই ঘটনা থেকে দেখা যাচ্ছে উমার ইবন খাত্তাব একজন মহিলার সাথে কথা বলছেন। তাদের মধ্যকার কথোপকথন ছিল সরলসোজা, সাদাসিধে, 'ফরমাল'। এছাড়াও, আসমা পরবর্তীতে অন্যান্য পুরুষ সাহাবাদেরকে এই হাদীস শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যকার সম্পর্কের ধরন ছিল চটুলতাবিবর্জিত, শিষ্টাচার সম্বলিত, সোজাসাপ্টা ও মার্জিত। তারা তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়ায় সর্বদা একটি গাম্ভীর্য বজায় রাখতেন। সস্তা কৌতুক বা হাসি-তামাশা করতেন না। পারস্পরিক সম্মান ও দূরত্ব বজায় রেখে পরস্পর কথা বলতেন।

আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী আরেক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উম্মে হাবিবা। তিনি ছিলেন আবু সুফিয়ানের মেয়ে। মক্কার বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে হাবাশায় হিজরত করা ছিল তাঁর জন্য একটা বড় ত্যাগস্বীকার। আবিসিনিয়া তার কাছে অচেনা, অজানা এক রাজ্য, তবু তিনি দ্বীনের জন্য সব ছেড়েছুঁড়ে সেখানে হিজরত করেন। স্বামী উবায়দুল্লাহ ইবন জাহাশ হিজরতের পর মুরতাদ হয়ে গেলো। ইসলামের পরিবর্তে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করলো। উবায়দুল্লাহর জীবনে কখনোই তেমন স্থিরতা আসে নি, একবার এই ধর্ম, আরেকবার ওই ধর্ম, এভাবে তার জীবনের অনেকটা সময় পার হয়েছে। ইসলাম গ্রহণের পর কিছুটা স্থিরতা এলেও শেষপর্যন্ত সে হাবাশা গিয়ে খ্রিস্টান হয়ে যায়। একজন মহিলার সবচেয়ে আপনজন তার স্বামী, স্বামীর দ্বারাই স্ত্রীরা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। উম্মে হাবিবার স্বামী মুরতাদ হয়ে যাওয়ায় তাকে কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছিল। কিন্তু তিনি নিজের দ্বীনকে বিসর্জন দেন নি। শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়-সেটাই ছিল তাদের সংসারের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। উম্মে হাবিবা ছিলেন দৃঢ়চেতা, মানসিকভাবে শক্ত-সমর্থ-মজবুত একজন ব্যক্তিত্ব। শত বাধা সত্ত্বেও তিনি তাঁর দ্বীনকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে থাকতে পেরেছিলেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 হিজরতের বিধান

📄 হিজরতের বিধান


১। যদি কোনো মুসলিম তার দেশে ইসলামের আবশ্যকীয় আহকাম যেমন সালাত, সাওম ইত্যাদি পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে সামর্থ্য থাকলে তার অন্য কোথাও চলে যাওয়া তার জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়।

২। যদি এমন হয় যে, কোনো দেশে বাস করতে গিয়ে একজন মুসলিমের এমন সব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় যা তার জন্য কষ্টকর, তখন সে চাইলে তার যন্ত্রণা লাঘব করার উদ্দেশ্যে অন্য ইসলামি ভূমিতে হিজরত করতে পারে, তবে সেটি বাধ্যতামূলক নয়।

৩। কোনো মুসলিমের হিজরতের কারণে যদি সে অঞ্চলে ইসলামের কোনো আনুষ্ঠানিক হুকুম বা দায়িত্ব পালনে অবহেলা ঘটে-যার দায়িত্ব সে ছাড়া অন্য কেউ পালনের ক্ষমতা রাখে না, তাহলে তার জন্য সে অঞ্চল ছেড়ে অন্যত্র হিজরত করা নিষিদ্ধ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00