📄 চরিত্রহননের চেষ্টা
কুরাইশরা আল্লাহর রাসূলকে বিভিন্ন আজেবাজে নামে ডাকতো।
"তারা বলে, ওহে, যার প্রতি কোরআন নাযিল হয়েছে, তুমি তো আলবৎ একজন উন্মাদ।” (সূরা হিজর, ১৫: ৬)
উন্মাদ বা পাগল ডাকার পাশাপাশি জাদুকর, মিথ্যুক এসব বলেও সম্বোধন করতো। কুৎসা রটানোর জন্য যা মুখে আসতো, বলতো। কিছুই বাকি রাখেনি। তারা চাচ্ছিলো রাসূলুল্লাহর নামে কুৎসা রটিয়ে, তাঁর ভাবমূর্তিকে নষ্ট করে দিতে। লোকে যেন তাঁর কথায় পাত্তা না দেয়। তাহলেই ইসলামের প্রচার-প্রসার থেমে যাবে। এভাবে চরিত্রহননের মাধ্যমে তাঁর নিয়ে আসা ইসলামের বার্তাকে ধ্বংস করে দিতে চাইছিল কুরাইশরা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
"আমি অবশ্যই জানি, তারা যা বলে তা আপনাকে কষ্ট দেয়। কিন্তু তারা তো আপনাকে অস্বীকার করে না, বরং জালিমরা আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করে।” (সূরা আন'আম, ৬: ৩৩)
তারা বস্তুত ব্যক্তি মুহাম্মাদকে প্রত্যাখ্যান করে নি- মনের গভীরে তারা বিশ্বাস করতো যে মুহাম্মাদ সত্যি কথাই বলছেন কিন্তু তারপরও তারা তাঁর বিরোধিতা করেছে। কারণ তাদের সমস্যা ছিল ইসলাম। নিজেদের ধর্ম বাদ দিয়ে ইসলামকে তারা কোনো ক্রমেই মেনে নিতে চায়নি। ওয়ারাকা ইবন নওফালের সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠছিল। নবুওয়াতের একেবারে প্রথম দিকে, তিনি রাসূলুল্লাহকে বলেছিলেন, 'তোমাকে তোমার দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে।' সেদিন এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ চমকে উঠেছিলেন, তিনি জানতেন মক্কার লোকেরা তাঁকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। কিন্তু ওয়ারাকাহ অমোঘ বাণীর মত বলেন, 'যে ব্যক্তিই দ্বীনের এই বার্তা নিয়ে এসেছে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়েছে।'
মক্কার বাজারগুলো তখন কেবলমাত্র ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা কেনাকাটার জায়গা নয়, বরং এগুলো তাদের জন্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও বটে। সেখানে কাব্যচর্চা চলতো, চলতো বক্তৃতার চর্চা। সেরা কবিতাকে সসম্মানে ঝুলানো হতো আল-কাবার দেয়ালে। এগুলোকে বলা হতো আল-মুয়াল্লাকাত, বা ঝুলানো কবিতা।
আল্লাহর রাসূল এই বাজারগুলোতে এসেই দাওয়াহ দিতেন, সাধারণ জনতাকে বোঝাতেন ইসলামের কথা। ইমাম আহমেদ বর্ণনা করেছেন যে রাবিআ ইবন হাদ্দাদ বলেন,
"আমি আল্লাহর রাসূলকে জুলমাজায বাজারে দেখেছি। তিনি লোকদের ডেকে বলছিলেন, তোমরা বলো, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তাহলেই তোমরা সফলকাম হবে। রাসূলুল্লাহর সাথে নতুন নতুন লোকের দেখা হতো আর তিনি একই কথার পুনরাবৃত্তি করতেন।
হঠাৎ এক লোক তাঁর পিছু নিল। রাসূলুল্লাহ যার সাথেই কথা বললেন, সেই লোক পেছন পেছন গিয়ে তাকে বলে আসতো, এই লোককে (অর্থাৎ মুহাম্মাদকে) বিশ্বাস কোরো না, সে একটা মিথ্যুক।
আমি জিজ্ঞেস করলাম এই লোকটি কে, তারা আমাকে বললো, সে তাঁর চাচা আবু লাহাব।"²¹
রাবিআ ইবন হাদ্দাদ মক্কার অধিবাসী ছিলেন না। তাই তিনি আবু লাহাবকে চিনতেন না। এই ঘটনা বলে দেয় মুহাম্মাদের জন্য দাওয়াতের কাজ চালিয়ে কী ভয়াবহ দুঃসাধ্য ছিল-তিনি যা কিছুই করতেন, আবু লাহাব সেটা ভেস্তে দিত। সাধারণত কাজের ফল মানুষের মনে লেগে থাকার উৎসাহ জাগায়। আর্থিক প্রতিদান, সমাজের কাছে স্বীকৃতি, নেতাকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া সহায়তা ইত্যাদি-অন্তত কিছু একটা বিনিময়ের আশা নিয়েই মানুষ খাটতে থাকে। আশানুরূপ বিনিময় না পেলে মানুষের কাজের ইচ্ছা মরে যায়, প্রেরণা থাকে না, একসময় সে ক্ষান্ত দেয়। প্রতিদানের আশা ব্যতিক্রম। তারা নিরবিচ্ছিন্নভাবে লাগাতার কাজ করে গেছেন, যদিও তারা বিনিময়ে কিছুই পাননি। না করেই কোনো কাজ করে যাওয়া খুব কঠিন। কিন্ত রাসূলুল্লাহ আর নবী-রাসূলরা উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নূহের কথা। তিনি দিনরাত তাঁর জাতির কাছে দাওয়াহ দিয়েছেন-গোপনে এবং প্রকাশ্যে, কিন্তু বলার মতো কোনো সাড়া তাদের মাঝে পাননি। চোখের সামনে বিরোধিতাকারী এক জাতিকে নিয়েও তিনি দাওয়াহ করে গেছেন সুদীর্ঘ নয়শ পঞ্চাশ বছর।
এমন আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন বায়হাকী। হাজ্জের মৌসুম সবে শুরু, আল-ওয়ালিদ ইবন মুগীরা সে সময় কুরাইশদের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বি। সে কুরাইশ নেতাদের নিয়ে মিটিং ডাকলো। বললো, হাজ্জের মৌসুম আসছে, আরবের প্রতিনিধিরা কিছুদিন পরেই এখানে জমায়েত হবে। আসো সবাই মিলে (মুহাম্মাদের বিষয়ে) একটি সিদ্ধান্তে আসি। এই বিষয়টা নিয়ে আমাদের মধ্যে যেন কোনো মতভেদ না থাকে। তার বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল যে, মুহাম্মাদের ব্যাপারে একটা হেনস্থা করা। হাজ্জের সময় মক্কায় অনেক লোকের সমাগম হবে, আর মুহাম্মাদও এই সুযোগ হাতছাড়া করবে না, তাদের কাছে ইসলামের বার্তা নিয়ে যাবে, তাই মুহাম্মাদের ব্যাপারে তারা সবাইকে কী বলবে সে বিষয়ে সর্বসম্মত বক্তব্যে পৌঁছানো জরুরি ছিল। একেকজন একেক রকম কথা বললে কোন লাভ হবে না। কেউ বলবে সে মিথ্যুক, কেউ বলবে গণক, কেউ বলবে জাদুকর-এভাবে না করে বরং সবাই মিলে একই অপবাদ দিলে লোকে বেশি বিশ্বাস করবে।
কুরাইশরা ওয়ালিদ ইবন মুগীরাকে বললো, "আপনিই বলেন কী করা যায়। আপনি যেটা বলবেন, আমরা সেটাই সবাইকে বলবো।"
- আমি তোমাদের মুখে শুনতে চাই, ওয়ালিদ জবাব দিল।
- আমরা বলবো যে, সে একজন জ্যোতিষী।
- না, সে জ্যোতিষী নয়। আমি জ্যোতিষী দেখেছি, তাঁর মধ্যে জ্যোতিষীদের বৈশিষ্ট্য নেই, সে তাদের মতো অন্তঃসারশূন্য কথা বলে না।
- তাহলে আমরা বলবো যে, সে পাগল, বদ্ধ উন্মাদ।
- আমি পাগলও দেখেছি এবং তাদের প্রকৃতিও দেখেছি, সে তাদের মতো অপ্রকৃতস্থ আচরণ করে না, অসংলগ্ন কথাও বলে বেড়ায় না। সে উন্মাদ নয়, উন্মাদ কাকে বলে আমরা জানি।
- তাহলে আমরা বলবো যে, সে একজন কবি।
- না, না, সে কোনো কবি নয়। আমরা সব রকম ছন্দের কবিতাই চিনি, সে যা বলে তা কোনো কবিতা না।
- তাহলে আমরা বলি যে, সে একজন জাদুকর।
এই প্রস্তাবেও ওয়ালিদ রাজি হলো না, বললো-সে কোনো জাদুকরও নয়, আমরা জাদুকর দেখেছি আর তাদের জাদু-কৌশল দেখেছি। সে ঝাঁড়ফুক করে না, জাদুটোনাও করে না।
কুরাইশের নেতারা একে একে সম্ভাব্য সকল অপবাদ পেশ করলো। কিন্তু ওয়ালিদ ইবন মুগীরা বললো, না, এগুলো বলে কোনো লাভ হবে না।
- তাহলে, আপনি বলে দিন আমরা তাঁর ব্যাপারে কী বলবো।
ওয়ালিদ অনেকক্ষণ চিন্তা করে বললো,
'আল্লাহর কসম করে বলছি, তাঁর কথা বড়ো মিষ্টি, কী যেন গভীর তাৎপর্য আছে তাঁর কথায়। তোমরা তাঁকে নিয়ে যেটাই বলো না কেউ তোমাদেরকে বিশ্বাস করবে না। তবে তাঁর সম্পর্কে এ কথা বলতে পারো, তিনি একজন জাদুকর। তিনি যেসব কথা পেশ করেছেন তা স্রেফ জাদু। তাঁর কথা শুনলে পিতা-পুত্র, ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রী এবং গোত্র ও তার সদস্যের মাঝে বিরোধ লেগে যায়।²²
কুরআনে আল্লাহ এই ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন,
"সে (সত্য গ্রহণের ব্যাপারে কিছুটা) চিন্তাও করেছিল, তারপর আবার নিজের গোঁড়ামিতে ডুবে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। তার উপর অভিশাপ, কেমন করে সে (সত্য জানার পরেও) বিরোধিতার সিদ্ধান্ত নিল! তার উপর আবারও অভিশাপ, সে কীভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিল! সে একবার (উপস্থিত লোকদের দিকে) চেয়ে দেখলো, (অহংকার ও দম্ভভরে) সে ভ্রু কুঁচকালো এবং মুখটা বিকৃত করে ফেললো। অতঃপর সে পেছনে ফেরলো এবং অহংকার করলো। এরপর বললো, এটা তো লোক পরস্পরায় প্রাপ্ত জাদুবিদ্যার খেল ছাড়া কিছু নয়। এটা তো মানুষের কথা।" (সূরা মুদদাসসির, ৭৪: ১৮-২৫)
টিকাঃ
২১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮১।
২২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২২।
📄 ইসলামকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা
আন নযর ইবন হারিস পারস্য গিয়ে গল্প শিখে আসতো। সেখান থেকে মক্কায় ফিরে এসে সে লোকদের ডেকে ডেকে বলতো, 'আমার কাছে আসো, আমার কাছে আসলে আরও ভালো ভালো কাহিনি শুনতে পাবে।' সে লোকজনকে বলতো, মুহাম্মাদের বার্তা আসলে কেচ্ছা-কাহিনি দিয়ে ভরা, ওসব হচ্ছে গল্পকথা-কোনো ভিত্তি নেই। আল্লাহর নবীদের সাথে আসলেই কী হয়েছিল তা কি কেউ জানে? মুহাম্মদ যা বলছে সেসব বানোয়াট রূপকথার গল্প। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
"আর তারা বলে, এগুলো তো পুরাকালের রূপকথা – এসব সে লিখিয়ে নিয়েছে, আর এগুলো তার কাছে পাঠ করা হয় সকালে ও সন্ধ্যায়।” (সূরা ফুরকান, ২৫: ৫)
📄 আপস এবং সমঝোতা
কুরাইশের লোকেরা আল্লাহর রাসূলের সাথে আপোসের চেষ্টাও করেছিল। নবীজির কাছে এসে বললো-আসুন, আমরা একটি চুক্তি করি। আমরা এই শর্তে রাজি যে, আপনি এক দিন আমাদের দেব-দেবীর ইবাদত করবেন, আর আমরা পর দিন আল্লাহর ইবাদত করবো।
রাসূলুল্লাহ তাদেরকে বললেন যে তিনি কখনোই এমন কিছুতে রাজি হবেন না। তারা কিছুক্ষণ পর আবার তাঁর কাছে ফিরে আসলো। এবার বললো-আপনার জন্য এবার আগের বারের চেয়েও ভালো প্রস্তাব আছে। আপনি এক দিনের জন্য আমাদের দেবদেবীর ইবাদত করেন, তাহলে আমরা এক সপ্তাহ যাবৎ আল্লাহর ইবাদত করবো।
- না, রাসূলুল্লাহ তাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন।
এরপর আবার ফিরে এসে তারা আরেকটি প্রস্তাব দিলো। বললো, 'ঠিক আছে, আমরা নাহয় এক মাস ধরে আল্লাহর ইবাদত করবো, আপনি শুধু আমাদেরকে একটি দিন হলেও দিন।'
রাসূলুল্লাহর সেই এক জবাব, 'না', আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করলেন,
"তারা চায় আপনি নমনীয় হন, তবে তারাও নমনীয় হবে।” (সূরা কালাম ৬৮:৯)
কুরাইশদের ধর্ম ছিল মানবরচিত, তাদের নিজহাতে তৈরি, তারা চাইলেই আপোস করতে পারতো, যখন খুশি ধর্মকে নিজের মন মত বদলে নিতে পারতো। তাদের জন্য এটা কোনো ব্যাপার না। কিন্তু রাসূলুল্লাহর কাছে কোনো বিকল্প ছিল না। এমনকি তারা যদি বলতো, রাসূলুল্লাহ মাত্র এক দিন দেব দেবীকে পূজার বিনিময়ে, তারা সারা বছর আল্লাহর ইবাদত করবে, তারপরও নবীজির সামনে দ্বীনকে ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এই ধরনের আপোস বা সমঝোতা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন,
"বলুন, হে কাফিররা, তোমরা যার ইবাদাত করো, আমি তার ইবাদাত করিনা। এবং আমি যার ইবাদাত করি তোমরা তার ইবাদাতকারী নও। আর তোমরা যার ইবাদত করছ আমি তার ইবাদাতকারী হবো না। আর আমি যার ইবাদাত করি তোমরা তার ইবাদাতকারী নও। তোমাদের জন্য তোমাদের দীন আর আমার জন্য আমার দীন।” (সূরা কাফিরুন, ১০৬: ১-৬)
কুরাইশের লোকেরা আরও নানাভাবে সমঝোতায় আসার চেষ্টা করলো। কিন্তু কোনোটিই কাজে দিলো না। দিনে দিনে তারা আরও ক্ষেপে গেল, কিন্তু রাসূলুল্লাহর এক কথা-তিনি কেবল একজন রাসূল, আল্লাহর পাঠানো একজন দাস মাত্র-আল্লাহর দ্বীনের উপর হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার তিনি রাখেন না。
📄 প্রলোভন এবং চ্যালেঞ্জ
এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন ইবন আব্বাস²³। কুরাইশ নেতারা কাবার পাশে মিলিত হলো। বললো-আমরা সবরকম উপায়ে প্রচেষ্টা চালাবো, মুহাম্মাদকে এবার কোনো অজুহাত দেওয়ার সুযোগ দেবো না। তারা রাসূলুল্লাহকে ডেকে পাঠালো।
নবীজির মনে বড়ো আশা কুরাইশরা ইসলাম গ্রহণ করবে। তাদের ডাক পেয়ে খুব খুশি হলেন, ভাবলেন হয়তো তাদের মন বদলেছে, হয়তো তারা ইসলামের প্রতি একটু নরম হয়েছে!
নবীজি ছুটতে ছুটতে হাজির হলেন। তারা বললো-হে মুহাম্মাদ! তোমার সাথে মিটমাট করার উদ্দেশ্যে আমরা তোমাকে ডেকে পাঠিয়েছি। তাদের বক্তব্যের শুরুটা এমনই ছিল, সুন্দর, আশা জাগানিয়া। কিন্তু এরপরই তারা গা-জ্বালা করা কথাবার্তা বলতে শুরু করলো,
'আল্লাহর কসম, তুমি যা করলে, আর কোনো আরব লোক তার কওমের জন্য তোমার মত এত যন্ত্রণা আনে নি। বাপ-দাদার বিরোধিতা, আমাদের ধর্মের সমালোচনা, আমাদের রীতিনীতি নিয়ে উপহাস, দেব-দেবীকে অভিশাপ দেওয়া সবই তুমি করেছো। আমাদের সমাজটাকে বিভক্ত করে ফেলেছো তুমি। তোমার সাথে আমাদের সম্পর্কে ফাটল ধরানোর জন্য আমাদের অপ্রিয় কোনো কাজ করতে বাদ রাখোনি।'
এরপর শুরু হলো নানা রকম প্রলোভন দেখানো। তারা বললো, 'মুহাম্মাদ! অর্থের আশাতেই যদি তুমি এই বাণী প্রচার করে থাকো, তাহলে আমরা তোমার জন্য যত লাগে সম্পদের ব্যবস্থা করবো, তোমাকে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বিত্তশালী বানিয়ে দেব। তুমি যদি ক্ষমতার আশায় এ ধর্ম নিয়ে এসে থাকো, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের রাজা হিসেবে বেছে নিতে পারি। আর তুমি যদি নারীর লোভে এসব কাজ করে থাকো, তাহলে আমরা তোমার জন্য কুরাইশের সবচেয়ে সেরা দশ নারীকে বাছাই করে আনবো, এরপর তাদের প্রত্যেককে তোমার সাথে বিয়ে দেব। যদি তোমার ওপর শয়তান ভর করে থাকে, তাহলে আমরা তোমার সুস্থতার জন্য যা কিছু লাগে ব্যয় করবো, এমনকি যদি তাতে আমাদের সমস্ত সম্পদও দিয়ে দিতে হয়, তাও দেব। আমাদেরকে শুধু বলো তুমি কী চাও।'
রাসুলুল্লাহ জবাবে শান্তকণ্ঠে বললেন,
'তোমরা যা কিছুই বলেছো, তার কিছুই আমি চাই না। অর্থকড়ি, মানমর্যাদা কিংবা তোমাদের ওপর ক্ষমতা লাভের আশায় তোমাদের কাছে ইসলামের বার্তা নিয়ে আসিনি। আল্লাহ তোমাদের কাছে আমাকে একজন রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তিনি আমার উপর তাঁর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং আমাকে আদেশ দিয়েছেন তোমাদেরকে সুসংবাদ দিতে ও সতর্ক করতে। আমি তোমাদের কাছে আমার রবের পক্ষ থেকে একটি বার্তা নিয়ে এসেছি মাত্র। তোমাদেরকে পরামর্শ দিয়েছি যে, যা আমি তোমাদের কাছে হাজির করলাম, তোমরা তা গ্রহণ করে নিলে তোমাদের জন্যই মঙ্গলজনক-এই দুনিয়া ও আখিরাতে দু জগতেই। আর যদি তোমরা তা প্রত্যাখ্যান করো, তাহলে আমি আল্লাহর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করবো, যতক্ষণ না তিনি আমার এবং তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দেন।'
তারা তাঁকে বললো,
"তুমি যদি আমাদের কোনো প্রস্তাবই মানতে না চাও, তাহলে শোনো, আমাদের দেশ অনেক সংকীর্ণ, আমরা খুবই দরিদ্র, আর আমাদের জীবনযাত্রাও দুর্বিষহ। এক কাজ করলে কেমন হয়, যে রব তোমাকে পাঠিয়েছে, তাঁকে গিয়ে তুমি একটু বলো যেন সে এই পর্বতগুলো সরিয়ে দেয়, এগুলোকে মাটির সাথে মিশিয়ে সমতল করে একটু ফাঁকা স্থান তৈরি করে দিলেই চলবে। আর তুমি এটা কেন তাঁকে বলছো না মক্কার মধ্যে কয়েকটি নদী প্রবাহিত করে দিতে? যেমন করে সিরিয়া আর ইরাকে নদী আছে, সেরকম। আমরাও তো অন্যদের মতো নদী চাই! আর হ্যাঁ, আরেকটা ব্যাপার, আমরা চাই যে, তুমি তোমার রবের কাছে গিয়ে বলো, সে যেন আমাদের কয়েকজন পূর্বপুরুষকে মৃত থেকে জীবিত করে দেয়। কুসাই ইবন কালবের প্রাণও ফিরিয়ে এনো কিন্তু, তিনি তো অনেক জ্ঞানী লোক ছিলেন, তাঁকে জিজ্ঞেস করবে যে তুমি যা বলছো তা কি সত্য নাকি মিথ্যা। মুহাম্মাদ, তুমি যদি এটুকু করতে পারো আর আমাদের বাপ-দাদারা যদি তোমার কথা মেনে নেয়, তাহলে আমরা তোমাকে অনুসরণ করবো।"
রাসূলুল্লাহ এবারও শান্তকণ্ঠে উত্তর দিলেন,
'এ কারণে আমাকে পাঠানো হয়নি। আমি রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে কেবল সেটাই এনেছি, যা সহকারে তিনি আমাকে প্রেরণ করেছেন। আমার তোমাদেরকে যা জানানোর ছিল তা জানিয়েছি, যদি তোমরা তা গ্রহণ করো, তাহলে তা তোমাদের জন্যই কল্যাণকর, এই দুনিয়া এবং আখিরাতে। আর যদি তোমরা তা প্রত্যাখ্যান করো, তাহলে আমাকে অবশ্যই ধৈর্য সহকারে আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় থাকতে হবে যেন তিনি আমাদের মধ্যে বিচার করে দেন।'
তারা বিদ্রূপ করতেই থাকলো,
'আচ্ছা, তাহলে এক কাজ করো, তুমি তোমার রবকে বলো একজন ফেরেশতা পাঠাতে, যে তোমার পক্ষে সাক্ষ্য দেবে যে তুমি সত্য বলছো। আর তোমার রবকে বলো যেন আমাদের জন্য কিছু দূর্গ, বাগান, সোনা ও রুপার খনি দান করে, আর হ্যাঁ, আরেকটা কাজ করলে কেমন হয়-তুমি তাঁকে বলো যেন সে তোমার প্রয়োজনটাও পূরণ করে দেয়, কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি তুমি আমাদের মতো করে জীবিকা মেটানোর চেষ্টা করছো।'
তারা এই বলে উপহাস করছিল যে, মুহাম্মাদ যদি আল্লাহর এত প্রিয় বান্দা হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে কেন অন্য সবার মতো অর্থ উপার্জন করতে হচ্ছে! তাই তারা বলছিলো যে, আল্লাহর কাছ থেকে ধনসম্পদ নিয়ে আসতে। যেন তিনি যে আল্লাহর নিকটবর্তী বান্দা-সে কথা প্রমাণিত হয়। এসব কথাতেও রাসূলুল্লাহর ধৈর্যচ্যুতি হলো না বা তিনি উত্তেজিত হলেন না, তিনি এতটুকুই বললেন,
'আমি এসব কিছুই করবো না। আমি আমার রবের কাছে এসব জিনিস চাইতে যাবো না। এসব কারণে আমাকে তোমাদের কাছে প্রেরণ করা হয়নি। আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন তাঁর দ্বীন প্রচারের জন্য। যদি তোমরা আমার উপস্থাপিত বার্তা স্বীকার করে নাও, তাহলে দুনিয়া ও আখিরাতে তা তোমাদের জন্যই লাভজনক। আর যদি তোমরা তা অস্বীকার করো, তাহলে আমি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত। আর আমি এই বিষয়টি আমার রবের হাতে ছেড়ে দিলাম যতক্ষণ না তিনি আমার ও তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দেন।'
তারা বললো, 'আচ্ছা ঠিক আছে, তাহলে তোমার রবকে বলো তুমি আমাদেরকে যে শাস্তির প্রতিজ্ঞা করছো, সেই শাস্তি প্রেরণ করতে।'
আল্লাহর রাসূল বললেন, 'এটা আল্লাহর হাতে, যদি তিনি চান তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দিবেন।'
তারা টিটকারি মেরে বললো, 'আরে মুহাম্মাদ, তোমরা রব কি জানে না যে আমরা তোমাকে এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছি? সে কেন তোমাকে উত্তর দিতে সাহায্য করছে না? আমরা ভালোই জানি কে তোমাকে এইসব শিক্ষা দিচ্ছে, তোমাকে তোমার এই কুরআন শেখাচ্ছে ইয়ামামার এক লোক, তার নাম আর-রহমান। আর আমরা সেই আর-রহমানের কথায় কখনোই বিশ্বাস স্থাপন করবো না।'
কুরাইশরা হঠাৎ করে 'আর-রহমান' নামক ব্যক্তির গল্প ফেঁদে বসে। তাদের মাঝে একজন বললো, 'যাও, যাও, গিয়ে আল্লাহর কন্যা ফেরেশতাদের ইবাদত করো।' আরেকজন বললো, 'আমরা তোমাকে ততক্ষণ বিশ্বাস করবো না যতক্ষণ না তুমি আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতাদেরকে আমাদের সামনে হাজির করছো।' তারা সবাই মিলে রাসূলুল্লাহকে উপহাস, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে তাঁকে অপমান করে সে স্থান থেকে চলে গেল।
সবাই চলে যাওয়ার পর তাদের মাঝে একজন রাসূলুল্লাহর কাছে ফিরে আসলো, তার নাম ছিল আবদুল্লাহ ইবন উমাইয়া। তার ফিরে আসা দেখে মনে হয় যেন তার মুহাম্মাদের জন্য খারাপ লাগছে, হয়তো সে ক্ষমা চাইবে। সে নবীজির কাছে এসে বললো,
'মুহাম্মাদ, তোমার লোকেরা তোমার কাছে সেরা সেরা প্রস্তাব পেশ করেছে, আর তুমি-তুমি তাদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছ। তোমাকে কোনো অলৌকিক ঘটনা (মু'যিজা) দেখাতে বললো, সেটাতেও তোমার আপত্তি। তারপর বলা হলো, তুমি যেন তাদের ওপর আযাব নিয়ে আসো, সেটাও তুমি পারলে না। এবার আমি তোমাকে একটা কথা বলি-আমি তোমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস করবো না, যতক্ষণ না তুমি একটা মই নিয়ে আসো যেটা সরাসরি ওই আকাশ পর্যন্ত যায়। তুমি মই বেয়ে ওপরে উঠবে আর আমি তোমাকে দেখবো। তারপর তুমি আল্লাহর কাছে পৌঁছে তাঁকে বলবে সে যেন তোমার ব্যাপারে (প্রমাণস্বরূপ) একটি পত্র লিখে দেয়; সেখানে লেখা থাকবে যে, তুমি তার নবী, আর এর ওপর থাকবে তার স্বাক্ষর। এরপর চারজন ফেরেশতা সেই পত্র সঙ্গে করে নিচে নেমে আসবে, আর তারাও সাক্ষ্য দিবে যে তুমি আল্লাহর রাসূল। সত্যি কথা কী জানো, তুমি যদি এতকিছু করেও ফেলো, আমার মনে হয় এরপরও আমি তোমাকে বিশ্বাস করবো না।'
এই ছিল রাসূলের চারপাশের পরিবেশ এবং মানুষগুলোর অবস্থা ও তাদের মানসিকতা। এ ধরনের লোকদের তিনি দাওয়াহ করছিলেন।
টিকাঃ
২৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯৬।