📄 প্রলোভন এবং চ্যালেঞ্জ
এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন ইবন আব্বাস²³। কুরাইশ নেতারা কাবার পাশে মিলিত হলো। বললো-আমরা সবরকম উপায়ে প্রচেষ্টা চালাবো, মুহাম্মাদকে এবার কোনো অজুহাত দেওয়ার সুযোগ দেবো না। তারা রাসূলুল্লাহকে ডেকে পাঠালো।
নবীজির মনে বড়ো আশা কুরাইশরা ইসলাম গ্রহণ করবে। তাদের ডাক পেয়ে খুব খুশি হলেন, ভাবলেন হয়তো তাদের মন বদলেছে, হয়তো তারা ইসলামের প্রতি একটু নরম হয়েছে!
নবীজি ছুটতে ছুটতে হাজির হলেন। তারা বললো-হে মুহাম্মাদ! তোমার সাথে মিটমাট করার উদ্দেশ্যে আমরা তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি। তাদের বক্তব্যের শুরুটা এমনই ছিল, সুন্দর, আশা জাগানিয়া। কিন্তু এরপরই তারা গা-জ্বালা করা কথাবার্তা বলতে শুরু করলো,
'আল্লাহর কসম, তুমি যা করলে, আর কোনো আরব লোক তার কওমের জন্য তোমার মত এত যন্ত্রণা আনে নি। বাপ-দাদার বিরোধিতা, আমাদের ধর্মের সমালোচনা, আমাদের রীতিনীতি নিয়ে উপহাস, দেব-দেবীকে অভিশাপ দেওয়া সবই তুমি করেছো। আমাদের সমাজটাকে বিভক্ত করে ফেলেছো তুমি। তোমার সাথে আমাদের সম্পর্কে ফাটল ধরানোর জন্য আমাদের অপ্রিয় কোনো কাজ করতে বাদ রাখোনি।'
এরপর শুরু হলো নানা রকম প্রলোভন দেখানো। তারা বললো, 'মুহাম্মাদ! অর্থের আশাতেই যদি তুমি এই বাণী প্রচার করে থাকো, তাহলে আমরা তোমার জন্য যত লাগে সম্পদের ব্যবস্থা করবো, তোমাকে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিত্তশালী বানিয়ে দেব। তুমি যদি ক্ষমতার আশায় এ ধর্ম নিয়ে এসে থাকো, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের রাজা হিসেবে বেছে নিতে পারি। আর তুমি যদি নারীর লোভে এসব কাজ করে থাকো, তাহলে আমরা তোমার জন্য কুরাইশের সবচেয়ে সেরা দশ নারীকে বাছাই করে আনবো, এরপর তাদের প্রত্যেককে তোমার সাথে বিয়ে দেব। যদি তোমার ওপর শয়তান ভর করে থাকে, তাহলে আমরা তোমার সুস্থতার জন্য যা কিছু লাগে ব্যয় করবো, এমনকি যদি তাতে আমাদের সমস্ত সম্পদও দিয়ে দিতে হয়, তাও দেব। আমাদেরকে শুধু বলো তুমি কী চাও।'
রাসুলুল্লাহ জবাবে শান্তকণ্ঠে বললেন,
'তোমরা যা কিছুই বলেছো, তার কিছুই আমি চাই না। অর্থকড়ি, মানমর্যাদা কিংবা তোমাদের ওপর ক্ষমতা লাভের আশায় তোমাদের কাছে ইসলামের বার্তা নিয়ে আসিনি। আল্লাহ তোমাদের কাছে আমাকে একজন রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তিনি আমার উপর তাঁর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং আমাকে আদেশ দিয়েছেন তোমাদেরকে সুসংবাদ দিতে ও সতর্ক করতে। আমি তোমাদের কাছে আমার রবের পক্ষ থেকে একটি বার্তা নিয়ে এসেছি মাত্র। তোমাদেরকে পরামর্শ দিয়েছি যে, যা আমি তোমাদের কাছে হাজির করলাম, তোমরা তা গ্রহণ করে নিলে তোমাদের জন্যই মঙ্গলজনক-এই দুনিয়া ও আখিরাতে দু জগতেই। আর যদি তোমরা তা প্রত্যাখ্যান করো, তাহলে আমি আল্লাহর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করবো, যতক্ষণ না তিনি আমার এবং তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দেন।'
তারা তাঁকে বললো,
"তুমি যদি আমাদের কোনো প্রস্তাবই মানতে না চাও, তাহলে শোনো, আমাদের দেশ অনেক সংকীর্ণ, আমরা খুবই দরিদ্র, আর আমাদের জীবনযাত্রাও দুর্বিষহ। এক কাজ করলে কেমন হয়, যে রব তোমাকে পাঠিয়েছে, তাঁকে গিয়ে তুমি একটু বলো যেন সে এই পর্বতগুলো সরিয়ে দেয়, এগুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে সমতল করে একটু ফাঁকা স্থান তৈরি করে দিলেই চলবে। আর তুমি এটা কেন তাঁকে বলছো না মক্কার মধ্যে কয়েকটি নদী প্রবাহিত করে দিতে? যেমন করে সিরিয়া আর ইরাকে নদী আছে, সেরকম। আমরাও তো অন্যদের মতো নদী চাই! আর হ্যাঁ, আরেকটা ব্যাপার, আমরা চাই যে, তুমি তোমার রবের কাছে গিয়ে বলো, সে যেন আমাদের কয়েকজন পূর্বপুরুষকে মৃত থেকে জীবিত করে দেয়। কুসাই ইবন কালবের প্রাণও ফিরিয়ে এনো কিন্তু, তিনি তো অনেক জ্ঞানী লোক ছিলেন, তাঁকে জিজ্ঞেস করবে যে তুমি যা বলছো তা কি সত্য নাকি মিথ্যা। মুহাম্মাদ, তুমি যদি এটুকু করতে পারো আর আমাদের বাপ-দাদারা যদি তোমার কথা মেনে নেয়, তাহলে আমরা তোমাকে অনুসরণ করবো।"
রাসূলুল্লাহ এবারও শান্তকণ্ঠে উত্তর দিলেন,
'এ কারণে আমাকে পাঠানো হয়নি। আমি রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে কেবল সেটাই এনেছি, যা সহকারে তিনি আমাকে প্রেরণ করেছেন। আমার তোমাদেরকে যা জানানোর ছিল তা জানিয়েছি, যদি তোমরা তা গ্রহণ করো, তাহলে তা তোমাদের জন্যই কল্যাণকর, এই দুনিয়া এবং আখিরাতে। আর যদি তোমরা তা প্রত্যাখ্যান করো, তাহলে আমাকে অবশ্যই ধৈর্য সহকারে আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় থাকতে হবে যেন তিনি আমাদের মধ্যে বিচার করে দেন।'
তারা বিদ্রূপ করতেই থাকলো,
'আচ্ছা, তাহলে এক কাজ করো, তুমি তোমার রবকে বলো একজন ফেরেশতা পাঠাতে, যে তোমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে যে তুমি সত্য বলছো। আর তোমার রবকে বলো যেন আমাদের জন্য কিছু দূর্গ, বাগান, সোনা ও রুপার খনি দান করে, আর হ্যাঁ, আরেকটা কাজ করলে কেমন হয়-তুমি তাঁকে বলো যেন সে তোমার প্রয়োজনটাও পূরণ করে দেয়, কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি তুমি আমাদের মতো করে জীবিকা মেটানোর চেষ্টা করছো।'
তারা এই বলে উপহাস করছিল যে, মুহাম্মাদ যদি আল্লাহর এত প্রিয় বান্দা হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে কেন অন্য সবার মতো অর্থ উপার্জন করতে হচ্ছে! তাই তারা বলছিলো যে, আল্লাহর কাছ থেকে ধনসম্পদ নিয়ে আসতে। যেন তিনি যে আল্লাহর নিকটবর্তী বান্দা-সে কথা প্রমাণিত হয়। এসব কথাতেও রাসূলুল্লাহর ধৈর্যচ্যুতি হলো না বা তিনি উত্তেজিত হলেন না, তিনি এতটুকুই বললেন,
'আমি এসব কিছুই করবো না। আমি আমার রবের কাছে এসব জিনিস চাইতে যাবো না। এসব কারণে আমাকে তোমাদের কাছে প্রেরণ করা হয়নি। আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁর দ্বীন প্রচারের জন্য। যদি তোমরা আমার উপস্থাপিত বার্তা স্বীকার করে নাও, তাহলে দুনিয়া ও আখিরাতে তা তোমাদের জন্যই লাভজনক। আর যদি তোমরা তা অস্বীকার করো, তাহলে আমি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত। আর আমি এই বিষয়টি আমার রবের হাতে ছেড়ে দিলাম যতক্ষণ না তিনি আমার ও তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দেন।'
তারা বললো, 'আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে তোমার রবকে বলো তুমি আমাদেরকে যে শাস্তির প্রতিজ্ঞা করছো, সেই শাস্তি প্রেরণ করতে।'
আল্লাহর রাসূল বললেন, 'এটা আল্লাহর হাতে, যদি তিনি চান তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দিবেন।'
তারা টিটকারি মেরে বললো, 'আরে মুহাম্মাদ, তোমরা রব কি জানে না যে আমরা তোমাকে এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছি? সে কেন তোমাকে উত্তর দিতে সাহায্য করছে না? আমরা ভালোই জানি কে তোমাকে এইসব শিক্ষা দিচ্ছে, তোমাকে তোমার এই কুরআন শেখাচ্ছে ইয়ামামার এক লোক, তার নাম আর-রহমান। আর আমরা সেই আর-রহমানের কথায় কখনোই বিশ্বাস স্থাপন করবো না।'
কুরাইশরা হঠাৎ করে 'আর-রহমান' নামক ব্যক্তির গল্প ফেঁদে বসে। তাদের মাঝে একজন বললো, 'যাও, যাও, গিয়ে আল্লাহর কন্যা ফেরেশতাদের ইবাদত করো।' আরেকজন বললো, 'আমরা তোমাকে ততক্ষণ বিশ্বাস করবো না যতক্ষণ না তুমি আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে হাজির করছো।' তারা সবাই মিলে রাসূলুল্লাহকে উপহাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে তাঁকে অপমান করে সে স্থান থেকে চলে গেল।
সবাই চলে যাওয়ার পর তাদের মাঝে একজন রাসূলুল্লাহর কাছে ফিরে আসলো, তার নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবন উমাইয়া। তার ফিরে আসা দেখে মনে হয় যেন তার মুহাম্মাদের জন্য খারাপ লাগছে, হয়তো সে ক্ষমা চাইবে। সে নবীজির কাছে এসে বললো,
'মুহাম্মাদ, তোমার লোকেরা তোমার কাছে সেরা সেরা প্রস্তাব পেশ করেছে, আর তুমি-তুমি তাদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছ। তোমাকে কোনো অলৌকিক ঘটনা (মু'যিজা) দেখাতে বললো, সেটাতেও তোমার আপত্তি। তারপর বলা হলো, তুমি যেন তাদের ওপর আযাব নিয়ে আসো, সেটাও তুমি পারলে না। এবার আমি তোমাকে একটা কথা বলি-আমি তোমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস করবো না, যতক্ষণ না তুমি একটা মই নিয়ে আসো যেটা সরাসরি ওই আকাশ পর্যন্ত যায়। তুমি মই বেয়ে ওপরে উঠবে আর আমি তোমাকে দেখবো। তারপর তুমি আল্লাহর কাছে পৌঁছে তাঁকে বলবে সে যেন তোমার ব্যাপারে (প্রমাণস্বরূপ) একটি পত্র লিখে দেয়; সেখানে লেখা থাকবে যে, তুমি তার নবী, আর এর ওপর থাকবে তার স্বাক্ষর। এরপর চারজন ফেরেশতা সেই পত্র সঙ্গে করে নিচে নেমে আসবে, আর তারাও সাক্ষ্য দিবে যে তুমি আল্লাহর রাসূল। সত্যি কথা কী জানো, তুমি যদি এতকিছু করেও ফেলো, আমার মনে হয় এরপরও আমি তোমাকে বিশ্বাস করবো না।'
এই ছিল রাসূলের চারপাশের পরিবেশ এবং মানুষগুলোর অবস্থা ও তাদের মানসিকতা। এ ধরনের লোকদের তিনি দাওয়াহ করছিলেন।
টিকাঃ
২৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৬।
📄 চাপ প্রয়োগ
কুরাইশরা রাসূলুল্লাহর ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। তাঁকে দমিয়ে রাখতে সম্ভাব্য সকল পথেই হেঁটেছে তারা। এক পর্যায়ে নবীজির চাচা আবু তালিবকে কাজে লাগিয়ে তাদের হীন উদ্দেশ্য হাসিলের প্রয়াস চালায়। আবু তালিবের ছেলে আকীলের মুখেই এর একটি বিবরণ পাওয়া যায়।
'একদিন কুরাইশের লোকেরা বাবার কাছে এসে খুব হৈ চৈ লাগিয়ে দিলো। বললো, তোমার ভাতিজা মুহাম্মাদ, আমাদের সভা-সমাবেশে বাধা দিচ্ছে, দশ পদের ঝামেলা বাঁধাচ্ছে। তাঁকে বলে দিও-আমাদের থেকে সাবধান, তাঁকে যেন ধারেকাছেও আর না দেখি। বাবা আমাকে ডেকে বললেন, মুহাম্মাদকে ডেকে আনো। আমি ভাইকে খুঁজতে বেরোলাম। একটা কেনাসের²⁴ মধ্যে তাঁকে খুঁজে পেলাম।"
"রাসূলুল্লাহ বাবার সাথে দেখা করতে এলেন। বাবা বললেন, লোকেরা তোমার নামে অভিযোগ এনেছে। তুমি নাকি তাদের সভায় বাধা দিচ্ছো, কী সব ঝামেলা পাকাচ্ছো, তুমি কেন এসব করছো?"
আবু তালিব মুহাম্মাদের সাথে ধমকের সুরে কথা বলছিলেন না। হুকুম দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ভাতিজাকে ডাকেননি, বরং ভাতিজার জন্য যা ভালো হবে বলে মনে হয়েছে, তেমনটাই পরামর্শ দেওয়ার জন্য ডেকেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন-চাচা, আপনি কি সূর্য দেখতে পাচ্ছেন?
- হ্যাঁ।
- এই সূর্যের তাপ থেকে আমাকে রক্ষা করতে আপনি যতোটা অপারগ, আমার এ দাওয়াতী কাজ থামিয়ে দিতেও আমি ততোটাই অপারগ। '²⁵
ইসলাম ছিল রাসূলুল্লাহর জীবন, জীবনের মিশন। এই মিশন থেকে সরে আসার কথা তিনি ভাবতেও পারতেন না। অপেক্ষাকৃত দুর্বল একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ এনে দেয়, তবুও আমি এ কাজ থেকে বিরত থাকবো না, যতক্ষণ না স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ের ফয়সালা করে দেন, অথবা আমার মৃত্যু হয়।' তাঁর চাচা ভাতিজার কথার উত্তরে বলেন, আমার ভাতিজা, তুমি সত্য বলেছো। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। এগিয়ে যাও এবং নিজের মিশন পূর্ণ করো। আবু তালিব বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর ভাতিজাকে এই কাজ থেকে বিরত রাখা যাবে না। তাই তিনি নবীজিকে সবরকম ভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতে সম্মত হন।
কুরাইশরা রাসূলুল্লাহকে আটকানোর জন্য সর্বোতভাবে চেষ্টা চালাতে থাকে। কুরাইশদের অত্যাচার ও নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য মুহাম্মাদ তাঁর কিছু সাহাবীকে আবিসিনিয়াতে হিজরত করার নির্দেশ দেন। সঙ্গে সঙ্গে কুরাইশরা আবিসিনিয়ার শাসক নাজ্জাশির সাথে যোগাযোগ করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। তারা তড়িঘড়ি করে তাঁর কাছে রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করে তাঁকে বলে তিনি যেন তার দেশে হিজরত করা মুসলিমদেরকে মক্কায় ফেরত পাঠান।
সে সময় মুসলিমদের অবস্থা করুণ। রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা- কোনো বিচারেই তৎকালীন মুসলিমরা কুরাইশদের সমকক্ষ বা হুমকিস্বরূপ ছিল না। তারপরও কুরাইশরা এই নিরীহ মুসলিমদের পেছনে লেগে ছিল। কারণ তারা চাইছিল ইসলামকে যেন গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা যায়। তারা বুঝতে পেরেছিল ইসলামকে যদি শুরুতেই দমন করা না হয় তাহলে একসময় তাদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।
টিকাঃ
২৪. কেনাস অর্থ: একটি ছোট্ট ঘর বা তাঁবু।
২৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮২।
📄 হিংসা-বিদ্বেষ
হিংসার কথা বলতে প্রথমেই আসে কুরাইশদের বিখ্যাত নেতা ওয়ালিদ ইবন মুগীরার নাম। রাসূলুল্লাহর নবুওয়াত প্রাপ্তির বিষয়টি তার কোনোভাবেই সহ্য হচ্ছিল না। সে বলেছিল, 'আল্লাহ যদি কাউকে নবী বানাতেই চান, তাহলে আমাকে কেন নবী হিসেবে বাছাই করা হলো না? আমি জ্ঞানীগুণী লোক, বয়সেও মুহাম্মাদের চাইতে বড়।' একই সুরে কথা বলেছিল তাইফের আরেক লোক। হিজায অঞ্চলে সবচেয়ে প্রখ্যাত এলাকা এ দুটোই ছিল-মক্কা আর তাইফ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা আয যুখরুফে তাদের এ কথা উল্লেখ করেছেন,
"আর তারা বলে, এই কুরআন কেন দুই জনপদের (মক্কা ও তাইফ) মধ্যে কোনো এক প্রভাবশালী ব্যক্তির উপর অবতীর্ণ হলো না?” (সূরা যুখরুফ, ৪৩: ৩১)
তাইফ থেকে আল মুগীরা ইবন শুআইবা একবার মক্কা বেড়াতে এলো। রাসূলুল্লাহর সাথে তার প্রথমবার সাক্ষাতের ঘটনা সে নিজেই বর্ণনা করেছে-
'আমি আবু জাহেলের সাথে মক্কার পথ ধরে হাঁটছি, এমন সময় দেখি মুহাম্মাদ। আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন। আবু জাহেলকে বলে উঠলেন, কেন তুমি আমার অনুসরণ করছো না? কেন আল্লাহর ওপর বিশ্বাস আনছো না? কেন ইসলাম গ্রহণ করছো না?
মুহাম্মাদ, তুমি কবে আমাদের দেবতাদের অপমান করা বন্ধ করবে? তুমি যদি চাও আমরা তোমার মিশন সম্পন্ন করার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিই, তবে আমরা তোমার জন্য সে সাক্ষ্য দিয়ে দেবো। আর আমি যদি জানতাম যে তুমি সত্য বলছো, তাহলে তো কবেই তোমাকে অনুসরণ করতাম।
আবু জাহেলের এ উত্তর শোনার পর মুহাম্মাদ সেখান থেকে চলে যান। এরপর সে আমার দিকে ফিরে বলে,
মুগীরা, আমি জানি মুহাম্মাদ সত্যি কথাই বলছে, কিন্তু কী যেন একটা আমাকে আটকে রেখেছে। কুসাইরের লোকেরা যখন বললো, আমরা আন-নাদওয়ার (কুরাইশদের সংসদ সভা) কর্তৃত্ব চাই, আমরা কর্তৃত্ব ছেড়ে দিলাম। তারা বললো, আমরা হিজাবার (কাবা ঘর) মালিকানা চাই, সেটাও দিয়ে দিলাম। তারা বললো, আন্দিলবার (যুদ্ধের পতাকা) দায়িত্ব চাই, সেটাও দিলাম। এরপর তারা রিফাদা আর সিকায়ার দায়িত্ব নিতে চাইলো (হাজ্জযাত্রীদের জন্য খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা), আমরা তাও তাদেরকে করতে দিলাম। এবার যখন আমরা তাদের সাথে প্রতিদ্বন্দিতায় সমানে-সমান চলে এসেছি, এখন তারা বলছে, আমাদের মাঝে একজন নবী আছেন, আমরা এর সাথে কীভাবে প্রতিযোগিতা করবো? আল্লাহর কসম, আমরা কোনোদিনও তাঁকে মেনে নেব না।²⁶
নবুওয়াতের এই পুরো বিষয়টি আবু জাহেলের কাছে নিছক পারিবারিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। দুই পরিবারে প্রতিযোগিতা চলছে, কার হাতে ক্ষমতা যাবে সেটাই আবু জাহেলের মূল চিন্তা। কিন্তু সে বুঝতে পারছিল আর সবকিছুতে টেক্কা দিতে পারলেও নবুওয়াতের ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলকে টেক্কা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সে ঠিক করলো কিছুতেই নবীজির পরিবারকে জিততে দেওয়া যাবে না। নবীজির পরিবার এই একটি দিকে তার পরিবারের থেকে এগিয়ে আছে-এটা সে কোনোক্রমেই মেনে নিতে পারছিল না। তার মনে হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ বিষিয়ে উঠছিলো, আর এটাই আবু জাহেলের ইসলাম গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কুরআনে পূর্ববর্তী নবীদের কাহিনিতেও ঘুরেফিরে একটা রুঢ় বাস্তবতা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়-সমাজের ক্ষমতাধর লোকেরাই নবী-রাসূলদের ব্যাপারে সবচাইতে বেশি বিরোধিতা করে। কেননা এক আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করতে গিয়ে তারা তাদের ক্ষমতার আসন হাতছাড়া করতে চায় না।
টিকাঃ
২৬. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২৯।
📄 অত্যাচার-নিপীড়ন
নবুওয়্যাতের প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহকে অপবাদ, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, অপমান, ক্ষয়-ক্ষতি এ সবকিছু সহ্য করতে হলেও, অত্যাচার-নির্যাতন কখনো সহ্য করতে হয়নি। এটি ছিল আল্লাহ আযযা ওয়াজালের পক্ষ থেকে নবীজির জন্য একটি বিশেষ সুরক্ষা। প্রথমে আল্লাহ তাআলা নবীজির চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে তাঁকে নিরাপত্তা দান করেন। আবু তালিবের মৃত্যুর পরেও আল্লাহ তাঁকে নিরাপদ রেখেছেন; তবে তাঁর অনুসারী মুসলিমরা নানা রকম অত্যাচার আর নিপীড়নের শিকার হয়। এসব ঘটনা নবীজির মনে গভীর দাগ কাটতে থাকে। তিনি ছিলেন তাঁর সাহাবীদের জন্য অন্তঃপ্রাণ। সাহাবীদের ওপর অত্যাচার তাঁকে প্রচণ্ড পীড়া দিত, তিনি তাদের কষ্ট সইতে পারতেন না।
একটি বর্ণনায় ইবন ইসহাক বলেন, 'কুরাইশরা মুসলিমদেরকে লোহার পাতে মুড়ে কড়া রোদের নিচে রেখে দিত, যেন তাদের শরীরগুলো সূর্যের উত্তাপে ঝলসে যায়।' সীমাহীন অত্যাচারের মুখেও যে সাহাবী সর্বাধিক দৃঢ়তার পরিচয় দেন, তিনি হলেন বিলাল। তাঁকে যতই অত্যাচার করা হতো, তিনি যেন ততোই দৃঢ় হতেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়-এত নির্যাতন সত্ত্বেও আপনি কীভাবে 'আল্লাহ এক, আল্লাহ এক' (আহাদ, আহাদ) বলতে পারতেন?
বিলাল বলেন, কারণ আমি খেয়াল করেছি যখনই আমি 'আল্লাহ এক' বলে চিৎকার দিয়ে উঠি, ওরা আরও ক্ষেপে যায়, আরও বেশি অত্যাচার করে, তাই এটাই বারবার বলতাম।
ইবন ইসহাক বলেন, 'বিলাল আল্লাহর কাছে নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছিলেন।' বস্তুত আল্লাহ ছাড়া তাদের হৃদয়ে আর কিছুই স্থান পেতো না।
নানান মাত্রা আর ধরনের অত্যাচার বহাল থাকে। নির্যাতিতদের তালিকায় শুধু দাস সাহাবীরা নয়; বরং সম্ভ্রান্ত বংশের অনেক সাহাবীও যুক্ত হন। কুরাইশ বংশের অভিজাত পরিবার বনু উমাইয়ার সন্তান উসমান ইবন আফফান যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন তাঁকে মারাত্মক রোষের শিকার হতে হয়। কুরাইশরা তাঁকে কার্পেটে মুড়ে তাঁর গায়ের ওপর লাফাতো। পায়ের চাপায় পিষে দিতো যেন তাঁকে।
মুসলিম দাসদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা ছিল ভয়াবহ। আবু জাহেল তার অধীনস্থ দাস সুমাইয়া, তাঁর স্বামী ইয়াসির, ছেলে আম্মারের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। ইয়াসির আর সুমাইয়া দুজনেই আবু জাহেলের হাতে শহীদ হন। এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে, আবু জাহেল সুমাইয়ার গোপনাঙ্গে বর্শা দিয়ে আঘাত করে।
বাবা-মায়ের ওপর এই পাশবিক নির্যাতনের দৃশ্য সহ্য করা কোনো সন্তানের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু আম্মারকে এই ভয়ানক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছিল। সে চোখের সামনে দেখলো বাবা আর মা'কে অত্যাচার করতে করতে মেরে ফেলা হলো। নিজের ওপর শারীরিক নির্যাতন তো আগে থেকেই ছিল, তার ওপর বাবা-মায়ের মৃত্যু তাঁকে পাগল করে দিলো। শারীরিক অত্যাচার, মানসিক নির্যাতন সব মিলিয়ে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত সাহাবী আম্মারের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে নবীজির বিরুদ্ধে কিছু কথা। একটা সময় যখন সব ব্যথা থেকে নিষ্কৃতি পান, তাঁকে অনুশোচনা ঘিরে ধরে। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ছুটে যান নবীজির কাছে। নবীজি, যিনি সুখে-দুখে সর্বদা তাদের পরম আশ্রয়। পুরো ঘটনা খুলে বললেন তাঁর কাছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনের আয়াত নাযিল করলেন।
"যদি কোনো মুসলিম মাত্রাছাড়া অত্যাচারের কবলে পড়ে মুখে ঈমানের বিপরীতে কিছু কথা বলেও ফেলে, তবে সে কথার জন্য তাঁকে মাফ করে দেওয়া হবে, যদি তার অন্তরে ঈমান অটুট থাকে। কেননা আল্লাহ তাআলা কারো ওপর সাধ্যের বেশি বোঝা চাপান না।” (সূরা নাহল, ১৬: ১০৬)
ইসলামের বিরুদ্ধে আবু জাহেলের বাড়াবাড়ি সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সে ছিল দুর্বৃত্তদের নেতা, চরম ইসলামবিদ্বেষী। অপকর্ম আর দুষ্কৃতিতে তার কোনো জুড়ি নেই। সবাইকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছে, মুসলিমদের অত্যাচার করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে। এত একনিষ্ঠভাবে শত্রুতার উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। ইবন ইসহাকের বর্ণনায়,
'আবু জাহেল-ই হলো সেই পাপিষ্ঠ যে কুরাইশদেরকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ফুসলে দিতো। প্রভাবশালী বা উচ্চবংশীয় কোনো ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণের কথা তার কানে আসামাত্র সে তাকে অপমান করার জন্য বলতো, তুমি তোমার বাবার ধর্ম পরিত্যাগ করেছো, তোমার বাবা তোমার চেয়ে ঢের ভালো ছিল। বুড়ো আঙুল দেখাই আমরা তোমার এই ছাইপাশ আদর্শ আর মূল্যবোধকে। আমরা তোমাদেরকে বিভক্ত করে দেবো, মাটির সাথে মিশিয়ে দেবো তোমাদের সব খ্যাতি, মান-ইজ্জত নিয়ে বেঁচে থাকতে দেবো না। কোনো ব্যবসায়ী লোক মুসলিম হয়ে গেলে তাকে বলতো, আল্লাহর কসম, আমরা তোমার সাথে সব রকম ব্যবসা বয়কট করবো, তোমাকে শেষ করে দেবো। আর যদি ইসলাম গ্রহণকারী মানুষটি হতো সহায়-সম্পদহীন দুর্বল কোনো ব্যক্তি, তবে সে নিজে তো তাকে মারধোর করতোই, সেই সাথে অন্যদেরকেও মারধোর করার জন্য ডেকে আনতো। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল আবু জাহেলকে শাস্তি দিক, তাকে ধ্বংস করুক!²⁷
উমার ইবন খাত্তাব ইসলাম গ্রহণের আগে কট্টর ইসলামবিদ্বেষী ছিলেন। তাঁর একজন দাসী ছিল, তিনি তাঁকে অনেক মারধোর করতেন। পেটানোর মাঝখানে কখনও থেমে বলতেন, 'মনে কোরো না তোমার ওপর খুব দয়া এসেছে দেখে আমি তোমাকে পেটানো থামিয়ে দিলাম। তোমাকে মারা বন্ধ করেছি কারণ আমি এখন ক্লান্ত, তা না হলে আরো পেটাতাম।'
টিকাঃ
২৭. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১৭।