📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 ইকরা: জ্ঞানভিত্তিক এক উম্মাহ

📄 ইকরা: জ্ঞানভিত্তিক এক উম্মাহ


মুহাম্মাদের ওপর অবতীর্ণ কুরআনের প্রথম শব্দটি ছিল "ইকরা।”-এর তাৎপর্য হলো, আমরা মুসলিমরা সেই উম্মাহ যে উম্মাহ অধ্যয়ন করে, গবেষণা করে এবং সর্বোপরি দ্বীনের ইলম বা জ্ঞানার্জন করে। এই একটি শব্দ একটি নিরক্ষর জাতির মাঝে আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল, তাদের মধ্যে তৈরি করেছিল বিশ্ববরেণ্য আলেমসমাজ। সে সময় নবীজির অনুসারীরা ছিল নিরক্ষর, কিন্তু এই শব্দগুলো তাদেরকে লিখতে ও পড়তে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিম উম্মাহ বিশ্বের উচ্চ শিক্ষিত ও জ্ঞানী জাতিতে পরিণত হয়েছে। এই উম্মাহর মাঝে যে পরিমাণ আলেম তৈরি হয়েছে, তা অতুলনীয়! মুসলিম উম্মাহর আলেমদের গুণাগুণ লক্ষ করলে দেখা যাবে, তারা অনন্য-তাদের সাথে অন্য কোনো জাতির বিদ্বানদের তুলনাই হয় না।

উদাহরণস্বরূপ, ইমাম বুখারি-আড়াই লক্ষেরও বেশি হাদীস তাঁর ছিল মুখস্থ। কিংবা ইমাম শাফঈ-যিনি বলেছিলেন, 'আমি যখন কোনো বই খুলি তখন আমি তার একটা পাতা ঢেকে রাখি, কারণ আমি একটা পাতার সাথে আরেকটা পাতার তথ্য মিলিয়ে ফেলতে চাই না।' তাদের ছিল অসাধারণ স্মৃতিশক্তি, ফটোগ্রাফিক মেমোরি, ছবির মতো করে সব তথ্য মনে রাখতে পারার ক্ষমতা। অথবা শাইখ আল ওয়াফা ইবন আকীল, যিনি তিনশ গ্রন্থের একটি বিশ্বকোষ লেখেন। অবশ্য দুর্ভাগ্যক্রমে সেটা এখন আর নেই। ওটার মূল পাণ্ডুলিপি বাগদাদ লাইব্রেরি থেকে লুট করে নেওয়া হয়। এটাই ছিল "ইকরা" শব্দের শক্তি, যা পুরো উম্মাহর এতটা পরিবর্তন এনে দেয়।

রাসূলুল্লাহর ﷺ ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ছিল একটু ভিন্ন। তিনি লিখতে বা পড়তে জানতেন না। তাঁর কাছে এই শব্দটির মানে ছিল 'তিলাওয়াত করুন', অর্থাৎ তিলাওয়াত করুন এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার বাণীর পুনরাবৃত্তি করুন।

আল্লাহ আযযা ওয়াজাল তাঁর রাসূলকে নিরক্ষরই রাখতে চেয়েছেন, এটি ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নবীজির জন্য হুকুম। সূরা আল আনকাবুতে আছে,

"এবং আপনি তো এর পূর্বে কোনো কিতাব পাঠ করেননি এবং স্বহস্তে কোনো কিতাব লিখেননি। এরূপ হলে মিথ্যাবাদীরা অবশ্যই আপনার উপর সন্দেহ আরোপ করতো।” (সূরা আনকাবূত, ২৯:৪৮)

আল্লাহ তাআলাই বলছেন যে রাসূলুল্লাহ ﷺ কুরআনের আগে কোনো কিতাব পাঠ করেননি, তাঁর মাঝে লেখার বা পড়ার যোগ্যতা ছিল না। তিনি ছিলেন নিরক্ষর। সাধারণ মুসলিমদের জন্য পড়তে জানাই হচ্ছে জ্ঞানার্জনের চাবিকাঠি। কিন্তু নবীজির জন্য সত্যি বলতে, লিখতে-পড়তে পারাটা জরুরি ছিল না। রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বয়ং জিবরীল থেকে শিক্ষা নিচ্ছিলেন। সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে যে জন জ্ঞানার্জন করছেন, তাঁর জন্য বই থেকে শেখার মতো আসলেই কিছু নেই। আর তাই, তাঁর জন্য ইকরা শব্দটির অর্থ হলো "তিলাওয়াত করুন", কিন্তু উম্মাহর জন্য এর অর্থ হলো, 'পড়ুন।' মুসলিমদেরকে লিখতে ও পড়তে শিখতে হবে।

"নুন। কসম কলমের এবং তারা যা লিপিবদ্ধ করে তার।” (সূরা কালাম, ৬৮: ১)

যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কোনো কিছু নিয়ে শপথ করেন, তার অর্থ হলো সেই বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ কলমের নামে শপথ করেছেন। বদরের যুদ্ধে যুদ্ধবন্দী মুশরিকদের এই মর্মে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, তারা দশজন মুসলিমকে লিখতে ও পড়তে শেখাবে। এসব থেকে বোঝা যায় ইসলাম জ্ঞানার্জনের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছে।

এই উম্মাহ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যে পারদর্শী এক উম্মাহ, যদিও দুর্ভাগ্যবশত আজ এই উম্মাহ তার দায়িত্ব পালনে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। ইলম অর্জনের ব্যাপারে উম্মাহর বর্তমান প্রজন্মের এই অনীহা যেন পরবর্তী প্রজন্মেও প্রসারিত না হয় সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একবার বাচ্চাদের মধ্যে একটা জরিপ চালানো হয়। বিষয়বস্তু ছিল-কারা পড়তে ভালোবাসে আর কারা পড়তে ভালোবাসে না। জরিপের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাচ্চাদের লালন-পালনের ক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়ে তারতম্যের কারণে কিছু বাচ্চা পড়তে ভালোবাসছে, আর অন্যেরা পড়তে অপছন্দ করছে সেগুলো খুঁজে বের করা।

ফলাফলে দেখা গেল যেসব শিশুরা পড়তে পছন্দ করে, তাদের মাঝে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

এক, তাদের বাবা-মা'রাও পড়তে ভালোবাসে। শিশুর বিকাশের প্রথম বছরগুলোই তার অনুকরণ করার সময়। একটা শিশু যখন তার বাবা-মাকে বই পড়তে দেখে, তখন তারা পড়তে না জানলেও আপনা-আপনি বই বা ম্যাগাজিন নিয়ে খেলতে শুরু করে। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তাই বাড়িতে শিশুদের সামনে পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা হলে তাদের জন্য বই পড়ার দৃষ্টান্ত তৈরি করা সম্ভব।

দুই, যদি তারা বই-পুস্তক সমৃদ্ধ কোনো জায়গায় বেড়ে ওঠে, অর্থাৎ যেখানে প্রচুর বই কিংবা লাইব্রেরি আছে। অর্থাৎ তাদের জন্য বই খুব সহজলভ্য, এসব ক্ষেত্রে বড় হলেও তারা পড়তে ভালোবাসে।

তিন, তাদের নিজস্ব লাইব্রেরি থাকলে।

চার, তাদের বাবা-মা যদি তাদেরকে প্রায়ই বইয়ের দোকানে নিয়ে গিয়ে থাকেন।

পাঁচ, তারা এমন ধরনের শিশু যারা টেলিভিশন খুব কম দেখে কিংবা একেবারেই দেখে না।

বাবা-মায়েদের জন্য তথ্যগুলো অতীব জরুরি। লক্ষণীয় হচ্ছে, বাচ্চাদের বই পড়ার অভ্যাস বাড়ানোর অর্থ এই নয় যে, আজেবাজে গল্পের বই পড়বে বা যা-খুশি তা-ই পড়বে। কিছু বই আছে যেগুলো মানসিক বিকাশের সময়ে পড়া হলে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যেমন মদীনার প্রাথমিক যুগে এমন একটি ঘটনা আছে, রাসূল ﷺ দেখলেন উমার ইবন খাত্তাব তাওরাতের পাতা উল্টাচ্ছেন। রাসূল ﷺ রেগে গেলেন, উমারকে এই কাজের জন্য কঠিনভাবে তিরস্কার করলেন। তবে তাওরাত পড়ার ওপর এই নিষেধাজ্ঞা ছিল সাময়িক। মুসলিমরা পরবর্তীতে নিজেদের আদর্শে বলীয়ান হলে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। রাসূল ﷺ বলেন, 'আমি তোমাদেরকে ইতিপূর্বে বনী ইসরাইলের কিতাব পড়তে নিষেধ করেছিলাম, তবে এখন সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছি। তোমরা এসব গল্পে বিশ্বাসও করবে না, অবিশ্বাসও করবে না।' অন্য কথায়, এইসব কিতাবে এমন কিছু কথা আছে, যেগুলোর সত্যতা কুরআন বা হাদীস দিয়ে যাচাই করার কোনো সুযোগ নেই, সেগুলোকে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোনোটাই করা ঠিক হবে না।

যেকোনো পাঠ্যসূচি এমনভাবে সাজানো উচিত যেন তা ছাত্রদের জন্য বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। রাসূল ﷺ জানতেন, প্রাথমিক যুগে মুসলিমদের হাতে তাওরাত চলে গেলে তা তাদের স্বাভাবিক শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সমস্যা সৃষ্টি করবে। ইবন মাসউদ বলেন, 'তুমি যদি মানুষের সাথে এমন কথা বলো যা তাদের বোধশক্তির বাইরে, তাহলে সেটা তাদের জন্য ফিতনা হতে পারে।' কিছু জ্ঞান হচ্ছে কাজের আর কিছু অনর্থক। রাসূল ﷺ প্রায়ই আল্লাহর কাছে দুআ করতেন, 'হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞানের জন্য প্রার্থনা করছি, এবং আমি সেই জ্ঞান থেকে পানাহ চাই যে জান কোনো কাজে আসে না।' সূরা আল বাকারাহতে আছে, দুজন ফেরেশতা, হারুত এবং মারুত দুনিয়ায় পরীক্ষাস্বরুপ অবতীর্ণ হয়েছিলেন মানুষকে জাদুর বিষয়ে শিক্ষা দিতে, যা ছিল ঈমানবিনাশী জ্ঞান।

সংক্ষেপে এই ছিল রাসূলের কাছে নাযিলকৃত প্রথম আয়াতের মর্মার্থ।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 ওহী: আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত ঐশী বাণীর বিভিন্ন রূপ

📄 ওহী: আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত ঐশী বাণীর বিভিন্ন রূপ


ইবনুল কায়্যিম ওয়াহীর বিভিন্ন প্রকার নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি অসাধারণ একজন আলিম, ইবনে তাইমিয়ার ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত। তিনি বলেন, প্রথম প্রকারের ওয়াহী হলো সত্য স্বপ্ন। এই উপায়েই রাসূল ﷺ প্রথম ওয়াহী লাভ করা শুরু করেন। জিবরীল কর্তৃক ওয়াহী নাযিলের পূর্বে টানা ছয় মাস ধরে রাসূল ﷺ নিয়মিত স্বপ্ন দেখতেন। রাতের বেলায় যে স্বপ্ন দেখতেন, পরদিন দিনের বেলায় সে স্বপ্ন সত্যি হতো, এইভাবে চলেছিল প্রায় ছয় মাস!

ওয়াহীর প্রথম প্রকার: স্বপ্ন
রাসূল ﷺ বলেছেন, যেসব স্বপ্ন সত্য, সেগুলো নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। রাসূল ﷺ এর নবুওয়াতের জীবন ছিল তেইশ বছর দীর্ঘ, আর তিনি সত্য স্বপ্ন দেখেছেন ছয় মাস ধরে। তেইশ বছর সময়টাকে ছয় মাস দিয়ে ভাগ করলে অনুপাত দাঁড়ায় ১: ৪৬, ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। স্বপ্ন কেবল নবীরা নন, যে কেউই দেখে থাকে। পার্থক্য হলো এই-নবীদের স্বপ্ন এক ধরনের ওয়াহী হিসেবে বিবেচিত, অন্যদেরটা তা নয়। সাধারণ মানুষদের দেখা স্বপ্নের ব্যাপারে রাসূল ﷺ তিনটি প্রকারভেদ বলেছেন,
১) সত্য স্বপ্ন: এ ধরনের স্বপ্ন সত্যি হয় অথবা যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয় সে ব্যাখ্যা অনুসারে এই স্বপ্ন সত্যি হয়।
২) শয়তানের পক্ষ থেকে স্বপ্ন: রাসূল ﷺ বলেন, 'এই স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে এবং সে তোমাদের ক্ষতি করতে চায়।' রাসূল ﷺ বলেন, 'যদি এমন স্বপ্ন দেখ, তাহলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর এবং এই স্বপ্নের কথা কাউকে বলবে না।' কারণ, শয়তান চায় আমরা খারাপ স্বপ্ন দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ি আর মানুষকে বলে বেড়াই। রাসূল ﷺ বলেছেন এসব স্বপ্নের কথা কাউকে না বলতে, আর সেগুলো ভুলে যেতে।
৩) সাধারণ স্বপ্ন: এমন স্বপ্ন যা নিয়ে মানুষ দিনের বেলা ভাবে এবং রাতের বেলায় তা স্বপ্নে দেখতে পায়, এ স্বপ্নগুলো বস্তুত নিজের ভাবনার প্রতিফলন, যা নফস থেকে আসে।

ওয়াহীর দ্বিতীয় প্রকার
এই প্রকার হলো ফেরেশতাদের মাধ্যমে রাসূলের ওপর ওয়াহী নাযিল হয় কিন্তু জিবরীল সরাসরি মুহাম্মাদের সামনে হাজির হন না। যেমন রাসূল ﷺ বলেন, সেই মহান আত্মা (জিবরীল) আমাকে জানিয়েছেন, 'নির্দিষ্ট করে রাখা সময়ের আগে কারো মৃত্যু ঘটবে না। তাই আল্লাহকে ভয় করো এবং বিনীতভাবে তাঁর কাছে চাও। অধৈর্য হয়ে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে চলে যেও না। আল্লাহর আনুগত্য করা ছাড়া আল্লাহর নিআমত অর্জন করা সম্ভব নয়।'

ওয়াহীর তৃতীয় প্রকার
এই প্রকারের ওয়াহী নাযিলের সময় ফেরেশতা মুহাম্মাদের সামনে মানুষের আকৃতি নিয়ে হাজির হন। এর উদাহরণ হলো হাদীসে জিবরীল, জিবরীল মানুষের বেশে এসেছিলেন আর তাঁকে মুহাম্মাদ এবং অন্যরা দেখেছিলেন।

ওয়াহীর চতুর্থ প্রকার
ফেরেশতা ঘন্টার মতো শব্দ করে আসতেন। এটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন আবির্ভাব। জিবরীল তখন রাসূলকে শক্ত করে চেপে ধরতেন, শীতের দিনেও নবীজির ঘাম ছুটে যেতো। জিবরীল তাঁর ওপরে উঠে বসতেন, তাই রাসূল অস্বাভাবিক ভার অনুভব করতেন। আর সেই সাথে শুনতেন ঘন্টা বাজার আওয়াজ পেতেন, সম্ভবত সেটি ছিল জিবরীলের পাখার কম্পনের শব্দ। একটি হাদীসে বর্ণিত আছে, 'যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর আদেশ প্রেরণ করেন, তখন ফেরেশতারা এতটাই বিনয়াবত হয়ে পড়ে যে তাদের পাখাগুলো কাঁপতে থাকে এবং সেই পাখা কাঁপার শব্দ শুনতে পাথরের ওপর চেইন টেনে নিয়ে যাওয়ার আওয়াজের মতো শোনায়।'

জিবরীল যখন এই রূপে রাসূলুল্লাহর ﷺ নিকটে আসতেন, তখন রাসূলুল্লাহর ﷺ ওজন বেড়ে যেতো। দেখা যেতো, তিনি উটের উপর বসে আছেন, আর জিবরীল এসেছেন, তখন প্রবল চাপের ফলে বাধ্য হয়ে উট পর্যন্ত হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ত। যাইদ ইবন হারিসা বলেন, "একদিন নবীজি বসে ছিলেন। আমার পায়ের উপর তাঁর হাঁটু রাখা ছিল। এমতাবস্থায় ওয়াহী নাযিল হওয়া শুরু হয়। আমি তখন নবীজির হাঁটুর তীব্র চাপ অনুভব করি। আমার উরু যেন প্রচণ্ড চাপে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল।"

ওয়াহীর পঞ্চম প্রকার
এই প্রকারের ওয়াহী নাযিলের সময় ফেরেশতা তার স্বরূপে আগমন করেন। এরকম দু'বার হয়েছিল। সূরা নাজমে এর উল্লেখ আছে।

“নিশ্চয় সে তাঁকে আরেকবার দেখেছিল, দূরদিগন্তের সিদরাহ-গাছের কাছে..." (সূরা নাজম, ৫৩: ১৩-১৪)

জিবরীলের পাখা এত বড় ছিল যে সেগুলো দিগন্ত ছেয়ে ফেলত, রাসূল ﷺ বলেছেন, যখন জিবরীল তার স্বরূপে আসতেন, 'তিনি যেদিকেই তাকাতেন, সেদিকেই জিবরীলের পাখা দেখতে পেতেন।'

ওয়াহীর ষষ্ঠ প্রকার
এই প্রকারের ওয়াহীতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিজে সরাসরি রাসূলুল্লাহর ﷺ সাথে কথা বলেছেন, কোনো মাধ্যম ছাড়াই। এটা হয়েছিল আল-মিরাজের সময়। মুসার সাথেও আল্লাহ এভাবে কথা বলেছিলেন। এই ছয় ভাবেই নবীজির কাছে ওয়াহী নাযিল হয়েছে। এক এক সময় এক এক ভাবে। নবীজির কাছে জিবরীল তাঁর নিজ রূপে কেবল দুবারই এসেছিলেন।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 অগ্রগামী মুসলিমগণ

📄 অগ্রগামী মুসলিমগণ


খাদিজা ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম। তিনি তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত নবীজিকে সাহায্য-সহযোগিতা করে যান। ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম দাস হলেন যাইদ ইবন হারিসা, ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম শিশু হলেন আলী ইবন আবি তালিব এবং ইসলাম গ্রহণকারী সর্বপ্রথম পুরুষ হলেন আবু বকর সিদ্দীক্ব। তবে ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম পুরুষ কে তা নিয়ে আলিমদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। কেউ বলেন আবু বকর, কেউ বলেন আলী ইবন আবি তালিব। ইবন হাজার আল-আসকালানী এ মতবিরোধটি সমাধানের চেষ্টা করেন, তাঁর মতে, ইসলাম গ্রহণকারী সর্বপ্রথম পুরুষ আবু বকর, কেননা, আলী ইবন আবি তালিব বড়ই হয়েছেন নবুওয়াতের ঘরে, তিনি মক্কার কুরাইশদের ধর্ম গ্রহণই করেননি। ছোটবেলা থেকেই তিনি মুসলিম হিসেবে বড় হয়েছেন, তাই তাঁর অমুসলিম অবস্থা থেকে মুসলিম হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

আবু বকর দাসদেরকে মুক্ত করা ছাড়াও নানানভাবে ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন, তিনি ছিলেন অনেক ধনী এবং কুরাইশদের মধ্যে একজন সম্মানিত ব্যক্তি। আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ দান করার জন্য তিনি অনেক নন্দিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সমাজের প্রভাবশালী লোকেদের একজন। সমস্ত সম্পদ ইসলামের উপকারে ব্যয় করে দিয়েছিলেন। তাঁর সব সম্পদ, জ্ঞান ঢেলে দিয়েছিলেন নবী করীমের সেবায়। তিনি ছিলেন ইসলামের একজন মিশনারী। আর এ কারণেই তাঁকে বলা হয় 'সিদ্দীক', তিনি ছিলেন মু'মিন পুরুষদের মধ্যে প্রথম জন। সিদ্দীক মানে যে বিশ্বাস করেছে। লোকেরা রাসূলুল্লাহকে অবিশ্বাস করেছিল, আর আবু বকর তাঁকে বিশ্বাস করেছেন। বলা হয়ে থাকে, ইসলাম গ্রহণের সময়ে প্রত্যেকেই অন্তত মুহূর্তের জন্যে হলেও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেছে, কিন্তু আবু বকরের ক্ষেত্রে এমনটি হয়নি। যখনই তাঁর সামনে ইসলামকে উপস্থাপন করা হয়, তিনি সেটা সাথে সাথে গ্রহণ করেন, তাঁকে ইসলাম গ্রহণের পূর্বে দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে হয়নি। তিনি তাঁর সমস্ত সম্পদ নিয়ে আল্লাহর রাসূলের সামনে হাজির হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সেই স্বাধীন পুরুষ যিনি সর্বাগ্রে মুহাম্মাদকে আল্লাহর রাসূল হিসেবে দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেন, তিনি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি মিরাজের ঘটনায় সর্বপ্রথম বিশ্বাস স্থাপন করেন, তিনি হলেন সেই মুসলিম যিনি রাসূলের হিজরতের বিপদসংকুল সময়ে তাঁকে সঙ্গ দিয়েছিলেন।

রাসূলুল্লাহর সাহাবীদের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশি আপন ছিলেন তা নিয়ে একটি হাদীস আছে: আবু দারদা বর্ণনা করেন, একবার আবু বকর এবং উমারের মধ্যে ঝগড়া হয়। এই দুইজন ছিলেন রাসূলুল্লাহর সবচে কাছের মানুষ, তাঁর উপদেষ্টা। আলী ইবন আবি তালিব বলেন, 'আমি দেখেছি, রাসূল ﷺ যখনই কোথাও যেতেন, আবু বকর ও উমারকে সাথে করে যেতেন, কোথাও থেকে আসলে তাদের সাথে করে আসতেন, যখন তিনি বসতেন তাঁর এক পাশে থাকতো আবু বকর আর আরেক পাশে উমার।'

কিন্তু তারপরেও রাসূলুল্লাহর বিশেষ টান ছিল তাদের প্রতি যারা ইসলামের একেবারে প্রথম যুগে মুসলিম হয়েছিলেন। কাজেই যখন আবু বকরের সাথে উমারের ঝগড়া হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'আল্লাহ তোমাদের নিকট আমাকে পাঠিয়েছেন আর তোমরা আমাকে বলেছিলে-আপনি মিথ্যা বলছেন, কিন্তু তোমাদের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল আবু বকর, সে আমাকে বলেছিল-আপনি সত্য বলছেন, সে নিজেকে ও তার ভাগ্যকে আমার হাতে সঁপে দিয়েছিল, এরপরেও কি তোমরা আমার এই বন্ধুকে শান্তিতে থাকতে দেবে না? দেবে না শান্তিতে থাকতে?'

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 প্রকাশ্য দাওয়াতের শুরু

📄 প্রকাশ্য দাওয়াতের শুরু


ইসলামের প্রারম্ভিক দাওয়াহ ছিল গোপন পর্যায়ে, কুরআনে আল্লাহ এই আদেশ করেছেন।

"আপনি নিকটতম আত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিন।” (সূরা আশ-শুআরা, ২৬: ২১৪)

এই আয়াতটি যখন নাযিল হলো তখন মুহামাদ বেরিয়ে পড়লেন এবং আস-সাফা পাহাড়ে উঠে বলে উঠলেন, "ইয়া সাবাহা!” ইয়া সাবাহা বলাটা সে যুগে ঘন্টা বা সাইরেন বাজানোর মতো একটি বিষয় ছিল। খুব গুরুতর কোনো ঘটনা হলে এই কথাটি বলা হয়। কাজেই যারাই তাঁর ডাক শুনতে পেল, তারা তার দিকে চলে গেল এবং যারা যেতে পারছিল না তারা অন্য কাউকে পাঠিয়ে দিল তিনি কী বলেন তা শুনে আসার জন্য।

যখন সবাই একত্রিত হলো, রাসূল তাদেকে জিজ্ঞেস করলেন,
-আমি যদি তোমাদেরকে বলি, এই পাহাড়ের পেছনে এক সৈন্যবাহিনী অপেক্ষা করছে তোমাদের অতর্কিতে হামলা করার জন্য, তোমরা কি তা বিশ্বাস করবে?
-আমরা তো কখনো আপনাকে মিথ্যা বলতে শুনিনি।
-আমি এসেছি তোমাদেরকে এক কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করতে, যদি তোমরা বিশ্বাস না করো, তাহলে তা তোমাদের উপর আপতিত হবে।¹⁸

রাসূলুল্লাহর ﷺ এই কথাগুলোই ছিল কুরাইশদের প্রতি ইসলামের প্রথম দাওয়াহ। লক্ষণীয়, তাঁর কথাগুলো খুব সোজাসাপ্টা এবং পরিমিত। এভাবে কথা বলার কারণ হলো আল্লাহ নবীদেরকে আদেশ করেছেন স্পষ্ট বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। তাদের দায়িত্ব হলো 'বালাঘুল মুবীন', এর অর্থ হলো, ইসলামকে মানুষের সামনে অস্পষ্টভাবে, ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে, এদিক-ওদিক করে, রাখ-ঢাক রেখে, কিছুটা গোপন করে, কিছুটা প্রকাশ করে, মধু-মাখাভাবে উপস্থাপন করা যাবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আজকে আমরা যখন মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিচ্ছি, আমাদের দাওয়াতে শ্রোতাদের মনে বিভ্রান্তির জন্ম হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর দাওয়াতে সন্দেহের কোনো অবকাশ রাখেননি। তাঁর কথা শুনে শ্রোতারা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল যে, যদি তারা তাঁকে বিশ্বাস করে তাহলে তারা জান্নাতে যাবে আর অবিশ্বাস করলে জাহান্নাম।

যাই হোক, রাসূলুল্লাহ ﷺ সবাইকে ডাকলেন এবং তারা ভাবলো নিশ্চয়ই খুব জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে ডাকা হচ্ছে। বিষয়টি আসলেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল কিন্তু তা অনুধাবনের ক্ষমতা সকলের ছিল না। তাঁর আপন চাচা আবু লাহাব বলে উঠলো, 'তোমার সারা দিন মাটি হোক, এই কথা বলতে তুমি আমাদের ডেকেছ?' আবু লাহাব খুবই বিরক্ত ও রাগান্বিত হলো। কারণ তাকে তার কাজ ছেড়ে এসে এসব কথা শুনতে হয়েছিল। ব্যবসার ব্যস্ত সময়ে কেনাবেচা ছেড়ে রাসূলের কথা শোনা ছিল তার জন্য নিতান্তই গুরুত্বহীন একটি ব্যাপার। আবু লাহাবদের মতো লোকদের কাছে কাজ ফেলে জীবন, মৃত্যু, ধর্ম এবং আধ্যাত্মিকতা নিয়ে কথা শোনা সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়। সে ছিল প্রচণ্ড দুনিয়াবী, ওই সময়টা তার কাছে নিছকই টাকা কামানোর সময়। এমন ভাবনা তার একার নয়, মুসলিমদের মধ্যেও তার মতো অনেকেই আছে। তারা ধর্মীয় বিষয়ে কথা বলাকে স্রেফ সময় নষ্ট জ্ঞান করে, তারা শুধু সেই কাজে ও কথায় মন দেয় যা তাদেরকে দুনিয়াতে উপকার করবে। কিন্তু দুনিয়ার পরের জীবনে কী তাদের উপকারে আসবে সেটা জানার সময় তাদের হয়ে ওঠে না।

সূরা লাহাবের প্রথম দুই আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,

"ধ্বংস হোক আবু লাহাবের উভয় হাত, আর সে নিজেও ধ্বংস হোক! তার ধন-সম্পদ ও যা সে অর্জন করেছে তা তার কোনো কাজে আসবে না।” (সূরা লাহাব, ১১১: ১-২)

আল্লাহ তাআলা বলছেন তার এই সম্পদ, অর্থ কোনো কাজেই আসবে না। যারা দুনিয়ার পেছনে ছুটে বেড়ায়, দুনিয়া তাদের কোনো কাজে আসবে না, যদি না তারা ইসলামের আলোকে জীবনযাপন করে। এই সূরাটি কুরআনের অলৌকিকত্বের একটি প্রমাণও বটে। কেননা, এই আয়াতে বলছে, আবু লাহাব ও তার স্ত্রী জাহান্নামে যাবে। এই আয়াত যখন নাযিল হয় তখন তারা বেঁচে ছিল, যদি তারা কুরআনকে ভুল প্রমাণ করতে চাইতো, তারা মুসলিম হয়ে গেলেই তা করে ফেলতে পারতো, কেননা কুরআন বলেছে তারা জাহান্নামী হবে আর তারা মুসলিম হয়ে গেলে এই কথা মিথ্যা হয়ে যায়। কিন্তু না, তারা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাফের ছিল আর সে অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে।

টিকাঃ
১৮. 'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00