📄 ইহুদি মতবাদের প্রচলন
ইয়েমেনের রাজা তুব্বান আসআদ ব্যবসার উদ্দেশ্যে আশ-শামে গিয়েছিল। মদীনা অতিক্রম করার সময় সে তার ছেলেকে সেখানে রেখে যায় যেন সে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তার ছেলে মদীনায় ব্যবসা চালিয়ে নিতে পারে। কিন্তু মদীনার কিছু লোক তার ছেলেকে মেরে ফেলে। মদীনায় ফিরে এসে সে তার ছেলের মৃত্যুসংবাদ পায়। এ সংবাদ শুনে সে মদীনাকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাই সে মদীনায় আক্রমণ করে। তার বিশাল সৈন্য বাহিনীকে মোকাবিলা করার মতো মদীনার তেমন শক্তিই ছিল না। তুব্বান চাইলে মদীনাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারত, কিন্তু সে সময় হঠাৎ মদীনায় দুইজন ইহুদী পণ্ডিতের আগমন ঘটে।
রোমানরা জেরুসালেম দখল করার পর ইহুদিরা উদ্বাস্তু হয়ে গিয়েছিল। তখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ শেষ নবীর খোঁজে আরবে চলে আসে। তাদের ধর্মগ্রন্থে শেষ নবীর আগমনের কিছু লক্ষণ ছিল, তারা মদীনায় সেই লক্ষণগুলো দেখতে পায়। তাই তারা মদীনায় বসতি স্থাপন করে। সেখানে বাস করত তাদের তিনটি গোত্র-বনু কায়নুকা, বনু নাযির এবং বনু কুরায়যা। ইহুদি পণ্ডিতরা তুব্বান আস'আদের কাছে গিয়ে বলে, 'দেখুন, এই স্থানটি আল্লাহ তাআলা সুরক্ষিত করে রেখেছেন, যদি আপনি মদীনাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেন তবে আল্লাহ আপনাকে ধ্বংস করে দেবেন।' তারা একথা সেকথা বলে শেষ পর্যন্ত তুব্বানকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, মদীনা আক্রমণ করলে তুব্বান ভুল করবে। তাদের কথায় তুব্বান এতটাই প্রভাবিত হয় যে, সে শুধুমাত্র মদীনা আক্রমণ থেকেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তার ইহুদি ধর্ম ভালো লেগে যায় এবং সেই ইহুদিদের ধর্ম গ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। এরপর সে সেই পণ্ডিতদেরকে ইয়েমেনে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। তারা রাজি হয় এবং অবশেষে তুব্বান ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করে।
সেই সময় হাওয়াযিন এবং কুরাইশ গোত্রের মধ্যে বিরোধ চলছিল। হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা মক্কা ও তুব্বান আস'আদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করার প্রয়াস চালিয়ে আসছিল এবং তারা এই উদ্দেশ্য পূরণে সফলও হয়। তুব্বান মক্কা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন ইহুদি পণ্ডিতরা আবার তাকে বলল যে আল্লাহ তাআলা মক্কাকেও সুরক্ষিত করে রেখেছেন। তাই মক্কায় আক্রমণ করার বদলে তুব্বানের মক্কায় যাওয়া উচিত এবং কাবা শরীফ তাওয়াফ করা উচিত। তুব্বান ইহুদি পণ্ডিতদের সাথে মক্কায় গিয়ে কাবা শরীফ তাওয়াফ করার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু তারা সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ ইহুদি আলিমদের জন্য কাবা তাওয়াফ করা সমীচীন হবে না কেননা কাবা মাটির তৈরি মূর্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত। সুতরাং তুব্বান একাই মক্কায় যায় এবং কাবা শরীফ তাওয়াফ করে। তুব্বান সর্বপ্রথম কাবা শরীফকে চাদর দিয়ে আবৃত করে। সে প্রতি বছর একবার কাবার চাদর পরিবর্তন করত। পূর্বে তারা একটি চাদরের উপর অন্য চাদর বিছিয়ে দিতো। তারা মনে করতো যে, কাবার চাদর অনেক পবিত্র তাই এটি সরানো ঠিক হবে না। এই নিয়ম ততদিন বলবৎ থাকে যতদিন না অনেকগুলো চাদর কাবা শরীফের জন্য অতিরিক্ত ভারী হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে তারা কাবার চাদর অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। তুব্বান আস'আদ ইহুদি পণ্ডিতদের নিয়ে ইয়েমেনে চলে যায় এবং সেখানে তাদেরকে ইহুদি মতবাদ প্রচারের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা এবং উৎসাহ দেয়। বেশিরভাগ গোত্র এই মতবাদ গ্রহণ করে। সুতরাং তখনকার সময়ে দুই ধরনের ইহুদি ছিল। একদল ছিল জাতিগত ভাবে ইহুদি, এরা মূলত খায়বার ও মদীনায় বসবাস করত, আরেকদল ছিল বিশ্বাসগত ভাবে ইহুদি, এরা জাতিগতভাবে আরব, কিন্তু বিশ্বাসের দিক থেকে ইহুদি, এরা বসবাস করত ইয়েমেনে। এ থেকে বোঝা যায়, এক সময়ে ইহুদিরা তাদের ধর্ম প্রচার করত যা তারা এখন আর করে না। এভাবেই আরবে ইহুদি মতবাদের প্রসার ঘটেছিল।
ইয়েমেনের রাজা তুব্বান আসআদ ব্যবসার উদ্দেশ্যে আশ-শামে গিয়েছিল। মদীনা অতিক্রম করার সময় সে তার ছেলেকে সেখানে রেখে যায় যেন সে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত তার ছেলে মদীনায় ব্যবসা চালিয়ে নিতে পারে। কিন্তু মদীনার কিছু লোক তার ছেলেকে মেরে ফেলে। মদীনায় ফিরে এসে সে তার ছেলের মৃত্যুসংবাদ পায়। এ সংবাদ শুনে সে মদীনাকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাই সে মদীনায় আক্রমণ করে। তার বিশাল সৈন্য বাহিনীকে মোকাবিলা করার মতো মদীনার তেমন শক্তিই ছিল না। তুব্বান চাইলে মদীনাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারত, কিন্তু সে সময় হঠাৎ মদীনায় দুইজন ইহুদী পণ্ডিতের আগমন ঘটে।
রোমানরা জেরুসালেম দখল করার পর ইহুদিরা উদ্বাস্তু হয়ে গিয়েছিল। তখন তাদের মধ্যে কেউ কেউ শেষ নবীর খোঁজে আরবে চলে আসে। তাদের ধর্মগ্রন্থে শেষ নবীর আগমনের কিছু লক্ষণ ছিল, তারা মদীনায় সেই লক্ষণগুলো দেখতে পায়। তাই তারা মদীনায় বসতি স্থাপন করে। সেখানে বাস করত তাদের তিনটি গোত্র-বনু কায়নুকা, বনু নাযির এবং বনু কুরায়যা। ইহুদি পণ্ডিতরা তুব্বান আস'আদের কাছে গিয়ে বলে, 'দেখুন, এই স্থানটি আল্লাহ তাআলা সুরক্ষিত করে রেখেছেন, যদি আপনি মদীনাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেন তবে আল্লাহ আপনাকে ধ্বংস করে দেবেন।' তারা একথা সেকথা বলে শেষ পর্যন্ত তুব্বানকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, মদীনা আক্রমণ করলে তুব্বান ভুল করবে। তাদের কথায় তুব্বান এতটাই প্রভাবিত হয় যে, সে শুধুমাত্র মদীনা আক্রমণ থেকেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তার ইহুদি ধর্ম ভালো লেগে যায় এবং সেই ইহুদিদের ধর্ম গ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। এরপর সে সেই পণ্ডিতদেরকে ইয়েমেনে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে। তারা রাজি হয় এবং অবশেষে তুব্বান ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করে।
সেই সময় হাওয়াযিন এবং কুরাইশ গোত্রের মধ্যে বিরোধ চলছিল। হাওয়াযিন গোত্রের লোকেরা মক্কা ও তুব্বান আস'আদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করার প্রয়াস চালিয়ে আসছিল এবং তারা এই উদ্দেশ্য পূরণে সফলও হয়। তুব্বান মক্কা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। তখন ইহুদি পণ্ডিতরা আবার তাকে বলল যে আল্লাহ তাআলা মক্কাকেও সুরক্ষিত করে রেখেছেন। তাই মক্কায় আক্রমণ করার বদলে তুব্বানের মক্কায় যাওয়া উচিত এবং কাবা শরীফ তাওয়াফ করা উচিত। তুব্বান ইহুদি পণ্ডিতদের সাথে মক্কায় গিয়ে কাবা শরীফ তাওয়াফ করার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু তারা সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ ইহুদি আলিমদের জন্য কাবা তাওয়াফ করা সমীচীন হবে না কেননা কাবা মাটির তৈরি মূর্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত। সুতরাং তুব্বান একাই মক্কায় যায় এবং কাবা শরীফ তাওয়াফ করে। তুব্বান সর্বপ্রথম কাবা শরীফকে চাদর দিয়ে আবৃত করে। সে প্রতি বছর একবার কাবার চাদর পরিবর্তন করত। পূর্বে তারা একটি চাদরের উপর অন্য চাদর বিছিয়ে দিতো। তারা মনে করতো যে, কাবার চাদর অনেক পবিত্র তাই এটি সরানো ঠিক হবে না। এই নিয়ম ততদিন বলবৎ থাকে যতদিন না অনেকগুলো চাদর কাবা শরীফের জন্য অতিরিক্ত ভারী হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে তারা কাবার চাদর অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। তুব্বান আস'আদ ইহুদি পণ্ডিতদের নিয়ে ইয়েমেনে চলে যায় এবং সেখানে তাদেরকে ইহুদি মতবাদ প্রচারের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা এবং উৎসাহ দেয়। বেশিরভাগ গোত্র এই মতবাদ গ্রহণ করে। সুতরাং তখনকার সময়ে দুই ধরনের ইহুদি ছিল। একদল ছিল জাতিগত ভাবে ইহুদি, এরা মূলত খায়বার ও মদীনায় বসবাস করত, আরেকদল ছিল বিশ্বাসগত ভাবে ইহুদি, এরা জাতিগতভাবে আরব, কিন্তু বিশ্বাসের দিক থেকে ইহুদি, এরা বসবাস করত ইয়েমেনে। এ থেকে বোঝা যায়, এক সময়ে ইহুদিরা তাদের ধর্ম প্রচার করত যা তারা এখন আর করে না। এভাবেই আরবে ইহুদি মতবাদের প্রসার ঘটেছিল।
📄 খ্রিস্টধর্মের আগমন
ঈসার পর পর্যায়ক্রমে খ্রিস্টধর্মের বিভিন্ন শাখা প্রশাখার সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে অনেক অনুসারী ধর্মচ্যুত হয়। খুব কম সংখ্যক লোকই অবশিষ্ট ছিল যারা ছিল সত্যিকার অর্থে এই ধর্মের প্রকৃত অনুসরণ করতো। পরবর্তীতে তারাই পুনরায় খ্রিস্টধর্ম পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হয়। ঈসার ধর্মের মূল বক্তব্য ছিল বিশুদ্ধ তাওহীদ।
সেই অনুসারীদের মধ্যেই একজন একবার ইয়েমেনে যান এবং সেখানে নাযরান নামের এক এলাকায় খ্রিস্টধর্ম প্রচার করা শুরু করেন। সেখানে অনেক গোপনে এবং ধীরে ধীরে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের কাজ চলছিল। ততদিনে তুব্বান আস'আদ মারা যায়। আর ইয়েমেনের রাজা ছিল তার ছেলে যু নাওয়াস। নতুন এই ধর্মের কথা তার কানে পৌঁছলে সে এটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং এর অনুসারীদের ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করে।
ঈসার পর পর্যায়ক্রমে খ্রিস্টধর্মের বিভিন্ন শাখা প্রশাখার সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে অনেক অনুসারী ধর্মচ্যুত হয়। খুব কম সংখ্যক লোকই অবশিষ্ট ছিল যারা ছিল সত্যিকার অর্থে এই ধর্মের প্রকৃত অনুসরণ করতো। পরবর্তীতে তারাই পুনরায় খ্রিস্টধর্ম পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হয়। ঈসার ধর্মের মূল বক্তব্য ছিল বিশুদ্ধ তাওহীদ।
সেই অনুসারীদের মধ্যেই একজন একবার ইয়েমেনে যান এবং সেখানে নাযরান নামের এক এলাকায় খ্রিস্টধর্ম প্রচার করা শুরু করেন। সেখানে অনেক গোপনে এবং ধীরে ধীরে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের কাজ চলছিল। ততদিনে তুব্বান আস'আদ মারা যায়। আর ইয়েমেনের রাজা ছিল তার ছেলে যু নাওয়াস। নতুন এই ধর্মের কথা তার কানে পৌঁছলে সে এটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং এর অনুসারীদের ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করে।
📄 আসহাবুল উখদুদের গল্প
সহীহ মুসলিমে এই সংক্রান্ত একটি কাহিনি বর্ণিত আছে, গল্পটি এক রাজা ও এক কমবয়সী ছেলেকে ঘিরে। অনেক আলিম গল্পটিকে রাজা যু নাওয়াস এবং ইয়েমেনের তাওহীদবাদী খ্রিস্টানদের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন। ঘটনাটি এমন:
এক রাজা ছিল, সে জাদুবিদ্যা চর্চা করত এবং তার উপদেষ্টাও ছিল জাদুকর। কালের পরিক্রমায় একসময় জাদুকর বার্ধক্যে উপনীত হয়। সে রাজাকে বলে, 'আমার তো সময় শেষ হয়ে আসছে, আমি যেকোনো মুহূর্তে মারা যেতে পারি। তাই আমি একজনকে এই জাদুবিদ্যা শিখিয়ে যেতে চাই যেন আমি মারা যাওয়ার পর সে আমার অভাব পূরণ করতে পারে।' তারা জাদুকরের উত্তরসূরির সন্ধান করতে থাকে। অতঃপর তারা এক বালককে সেই জাদুকরের ছাত্র হিসেবে মনোনীত করে। ছেলেটি খুব সকালে তার বাড়ি থেকে জাদুকরের কাছে জাদুবিদ্যা শিখতে যেত এবং রাতে নিজ বাড়িতে ফিরে যেত।
একদিনের ঘটনা, জাদুকরের বাড়ির দিকে যাওয়ার পথে সে দেখলো একটি ইবাদাতখানা, তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে সেখানে প্রার্থনার আওয়াজ শুনতে পেল। ছেলেটির কাছে এই ইবাদাত একটু অন্যরকম ঠেকলো, সে ঠিক এই ধরনের ইবাদাতের সাথে পরিচিত ছিল না। সে জায়গাটি ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিল। বস্তুত, এটি ছিল তাওহীদের গির্জা। সেখানে ঈসা আনীত সত্য ধর্মের দাওয়াত দেওয়া হতো। সেখানে এক লোকের কাছে সে খ্রিস্টান ধর্মের ব্যাপারে জানতে পারলো এবং তা তাকে অভিভূত করলো। কিন্তু ওই সময়ে তার জাদুকরের কাছ থেকে জাদু শিখার কথা ছিল। ছেলেটি বুঝতে পারছিল না সে কী করবে - এখানে থাকবে নাকি জাদুকরের কাছে চলে যাবে, সে গির্জার ধর্মযাজককে জিজ্ঞাসা করলো যে এই ব্যাপারে তার কী করণীয়। তিনি তাকে প্রতিদিন সকালে তার কাছে এসে শিক্ষাগ্রহণের পরামর্শ দিলেন এবং তারপর জাদুকরের কাছে যেতে বললেন। যদি জাদুকর দেরি করে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করে তাহলে সে যেন বলে, 'আমার পিতামাতার জন্য দেরি হয়েছে।' তিনি তাকে আরো বললেন, বাড়ি ফেরার আগে সে যেন আবার গির্জা হয়ে যায়। যদি তার পিতামাতা বাড়িতে দেরি করে ফেরার কারণ জানতে চায় তাহলে সে যেন বলে যে জাদুকর তাকে দেরি করিয়ে দিয়েছে।
এভাবেই সেই অল্পবয়স্ক ছেলেটির দিন কাটতে লাগলো, সে জাদুকরের কাছে যাওয়ার আগে এবং বাড়ি ফেরার পথে গির্জা থেকে দীক্ষা নিয়ে যায়। একদিন একটি ঘটনা ঘটলো, এক ভয়ানক জন্তু বাজারে ঢুকে পড়লো এবং বাজারে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলো। কেউ জন্তুটিকে থামাতে পারছিল না। তখন ছেলেটি বললো, 'হে আল্লাহ! আমি আজকে জানতে চাই যে ধর্মযাজক এবং জাদুকর, এই দুইজনের মধ্যে কে সঠিক পথের উপর আছে। হে আল্লাহ! আমাকে সঠিক পথ দেখিয়ে দাও।' সবাই জন্তুটিকে হত্যা করার চেষ্টা করলো কিন্তু কেউ সফল হলো না। সে একটি পাথর হাতে নিয়ে বললো, 'হে আল্লাহ! যদি গির্জার ধর্মযাজক সত্য পথের উপর থাকে তাহলে এই পাথর দ্বারা জন্তুটিকে মেরে ফেলো।'
সে সেই জন্তুর দিকে পাথরটি ছুঁড়ে মারলো এবং জন্তুটি সাথে সাথে মারা গেল। ধর্মযাজকের কাছে গিয়ে ছেলেটি সব কিছু খুলে বললো। সবকিছু শুনে তিনি বললেন, 'তুমি আজকে অনেক উঁচু পর্যায়ে উন্নীত হতে পেরেছো। এখন তোমাকে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে।'
প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তাআলার পরীক্ষা ছাড়া কেউ উঁচু মর্যাদার অধিকারী হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীতে পরীক্ষা করার জন্য মানুষদের পাঠিয়েছেন। আর সবাইকে তাদের নিজ নিজ যোগ্যতা অনুসারে পরীক্ষা করা হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন নবীগণ। এরপর পর্যায়ক্রমে যোগ্যতা অনুসারে সবার পরীক্ষা নেওয়া হয়।'
ধর্মযাজক বালকটিকে বলেছিলেন যে, সে শীঘ্রই কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তিনি আরো বললেন যে, 'যখন পরীক্ষার সময় আসবে তখন তুমি আমার নাম কারো কাছে প্রকাশ করে দিও না।' তিনি ভয় পেয়ে নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি-বিষয়টা এমন ছিল না। যেহেতু তাঁর দাওয়াহর পুরো কার্যক্রমটাই গোপনে পরিচালিত হচ্ছিল তাই তিনি সাবধানতা অবলম্বনের জন্য এমনটি করেছেন।
অন্যদিকে, রাজার একজন অন্ধ উপদেষ্টা ছিল। তিনি এই বালকের কাছে আরোগ্য লাভের উদ্দেশ্যে গেলেন। এই বালক ততদিনে সবার কাছে বেশ পরিচিতি লাভ করেছিল এবং সবাই তার কাছে বিভিন্ন সাহায্যের জন্য আসতো। যখন রাজার উপদেষ্টা বালকের কাছে গেলো, সে বললো, 'আমি নই, বরং আল্লাহ তাআলাই আপনাকে সুস্থ করে তুলতে পারবেন।' অতঃপর সে আল্লাহর সাহায্যে লোকটির অন্ধত্ব দূর করে দিল। সুস্থ হওয়ার পর লোকটি রাজার কাছে গেলে রাজা তাকে জিজ্ঞাসা করলো, 'কে তোমাকে সুস্থ করে তুললো?' লোকটি বললো, 'আল্লাহ।' তখন রাজা বললো, "কী! আমি ছাড়া তোমার আর কি কোনো রব আছে?' লোকটি উত্তর দিল, 'হ্যাঁ আছে। আল্লাহ আমার রব এবং আপনারও।'
এরপর রাজা তার এই উপদেষ্টাকে অনেক অত্যাচার করলো যাতে সে ওই ব্যক্তির নাম প্রকাশ করে যে তাকে এই শিক্ষা দিয়েছে। অনেক অত্যাচারের পর সে ছেলেটির নাম প্রকাশ করে দিল। ছেলেটিকে গ্রেপ্তার করা হলো, তাকেও অনেক নির্যাতন করা হলো। সে অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তার শিক্ষকের নাম বলে দিতে বাধ্য হলো। এরপর ধরে আনা হলো বালকের দীক্ষাগুরু সেই ধর্মযাজককে। তাকে তার ধর্ম ত্যাগ করতে বলা হলো। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। এরপর তারা একটি করাত এনে তার মাথার উপর রাখলো আর তাকে কেটে দু'ভাগ করে ফেললো। কিন্তু তবুও তিনি তার দ্বীন ত্যাগ করতে রাজি হননি। অদম্য সাহসিকতার এক অদ্ভুত দৃষ্টান্ত!
বাকি থাকল সেই ছেলেটি। রাজা ছেলেটিকে পাহাড়ের ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার আদেশ করলো। ছেলেটি আল্লাহর কাছে দুআ করলো, 'হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে ভালো মনে করো সেভাবেই আমাকে ওদের হাত থেকে রক্ষা করো।' সে পুরোপুরিভাবে আল্লাহর উপর ভরসা করলো। তারা ছেলেটিকে নিয়ে পাহাড়ের উপরে গেলো। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই পাহাড়টি কেঁপে উঠলো এবং ছেলেটি ছাড়া বাকি সব সৈন্য পাহাড় থেকে পড়ে গেল। এরপর ছেলেটি রাজার প্রাসাদে ফিরে গেল। রাজা তখন অন্য আরেকদল সৈন্যকে আদেশ দিল যে তাকে যেন গভীর সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়। তারা নৌকা করে সমুদ্রে গেল এবং সে পুনরায় একই দুআ করলো, 'হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে ভালো মনে করো সেভাবেই আমাকে ওদের হাত থেকে রক্ষা করো।' হঠাৎ মাঝপথে নৌকাটি উল্টে গেলো এবং সে ছাড়া সবাই ডুবে মারা গেলো। সে আবার রাজার কাছে ফিরে গেল।
পুনরায় রাজা ছেলেটিকে মারতে চাইলো এবং সে আরো এক দল সৈন্য নিয়োগ দিল। সে ছেলে তাকে বললো, 'আপনি আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত মারতে পারবেন না যতক্ষণ না আপনি আমার কথামত কাজ করেন।' রাজা প্রশ্ন করলো, 'কী সেই কাজ?' তখন বালকটি বললো, 'আপনি আমাকে রশি দিয়ে একটি গাছের সাথে বেঁধে সেখানে সবাইকে জড়ো করেন। তারপর আপনি আপনার তীর নিয়ে বলবেন- বিসমিল্লাহ! এই বালকের রবের নামে। এই কাজ করলে আপনি আমাকে মেরে ফেলতে পারবেন।' অর্থাৎ ছেলেটি রাজাকে বলে দিল কীভাবে তাকে মেরে ফেলতে হবে।
ফিদায়ী বা আত্মোৎসর্গমূলক হামলা বা অভিযানের বৈধতার পক্ষের বিভিন্ন দলীলের মধ্যে এই ঘটনাটি প্রমাণ হিসেবে উত্থাপন করা হয়। আল্লাহ তাআলার খাতিরে নিজের জীবন উৎসর্গ করা নিঃসন্দেহে একটি বৈধ কাজ, তবে কখন এবং কোথায় এই কাজটি করা যাবে সেই ব্যাপারে অবশ্যই কিছু বিধিনিষেধ আছে। কারণ এই ঘটনায় দেখা যাচ্ছে ছেলেটি রাজাকে বলে দিয়েছিল যে কীভাবে তাকে মেরে ফেলা সম্ভব। ছেলেটি এই কাজ করেছে একটি মহৎ উদ্দেশ্যে।
রাজা ছেলেটির বলে দেওয়া পদ্ধতি অনুসরণ করলো। 'বিসমিল্লাহ! এই ছেলের রবের নামে' – এই কথা বলে সর্বসমক্ষে রাজা তার দিকে তীর নিক্ষেপ করলো। তীরটি সরাসরি ছেলেটির মাথায় বিঁধে যায়। ফলে সে সাথে সাথে মারা যায়। এটা দেখে ঘটনাস্থলের সবাই মুসলিম হয়ে যায়। ছেলেটি নিজের জীবন বিসর্জন দিল যেন অন্যের জীবন বাঁচতে পারে, আর বেঁচে থাকার অর্থ তো একমাত্র ইসলামের মধ্যেই নিহিত। যে জীবনে ইসলাম নেই, সেই জীবনের কোনো মূল্য নেই। নিজের মৃত্যুর মাধ্যমে সে একদল মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করে গেল।
অতঃপর রাজার উপদেষ্টারা তাকে বললো, 'হায় হায়! আপনি যা আশঙ্কা করছিলেন তা-ই ঘটলো।' ছেলেটিকে রাজা মেরে ফেলতে চেয়েছিল যেন তার দ্বীন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, অথচ এখন সবাই ছেলেটিকে মারা যেতে দেখে মুসলিম হয়ে গেল, রাজার পরিকল্পনা পুরোপুরি ব্যর্থ হলো। রেগে গিয়ে রাজা যু নাওয়াস একটি বড় গর্ত খোঁড়ার জন্য তার সৈন্যদের আদেশ দেয়। তারপর সেই গর্তে কাঠ রেখে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। লোকদেরকে বলা হলো তাদের নতুন ধর্ম পরিত্যাগ করতে। যারা অস্বীকৃতি জানালো তাদের সবাইকে ধরে ধরে এই আগুনে পুড়িয়ে মারা হলো। অনেক মানুষকে সেই জ্বলন্ত আগুনে সেদিন জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। এরা আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছিল। তারা পিছু হটেনি, ছাড়ও দেয়নি।
গল্পের শেষটা অসাধারণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'একজন মহিলা আগুনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো, তার কোলে ছিল তার বাচ্চা। বাচ্চাটির জন্য সে মুহূর্তের জন্য দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন সেই কোলের শিশুটি বলে উঠে, 'মা! আপনি শান্ত হোন কারণ আপনি সত্য পথে আছেন', আর এই কথা শুনে মহিলা নির্ভীকচিত্তে আগুনে ঝাঁপ দেন।' রাসূলুল্লাহ ﷺ আরো বলেন, 'তিনজন শিশু আছে যারা (অলৌকিকভাবে) শিশু বয়সে কথা বলে উঠেছিল। এই শিশুটি তাদেরই একজন।⁴
সূরা আল-বুরুজে এই ঘটনা বর্ণিত আছে। তাদেরকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল, কিন্তু বস্তুত তারা মৃত্যুর মাধ্যমে নতুন জীবন লাভ করেছে। মনে হতে পারে যে, এখানে রাজা বিজয়ী হয়েছে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলছেন ভিন্ন কথা, তিনি বলেছেন,
"...এটিইতো বিরাট সাফল্য।” (সূরা বুরুজ: ১১)
আল্লাহ তাআলা কেন এমন একদল মানুষকে বিজয়ী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন যারা আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছে? প্রকৃত বিজয় দুনিয়াবী শক্তির বিজয় নয়, বরং প্রকৃত বিজয়ী তারাই, যারা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সত্য আদর্শের উপরে, নিজ বিশ্বাসের উপর অটল থাকে। জান্নাতে প্রবেশ করতে পারাই হচ্ছে বিজয়, আর তাই শহীদরা অবশ্যই বিজয়ী, যদিও তারা অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হন বা কষ্ট ভোগ করেন।
সেদিন সব মুসলিমকে হত্যা করা হলেও তাদের মধ্যে একজন বেঁচে যান, তিনি রোমান সম্রাটের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন, কারণ সেই সম্রাট ছিল খ্রিস্টান। খ্রিস্টানরা তৎকালীন সময় বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল, কেননা ততদিনে রোমান খ্রিস্টানরা ত্রিতত্ত্ববাদ ও ঈসাকে ঈশ্বর হিসেবে বিশ্বাস করতে শুরু করে তাদের ধর্মকে বিকৃত করে ফেলে। এই কারণে বিভিন্ন ফিরকার উদ্ভব হয়। সেই বেঁচে যাওয়া মানুষটি রোমান সম্রাটের কাছে গিয়ে তাদের অবস্থার কথা বুঝিয়ে বললেন এবং রোমান সম্রাটের কাছে সাহায্য চাইলেন। রোমান সম্রাট তখন বললো, 'আমরা ইয়েমেন থেকে অনেক দূরে আছি। তবে আমি যা করতে পারি, তোমাদের অবস্থার কথা জানিয়ে আবিসিনিয়ার নাজ্জাশির কাছে সংবাদ পাঠাতে পারি, আশা করি সে তোমাদের সাহায্য করতে পারবে।' তখন আবিসিনিয়ার নাজ্জাশিও খ্রিস্টান ছিলেন। তাই রোমান সম্রাট তাঁর কাছে খবর পাঠালো।
অতঃপর নাজ্জাশি তাঁর সেনাপতি আরইয়াতের নেতৃত্বে একদল সৈন্য পাঠান। তারা ইয়েমেন আক্রমণ করে যু নাওয়াসের সাথে যুদ্ধ করে। যুদ্ধে যু নাওয়াস পরাজিত হয় এবং লোহিত সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। ইয়েমেনের কিছু অংশে তখন আবিসিনিয়ার শাসন শুরু হয়। প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা এই আক্রমণ পরিচালনা করে কারণ ইয়েমেনের ইহুদিরা খ্রিস্টানদের হত্যা করেছিল। আরইয়াত কিছুদিনের জন্য ইয়েমেন শাসন করে। এমন সময় আরইয়াতের এক সেনাপতি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে এবং এই বিদ্রোহের ফলে ইয়েমেনে বসবাসরত আবসিনিয়ানরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল ছিল আরইয়াতের পক্ষে এবং অন্যদল ছিল বিদ্রোহী সেনাপতি আবরাহার পক্ষে। দল দুটি পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
আরইয়াত আবরাহাকে বলে, 'আমরা যদি দুই দল মিলে যুদ্ধ করি তাহলে ইয়েমেনের লোকেরা আমাদের হাত থেকে ইয়েমেন ছিনিয়ে নেবে। কেমন হয় যদি শুধু আমরা দুইজন একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি?' আবরাহা রাজি হয়, কিন্তু সে একটি চক্রান্ত করে। সে গোপনে তার কয়েকজন দেহরক্ষীর সাথে আরইয়াতের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করলো যে, যদি তারা আবরাহাকে হারতে দেখে তবে তারা যেন তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে। বর্ণনামতে আরইয়াত ছিল লম্বা এবং সুঠাম দেহের অধিকারী। অন্যদিকে আবরাহা ছিল খাটো এবং স্থুলকায়। তারা যখন একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল তখন চারপাশে অনেক মানুষ যুদ্ধ দেখছিল। যুদ্ধের প্রথমেই আরইয়াত আবরাহাকে আক্রমণ করে এবং এক পর্যায়ে তার নাক কেটে ফেলে। এমন অবস্থায় আবরাহার একজন রক্ষী এগিয়ে এসে আরইয়াতকে মেরে ফেলে। এভাবেই আবরাহা ইয়েমেনের শাসনক্ষমতা দখল করে।⁵
টিকাঃ
৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৮। তবে ইবন ইসহাক কাহিনীটি অন্যভাবে বর্ণনা করেছেন, তার বর্ণনা অনুসারে রাজা ইসলাম গ্রহণ করে মারা যায় এবং বাকি সকলেও মুসলিম হয়ে যায়। তিন শিশুর দোলনায় কথা বলার হাদীসটি বুখারিতে উল্লেখিত আছে-অধ্যায় নবীদের কথা, হাদীস ১০৭।
৫. সীরাত ইবন হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭২।
সহীহ মুসলিমে এই সংক্রান্ত একটি কাহিনি বর্ণিত আছে, গল্পটি এক রাজা ও এক কমবয়সী ছেলেকে ঘিরে। অনেক আলিম গল্পটিকে রাজা যু নাওয়াস এবং ইয়েমেনের তাওহীদবাদী খ্রিস্টানদের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন। ঘটনাটি এমন:
এক রাজা ছিল, সে জাদুবিদ্যা চর্চা করত এবং তার উপদেষ্টাও ছিল জাদুকর। কালের পরিক্রমায় একসময় জাদুকর বার্ধক্যে উপনীত হয়। সে রাজাকে বলে, 'আমার তো সময় শেষ হয়ে আসছে, আমি যেকোনো মুহূর্তে মারা যেতে পারি। তাই আমি একজনকে এই জাদুবিদ্যা শিখিয়ে যেতে চাই যেন আমি মারা যাওয়ার পর সে আমার অভাব পূরণ করতে পারে।' তারা জাদুকরের উত্তরসূরির সন্ধান করতে থাকে। অতঃপর তারা এক বালককে সেই জাদুকরের ছাত্র হিসেবে মনোনীত করে। ছেলেটি খুব সকালে তার বাড়ি থেকে জাদুকরের কাছে জাদুবিদ্যা শিখতে যেত এবং রাতে নিজ বাড়িতে ফিরে যেত।
একদিনের ঘটনা, জাদুকরের বাড়ির দিকে যাওয়ার পথে সে দেখলো একটি ইবাদাতখানা, তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে সেখানে প্রার্থনার আওয়াজ শুনতে পেল। ছেলেটির কাছে এই ইবাদাত একটু অন্যরকম ঠেকলো, সে ঠিক এই ধরনের ইবাদাতের সাথে পরিচিত ছিল না। সে জায়গাটি ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিল। বস্তুত, এটি ছিল তাওহীদের গির্জা। সেখানে ঈসা আনীত সত্য ধর্মের দাওয়াত দেওয়া হতো। সেখানে এক লোকের কাছে সে খ্রিস্টান ধর্মের ব্যাপারে জানতে পারলো এবং তা তাকে অভিভূত করলো। কিন্তু ওই সময়ে তার জাদুকরের কাছ থেকে জাদু শিখার কথা ছিল। ছেলেটি বুঝতে পারছিল না সে কী করবে - এখানে থাকবে নাকি জাদুকরের কাছে চলে যাবে, সে গির্জার ধর্মযাজককে জিজ্ঞাসা করলো যে এই ব্যাপারে তার কী করণীয়। তিনি তাকে প্রতিদিন সকালে তার কাছে এসে শিক্ষাগ্রহণের পরামর্শ দিলেন এবং তারপর জাদুকরের কাছে যেতে বললেন। যদি জাদুকর দেরি করে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করে তাহলে সে যেন বলে, 'আমার পিতামাতার জন্য দেরি হয়েছে।' তিনি তাকে আরো বললেন, বাড়ি ফেরার আগে সে যেন আবার গির্জা হয়ে যায়। যদি তার পিতামাতা বাড়িতে দেরি করে ফেরার কারণ জানতে চায় তাহলে সে যেন বলে যে জাদুকর তাকে দেরি করিয়ে দিয়েছে।
এভাবেই সেই অল্পবয়স্ক ছেলেটির দিন কাটতে লাগলো, সে জাদুকরের কাছে যাওয়ার আগে এবং বাড়ি ফেরার পথে গির্জা থেকে দীক্ষা নিয়ে যায়। একদিন একটি ঘটনা ঘটলো, এক ভয়ানক জন্তু বাজারে ঢুকে পড়লো এবং বাজারে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলো। কেউ জন্তুটিকে থামাতে পারছিল না। তখন ছেলেটি বললো, 'হে আল্লাহ! আমি আজকে জানতে চাই যে ধর্মযাজক এবং জাদুকর, এই দুইজনের মধ্যে কে সঠিক পথের উপর আছে। হে আল্লাহ! আমাকে সঠিক পথ দেখিয়ে দাও।' সবাই জন্তুটিকে হত্যা করার চেষ্টা করলো কিন্তু কেউ সফল হলো না। সে একটি পাথর হাতে নিয়ে বললো, 'হে আল্লাহ! যদি গির্জার ধর্মযাজক সত্য পথের উপর থাকে তাহলে এই পাথর দ্বারা জন্তুটিকে মেরে ফেলো।'
সে সেই জন্তুর দিকে পাথরটি ছুঁড়ে মারলো এবং জন্তুটি সাথে সাথে মারা গেল। ধর্মযাজকের কাছে গিয়ে ছেলেটি সব কিছু খুলে বললো। সবকিছু শুনে তিনি বললেন, 'তুমি আজকে অনেক উঁচু পর্যায়ে উন্নীত হতে পেরেছো। এখন তোমাকে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে।'
প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তাআলার পরীক্ষা ছাড়া কেউ উঁচু মর্যাদার অধিকারী হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীতে পরীক্ষা করার জন্য মানুষদের পাঠিয়েছেন। আর সবাইকে তাদের নিজ নিজ যোগ্যতা অনুসারে পরীক্ষা করা হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন নবীগণ। এরপর পর্যায়ক্রমে যোগ্যতা অনুসারে সবার পরীক্ষা নেওয়া হয়।'
ধর্মযাজক বালকটিকে বলেছিলেন যে, সে শীঘ্রই কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তিনি আরো বললেন যে, 'যখন পরীক্ষার সময় আসবে তখন তুমি আমার নাম কারো কাছে প্রকাশ করে দিও না।' তিনি ভয় পেয়ে নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি-বিষয়টা এমন ছিল না। যেহেতু তাঁর দাওয়াহর পুরো কার্যক্রমটাই গোপনে পরিচালিত হচ্ছিল তাই তিনি সাবধানতা অবলম্বনের জন্য এমনটি করেছেন।
অন্যদিকে, রাজার একজন অন্ধ উপদেষ্টা ছিল। তিনি এই বালকের কাছে আরোগ্য লাভের উদ্দেশ্যে গেলেন। এই বালক ততদিনে সবার কাছে বেশ পরিচিতি লাভ করেছিল এবং সবাই তার কাছে বিভিন্ন সাহায্যের জন্য আসতো। যখন রাজার উপদেষ্টা বালকের কাছে গেলো, সে বললো, 'আমি নই, বরং আল্লাহ তাআলাই আপনাকে সুস্থ করে তুলতে পারবেন।' অতঃপর সে আল্লাহর সাহায্যে লোকটির অন্ধত্ব দূর করে দিল। সুস্থ হওয়ার পর লোকটি রাজার কাছে গেলে রাজা তাকে জিজ্ঞাসা করলো, 'কে তোমাকে সুস্থ করে তুললো?' লোকটি বললো, 'আল্লাহ।' তখন রাজা বললো, "কী! আমি ছাড়া তোমার আর কি কোনো রব আছে?' লোকটি উত্তর দিল, 'হ্যাঁ আছে। আল্লাহ আমার রব এবং আপনারও।'
এরপর রাজা তার এই উপদেষ্টাকে অনেক অত্যাচার করলো যাতে সে ওই ব্যক্তির নাম প্রকাশ করে যে তাকে এই শিক্ষা দিয়েছে। অনেক অত্যাচারের পর সে ছেলেটির নাম প্রকাশ করে দিল। ছেলেটিকে গ্রেপ্তার করা হলো, তাকেও অনেক নির্যাতন করা হলো। সে অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তার শিক্ষকের নাম বলে দিতে বাধ্য হলো। এরপর ধরে আনা হলো বালকের দীক্ষাগুরু সেই ধর্মযাজককে। তাকে তার ধর্ম ত্যাগ করতে বলা হলো। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। এরপর তারা একটি করাত এনে তার মাথার উপর রাখলো আর তাকে কেটে দু'ভাগ করে ফেললো। কিন্তু তবুও তিনি তার দ্বীন ত্যাগ করতে রাজি হননি। অদম্য সাহসিকতার এক অদ্ভুত দৃষ্টান্ত!
বাকি থাকল সেই ছেলেটি। রাজা ছেলেটিকে পাহাড়ের ওপর থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার আদেশ করলো। ছেলেটি আল্লাহর কাছে দুআ করলো, 'হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে ভালো মনে করো সেভাবেই আমাকে ওদের হাত থেকে রক্ষা করো।' সে পুরোপুরিভাবে আল্লাহর উপর ভরসা করলো। তারা ছেলেটিকে নিয়ে পাহাড়ের উপরে গেলো। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই পাহাড়টি কেঁপে উঠলো এবং ছেলেটি ছাড়া বাকি সব সৈন্য পাহাড় থেকে পড়ে গেল। এরপর ছেলেটি রাজার প্রাসাদে ফিরে গেল। রাজা তখন অন্য আরেকদল সৈন্যকে আদেশ দিল যে তাকে যেন গভীর সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়। তারা নৌকা করে সমুদ্রে গেল এবং সে পুনরায় একই দুআ করলো, 'হে আল্লাহ! তুমি যেভাবে ভালো মনে করো সেভাবেই আমাকে ওদের হাত থেকে রক্ষা করো।' হঠাৎ মাঝপথে নৌকাটি উল্টে গেলো এবং সে ছাড়া সবাই ডুবে মারা গেলো। সে আবার রাজার কাছে ফিরে গেল।
পুনরায় রাজা ছেলেটিকে মারতে চাইলো এবং সে আরো এক দল সৈন্য নিয়োগ দিল। সে ছেলে তাকে বললো, 'আপনি আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত মারতে পারবেন না যতক্ষণ না আপনি আমার কথামত কাজ করেন।' রাজা প্রশ্ন করলো, 'কী সেই কাজ?' তখন বালকটি বললো, 'আপনি আমাকে রশি দিয়ে একটি গাছের সাথে বেঁধে সেখানে সবাইকে জড়ো করেন। তারপর আপনি আপনার তীর নিয়ে বলবেন- বিসমিল্লাহ! এই বালকের রবের নামে। এই কাজ করলে আপনি আমাকে মেরে ফেলতে পারবেন।' অর্থাৎ ছেলেটি রাজাকে বলে দিল কীভাবে তাকে মেরে ফেলতে হবে।
ফিদায়ী বা আত্মোৎসর্গমূলক হামলা বা অভিযানের বৈধতার পক্ষের বিভিন্ন দলীলের মধ্যে এই ঘটনাটি প্রমাণ হিসেবে উত্থাপন করা হয়। আল্লাহ তাআলার খাতিরে নিজের জীবন উৎসর্গ করা নিঃসন্দেহে একটি বৈধ কাজ, তবে কখন এবং কোথায় এই কাজটি করা যাবে সেই ব্যাপারে অবশ্যই কিছু বিধিনিষেধ আছে। কারণ এই ঘটনায় দেখা যাচ্ছে ছেলেটি রাজাকে বলে দিয়েছিল যে কীভাবে তাকে মেরে ফেলা সম্ভব। ছেলেটি এই কাজ করেছে একটি মহৎ উদ্দেশ্যে।
রাজা ছেলেটির বলে দেওয়া পদ্ধতি অনুসরণ করলো। 'বিসমিল্লাহ! এই ছেলের রবের নামে' – এই কথা বলে সর্বসমক্ষে রাজা তার দিকে তীর নিক্ষেপ করলো। তীরটি সরাসরি ছেলেটির মাথায় বিঁধে যায়। ফলে সে সাথে সাথে মারা যায়। এটা দেখে ঘটনাস্থলের সবাই মুসলিম হয়ে যায়। ছেলেটি নিজের জীবন বিসর্জন দিল যেন অন্যের জীবন বাঁচতে পারে, আর বেঁচে থাকার অর্থ তো একমাত্র ইসলামের মধ্যেই নিহিত। যে জীবনে ইসলাম নেই, সেই জীবনের কোনো মূল্য নেই। নিজের মৃত্যুর মাধ্যমে সে একদল মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করে গেল।
অতঃপর রাজার উপদেষ্টারা তাকে বললো, 'হায় হায়! আপনি যা আশঙ্কা করছিলেন তা-ই ঘটলো।' ছেলেটিকে রাজা মেরে ফেলতে চেয়েছিল যেন তার দ্বীন মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, অথচ এখন সবাই ছেলেটিকে মারা যেতে দেখে মুসলিম হয়ে গেল, রাজার পরিকল্পনা পুরোপুরি ব্যর্থ হলো। রেগে গিয়ে রাজা যু নাওয়াস একটি বড় গর্ত খোঁড়ার জন্য তার সৈন্যদের আদেশ দেয়। তারপর সেই গর্তে কাঠ রেখে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। লোকদেরকে বলা হলো তাদের নতুন ধর্ম পরিত্যাগ করতে। যারা অস্বীকৃতি জানালো তাদের সবাইকে ধরে ধরে এই আগুনে পুড়িয়ে মারা হলো। অনেক মানুষকে সেই জ্বলন্ত আগুনে সেদিন জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। এরা আল্লাহর প্রতি তাদের বিশ্বাসকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করেছিল। তারা পিছু হটেনি, ছাড়ও দেয়নি।
গল্পের শেষটা অসাধারণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'একজন মহিলা আগুনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো, তার কোলে ছিল তার বাচ্চা। বাচ্চাটির জন্য সে মুহূর্তের জন্য দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন সেই কোলের শিশুটি বলে উঠে, 'মা! আপনি শান্ত হোন কারণ আপনি সত্য পথে আছেন', আর এই কথা শুনে মহিলা নির্ভীকচিত্তে আগুনে ঝাঁপ দেন।' রাসূলুল্লাহ ﷺ আরো বলেন, 'তিনজন শিশু আছে যারা (অলৌকিকভাবে) শিশু বয়সে কথা বলে উঠেছিল। এই শিশুটি তাদেরই একজন।⁴
সূরা আল-বুরুজে এই ঘটনা বর্ণিত আছে। তাদেরকে জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল, কিন্তু বস্তুত তারা মৃত্যুর মাধ্যমে নতুন জীবন লাভ করেছে। মনে হতে পারে যে, এখানে রাজা বিজয়ী হয়েছে, কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলছেন ভিন্ন কথা, তিনি বলেছেন,
"...এটিইতো বিরাট সাফল্য।” (সূরা বুরুজ: ১১)
আল্লাহ তাআলা কেন এমন একদল মানুষকে বিজয়ী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন যারা আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছে? প্রকৃত বিজয় দুনিয়াবী শক্তির বিজয় নয়, বরং প্রকৃত বিজয়ী তারাই, যারা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সত্য আদর্শের উপরে, নিজ বিশ্বাসের উপর অটল থাকে। জান্নাতে প্রবেশ করতে পারাই হচ্ছে বিজয়, আর তাই শহীদরা অবশ্যই বিজয়ী, যদিও তারা অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হন বা কষ্ট ভোগ করেন।
সেদিন সব মুসলিমকে হত্যা করা হলেও তাদের মধ্যে একজন বেঁচে যান, তিনি রোমান সম্রাটের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন, কারণ সেই সম্রাট ছিল খ্রিস্টান। খ্রিস্টানরা তৎকালীন সময় বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল, কেননা ততদিনে রোমান খ্রিস্টানরা ত্রিতত্ত্ববাদ ও ঈসাকে ঈশ্বর হিসেবে বিশ্বাস করতে শুরু করে তাদের ধর্মকে বিকৃত করে ফেলে। এই কারণে বিভিন্ন ফিরকার উদ্ভব হয়। সেই বেঁচে যাওয়া মানুষটি রোমান সম্রাটের কাছে গিয়ে তাদের অবস্থার কথা বুঝিয়ে বললেন এবং রোমান সম্রাটের কাছে সাহায্য চাইলেন। রোমান সম্রাট তখন বললো, 'আমরা ইয়েমেন থেকে অনেক দূরে আছি। তবে আমি যা করতে পারি, তোমাদের অবস্থার কথা জানিয়ে আবিসিনিয়ার নাজ্জাশির কাছে সংবাদ পাঠাতে পারি, আশা করি সে তোমাদের সাহায্য করতে পারবে।' তখন আবিসিনিয়ার নাজ্জাশিও খ্রিস্টান ছিলেন। তাই রোমান সম্রাট তাঁর কাছে খবর পাঠালো।
অতঃপর নাজ্জাশি তাঁর সেনাপতি আরইয়াতের নেতৃত্বে একদল সৈন্য পাঠান। তারা ইয়েমেন আক্রমণ করে যু নাওয়াসের সাথে যুদ্ধ করে। যুদ্ধে যু নাওয়াস পরাজিত হয় এবং লোহিত সাগরে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। ইয়েমেনের কিছু অংশে তখন আবিসিনিয়ার শাসন শুরু হয়। প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা এই আক্রমণ পরিচালনা করে কারণ ইয়েমেনের ইহুদিরা খ্রিস্টানদের হত্যা করেছিল। আরইয়াত কিছুদিনের জন্য ইয়েমেন শাসন করে। এমন সময় আরইয়াতের এক সেনাপতি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বসে এবং এই বিদ্রোহের ফলে ইয়েমেনে বসবাসরত আবসিনিয়ানরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল ছিল আরইয়াতের পক্ষে এবং অন্যদল ছিল বিদ্রোহী সেনাপতি আবরাহার পক্ষে। দল দুটি পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
আরইয়াত আবরাহাকে বলে, 'আমরা যদি দুই দল মিলে যুদ্ধ করি তাহলে ইয়েমেনের লোকেরা আমাদের হাত থেকে ইয়েমেন ছিনিয়ে নেবে। কেমন হয় যদি শুধু আমরা দুইজন একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি?' আবরাহা রাজি হয়, কিন্তু সে একটি চক্রান্ত করে। সে গোপনে তার কয়েকজন দেহরক্ষীর সাথে আরইয়াতের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করলো যে, যদি তারা আবরাহাকে হারতে দেখে তবে তারা যেন তাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে। বর্ণনামতে আরইয়াত ছিল লম্বা এবং সুঠাম দেহের অধিকারী। অন্যদিকে আবরাহা ছিল খাটো এবং স্থুলকায়। তারা যখন একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল তখন চারপাশে অনেক মানুষ যুদ্ধ দেখছিল। যুদ্ধের প্রথমেই আরইয়াত আবরাহাকে আক্রমণ করে এবং এক পর্যায়ে তার নাক কেটে ফেলে। এমন অবস্থায় আবরাহার একজন রক্ষী এগিয়ে এসে আরইয়াতকে মেরে ফেলে। এভাবেই আবরাহা ইয়েমেনের শাসনক্ষমতা দখল করে।⁵
টিকাঃ
৪. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫৮। তবে ইবন ইসহাক কাহিনীটি অন্যভাবে বর্ণনা করেছেন, তার বর্ণনা অনুসারে রাজা ইসলাম গ্রহণ করে মারা যায় এবং বাকি সকলেও মুসলিম হয়ে যায়। তিন শিশুর দোলনায় কথা বলার হাদীসটি বুখারিতে উল্লেখিত আছে-অধ্যায় নবীদের কথা, হাদীস ১০৭।
৫. সীরাত ইবন হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭২।
📄 আবরাহার বাহিনী ও হাতির বছর
আবরাহা ইয়েমেন দখল করে নিয়ে সেখানে শাসন করা শুরু করে। সে সবাইকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করতে চাচ্ছিলো। কাবাঘরের প্রতি আরবদের বিশেষ দুর্বলতা ছিল, তাই সে এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কাবার অনুরূপ 'আল-কালিস' নামের একটি চমৎকার গির্জা নির্মাণ করে। কাবার সাথে প্রতিযোগিতা করার উদ্দেশ্যে এই গির্জা বানানো হয়েছিল। কিন্তু এই কাজটি আরব গোত্রগুলোর পছন্দ হয়নি। একদিন রাতের অন্ধকারে একজন গির্জায় গিয়ে মলত্যাগ করে এবং গির্জার দেওয়ালে মল ছুঁড়ে নোংরা করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় আবরাহা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়। সে কাবা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। আবরাহা তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অভিযান শুরু করে। কিন্তু পথিমধ্যে তাকে কিছু বাধার সম্মুখীন হতে হয়। নুফাইল নামের একজন গোত্রনেতা তার বিরোধিতা করে তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সে আবরাহার কাছে হেরে যায় এবং যুদ্ধবন্দী হয়।
আবরাহা আত-তাইফে পৌঁছানোর পর সেখানকার লোকেরা তাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে, কেননা কুরাইশদের সাথে তাইফবাসীর শত্রুতা ছিল। তাইফের এক লোক আবরাহার বাহিনীকে পথ দেখানোর জন্য রাজি হয়, কিন্তু তাইফ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে সে মারা যায়।
আবরাহা আরবের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছাল। সেখানে একটি চারণভূমিতে কিছু মেষ এবং উট চড়ছিল। আবরাহা সেগুলো দখল করে নেয়। এই মেষ এবং উটগুলো ছিল রাসূলুল্লাহর দাদা আবদুল মুত্তালিবের।
আবদুল মুত্তালিব আবরাহার সাথে দেখা করতে গেলেন। অন্যদিকে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন নুফাইলের বন্ধু। নুফাইল আবরাহার কাছে বন্দী ছিলেন। বন্দী অবস্থাতেই নুফাইলের সাথে উনাইস নামের এক ব্যক্তির বন্ধুত্ব হয়। উনাইস ছিল আবরাহার বাহিনীর হস্তীচালক। আবদুল মুত্তালিব নুফাইলের সাথে দেখা করে তাকে বলেন যে, তিনি আবরাহার সাথে দেখা করতে এসেছেন। নুফাইল উনাইসের সাথে কথা বলে আবরাহার সাথে আবদুল মুত্তালিবের দেখা করার বন্দোবস্ত করে দেন। উনাইস আবরাহার সাথে আবদুল মুত্তালিবের সাক্ষাৎ করিয়ে দেয়। আবরাহা তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানায়।
বর্ণনানুসারে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন সুপুরুষ এবং ব্যক্তিত্বের অধিকারী, তাকে দেখে যেকোনো মানুষের মনে শ্রদ্ধার উদ্রেক ঘটবে। আবদুল মুত্তালিবকে দেখার সাথে সাথেই আবরাহা খুব সম্মানের সাথে তাকে স্বাগত জানায়, যদিও তখনও আবদুল মুত্তালিবের সাথে আবরাহার কথা হয়নি। আবরাহা ছিল রাজা, তার সাথে কেউ দেখা করতে আসলে সে অনেক উঁচু একটি সিংহাসনে বসতো এবং বাকিরা নিচে, তার পায়ের কাছে বসতো। কিন্তু সে আবদুল মুত্তালিবকে দেখার পর তাকে পায়ের কাছে বসানো পছন্দ করলো না। সে চাইলে আবদুল মুত্তালিবকে তার সিংহাসনে বসার জন্য বলতে পারতো, কিন্তু তা না করে আবরাহা আবদুল মুত্তালিবের সাথে মেঝেতে বসলো এবং তার দোভাষীর মাধ্যমে জানতে চাইলো যে তিনি কী চান।
কোনো রাখঢাক না রেখে আবদুল মুত্তালিব দোভাষীকে সরাসরি বললেন, 'আবরাহা আমার দু'শ উট লুট করেছে। আমি তা ফেরত নিতে এসেছি।'
- প্রথম দেখায় তোমার প্রতি আমার যে শ্রদ্ধা জাগ্রত হয়েছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে। আমি এসেছি তোমার এবং তোমার পূর্বপুরুষদের লাঞ্ছিত করতে, তোমাদের দেশ ধ্বংস করতে। আমি তোমাদের পূর্বপুরুষদের বানানো আল-কাবা ভেঙে দিতে চাই। আর তুমি কিনা এসেছ আমার কাছে উট চাইতে?
- এই উটের মালিক আমি, তাই আমি আমার উট নিয়ে যেতে এসেছি। কাবা ঘরের মালিক স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। তাই আল্লাহই এর রক্ষণাবেক্ষণ করবেন।
অতঃপর আবরাহা আবদুল মুত্তালিবের উট ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দিল। আবদুল মুত্তালিব মক্কায় ফিরে গেলেন আর তাঁর গোত্রের লোকদের বললেন, 'আবরাহার সাথে যুদ্ধ কোরো না, মক্কা থেকে পালিয়ে যাও।' আবদুল মুত্তালিব পরিষ্কারভাবে সবাইকে পরিস্থিতির কথা জানিয়ে দিলেন। সবাই মক্কা ছেড়ে পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়। আবদুল মুত্তালিব সবার শেষে মক্কা ত্যাগ করেন। যাওয়ার পূর্বে তিনি কাবার চাদর জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর নিকট দুআ করেন যেন আল্লাহ তাআলা তাঁর ঘরকে রক্ষা করেন। তারপর তিনি মক্কা থেকে চলে যান।
আবরাহা তার সৈন্যদলকে কাবার অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার আদেশ দেয় কিন্তু হাতিগুলো কিছুতেই সামনে এগোচ্ছিলো না। হাতি চালকরা তাদের হাতিগুলো অন্য কোনো দিকে চালনা করলে হাতিগুলো সেদিকে দৌড়ে যেতো। কিন্তু তাদেরকে মক্কার দিকে ঠেলা হলে তারা সেখানেই বসে পড়তো। এটা ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কারামত। বলা হয়ে থাকে উনাইস নামের সেই লোকটি হাতির কানের কাছে গিয়ে বলেছিল, 'এটা আল্লাহর ঘর, একে আক্রমণ কোরো না'-এই বলে সে পালিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক, কোনো না কোনো কারণে হাতিগুলো কাবার দিকে এগুচ্ছিলো না।
তারা হাতিগুলোকে মারতে লাগলো, তাদের বল্লম দিয়ে খোঁচা দিয়ে রক্তাক্ত করে ফেললো কিন্তু তবুও হাতিগুলো কাবার দিকে একচুল পরিমাণ নড়লো না। অবশেষে তারা হাতিগুলোকে পিছনে ফেলে সামনে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। আল্লাহ তাআলা এবার তাঁর সৈন্যবাহিনী পাঠালেন। যেকোনো কিছুই আল্লাহর সৈন্য হতে পারে; পানি, বাতাস, জীব-জন্তু। আল্লাহ তাআলা এবার সৈন্য হিসেবে প্রেরণ করলেন এক দল পাখি। সবগুলো পাখি পায়ে একটি করে পাথরের নুড়ি নিয়ে আবরাহার বাহিনীর দিকে উড়ে গেল এবং পাথর ছুঁড়ে তারা নিমেষেই আবরাহার বাহিনী ধ্বংস করে ফেললো। সূরা আল-ফীলে এই ঘটনা বর্ণিত আছে।
রাসূলুল্লাহর জন্মের বছরে এই ঘটনা ঘটেছিল। তাই তাঁর জন্মের বছরকে 'হাতির বছর' বলা হয়।⁶
টিকাঃ
৬. সীরাত ইবন হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮২। পুরো কাহিনীটি খুব সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে।
আবরাহা ইয়েমেন দখল করে নিয়ে সেখানে শাসন করা শুরু করে। সে সবাইকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করতে চাচ্ছিলো। কাবাঘরের প্রতি আরবদের বিশেষ দুর্বলতা ছিল, তাই সে এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কাবার অনুরূপ 'আল-কালিস' নামের একটি চমৎকার গির্জা নির্মাণ করে। কাবার সাথে প্রতিযোগিতা করার উদ্দেশ্যে এই গির্জা বানানো হয়েছিল। কিন্তু এই কাজটি আরব গোত্রগুলোর পছন্দ হয়নি। একদিন রাতের অন্ধকারে একজন গির্জায় গিয়ে মলত্যাগ করে এবং গির্জার দেওয়ালে মল ছুঁড়ে নোংরা করে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় আবরাহা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়। সে কাবা আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। আবরাহা তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অভিযান শুরু করে। কিন্তু পথিমধ্যে তাকে কিছু বাধার সম্মুখীন হতে হয়। নুফাইল নামের একজন গোত্রনেতা তার বিরোধিতা করে তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সে আবরাহার কাছে হেরে যায় এবং যুদ্ধবন্দী হয়।
আবরাহা আত-তাইফে পৌঁছানোর পর সেখানকার লোকেরা তাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে, কেননা কুরাইশদের সাথে তাইফবাসীর শত্রুতা ছিল। তাইফের এক লোক আবরাহার বাহিনীকে পথ দেখানোর জন্য রাজি হয়, কিন্তু তাইফ থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে সে মারা যায়।
আবরাহা আরবের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছাল। সেখানে একটি চারণভূমিতে কিছু মেষ এবং উট চড়ছিল। আবরাহা সেগুলো দখল করে নেয়। এই মেষ এবং উটগুলো ছিল রাসূলুল্লাহর দাদা আবদুল মুত্তালিবের।
আবদুল মুত্তালিব আবরাহার সাথে দেখা করতে গেলেন। অন্যদিকে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন নুফাইলের বন্ধু। নুফাইল আবরাহার কাছে বন্দী ছিলেন। বন্দী অবস্থাতেই নুফাইলের সাথে উনাইস নামের এক ব্যক্তির বন্ধুত্ব হয়। উনাইস ছিল আবরাহার বাহিনীর হস্তীচালক। আবদুল মুত্তালিব নুফাইলের সাথে দেখা করে তাকে বলেন যে, তিনি আবরাহার সাথে দেখা করতে এসেছেন। নুফাইল উনাইসের সাথে কথা বলে আবরাহার সাথে আবদুল মুত্তালিবের দেখা করার বন্দোবস্ত করে দেন। উনাইস আবরাহার সাথে আবদুল মুত্তালিবের সাক্ষাৎ করিয়ে দেয়। আবরাহা তাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানায়।
বর্ণনানুসারে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন সুপুরুষ এবং ব্যক্তিত্বের অধিকারী, তাকে দেখে যেকোনো মানুষের মনে শ্রদ্ধার উদ্রেক ঘটবে। আবদুল মুত্তালিবকে দেখার সাথে সাথেই আবরাহা খুব সম্মানের সাথে তাকে স্বাগত জানায়, যদিও তখনও আবদুল মুত্তালিবের সাথে আবরাহার কথা হয়নি। আবরাহা ছিল রাজা, তার সাথে কেউ দেখা করতে আসলে সে অনেক উঁচু একটি সিংহাসনে বসতো এবং বাকিরা নিচে, তার পায়ের কাছে বসতো। কিন্তু সে আবদুল মুত্তালিবকে দেখার পর তাকে পায়ের কাছে বসানো পছন্দ করলো না। সে চাইলে আবদুল মুত্তালিবকে তার সিংহাসনে বসার জন্য বলতে পারতো, কিন্তু তা না করে আবরাহা আবদুল মুত্তালিবের সাথে মেঝেতে বসলো এবং তার দোভাষীর মাধ্যমে জানতে চাইলো যে তিনি কী চান।
কোনো রাখঢাক না রেখে আবদুল মুত্তালিব দোভাষীকে সরাসরি বললেন, 'আবরাহা আমার দু'শ উট লুট করেছে। আমি তা ফেরত নিতে এসেছি।'
- প্রথম দেখায় তোমার প্রতি আমার যে শ্রদ্ধা জাগ্রত হয়েছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে। আমি এসেছি তোমার এবং তোমার পূর্বপুরুষদের লাঞ্ছিত করতে, তোমাদের দেশ ধ্বংস করতে। আমি তোমাদের পূর্বপুরুষদের বানানো আল-কাবা ভেঙে দিতে চাই। আর তুমি কিনা এসেছ আমার কাছে উট চাইতে?
- এই উটের মালিক আমি, তাই আমি আমার উট নিয়ে যেতে এসেছি। কাবা ঘরের মালিক স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। তাই আল্লাহই এর রক্ষণাবেক্ষণ করবেন।
অতঃপর আবরাহা আবদুল মুত্তালিবের উট ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দিল। আবদুল মুত্তালিব মক্কায় ফিরে গেলেন আর তাঁর গোত্রের লোকদের বললেন, 'আবরাহার সাথে যুদ্ধ কোরো না, মক্কা থেকে পালিয়ে যাও।' আবদুল মুত্তালিব পরিষ্কারভাবে সবাইকে পরিস্থিতির কথা জানিয়ে দিলেন। সবাই মক্কা ছেড়ে পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়। আবদুল মুত্তালিব সবার শেষে মক্কা ত্যাগ করেন। যাওয়ার পূর্বে তিনি কাবার চাদর জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর নিকট দুআ করেন যেন আল্লাহ তাআলা তাঁর ঘরকে রক্ষা করেন। তারপর তিনি মক্কা থেকে চলে যান।
আবরাহা তার সৈন্যদলকে কাবার অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার আদেশ দেয় কিন্তু হাতিগুলো কিছুতেই সামনে এগোচ্ছিলো না। হাতি চালকরা তাদের হাতিগুলো অন্য কোনো দিকে চালনা করলে হাতিগুলো সেদিকে দৌড়ে যেতো। কিন্তু তাদেরকে মক্কার দিকে ঠেলা হলে তারা সেখানেই বসে পড়তো। এটা ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে কারামত। বলা হয়ে থাকে উনাইস নামের সেই লোকটি হাতির কানের কাছে গিয়ে বলেছিল, 'এটা আল্লাহর ঘর, একে আক্রমণ কোরো না'-এই বলে সে পালিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক, কোনো না কোনো কারণে হাতিগুলো কাবার দিকে এগুচ্ছিলো না।
তারা হাতিগুলোকে মারতে লাগলো, তাদের বল্লম দিয়ে খোঁচা দিয়ে রক্তাক্ত করে ফেললো কিন্তু তবুও হাতিগুলো কাবার দিকে একচুল পরিমাণ নড়লো না। অবশেষে তারা হাতিগুলোকে পিছনে ফেলে সামনে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। আল্লাহ তাআলা এবার তাঁর সৈন্যবাহিনী পাঠালেন। যেকোনো কিছুই আল্লাহর সৈন্য হতে পারে; পানি, বাতাস, জীব-জন্তু। আল্লাহ তাআলা এবার সৈন্য হিসেবে প্রেরণ করলেন এক দল পাখি। সবগুলো পাখি পায়ে একটি করে পাথরের নুড়ি নিয়ে আবরাহার বাহিনীর দিকে উড়ে গেল এবং পাথর ছুঁড়ে তারা নিমেষেই আবরাহার বাহিনী ধ্বংস করে ফেললো। সূরা আল-ফীলে এই ঘটনা বর্ণিত আছে।
রাসূলুল্লাহর জন্মের বছরে এই ঘটনা ঘটেছিল। তাই তাঁর জন্মের বছরকে 'হাতির বছর' বলা হয়।⁶
টিকাঃ
৬. সীরাত ইবন হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮২। পুরো কাহিনীটি খুব সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে।