📄 যায়িদ ইবন নাওফাল ؓ
যায়িদ ছিলেন কুরাইশ বংশের সন্তান। কিন্তু সত্যের সন্ধানে মক্কার বাইরে যাত্রা করেন। ইহুদিদের কাছে যান, তাদের কাছ থেকে ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে জানেন। সব জানার পরে, এই ধর্মের অনুসরণ না করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর তিনি যান খ্রিস্টানদের কাছে। খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে জানার পরেও তিনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তাই খ্রিস্টধর্মও গ্রহণ করেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি জানতে পারলেন নবী ইবরাহীমের দ্বীনের কথা, যে দ্বীনকে বলা হয়েছে 'হানিফিয়া' বা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার ইবাদতের দ্বীন। তিনি ইবরাহীমের দ্বীন অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে, একজন "হানিফি” হিসেবে তিনি শুধুমাত্র এক আল্লাহর ইবাদত করতে লাগলেন।
মক্কার শির্কের গভীর আঁধার-সাগরে যায়িদ ইবন নাওফাল একাই যেন স্রোতের বিপরীতে যাচ্ছিলেন। তিনি ছাড়া এক আল্লাহর ইবাদতের কথা বলার আর কেউ ছিল না। আসমা বিনতে আবু বকর বলেন, 'আমি দেখতাম যায়িদ ইবন নাওফাল কাবায় পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে লোকদেরকে ডাকতেন। তিনি বলতেন, 'হে কুরাইশ গোত্র, তাঁর শপথ যাঁর হাতে যায়িদের জীবন ও মরণ, আমি ছাড়া তোমাদের আর কেউ-ই ইবরাহীমের দ্বীনকে অনুসরণ করছো না।' অথচ কুরাইশের লোকেরা খুব দাবি করতো যে, তারাই ইবরাহীমের দ্বীনের ওপর আছে! যায়িদ আরও বলতেন, 'হে আল্লাহ! আমি যদি একটু জানতে পারতাম কোন পথ তোমার সর্বাপেক্ষা পছন্দনীয়, আমি সেই পথেই তোমার ইবাদত করতাম, কিন্তু আমি তো তা জানি না।'
যায়িদ ইবন নাওফাল সত্য বুঝতে পেরেছিলেন, আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছিলেন। কিন্তু এই সত্যকে কীভাবে জীবনে প্রয়োগ করতে হয়, কীভাবে আল্লাহর ইবাদত করতে হয় – তা তাঁর জানা ছিল না। দ্বীন পালন করার জন্য তাঁর কাছে কোনো শরীয়াহ ছিল না। প্রত্যেক যুগেই যায়িদের মতো কিছু লোক থাকে যারা সত্যকে অনুধাবন করতে পারে। তারা বোঝে যে, সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ কেবলমাত্র একজন। তারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে, আল্লাহর ইবাদত করতে চায়, কিন্তু ইবাদতের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের জ্ঞান থাকে না। এমনকি, অনেক ধর্মান্তরিত মুসলিম ভাইবোনের পূর্ব অভিজ্ঞতা শুনলে জানা যায়, তাদের অনেকেই আগে থেকেই বুঝতে পারতেন যে, আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। তারা নিজে নিজেই বুঝতে পারতেন, কোনটা সঠিক এবং কোনটা ভুল। যায়িদ শুধুমাত্র তাঁর প্রকৃতিগত স্বভাবের মাধ্যমেই অনেক কিছু বুঝতে পেরেছিলেন। ব্যাপারটি বিস্ময়কর! যেমন, তিনি কখনও কন্যাশিশু হত্যায় শরীক হতেন না। এই কাজটা থেকে সবসময় দূরে থাকতেন। এমনকি কোনো বাবা তার মেয়েকে হত্যা করবে শুনলেই তিনি সোজা সেই বাবার কাছে হাজির হতেন। বলতেন, 'একে আমার কাছে দিয়ে দাও, আমি ওর দেখাশোনা করবো। সে বড় হওয়ার পর তুমি চাইলে তাকে ফেরত নিতে পারো আর না হয় আমার কাছেই রেখে দিতে পারো।' এভাবে তিনি বহু মেয়েকে পালক নিয়েছিলেন।
মক্কায় জবাই হওয়া পশুর মাংস খেতেও যায়িদের আপত্তি ছিল। একবার রাসূলুল্লাহর সামনে মাংস রাখা হলে তিনি তা খেতে আপত্তি জানান এবং পাশের জনকে দিয়ে দেন। এরপর সেই মাংস যখন যায়িদকে দেওয়া হলো, তিনি বললেন, 'আমি এই গোশত খাবো না। তোমাদের দেবতাদের জন্য যে পশু জবাই দিয়েছ সেখান থেকে আমি গোশত খাবো না।' যায়িদ কুরাইশদের লোকদের কাছে গিয়ে তাদের দেবতাদের জন্য পশু বলি দেওয়ার নিন্দা করতেন। তিনি বলতেন, 'এইসব ভেড়া আল্লাহর সৃষ্টি, তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, তা থেকে জমিতে ফসল ফলান। তাহলে তোমরা কেন আল্লাহর এত নিআমতকে অস্বীকার করছো? কীভাবে তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য দেবদেবীর নামে জবাই দিচ্ছো?'
নবীজির নবুওয়াত লাভের আগেই যায়িদ ইবন আমর ইবন নাওফাল মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর পুত্র সায়িদ ছিলেন মুসলিম, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবীর একজন। তিনি একদিন রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে নিজের বাবা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন-
- বাবা তো নবুওয়াতের আগেই মারা গেছেন, তাহলে তাঁর দ্বীন কী ছিল?
- কিয়ামতের দিনে তোমার বাবা একাই একটা জাতি হিসেবে উপস্থিত হবে।
অর্থাৎ নবীজি যায়িদ ইবন নাওফালের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। বিচার দিবসে যায়িদ একাই যেন একটি জাতি হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবেন।
হাশরের ময়দানে লোকেরা বিভিন্ন জাতিতে বিভক্ত থাকবে। প্রত্যেক জাতির সাথে থাকবে সেই জাতির জন্য প্রেরিত নবী ও রাসূল। মূসা, ঈসা, নূহ, ইবরাহীম, মুহাম্মাদ, প্রত্যেকে তাদের উম্মাতসহ উপস্থিত হবেন। কিন্তু যেহেতু যায়িদ ইবন নাওফাল কোনো নবীর উম্মাতের অংশ ছিলেন না, তাই সেদিন তিনি একাই যেন একটি জাতি। বিচারের দিনে যায়িদ একাকী হয়েও একটি উম্মাহ হিসেবে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর মর্যাদা পাবেন। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে দাখিল করবেন, কেননা তিনি সত্য খোঁজার চেষ্টা করেছেন, সত্যকে জানার পর এক আল্লাহর ইবাদত করেছেন, তাঁর পক্ষে যতটা করা সম্ভব ছিল ততটাই করেছেন।
📄 ওয়রাকাহ ইবন নাওফাল ؓ
ওয়ারাকাহ ইবন নাওফাল মা খাদিজার চাচাতো ভাই। ধর্মমতে খ্রিস্টান। শিক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন, খ্রিস্টধর্ম নিয়ে অনেক পড়াশুনা করেছেন। তবে খ্রিস্টান হলেও তাঁর বিশ্বাস ছিল আল্লাহ এক, অর্থাৎ তিনি তাওহীদে বিশ্বাসী ছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় যে, সে সময় খ্রিস্টধর্মের এমন কিছু অনুসারী ছিল যারা এক আল্লাহর ওপর বিশ্বাস করতো, তারা ঈসাকে রব আখ্যায়িত করতো না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন প্রথম ওয়াহী প্রাপ্ত হন, তখন খাদিজা এই ওয়ারাকাহ ইবন নাওফালের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু এর ঠিক পরপরই ওয়ারাকাহ মৃত্যুবরণ করেন। ইসলাম গ্রহণ করার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। লোকে বলাবলি করতে থাকে, ওয়ারাকাহর কী হবে? সে তো মুসলিম ছিল না, সে নিশ্চয়ই জাহান্নামে যাবে। নবীজির ওপর তখন ওয়াহী অবতীর্ণ হলেও, সেটা সবার কাছে প্রচার করার নির্দেশ আসেনি। রাসূলুল্লাহ ﷺ ওয়ারাকাহ সম্পর্কে বলেন, 'আমি তাঁকে স্বপ্নে দেখেছি, তাঁর পরনে ছিল সাদা কাপড়। যদি তিনি জাহান্নামের অধিবাসী হতেন, তবে সাদা কাপড় পরে থাকতেন না।'
পরবর্তীতে তিনি আরেকটি স্বপ্ন দেখেন। এবারে তিনি দেখেন, ওয়ারাকাহ জান্নাতে অবস্থান করছেন এবং তাঁর দুজন অভিভাবক রয়েছে। এই স্বপ্ন থেকে বোঝা যায়, ওয়ারাকাহ জান্নাতে যাবেন, কেননা তাঁর ঈমান সঠিক ছিল।
📄 সালমান আল ফারিসী ؓ
সালমান আল ফারিসীর কাহিনি খুবই চমকপ্রদ। তাঁর নিজের বর্ণনা থেকেই সেই কাহিনি সংরক্ষিত রয়েছে। সালমান আল ফারিসীর বৃদ্ধ বয়সের ঘটনা, একদিন ইবন আব্বাস তাঁর কাছে গিয়ে তাঁর জীবনের গল্প শুনতে চাইলেন। তখন তিনি ইবন আব্বাসকে নিজের কাহিনি বলতে শুরু করলেন। তাঁর ভাষায়-
"আমি ছিলাম ইস্পাহানের (বর্তমান ইরান) এক ফারসি যুবক। আমাদের গ্রামের নাম জাইয়্যান। আমার বাবা সেই অঞ্চলের প্রধান। আমরা ছিলাম 'মাজুস' (Magian) ধর্মের অনুসারী। আমি অনেক কষ্ট সহ্য করে অত্যন্ত কঠোরভাবে সেই ধর্মের অনুসরণ করছিলাম। একজন ভালো মাজুস হওয়ার জন্য আমি কঠিন সাধনা করছি। এক সময় আমি 'আগুনের রক্ষক' হিসেবে উন্নীত হলাম।"
মাজুসি ধর্মাবলম্বীরা মঙ্গল ও অমঙ্গলের শক্তিতে বিশ্বাস করতো এবং আগুনের পূজা করতো। এটা ছিল শির্ক। আগুনের রক্ষক হওয়া সেই ধর্মের খুব উঁচু পদ ছিল। সালমানের ওপর সে দায়িত্ব এসে পড়ে। তাঁর কাজ ছিল আগুন জ্বালানো এবং কখনও যেন এটা নিভে না যায় সেদিকে লক্ষ রাখা। প্রত্যেক গ্রামের মন্দিরেই এমন একটি করে আগুন জ্বালানো থাকতো। সেটা সর্বদা জ্বালিয়ে রাখার নিয়ম ছিল।
"আমার বাবার অনেক বড় ব্যবসা ছিল। একদিনের কথা। আব্বা একটা বাড়ি বানানোর কাজে সেদিন খুব ব্যস্ত। আমাকে বললেন ব্যবসার দিকটা দেখতে। আমার বাবা আমাকে এতো ভালোবাসতেন যে, তিনি আমাকে ঘরের মধ্যে আটকে রাখতেন, ঘর থেকে বাইরে কোথাও যেতে দিতেন না। সেদিন ব্যবসার কাজে বাইরে পাঠানোর সময় আমাকে বাবা বললেন, শোনো বাবা, তুমি জানো তুমি আমার কতো প্রিয়। যদি তুমি ফিরতে দেরি করো, তাহলে চিন্তায় আমি অস্থির হয়ে যাবো। এই বলে বাবা আমাকে কাজে পাঠালেন।
আমাকে এমনভাবে ঘরের মধ্যে রাখা হতো যেন আমি একটা বন্দী দাস। সেদিন খ্রিস্টানদের একটা গির্জার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় তাদের প্রার্থনার আওয়াজ শুনতে পেলাম। খুব কৌতূহলো হলো। কী ঘটছে জানার জন্য ভেতরে ঢুকতে চাইলাম। আমি কখনও বাড়ির বাইরে পা রাখি নি, পুরো বিষয়টাই আমার কাছে অভিনব, নতুন! বুঝতে পারলাম, মাজুসি ছাড়াও আরো ধর্ম রয়েছে।
গির্জার ভেতরে ঢুকবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। সেখানে গিয়ে দেখি সবাই প্রার্থনা করছে। আমি তাদের প্রার্থনার ভঙ্গিমা দেখে মুগ্ধ! সেখানেই সূর্যাস্ত পর্যন্ত থেকে গেলাম, ওদিকে বাবার কাজ কিছুই করা হলো না। বাবা আমার এত চিন্তিত হয়ে পড়েন যে আমাকে খোঁজার জন্য চারিদিকে লোক পাঠিয়ে দিলেন।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে গেল। আমাকে দেখে বাবা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, তোমাকে কি আমি দেরি করতে নিষেধ করিনি? কী হয়েছিল?
- আমি খ্রিস্টানদের গির্জার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন তাদের প্রার্থনা দেখার জন্য সেখানে ঢুকি। তাদের প্রার্থনার ব্যাপারে আরও জানতে গিয়ে আমি আপনার দেওয়া কাজের কথা ভুলে গিয়েছিলাম।
- দেখো বাবা, তাদের ধর্ম ভালো নয়। তোমার এবং তোমার পূর্বপুরুষদের ধর্মই সবচেয়ে সেরা।
- না, তাদের ধর্ম আমাদের চেয়ে উত্তম।"
ছেলের মুখে এ কথা শোনার পর তাঁর বাবা অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল। ছেলে নিজ ধর্ম বদলে ফেলবে এই আশঙ্কায় সে তাকে শেকল দিয়ে আটকে রাখলো।
গির্জায় ঢোকার পর সালমান একজনের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, 'তোমাদের ধর্মের কেন্দ্র কোনটি?' লোকটি জবাব দিল, 'পবিত্র ভূমি, আশ-শাম (ফিলিস্তিন), লোকটা জবাব দিল।'
শেকলে বন্দী অবস্থায় সালমানের এই কথাটা মনে পড়ে গেল। অতি কষ্টে গির্জার লোকেদের কাছে একটা বার্তা পাঠাতে সক্ষম হলেন, 'যদি আপনারা আশ-শাম থেকে আগত কোনো কাফেলার সন্ধান পান, তাহলে অবশ্যই আমাকে জানাবেন।'
এক সময় সালমানের কাছে কাছে বার্তা এল, 'শামগামী কাফেলা এসে গেছে।' সেই দিনই সালমান আল ফারিসী কৌশলে নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। অতঃপর এই কাফেলার সাথে পবিত্র ভূমি শামে গিয়ে পৌঁছান। এভাবেই সত্যের সন্ধানে তাঁর যাত্রার শুরু।
ধর্মের ব্যাপারে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তির কাছ থেকেই তিনি শিখতে চাইছিলেন। সিরিয়াতে গিয়েই খবর নিলেন এ ধর্মের সবচে জ্ঞানী ব্যাক্তি কে। সবাই বললো বিশপের কাছে যাও, গির্জার পুরোহিত।
বিশপের কাছে গিয়ে নিজের সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন সালমান। তাকে বললেন, আমি আপনার কাছ থেকে ধর্ম সম্পর্কে শিখতে চাই! বিশপ জবাব দিলেন, 'স্বাগতম! তুমি আমার সাথেই গির্জায় থেকে যাও।'
সালমান ফারিসী গির্জাতেই দিন কাটাতে লাগলেন। বিশপ কেমন ছিল বোঝার জন্য সালমান আল ফারিসীর একটা মন্তব্যই যথেষ্ট, তিনি বিশপ সম্পর্কে বলেন, "এই লোকটা অত্যন্ত অসৎ! মানুষদেরকে দান করতে উৎসাহ দিত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দানের সব টাকা নিজের জন্য রেখে দিত। আমি তাকে খুবই ঘৃণা করতাম।"
অথচ এত ঘৃণা সত্ত্বেও তিনি সেই বিশপের সাথে রয়ে গেলেন। এর পেছনে কারণ ছিল তাঁর জ্ঞানার্জনের তীব্র স্পৃহা। দীর্ঘদিন এসব ব্যাপারে সালমান চুপ ছিলেন। বিশপ মারা যাওয়ার পর খ্রিস্টানরা যখন তার মৃতদেহ সমাধিস্থ করার ব্যবস্থা করতে চাইলো, তখন তিনি মুখ খুললেন। বললেন, এই বিশপ ছিল একটা অসৎ আর খারাপ লোক।
- তারা রেগে হৈ হৈ করে উঠলো। তোমার কত বড় সাহস, বিশপকে নিয়ে এসব কথা বলো?
- আমি তোমাদেরকে প্রমাণ দিতে পারি।
সালমান আল ফারিসী তাদেরকে সেই স্থানে নিয়ে গেলেন, যেখানে বিশপ তার সমস্ত সম্পদ অর্থাৎ তার অনুসারীদের দেওয়া দানের মাল জমা করে রেখেছিল। সে সাত বাক্সভর্তি লুকোনো সোনা আর রূপা বের করলো।
সালমান ফারিসী বলেন, লোকেরা এতো রেগে গেলো যে, তারা শেষ পর্যন্ত ওই বিশপের মৃতদেহ ক্রুশবিদ্ধ করে তাতে পাথর ছুঁড়তে লাগলো।
এরপর তারা অন্য এক ব্যক্তিকে বিশপের স্থানে নিয়োগ করলো। তিনি এই ব্যক্তির সম্পর্কে বলেন, "আমি এমন চমৎকার মানুষ আর দেখিনি যে তার মতো এত যত্নের সাথে আল্লাহর ইবাদত করে। লোকটা ছিলেন দুনিয়ার প্রতি বিমুখ আর আখিরাত নিয়ে উদগ্রীব, দিন-রাত জুড়ে কঠোর সাধনা করতেন।"
এই আলেমের সাথেই সালমান ফারিসী সময় কাটাতে লাগলেন। তার কাছ থেকে দীক্ষা নিলেন, দ্বীনের ব্যাপারে শিখলেন, এবং ইবাদত করতে থাকলেন। একসময় এই বৃদ্ধ আলেমের মৃত্যু ঘনিয়ে আসে।
"মৃত্যুশয্যায় আমি তার কাছে গিয়ে বললাম, আপনি তো আমার কাহিনি সবই জানেন যে, কীভাবে আমি সবকিছু পেরিয়ে এই ধর্মের শিক্ষা নিতে এসেছি। আপনার ওপর আল্লাহর হুকুম সমাগত, এখন আপনি কার কাছে আমাকে রেখে যেতে চান?
তিনি বললেন, বাবা, আমি যা করেছি সেরকম আর কেউ করেছে বলে আমার জানা নেই। তবে মসুল অঞ্চলে একজন আছেন। তিনি ঠিক আমার মতোই ইবাদতে মশগুল থাকেন, তুমি তার কাছে যাও।"
সালমান তখন আশ-শাম (ফিলিস্তিন/সিরিয়া) থেকে যাত্রা করে সুদূর মসুলে হাজির হলেন। মসুলের পুরোহিতের কাছে গিয়ে নিজের সমস্ত কাহিনি আগাগোড়া খুলে বললেন। এরপর বললেন, শামের পুরোহিত আমাকে মসুলে পাঠিয়েছেন। আপনি কি আমাকে আপনার সাথে থাকার অনুমতি দিবেন? পুরোহিত বললেন, 'অবশ্যই। তুমি আমার শিষ্য হতে পারো।'
এভাবে সালমান তার সাথে থাকতে লাগলেন। কিন্তু তিনিও ছিলেন বেশ বৃদ্ধ। তার মৃত্যুও ঘনিয়ে আসছিল। সালমান তার কাছেও একই প্রশ্ন তুললেন।
- আমি আপনার কাছে খ্রিস্টধর্ম শিখতে এসেছিলাম। কিন্তু এখন আপনার সময় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আপনার মৃত্যুর পর আমি কার কাছে যাবো?
- আমাদের পথের অনুসারী আর কারো কথাই আমার জানা নেই। শুধুমাত্র একজন বাদে। তুমি নিসিবিসের (নুসাইবিন) বিশপের কাছে যাও।
সালমান নিসিবিস পৌঁছে সেখানকার পুরোহিতের কাছে সব খুলে বলেন। নতুন করে তাঁর জীবন শুরু হলো নিসিবিসে। কিন্তু এই লোকটিও তখন জীবনসায়াহ্নে। সালমানের উস্তাদদের যেন মৃত্যুর মেলা বসেছিল, সবাই মারা যাচ্ছিল একে একে। তাদের পরে ধর্মের অনুসরণ করার মতো আর কেউ ছিল না। নিসিবিসের পুরোহিত মৃত্যুর সময় বলে গেলেন, আম্মুরিয়ার আলেম পুরোহিতের কাছে যেতে। সালমান ফারিসী তুরস্কের দিকে পা বাড়ালেন। আম্মুরিয়া হচ্ছে বর্তমান বাইজেন্টাইন।
আম্মুরিয়ায় জ্ঞানার্জন ও ইবাদত-বন্দেগীর পাশাপাশি সালমান নিজের একটা ব্যবসা আরম্ভ করলেন। লাভের টাকায় কিছু ভেড়া আর গরুও কিনলেন। এই শিক্ষকেরও শেষ সময় এগিয়ে আসলে তিনি পরবর্তী শিক্ষকের ব্যাপারে উপদেশ চাইলেন। আলেম উত্তর দিলেন, 'বাবা, আমার জানামতে এমন কেউ নেই যার কাছে আমি তোমাকে পাঠাতে পারবো। কিন্তু এখন নবী আগমনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তিনি আসবেন আরবদের মধ্য থেকে। এরপর সেখান থেকে এমন এক স্থানে যাত্রা করবেন, যেখানে থাকবে খেজুর গাছের সমাহার আর তার দুইপাশে থাকবে পাথুরে ভূমি। তিনি কিছু সুস্পষ্ট চিহ্ন ধারণ করবেন। তিনি উপহারের খাবার খাবেন, কিন্তু দানের বস্তু ফিরিয়ে দিবেন। তাঁর দুই কাঁধের মাঝে নবুওয়াতের মোহর অঙ্কিত থাকবে। যদি পারো, সেখানে চলে যাও।'
এখানে লক্ষণীয় ব্যাপার আম্মুরিয়ার আলেমের বক্তব্য। তিনি সালমানকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাদের পথের আর কোনো অনুসারী জীবিত নেই। যারা ঈসার দ্বীনকে সঠিকভাবে মেনে চলতেন, তারা সবাই মৃত্যুবরণ করেছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে আবার নতুন বার্তা আসার সময় হয়ে গেছে। পৃথিবী এখন নতুন দিকনির্দেশনার জন্য অপেক্ষমান।
রাসূলুল্লাহর তিনটি চিহ্নের কথাও সালমান ফারিসীকে বলা হয়-
এক, তিনি হবেন আরব। তিনি এমন এক স্থানে সফর করবেন, যেখানে অনেক খেজুর গাছ জন্মে আর সে ভূমির দুই পাশে হবে পাথুরে অঞ্চল।
দুই, তিনি লোকেদের সাদাকাহ গ্রহণ করেন না, কিন্তু উপহার নেন।
তিন, তাঁর পিঠে দুই কাঁধের মধ্যখানে অঙ্কিত মোহর। এটা হলো নবুওয়াত বা রিসালাতের চিহ্ন।
"আমি আরবে যাওয়ার পথ খুঁজতে লাগলাম। হঠাৎ কালব গোত্রের একদল বণিকের সাথে আমার সাক্ষাৎ হলো। তাদেরকে বললাম, 'আমাকে তোমাদের সঙ্গে নিয়ে চলো, বিনিময়ে আমার সব সম্পদ তোমাদের। আমার গাভী-ভেড়া সব তোমাদের। তোমরা শুধু আমাকে আরবে নিয়ে চলো!"
অসাধারণ এই যুবক, অসাধারণ তাঁর কাহিনি! সত্যের খোঁজে পথে পথে ফেরা জীবনের গল্প!
লোকগুলো তাকে সাথে নিতে রাজি হলো। কিন্তু আরবে পৌঁছানোর পর বিশ্বাসঘাতকতা করতেও পিছপা হলো না, মুহূর্তের মধ্যে চোখ উল্টে ফেললো-ওয়াদি আল কুরা নামক এলাকায় এসে সালমানকে দাস হিসেবে এক ইহুদি লোকের কাছে বিক্রি করে দিল। তখনকার দাসপ্রথাটা এমন ছিল যে একবার কেউ দাস হলে সেখান থেকে আর মুক্তির কোনো পথ নেই। দাস-দাসীর কথা না কেউ শোনে, না বিশ্বাস করে। তাই সে নিজেকে যতোই "স্বাধীন” বলে দাবি করুক, কেউ মানবে না। ইহুদি সেই লোক সালমানকে ওয়াদি আল-কুরায় নিয়ে গেলো।
"আমি জায়গাটি দেখে ভাবতে লাগলাম বোধহয় এই জায়গার কথাই পুরোহিত আমাকে বলেছিল। তখন আমার মালিকের এক জ্ঞাতিভাই এসে আমাকে তার কাছ থেকে কিনে নিল। সে ছিল বনু কুরাইযার অধিবাসী।” আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, এই বনু কুরাইযা গোত্রের লোকেরা বাস করতো মদীনায়! সালমান তার নতুন মালিকের সাথে মদীনায় গিয়ে পৌঁছালেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলেন, এই জায়গাই তিনি খুঁজছিলেন। প্রচুর খেজুর গাছ আর দুইপাশে পাথুরে ভূমি। একদিকের অংশের নাম আল হাররা আর গারবিয়া, আরেক দিক হলো আল হাররা আশ-শাকিয়া। এভাবে প্রাকৃতিকভাবেই মদীনার দুইপাশের সীমান্ত সুরক্ষিত ছিল। দক্ষিণ দিকে ছিল গাছগাছালির দেয়াল।
"রাসূলুল্লাহর আগমন হলো। তিনি বছরের পর বছর মক্কায় কাটালেন, অথচ আমি এর কিছুই জানতে পারলাম না! দাসত্বের চাকায় পিষ্ট হয়ে আর কোনোদিকে খেয়াল করার অবস্থা ছিল না।” সালমান তখনও ইসলামের বার্তা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।
একদিন আমি খেজুর গাছের ওপরে চড়ে আমার কাজ করছি। আমার মালিক গাছের নিচেই বসা। তার এক চাচাতো ভাই এসে রাগত স্বরে বলতে লাগলো, ইয়া মাবুদ, কায়লার বংশধরদের ওপর গযব পড়ুক! কোন এক মক্কার লোক নিজেকে নবী বলে দাবি করছে, আর তার জন্য ওরা কুবায় লোক জড়ো করছে।" আউস ও খাযরাজ গোত্র কায়লার বংশধর নামে পরিচিত ছিল।
সালমান বললেন, "কথাটা কানে আসামাত্র বুকের মধ্যে ধক করে উঠলো। আমি কাঁপতে শুরু করলাম, এতো বেশি কাঁপুনি হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল গাছ থেকে সরাসরি আমার মালিকের ওপর গিয়ে পড়বো!"
এই একটি মুহূর্ত! যার জন্য বছরের পর বছর ধরে সালমান ফারিসী অপেক্ষা করেছেন। ঘর ছেড়েছেন, পরিবার ছেড়েছেন, অজানা-অচেনা কতো জায়গায় ঘুরে ফিরেছেন। শুধু সত্য জানার আশায়। পারস্য ছাড়লেন, শামে গেলেন, সেখান থেকে তুরস্ক, তারপর ইরাক, শেষমেষ আরবে এসে পৌঁছালেন। আর আরব ভূমি ছিল পুরো দুনিয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন একটি এলাকা। এর পার্শ্ববর্তী পারস্য আর রোমের থেকেও বহু বহু দূরে। এই দূর পরবাসে সালমান একটা দাস হয়ে থেকে গেলেন শুধুই সত্য জানার জন্য। চিন্তা করা যায়, তিনি কী পরিমাণ একাকী বোধ করেছেন, ঘরের জন্য তাঁর মন কতোটা আনচান করেছে!
অবশেষে তিনি তাঁর আরাধ্য সংবাদটি শুনলেন।
"আমি দ্রুত গাছ থেকে নেমে এলাম, ওই লোকের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। আমার মালিক আমার ঘাড়ে ধরে টেনে এনে মুখের ওপর ঘুষি বসালো। বললো, এত কিছু তোর জানার দরকার নেই। যা, কাজে যা। সেদিন সন্ধ্যার দিকে কিছু খাবার প্রস্তুত করে নিয়ে আমি কুবার দিকে রওনা হলাম। কুবা এলাকাটা মদীনার বাইরে। পৌঁছতে রাত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহর কাছে গিয়ে বললাম, আমি শুনেছি আপনি খুব সজ্জন, অচেনা অসহায় লোকদেরকে আপনি নিজের সঙ্গী বানিয়ে নেন! আমি কিছু খাবার সাদাক্বাহ করতে চাই, আমার মনে হয় আপনিই এটার সবচেয়ে উপযুক্ত। এই বলে তাঁর হাতে খাবারগুলো দিয়ে দিলাম।
"রাসূলুল্লাহ খাবারগুলো নিলেন। এরপর তাঁর সঙ্গীদেরকে সেখান থেকে খেতে বললেন, কিন্তু নিজে তাদের সাথে খেতে বসলেন না।" এটা ছিল প্রথম চিহ্ন – নবীজি নিজের জন্য দানের বস্তু গ্রহণ করেন না।
"পরদিন ফের সেখানে গেলাম। রাসূলুল্লাহ ইতিমধ্যে মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে শুরু করেছেন। তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, গতবার আপনাকে বলেছিলাম খাবারগুলো দান করতে চাই, কিন্তু আপনি সেখান থেকে খাননি। তাই এবার আমি আপনাকে এই খাবারগুলি উপহার হিসেবে দিয়ে সম্মানিত করতে চাই। এই বলে তাঁর দিকে খাবারগুলো বাড়িয়ে দিলাম। তিনি এবার তাঁর সাথীদের খেতে ডাকলেন, নিজেও তাদের সাথে যোগ দিলেন।
"এরপর আবারও তাঁর সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি সে সময় মদীনার গোরস্থানে ছিলেন। একটু আগেই একজনের জানাযা হয়েছে। আমি নবীজীর কাছে গিয়ে কুশল বিনিময় করলাম। তাঁর চারপাশে ঘুরে পিঠের চিহ্ন দেখার চেষ্টা করতে লাগলাম। রাসূলুল্লাহ বোধ হয় বুঝতে পেরেছিলেন যে আমি কোনো একটা চিহ্নের কথা জানতে পেরে সেটা খোঁজার চেষ্টা করছি। তিনি নিজের পিঠ উন্মুক্ত করে দিলেন। তাঁর গায়ের ওপর থেকে চাদর সরিয়ে দেওয়ামাত্র আমার চোখের সামনে সেই চিহ্নটি স্পষ্ট হয়ে গেলো-রিসালাতের মোহর! নবীজির সামনে মাটিতে সিজদায় লুটিয়ে পড়লাম! তাঁর পায়ে চুমু দিতে লাগলাম। আমি কান্নায় ভেসে যাচ্ছিলাম।”
"রাসূলুল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে আমাকে উঠে দাঁড়াতে বললেন।” কেননা নবীজি নিজের জন্য কারো সিজদা নিতেন না। এরপর তিনি সালমানকে তাঁর কাহিনি শোনাতে বললেন। সালমান নবীজীকে সব খুলে বললেন।
"রাসূলুল্লাহ আমাকে বললেন, তুমি নিজের এই কাহিনি আমার সাহাবীদেরকেও শোনাও।"
সালমান ফারিসী বলেন, "হে ইবনে আব্বাস, আমি আমার কাহিনি ঠিক সেভাবেই তাদেরকে শুনিয়েছি, যেভাবে আমি আজ তোমার কাছে বর্ণনা করছি।"
"দাস হওয়ার কারণে আমি বদরের যুদ্ধ, উহুদের যুদ্ধ কোনোটাতেই অংশগ্রহণ করতে পারিনি। এরপর রাসূলুল্লাহ আমাকে একদিন ডেকে বললেন, 'সালমান, নিজেকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করো।' দাসপ্রথা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য দাস মনিবের সাথে চুক্তি করতে পারত। দাস একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাজ করবে এবং একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের টাকা কামাতে পারলে, সে নিজেকে দাসত্ব থেকে ছুটিয়ে নিতে পারে। সালমান ফারিসী তাঁর মালিকের কাছে মুক্তির আবেদন করলেন। তাঁর মালিক বললো, "আমার জন্য তিনশ খেজুর গাছ লাগাবে, আর এই তিনশ গাছের একটাও যেন নষ্ট না হয়। আর সেই সাথে আমাকে চল্লিশ আউন্স স্বর্ণ দিতে হবে, তাহলে তুমি নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারবে।"
নবীজির কাছে ছুটে গিয়ে সালমান তাঁর মালিকের এই অসম্ভব দাবির কথা বললেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, 'চিন্তা করো না।' সাহাবাদের ডেকে বললেন, 'তোমাদের ভাইকে সাহায্য করো।'
সালমান ফারিসী বলেন, "এরপর সাহাবীদের কেউ তিরিশটা খেজুরের বীজ নিয়ে এলো, কেউ আনলো, কেউ বিশটা, কেউ দশটা, যে যেমন পারছিল আনছিল। এমনি করে আমার তিনশটা বীজ যোগাড় হয়ে গেল।"
নবীজি বললেন, 'যখন তোমার কাছে ৩০০টা বীজ হয়ে যাবে, তখন সেগুলোর জন্য গর্ত খুঁড়বে, কিন্তু আগেই বীজ বপন কোরো না, আমার সাথে দেখা করে যেও।'
সালমান তিনশটা গর্ত খুঁড়লেন। রাসূলুল্লাহর কথা অনুযায়ী সেগুলো সেভাবেই রেখে তাকে বলতে গেলেন। সালমান বলেন, 'রাসূলুল্লাহ নিজের বরকতময় হাত দিয়ে সেই তিনশটি বীজ একটি একটি করে বপন করলেন। সেই তিনশ গাছের একটা গাছও (ফল দেওয়ার আগে) মরেনি।'
এরপর বাকি থাকে চল্লিশ আউন্স স্বর্ণ। কীভাবে এই স্বর্ণের যোগাড় হবে সে ব্যাপারে সালমানের কোনো ধারণাই ছিল না। একদিন রাসূলুল্লাহকে কিছু স্বর্ণ দেওয়া হলো। তিনি বলে উঠলেন, 'তোমাদের পারস্যের সেই ভাই কোথায়?'
সাহাবীরা সালমানের খোঁজে বেরিয়ে গেলেন। সালমান এলে নবীজি তাঁকে বলেন, 'এই নাও স্বর্ণ, এটা দিয়ে নিজেকে মুক্ত করে নাও।'
- ইয়া রাসূলুল্লাহ! এতটুকু স্বর্ণ দিয়ে কী হবে?
- এটা নাও, এটাই যথেষ্ট হবে।
সালমান বলেন, "মাপতে গিয়ে দেখি, ওই এক রত্তি স্বর্ণের ওজন ঠিক চল্লিশ আউন্স! আমি সেই স্বর্ণের বিনিময়ে দাসত্ব থেকে মুক্ত, স্বাধীন হলাম! এরপর নবীজির সাথে সব জিহাদে আমি অংশগ্রহণ করেছি, একটিও বাদ দেইনি।"¹⁶
সালমান আল ফারিসী প্রথমবারের মতো খন্দকের যুদ্ধে যোগ দেন। শত্রুদের জন্য মাটি খুঁড়ে পরিখা তৈরি করার চমকপ্রদ বুদ্ধিটা তিনিই দিয়েছিলেন।
টিকাঃ
১৬. সীরাত ইবন হিশাম, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬০৯।
📄 শিক্ষা
সালমান ফারিসী তাঁর জীবনের শুরুতে দ্বীনের শিক্ষা নিয়েছিলেন সিরিয়ার পুরোহিতের কাছে। সালমান তার সম্পর্কে বলেন, 'আমি তার সাথে ছিলাম, কিন্তু সে ছিল অসৎ এক লোক। মানুষের থেকে দান-খয়রাত চাইতো, এরপর সেগুলো গরিবদের মধ্যে না বিলিয়ে নিজের জন্য জমা করে রাখতো। এভাবে সাত বাক্স ভরা সোনা আর রূপা তার কাছে জড়ো হলো! তার এইসব কাজ দেখার পর আমি তাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতাম।'- একজন মানুষ সত্য জানার জন্য পথে পথে ঘুরছে। অথচ শেষমেষ সে এমন এক লোকের সন্ধান পায়, যে বাইরে "আলেম" সাজলেও ভেতরে ভেতরে অসৎ। সত্য জানার প্রতি বিতৃষ্ণা এনে দেওয়ার জন্য যা কিছু দরকার, তার সবকিছুই সেই পুরোহিতের স্বভাবে উপস্থিত ছিল। কিন্তু সালমান ফারিসী ছিলেন নিজের লক্ষ্যে অবিচল, দৃঢ়। তাঁর সত্যকে খুঁজে বের করার আগ্রহ এত প্রবল ছিল যে, এসব দেখেও তিনি সত্য খোঁজার ব্যাপারে বিরত হননি।
আজকাল দেখা যায় যে, মুসলিমদের কাজের কারণে লোকেরা ইসলাম থেকে দূরে সরে যায়। লোকে বলে, মুসলিমদের আচরণের জন্যই মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে না। এই কথাটি কিছু অংশে সত্য হলেও পুরোপুরি সঠিক নয়। কেউ যদি সত্যপথ খুঁজে বের করার জন্য সত্যিই আন্তরিক হয়, তবে তার বোঝা প্রয়োজন যে, সমাজের সবাই সত্যের অনুসারী নাও হতে পারে। তাই কোনো ব্যক্তি বা দল ভুল মানেই এটা না যে, সেই ধর্মও ভুল। সালমান ফারিসী একটা অসৎ লোকের দেখা পাওয়ার পরেও সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টধর্মকে বাতিল মনে করেননি। বরং তিনি সত্যকে জানার জন্য আরো উঠেপড়ে লেগেছেন। সেই লোকের সাথেই থেকে গিয়ে, আরও ভালো কিছুর সন্ধান করেছেন। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল তাঁকে তাঁর এই ধৈর্যের পুরস্কার দিয়েছেন। সালমান পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্মের শ্রেষ্ঠ আলেমদের থেকে ইলম অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন। লোকেরা সেই দুর্বৃত্ত পুরোহিতের বদলে এমন একজনকে সেখানে নিয়োগ দেয়, যাকে দেখে সালমান বলেছিলেন, মুসলিমদের সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার আগ পর্যন্ত তার দেখা সবচেয়ে উত্তম লোক ছিলেন তিনি।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা মুহাম্মদে বলেছেন,
"আর যারা সৎপথপ্রাপ্ত হয়েছে, আল্লাহ তাদের সৎ পথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেন আর তাদের প্রদান করেন তাকওয়া।" (সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭: ১৭)
পুরো ঘটনাটি থেকে আরো কিছু শিক্ষা গ্রহণ করা যায়:
প্রথমত, যারা হিদায়াতের খোঁজে থাকে, তাদেরকে হিদায়াত দেওয়া হয়। কিন্তু আল্লাহর হিদায়াত পাওয়ার জন্য নিজেদেরকেও পরিশ্রম করতে হবে। যখন কেউ আল্লাহর জন্য কষ্ট করবে, ত্যাগস্বীকার করবে; তখন তার পুরস্কার হবে অসামান্য। যদি কেউ আল্লাহর দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, আল্লাহ তাঁর দিকে দৌড়ে আসবেন। কিন্তু মানুষকে প্রথম ধাপটি নিতে হবে। সালমান ফারিসী ধীরে ধীরে ঠিকই ইসলামকে খুঁজে পেয়েছিলেন, যদিও তিনি প্রথমে ছিলেন এমন একটি জায়গায় যা ইসলাম থেকে শত শত মাইল দূরে অবস্থিত।
দ্বিতীয়ত, কারো ভুল কাজ যেন আমাদেরকে দমিয়ে না দেয়। ধর্ম তাদের অসৎ কাজের উৎস নয়-সালমান ফারিসী এটা বুঝতে পেরেছিলেন। আর তাই একজন অসৎ লোকের কারণে সেই ধর্মকেই অবিশ্বাস করা শুরু করে দেননি। একটা পুরোহিত খারাপ বলেই তিনি আশা হারিয়ে ফেলেননি। সত্য জানার আগ্রহ যেন মানুষের ভুল কাজ নিয়ে আমাদের বিতৃষ্ণা বা ঘৃণাকেও ছাপিয়ে যায়, এটা খুব দরকার।
তৃতীয়ত, মুসলিমদেরকে নতুন মুসলিমদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের সুবিধা-অসুবিধা দেখার দায়িত্ব মুসলিম সমাজের। মুহাম্মাদ স্বয়ং সালমানকে সাহায্য করেছেন, সাহাবীদেরকেও সহযোগিতা করতে বলেছেন। নতুন ইসলাম গ্রহণ করার পরে বেশিরভাগ সময়েই আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন হয়। নওমুসলিমদেরকে আর্থিকভাবে সহায়তা করাও এক ধরনের দাওয়াহ। খালি মুখের কথায় দাওয়াহ হয় না। যারা সম্প্রতি ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের দায়িত্ব নেওয়াও এর অন্তর্গত।
সাহাবীদের জীবনের দিকে লক্ষ করলে দেখব, নতুন মুসলিমদের অনেকেরই সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। বিলাল ছিলেন একজন দাস, আবু বকর তাঁকে মুক্ত করেন। প্রথম যুগের অনেক মুসলিমই দাস ছিল। এই রকম অবস্থায় বড় ধরনের সহযোগিতার দরকার পড়ে। এই সহযোগিতাটুকু না দিলে তাদের দ্বীন গ্রহণের প্রাথমিক সময়টা এত কঠিন হয়ে পড়ে, যে অনেকসময় তারা দ্বীন থেকেই সরে যায়। আমেরিকায় একটা পরিসংখ্যানে জানা যায়, বেশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণের নতুন মুসলিমরা শেষ পর্যন্ত ইসলাম ছেড়ে দেয়। ইসলাম গ্রহণের পর তাদেরকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরিবারের আপন মানুষগুলো পর হয়ে যায়। তাদের সামাজিক অবস্থান বদলে যায়। তাই এরকম পরিস্থিতিতে তাদের অনেক সহানুভূতি ও সহযোগিতার প্রয়োজন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'কয়েকটি ব্যাপার চলে আসার আগেই তোমরা ভালো কাজ করে নাও। দারিদ্র্য তোমাকে বিস্মরণ করিয়ে দেওয়ার আগেই সৎ কাজ করো।' যখন লোক খালি পেটে থাকে, তখন আধ্যাত্মিকতা, ইলম অর্জন-এসবের প্রতি সে আকর্ষণ বোধ নাও করতে পারে। তাই মানুষের প্রয়োজনের দিকে নজর রাখাও দাওয়াহ দেওয়ার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।