📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 হিলফুল ফুজুল

📄 হিলফুল ফুজুল


রাসূলুল্লাহর প্রাথমিক জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো 'হিলফুল ফুদুল' চুক্তি। এর পেছনের একটা গল্প আছে। ইয়েমেনের যাবিদ নামের এক এলাকা থেকে একজন লোক ব্যবসা করতে মক্কায় আসে। তার ব্যবসায়ের পণ্যসামগ্রী সাহম গোত্রের এক স্বনামধন্য ব্যক্তি আল আস ইবন ওয়াইল কিনে নেয়, টাকা পরিশোধ করে দেওয়ার প্রতিজ্ঞাও করে। কিন্তু কিছু সময় পর গড়িমসি আরম্ভ করে। লোকটাকে পাওনা বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ইয়েমেনি লোকটি মক্কায় ভিনদেশী, আল-আস আশা করেছিল যে লোকটি কিছুদিনের মধ্যে চলে যাবে, সেই সুযোগে আল-আস তার টাকা আত্মসাৎ করার পরিকল্পনা করে।

কিন্তু ইয়েমেনি লোকটি এত সহজে চলে গেল না। সে হক আদায় না করে নড়বে না। মক্কায় মানুষের ভীড়ের মাঝে গিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা শুরু করলো। 'হে মক্কাবাসী, আমি তোমাদের দেশে এসে যুলুমের শিকার হয়েছি, অন্যায়ের শিকার হয়েছি, হে লোকসকল, তোমরা কে আছ যে আমার পাশে দাঁড়াবে, তোমরা কি তোমাদের দেশে এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবে?' তার আবেগী কথা শুনে কুরাইশের কিছু গোত্র জড়ো হয়ে একটা চুক্তি করলো। চুক্তির কথা ছিল, মক্কার দুর্বল ও নিপীড়িত মানুষদের অধিকার কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। চুক্তিতে অংশ নেওয়া গোত্রগুলোর একটি ছিল নবীজির পরিবার। নবীজি সেই সময় কিশোর, কিন্তু আবদুল মুত্তালিব তাঁকেও সভায় নিয়ে যান। সভা অনুষ্ঠিত হয় আবদুল্লাহ ইবনে জাদানের বাড়িতে। সে ছিল খুবই উদার প্রকৃতির মানুষ, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল। মানুষের অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার। তার সম্মানে সে বাড়িতেই তারা সভার আয়োজন করলো। সভায় চুক্তি হলো যে, তারা সকলে একত্রিত হয়ে মজলুমদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার হবে। এ ঘটনা নবুওয়াতের আগেই ঘটেছিল আর চুক্তিটাও মুশরিকদের মধ্যকার একটি চুক্তি। রাসূল বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনে জাদানের বাড়িতে যে চুক্তি সম্পাদিত হলো, আমি এক পাল ভালো পশুর বিনিময়ে হলেও সেই চুক্তিতে থাকার সুযোগ হাতছাড়া করতাম না। আর যদি ইসলামের পরে এমন ঘটনা ঘটতো তখনও আমি বিষয়টিকে স্বাগত জানাতাম।'

অর্থাৎ যদি ইসলাম আসার পরে এমন কোনো চুক্তি করার সুযোগ আসতো, রাসূল সেই চুক্তিতে সানন্দে অংশ নিতেন, এমনকি যদি এই ধরনের চুক্তি কাফেরদের মধ্যে সংঘটিত হয়, তবুও। এখানে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে, তা হলো, মুসলিমরা সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে, চাই সেই ন্যায় একজন মুসলিমের পক্ষে বা কোনো অমুসলিমের পক্ষে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুসলিমরা হকের পক্ষ, নিপীড়িত মানুষের পক্ষ, মজলুমের পক্ষাবলম্বন করবে। মুহাম্মাদ মারা যাওয়ার অনেক বছর পরে একটি ঘটনার সূত্র ধরে আবারো হিলফুল ফুদুল এর নামটি চলে আসে। ঘটনাটা ঘটেছিল হুসাইন ইবন আলী ইবনে আবু তালিব এবং আল ওয়ালিদ ইবনে উকবা ইবনে আবু সুফিয়ানের মধ্যে। ওয়ালিদ ছিল মদীনার গভর্নর, সে তার ক্ষমতার জোরে অন্যায়ভাবে হুসাইনের কিছু সম্পত্তি নিয়ে দখল করে নেয়। হুসাইন ওয়ালিদের কাছে গিয়ে বললেন, 'শোনো, হয় তুমি আমার প্রাপ্য আমাকে ফেরত দিবে নয়তো আমি মসজিদের দিকে গিয়ে হিলফুল ফুদুলের ঘোষণা দিব। লোকদেরকে আমি হিলফুল ফুদুলের কথা স্মরণ করিয়ে দিব।'

আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের সে সময় ওয়ালিদের সাথেই ছিলেন। হুসাইনের মুখে হিলফুল ফুদুলের কথা শুনে তিনি বলে উঠলেন, 'তবে আমিও আল্লাহর নামে শপথ করছি, যদি হুসাইন হিলফুল ফুদুলের ডাক দেয়, আমি আমার তরবারি উন্মুক্ত করবো এবং তার পক্ষ নেব। যতক্ষণ সে ন্যায় বিচার না পাচ্ছে, আমরা যুদ্ধ করতে থাকবো। সে ন্যায়বিচার পেলে তবেই আমরা থামবো, নতুবা যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যাবো।' এই কথা পরে আরও কিছু মানুষের কানে গেল। তারাও উত্তেজিত হয়ে একই রকম বিবৃতি দিলো। ওয়ালিদ বুঝলো পরিস্থিতি মোটেও সুবিধার নয়, তাই সে তড়িঘড়ি করে হুসাইনের প্রাপ্য তাকে বুঝিয়ে দেয়। এই ঘটনার শিক্ষণীয় দিক হলো—মুসলিমরা কখনো কারো প্রতি জুলুম সহ্য করে না। তৎকালীন সময়ে মুসলিমরা একজন মুসলিম নেতা ওয়ালিদ ইবনে উকবার অধীনে ইসলামি ব্যবস্থার মধ্যেই বসবাস করতো, তবুও তারা হকের জন্য তাদের নেতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।

শাইখ মুহাম্মাদ গাজ্জালী এই ব্যাপারে মন্তব্য করেন, 'এই চুক্তি (হিলফুল ফুদুল) আমাদের সামনে একটি বিষয় তুলে ধরবে, রাত যত গভীর হোক না কেন, শাসক যতই অত্যাচারী হোক না কেন, উন্নত চরিত্র সবসময়ই কিছু না কিছু মানুষের মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। তারা সুবিচার এবং ন্যায়ের জন্য উঠে দাঁড়াবে। আল্লাহ তাআলা ভালো কাজে সহযোগিতা করাকে একজন মুসলিমের উপর একান্ত কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।'

"...সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।” (সূরা মায়িদা, ৫: ২)

যে কোনো মুসলিম দলের জন্য হিলফুল ফুযুল বা এ ধরনের কোনো চুক্তিতে অংশগ্রহণ বৈধ, কেননা, এ সকল চুক্তির আসল উদ্দেশ্যই হলো জুলুমের অপসারণ যা পালনের মাধ্যমে ইসলামি একটি দায়িত্বের বুনিয়াদ দৃঢ় হয়। মুসলিমদের জন্য অন্য ধর্মবিশ্বাসীদের সাথে যুলুমের অপসারণ কিংবা যালিমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার উদ্দেশ্যে চুক্তি করা বৈধ, যদি সেখানে ইসলামের জন্য এবং মুসলিমদের জন্য কোনো কল্যাণ থেকে থাকে। যেহেতু রাসূল ইসলামের আগমনের পরেও এই ধরনের চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, সুতরাং তা মুসলিমদের জন্যেও বৈধ।

রাসূলুল্লাহর প্রাথমিক জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো 'হিলফুল ফুদুল' চুক্তি। এর পেছনের একটা গল্প আছে। ইয়েমেনের যাবিদ নামের এক এলাকা থেকে একজন লোক ব্যবসা করতে মক্কায় আসে। তার ব্যবসায়ের পণ্যসামগ্রী সাহম গোত্রের এক স্বনামধন্য ব্যক্তি আল আস ইবন ওয়াইল কিনে নেয়, টাকা পরিশোধ করে দেওয়ার প্রতিজ্ঞাও করে। কিন্তু কিছু সময় পর গড়িমসি আরম্ভ করে। লোকটাকে পাওনা বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ইয়েমেনি লোকটি মক্কায় ভিনদেশী, আল-আস আশা করেছিল যে লোকটি কিছুদিনের মধ্যে চলে যাবে, সেই সুযোগে আল-আস তার টাকা আত্মসাৎ করার পরিকল্পনা করে।

কিন্তু ইয়েমেনি লোকটি এত সহজে চলে গেল না। সে হক আদায় না করে নড়বে না। মক্কায় মানুষের ভীড়ের মাঝে গিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা শুরু করলো। 'হে মক্কাবাসী, আমি তোমাদের দেশে এসে যুলুমের শিকার হয়েছি, অন্যায়ের শিকার হয়েছি, হে লোকসকল, তোমরা কে আছ যে আমার পাশে দাঁড়াবে, তোমরা কি তোমাদের দেশে এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবে?' তার আবেগী কথা শুনে কুরাইশের কিছু গোত্র জড়ো হয়ে একটা চুক্তি করলো। চুক্তির কথা ছিল, মক্কার দুর্বল ও নিপীড়িত মানুষদের অধিকার কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। চুক্তিতে অংশ নেওয়া গোত্রগুলোর একটি ছিল নবীজির পরিবার। নবীজি সেই সময় কিশোর, কিন্তু আবদুল মুত্তালিব তাঁকেও সভায় নিয়ে যান। সভা অনুষ্ঠিত হয় আবদুল্লাহ ইবনে জাদানের বাড়িতে। সে ছিল খুবই উদার প্রকৃতির মানুষ, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল। মানুষের অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার। তার সম্মানে সে বাড়িতেই তারা সভার আয়োজন করলো। সভায় চুক্তি হলো যে, তারা সকলে একত্রিত হয়ে মজলুমদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার হবে। এ ঘটনা নবুওয়াতের আগেই ঘটেছিল আর চুক্তিটাও মুশরিকদের মধ্যকার একটি চুক্তি। রাসূল বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনে জাদানের বাড়িতে যে চুক্তি সম্পাদিত হলো, আমি এক পাল ভালো পশুর বিনিময়ে হলেও সেই চুক্তিতে থাকার সুযোগ হাতছাড়া করতাম না। আর যদি ইসলামের পরে এমন ঘটনা ঘটতো তখনও আমি বিষয়টিকে স্বাগত জানাতাম।'

অর্থাৎ যদি ইসলাম আসার পরে এমন কোনো চুক্তি করার সুযোগ আসতো, রাসূল সেই চুক্তিতে সানন্দে অংশ নিতেন, এমনকি যদি এই ধরনের চুক্তি কাফেরদের মধ্যে সংঘটিত হয়, তবুও। এখানে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে, তা হলো, মুসলিমরা সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে, চাই সেই ন্যায় একজন মুসলিমের পক্ষে বা কোনো অমুসলিমের পক্ষে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুসলিমরা হকের পক্ষ, নিপীড়িত মানুষের পক্ষ, মজলুমের পক্ষাবলম্বন করবে। মুহাম্মাদ মারা যাওয়ার অনেক বছর পরে একটি ঘটনার সূত্র ধরে আবারো হিলফুল ফুদুল এর নামটি চলে আসে। ঘটনাটা ঘটেছিল হুসাইন ইবন আলী ইবনে আবু তালিব এবং আল ওয়ালিদ ইবনে উকবা ইবনে আবু সুফিয়ানের মধ্যে। ওয়ালিদ ছিল মদীনার গভর্নর, সে তার ক্ষমতার জোরে অন্যায়ভাবে হুসাইনের কিছু সম্পত্তি নিয়ে দখল করে নেয়। হুসাইন ওয়ালিদের কাছে গিয়ে বললেন, 'শোনো, হয় তুমি আমার প্রাপ্য আমাকে ফেরত দিবে নয়তো আমি মসজিদের দিকে গিয়ে হিলফুল ফুদুলের ঘোষণা দিব। লোকদেরকে আমি হিলফুল ফুদুলের কথা স্মরণ করিয়ে দিব।'

আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের সে সময় ওয়ালিদের সাথেই ছিলেন। হুসাইনের মুখে হিলফুল ফুদুলের কথা শুনে তিনি বলে উঠলেন, 'তবে আমিও আল্লাহর নামে শপথ করছি, যদি হুসাইন হিলফুল ফুদুলের ডাক দেয়, আমি আমার তরবারি উন্মুক্ত করবো এবং তার পক্ষ নেব। যতক্ষণ সে ন্যায় বিচার না পাচ্ছে, আমরা যুদ্ধ করতে থাকবো। সে ন্যায়বিচার পেলে তবেই আমরা থামবো, নতুবা যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যাবো।' এই কথা পরে আরও কিছু মানুষের কানে গেল। তারাও উত্তেজিত হয়ে একই রকম বিবৃতি দিলো। ওয়ালিদ বুঝলো পরিস্থিতি মোটেও সুবিধার নয়, তাই সে তড়িঘড়ি করে হুসাইনের প্রাপ্য তাকে বুঝিয়ে দেয়। এই ঘটনার শিক্ষণীয় দিক হলো—মুসলিমরা কখনো কারো প্রতি জুলুম সহ্য করে না। তৎকালীন সময়ে মুসলিমরা একজন মুসলিম নেতা ওয়ালিদ ইবনে উকবার অধীনে ইসলামি ব্যবস্থার মধ্যেই বসবাস করতো, তবুও তারা হকের জন্য তাদের নেতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।

শাইখ মুহাম্মাদ গাজ্জালী এই ব্যাপারে মন্তব্য করেন, 'এই চুক্তি (হিলফুল ফুদুল) আমাদের সামনে একটি বিষয় তুলে ধরবে, রাত যত গভীর হোক না কেন, শাসক যতই অত্যাচারী হোক না কেন, উন্নত চরিত্র সবসময়ই কিছু না কিছু মানুষের মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। তারা সুবিচার এবং ন্যায়ের জন্য উঠে দাঁড়াবে। আল্লাহ তাআলা ভালো কাজে সহযোগিতা করাকে একজন মুসলিমের উপর একান্ত কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।'

"...সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।” (সূরা মায়িদা, ৫: ২)

যে কোনো মুসলিম দলের জন্য হিলফুল ফুযুল বা এ ধরনের কোনো চুক্তিতে অংশগ্রহণ বৈধ, কেননা, এ সকল চুক্তির আসল উদ্দেশ্যই হলো জুলুমের অপসারণ যা পালনের মাধ্যমে ইসলামি একটি দায়িত্বের বুনিয়াদ দৃঢ় হয়। মুসলিমদের জন্য অন্য ধর্মবিশ্বাসীদের সাথে যুলুমের অপসারণ কিংবা যালিমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার উদ্দেশ্যে চুক্তি করা বৈধ, যদি সেখানে ইসলামের জন্য এবং মুসলিমদের জন্য কোনো কল্যাণ থেকে থাকে। যেহেতু রাসূল ইসলামের আগমনের পরেও এই ধরনের চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, সুতরাং তা মুসলিমদের জন্যেও বৈধ।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 নবীজির ﷽ বৈবাহিক জীবন

📄 নবীজির ﷽ বৈবাহিক জীবন


নবীজি প্রথম বিয়ে করেছিলেন পঁচিশ বছর বয়সে। ন্যায়নীতিহীন একটি সমাজে থেকেও এই পঁচিশ বছর পর্যন্ত তিনি সৎ ও পবিত্র হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। নবুওয়াত পাওয়ার আগেও তাঁর জীবনে নারীঘটিত কিছু ছিল না। রাসূলুল্লাহর বৈবাহিক জীবন সম্পর্কে মুসলিমদের সঠিক ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি। রাসূলুল্লাহ তাঁর প্রথম স্ত্রী খাদিজার সাথে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত সংসার করেন। একজন পুরুষ যুবক বয়স থেকে পঞ্চাশ বছর পর্যন্তই সাধারণত নারীদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। এই বয়সটাতে পুরুষের চাহিদা থাকে সর্বাধিক। কিন্তু নবীজি তাঁর পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত কেবলমাত্র এক স্ত্রী নিয়েই সংসার করেছেন। যতদিন পর্যন্ত খাদিজা বেঁচে ছিলেন, ততদিন অন্য কোনো বিয়ে করেননি এবং খাদিজাকে নিয়েই তিনি অত্যন্ত খুশি ছিলেন। সুতরাং নবীজি নারীদের ব্যাপারে দুর্বল বা তিনি নারীলোভী ছিলেন—এই ধরনের কথা শুধু ভিত্তিহীনই নয়, বরং নির্ভেজাল মিথ্যাচার।

নবীজি প্রথম বিয়ে করেছিলেন পঁচিশ বছর বয়সে। ন্যায়নীতিহীন একটি সমাজে থেকেও এই পঁচিশ বছর পর্যন্ত তিনি সৎ ও পবিত্র হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। নবুওয়াত পাওয়ার আগেও তাঁর জীবনে নারীঘটিত কিছু ছিল না। রাসূলুল্লাহর বৈবাহিক জীবন সম্পর্কে মুসলিমদের সঠিক ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি। রাসূলুল্লাহ তাঁর প্রথম স্ত্রী খাদিজার সাথে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত সংসার করেন। একজন পুরুষ যুবক বয়স থেকে পঞ্চাশ বছর পর্যন্তই সাধারণত নারীদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। এই বয়সটাতে পুরুষের চাহিদা থাকে সর্বাধিক। কিন্তু নবীজি তাঁর পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত কেবলমাত্র এক স্ত্রী নিয়েই সংসার করেছেন। যতদিন পর্যন্ত খাদিজা বেঁচে ছিলেন, ততদিন অন্য কোনো বিয়ে করেননি এবং খাদিজাকে নিয়েই তিনি অত্যন্ত খুশি ছিলেন। সুতরাং নবীজি নারীদের ব্যাপারে দুর্বল বা তিনি নারীলোভী ছিলেন—এই ধরনের কথা শুধু ভিত্তিহীনই নয়, বরং নির্ভেজাল মিথ্যাচার।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 খাদিজার ؓ সাথে বিয়ে

📄 খাদিজার ؓ সাথে বিয়ে


যুবক বয়সে নবীজির জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো খাদিজার সাথে বিয়ে। খাদিজা মক্কার বিখ্যাত এক নারী, সম্ভ্রান্ত বংশের মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলা। তাঁর আগেও বিয়ে হয়েছিল। খাদিজার নিজস্ব ব্যবসা ছিল। সে সময় ব্যবসার কাজে প্রায়ই ইয়েমেন ও সিরিয়া যাতায়াত করা লাগতো। তিনি ব্যবসার কাজ সামলাবার জন্য বিভিন্ন লোক ভাড়া করতেন, নিজে ঘরের বাইরে গিয়ে ব্যবসা করতেন না। কুরাইশের লোকেরা শীত ও গ্রীষ্মে বছরের দুই সময়ে সফরে বের হতো একবার ইয়েমেনে, আরেকবার শামে। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল মক্কার সে সময়ের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, "কুরাইশদের নিরাপত্তার জন্য, শীত ও গ্রীষ্ম সফরে তাদের নিরাপত্তার জন্য।” (সূরা কুরাইশ, ১০৬: ১-২)

নবীজির সততা ও সত্যবাদিতার কথা তখন মক্কার দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর কথা শুনে খাদিজা তাঁকেই ব্যবসার কাজে নিয়োজিত করলেন। মুহাম্মাদ যখন শামে সফরের উদ্দেশ্যে বের হলেন, খাদিজা তাঁর দাস মায়সারাহকে তাঁর সঙ্গে পাঠালেন। তাঁরা দুজন শামে ব্যবসা শেষ করে ফিরে এলেন। মায়সারাহ খাদিজার কাছে তাদের সফরের বর্ণনা দিতে এসে মুহাম্মাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি বলেন, 'এই মানুষটার সততা ও বিশ্বস্ততা মুগ্ধ হওয়ার মতো!'

খাদিজা নবীজির কথা যত শুনছেন, ততই তাঁর প্রতি আগ্রহ বোধ করছেন। নবীজির চারিত্রিক গুণাবলি এমনই ছিল যে সবাইকে টানতো। খাদিজা, মক্কার একজন বিত্তশালী মহিলা, এক সাধারণ কর্মচারীর অসাধারণ চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। রাসূলুল্লাহ খাদিজার প্রস্তাব মেনে নিয়ে বিয়ের জন্য সম্মতি জানালেন। বিয়ের সময় নবীজির বয়স ছিল পঁচিশ, আর খাদিজার বয়স ছিল চল্লিশ। দুজনের বয়সের পার্থক্য পনেরো বছর, কিন্তু বয়সের এই সুবিশাল ফারাক তাদের বৈবাহিক জীবনে কোনো আঁচ ফেলতে পারে নি।

যুবক বয়সে নবীজির জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো খাদিজার সাথে বিয়ে। খাদিজা মক্কার বিখ্যাত এক নারী, সম্ভ্রান্ত বংশের মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলা। তাঁর আগেও বিয়ে হয়েছিল। খাদিজার নিজস্ব ব্যবসা ছিল। সে সময় ব্যবসার কাজে প্রায়ই ইয়েমেন ও সিরিয়া যাতায়াত করা লাগতো। তিনি ব্যবসার কাজ সামলাবার জন্য বিভিন্ন লোক ভাড়া করতেন, নিজে ঘরের বাইরে গিয়ে ব্যবসা করতেন না। কুরাইশের লোকেরা শীত ও গ্রীষ্মে বছরের দুই সময়ে সফরে বের হতো একবার ইয়েমেনে, আরেকবার শামে। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল মক্কার সে সময়ের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, "কুরাইশদের নিরাপত্তার জন্য, শীত ও গ্রীষ্ম সফরে তাদের নিরাপত্তার জন্য।” (সূরা কুরাইশ, ১০৬: ১-২)

নবীজির সততা ও সত্যবাদিতার কথা তখন মক্কার দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর কথা শুনে খাদিজা তাঁকেই ব্যবসার কাজে নিয়োজিত করলেন। মুহাম্মাদ যখন শামে সফরের উদ্দেশ্যে বের হলেন, খাদিজা তাঁর দাস মায়সারাহকে তাঁর সঙ্গে পাঠালেন। তাঁরা দুজন শামে ব্যবসা শেষ করে ফিরে এলেন। মায়সারাহ খাদিজার কাছে তাদের সফরের বর্ণনা দিতে এসে মুহাম্মাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি বলেন, 'এই মানুষটার সততা ও বিশ্বস্ততা মুগ্ধ হওয়ার মতো!'

খাদিজা নবীজির কথা যত শুনছেন, ততই তাঁর প্রতি আগ্রহ বোধ করছেন। নবীজির চারিত্রিক গুণাবলি এমনই ছিল যে সবাইকে টানতো। খাদিজা, মক্কার একজন বিত্তশালী মহিলা, এক সাধারণ কর্মচারীর অসাধারণ চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। রাসূলুল্লাহ খাদিজার প্রস্তাব মেনে নিয়ে বিয়ের জন্য সম্মতি জানালেন। বিয়ের সময় নবীজির বয়স ছিল পঁচিশ, আর খাদিজার বয়স ছিল চল্লিশ। দুজনের বয়সের পার্থক্য পনেরো বছর, কিন্তু বয়সের এই সুবিশাল ফারাক তাদের বৈবাহিক জীবনে কোনো আঁচ ফেলতে পারে নি।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 খাদিজার ؓ অনন্যতা

📄 খাদিজার ؓ অনন্যতা


খাদিজা বেঁচে থাকা অবস্থায় নবীজি আর কোনো বিয়ে করেননি। নবীজির বেঁচে থাকা সন্তানদের প্রত্যেকেই ছিলেন মা খাদিজার সন্তান। তাদের ছয় সন্তান—যায়নাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা, আল কাসিম আর আবদুল্লাহ। কেবল ফাতিমা বাদে বাকি সবাই নবীজির জীবদ্দশাতেই মারা যান। ফাতিমা ও আলী থেকেই নবীজির বংশের ধারা প্রবাহিত হয়। রাসূলুল্লাহ খাদিজাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। খাদিজার সাথে তাঁর বন্ধন, বিশ্বাস, প্রতিশ্রুতি মৃত্যুর পরেও ভাঙেনি। তিনি সবসময় তাঁকে মনে করতেন, তাঁর কথা বলতেন। আর এজন্য নবীজির অন্য স্ত্রীরা মৃত খাদিজাকে নিয়েও ঈর্ষা বোধ করতেন! তবুও নবীজিকে খাদিজার স্মরণ থেকে থামানো যেতো না। খাদিজার জন্য রাসূলুল্লাহর ভালোবাসা, আকর্ষণ, মমতা ও সম্মান ছিল সবচাইতে বেশি। কারণ তিনি খাদিজাকে সবসময় নিজের পাশে পেয়েছেন। যখন সবাই রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে কথা বলেছে, তখন সান্ত্বনা আর আশার কথা শুনিয়েছেন খাদিজা। তিনি নবীজিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন।

খাদিজার পর নবীজির সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী ছিলেন আ'ইশা। কিন্তু এই আ'ইশাও খাদিজার প্রতি ঈর্ষা বোধ করতেন। বুখারি ও মুসলিমের হাদীসে আছে যে, আ'ইশা বলেন, 'আমি খাদিজা ছাড়া নবীজির আর কোনো স্ত্রীকে নিয়ে এতটা ঈর্ষা অনুভব করিনি! এটা এজন্য নয় যে আমি তাকে কোনোদিন দেখিনি, বরং এটা এজন্য যে নবীজির তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। '

নবীজি মাঝে মাঝে একটা ভেড়া জবাই করে বলতেন, 'এই ভেড়ার মাংস খাদিজার বান্ধবীদের জন্য পাঠিয়ে দাও।' নবীজি যে কেবল খাদিজার নাম বারবার উল্লেখ করতেন তাই নয়, তিনি খাদিজা মারা হবার পরেও তাঁর বান্ধবীদের সাথে সৌহার্দ্য বজায় রেখেছেন। এটা তিনি করতেন খাদিজার প্রতি ভালোবাসা থেকে। এমনটা করতে দেখে আইশা বেশ ঈর্ষা বোধ করতেন, একদিন বলেই ফেললেন, 'শুধু খাদিজা আর খাদিজা!' তখন নবীজি বললেন, 'মহান আল্লাহ তাআলাই আমার অন্তরে খাদিজার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে দিয়েছেন। ' এই ভালোবাসার নিয়ন্ত্রণ রাসূলুল্লাহর হাতে ছিল না, এটা সম্পূর্ণ আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ তাআলাই তাঁর অন্তরে খাদিজার জন্য বিশেষ স্থান তৈরি করে দিয়েছেন।

ইমাম আহমাদ ও তিরমিযী থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে আছে, আ'ইশা বলেন, 'এমন অনেক দিন হয়েছে যে, খাদিজার প্রশংসা না করে নবীজি ঘর থেকে বের হোন নি! একদিন এভাবে তিনি খাদিজার প্রশংসা করছিলেন। আমি আর সহ্য করতে না পেরে বলে উঠলাম, 'তিনি কী এমন ছিলেন? তিনি তো একজন বয়স্ক মহিলা মাত্র। তাঁর চেয়েও উত্তম নারী দিয়ে কি আল্লাহ তাআলা আপনার স্ত্রীর স্থান পূরণ করে দেননি?' এ কথা শোনামাত্র নবীজি রেগে যান। রাগত স্বরে বলেন, 'না, আল্লাহর শপথ, তিনি খাদিজার চাইতে উত্তম আর কাউকেই আমার জীবনে আনেননি। যখন সবাই আমাকে অস্বীকার করেছে, তখন সে আমার ওপর আস্থা রেখেছে। যখন সবাই আমাকে মিথ্যুক ডেকেছে, তখন সে আমাকে বিশ্বাস করেছে। যখন সবাই আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন সে, তাঁর সবকিছু দিয়ে আমাকে স্বস্তি দিয়েছে। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে আমার ওপর রহমত দিয়েছেন, আমাকে তাঁর থেকে সন্তান দান করেছেন।'

কেউ খাদিজার বিরুদ্ধে টু শব্দ করামাত্র নবীজি রেগে যেতেন। নবীজির চরিত্রের এই দিকটি থেকে একটি ব্যাপার বোঝা যায়, আর তা হলো—আপন মানুষদের জন্য নবীজির কদর। তিনি সবসময় তাদেরকে বিশেষ স্থান দিয়েছেন। খাদিজা মারা যাবার বহুবছর পরেও তিনি তাঁকে স্মরণ করতেন। হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব, মুসআব ইবন উমাইর, খাদিজা—এদের সবাইকে তিনি স্মরণ করতেন। মৃত্যুর ঠিক আগে নবীজি একটি কাজ করেছিলেন। তিনি উহুদের শহীদ সাহাবাদের কবর যিয়ারত করতে যান। নবীজির ৭০ জন সঙ্গী সেই যুদ্ধে শহীদ হয়েছিল। তাই যখনই নবীজি বুঝতে পারেন যে, তাঁর হাতে আর বেশিদিন বাকি নেই, তিনি সেখানে গিয়ে তাদের সবার জন্য দুআ করলেন, এবং দুআর মাঝে বললেন, 'শীঘ্রই আমাদের দেখা হবে।'

নবীজি তাদেরকে অসম্ভব ভালোবাসতেন, নিজের পাশে তাদের অভাব অনুভব করতেন। তাই আল্লাহর কাছে দুআ করেন, যেন আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তাঁকে তাদের সাথে মিলিত করে দেন। তিনি তাঁর কোনো সঙ্গীকে ভুলে যাননি। তাদেরকে আজীবন স্মরণ রেখেছেন। তেমনি করেই মনে রেখেছেন নিজের স্ত্রী খাদিজার কথা, যিনি তাঁর দুঃসময়ের সঙ্গী। তিনি নিয়মিত খাদিজার জন্য দুআ চাইতেন, ঘুরেফিরে তাঁর কথাই বলতেন। খাদিজা আসলেই ছিলেন একজন বিশেষ ব্যক্তি। তিনি বেঁচে থাকতে একবার জিবরীল নবীজির কাছে এসে বললেন, 'এখন খাদিজা আপনার কাছে আসবেন। তিনি আপনার খাবার নিয়ে আসছেন। যখন তিনি আসবেন, তাঁকে বলবেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে সালাম দিয়েছেন। সেই সাথে বলবেন যে, আমিও তাঁকে সালাম জানিয়েছি।' খাদিজার মর্যাদা এতোটাই অসামান্য ছিল যে স্বয়ং আল্লাহ আযযা ওয়াজাল তাঁকে সালাম দেওয়ার জন্য জিবরীলকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর জিবরীল নিজের পক্ষ থেকেও তাঁকে সালাম জানিয়েছেন। এরপর জিবরীল বলেন, 'খাদিজাকে জান্নাতের বাড়ির সুসংবাদ দিন!'

খাদিজা হলেন জান্নাতী রমণী। পৃথিবীর বুকে সবচাইতে মর্যাদাসম্পন্ন চারজন নারীর একজন হলেন মা খাদিজা। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'দুনিয়ার মাঝে শ্রেষ্ঠ নারী চারজন। মারইয়াম বিনতে ইমরান, খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ এবং আসিয়া ইবন মুযাহিম।' এই চারজনের মাঝে সেরা হলেন, মারইয়াম। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল সূরা আলে-ইমরানে বলেন, "আর স্মরণ কর, যখন ফেরেশতারা বললো, হে মারইয়াম, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন ও পবিত্র করেছেন। আর তোমাকে বিশ্ব নারী সমাজের ঊর্ধ্বে মনোনীত করেছেন।" (সূরা আলে ইমরান, ৩: ৪২) এরপর দ্বিতীয় স্থানে আছেন খাদিজা। তারপর ফাতিমা এবং চার নম্বরে আসিয়া বিনতে মুযাহিম। এই চারজনের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো নবীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। এদের মাঝে দুইজন ছিলেন নবীদের মা বা নবীদের বড় করেছেন—মারইয়াম এবং আসিয়া। মারইয়াম ছিলেন নবী ঈসার মা আর আসিয়া নবী মূসাকে লালনপালন করেন। খাদিজা ছিলেন একজন নবীর স্ত্রী এবং ফাতিমা একজন নবীর কন্যা।

এই চার নারীর মধ্যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
এক, তাদের নিরেট ঈমান। তাদের ঈমান ছিল শক্তিশালী। অন্তর ছিল ঈমানে পরিপূর্ণ। আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাস এত দৃঢ় ছিল যে কোনোকিছুই হৃদয়ে সন্দেহের জন্ম দিতে পারতো না। তাদের প্রবল ঈমানকে টলাবার সাধ্য কারো ছিল না। তাদের ঈমান মূলত ইয়াকীনের পর্যায়ে ছিল। দেখা জগতের তুলনায় অদেখা জগৎটার প্রতিই তাদের বিশ্বাস ও আস্থা বেশি ছিল—যে গায়েবকে তারা কখনও দেখেননি বা শোনেননি, সেই "গায়েব” জগৎটাই ছিল তাদের বেশি প্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত। যেমন ফির'আউনের স্ত্রী আসিয়া, তাঁর কী-ই না ছিল! একজন নারী দুনিয়ার যা কিছু চাইতে পারে সে সবই তাঁর ছিল। সম্পদ, ক্ষমতা, 'টাকাওয়ালা' স্বামী, ফাই-ফরমাশ খাটার জন্য নিয়োজিত চাকর-চাকরানীর দল। অথচ তিনি এ সবকিছু আল্লাহর জন্য ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে চমৎকার এক স্থানে, রানীর হালে থাকার সুযোগ দিয়েছেন আর আসিয়া বলেছেন তিনি এসবের কিছুই চান না, তিনি চান কেবল জান্নাতের একটি ঘর। "আল্লাহ তাআলা মু'মিনদের জন্যে ফির'আউনের স্ত্রীর এক দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে বলেছিল, হে আমার রব, আপনার কাছে জান্নাতে আমার জন্যে একটি ঘর নির্মাণ করুন, আমাকে ফিরআরউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।” (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬: ১১) আসিয়া দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব চাননি। তিনি ফিরআউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে মুক্তি চেয়েছেন। এটাই দেখিয়ে দেয় তার ঈমান কত প্রবল, কত গভীর। অত্যন্ত নীতিহীন এবং কলুষিত সমাজের একজন বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তিনি এ সব কিছু থেকে নিজেকে পবিত্র রেখেছিলেন এবং তাঁর হৃদয়কে আল্লাহর সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন। বাকি তিন জন নারীর ক্ষেত্রেও তা বলা যায়।

দুই, তাদের সবার মধ্যে দ্বিতীয় যে বিষয়টি লক্ষ করা যায় তা হলো তারা প্রত্যেকে ছিলেন ভালো স্ত্রী বা ভালো মা। নারীবাদীরা এ বিষয়টি ভালো চোখে নাও দেখতে পারে। এই চার নারী কিন্তু তাদের ক্যারিয়ার, সংস্কার কার্যক্রম, আন্দোলন কিংবা জ্ঞানের কারণে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেননি। আসিয়া এবং মারইয়াম এই দুইজনের ঘরে প্রতিপালিত হয়েছিল দুই শ্রেষ্ঠ নবী, মূসা এবং ঈসা। খাদিজার অনন্যতার পেছনে রয়েছে তাঁর স্বামী নবী মুহাম্মাদের প্রতি তাঁর সর্বাত্মক সহযোগিতা ও সমর্থন। তিনি বড় ব্যবসায়ী ছিলেন সত্যি, তবে এজন্য তিনি শ্রেষ্ঠ নন, তিনি শ্রেষ্ঠ কারণ—যখনই প্রয়োজন হয়েছে, তখনই তিনি তাঁর স্বামীর পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁকে স্বস্তি দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে মা খাদিজা ছিলেন একজন চমৎকার স্ত্রী।

ফাতিমাও এমন একজন ব্যতিক্রমী স্ত্রী। একবার আলী শুনলেন রাসূল কিছু দাস পেয়েছেন, তিনি ও তাঁর স্ত্রী ভাবলেন নবীজির কাছে একটা দাস চাইবেন। নবীজিকে ঘরে পাওয়া গেল না, তারা মা আ'ইশার কাছে বিষয়টি জানিয়ে ফিরে আসেন। রাসূল ঘরে ফিরে সব কথা শুনলেন। আলী ও ফাতিমার বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। এই হাদীসটি আলী ইবন আবি তালিব নিজে বর্ণনা করেছেন, তাঁর ভাষায়— "নবীজি আমাদের ঘরে আসলেন। আমরা তখন শুয়ে ছিলাম। তাঁকে দেখামাত্র আমরা শোয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেলাম। রাসূল বললেন, যেমন ছিলে থাকো। তিনি এসে আমার আর ফাতিমার মাঝে বসলেন, আমরা দুজনেই তাঁর গা ঘেষে বিছানায় শুয়ে আছি।" রাসূল তাঁর মেয়ে ফাতিমাকে এত ভালবাসতেন যে তিনি একবার বলেছিলেন, 'ফাতিমা আমারই অংশ, কেউ যদি তাঁকে কষ্ট দেয়, সে আমাকেও কষ্ট দেয়। কেউ যদি তাঁকে আনন্দ দেয়, তাতে আমিও আনন্দিত হই।' রাসূলুল্লাহর সন্তানদের মধ্যে একমাত্র ফাতিমাই বেঁচে ছিলেন আর তিনি তাঁকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। তিনি তাঁর মেয়ের জন্য সবচেয়ে ভালোটাই চাইতেন। তিনি চাইলেই পারতেন একজন ভৃত্য তাদের ঘরে নিযুক্ত করতে, কিন্তু তিনি তা করেননি।

তিনি বললেন, "তোমাদের দেওয়ার জন্য দাস থেকেও ভালো কিছু আমার কাছে আছে। তোমরা রাতে ঘুমুবার আগে, সুবহানআল্লাহ তেত্রিশ বার, আলহামদুলিল্লাহ তেত্রিশ বার এবং আল্লাহু আকবর তেত্রিশ বার করে পড়বে। এটা তোমাদের জন্য একটা ভৃত্য রাখা অপেক্ষা উত্তম।" রাসূল জানতেন তাঁর কন্যা হচ্ছেন সেরাদেরও সেরা। তিনি জানতেন কাজ করতে করতে ফাতিমার হাতগুলো রুক্ষ হয়ে গিয়েছিল, তিনি জানতেন তাঁর হাতের চামড়াগুলো খসখসে হয়ে গিয়েছিল, তারপরেও তিনি তাঁকে তাসবীহ উপহার দিয়েছিলেন, ভৃত্য নয়। আলী ইবন আবি তালিবের থেকেই তাঁর স্ত্রীর বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, 'ফাতিমা খুবই কঠোর পরিশ্রম করতেন, যাঁতাকলে কাজ করার কারণে ওঁর হাত রুক্ষ, খসখসে হয়ে যায়। কুয়া থেকে পানি তুলতে তুলতে ওঁর ঘাড়ে দাগ পড়ে যেতো, ঘর পরিষ্কার করতে করতে ওঁর পোশাক ময়লা হয়ে পড়ত।' এই ছিল পৃথিবীর সেরা মানুষটির কন্যার অবস্থা। আর এর কারণেই তিনি ছিলেন চার সেরা নারীর একজন। জ্ঞান বা মেধার বিবেচনায় আ'ইশা ছিলেন খাদিজা ও ফাতিমার থেকে অনেক অনেক এগিয়ে, তথাপি তিনি ফাতিমা বা খাদিজার সমান সম্মাননা অর্জন করেননি।

টিকাঃ
১৪. তিরমিযী, অধ্যায় তাক্বওয়া এবং আত্বীয়দের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা, হাদীস ১২৩।
১৫. সহীহ মুসলিম অধ্যায় সাহাবিদের মর্যাদা, হাদীস ১০৮।

খাদিজা বেঁচে থাকা অবস্থায় নবীজি আর কোনো বিয়ে করেননি। নবীজির বেঁচে থাকা সন্তানদের প্রত্যেকেই ছিলেন মা খাদিজার সন্তান। তাদের ছয় সন্তান—যায়নাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা, আল কাসিম আর আবদুল্লাহ। কেবল ফাতিমা বাদে বাকি সবাই নবীজির জীবদ্দশাতেই মারা যান। ফাতিমা ও আলী থেকেই নবীজির বংশের ধারা প্রবাহিত হয়। রাসূলুল্লাহ খাদিজাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। খাদিজার সাথে তাঁর বন্ধন, বিশ্বাস, প্রতিশ্রুতি মৃত্যুর পরেও ভাঙেনি। তিনি সবসময় তাঁকে মনে করতেন, তাঁর কথা বলতেন। আর এজন্য নবীজির অন্য স্ত্রীরা মৃত খাদিজাকে নিয়েও ঈর্ষা বোধ করতেন! তবুও নবীজিকে খাদিজার স্মরণ থেকে থামানো যেতো না। খাদিজার জন্য রাসূলুল্লাহর ভালোবাসা, আকর্ষণ, মমতা ও সম্মান ছিল সবচাইতে বেশি। কারণ তিনি খাদিজাকে সবসময় নিজের পাশে পেয়েছেন। যখন সবাই রাসূলুল্লাহর বিরুদ্ধে কথা বলেছে, তখন সান্ত্বনা আর আশার কথা শুনিয়েছেন খাদিজা। তিনি নবীজিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন।

খাদিজার পর নবীজির সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী ছিলেন আ'ইশা। কিন্তু এই আ'ইশাও খাদিজার প্রতি ঈর্ষা বোধ করতেন। বুখারি ও মুসলিমের হাদীসে আছে যে, আ'ইশা বলেন, 'আমি খাদিজা ছাড়া নবীজির আর কোনো স্ত্রীকে নিয়ে এতটা ঈর্ষা অনুভব করিনি! এটা এজন্য নয় যে আমি তাকে কোনোদিন দেখিনি, বরং এটা এজন্য যে নবীজির তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। '

নবীজি মাঝে মাঝে একটা ভেড়া জবাই করে বলতেন, 'এই ভেড়ার মাংস খাদিজার বান্ধবীদের জন্য পাঠিয়ে দাও।' নবীজি যে কেবল খাদিজার নাম বারবার উল্লেখ করতেন তাই নয়, তিনি খাদিজা মারা হবার পরেও তাঁর বান্ধবীদের সাথে সৌহার্দ্য বজায় রেখেছেন। এটা তিনি করতেন খাদিজার প্রতি ভালোবাসা থেকে। এমনটা করতে দেখে আইশা বেশ ঈর্ষা বোধ করতেন, একদিন বলেই ফেললেন, 'শুধু খাদিজা আর খাদিজা!' তখন নবীজি বললেন, 'মহান আল্লাহ তাআলাই আমার অন্তরে খাদিজার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করে দিয়েছেন। ' এই ভালোবাসার নিয়ন্ত্রণ রাসূলুল্লাহর হাতে ছিল না, এটা সম্পূর্ণ আল্লাহর পক্ষ থেকে। আল্লাহ তাআলাই তাঁর অন্তরে খাদিজার জন্য বিশেষ স্থান তৈরি করে দিয়েছেন।

ইমাম আহমাদ ও তিরমিযী থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদীসে আছে, আ'ইশা বলেন, 'এমন অনেক দিন হয়েছে যে, খাদিজার প্রশংসা না করে নবীজি ঘর থেকে বের হোন নি! একদিন এভাবে তিনি খাদিজার প্রশংসা করছিলেন। আমি আর সহ্য করতে না পেরে বলে উঠলাম, 'তিনি কী এমন ছিলেন? তিনি তো একজন বয়স্ক মহিলা মাত্র। তাঁর চেয়েও উত্তম নারী দিয়ে কি আল্লাহ তাআলা আপনার স্ত্রীর স্থান পূরণ করে দেননি?' এ কথা শোনামাত্র নবীজি রেগে যান। রাগত স্বরে বলেন, 'না, আল্লাহর শপথ, তিনি খাদিজার চাইতে উত্তম আর কাউকেই আমার জীবনে আনেননি। যখন সবাই আমাকে অস্বীকার করেছে, তখন সে আমার ওপর আস্থা রেখেছে। যখন সবাই আমাকে মিথ্যুক ডেকেছে, তখন সে আমাকে বিশ্বাস করেছে। যখন সবাই আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তখন সে, তাঁর সবকিছু দিয়ে আমাকে স্বস্তি দিয়েছে। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে আমার ওপর রহমত দিয়েছেন, আমাকে তাঁর থেকে সন্তান দান করেছেন।'

কেউ খাদিজার বিরুদ্ধে টু শব্দ করামাত্র নবীজি রেগে যেতেন। নবীজির চরিত্রের এই দিকটি থেকে একটি ব্যাপার বোঝা যায়, আর তা হলো—আপন মানুষদের জন্য নবীজির কদর। তিনি সবসময় তাদেরকে বিশেষ স্থান দিয়েছেন। খাদিজা মারা যাবার বহুবছর পরেও তিনি তাঁকে স্মরণ করতেন। হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব, মুসআব ইবন উমাইর, খাদিজা—এদের সবাইকে তিনি স্মরণ করতেন। মৃত্যুর ঠিক আগে নবীজি একটি কাজ করেছিলেন। তিনি উহুদের শহীদ সাহাবাদের কবর যিয়ারত করতে যান। নবীজির ৭০ জন সঙ্গী সেই যুদ্ধে শহীদ হয়েছিল। তাই যখনই নবীজি বুঝতে পারেন যে, তাঁর হাতে আর বেশিদিন বাকি নেই, তিনি সেখানে গিয়ে তাদের সবার জন্য দুআ করলেন, এবং দুআর মাঝে বললেন, 'শীঘ্রই আমাদের দেখা হবে।'

নবীজি তাদেরকে অসম্ভব ভালোবাসতেন, নিজের পাশে তাদের অভাব অনুভব করতেন। তাই আল্লাহর কাছে দুআ করেন, যেন আল্লাহ তাআলা জান্নাতে তাঁকে তাদের সাথে মিলিত করে দেন। তিনি তাঁর কোনো সঙ্গীকে ভুলে যাননি। তাদেরকে আজীবন স্মরণ রেখেছেন। তেমনি করেই মনে রেখেছেন নিজের স্ত্রী খাদিজার কথা, যিনি তাঁর দুঃসময়ের সঙ্গী। তিনি নিয়মিত খাদিজার জন্য দুআ চাইতেন, ঘুরেফিরে তাঁর কথাই বলতেন। খাদিজা আসলেই ছিলেন একজন বিশেষ ব্যক্তি। তিনি বেঁচে থাকতে একবার জিবরীল নবীজির কাছে এসে বললেন, 'এখন খাদিজা আপনার কাছে আসবেন। তিনি আপনার খাবার নিয়ে আসছেন। যখন তিনি আসবেন, তাঁকে বলবেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে সালাম দিয়েছেন। সেই সাথে বলবেন যে, আমিও তাঁকে সালাম জানিয়েছি।' খাদিজার মর্যাদা এতোটাই অসামান্য ছিল যে স্বয়ং আল্লাহ আযযা ওয়াজাল তাঁকে সালাম দেওয়ার জন্য জিবরীলকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর জিবরীল নিজের পক্ষ থেকেও তাঁকে সালাম জানিয়েছেন। এরপর জিবরীল বলেন, 'খাদিজাকে জান্নাতের বাড়ির সুসংবাদ দিন!'

খাদিজা হলেন জান্নাতী রমণী। পৃথিবীর বুকে সবচাইতে মর্যাদাসম্পন্ন চারজন নারীর একজন হলেন মা খাদিজা। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'দুনিয়ার মাঝে শ্রেষ্ঠ নারী চারজন। মারইয়াম বিনতে ইমরান, খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ, ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ এবং আসিয়া ইবন মুযাহিম।' এই চারজনের মাঝে সেরা হলেন, মারইয়াম। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল সূরা আলে-ইমরানে বলেন, "আর স্মরণ কর, যখন ফেরেশতারা বললো, হে মারইয়াম, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন ও পবিত্র করেছেন। আর তোমাকে বিশ্ব নারী সমাজের ঊর্ধ্বে মনোনীত করেছেন।" (সূরা আলে ইমরান, ৩: ৪২) এরপর দ্বিতীয় স্থানে আছেন খাদিজা। তারপর ফাতিমা এবং চার নম্বরে আসিয়া বিনতে মুযাহিম। এই চারজনের প্রত্যেকেই কোনো না কোনো নবীর সাথে সম্পর্কযুক্ত। এদের মাঝে দুইজন ছিলেন নবীদের মা বা নবীদের বড় করেছেন—মারইয়াম এবং আসিয়া। মারইয়াম ছিলেন নবী ঈসার মা আর আসিয়া নবী মূসাকে লালনপালন করেন। খাদিজা ছিলেন একজন নবীর স্ত্রী এবং ফাতিমা একজন নবীর কন্যা।

এই চার নারীর মধ্যে সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
এক, তাদের নিরেট ঈমান। তাদের ঈমান ছিল শক্তিশালী। অন্তর ছিল ঈমানে পরিপূর্ণ। আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাস এত দৃঢ় ছিল যে কোনোকিছুই হৃদয়ে সন্দেহের জন্ম দিতে পারতো না। তাদের প্রবল ঈমানকে টলাবার সাধ্য কারো ছিল না। তাদের ঈমান মূলত ইয়াকীনের পর্যায়ে ছিল। দেখা জগতের তুলনায় অদেখা জগৎটার প্রতিই তাদের বিশ্বাস ও আস্থা বেশি ছিল—যে গায়েবকে তারা কখনও দেখেননি বা শোনেননি, সেই "গায়েব” জগৎটাই ছিল তাদের বেশি প্রিয় ও কাঙ্ক্ষিত। যেমন ফির'আউনের স্ত্রী আসিয়া, তাঁর কী-ই না ছিল! একজন নারী দুনিয়ার যা কিছু চাইতে পারে সে সবই তাঁর ছিল। সম্পদ, ক্ষমতা, 'টাকাওয়ালা' স্বামী, ফাই-ফরমাশ খাটার জন্য নিয়োজিত চাকর-চাকরানীর দল। অথচ তিনি এ সবকিছু আল্লাহর জন্য ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে চমৎকার এক স্থানে, রানীর হালে থাকার সুযোগ দিয়েছেন আর আসিয়া বলেছেন তিনি এসবের কিছুই চান না, তিনি চান কেবল জান্নাতের একটি ঘর। "আল্লাহ তাআলা মু'মিনদের জন্যে ফির'আউনের স্ত্রীর এক দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছেন। সে বলেছিল, হে আমার রব, আপনার কাছে জান্নাতে আমার জন্যে একটি ঘর নির্মাণ করুন, আমাকে ফিরআরউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।” (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬: ১১) আসিয়া দুনিয়ার বিত্ত-বৈভব চাননি। তিনি ফিরআউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে মুক্তি চেয়েছেন। এটাই দেখিয়ে দেয় তার ঈমান কত প্রবল, কত গভীর। অত্যন্ত নীতিহীন এবং কলুষিত সমাজের একজন বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তিনি এ সব কিছু থেকে নিজেকে পবিত্র রেখেছিলেন এবং তাঁর হৃদয়কে আল্লাহর সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন। বাকি তিন জন নারীর ক্ষেত্রেও তা বলা যায়।

দুই, তাদের সবার মধ্যে দ্বিতীয় যে বিষয়টি লক্ষ করা যায় তা হলো তারা প্রত্যেকে ছিলেন ভালো স্ত্রী বা ভালো মা। নারীবাদীরা এ বিষয়টি ভালো চোখে নাও দেখতে পারে। এই চার নারী কিন্তু তাদের ক্যারিয়ার, সংস্কার কার্যক্রম, আন্দোলন কিংবা জ্ঞানের কারণে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেননি। আসিয়া এবং মারইয়াম এই দুইজনের ঘরে প্রতিপালিত হয়েছিল দুই শ্রেষ্ঠ নবী, মূসা এবং ঈসা। খাদিজার অনন্যতার পেছনে রয়েছে তাঁর স্বামী নবী মুহাম্মাদের প্রতি তাঁর সর্বাত্মক সহযোগিতা ও সমর্থন। তিনি বড় ব্যবসায়ী ছিলেন সত্যি, তবে এজন্য তিনি শ্রেষ্ঠ নন, তিনি শ্রেষ্ঠ কারণ—যখনই প্রয়োজন হয়েছে, তখনই তিনি তাঁর স্বামীর পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁকে স্বস্তি দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে মা খাদিজা ছিলেন একজন চমৎকার স্ত্রী।

ফাতিমাও এমন একজন ব্যতিক্রমী স্ত্রী। একবার আলী শুনলেন রাসূল কিছু দাস পেয়েছেন, তিনি ও তাঁর স্ত্রী ভাবলেন নবীজির কাছে একটা দাস চাইবেন। নবীজিকে ঘরে পাওয়া গেল না, তারা মা আ'ইশার কাছে বিষয়টি জানিয়ে ফিরে আসেন। রাসূল ঘরে ফিরে সব কথা শুনলেন। আলী ও ফাতিমার বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। এই হাদীসটি আলী ইবন আবি তালিব নিজে বর্ণনা করেছেন, তাঁর ভাষায়— "নবীজি আমাদের ঘরে আসলেন। আমরা তখন শুয়ে ছিলাম। তাঁকে দেখামাত্র আমরা শোয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গেলাম। রাসূল বললেন, যেমন ছিলে থাকো। তিনি এসে আমার আর ফাতিমার মাঝে বসলেন, আমরা দুজনেই তাঁর গা ঘেষে বিছানায় শুয়ে আছি।" রাসূল তাঁর মেয়ে ফাতিমাকে এত ভালবাসতেন যে তিনি একবার বলেছিলেন, 'ফাতিমা আমারই অংশ, কেউ যদি তাঁকে কষ্ট দেয়, সে আমাকেও কষ্ট দেয়। কেউ যদি তাঁকে আনন্দ দেয়, তাতে আমিও আনন্দিত হই।' রাসূলুল্লাহর সন্তানদের মধ্যে একমাত্র ফাতিমাই বেঁচে ছিলেন আর তিনি তাঁকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। তিনি তাঁর মেয়ের জন্য সবচেয়ে ভালোটাই চাইতেন। তিনি চাইলেই পারতেন একজন ভৃত্য তাদের ঘরে নিযুক্ত করতে, কিন্তু তিনি তা করেননি।

তিনি বললেন, "তোমাদের দেওয়ার জন্য দাস থেকেও ভালো কিছু আমার কাছে আছে। তোমরা রাতে ঘুমুবার আগে, সুবহানআল্লাহ তেত্রিশ বার, আলহামদুলিল্লাহ তেত্রিশ বার এবং আল্লাহু আকবর তেত্রিশ বার করে পড়বে। এটা তোমাদের জন্য একটা ভৃত্য রাখা অপেক্ষা উত্তম।" রাসূল জানতেন তাঁর কন্যা হচ্ছেন সেরাদেরও সেরা। তিনি জানতেন কাজ করতে করতে ফাতিমার হাতগুলো রুক্ষ হয়ে গিয়েছিল, তিনি জানতেন তাঁর হাতের চামড়াগুলো খসখসে হয়ে গিয়েছিল, তারপরেও তিনি তাঁকে তাসবীহ উপহার দিয়েছিলেন, ভৃত্য নয়। আলী ইবন আবি তালিবের থেকেই তাঁর স্ত্রীর বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, 'ফাতিমা খুবই কঠোর পরিশ্রম করতেন, যাঁতাকলে কাজ করার কারণে ওঁর হাত রুক্ষ, খসখসে হয়ে যায়। কুয়া থেকে পানি তুলতে তুলতে ওঁর ঘাড়ে দাগ পড়ে যেতো, ঘর পরিষ্কার করতে করতে ওঁর পোশাক ময়লা হয়ে পড়ত।' এই ছিল পৃথিবীর সেরা মানুষটির কন্যার অবস্থা। আর এর কারণেই তিনি ছিলেন চার সেরা নারীর একজন। জ্ঞান বা মেধার বিবেচনায় আ'ইশা ছিলেন খাদিজা ও ফাতিমার থেকে অনেক অনেক এগিয়ে, তথাপি তিনি ফাতিমা বা খাদিজার সমান সম্মাননা অর্জন করেননি।

টিকাঃ
১৪. তিরমিযী, অধ্যায় তাক্বওয়া এবং আত্বীয়দের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা, হাদীস ১২৩।
১৫. সহীহ মুসলিম অধ্যায় সাহাবিদের মর্যাদা, হাদীস ১০৮।

ফন্ট সাইজ
15px
17px