📄 খাদিজার ؓ অনন্যতা
খাদিজা বেঁচে থাকা অবস্থায় নবীজি আর কোনো বিয়ে করেননি। নবীজির বেঁচে থাকা সন্তানদের প্রত্যেকেই ছিলেন মা খাদিজার সন্তান। তাদের ছয় সন্তান—যায়নাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা, আল কাসিম আর আবদুল্লাহ। কেবল ফাতিমা বাদে বাকি সবাই নবীজির জীবদ্দশাতেই মারা যান। ফাতিমা ও আলী থেকেই নবীজির বংশের ধারা প্রবাহিত হয়। রাসূলুল্লাহ খাদিজাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। খাদিজার সাথে তাঁর বন্ধন, বিশ্বাস, প্রতিশ্রুতি মৃত্যুর পরেও ভাঙেনি। তিনি সবসময় তাঁকে মনে করতেন, তাঁর কথা বলতেন। আর এজন্য নবীজির অন্য স্ত্রীরা মৃত খাদিজাকে নিয়েও ঈর্ষা বোধ করতেন! তবুও নবীজিকে খাদিজার স্মরণ থেকে থামানো যেতো না। খাদিজার জন্য রাসূলুল্লাহর ভালোবাসা, আকর্ষণ, মমতা ও সম্মান ছিল সবচাইতে বেশি। কারণ তিনি খাদিজাকে সবসময় নিজের পাশে পেয়েছেন। যখন সবাই রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে কথা বলেছে, তখন সান্ত্বনা আর আশার কথা শুনিয়েছেন খাদিজা। তিনি নবীজিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন।
খাদিজার পর নবীজির সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী ছিলেন আ'ইশা। কিন্তু এই আ'ইশাও খাদিজার প্রতি ঈর্ষা বোধ করতেন। বুখারি ও মুসলিমের হাদীসে আছে যে, আ'ইশা বলেন, 'আমি খাদিজা ছাড়া নবীজির আর কোনো স্ত্রীকে নিয়ে এতটা ঈর্ষা অনুভব করিনি! এটা এজন্য নয় যে আমি তাকে কোনোদিন দেখিনি, বরং এটা এজন্য যে নবীজির তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। '
নবীজি মাঝে মাঝে একটা ভেড়া জবাই করে বলতেন, 'এই ভেড়ার মাংস খাদিজার বান্ধবীদের জন্য পাঠিয়ে দাও।' নবীজি যে কেবল খাদিজার নাম বারবার উল্লেখ করতেন তাই নয়, তিনি খাদিজা মারা হবার পরেও তাঁর বান্ধবীদের সাথে সৌহার্দ্য বজায় রেখেছেন। এটা তিনি করতেন খাদিজার প্রতি ভালোবাসা থেকে। এমনটা করতে দেখে আইশা বেশ ঈর্ষা বোধ করতেন, একদিন বলেই ফেললেন, 'শুধু খাদিজা আর খাদিজা!' তখন নবীজি বললেন, 'মহান আল্লাহ তাআলাই আমার অন্তরে খাদিজার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে দিয়েছেন। ' এই ভালোবাসার নিয়ন্ত্রণ রাসূলুল্লাহর হাতে ছিল না, এটা সম্পূর্ণ আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ তাআলাই তাঁর অন্তরে খাদিজার জন্য বিশেষ স্থান তৈরি করে দিয়েছেন।
ইমাম আহমাদ ও তিরমিযী থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে আছে, আ'ইশা বলেন, 'এমন অনেক দিন হয়েছে যে, খাদিজার প্রশংসা না করে নবীজি ঘর থেকে বের হোন নি! একদিন এভাবে তিনি খাদিজার প্রশংসা করছিলেন। আমি আর সহ্য করতে না পেরে বলে উঠলাম, 'তিনি কী এমন ছিলেন? তিনি তো একজন বয়স্ক মহিলা মাত্র। তাঁর চেয়েও উত্তম নারী দিয়ে কি আল্লাহ তাআলা আপনার স্ত্রীর স্থান পূরণ করে দেননি?' এ কথা শোনামাত্র নবীজি রেগে যান। রাগত স্বরে বলেন, 'না, আল্লাহর শপথ, তিনি খাদিজার চাইতে উত্তম আর কাউকেই আমার জীবনে আনেননি। যখন সবাই আমাকে অস্বীকার করেছে, তখন সে আমার ওপর আস্থা রেখেছে। যখন সবাই আমাকে মিথ্যুক ডেকেছে, তখন সে আমাকে বিশ্বাস করেছে। যখন সবাই আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন সে, তাঁর সবকিছু দিয়ে আমাকে স্বস্তি দিয়েছে। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে আমার ওপর রহমত দিয়েছেন, আমাকে তাঁর থেকে সন্তান দান করেছেন।'
কেউ খাদিজার বিরুদ্ধে টু শব্দ করামাত্র নবীজি রেগে যেতেন। নবীজির চরিত্রের এই দিকটি থেকে একটি ব্যাপার বোঝা যায়, আর তা হলো—আপন মানুষদের জন্য নবীজির কদর। তিনি সবসময় তাদেরকে বিশেষ স্থান দিয়েছেন। খাদিজা মারা যাবার বহুবছর পরেও তিনি তাঁকে স্মরণ করতেন। হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব, মুসআব ইবন উমাইর, খাদিজা—এদের সবাইকে তিনি স্মরণ করতেন। মৃত্যুর ঠিক আগে নবীজি একটি কাজ করেছিলেন। তিনি উহুদের শহীদ সাহাবাদের কবর যিয়ারত করতে যান। নবীজির ৭০ জন সঙ্গী সেই যুদ্ধে শহীদ হয়েছিল। তাই যখনই নবীজি বুঝতে পারেন যে, তাঁর হাতে আর বেশিদিন বাকি নেই, তিনি সেখানে গিয়ে তাদের সবার জন্য দুআ করলেন, এবং দুআর মাঝে বললেন, 'শীঘ্রই আমাদের দেখা হবে।'
নবীজি তাদেরকে অসম্ভব ভালোবাসতেন, নিজের পাশে তাদের অভাব অনুভব করতেন। তাই আল্লাহর কাছে দুআ করেন, যেন আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তাঁকে তাদের সাথে মিলিত করে দেন। তিনি তাঁর কোনো সঙ্গীকে ভুলে যাননি। তাদেরকে আজীবন স্মরণ রেখেছেন। তেমনি করেই মনে রেখেছেন নিজের স্ত্রী খাদিজার কথা, যিনি তাঁর দুঃসময়ের সঙ্গী। তিনি নিয়মিত খাদিজার জন্য দুআ চাইতেন, ঘুরেফিরে তাঁর কথাই বলতেন। খাদিজা আসলেই ছিলেন একজন বিশেষ ব্যক্তি। তিনি বেঁচে থাকতে একবার জিবরীল নবীজির কাছে এসে বললেন, 'এখন খাদিজা আপনার কাছে আসবেন। তিনি আপনার খাবার নিয়ে আসছেন। যখন তিনি আসবেন, তাঁকে বলবেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে সালাম দিয়েছেন। সেই সাথে বলবেন যে, আমিও তাঁকে সালাম জানিয়েছি।' খাদিজার মর্যাদা এতোটাই অসামান্য ছিল যে স্বয়ং আল্লাহ আযযা ওয়াজাল তাঁকে সালাম দেওয়ার জন্য জিবরীলকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর জিবরীল নিজের পক্ষ থেকেও তাঁকে সালাম জানিয়েছেন। এরপর জিবরীল বলেন, 'খাদিজাকে জান্নাতের বাড়ির সুসংবাদ দিন!'
খাদিজা হলেন জান্নাতী রমণী। পৃথিবীর বুকে সবচাইতে মর্যাদাসম্পন্ন চারজন নারীর একজন হলেন মা খাদিজা। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'দুনিয়ার মাঝে শ্রেষ্ঠ নারী চারজন। মারইয়াম বিনতে ইমরান, খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ এবং আসিয়া ইবন মুযাহিম।' এই চারজনের মাঝে সেরা হলেন, মারইয়াম। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল সূরা আলে-ইমরানে বলেন, "আর স্মরণ কর, যখন ফেরেশতারা বললো, হে মারইয়াম, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন ও পবিত্র করেছেন। আর তোমাকে বিশ্ব নারী সমাজের ঊর্ধ্বে মনোনীত করেছেন।" (সূরা আলে ইমরান, ৩: ৪২) এরপর দ্বিতীয় স্থানে আছেন খাদিজা। তারপর ফাতিমা এবং চার নম্বরে আসিয়া বিনতে মুযাহিম। এই চারজনের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো নবীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। এদের মাঝে দুইজন ছিলেন নবীদের মা বা নবীদের বড় করেছেন—মারইয়াম এবং আসিয়া। মারইয়াম ছিলেন নবী ঈসার মা আর আসিয়া নবী মূসাকে লালনপালন করেন। খাদিজা ছিলেন একজন নবীর স্ত্রী এবং ফাতিমা একজন নবীর কন্যা।
এই চার নারীর মধ্যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
এক, তাদের নিরেট ঈমান। তাদের ঈমান ছিল শক্তিশালী। অন্তর ছিল ঈমানে পরিপূর্ণ। আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাস এত দৃঢ় ছিল যে কোনোকিছুই হৃদয়ে সন্দেহের জন্ম দিতে পারতো না। তাদের প্রবল ঈমানকে টলাবার সাধ্য কারো ছিল না। তাদের ঈমান মূলত ইয়াকীনের পর্যায়ে ছিল। দেখা জগতের তুলনায় অদেখা জগৎটার প্রতিই তাদের বিশ্বাস ও আস্থা বেশি ছিল—যে গায়েবকে তারা কখনও দেখেননি বা শোনেননি, সেই "গায়েব” জগৎটাই ছিল তাদের বেশি প্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত। যেমন ফির'আউনের স্ত্রী আসিয়া, তাঁর কী-ই না ছিল! একজন নারী দুনিয়ার যা কিছু চাইতে পারে সে সবই তাঁর ছিল। সম্পদ, ক্ষমতা, 'টাকাওয়ালা' স্বামী, ফাই-ফরমাশ খাটার জন্য নিয়োজিত চাকর-চাকরানীর দল। অথচ তিনি এ সবকিছু আল্লাহর জন্য ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে চমৎকার এক স্থানে, রানীর হালে থাকার সুযোগ দিয়েছেন আর আসিয়া বলেছেন তিনি এসবের কিছুই চান না, তিনি চান কেবল জান্নাতের একটি ঘর। "আল্লাহ তাআলা মু'মিনদের জন্যে ফির'আউনের স্ত্রীর এক দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে বলেছিল, হে আমার রব, আপনার কাছে জান্নাতে আমার জন্যে একটি ঘর নির্মাণ করুন, আমাকে ফিরআরউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।” (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬: ১১) আসিয়া দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব চাননি। তিনি ফিরআউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে মুক্তি চেয়েছেন। এটাই দেখিয়ে দেয় তার ঈমান কত প্রবল, কত গভীর। অত্যন্ত নীতিহীন এবং কলুষিত সমাজের একজন বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তিনি এ সব কিছু থেকে নিজেকে পবিত্র রেখেছিলেন এবং তাঁর হৃদয়কে আল্লাহর সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন। বাকি তিন জন নারীর ক্ষেত্রেও তা বলা যায়।
দুই, তাদের সবার মধ্যে দ্বিতীয় যে বিষয়টি লক্ষ করা যায় তা হলো তারা প্রত্যেকে ছিলেন ভালো স্ত্রী বা ভালো মা। নারীবাদীরা এ বিষয়টি ভালো চোখে নাও দেখতে পারে। এই চার নারী কিন্তু তাদের ক্যারিয়ার, সংস্কার কার্যক্রম, আন্দোলন কিংবা জ্ঞানের কারণে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেননি। আসিয়া এবং মারইয়াম এই দুইজনের ঘরে প্রতিপালিত হয়েছিল দুই শ্রেষ্ঠ নবী, মূসা এবং ঈসা। খাদিজার অনন্যতার পেছনে রয়েছে তাঁর স্বামী নবী মুহাম্মাদের প্রতি তাঁর সর্বাত্মক সহযোগিতা ও সমর্থন। তিনি বড় ব্যবসায়ী ছিলেন সত্যি, তবে এজন্য তিনি শ্রেষ্ঠ নন, তিনি শ্রেষ্ঠ কারণ—যখনই প্রয়োজন হয়েছে, তখনই তিনি তাঁর স্বামীর পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁকে স্বস্তি দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে মা খাদিজা ছিলেন একজন চমৎকার স্ত্রী।
ফাতিমাও এমন একজন ব্যতিক্রমী স্ত্রী। একবার আলী শুনলেন রাসূল কিছু দাস পেয়েছেন, তিনি ও তাঁর স্ত্রী ভাবলেন নবীজির কাছে একটা দাস চাইবেন। নবীজিকে ঘরে পাওয়া গেল না, তারা মা আ'ইশার কাছে বিষয়টি জানিয়ে ফিরে আসেন। রাসূল ঘরে ফিরে সব কথা শুনলেন। আলী ও ফাতিমার বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। এই হাদীসটি আলী ইবন আবি তালিব নিজে বর্ণনা করেছেন, তাঁর ভাষায়— "নবীজি আমাদের ঘরে আসলেন। আমরা তখন শুয়ে ছিলাম। তাঁকে দেখামাত্র আমরা শোয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেলাম। রাসূল বললেন, যেমন ছিলে থাকো। তিনি এসে আমার আর ফাতিমার মাঝে বসলেন, আমরা দুজনেই তাঁর গা ঘেষে বিছানায় শুয়ে আছি।" রাসূল তাঁর মেয়ে ফাতিমাকে এত ভালবাসতেন যে তিনি একবার বলেছিলেন, 'ফাতিমা আমারই অংশ, কেউ যদি তাঁকে কষ্ট দেয়, সে আমাকেও কষ্ট দেয়। কেউ যদি তাঁকে আনন্দ দেয়, তাতে আমিও আনন্দিত হই।' রাসূলুল্লাহর সন্তানদের মধ্যে একমাত্র ফাতিমাই বেঁচে ছিলেন আর তিনি তাঁকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। তিনি তাঁর মেয়ের জন্য সবচেয়ে ভালোটাই চাইতেন। তিনি চাইলেই পারতেন একজন ভৃত্য তাদের ঘরে নিযুক্ত করতে, কিন্তু তিনি তা করেননি।
তিনি বললেন, "তোমাদের দেওয়ার জন্য দাস থেকেও ভালো কিছু আমার কাছে আছে। তোমরা রাতে ঘুমুবার আগে, সুবহানআল্লাহ তেত্রিশ বার, আলহামদুলিল্লাহ তেত্রিশ বার এবং আল্লাহু আকবর তেত্রিশ বার করে পড়বে। এটা তোমাদের জন্য একটা ভৃত্য রাখা অপেক্ষা উত্তম।" রাসূল জানতেন তাঁর কন্যা হচ্ছেন সেরাদেরও সেরা। তিনি জানতেন কাজ করতে করতে ফাতিমার হাতগুলো রুক্ষ হয়ে গিয়েছিল, তিনি জানতেন তাঁর হাতের চামড়াগুলো খসখসে হয়ে গিয়েছিল, তারপরেও তিনি তাঁকে তাসবীহ উপহার দিয়েছিলেন, ভৃত্য নয়। আলী ইবন আবি তালিবের থেকেই তাঁর স্ত্রীর বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, 'ফাতিমা খুবই কঠোর পরিশ্রম করতেন, যাঁতাকলে কাজ করার কারণে ওঁর হাত রুক্ষ, খসখসে হয়ে যায়। কুয়া থেকে পানি তুলতে তুলতে ওঁর ঘাড়ে দাগ পড়ে যেতো, ঘর পরিষ্কার করতে করতে ওঁর পোশাক ময়লা হয়ে পড়ত।' এই ছিল পৃথিবীর সেরা মানুষটির কন্যার অবস্থা। আর এর কারণেই তিনি ছিলেন চার সেরা নারীর একজন। জ্ঞান বা মেধার বিবেচনায় আ'ইশা ছিলেন খাদিজা ও ফাতিমার থেকে অনেক অনেক এগিয়ে, তথাপি তিনি ফাতিমা বা খাদিজার সমান সম্মাননা অর্জন করেননি।
টিকাঃ
১৪. তিরমিযী, অধ্যায় তাক্বওয়া এবং আত্বীয়দের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা, হাদীস ১২৩।
১৫. সহীহ মুসলিম অধ্যায় সাহাবিদের মর্যাদা, হাদীস ১০৮।
খাদিজা বেঁচে থাকা অবস্থায় নবীজি আর কোনো বিয়ে করেননি। নবীজির বেঁচে থাকা সন্তানদের প্রত্যেকেই ছিলেন মা খাদিজার সন্তান। তাদের ছয় সন্তান—যায়নাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা, আল কাসিম আর আবদুল্লাহ। কেবল ফাতিমা বাদে বাকি সবাই নবীজির জীবদ্দশাতেই মারা যান। ফাতিমা ও আলী থেকেই নবীজির বংশের ধারা প্রবাহিত হয়। রাসূলুল্লাহ খাদিজাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। খাদিজার সাথে তাঁর বন্ধন, বিশ্বাস, প্রতিশ্রুতি মৃত্যুর পরেও ভাঙেনি। তিনি সবসময় তাঁকে মনে করতেন, তাঁর কথা বলতেন। আর এজন্য নবীজির অন্য স্ত্রীরা মৃত খাদিজাকে নিয়েও ঈর্ষা বোধ করতেন! তবুও নবীজিকে খাদিজার স্মরণ থেকে থামানো যেতো না। খাদিজার জন্য রাসূলুল্লাহর ভালোবাসা, আকর্ষণ, মমতা ও সম্মান ছিল সবচাইতে বেশি। কারণ তিনি খাদিজাকে সবসময় নিজের পাশে পেয়েছেন। যখন সবাই রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে কথা বলেছে, তখন সান্ত্বনা আর আশার কথা শুনিয়েছেন খাদিজা। তিনি নবীজিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন।
খাদিজার পর নবীজির সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী ছিলেন আ'ইশা। কিন্তু এই আ'ইশাও খাদিজার প্রতি ঈর্ষা বোধ করতেন। বুখারি ও মুসলিমের হাদীসে আছে যে, আ'ইশা বলেন, 'আমি খাদিজা ছাড়া নবীজির আর কোনো স্ত্রীকে নিয়ে এতটা ঈর্ষা অনুভব করিনি! এটা এজন্য নয় যে আমি তাকে কোনোদিন দেখিনি, বরং এটা এজন্য যে নবীজির তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। '
নবীজি মাঝে মাঝে একটা ভেড়া জবাই করে বলতেন, 'এই ভেড়ার মাংস খাদিজার বান্ধবীদের জন্য পাঠিয়ে দাও।' নবীজি যে কেবল খাদিজার নাম বারবার উল্লেখ করতেন তাই নয়, তিনি খাদিজা মারা হবার পরেও তাঁর বান্ধবীদের সাথে সৌহার্দ্য বজায় রেখেছেন। এটা তিনি করতেন খাদিজার প্রতি ভালোবাসা থেকে। এমনটা করতে দেখে আইশা বেশ ঈর্ষা বোধ করতেন, একদিন বলেই ফেললেন, 'শুধু খাদিজা আর খাদিজা!' তখন নবীজি বললেন, 'মহান আল্লাহ তাআলাই আমার অন্তরে খাদিজার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে দিয়েছেন। ' এই ভালোবাসার নিয়ন্ত্রণ রাসূলুল্লাহর হাতে ছিল না, এটা সম্পূর্ণ আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ তাআলাই তাঁর অন্তরে খাদিজার জন্য বিশেষ স্থান তৈরি করে দিয়েছেন।
ইমাম আহমাদ ও তিরমিযী থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে আছে, আ'ইশা বলেন, 'এমন অনেক দিন হয়েছে যে, খাদিজার প্রশংসা না করে নবীজি ঘর থেকে বের হোন নি! একদিন এভাবে তিনি খাদিজার প্রশংসা করছিলেন। আমি আর সহ্য করতে না পেরে বলে উঠলাম, 'তিনি কী এমন ছিলেন? তিনি তো একজন বয়স্ক মহিলা মাত্র। তাঁর চেয়েও উত্তম নারী দিয়ে কি আল্লাহ তাআলা আপনার স্ত্রীর স্থান পূরণ করে দেননি?' এ কথা শোনামাত্র নবীজি রেগে যান। রাগত স্বরে বলেন, 'না, আল্লাহর শপথ, তিনি খাদিজার চাইতে উত্তম আর কাউকেই আমার জীবনে আনেননি। যখন সবাই আমাকে অস্বীকার করেছে, তখন সে আমার ওপর আস্থা রেখেছে। যখন সবাই আমাকে মিথ্যুক ডেকেছে, তখন সে আমাকে বিশ্বাস করেছে। যখন সবাই আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন সে, তাঁর সবকিছু দিয়ে আমাকে স্বস্তি দিয়েছে। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে আমার ওপর রহমত দিয়েছেন, আমাকে তাঁর থেকে সন্তান দান করেছেন।'
কেউ খাদিজার বিরুদ্ধে টু শব্দ করামাত্র নবীজি রেগে যেতেন। নবীজির চরিত্রের এই দিকটি থেকে একটি ব্যাপার বোঝা যায়, আর তা হলো—আপন মানুষদের জন্য নবীজির কদর। তিনি সবসময় তাদেরকে বিশেষ স্থান দিয়েছেন। খাদিজা মারা যাবার বহুবছর পরেও তিনি তাঁকে স্মরণ করতেন। হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব, মুসআব ইবন উমাইর, খাদিজা—এদের সবাইকে তিনি স্মরণ করতেন। মৃত্যুর ঠিক আগে নবীজি একটি কাজ করেছিলেন। তিনি উহুদের শহীদ সাহাবাদের কবর যিয়ারত করতে যান। নবীজির ৭০ জন সঙ্গী সেই যুদ্ধে শহীদ হয়েছিল। তাই যখনই নবীজি বুঝতে পারেন যে, তাঁর হাতে আর বেশিদিন বাকি নেই, তিনি সেখানে গিয়ে তাদের সবার জন্য দুআ করলেন, এবং দুআর মাঝে বললেন, 'শীঘ্রই আমাদের দেখা হবে।'
নবীজি তাদেরকে অসম্ভব ভালোবাসতেন, নিজের পাশে তাদের অভাব অনুভব করতেন। তাই আল্লাহর কাছে দুআ করেন, যেন আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তাঁকে তাদের সাথে মিলিত করে দেন। তিনি তাঁর কোনো সঙ্গীকে ভুলে যাননি। তাদেরকে আজীবন স্মরণ রেখেছেন। তেমনি করেই মনে রেখেছেন নিজের স্ত্রী খাদিজার কথা, যিনি তাঁর দুঃসময়ের সঙ্গী। তিনি নিয়মিত খাদিজার জন্য দুআ চাইতেন, ঘুরেফিরে তাঁর কথাই বলতেন। খাদিজা আসলেই ছিলেন একজন বিশেষ ব্যক্তি। তিনি বেঁচে থাকতে একবার জিবরীল নবীজির কাছে এসে বললেন, 'এখন খাদিজা আপনার কাছে আসবেন। তিনি আপনার খাবার নিয়ে আসছেন। যখন তিনি আসবেন, তাঁকে বলবেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে সালাম দিয়েছেন। সেই সাথে বলবেন যে, আমিও তাঁকে সালাম জানিয়েছি।' খাদিজার মর্যাদা এতোটাই অসামান্য ছিল যে স্বয়ং আল্লাহ আযযা ওয়াজাল তাঁকে সালাম দেওয়ার জন্য জিবরীলকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর জিবরীল নিজের পক্ষ থেকেও তাঁকে সালাম জানিয়েছেন। এরপর জিবরীল বলেন, 'খাদিজাকে জান্নাতের বাড়ির সুসংবাদ দিন!'
খাদিজা হলেন জান্নাতী রমণী। পৃথিবীর বুকে সবচাইতে মর্যাদাসম্পন্ন চারজন নারীর একজন হলেন মা খাদিজা। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'দুনিয়ার মাঝে শ্রেষ্ঠ নারী চারজন। মারইয়াম বিনতে ইমরান, খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ এবং আসিয়া ইবন মুযাহিম।' এই চারজনের মাঝে সেরা হলেন, মারইয়াম। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল সূরা আলে-ইমরানে বলেন, "আর স্মরণ কর, যখন ফেরেশতারা বললো, হে মারইয়াম, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন ও পবিত্র করেছেন। আর তোমাকে বিশ্ব নারী সমাজের ঊর্ধ্বে মনোনীত করেছেন।" (সূরা আলে ইমরান, ৩: ৪২) এরপর দ্বিতীয় স্থানে আছেন খাদিজা। তারপর ফাতিমা এবং চার নম্বরে আসিয়া বিনতে মুযাহিম। এই চারজনের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো নবীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। এদের মাঝে দুইজন ছিলেন নবীদের মা বা নবীদের বড় করেছেন—মারইয়াম এবং আসিয়া। মারইয়াম ছিলেন নবী ঈসার মা আর আসিয়া নবী মূসাকে লালনপালন করেন। খাদিজা ছিলেন একজন নবীর স্ত্রী এবং ফাতিমা একজন নবীর কন্যা।
এই চার নারীর মধ্যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
এক, তাদের নিরেট ঈমান। তাদের ঈমান ছিল শক্তিশালী। অন্তর ছিল ঈমানে পরিপূর্ণ। আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাস এত দৃঢ় ছিল যে কোনোকিছুই হৃদয়ে সন্দেহের জন্ম দিতে পারতো না। তাদের প্রবল ঈমানকে টলাবার সাধ্য কারো ছিল না। তাদের ঈমান মূলত ইয়াকীনের পর্যায়ে ছিল। দেখা জগতের তুলনায় অদেখা জগৎটার প্রতিই তাদের বিশ্বাস ও আস্থা বেশি ছিল—যে গায়েবকে তারা কখনও দেখেননি বা শোনেননি, সেই "গায়েব” জগৎটাই ছিল তাদের বেশি প্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত। যেমন ফির'আউনের স্ত্রী আসিয়া, তাঁর কী-ই না ছিল! একজন নারী দুনিয়ার যা কিছু চাইতে পারে সে সবই তাঁর ছিল। সম্পদ, ক্ষমতা, 'টাকাওয়ালা' স্বামী, ফাই-ফরমাশ খাটার জন্য নিয়োজিত চাকর-চাকরানীর দল। অথচ তিনি এ সবকিছু আল্লাহর জন্য ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে চমৎকার এক স্থানে, রানীর হালে থাকার সুযোগ দিয়েছেন আর আসিয়া বলেছেন তিনি এসবের কিছুই চান না, তিনি চান কেবল জান্নাতের একটি ঘর। "আল্লাহ তাআলা মু'মিনদের জন্যে ফির'আউনের স্ত্রীর এক দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে বলেছিল, হে আমার রব, আপনার কাছে জান্নাতে আমার জন্যে একটি ঘর নির্মাণ করুন, আমাকে ফিরআরউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।” (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬: ১১) আসিয়া দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব চাননি। তিনি ফিরআউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে মুক্তি চেয়েছেন। এটাই দেখিয়ে দেয় তার ঈমান কত প্রবল, কত গভীর। অত্যন্ত নীতিহীন এবং কলুষিত সমাজের একজন বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তিনি এ সব কিছু থেকে নিজেকে পবিত্র রেখেছিলেন এবং তাঁর হৃদয়কে আল্লাহর সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন। বাকি তিন জন নারীর ক্ষেত্রেও তা বলা যায়।
দুই, তাদের সবার মধ্যে দ্বিতীয় যে বিষয়টি লক্ষ করা যায় তা হলো তারা প্রত্যেকে ছিলেন ভালো স্ত্রী বা ভালো মা। নারীবাদীরা এ বিষয়টি ভালো চোখে নাও দেখতে পারে। এই চার নারী কিন্তু তাদের ক্যারিয়ার, সংস্কার কার্যক্রম, আন্দোলন কিংবা জ্ঞানের কারণে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেননি। আসিয়া এবং মারইয়াম এই দুইজনের ঘরে প্রতিপালিত হয়েছিল দুই শ্রেষ্ঠ নবী, মূসা এবং ঈসা। খাদিজার অনন্যতার পেছনে রয়েছে তাঁর স্বামী নবী মুহাম্মাদের প্রতি তাঁর সর্বাত্মক সহযোগিতা ও সমর্থন। তিনি বড় ব্যবসায়ী ছিলেন সত্যি, তবে এজন্য তিনি শ্রেষ্ঠ নন, তিনি শ্রেষ্ঠ কারণ—যখনই প্রয়োজন হয়েছে, তখনই তিনি তাঁর স্বামীর পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁকে স্বস্তি দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে মা খাদিজা ছিলেন একজন চমৎকার স্ত্রী।
ফাতিমাও এমন একজন ব্যতিক্রমী স্ত্রী। একবার আলী শুনলেন রাসূল কিছু দাস পেয়েছেন, তিনি ও তাঁর স্ত্রী ভাবলেন নবীজির কাছে একটা দাস চাইবেন। নবীজিকে ঘরে পাওয়া গেল না, তারা মা আ'ইশার কাছে বিষয়টি জানিয়ে ফিরে আসেন। রাসূল ঘরে ফিরে সব কথা শুনলেন। আলী ও ফাতিমার বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। এই হাদীসটি আলী ইবন আবি তালিব নিজে বর্ণনা করেছেন, তাঁর ভাষায়— "নবীজি আমাদের ঘরে আসলেন। আমরা তখন শুয়ে ছিলাম। তাঁকে দেখামাত্র আমরা শোয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেলাম। রাসূল বললেন, যেমন ছিলে থাকো। তিনি এসে আমার আর ফাতিমার মাঝে বসলেন, আমরা দুজনেই তাঁর গা ঘেষে বিছানায় শুয়ে আছি।" রাসূল তাঁর মেয়ে ফাতিমাকে এত ভালবাসতেন যে তিনি একবার বলেছিলেন, 'ফাতিমা আমারই অংশ, কেউ যদি তাঁকে কষ্ট দেয়, সে আমাকেও কষ্ট দেয়। কেউ যদি তাঁকে আনন্দ দেয়, তাতে আমিও আনন্দিত হই।' রাসূলুল্লাহর সন্তানদের মধ্যে একমাত্র ফাতিমাই বেঁচে ছিলেন আর তিনি তাঁকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। তিনি তাঁর মেয়ের জন্য সবচেয়ে ভালোটাই চাইতেন। তিনি চাইলেই পারতেন একজন ভৃত্য তাদের ঘরে নিযুক্ত করতে, কিন্তু তিনি তা করেননি।
তিনি বললেন, "তোমাদের দেওয়ার জন্য দাস থেকেও ভালো কিছু আমার কাছে আছে। তোমরা রাতে ঘুমুবার আগে, সুবহানআল্লাহ তেত্রিশ বার, আলহামদুলিল্লাহ তেত্রিশ বার এবং আল্লাহু আকবর তেত্রিশ বার করে পড়বে। এটা তোমাদের জন্য একটা ভৃত্য রাখা অপেক্ষা উত্তম।" রাসূল জানতেন তাঁর কন্যা হচ্ছেন সেরাদেরও সেরা। তিনি জানতেন কাজ করতে করতে ফাতিমার হাতগুলো রুক্ষ হয়ে গিয়েছিল, তিনি জানতেন তাঁর হাতের চামড়াগুলো খসখসে হয়ে গিয়েছিল, তারপরেও তিনি তাঁকে তাসবীহ উপহার দিয়েছিলেন, ভৃত্য নয়। আলী ইবন আবি তালিবের থেকেই তাঁর স্ত্রীর বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, 'ফাতিমা খুবই কঠোর পরিশ্রম করতেন, যাঁতাকলে কাজ করার কারণে ওঁর হাত রুক্ষ, খসখসে হয়ে যায়। কুয়া থেকে পানি তুলতে তুলতে ওঁর ঘাড়ে দাগ পড়ে যেতো, ঘর পরিষ্কার করতে করতে ওঁর পোশাক ময়লা হয়ে পড়ত।' এই ছিল পৃথিবীর সেরা মানুষটির কন্যার অবস্থা। আর এর কারণেই তিনি ছিলেন চার সেরা নারীর একজন। জ্ঞান বা মেধার বিবেচনায় আ'ইশা ছিলেন খাদিজা ও ফাতিমার থেকে অনেক অনেক এগিয়ে, তথাপি তিনি ফাতিমা বা খাদিজার সমান সম্মাননা অর্জন করেননি।
টিকাঃ
১৪. তিরমিযী, অধ্যায় তাক্বওয়া এবং আত্বীয়দের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা, হাদীস ১২৩।
১৫. সহীহ মুসলিম অধ্যায় সাহাবিদের মর্যাদা, হাদীস ১০৮।
📄 নবীজির ﷽ বৈবাহিক জীবন নিয়ে সমালোচনার জবাব
নবীজি প্রথম বিয়ে করেছিলেন পঁচিশ বছর বয়সে। ন্যায়নীতিহীন একটি সমাজে থেকেও এই পঁচিশ বছর পর্যন্ত তিনি সৎ ও পবিত্র হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। নবুওয়াত পাওয়ার আগেও তাঁর জীবনে নারীঘটিত কিছু ছিল না। কিন্তু ইসলামবিদ্বেষীরা নবীজির নামে নানারকম কুৎসা রটনা করেছে, তারা নবীজির বিয়েকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। আ'ইশাকে অল্পবয়সে বিয়ে করা, বারো জন স্ত্রী রাখা—এসব নিয়ে তারা নবীজিকে নিয়ে নানারকম অপবাদ দেয়। তাই রাসূলুল্লাহর বৈবাহিক জীবন সম্পর্কে মুসলিমদের সঠিক ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, নবীজির জীবনকালে মক্কার অবস্থা ছিল ভয়াবহ। নারী-পুরুষের মাঝে অবৈধ সম্পর্ক, মেলামেশা, ব্যভিচার এসব ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আ'ইশা থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে জানা যায় যে, সেই সময় নারী-পুরুষের মাঝে চার ধরনের সম্পর্ক প্রচলিত ছিল। একটা ছিল এখনকার সাধারণ বিয়ের মতো। দ্বিতীয় প্রকার ছিল পতিতাবৃত্তি—মক্কায় কিছু বাড়ির ওপর বিশেষ ধরনের চিহ্ন থাকতো, এগুলো ছিল পতিতালয়। তৃতীয় সম্পর্ক ছিল এমন, একজন নারী দশজন পুরুষের সাথে এক এক করে শয্যাশায়ী হবে, এরপর গর্ভধারণ করলে, তার ইচ্ছা মতো তাদের যেকোনো একজনের দিকে নির্দেশ করবে এবং সেই লোককেই বাচ্চার সমস্ত দায়দায়িত্ব গ্রহণ করে নিতে হবে। চতুর্থ ধরনের সম্পর্ক ছিল এমন, একজন লোক তার স্ত্রীকে অভিজাত ঘরের কোনো লোকের সাথে যিনা করার জন্য পাঠাবে, যাতে করে তাদের সন্তান উন্নত বংশের হয়। এরকম নীতিবিবর্জিত সমাজে থেকেও নবীজি নারীদের সাথে কোনো সম্পর্কে জড়াননি। পঁচিশ বছর পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন কুমার।
দ্বিতীয়ত, পঁচিশ বছর বয়সে এসে তিনি বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় এমন একজন নারীকে বেছে নেন, যিনি ছিলেন তাঁর চাইতে পনেরো বছরের বড়। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন একজন বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত মহিলা। নবীজি উচ্চবংশের যুবক ছিলেন, চাইলেই নিজের জন্য মক্কার যেকোনো নারীকে বাছাই করতে পারতেন। তিনি চাইলেই নিজের চেয়ে ছোট অল্প বয়সী কোনো তরুণীকে বিয়ে করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি এমন একজন নারীকে বিয়ে করলেন যিনি তার চেয়েও পনেরো বছরের বড়।
তৃতীয়ত, রাসূলুল্লাহ তাঁর প্রথম স্ত্রী খাদিজার সাথে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত সংসার করেন। একজন পুরুষ যুবক বয়স থেকে পঞ্চাশ বছর পর্যন্তই সাধারণত নারীদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। এই বয়সটাতে পুরুষের চাহিদা থাকে সর্বাধিক। কিন্তু নবীজি তাঁর পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত কেবলমাত্র এক স্ত্রী নিয়েই সংসার করেছেন। যতদিন পর্যন্ত খাদিজা বেঁচে ছিলেন, ততদিন অন্য কোনো বিয়ে করেননি এবং খাদিজাকে নিয়েই তিনি অত্যন্ত খুশি ছিলেন। সুতরাং নবীজি নারীদের ব্যাপারে দুর্বল বা তিনি নারীলোভী ছিলেন—এই ধরনের কথা শুধু ভিত্তিহীনই নয়, বরং নির্ভেজাল মিথ্যাচার।
চতুর্থত, খাদিজা মারা যাবারও দুই-তিন বছর পর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ একাই জীবনযাপন করেন। এর পর আরেকজন বিধবা, সাওদাহকে বিয়ে করেন। সাওদার স্বামী মারা যাওয়ায় তিনি তাঁকে বিয়ে করেন। সাওদাহ বেশ বয়স্ক ছিলেন। একটা সময় তিনি নবীজিকে তাঁর ভাগের রাতগুলো আ'ইশার সাথে কাটানোর অনুমতি দেন, এর কারণ ছিল তাঁর বার্ধক্য।
নবীজি এর পরবর্তীতে আরও কিছু বিয়ে করেন। তাঁর জীবনের শেষ দশ বছরেই তিনি বেশিরভাগ বিয়ে সম্পন্ন করেন। তিনি যখন মারা যান, তখন তাঁর নয়জন বিধবা স্ত্রী ছিল। প্রশ্ন আসতে পারে কেন নবীজি জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে এতগুলো বিয়ে করলেন, যখন নিজের যুবাবয়সে মাত্র একজন বিধবাকে বিয়ে করেই তিনি সুখী বিবাহিত জীবন লাভ করেছিলেন। শেষ বয়সে তাঁর এতগুলো বিয়ে করার কারণ কী?
প্রথমত, বিভিন্ন গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন। রাসূলুল্লাহর জীবনের মিশন ছিল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা, ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটানো। তিনি যা কিছুই করেছেন, এমনকি নিজের বৈবাহিক জীবনেও যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেগুলো কেবলমাত্র ইসলামের ভালোর কথা চিন্তা করেই নেওয়া। শুধুমাত্র নিজের খেয়ালখুশি বা চাহিদা মেটানোর জন্য কোনো কাজ করেননি। তিনি বেশ কিছু বিয়ে এই কারণেই করেছিলেন, যাতে করে অন্যান্য গোত্র ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয়। যেমন, জুওয়াইরিয়্যাহকে বিয়ে করার ফলস্বরূপ বনু মুসতালিক গোত্রের সবাই ইসলাম গ্রহণ করে।
দ্বিতীয়ত, সাহাবীদের দেখাশোনা করার জন্য—যেমন, সাওদাহকে বিয়ে করেছিলেন, সাওদাহ ছিলেন বিধবা।
তৃতীয়ত, ঘনিষ্ঠ সাহাবীদের সাথে সম্পর্ক আরো মজবুত করা। রাসূলুল্লাহর সাথে সাহাবীদের সম্পর্ক ছিল ভাইয়ের মতো। তিনি ইসলামের এই ভ্রাতৃত্বের সাথে পারিবারিক বন্ধন যুক্ত করে সম্পর্ক আরো মজবুত করতে চেয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ দুই সাহাবী আবু বকর ও উমারের মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। আর উসমানের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। যখন সেই মেয়ে মারা গেলেন, তখন আরেক মেয়েকেও উসমানের কাছে বিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনিও মারা যান। তখন নবীজি বলেন, 'আমার যদি আরো মেয়ে থাকতো, তাহলে আমি তাদেরকে একের পর এক করে উসমানের কাছেই বিয়ে দিতাম।' আলী ইবন আবি তালিবের সাথে তিনি ফাতিমার বিয়ে দেন। এমনি করে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ চার সাহাবীর সাথেই নবীজির পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।
চতুর্থত, দ্বীনের শিক্ষা পরিপূর্ণ করার জন্য নবীজির একাধিক বিয়ের প্রয়োজন ছিল। রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ জানা ও মানা মুসলিমদের কর্তব্য। দেশ পরিচালনা, শিক্ষকতা, ইমামতি, সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, স্বামীর দায়িত্ব প্রত্যেকটি বিষয়ে নবীজির সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে। তিনি আমীর হিসেবে কেমন ছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে কেমন ছিলেন, কিংবা শিক্ষক ও ইমাম হিসেবে কেমন ছিলেন—এগুলো বলার জন্য শত শত সাহাবী ছিলেন। কিন্তু নবীজির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কে জানাতে পারবে, এমন সাহাবির সংখ্যা নগণ্য। রাসূলুল্লাহর সন্তানদের মাঝেও একজন বাদে সবাই মারা যান। রাসূলুল্লাহর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় তাঁর স্ত্রীদের বর্ণনা থেকে।
নবীজির যদি কেবলমাত্র একজন স্ত্রী থাকতো, তাহলে অনেক সমস্যা হতো। একাধিক স্ত্রী থাকার কারণে অনেকগুলো সুবিধা হয়েছে। প্রথমত, একজনের পক্ষে সমস্ত খুঁটিনাটি ব্যাপার মনে করে রাখা খুব দুরূহ ব্যাপার। আর যদি কয়েকজন স্ত্রী থাকে, তখন একজন ভুলে গেলেও অন্য কেউ সে বিষয়টা স্মরণ করতে পারবেন। এছাড়াও যদি শুধুমাত্র একজন বর্ণনা করে, তাহলে তার কথাকে সহজেই বাতিল করে দেওয়া যায়, কেননা মাত্র একজন কথাগুলো বলছে, যার আর অন্য কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ নেই। একটা মাত্র উৎস হলে, তার বক্তব্য দুর্বল বলে প্রমাণ করে দিতে পারলেই সবগুলো হাদীসকে বাতিল করে দেওয়া যেতো। সেক্ষেত্রে তাঁর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে জানা অসম্ভব হয়ে পড়তো। কাফেররা সবসময় চায় ইসলামের উপর আঘাত হানতে। তারা আবু হুরাইরাকে ভুল প্রমাণ করার জন্য কতভাবে যে আক্রমণ করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। এর কারণ হলো, আবু হুরাইরাকে বাতিল প্রমাণ করতে পারলে তাঁর থেকে বর্ণিত পাঁচ হাজার হাদীসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেওয়া সম্ভব। নবীজির একাধিক স্ত্রী থাকায়, তাদের থেকে বর্ণিত হাদীসগুলোর সত্যতা আরো বেশি জোরালো হয়েছে।
রাসূলুল্লাহর পারিবারিক জীবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুন্নাহ সম্পর্কে অবহিত করে। আর এই সুন্নাহগুলো সবার জন্য প্রযোজ্য। সবাই শিক্ষক, ইমাম বা আমীর না হলেও প্রত্যেকেই একটি পরিবারের সদস্য। তাই পরিবারে রাসূল কীরূপ আচরণ করেছেন সেটা জানার গুরুত্ব অপরিসীম, আর সেটা একমাত্র স্ত্রীদের পক্ষেই জানানো সম্ভব। এই বিশাল পরিমাণ জ্ঞানের উৎস তাঁর স্ত্রীদের থেকে পাওয়া গেছে। তাদের বক্তব্য থেকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি ব্যাপার জানা সম্ভব হয়েছে। তিনি কীভাবে খেতেন, ঘুমোতেন, বসতেন, কীভাবে স্ত্রীদের সাথে রাত কাটাতেন, কীভাবে তাদের সাথে আচরণ করতেন, দাসদের সাথে তাঁর ব্যবহার কেমন ছিল, এসব বিষয়ে বহু হাদীস উম্মুল মুমিনীনদের মাধ্যমে জানা যায়।
আল্লাহ আযযা ওয়াজাল নবী মুহাম্মাদকে প্রেরণ করেছেন কুরআনের জীবন্ত প্রমাণ হিসেবে, ইসলামের শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে। তাই তাঁর সুন্নাহ সকলের কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। এই কারণেই তাঁকে সাধারণ নিয়ম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। চারজন বা কম সংখ্যক স্ত্রীর বদলে অধিক স্ত্রী দান করা হয়। এসবই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পরিকল্পনার অংশ। এভাবেই আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীনকে হেফাজত করেছেন এবং নবীজির সব সুন্নাহ পরবর্তী সকল প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
নবীজির যে দুটি বিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়, সে দুটি হলো আ'ইশা এবং যাইনাব বিনতে জাহশের সাথে বিয়ে। এই দুটো বিয়ের দিকেই লোকেরা সবচেয়ে বেশি আঙ্গুল তোলে। কারণ, আ'ইশার সাথে যখন নবীজির বিয়ে হয়, তখন আ'ইশার বয়স মাত্র ছয় বছর। এই বিয়ে পরিপূর্ণতা লাভ করে আ'ইশার বয়স নয় বছর হওয়ার পর। ওদিকে যাইনাবের সাথে নবীজির বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণ যাইনাব ছিল নবীজির পালক সন্তান যায়িদের স্ত্রী। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে বিয়েগুলো নিয়ে মানুষের মনে এত প্রশ্ন, ক্ষোভ, আপত্তি—সেই দুটো বিয়েই আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি আদেশপ্রাপ্ত ছিল। নবীজির অন্য কোনো বিয়ে ওয়াহীর মাধ্যমে নির্দেশিত ছিল না, শুধুমাত্র এই দুটি ছিল ব্যতিক্রম। সূরা আল আহযাবে আল্লাহ আযযা ওয়াজাল যাইনাবকে বিয়ে করার জন্য রাসূলুল্লাহকে নির্দেশ দেন, "অতঃপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলো, তখন আমি তাঁকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মু'মিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মু'মিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকরী হয়েই থাকে।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৭)
আ'ইশার সাথে বিয়ের নির্দেশও ওয়াহীর মাধ্যমে এসেছিল। নবীজি স্বপ্নে এই নির্দেশনা পান। সহীহ বুখারিতে এই স্বপ্নের কথা বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ আ'ইশাকে বলেছেন, 'জিবরীল আমার কাছে এলেন। আমি দেখতে পেলাম তুমি একটি সিল্কের কাপড়ে জড়ানো। যখন আমি কাপড়টি সরিয়ে তোমাকে দেখলাম, জিবরীল বললেন, এই হলো তোমার স্ত্রী—দুনিয়ায় এবং আখিরাতে।' নবীজি দু'বার একই স্বপ্ন দেখেন। নবী-রাসূলদের স্বপ্নও আল্লাহর পক্ষ থেকে ওয়াহী। অর্থাৎ এভাবেই আল্লাহ তাআলা নবীজিকে আ'ইশার সাথে বিয়ের নির্দেশ দেন।
আজকাল দুই ধরনের লোক নবীজির বিয়ে নিয়ে আক্রমণ করে, দুর্বল ঈমানের মুসলিম আর অমুসলিম। দুর্বল ঈমানের মুসলিমরা অবাক হয় এই ভেবে যে, নবীজি কীভাবে এমন কাজ করতে পারলেন? তাদের জন্য উত্তর হলো—এটা ছিল আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহ তাআলা যা-ই আদেশ দেন না কেন, একজন মুসলিম হিসেবে তা মেনে নিতে হবে, এটা নিয়ে সন্দেহ বা সংশয় প্রকাশ করলে কিংবা প্রশ্ন তুললে মুসলিম থাকা যাবে না। নবীজির সাথে আ'ইশার বিয়ে সাধারণ নিয়মের একটি ব্যতিক্রম, এটি সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। কিন্তু নবীজির জন্য এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত হুকুম ছিল। সুতরাং আল্লাহর ইচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন করার কোনো অধিকার একজন মুসলিমের নেই।
আর যেসব অমুসলিম নবীজির চরিত্র নিয়ে বাজে কথা বলে, তাদের মূল সমস্যা আসলে নবীজি ও আ'ইশার বিয়ে নিয়ে নয়। তাদের সমস্যা হচ্ছে, তারা মুহাম্মাদকে আল্লাহর রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করে না। আ'ইশার সাথে নবীজির বিয়ে একটি অজুহাত মাত্র। নবীজি যদি আ'ইশাকে বিয়ে নাও করতেন, তবুও এই ইসলাম বিদ্বেষীরা কোনো না কোনো বিষয় খুঁজে নিয়ে তাঁকে আক্রমণ করতো। কারণ তারা নবীজিকে আল্লাহর রাসূল হিসেবেই মানে না। তাই তাঁর সম্পর্কে ভুল ধরার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। অমুসলিমদের সাথে নবীজির বৈবাহিক জীবন নিয়ে তর্কে লিপ্ত হওয়াটাই তাই অর্থহীন। যখন মক্কার কুরাইশরা রাসূলুল্লাহকে নানাভাবে আক্রমণ করছিল, তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কিছু আয়াত নাযিল করেন, "তাদের কথাবার্তায় আপনার যে দুঃখ ও মনঃকষ্ট হয় তা আমি খুব ভালভাবেই জানি। কিন্তু তারা তো নিশ্চয়ই আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে না, বরং এই জালিমরা আল্লাহর আয়াতকেই অস্বীকার করে।" (সূরা আনআম, ৬: ৩৩)
তারা ব্যক্তি মুহাম্মাদকে অস্বীকার করেনি বরং তারা আল্লাহর বাণীকেই অস্বীকার করেছে। নবীজির সাথে তাদের আক্রমণাত্মক আচরণের কারণ ছিল এটাই যে তিনি আল্লাহর রাসূল। নবীজির চরিত্রের জন্য আসলে তারা তাঁকে আক্রমণ করে না, বরং নবীজি ইসলামের বার্তা প্রচারের মিশনে নেমেছেন দেখেই তাঁকে নিয়ে তাদের এতো ক্ষোভ। নবীজির সাথে আ'ইশার বিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। সত্যি বলতে, নবীজির সাথে আ'ইশার বিয়ে হওয়ার মধ্য দিয়ে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের ওপর অনেক বিশাল নিআমত দান করেছেন। যারা আ'ইশার অল্প বয়সে বিয়ে নিয়ে সংশয় পোষণ করে, তারা মূলত বুঝতেই পারে না যে, এই বিয়ে না হলে মুসলিম উম্মাহর ওপর কী দুর্যোগ আপতিত হতো! আ'ইশা ছিলেন একজন আলিমা, প্রচণ্ড মেধাশক্তির অধিকারী, অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও অনুসন্ধানী প্রকৃতির।
আ'ইশার বয়স খুব কম ছিল এবং রাসূলুল্লাহর সাথেও তাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুসুলভ, তাই তিনি নবীজিকে প্রশ্ন করতে পারতেন। কিন্তু অন্য সাহাবীরা নবীজির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান থেকে এভাবে প্রশ্ন করতে পারতেন না। এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন অবশ্যই ছিল, যে নবীজির কাছে তাঁর বক্তব্যগুলো নিয়ে জানতে চাইতে পারে। তাই আ'ইশার স্ত্রী হওয়াটা জরুরি ছিল। নবীজির এক সাহাবী, আমর ইবন আস বলেন, 'আমি নবীজির সাথে বছরের পর বছর একসাথে থেকেছি। কিন্তু তোমরা যদি আমাকে জিজ্ঞেস করো, রাসূলুল্লাহ দেখতে কেমন ছিলেন; আমি বলতে পারবো না। কারণ তাঁর প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধার কারণে আমি কখনো তাঁর চোখের দিকে সরাসরি তাকাইনি।' যেখানে নবীজির সাহাবীরা তাঁর দিকে তাকানোর পর্যন্ত সাহস পেতেন না, সেখানে আ'ইশা খুব খোলাখুলিভাবে নবীজির সাথে আলোচনা করার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে আ'ইশা অনেক বেশি শিখতে পেরেছিলেন। তিনি ইসলামের বড় মাপের আলিমদের একজন। সবচেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে তাঁর অবস্থান চতুর্থ। ইসলামের যেকোনো ফিকহের গ্রন্থে আ'ইশার উল্লেখ পাওয়া যাবে। সুতরাং নবীজির আ'ইশাকে বিয়ে করা সত্যিকার অর্থেই মুসলিম উম্মাহর জন্য অনেক বড় নিআমত।
আ'ইশা ব্যতীত রাসূলুল্লাহ আর কোনো কুমারী নারীকে বিয়ে করেননি। আর আ'ইশাই ছিলেন নবীজির একমাত্র কমবয়সী স্ত্রী। তিনি ছাড়া নবীজির বাকি সব স্ত্রী হয় বিধবা ছিলেন কিংবা তালাকপ্রাপ্তা, বয়সেও সবাই পূর্ণবয়স্ক ছিলেন। তাই আ'ইশার সাথে নবীজির বিবাহ ছিল একটি ব্যতিক্রমী বিয়ে।
নবীজি অন্যান্য যে বিয়েগুলো করেছিলেন, সেগুলোর প্রেক্ষাপটও জানা প্রয়োজন। উম্মে হাবিবা ছিলেন রাসূলুল্লাহর আরেকজন স্ত্রী। তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে আবিসিনিয়াতে হিজরত করেন। কিন্তু তাঁর স্বামী ইসলাম থেকে খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়, ফলে তাঁকে অনেক দুর্দশা আর কষ্টের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়। তিনি ছিলেন আবু সুফিয়ানের কন্যা। পরবর্তীতে তাঁর স্বামী মারা গেলে, রাসূলুল্লাহ আমর ইবন উমাইয়া আদ দামরীর মাধ্যমে নাজ্জাশির কাছে একটি চিঠি লিখে পাঠান। এই পত্রে লেখা ছিল যে, নাজ্জাশি যেন নবীজির সাথে উম্মে হাবিবার বিয়ের ব্যবস্থা করেন। উম্মে হাবিবাকে রাসূলুল্লাহ বিয়ে করেছিলেন তাঁর প্রতি সহানুভূতি থেকে। এই কারণে তিনি হাজারো মাইল দূরে থাকা সত্ত্বেও নবীজি তাঁকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর সকল দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন। আরেকটা কারণ ছিল, এই বিয়ের মাধ্যমে ইসলামের সবচেয়ে একগুঁয়ে শত্রু আবু সুফিয়ানকে ইসলামের কাছাকাছি নিয়ে আসা, ইসলামের প্রতি তাদের অবস্থানকে নমনীয় করে তোলা।
অদ্ভুত বিষয় হলো, ইসলামের ঘোরতর শত্রু হওয়া সত্ত্বেও আবু সুফিয়ান নবীজির সাথে নিজের মেয়ের বিয়ের কথা শুনে খুশি হয়ে ওঠে! সে বলে ওঠে, 'মুহাম্মাদের চেয়ে উত্তম আর কে আছে!' এর কারণ ছিল রাসূলুল্লাহর বংশমর্যাদা। বনু হাশিম গোত্রের একজন সদস্যের সাথে তার মেয়ের বিয়ে হয়েছে জেনে সে আনন্দিত হয়ে উঠেছিল। রাসূলুল্লাহর সাথে তার বিরোধ ছিল আদর্শিক বিরোধ, দ্বীন নিয়ে দ্বন্দ্ব, কিন্তু মুহাম্মাদ ছিলেন তাদের চাইতে অনেক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বংশের অধিকারী, তাই তিনি তার মত কম মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির মেয়েকে বিয়ে করায় তার অন্তর নরম হয়ে পড়ে।
আরেকটি বিয়ে ছিল উম্মে সালামার সাথে। তিনিও আবিসিনিয়াতে হিজরত করেছিলেন। এরপর তিনি মদীনায় হিজরত করেন। তাঁর স্বামী আবু সালামা মারা যাবার পরে নবীজি উম্মে সালামাকে বিয়ে করেন। এভাবে নবীজি মৃত সাহাবাদের স্ত্রীদেরকে বিয়ে করার মাধ্যমে তাদের দেখাশোনার ভার গ্রহণ করতেন। এইসব সাহাবিয়াত ছিলেন বয়স্কা, বৃদ্ধা নারী। এরপরও রাসূলুল্লাহ তাদেরকে বিয়ে করেছিলেন। মুহাম্মাদ হলেন মুসলিম উম্মাহর পিতা, মুসলিম উম্মাহর তত্ত্বাবধায়ক। সাহাবীদের সাথে রক্তের সম্পর্ক না থাকুক, তিনি ছিলেন তাদের সবচেয়ে আপনজন। সাহাবীদের ক্ষুধায়, তৃষ্ণায়, কষ্টে, প্রয়োজনে, দুঃসময়ে সবসময় পাশে থেকেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
নবীজি প্রথম বিয়ে করেছিলেন পঁচিশ বছর বয়সে। ন্যায়নীতিহীন একটি সমাজে থেকেও এই পঁচিশ বছর পর্যন্ত তিনি সৎ ও পবিত্র হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। নবুওয়াত পাওয়ার আগেও তাঁর জীবনে নারীঘটিত কিছু ছিল না। কিন্তু ইসলামবিদ্বেষীরা নবীজির নামে নানারকম কুৎসা রটনা করেছে, তারা নবীজির বিয়েকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে। আ'ইশাকে অল্পবয়সে বিয়ে করা, বারো জন স্ত্রী রাখা—এসব নিয়ে তারা নবীজিকে নিয়ে নানারকম অপবাদ দেয়। তাই রাসূলুল্লাহর বৈবাহিক জীবন সম্পর্কে মুসলিমদের সঠিক ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, নবীজির জীবনকালে মক্কার অবস্থা ছিল ভয়াবহ। নারী-পুরুষের মাঝে অবৈধ সম্পর্ক, মেলামেশা, ব্যভিচার এসব ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আ'ইশা থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে জানা যায় যে, সেই সময় নারী-পুরুষের মাঝে চার ধরনের সম্পর্ক প্রচলিত ছিল। একটা ছিল এখনকার সাধারণ বিয়ের মতো। দ্বিতীয় প্রকার ছিল পতিতাবৃত্তি—মক্কায় কিছু বাড়ির ওপর বিশেষ ধরনের চিহ্ন থাকতো, এগুলো ছিল পতিতালয়। তৃতীয় সম্পর্ক ছিল এমন, একজন নারী দশজন পুরুষের সাথে এক এক করে শয্যাশায়ী হবে, এরপর গর্ভধারণ করলে, তার ইচ্ছা মতো তাদের যেকোনো একজনের দিকে নির্দেশ করবে এবং সেই লোককেই বাচ্চার সমস্ত দায়দায়িত্ব গ্রহণ করে নিতে হবে। চতুর্থ ধরনের সম্পর্ক ছিল এমন, একজন লোক তার স্ত্রীকে অভিজাত ঘরের কোনো লোকের সাথে যিনা করার জন্য পাঠাবে, যাতে করে তাদের সন্তান উন্নত বংশের হয়। এরকম নীতিবিবর্জিত সমাজে থেকেও নবীজি নারীদের সাথে কোনো সম্পর্কে জড়াননি। পঁচিশ বছর পর্যন্ত তিনি ছিলেন একজন কুমার।
দ্বিতীয়ত, পঁচিশ বছর বয়সে এসে তিনি বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় এমন একজন নারীকে বেছে নেন, যিনি ছিলেন তাঁর চাইতে পনেরো বছরের বড়। শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন একজন বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত মহিলা। নবীজি উচ্চবংশের যুবক ছিলেন, চাইলেই নিজের জন্য মক্কার যেকোনো নারীকে বাছাই করতে পারতেন। তিনি চাইলেই নিজের চেয়ে ছোট অল্প বয়সী কোনো তরুণীকে বিয়ে করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি এমন একজন নারীকে বিয়ে করলেন যিনি তার চেয়েও পনেরো বছরের বড়।
তৃতীয়ত, রাসূলুল্লাহ তাঁর প্রথম স্ত্রী খাদিজার সাথে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত সংসার করেন। একজন পুরুষ যুবক বয়স থেকে পঞ্চাশ বছর পর্যন্তই সাধারণত নারীদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। এই বয়সটাতে পুরুষের চাহিদা থাকে সর্বাধিক। কিন্তু নবীজি তাঁর পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত কেবলমাত্র এক স্ত্রী নিয়েই সংসার করেছেন। যতদিন পর্যন্ত খাদিজা বেঁচে ছিলেন, ততদিন অন্য কোনো বিয়ে করেননি এবং খাদিজাকে নিয়েই তিনি অত্যন্ত খুশি ছিলেন। সুতরাং নবীজি নারীদের ব্যাপারে দুর্বল বা তিনি নারীলোভী ছিলেন—এই ধরনের কথা শুধু ভিত্তিহীনই নয়, বরং নির্ভেজাল মিথ্যাচার।
চতুর্থত, খাদিজা মারা যাবারও দুই-তিন বছর পর পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ একাই জীবনযাপন করেন। এর পর আরেকজন বিধবা, সাওদাহকে বিয়ে করেন। সাওদার স্বামী মারা যাওয়ায় তিনি তাঁকে বিয়ে করেন। সাওদাহ বেশ বয়স্ক ছিলেন। একটা সময় তিনি নবীজিকে তাঁর ভাগের রাতগুলো আ'ইশার সাথে কাটানোর অনুমতি দেন, এর কারণ ছিল তাঁর বার্ধক্য।
নবীজি এর পরবর্তীতে আরও কিছু বিয়ে করেন। তাঁর জীবনের শেষ দশ বছরেই তিনি বেশিরভাগ বিয়ে সম্পন্ন করেন। তিনি যখন মারা যান, তখন তাঁর নয়জন বিধবা স্ত্রী ছিল। প্রশ্ন আসতে পারে কেন নবীজি জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে এতগুলো বিয়ে করলেন, যখন নিজের যুবাবয়সে মাত্র একজন বিধবাকে বিয়ে করেই তিনি সুখী বিবাহিত জীবন লাভ করেছিলেন। শেষ বয়সে তাঁর এতগুলো বিয়ে করার কারণ কী?
প্রথমত, বিভিন্ন গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন। রাসূলুল্লাহর জীবনের মিশন ছিল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা, ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটানো। তিনি যা কিছুই করেছেন, এমনকি নিজের বৈবাহিক জীবনেও যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেগুলো কেবলমাত্র ইসলামের ভালোর কথা চিন্তা করেই নেওয়া। শুধুমাত্র নিজের খেয়ালখুশি বা চাহিদা মেটানোর জন্য কোনো কাজ করেননি। তিনি বেশ কিছু বিয়ে এই কারণেই করেছিলেন, যাতে করে অন্যান্য গোত্র ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হয়। যেমন, জুওয়াইরিয়্যাহকে বিয়ে করার ফলস্বরূপ বনু মুসতালিক গোত্রের সবাই ইসলাম গ্রহণ করে।
দ্বিতীয়ত, সাহাবীদের দেখাশোনা করার জন্য—যেমন, সাওদাহকে বিয়ে করেছিলেন, সাওদাহ ছিলেন বিধবা।
তৃতীয়ত, ঘনিষ্ঠ সাহাবীদের সাথে সম্পর্ক আরো মজবুত করা। রাসূলুল্লাহর সাথে সাহাবীদের সম্পর্ক ছিল ভাইয়ের মতো। তিনি ইসলামের এই ভ্রাতৃত্বের সাথে পারিবারিক বন্ধন যুক্ত করে সম্পর্ক আরো মজবুত করতে চেয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ দুই সাহাবী আবু বকর ও উমারের মেয়েকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। আর উসমানের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। যখন সেই মেয়ে মারা গেলেন, তখন আরেক মেয়েকেও উসমানের কাছে বিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনিও মারা যান। তখন নবীজি বলেন, 'আমার যদি আরো মেয়ে থাকতো, তাহলে আমি তাদেরকে একের পর এক করে উসমানের কাছেই বিয়ে দিতাম।' আলী ইবন আবি তালিবের সাথে তিনি ফাতিমার বিয়ে দেন। এমনি করে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ চার সাহাবীর সাথেই নবীজির পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।
চতুর্থত, দ্বীনের শিক্ষা পরিপূর্ণ করার জন্য নবীজির একাধিক বিয়ের প্রয়োজন ছিল। রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ জানা ও মানা মুসলিমদের কর্তব্য। দেশ পরিচালনা, শিক্ষকতা, ইমামতি, সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, স্বামীর দায়িত্ব প্রত্যেকটি বিষয়ে নবীজির সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে। তিনি আমীর হিসেবে কেমন ছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে কেমন ছিলেন, কিংবা শিক্ষক ও ইমাম হিসেবে কেমন ছিলেন—এগুলো বলার জন্য শত শত সাহাবী ছিলেন। কিন্তু নবীজির ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কে জানাতে পারবে, এমন সাহাবির সংখ্যা নগণ্য। রাসূলুল্লাহর সন্তানদের মাঝেও একজন বাদে সবাই মারা যান। রাসূলুল্লাহর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় তাঁর স্ত্রীদের বর্ণনা থেকে।
নবীজির যদি কেবলমাত্র একজন স্ত্রী থাকতো, তাহলে অনেক সমস্যা হতো। একাধিক স্ত্রী থাকার কারণে অনেকগুলো সুবিধা হয়েছে। প্রথমত, একজনের পক্ষে সমস্ত খুঁটিনাটি ব্যাপার মনে করে রাখা খুব দুরূহ ব্যাপার। আর যদি কয়েকজন স্ত্রী থাকে, তখন একজন ভুলে গেলেও অন্য কেউ সে বিষয়টা স্মরণ করতে পারবেন। এছাড়াও যদি শুধুমাত্র একজন বর্ণনা করে, তাহলে তার কথাকে সহজেই বাতিল করে দেওয়া যায়, কেননা মাত্র একজন কথাগুলো বলছে, যার আর অন্য কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ নেই। একটা মাত্র উৎস হলে, তার বক্তব্য দুর্বল বলে প্রমাণ করে দিতে পারলেই সবগুলো হাদীসকে বাতিল করে দেওয়া যেতো। সেক্ষেত্রে তাঁর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে জানা অসম্ভব হয়ে পড়তো। কাফেররা সবসময় চায় ইসলামের উপর আঘাত হানতে। তারা আবু হুরাইরাকে ভুল প্রমাণ করার জন্য কতভাবে যে আক্রমণ করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। এর কারণ হলো, আবু হুরাইরাকে বাতিল প্রমাণ করতে পারলে তাঁর থেকে বর্ণিত পাঁচ হাজার হাদীসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেওয়া সম্ভব। নবীজির একাধিক স্ত্রী থাকায়, তাদের থেকে বর্ণিত হাদীসগুলোর সত্যতা আরো বেশি জোরালো হয়েছে।
রাসূলুল্লাহর পারিবারিক জীবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সুন্নাহ সম্পর্কে অবহিত করে। আর এই সুন্নাহগুলো সবার জন্য প্রযোজ্য। সবাই শিক্ষক, ইমাম বা আমীর না হলেও প্রত্যেকেই একটি পরিবারের সদস্য। তাই পরিবারে রাসূল কীরূপ আচরণ করেছেন সেটা জানার গুরুত্ব অপরিসীম, আর সেটা একমাত্র স্ত্রীদের পক্ষেই জানানো সম্ভব। এই বিশাল পরিমাণ জ্ঞানের উৎস তাঁর স্ত্রীদের থেকে পাওয়া গেছে। তাদের বক্তব্য থেকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি ব্যাপার জানা সম্ভব হয়েছে। তিনি কীভাবে খেতেন, ঘুমোতেন, বসতেন, কীভাবে স্ত্রীদের সাথে রাত কাটাতেন, কীভাবে তাদের সাথে আচরণ করতেন, দাসদের সাথে তাঁর ব্যবহার কেমন ছিল, এসব বিষয়ে বহু হাদীস উম্মুল মুমিনীনদের মাধ্যমে জানা যায়।
আল্লাহ আযযা ওয়াজাল নবী মুহাম্মাদকে প্রেরণ করেছেন কুরআনের জীবন্ত প্রমাণ হিসেবে, ইসলামের শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে। তাই তাঁর সুন্নাহ সকলের কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। এই কারণেই তাঁকে সাধারণ নিয়ম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। চারজন বা কম সংখ্যক স্ত্রীর বদলে অধিক স্ত্রী দান করা হয়। এসবই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পরিকল্পনার অংশ। এভাবেই আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীনকে হেফাজত করেছেন এবং নবীজির সব সুন্নাহ পরবর্তী সকল প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
নবীজির যে দুটি বিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়, সে দুটি হলো আ'ইশা এবং যাইনাব বিনতে জাহশের সাথে বিয়ে। এই দুটো বিয়ের দিকেই লোকেরা সবচেয়ে বেশি আঙ্গুল তোলে। কারণ, আ'ইশার সাথে যখন নবীজির বিয়ে হয়, তখন আ'ইশার বয়স মাত্র ছয় বছর। এই বিয়ে পরিপূর্ণতা লাভ করে আ'ইশার বয়স নয় বছর হওয়ার পর। ওদিকে যাইনাবের সাথে নবীজির বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণ যাইনাব ছিল নবীজির পালক সন্তান যায়িদের স্ত্রী। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে বিয়েগুলো নিয়ে মানুষের মনে এত প্রশ্ন, ক্ষোভ, আপত্তি—সেই দুটো বিয়েই আল্লাহর পক্ষ থেকে সরাসরি আদেশপ্রাপ্ত ছিল। নবীজির অন্য কোনো বিয়ে ওয়াহীর মাধ্যমে নির্দেশিত ছিল না, শুধুমাত্র এই দুটি ছিল ব্যতিক্রম। সূরা আল আহযাবে আল্লাহ আযযা ওয়াজাল যাইনাবকে বিয়ে করার জন্য রাসূলুল্লাহকে নির্দেশ দেন, "অতঃপর যায়েদ যখন যয়নবের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলো, তখন আমি তাঁকে আপনার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করলাম যাতে মু'মিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলে সেসব স্ত্রীকে বিবাহ করার ব্যাপারে মু'মিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকরী হয়েই থাকে।” (সূরা আহযাব, ৩৩: ৩৭)
আ'ইশার সাথে বিয়ের নির্দেশও ওয়াহীর মাধ্যমে এসেছিল। নবীজি স্বপ্নে এই নির্দেশনা পান। সহীহ বুখারিতে এই স্বপ্নের কথা বর্ণিত আছে। রাসূলুল্লাহ আ'ইশাকে বলেছেন, 'জিবরীল আমার কাছে এলেন। আমি দেখতে পেলাম তুমি একটি সিল্কের কাপড়ে জড়ানো। যখন আমি কাপড়টি সরিয়ে তোমাকে দেখলাম, জিবরীল বললেন, এই হলো তোমার স্ত্রী—দুনিয়ায় এবং আখিরাতে।' নবীজি দু'বার একই স্বপ্ন দেখেন। নবী-রাসূলদের স্বপ্নও আল্লাহর পক্ষ থেকে ওয়াহী। অর্থাৎ এভাবেই আল্লাহ তাআলা নবীজিকে আ'ইশার সাথে বিয়ের নির্দেশ দেন।
আজকাল দুই ধরনের লোক নবীজির বিয়ে নিয়ে আক্রমণ করে, দুর্বল ঈমানের মুসলিম আর অমুসলিম। দুর্বল ঈমানের মুসলিমরা অবাক হয় এই ভেবে যে, নবীজি কীভাবে এমন কাজ করতে পারলেন? তাদের জন্য উত্তর হলো—এটা ছিল আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহ তাআলা যা-ই আদেশ দেন না কেন, একজন মুসলিম হিসেবে তা মেনে নিতে হবে, এটা নিয়ে সন্দেহ বা সংশয় প্রকাশ করলে কিংবা প্রশ্ন তুললে মুসলিম থাকা যাবে না। নবীজির সাথে আ'ইশার বিয়ে সাধারণ নিয়মের একটি ব্যতিক্রম, এটি সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। কিন্তু নবীজির জন্য এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত হুকুম ছিল। সুতরাং আল্লাহর ইচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন করার কোনো অধিকার একজন মুসলিমের নেই।
আর যেসব অমুসলিম নবীজির চরিত্র নিয়ে বাজে কথা বলে, তাদের মূল সমস্যা আসলে নবীজি ও আ'ইশার বিয়ে নিয়ে নয়। তাদের সমস্যা হচ্ছে, তারা মুহাম্মাদকে আল্লাহর রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করে না। আ'ইশার সাথে নবীজির বিয়ে একটি অজুহাত মাত্র। নবীজি যদি আ'ইশাকে বিয়ে নাও করতেন, তবুও এই ইসলাম বিদ্বেষীরা কোনো না কোনো বিষয় খুঁজে নিয়ে তাঁকে আক্রমণ করতো। কারণ তারা নবীজিকে আল্লাহর রাসূল হিসেবেই মানে না। তাই তাঁর সম্পর্কে ভুল ধরার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। অমুসলিমদের সাথে নবীজির বৈবাহিক জীবন নিয়ে তর্কে লিপ্ত হওয়াটাই তাই অর্থহীন। যখন মক্কার কুরাইশরা রাসূলুল্লাহকে নানাভাবে আক্রমণ করছিল, তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কিছু আয়াত নাযিল করেন, "তাদের কথাবার্তায় আপনার যে দুঃখ ও মনঃকষ্ট হয় তা আমি খুব ভালভাবেই জানি। কিন্তু তারা তো নিশ্চয়ই আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে না, বরং এই জালিমরা আল্লাহর আয়াতকেই অস্বীকার করে।" (সূরা আনআম, ৬: ৩৩)
তারা ব্যক্তি মুহাম্মাদকে অস্বীকার করেনি বরং তারা আল্লাহর বাণীকেই অস্বীকার করেছে। নবীজির সাথে তাদের আক্রমণাত্মক আচরণের কারণ ছিল এটাই যে তিনি আল্লাহর রাসূল। নবীজির চরিত্রের জন্য আসলে তারা তাঁকে আক্রমণ করে না, বরং নবীজি ইসলামের বার্তা প্রচারের মিশনে নেমেছেন দেখেই তাঁকে নিয়ে তাদের এতো ক্ষোভ। নবীজির সাথে আ'ইশার বিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। সত্যি বলতে, নবীজির সাথে আ'ইশার বিয়ে হওয়ার মধ্য দিয়ে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের ওপর অনেক বিশাল নিআমত দান করেছেন। যারা আ'ইশার অল্প বয়সে বিয়ে নিয়ে সংশয় পোষণ করে, তারা মূলত বুঝতেই পারে না যে, এই বিয়ে না হলে মুসলিম উম্মাহর ওপর কী দুর্যোগ আপতিত হতো! আ'ইশা ছিলেন একজন আলিমা, প্রচণ্ড মেধাশক্তির অধিকারী, অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও অনুসন্ধানী প্রকৃতির।
আ'ইশার বয়স খুব কম ছিল এবং রাসূলুল্লাহর সাথেও তাঁর সম্পর্ক ছিল বন্ধুসুলভ, তাই তিনি নবীজিকে প্রশ্ন করতে পারতেন। কিন্তু অন্য সাহাবীরা নবীজির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান থেকে এভাবে প্রশ্ন করতে পারতেন না। এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন অবশ্যই ছিল, যে নবীজির কাছে তাঁর বক্তব্যগুলো নিয়ে জানতে চাইতে পারে। তাই আ'ইশার স্ত্রী হওয়াটা জরুরি ছিল। নবীজির এক সাহাবী, আমর ইবন আস বলেন, 'আমি নবীজির সাথে বছরের পর বছর একসাথে থেকেছি। কিন্তু তোমরা যদি আমাকে জিজ্ঞেস করো, রাসূলুল্লাহ দেখতে কেমন ছিলেন; আমি বলতে পারবো না। কারণ তাঁর প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধার কারণে আমি কখনো তাঁর চোখের দিকে সরাসরি তাকাইনি।' যেখানে নবীজির সাহাবীরা তাঁর দিকে তাকানোর পর্যন্ত সাহস পেতেন না, সেখানে আ'ইশা খুব খোলাখুলিভাবে নবীজির সাথে আলোচনা করার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে আ'ইশা অনেক বেশি শিখতে পেরেছিলেন। তিনি ইসলামের বড় মাপের আলিমদের একজন। সবচেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে তাঁর অবস্থান চতুর্থ। ইসলামের যেকোনো ফিকহের গ্রন্থে আ'ইশার উল্লেখ পাওয়া যাবে। সুতরাং নবীজির আ'ইশাকে বিয়ে করা সত্যিকার অর্থেই মুসলিম উম্মাহর জন্য অনেক বড় নিআমত।
আ'ইশা ব্যতীত রাসূলুল্লাহ আর কোনো কুমারী নারীকে বিয়ে করেননি। আর আ'ইশাই ছিলেন নবীজির একমাত্র কমবয়সী স্ত্রী। তিনি ছাড়া নবীজির বাকি সব স্ত্রী হয় বিধবা ছিলেন কিংবা তালাকপ্রাপ্তা, বয়সেও সবাই পূর্ণবয়স্ক ছিলেন। তাই আ'ইশার সাথে নবীজির বিবাহ ছিল একটি ব্যতিক্রমী বিয়ে।
নবীজি অন্যান্য যে বিয়েগুলো করেছিলেন, সেগুলোর প্রেক্ষাপটও জানা প্রয়োজন। উম্মে হাবিবা ছিলেন রাসূলুল্লাহর আরেকজন স্ত্রী। তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে আবিসিনিয়াতে হিজরত করেন। কিন্তু তাঁর স্বামী ইসলাম থেকে খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়, ফলে তাঁকে অনেক দুর্দশা আর কষ্টের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়। তিনি ছিলেন আবু সুফিয়ানের কন্যা। পরবর্তীতে তাঁর স্বামী মারা গেলে, রাসূলুল্লাহ আমর ইবন উমাইয়া আদ দামরীর মাধ্যমে নাজ্জাশির কাছে একটি চিঠি লিখে পাঠান। এই পত্রে লেখা ছিল যে, নাজ্জাশি যেন নবীজির সাথে উম্মে হাবিবার বিয়ের ব্যবস্থা করেন। উম্মে হাবিবাকে রাসূলুল্লাহ বিয়ে করেছিলেন তাঁর প্রতি সহানুভূতি থেকে। এই কারণে তিনি হাজারো মাইল দূরে থাকা সত্ত্বেও নবীজি তাঁকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর সকল দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেন। আরেকটা কারণ ছিল, এই বিয়ের মাধ্যমে ইসলামের সবচেয়ে একগুঁয়ে শত্রু আবু সুফিয়ানকে ইসলামের কাছাকাছি নিয়ে আসা, ইসলামের প্রতি তাদের অবস্থানকে নমনীয় করে তোলা।
অদ্ভুত বিষয় হলো, ইসলামের ঘোরতর শত্রু হওয়া সত্ত্বেও আবু সুফিয়ান নবীজির সাথে নিজের মেয়ের বিয়ের কথা শুনে খুশি হয়ে ওঠে! সে বলে ওঠে, 'মুহাম্মাদের চেয়ে উত্তম আর কে আছে!' এর কারণ ছিল রাসূলুল্লাহর বংশমর্যাদা। বনু হাশিম গোত্রের একজন সদস্যের সাথে তার মেয়ের বিয়ে হয়েছে জেনে সে আনন্দিত হয়ে উঠেছিল। রাসূলুল্লাহর সাথে তার বিরোধ ছিল আদর্শিক বিরোধ, দ্বীন নিয়ে দ্বন্দ্ব, কিন্তু মুহাম্মাদ ছিলেন তাদের চাইতে অনেক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বংশের অধিকারী, তাই তিনি তার মত কম মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির মেয়েকে বিয়ে করায় তার অন্তর নরম হয়ে পড়ে।
আরেকটি বিয়ে ছিল উম্মে সালামার সাথে। তিনিও আবিসিনিয়াতে হিজরত করেছিলেন। এরপর তিনি মদীনায় হিজরত করেন। তাঁর স্বামী আবু সালামা মারা যাবার পরে নবীজি উম্মে সালামাকে বিয়ে করেন। এভাবে নবীজি মৃত সাহাবাদের স্ত্রীদেরকে বিয়ে করার মাধ্যমে তাদের দেখাশোনার ভার গ্রহণ করতেন। এইসব সাহাবিয়াত ছিলেন বয়স্কা, বৃদ্ধা নারী। এরপরও রাসূলুল্লাহ তাদেরকে বিয়ে করেছিলেন। মুহাম্মাদ হলেন মুসলিম উম্মাহর পিতা, মুসলিম উম্মাহর তত্ত্বাবধায়ক। সাহাবীদের সাথে রক্তের সম্পর্ক না থাকুক, তিনি ছিলেন তাদের সবচেয়ে আপনজন। সাহাবীদের ক্ষুধায়, তৃষ্ণায়, কষ্টে, প্রয়োজনে, দুঃসময়ে সবসময় পাশে থেকেছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
📄 কাবা পুনর্নির্মাণ
মুহাম্মাদের নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল। একবার আল-কাবা বন্যাকবলিত হয়। আল-কাবার অবস্থান একটি নিচু উপত্যকায়, পর্বতরাজির মাঝে। বন্যার ফলে কাবার কাঠামোতে ফাটল ধরে। তাই কুরাইশগণ কাবাকে পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন অনুভব করে। আল-কাবা মোট চার বা পাঁচবার পুনর্নির্মিত হয়েছে। ইবরাহীম এবং আদম—এই দুইজনের মধ্যে কে সর্বপ্রথম আল-কাবা নির্মাণ করেছিলেন তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে অধিকাংশের মতানুসারে ইবরাহীম-ই প্রথম তা নির্মাণ করেন।
যারা বলেন যে আদমই প্রথম নির্মাণকারী তারা এর পক্ষে কুরআনের যুক্তি পেশ করেন। কেননা কুরআনে বলা আছে, “এবং স্মরণ করো যখন ইবরাহীম ও ইসমাইল কাবার ভিত্তি উত্তোলন করেছিল, তখন তারা বলেছিল, হে আমাদের রব, আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহা শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।” (সূরা বাকারাহ, ২: ১২৭) তাঁরা বলেন যে, ইবরাহীম কাবাঘর গোড়া থেকে নির্মাণ করেননি, তিনি যা করেছিলেন তা হলো ভিত্তি উত্তোলন, অর্থাৎ সেখানে ইতিমধ্যে উত্তোলন করার মতো কিছু ছিল। তাই তাঁরা বলেন যে, নবী আদমের সময়েই আল-কাবার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু প্রচলিত বিশ্বাস এটাই যে ইবরাহীম আল-কাবা নির্মাণ করেছেন। তবে যে নবীই সর্বপ্রথম তা করুক না কেন আল-কাবার পবিত্রতা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই।
বেশ কয়েকজন নবী-রাসূল আল্লাহর ঘর পরিদর্শন করেছেন। হাদীস থেকে জানা যায়, হুদ, সালেহ এবং নূহ আল-কাবা পরিদর্শন করেছিলেন। এছাড়াও জানা যায় ঈসা যখন পুনরায় পৃথিবীর বুকে প্রত্যাবর্তন করবেন তখন তিনি হজ্ব করবেন। সুতরাং, এটি হয় আদম অথবা ইবরাহীম নির্মাণ করেছেন কিন্তু আল্লাহকে স্মরণের জন্য এটিই প্রথম নির্মিত ঘর। “নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত বরকতময় এবং বিশ্ববাসীর জন্য পথ প্রদর্শক।” (সূরা আল-ইমরান, ৩: ৯৬)
মক্কা বন্যাপ্লাবিত হওয়ায় কাবা ঘর দ্বিতীয়বার নির্মাণের প্রয়োজন হয়। কুরাইশগণ এটিকে পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছিল, তাই কাবা ঘরের পুরনো ইমারতটি ভেঙ্গে ফেলার প্রয়োজন পড়লো, কিন্তু তারা কেউই এই পদক্ষেপটি নিতে সাহস পাচ্ছিল না। তারা তাদের সব যন্ত্রপাতি নিয়ে আল-কাবার চারপাশে অপেক্ষা করছে, কিন্তু কেউই সামনে গিয়ে এটি ভাঙ্গার কাজটি শুরু করতে চাচ্ছিল না, সেই সময়ে মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও তারা আল-কাবাকে এতটা শ্রদ্ধা ও সম্মান করতো। তারা সত্যি সত্যিই আল্লাহকে ভয় পেত; তারা বিশ্বাস করতো যে এটি ভেঙ্গে ফেললে মারাত্মক বিপদ হতে পারে। অতঃপর তাদের মধ্যে একজন বললো যে, সে এই কাজটি শুরু করবে, তাই পরদিন ভোরে সে তার পুত্রদের নিয়ে আল-কাবার পাথরসমূহ সরাতে শুরু করলো আর বলতে থাকলো, 'হে আল্লাহ! তুমি ভয় পেয়ো না। আমরা তোমার ভালো চাই।'
এখানে লক্ষণীয়, আল্লাহ সম্পর্কে তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস—তারা ভাবত যে, এসব বলে তারা আল্লাহকে শান্ত করছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সবকিছু জানেন, মানুষ কোন কাজটা কেন করছে তা তাকে মুখে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তিনি অন্তরের খবর রাখেন। মক্কার মুশরিকরা আল্লাহকে বিশ্বাস করতো ঠিকই কিন্তু তাঁর গুণাবলিকে অনুধাবন করতে পারতো না।
এরপর আল-কাবার দেয়ালগুলোকে নামিয়ে ফেলা হয়। তখন মক্কার অদূরে অবস্থিত লোহিত সাগর বন্দরে রোমের একটি জাহাজ নোঙর করে। তারা সেই জাহাজের কিছু কাঠ নিয়ে আসে, ওই জাহাজে আগত এক রোমান নির্মাতার সাহায্যে আল-কাবার পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন করে। জাহাজ থেকে নিয়ে আসা ওই কাঠ দিয়েই প্রথমবারের মত আল-কাবার ছাদ নির্মিত হয়েছিল। কুরাইশগণ খুব ভালভাবেই জানত যে সুদের অর্থে ভালো কিছু নেই। আর তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে শুধুমাত্র হালাল অর্থ দিয়েই আল-কাবার নির্মাণকাজ সম্পাদিত হবে। সেই সময় পতিতাবৃত্তি বহুল প্রচলিত ব্যবসা হওয়া সত্ত্বেও তারা সুদ অথবা পতিতাবৃত্তি থেকে প্রাপ্ত অর্থ এই কাজে কোনোভাবেই ব্যবহার করবে না বলে মনস্থ করে। মানুষ সেই সময় থেকেই জানত যে এভাবে অর্জিত অর্থে কোনো কল্যাণ নেই অথচ তারপরেও তারা অর্থ উপার্জনের খাতিরে তাদের ক্রীতদাস মেয়েদেরকে দিয়ে পতিতাবৃত্তিসহ আরও বিভিন্ন রকম কাজ করাতো। অর্থের সংকুলান না হওয়ার কারণে তারা আল-কাবার একটি দিক কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল। কাবাকে আয়তাকার না বানিয়ে বর্গাকার বানিয়েছিল। কাবার যে অংশটি তারা আর বানাতে পারেনি সেই অংশটিই এখন আল-হিজর বলে পরিচিত। কাবার দুটো ফটক ছিল, তারা বানিয়েছিল একটি আর তারা এর দোরগোড়াকে উঁচু করে বানিয়েছিল, তাই এখন-কাবার দরজার কাছে যেতে হলে উপরে উঠতে হয়।
আল্লাহর রাসূল এক হাদীসে স্ত্রী আ'ইশাকে বলেন, 'তুমি কি জানো না যে তোমাদের সম্প্রদায়ের আল-কাবা নির্মাণের ব্যয় বহনের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল ছিল না? তোমাদের সম্প্রদায় নওমুসলিম না হলে অমি আল-কাবাকে ভেঙে এর পূর্ব ও পশ্চিমদিকে একটি করে দরজা নির্মাণ করতাম। আমি আল-হিজরকে আল-কাবার অন্তর্ভুক্ত করতাম।'
রাসূল মক্কাতে প্রবেশের পরপরই আল-কাবাকে তার প্রকৃত ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু এরপর তিনি আ'ইশাকে বলেন, 'আমি এই কাজটি করবো না শুধু এই কারণে যে কুরাইশরা সবেমাত্র মুসলিম হয়েছে। তাদের ইসলাম এখন ভঙ্গুর, ঈমান দুর্বল, আর এখন যদি অমি কাবাকে পুনর্নির্মাণ করি, তা তাদের অনুভূতিকে আঘাত করবে।'
রাসূলুল্লাহ কাবার পুনর্নির্মাণে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। কুরাইশরা কাবার পুনর্মাণের কাজ শুরু করার পর কালো পাথর বসানোর বিষয়টি সামনে এলে সমস্যা বেঁধে যায়। সবাই কালো পাথর যথাস্থানে রাখার মর্যাদা পেতে চায়। বনু আব্দুদ দার গোত্র তার সমস্ত লোকজনকে এক করে রক্তে পূর্ণ একটি পাত্র নিয়ে কাবার সামনে উপস্থিত হয়। পাত্রটি সবার সামনে রেখে তারা তাতে হাত ডুবিয়ে আবার হাত বের করে নেয়। এর দ্বারা তারা সবাইকে বুঝিয়ে দেয় যে, যদি তাদেরকে পবিত্র কালো পাথর হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে স্থাপনের সম্মান না দেয়া হয় তবে তারা এর জন্য যুদ্ধ করে মরতে প্রস্তুত। অন্যেরাও দমবার পাত্র ছিল না! এই দৃশ্য দেখে উল্টো আরেক গোত্র তাদের রক্তের পাত্র এনে একইভাবে যুদ্ধের অঙ্গীকার করে। অন্যান্য গোত্রও একই রকম অঙ্গীকার করলো। চার পাঁচদিন যাবত এই নিয়ে ঝগড়া চলতে থাকে। অবশেষে তাদের মধ্যকার বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি উমাইয়া বললেন, 'আসুন আমরা সকলে এই সিদ্ধান্তে সম্মত হই যে, আগামীকাল ভোরে মাসজিদুল হারামের দরজা দিয়ে যিনি প্রথম প্রবেশ করবেন তাঁর ফয়সালা আমরা সবাই মেনে নেব।'
পরদিন ভোরে মুহাম্মাদ সর্বপ্রথম মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করেন। তখন তারা সবাই দাঁড়িয়ে বলে, 'ইনি তো সত্যনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত! আমরা তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিলাম।' তারা মাসজিদুল হারামে প্রবেশকারী প্রথম ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব দিবে বলে সম্মত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ব্যক্তি মুহাম্মাদ হওয়ায় তারা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত ও খুশি হয়েছিল, কারণ তারা জানত যে, তিনি কখনোই পক্ষপাতিত্ব করবেন না। আর তাই তারা তাঁর হাতে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ন্যস্ত করেছিল।
রাসূলুল্লাহ তাদেরকে একটা চাদর আনতে বলেন। এরপর নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ উঠিয়ে তা সেই চাদরের মাঝখানে রাখেন। অতঃপর বিদ্যমান গোত্রসমূহের নেতাগণকে সেই চাদরের কিনারা ধরতে বলেন। তারা সবাই একই সময়ে চাদরটি উঁচিয়ে ধরলো; এভাবে প্রত্যেকটি গোত্রই পবিত্র কালো পাথর হাজরে আসওয়াদ উত্তোলনে অংশ নেয়। যখন তারা সবাই পাথরটি উঁচিয়ে ধরে তার নির্ধারিত জায়গায় নিয়ে যায় তখন মুহাম্মাদ তাঁর পবিত্র হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে স্থাপন করেন। অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহই হাজরে আসওয়াদকে তার নির্ধারিত জায়গায় স্থাপন করেন। এভাবে দ্বিতীয়বারের মতো কাবা নির্মিত হয়।
রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন যে, যদি কুরাইশরা সেই সময়ে নওমুসলিম না হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই আল-কাবাকে ইবরাহীমের দেওয়া ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণ করতেন। এর বেশ কয়েক বছর পর আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবায়ের মক্কার আমীর পদে আসীন হন। আ'ইশা তাঁর খালা হওয়ার সুবাদে তিনি এই হাদীস সম্পর্কে জানতেন। আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইরের মা আসমা বিনত আবি বকর ছিলেন আ'ইশার বোন। আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইর আল কাবাকে তার মূল ভিত্তির ওপর ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ তৎকালীন মুসলিমগণ পূর্বের ন্যায় আর নও মুসলিম ছিলেন না, তারা ততদিনে পরিণত হয়েছেন। আয যুবাইর তখন কাবাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন কারণ বনু উমাইয়্যাহর সাথে যুদ্ধে কাবায় একবার আগুন ধরে যায়। আল হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ আস সাক্বাফি মক্কা অবরোধ করেছিল, ওই সময় আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইর এবং বনু উমাইয়্যাহর মধ্যে সিরিয়াতে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আবু উমায়েরের সেনাবাহিনী প্রধান মক্কা অবরোধ করেছিল, তাদের নিক্ষিপ্ত গোলাবারুদের দ্বারা কাবা অগ্নিদগ্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ক্ষতিটুকু কাবার ইমারতকে না ভেঙেও মেরামত করা যেতো। কিন্তু আয যুবাইর এই পরিস্থিতির সুযোগ ব্যবহার করে কাবাকে তার মূল ভিত্তির উপর ফিরিয়ে আনেন। তিনি রাসূলুল্লাহর হাদীস অনুযায়ী কাবাকে পুনর্নির্মাণ করেন। রাসূলের ইচ্ছানুযায়ী কাবার দরজাকে নিচে নামিয়ে আনেন, পূর্ব ও পশ্চিম পার্শ্বে একটি করে দরজা নির্মাণ করেন এবং হিজরের দিকে কাবাকে প্রসারিত করেন।
আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইর সেই যুদ্ধে পরাজিত ও শহীদ হন। আল হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ মক্কা দখল করে। তৎকালীন খলিফা আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান রাসূলুল্লাহর সেই হাদীস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তাই তিনি কাবাকে আবার আবদুল্লাহ আয যুবাইরের আগে যেভাবে কুরাইশগণ নির্মাণ করেছিল, সেভাবে করার হুকুম জারি করেন। বনু উমাইয়্যাহর খিলাফাহর পর বনু আব্বাস খিলাফত লাভ করে, তারাই ছিল খলিফার রাজপরিবার। বনু আব্বাসের একজন খলিফা কাবাকে তার মূল ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণের কথা ভাবছিলেন। তিনি ইমাম মালিকের সাথে এই ব্যাপারে শলা-পরামর্শ করেন। ইমাম মালিক খলিফাকে বলেন, 'আমরা কাবাকে রাজা-রাজড়াদের হাতের পুতুলের মতো ক্ষণে ক্ষণে আকৃতি পরিবর্তনের পক্ষপাতী নই। যদিও এটিকে হযরত ইবরাহীমের দেওয়া ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণের কথা ও পরিকল্পনা রাসূলুল্লাহরও ছিল, কিন্তু এটা এভাবেই থাকুক এবং আমরা আর এর পরিবর্তন সাধন করবো না।' এটি ইমাম মালিকের দেওয়া একটি অন্যতম বিচক্ষণ পরামর্শ ছিল। খলিফাও সেটি তখন মেনে নিয়েছিলেন। বর্তমানে যে কাবা রয়েছে তা কুরাইশগণের ভিত্তির ওপরই নির্মিত।
আলহামদুলিল্লাহ, এতে ভালোই হয়েছে। যদি কাবাকে ইবরাহীমের দেওয়া তাঁর আসল ভিত্তির উপর নির্মাণ করা হতো, তাহলে মুসলিমরা কাবার অভ্যন্তরে ইবাদত করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো। কিন্তু যেহেতু এটাকে কমিয়ে ফেলা হয়েছিল, তাই অর্ধবৃত্ত দিয়ে ঘেরা অংশটি প্রকৃতপক্ষে কাবারই অংশ। তাই ওই অংশে ইবাদাত করা যেন কাবার অভ্যন্তরেই ইবাদত করা। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ কাবার অভ্যন্তরে ইবাদত করেছেন। সময়ের সাথে সাথে কাবার উচ্চতাকে বাড়ানো হয়েছে বটে কিন্তু এর জায়গার পরিবর্তন হয়নি। যে পাথরগুলো দিয়ে কাবা নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলো সেইসব পাথরের অবশিষ্টাংশ যা ইবরাহীম ব্যবহার করেছিলেন, তবে সবগুলো নয়, কিছু পাথর পরবর্তীতে কুরাইশ এবং অন্যেরা সংযোজন করেছে। এটিই সেই কালো পাথর যা ইবরাহীম ব্যবহার করেছিলেন। এই পাথরটি ঘিরে অনেক গল্প কাহিনি প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেন যে এটি জান্নাতে তৈরি হয়েছে। তিরমিযীর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, কালো পাথরটি আসলে সাদা ছিল যা পরবর্তীতে পাপী আদম সন্তানদের স্পর্শের কারণে কালো রঙ ধারণ করেছে। অন্য হাদীসে এসেছে এই পাথরটি স্পর্শ করলে গুনাহ মাফ হয়। এটি কাবার একমাত্র অংশ যাকে চুম্বন করা হয় এবং দূর থেকে যার দিকে ইঙ্গিত করা হয়। কেউ কেউ আবার ইয়েমেনি কোণের দিকেও ইঙ্গিত করে থাকে, কিন্তু তা সঠিক নয়। কাবা প্রদক্ষিণ করার সময় ইয়েমেনি কোণকে স্পর্শ করা যেতে পারে কিন্তু সেটির দিকে ইঙ্গিত করা কিংবা অভিবাদন করা ঠিক না। এটি শুধুমাত্র পবিত্র কালো পাথরকেই করা উচিত।
মুহাম্মাদের নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল। একবার আল-কাবা বন্যাকবলিত হয়। আল-কাবার অবস্থান একটি নিচু উপত্যকায়, পর্বতরাজির মাঝে। বন্যার ফলে কাবার কাঠামোতে ফাটল ধরে। তাই কুরাইশগণ কাবাকে পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন অনুভব করে। আল-কাবা মোট চার বা পাঁচবার পুনর্নির্মিত হয়েছে। ইবরাহীম এবং আদম—এই দুইজনের মধ্যে কে সর্বপ্রথম আল-কাবা নির্মাণ করেছিলেন তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে অধিকাংশের মতানুসারে ইবরাহীম-ই প্রথম তা নির্মাণ করেন।
যারা বলেন যে আদমই প্রথম নির্মাণকারী তারা এর পক্ষে কুরআনের যুক্তি পেশ করেন। কেননা কুরআনে বলা আছে, “এবং স্মরণ করো যখন ইবরাহীম ও ইসমাইল কাবার ভিত্তি উত্তোলন করেছিল, তখন তারা বলেছিল, হে আমাদের রব, আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহা শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।” (সূরা বাকারাহ, ২: ১২৭) তাঁরা বলেন যে, ইবরাহীম কাবাঘর গোড়া থেকে নির্মাণ করেননি, তিনি যা করেছিলেন তা হলো ভিত্তি উত্তোলন, অর্থাৎ সেখানে ইতিমধ্যে উত্তোলন করার মতো কিছু ছিল। তাই তাঁরা বলেন যে, নবী আদমের সময়েই আল-কাবার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু প্রচলিত বিশ্বাস এটাই যে ইবরাহীম আল-কাবা নির্মাণ করেছেন। তবে যে নবীই সর্বপ্রথম তা করুক না কেন আল-কাবার পবিত্রতা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই।
বেশ কয়েকজন নবী-রাসূল আল্লাহর ঘর পরিদর্শন করেছেন। হাদীস থেকে জানা যায়, হুদ, সালেহ এবং নূহ আল-কাবা পরিদর্শন করেছিলেন। এছাড়াও জানা যায় ঈসা যখন পুনরায় পৃথিবীর বুকে প্রত্যাবর্তন করবেন তখন তিনি হজ্ব করবেন। সুতরাং, এটি হয় আদম অথবা ইবরাহীম নির্মাণ করেছেন কিন্তু আল্লাহকে স্মরণের জন্য এটিই প্রথম নির্মিত ঘর। “নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত বরকতময় এবং বিশ্ববাসীর জন্য পথ প্রদর্শক।” (সূরা আল-ইমরান, ৩: ৯৬)
মক্কা বন্যাপ্লাবিত হওয়ায় কাবা ঘর দ্বিতীয়বার নির্মাণের প্রয়োজন হয়। কুরাইশগণ এটিকে পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছিল, তাই কাবা ঘরের পুরনো ইমারতটি ভেঙ্গে ফেলার প্রয়োজন পড়লো, কিন্তু তারা কেউই এই পদক্ষেপটি নিতে সাহস পাচ্ছিল না। তারা তাদের সব যন্ত্রপাতি নিয়ে আল-কাবার চারপাশে অপেক্ষা করছে, কিন্তু কেউই সামনে গিয়ে এটি ভাঙ্গার কাজটি শুরু করতে চাচ্ছিল না, সেই সময়ে মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও তারা আল-কাবাকে এতটা শ্রদ্ধা ও সম্মান করতো। তারা সত্যি সত্যিই আল্লাহকে ভয় পেত; তারা বিশ্বাস করতো যে এটি ভেঙ্গে ফেললে মারাত্মক বিপদ হতে পারে। অতঃপর তাদের মধ্যে একজন বললো যে, সে এই কাজটি শুরু করবে, তাই পরদিন ভোরে সে তার পুত্রদের নিয়ে আল-কাবার পাথরসমূহ সরাতে শুরু করলো আর বলতে থাকলো, 'হে আল্লাহ! তুমি ভয় পেয়ো না। আমরা তোমার ভালো চাই।'
এখানে লক্ষণীয়, আল্লাহ সম্পর্কে তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস—তারা ভাবত যে, এসব বলে তারা আল্লাহকে শান্ত করছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সবকিছু জানেন, মানুষ কোন কাজটা কেন করছে তা তাকে মুখে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তিনি অন্তরের খবর রাখেন। মক্কার মুশরিকরা আল্লাহকে বিশ্বাস করতো ঠিকই কিন্তু তাঁর গুণাবলিকে অনুধাবন করতে পারতো না।
এরপর আল-কাবার দেয়ালগুলোকে নামিয়ে ফেলা হয়। তখন মক্কার অদূরে অবস্থিত লোহিত সাগর বন্দরে রোমের একটি জাহাজ নোঙর করে। তারা সেই জাহাজের কিছু কাঠ নিয়ে আসে, ওই জাহাজে আগত এক রোমান নির্মাতার সাহায্যে আল-কাবার পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন করে। জাহাজ থেকে নিয়ে আসা ওই কাঠ দিয়েই প্রথমবারের মত আল-কাবার ছাদ নির্মিত হয়েছিল। কুরাইশগণ খুব ভালভাবেই জানত যে সুদের অর্থে ভালো কিছু নেই। আর তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে শুধুমাত্র হালাল অর্থ দিয়েই আল-কাবার নির্মাণকাজ সম্পাদিত হবে। সেই সময় পতিতাবৃত্তি বহুল প্রচলিত ব্যবসা হওয়া সত্ত্বেও তারা সুদ অথবা পতিতাবৃত্তি থেকে প্রাপ্ত অর্থ এই কাজে কোনোভাবেই ব্যবহার করবে না বলে মনস্থ করে। মানুষ সেই সময় থেকেই জানত যে এভাবে অর্জিত অর্থে কোনো কল্যাণ নেই অথচ তারপরেও তারা অর্থ উপার্জনের খাতিরে তাদের ক্রীতদাস মেয়েদেরকে দিয়ে পতিতাবৃত্তিসহ আরও বিভিন্ন রকম কাজ করাতো। অর্থের সংকুলান না হওয়ার কারণে তারা আল-কাবার একটি দিক কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছিল। কাবাকে আয়তাকার না বানিয়ে বর্গাকার বানিয়েছিল। কাবার যে অংশটি তারা আর বানাতে পারেনি সেই অংশটিই এখন আল-হিজর বলে পরিচিত। কাবার দুটো ফটক ছিল, তারা বানিয়েছিল একটি আর তারা এর দোরগোড়াকে উঁচু করে বানিয়েছিল, তাই এখন-কাবার দরজার কাছে যেতে হলে উপরে উঠতে হয়।
আল্লাহর রাসূল এক হাদীসে স্ত্রী আ'ইশাকে বলেন, 'তুমি কি জানো না যে তোমাদের সম্প্রদায়ের আল-কাবা নির্মাণের ব্যয় বহনের জন্য পর্যাপ্ত তহবিল ছিল না? তোমাদের সম্প্রদায় নওমুসলিম না হলে অমি আল-কাবাকে ভেঙে এর পূর্ব ও পশ্চিমদিকে একটি করে দরজা নির্মাণ করতাম। আমি আল-হিজরকে আল-কাবার অন্তর্ভুক্ত করতাম।'
রাসূল মক্কাতে প্রবেশের পরপরই আল-কাবাকে তার প্রকৃত ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু এরপর তিনি আ'ইশাকে বলেন, 'আমি এই কাজটি করবো না শুধু এই কারণে যে কুরাইশরা সবেমাত্র মুসলিম হয়েছে। তাদের ইসলাম এখন ভঙ্গুর, ঈমান দুর্বল, আর এখন যদি অমি কাবাকে পুনর্নির্মাণ করি, তা তাদের অনুভূতিকে আঘাত করবে।'
রাসূলুল্লাহ কাবার পুনর্নির্মাণে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। কুরাইশরা কাবার পুনর্মাণের কাজ শুরু করার পর কালো পাথর বসানোর বিষয়টি সামনে এলে সমস্যা বেঁধে যায়। সবাই কালো পাথর যথাস্থানে রাখার মর্যাদা পেতে চায়। বনু আব্দুদ দার গোত্র তার সমস্ত লোকজনকে এক করে রক্তে পূর্ণ একটি পাত্র নিয়ে কাবার সামনে উপস্থিত হয়। পাত্রটি সবার সামনে রেখে তারা তাতে হাত ডুবিয়ে আবার হাত বের করে নেয়। এর দ্বারা তারা সবাইকে বুঝিয়ে দেয় যে, যদি তাদেরকে পবিত্র কালো পাথর হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে স্থাপনের সম্মান না দেয়া হয় তবে তারা এর জন্য যুদ্ধ করে মরতে প্রস্তুত। অন্যেরাও দমবার পাত্র ছিল না! এই দৃশ্য দেখে উল্টো আরেক গোত্র তাদের রক্তের পাত্র এনে একইভাবে যুদ্ধের অঙ্গীকার করে। অন্যান্য গোত্রও একই রকম অঙ্গীকার করলো। চার পাঁচদিন যাবত এই নিয়ে ঝগড়া চলতে থাকে। অবশেষে তাদের মধ্যকার বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি উমাইয়া বললেন, 'আসুন আমরা সকলে এই সিদ্ধান্তে সম্মত হই যে, আগামীকাল ভোরে মাসজিদুল হারামের দরজা দিয়ে যিনি প্রথম প্রবেশ করবেন তাঁর ফয়সালা আমরা সবাই মেনে নেব।'
পরদিন ভোরে মুহাম্মাদ সর্বপ্রথম মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করেন। তখন তারা সবাই দাঁড়িয়ে বলে, 'ইনি তো সত্যনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত! আমরা তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিলাম।' তারা মাসজিদুল হারামে প্রবেশকারী প্রথম ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব দিবে বলে সম্মত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ব্যক্তি মুহাম্মাদ হওয়ায় তারা পুরোপুরি নিশ্চিন্ত ও খুশি হয়েছিল, কারণ তারা জানত যে, তিনি কখনোই পক্ষপাতিত্ব করবেন না। আর তাই তারা তাঁর হাতে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ন্যস্ত করেছিল।
রাসূলুল্লাহ তাদেরকে একটা চাদর আনতে বলেন। এরপর নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ উঠিয়ে তা সেই চাদরের মাঝখানে রাখেন। অতঃপর বিদ্যমান গোত্রসমূহের নেতাগণকে সেই চাদরের কিনারা ধরতে বলেন। তারা সবাই একই সময়ে চাদরটি উঁচিয়ে ধরলো; এভাবে প্রত্যেকটি গোত্রই পবিত্র কালো পাথর হাজরে আসওয়াদ উত্তোলনে অংশ নেয়। যখন তারা সবাই পাথরটি উঁচিয়ে ধরে তার নির্ধারিত জায়গায় নিয়ে যায় তখন মুহাম্মাদ তাঁর পবিত্র হাত দিয়ে হাজরে আসওয়াদকে যথাস্থানে স্থাপন করেন। অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহই হাজরে আসওয়াদকে তার নির্ধারিত জায়গায় স্থাপন করেন। এভাবে দ্বিতীয়বারের মতো কাবা নির্মিত হয়।
রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন যে, যদি কুরাইশরা সেই সময়ে নওমুসলিম না হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই আল-কাবাকে ইবরাহীমের দেওয়া ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণ করতেন। এর বেশ কয়েক বছর পর আবদুল্লাহ ইবন আয-যুবায়ের মক্কার আমীর পদে আসীন হন। আ'ইশা তাঁর খালা হওয়ার সুবাদে তিনি এই হাদীস সম্পর্কে জানতেন। আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইরের মা আসমা বিনত আবি বকর ছিলেন আ'ইশার বোন। আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইর আল কাবাকে তার মূল ভিত্তির ওপর ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন, কারণ তৎকালীন মুসলিমগণ পূর্বের ন্যায় আর নও মুসলিম ছিলেন না, তারা ততদিনে পরিণত হয়েছেন। আয যুবাইর তখন কাবাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন কারণ বনু উমাইয়্যাহর সাথে যুদ্ধে কাবায় একবার আগুন ধরে যায়। আল হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ আস সাক্বাফি মক্কা অবরোধ করেছিল, ওই সময় আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইর এবং বনু উমাইয়্যাহর মধ্যে সিরিয়াতে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আবু উমায়েরের সেনাবাহিনী প্রধান মক্কা অবরোধ করেছিল, তাদের নিক্ষিপ্ত গোলাবারুদের দ্বারা কাবা অগ্নিদগ্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ক্ষতিটুকু কাবার ইমারতকে না ভেঙেও মেরামত করা যেতো। কিন্তু আয যুবাইর এই পরিস্থিতির সুযোগ ব্যবহার করে কাবাকে তার মূল ভিত্তির উপর ফিরিয়ে আনেন। তিনি রাসূলুল্লাহর হাদীস অনুযায়ী কাবাকে পুনর্নির্মাণ করেন। রাসূলের ইচ্ছানুযায়ী কাবার দরজাকে নিচে নামিয়ে আনেন, পূর্ব ও পশ্চিম পার্শ্বে একটি করে দরজা নির্মাণ করেন এবং হিজরের দিকে কাবাকে প্রসারিত করেন।
আবদুল্লাহ ইবন আয যুবাইর সেই যুদ্ধে পরাজিত ও শহীদ হন। আল হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ মক্কা দখল করে। তৎকালীন খলিফা আবদুল মালিক ইবন মারওয়ান রাসূলুল্লাহর সেই হাদীস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তাই তিনি কাবাকে আবার আবদুল্লাহ আয যুবাইরের আগে যেভাবে কুরাইশগণ নির্মাণ করেছিল, সেভাবে করার হুকুম জারি করেন। বনু উমাইয়্যাহর খিলাফাহর পর বনু আব্বাস খিলাফত লাভ করে, তারাই ছিল খলিফার রাজপরিবার। বনু আব্বাসের একজন খলিফা কাবাকে তার মূল ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণের কথা ভাবছিলেন। তিনি ইমাম মালিকের সাথে এই ব্যাপারে শলা-পরামর্শ করেন। ইমাম মালিক খলিফাকে বলেন, 'আমরা কাবাকে রাজা-রাজড়াদের হাতের পুতুলের মতো ক্ষণে ক্ষণে আকৃতি পরিবর্তনের পক্ষপাতী নই। যদিও এটিকে হযরত ইবরাহীমের দেওয়া ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণের কথা ও পরিকল্পনা রাসূলুল্লাহরও ছিল, কিন্তু এটা এভাবেই থাকুক এবং আমরা আর এর পরিবর্তন সাধন করবো না।' এটি ইমাম মালিকের দেওয়া একটি অন্যতম বিচক্ষণ পরামর্শ ছিল। খলিফাও সেটি তখন মেনে নিয়েছিলেন। বর্তমানে যে কাবা রয়েছে তা কুরাইশগণের ভিত্তির ওপরই নির্মিত।
আলহামদুলিল্লাহ, এতে ভালোই হয়েছে। যদি কাবাকে ইবরাহীমের দেওয়া তাঁর আসল ভিত্তির উপর নির্মাণ করা হতো, তাহলে মুসলিমরা কাবার অভ্যন্তরে ইবাদত করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতো। কিন্তু যেহেতু এটাকে কমিয়ে ফেলা হয়েছিল, তাই অর্ধবৃত্ত দিয়ে ঘেরা অংশটি প্রকৃতপক্ষে কাবারই অংশ। তাই ওই অংশে ইবাদাত করা যেন কাবার অভ্যন্তরেই ইবাদত করা। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ কাবার অভ্যন্তরে ইবাদত করেছেন। সময়ের সাথে সাথে কাবার উচ্চতাকে বাড়ানো হয়েছে বটে কিন্তু এর জায়গার পরিবর্তন হয়নি। যে পাথরগুলো দিয়ে কাবা নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলো সেইসব পাথরের অবশিষ্টাংশ যা ইবরাহীম ব্যবহার করেছিলেন, তবে সবগুলো নয়, কিছু পাথর পরবর্তীতে কুরাইশ এবং অন্যেরা সংযোজন করেছে। এটিই সেই কালো পাথর যা ইবরাহীম ব্যবহার করেছিলেন। এই পাথরটি ঘিরে অনেক গল্প কাহিনি প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেন যে এটি জান্নাতে তৈরি হয়েছে। তিরমিযীর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, কালো পাথরটি আসলে সাদা ছিল যা পরবর্তীতে পাপী আদম সন্তানদের স্পর্শের কারণে কালো রঙ ধারণ করেছে। অন্য হাদীসে এসেছে এই পাথরটি স্পর্শ করলে গুনাহ মাফ হয়। এটি কাবার একমাত্র অংশ যাকে চুম্বন করা হয় এবং দূর থেকে যার দিকে ইঙ্গিত করা হয়। কেউ কেউ আবার ইয়েমেনি কোণের দিকেও ইঙ্গিত করে থাকে, কিন্তু তা সঠিক নয়। কাবা প্রদক্ষিণ করার সময় ইয়েমেনি কোণকে স্পর্শ করা যেতে পারে কিন্তু সেটির দিকে ইঙ্গিত করা কিংবা অভিবাদন করা ঠিক না। এটি শুধুমাত্র পবিত্র কালো পাথরকেই করা উচিত।
📄 শিক্ষা
দাঈদেরকে সমসাময়িক মানুষদের মানসিকতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। রাসূল কাবার পুনর্নির্মাণ করতে আগ্রহী ছিলেন, তবু তিনি তা করেননি কারণ তিনি সেখানকার মানুষদের ঈমানে কোনোরূপ আঘাত করতে চাননি। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেছেন, 'তুমি যদি মানুষকে এমন কোনো কথা বলো যা তাদের বোধগম্য নয়, তাদের স্বল্পবুদ্ধি বা ঈমানের কারণে তা তারা বুঝতে পারে না, তখন তা তাদের জন্য ফিতনা হতে পারে।' এমন হতে পারে যে, একটি বিষয় সম্পূর্ণ সত্য এবং বৈধ—কিন্তু সেটা শোনার জন্য মানুষ এখনো প্রস্তুত নয়, তখন সে বিষয়ক তথ্য উল্টো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'তোমাদের সম্প্রদায় (কুরাইশ) আল-কাবার দরজা উঁচু করে নির্মাণ করেছে যাতে তারা কে এর ভিতরে গেল আর কে বের হলো তা তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।' এটি ছিল ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের একটি বিষয়। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'যদি আমি একে আবার বানাতাম তাহলে এর দরজাটি নিচু করে দিতাম আর দুইটি দরজা বানাতাম যাতে মানুষ একটি দিয়ে প্রবেশ করে অপরটি দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে।'
রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন যে, যদি কুরাইশরা সেই সময়ে নওমুসলিম না হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই আল-কাবাকে ইবরাহীমের দেওয়া ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণ করতেন। তিরমিযীর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, কালো পাথরটি আসলে সাদা ছিল যা পরবর্তীতে পাপী আদম সন্তানদের স্পর্শের কারণে কালো রঙ ধারণ করেছে।
দাঈদেরকে সমসাময়িক মানুষদের মানসিকতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে। রাসূল কাবার পুনর্নির্মাণ করতে আগ্রহী ছিলেন, তবু তিনি তা করেননি কারণ তিনি সেখানকার মানুষদের ঈমানে কোনোরূপ আঘাত করতে চাননি। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেছেন, 'তুমি যদি মানুষকে এমন কোনো কথা বলো যা তাদের বোধগম্য নয়, তাদের স্বল্পবুদ্ধি বা ঈমানের কারণে তা তারা বুঝতে পারে না, তখন তা তাদের জন্য ফিতনা হতে পারে।' এমন হতে পারে যে, একটি বিষয় সম্পূর্ণ সত্য এবং বৈধ—কিন্তু সেটা শোনার জন্য মানুষ এখনো প্রস্তুত নয়, তখন সে বিষয়ক তথ্য উল্টো ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'তোমাদের সম্প্রদায় (কুরাইশ) আল-কাবার দরজা উঁচু করে নির্মাণ করেছে যাতে তারা কে এর ভিতরে গেল আর কে বের হলো তা তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।' এটি ছিল ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের একটি বিষয়। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'যদি আমি একে আবার বানাতাম তাহলে এর দরজাটি নিচু করে দিতাম আর দুইটি দরজা বানাতাম যাতে মানুষ একটি দিয়ে প্রবেশ করে অপরটি দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে।'
রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন যে, যদি কুরাইশরা সেই সময়ে নওমুসলিম না হতো, তাহলে তিনি অবশ্যই আল-কাবাকে ইবরাহীমের দেওয়া ভিত্তির উপর পুনর্নির্মাণ করতেন। তিরমিযীর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, কালো পাথরটি আসলে সাদা ছিল যা পরবর্তীতে পাপী আদম সন্তানদের স্পর্শের কারণে কালো রঙ ধারণ করেছে।