📄 খাব্বাবের ؓ ঘটনা থেকে শিক্ষা
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ ধৈর্য ধারণ করতে বলেছেন। যত কষ্ট-দুর্ভোগ-অত্যাচার সহ্য করতে হোক না কেন, হার মানা যাবে না।
২. প্রকৃতি, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান প্রভৃতির যেমন কিছু ধরাবাঁধা সূত্র আছে, তেমনি দ্বীন কায়েমেরও কিছু নির্দিষ্ট সূত্র আছে যেগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ঠিক করে রেখেছেন। দুনিয়ার বুকে দ্বীনকে কায়েম করার জন্য মুসলিম উম্মাহকে একে একে সেই নির্ধারিত পথের প্রতিটি ধাপ পাড়ি দিতে হবে; এর কোনো ব্যতিক্রম বা শর্টকাট নেই। বহু আগের যুগের মু'মিনরা যে কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করেছেন, সাহাবীদেরকেও ﷺ সেই একই পথ পার করতে হয়েছে। আমাদেরও সে পথই পাড়ি দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ চেয়েছিলেন তাঁর উম্মাহ হবে সবার সেরা। তাই পূর্ববর্তী জাতিরা যদি দ্বীন কায়েমের পথে ধৈর্যশীল হয়ে থাকে, তবে তাঁর উম্মাহ যেন আরও বেশি ধৈর্যের পরিচয় দেয়। পূর্ববর্তী জাতিরা যদি শক্তিশালী হয়ে থাকে, তবে এই উম্মাহ যেন তারচেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়-এটাই ছিল নবীজির ﷺ চাওয়া। তিনি চাইতেন যে কিয়ামতের দিনে তাঁর উম্মাহ-ই হবে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাই মুসলিমদের দায়িত্ব হচ্ছে রাসূলুল্লাহর ﷺ প্রত্যাশা অনুযায়ী আচরণ করা।
৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করবেন আর এমন এক সময় আসবে যখন লোকেরা সানা থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত নিরাপদে সফর করতে পারবে আর তাদের মনে আল্লাহ ছাড়া আর কারো ভয় স্থান পাবে না। এখানে প্রশ্ন জাগতে পারে, রাসূল ﷺ ছিলেন মক্কার অধিবাসী, তিনি মক্কার কথা না বলে ইয়েমেনের এই বিশেষ দুটি স্থানকে বেছে নিলেন কেন? মক্কার লোকেদের জীবনেই তো তেমন নিরাপত্তা ছিল না, তাহলে মক্কা উল্লেখ করে বোঝানো কি যেতো না যে, পরবর্তী সময়ে মক্কায় নিরাপত্তা আসবে। হাদীসে মক্কার কথা উল্লেখ না করে ইয়েমেনের কথা বলার বিশেষ কারণ আছে। সেই অতীত থেকে আজ পর্যন্ত ইয়েমেনে গোত্রভিত্তিক সমাজব্যবস্থা প্রচলিত। রাসূলের ﷺ সময় পুরো ইয়েমেনজুড়ে প্রচুর সশস্ত্র গোত্র ছিল। তারা একে অপরের সাথে যুদ্ধ ও হানাহানিতে লিপ্ত থাকতো। তারা প্রত্যেকে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী। রাসূলুল্লাহর ﷺ যুগে যখন ইসলামের আলো ইয়েমেনে প্রবেশ করলো, তা পুরো সমাজকে শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন করে তুললো। ইসলামের সৌন্দর্যই এটা। যেকোনো কিছুই ইসলামের স্পর্শে নিরাপদ ও প্রশান্তিময় হয়ে ওঠে। এখন মানুষ ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, শরীয়াহর শাসন উঠে গেছে আর সেজন্যই সেই একই সানা থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত অঞ্চলটি আজ আবারও ইয়েমেনের সবচেয়ে অনিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া এ দুটো স্থানের আশেপাশে সফরের কথা চিন্তায় আনাও নির্বুদ্ধিতার শামিল। এতেই বোঝা যায়, একমাত্র ইসলামের ছায়াতলেই রয়েছে সত্যিকার শান্তি。
📄 কথার লড়াই
কুরাইশদের সাথে নবীজির প্রজ্ঞাপূর্ণ বোঝাপড়ার একটি উল্লেখযোগ্য কাহিনি আছে। একবার কুরাইশের লোকেরা একত্র হয়ে ঠিক করলো, 'চলো, এমন একজনকে খুঁজে বের করি যে জাদু আর কবিতা রচনায় পারদর্শী। সে আমাদের হয়ে মুহাম্মাদের সাথে মোকাবেলা করবে।' তারা উতবা ইবন রাবিয়াকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল। উতবা ইবন রাবিয়াহ মহা ধুরন্ধর লোক, কথার মারপ্যাঁচে সে ছিল সিদ্ধহস্ত। উতবা নবীজির কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলো, 'আচ্ছা মুহাম্মাদ, বলো তো কে উত্তম - তুমি নাকি আবদুল মুত্তালিব?'
খুবই চতুরতাপূর্ণ প্রশ্ন। তৎকালীন আরব সমাজে মৃত পূর্বপুরুষদের অত্যধিক সম্মান করা হতো। আর রাসূলুল্লাহর পরিবারকে সমগ্র মক্কার লোক সম্ভ্রমের নজরে দেখতো। আবদুল মুত্তালিব বা তাঁর মতো মানুষের বিপক্ষে কথা বলবে এমন সাহস কারো ছিল না। সেই সমাজে পূর্বপুরুষদের হেয় করে কথা বলাটাই ছিল এক ধরনের অপরাধ। তাই উতবা যখন নবীজিকে তাঁর বাবা আবদুল্লাহ এবং দাদা আবদুল মুত্তালিবের কথা জিজ্ঞেস করলো, নবীজি চুপ করে রইলেন। সুযোগ পেয়ে উতবা বলে উঠলো,
'দেখো, তুমি যদি বলো এই মানুষগুলো তোমার চেয়ে উত্তম, তাহলে শুনে রাখো, যে দেব দেবীদের নামে তুমি বাজে বকছো, ওরাও তো তাদেরই উপাসনা করতো। আর তুমি যদি নিজেকে তাদের চেয়ে ভালো মনে করো তাহলে তোমার কী বক্তব্য আছে পেশ করো। আমরাও শুনি তোমার কী বলার আছে। তবে আল্লাহর কসম করে বলছি, তোমার চেয়ে বড়ো মূর্খ আমরা জন্মেও দেখিনি, যে কিনা তার আপন জাতির এত ক্ষতি করে। তুমি আমাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করেছো, দ্বন্দ্ব বাড়াচ্ছো, আমাদের ধর্ম নিয়ে বিদ্রূপ করছো। তোমার জন্য আমরা আরবদের চোখে ছোট হয়ে গেছি, লোকের মুখে মুখে রটে বেড়াচ্ছে-কুরাইশদের মাঝে নাকি জাদুকর আছে।'
অদ্ভুত ব্যাপার হলো-কুরাইশদের মাঝে জাদুকর আছে এই গুজব সৃষ্টির জন্য উতবা রাসূলুল্লাহকে দায়ী করছে, অথচ এই গুজব শুরুতে কুরাইশ নেতারাই রটায়। তারাই মুহাম্মাদকে জাদুকর ডাকতে শুরু করে। কিন্তু পরবর্তীতে তাদের নিজেদের কাজে নিজেরাই লজ্জায় পড়ে যায়। উতবা বলে, 'আল্লাহর কসম, দেখে মনে হচ্ছে যেন আমরা এক গর্ভবতী নারীর কান্নার জন্য বসে আছি, এরপরই আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে তরবারি নিয়ে যুদ্ধ করতে থাকবো যতোক্ষণ না আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাই।' তার কথার অর্থ ছিল, ইসলামের কারণে যুদ্ধ-বিগ্রহ বেধে যাবে, আর সেজন্য মুহাম্মাদ দায়ী।
এরপর উতবা প্রস্তাব দিল, মুহাম্মাদকে উচ্চ মর্যাদা, ধনসম্পদ তিনি যা চান তা-ই দেওয়া হবে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নবীজিকে লোভ দেখিয়ে আপস-সমঝোতার মাধ্যমে ইসলামকে পঙ্গু ও নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া। এখানে লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, রাসূলুল্লাহ উতবার এসব বকবকানি মন দিয়ে শুনেছেন, কথার মাঝখানে তাকে একবারও বাধা দেননি। কেননা রাসূলুল্লাহ ছিলেন একজন উৎকৃষ্ট শ্রোতা। আর তাই উতবার কথাগুলো অর্থহীন হলেও তিনি শান্তভাবে তার সব কথা শুনে গেলেন। উতবা একসময় থামলো, তখন রাসূলুল্লাহ মৃদুস্বরে তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
- উতবা, তোমার কথা কি শেষ হয়েছে?
- হ্যাঁ শেষ, উতবা জবাব দিল।
এরপর রাসূলুল্লাহ নিজ থেকে উতবার কথার কোনো জবাব দিলেন না, বরং কুরআনের একটি আয়াত পাঠ করতে শুরু করলেন...
"বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম। হা-মীম। এটা অবতীর্ণ পরম করুণাময়, দয়ালুর পক্ষ থেকে। এমন এক কিতাব, যার আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে বিবৃত, আরবী কুরআন, সেই লোকদের জন্য যারা জানে।” (সূরা ফুসসিলাত, ৪১: ১-৩)
রাসূলুল্লাহ তিলাওয়াত করতেই থাকলেন, করতেই থাকলেন। এরপর এই আয়াত এলো যেখানে বলা হয়েছে, (৪১: ১৩)
"অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলুন, আমি তোমাদেরকে সতর্ক করলাম এক কঠোর আযাব সম্পর্কে আদ ও সামুদের আযাবের মতো।” (সূরা ফুসসিলাত, ৪১: ১৩)
এই আয়াতটি পাঠ করামাত্র উতবা হাত বাড়িয়ে রাসূলুল্লাহর মুখে চাপা দিয়ে তাঁকে থামাতে গেলো। কেননা এই আয়াতে কাফেরদেরকে তাদের অপরাধের জন্য শাস্তির হুমকি দেওয়া হচ্ছিলো আর উতবা মনে মনে ঠিকই জানতো যে, মুহাম্মাদ সত্যবাদী। তিনি যা উচ্চারণ করবেন, তার প্রতিটি বর্ণ অক্ষরে অক্ষরে ফলবে। সে মরিয়া হয়ে বললো, 'আমাদের সম্পর্কের কসম লাগে, থামো, তুমি থামো!'
উতবা কুরাইশের লোকেদের কাছে ফিরে গিয়ে বললো, 'মুহাম্মাদ যখন কুরআন পড়তে শুরু করলো, সে যে কী বলছিল আমি আগামাথা কিছুই বুঝতে পারিনি। শুধু একটা ব্যাপার বুঝেছি, আদ ও সামূদ জাতির ওপর যেমন আযাব এসেছিল, আমাদের ওপরও তেমন আযাব আসবে। এমনটাই সে হুমকি দিয়েছে।' কুরাইশের লোকেরা বললো, 'দূর হও! সে তোমার সাথে স্পষ্ট আরবি ভাষায় কথা বললো তবু তুমি তাঁর কথা বুঝতে পারলে না?' উতবা উত্তর দিলো, 'আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, আমি তাঁর কথা বুঝতে পারছিলাম না।'²⁹
এখানে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ একেক পরিস্থিতি একেকভাবে মোকাবেলা করেছেন। অনেক সময়ই তিনি সরাসরি কুরআনের আয়াত দিয়ে মানুষের কথার জবাব দিয়েছেন। এখান থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, দাওয়াহ দেওয়ার সময়ে কুরআনের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করা একটি উত্তম পদ্ধতি, কেননা আল্লাহ আযযা ওয়াজালের কথাই উত্তম দাওয়াত।
টিকাঃ
২৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৩।