📄 রাসূলুল্লাহর ﷽ জন্ম
রাসূলুল্লাহর জন্মের সময় আরব এবং পুরো বিশ্বের অবস্থা ছিল খুবই নাজুক, সে সময় তাদের পথ নির্দেশনা বা নেতৃত্বের খুব প্রয়োজন ছিল। তবে তখনও মানুষের মাঝে কিছু ভালো গুণ বিদ্যমান ছিল। যেমন আরবরা বেশ উদার ও অতিথিপরায়ণ ছিল, তারা কথা দিয়ে কথা রাখতো। তাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ ছিল প্রবল, তাদের মধ্যে আরো ছিল লজ্জাবোধ এবং অন্যায়কে রুখে দেওয়ার মানসিকতা। তাদের ছিল দৃঢ়তা, অধ্যবসায়, উদ্যম এবং সারল্য। আরবদের এই চমৎকার গুণ ইসলামের প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সাহাবারা এই গুণগুলোর অধিকারী ছিলেন, আর তাই তাঁরা এই দ্বীন প্রচারে সফল হয়েছিলেন। সাহাবাদের উদারতা আর আতিথেয়তার কারণে তারা যেখানে যেতেন সেখানেই তাদেরকে সকলে বরণ করে নিত, তাদের স্বাগত জানাতো। জনগণের চোখে তারা মোটেও ঘৃণিত দখলদার ছিলেন না, বরং তারা সাহাবীদেরকে পেয়েছিল মুক্তিদাতা সৈনিক হিসেবে। মিসর ও সিরিয়াতে এমনটা হয়েছিল। মুসলিমরা যখন তাদেরকে রোমান শাসনের অধীন থেকে উদ্ধার করে লোকজন তখন অনেক খুশি হয় এবং তাদেরকে মুক্তিদাতা হিসেবে স্বাগত জানায়।
সাহাবাগণ ক্ষমতা বা কর্তৃত্বলোভী ছিলেন না। অনেক সময়ই তারা নিজেদের হাত থেকে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে যোগ্য লোকদের হাতে তুলে দিতেন। তারা তাদেরকে নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের হাতেই নেতৃত্ব হস্তান্তর করে যেতেন। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির মতো জনগণের সম্পদ লুট করার জন্য সাহাবারা যুদ্ধ করতেন না, বরং তাদেরকে ইসলামের পথে আহ্বান জানাতে তারা যুদ্ধ করতেন। তাঁরা ছিলেন বিশ্বস্ত, অঙ্গীকার পূরণে সদা-সচেষ্ট এবং নির্ভরতার প্রতীক। স্থানীয় জনগণের কাছে তাদেরকে তাদের কাজের জন্য জবাবদিহিতা করতে হত। এই গুণগুলো দাওয়াহর ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আর এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মক্কা ও মক্কার মানুষগুলোকে শেষ নবীর রিসালাতের স্থান হিসেবে অন্য সবকিছুর উপর মনোনীত করেছেন। কেননা তাদের মাঝেই ইসলামের বার্তা বহন করার জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলি ছিল।
রাসূলুল্লাহ সেই বছর জন্মগ্রহণ করেন, যে বছর আল্লাহ তাআলা আবরাহার বাহিনীকে ধ্বংস করে দেন। নবী জন্মের সময় সম্পর্কিত অনেক বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই সহীহ নয় তাই সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া ভালো। যখন নবীজির মা আমিনা গর্ভবতী ছিলেন, তাঁর বাবা আবদুল্লাহ আশ-শামে সফররত ছিলেন। কিন্তু তিনি মদীনার কাছাকাছি একটি স্থানে এসে মারা যান। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। অর্থাৎ আবদুল্লাহ তাঁর পুত্রের জন্মের আগেই মৃত্যুবরণ করেন।
রাসূলুল্লাহর জন্মের সময় তাঁর মা আমিনা একটি আলো দেখতে পেলেন। তাঁর শরীর থেকে এই আলো বেরিয়ে আসছিল এবং সেই আলো আশ-শাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এই আলোর দ্বারাই প্রকাশ পাচ্ছিল যে, মুহাম্মাদের বার্তা বিশ্বময় ছড়িয়ে যাবে। ইমাম আহমেদ থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে জানা যায়, লোকেরা মুহাম্মাদকে নিয়ে নানা রকম কথা বলতো। যেমন তারা বলতো যে, মুহাম্মাদ যেন শুষ্ক মরুভূমিতে জন্ম নেওয়া একটি সবুজ সতেজ গাছ। তারা বোঝাতে চাইতো যে তিনিই তাদের বংশের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। ইবনে আব্বাস বলেন, 'লোকেদের কিছু কথা রাসূলুল্লাহর নিকট পৌঁছালো, তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা বলো, আমি কে?' তারা বললো, 'আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল।' তিনি বললেন,
'আমি মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব, আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে তাঁর সৃষ্টির সেরা অংশের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি সব সৃষ্টিকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন, এবং আমাকে সেই দুইয়ের মাঝে উত্তম দলটিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি মানুষকে অনেক গোত্রতে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ গোত্রের মাঝে স্থান দিয়েছেন। তিনি তাদেরকে অনেকগুলো বংশে ভাগ করেছেন এবং আমাকে সেরা বংশে জন্ম দিয়েছেন যারা তাদের গোত্রের মাঝে সেরা এবং চেতনায় অগ্রগামী।'
রাসূল খারাপ মানুষদের মধ্যে প্রেরিত ভালো মানুষ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সেরাদের মধ্যে সেরা। তিনি আরো বলেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ আযযা ওয়াজাল ইসমাঈলের বংশধরদের মধ্য থেকে কিনানাকে পছন্দ করেছেন, এবং কিনানার মধ্য থেকে কুরাইশদেরকে মনোনীত করেছেন, এবং তিনি কুরাইশদের মধ্য থেকে মনোনীত করেছেন বনু হাশিমকে এবং তিনি বনু হাশিম থেকে আমাকে মনোনীত করেছেন।' অন্য এক হাদীসে তিনি বলেন, 'আমি বৈবাহিক সম্পর্কজাত সন্তান, আদম থেকে শুরু করে আমার পিতা-মাতা পর্যন্ত আমার বংশধারায় কোনো অবৈধ সন্তান নেই। জাহিলিয়াতের ব্যভিচার আমার বংশকে দূষিত করতে পারেনি।'
জাহিলিয়াতের যুগে যদিও যিনা ব্যভিচার জাতীয় অনৈতিক কার্যকলাপ খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল, কিন্তু রাসূলুল্লাহর পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউই এমন জঘন্য কাজে অংশ নেয়নি, আল্লাহ তাঁর বংশধারাকে সবসময় হেফাজত করেছেন।
টিকাঃ
৭. মুসনাদ ইমাম আহমাদ, ৫/২৬২।
৮. তিরমিযী, অধ্যায় রাসূলুল্লাহর (সা) মর্যাদা, হাদীস ৩৯৬৪ (আরবি রেফারেন্স)।
রাসূলুল্লাহর জন্মের সময় আরব এবং পুরো বিশ্বের অবস্থা ছিল খুবই নাজুক, সে সময় তাদের পথ নির্দেশনা বা নেতৃত্বের খুব প্রয়োজন ছিল। তবে তখনও মানুষের মাঝে কিছু ভালো গুণ বিদ্যমান ছিল। যেমন আরবরা বেশ উদার ও অতিথিপরায়ণ ছিল, তারা কথা দিয়ে কথা রাখতো। তাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ ছিল প্রবল, তাদের মধ্যে আরো ছিল লজ্জাবোধ এবং অন্যায়কে রুখে দেওয়ার মানসিকতা। তাদের ছিল দৃঢ়তা, অধ্যবসায়, উদ্যম এবং সারল্য। আরবদের এই চমৎকার গুণ ইসলামের প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সাহাবারা এই গুণগুলোর অধিকারী ছিলেন, আর তাই তাঁরা এই দ্বীন প্রচারে সফল হয়েছিলেন। সাহাবাদের উদারতা আর আতিথেয়তার কারণে তারা যেখানে যেতেন সেখানেই তাদেরকে সকলে বরণ করে নিত, তাদের স্বাগত জানাতো। জনগণের চোখে তারা মোটেও ঘৃণিত দখলদার ছিলেন না, বরং তারা সাহাবীদেরকে পেয়েছিল মুক্তিদাতা সৈনিক হিসেবে। মিসর ও সিরিয়াতে এমনটা হয়েছিল। মুসলিমরা যখন তাদেরকে রোমান শাসনের অধীন থেকে উদ্ধার করে লোকজন তখন অনেক খুশি হয় এবং তাদেরকে মুক্তিদাতা হিসেবে স্বাগত জানায়।
সাহাবাগণ ক্ষমতা বা কর্তৃত্বলোভী ছিলেন না। অনেক সময়ই তারা নিজেদের হাত থেকে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে যোগ্য লোকদের হাতে তুলে দিতেন। তারা তাদেরকে নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের হাতেই নেতৃত্ব হস্তান্তর করে যেতেন। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির মতো জনগণের সম্পদ লুট করার জন্য সাহাবারা যুদ্ধ করতেন না, বরং তাদেরকে ইসলামের পথে আহ্বান জানাতে তারা যুদ্ধ করতেন। তাঁরা ছিলেন বিশ্বস্ত, অঙ্গীকার পূরণে সদা-সচেষ্ট এবং নির্ভরতার প্রতীক। স্থানীয় জনগণের কাছে তাদেরকে তাদের কাজের জন্য জবাবদিহিতা করতে হত। এই গুণগুলো দাওয়াহর ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আর এ কারণেই আল্লাহ তাআলা মক্কা ও মক্কার মানুষগুলোকে শেষ নবীর রিসালাতের স্থান হিসেবে অন্য সবকিছুর উপর মনোনীত করেছেন। কেননা তাদের মাঝেই ইসলামের বার্তা বহন করার জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলি ছিল।
রাসূলুল্লাহ সেই বছর জন্মগ্রহণ করেন, যে বছর আল্লাহ তাআলা আবরাহার বাহিনীকে ধ্বংস করে দেন। নবী জন্মের সময় সম্পর্কিত অনেক বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই সহীহ নয় তাই সেগুলো এড়িয়ে যাওয়া ভালো। যখন নবীজির মা আমিনা গর্ভবতী ছিলেন, তাঁর বাবা আবদুল্লাহ আশ-শামে সফররত ছিলেন। কিন্তু তিনি মদীনার কাছাকাছি একটি স্থানে এসে মারা যান। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। অর্থাৎ আবদুল্লাহ তাঁর পুত্রের জন্মের আগেই মৃত্যুবরণ করেন।
রাসূলুল্লাহর জন্মের সময় তাঁর মা আমিনা একটি আলো দেখতে পেলেন। তাঁর শরীর থেকে এই আলো বেরিয়ে আসছিল এবং সেই আলো আশ-শাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এই আলোর দ্বারাই প্রকাশ পাচ্ছিল যে, মুহাম্মাদের বার্তা বিশ্বময় ছড়িয়ে যাবে। ইমাম আহমেদ থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে জানা যায়, লোকেরা মুহাম্মাদকে নিয়ে নানা রকম কথা বলতো। যেমন তারা বলতো যে, মুহাম্মাদ যেন শুষ্ক মরুভূমিতে জন্ম নেওয়া একটি সবুজ সতেজ গাছ। তারা বোঝাতে চাইতো যে তিনিই তাদের বংশের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। ইবনে আব্বাস বলেন, 'লোকেদের কিছু কথা রাসূলুল্লাহর নিকট পৌঁছালো, তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা বলো, আমি কে?' তারা বললো, 'আপনি হলেন আল্লাহর রাসূল।' তিনি বললেন,
'আমি মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব, আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টিকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে তাঁর সৃষ্টির সেরা অংশের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি সব সৃষ্টিকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন, এবং আমাকে সেই দুইয়ের মাঝে উত্তম দলটিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি মানুষকে অনেক গোত্রতে বিভক্ত করেছেন এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ গোত্রের মাঝে স্থান দিয়েছেন। তিনি তাদেরকে অনেকগুলো বংশে ভাগ করেছেন এবং আমাকে সেরা বংশে জন্ম দিয়েছেন যারা তাদের গোত্রের মাঝে সেরা এবং চেতনায় অগ্রগামী।'
রাসূল খারাপ মানুষদের মধ্যে প্রেরিত ভালো মানুষ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সেরাদের মধ্যে সেরা। তিনি আরো বলেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ আযযা ওয়াজাল ইসমাঈলের বংশধরদের মধ্য থেকে কিনানাকে পছন্দ করেছেন, এবং কিনানার মধ্য থেকে কুরাইশদেরকে মনোনীত করেছেন, এবং তিনি কুরাইশদের মধ্য থেকে মনোনীত করেছেন বনু হাশিমকে এবং তিনি বনু হাশিম থেকে আমাকে মনোনীত করেছেন।' অন্য এক হাদীসে তিনি বলেন, 'আমি বৈবাহিক সম্পর্কজাত সন্তান, আদম থেকে শুরু করে আমার পিতা-মাতা পর্যন্ত আমার বংশধারায় কোনো অবৈধ সন্তান নেই। জাহিলিয়াতের ব্যভিচার আমার বংশকে দূষিত করতে পারেনি।'
জাহিলিয়াতের যুগে যদিও যিনা ব্যভিচার জাতীয় অনৈতিক কার্যকলাপ খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল, কিন্তু রাসূলুল্লাহর পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউই এমন জঘন্য কাজে অংশ নেয়নি, আল্লাহ তাঁর বংশধারাকে সবসময় হেফাজত করেছেন।
টিকাঃ
৭. মুসনাদ ইমাম আহমাদ, ৫/২৬২।
৮. তিরমিযী, অধ্যায় রাসূলুল্লাহর (সা) মর্যাদা, হাদীস ৩৯৬৪ (আরবি রেফারেন্স)।
📄 রাসূলুল্লাহর ﷽ নামসমূহ
মুহাম্মাদের সবচেয়ে সুপরিচিত নাম হলো, মুহাম্মাদ এবং আহমাদ। কিন্তু এগুলো ছাড়াও তাঁর আরও কিছু নাম আছে। তাঁর পরিবার থেকে তাঁকে নাম দেওয়া হয়েছিল মুহাম্মাদ। তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে এই নাম দেন। "মুহাম্মাদ” নামের অর্থ হলো যিনি প্রশংসিত। লোকজন তাঁর প্রশংসা করতো তাঁর চরিত্র, তাঁর কাজ, ও তাঁর ব্যক্তিত্বের জন্য, তিনি ছিলেন প্রশংসার মূর্ত প্রকাশ। মুহাম্মাদ হলেন সেই মানুষ যাকে দিনে-রাতে প্রতি মুহূর্তে প্রশংসা করা হয়। ইতিহাসে এমন আর কোনো মানবসত্তা নেই যাকে মানবজাতি এত প্রশংসা করেছে। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল তাঁর নামের অর্থকে পরিপূর্ণতা দিয়েছেন। আহমাদ ও মুহাম্মাদ নাম দুটি একই মূল শব্দ থেকে এসেছে, 'হামদ'। হামদ মানে প্রশংসা। 'মুহাম্মাদ' মানে প্রশংসার অধিকারী। 'আহমাদ' মানে হলো, যিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন। রাসূল আল্লাহর প্রশংসা করেন, এবং তাঁর প্রশংসা অন্য সবার চাইতে বেশি।
তাঁর আরো কিছু নাম আছে, যা হাদীস থেকে জানা যায়, তার মাঝে একটি হলো "আল হাশির", আল হাশির অর্থ হচ্ছে জড়োকারী, যার জাগরণের সাথে সাথে সমগ্র মানবজাতির পুনরুত্থান ঘটবে এবং তার পেছনে জড়ো হবে। নবী মুহাম্মাদকে হাশরের দিন সর্বপ্রথম পুনরুজ্জীবিত করা হবে এবং পুরো মানবজাতি তাঁর পুনরুজ্জীবনের পর জাগ্রত হবে। "আল-মুকতাফ" বা "উত্তরসূরি" তাঁর আরেকটি নাম। মুহাম্মাদ হলেন নবী ও রাসূলদের মধ্যে সর্বশেষ। আর কেউ তাঁর পরে নবী বা রাসূল হিসেবে আসবেন না, এ কারণে তিনি হলেন সকল নবীর সর্বশেষ উত্তরসূরি। "আল মাহী" তাঁর আরেক নাম, যার অর্থ হলো "নিশ্চিহ্নকারী", যিনি কুফরিকে মুছে ফেলেন বা নিশ্চিহ্ন করেন। মুহাম্মাদ ছাড়া আর কোনো নবীই পুরোপুরিভাবে কুফরিকে অপসারণ করতে পারেননি, যদিও নবীজির এই মিশন তাঁর হাতে পূর্ণ হয়নি, তবে তা তাঁর উম্মাহর হাত দিয়ে অর্জিত হবে, তাঁর উম্মাহ এখনও পর্যন্ত এই মিশন চালিয়ে যাচ্ছে। ইসলামের চূড়ান্ত বিজয় সেই মুহূর্তে আসবে যখন সারা বিশ্ব মুসলিম হয়ে যাবে, সেটা আসবে উম্মাতে মুহাম্মাদীর হাতে, ঈসার নেতৃত্বে। তাই, মুহাম্মাদই কুফরকে সমূলে দূরীভূত করতে সফল হবেন। তাঁর আরেকটি নাম হচ্ছে "নাবিয়্যুল মালহামা" বা "যুদ্ধের নবী।" মালহামা মানে একটি যুদ্ধ নয়, বরং মালহামা দ্বারা বোঝানো হয় একের পর এক সংঘটিত ভয়ংকর যুদ্ধ। নবীজির এই নামের একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি অর্থ হতে পারে যে, তাঁর উম্মাহ জিহাদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ। তবে এই নামের অন্য অর্থও রয়েছে।
মুহাম্মাদের সবচেয়ে সুপরিচিত নাম হলো, মুহাম্মাদ এবং আহমাদ। কিন্তু এগুলো ছাড়াও তাঁর আরও কিছু নাম আছে। তাঁর পরিবার থেকে তাঁকে নাম দেওয়া হয়েছিল মুহাম্মাদ। তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব তাঁকে এই নাম দেন। "মুহাম্মাদ” নামের অর্থ হলো যিনি প্রশংসিত। লোকজন তাঁর প্রশংসা করতো তাঁর চরিত্র, তাঁর কাজ, ও তাঁর ব্যক্তিত্বের জন্য, তিনি ছিলেন প্রশংসার মূর্ত প্রকাশ। মুহাম্মাদ হলেন সেই মানুষ যাকে দিনে-রাতে প্রতি মুহূর্তে প্রশংসা করা হয়। ইতিহাসে এমন আর কোনো মানবসত্তা নেই যাকে মানবজাতি এত প্রশংসা করেছে। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল তাঁর নামের অর্থকে পরিপূর্ণতা দিয়েছেন। আহমাদ ও মুহাম্মাদ নাম দুটি একই মূল শব্দ থেকে এসেছে, 'হামদ'। হামদ মানে প্রশংসা। 'মুহাম্মাদ' মানে প্রশংসার অধিকারী। 'আহমাদ' মানে হলো, যিনি আল্লাহর প্রশংসা করেন। রাসূল আল্লাহর প্রশংসা করেন, এবং তাঁর প্রশংসা অন্য সবার চাইতে বেশি।
তাঁর আরো কিছু নাম আছে, যা হাদীস থেকে জানা যায়, তার মাঝে একটি হলো "আল হাশির", আল হাশির অর্থ হচ্ছে জড়োকারী, যার জাগরণের সাথে সাথে সমগ্র মানবজাতির পুনরুত্থান ঘটবে এবং তার পেছনে জড়ো হবে। নবী মুহাম্মাদকে হাশরের দিন সর্বপ্রথম পুনরুজ্জীবিত করা হবে এবং পুরো মানবজাতি তাঁর পুনরুজ্জীবনের পর জাগ্রত হবে। "আল-মুকতাফ" বা "উত্তরসূরি" তাঁর আরেকটি নাম। মুহাম্মাদ হলেন নবী ও রাসূলদের মধ্যে সর্বশেষ। আর কেউ তাঁর পরে নবী বা রাসূল হিসেবে আসবেন না, এ কারণে তিনি হলেন সকল নবীর সর্বশেষ উত্তরসূরি। "আল মাহী" তাঁর আরেক নাম, যার অর্থ হলো "নিশ্চিহ্নকারী", যিনি কুফরিকে মুছে ফেলেন বা নিশ্চিহ্ন করেন। মুহাম্মাদ ছাড়া আর কোনো নবীই পুরোপুরিভাবে কুফরিকে অপসারণ করতে পারেননি, যদিও নবীজির এই মিশন তাঁর হাতে পূর্ণ হয়নি, তবে তা তাঁর উম্মাহর হাত দিয়ে অর্জিত হবে, তাঁর উম্মাহ এখনও পর্যন্ত এই মিশন চালিয়ে যাচ্ছে। ইসলামের চূড়ান্ত বিজয় সেই মুহূর্তে আসবে যখন সারা বিশ্ব মুসলিম হয়ে যাবে, সেটা আসবে উম্মাতে মুহাম্মাদীর হাতে, ঈসার নেতৃত্বে। তাই, মুহাম্মাদই কুফরকে সমূলে দূরীভূত করতে সফল হবেন। তাঁর আরেকটি নাম হচ্ছে "নাবিয়্যুল মালহামা" বা "যুদ্ধের নবী।" মালহামা মানে একটি যুদ্ধ নয়, বরং মালহামা দ্বারা বোঝানো হয় একের পর এক সংঘটিত ভয়ংকর যুদ্ধ। নবীজির এই নামের একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি অর্থ হতে পারে যে, তাঁর উম্মাহ জিহাদের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ। তবে এই নামের অন্য অর্থও রয়েছে।
📄 শৈশব
রাসূলুল্লাহ তাঁর প্রথম জীবনে লালিত হয়েছিলেন তাঁর মা এবং উম্মে আইমানের হাতে, যাঁর আসল নাম বারাকা। উম্মে আইমান ছিলেন একজন আবিসিনিয়ান মহিলা। তিনি মক্কায় বাস করতেন। তিনি পরবর্তীতে মুসলিম হন। রাসূল তাঁকে তাঁর মুক্ত করা দাস যায়িদ ইবনে হারিসের সাথে বিবাহ দেন। আরব নগরীর একটি ঐতিহ্য ছিল তাদের সন্তানদেরকে বড় করার জন্য মরুভূমিতে পাঠানো। তারা বিশ্বাস করতো যে মরুভূমির পরিবেশ হলো স্বাস্থ্যকর ও বিশুদ্ধ। মরুভূমি ছিল গরম এবং শুষ্ক, ফলে তা জীবাণুদের টিকে থাকার জন্য খুবই অনুপযুক্ত পরিবেশ। তারা আরো বিশ্বাস করতো যে, মরুভূমির প্রখরতা তাদের ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় আর শক্তিশালী করে তোলে। তাই তারা তাদের সন্তানদের শহর থেকে দূরে মরুভূমিতে পাঠিয়ে দিত। রাসূলুল্লাহর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটে নি। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন বনু সাদের ভূমিতে।
হালিমা সাদিয়া ছিলেন রাসূলুল্লাহর দুধ-মা। তিনি তাঁর বান্ধবীদের সাথে মক্কায় এসেছিলেন শিশুর খোঁজে, যাকে তারা লালন-পালন ও দুধ খাওয়াবার জন্য নিয়ে যাবেন। এটা ছিল তাদের ব্যবসা। এই বেদুইন মহিলাগণ মক্কায় আসতো, আর কিছু শিশুকে দুধ খাওয়ানোর জন্য নিয়ে যেতো। এর বিনিময়ে তারা অর্থ লাভ করতো। যে বছর তিনি মক্কায় যান সেটি ছিল দুর্ভিক্ষের বছর। আর তারাও ছিলো হতদরিদ্র। তারা মক্কার বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে দুগ্ধপোষ্য সন্তানদের খোঁজ করতে লাগলো। বেদুইন মহিলাদের প্রত্যেকের কাছেই মুহাম্মাদকে উপস্থিত করা হয়, কিন্তু তারা কেউই তাঁকে গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। এর কারণ ছিল, নবীজি ছিলেন এতিম। তারা বলতে লাগলো, 'এই এতিম আমাদের কী উপকার করবে? কে আমাদেরকে টাকা দেবে, তাঁর তো বাবা মারা গেছে।' তারা ভাবলো যে তাঁর মা তাদেরকে বেশি কিছু দিতে পারবেন না। হালিমার ভাষায়,
"দিন শেষে আমার সব বান্ধবী নিজেদের সঙ্গে শিশুদেরকে নিয়ে তাদের তাঁবুতে ফিরে যাচ্ছিল, একমাত্র আমি ছাড়া। আমি আমার সাথে নেবার মতো একটি শিশুকেও পেলাম না! রাতের বেলা আমার স্বামীকে ডেকে বললাম, শোনো, আমি আগামীকাল সকালে মুহাম্মাদ নামের ওই বাচ্চাটিকেই নিয়ে আসব, আমি খালি হাতে ফিরে যেতে চাই না। আমার স্বামী রাজি হলেন। পরদিন সকালে আমি মুহাম্মাদের মা আমিনা বিনতে ওয়াহাবের কাছে গেলাম। তাঁকে গিয়ে বললাম, আমি আপনার সন্তানকে নিতে রাজি আছি। এর আগের রাতে আমরা একটুও ঘুমাতে পারিনি কারণ আমাদের উটগুলি কোনো দুধ দিচ্ছিল না, দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধার কারণে আমি আমার সন্তানকেও দুধ পান করাতে পারিনি। সে সারারাত কান্নাকাটি করে আমাদেরকেও ঘুমুতে দেয় নি। যখন আমি মুহাম্মাদকে আমার তাঁবুতে নিয়ে এলাম, আমার স্তন যেন এই শিশুকে স্বাগত জানালো। তাঁকে সবটুকু দুধ দিলো, যতখানি তাঁর প্রয়োজন ছিল। সেই দুধ আমার সন্তানের জন্যেও যথেষ্ট ছিল। সেই রাতে আমরা অনেকদিন পর পুরো রাত শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছিলাম। কারণ আমার ছেলে গত কয়েক রাত ধরে ঠিকমতো ঘুমুতে পারেনি। আমার স্বামী এরপর উটের দুধ দোহন করতে গেলে, উটটি এত দুধ দিল যে আমার স্বামী আমার কাছে ফিরে এসে বললেন, 'হালিমা, তুমি তো এক বরকতময় আত্মাকে নিয়ে এসেছো!'
মক্কায় আসার সময় আমি একটি দুর্বল বৃদ্ধ গাধার পিঠে ছিলাম। এটি এত ধীরে চলছিল যে এটার সাথে তাল মিলাতে গিয়ে অন্যদেরও আস্তে চলতে হচ্ছিল আর এ কারণে বাকি সবাই বিরক্ত হচ্ছিল। অথচ ফিরে যাওয়ার দিন আমার গাধাটিই হয়ে যায় পুরো দলের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগামী গাধা! আমার বান্ধবীরা আমাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো,
- তুমি তো এই গাধার পিঠে চড়েই মক্কায় এসেছিলে, তাই না?
- হ্যাঁ, এটা সেই গাধাটাই।
- আল্লাহ শপথ, নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটছে।
সেদিনের পর থেকে আমি এবং আমার স্বামী আমাদের ছাগলগুলোকে যখনই মাঠে চরাতে পাঠাতাম, তারা ভরপেট হয়ে ফিরে আসতো। আমরা যখন খুশি দুধ দোহাতে পারতাম। অথচ আমাদের গোত্রের অন্য সকলের পশুগুলো ক্ষুধার্ত থেকে যেতো। সেগুলো কোনো দুধও দিত না। লোকজন তাদের মেষপালকদের নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে লাগল। তারা বলতে লাগল, 'হালিমা তাঁর পশুগুলো যে মাঠে নিয়ে যায় তোমরা কেন সে মাঠে আমাদের পশুগুলোকে চরাতে নিয়ে যাও না?' তারাও তাদের পশুগুলোকে আমাদের পেছন পেছন একই জায়গায় নিয়ে যেতো, এরপরও আমাদের পশুগুলোই ভরপেট ফেরত আসত আর তাদেরগুলো ফিরতো খালি পেটে! দিনে দিনে শিশুটি বেড়ে উঠতে থাকে, আর আমরা আবিষ্কার করতে থাকি যে আল্লাহ তাআলা এই শিশুর উসিলায় আমাদের সকলের জন্য রহমতের ওপর রহমত বর্ষণ করছেন! দুই বছর বয়সেই তাঁকে দেখতে খুবই চমৎকার লাগত। তিনি সেই বয়সী অন্য বাচ্চাদের মতো ছিলেন না, আল্লাহর শপথ, দুই বছর বয়সেই তিনি অনেক বলিষ্ঠ ছিলেন।"
দুই বছর বয়সে শিশু মুহাম্মাদকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেবার সময় চলে আসে। তারা মক্কায় ফিরে গিয়ে আমিনার কাছে শিশু মুহাম্মাদকে আরও কিছুদিন রাখার অনুমতি চান। তারা মুহাম্মাদকে অসম্ভব ভালোবাসতেন এবং এটাও জানতেন যে তিনি ছিলেন বরকতময়। তারা আমিনাকে বিভিন্ন রকম অজুহাত দেখিয়ে বোঝাতে চাচ্ছিলেন যে, মুহাম্মাদের জন্য মরুভূমিতে থাকাই শ্রেয়। আমিনা রাজি হওয়া পর্যন্ত তারা চেষ্টা চালিয়ে যান। একসময় আমিনা সম্মতি দেন। এরপর হালিমা মুহাম্মাদকে আবার মরুভূমিতে ফিরিয়ে নিয়ে যান। হালিমা বলতে থাকেন, "একদিন শিশু মুহাম্মাদ তাঁর দুধ-ভাইয়ের সাথে খেলা করছিলেন। হঠাৎ তাঁর ভাই ছুটে এসে অন্যদের বললো,
- আমার কুরাইশের ভাই!
- কী হয়েছে তাঁর?
- আমি দেখলাম, দুইজন সাদা কাপড় পরা লোক মাটিতে নেমে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে শুইয়ে দিল। এরপর তাঁর বুক চিরে ফেললো।
এ কথা শোনার পর আমি আর তাঁর বাবা ছুটে গেলাম। মুহাম্মাদের মুখ ফ্যাকাসে। আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম,
- কী হয়েছে বাবা?
- দুইজন লোক এসে আমার বুক চিরে আমার ভেতর থেকে কিছু একটা বের করে নিয়ে গেল।
আমি মুহাম্মাদকে খুব বেশি ভালোবাসতাম। কেউ তাঁর কোনো ক্ষতি করুক এটা আমি কিছুতেই চাই না, বিশেষ করে আমার তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায়। তাই দ্রুত মক্কায় ফিরে যাওয়াই সঙ্গত মনে করলাম। মক্কায় গিয়ে আমিনার কাছে বললাম, 'এই যে মুহাম্মাদ, এখন থেকে আপনি তাঁকে নিজের কাছে রাখতে পারেন। আমরা আমাদের দায়িত্ব পূর্ণ করলাম।'
- মাত্র কদিন আগেই তো তোমরা তাঁকে নিজের কাছে রাখার জন্য খুব উৎসাহ দেখাচ্ছিলে। এখন হঠাৎ করে কেন তাঁকে ফিরিয়ে দিতে এলে?
আমরা কোনো উত্তর দিলাম না। কিন্তু মা আমিনাও নাছোড়বান্দা। তিনি আমাদেরকে বারবার প্রশ্ন করতেই লাগলেন, এক পর্যায়ে আমরা তাঁর কাছে আসল ঘটনা খুলে বললাম। সব শুনে আমিনা বললেন, 'তোমরা কি তাঁকে নিয়ে এই ভয়ে শঙ্কিত যে, শয়তান তাঁর কোনো ক্ষতি করবে? আল্লাহর শপথ, এমনটা হতে পারে না। তাঁকে যখন আমি গর্ভধারণ করি তখন সে ছিল সবচেয়ে হালকা, আর যখন তাঁকে প্রসব করি, তাঁর জন্ম অন্যসব বাচ্চাদের মতো ছিল না। যখন সে বের হয়ে আসলো, আমি আলো দেখতে পেলাম, যা ছিল আশ-শাম পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই বলছি, আল্লাহর সুরক্ষা তাঁর সাথে আছে। আমি নিশ্চিত তাঁর ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল হবে।' এটুকু একনাগাড়ে বলে মা আমিনা থামলেন।
মুহাম্মাদ তাঁর মায়ের সাথে মক্কায় থেকে যান। ছয় বছর বয়সে তাঁর মা মৃত্যুবরণ করেন। এরপর মুহাম্মাদ পিতৃমাতৃহীন হয়ে পড়েন। এরপর তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের কাছে লালিত পালিত হতে লাগলেন। আবদুল মুত্তালিব তাঁকে বড় করেন, কিন্তু নবীজির আট বছর বয়সে তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। তখন মুহাম্মাদ তাঁর চাচা আবু তালিবের কাছে বড় হতে থাকেন। তিনি তাঁকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দেন, সাহায্য করেন, এবং তাঁকে তাঁর জীবনের পরবর্তী চল্লিশ বছর ধরে সহায়তা করে যান।
এই ছিল নবীজির জীবনের প্রথম দিকের বছরসমূহ। রাসূলুল্লাহকে আল্লাহ সর্বদা হেফাযত করেছেন। তৎকালীন সমাজে লোকেদের মাঝে নানান গুনাহ আর পাপকাজের প্রচলন থাকলেও তিনি কখনো সেসবের সাথে জড়াননি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে সেসব কাজ থেকে দূরে রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহর এক ঘটনা বর্ণনা করেন। 'আমি ছিলাম একজন মেষপালক। একদিন আমি আমার এক মেষপালক বন্ধুকে বললাম, 'আজ রাতে আমি মক্কার আসরে যেতে চাই, যেখানে অন্য সকলে যায়।' আমি সেখানে গিয়ে দেখতে চাচ্ছিলাম যে তারা কী করে। তাই আমার বন্ধুকে বললাম, আমি না আসা পর্যন্ত যেন আমার মেষগুলোকে দেখে রাখে। সে রাজি হলো। আমি মক্কায় তাদের আসরের কাছে গেলাম। যেই না আমি সুরেলা ধ্বনি শুনলাম, আল্লাহ আযযা ওয়াজাল সাথে সাথে আমার কান বন্ধ করে দিলেন এবং আমি গভীর ঘুমে ঢলে পড়লাম। আমি যখন জেগে উঠলাম, তখন আসর শেষ হয়ে গেছে। পরের দিন, আমি অন্য একটি আসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি আমার বন্ধুর সাথে কথা বলে সেই আগের দিনের মতো একই রকম ব্যবস্থা করে মক্কায় গেলাম। মক্কায় পৌঁছে আমি আসরে গেলাম। যখনই সুর শুনতে পেলাম, আল্লাহ তাআলা আবারও আমার কান বন্ধ করে দিলেন এবং আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। জেগে উঠলাম আসর শেষ হওয়ার পর। আর তখন আমি উপলব্ধি করলাম যে, এটা আল্লাহর তরফ থেকে আমার জন্য এক বিশেষ নিদর্শন।'
এমন আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন যায়িদ ইবনে হারিসা, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর একজন ক্রীতদাস। তিনি বর্ণনা করেন, ইসাফ ও নাইলা নামে পিতলের দুটো মূর্তি ছিল। মুশরিকরা কাবাঘর তাওয়াফ করার সময় মূর্তিগুলো স্পর্শ করতো। আল্লাহর রাসূল বলেন, 'এগুলো স্পর্শ কোরো না।' তিনি তখনো নবুওয়াত প্রাপ্ত হননি, তারপরেও তিনি কেমন করে যেন জানতেন যে, এগুলো স্পর্শ করা উচিত হবে না। আসলে এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত। ঘটনা এখানেই শেষ নয়, যায়িদ আরো বর্ণনা করেন, 'আমরা যখন ঘুরে আসলাম, তখন আমি মনে মনে ভাবলাম—একটু ছুঁয়েই দেখি না কী হয়!' যেই না আমি ছুঁয়েছি আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমাকে কি এটা করতে নিষেধ করা হয়নি?'
যায়িদ বলেন, 'রাসূলুল্লাহ নবুওয়াতের পূর্ববর্তী জীবনে কখনো কোনো মূর্তিকে নমস্কার করেননি।' রাসূলুল্লাহ কখনও কোনো মূর্তির উপাসনা করেননি এবং কোন মূর্তিকে পূজা করার উদ্দেশ্যে স্পর্শও করেননি। তিনি স্বভাবগতভাবেই মূর্তিপূজা অপছন্দ করতেন। আর তিনি এই নিয়মগুলো নিজ পরিবারের জন্যেও খাটাতেন। তিনি যায়িদকে বলতেন, যায়িদ মূর্তিপূজায় অংশগ্রহণ কোরো না। এই কারণেই আলী ইবনে আবি তালিবও কোনোদিন মূর্তিপূজা করেননি কেননা তিনি মুহাম্মাদের বাড়িতেই বড় হয়েছেন। আবু তালিব দরিদ্র হয়ে পড়লে, রাসূলুল্লাহ তাঁর ছেলে আলী ইবনে আবু তালিবের দেখাশোনা করার দায়িত্ব নেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নবীজিকে কিছু ইবাদত করার প্রতি নির্দেশনা দিতেন, যা সম্পর্কে এর আগে কেউ জানতো না। কুরাইশদের মধ্যে হাজ্জের সময় তারাই ছিল একমাত্র লোক, যারা আরাফাতে অংশগ্রহণ করতো না। হাজ্জের বিভিন্ন নিয়ম কানুন ছিল, যেমন—তাওয়াফ, সাঈ, আরাফাতে অবস্থান এবং মিনায় অবস্থান করা। কুরাইশের লোকজন সব নিয়ম-কানুন পালন করলেও আরাফাতে অবস্থান করতো না এর কারণ হলো তারা এটাকে হারামের সীমানার বাইরে মনে করতো। আরবের অন্য সকলে সেখানে যেতো, আর কুরাইশরা তাদের বলতো, 'আমরা আল হারামের বাসিন্দা, আমরা কীভাবে আল হারামের বাইরে যেতে পারি?' তারা আরাফাতের সীমানা পর্যন্ত গিয়ে সেখানে থেকে যেতো। জুবাইর ইবনে মুত'ইম একবার তার উট হারিয়ে ফেলেন। তিনি তা খুঁজতে খুঁজতে আরাফাতে গিয়ে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে অর্থাৎ আরাফাতে মুহাম্মাদকে দেখতে পেয়ে তিনি আশ্চর্যান্বিত হয়ে যান। তিনি বলে উঠেন, 'সে কি কুরাইশের লোক নয়? সে আরাফাতে কী করছে?'
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুহাম্মাদকে ফিতরাতের মাধ্যমে পথ দেখাতেন, তাঁর অজান্তেই তাঁকে দিয়ে হাজ্জের একটি আহকাম পালন করিয়ে নিয়েছেন, যেটা তাঁর গোত্রের লোকেরা করতো না।
টিকাঃ
৯. সীরাত ইবন হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬১।
১০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭৪।
রাসূলুল্লাহ তাঁর প্রথম জীবনে লালিত হয়েছিলেন তাঁর মা এবং উম্মে আইমানের হাতে, যাঁর আসল নাম বারাকা। উম্মে আইমান ছিলেন একজন আবিসিনিয়ান মহিলা। তিনি মক্কায় বাস করতেন। তিনি পরবর্তীতে মুসলিম হন। রাসূল তাঁকে তাঁর মুক্ত করা দাস যায়িদ ইবনে হারিসের সাথে বিবাহ দেন। আরব নগরীর একটি ঐতিহ্য ছিল তাদের সন্তানদেরকে বড় করার জন্য মরুভূমিতে পাঠানো। তারা বিশ্বাস করতো যে মরুভূমির পরিবেশ হলো স্বাস্থ্যকর ও বিশুদ্ধ। মরুভূমি ছিল গরম এবং শুষ্ক, ফলে তা জীবাণুদের টিকে থাকার জন্য খুবই অনুপযুক্ত পরিবেশ। তারা আরো বিশ্বাস করতো যে, মরুভূমির প্রখরতা তাদের ব্যক্তিত্বকে দৃঢ় আর শক্তিশালী করে তোলে। তাই তারা তাদের সন্তানদের শহর থেকে দূরে মরুভূমিতে পাঠিয়ে দিত। রাসূলুল্লাহর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটে নি। তিনি বেড়ে উঠেছিলেন বনু সাদের ভূমিতে।
হালিমা সাদিয়া ছিলেন রাসূলুল্লাহর দুধ-মা। তিনি তাঁর বান্ধবীদের সাথে মক্কায় এসেছিলেন শিশুর খোঁজে, যাকে তারা লালন-পালন ও দুধ খাওয়াবার জন্য নিয়ে যাবেন। এটা ছিল তাদের ব্যবসা। এই বেদুইন মহিলাগণ মক্কায় আসতো, আর কিছু শিশুকে দুধ খাওয়ানোর জন্য নিয়ে যেতো। এর বিনিময়ে তারা অর্থ লাভ করতো। যে বছর তিনি মক্কায় যান সেটি ছিল দুর্ভিক্ষের বছর। আর তারাও ছিলো হতদরিদ্র। তারা মক্কার বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে দুগ্ধপোষ্য সন্তানদের খোঁজ করতে লাগলো। বেদুইন মহিলাদের প্রত্যেকের কাছেই মুহাম্মাদকে উপস্থিত করা হয়, কিন্তু তারা কেউই তাঁকে গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। এর কারণ ছিল, নবীজি ছিলেন এতিম। তারা বলতে লাগলো, 'এই এতিম আমাদের কী উপকার করবে? কে আমাদেরকে টাকা দেবে, তাঁর তো বাবা মারা গেছে।' তারা ভাবলো যে তাঁর মা তাদেরকে বেশি কিছু দিতে পারবেন না। হালিমার ভাষায়,
"দিন শেষে আমার সব বান্ধবী নিজেদের সঙ্গে শিশুদেরকে নিয়ে তাদের তাঁবুতে ফিরে যাচ্ছিল, একমাত্র আমি ছাড়া। আমি আমার সাথে নেবার মতো একটি শিশুকেও পেলাম না! রাতের বেলা আমার স্বামীকে ডেকে বললাম, শোনো, আমি আগামীকাল সকালে মুহাম্মাদ নামের ওই বাচ্চাটিকেই নিয়ে আসব, আমি খালি হাতে ফিরে যেতে চাই না। আমার স্বামী রাজি হলেন। পরদিন সকালে আমি মুহাম্মাদের মা আমিনা বিনতে ওয়াহাবের কাছে গেলাম। তাঁকে গিয়ে বললাম, আমি আপনার সন্তানকে নিতে রাজি আছি। এর আগের রাতে আমরা একটুও ঘুমাতে পারিনি কারণ আমাদের উটগুলি কোনো দুধ দিচ্ছিল না, দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধার কারণে আমি আমার সন্তানকেও দুধ পান করাতে পারিনি। সে সারারাত কান্নাকাটি করে আমাদেরকেও ঘুমুতে দেয় নি। যখন আমি মুহাম্মাদকে আমার তাঁবুতে নিয়ে এলাম, আমার স্তন যেন এই শিশুকে স্বাগত জানালো। তাঁকে সবটুকু দুধ দিলো, যতখানি তাঁর প্রয়োজন ছিল। সেই দুধ আমার সন্তানের জন্যেও যথেষ্ট ছিল। সেই রাতে আমরা অনেকদিন পর পুরো রাত শান্তিতে ঘুমাতে পেরেছিলাম। কারণ আমার ছেলে গত কয়েক রাত ধরে ঠিকমতো ঘুমুতে পারেনি। আমার স্বামী এরপর উটের দুধ দোহন করতে গেলে, উটটি এত দুধ দিল যে আমার স্বামী আমার কাছে ফিরে এসে বললেন, 'হালিমা, তুমি তো এক বরকতময় আত্মাকে নিয়ে এসেছো!'
মক্কায় আসার সময় আমি একটি দুর্বল বৃদ্ধ গাধার পিঠে ছিলাম। এটি এত ধীরে চলছিল যে এটার সাথে তাল মিলাতে গিয়ে অন্যদেরও আস্তে চলতে হচ্ছিল আর এ কারণে বাকি সবাই বিরক্ত হচ্ছিল। অথচ ফিরে যাওয়ার দিন আমার গাধাটিই হয়ে যায় পুরো দলের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগামী গাধা! আমার বান্ধবীরা আমাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো,
- তুমি তো এই গাধার পিঠে চড়েই মক্কায় এসেছিলে, তাই না?
- হ্যাঁ, এটা সেই গাধাটাই।
- আল্লাহ শপথ, নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটছে।
সেদিনের পর থেকে আমি এবং আমার স্বামী আমাদের ছাগলগুলোকে যখনই মাঠে চরাতে পাঠাতাম, তারা ভরপেট হয়ে ফিরে আসতো। আমরা যখন খুশি দুধ দোহাতে পারতাম। অথচ আমাদের গোত্রের অন্য সকলের পশুগুলো ক্ষুধার্ত থেকে যেতো। সেগুলো কোনো দুধও দিত না। লোকজন তাদের মেষপালকদের নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে লাগল। তারা বলতে লাগল, 'হালিমা তাঁর পশুগুলো যে মাঠে নিয়ে যায় তোমরা কেন সে মাঠে আমাদের পশুগুলোকে চরাতে নিয়ে যাও না?' তারাও তাদের পশুগুলোকে আমাদের পেছন পেছন একই জায়গায় নিয়ে যেতো, এরপরও আমাদের পশুগুলোই ভরপেট ফেরত আসত আর তাদেরগুলো ফিরতো খালি পেটে! দিনে দিনে শিশুটি বেড়ে উঠতে থাকে, আর আমরা আবিষ্কার করতে থাকি যে আল্লাহ তাআলা এই শিশুর উসিলায় আমাদের সকলের জন্য রহমতের ওপর রহমত বর্ষণ করছেন! দুই বছর বয়সেই তাঁকে দেখতে খুবই চমৎকার লাগত। তিনি সেই বয়সী অন্য বাচ্চাদের মতো ছিলেন না, আল্লাহর শপথ, দুই বছর বয়সেই তিনি অনেক বলিষ্ঠ ছিলেন।"
দুই বছর বয়সে শিশু মুহাম্মাদকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেবার সময় চলে আসে। তারা মক্কায় ফিরে গিয়ে আমিনার কাছে শিশু মুহাম্মাদকে আরও কিছুদিন রাখার অনুমতি চান। তারা মুহাম্মাদকে অসম্ভব ভালোবাসতেন এবং এটাও জানতেন যে তিনি ছিলেন বরকতময়। তারা আমিনাকে বিভিন্ন রকম অজুহাত দেখিয়ে বোঝাতে চাচ্ছিলেন যে, মুহাম্মাদের জন্য মরুভূমিতে থাকাই শ্রেয়। আমিনা রাজি হওয়া পর্যন্ত তারা চেষ্টা চালিয়ে যান। একসময় আমিনা সম্মতি দেন। এরপর হালিমা মুহাম্মাদকে আবার মরুভূমিতে ফিরিয়ে নিয়ে যান। হালিমা বলতে থাকেন, "একদিন শিশু মুহাম্মাদ তাঁর দুধ-ভাইয়ের সাথে খেলা করছিলেন। হঠাৎ তাঁর ভাই ছুটে এসে অন্যদের বললো,
- আমার কুরাইশের ভাই!
- কী হয়েছে তাঁর?
- আমি দেখলাম, দুইজন সাদা কাপড় পরা লোক মাটিতে নেমে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে শুইয়ে দিল। এরপর তাঁর বুক চিরে ফেললো।
এ কথা শোনার পর আমি আর তাঁর বাবা ছুটে গেলাম। মুহাম্মাদের মুখ ফ্যাকাসে। আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম,
- কী হয়েছে বাবা?
- দুইজন লোক এসে আমার বুক চিরে আমার ভেতর থেকে কিছু একটা বের করে নিয়ে গেল।
আমি মুহাম্মাদকে খুব বেশি ভালোবাসতাম। কেউ তাঁর কোনো ক্ষতি করুক এটা আমি কিছুতেই চাই না, বিশেষ করে আমার তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায়। তাই দ্রুত মক্কায় ফিরে যাওয়াই সঙ্গত মনে করলাম। মক্কায় গিয়ে আমিনার কাছে বললাম, 'এই যে মুহাম্মাদ, এখন থেকে আপনি তাঁকে নিজের কাছে রাখতে পারেন। আমরা আমাদের দায়িত্ব পূর্ণ করলাম।'
- মাত্র কদিন আগেই তো তোমরা তাঁকে নিজের কাছে রাখার জন্য খুব উৎসাহ দেখাচ্ছিলে। এখন হঠাৎ করে কেন তাঁকে ফিরিয়ে দিতে এলে?
আমরা কোনো উত্তর দিলাম না। কিন্তু মা আমিনাও নাছোড়বান্দা। তিনি আমাদেরকে বারবার প্রশ্ন করতেই লাগলেন, এক পর্যায়ে আমরা তাঁর কাছে আসল ঘটনা খুলে বললাম। সব শুনে আমিনা বললেন, 'তোমরা কি তাঁকে নিয়ে এই ভয়ে শঙ্কিত যে, শয়তান তাঁর কোনো ক্ষতি করবে? আল্লাহর শপথ, এমনটা হতে পারে না। তাঁকে যখন আমি গর্ভধারণ করি তখন সে ছিল সবচেয়ে হালকা, আর যখন তাঁকে প্রসব করি, তাঁর জন্ম অন্যসব বাচ্চাদের মতো ছিল না। যখন সে বের হয়ে আসলো, আমি আলো দেখতে পেলাম, যা ছিল আশ-শাম পর্যন্ত বিস্তৃত। তাই বলছি, আল্লাহর সুরক্ষা তাঁর সাথে আছে। আমি নিশ্চিত তাঁর ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল হবে।' এটুকু একনাগাড়ে বলে মা আমিনা থামলেন।
মুহাম্মাদ তাঁর মায়ের সাথে মক্কায় থেকে যান। ছয় বছর বয়সে তাঁর মা মৃত্যুবরণ করেন। এরপর মুহাম্মাদ পিতৃমাতৃহীন হয়ে পড়েন। এরপর তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের কাছে লালিত পালিত হতে লাগলেন। আবদুল মুত্তালিব তাঁকে বড় করেন, কিন্তু নবীজির আট বছর বয়সে তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। তখন মুহাম্মাদ তাঁর চাচা আবু তালিবের কাছে বড় হতে থাকেন। তিনি তাঁকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দেন, সাহায্য করেন, এবং তাঁকে তাঁর জীবনের পরবর্তী চল্লিশ বছর ধরে সহায়তা করে যান।
এই ছিল নবীজির জীবনের প্রথম দিকের বছরসমূহ। রাসূলুল্লাহকে আল্লাহ সর্বদা হেফাযত করেছেন। তৎকালীন সমাজে লোকেদের মাঝে নানান গুনাহ আর পাপকাজের প্রচলন থাকলেও তিনি কখনো সেসবের সাথে জড়াননি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁকে সেসব কাজ থেকে দূরে রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহর এক ঘটনা বর্ণনা করেন। 'আমি ছিলাম একজন মেষপালক। একদিন আমি আমার এক মেষপালক বন্ধুকে বললাম, 'আজ রাতে আমি মক্কার আসরে যেতে চাই, যেখানে অন্য সকলে যায়।' আমি সেখানে গিয়ে দেখতে চাচ্ছিলাম যে তারা কী করে। তাই আমার বন্ধুকে বললাম, আমি না আসা পর্যন্ত যেন আমার মেষগুলোকে দেখে রাখে। সে রাজি হলো। আমি মক্কায় তাদের আসরের কাছে গেলাম। যেই না আমি সুরেলা ধ্বনি শুনলাম, আল্লাহ আযযা ওয়াজাল সাথে সাথে আমার কান বন্ধ করে দিলেন এবং আমি গভীর ঘুমে ঢলে পড়লাম। আমি যখন জেগে উঠলাম, তখন আসর শেষ হয়ে গেছে। পরের দিন, আমি অন্য একটি আসরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি আমার বন্ধুর সাথে কথা বলে সেই আগের দিনের মতো একই রকম ব্যবস্থা করে মক্কায় গেলাম। মক্কায় পৌঁছে আমি আসরে গেলাম। যখনই সুর শুনতে পেলাম, আল্লাহ তাআলা আবারও আমার কান বন্ধ করে দিলেন এবং আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। জেগে উঠলাম আসর শেষ হওয়ার পর। আর তখন আমি উপলব্ধি করলাম যে, এটা আল্লাহর তরফ থেকে আমার জন্য এক বিশেষ নিদর্শন।'
এমন আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন যায়িদ ইবনে হারিসা, তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর একজন ক্রীতদাস। তিনি বর্ণনা করেন, ইসাফ ও নাইলা নামে পিতলের দুটো মূর্তি ছিল। মুশরিকরা কাবাঘর তাওয়াফ করার সময় মূর্তিগুলো স্পর্শ করতো। আল্লাহর রাসূল বলেন, 'এগুলো স্পর্শ কোরো না।' তিনি তখনো নবুওয়াত প্রাপ্ত হননি, তারপরেও তিনি কেমন করে যেন জানতেন যে, এগুলো স্পর্শ করা উচিত হবে না। আসলে এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত। ঘটনা এখানেই শেষ নয়, যায়িদ আরো বর্ণনা করেন, 'আমরা যখন ঘুরে আসলাম, তখন আমি মনে মনে ভাবলাম—একটু ছুঁয়েই দেখি না কী হয়!' যেই না আমি ছুঁয়েছি আল্লাহর রাসূল বললেন, 'তোমাকে কি এটা করতে নিষেধ করা হয়নি?'
যায়িদ বলেন, 'রাসূলুল্লাহ নবুওয়াতের পূর্ববর্তী জীবনে কখনো কোনো মূর্তিকে নমস্কার করেননি।' রাসূলুল্লাহ কখনও কোনো মূর্তির উপাসনা করেননি এবং কোন মূর্তিকে পূজা করার উদ্দেশ্যে স্পর্শও করেননি। তিনি স্বভাবগতভাবেই মূর্তিপূজা অপছন্দ করতেন। আর তিনি এই নিয়মগুলো নিজ পরিবারের জন্যেও খাটাতেন। তিনি যায়িদকে বলতেন, যায়িদ মূর্তিপূজায় অংশগ্রহণ কোরো না। এই কারণেই আলী ইবনে আবি তালিবও কোনোদিন মূর্তিপূজা করেননি কেননা তিনি মুহাম্মাদের বাড়িতেই বড় হয়েছেন। আবু তালিব দরিদ্র হয়ে পড়লে, রাসূলুল্লাহ তাঁর ছেলে আলী ইবনে আবু তালিবের দেখাশোনা করার দায়িত্ব নেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নবীজিকে কিছু ইবাদত করার প্রতি নির্দেশনা দিতেন, যা সম্পর্কে এর আগে কেউ জানতো না। কুরাইশদের মধ্যে হাজ্জের সময় তারাই ছিল একমাত্র লোক, যারা আরাফাতে অংশগ্রহণ করতো না। হাজ্জের বিভিন্ন নিয়ম কানুন ছিল, যেমন—তাওয়াফ, সাঈ, আরাফাতে অবস্থান এবং মিনায় অবস্থান করা। কুরাইশের লোকজন সব নিয়ম-কানুন পালন করলেও আরাফাতে অবস্থান করতো না এর কারণ হলো তারা এটাকে হারামের সীমানার বাইরে মনে করতো। আরবের অন্য সকলে সেখানে যেতো, আর কুরাইশরা তাদের বলতো, 'আমরা আল হারামের বাসিন্দা, আমরা কীভাবে আল হারামের বাইরে যেতে পারি?' তারা আরাফাতের সীমানা পর্যন্ত গিয়ে সেখানে থেকে যেতো। জুবাইর ইবনে মুত'ইম একবার তার উট হারিয়ে ফেলেন। তিনি তা খুঁজতে খুঁজতে আরাফাতে গিয়ে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে অর্থাৎ আরাফাতে মুহাম্মাদকে দেখতে পেয়ে তিনি আশ্চর্যান্বিত হয়ে যান। তিনি বলে উঠেন, 'সে কি কুরাইশের লোক নয়? সে আরাফাতে কী করছে?'
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মুহাম্মাদকে ফিতরাতের মাধ্যমে পথ দেখাতেন, তাঁর অজান্তেই তাঁকে দিয়ে হাজ্জের একটি আহকাম পালন করিয়ে নিয়েছেন, যেটা তাঁর গোত্রের লোকেরা করতো না।
টিকাঃ
৯. সীরাত ইবন হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬১।
১০. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭৪।
📄 মেষপালন: সকল নবীর পেশা
নবীর প্রথম পেশা ছিল মেষপালন। তিনি বলেন, 'আল্লাহ এমন কোনো নবী পাঠাননি যিনি মেষপালক ছিলেন না।' তাঁর সাথীরা জিজ্ঞেস করেন, 'আর আপনি?' তিনি বলেন, 'হ্যাঁ, আমিও মাঠে ভেড়া চরাতাম আর মক্কার লোকদের কাছ থেকে এই কাজের জন্য বিনিময় নিতাম।'
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো প্রত্যেক নবীই একজন মেষপালক ছিলেন। আল্লাহ তাআলা সব নবীকেই এই কাজটির মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। মেষচালনা থেকে নবীগণ অনেকগুলো শিক্ষা লাভ করেছিলেন। প্রথমত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হলো দায়িত্ববোধ। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'তোমরা সকলেই হলে মেষপালক এবং তোমরা তোমাদের পালের ব্যাপারে দায়িত্ববান।' উদাহরণস্বরূপ, মুসলিমদের জন্য দায়িত্বশীল হলেন তাদের ইমাম, পরিবারের জন্য দায়িত্বশীল পরিবারের কর্তা ইত্যাদি। প্রত্যেক ব্যক্তিই কোনো না কোনো কিছুর ব্যাপারে বা অন্যের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। একজন নেতার জন্য দায়িত্বশীলতা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নেতা তার দলের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে উম্মাহর নেতা হিসেবে প্রেরণ করেছেন তাই তাঁরা তাদের উম্মাহর জন্য হিসাব দিতে বাধ্য থাকবেন।
দ্বিতীয়ত, মেষপালন তাদেরকে ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। ভেড়াদেরকে মাঠে চরানো একটি সময়সাপেক্ষ বিষয়। তারা খুবই ধীরস্থির প্রাণী, সময় নিয়ে আস্তে আস্তে সবকিছু করে। পশুপালককেও তাদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কখনো ভেড়াগুলো নিজেদের মধ্যেই মারামারি লাগিয়ে দেয়, আবার কখনো বা একে অপরের সাথে খেলা করে। কিন্তু মেষপালককে ধৈর্য ধরে সবকিছু লক্ষ রাখতে হয়। সে তাদেরকে এ কথা বলতে পারবে না যে, 'আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, তোমরা তাড়াতাড়ি করো।' ভেড়ারা তাদের মর্জি অনুযায়ী ঢিলেমি করবে। মেষপালকেরা সাধারণত সকালে বের হয়, আর ফেরে সন্ধ্যাবেলায়, সূর্য অস্ত যাবার সময়। আল্লাহ তাআলা সকল নবীকে মেষপালকের দায়িত্ব দিয়ে গড়ে তুলেছেন যেন তাদের মধ্যে ধৈর্যের অনুশীলন গড়ে ওঠে, যেন তাঁরা উম্মাহর ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করতে পারেন। নবী মূসার সাথে তাঁর উম্মাহর লোকেরা যা করেছিল, তা ছিল রীতিমতো অসহনীয়। এই খুবই দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মত চরিত্র গঠনের জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁকে দিয়েই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে মেষপালন করান, দীর্ঘ দশ বছর। নূহ সুদীর্ঘ ৯৫০ বছর দাওয়াহর কাজে ব্যয় করেন, এরপরও তিনি ধৈর্য হারাননি। সকল উপায়ে চেষ্টা চালিয়েছেন, "আমি চেষ্টা করেছি প্রকাশ্যে এবং গোপনে। আমি চেষ্টা করেছি দিনে ও রাতে। আমি চেষ্টা করেছি প্রত্যেক উপায়ে। এবং তারা আমার বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।” (সূরা নূহ, ৭১: ৩)
তৃতীয়ত, সুরক্ষা প্রদান, মেষপালকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো তাদের ভেড়ার পালকে বিপদাপদ থেকে রক্ষা করা। ভেড়ার পালে নেকড়ে বা অন্য পশু হামলা করতে পারে, তাদের রোগবালাই হতে পারে। মেষপালক সর্বদাই তাদেরকে এটা নিশ্চিত করে যে তারা সকল প্রকার আশঙ্কামুক্ত। আল্লাহর নবীরাও অনুরূপ। তাঁরা উম্মাহকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। তাদেরকে শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রকার বিপদ থেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করেন। একবার মদীনায় রাতে হঠাৎ হৈ চৈ শুরু হয়। হৈ চৈ শুনে কিছু সাহাবা অস্ত্র নিয়ে ঘোড়া চালিয়ে সবেগে সেখানে শব্দের উৎসের দিকে ছুটে যান। তাঁরা সেখানে পৌঁছে আশ্চর্য হয়ে দেখলেন যে, রাসূলুল্লাহ ইতিমধ্যেই সেখান থেকে ফিরে আসছেন আর তাদেরকে জানালেন সবকিছু ঠিকঠাক আছে। সাহাবীরা খুব তাড়াহুড়ো করে সেখানে গিয়েছিলেন, কিন্তু রাসূল তাদেরও আগে সেখানে পৌঁছে গিয়ে খোঁজখবর করে ফেলেছেন। রাসূলুল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে সম্ভাব্য সকল বিপদ সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছেন, এমনকি ভবিষ্যতে যেসব বিপদ আসবে যেমন, দাজ্জাল, সে সম্পর্কেও সতর্ক করে গেছেন।
চতুর্থত, দূরদৃষ্টি অর্জন। এই পশুগুলো থাকে মাটির খুব কাছাকাছি এবং তাদের দৃষ্টিসীমা খুবই সীমিত। সামান্য দূরে কী আছে সেটা তারা দেখতে পায় না। চোখের সামনে ছোটোখাটো বস্তুও তাদের দৃষ্টি আটকে দিতে যথেষ্ট। ওপাশে কী আছে তারা বুঝতে পারে না। অন্যদিকে একজন মেষপালকের দৃষ্টিসীমা ভেড়ার তুলনায় বহুগুণে বিস্তৃত, বিপদ আসার অনেক আগেই সে ভেড়াগুলোকে সতর্ক করে দিতে পারে। নবী এবং তাদের অনুসারীদের বিষয়টিও ঠিক এমন। বিপদ ঘটার আগেই নবীরা তাদের উম্মাহকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দেন, কেননা তাদেরই আছে অন্তর্দৃষ্টি এবং দূরদৃষ্টি। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'আমার এবং তোমাদের মধ্যে তুলনা হলো এই, আমি আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে আছি এবং তোমরা আগুনের আলো দ্বারা আকৃষ্ট হচ্ছ আর এতে লাফ দিচ্ছ। আমি তোমাদের কাপড় টেনে, তোমাদেরকে টেনে-হিঁচড়ে সেই আগুন থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি আর তোমরা তখন আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য আমার কাছ থেকে নিজেদেরকে ছুটিয়ে নিচ্ছ। '
সাধারণ মানুষের সাথে নবীদের পার্থক্য হলো এই, নবীরা বিপদ আঁচ করতে পারেন কিন্তু আমরা তা পারি না। হতে পারে ভেড়াদেরকে রক্ষা করার জন্য মেষপালক তাদেরই কাউকে লাঠি দিয়ে আঘাত করলো। তবে এখানে আঘাত করা উদ্দেশ্য নয়, বরং তাদের ভালোর জন্যই আঘাত করাটা দরকার। তাই যখনই আল্লাহর নবীগণ উঠে দাঁড়ান আর মানুষকে কঠিনভাবে সতর্ক করেন, তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা খুব রুঢ় কিংবা আবেগবর্জিত। বরং প্রকৃতপক্ষে তারা উম্মাহর ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান। রাসূল একদিন মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে বললেন, 'আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করছি, আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করছি, আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করছি।' হাদীসের বর্ণনাকারী বলেন, নবীজির কণ্ঠস্বর তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল, বাজারের লোকেরা পর্যন্ত মসজিদ থেকে রাসূলের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিল।
পঞ্চমত, সাধারণ জীবনযাপন। মেষপালকদের জীবন সহজ, সরল, সাদাসিধে। তার তেমন কোনো বিষয়পত্র নেই। মার্সিডিজ বেনজ, টেলিভিশন কিংবা ফ্রিজ নেই। যদি সে ধনী ব্যক্তিও হয়, মেষ চড়ানোর সময় বিলাসি জিনিসগুলো সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাদেরকে হালকাভাবে চলাফেরা করতে হয় যাতে পশুদের দেখাশোনা করা যায়। তারা খুব সাধারণ খাবার খায় এবং তাদের বাসস্থানও বৈচিত্র্যহীন। সাদেকী জীবন যাপন তাদের বৈশিষ্ট্য, আর নবীদের ক্ষেত্রেও তা-ই।
ষষ্ঠত, মেষপালনের অভ্যাস মানুষকে বিভিন্ন পরিবেশে মানিয়ে নিতে শেখায়। রৌদ্রতপ্ত গরম, মুষলধারে বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া বা জমে যাওয়া ঠাণ্ডাতেও মেষপালককে প্রথমে তার পশুপালকে রক্ষা করতে হয় এবং সবশেষে নিজেকে সামলাতে হয়। রাসূলুল্লাহকে অনেক ভ্রমণ করতে হতো, দাওয়াহ এবং জিহাদের জন্য বিভিন্ন রকম আবহাওয়ার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
সপ্তমত, আল্লাহর সৃষ্টির কাছাকাছি থাকা। এটা মানুষকে পৃথিবীর কৃত্রিমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, প্রকৃতির নির্মলতার কাছাকাছি নিয়ে যায়। যখন কেউ মরুভূমিতে আল্লাহর সৃষ্টিকে নিয়ে পড়ে থাকে, তা তাকে মেকি দুনিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। কৃত্রিমতাপূর্ণ জীবন যাপন করতে করতে মন ও মগজে, চিন্তায়-চেতনায় একটা ক্ষত সৃষ্টি হয়। ইট-পাথরের এই পৃথিবীতে প্রায় সবকিছুই কৃত্রিম, সবকিছুই সৃষ্টির স্বাভাবিক বিন্যাসের বিরুদ্ধে। মানুষ সৃষ্টি হয়েছে মাটি থেকে, প্রকৃতি মানুষের অস্তিত্বে মিশে আছে। এই কৃত্রিমতাভরা পৃথিবী মানুষকে আল্লাহর বিশাল সৃষ্টির ব্যাপারে উদাসীন করে রাখে। সে সাধারণভাবে চিন্তা করতে ভুলে যায়। দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলার অনেক সৃষ্টি সম্পর্কে বলেছেন। সূর্য, চাঁদ, তারা, জান্নাত, পাহাড়-পর্বত, নদী, গাছপালা, গরু, মশা, মেঘ, বৃষ্টি কত কিছু স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। আল্লাহর সৃষ্টি হচ্ছে আয়নার মতো, যেখানে আল্লাহর গুণগুলো প্রতিফলিত হয়। আল্লাহর সৃষ্টির দিকে তাকানোর মত করে তাকালেই আল্লাহর গুণ সম্পর্কে জানা যায়। একজন নবী এভাবেই আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতেন।
নবীগণ মেষপালক হওয়ার মাধ্যমেই এমন দরকারি সব শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। উট, গরু বা ছাগল নয়, তাঁরা ছিলেন মেষ পালক। উট বা গরুর তুলনায় ভেড়া অনেক বেশি দুর্বল। সহজেই শিকারীর ফাঁদে পড়ে। তাদের জন্য প্রয়োজন অত্যধিক যত্ন ও সুরক্ষা। শয়তানের ব্যাপারে মানুষ এই ভেড়াগুলোর মতোই দুর্বল। শয়তান মানুষকে অতি সহজেই প্রলুব্ধ করতে পারে, আক্রমণ করতে পারে। রাসূল যখন শয়তান হতে সাবধান করতে চাইতেন, তিনি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতেন, 'তোমরা দলবদ্ধভাবে থাকো, কারণ নেকড়ে দলছুট ভেড়াকেই কামড়ে খায়।' রাসূলুল্লাহ মেষপালনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন নেকড়ে কেবলমাত্র সেই ভেড়াকেই আক্রমণ করে যে দল থেকে আলাদা হয়ে গেছে, পুরো দলকে সে কখনো আক্রমণ করে না। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ভেড়ার পালকরা সাধারণত উট বা অন্যান্য পশুপালকের চেয়ে বেশ আলাদা স্বভাবের হয়। ভেড়ারা নরম-প্রকৃতির প্রাণী, স্নেহের কাঙাল। তাদেরকে দয়া-মায়া দিয়ে পালতে হয়, কঠোর আচরণ করা যায় না। এমনি করে মেষপালকেরাও খুব সদয় ও দয়ালু হওয়ার শিক্ষা পায়। আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে মেষপালনের অনুশীলন করান যেন তাঁরা তাদের অনুসারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারেন। মেষ বা ভেড়ার ক্ষেত্রে যেমন, উটের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টোটা সত্যি। উট খুবই উদ্ধত প্রাণী। উটের প্রতি নরম হলেই সে সরলতার সুযোগ নেবে। উটকে তাই খুব কঠোরভাবে শাসন করতে হয়, এ কারণে উট পালকরা রুঢ় আর কর্কশ স্বভাবের হয়। মানুষ তার পেশা দ্বারা প্রভাবিত হয়। শিক্ষকদের আচরণ পিতৃসুলভ হয়ে থাকে। ডাক্তাররা তাদের লেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আবার অন্যভাবে বলা যায়, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্ব মানুষের পেশাকে প্রভাবিত করে, কারণ মানুষ তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে পেশা নির্বাচন করে আর সেই পেশা বেছে নেওয়ার ফলে তার ওই বৈশিষ্ট্যগুলো আরো প্রকটভাবে তার মাঝে বিকশিত হয়। মুসলিমদের তাদের কাজের ধরন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। মাথায় রাখতে হবে যে, তাদের পেশা ও কাজ তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইবনে হাজার ছিলেন সালাফ আস-সলেহীনদের সময়কার একজন প্রসিদ্ধ আলিম। তিনি তাঁর হাদীসের শারহ (ব্যাখ্যা) নিয়ে লেখা বই, "ফাতহ আল-বারি”-তে উল্লেখ করেন, "নবুওয়াতের পূর্বে নবীদের মেষপালক হিসেবে কর্মরত থাকার পেছনে হিকমাহ হলো, তারা পশুর পালকে চালাতে দক্ষতা অর্জন করতেন, কেননা পরবর্তীতে তাদেরকে নিজ নিজ জাতির পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে। পশুপালন একজন মানুষকে সহনশীল ও দয়ালু হওয়ার শিক্ষা দেয়, ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। যখন একজন মেষপালক তার পশুর পালকে এক স্থানে জড়ো করে, কিংবা পুরো পালকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায়; তখন তাকে তাদের সকলের বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। সেই সাথে নজর রাখতে হয় যেন কোনো শিকারী পশু তাদেরকে আক্রমণ করতে না পারে। এমনি করে সে একটি জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে। ভেতর-বাহির সবরকম শত্রুর হাত থেকে নিরাপত্তা দেওয়ার যোগ্যতা লাভ করে। মেষপালক হওয়ার মাধ্যমে এভাবেই নবীরা তাদের জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় ধৈর্যধারণ করা শিখেছেন, বিভিন্ন ঘরানার মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে শিখেছেন, আর শিখেছেন দুর্বলদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে আর ক্ষমতাসীনদের গুঁড়িয়ে দিতে। আল্লাহ কেন গরু বা উটের বদলে ভেড়ার পালক হিসেবে তাঁর নবীদেরকে নিয়োজিত করেছেন? এর কারণ হলো ভেড়ারা খুবই দুর্বল প্রাণী। তাদের অতিরিক্ত যত্ন ও দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হয়। অন্যান্য পশুর তুলনায় ভেড়ার পালকে সামলে রাখা অত্যন্ত কঠিন। কেননা তারা খুব সহজেই এদিক-ওদিক হেঁটে হারিয়ে যেতে পারে। আর সমাজে মানুষের অবস্থানও ঠিক একই রকম। আর তাই এটা মহান আল্লাহর আযযা ওয়াজালের পরম প্রজ্ঞা যে তিনি নবী-রাসূলদেরকে একইভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।"
সমসাময়িক আরেকজন লেখক এক্ষেত্রে মন্তব্য করেন, "দ্বীন ইসলাম শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে সেইসব চিন্তাবিদ, নির্ভীক, মেধাবী মানুষদের দ্বারা, যারা সৎ ও ন্যায়পরায়ণ। দুশ্চরিত্র মানুষদের সাথে থেকে কেউ ইসলামকে নিজের মাঝে ধারণ করতে পারে না। মুসলিমদের জন্য এটা খুবই জরুরি যে তারা মানুষের স্বভাবজাত সৎগুণকে নিজের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করবে। এর প্রমাণ রয়েছে খলিফা উমার ইবন খাত্তাবের জীবনে, তিনি লোকদেরকে কষ্টসহিষ্ণু এবং কঠোর জীবনে অভ্যস্ত হতে শেখান। চলন্ত ঘোড়ায় উঠতে বলেন। এটা এজন্য যেন লোকজন দীর্ঘ (আরাম-আয়েশের) জীবনের আকাঙ্ক্ষা না করে এবং বদঅভ্যাস (যেমন আলস্য) যেন তাদের পেয়ে না বসে। এর মানে এই নয় যে শহুরে জীবন ছেড়েছুঁড়ে চলে আসতে হবে। বিষয়টা হলো, সেসব (দুনিয়াবী) বিষয় ত্যাগ করতে হবে যেগুলো নিজের মাঝে থাকলে ইসলামের জন্য কষ্ট স্বীকারের ইচ্ছেটুকু নষ্ট হয়ে যায়।"
এই মন্তব্যটি রাসূলুল্লাহর পেশা হিসেবে মেষপালন বেছে নেওয়া এবং প্রাথমিক জীবনে তাঁর মরুভূমিতে বেড়ে ওঠা নিয়ে। এই কাজগুলোর ফলে রাসূলুল্লাহর মধ্যে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকারের অভ্যাস গড়ে ওঠে। নবুওয়াতের মিশনের জন্য তাঁকে উপযুক্ত করে তোলে। রাসূলুল্লাহর ওফাতের কয়েক বছর পর তাঁর সাহাবি উমার যখন খলিফা, এই বিশ্বের সেরা জিনিসগুলোর কর্তৃত্ব হাতের মুঠোয় নিয়ে বসা, আজও তিনি সেসব স্পর্শ করেন নি। খুব সহজ-সরল-সাধারণ জীবন যাপন করেছেন, মুসলিমদেরও সতর্ক করেছেন তারা যেন আরাম-আয়েশের জীবনে অভ্যস্ত না হয়ে রুক্ষ ও কঠোর জীবনের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয়। ইসলাম এমনই এক দ্বীন, এমনই এক বার্তা, যা মেনে চলতে গেলে মু'মিনকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আর তাই প্রস্তুত থাকতে হবে। নাহয় সামান্য চাপেই সে বেসামাল হয়ে পড়বে। দাওয়াহ ইসলামের এমন একটি ইবাদাহ যার জন্য কষ্ট স্বীকারের মানসিকতা থাকা চাই। একজন দাঈ যদি কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার ইচ্ছা ও ধৈর্যধারণ করতে না পারেন, তাহলে তিনি কখনোই আন্তরিকতার সাথে মন-প্রাণ দিয়ে দাওয়াতের কাজে নিজেকে ঢেলে দিতে পারবেন না।
টিকাঃ
১১. সহীহ বুখারি, অধ্যায় ইজারাহ, হাদীস ৩।
১২. ইবন মাজাহ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৭৭২।
১৩. রিয়াদুস স্বলেহীন, অধ্যায় ১, হাদীস ১৬৩ (মুসলিম)।
নবীর প্রথম পেশা ছিল মেষপালন। তিনি বলেন, 'আল্লাহ এমন কোনো নবী পাঠাননি যিনি মেষপালক ছিলেন না।' তাঁর সাথীরা জিজ্ঞেস করেন, 'আর আপনি?' তিনি বলেন, 'হ্যাঁ, আমিও মাঠে ভেড়া চরাতাম আর মক্কার লোকদের কাছ থেকে এই কাজের জন্য বিনিময় নিতাম।'
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো প্রত্যেক নবীই একজন মেষপালক ছিলেন। আল্লাহ তাআলা সব নবীকেই এই কাজটির মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। মেষচালনা থেকে নবীগণ অনেকগুলো শিক্ষা লাভ করেছিলেন। প্রথমত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হলো দায়িত্ববোধ। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'তোমরা সকলেই হলে মেষপালক এবং তোমরা তোমাদের পালের ব্যাপারে দায়িত্ববান।' উদাহরণস্বরূপ, মুসলিমদের জন্য দায়িত্বশীল হলেন তাদের ইমাম, পরিবারের জন্য দায়িত্বশীল পরিবারের কর্তা ইত্যাদি। প্রত্যেক ব্যক্তিই কোনো না কোনো কিছুর ব্যাপারে বা অন্যের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। একজন নেতার জন্য দায়িত্বশীলতা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নেতা তার দলের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে উম্মাহর নেতা হিসেবে প্রেরণ করেছেন তাই তাঁরা তাদের উম্মাহর জন্য হিসাব দিতে বাধ্য থাকবেন।
দ্বিতীয়ত, মেষপালন তাদেরকে ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। ভেড়াদেরকে মাঠে চরানো একটি সময়সাপেক্ষ বিষয়। তারা খুবই ধীরস্থির প্রাণী, সময় নিয়ে আস্তে আস্তে সবকিছু করে। পশুপালককেও তাদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কখনো ভেড়াগুলো নিজেদের মধ্যেই মারামারি লাগিয়ে দেয়, আবার কখনো বা একে অপরের সাথে খেলা করে। কিন্তু মেষপালককে ধৈর্য ধরে সবকিছু লক্ষ রাখতে হয়। সে তাদেরকে এ কথা বলতে পারবে না যে, 'আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, তোমরা তাড়াতাড়ি করো।' ভেড়ারা তাদের মর্জি অনুযায়ী ঢিলেমি করবে। মেষপালকেরা সাধারণত সকালে বের হয়, আর ফেরে সন্ধ্যাবেলায়, সূর্য অস্ত যাবার সময়। আল্লাহ তাআলা সকল নবীকে মেষপালকের দায়িত্ব দিয়ে গড়ে তুলেছেন যেন তাদের মধ্যে ধৈর্যের অনুশীলন গড়ে ওঠে, যেন তাঁরা উম্মাহর ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করতে পারেন। নবী মূসার সাথে তাঁর উম্মাহর লোকেরা যা করেছিল, তা ছিল রীতিমতো অসহনীয়। এই খুবই দুঃসহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মত চরিত্র গঠনের জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁকে দিয়েই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে মেষপালন করান, দীর্ঘ দশ বছর। নূহ সুদীর্ঘ ৯৫০ বছর দাওয়াহর কাজে ব্যয় করেন, এরপরও তিনি ধৈর্য হারাননি। সকল উপায়ে চেষ্টা চালিয়েছেন, "আমি চেষ্টা করেছি প্রকাশ্যে এবং গোপনে। আমি চেষ্টা করেছি দিনে ও রাতে। আমি চেষ্টা করেছি প্রত্যেক উপায়ে। এবং তারা আমার বার্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।” (সূরা নূহ, ৭১: ৩)
তৃতীয়ত, সুরক্ষা প্রদান, মেষপালকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো তাদের ভেড়ার পালকে বিপদাপদ থেকে রক্ষা করা। ভেড়ার পালে নেকড়ে বা অন্য পশু হামলা করতে পারে, তাদের রোগবালাই হতে পারে। মেষপালক সর্বদাই তাদেরকে এটা নিশ্চিত করে যে তারা সকল প্রকার আশঙ্কামুক্ত। আল্লাহর নবীরাও অনুরূপ। তাঁরা উম্মাহকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। তাদেরকে শারীরিক ও মানসিক উভয় প্রকার বিপদ থেকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করেন। একবার মদীনায় রাতে হঠাৎ হৈ চৈ শুরু হয়। হৈ চৈ শুনে কিছু সাহাবা অস্ত্র নিয়ে ঘোড়া চালিয়ে সবেগে সেখানে শব্দের উৎসের দিকে ছুটে যান। তাঁরা সেখানে পৌঁছে আশ্চর্য হয়ে দেখলেন যে, রাসূলুল্লাহ ইতিমধ্যেই সেখান থেকে ফিরে আসছেন আর তাদেরকে জানালেন সবকিছু ঠিকঠাক আছে। সাহাবীরা খুব তাড়াহুড়ো করে সেখানে গিয়েছিলেন, কিন্তু রাসূল তাদেরও আগে সেখানে পৌঁছে গিয়ে খোঁজখবর করে ফেলেছেন। রাসূলুল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে সম্ভাব্য সকল বিপদ সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছেন, এমনকি ভবিষ্যতে যেসব বিপদ আসবে যেমন, দাজ্জাল, সে সম্পর্কেও সতর্ক করে গেছেন।
চতুর্থত, দূরদৃষ্টি অর্জন। এই পশুগুলো থাকে মাটির খুব কাছাকাছি এবং তাদের দৃষ্টিসীমা খুবই সীমিত। সামান্য দূরে কী আছে সেটা তারা দেখতে পায় না। চোখের সামনে ছোটোখাটো বস্তুও তাদের দৃষ্টি আটকে দিতে যথেষ্ট। ওপাশে কী আছে তারা বুঝতে পারে না। অন্যদিকে একজন মেষপালকের দৃষ্টিসীমা ভেড়ার তুলনায় বহুগুণে বিস্তৃত, বিপদ আসার অনেক আগেই সে ভেড়াগুলোকে সতর্ক করে দিতে পারে। নবী এবং তাদের অনুসারীদের বিষয়টিও ঠিক এমন। বিপদ ঘটার আগেই নবীরা তাদের উম্মাহকে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে দেন, কেননা তাদেরই আছে অন্তর্দৃষ্টি এবং দূরদৃষ্টি। রাসূলুল্লাহ বলেন, 'আমার এবং তোমাদের মধ্যে তুলনা হলো এই, আমি আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে আছি এবং তোমরা আগুনের আলো দ্বারা আকৃষ্ট হচ্ছ আর এতে লাফ দিচ্ছ। আমি তোমাদের কাপড় টেনে, তোমাদেরকে টেনে-হিঁচড়ে সেই আগুন থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছি আর তোমরা তখন আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য আমার কাছ থেকে নিজেদেরকে ছুটিয়ে নিচ্ছ। '
সাধারণ মানুষের সাথে নবীদের পার্থক্য হলো এই, নবীরা বিপদ আঁচ করতে পারেন কিন্তু আমরা তা পারি না। হতে পারে ভেড়াদেরকে রক্ষা করার জন্য মেষপালক তাদেরই কাউকে লাঠি দিয়ে আঘাত করলো। তবে এখানে আঘাত করা উদ্দেশ্য নয়, বরং তাদের ভালোর জন্যই আঘাত করাটা দরকার। তাই যখনই আল্লাহর নবীগণ উঠে দাঁড়ান আর মানুষকে কঠিনভাবে সতর্ক করেন, তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা খুব রুঢ় কিংবা আবেগবর্জিত। বরং প্রকৃতপক্ষে তারা উম্মাহর ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান। রাসূল একদিন মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে বললেন, 'আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করছি, আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করছি, আমি তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে সতর্ক করছি।' হাদীসের বর্ণনাকারী বলেন, নবীজির কণ্ঠস্বর তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল, বাজারের লোকেরা পর্যন্ত মসজিদ থেকে রাসূলের কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিল।
পঞ্চমত, সাধারণ জীবনযাপন। মেষপালকদের জীবন সহজ, সরল, সাদাসিধে। তার তেমন কোনো বিষয়পত্র নেই। মার্সিডিজ বেনজ, টেলিভিশন কিংবা ফ্রিজ নেই। যদি সে ধনী ব্যক্তিও হয়, মেষ চড়ানোর সময় বিলাসি জিনিসগুলো সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাদেরকে হালকাভাবে চলাফেরা করতে হয় যাতে পশুদের দেখাশোনা করা যায়। তারা খুব সাধারণ খাবার খায় এবং তাদের বাসস্থানও বৈচিত্র্যহীন। সাদেকী জীবন যাপন তাদের বৈশিষ্ট্য, আর নবীদের ক্ষেত্রেও তা-ই।
ষষ্ঠত, মেষপালনের অভ্যাস মানুষকে বিভিন্ন পরিবেশে মানিয়ে নিতে শেখায়। রৌদ্রতপ্ত গরম, মুষলধারে বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া বা জমে যাওয়া ঠাণ্ডাতেও মেষপালককে প্রথমে তার পশুপালকে রক্ষা করতে হয় এবং সবশেষে নিজেকে সামলাতে হয়। রাসূলুল্লাহকে অনেক ভ্রমণ করতে হতো, দাওয়াহ এবং জিহাদের জন্য বিভিন্ন রকম আবহাওয়ার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
সপ্তমত, আল্লাহর সৃষ্টির কাছাকাছি থাকা। এটা মানুষকে পৃথিবীর কৃত্রিমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, প্রকৃতির নির্মলতার কাছাকাছি নিয়ে যায়। যখন কেউ মরুভূমিতে আল্লাহর সৃষ্টিকে নিয়ে পড়ে থাকে, তা তাকে মেকি দুনিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। কৃত্রিমতাপূর্ণ জীবন যাপন করতে করতে মন ও মগজে, চিন্তায়-চেতনায় একটা ক্ষত সৃষ্টি হয়। ইট-পাথরের এই পৃথিবীতে প্রায় সবকিছুই কৃত্রিম, সবকিছুই সৃষ্টির স্বাভাবিক বিন্যাসের বিরুদ্ধে। মানুষ সৃষ্টি হয়েছে মাটি থেকে, প্রকৃতি মানুষের অস্তিত্বে মিশে আছে। এই কৃত্রিমতাভরা পৃথিবী মানুষকে আল্লাহর বিশাল সৃষ্টির ব্যাপারে উদাসীন করে রাখে। সে সাধারণভাবে চিন্তা করতে ভুলে যায়। দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলার অনেক সৃষ্টি সম্পর্কে বলেছেন। সূর্য, চাঁদ, তারা, জান্নাত, পাহাড়-পর্বত, নদী, গাছপালা, গরু, মশা, মেঘ, বৃষ্টি কত কিছু স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। আল্লাহর সৃষ্টি হচ্ছে আয়নার মতো, যেখানে আল্লাহর গুণগুলো প্রতিফলিত হয়। আল্লাহর সৃষ্টির দিকে তাকানোর মত করে তাকালেই আল্লাহর গুণ সম্পর্কে জানা যায়। একজন নবী এভাবেই আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতেন।
নবীগণ মেষপালক হওয়ার মাধ্যমেই এমন দরকারি সব শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। উট, গরু বা ছাগল নয়, তাঁরা ছিলেন মেষ পালক। উট বা গরুর তুলনায় ভেড়া অনেক বেশি দুর্বল। সহজেই শিকারীর ফাঁদে পড়ে। তাদের জন্য প্রয়োজন অত্যধিক যত্ন ও সুরক্ষা। শয়তানের ব্যাপারে মানুষ এই ভেড়াগুলোর মতোই দুর্বল। শয়তান মানুষকে অতি সহজেই প্রলুব্ধ করতে পারে, আক্রমণ করতে পারে। রাসূল যখন শয়তান হতে সাবধান করতে চাইতেন, তিনি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতেন, 'তোমরা দলবদ্ধভাবে থাকো, কারণ নেকড়ে দলছুট ভেড়াকেই কামড়ে খায়।' রাসূলুল্লাহ মেষপালনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছিলেন নেকড়ে কেবলমাত্র সেই ভেড়াকেই আক্রমণ করে যে দল থেকে আলাদা হয়ে গেছে, পুরো দলকে সে কখনো আক্রমণ করে না। এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ভেড়ার পালকরা সাধারণত উট বা অন্যান্য পশুপালকের চেয়ে বেশ আলাদা স্বভাবের হয়। ভেড়ারা নরম-প্রকৃতির প্রাণী, স্নেহের কাঙাল। তাদেরকে দয়া-মায়া দিয়ে পালতে হয়, কঠোর আচরণ করা যায় না। এমনি করে মেষপালকেরাও খুব সদয় ও দয়ালু হওয়ার শিক্ষা পায়। আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে মেষপালনের অনুশীলন করান যেন তাঁরা তাদের অনুসারীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারেন। মেষ বা ভেড়ার ক্ষেত্রে যেমন, উটের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টোটা সত্যি। উট খুবই উদ্ধত প্রাণী। উটের প্রতি নরম হলেই সে সরলতার সুযোগ নেবে। উটকে তাই খুব কঠোরভাবে শাসন করতে হয়, এ কারণে উট পালকরা রুঢ় আর কর্কশ স্বভাবের হয়। মানুষ তার পেশা দ্বারা প্রভাবিত হয়। শিক্ষকদের আচরণ পিতৃসুলভ হয়ে থাকে। ডাক্তাররা তাদের লেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আবার অন্যভাবে বলা যায়, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিত্ব মানুষের পেশাকে প্রভাবিত করে, কারণ মানুষ তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে পেশা নির্বাচন করে আর সেই পেশা বেছে নেওয়ার ফলে তার ওই বৈশিষ্ট্যগুলো আরো প্রকটভাবে তার মাঝে বিকশিত হয়। মুসলিমদের তাদের কাজের ধরন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। মাথায় রাখতে হবে যে, তাদের পেশা ও কাজ তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইবনে হাজার ছিলেন সালাফ আস-সলেহীনদের সময়কার একজন প্রসিদ্ধ আলিম। তিনি তাঁর হাদীসের শারহ (ব্যাখ্যা) নিয়ে লেখা বই, "ফাতহ আল-বারি”-তে উল্লেখ করেন, "নবুওয়াতের পূর্বে নবীদের মেষপালক হিসেবে কর্মরত থাকার পেছনে হিকমাহ হলো, তারা পশুর পালকে চালাতে দক্ষতা অর্জন করতেন, কেননা পরবর্তীতে তাদেরকে নিজ নিজ জাতির পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে। পশুপালন একজন মানুষকে সহনশীল ও দয়ালু হওয়ার শিক্ষা দেয়, ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। যখন একজন মেষপালক তার পশুর পালকে এক স্থানে জড়ো করে, কিংবা পুরো পালকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যায়; তখন তাকে তাদের সকলের বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। সেই সাথে নজর রাখতে হয় যেন কোনো শিকারী পশু তাদেরকে আক্রমণ করতে না পারে। এমনি করে সে একটি জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে। ভেতর-বাহির সবরকম শত্রুর হাত থেকে নিরাপত্তা দেওয়ার যোগ্যতা লাভ করে। মেষপালক হওয়ার মাধ্যমে এভাবেই নবীরা তাদের জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় ধৈর্যধারণ করা শিখেছেন, বিভিন্ন ঘরানার মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝতে শিখেছেন, আর শিখেছেন দুর্বলদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে আর ক্ষমতাসীনদের গুঁড়িয়ে দিতে। আল্লাহ কেন গরু বা উটের বদলে ভেড়ার পালক হিসেবে তাঁর নবীদেরকে নিয়োজিত করেছেন? এর কারণ হলো ভেড়ারা খুবই দুর্বল প্রাণী। তাদের অতিরিক্ত যত্ন ও দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হয়। অন্যান্য পশুর তুলনায় ভেড়ার পালকে সামলে রাখা অত্যন্ত কঠিন। কেননা তারা খুব সহজেই এদিক-ওদিক হেঁটে হারিয়ে যেতে পারে। আর সমাজে মানুষের অবস্থানও ঠিক একই রকম। আর তাই এটা মহান আল্লাহর আযযা ওয়াজালের পরম প্রজ্ঞা যে তিনি নবী-রাসূলদেরকে একইভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।"
সমসাময়িক আরেকজন লেখক এক্ষেত্রে মন্তব্য করেন, "দ্বীন ইসলাম শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে সেইসব চিন্তাবিদ, নির্ভীক, মেধাবী মানুষদের দ্বারা, যারা সৎ ও ন্যায়পরায়ণ। দুশ্চরিত্র মানুষদের সাথে থেকে কেউ ইসলামকে নিজের মাঝে ধারণ করতে পারে না। মুসলিমদের জন্য এটা খুবই জরুরি যে তারা মানুষের স্বভাবজাত সৎগুণকে নিজের মধ্যে ধারণ করার চেষ্টা করবে। এর প্রমাণ রয়েছে খলিফা উমার ইবন খাত্তাবের জীবনে, তিনি লোকদেরকে কষ্টসহিষ্ণু এবং কঠোর জীবনে অভ্যস্ত হতে শেখান। চলন্ত ঘোড়ায় উঠতে বলেন। এটা এজন্য যেন লোকজন দীর্ঘ (আরাম-আয়েশের) জীবনের আকাঙ্ক্ষা না করে এবং বদঅভ্যাস (যেমন আলস্য) যেন তাদের পেয়ে না বসে। এর মানে এই নয় যে শহুরে জীবন ছেড়েছুঁড়ে চলে আসতে হবে। বিষয়টা হলো, সেসব (দুনিয়াবী) বিষয় ত্যাগ করতে হবে যেগুলো নিজের মাঝে থাকলে ইসলামের জন্য কষ্ট স্বীকারের ইচ্ছেটুকু নষ্ট হয়ে যায়।"
এই মন্তব্যটি রাসূলুল্লাহর পেশা হিসেবে মেষপালন বেছে নেওয়া এবং প্রাথমিক জীবনে তাঁর মরুভূমিতে বেড়ে ওঠা নিয়ে। এই কাজগুলোর ফলে রাসূলুল্লাহর মধ্যে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকারের অভ্যাস গড়ে ওঠে। নবুওয়াতের মিশনের জন্য তাঁকে উপযুক্ত করে তোলে। রাসূলুল্লাহর ওফাতের কয়েক বছর পর তাঁর সাহাবি উমার যখন খলিফা, এই বিশ্বের সেরা জিনিসগুলোর কর্তৃত্ব হাতের মুঠোয় নিয়ে বসা, আজও তিনি সেসব স্পর্শ করেন নি। খুব সহজ-সরল-সাধারণ জীবন যাপন করেছেন, মুসলিমদেরও সতর্ক করেছেন তারা যেন আরাম-আয়েশের জীবনে অভ্যস্ত না হয়ে রুক্ষ ও কঠোর জীবনের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয়। ইসলাম এমনই এক দ্বীন, এমনই এক বার্তা, যা মেনে চলতে গেলে মু'মিনকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আর তাই প্রস্তুত থাকতে হবে। নাহয় সামান্য চাপেই সে বেসামাল হয়ে পড়বে। দাওয়াহ ইসলামের এমন একটি ইবাদাহ যার জন্য কষ্ট স্বীকারের মানসিকতা থাকা চাই। একজন দাঈ যদি কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার ইচ্ছা ও ধৈর্যধারণ করতে না পারেন, তাহলে তিনি কখনোই আন্তরিকতার সাথে মন-প্রাণ দিয়ে দাওয়াতের কাজে নিজেকে ঢেলে দিতে পারবেন না।
টিকাঃ
১১. সহীহ বুখারি, অধ্যায় ইজারাহ, হাদীস ৩।
১২. ইবন মাজাহ, অধ্যায় জিহাদ, হাদীস ২৭৭২।
১৩. রিয়াদুস স্বলেহীন, অধ্যায় ১, হাদীস ১৬৩ (মুসলিম)।