📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 কাবা পুনর্নির্মাণ

📄 কাবা পুনর্নির্মাণ


মুহাম্মাদের নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল। একবার আল-কাবা বন্যাকবলিত হয়। আল-কাবার অবস্থান একটি নিচু উপত্যকায়, পর্বতরাজির মাঝে। বন্যার ফলে কাবার কাঠামোতে ফাটল ধরে। তাই কুরাইশগণ কাবাকে পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন অনুভব করে। আল-কাবা মোট চার বা পাঁচবার পুনর্নির্মিত হয়েছে। ইবরাহীম এবং আদম—এই দুইজনের মধ্যে কে সর্বপ্রথম আল-কাবা নির্মাণ করেছিলেন তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে অধিকাংশের মতানুসারে ইবরাহীম-ই প্রথম তা নির্মাণ করেন।

যারা বলেন যে আদমই প্রথম নির্মাণকারী তারা এর পক্ষে কুরআনের যুক্তি পেশ করেন। কেননা কুরআনে বলা আছে, “এবং স্মরণ করো যখন ইবরাহীম ও ইসমাইল কাবার ভিত্তি উত্তোলন করেছিল, তখন তারা বলেছিল, হে আমাদের রব, আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহা শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।” (সূরা বাকারাহ, ২: ১২৭) তাঁরা বলেন যে, ইবরাহীম কাবাঘর গোড়া থেকে নির্মাণ করেননি, তিনি যা করেছিলেন তা হলো ভিত্তি উত্তোলন, অর্থাৎ সেখানে ইতিমধ্যে উত্তোলন করার মতো কিছু ছিল। তাই তাঁরা বলেন যে, নবী আদমের সময়েই আল-কাবার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু প্রচলিত বিশ্বাস এটাই যে ইবরাহীম আল-কাবা নির্মাণ করেছেন। তবে যে নবীই সর্বপ্রথম তা করুক না কেন আল-কাবার পবিত্রতা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই।

বেশ কয়েকজন নবী-রাসূল আল্লাহর ঘর পরিদর্শন করেছেন। হাদীস থেকে জানা যায়, হুদ, সালেহ এবং নূহ আল-কাবা পরিদর্শন করেছিলেন। এছাড়াও জানা যায় ঈসা যখন পুনরায় পৃথিবীর বুকে প্রত্যাবর্তন করবেন তখন তিনি হজ্ব করবেন। সুতরাং, এটি হয় আদম অথবা ইবরাহীম নির্মাণ করেছেন কিন্তু আল্লাহকে স্মরণের জন্য এটিই প্রথম নির্মিত ঘর। “নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত বরকতময় এবং বিশ্ববাসীর জন্য পথ প্রদর্শক।” (সূরা আল-ইমরান, ৩: ৯৬)

মক্কা বন্যাপ্লাবিত হওয়ায় কাবা ঘর দ্বিতীয়বার নির্মাণের প্রয়োজন হয়। কুরাইশগণ এটিকে পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছিল, তাই কাবা ঘরের পুরনো ইমারতটি ভেঙ্গে ফেলার প্রয়োজন পড়লো, কিন্তু তারা কেউই এই পদক্ষেপটি নিতে সাহস পাচ্ছিল না। তারা তাদের সব যন্ত্রপাতি নিয়ে আল-কাবার চারপাশে অপেক্ষা করছে, কিন্তু কেউই সামনে গিয়ে এটি ভাঙ্গার কাজটি শুরু করতে চাচ্ছিল না, সেই সময়ে মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও তারা আল-কাবাকে এতটা শ্রদ্ধা ও সম্মান করতো। তারা সত্যি সত্যিই আল্লাহকে ভয় পেত; তারা বিশ্বাস করতো যে এটি ভেঙ্গে ফেললে মারাত্মক বিপদ হতে পারে। অতঃপর তাদের মধ্যে একজন বললো যে, সে এই কাজটি শুরু করবে, তাই পরদিন ভোরে সে তার পুত্রদের নিয়ে আল-কাবার পাথরসমূহ সরাতে শুরু করলো আর বলতে থাকলো, 'হে আল্লাহ! তুমি ভয় পেয়ো না। আমরা তোমার ভালো চাই।'

এখানে লক্ষণীয়, আল্লাহ সম্পর্কে তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস—তারা ভাবত যে, এসব বলে তারা আল্লাহকে শান্ত করছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সবকিছু জানেন, মানুষ কোন কাজটা কেন করছে তা তাকে মুখে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তিনি অন্তরের খবর রাখেন। মক্কার মুশরিকরা আল্লাহকে বিশ্বাস করতো ঠিকই কিন্তু তাঁর গুণাবলিকে অনুধাবন করতে পারতো না।

এরপর আল-কাবার দেয়ালগুলোকে নামিয়ে ফেলা হয়। তখন মক্কার অদূরে অবস্থিত লোহিত সাগর বন্দরে রোমের একটি জাহাজ নোঙর করে। তারা সেই জাহাজের কিছু কাঠ নিয়ে আসে, ওই জাহাজে আগত এক রোমান নির্মাতার সাহায্যে আল-কাবার পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন করে। জাহাজ থেকে নিয়ে আসা ওই কাঠ দিয়েই প্রথমবারের মত আল-কাবার ছাদ নির্মিত হয়েছিল। কুরাইশগণ খুব ভালভাবেই জানত যে সুদের অর্থে ভালো কিছু নেই। আর তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে শুধুমাত্র হালাল অর্থ দিয়েই আল-কাবার নির্মাণকাজ সম্পাদিত হবে। সেই সময় পতিতাবৃত্তি বহুল প্রচলিত ব্যবসা হওয়া সত্ত্বেও তারা সুদ অথবা পতিতাবৃত্তি থেকে প্রাপ্ত অর্থ এই কাজে কোনোভাবেই ব্যবহার করবে না বলে মনস্থ করে। মানুষ সেই সময় থেকেই জানত যে এভাবে অর্জিত অর্থে কোনো কল্যাণ নেই অথচ তারপরেও তারা অর্থ উপার্জনের খাতিরে তাদের ক্রীতদাস মেয়েদেরকে দিয়ে পতিতাবৃত্তিসহ আরও বিভিন্ন রকম কাজ করাতো। অর্থের সংকুলান না হওয়ার কারণে তারা আল-কাবার একটি দিক কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল। কাবাকে আয়তাকার না বানিয়ে বর্গাকার বানিয়েছিল। কাবার যে অংশটি তারা আর বানাতে পারেনি সেই অংশটিই এখন আল-হিজর বলে পরিচিত। কাবার দুটো ফটক ছিল, তারা বানিয়েছিল একটি আর তারা এর দোরগোড়াকে উঁচু করে বানিয়েছিল, তাই এখন-কাবার দরজার কাছে যেতে হলে উপরে উঠতে হয়।

আল্লাহর রাসূল এক হাদীসে স্ত্রী আ'ইশাকে বলেন, 'তুমি কি জানো না যে তোমাদের সম্প্রদায়ের আল-কাবা নির্মাণের ব্যয় বহনের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল ছিল না? তোমাদের সম্প্রদায় নওমুসলিম না হলে অমি আল-কাবাকে ভেঙে এর পূর্ব ও পশ্চিমদিকে একটি করে দরজা নির্মাণ করতাম। আমি আল-হিজরকে আল-কাবার অন্তর্ভুক্ত করতাম।'

রাসূল মক্কাতে প্রবেশের পরপরই আল-কাবাকে তার প্রকৃত ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু এরপর তিনি আ'ইশাকে বলেন, 'আমি এই কাজটি করবো না শুধু এই কারণে যে কুরাইশরা সবেমাত্র মুসলিম হয়েছে। তাদের ইসলাম এখন ভঙ্গুর, ঈমান দুর্বল, আর এখন যদি অমি কাবাকে পুনর্নির্মাণ করি, তা তাদের অনুভূতিকে আঘাত করবে।'

রাসূলুল্লাহ কাবার পুনর্নির্মাণে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। কুরাইশরা কাবার পুনর্মাণের কাজ শুরু করার পর কালো পাথর বসানোর বিষয়টি সামনে এলে সমস্যা বেঁধে যায়। সবাই কালো পাথর যথাস্থানে রাখার মর্যাদা পেতে চায়। বনু আব্দুদ দার গোত্র তার সমস্ত লোকজনকে এক করে রক্তে পূর্ণ একটি পাত্র নিয়ে কাবার সামনে উপস্থিত হয়। পাত্রটি সবার সামনে রেখে তারা তাতে হাত ডুবিয়ে আবার হাত বের করে নেয়। এর দ্বারা তারা সবাইকে বুঝিয়ে দেয় যে, যদি তাদেরকে পবিত্র কালো পাথর হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে স্থাপনের সম্মান না দেয়া হয় তবে তারা এর জন্য যুদ্ধ করে মরতে প্রস্তুত। অন্যেরাও দমবার পাত্র ছিল না! এই দৃশ্য দেখে উল্টো আরেক গোত্র তাদের রক্তের পাত্র এনে একইভাবে যুদ্ধের অঙ্গীকার করে। অন্যান্য গোত্রও একই রকম অঙ্গীকার করলো। চার পাঁচদিন যাবত এই নিয়ে ঝগড়া চলতে থাকে। অবশেষে তাদের মধ্যকার বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি উমাইয়া বললেন, 'আসুন আমরা সকলে এই সিদ্ধান্তে সম্মত হই যে, আগামীকাল ভোরে মাসজিদুল হারামের দরজা দিয়ে যিনি প্রথম প্রবেশ করবেন তাঁর ফয়সালা আমরা সবাই মেনে নেব।'

পরদিন ভোরে মুহাম্মাদ সর্বপ্রথম মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করেন। তখন তারা সবাই দাঁড়িয়ে বলে, 'ইনি তো সত্যনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত! আমরা তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিলাম।' তারা মাসজিদুল হারামে প্রবেশকারী প্রথম ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব দিবে বলে সম্মত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ব্যক্তি মুহাম্মাদ হওয়ায় তারা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত ও খুশি হয়েছিল, কারণ তারা জানত যে, তিনি কখনোই পক্ষপাতিত্ব করবেন না। আর তাই তারা তাঁর হাতে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ন্যস্ত করেছিল।

রাসূলুল্লাহ তাদেরকে একটা চাদর আনতে বলেন। এরপর নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ উঠিয়ে তা সেই চাদরের মাঝখানে রাখেন। অতঃপর বিদ্যমান গোত্রসমূহের নেতাগণকে সেই চাদরের কিনারা ধরতে বলেন। তারা সবাই একই সময়ে চাদরটি উঁচিয়ে ধরলো; এভাবে প্রত্যেকটি গোত্রই পবিত্র কালো পাথর হাজরে আসওয়াদ উত্তোলনে অংশ নেয়। যখন তারা সবাই পাথরটি উঁচিয়ে ধরে তার নির্ধারিত জায়গায় নিয়ে যায় তখন মুহাম্মাদ তাঁর পবিত্র হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে স্থাপন করেন। অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহই হাজরে আসওয়াদকে তার নির্ধারিত জায়গায় স্থাপন করেন। এভাবে দ্বিতীয়বারের মতো কাবা নির্মিত হয়।

রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন যে, যদি কুরাইশরা সেই সময়ে নওমুসলিম না হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই আল-কাবাকে ইবরাহীমের দেওয়া ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণ করতেন। এর বেশ কয়েক বছর পর আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবায়ের মক্কার আমীর পদে আসীন হন। আ'ইশা তাঁর খালা হওয়ার সুবাদে তিনি এই হাদীস সম্পর্কে জানতেন। আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইরের মা আসমা বিনত আবি বকর ছিলেন আ'ইশার বোন। আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইর আল কাবাকে তার মূল ভিত্তির ওপর ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ তৎকালীন মুসলিমগণ পূর্বের ন্যায় আর নও মুসলিম ছিলেন না, তারা ততদিনে পরিণত হয়েছেন। আয যুবাইর তখন কাবাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন কারণ বনু উমাইয়্যাহর সাথে যুদ্ধে কাবায় একবার আগুন ধরে যায়। আল হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ আস সাক্বাফি মক্কা অবরোধ করেছিল, ওই সময় আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইর এবং বনু উমাইয়্যাহর মধ্যে সিরিয়াতে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আবু উমায়েরের সেনাবাহিনী প্রধান মক্কা অবরোধ করেছিল, তাদের নিক্ষিপ্ত গোলাবারুদের দ্বারা কাবা অগ্নিদগ্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ক্ষতিটুকু কাবার ইমারতকে না ভেঙেও মেরামত করা যেতো। কিন্তু আয যুবাইর এই পরিস্থিতির সুযোগ ব্যবহার করে কাবাকে তার মূল ভিত্তির উপর ফিরিয়ে আনেন। তিনি রাসূলুল্লাহর হাদীস অনুযায়ী কাবাকে পুনর্নির্মাণ করেন। রাসূলের ইচ্ছানুযায়ী কাবার দরজাকে নিচে নামিয়ে আনেন, পূর্ব ও পশ্চিম পার্শ্বে একটি করে দরজা নির্মাণ করেন এবং হিজরের দিকে কাবাকে প্রসারিত করেন।

আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইর সেই যুদ্ধে পরাজিত ও শহীদ হন। আল হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ মক্কা দখল করে। তৎকালীন খলিফা আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান রাসূলুল্লাহর সেই হাদীস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তাই তিনি কাবাকে আবার আবদুল্লাহ আয যুবাইরের আগে যেভাবে কুরাইশগণ নির্মাণ করেছিল, সেভাবে করার হুকুম জারি করেন। বনু উমাইয়্যাহর খিলাফাহর পর বনু আব্বাস খিলাফত লাভ করে, তারাই ছিল খলিফার রাজপরিবার। বনু আব্বাসের একজন খলিফা কাবাকে তার মূল ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণের কথা ভাবছিলেন। তিনি ইমাম মালিকের সাথে এই ব্যাপারে শলা-পরামর্শ করেন। ইমাম মালিক খলিফাকে বলেন, 'আমরা কাবাকে রাজা-রাজড়াদের হাতের পুতুলের মতো ক্ষণে ক্ষণে আকৃতি পরিবর্তনের পক্ষপাতী নই। যদিও এটিকে হযরত ইবরাহীমের দেওয়া ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণের কথা ও পরিকল্পনা রাসূলুল্লাহরও ছিল, কিন্তু এটা এভাবেই থাকুক এবং আমরা আর এর পরিবর্তন সাধন করবো না।' এটি ইমাম মালিকের দেওয়া একটি অন্যতম বিচক্ষণ পরামর্শ ছিল। খলিফাও সেটি তখন মেনে নিয়েছিলেন। বর্তমানে যে কাবা রয়েছে তা কুরাইশগণের ভিত্তির ওপরই নির্মিত।

আলহামদুলিল্লাহ, এতে ভালোই হয়েছে। যদি কাবাকে ইবরাহীমের দেওয়া তাঁর আসল ভিত্তির উপর নির্মাণ করা হতো, তাহলে মুসলিমরা কাবার অভ্যন্তরে ইবাদত করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো। কিন্তু যেহেতু এটাকে কমিয়ে ফেলা হয়েছিল, তাই অর্ধবৃত্ত দিয়ে ঘেরা অংশটি প্রকৃতপক্ষে কাবারই অংশ। তাই ওই অংশে ইবাদাত করা যেন কাবার অভ্যন্তরেই ইবাদত করা। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ কাবার অভ্যন্তরে ইবাদত করেছেন। সময়ের সাথে সাথে কাবার উচ্চতাকে বাড়ানো হয়েছে বটে কিন্তু এর জায়গার পরিবর্তন হয়নি। যে পাথরগুলো দিয়ে কাবা নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলো সেইসব পাথরের অবশিষ্টাংশ যা ইবরাহীম ব্যবহার করেছিলেন, তবে সবগুলো নয়, কিছু পাথর পরবর্তীতে কুরাইশ এবং অন্যেরা সংযোজন করেছে। এটিই সেই কালো পাথর যা ইবরাহীম ব্যবহার করেছিলেন। এই পাথরটি ঘিরে অনেক গল্প কাহিনি প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেন যে এটি জান্নাতে তৈরি হয়েছে। তিরমিযীর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, কালো পাথরটি আসলে সাদা ছিল যা পরবর্তীতে পাপী আদম সন্তানদের স্পর্শের কারণে কালো রঙ ধারণ করেছে। অন্য হাদীসে এসেছে এই পাথরটি স্পর্শ করলে গুনাহ মাফ হয়। এটি কাবার একমাত্র অংশ যাকে চুম্বন করা হয় এবং দূর থেকে যার দিকে ইঙ্গিত করা হয়। কেউ কেউ আবার ইয়েমেনি কোণের দিকেও ইঙ্গিত করে থাকে, কিন্তু তা সঠিক নয়। কাবা প্রদক্ষিণ করার সময় ইয়েমেনি কোণকে স্পর্শ করা যেতে পারে কিন্তু সেটির দিকে ইঙ্গিত করা কিংবা অভিবাদন করা ঠিক না। এটি শুধুমাত্র পবিত্র কালো পাথরকেই করা উচিত।

মুহাম্মাদের নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল। একবার আল-কাবা বন্যাকবলিত হয়। আল-কাবার অবস্থান একটি নিচু উপত্যকায়, পর্বতরাজির মাঝে। বন্যার ফলে কাবার কাঠামোতে ফাটল ধরে। তাই কুরাইশগণ কাবাকে পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন অনুভব করে। আল-কাবা মোট চার বা পাঁচবার পুনর্নির্মিত হয়েছে। ইবরাহীম এবং আদম—এই দুইজনের মধ্যে কে সর্বপ্রথম আল-কাবা নির্মাণ করেছিলেন তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে অধিকাংশের মতানুসারে ইবরাহীম-ই প্রথম তা নির্মাণ করেন।

যারা বলেন যে আদমই প্রথম নির্মাণকারী তারা এর পক্ষে কুরআনের যুক্তি পেশ করেন। কেননা কুরআনে বলা আছে, “এবং স্মরণ করো যখন ইবরাহীম ও ইসমাইল কাবার ভিত্তি উত্তোলন করেছিল, তখন তারা বলেছিল, হে আমাদের রব, আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহা শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।” (সূরা বাকারাহ, ২: ১২৭) তাঁরা বলেন যে, ইবরাহীম কাবাঘর গোড়া থেকে নির্মাণ করেননি, তিনি যা করেছিলেন তা হলো ভিত্তি উত্তোলন, অর্থাৎ সেখানে ইতিমধ্যে উত্তোলন করার মতো কিছু ছিল। তাই তাঁরা বলেন যে, নবী আদমের সময়েই আল-কাবার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু প্রচলিত বিশ্বাস এটাই যে ইবরাহীম আল-কাবা নির্মাণ করেছেন। তবে যে নবীই সর্বপ্রথম তা করুক না কেন আল-কাবার পবিত্রতা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই।

বেশ কয়েকজন নবী-রাসূল আল্লাহর ঘর পরিদর্শন করেছেন। হাদীস থেকে জানা যায়, হুদ, সালেহ এবং নূহ আল-কাবা পরিদর্শন করেছিলেন। এছাড়াও জানা যায় ঈসা যখন পুনরায় পৃথিবীর বুকে প্রত্যাবর্তন করবেন তখন তিনি হজ্ব করবেন। সুতরাং, এটি হয় আদম অথবা ইবরাহীম নির্মাণ করেছেন কিন্তু আল্লাহকে স্মরণের জন্য এটিই প্রথম নির্মিত ঘর। “নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত বরকতময় এবং বিশ্ববাসীর জন্য পথ প্রদর্শক।” (সূরা আল-ইমরান, ৩: ৯৬)

মক্কা বন্যাপ্লাবিত হওয়ায় কাবা ঘর দ্বিতীয়বার নির্মাণের প্রয়োজন হয়। কুরাইশগণ এটিকে পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছিল, তাই কাবা ঘরের পুরনো ইমারতটি ভেঙ্গে ফেলার প্রয়োজন পড়লো, কিন্তু তারা কেউই এই পদক্ষেপটি নিতে সাহস পাচ্ছিল না। তারা তাদের সব যন্ত্রপাতি নিয়ে আল-কাবার চারপাশে অপেক্ষা করছে, কিন্তু কেউই সামনে গিয়ে এটি ভাঙ্গার কাজটি শুরু করতে চাচ্ছিল না, সেই সময়ে মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও তারা আল-কাবাকে এতটা শ্রদ্ধা ও সম্মান করতো। তারা সত্যি সত্যিই আল্লাহকে ভয় পেত; তারা বিশ্বাস করতো যে এটি ভেঙ্গে ফেললে মারাত্মক বিপদ হতে পারে। অতঃপর তাদের মধ্যে একজন বললো যে, সে এই কাজটি শুরু করবে, তাই পরদিন ভোরে সে তার পুত্রদের নিয়ে আল-কাবার পাথরসমূহ সরাতে শুরু করলো আর বলতে থাকলো, 'হে আল্লাহ! তুমি ভয় পেয়ো না। আমরা তোমার ভালো চাই।'

এখানে লক্ষণীয়, আল্লাহ সম্পর্কে তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস—তারা ভাবত যে, এসব বলে তারা আল্লাহকে শান্ত করছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সবকিছু জানেন, মানুষ কোন কাজটা কেন করছে তা তাকে মুখে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তিনি অন্তরের খবর রাখেন। মক্কার মুশরিকরা আল্লাহকে বিশ্বাস করতো ঠিকই কিন্তু তাঁর গুণাবলিকে অনুধাবন করতে পারতো না।

এরপর আল-কাবার দেয়ালগুলোকে নামিয়ে ফেলা হয়। তখন মক্কার অদূরে অবস্থিত লোহিত সাগর বন্দরে রোমের একটি জাহাজ নোঙর করে। তারা সেই জাহাজের কিছু কাঠ নিয়ে আসে, ওই জাহাজে আগত এক রোমান নির্মাতার সাহায্যে আল-কাবার পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন করে। জাহাজ থেকে নিয়ে আসা ওই কাঠ দিয়েই প্রথমবারের মত আল-কাবার ছাদ নির্মিত হয়েছিল। কুরাইশগণ খুব ভালভাবেই জানত যে সুদের অর্থে ভালো কিছু নেই। আর তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে শুধুমাত্র হালাল অর্থ দিয়েই আল-কাবার নির্মাণকাজ সম্পাদিত হবে। সেই সময় পতিতাবৃত্তি বহুল প্রচলিত ব্যবসা হওয়া সত্ত্বেও তারা সুদ অথবা পতিতাবৃত্তি থেকে প্রাপ্ত অর্থ এই কাজে কোনোভাবেই ব্যবহার করবে না বলে মনস্থ করে। মানুষ সেই সময় থেকেই জানত যে এভাবে অর্জিত অর্থে কোনো কল্যাণ নেই অথচ তারপরেও তারা অর্থ উপার্জনের খাতিরে তাদের ক্রীতদাস মেয়েদেরকে দিয়ে পতিতাবৃত্তিসহ আরও বিভিন্ন রকম কাজ করাতো। অর্থের সংকুলান না হওয়ার কারণে তারা আল-কাবার একটি দিক কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল। কাবাকে আয়তাকার না বানিয়ে বর্গাকার বানিয়েছিল। কাবার যে অংশটি তারা আর বানাতে পারেনি সেই অংশটিই এখন আল-হিজর বলে পরিচিত। কাবার দুটো ফটক ছিল, তারা বানিয়েছিল একটি আর তারা এর দোরগোড়াকে উঁচু করে বানিয়েছিল, তাই এখন-কাবার দরজার কাছে যেতে হলে উপরে উঠতে হয়।

আল্লাহর রাসূল এক হাদীসে স্ত্রী আ'ইশাকে বলেন, 'তুমি কি জানো না যে তোমাদের সম্প্রদায়ের আল-কাবা নির্মাণের ব্যয় বহনের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল ছিল না? তোমাদের সম্প্রদায় নওমুসলিম না হলে অমি আল-কাবাকে ভেঙে এর পূর্ব ও পশ্চিমদিকে একটি করে দরজা নির্মাণ করতাম। আমি আল-হিজরকে আল-কাবার অন্তর্ভুক্ত করতাম।'

রাসূল মক্কাতে প্রবেশের পরপরই আল-কাবাকে তার প্রকৃত ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু এরপর তিনি আ'ইশাকে বলেন, 'আমি এই কাজটি করবো না শুধু এই কারণে যে কুরাইশরা সবেমাত্র মুসলিম হয়েছে। তাদের ইসলাম এখন ভঙ্গুর, ঈমান দুর্বল, আর এখন যদি অমি কাবাকে পুনর্নির্মাণ করি, তা তাদের অনুভূতিকে আঘাত করবে।'

রাসূলুল্লাহ কাবার পুনর্নির্মাণে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। কুরাইশরা কাবার পুনর্মাণের কাজ শুরু করার পর কালো পাথর বসানোর বিষয়টি সামনে এলে সমস্যা বেঁধে যায়। সবাই কালো পাথর যথাস্থানে রাখার মর্যাদা পেতে চায়। বনু আব্দুদ দার গোত্র তার সমস্ত লোকজনকে এক করে রক্তে পূর্ণ একটি পাত্র নিয়ে কাবার সামনে উপস্থিত হয়। পাত্রটি সবার সামনে রেখে তারা তাতে হাত ডুবিয়ে আবার হাত বের করে নেয়। এর দ্বারা তারা সবাইকে বুঝিয়ে দেয় যে, যদি তাদেরকে পবিত্র কালো পাথর হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে স্থাপনের সম্মান না দেয়া হয় তবে তারা এর জন্য যুদ্ধ করে মরতে প্রস্তুত। অন্যেরাও দমবার পাত্র ছিল না! এই দৃশ্য দেখে উল্টো আরেক গোত্র তাদের রক্তের পাত্র এনে একইভাবে যুদ্ধের অঙ্গীকার করে। অন্যান্য গোত্রও একই রকম অঙ্গীকার করলো। চার পাঁচদিন যাবত এই নিয়ে ঝগড়া চলতে থাকে। অবশেষে তাদের মধ্যকার বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি উমাইয়া বললেন, 'আসুন আমরা সকলে এই সিদ্ধান্তে সম্মত হই যে, আগামীকাল ভোরে মাসজিদুল হারামের দরজা দিয়ে যিনি প্রথম প্রবেশ করবেন তাঁর ফয়সালা আমরা সবাই মেনে নেব।'

পরদিন ভোরে মুহাম্মাদ সর্বপ্রথম মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করেন। তখন তারা সবাই দাঁড়িয়ে বলে, 'ইনি তো সত্যনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত! আমরা তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিলাম।' তারা মাসজিদুল হারামে প্রবেশকারী প্রথম ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব দিবে বলে সম্মত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ব্যক্তি মুহাম্মাদ হওয়ায় তারা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত ও খুশি হয়েছিল, কারণ তারা জানত যে, তিনি কখনোই পক্ষপাতিত্ব করবেন না। আর তাই তারা তাঁর হাতে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ন্যস্ত করেছিল।

রাসূলুল্লাহ তাদেরকে একটা চাদর আনতে বলেন। এরপর নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ উঠিয়ে তা সেই চাদরের মাঝখানে রাখেন। অতঃপর বিদ্যমান গোত্রসমূহের নেতাগণকে সেই চাদরের কিনারা ধরতে বলেন। তারা সবাই একই সময়ে চাদরটি উঁচিয়ে ধরলো; এভাবে প্রত্যেকটি গোত্রই পবিত্র কালো পাথর হাজরে আসওয়াদ উত্তোলনে অংশ নেয়। যখন তারা সবাই পাথরটি উঁচিয়ে ধরে তার নির্ধারিত জায়গায় নিয়ে যায় তখন মুহাম্মাদ তাঁর পবিত্র হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে স্থাপন করেন। অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহই হাজরে আসওয়াদকে তার নির্ধারিত জায়গায় স্থাপন করেন। এভাবে দ্বিতীয়বারের মতো কাবা নির্মিত হয়।

রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন যে, যদি কুরাইশরা সেই সময়ে নওমুসলিম না হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই আল-কাবাকে ইবরাহীমের দেওয়া ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণ করতেন। এর বেশ কয়েক বছর পর আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবায়ের মক্কার আমীর পদে আসীন হন। আ'ইশা তাঁর খালা হওয়ার সুবাদে তিনি এই হাদীস সম্পর্কে জানতেন। আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইরের মা আসমা বিনত আবি বকর ছিলেন আ'ইশার বোন। আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইর আল কাবাকে তার মূল ভিত্তির ওপর ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ তৎকালীন মুসলিমগণ পূর্বের ন্যায় আর নও মুসলিম ছিলেন না, তারা ততদিনে পরিণত হয়েছেন। আয যুবাইর তখন কাবাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন কারণ বনু উমাইয়্যাহর সাথে যুদ্ধে কাবায় একবার আগুন ধরে যায়। আল হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ আস সাক্বাফি মক্কা অবরোধ করেছিল, ওই সময় আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইর এবং বনু উমাইয়্যাহর মধ্যে সিরিয়াতে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আবু উমায়েরের সেনাবাহিনী প্রধান মক্কা অবরোধ করেছিল, তাদের নিক্ষিপ্ত গোলাবারুদের দ্বারা কাবা অগ্নিদগ্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ক্ষতিটুকু কাবার ইমারতকে না ভেঙেও মেরামত করা যেতো। কিন্তু আয যুবাইর এই পরিস্থিতির সুযোগ ব্যবহার করে কাবাকে তার মূল ভিত্তির উপর ফিরিয়ে আনেন। তিনি রাসূলুল্লাহর হাদীস অনুযায়ী কাবাকে পুনর্নির্মাণ করেন। রাসূলের ইচ্ছানুযায়ী কাবার দরজাকে নিচে নামিয়ে আনেন, পূর্ব ও পশ্চিম পার্শ্বে একটি করে দরজা নির্মাণ করেন এবং হিজরের দিকে কাবাকে প্রসারিত করেন।

আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইর সেই যুদ্ধে পরাজিত ও শহীদ হন। আল হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ মক্কা দখল করে। তৎকালীন খলিফা আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান রাসূলুল্লাহর সেই হাদীস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তাই তিনি কাবাকে আবার আবদুল্লাহ আয যুবাইরের আগে যেভাবে কুরাইশগণ নির্মাণ করেছিল, সেভাবে করার হুকুম জারি করেন। বনু উমাইয়্যাহর খিলাফাহর পর বনু আব্বাস খিলাফত লাভ করে, তারাই ছিল খলিফার রাজপরিবার। বনু আব্বাসের একজন খলিফা কাবাকে তার মূল ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণের কথা ভাবছিলেন। তিনি ইমাম মালিকের সাথে এই ব্যাপারে শলা-পরামর্শ করেন। ইমাম মালিক খলিফাকে বলেন, 'আমরা কাবাকে রাজা-রাজড়াদের হাতের পুতুলের মতো ক্ষণে ক্ষণে আকৃতি পরিবর্তনের পক্ষপাতী নই। যদিও এটিকে হযরত ইবরাহীমের দেওয়া ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণের কথা ও পরিকল্পনা রাসূলুল্লাহরও ছিল, কিন্তু এটা এভাবেই থাকুক এবং আমরা আর এর পরিবর্তন সাধন করবো না।' এটি ইমাম মালিকের দেওয়া একটি অন্যতম বিচক্ষণ পরামর্শ ছিল। খলিফাও সেটি তখন মেনে নিয়েছিলেন। বর্তমানে যে কাবা রয়েছে তা কুরাইশগণের ভিত্তির ওপরই নির্মিত।

আলহামদুলিল্লাহ, এতে ভালোই হয়েছে। যদি কাবাকে ইবরাহীমের দেওয়া তাঁর আসল ভিত্তির উপর নির্মাণ করা হতো, তাহলে মুসলিমরা কাবার অভ্যন্তরে ইবাদত করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো। কিন্তু যেহেতু এটাকে কমিয়ে ফেলা হয়েছিল, তাই অর্ধবৃত্ত দিয়ে ঘেরা অংশটি প্রকৃতপক্ষে কাবারই অংশ। তাই ওই অংশে ইবাদাত করা যেন কাবার অভ্যন্তরেই ইবাদত করা। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ কাবার অভ্যন্তরে ইবাদত করেছেন। সময়ের সাথে সাথে কাবার উচ্চতাকে বাড়ানো হয়েছে বটে কিন্তু এর জায়গার পরিবর্তন হয়নি। যে পাথরগুলো দিয়ে কাবা নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলো সেইসব পাথরের অবশিষ্টাংশ যা ইবরাহীম ব্যবহার করেছিলেন, তবে সবগুলো নয়, কিছু পাথর পরবর্তীতে কুরাইশ এবং অন্যেরা সংযোজন করেছে। এটিই সেই কালো পাথর যা ইবরাহীম ব্যবহার করেছিলেন। এই পাথরটি ঘিরে অনেক গল্প কাহিনি প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেন যে এটি জান্নাতে তৈরি হয়েছে। তিরমিযীর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, কালো পাথরটি আসলে সাদা ছিল যা পরবর্তীতে পাপী আদম সন্তানদের স্পর্শের কারণে কালো রঙ ধারণ করেছে। অন্য হাদীসে এসেছে এই পাথরটি স্পর্শ করলে গুনাহ মাফ হয়। এটি কাবার একমাত্র অংশ যাকে চুম্বন করা হয় এবং দূর থেকে যার দিকে ইঙ্গিত করা হয়। কেউ কেউ আবার ইয়েমেনি কোণের দিকেও ইঙ্গিত করে থাকে, কিন্তু তা সঠিক নয়। কাবা প্রদক্ষিণ করার সময় ইয়েমেনি কোণকে স্পর্শ করা যেতে পারে কিন্তু সেটির দিকে ইঙ্গিত করা কিংবা অভিবাদন করা ঠিক না। এটি শুধুমাত্র পবিত্র কালো পাথরকেই করা উচিত।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 শিক্ষা

📄 শিক্ষা


দাঈদেরকে সমসাময়িক মানুষদের মানসিকতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। রাসূল কাবার পুনর্নির্মাণ করতে আগ্রহী ছিলেন, তবু তিনি তা করেননি কারণ তিনি সেখানকার মানুষদের ঈমানে কোনোরূপ আঘাত করতে চাননি। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেছেন, 'তুমি যদি মানুষকে এমন কোনো কথা বলো যা তাদের বোধগম্য নয়, তাদের স্বল্পবুদ্ধি বা ঈমানের কারণে তা তারা বুঝতে পারে না, তখন তা তাদের জন্য ফিতনা হতে পারে।' এমন হতে পারে যে, একটি বিষয় সম্পূর্ণ সত্য এবং বৈধ—কিন্তু সেটা শোনার জন্য মানুষ এখনো প্রস্তুত নয়, তখন সে বিষয়ক তথ্য উল্টো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'তোমাদের সম্প্রদায় (কুরাইশ) আল-কাবার দরজা উঁচু করে নির্মাণ করেছে যাতে তারা কে এর ভিতরে গেল আর কে বের হলো তা তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।' এটি ছিল ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের একটি বিষয়। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'যদি আমি একে আবার বানাতাম তাহলে এর দরজাটি নিচু করে দিতাম আর দুইটি দরজা বানাতাম যাতে মানুষ একটি দিয়ে প্রবেশ করে অপরটি দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে।'

রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন যে, যদি কুরাইশরা সেই সময়ে নওমুসলিম না হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই আল-কাবাকে ইবরাহীমের দেওয়া ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণ করতেন। তিরমিযীর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, কালো পাথরটি আসলে সাদা ছিল যা পরবর্তীতে পাপী আদম সন্তানদের স্পর্শের কারণে কালো রঙ ধারণ করেছে।

দাঈদেরকে সমসাময়িক মানুষদের মানসিকতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। রাসূল কাবার পুনর্নির্মাণ করতে আগ্রহী ছিলেন, তবু তিনি তা করেননি কারণ তিনি সেখানকার মানুষদের ঈমানে কোনোরূপ আঘাত করতে চাননি। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেছেন, 'তুমি যদি মানুষকে এমন কোনো কথা বলো যা তাদের বোধগম্য নয়, তাদের স্বল্পবুদ্ধি বা ঈমানের কারণে তা তারা বুঝতে পারে না, তখন তা তাদের জন্য ফিতনা হতে পারে।' এমন হতে পারে যে, একটি বিষয় সম্পূর্ণ সত্য এবং বৈধ—কিন্তু সেটা শোনার জন্য মানুষ এখনো প্রস্তুত নয়, তখন সে বিষয়ক তথ্য উল্টো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'তোমাদের সম্প্রদায় (কুরাইশ) আল-কাবার দরজা উঁচু করে নির্মাণ করেছে যাতে তারা কে এর ভিতরে গেল আর কে বের হলো তা তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।' এটি ছিল ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের একটি বিষয়। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'যদি আমি একে আবার বানাতাম তাহলে এর দরজাটি নিচু করে দিতাম আর দুইটি দরজা বানাতাম যাতে মানুষ একটি দিয়ে প্রবেশ করে অপরটি দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে।'

রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন যে, যদি কুরাইশরা সেই সময়ে নওমুসলিম না হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই আল-কাবাকে ইবরাহীমের দেওয়া ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণ করতেন। তিরমিযীর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, কালো পাথরটি আসলে সাদা ছিল যা পরবর্তীতে পাপী আদম সন্তানদের স্পর্শের কারণে কালো রঙ ধারণ করেছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px