📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 কুরাইশ বংশের উৎপত্তি

📄 কুরাইশ বংশের উৎপত্তি


জুরহুম গোত্র দীর্ঘ দিন ধরে মক্কায় ছিল। ধীরে ধীরে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের স্থলে বনু খুযা'আ গোত্রকে পাঠান। বনু খুযাআ জুরহুম গোত্রকে মক্কা থেকে বের করে দেয়। বনু খুযাআ ছিল একটি ইয়েমেনি গোত্র এবং অন্যান্য গোত্রসমূহের মতো এটিও ইয়েমেন ত্যাগ করেছিল। অবশেষে তারা হিজাযে কর্তৃত্ব স্থাপন করে। এদিকে জুরহুম মক্কা ছেড়ে যাওয়ার আগে দুটো কাজ করলো, প্রথমত, তারা যমযম কূপের মুখ বন্ধ করে এর সমস্ত চিহ্ন মুছে দিল। দ্বিতীয়ত, আল-কাবার ভেতরে যে মূল্যবান সম্পদগুলো ছিল সেগুলো তারা সাথে করে নিয়ে গেল।

জুরহুম গোত্র চলে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই মক্কার শাসন ক্ষমতা চলে গেল বনু খুযাআর হাতে। যদিও সে সময় ইসমাঈলের বংশধররা সংখ্যায় অনেকগুণ বেড়ে যায় এবং অনেক গোত্রে বিভক্ত হয়ে সমগ্র আরবে ছড়িয়ে পড়ে। মক্কায় একটিমাত্র শাখা গোত্র রয়ে যায় আর এই শাখা গোত্রটির নাম হলো কুরাইশ। অর্থাৎ ইসমাঈল থেকে উদ্ভূত গোত্রগুলোর একটি হলো কুরাইশ। তবে মক্কার কর্তৃত্ব তখনো কুরাইশদের হাতে নয়, বরং বনু খুযাআর হাতেই ছিল।

বনু খুযাআর অন্যতম নেতা ছিল আমর ইবন লুহাই আল খুযাই। আরবের ধর্মীয় পটভূমির আলোচনায় তাকে নিয়ে আলোচনা করা হবে। অন্যদিকে কুরাইশদের নেতা ছিল কুসাই ইবন কালব-সে সকল কুরাইশকে ঐক্যবদ্ধ করে বনু খুযাআর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং তাদেরকে পরাজিত করে মক্কা থেকে বের করে দেয়। প্রথমবারের মতো মক্কার রাজনৈতিক ও ধর্মীয়-উভয় নেতৃত্ব কুসাই তথা কুরাইশদের হস্তগত হয়। কুসাইর হাতে তখন কাবা ঘরের অভিভাবকত্ব চলে আসে। সে একই সাথে কাবা ঘরের সিকায়াহ ও নিফাদা এর ব্যাপারে কর্তৃত্বশীল হয়। সিকায়াহ ও নিফাদা হলো কাবায় আগত হাজীদের খাবার ও পানি পান করানোর দায়িত্ব।

এই কাজগুলো সাধারণভাবে খুব আহামরি মনে না হলেও আরবে আল্লাহ তাআলার অতিথিদেরকে আপ্যায়ন করতে পারাটা অত্যন্ত সম্মানজনক একটি ব্যাপার ছিল। এই দায়িত্ব লাভের মাধ্যমে হাজ্জ করতে আগত হাজীদের মেহমানদারির দায়িত্ব বর্তায় কুরাইশদের উপর। তৎকালীন কুরাইশদের রাজনৈতিক পরিষদ আন-নাদওয়ার কর্তৃত্বও কুসাই ইবন কালবের হাতে ছিল। আন-নাদওয়া ছিল অনেকটা বর্তমান যুগের সংসদের মতো। তার হাতে আরও ছিল আল-লিওয়ার নিয়ন্ত্রণ। আল-লিওয়া ছিল যুদ্ধের ব্যানার, অর্থাৎ যুদ্ধ ঘোষণা দেওয়ার সকল ক্ষমতাও ছিল কুসাইয়ের হাতে। এক কথায় বলা যায় যে কুসাই ইবন কালব ছিল তৎকালীন মক্কার একচ্ছত্র অধিপতি।

কুসাই ইবন কালবের মৃত্যুর পর এসব ক্ষমতা তার সন্তানরা নিজেদের মাঝে ভাগ করে নেয়। কুসাইয়ের নাতি আমর পৈত্রিক সূত্রে হাজীদের খাবার ও পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করার দায়িত্ব লাভ করেন। সচরাচর শুধুমাত্র স্যুপ দিয়ে হাজীদের আপ্যায়ন করা হতো। কিন্তু আমর এ খাবারে কিছুটা নতুনত্ব আনেন। তিনি রুটি ছিঁড়ে স্যুপের মধ্যে ভেজানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে খাবারটির স্বাদ আরও বেড়ে গিয়েছিল। কোনো কিছু ভেঙ্গে গুঁড়ো করার পদ্ধতিকে আরবিতে 'হাশম' বলা হয়। এই হাশম থেকেই তখন আমরকে হাশিম নামে ডাকা হতো। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর প্রপিতামহ। হাশিম বিয়ে করেছিলেন মদীনার এক মহিলাকে। এরপর তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনে যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। গাযাতে তাকে দাফন করা হয়। এর মধ্যে তার স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে তিনি এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। পুত্রের নাম রাখা হয়েছিল 'শায়বা'। শায়বা মানে হলো বৃদ্ধ লোক। ছোটো শিশুর এরূপ অদ্ভুত নামকরণের কারণ হলো জন্ম থেকেই তার মাথার কিছু চুল ধূসর ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর শায়বার মা ইয়াসরিবে পিতামাতার কাছেই থেকে গিয়েছিলেন। তাই শায়বার ছোটবেলা কেটেছিল ইয়াসরিবে তার নানাবাড়িতে। আর এই ইয়াসরিবে যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ হিজরত করলেন তখন সেই ইয়াসিরবের নাম বদলে হয়ে গেলো মদীনা।

জুরহুম গোত্র দীর্ঘ দিন ধরে মক্কায় ছিল। ধীরে ধীরে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের স্থলে বনু খুযা'আ গোত্রকে পাঠান। বনু খুযাআ জুরহুম গোত্রকে মক্কা থেকে বের করে দেয়। বনু খুযাআ ছিল একটি ইয়েমেনি গোত্র এবং অন্যান্য গোত্রসমূহের মতো এটিও ইয়েমেন ত্যাগ করেছিল। অবশেষে তারা হিজাযে কর্তৃত্ব স্থাপন করে। এদিকে জুরহুম মক্কা ছেড়ে যাওয়ার আগে দুটো কাজ করলো, প্রথমত, তারা যমযম কূপের মুখ বন্ধ করে এর সমস্ত চিহ্ন মুছে দিল। দ্বিতীয়ত, আল-কাবার ভেতরে যে মূল্যবান সম্পদগুলো ছিল সেগুলো তারা সাথে করে নিয়ে গেল।

জুরহুম গোত্র চলে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই মক্কার শাসন ক্ষমতা চলে গেল বনু খুযাআর হাতে। যদিও সে সময় ইসমাঈলের বংশধররা সংখ্যায় অনেকগুণ বেড়ে যায় এবং অনেক গোত্রে বিভক্ত হয়ে সমগ্র আরবে ছড়িয়ে পড়ে। মক্কায় একটিমাত্র শাখা গোত্র রয়ে যায় আর এই শাখা গোত্রটির নাম হলো কুরাইশ। অর্থাৎ ইসমাঈল থেকে উদ্ভূত গোত্রগুলোর একটি হলো কুরাইশ। তবে মক্কার কর্তৃত্ব তখনো কুরাইশদের হাতে নয়, বরং বনু খুযাআর হাতেই ছিল।

বনু খুযাআর অন্যতম নেতা ছিল আমর ইবন লুহাই আল খুযাই। আরবের ধর্মীয় পটভূমির আলোচনায় তাকে নিয়ে আলোচনা করা হবে। অন্যদিকে কুরাইশদের নেতা ছিল কুসাই ইবন কালব-সে সকল কুরাইশকে ঐক্যবদ্ধ করে বনু খুযাআর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং তাদেরকে পরাজিত করে মক্কা থেকে বের করে দেয়। প্রথমবারের মতো মক্কার রাজনৈতিক ও ধর্মীয়-উভয় নেতৃত্ব কুসাই তথা কুরাইশদের হস্তগত হয়। কুসাইর হাতে তখন কাবা ঘরের অভিভাবকত্ব চলে আসে। সে একই সাথে কাবা ঘরের সিকায়াহ ও নিফাদা এর ব্যাপারে কর্তৃত্বশীল হয়। সিকায়াহ ও নিফাদা হলো কাবায় আগত হাজীদের খাবার ও পানি পান করানোর দায়িত্ব।

এই কাজগুলো সাধারণভাবে খুব আহামরি মনে না হলেও আরবে আল্লাহ তাআলার অতিথিদেরকে আপ্যায়ন করতে পারাটা অত্যন্ত সম্মানজনক একটি ব্যাপার ছিল। এই দায়িত্ব লাভের মাধ্যমে হাজ্জ করতে আগত হাজীদের মেহমানদারির দায়িত্ব বর্তায় কুরাইশদের উপর। তৎকালীন কুরাইশদের রাজনৈতিক পরিষদ আন-নাদওয়ার কর্তৃত্বও কুসাই ইবন কালবের হাতে ছিল। আন-নাদওয়া ছিল অনেকটা বর্তমান যুগের সংসদের মতো। তার হাতে আরও ছিল আল-লিওয়ার নিয়ন্ত্রণ। আল-লিওয়া ছিল যুদ্ধের ব্যানার, অর্থাৎ যুদ্ধ ঘোষণা দেওয়ার সকল ক্ষমতাও ছিল কুসাইয়ের হাতে। এক কথায় বলা যায় যে কুসাই ইবন কালব ছিল তৎকালীন মক্কার একচ্ছত্র অধিপতি।

কুসাই ইবন কালবের মৃত্যুর পর এসব ক্ষমতা তার সন্তানরা নিজেদের মাঝে ভাগ করে নেয়। কুসাইয়ের নাতি আমর পৈত্রিক সূত্রে হাজীদের খাবার ও পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করার দায়িত্ব লাভ করেন। সচরাচর শুধুমাত্র স্যুপ দিয়ে হাজীদের আপ্যায়ন করা হতো। কিন্তু আমর এ খাবারে কিছুটা নতুনত্ব আনেন। তিনি রুটি ছিঁড়ে স্যুপের মধ্যে ভেজানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে খাবারটির স্বাদ আরও বেড়ে গিয়েছিল। কোনো কিছু ভেঙ্গে গুঁড়ো করার পদ্ধতিকে আরবিতে 'হাশম' বলা হয়। এই হাশম থেকেই তখন আমরকে হাশিম নামে ডাকা হতো। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর প্রপিতামহ। হাশিম বিয়ে করেছিলেন মদীনার এক মহিলাকে। এরপর তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনে যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। গাযাতে তাকে দাফন করা হয়। এর মধ্যে তার স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে তিনি এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। পুত্রের নাম রাখা হয়েছিল 'শায়বা'। শায়বা মানে হলো বৃদ্ধ লোক। ছোটো শিশুর এরূপ অদ্ভুত নামকরণের কারণ হলো জন্ম থেকেই তার মাথার কিছু চুল ধূসর ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর শায়বার মা ইয়াসরিবে পিতামাতার কাছেই থেকে গিয়েছিলেন। তাই শায়বার ছোটবেলা কেটেছিল ইয়াসরিবে তার নানাবাড়িতে। আর এই ইয়াসরিবে যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ হিজরত করলেন তখন সেই ইয়াসিরবের নাম বদলে হয়ে গেলো মদীনা।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 আবদুল মুত্তালিবের নেতৃত্ব লাভ

📄 আবদুল মুত্তালিবের নেতৃত্ব লাভ


একদিন আল-মুত্তালিব নামক এক ব্যক্তি মদীনায় আসলেন। তিনি ছিলেন হাশিমের ভাই। ভাতিজা শায়বাকে মক্কায় নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি মদীনায় এসেছিলেন। তখন শায়বার বয়স ছিল প্রায় আট বছর। প্রথমে তার মা ছেলেকে ছাড়তে চাচ্ছিলেন না, কিন্তু আল-মুত্তালিব তাকে বোঝালেন যে, সে কুরাইশের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের অন্যতম উত্তরাধিকারী এবং তার উচিত তার নিজ বংশ ও পরিবারের নিকটে ফিরে যাওয়া এবং সেখানে দায়িত্বসমূহ বুঝে নেওয়া-একথা শুনে শায়বার মা রাজি হন।

এরপর আল-মুত্তালিব শায়বাকে নিয়ে মক্কায় ফিরে যান। শায়বাকে এর আগে মক্কার কেউ দেখেনি। তখনকার দিনে দাস কেনাবেচা খুব সাধারণ একটি ব্যাপার ছিল। তাই লোকজন আল-মুত্তালিবের সাথে এই অচেনা ছোট ছেলেটিকে দেখে ভেবেছিল যে সে বোধহয় আল-মুত্তালিবের দাস। তাই তারা শায়বাকে আবদুল মুত্তালিব বলে ডাকতে থাকে আর এই আবদুল মুত্তালিবই হলেন রাসূলুল্লাহর দাদা। তার আসল নাম ছিল শায়বা, কিন্তু লোকেরা মুত্তালিবের দাস ভেবে তাকে আবদুল মুত্তালিব নামে ডাকতে শুরু করেছিল।

আবদুল মুত্তালিবের বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা আছে। বনু জুরহুম গোত্র মক্কা ছেড়ে যাওয়ার সময় যমযম কূপের মুখ বন্ধ করে এর সব চিহ্ন মুছে দিয়েছিল, এ ঘটনার পর প্রায় তিনশ বছর পর্যন্ত যমযম কূপের অবস্থান মক্কাবাসীদের কাছে অজানা ছিল। একদিন আবদুল মুত্তালিব একটি স্বপ্ন দেখলেন, স্বপ্নে কেউ তাঁর কাছে এসে বলতে লাগল, 'খোঁড়। তায়্যিবা', তায়্যিবা মানে হলো পবিত্র। আবদুল মুত্তালিব স্বপ্নের মধ্যেই সাড়া দিলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, 'তায়্যিবা কী?' কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। সেদিনের মতো স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। পরের দিন রাতেও তিনি একই রকম স্বপ্ন দেখেন, সেই একই আওয়াজ তাকে বলতে থাকে, 'গর্ত করো, সেই মহার্ঘ।' আবদুল মুত্তালিব বললেন, 'কী সেই মহার্ঘ?' সে রাতেও তিনি কোনো উত্তর পেলেন না। তৃতীয় রাতে সেই একই আওয়াজ তাকে বলল, 'যমযম খনন করো।' আবদুল মুত্তালিব জিজ্ঞাসা করলেন, 'যমযম কী?' এবার তিনি উত্তর পেলেন। সেই কণ্ঠস্বরটি এবার বলল, 'যমযম একটি কূপ যা কখনো বন্ধ হবে না বা শুকিয়ে যাবে না। এখান থেকে হাজীরা পানি পান করবে। এই কূপ রয়েছে গোবর আর রক্তের মাঝে, এর কাছেই রয়েছে সাদা পা-বিশিষ্ট কাক এবং পিঁপড়ার আবাস।'

এই দুর্বোধ্য সাংকেতিক কথাবার্তার কিছুই আবদুল মুত্তালিব বুঝতে পারলেন না। পরের দিন সকালে তিনি যখন কাবাঘর তাওয়াফ করছিলেন তখন কাছেই সেখানে তিনি গোবর ও রক্ত দেখতে পান। সেগুলো ছিল একটি জবাইকৃত উটের রক্ত আর গোবর। এরপর তিনি সেই একই জায়গায় সাদা পা-বিশিষ্ট একটি কাক এবং একটি পিঁপড়ার বাসা দেখতে পেলেন। অবশেষে তিনি বুঝতে পারলেন যে এই স্থানের কথাই তাকে স্বপ্নে জানানো হয়েছে, এখানেই তাঁর পূর্বপুরুষের যমযম কূপ রয়েছে। এরপর তিনি পুত্র হারিসকে সঙ্গে নিয়ে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু করে দিলেন।

যমযম কূপ আল-কাবা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। পিতাপুত্রের এই খোঁড়াখুঁড়ি দেখে লোকজন জড়ো হয়ে যায় এবং তারা জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কী করছ? আল-কাবার পাশে এভাবে খোঁড়াখুঁড়ি করছ কেন?' তারা তাদেরকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর পুত্র হারিস খনন কাজ বন্ধ না করে চালিয়ে যেতে লাগলেন। একদিকে পিতা-পুত্র খনন কাজ চালিয়ে যেতে লাগল, আরেকদিকে লোকজনও তাদেরকে বাধা দিতে লাগল। আবদুল মুত্তালিবের এরকম করার কারণ তারা কোনোভাবেই বুঝতে পারছিল না। এক পর্যায়ে তারা তাকে ছেড়ে দিল। তারা ফিরে যাওয়ার সময় আবদুল মুত্তালিবের চিৎকার শুনতে পেল। লোকেরা দৌড়ে এসে দেখতে পেল যে আবদুল মুত্তালিব যমযম কূপের ঢাকনা উন্মোচন করেছেন।

এরপর উপস্থিত কুরাইশের নেতারা এসে বলল যে, 'হ্যাঁ হ্যাঁ, এটাই হলো আমাদের পূর্বপুরুষ ইসমা'ঈলের কূপ', এ কথার মাধ্যমে তারা ইঙ্গিত দিতে চাইল যে এই কূপের উপর তাদের সবার অধিকার আছে, তাই এই কূপের অংশীদার তারা সবাই। কিন্তু আবদুল মুত্তালিব বললেন, 'আমিই স্বপ্নে এই কূপের খোঁজ পেয়েছি। আমিই এটাকে আবার উন্মোচন করেছি। তাই এই কূপের মালিক আমি।' কিন্তু তারা এটা মানতে চাইল না। তারা বলতে লাগল যে তারা সবাই ইসমা'ঈলের উত্তরসূরি, তাই তারা সবাই এই কূপের মালিক। এদিকে আবদুল মুত্তালিব এই কূপের মালিকানা অন্য কারও হাতে দেবেন না বলে মনস্থির করেছেন। দুই পক্ষই তর্কাতর্কি চালিয়ে যাচ্ছিল। তাদের মাঝে যখন এই কূপ নিয়ে প্রায় যুদ্ধ বেঁধে যাচ্ছিল তখন কেউ একজন প্রস্তাব দিল যে, 'নিজেদের মাঝে এরকম মারামারি না করে আমরা বরং বনু সাদের মহিলা জাদুকরের কাছে যাই। সে হয়তোবা আমাদের একটা সমাধান দিতে পারবে।'

বনু সাদের এই মহিলা জাদুকর দাবি করত যে তার সাথে আত্মার যোগাযোগ আছে। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ যমযম কূপ নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান পাওয়ার আশায় এই মহিলার কাছে গেল। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারল যে সেই মহিলা সিরিয়া চলে গিয়েছে। তখন তারা আবার আশ-শামের দিকে যাত্রা শুরু করল। যাত্রাপথে তাদের পানি শেষ হয়ে গেল। তখন তারা ছিল মরুভূমির মাঝে। সেখানে পানির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এ অবস্থায় আবদুল মুত্তালিব বাকি সবাইকে বললেন, 'আমাদের মৃত্যু যদি এই নির্জন মরুভূমিতেই ঠিক করা থাকে তাহলে সবার উচিত যার যার কবর খুঁড়ে ফেলা যাতে কেউ একজন মারা গেলে বাকিরা তাকে কবর দিতে পারে। তাহলে অন্তত একজন ছাড়া বাকিদের কবর হবে।' তাঁর কথামতো সবাই যার যার কবর খুঁড়ে ফেলল এবং সেই কবরে শুয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে আবদুল মুত্তালিবই আবার বলে উঠলেন, 'নাহ, আমাদের মতো পুরুষদের এভাবে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা মানায় না। তার চেয়ে বরং আমরা সবাই পানির খোঁজে বের হই।' তাঁর সাথে সবাই একমত হলো এবং একেকজন পানির খোঁজে একেকদিকে বেরিয়ে পড়ল।

কিছুক্ষণ পরে আবদুল মুত্তালিব পানির খোঁজ পেলেন। পানি নিয়ে সঙ্গীদের কাছে ফিরে এলে তারা বলল, 'আল্লাহ তাআলা তোমাকে এই মরুভূমিতে পানির সন্ধান দিয়ে রক্ষা করেছেন এবং তিনিই তোমাকে যমযম কূপ উন্মোচনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এসব কিছুই একটি জিনিস নির্দেশ করে; এই কূপ তোমার জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে একটি অনুগ্রহ আর এই কূপের মালিকানা তোমারই। আমরা আমাদের দাবি ছেড়ে দিলাম। এখন চলো, আমরা মক্কায় ফিরে যাই।'

যখন কুরাইশ নেতারা যমযম কূপের মালিকানার জন্য আবদুল মুত্তালিবকে চাপাচাপি করছিল, তখন আবদুল মুত্তালিবের পাশে একমাত্র পুত্র ছাড়া আর কেউ ছিল না। এ ব্যাপারটি আবদুল মুত্তালিবকে বেশ ভাবিয়ে তোলে, কেননা গোত্রীয় সমাজে কোনো ব্যক্তির শক্তিমত্তা কেমন তা নির্ধারিত হয় তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সংখ্যাধিক্যের উপরে, যেমন যার যত ছেলে, ভাই, চাচা, কিংবা আত্মীয় – সে তত বেশি শক্তিশালী। আবদুল মুত্তালিব তখন আল্লাহ তাআলার কাছে এই বলে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ, আপনি যদি আমাকে দশটি পুত্র সন্তান দেন, তাহলে আমি তাদের মধ্যে থেকে একজনকে আপনার পথে কুরবানি দেব।' এরপর আল্লাহ তাআলার দয়ায় আবদুল মুত্তালিব দশটি পুত্র ও ছয়টি কন্যাসন্তান লাভ করলেন। তখন তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে কৃত ওয়াদা পূরণ করার ব্যবস্থা নিলেন। আবদুল মুত্তালিবসহ কুরাইশের অন্যান্য লোকেরা তাদের সবচেয়ে বড় মূর্তি হুবালের কাছে যায়। এই মূর্তির পাশে কিছু তীর ছিল, তীরগুলোকে তারা খুব পবিত্র বলে বিশ্বাস করত, সেগুলোর সাথে ঐশ্বরিক ব্যাপার জড়িয়ে আছে বলে তারা মনে করতো। ওই তীরগুলোর গায়ে আবদুল মুত্তালিবের সব পুত্রের নাম লেখা হয়েছিল। এরপর লটারি করা হলে প্রথমবার উঠল আবদুল্লাহর নাম, দ্বিতীয়বারেও উঠল আবদুল্লাহর নাম এবং তৃতীয়বারেও আবদুল্লাহর নাম উঠল।

তারপর আবদুল মুত্তালিব আবদুল্লাহকে আল-কাবার পাশে নিয়ে গেলেন। তিনি যখন ছুরি বের করে আবদুল্লাহকে জবাই করতে যাচ্ছিলেন তখন দৌঁড়ে আসলো তারই আরেক পুত্র আবু তালিব। আবু তালিব তাঁর পিতাকে বলল, 'আমরা আপনাকে এ কাজ করতে দিতে পারি না।' এরপর আবদুল্লাহর মাতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়স্বজনরা এসে বলল, 'আমরা আপনাকে আমাদের পুত্রকে জবাই করতে দিতে পারি না।' তখন আবার অন্যান্য লোকেরাও আবদুল মুত্তালিবকে বলতে লাগল, 'আপনি যদি এ কাজটা করেন তাহলে তা আপনার উত্তরসূরিদের জন্য করণীয় বলে গণ্য হবে', কেননা আবদুল মুত্তালিব ছিলেন তাদের নেতা, তিনি কোনো কাজ করলে তা প্রথা হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু আবদুল মুত্তালিব তাদের আপত্তি মানতে চাইলেন না। তিনি বললেন, 'আমি আল্লাহ তাআলার কাছে যে মানত করেছি তা কোনোভাবেই ভঙ্গ করতে পারব না।' এ নিয়ে তাদের মাঝে কথা কাটাকাটি হতে লাগল। শেষ পর্যন্ত তারা যখন কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারল না, তখন তারা আবার সেই মহিলা জাদুকরের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিল।

তারা সেই মহিলার কাছে গেল এবং সবকিছু শুনে সেই মহিলা জাদুকর বলল, 'আচ্ছা তোমরা আজকে যাও, আগামীকাল আবার এসো। আমি এর মাঝে আমার আত্মাগুলোর সাথে এ ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করব।' কুরাইশরা পরদিন তাঁর কাছে উপস্থিত হলো। এর মাঝে মহিলা জাদুকর একটি সমাধান বের করে নিল। মহিলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কোনো ব্যক্তির রক্তপণ কীভাবে আদায় করো?' তারা বলল, 'দশটি উট দিয়ে।' তখন মহিলা বলল, 'ঠিক আছে, তাহলে এক পাশে দশটি উট ও অপর পাশে আবদুল্লাহকে রেখে তীর চালনা করো; তীরটি উটের দিকে নির্দেশ করলে উটগুলোকে জবাই করবে আর আবদুল্লাহর দিকে নির্দেশ করলে পূর্বের উটগুলোর সাথে আরও দশটি উট যোগ করবে।' কুরাইশরা এতে রাজি হলো এবং মক্কায় ফিরে গেল।

মহিলা জাদুকর যা যা করতে বলেছিল কুরাইশরা ঠিক তা-ই করল। তীর যতবার আবদুল্লাহর দিকে নির্দেশ করছিল ততবার তারা উটের সংখ্যা বাড়াতে লাগল। এভাবে উটের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে যখন একশতে পৌঁছল তখন এটি উটের দিকে নির্দেশ করল। কুরাইশের লোকেরা আবদুল মুত্তালিবকে বলল, 'অবশেষে আমরা তোমার ছেলেকে জবাই থেকে বাঁচাতে পারলাম।' কিন্তু আবদুল মুত্তালিব বলল, 'না, এখনো শেষ হয়নি। আমরা আরেকবার লটারি করব।' তারা আরো দুইবার একই কাজ করল এবং প্রতিবারই নিক্ষিপ্ত তীর উট বরাবর ছিল। অবশেষে সেই একশত উট জবাই করা হলো আর আবদুল মুত্তালিবকে এই উটগুলোর পুরো খরচ একা বহন করতে হয়েছিল। তিনি খুবই দয়ালু ছিলেন, নিজের জন্য গোশত না রেখে সমস্ত উটের গোশত মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। লোকজন গোশত খেয়ে আবার সাথে করে নিয়েও যাচ্ছিল কিন্তু তারপরও পশুপাখিদেরকে খাওয়ানোর মতো যথেষ্ট গোশত উদ্বৃত্ত ছিল। এরপর থেকে আরবদের মাঝে এই কথাটি ব্যাপক বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল যে আবদুল মুত্তালিবই হলেন সেই ব্যক্তি যিনি মানুষ ও পশুদেরকে খাইয়েছিলেন, এমনকি আকাশের পাখিদেরকেও খাইয়েছিলেন।

কুরাইশদের কথা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল, তারা বলেছিল আবদুল মুত্তালিব যে কাজ করবে, পরবর্তী আরবদের জন্য তা প্রথা হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। পরবর্তীতে দেখা যায় যে, যে আরবে রক্তপণ হিসেবে ১০টি উট দেওয়া হতো, আবদুল মুত্তালিবের ১০০টি উট জবাই করার পর সেখানে রক্তপণের মূল্য ১০০টি উট নির্ধারিত হয়। ইসলামেও এই নিয়মটি বহাল রাখা হয়েছে। অবশ্য এখন আর উট দিয়ে রক্তপণ আদায় করা হয় না, বরং ১০০ উটের মূল্য মুদ্রার সাপেক্ষে হিসাব করা হয় এবং টাকা দিয়ে তা পরিশোধ করা হয়।

আবদুল্লাহ ও আমিনা হলেন মুহাম্মাদের পিতামাতা। তাকে বলা হতো, 'তুমি হলে দুই যবীহের সন্তান। তারা হলেন ইসমা'ঈল ও আবদুল্লাহ।'

একদিন আল-মুত্তালিব নামক এক ব্যক্তি মদীনায় আসলেন। তিনি ছিলেন হাশিমের ভাই। ভাতিজা শায়বাকে মক্কায় নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি মদীনায় এসেছিলেন। তখন শায়বার বয়স ছিল প্রায় আট বছর। প্রথমে তার মা ছেলেকে ছাড়তে চাচ্ছিলেন না, কিন্তু আল-মুত্তালিব তাকে বোঝালেন যে, সে কুরাইশের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত পরিবারের অন্যতম উত্তরাধিকারী এবং তার উচিত তার নিজ বংশ ও পরিবারের নিকটে ফিরে যাওয়া এবং সেখানে দায়িত্বসমূহ বুঝে নেওয়া-একথা শুনে শায়বার মা রাজি হন।

এরপর আল-মুত্তালিব শায়বাকে নিয়ে মক্কায় ফিরে যান। শায়বাকে এর আগে মক্কার কেউ দেখেনি। তখনকার দিনে দাস কেনাবেচা খুব সাধারণ একটি ব্যাপার ছিল। তাই লোকজন আল-মুত্তালিবের সাথে এই অচেনা ছোট ছেলেটিকে দেখে ভেবেছিল যে সে বোধহয় আল-মুত্তালিবের দাস। তাই তারা শায়বাকে আবদুল মুত্তালিব বলে ডাকতে থাকে আর এই আবদুল মুত্তালিবই হলেন রাসূলুল্লাহর দাদা। তার আসল নাম ছিল শায়বা, কিন্তু লোকেরা মুত্তালিবের দাস ভেবে তাকে আবদুল মুত্তালিব নামে ডাকতে শুরু করেছিল।

আবদুল মুত্তালিবের বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা আছে। বনু জুরহুম গোত্র মক্কা ছেড়ে যাওয়ার সময় যমযম কূপের মুখ বন্ধ করে এর সব চিহ্ন মুছে দিয়েছিল, এ ঘটনার পর প্রায় তিনশ বছর পর্যন্ত যমযম কূপের অবস্থান মক্কাবাসীদের কাছে অজানা ছিল। একদিন আবদুল মুত্তালিব একটি স্বপ্ন দেখলেন, স্বপ্নে কেউ তাঁর কাছে এসে বলতে লাগল, 'খোঁড়। তায়্যিবা', তায়্যিবা মানে হলো পবিত্র। আবদুল মুত্তালিব স্বপ্নের মধ্যেই সাড়া দিলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, 'তায়্যিবা কী?' কিন্তু কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। সেদিনের মতো স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। পরের দিন রাতেও তিনি একই রকম স্বপ্ন দেখেন, সেই একই আওয়াজ তাকে বলতে থাকে, 'গর্ত করো, সেই মহার্ঘ।' আবদুল মুত্তালিব বললেন, 'কী সেই মহার্ঘ?' সে রাতেও তিনি কোনো উত্তর পেলেন না। তৃতীয় রাতে সেই একই আওয়াজ তাকে বলল, 'যমযম খনন করো।' আবদুল মুত্তালিব জিজ্ঞাসা করলেন, 'যমযম কী?' এবার তিনি উত্তর পেলেন। সেই কণ্ঠস্বরটি এবার বলল, 'যমযম একটি কূপ যা কখনো বন্ধ হবে না বা শুকিয়ে যাবে না। এখান থেকে হাজীরা পানি পান করবে। এই কূপ রয়েছে গোবর আর রক্তের মাঝে, এর কাছেই রয়েছে সাদা পা-বিশিষ্ট কাক এবং পিঁপড়ার আবাস।'

এই দুর্বোধ্য সাংকেতিক কথাবার্তার কিছুই আবদুল মুত্তালিব বুঝতে পারলেন না। পরের দিন সকালে তিনি যখন কাবাঘর তাওয়াফ করছিলেন তখন কাছেই সেখানে তিনি গোবর ও রক্ত দেখতে পান। সেগুলো ছিল একটি জবাইকৃত উটের রক্ত আর গোবর। এরপর তিনি সেই একই জায়গায় সাদা পা-বিশিষ্ট একটি কাক এবং একটি পিঁপড়ার বাসা দেখতে পেলেন। অবশেষে তিনি বুঝতে পারলেন যে এই স্থানের কথাই তাকে স্বপ্নে জানানো হয়েছে, এখানেই তাঁর পূর্বপুরুষের যমযম কূপ রয়েছে। এরপর তিনি পুত্র হারিসকে সঙ্গে নিয়ে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু করে দিলেন।

যমযম কূপ আল-কাবা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। পিতাপুত্রের এই খোঁড়াখুঁড়ি দেখে লোকজন জড়ো হয়ে যায় এবং তারা জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কী করছ? আল-কাবার পাশে এভাবে খোঁড়াখুঁড়ি করছ কেন?' তারা তাদেরকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু আবদুল মুত্তালিব ও তাঁর পুত্র হারিস খনন কাজ বন্ধ না করে চালিয়ে যেতে লাগলেন। একদিকে পিতা-পুত্র খনন কাজ চালিয়ে যেতে লাগল, আরেকদিকে লোকজনও তাদেরকে বাধা দিতে লাগল। আবদুল মুত্তালিবের এরকম করার কারণ তারা কোনোভাবেই বুঝতে পারছিল না। এক পর্যায়ে তারা তাকে ছেড়ে দিল। তারা ফিরে যাওয়ার সময় আবদুল মুত্তালিবের চিৎকার শুনতে পেল। লোকেরা দৌড়ে এসে দেখতে পেল যে আবদুল মুত্তালিব যমযম কূপের ঢাকনা উন্মোচন করেছেন।

এরপর উপস্থিত কুরাইশের নেতারা এসে বলল যে, 'হ্যাঁ হ্যাঁ, এটাই হলো আমাদের পূর্বপুরুষ ইসমা'ঈলের কূপ', এ কথার মাধ্যমে তারা ইঙ্গিত দিতে চাইল যে এই কূপের উপর তাদের সবার অধিকার আছে, তাই এই কূপের অংশীদার তারা সবাই। কিন্তু আবদুল মুত্তালিব বললেন, 'আমিই স্বপ্নে এই কূপের খোঁজ পেয়েছি। আমিই এটাকে আবার উন্মোচন করেছি। তাই এই কূপের মালিক আমি।' কিন্তু তারা এটা মানতে চাইল না। তারা বলতে লাগল যে তারা সবাই ইসমা'ঈলের উত্তরসূরি, তাই তারা সবাই এই কূপের মালিক। এদিকে আবদুল মুত্তালিব এই কূপের মালিকানা অন্য কারও হাতে দেবেন না বলে মনস্থির করেছেন। দুই পক্ষই তর্কাতর্কি চালিয়ে যাচ্ছিল। তাদের মাঝে যখন এই কূপ নিয়ে প্রায় যুদ্ধ বেঁধে যাচ্ছিল তখন কেউ একজন প্রস্তাব দিল যে, 'নিজেদের মাঝে এরকম মারামারি না করে আমরা বরং বনু সাদের মহিলা জাদুকরের কাছে যাই। সে হয়তোবা আমাদের একটা সমাধান দিতে পারবে।'

বনু সাদের এই মহিলা জাদুকর দাবি করত যে তার সাথে আত্মার যোগাযোগ আছে। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ যমযম কূপ নিয়ে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান পাওয়ার আশায় এই মহিলার কাছে গেল। কিন্তু সেখানে গিয়ে জানতে পারল যে সেই মহিলা সিরিয়া চলে গিয়েছে। তখন তারা আবার আশ-শামের দিকে যাত্রা শুরু করল। যাত্রাপথে তাদের পানি শেষ হয়ে গেল। তখন তারা ছিল মরুভূমির মাঝে। সেখানে পানির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এ অবস্থায় আবদুল মুত্তালিব বাকি সবাইকে বললেন, 'আমাদের মৃত্যু যদি এই নির্জন মরুভূমিতেই ঠিক করা থাকে তাহলে সবার উচিত যার যার কবর খুঁড়ে ফেলা যাতে কেউ একজন মারা গেলে বাকিরা তাকে কবর দিতে পারে। তাহলে অন্তত একজন ছাড়া বাকিদের কবর হবে।' তাঁর কথামতো সবাই যার যার কবর খুঁড়ে ফেলল এবং সেই কবরে শুয়ে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে আবদুল মুত্তালিবই আবার বলে উঠলেন, 'নাহ, আমাদের মতো পুরুষদের এভাবে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা মানায় না। তার চেয়ে বরং আমরা সবাই পানির খোঁজে বের হই।' তাঁর সাথে সবাই একমত হলো এবং একেকজন পানির খোঁজে একেকদিকে বেরিয়ে পড়ল।

কিছুক্ষণ পরে আবদুল মুত্তালিব পানির খোঁজ পেলেন। পানি নিয়ে সঙ্গীদের কাছে ফিরে এলে তারা বলল, 'আল্লাহ তাআলা তোমাকে এই মরুভূমিতে পানির সন্ধান দিয়ে রক্ষা করেছেন এবং তিনিই তোমাকে যমযম কূপ উন্মোচনের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। এসব কিছুই একটি জিনিস নির্দেশ করে; এই কূপ তোমার জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে একটি অনুগ্রহ আর এই কূপের মালিকানা তোমারই। আমরা আমাদের দাবি ছেড়ে দিলাম। এখন চলো, আমরা মক্কায় ফিরে যাই।'

যখন কুরাইশ নেতারা যমযম কূপের মালিকানার জন্য আবদুল মুত্তালিবকে চাপাচাপি করছিল, তখন আবদুল মুত্তালিবের পাশে একমাত্র পুত্র ছাড়া আর কেউ ছিল না। এ ব্যাপারটি আবদুল মুত্তালিবকে বেশ ভাবিয়ে তোলে, কেননা গোত্রীয় সমাজে কোনো ব্যক্তির শক্তিমত্তা কেমন তা নির্ধারিত হয় তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সংখ্যাধিক্যের উপরে, যেমন যার যত ছেলে, ভাই, চাচা, কিংবা আত্মীয় – সে তত বেশি শক্তিশালী। আবদুল মুত্তালিব তখন আল্লাহ তাআলার কাছে এই বলে দুআ করলেন, 'হে আল্লাহ, আপনি যদি আমাকে দশটি পুত্র সন্তান দেন, তাহলে আমি তাদের মধ্যে থেকে একজনকে আপনার পথে কুরবানি দেব।' এরপর আল্লাহ তাআলার দয়ায় আবদুল মুত্তালিব দশটি পুত্র ও ছয়টি কন্যাসন্তান লাভ করলেন। তখন তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে কৃত ওয়াদা পূরণ করার ব্যবস্থা নিলেন। আবদুল মুত্তালিবসহ কুরাইশের অন্যান্য লোকেরা তাদের সবচেয়ে বড় মূর্তি হুবালের কাছে যায়। এই মূর্তির পাশে কিছু তীর ছিল, তীরগুলোকে তারা খুব পবিত্র বলে বিশ্বাস করত, সেগুলোর সাথে ঐশ্বরিক ব্যাপার জড়িয়ে আছে বলে তারা মনে করতো। ওই তীরগুলোর গায়ে আবদুল মুত্তালিবের সব পুত্রের নাম লেখা হয়েছিল। এরপর লটারি করা হলে প্রথমবার উঠল আবদুল্লাহর নাম, দ্বিতীয়বারেও উঠল আবদুল্লাহর নাম এবং তৃতীয়বারেও আবদুল্লাহর নাম উঠল।

তারপর আবদুল মুত্তালিব আবদুল্লাহকে আল-কাবার পাশে নিয়ে গেলেন। তিনি যখন ছুরি বের করে আবদুল্লাহকে জবাই করতে যাচ্ছিলেন তখন দৌঁড়ে আসলো তারই আরেক পুত্র আবু তালিব। আবু তালিব তাঁর পিতাকে বলল, 'আমরা আপনাকে এ কাজ করতে দিতে পারি না।' এরপর আবদুল্লাহর মাতৃসম্পর্কীয় আত্মীয়স্বজনরা এসে বলল, 'আমরা আপনাকে আমাদের পুত্রকে জবাই করতে দিতে পারি না।' তখন আবার অন্যান্য লোকেরাও আবদুল মুত্তালিবকে বলতে লাগল, 'আপনি যদি এ কাজটা করেন তাহলে তা আপনার উত্তরসূরিদের জন্য করণীয় বলে গণ্য হবে', কেননা আবদুল মুত্তালিব ছিলেন তাদের নেতা, তিনি কোনো কাজ করলে তা প্রথা হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু আবদুল মুত্তালিব তাদের আপত্তি মানতে চাইলেন না। তিনি বললেন, 'আমি আল্লাহ তাআলার কাছে যে মানত করেছি তা কোনোভাবেই ভঙ্গ করতে পারব না।' এ নিয়ে তাদের মাঝে কথা কাটাকাটি হতে লাগল। শেষ পর্যন্ত তারা যখন কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারল না, তখন তারা আবার সেই মহিলা জাদুকরের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিল।

তারা সেই মহিলার কাছে গেল এবং সবকিছু শুনে সেই মহিলা জাদুকর বলল, 'আচ্ছা তোমরা আজকে যাও, আগামীকাল আবার এসো। আমি এর মাঝে আমার আত্মাগুলোর সাথে এ ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করব।' কুরাইশরা পরদিন তাঁর কাছে উপস্থিত হলো। এর মাঝে মহিলা জাদুকর একটি সমাধান বের করে নিল। মহিলা তাদেরকে জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কোনো ব্যক্তির রক্তপণ কীভাবে আদায় করো?' তারা বলল, 'দশটি উট দিয়ে।' তখন মহিলা বলল, 'ঠিক আছে, তাহলে এক পাশে দশটি উট ও অপর পাশে আবদুল্লাহকে রেখে তীর চালনা করো; তীরটি উটের দিকে নির্দেশ করলে উটগুলোকে জবাই করবে আর আবদুল্লাহর দিকে নির্দেশ করলে পূর্বের উটগুলোর সাথে আরও দশটি উট যোগ করবে।' কুরাইশরা এতে রাজি হলো এবং মক্কায় ফিরে গেল।

মহিলা জাদুকর যা যা করতে বলেছিল কুরাইশরা ঠিক তা-ই করল। তীর যতবার আবদুল্লাহর দিকে নির্দেশ করছিল ততবার তারা উটের সংখ্যা বাড়াতে লাগল। এভাবে উটের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে যখন একশতে পৌঁছল তখন এটি উটের দিকে নির্দেশ করল। কুরাইশের লোকেরা আবদুল মুত্তালিবকে বলল, 'অবশেষে আমরা তোমার ছেলেকে জবাই থেকে বাঁচাতে পারলাম।' কিন্তু আবদুল মুত্তালিব বলল, 'না, এখনো শেষ হয়নি। আমরা আরেকবার লটারি করব।' তারা আরো দুইবার একই কাজ করল এবং প্রতিবারই নিক্ষিপ্ত তীর উট বরাবর ছিল। অবশেষে সেই একশত উট জবাই করা হলো আর আবদুল মুত্তালিবকে এই উটগুলোর পুরো খরচ একা বহন করতে হয়েছিল। তিনি খুবই দয়ালু ছিলেন, নিজের জন্য গোশত না রেখে সমস্ত উটের গোশত মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। লোকজন গোশত খেয়ে আবার সাথে করে নিয়েও যাচ্ছিল কিন্তু তারপরও পশুপাখিদেরকে খাওয়ানোর মতো যথেষ্ট গোশত উদ্বৃত্ত ছিল। এরপর থেকে আরবদের মাঝে এই কথাটি ব্যাপক বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল যে আবদুল মুত্তালিবই হলেন সেই ব্যক্তি যিনি মানুষ ও পশুদেরকে খাইয়েছিলেন, এমনকি আকাশের পাখিদেরকেও খাইয়েছিলেন।

কুরাইশদের কথা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল, তারা বলেছিল আবদুল মুত্তালিব যে কাজ করবে, পরবর্তী আরবদের জন্য তা প্রথা হয়ে দাঁড়িয়ে যাবে। পরবর্তীতে দেখা যায় যে, যে আরবে রক্তপণ হিসেবে ১০টি উট দেওয়া হতো, আবদুল মুত্তালিবের ১০০টি উট জবাই করার পর সেখানে রক্তপণের মূল্য ১০০টি উট নির্ধারিত হয়। ইসলামেও এই নিয়মটি বহাল রাখা হয়েছে। অবশ্য এখন আর উট দিয়ে রক্তপণ আদায় করা হয় না, বরং ১০০ উটের মূল্য মুদ্রার সাপেক্ষে হিসাব করা হয় এবং টাকা দিয়ে তা পরিশোধ করা হয়।

আবদুল্লাহ ও আমিনা হলেন মুহাম্মাদের পিতামাতা। তাকে বলা হতো, 'তুমি হলে দুই যবীহের সন্তান। তারা হলেন ইসমা'ঈল ও আবদুল্লাহ।'

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 আরবের তৎকালীন ধর্মীয় পটভূমি

📄 আরবের তৎকালীন ধর্মীয় পটভূমি


ইসমা'ঈল ছিলেন আরবের নবী, আর ইসমা'ঈলের দাওয়াহ ছিল তাওহীদের দাওয়াহ, তাই আরবরা প্রথমত মুসলিমই ছিল, কিন্তু কালের পরিক্রমায় তারা একটা সময়ে এসে মুশরিক হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহর আমলে আরবে মূলত তিনটি ধর্মের প্রচলন ছিল, পৌত্তলিকতা, ইহুদি ও খ্রিস্টধর্ম।

ইসমা'ঈল ছিলেন আরবের নবী, আর ইসমা'ঈলের দাওয়াহ ছিল তাওহীদের দাওয়াহ, তাই আরবরা প্রথমত মুসলিমই ছিল, কিন্তু কালের পরিক্রমায় তারা একটা সময়ে এসে মুশরিক হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহর আমলে আরবে মূলত তিনটি ধর্মের প্রচলন ছিল, পৌত্তলিকতা, ইহুদি ও খ্রিস্টধর্ম।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 আরবে শিরকের উদ্ভব

📄 আরবে শিরকের উদ্ভব


আমর ইবন লুহাই আল খুযাই ছিল খুযাআ গোত্রের নেতা। সে ছিল বেশ উদারমনা, ক্ষমতাবান এক ব্যক্তি। তাকে তার গোত্রের লোকেরা অনেক সম্মান করত। তারা তাকে এতটাই সম্মান করত যে তার কথাকে আইন হিসেবে মেনে নিত। একবার আমর আশ-শামে (বর্তমান সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, লেবানন এবং জর্ডান) ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভ্রমণে যায়। সেখানে সে কিছু মূর্তি দেখে। স্থানীয় লোকদেরকে এগুলোর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তারা তাকে বলে, 'মূর্তিগুলো আমাদের এবং আল্লাহর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী। আমাদের একেক রকম সমস্যার জন্য আমরা এক এক মূর্তির কাছে সাহায্য চাই। তারা আমাদের হয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে।' মূর্তিপূজার এই প্রথা আমর ইবন লুহাই আল খুযাইকে অভিভূত করে। তার মনে হলো যে, এই মুহূর্তে আরবদের জন্য এমন কিছুই চাই! আরবদের এমন কাউকে দরকার যা তাদের হয়ে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবে।

আমর ইবন লুহাই আল খুযাই আশ-শামের লোকদের কাছে একটা মূর্তি চাইলো যেন সে মূর্তিটি তার গোত্রের লোকদের কাছে নিয়ে যেতে পারে। তারা তাকে হুবাল নামের এক বিশাল মূর্তি দিল। সে হুবালের মূর্তি নিয়ে মক্কায় ফেরত গেল। হারামে গিয়ে আল-কাবার ঠিক পাশে একে স্থাপন করল। তার গোত্রের লোকদেরকে বলল যে মূর্তিটি তাদের হয়ে আল্লাহর সাথে মধ্যস্থতা করবে। মক্কা ছিল আরবের কেন্দ্রবিন্দু, ধর্মীয় ব্যবস্থাপনার মধ্যস্থল। আর এ কারণে মক্কার চারপাশে এই বিদআতটি যেন দাবানলের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ল। মানুষের মাঝে এই ভ্রান্ত প্রথাটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আরেকটি কারণ ছিল ব্যক্তি হিসেবে সমাজে আমর ইবন লুহাই আল খুযাইয়ের গ্রহণযোগ্যতা, তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করতে চাওয়ার প্রবণতা। সে তার গোত্রের অন্যতম সম্মানিত ব্যক্তি ছিল। তাই সবাই তাকে অনুসরণ করতে চাইত। মূর্তি বানানো এবং তা বিভিন্ন গোত্রের কাছে বিক্রি করা মক্কার একটি ব্যবসায় রূপ নিল। বিভিন্ন গোত্র মক্কায় আসত এবং মানুষ তাদের পছন্দের মূর্তি কিনে চলে যেতো। তারা বহনযোগ্য মূর্তি বানানো শুরু করল যাতে মূর্তিগুলো নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করা যায়।

মূর্তিপূজার বিষয়ে উমারের একটি ঘটনা আছে, একদিন উমারকে দেখা গেল একবার হাসছেন আবার কাঁদছেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে কেন তিনি এমন করছেন। তিনি বললেন, 'আমি জাহেলি যুগের একটি দিনের কথা ভেবে হাসছি। সে দিন আমি ভ্রমণে বের হয়েছিলাম। হঠাৎ আমার মূর্তিপূজা করার শখ জাগল। কিন্তু আমার মনে পড়ল যে আমি আমার মূর্তিটি ফেলে এসেছি। তাই আমি উপাসনার অন্য একটি উপায় বের করার চেষ্টা করলাম। তখন আমার সাথে ছিল কিছু খেজুর। আমি সেই খেজুরগুলো দিয়ে একটি মূর্তি বানালাম এবং সেই মূর্তির পূজা করলাম। সেই রাতে আমার অনেক খিদে পায়। তখন আমি খেজুরের তৈরি মূর্তিটি খেয়ে ফেলি।' উমার পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে করছিলেন এবং অনুধাবন করছিলেন যে মূর্তি পূজারিরা কত বোকা! এভাবেই ইসলাম মানুষকে বদলে ফেলে। এটাই ইসলামের কারামত। ইসলাম মানুষকে তুচ্ছ অবস্থান থেকে অনেক উঁচু স্থানে উন্নীত করে। উমার ইবন খাত্তাবের ব্যাপারে আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ তাঁর বইয়ে একটি প্রশ্ন তুলেছেন,

'ইসলাম ছাড়া উমার ইবন খাত্তাব কী হতে পারতেন?' এর উত্তরে তিনি ব্যাখ্যা করেন, 'তিনি তাঁর গোত্রের প্রধান হতে পারতেন, অথবা তিনি কুরাইশ গোত্রের একজন প্রসিদ্ধ নেতা হতে পারতেন অথবা সর্বোচ্চ তিনি কুরাইশ বংশের নেতা হতেন। তবে তিনি যদি কম বয়সে মারা যেতেন সেটাই হতো তাঁর জন্য প্রত্যাশিত ও স্বাভাবিক ঘটনা। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিলেন, এই বদঅভ্যাসের জন্য তিনি হয়তো অল্প বয়সে অপরিচিত অবস্থায় মারা যেতে পারতেন। কিন্তু ইসলাম তাঁকে ও তাঁর অবস্থানকে বদলে দিয়েছে। ইসলাম গ্রহণের কারণে তিনি শুধু সমগ্র আরবের নেতা হননি বরং তিনি পুরো পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশের নেতা হয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে তিনি ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তি।'

মক্কায় মূর্তিপূজা সাধারণ একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন উদ্দেশ্যের জন্য বিভিন্ন মূর্তি পাওয়া যেত। আল-কাবা এইসব মূর্তি দ্বারা অপবিত্র হয়ে যায়। তখন কাবা শরীফে ৩৬০টি মূর্তি ছিল। চারদিকে শির্কের ছড়াছড়ি। একটি আমদানি করা মূর্তি থেকে শির্ক সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ল। দিনে দিনে এটি একটি ব্যবসায় রূপ নেয়। এভাবেই ইসমাঈলের আনীত দ্বীনের বিকৃতি ঘটে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'আমি জাহান্নামে আমর ইবন লুহাই আল খুযাইকে নাড়িভুঁড়ি ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে চলতে দেখেছি।'³ কারণ সে-ই আরবে সর্বপ্রথম মূর্তিপূজার প্রচলন করেছিল।

টিকাঃ
৩. সহীহ বুখারি, অধ্যায় মানাকিব, হাদীস ৩১।

আমর ইবন লুহাই আল খুযাই ছিল খুযাআ গোত্রের নেতা। সে ছিল বেশ উদারমনা, ক্ষমতাবান এক ব্যক্তি। তাকে তার গোত্রের লোকেরা অনেক সম্মান করত। তারা তাকে এতটাই সম্মান করত যে তার কথাকে আইন হিসেবে মেনে নিত। একবার আমর আশ-শামে (বর্তমান সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, লেবানন এবং জর্ডান) ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভ্রমণে যায়। সেখানে সে কিছু মূর্তি দেখে। স্থানীয় লোকদেরকে এগুলোর ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তারা তাকে বলে, 'মূর্তিগুলো আমাদের এবং আল্লাহর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী। আমাদের একেক রকম সমস্যার জন্য আমরা এক এক মূর্তির কাছে সাহায্য চাই। তারা আমাদের হয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে।' মূর্তিপূজার এই প্রথা আমর ইবন লুহাই আল খুযাইকে অভিভূত করে। তার মনে হলো যে, এই মুহূর্তে আরবদের জন্য এমন কিছুই চাই! আরবদের এমন কাউকে দরকার যা তাদের হয়ে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবে।

আমর ইবন লুহাই আল খুযাই আশ-শামের লোকদের কাছে একটা মূর্তি চাইলো যেন সে মূর্তিটি তার গোত্রের লোকদের কাছে নিয়ে যেতে পারে। তারা তাকে হুবাল নামের এক বিশাল মূর্তি দিল। সে হুবালের মূর্তি নিয়ে মক্কায় ফেরত গেল। হারামে গিয়ে আল-কাবার ঠিক পাশে একে স্থাপন করল। তার গোত্রের লোকদেরকে বলল যে মূর্তিটি তাদের হয়ে আল্লাহর সাথে মধ্যস্থতা করবে। মক্কা ছিল আরবের কেন্দ্রবিন্দু, ধর্মীয় ব্যবস্থাপনার মধ্যস্থল। আর এ কারণে মক্কার চারপাশে এই বিদআতটি যেন দাবানলের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ল। মানুষের মাঝে এই ভ্রান্ত প্রথাটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আরেকটি কারণ ছিল ব্যক্তি হিসেবে সমাজে আমর ইবন লুহাই আল খুযাইয়ের গ্রহণযোগ্যতা, তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করতে চাওয়ার প্রবণতা। সে তার গোত্রের অন্যতম সম্মানিত ব্যক্তি ছিল। তাই সবাই তাকে অনুসরণ করতে চাইত। মূর্তি বানানো এবং তা বিভিন্ন গোত্রের কাছে বিক্রি করা মক্কার একটি ব্যবসায় রূপ নিল। বিভিন্ন গোত্র মক্কায় আসত এবং মানুষ তাদের পছন্দের মূর্তি কিনে চলে যেতো। তারা বহনযোগ্য মূর্তি বানানো শুরু করল যাতে মূর্তিগুলো নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করা যায়।

মূর্তিপূজার বিষয়ে উমারের একটি ঘটনা আছে, একদিন উমারকে দেখা গেল একবার হাসছেন আবার কাঁদছেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো যে কেন তিনি এমন করছেন। তিনি বললেন, 'আমি জাহেলি যুগের একটি দিনের কথা ভেবে হাসছি। সে দিন আমি ভ্রমণে বের হয়েছিলাম। হঠাৎ আমার মূর্তিপূজা করার শখ জাগল। কিন্তু আমার মনে পড়ল যে আমি আমার মূর্তিটি ফেলে এসেছি। তাই আমি উপাসনার অন্য একটি উপায় বের করার চেষ্টা করলাম। তখন আমার সাথে ছিল কিছু খেজুর। আমি সেই খেজুরগুলো দিয়ে একটি মূর্তি বানালাম এবং সেই মূর্তির পূজা করলাম। সেই রাতে আমার অনেক খিদে পায়। তখন আমি খেজুরের তৈরি মূর্তিটি খেয়ে ফেলি।' উমার পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে করছিলেন এবং অনুধাবন করছিলেন যে মূর্তি পূজারিরা কত বোকা! এভাবেই ইসলাম মানুষকে বদলে ফেলে। এটাই ইসলামের কারামত। ইসলাম মানুষকে তুচ্ছ অবস্থান থেকে অনেক উঁচু স্থানে উন্নীত করে। উমার ইবন খাত্তাবের ব্যাপারে আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ তাঁর বইয়ে একটি প্রশ্ন তুলেছেন,

'ইসলাম ছাড়া উমার ইবন খাত্তাব কী হতে পারতেন?' এর উত্তরে তিনি ব্যাখ্যা করেন, 'তিনি তাঁর গোত্রের প্রধান হতে পারতেন, অথবা তিনি কুরাইশ গোত্রের একজন প্রসিদ্ধ নেতা হতে পারতেন অথবা সর্বোচ্চ তিনি কুরাইশ বংশের নেতা হতেন। তবে তিনি যদি কম বয়সে মারা যেতেন সেটাই হতো তাঁর জন্য প্রত্যাশিত ও স্বাভাবিক ঘটনা। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিলেন, এই বদঅভ্যাসের জন্য তিনি হয়তো অল্প বয়সে অপরিচিত অবস্থায় মারা যেতে পারতেন। কিন্তু ইসলাম তাঁকে ও তাঁর অবস্থানকে বদলে দিয়েছে। ইসলাম গ্রহণের কারণে তিনি শুধু সমগ্র আরবের নেতা হননি বরং তিনি পুরো পৃথিবীর দুই-তৃতীয়াংশের নেতা হয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে তিনি ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তি।'

মক্কায় মূর্তিপূজা সাধারণ একটি স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন উদ্দেশ্যের জন্য বিভিন্ন মূর্তি পাওয়া যেত। আল-কাবা এইসব মূর্তি দ্বারা অপবিত্র হয়ে যায়। তখন কাবা শরীফে ৩৬০টি মূর্তি ছিল। চারদিকে শির্কের ছড়াছড়ি। একটি আমদানি করা মূর্তি থেকে শির্ক সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ল। দিনে দিনে এটি একটি ব্যবসায় রূপ নেয়। এভাবেই ইসমাঈলের আনীত দ্বীনের বিকৃতি ঘটে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'আমি জাহান্নামে আমর ইবন লুহাই আল খুযাইকে নাড়িভুঁড়ি ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে চলতে দেখেছি।'³ কারণ সে-ই আরবে সর্বপ্রথম মূর্তিপূজার প্রচলন করেছিল.

টিকাঃ
৩. সহীহ বুখারি, অধ্যায় মানাকিব, হাদীস ৩১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00