📄 প্রকাশ্য দাওয়াতের পর মক্কার প্রতিক্রিয়া
রাসূলুল্লাহর ﷺ দাওয়াহর জবাবে কুরাইশদের প্রতিক্রিয়া ছিল বহুমাত্রিক। এক এক পর্যায়ে তারা এক এক রকম প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল। সামগ্রিকভাবে তাদের প্রতিক্রিয়াকে নিম্নোক্তভাবে সাজানো যেতে পারে:
১। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ
২। অপমান
৩। চরিত্রহননের চেষ্টা
৪। ইসলামের বার্তাকে বিকৃত করা এবং কুৎসা রটানো
৫। রাসূলুল্লাহর ﷺ সাথে আপোস করা বা সমঝোতার চেষ্টা করা
৬। প্রলোভন
৭। চ্যালেঞ্জ
৮। চাপ প্রয়োগ
৯। হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা
১০। নির্যাতন-নিপীড়ন
১১। গুপ্তহত্যার প্রচেষ্টা
📄 ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা আল-ফুরকানে বলেন,
"তারা যখন আপনাকে দেখে, তখন আপনাকে কেবল বিদ্রূপের পাত্ররূপে গ্রহণ করে, বলে, এ-ই কি সে যাকে আল্লাহ 'রাসূল' করে প্রেরণ করেছেন?" (সূরা ফুরকান, ২৫: ৪১)
তারা বলতো-আল্লাহর কাছে কি রাসূল হিসেবে প্রেরণ করার জন্য এর চেয়ে যোগ্য কেউ ছিল না? তারা আল্লাহর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা, তাঁকে ব্যঙ্গ করা, ছোট করা কোনো কিছুই বাদ দেয়নি। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন কুরাইশের সবচেয়ে অভিজাত পরিবারের সন্তান, সুঠাম দেহ, উন্নত চরিত্রের অধিকারী। তাঁকে দেখলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রতি সম্ভ্রম তৈরি হয়। তারপরও কুরাইশরা তাঁকে নিয়ে মজা উড়াতো, কারণ তিনি ধনী ছিলেন না, ক্ষমতাও ছিল না। মানুষ সাধারণত ধন-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখে বেশি প্রভাবিত হয়-যার ধন-সম্পদ বা ক্ষমতা-প্রতিপত্তি আছে, তার ব্যাপারে সবার বেশি আগ্রহ থাকে। বনী ইসরাঈল তাদের নবীর কাছে গিয়ে বলেছিল, 'আমরা চাই আপনি আমাদের উপর একজন রাজা নিয়োগ করেন, যেন আমরা জিহাদ করতে পারি।' তাদের ওপর রাজা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছিল তালুতকে। কিন্তু তাকে তাদের পছন্দ হলো না। তালুত বিত্তশালী বা 'পয়সাওয়ালা' ছিলেন না। তাই বনী ইসরাঈলও তাকে মেনে নিল না। তাদের মনে হয়েছিল রাজা হওয়ার উপযুক্ত আরো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাদের মাঝেই আছে, যারা তালুতের চাইতে বেশি বিত্তবান। মক্কায় রাসূলুল্লাহর সাথে এই আচরণেরই পুনরাবৃত্তি ঘটে। রাসূলুল্লাহ যে বার তাইফে যান, এক লোক তাঁকে বলেছিল, 'তবে কি আল্লাহ নবী হিসেবে তোমার চাইতে ভালো আর কাউকে খুঁজে পায়নি?' এভাবেই তারা নবীজিকে ﷺ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতো।
📄 অপমান
কুরাইশের লোকেরা আল্লাহর রাসূলকে অপমান করতো, তাঁর ক্ষতি করার চেষ্টা করতো। একদিন কাবার পাশে কুরাইশদের কিছু নেতা বসে ছিল। আবু জাহেল তাদের কাছে এসে বললো, 'আজকাল তোমরা নাকি মুহাম্মাদকে মাটির সাথে মুখ ঘষাঘষি করার সুযোগ দিচ্ছ? আমি যদি তাঁকে এমন করতে দেখি (অর্থাৎ সালাত আদায় করতে দেখি), তাহলে তাঁর গলায় পাড়া দিয়ে মুখটা ধুলোর মধ্যে ঘষে দিব।'
রাসূলুল্লাহ ﷺ ঠিক তখনই সালাত আদায় করতে এলেন। নবীজি সালাত পড়ছেন, আর আবু জাহেল এক পা এক পা করে এগোচ্ছে। মুখে যত বড় হুমকি দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন হবে তো?
আবু জাহেল হেঁটে মুহাম্মাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। মুহাম্মাদ তখন সিজদারত। উপস্থিত সবাই বিস্মিত চোখে দেখলো আবু জাহেল উল্টে পড়ে যাচ্ছে। তাঁর দু-হাত মুখের ওপর এনে অদ্ভুত ভঙ্গিতে নাড়াচ্ছে, যেন সে কোনো ভয়াবহ বিপদে পড়েছে আর হাত নাড়িয়ে কিছু একটা থামানোর চেষ্টা করছে। আবু জাহেল ফিরে আসার পর অন্যরা তাকে ঘিরে ধরলো। জিজ্ঞাসা করতে লাগলো,
- তোমার হঠাৎ কী হলো?
- কী হলো মানে? তোমরা কী বলতে চাও? তোমরা কি দেখোনি কী হয়েছে?
- না আমরা কিছু দেখিনি। ওখানে তো কিছুই ছিল না। আমরা শুধু দেখলাম যে তুমি উল্টে পড়ে গেলে আর হাত নাড়তে লাগলে।
- আমার সামনে একটা গর্ত ছিল, আর ছিল আগুন, বাতাস এবং আতঙ্ক। আবু জাহেল জবাব দিল।
আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেন, 'সেগুলো ছিল ফেরেশতা। সে যদি আমার দিকে আর একটুও এগিয়ে আসতো, তাহলে তারা তাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলতো।'¹⁹
অন্য আরেকদিনের ঘটনা, উকবা ইবন আবু মুআইত একদিন কাবার পাশে রাসূলুল্লাহকে ﷺ দেখতে পেল। নবীজির ﷺ কাপড়ে হেঁচকা টান মেরে সেটা তাঁর গলায় পেঁচানো শুরু করলো, যেন তাঁকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলা যায়। আবু বকর ছুটে আসলেন। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন উকবাকে। উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, 'তোমরা কি একটা মানুষকে শুধু এই জন্য মেরে ফেলবে কারণ সে বলে-আমার রব হলেন আল্লাহ?'
পৃথিবীতে অনেকেই আছে যারা অপমানিত বা অপদস্থ হলেও কিছু মনে করে না, তাদের আত্মসম্মানবোধ নেই, বোধবুদ্ধিও কম। কিন্তু আল্লাহর নবীরা খুব স্পর্শকাতর ছিলেন। তারা সম্মানী, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন মানুষ। আবু জাহেল বা উকবা ইবন আবু মুআইতের আচরণগুলো নবীজিকে ﷺ খুব কষ্ট দিত, তবু তিনি উপেক্ষা করে যেতেন। তাদের বাজে কথার উত্তর দিতেন না, হাতাহাতিতেও যেতেন না। শুধু তাঁর দাওয়াতের মিশন অব্যাহত রাখার দিকে নিবদ্ধ হয়ে থাকতেন।
এরকম আরেকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে সহীহ বুখারিতে, রাসূলুল্লাহ ﷺ কাবার পাশে সালাত আদায় করছিলেন, পাশেই কুরাইশদের কয়েকজন নেতা বসা। এমন সময় তাদের কাছে আসলো আবু জাহেল। বললো, 'অমুক তো একটা উট জবাই করেছে, ওটার নাড়িভুঁড়িগুলো এনে মুহাম্মাদের গায়ে ঢালতে পারবে কে?' তাদের মধ্যকার সবচেয়ে জঘন্য লোকটাই সাড়া দিল, এই জঘন্য লোকটি হলো উকবা ইবন আবি মুআইত। সে উঠে গিয়ে উটের নাড়িভুঁড়ি যোগাড় করে আনলো। এরপর ঘাপটি মেরে বসে থাকলো কখন রাসূলুল্লাহ সিজদায় যান সেই আশায়। আল্লাহর রাসূল সিজদায় যাওয়া মাত্র নাড়িভুঁড়ির দলা চাপিয়ে দিল তাঁর পিঠের ওপর।
রাসূলুল্লাহ স্থির হয়ে সিজদাতেই পড়ে থাকলেন, যেন তাঁর সাথে কিছুই হয়নি। মেয়ে ফাতিমা দূর থেকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে বাবার কাছে ছুটে আসলেন। বাবার কাঁধে চেপে থাকা ময়লা-আবর্জনাগুলোকে দু হাতে সরিয়ে দিলেন। রাসূলুল্লাহর সালাহ শেষ হলো। তিনি কুরাইশদের কিছুই বললেন না। শুধু জোরে জোরে একটি দুআ করলেন-
"হে আল্লাহ, শাস্তি দাও আবু জাহেল, উতবা ইবন রাবিআ, শায়বা ইবন রাবিআ, আল-ওয়ালিদ ইবন উতবা, উমাইয়া ইবন খালাফ, আর উকবা ইবন আবি মুআইত কে।"²⁰
এভাবে একে একে সাত জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নাম ধরে দুআ করলেন রাসূলুল্লাহ, যদিও হাদিসের বর্ণনাকারী সপ্তম জনের নাম মনে করতে না পারায় এখানে শুধু ছয়টি নাম বলা হলো। আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ বলেন, 'আমি নিজের চোখে দেখেছি, এই সাত জনের প্রত্যেককে বদরের যুদ্ধে হত্যা করা হয়েছে।'
আল্লাহ নবীজির দুআ কবুল করেছিলেন।
টিকাঃ
১৯. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৪।
২০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৬।
📄 চরিত্রহননের চেষ্টা
কুরাইশরা আল্লাহর রাসূলকে বিভিন্ন আজেবাজে নামে ডাকতো।
"তারা বলে, ওহে, যার প্রতি কোরআন নাযিল হয়েছে, তুমি তো আলবৎ একজন উন্মাদ।” (সূরা হিজর, ১৫: ৬)
উন্মাদ বা পাগল ডাকার পাশাপাশি জাদুকর, মিথ্যুক এসব বলেও সম্বোধন করতো। কুৎসা রটানোর জন্য যা মুখে আসতো, বলতো। কিছুই বাকি রাখেনি। তারা চাচ্ছিলো রাসূলুল্লাহর নামে কুৎসা রটিয়ে, তাঁর ভাবমূর্তিকে নষ্ট করে দিতে। লোকে যেন তাঁর কথায় পাত্তা না দেয়। তাহলেই ইসলামের প্রচার-প্রসার থেমে যাবে। এভাবে চরিত্রহননের মাধ্যমে তাঁর নিয়ে আসা ইসলামের বার্তাকে ধ্বংস করে দিতে চাইছিল কুরাইশরা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
"আমি অবশ্যই জানি, তারা যা বলে তা আপনাকে কষ্ট দেয়। কিন্তু তারা তো আপনাকে অস্বীকার করে না, বরং জালিমরা আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করে।” (সূরা আন'আম, ৬: ৩৩)
তারা বস্তুত ব্যক্তি মুহাম্মাদকে প্রত্যাখ্যান করে নি- মনের গভীরে তারা বিশ্বাস করতো যে মুহাম্মাদ সত্যি কথাই বলছেন কিন্তু তারপরও তারা তাঁর বিরোধিতা করেছে। কারণ তাদের সমস্যা ছিল ইসলাম। নিজেদের ধর্ম বাদ দিয়ে ইসলামকে তারা কোনো ক্রমেই মেনে নিতে চায়নি। ওয়ারাকা ইবন নওফালের সতর্কবাণীই যেন সত্যি হয়ে উঠছিল। নবুওয়াতের একেবারে প্রথম দিকে, তিনি রাসূলুল্লাহকে বলেছিলেন, 'তোমাকে তোমার দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে।' সেদিন এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ চমকে উঠেছিলেন, তিনি জানতেন মক্কার লোকেরা তাঁকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। কিন্তু ওয়ারাকাহ অমোঘ বাণীর মত বলেন, 'যে ব্যক্তিই দ্বীনের এই বার্তা নিয়ে এসেছে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়েছে।'
মক্কার বাজারগুলো তখন কেবলমাত্র ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা কেনাকাটার জায়গা নয়, বরং এগুলো তাদের জন্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও বটে। সেখানে কাব্যচর্চা চলতো, চলতো বক্তৃতার চর্চা। সেরা কবিতাকে সসম্মানে ঝুলানো হতো আল-কাবার দেয়ালে। এগুলোকে বলা হতো আল-মুয়াল্লাকাত, বা ঝুলানো কবিতা।
আল্লাহর রাসূল এই বাজারগুলোতে এসেই দাওয়াহ দিতেন, সাধারণ জনতাকে বোঝাতেন ইসলামের কথা। ইমাম আহমেদ বর্ণনা করেছেন যে রাবিআ ইবন হাদ্দাদ বলেন,
"আমি আল্লাহর রাসূলকে জুলমাজায বাজারে দেখেছি। তিনি লোকদের ডেকে বলছিলেন, তোমরা বলো, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই, তাহলেই তোমরা সফলকাম হবে। রাসূলুল্লাহর সাথে নতুন নতুন লোকের দেখা হতো আর তিনি একই কথার পুনরাবৃত্তি করতেন।
হঠাৎ এক লোক তাঁর পিছু নিল। রাসূলুল্লাহ যার সাথেই কথা বললেন, সেই লোক পেছন পেছন গিয়ে তাকে বলে আসতো, এই লোককে (অর্থাৎ মুহাম্মাদকে) বিশ্বাস কোরো না, সে একটা মিথ্যুক।
আমি জিজ্ঞেস করলাম এই লোকটি কে, তারা আমাকে বললো, সে তাঁর চাচা আবু লাহাব।"²¹
রাবিআ ইবন হাদ্দাদ মক্কার অধিবাসী ছিলেন না। তাই তিনি আবু লাহাবকে চিনতেন না। এই ঘটনা বলে দেয় মুহাম্মাদের জন্য দাওয়াতের কাজ চালিয়ে কী ভয়াবহ দুঃসাধ্য ছিল-তিনি যা কিছুই করতেন, আবু লাহাব সেটা ভেস্তে দিত। সাধারণত কাজের ফল মানুষের মনে লেগে থাকার উৎসাহ জাগায়। আর্থিক প্রতিদান, সমাজের কাছে স্বীকৃতি, নেতাকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া সহায়তা ইত্যাদি-অন্তত কিছু একটা বিনিময়ের আশা নিয়েই মানুষ খাটতে থাকে। আশানুরূপ বিনিময় না পেলে মানুষের কাজের ইচ্ছা মরে যায়, প্রেরণা থাকে না, একসময় সে ক্ষান্ত দেয়। প্রতিদানের আশা ব্যতিক্রম। তারা নিরবিচ্ছিন্নভাবে লাগাতার কাজ করে গেছেন, যদিও তারা বিনিময়ে কিছুই পাননি। না করেই কোনো কাজ করে যাওয়া খুব কঠিন। কিন্ত রাসূলুল্লাহ আর নবী-রাসূলরা উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নূহের কথা। তিনি দিনরাত তাঁর জাতির কাছে দাওয়াহ দিয়েছেন-গোপনে এবং প্রকাশ্যে, কিন্তু বলার মতো কোনো সাড়া তাদের মাঝে পাননি। চোখের সামনে বিরোধিতাকারী এক জাতিকে নিয়েও তিনি দাওয়াহ করে গেছেন সুদীর্ঘ নয়শ পঞ্চাশ বছর।
এমন আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন বায়হাকী। হাজ্জের মৌসুম সবে শুরু, আল-ওয়ালিদ ইবন মুগীরা সে সময় কুরাইশদের একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বি। সে কুরাইশ নেতাদের নিয়ে মিটিং ডাকলো। বললো, হাজ্জের মৌসুম আসছে, আরবের প্রতিনিধিরা কিছুদিন পরেই এখানে জমায়েত হবে। আসো সবাই মিলে (মুহাম্মাদের বিষয়ে) একটি সিদ্ধান্তে আসি। এই বিষয়টা নিয়ে আমাদের মধ্যে যেন কোনো মতভেদ না থাকে। তার বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল যে, মুহাম্মাদের ব্যাপারে একটা হেনস্থা করা। হাজ্জের সময় মক্কায় অনেক লোকের সমাগম হবে, আর মুহাম্মাদও এই সুযোগ হাতছাড়া করবে না, তাদের কাছে ইসলামের বার্তা নিয়ে যাবে, তাই মুহাম্মাদের ব্যাপারে তারা সবাইকে কী বলবে সে বিষয়ে সর্বসম্মত বক্তব্যে পৌঁছানো জরুরি ছিল। একেকজন একেক রকম কথা বললে কোন লাভ হবে না। কেউ বলবে সে মিথ্যুক, কেউ বলবে গণক, কেউ বলবে জাদুকর-এভাবে না করে বরং সবাই মিলে একই অপবাদ দিলে লোকে বেশি বিশ্বাস করবে।
কুরাইশরা ওয়ালিদ ইবন মুগীরাকে বললো, "আপনিই বলেন কী করা যায়। আপনি যেটা বলবেন, আমরা সেটাই সবাইকে বলবো।"
- আমি তোমাদের মুখে শুনতে চাই, ওয়ালিদ জবাব দিল।
- আমরা বলবো যে, সে একজন জ্যোতিষী।
- না, সে জ্যোতিষী নয়। আমি জ্যোতিষী দেখেছি, তাঁর মধ্যে জ্যোতিষীদের বৈশিষ্ট্য নেই, সে তাদের মতো অন্তঃসারশূন্য কথা বলে না।
- তাহলে আমরা বলবো যে, সে পাগল, বদ্ধ উন্মাদ।
- আমি পাগলও দেখেছি এবং তাদের প্রকৃতিও দেখেছি, সে তাদের মতো অপ্রকৃতস্থ আচরণ করে না, অসংলগ্ন কথাও বলে বেড়ায় না। সে উন্মাদ নয়, উন্মাদ কাকে বলে আমরা জানি।
- তাহলে আমরা বলবো যে, সে একজন কবি।
- না, না, সে কোনো কবি নয়। আমরা সব রকম ছন্দের কবিতাই চিনি, সে যা বলে তা কোনো কবিতা না।
- তাহলে আমরা বলি যে, সে একজন জাদুকর।
এই প্রস্তাবেও ওয়ালিদ রাজি হলো না, বললো-সে কোনো জাদুকরও নয়, আমরা জাদুকর দেখেছি আর তাদের জাদু-কৌশল দেখেছি। সে ঝাঁড়ফুক করে না, জাদুটোনাও করে না।
কুরাইশের নেতারা একে একে সম্ভাব্য সকল অপবাদ পেশ করলো। কিন্তু ওয়ালিদ ইবন মুগীরা বললো, না, এগুলো বলে কোনো লাভ হবে না।
- তাহলে, আপনি বলে দিন আমরা তাঁর ব্যাপারে কী বলবো।
ওয়ালিদ অনেকক্ষণ চিন্তা করে বললো,
'আল্লাহর কসম করে বলছি, তাঁর কথা বড়ো মিষ্টি, কী যেন গভীর তাৎপর্য আছে তাঁর কথায়। তোমরা তাঁকে নিয়ে যেটাই বলো না কেউ তোমাদেরকে বিশ্বাস করবে না। তবে তাঁর সম্পর্কে এ কথা বলতে পারো, তিনি একজন জাদুকর। তিনি যেসব কথা পেশ করেছেন তা স্রেফ জাদু। তাঁর কথা শুনলে পিতা-পুত্র, ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রী এবং গোত্র ও তার সদস্যের মাঝে বিরোধ লেগে যায়।²²
কুরআনে আল্লাহ এই ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন,
"সে (সত্য গ্রহণের ব্যাপারে কিছুটা) চিন্তাও করেছিল, তারপর আবার নিজের গোঁড়ামিতে ডুবে থাকার সিদ্ধান্ত নিল। তার উপর অভিশাপ, কেমন করে সে (সত্য জানার পরেও) বিরোধিতার সিদ্ধান্ত নিল! তার উপর আবারও অভিশাপ, সে কীভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিল! সে একবার (উপস্থিত লোকদের দিকে) চেয়ে দেখলো, (অহংকার ও দম্ভভরে) সে ভ্রু কুঁচকালো এবং মুখটা বিকৃত করে ফেললো। অতঃপর সে পেছনে ফেরলো এবং অহংকার করলো। এরপর বললো, এটা তো লোক পরস্পরায় প্রাপ্ত জাদুবিদ্যার খেল ছাড়া কিছু নয়। এটা তো মানুষের কথা।" (সূরা মুদদাসসির, ৭৪: ১৮-২৫)
টিকাঃ
২১. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮১।
২২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১২২।