📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 শিক্ষা

📄 শিক্ষা


সালমান ফারিসী তাঁর জীবনের শুরুতে দ্বীনের শিক্ষা নিয়েছিলেন সিরিয়ার পুরোহিতের কাছে। সালমান তার সম্পর্কে বলেন, 'আমি তার সাথে ছিলাম, কিন্তু সে ছিল অসৎ এক লোক। মানুষের থেকে দান-খয়রাত চাইতো, এরপর সেগুলো গরিবদের মধ্যে না বিলিয়ে নিজের জন্য জমা করে রাখতো। এভাবে সাত বাক্স ভরা সোনা আর রূপা তার কাছে জড়ো হলো! তার এইসব কাজ দেখার পর আমি তাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতাম।'- একজন মানুষ সত্য জানার জন্য পথে পথে ঘুরছে। অথচ শেষমেষ সে এমন এক লোকের সন্ধান পায়, যে বাইরে "আলেম" সাজলেও ভেতরে ভেতরে অসৎ। সত্য জানার প্রতি বিতৃষ্ণা এনে দেওয়ার জন্য যা কিছু দরকার, তার সবকিছুই সেই পুরোহিতের স্বভাবে উপস্থিত ছিল। কিন্তু সালমান ফারিসী ছিলেন নিজের লক্ষ্যে অবিচল, দৃঢ়। তাঁর সত্যকে খুঁজে বের করার আগ্রহ এত প্রবল ছিল যে, এসব দেখেও তিনি সত্য খোঁজার ব্যাপারে বিরত হননি।

আজকাল দেখা যায় যে, মুসলিমদের কাজের কারণে লোকেরা ইসলাম থেকে দূরে সরে যায়। লোকে বলে, মুসলিমদের আচরণের জন্যই মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে না। এই কথাটি কিছু অংশে সত্য হলেও পুরোপুরি সঠিক নয়। কেউ যদি সত্যপথ খুঁজে বের করার জন্য সত্যিই আন্তরিক হয়, তবে তার বোঝা প্রয়োজন যে, সমাজের সবাই সত্যের অনুসারী নাও হতে পারে। তাই কোনো ব্যক্তি বা দল ভুল মানেই এটা না যে, সেই ধর্মও ভুল। সালমান ফারিসী একটা অসৎ লোকের দেখা পাওয়ার পরেও সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টধর্মকে বাতিল মনে করেননি। বরং তিনি সত্যকে জানার জন্য আরো উঠেপড়ে লেগেছেন। সেই লোকের সাথেই থেকে গিয়ে, আরও ভালো কিছুর সন্ধান করেছেন। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল তাঁকে তাঁর এই ধৈর্যের পুরস্কার দিয়েছেন। সালমান পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্মের শ্রেষ্ঠ আলেমদের থেকে ইলম অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন। লোকেরা সেই দুর্বৃত্ত পুরোহিতের বদলে এমন একজনকে সেখানে নিয়োগ দেয়, যাকে দেখে সালমান বলেছিলেন, মুসলিমদের সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার আগ পর্যন্ত তার দেখা সবচেয়ে উত্তম লোক ছিলেন তিনি।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা মুহাম্মদে বলেছেন,
"আর যারা সৎপথপ্রাপ্ত হয়েছে, আল্লাহ তাদের সৎ পথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেন আর তাদের প্রদান করেন তাকওয়া।" (সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ১৭)

পুরো ঘটনাটি থেকে আরো কিছু শিক্ষা গ্রহণ করা যায়:
প্রথমত, যারা হিদায়াতের খোঁজে থাকে, তাদেরকে হিদায়াত দেওয়া হয়। কিন্তু আল্লাহর হিদায়াত পাওয়ার জন্য নিজেদেরকেও পরিশ্রম করতে হবে। যখন কেউ আল্লাহর জন্য কষ্ট করবে, ত্যাগস্বীকার করবে; তখন তার পুরস্কার হবে অসামান্য। যদি কেউ আল্লাহর দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, আল্লাহ তাঁর দিকে দৌড়ে আসবেন। কিন্তু মানুষকে প্রথম ধাপটি নিতে হবে। সালমান ফারিসী ধীরে ধীরে ঠিকই ইসলামকে খুঁজে পেয়েছিলেন, যদিও তিনি প্রথমে ছিলেন এমন একটি জায়গায় যা ইসলাম থেকে শত শত মাইল দূরে অবস্থিত।

দ্বিতীয়ত, কারো ভুল কাজ যেন আমাদেরকে দমিয়ে না দেয়। ধর্ম তাদের অসৎ কাজের উৎস নয়-সালমান ফারিসী এটা বুঝতে পেরেছিলেন। আর তাই একজন অসৎ লোকের কারণে সেই ধর্মকেই অবিশ্বাস করা শুরু করে দেননি। একটা পুরোহিত খারাপ বলেই তিনি আশা হারিয়ে ফেলেননি। সত্য জানার আগ্রহ যেন মানুষের ভুল কাজ নিয়ে আমাদের বিতৃষ্ণা বা ঘৃণাকেও ছাপিয়ে যায়, এটা খুব দরকার।

তৃতীয়ত, মুসলিমদেরকে নতুন মুসলিমদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখার দায়িত্ব মুসলিম সমাজের। মুহাম্মাদ স্বয়ং সালমানকে সাহায্য করেছেন, সাহাবীদেরকেও সহযোগিতা করতে বলেছেন। নতুন ইসলাম গ্রহণ করার পরে বেশিরভাগ সময়েই আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন হয়। নওমুসলিমদেরকে আর্থিকভাবে সহায়তা করাও এক ধরনের দাওয়াহ। খালি মুখের কথায় দাওয়াহ হয় না। যারা সম্প্রতি ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের দায়িত্ব নেওয়াও এর অন্তর্গত।

সাহাবীদের জীবনের দিকে লক্ষ করলে দেখব, নতুন মুসলিমদের অনেকেরই সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। বিলাল ছিলেন একজন দাস, আবু বকর তাঁকে মুক্ত করেন। প্রথম যুগের অনেক মুসলিমই দাস ছিল। এই রকম অবস্থায় বড় ধরনের সহযোগিতার দরকার পড়ে। এই সহযোগিতাটুকু না দিলে তাদের দ্বীন গ্রহণের প্রাথমিক সময়টা এত কঠিন হয়ে পড়ে, যে অনেকসময় তারা দ্বীন থেকেই সরে যায়। আমেরিকায় একটা পরিসংখ্যানে জানা যায়, বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণের নতুন মুসলিমরা শেষ পর্যন্ত ইসলাম ছেড়ে দেয়। ইসলাম গ্রহণের পর তাদেরকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরিবারের আপন মানুষগুলো পর হয়ে যায়। তাদের সামাজিক অবস্থান বদলে যায়। তাই এরকম পরিস্থিতিতে তাদের অনেক সহানুভূতি ও সহযোগিতার প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'কয়েকটি ব্যাপার চলে আসার আগেই তোমরা ভালো কাজ করে নাও। দারিদ্র্য তোমাকে বিস্মরণ করিয়ে দেওয়ার আগেই সৎ কাজ করো।' যখন লোক খালি পেটে থাকে, তখন আধ্যাত্মিকতা, ইলম অর্জন-এসবের প্রতি সে আকর্ষণ বোধ নাও করতে পারে। তাই মানুষের প্রয়োজনের দিকে নজর রাখাও দাওয়াহ দেওয়ার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00