📄 মেষপালন: সকল নবীর পেশা
নবীর প্রথম পেশা ছিল মেষপালন। তিনি বলেন, 'আল্লাহ এমন কোনো নবী পাঠাননি যিনি মেষপালক ছিলেন না।' তাঁর সাথীরা জিজ্ঞেস করেন, 'আর আপনি?' তিনি বলেন, 'হ্যাঁ, আমিও মাঠে ভেড়া চরাতাম আর মক্কার লোকদের কাছ থেকে এই কাজের জন্য বিনিময় নিতাম।'
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো প্রত্যেক নবীই একজন মেষপালক ছিলেন। আল্লাহ তাআলা সব নবীকেই এই কাজটির মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। মেষচালনা থেকে নবীগণ অনেকগুলো শিক্ষা লাভ করেছিলেন। প্রথমত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হলো দায়িত্ববোধ। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'তোমরা সকলেই হলে মেষপালক এবং তোমরা তোমাদের পালের ব্যাপারে দায়িত্ববান।' উদাহরণস্বরূপ, মুসলিমদের জন্য দায়িত্বশীল হলেন তাদের ইমাম, পরিবারের জন্য দায়িত্বশীল পরিবারের কর্তা ইত্যাদি। প্রত্যেক ব্যক্তিই কোনো না কোনো কিছুর ব্যাপারে বা অন্যের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। একজন নেতার জন্য দায়িত্বশীলতা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নেতা তার দলের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে উম্মাহর নেতা হিসেবে প্রেরণ করেছেন তাই তাঁরা তাদের উম্মাহর জন্য হিসাব দিতে বাধ্য থাকবেন।
দ্বিতীয়ত, মেষপালন তাদেরকে ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। ভেড়াদেরকে মাঠে চরানো একটি সময়সাপেক্ষ বিষয়। তারা খুবই ধীরস্থির প্রাণী, সময় নিয়ে আস্তে আস্তে সবকিছু করে। পশুপালককেও তাদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কখনো ভেড়াগুলো নিজেদের মধ্যেই মারামারি লাগিয়ে দেয়, আবার কখনো বা একে অপরের সাথে খেলা করে। কিন্তু মেষপালককে ধৈর্য ধরে সবকিছু লক্ষ রাখতে হয়। সে তাদেরকে এ কথা বলতে পারবে না যে, 'আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, তোমরা তাড়াতাড়ি করো।' ভেড়ারা তাদের মর্জি অনুযায়ী ঢিলেমি করবে। মেষপালকেরা সাধারণত সকালে বের হয়, আর ফেরে সন্ধ্যাবেলায়, সূর্য অস্ত যাবার সময়। আল্লাহ তাআলা সকল নবীকে মেষপালকের দায়িত্ব দিয়ে গড়ে তুলেছেন যেন তাদের মধ্যে ধৈর্যের অনুশীলন গড়ে ওঠে, যেন তাঁরা উম্মাহর ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করতে পারেন। নবী মূসার সাথে তাঁর উম্মাহর লোকেরা যা করেছিল, তা ছিল রীতিমতো অসহনীয়। এই খুবই দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মত চরিত্র গঠনের জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁকে দিয়েই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে মেষপালন করান, দীর্ঘ দশ বছর। নূহ সুদীর্ঘ ৯৫০ বছর দাওয়াহর কাজে ব্যয় করেন, এরপরও তিনি ধৈর্য হারাননি। সকল উপায়ে চেষ্টা চালিয়েছেন, "আমি চেষ্টা করেছি প্রকাশ্যে এবং গোপনে। আমি চেষ্টা করেছি দিনে ও রাতে। আমি চেষ্টা করেছি প্রত্যেক উপায়ে। এবং তারা আমার বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।” (সূরা নূহ, ৭১: ৩)
তৃতীয়ত, সুরক্ষা প্রদান, মেষপালকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো তাদের ভেড়ার পালকে বিপদাপদ থেকে রক্ষা করা। ভেড়ার পালে নেকড়ে বা অন্য পশু হামলা করতে পারে, তাদের রোগবালাই হতে পারে। মেষপালক সর্বদাই তাদেরকে এটা নিশ্চিত করে যে তারা সকল প্রকার আশঙ্কামুক্ত। আল্লাহর নবীরাও অনুরূপ। তাঁরা উম্মাহকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। তাদেরকে শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রকার বিপদ থেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করেন। একবার মদীনায় রাতে হঠাৎ হৈ চৈ শুরু হয়। হৈ চৈ শুনে কিছু সাহাবা অস্ত্র নিয়ে ঘোড়া চালিয়ে সবেগে সেখানে শব্দের উৎসের দিকে ছুটে যান। তাঁরা সেখানে পৌঁছে আশ্চর্য হয়ে দেখলেন যে, রাসূলুল্লাহ ইতিমধ্যেই সেখান থেকে ফিরে আসছেন আর তাদেরকে জানালেন সবকিছু ঠিকঠাক আছে। সাহাবীরা খুব তাড়াহুড়ো করে সেখানে গিয়েছিলেন, কিন্তু রাসূল তাদেরও আগে সেখানে পৌঁছে গিয়ে খোঁজখবর করে ফেলেছেন। রাসূলুল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে সম্ভাব্য সকল বিপদ সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছেন, এমনকি ভবিষ্যতে যেসব বিপদ আসবে যেমন, দাজ্জাল, সে সম্পর্কেও সতর্ক করে গেছেন।
চতুর্থত, দূরদৃষ্টি অর্জন। এই পশুগুলো থাকে মাটির খুব কাছাকাছি এবং তাদের দৃষ্টিসীমা খুবই সীমিত। সামান্য দূরে কী আছে সেটা তারা দেখতে পায় না। চোখের সামনে ছোটোখাটো বস্তুও তাদের দৃষ্টি আটকে দিতে যথেষ্ট। ওপাশে কী আছে তারা বুঝতে পারে না। অন্যদিকে একজন মেষপালকের দৃষ্টিসীমা ভেড়ার তুলনায় বহুগুণে বিস্তৃত, বিপদ আসার অনেক আগেই সে ভেড়াগুলোকে সতর্ক করে দিতে পারে। নবী এবং তাদের অনুসারীদের বিষয়টিও ঠিক এমন। বিপদ ঘটার আগেই নবীরা তাদের উম্মাহকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দেন, কেননা তাদেরই আছে অন্তর্দৃষ্টি এবং দূরদৃষ্টি। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'আমার এবং তোমাদের মধ্যে তুলনা হলো এই, আমি আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে আছি এবং তোমরা আগুনের আলো দ্বারা আকৃষ্ট হচ্ছ আর এতে লাফ দিচ্ছ। আমি তোমাদের কাপড় টেনে, তোমাদেরকে টেনে-হিঁচড়ে সেই আগুন থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি আর তোমরা তখন আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য আমার কাছ থেকে নিজেদেরকে ছুটিয়ে নিচ্ছ। '
সাধারণ মানুষের সাথে নবীদের পার্থক্য হলো এই, নবীরা বিপদ আঁচ করতে পারেন কিন্তু আমরা তা পারি না। হতে পারে ভেড়াদেরকে রক্ষা করার জন্য মেষপালক তাদেরই কাউকে লাঠি দিয়ে আঘাত করলো। তবে এখানে আঘাত করা উদ্দেশ্য নয়, বরং তাদের ভালোর জন্যই আঘাত করাটা দরকার। তাই যখনই আল্লাহর নবীগণ উঠে দাঁড়ান আর মানুষকে কঠিনভাবে সতর্ক করেন, তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা খুব রুঢ় কিংবা আবেগবর্জিত। বরং প্রকৃতপক্ষে তারা উম্মাহর ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান। রাসূল একদিন মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে বললেন, 'আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করছি, আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করছি, আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করছি।' হাদীসের বর্ণনাকারী বলেন, নবীজির কণ্ঠস্বর তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল, বাজারের লোকেরা পর্যন্ত মসজিদ থেকে রাসূলের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিল।
পঞ্চমত, সাধারণ জীবনযাপন। মেষপালকদের জীবন সহজ, সরল, সাদাসিধে। তার তেমন কোনো বিষয়পত্র নেই। মার্সিডিজ বেনজ, টেলিভিশন কিংবা ফ্রিজ নেই। যদি সে ধনী ব্যক্তিও হয়, মেষ চড়ানোর সময় বিলাসি জিনিসগুলো সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাদেরকে হালকাভাবে চলাফেরা করতে হয় যাতে পশুদের দেখাশোনা করা যায়। তারা খুব সাধারণ খাবার খায় এবং তাদের বাসস্থানও বৈচিত্র্যহীন। সাদেকী জীবন যাপন তাদের বৈশিষ্ট্য, আর নবীদের ক্ষেত্রেও তা-ই।
ষষ্ঠত, মেষপালনের অভ্যাস মানুষকে বিভিন্ন পরিবেশে মানিয়ে নিতে শেখায়। রৌদ্রতপ্ত গরম, মুষলধারে বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া বা জমে যাওয়া ঠাণ্ডাতেও মেষপালককে প্রথমে তার পশুপালকে রক্ষা করতে হয় এবং সবশেষে নিজেকে সামলাতে হয়। রাসূলুল্লাহকে অনেক ভ্রমণ করতে হতো, দাওয়াহ এবং জিহাদের জন্য বিভিন্ন রকম আবহাওয়ার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
সপ্তমত, আল্লাহর সৃষ্টির কাছাকাছি থাকা। এটা মানুষকে পৃথিবীর কৃত্রিমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, প্রকৃতির নির্মলতার কাছাকাছি নিয়ে যায়। যখন কেউ মরুভূমিতে আল্লাহর সৃষ্টিকে নিয়ে পড়ে থাকে, তা তাকে মেকি দুনিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। কৃত্রিমতাপূর্ণ জীবন যাপন করতে করতে মন ও মগজে, চিন্তায়-চেতনায় একটা ক্ষত সৃষ্টি হয়। ইট-পাথরের এই পৃথিবীতে প্রায় সবকিছুই কৃত্রিম, সবকিছুই সৃষ্টির স্বাভাবিক বিন্যাসের বিরুদ্ধে। মানুষ সৃষ্টি হয়েছে মাটি থেকে, প্রকৃতি মানুষের অস্তিত্বে মিশে আছে। এই কৃত্রিমতাভরা পৃথিবী মানুষকে আল্লাহর বিশাল সৃষ্টির ব্যাপারে উদাসীন করে রাখে। সে সাধারণভাবে চিন্তা করতে ভুলে যায়। দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলার অনেক সৃষ্টি সম্পর্কে বলেছেন। সূর্য, চাঁদ, তারা, জান্নাত, পাহাড়-পর্বত, নদী, গাছপালা, গরু, মশা, মেঘ, বৃষ্টি কত কিছু স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। আল্লাহর সৃষ্টি হচ্ছে আয়নার মতো, যেখানে আল্লাহর গুণগুলো প্রতিফলিত হয়। আল্লাহর সৃষ্টির দিকে তাকানোর মত করে তাকালেই আল্লাহর গুণ সম্পর্কে জানা যায়। একজন নবী এভাবেই আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতেন।
নবীগণ মেষপালক হওয়ার মাধ্যমেই এমন দরকারি সব শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। উট, গরু বা ছাগল নয়, তাঁরা ছিলেন মেষ পালক। উট বা গরুর তুলনায় ভেড়া অনেক বেশি দুর্বল। সহজেই শিকারীর ফাঁদে পড়ে। তাদের জন্য প্রয়োজন অত্যধিক যত্ন ও সুরক্ষা। শয়তানের ব্যাপারে মানুষ এই ভেড়াগুলোর মতোই দুর্বল। শয়তান মানুষকে অতি সহজেই প্রলুব্ধ করতে পারে, আক্রমণ করতে পারে। রাসূল যখন শয়তান হতে সাবধান করতে চাইতেন, তিনি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতেন, 'তোমরা দলবদ্ধভাবে থাকো, কারণ নেকড়ে দলছুট ভেড়াকেই কামড়ে খায়।' রাসূলুল্লাহ মেষপালনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন নেকড়ে কেবলমাত্র সেই ভেড়াকেই আক্রমণ করে যে দল থেকে আলাদা হয়ে গেছে, পুরো দলকে সে কখনো আক্রমণ করে না। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ভেড়ার পালকরা সাধারণত উট বা অন্যান্য পশুপালকের চেয়ে বেশ আলাদা স্বভাবের হয়। ভেড়ারা নরম-প্রকৃতির প্রাণী, স্নেহের কাঙাল। তাদেরকে দয়া-মায়া দিয়ে পালতে হয়, কঠোর আচরণ করা যায় না। এমনি করে মেষপালকেরাও খুব সদয় ও দয়ালু হওয়ার শিক্ষা পায়। আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে মেষপালনের অনুশীলন করান যেন তাঁরা তাদের অনুসারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারেন। মেষ বা ভেড়ার ক্ষেত্রে যেমন, উটের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টোটা সত্যি। উট খুবই উদ্ধত প্রাণী। উটের প্রতি নরম হলেই সে সরলতার সুযোগ নেবে। উটকে তাই খুব কঠোরভাবে শাসন করতে হয়, এ কারণে উট পালকরা রুঢ় আর কর্কশ স্বভাবের হয়। মানুষ তার পেশা দ্বারা প্রভাবিত হয়। শিক্ষকদের আচরণ পিতৃসুলভ হয়ে থাকে। ডাক্তাররা তাদের লেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আবার অন্যভাবে বলা যায়, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্ব মানুষের পেশাকে প্রভাবিত করে, কারণ মানুষ তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে পেশা নির্বাচন করে আর সেই পেশা বেছে নেওয়ার ফলে তার ওই বৈশিষ্ট্যগুলো আরো প্রকটভাবে তার মাঝে বিকশিত হয়। মুসলিমদের তাদের কাজের ধরন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। মাথায় রাখতে হবে যে, তাদের পেশা ও কাজ তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইবনে হাজার ছিলেন সালাফ আস-সলেহীনদের সময়কার একজন প্রসিদ্ধ আলিম। তিনি তাঁর হাদীসের শারহ (ব্যাখ্যা) নিয়ে লেখা বই, "ফাতহ আল-বারি”-তে উল্লেখ করেন, "নবুওয়াতের পূর্বে নবীদের মেষপালক হিসেবে কর্মরত থাকার পেছনে হিকমাহ হলো, তারা পশুর পালকে চালাতে দক্ষতা অর্জন করতেন, কেননা পরবর্তীতে তাদেরকে নিজ নিজ জাতির পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে। পশুপালন একজন মানুষকে সহনশীল ও দয়ালু হওয়ার শিক্ষা দেয়, ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। যখন একজন মেষপালক তার পশুর পালকে এক স্থানে জড়ো করে, কিংবা পুরো পালকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায়; তখন তাকে তাদের সকলের বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। সেই সাথে নজর রাখতে হয় যেন কোনো শিকারী পশু তাদেরকে আক্রমণ করতে না পারে। এমনি করে সে একটি জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে। ভেতর-বাহির সবরকম শত্রুর হাত থেকে নিরাপত্তা দেওয়ার যোগ্যতা লাভ করে। মেষপালক হওয়ার মাধ্যমে এভাবেই নবীরা তাদের জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় ধৈর্যধারণ করা শিখেছেন, বিভিন্ন ঘরানার মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে শিখেছেন, আর শিখেছেন দুর্বলদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে আর ক্ষমতাসীনদের গুঁড়িয়ে দিতে। আল্লাহ কেন গরু বা উটের বদলে ভেড়ার পালক হিসেবে তাঁর নবীদেরকে নিয়োজিত করেছেন? এর কারণ হলো ভেড়ারা খুবই দুর্বল প্রাণী। তাদের অতিরিক্ত যত্ন ও দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হয়। অন্যান্য পশুর তুলনায় ভেড়ার পালকে সামলে রাখা অত্যন্ত কঠিন। কেননা তারা খুব সহজেই এদিক-ওদিক হেঁটে হারিয়ে যেতে পারে। আর সমাজে মানুষের অবস্থানও ঠিক একই রকম। আর তাই এটা মহান আল্লাহর আযযা ওয়াজালের পরম প্রজ্ঞা যে তিনি নবী-রাসূলদেরকে একইভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।"
সমসাময়িক আরেকজন লেখক এক্ষেত্রে মন্তব্য করেন, "দ্বীন ইসলাম শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে সেইসব চিন্তাবিদ, নির্ভীক, মেধাবী মানুষদের দ্বারা, যারা সৎ ও ন্যায়পরায়ণ। দুশ্চরিত্র মানুষদের সাথে থেকে কেউ ইসলামকে নিজের মাঝে ধারণ করতে পারে না। মুসলিমদের জন্য এটা খুবই জরুরি যে তারা মানুষের স্বভাবজাত সৎগুণকে নিজের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করবে। এর প্রমাণ রয়েছে খলিফা উমার ইবন খাত্তাবের জীবনে, তিনি লোকদেরকে কষ্টসহিষ্ণু এবং কঠোর জীবনে অভ্যস্ত হতে শেখান। চলন্ত ঘোড়ায় উঠতে বলেন। এটা এজন্য যেন লোকজন দীর্ঘ (আরাম-আয়েশের) জীবনের আকাঙ্ক্ষা না করে এবং বদঅভ্যাস (যেমন আলস্য) যেন তাদের পেয়ে না বসে। এর মানে এই নয় যে শহুরে জীবন ছেড়েছুঁড়ে চলে আসতে হবে। বিষয়টা হলো, সেসব (দুনিয়াবী) বিষয় ত্যাগ করতে হবে যেগুলো নিজের মাঝে থাকলে ইসলামের জন্য কষ্ট স্বীকারের ইচ্ছেটুকু নষ্ট হয়ে যায়।"
এই মন্তব্যটি রাসূলুল্লাহর পেশা হিসেবে মেষপালন বেছে নেওয়া এবং প্রাথমিক জীবনে তাঁর মরুভূমিতে বেড়ে ওঠা নিয়ে। এই কাজগুলোর ফলে রাসূলুল্লাহর মধ্যে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকারের অভ্যাস গড়ে ওঠে। নবুওয়াতের মিশনের জন্য তাঁকে উপযুক্ত করে তোলে। রাসূলুল্লাহর ওফাতের কয়েক বছর পর তাঁর সাহাবি উমার যখন খলিফা, এই বিশ্বের সেরা জিনিসগুলোর কর্তৃত্ব হাতের মুঠোয় নিয়ে বসা, আজও তিনি সেসব স্পর্শ করেন নি। খুব সহজ-সরল-সাধারণ জীবন যাপন করেছেন, মুসলিমদেরও সতর্ক করেছেন তারা যেন আরাম-আয়েশের জীবনে অভ্যস্ত না হয়ে রুক্ষ ও কঠোর জীবনের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয়। ইসলাম এমনই এক দ্বীন, এমনই এক বার্তা, যা মেনে চলতে গেলে মু'মিনকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আর তাই প্রস্তুত থাকতে হবে। নাহয় সামান্য চাপেই সে বেসামাল হয়ে পড়বে। দাওয়াহ ইসলামের এমন একটি ইবাদাহ যার জন্য কষ্ট স্বীকারের মানসিকতা থাকা চাই। একজন দাঈ যদি কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার ইচ্ছা ও ধৈর্যধারণ করতে না পারেন, তাহলে তিনি কখনোই আন্তরিকতার সাথে মন-প্রাণ দিয়ে দাওয়াতের কাজে নিজেকে ঢেলে দিতে পারবেন না।
টিকাঃ
১১. সহীহ বুখারি, অধ্যায় ইজারাহ, হাদীস ৩।
১২. ইবন মাজাহ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৭৭২।
১৩. রিয়াদুস স্বলেহীন, অধ্যায় ১, হাদীস ১৬৩ (মুসলিম)।
নবীর প্রথম পেশা ছিল মেষপালন। তিনি বলেন, 'আল্লাহ এমন কোনো নবী পাঠাননি যিনি মেষপালক ছিলেন না।' তাঁর সাথীরা জিজ্ঞেস করেন, 'আর আপনি?' তিনি বলেন, 'হ্যাঁ, আমিও মাঠে ভেড়া চরাতাম আর মক্কার লোকদের কাছ থেকে এই কাজের জন্য বিনিময় নিতাম।'
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো প্রত্যেক নবীই একজন মেষপালক ছিলেন। আল্লাহ তাআলা সব নবীকেই এই কাজটির মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। মেষচালনা থেকে নবীগণ অনেকগুলো শিক্ষা লাভ করেছিলেন। প্রথমত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হলো দায়িত্ববোধ। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'তোমরা সকলেই হলে মেষপালক এবং তোমরা তোমাদের পালের ব্যাপারে দায়িত্ববান।' উদাহরণস্বরূপ, মুসলিমদের জন্য দায়িত্বশীল হলেন তাদের ইমাম, পরিবারের জন্য দায়িত্বশীল পরিবারের কর্তা ইত্যাদি। প্রত্যেক ব্যক্তিই কোনো না কোনো কিছুর ব্যাপারে বা অন্যের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। একজন নেতার জন্য দায়িত্বশীলতা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নেতা তার দলের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে উম্মাহর নেতা হিসেবে প্রেরণ করেছেন তাই তাঁরা তাদের উম্মাহর জন্য হিসাব দিতে বাধ্য থাকবেন।
দ্বিতীয়ত, মেষপালন তাদেরকে ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। ভেড়াদেরকে মাঠে চরানো একটি সময়সাপেক্ষ বিষয়। তারা খুবই ধীরস্থির প্রাণী, সময় নিয়ে আস্তে আস্তে সবকিছু করে। পশুপালককেও তাদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কখনো ভেড়াগুলো নিজেদের মধ্যেই মারামারি লাগিয়ে দেয়, আবার কখনো বা একে অপরের সাথে খেলা করে। কিন্তু মেষপালককে ধৈর্য ধরে সবকিছু লক্ষ রাখতে হয়। সে তাদেরকে এ কথা বলতে পারবে না যে, 'আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, তোমরা তাড়াতাড়ি করো।' ভেড়ারা তাদের মর্জি অনুযায়ী ঢিলেমি করবে। মেষপালকেরা সাধারণত সকালে বের হয়, আর ফেরে সন্ধ্যাবেলায়, সূর্য অস্ত যাবার সময়। আল্লাহ তাআলা সকল নবীকে মেষপালকের দায়িত্ব দিয়ে গড়ে তুলেছেন যেন তাদের মধ্যে ধৈর্যের অনুশীলন গড়ে ওঠে, যেন তাঁরা উম্মাহর ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করতে পারেন। নবী মূসার সাথে তাঁর উম্মাহর লোকেরা যা করেছিল, তা ছিল রীতিমতো অসহনীয়। এই খুবই দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মত চরিত্র গঠনের জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁকে দিয়েই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে মেষপালন করান, দীর্ঘ দশ বছর। নূহ সুদীর্ঘ ৯৫০ বছর দাওয়াহর কাজে ব্যয় করেন, এরপরও তিনি ধৈর্য হারাননি। সকল উপায়ে চেষ্টা চালিয়েছেন, "আমি চেষ্টা করেছি প্রকাশ্যে এবং গোপনে। আমি চেষ্টা করেছি দিনে ও রাতে। আমি চেষ্টা করেছি প্রত্যেক উপায়ে। এবং তারা আমার বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।” (সূরা নূহ, ৭১: ৩)
তৃতীয়ত, সুরক্ষা প্রদান, মেষপালকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো তাদের ভেড়ার পালকে বিপদাপদ থেকে রক্ষা করা। ভেড়ার পালে নেকড়ে বা অন্য পশু হামলা করতে পারে, তাদের রোগবালাই হতে পারে। মেষপালক সর্বদাই তাদেরকে এটা নিশ্চিত করে যে তারা সকল প্রকার আশঙ্কামুক্ত। আল্লাহর নবীরাও অনুরূপ। তাঁরা উম্মাহকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। তাদেরকে শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রকার বিপদ থেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করেন। একবার মদীনায় রাতে হঠাৎ হৈ চৈ শুরু হয়। হৈ চৈ শুনে কিছু সাহাবা অস্ত্র নিয়ে ঘোড়া চালিয়ে সবেগে সেখানে শব্দের উৎসের দিকে ছুটে যান। তাঁরা সেখানে পৌঁছে আশ্চর্য হয়ে দেখলেন যে, রাসূলুল্লাহ ইতিমধ্যেই সেখান থেকে ফিরে আসছেন আর তাদেরকে জানালেন সবকিছু ঠিকঠাক আছে। সাহাবীরা খুব তাড়াহুড়ো করে সেখানে গিয়েছিলেন, কিন্তু রাসূল তাদেরও আগে সেখানে পৌঁছে গিয়ে খোঁজখবর করে ফেলেছেন। রাসূলুল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে সম্ভাব্য সকল বিপদ সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছেন, এমনকি ভবিষ্যতে যেসব বিপদ আসবে যেমন, দাজ্জাল, সে সম্পর্কেও সতর্ক করে গেছেন।
চতুর্থত, দূরদৃষ্টি অর্জন। এই পশুগুলো থাকে মাটির খুব কাছাকাছি এবং তাদের দৃষ্টিসীমা খুবই সীমিত। সামান্য দূরে কী আছে সেটা তারা দেখতে পায় না। চোখের সামনে ছোটোখাটো বস্তুও তাদের দৃষ্টি আটকে দিতে যথেষ্ট। ওপাশে কী আছে তারা বুঝতে পারে না। অন্যদিকে একজন মেষপালকের দৃষ্টিসীমা ভেড়ার তুলনায় বহুগুণে বিস্তৃত, বিপদ আসার অনেক আগেই সে ভেড়াগুলোকে সতর্ক করে দিতে পারে। নবী এবং তাদের অনুসারীদের বিষয়টিও ঠিক এমন। বিপদ ঘটার আগেই নবীরা তাদের উম্মাহকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দেন, কেননা তাদেরই আছে অন্তর্দৃষ্টি এবং দূরদৃষ্টি। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'আমার এবং তোমাদের মধ্যে তুলনা হলো এই, আমি আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে আছি এবং তোমরা আগুনের আলো দ্বারা আকৃষ্ট হচ্ছ আর এতে লাফ দিচ্ছ। আমি তোমাদের কাপড় টেনে, তোমাদেরকে টেনে-হিঁচড়ে সেই আগুন থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি আর তোমরা তখন আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য আমার কাছ থেকে নিজেদেরকে ছুটিয়ে নিচ্ছ। '
সাধারণ মানুষের সাথে নবীদের পার্থক্য হলো এই, নবীরা বিপদ আঁচ করতে পারেন কিন্তু আমরা তা পারি না। হতে পারে ভেড়াদেরকে রক্ষা করার জন্য মেষপালক তাদেরই কাউকে লাঠি দিয়ে আঘাত করলো। তবে এখানে আঘাত করা উদ্দেশ্য নয়, বরং তাদের ভালোর জন্যই আঘাত করাটা দরকার। তাই যখনই আল্লাহর নবীগণ উঠে দাঁড়ান আর মানুষকে কঠিনভাবে সতর্ক করেন, তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা খুব রুঢ় কিংবা আবেগবর্জিত। বরং প্রকৃতপক্ষে তারা উম্মাহর ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান। রাসূল একদিন মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে বললেন, 'আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করছি, আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করছি, আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করছি।' হাদীসের বর্ণনাকারী বলেন, নবীজির কণ্ঠস্বর তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল, বাজারের লোকেরা পর্যন্ত মসজিদ থেকে রাসূলের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিল।
পঞ্চমত, সাধারণ জীবনযাপন। মেষপালকদের জীবন সহজ, সরল, সাদাসিধে। তার তেমন কোনো বিষয়পত্র নেই। মার্সিডিজ বেনজ, টেলিভিশন কিংবা ফ্রিজ নেই। যদি সে ধনী ব্যক্তিও হয়, মেষ চড়ানোর সময় বিলাসি জিনিসগুলো সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাদেরকে হালকাভাবে চলাফেরা করতে হয় যাতে পশুদের দেখাশোনা করা যায়। তারা খুব সাধারণ খাবার খায় এবং তাদের বাসস্থানও বৈচিত্র্যহীন। সাদেকী জীবন যাপন তাদের বৈশিষ্ট্য, আর নবীদের ক্ষেত্রেও তা-ই।
ষষ্ঠত, মেষপালনের অভ্যাস মানুষকে বিভিন্ন পরিবেশে মানিয়ে নিতে শেখায়। রৌদ্রতপ্ত গরম, মুষলধারে বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া বা জমে যাওয়া ঠাণ্ডাতেও মেষপালককে প্রথমে তার পশুপালকে রক্ষা করতে হয় এবং সবশেষে নিজেকে সামলাতে হয়। রাসূলুল্লাহকে অনেক ভ্রমণ করতে হতো, দাওয়াহ এবং জিহাদের জন্য বিভিন্ন রকম আবহাওয়ার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
সপ্তমত, আল্লাহর সৃষ্টির কাছাকাছি থাকা। এটা মানুষকে পৃথিবীর কৃত্রিমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, প্রকৃতির নির্মলতার কাছাকাছি নিয়ে যায়। যখন কেউ মরুভূমিতে আল্লাহর সৃষ্টিকে নিয়ে পড়ে থাকে, তা তাকে মেকি দুনিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। কৃত্রিমতাপূর্ণ জীবন যাপন করতে করতে মন ও মগজে, চিন্তায়-চেতনায় একটা ক্ষত সৃষ্টি হয়। ইট-পাথরের এই পৃথিবীতে প্রায় সবকিছুই কৃত্রিম, সবকিছুই সৃষ্টির স্বাভাবিক বিন্যাসের বিরুদ্ধে। মানুষ সৃষ্টি হয়েছে মাটি থেকে, প্রকৃতি মানুষের অস্তিত্বে মিশে আছে। এই কৃত্রিমতাভরা পৃথিবী মানুষকে আল্লাহর বিশাল সৃষ্টির ব্যাপারে উদাসীন করে রাখে। সে সাধারণভাবে চিন্তা করতে ভুলে যায়। দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলার অনেক সৃষ্টি সম্পর্কে বলেছেন। সূর্য, চাঁদ, তারা, জান্নাত, পাহাড়-পর্বত, নদী, গাছপালা, গরু, মশা, মেঘ, বৃষ্টি কত কিছু স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। আল্লাহর সৃষ্টি হচ্ছে আয়নার মতো, যেখানে আল্লাহর গুণগুলো প্রতিফলিত হয়। আল্লাহর সৃষ্টির দিকে তাকানোর মত করে তাকালেই আল্লাহর গুণ সম্পর্কে জানা যায়। একজন নবী এভাবেই আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতেন।
নবীগণ মেষপালক হওয়ার মাধ্যমেই এমন দরকারি সব শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। উট, গরু বা ছাগল নয়, তাঁরা ছিলেন মেষ পালক। উট বা গরুর তুলনায় ভেড়া অনেক বেশি দুর্বল। সহজেই শিকারীর ফাঁদে পড়ে। তাদের জন্য প্রয়োজন অত্যধিক যত্ন ও সুরক্ষা। শয়তানের ব্যাপারে মানুষ এই ভেড়াগুলোর মতোই দুর্বল। শয়তান মানুষকে অতি সহজেই প্রলুব্ধ করতে পারে, আক্রমণ করতে পারে। রাসূল যখন শয়তান হতে সাবধান করতে চাইতেন, তিনি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতেন, 'তোমরা দলবদ্ধভাবে থাকো, কারণ নেকড়ে দলছুট ভেড়াকেই কামড়ে খায়।' রাসূলুল্লাহ মেষপালনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন নেকড়ে কেবলমাত্র সেই ভেড়াকেই আক্রমণ করে যে দল থেকে আলাদা হয়ে গেছে, পুরো দলকে সে কখনো আক্রমণ করে না। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ভেড়ার পালকরা সাধারণত উট বা অন্যান্য পশুপালকের চেয়ে বেশ আলাদা স্বভাবের হয়। ভেড়ারা নরম-প্রকৃতির প্রাণী, স্নেহের কাঙাল। তাদেরকে দয়া-মায়া দিয়ে পালতে হয়, কঠোর আচরণ করা যায় না। এমনি করে মেষপালকেরাও খুব সদয় ও দয়ালু হওয়ার শিক্ষা পায়। আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে মেষপালনের অনুশীলন করান যেন তাঁরা তাদের অনুসারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারেন। মেষ বা ভেড়ার ক্ষেত্রে যেমন, উটের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টোটা সত্যি। উট খুবই উদ্ধত প্রাণী। উটের প্রতি নরম হলেই সে সরলতার সুযোগ নেবে। উটকে তাই খুব কঠোরভাবে শাসন করতে হয়, এ কারণে উট পালকরা রুঢ় আর কর্কশ স্বভাবের হয়। মানুষ তার পেশা দ্বারা প্রভাবিত হয়। শিক্ষকদের আচরণ পিতৃসুলভ হয়ে থাকে। ডাক্তাররা তাদের লেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আবার অন্যভাবে বলা যায়, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্ব মানুষের পেশাকে প্রভাবিত করে, কারণ মানুষ তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে পেশা নির্বাচন করে আর সেই পেশা বেছে নেওয়ার ফলে তার ওই বৈশিষ্ট্যগুলো আরো প্রকটভাবে তার মাঝে বিকশিত হয়। মুসলিমদের তাদের কাজের ধরন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। মাথায় রাখতে হবে যে, তাদের পেশা ও কাজ তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইবনে হাজার ছিলেন সালাফ আস-সলেহীনদের সময়কার একজন প্রসিদ্ধ আলিম। তিনি তাঁর হাদীসের শারহ (ব্যাখ্যা) নিয়ে লেখা বই, "ফাতহ আল-বারি”-তে উল্লেখ করেন, "নবুওয়াতের পূর্বে নবীদের মেষপালক হিসেবে কর্মরত থাকার পেছনে হিকমাহ হলো, তারা পশুর পালকে চালাতে দক্ষতা অর্জন করতেন, কেননা পরবর্তীতে তাদেরকে নিজ নিজ জাতির পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে। পশুপালন একজন মানুষকে সহনশীল ও দয়ালু হওয়ার শিক্ষা দেয়, ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। যখন একজন মেষপালক তার পশুর পালকে এক স্থানে জড়ো করে, কিংবা পুরো পালকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায়; তখন তাকে তাদের সকলের বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। সেই সাথে নজর রাখতে হয় যেন কোনো শিকারী পশু তাদেরকে আক্রমণ করতে না পারে। এমনি করে সে একটি জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে। ভেতর-বাহির সবরকম শত্রুর হাত থেকে নিরাপত্তা দেওয়ার যোগ্যতা লাভ করে। মেষপালক হওয়ার মাধ্যমে এভাবেই নবীরা তাদের জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় ধৈর্যধারণ করা শিখেছেন, বিভিন্ন ঘরানার মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে শিখেছেন, আর শিখেছেন দুর্বলদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে আর ক্ষমতাসীনদের গুঁড়িয়ে দিতে। আল্লাহ কেন গরু বা উটের বদলে ভেড়ার পালক হিসেবে তাঁর নবীদেরকে নিয়োজিত করেছেন? এর কারণ হলো ভেড়ারা খুবই দুর্বল প্রাণী। তাদের অতিরিক্ত যত্ন ও দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হয়। অন্যান্য পশুর তুলনায় ভেড়ার পালকে সামলে রাখা অত্যন্ত কঠিন। কেননা তারা খুব সহজেই এদিক-ওদিক হেঁটে হারিয়ে যেতে পারে। আর সমাজে মানুষের অবস্থানও ঠিক একই রকম। আর তাই এটা মহান আল্লাহর আযযা ওয়াজালের পরম প্রজ্ঞা যে তিনি নবী-রাসূলদেরকে একইভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।"
সমসাময়িক আরেকজন লেখক এক্ষেত্রে মন্তব্য করেন, "দ্বীন ইসলাম শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে সেইসব চিন্তাবিদ, নির্ভীক, মেধাবী মানুষদের দ্বারা, যারা সৎ ও ন্যায়পরায়ণ। দুশ্চরিত্র মানুষদের সাথে থেকে কেউ ইসলামকে নিজের মাঝে ধারণ করতে পারে না। মুসলিমদের জন্য এটা খুবই জরুরি যে তারা মানুষের স্বভাবজাত সৎগুণকে নিজের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করবে। এর প্রমাণ রয়েছে খলিফা উমার ইবন খাত্তাবের জীবনে, তিনি লোকদেরকে কষ্টসহিষ্ণু এবং কঠোর জীবনে অভ্যস্ত হতে শেখান। চলন্ত ঘোড়ায় উঠতে বলেন। এটা এজন্য যেন লোকজন দীর্ঘ (আরাম-আয়েশের) জীবনের আকাঙ্ক্ষা না করে এবং বদঅভ্যাস (যেমন আলস্য) যেন তাদের পেয়ে না বসে। এর মানে এই নয় যে শহুরে জীবন ছেড়েছুঁড়ে চলে আসতে হবে। বিষয়টা হলো, সেসব (দুনিয়াবী) বিষয় ত্যাগ করতে হবে যেগুলো নিজের মাঝে থাকলে ইসলামের জন্য কষ্ট স্বীকারের ইচ্ছেটুকু নষ্ট হয়ে যায়।"
এই মন্তব্যটি রাসূলুল্লাহর পেশা হিসেবে মেষপালন বেছে নেওয়া এবং প্রাথমিক জীবনে তাঁর মরুভূমিতে বেড়ে ওঠা নিয়ে। এই কাজগুলোর ফলে রাসূলুল্লাহর মধ্যে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকারের অভ্যাস গড়ে ওঠে। নবুওয়াতের মিশনের জন্য তাঁকে উপযুক্ত করে তোলে। রাসূলুল্লাহর ওফাতের কয়েক বছর পর তাঁর সাহাবি উমার যখন খলিফা, এই বিশ্বের সেরা জিনিসগুলোর কর্তৃত্ব হাতের মুঠোয় নিয়ে বসা, আজও তিনি সেসব স্পর্শ করেন নি। খুব সহজ-সরল-সাধারণ জীবন যাপন করেছেন, মুসলিমদেরও সতর্ক করেছেন তারা যেন আরাম-আয়েশের জীবনে অভ্যস্ত না হয়ে রুক্ষ ও কঠোর জীবনের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয়। ইসলাম এমনই এক দ্বীন, এমনই এক বার্তা, যা মেনে চলতে গেলে মু'মিনকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আর তাই প্রস্তুত থাকতে হবে। নাহয় সামান্য চাপেই সে বেসামাল হয়ে পড়বে। দাওয়াহ ইসলামের এমন একটি ইবাদাহ যার জন্য কষ্ট স্বীকারের মানসিকতা থাকা চাই। একজন দাঈ যদি কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার ইচ্ছা ও ধৈর্যধারণ করতে না পারেন, তাহলে তিনি কখনোই আন্তরিকতার সাথে মন-প্রাণ দিয়ে দাওয়াতের কাজে নিজেকে ঢেলে দিতে পারবেন না।
টিকাঃ
১১. সহীহ বুখারি, অধ্যায় ইজারাহ, হাদীস ৩।
১২. ইবন মাজাহ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৭৭২।
১৩. রিয়াদুস স্বলেহীন, অধ্যায় ১, হাদীস ১৬৩ (মুসলিম)।
📄 হিলফুল ফুজুল
রাসূলুল্লাহর প্রাথমিক জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো 'হিলফুল ফুদুল' চুক্তি। এর পেছনের একটা গল্প আছে। ইয়েমেনের যাবিদ নামের এক এলাকা থেকে একজন লোক ব্যবসা করতে মক্কায় আসে। তার ব্যবসায়ের পণ্যসামগ্রী সাহম গোত্রের এক স্বনামধন্য ব্যক্তি আল আস ইবন ওয়াইল কিনে নেয়, টাকা পরিশোধ করে দেওয়ার প্রতিজ্ঞাও করে। কিন্তু কিছু সময় পর গড়িমসি আরম্ভ করে। লোকটাকে পাওনা বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ইয়েমেনি লোকটি মক্কায় ভিনদেশী, আল-আস আশা করেছিল যে লোকটি কিছুদিনের মধ্যে চলে যাবে, সেই সুযোগে আল-আস তার টাকা আত্মসাৎ করার পরিকল্পনা করে।
কিন্তু ইয়েমেনি লোকটি এত সহজে চলে গেল না। সে হক আদায় না করে নড়বে না। মক্কায় মানুষের ভীড়ের মাঝে গিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা শুরু করলো। 'হে মক্কাবাসী, আমি তোমাদের দেশে এসে যুলুমের শিকার হয়েছি, অন্যায়ের শিকার হয়েছি, হে লোকসকল, তোমরা কে আছ যে আমার পাশে দাঁড়াবে, তোমরা কি তোমাদের দেশে এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবে?' তার আবেগী কথা শুনে কুরাইশের কিছু গোত্র জড়ো হয়ে একটা চুক্তি করলো। চুক্তির কথা ছিল, মক্কার দুর্বল ও নিপীড়িত মানুষদের অধিকার কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। চুক্তিতে অংশ নেওয়া গোত্রগুলোর একটি ছিল নবীজির পরিবার। নবীজি সেই সময় কিশোর, কিন্তু আবদুল মুত্তালিব তাঁকেও সভায় নিয়ে যান। সভা অনুষ্ঠিত হয় আবদুল্লাহ ইবনে জাদানের বাড়িতে। সে ছিল খুবই উদার প্রকৃতির মানুষ, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল। মানুষের অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার। তার সম্মানে সে বাড়িতেই তারা সভার আয়োজন করলো। সভায় চুক্তি হলো যে, তারা সকলে একত্রিত হয়ে মজলুমদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার হবে। এ ঘটনা নবুওয়াতের আগেই ঘটেছিল আর চুক্তিটাও মুশরিকদের মধ্যকার একটি চুক্তি। রাসূল বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনে জাদানের বাড়িতে যে চুক্তি সম্পাদিত হলো, আমি এক পাল ভালো পশুর বিনিময়ে হলেও সেই চুক্তিতে থাকার সুযোগ হাতছাড়া করতাম না। আর যদি ইসলামের পরে এমন ঘটনা ঘটতো তখনও আমি বিষয়টিকে স্বাগত জানাতাম।'
অর্থাৎ যদি ইসলাম আসার পরে এমন কোনো চুক্তি করার সুযোগ আসতো, রাসূল সেই চুক্তিতে সানন্দে অংশ নিতেন, এমনকি যদি এই ধরনের চুক্তি কাফেরদের মধ্যে সংঘটিত হয়, তবুও। এখানে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে, তা হলো, মুসলিমরা সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে, চাই সেই ন্যায় একজন মুসলিমের পক্ষে বা কোনো অমুসলিমের পক্ষে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুসলিমরা হকের পক্ষ, নিপীড়িত মানুষের পক্ষ, মজলুমের পক্ষাবলম্বন করবে। মুহাম্মাদ মারা যাওয়ার অনেক বছর পরে একটি ঘটনার সূত্র ধরে আবারো হিলফুল ফুদুল এর নামটি চলে আসে। ঘটনাটা ঘটেছিল হুসাইন ইবন আলী ইবনে আবু তালিব এবং আল ওয়ালিদ ইবনে উকবা ইবনে আবু সুফিয়ানের মধ্যে। ওয়ালিদ ছিল মদীনার গভর্নর, সে তার ক্ষমতার জোরে অন্যায়ভাবে হুসাইনের কিছু সম্পত্তি নিয়ে দখল করে নেয়। হুসাইন ওয়ালিদের কাছে গিয়ে বললেন, 'শোনো, হয় তুমি আমার প্রাপ্য আমাকে ফেরত দিবে নয়তো আমি মসজিদের দিকে গিয়ে হিলফুল ফুদুলের ঘোষণা দিব। লোকদেরকে আমি হিলফুল ফুদুলের কথা স্মরণ করিয়ে দিব।'
আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের সে সময় ওয়ালিদের সাথেই ছিলেন। হুসাইনের মুখে হিলফুল ফুদুলের কথা শুনে তিনি বলে উঠলেন, 'তবে আমিও আল্লাহর নামে শপথ করছি, যদি হুসাইন হিলফুল ফুদুলের ডাক দেয়, আমি আমার তরবারি উন্মুক্ত করবো এবং তার পক্ষ নেব। যতক্ষণ সে ন্যায় বিচার না পাচ্ছে, আমরা যুদ্ধ করতে থাকবো। সে ন্যায়বিচার পেলে তবেই আমরা থামবো, নতুবা যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যাবো।' এই কথা পরে আরও কিছু মানুষের কানে গেল। তারাও উত্তেজিত হয়ে একই রকম বিবৃতি দিলো। ওয়ালিদ বুঝলো পরিস্থিতি মোটেও সুবিধার নয়, তাই সে তড়িঘড়ি করে হুসাইনের প্রাপ্য তাকে বুঝিয়ে দেয়। এই ঘটনার শিক্ষণীয় দিক হলো—মুসলিমরা কখনো কারো প্রতি জুলুম সহ্য করে না। তৎকালীন সময়ে মুসলিমরা একজন মুসলিম নেতা ওয়ালিদ ইবনে উকবার অধীনে ইসলামি ব্যবস্থার মধ্যেই বসবাস করতো, তবুও তারা হকের জন্য তাদের নেতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।
শাইখ মুহাম্মাদ গাজ্জালী এই ব্যাপারে মন্তব্য করেন, 'এই চুক্তি (হিলফুল ফুদুল) আমাদের সামনে একটি বিষয় তুলে ধরবে, রাত যত গভীর হোক না কেন, শাসক যতই অত্যাচারী হোক না কেন, উন্নত চরিত্র সবসময়ই কিছু না কিছু মানুষের মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। তারা সুবিচার এবং ন্যায়ের জন্য উঠে দাঁড়াবে। আল্লাহ তাআলা ভালো কাজে সহযোগিতা করাকে একজন মুসলিমের উপর একান্ত কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।'
"...সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।” (সূরা মায়িদা, ৫: ২)
যে কোনো মুসলিম দলের জন্য হিলফুল ফুযুল বা এ ধরনের কোনো চুক্তিতে অংশগ্রহণ বৈধ, কেননা, এ সকল চুক্তির আসল উদ্দেশ্যই হলো জুলুমের অপসারণ যা পালনের মাধ্যমে ইসলামি একটি দায়িত্বের বুনিয়াদ দৃঢ় হয়। মুসলিমদের জন্য অন্য ধর্মবিশ্বাসীদের সাথে যুলুমের অপসারণ কিংবা যালিমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার উদ্দেশ্যে চুক্তি করা বৈধ, যদি সেখানে ইসলামের জন্য এবং মুসলিমদের জন্য কোনো কল্যাণ থেকে থাকে। যেহেতু রাসূল ইসলামের আগমনের পরেও এই ধরনের চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, সুতরাং তা মুসলিমদের জন্যেও বৈধ।
রাসূলুল্লাহর প্রাথমিক জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো 'হিলফুল ফুদুল' চুক্তি। এর পেছনের একটা গল্প আছে। ইয়েমেনের যাবিদ নামের এক এলাকা থেকে একজন লোক ব্যবসা করতে মক্কায় আসে। তার ব্যবসায়ের পণ্যসামগ্রী সাহম গোত্রের এক স্বনামধন্য ব্যক্তি আল আস ইবন ওয়াইল কিনে নেয়, টাকা পরিশোধ করে দেওয়ার প্রতিজ্ঞাও করে। কিন্তু কিছু সময় পর গড়িমসি আরম্ভ করে। লোকটাকে পাওনা বুঝিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ইয়েমেনি লোকটি মক্কায় ভিনদেশী, আল-আস আশা করেছিল যে লোকটি কিছুদিনের মধ্যে চলে যাবে, সেই সুযোগে আল-আস তার টাকা আত্মসাৎ করার পরিকল্পনা করে।
কিন্তু ইয়েমেনি লোকটি এত সহজে চলে গেল না। সে হক আদায় না করে নড়বে না। মক্কায় মানুষের ভীড়ের মাঝে গিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা শুরু করলো। 'হে মক্কাবাসী, আমি তোমাদের দেশে এসে যুলুমের শিকার হয়েছি, অন্যায়ের শিকার হয়েছি, হে লোকসকল, তোমরা কে আছ যে আমার পাশে দাঁড়াবে, তোমরা কি তোমাদের দেশে এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবে?' তার আবেগী কথা শুনে কুরাইশের কিছু গোত্র জড়ো হয়ে একটা চুক্তি করলো। চুক্তির কথা ছিল, মক্কার দুর্বল ও নিপীড়িত মানুষদের অধিকার কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। চুক্তিতে অংশ নেওয়া গোত্রগুলোর একটি ছিল নবীজির পরিবার। নবীজি সেই সময় কিশোর, কিন্তু আবদুল মুত্তালিব তাঁকেও সভায় নিয়ে যান। সভা অনুষ্ঠিত হয় আবদুল্লাহ ইবনে জাদানের বাড়িতে। সে ছিল খুবই উদার প্রকৃতির মানুষ, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল। মানুষের অধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার। তার সম্মানে সে বাড়িতেই তারা সভার আয়োজন করলো। সভায় চুক্তি হলো যে, তারা সকলে একত্রিত হয়ে মজলুমদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার হবে। এ ঘটনা নবুওয়াতের আগেই ঘটেছিল আর চুক্তিটাও মুশরিকদের মধ্যকার একটি চুক্তি। রাসূল বলেন, 'আবদুল্লাহ ইবনে জাদানের বাড়িতে যে চুক্তি সম্পাদিত হলো, আমি এক পাল ভালো পশুর বিনিময়ে হলেও সেই চুক্তিতে থাকার সুযোগ হাতছাড়া করতাম না। আর যদি ইসলামের পরে এমন ঘটনা ঘটতো তখনও আমি বিষয়টিকে স্বাগত জানাতাম।'
অর্থাৎ যদি ইসলাম আসার পরে এমন কোনো চুক্তি করার সুযোগ আসতো, রাসূল সেই চুক্তিতে সানন্দে অংশ নিতেন, এমনকি যদি এই ধরনের চুক্তি কাফেরদের মধ্যে সংঘটিত হয়, তবুও। এখানে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে, তা হলো, মুসলিমরা সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে, চাই সেই ন্যায় একজন মুসলিমের পক্ষে বা কোনো অমুসলিমের পক্ষে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মুসলিমরা হকের পক্ষ, নিপীড়িত মানুষের পক্ষ, মজলুমের পক্ষাবলম্বন করবে। মুহাম্মাদ মারা যাওয়ার অনেক বছর পরে একটি ঘটনার সূত্র ধরে আবারো হিলফুল ফুদুল এর নামটি চলে আসে। ঘটনাটা ঘটেছিল হুসাইন ইবন আলী ইবনে আবু তালিব এবং আল ওয়ালিদ ইবনে উকবা ইবনে আবু সুফিয়ানের মধ্যে। ওয়ালিদ ছিল মদীনার গভর্নর, সে তার ক্ষমতার জোরে অন্যায়ভাবে হুসাইনের কিছু সম্পত্তি নিয়ে দখল করে নেয়। হুসাইন ওয়ালিদের কাছে গিয়ে বললেন, 'শোনো, হয় তুমি আমার প্রাপ্য আমাকে ফেরত দিবে নয়তো আমি মসজিদের দিকে গিয়ে হিলফুল ফুদুলের ঘোষণা দিব। লোকদেরকে আমি হিলফুল ফুদুলের কথা স্মরণ করিয়ে দিব।'
আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের সে সময় ওয়ালিদের সাথেই ছিলেন। হুসাইনের মুখে হিলফুল ফুদুলের কথা শুনে তিনি বলে উঠলেন, 'তবে আমিও আল্লাহর নামে শপথ করছি, যদি হুসাইন হিলফুল ফুদুলের ডাক দেয়, আমি আমার তরবারি উন্মুক্ত করবো এবং তার পক্ষ নেব। যতক্ষণ সে ন্যায় বিচার না পাচ্ছে, আমরা যুদ্ধ করতে থাকবো। সে ন্যায়বিচার পেলে তবেই আমরা থামবো, নতুবা যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে যাবো।' এই কথা পরে আরও কিছু মানুষের কানে গেল। তারাও উত্তেজিত হয়ে একই রকম বিবৃতি দিলো। ওয়ালিদ বুঝলো পরিস্থিতি মোটেও সুবিধার নয়, তাই সে তড়িঘড়ি করে হুসাইনের প্রাপ্য তাকে বুঝিয়ে দেয়। এই ঘটনার শিক্ষণীয় দিক হলো—মুসলিমরা কখনো কারো প্রতি জুলুম সহ্য করে না। তৎকালীন সময়ে মুসলিমরা একজন মুসলিম নেতা ওয়ালিদ ইবনে উকবার অধীনে ইসলামি ব্যবস্থার মধ্যেই বসবাস করতো, তবুও তারা হকের জন্য তাদের নেতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।
শাইখ মুহাম্মাদ গাজ্জালী এই ব্যাপারে মন্তব্য করেন, 'এই চুক্তি (হিলফুল ফুদুল) আমাদের সামনে একটি বিষয় তুলে ধরবে, রাত যত গভীর হোক না কেন, শাসক যতই অত্যাচারী হোক না কেন, উন্নত চরিত্র সবসময়ই কিছু না কিছু মানুষের মধ্যে বিদ্যমান থাকবে। তারা সুবিচার এবং ন্যায়ের জন্য উঠে দাঁড়াবে। আল্লাহ তাআলা ভালো কাজে সহযোগিতা করাকে একজন মুসলিমের উপর একান্ত কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।'
"...সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা কর। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।” (সূরা মায়িদা, ৫: ২)
যে কোনো মুসলিম দলের জন্য হিলফুল ফুযুল বা এ ধরনের কোনো চুক্তিতে অংশগ্রহণ বৈধ, কেননা, এ সকল চুক্তির আসল উদ্দেশ্যই হলো জুলুমের অপসারণ যা পালনের মাধ্যমে ইসলামি একটি দায়িত্বের বুনিয়াদ দৃঢ় হয়। মুসলিমদের জন্য অন্য ধর্মবিশ্বাসীদের সাথে যুলুমের অপসারণ কিংবা যালিমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার উদ্দেশ্যে চুক্তি করা বৈধ, যদি সেখানে ইসলামের জন্য এবং মুসলিমদের জন্য কোনো কল্যাণ থেকে থাকে। যেহেতু রাসূল ইসলামের আগমনের পরেও এই ধরনের চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, সুতরাং তা মুসলিমদের জন্যেও বৈধ।
📄 নবীজির ﷽ বৈবাহিক জীবন
নবীজি প্রথম বিয়ে করেছিলেন পঁচিশ বছর বয়সে। ন্যায়নীতিহীন একটি সমাজে থেকেও এই পঁচিশ বছর পর্যন্ত তিনি সৎ ও পবিত্র হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। নবুওয়াত পাওয়ার আগেও তাঁর জীবনে নারীঘটিত কিছু ছিল না। রাসূলুল্লাহর বৈবাহিক জীবন সম্পর্কে মুসলিমদের সঠিক ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি। রাসূলুল্লাহ তাঁর প্রথম স্ত্রী খাদিজার সাথে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত সংসার করেন। একজন পুরুষ যুবক বয়স থেকে পঞ্চাশ বছর পর্যন্তই সাধারণত নারীদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। এই বয়সটাতে পুরুষের চাহিদা থাকে সর্বাধিক। কিন্তু নবীজি তাঁর পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত কেবলমাত্র এক স্ত্রী নিয়েই সংসার করেছেন। যতদিন পর্যন্ত খাদিজা বেঁচে ছিলেন, ততদিন অন্য কোনো বিয়ে করেননি এবং খাদিজাকে নিয়েই তিনি অত্যন্ত খুশি ছিলেন। সুতরাং নবীজি নারীদের ব্যাপারে দুর্বল বা তিনি নারীলোভী ছিলেন—এই ধরনের কথা শুধু ভিত্তিহীনই নয়, বরং নির্ভেজাল মিথ্যাচার।
নবীজি প্রথম বিয়ে করেছিলেন পঁচিশ বছর বয়সে। ন্যায়নীতিহীন একটি সমাজে থেকেও এই পঁচিশ বছর পর্যন্ত তিনি সৎ ও পবিত্র হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। নবুওয়াত পাওয়ার আগেও তাঁর জীবনে নারীঘটিত কিছু ছিল না। রাসূলুল্লাহর বৈবাহিক জীবন সম্পর্কে মুসলিমদের সঠিক ধারণা রাখা অত্যন্ত জরুরি। রাসূলুল্লাহ তাঁর প্রথম স্ত্রী খাদিজার সাথে পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত সংসার করেন। একজন পুরুষ যুবক বয়স থেকে পঞ্চাশ বছর পর্যন্তই সাধারণত নারীদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। এই বয়সটাতে পুরুষের চাহিদা থাকে সর্বাধিক। কিন্তু নবীজি তাঁর পঞ্চাশ বছর বয়স পর্যন্ত কেবলমাত্র এক স্ত্রী নিয়েই সংসার করেছেন। যতদিন পর্যন্ত খাদিজা বেঁচে ছিলেন, ততদিন অন্য কোনো বিয়ে করেননি এবং খাদিজাকে নিয়েই তিনি অত্যন্ত খুশি ছিলেন। সুতরাং নবীজি নারীদের ব্যাপারে দুর্বল বা তিনি নারীলোভী ছিলেন—এই ধরনের কথা শুধু ভিত্তিহীনই নয়, বরং নির্ভেজাল মিথ্যাচার।
📄 খাদিজার ؓ সাথে বিয়ে
যুবক বয়সে নবীজির জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো খাদিজার সাথে বিয়ে। খাদিজা মক্কার বিখ্যাত এক নারী, সম্ভ্রান্ত বংশের মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলা। তাঁর আগেও বিয়ে হয়েছিল। খাদিজার নিজস্ব ব্যবসা ছিল। সে সময় ব্যবসার কাজে প্রায়ই ইয়েমেন ও সিরিয়া যাতায়াত করা লাগতো। তিনি ব্যবসার কাজ সামলাবার জন্য বিভিন্ন লোক ভাড়া করতেন, নিজে ঘরের বাইরে গিয়ে ব্যবসা করতেন না। কুরাইশের লোকেরা শীত ও গ্রীষ্মে বছরের দুই সময়ে সফরে বের হতো একবার ইয়েমেনে, আরেকবার শামে। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল মক্কার সে সময়ের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, "কুরাইশদের নিরাপত্তার জন্য, শীত ও গ্রীষ্ম সফরে তাদের নিরাপত্তার জন্য।” (সূরা কুরাইশ, ১০৬: ১-২)
নবীজির সততা ও সত্যবাদিতার কথা তখন মক্কার দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর কথা শুনে খাদিজা তাঁকেই ব্যবসার কাজে নিয়োজিত করলেন। মুহাম্মাদ যখন শামে সফরের উদ্দেশ্যে বের হলেন, খাদিজা তাঁর দাস মায়সারাহকে তাঁর সঙ্গে পাঠালেন। তাঁরা দুজন শামে ব্যবসা শেষ করে ফিরে এলেন। মায়সারাহ খাদিজার কাছে তাদের সফরের বর্ণনা দিতে এসে মুহাম্মাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি বলেন, 'এই মানুষটার সততা ও বিশ্বস্ততা মুগ্ধ হওয়ার মতো!'
খাদিজা নবীজির কথা যত শুনছেন, ততই তাঁর প্রতি আগ্রহ বোধ করছেন। নবীজির চারিত্রিক গুণাবলি এমনই ছিল যে সবাইকে টানতো। খাদিজা, মক্কার একজন বিত্তশালী মহিলা, এক সাধারণ কর্মচারীর অসাধারণ চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। রাসূলুল্লাহ খাদিজার প্রস্তাব মেনে নিয়ে বিয়ের জন্য সম্মতি জানালেন। বিয়ের সময় নবীজির বয়স ছিল পঁচিশ, আর খাদিজার বয়স ছিল চল্লিশ। দুজনের বয়সের পার্থক্য পনেরো বছর, কিন্তু বয়সের এই সুবিশাল ফারাক তাদের বৈবাহিক জীবনে কোনো আঁচ ফেলতে পারে নি।
যুবক বয়সে নবীজির জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো খাদিজার সাথে বিয়ে। খাদিজা মক্কার বিখ্যাত এক নারী, সম্ভ্রান্ত বংশের মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলা। তাঁর আগেও বিয়ে হয়েছিল। খাদিজার নিজস্ব ব্যবসা ছিল। সে সময় ব্যবসার কাজে প্রায়ই ইয়েমেন ও সিরিয়া যাতায়াত করা লাগতো। তিনি ব্যবসার কাজ সামলাবার জন্য বিভিন্ন লোক ভাড়া করতেন, নিজে ঘরের বাইরে গিয়ে ব্যবসা করতেন না। কুরাইশের লোকেরা শীত ও গ্রীষ্মে বছরের দুই সময়ে সফরে বের হতো একবার ইয়েমেনে, আরেকবার শামে। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল মক্কার সে সময়ের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, "কুরাইশদের নিরাপত্তার জন্য, শীত ও গ্রীষ্ম সফরে তাদের নিরাপত্তার জন্য।” (সূরা কুরাইশ, ১০৬: ১-২)
নবীজির সততা ও সত্যবাদিতার কথা তখন মক্কার দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর কথা শুনে খাদিজা তাঁকেই ব্যবসার কাজে নিয়োজিত করলেন। মুহাম্মাদ যখন শামে সফরের উদ্দেশ্যে বের হলেন, খাদিজা তাঁর দাস মায়সারাহকে তাঁর সঙ্গে পাঠালেন। তাঁরা দুজন শামে ব্যবসা শেষ করে ফিরে এলেন। মায়সারাহ খাদিজার কাছে তাদের সফরের বর্ণনা দিতে এসে মুহাম্মাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তিনি বলেন, 'এই মানুষটার সততা ও বিশ্বস্ততা মুগ্ধ হওয়ার মতো!'
খাদিজা নবীজির কথা যত শুনছেন, ততই তাঁর প্রতি আগ্রহ বোধ করছেন। নবীজির চারিত্রিক গুণাবলি এমনই ছিল যে সবাইকে টানতো। খাদিজা, মক্কার একজন বিত্তশালী মহিলা, এক সাধারণ কর্মচারীর অসাধারণ চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। রাসূলুল্লাহ খাদিজার প্রস্তাব মেনে নিয়ে বিয়ের জন্য সম্মতি জানালেন। বিয়ের সময় নবীজির বয়স ছিল পঁচিশ, আর খাদিজার বয়স ছিল চল্লিশ। দুজনের বয়সের পার্থক্য পনেরো বছর, কিন্তু বয়সের এই সুবিশাল ফারাক তাদের বৈবাহিক জীবনে কোনো আঁচ ফেলতে পারে নি।