📄 ইসলামকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা
আন নযর ইবন হারিস পারস্য গিয়ে গল্প শিখে আসতো। সেখান থেকে মক্কায় ফিরে এসে সে লোকদের ডেকে ডেকে বলতো, 'আমার কাছে আসো, আমার কাছে আসলে আরও ভালো ভালো কাহিনি শুনতে পাবে।' সে লোকজনকে বলতো, মুহাম্মাদের বার্তা আসলে কেচ্ছা-কাহিনি দিয়ে ভরা, ওসব হচ্ছে গল্পকথা-কোনো ভিত্তি নেই। আল্লাহর নবীদের সাথে আসলেই কী হয়েছিল তা কি কেউ জানে? মুহাম্মদ যা বলছে সেসব বানোয়াট রূপকথার গল্প। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
"আর তারা বলে, এগুলো তো পুরাকালের রূপকথা – এসব সে লিখিয়ে নিয়েছে, আর এগুলো তার কাছে পাঠ করা হয় সকালে ও সন্ধ্যায়।” (সূরা ফুরকান, ২৫: ৫)
📄 আপস এবং সমঝোতা
কুরাইশের লোকেরা আল্লাহর রাসূলের সাথে আপোসের চেষ্টাও করেছিল। নবীজির কাছে এসে বললো-আসুন, আমরা একটি চুক্তি করি। আমরা এই শর্তে রাজি যে, আপনি এক দিন আমাদের দেব-দেবীর ইবাদত করবেন, আর আমরা পর দিন আল্লাহর ইবাদত করবো।
রাসূলুল্লাহ তাদেরকে বললেন যে তিনি কখনোই এমন কিছুতে রাজি হবেন না। তারা কিছুক্ষণ পর আবার তাঁর কাছে ফিরে আসলো। এবার বললো-আপনার জন্য এবার আগের বারের চেয়েও ভালো প্রস্তাব আছে। আপনি এক দিনের জন্য আমাদের দেবদেবীর ইবাদত করেন, তাহলে আমরা এক সপ্তাহ যাবৎ আল্লাহর ইবাদত করবো।
- না, রাসূলুল্লাহ তাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন।
এরপর আবার ফিরে এসে তারা আরেকটি প্রস্তাব দিলো। বললো, 'ঠিক আছে, আমরা নাহয় এক মাস ধরে আল্লাহর ইবাদত করবো, আপনি শুধু আমাদেরকে একটি দিন হলেও দিন।'
রাসূলুল্লাহর সেই এক জবাব, 'না', আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করলেন,
"তারা চায় আপনি নমনীয় হন, তবে তারাও নমনীয় হবে।” (সূরা কালাম ৬৮:৯)
কুরাইশদের ধর্ম ছিল মানবরচিত, তাদের নিজহাতে তৈরি, তারা চাইলেই আপোস করতে পারতো, যখন খুশি ধর্মকে নিজের মন মত বদলে নিতে পারতো। তাদের জন্য এটা কোনো ব্যাপার না। কিন্তু রাসূলুল্লাহর কাছে কোনো বিকল্প ছিল না। এমনকি তারা যদি বলতো, রাসূলুল্লাহ মাত্র এক দিন দেব দেবীকে পূজার বিনিময়ে, তারা সারা বছর আল্লাহর ইবাদত করবে, তারপরও নবীজির সামনে দ্বীনকে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এই ধরনের আপোস বা সমঝোতা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন,
"বলুন, হে কাফিররা, তোমরা যার ইবাদাত করো, আমি তার ইবাদাত করিনা। এবং আমি যার ইবাদাত করি তোমরা তার ইবাদাতকারী নও। আর তোমরা যার ইবাদত করছ আমি তার ইবাদাতকারী হবো না। আর আমি যার ইবাদাত করি তোমরা তার ইবাদাতকারী নও। তোমাদের জন্য তোমাদের দীন আর আমার জন্য আমার দীন।” (সূরা কাফিরুন, ১০৬: ১-৬)
কুরাইশের লোকেরা আরও নানাভাবে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করলো। কিন্তু কোনোটিই কাজে দিলো না। দিনে দিনে তারা আরও ক্ষেপে গেল, কিন্তু রাসূলুল্লাহর এক কথা-তিনি কেবল একজন রাসূল, আল্লাহর পাঠানো একজন দাস মাত্র-আল্লাহর দ্বীনের উপর হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার তিনি রাখেন না。
📄 প্রলোভন এবং চ্যালেঞ্জ
এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন ইবন আব্বাস²³। কুরাইশ নেতারা কাবার পাশে মিলিত হলো। বললো-আমরা সবরকম উপায়ে প্রচেষ্টা চালাবো, মুহাম্মাদকে এবার কোনো অজুহাত দেওয়ার সুযোগ দেবো না। তারা রাসূলুল্লাহকে ডেকে পাঠালো।
নবীজির মনে বড়ো আশা কুরাইশরা ইসলাম গ্রহণ করবে। তাদের ডাক পেয়ে খুব খুশি হলেন, ভাবলেন হয়তো তাদের মন বদলেছে, হয়তো তারা ইসলামের প্রতি একটু নরম হয়েছে!
নবীজি ছুটতে ছুটতে হাজির হলেন। তারা বললো-হে মুহাম্মাদ! তোমার সাথে মিটমাট করার উদ্দেশ্যে আমরা তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি। তাদের বক্তব্যের শুরুটা এমনই ছিল, সুন্দর, আশা জাগানিয়া। কিন্তু এরপরই তারা গা-জ্বালা করা কথাবার্তা বলতে শুরু করলো,
'আল্লাহর কসম, তুমি যা করলে, আর কোনো আরব লোক তার কওমের জন্য তোমার মত এত যন্ত্রণা আনে নি। বাপ-দাদার বিরোধিতা, আমাদের ধর্মের সমালোচনা, আমাদের রীতিনীতি নিয়ে উপহাস, দেব-দেবীকে অভিশাপ দেওয়া সবই তুমি করেছো। আমাদের সমাজটাকে বিভক্ত করে ফেলেছো তুমি। তোমার সাথে আমাদের সম্পর্কে ফাটল ধরানোর জন্য আমাদের অপ্রিয় কোনো কাজ করতে বাদ রাখোনি।'
এরপর শুরু হলো নানা রকম প্রলোভন দেখানো। তারা বললো, 'মুহাম্মাদ! অর্থের আশাতেই যদি তুমি এই বাণী প্রচার করে থাকো, তাহলে আমরা তোমার জন্য যত লাগে সম্পদের ব্যবস্থা করবো, তোমাকে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিত্তশালী বানিয়ে দেব। তুমি যদি ক্ষমতার আশায় এ ধর্ম নিয়ে এসে থাকো, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের রাজা হিসেবে বেছে নিতে পারি। আর তুমি যদি নারীর লোভে এসব কাজ করে থাকো, তাহলে আমরা তোমার জন্য কুরাইশের সবচেয়ে সেরা দশ নারীকে বাছাই করে আনবো, এরপর তাদের প্রত্যেককে তোমার সাথে বিয়ে দেব। যদি তোমার ওপর শয়তান ভর করে থাকে, তাহলে আমরা তোমার সুস্থতার জন্য যা কিছু লাগে ব্যয় করবো, এমনকি যদি তাতে আমাদের সমস্ত সম্পদও দিয়ে দিতে হয়, তাও দেব। আমাদেরকে শুধু বলো তুমি কী চাও।'
রাসুলুল্লাহ জবাবে শান্তকণ্ঠে বললেন,
'তোমরা যা কিছুই বলেছো, তার কিছুই আমি চাই না। অর্থকড়ি, মানমর্যাদা কিংবা তোমাদের ওপর ক্ষমতা লাভের আশায় তোমাদের কাছে ইসলামের বার্তা নিয়ে আসিনি। আল্লাহ তোমাদের কাছে আমাকে একজন রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তিনি আমার উপর তাঁর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং আমাকে আদেশ দিয়েছেন তোমাদেরকে সুসংবাদ দিতে ও সতর্ক করতে। আমি তোমাদের কাছে আমার রবের পক্ষ থেকে একটি বার্তা নিয়ে এসেছি মাত্র। তোমাদেরকে পরামর্শ দিয়েছি যে, যা আমি তোমাদের কাছে হাজির করলাম, তোমরা তা গ্রহণ করে নিলে তোমাদের জন্যই মঙ্গলজনক-এই দুনিয়া ও আখিরাতে দু জগতেই। আর যদি তোমরা তা প্রত্যাখ্যান করো, তাহলে আমি আল্লাহর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করবো, যতক্ষণ না তিনি আমার এবং তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দেন।'
তারা তাঁকে বললো,
"তুমি যদি আমাদের কোনো প্রস্তাবই মানতে না চাও, তাহলে শোনো, আমাদের দেশ অনেক সংকীর্ণ, আমরা খুবই দরিদ্র, আর আমাদের জীবনযাত্রাও দুর্বিষহ। এক কাজ করলে কেমন হয়, যে রব তোমাকে পাঠিয়েছে, তাঁকে গিয়ে তুমি একটু বলো যেন সে এই পর্বতগুলো সরিয়ে দেয়, এগুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে সমতল করে একটু ফাঁকা স্থান তৈরি করে দিলেই চলবে। আর তুমি এটা কেন তাঁকে বলছো না মক্কার মধ্যে কয়েকটি নদী প্রবাহিত করে দিতে? যেমন করে সিরিয়া আর ইরাকে নদী আছে, সেরকম। আমরাও তো অন্যদের মতো নদী চাই! আর হ্যাঁ, আরেকটা ব্যাপার, আমরা চাই যে, তুমি তোমার রবের কাছে গিয়ে বলো, সে যেন আমাদের কয়েকজন পূর্বপুরুষকে মৃত থেকে জীবিত করে দেয়। কুসাই ইবন কালবের প্রাণও ফিরিয়ে এনো কিন্তু, তিনি তো অনেক জ্ঞানী লোক ছিলেন, তাঁকে জিজ্ঞেস করবে যে তুমি যা বলছো তা কি সত্য নাকি মিথ্যা। মুহাম্মাদ, তুমি যদি এটুকু করতে পারো আর আমাদের বাপ-দাদারা যদি তোমার কথা মেনে নেয়, তাহলে আমরা তোমাকে অনুসরণ করবো।"
রাসূলুল্লাহ এবারও শান্তকণ্ঠে উত্তর দিলেন,
'এ কারণে আমাকে পাঠানো হয়নি। আমি রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে কেবল সেটাই এনেছি, যা সহকারে তিনি আমাকে প্রেরণ করেছেন। আমার তোমাদেরকে যা জানানোর ছিল তা জানিয়েছি, যদি তোমরা তা গ্রহণ করো, তাহলে তা তোমাদের জন্যই কল্যাণকর, এই দুনিয়া এবং আখিরাতে। আর যদি তোমরা তা প্রত্যাখ্যান করো, তাহলে আমাকে অবশ্যই ধৈর্য সহকারে আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় থাকতে হবে যেন তিনি আমাদের মধ্যে বিচার করে দেন।'
তারা বিদ্রূপ করতেই থাকলো,
'আচ্ছা, তাহলে এক কাজ করো, তুমি তোমার রবকে বলো একজন ফেরেশতা পাঠাতে, যে তোমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে যে তুমি সত্য বলছো। আর তোমার রবকে বলো যেন আমাদের জন্য কিছু দূর্গ, বাগান, সোনা ও রুপার খনি দান করে, আর হ্যাঁ, আরেকটা কাজ করলে কেমন হয়-তুমি তাঁকে বলো যেন সে তোমার প্রয়োজনটাও পূরণ করে দেয়, কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি তুমি আমাদের মতো করে জীবিকা মেটানোর চেষ্টা করছো।'
তারা এই বলে উপহাস করছিল যে, মুহাম্মাদ যদি আল্লাহর এত প্রিয় বান্দা হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে কেন অন্য সবার মতো অর্থ উপার্জন করতে হচ্ছে! তাই তারা বলছিলো যে, আল্লাহর কাছ থেকে ধনসম্পদ নিয়ে আসতে। যেন তিনি যে আল্লাহর নিকটবর্তী বান্দা-সে কথা প্রমাণিত হয়। এসব কথাতেও রাসূলুল্লাহর ধৈর্যচ্যুতি হলো না বা তিনি উত্তেজিত হলেন না, তিনি এতটুকুই বললেন,
'আমি এসব কিছুই করবো না। আমি আমার রবের কাছে এসব জিনিস চাইতে যাবো না। এসব কারণে আমাকে তোমাদের কাছে প্রেরণ করা হয়নি। আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁর দ্বীন প্রচারের জন্য। যদি তোমরা আমার উপস্থাপিত বার্তা স্বীকার করে নাও, তাহলে দুনিয়া ও আখিরাতে তা তোমাদের জন্যই লাভজনক। আর যদি তোমরা তা অস্বীকার করো, তাহলে আমি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত। আর আমি এই বিষয়টি আমার রবের হাতে ছেড়ে দিলাম যতক্ষণ না তিনি আমার ও তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দেন।'
তারা বললো, 'আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে তোমার রবকে বলো তুমি আমাদেরকে যে শাস্তির প্রতিজ্ঞা করছো, সেই শাস্তি প্রেরণ করতে।'
আল্লাহর রাসূল বললেন, 'এটা আল্লাহর হাতে, যদি তিনি চান তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দিবেন।'
তারা টিটকারি মেরে বললো, 'আরে মুহাম্মাদ, তোমরা রব কি জানে না যে আমরা তোমাকে এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছি? সে কেন তোমাকে উত্তর দিতে সাহায্য করছে না? আমরা ভালোই জানি কে তোমাকে এইসব শিক্ষা দিচ্ছে, তোমাকে তোমার এই কুরআন শেখাচ্ছে ইয়ামামার এক লোক, তার নাম আর-রহমান। আর আমরা সেই আর-রহমানের কথায় কখনোই বিশ্বাস স্থাপন করবো না।'
কুরাইশরা হঠাৎ করে 'আর-রহমান' নামক ব্যক্তির গল্প ফেঁদে বসে। তাদের মাঝে একজন বললো, 'যাও, যাও, গিয়ে আল্লাহর কন্যা ফেরেশতাদের ইবাদত করো।' আরেকজন বললো, 'আমরা তোমাকে ততক্ষণ বিশ্বাস করবো না যতক্ষণ না তুমি আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে হাজির করছো।' তারা সবাই মিলে রাসূলুল্লাহকে উপহাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে তাঁকে অপমান করে সে স্থান থেকে চলে গেল।
সবাই চলে যাওয়ার পর তাদের মাঝে একজন রাসূলুল্লাহর কাছে ফিরে আসলো, তার নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবন উমাইয়া। তার ফিরে আসা দেখে মনে হয় যেন তার মুহাম্মাদের জন্য খারাপ লাগছে, হয়তো সে ক্ষমা চাইবে। সে নবীজির কাছে এসে বললো,
'মুহাম্মাদ, তোমার লোকেরা তোমার কাছে সেরা সেরা প্রস্তাব পেশ করেছে, আর তুমি-তুমি তাদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছ। তোমাকে কোনো অলৌকিক ঘটনা (মু'যিজা) দেখাতে বললো, সেটাতেও তোমার আপত্তি। তারপর বলা হলো, তুমি যেন তাদের ওপর আযাব নিয়ে আসো, সেটাও তুমি পারলে না। এবার আমি তোমাকে একটা কথা বলি-আমি তোমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস করবো না, যতক্ষণ না তুমি একটা মই নিয়ে আসো যেটা সরাসরি ওই আকাশ পর্যন্ত যায়। তুমি মই বেয়ে ওপরে উঠবে আর আমি তোমাকে দেখবো। তারপর তুমি আল্লাহর কাছে পৌঁছে তাঁকে বলবে সে যেন তোমার ব্যাপারে (প্রমাণস্বরূপ) একটি পত্র লিখে দেয়; সেখানে লেখা থাকবে যে, তুমি তার নবী, আর এর ওপর থাকবে তার স্বাক্ষর। এরপর চারজন ফেরেশতা সেই পত্র সঙ্গে করে নিচে নেমে আসবে, আর তারাও সাক্ষ্য দিবে যে তুমি আল্লাহর রাসূল। সত্যি কথা কী জানো, তুমি যদি এতকিছু করেও ফেলো, আমার মনে হয় এরপরও আমি তোমাকে বিশ্বাস করবো না।'
এই ছিল রাসূলের চারপাশের পরিবেশ এবং মানুষগুলোর অবস্থা ও তাদের মানসিকতা। এ ধরনের লোকদের তিনি দাওয়াহ করছিলেন।
টিকাঃ
২৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৬।
📄 চাপ প্রয়োগ
কুরাইশরা রাসূলুল্লাহর ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। তাঁকে দমিয়ে রাখতে সম্ভাব্য সকল পথেই হেঁটেছে তারা। এক পর্যায়ে নবীজির চাচা আবু তালিবকে কাজে লাগিয়ে তাদের হীন উদ্দেশ্য হাসিলের প্রয়াস চালায়। আবু তালিবের ছেলে আকীলের মুখেই এর একটি বিবরণ পাওয়া যায়।
'একদিন কুরাইশের লোকেরা বাবার কাছে এসে খুব হৈ চৈ লাগিয়ে দিলো। বললো, তোমার ভাতিজা মুহাম্মাদ, আমাদের সভা-সমাবেশে বাধা দিচ্ছে, দশ পদের ঝামেলা বাঁধাচ্ছে। তাঁকে বলে দিও-আমাদের থেকে সাবধান, তাঁকে যেন ধারেকাছেও আর না দেখি। বাবা আমাকে ডেকে বললেন, মুহাম্মাদকে ডেকে আনো। আমি ভাইকে খুঁজতে বেরোলাম। একটা কেনাসের²⁴ মধ্যে তাঁকে খুঁজে পেলাম।"
"রাসূলুল্লাহ বাবার সাথে দেখা করতে এলেন। বাবা বললেন, লোকেরা তোমার নামে অভিযোগ এনেছে। তুমি নাকি তাদের সভায় বাধা দিচ্ছো, কী সব ঝামেলা পাকাচ্ছো, তুমি কেন এসব করছো?"
আবু তালিব মুহাম্মাদের সাথে ধমকের সুরে কথা বলছিলেন না। হুকুম দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ভাতিজাকে ডাকেননি, বরং ভাতিজার জন্য যা ভালো হবে বলে মনে হয়েছে, তেমনটাই পরামর্শ দেওয়ার জন্য ডেকেছিলেন।
রাসূলুল্লাহ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন-চাচা, আপনি কি সূর্য দেখতে পাচ্ছেন?
- হ্যাঁ।
- এই সূর্যের তাপ থেকে আমাকে রক্ষা করতে আপনি যতোটা অপারগ, আমার এ দাওয়াতী কাজ থামিয়ে দিতেও আমি ততোটাই অপারগ। '²⁵
ইসলাম ছিল রাসূলুল্লাহর জীবন, জীবনের মিশন। এই মিশন থেকে সরে আসার কথা তিনি ভাবতেও পারতেন না। অপেক্ষাকৃত দুর্বল একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ এনে দেয়, তবুও আমি এ কাজ থেকে বিরত থাকবো না, যতক্ষণ না স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এই বিষয়ের ফয়সালা করে দেন, অথবা আমার মৃত্যু হয়।' তাঁর চাচা ভাতিজার কথার উত্তরে বলেন, আমার ভাতিজা, তুমি সত্য বলেছো। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। এগিয়ে যাও এবং নিজের মিশন পূর্ণ করো। আবু তালিব বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর ভাতিজাকে এই কাজ থেকে বিরত রাখা যাবে না। তাই তিনি নবীজিকে সবরকম ভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতে সম্মত হন।
কুরাইশরা রাসূলুল্লাহকে আটকানোর জন্য সর্বোতভাবে চেষ্টা চালাতে থাকে। কুরাইশদের অত্যাচার ও নিপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য মুহাম্মাদ তাঁর কিছু সাহাবীকে আবিসিনিয়াতে হিজরত করার নির্দেশ দেন। সঙ্গে সঙ্গে কুরাইশরা আবিসিনিয়ার শাসক নাজ্জাশির সাথে যোগাযোগ করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। তারা তড়িঘড়ি করে তাঁর কাছে রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করে তাঁকে বলে তিনি যেন তার দেশে হিজরত করা মুসলিমদেরকে মক্কায় ফেরত পাঠান।
সে সময় মুসলিমদের অবস্থা করুণ। রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা- কোনো বিচারেই তৎকালীন মুসলিমরা কুরাইশদের সমকক্ষ বা হুমকিস্বরূপ ছিল না। তারপরও কুরাইশরা এই নিরীহ মুসলিমদের পেছনে লেগে ছিল। কারণ তারা চাইছিল ইসলামকে যেন গোড়া থেকে উপড়ে ফেলা যায়। তারা বুঝতে পেরেছিল ইসলামকে যদি শুরুতেই দমন করা না হয় তাহলে একসময় তাদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।
টিকাঃ
২৪. কেনাস অর্থ: একটি ছোট্ট ঘর বা তাঁবু।
২৫. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮২।