📄 আবরাহার বাহিনী ও হাতির বছর
আবরাহা ইয়েমেন দখল করে নিয়ে সেখানে শাসন করা শুরু করে। সে সবাইকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করতে চাচ্ছিলো। কাবাঘরের প্রতি আরবদের বিশেষ দুর্বলতা ছিল, তাই সে এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কাবার অনুরূপ 'আল-কালিস' নামের একটি চমৎকার গির্জা নির্মাণ করে। কাবার সাথে প্রতিযোগিতা করার উদ্দেশ্যে এই গির্জা বানানো হয়েছিল। কিন্তু এই কাজটি আরব গোত্রগুলোর পছন্দ হয়নি। একদিন রাতের অন্ধকারে একজন গির্জায় গিয়ে মলত্যাগ করে এবং গির্জার দেওয়ালে মল ছুঁড়ে নোংরা করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় আবরাহা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়। সে কাবা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। আবরাহা তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অভিযান শুরু করে। কিন্তু পথিমধ্যে তাকে কিছু বাধার সম্মুখীন হতে হয়। নুফাইল নামের একজন গোত্রনেতা তার বিরোধিতা করে তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সে আবরাহার কাছে হেরে যায় এবং যুদ্ধবন্দী হয়।
আবরাহা আত-তাইফে পৌঁছানোর পর সেখানকার লোকেরা তাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে, কেননা কুরাইশদের সাথে তাইফবাসীর শত্রুতা ছিল। তাইফের এক লোক আবরাহার বাহিনীকে পথ দেখানোর জন্য রাজি হয়, কিন্তু তাইফ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে সে মারা যায়।
আবরাহা আরবের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছাল। সেখানে একটি চারণভূমিতে কিছু মেষ এবং উট চড়ছিল। আবরাহা সেগুলো দখল করে নেয়। এই মেষ এবং উটগুলো ছিল রাসূলুল্লাহর দাদা আবদুল মুত্তালিবের।
আবদুল মুত্তালিব আবরাহার সাথে দেখা করতে গেলেন। অন্যদিকে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন নুফাইলের বন্ধু। নুফাইল আবরাহার কাছে বন্দী ছিলেন। বন্দী অবস্থাতেই নুফাইলের সাথে উনাইস নামের এক ব্যক্তির বন্ধুত্ব হয়। উনাইস ছিল আবরাহার বাহিনীর হস্তীচালক। আবদুল মুত্তালিব নুফাইলের সাথে দেখা করে তাকে বলেন যে, তিনি আবরাহার সাথে দেখা করতে এসেছেন। নুফাইল উনাইসের সাথে কথা বলে আবরাহার সাথে আবদুল মুত্তালিবের দেখা করার বন্দোবস্ত করে দেন। উনাইস আবরাহার সাথে আবদুল মুত্তালিবের সাক্ষাৎ করিয়ে দেয়। আবরাহা তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানায়।
বর্ণনানুসারে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন সুপুরুষ এবং ব্যক্তিত্বের অধিকারী, তাকে দেখে যেকোনো মানুষের মনে শ্রদ্ধার উদ্রেক ঘটবে। আবদুল মুত্তালিবকে দেখার সাথে সাথেই আবরাহা খুব সম্মানের সাথে তাকে স্বাগত জানায়, যদিও তখনও আবদুল মুত্তালিবের সাথে আবরাহার কথা হয়নি। আবরাহা ছিল রাজা, তার সাথে কেউ দেখা করতে আসলে সে অনেক উঁচু একটি সিংহাসনে বসতো এবং বাকিরা নিচে, তার পায়ের কাছে বসতো। কিন্তু সে আবদুল মুত্তালিবকে দেখার পর তাকে পায়ের কাছে বসানো পছন্দ করলো না। সে চাইলে আবদুল মুত্তালিবকে তার সিংহাসনে বসার জন্য বলতে পারতো, কিন্তু তা না করে আবরাহা আবদুল মুত্তালিবের সাথে মেঝেতে বসলো এবং তার দোভাষীর মাধ্যমে জানতে চাইলো যে তিনি কী চান।
কোনো রাখঢাক না রেখে আবদুল মুত্তালিব দোভাষীকে সরাসরি বললেন, 'আবরাহা আমার দু'শ উট লুট করেছে। আমি তা ফেরত নিতে এসেছি।'
- প্রথম দেখায় তোমার প্রতি আমার যে শ্রদ্ধা জাগ্রত হয়েছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে। আমি এসেছি তোমার এবং তোমার পূর্বপুরুষদের লাঞ্ছিত করতে, তোমাদের দেশ ধ্বংস করতে। আমি তোমাদের পূর্বপুরুষদের বানানো আল-কাবা ভেঙে দিতে চাই। আর তুমি কিনা এসেছ আমার কাছে উট চাইতে?
- এই উটের মালিক আমি, তাই আমি আমার উট নিয়ে যেতে এসেছি। কাবা ঘরের মালিক স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। তাই আল্লাহই এর রক্ষণাবেক্ষণ করবেন।
অতঃপর আবরাহা আবদুল মুত্তালিবের উট ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দিল। আবদুল মুত্তালিব মক্কায় ফিরে গেলেন আর তাঁর গোত্রের লোকদের বললেন, 'আবরাহার সাথে যুদ্ধ কোরো না, মক্কা থেকে পালিয়ে যাও।' আবদুল মুত্তালিব পরিষ্কারভাবে সবাইকে পরিস্থিতির কথা জানিয়ে দিলেন। সবাই মক্কা ছেড়ে পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়। আবদুল মুত্তালিব সবার শেষে মক্কা ত্যাগ করেন। যাওয়ার পূর্বে তিনি কাবার চাদর জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর নিকট দুআ করেন যেন আল্লাহ তাআলা তাঁর ঘরকে রক্ষা করেন। তারপর তিনি মক্কা থেকে চলে যান।
আবরাহা তার সৈন্যদলকে কাবার অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার আদেশ দেয় কিন্তু হাতিগুলো কিছুতেই সামনে এগোচ্ছিলো না। হাতি চালকরা তাদের হাতিগুলো অন্য কোনো দিকে চালনা করলে হাতিগুলো সেদিকে দৌড়ে যেতো। কিন্তু তাদেরকে মক্কার দিকে ঠেলা হলে তারা সেখানেই বসে পড়তো। এটা ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কারামত। বলা হয়ে থাকে উনাইস নামের সেই লোকটি হাতির কানের কাছে গিয়ে বলেছিল, 'এটা আল্লাহর ঘর, একে আক্রমণ কোরো না'-এই বলে সে পালিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক, কোনো না কোনো কারণে হাতিগুলো কাবার দিকে এগুচ্ছিলো না।
তারা হাতিগুলোকে মারতে লাগলো, তাদের বল্লম দিয়ে খোঁচা দিয়ে রক্তাক্ত করে ফেললো কিন্তু তবুও হাতিগুলো কাবার দিকে একচুল পরিমাণ নড়লো না। অবশেষে তারা হাতিগুলোকে পিছনে ফেলে সামনে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। আল্লাহ তাআলা এবার তাঁর সৈন্যবাহিনী পাঠালেন। যেকোনো কিছুই আল্লাহর সৈন্য হতে পারে; পানি, বাতাস, জীব-জন্তু। আল্লাহ তাআলা এবার সৈন্য হিসেবে প্রেরণ করলেন এক দল পাখি। সবগুলো পাখি পায়ে একটি করে পাথরের নুড়ি নিয়ে আবরাহার বাহিনীর দিকে উড়ে গেল এবং পাথর ছুঁড়ে তারা নিমেষেই আবরাহার বাহিনী ধ্বংস করে ফেললো। সূরা আল-ফীলে এই ঘটনা বর্ণিত আছে।
রাসূলুল্লাহর জন্মের বছরে এই ঘটনা ঘটেছিল। তাই তাঁর জন্মের বছরকে 'হাতির বছর' বলা হয়।⁶
টিকাঃ
৬. সীরাত ইবন হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮২। পুরো কাহিনীটি খুব সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে।
আবরাহা ইয়েমেন দখল করে নিয়ে সেখানে শাসন করা শুরু করে। সে সবাইকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করতে চাচ্ছিলো। কাবাঘরের প্রতি আরবদের বিশেষ দুর্বলতা ছিল, তাই সে এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কাবার অনুরূপ 'আল-কালিস' নামের একটি চমৎকার গির্জা নির্মাণ করে। কাবার সাথে প্রতিযোগিতা করার উদ্দেশ্যে এই গির্জা বানানো হয়েছিল। কিন্তু এই কাজটি আরব গোত্রগুলোর পছন্দ হয়নি। একদিন রাতের অন্ধকারে একজন গির্জায় গিয়ে মলত্যাগ করে এবং গির্জার দেওয়ালে মল ছুঁড়ে নোংরা করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় আবরাহা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়। সে কাবা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। আবরাহা তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অভিযান শুরু করে। কিন্তু পথিমধ্যে তাকে কিছু বাধার সম্মুখীন হতে হয়। নুফাইল নামের একজন গোত্রনেতা তার বিরোধিতা করে তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সে আবরাহার কাছে হেরে যায় এবং যুদ্ধবন্দী হয়।
আবরাহা আত-তাইফে পৌঁছানোর পর সেখানকার লোকেরা তাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে, কেননা কুরাইশদের সাথে তাইফবাসীর শত্রুতা ছিল। তাইফের এক লোক আবরাহার বাহিনীকে পথ দেখানোর জন্য রাজি হয়, কিন্তু তাইফ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে সে মারা যায়।
আবরাহা আরবের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছাল। সেখানে একটি চারণভূমিতে কিছু মেষ এবং উট চড়ছিল। আবরাহা সেগুলো দখল করে নেয়। এই মেষ এবং উটগুলো ছিল রাসূলুল্লাহর দাদা আবদুল মুত্তালিবের।
আবদুল মুত্তালিব আবরাহার সাথে দেখা করতে গেলেন। অন্যদিকে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন নুফাইলের বন্ধু। নুফাইল আবরাহার কাছে বন্দী ছিলেন। বন্দী অবস্থাতেই নুফাইলের সাথে উনাইস নামের এক ব্যক্তির বন্ধুত্ব হয়। উনাইস ছিল আবরাহার বাহিনীর হস্তীচালক। আবদুল মুত্তালিব নুফাইলের সাথে দেখা করে তাকে বলেন যে, তিনি আবরাহার সাথে দেখা করতে এসেছেন। নুফাইল উনাইসের সাথে কথা বলে আবরাহার সাথে আবদুল মুত্তালিবের দেখা করার বন্দোবস্ত করে দেন। উনাইস আবরাহার সাথে আবদুল মুত্তালিবের সাক্ষাৎ করিয়ে দেয়। আবরাহা তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানায়।
বর্ণনানুসারে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন সুপুরুষ এবং ব্যক্তিত্বের অধিকারী, তাকে দেখে যেকোনো মানুষের মনে শ্রদ্ধার উদ্রেক ঘটবে। আবদুল মুত্তালিবকে দেখার সাথে সাথেই আবরাহা খুব সম্মানের সাথে তাকে স্বাগত জানায়, যদিও তখনও আবদুল মুত্তালিবের সাথে আবরাহার কথা হয়নি। আবরাহা ছিল রাজা, তার সাথে কেউ দেখা করতে আসলে সে অনেক উঁচু একটি সিংহাসনে বসতো এবং বাকিরা নিচে, তার পায়ের কাছে বসতো। কিন্তু সে আবদুল মুত্তালিবকে দেখার পর তাকে পায়ের কাছে বসানো পছন্দ করলো না। সে চাইলে আবদুল মুত্তালিবকে তার সিংহাসনে বসার জন্য বলতে পারতো, কিন্তু তা না করে আবরাহা আবদুল মুত্তালিবের সাথে মেঝেতে বসলো এবং তার দোভাষীর মাধ্যমে জানতে চাইলো যে তিনি কী চান।
কোনো রাখঢাক না রেখে আবদুল মুত্তালিব দোভাষীকে সরাসরি বললেন, 'আবরাহা আমার দু'শ উট লুট করেছে। আমি তা ফেরত নিতে এসেছি।'
- প্রথম দেখায় তোমার প্রতি আমার যে শ্রদ্ধা জাগ্রত হয়েছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে। আমি এসেছি তোমার এবং তোমার পূর্বপুরুষদের লাঞ্ছিত করতে, তোমাদের দেশ ধ্বংস করতে। আমি তোমাদের পূর্বপুরুষদের বানানো আল-কাবা ভেঙে দিতে চাই। আর তুমি কিনা এসেছ আমার কাছে উট চাইতে?
- এই উটের মালিক আমি, তাই আমি আমার উট নিয়ে যেতে এসেছি। কাবা ঘরের মালিক স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। তাই আল্লাহই এর রক্ষণাবেক্ষণ করবেন।
অতঃপর আবরাহা আবদুল মুত্তালিবের উট ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দিল। আবদুল মুত্তালিব মক্কায় ফিরে গেলেন আর তাঁর গোত্রের লোকদের বললেন, 'আবরাহার সাথে যুদ্ধ কোরো না, মক্কা থেকে পালিয়ে যাও।' আবদুল মুত্তালিব পরিষ্কারভাবে সবাইকে পরিস্থিতির কথা জানিয়ে দিলেন। সবাই মক্কা ছেড়ে পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়। আবদুল মুত্তালিব সবার শেষে মক্কা ত্যাগ করেন। যাওয়ার পূর্বে তিনি কাবার চাদর জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর নিকট দুআ করেন যেন আল্লাহ তাআলা তাঁর ঘরকে রক্ষা করেন। তারপর তিনি মক্কা থেকে চলে যান।
আবরাহা তার সৈন্যদলকে কাবার অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার আদেশ দেয় কিন্তু হাতিগুলো কিছুতেই সামনে এগোচ্ছিলো না। হাতি চালকরা তাদের হাতিগুলো অন্য কোনো দিকে চালনা করলে হাতিগুলো সেদিকে দৌড়ে যেতো। কিন্তু তাদেরকে মক্কার দিকে ঠেলা হলে তারা সেখানেই বসে পড়তো। এটা ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কারামত। বলা হয়ে থাকে উনাইস নামের সেই লোকটি হাতির কানের কাছে গিয়ে বলেছিল, 'এটা আল্লাহর ঘর, একে আক্রমণ কোরো না'-এই বলে সে পালিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক, কোনো না কোনো কারণে হাতিগুলো কাবার দিকে এগুচ্ছিলো না।
তারা হাতিগুলোকে মারতে লাগলো, তাদের বল্লম দিয়ে খোঁচা দিয়ে রক্তাক্ত করে ফেললো কিন্তু তবুও হাতিগুলো কাবার দিকে একচুল পরিমাণ নড়লো না। অবশেষে তারা হাতিগুলোকে পিছনে ফেলে সামনে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। আল্লাহ তাআলা এবার তাঁর সৈন্যবাহিনী পাঠালেন। যেকোনো কিছুই আল্লাহর সৈন্য হতে পারে; পানি, বাতাস, জীব-জন্তু। আল্লাহ তাআলা এবার সৈন্য হিসেবে প্রেরণ করলেন এক দল পাখি। সবগুলো পাখি পায়ে একটি করে পাথরের নুড়ি নিয়ে আবরাহার বাহিনীর দিকে উড়ে গেল এবং পাথর ছুঁড়ে তারা নিমেষেই আবরাহার বাহিনী ধ্বংস করে ফেললো। সূরা আল-ফীলে এই ঘটনা বর্ণিত আছে।
রাসূলুল্লাহর জন্মের বছরে এই ঘটনা ঘটেছিল। তাই তাঁর জন্মের বছরকে 'হাতির বছর' বলা হয়।⁶
টিকাঃ
৬. সীরাত ইবন হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮২। পুরো কাহিনীটি খুব সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে।