📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 যমযম কূপের উদ্ভব

📄 যমযম কূপের উদ্ভব


ইবরাহীম তাঁর স্ত্রী হাজেরা ও সদ্যজাত পুত্র ইসমা'ঈলকে নিয়ে হিজাযের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তিনি তাদেরকে যে জায়গাটিতে নিয়ে যান সে জায়গাটিই এখন মক্কা নামে পরিচিত। ওই সময় মক্কা ছিল জনমানবশূন্য। তবে যে স্থানে কাবা নির্মাণ করা হয়েছিল তা সৃষ্টির শুরু থেকেই পবিত্র ছিল। ইবরাহীম তাঁর স্ত্রী ও পুত্রকে অল্প কিছু পানি ও এক থলে খেজুরসহ সেই নিরিবিলি জায়গায় রেখে আসেন। তারপর কিছু না বলেই সেখান থেকে উল্টো পথে হাঁটা শুরু করেন।

হাজেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর স্বামী তাদেরকে রেখে যাবেন, কিন্তু তিনি এটা আশা করেননি যে এরকম জনমানবহীন মরুভূমির মাঝে তিনি তাদেরকে এভাবে ফেলে চলে যাবেন। তিনি স্বামীর পিছে পিছে গিয়ে প্রশ্ন করেন, 'ইবরাহীম, আপনি কি আমাদেরকে এখানে ফেলে রেখে যাচ্ছেন? এখানে না আছে কোনো জনবসতি, না কোনো ফল-ফসল!'

ইবরাহীম চুপ করে রইলেন।

তাঁর স্ত্রী আবারও একই প্রশ্ন করলেন, ইবরাহীম কোনো উত্তর দিলেন না। তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করা হলো। তখনও তিনি নিশ্চুপ।

হাজেরা প্রশ্ন করলেন, 'তবে কি আল্লাহ তাআলা আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন?' এবার উত্তর এল, 'হ্যাঁ।'

হাজেরা বললেন, 'তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। আল্লাহ তাআলাই আমাদের দেখাশোনা করবেন। তিনি আমাদের কখনোই অবহেলা করবেন না।'

হাজেরা জানতেন, যদি আল্লাহ তাআলার আদেশে ইবরাহীম তাদেরকে এমন জনমানবহীন অঞ্চলেও রেখে যান, তবুও দুশ্চিন্তার কিছু নেই, কেননা আল্লাহ তাআলাই এই আদেশ করেছেন। আল্লাহ তাআলার উপর তাঁর এই বিশ্বাস আছে যে আল্লাহ তাআলাই তাঁকে দেখে রাখবেন। যদি সে আদেশ হয় এরকম নিরিবিলি স্থানে একাকী বসবাস করা, তবে সেখানেও আল্লাহর হেফাজতের চাদর তাদের ঘিরে রাখবে।

ইবরাহীম চলে গেলেন। তিনি অনেক দূরে চলে গেলেন, তাঁর স্ত্রী ও ছেলেকে আর দেখা যাচ্ছিল না। তখন কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে একটি দুআ করেন। এই চমৎকার দুআটি আছে কুরআনের সূরা ইবরাহীমে,

“হে আমাদের রব, আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে অনুর্বর উপত্যকায় আবাদ করেছি। হে আমাদের রব, যাতে তারা সালাত কায়েম রাখে। আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং তাদেরকে রিযিক প্রদান করুন ফল-ফলাদি থেকে, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।” (সূরা ইবরাহীম, ১৪: ৩৭)

Maslow's hierarchy of needs নামে একটি তত্ত্ব আছে যেখানে মানুষের বিভিন্ন চাহিদাকে একটি পিরামিড আকারে দেখানো হয়েছে। এই পিরামিডের সবচেয়ে নিচের স্তরে আছে মানুষের শারীরবৃত্তীয় চাহিদা। অর্থাৎ এই তত্ত্ব অনুসারে শারীরিক চাহিদা (যেমন খাদ্যগ্রহণ) মানব জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা। গুরুত্বের দিক থেকে এর পরে আছে যথাক্রমে সামাজিক চাহিদা (সমাজবদ্ধ হয়ে থাকা), আধ্যাত্মিক চাহিদা (ধর্মচর্চা) এবং পিরামিডের চূড়ায় আছে আত্মোপলব্ধি; নিজের সম্ভাবনা ও প্রতিভাকে আবিষ্কার করে তা বিকশিত করতে ধাবিত হওয়া (self-actualization)। মাসলোর এই তত্ত্ব অনুযায়ী বলতে হয়, একজন মানুষ প্রথমে তার শারীরবৃত্তীয় চাহিদা পূরণ করতে সচেষ্ট হবে, তারপর দলবদ্ধ হয়ে থাকতে শুরু করবে, এরপর ধর্মের খোঁজ করবে এবং অবশেষে সে নিজস্ব স্বকীয়তা ও সৃষ্টিশীলতার সন্ধান করতে শুরু করবে।

কিন্তু ইবরাহিমের দুআতে তত্ত্বের এই পিরামিডটিকে সম্পূর্ণ উল্টো রূপে দেখা যায়। তিনি তাঁর পরিবারের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে প্রথমেই যা চেয়েছেন তা হলো-লি ইউক্বীমুস স্বলাহ-যেন তারা সালাত কায়েম করে। অর্থাৎ তিনি প্রথমে অগ্রাধিকার দিয়েছেন আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণের প্রতি। এরপর তিনি দুআ করেছেন, ফাজ 'আল আফ-ইদাতাম মিনান নাস-আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন। এখানে তিনি তাঁর পরিবারের জন্য মানুষের অন্তরে ভালোবাসা গড়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে অনুরোধ করেছেন। এটি হলো তাঁর পরিবারের জন্য সামাজিক চাহিদা। সবশেষে তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে যা চাইলেন তা হলো রিযক অর্থাৎ তাদের শারীরবৃত্তীয় চাহিদাপূরণ-ওয়ারযুকুহুম মিনাস সামারাত-তাদেরকে ফলাদি দ্বারা রুজি দান করুন। তবে এখানে এটাও লক্ষণীয়, ইবরাহীম তাঁর দুআর শেষ অংশে শুধুমাত্র রুজির ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেননি বরং এর সাথে ইবাদাতের ব্যাপারটিও যুক্ত করে দিয়েছেন, তিনি বলেছেন, লা আল্লাহুম ইয়াশকুরুন-যেন, তারা শুকরিয়া আদায় করে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

ইবরাহীম চলে গেলেন। মা হাজেরার কাছে অল্প যে খাবার ছিল তা কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। আর ইসমা'ঈল তখনো ছিলেন দুধের শিশু। হাজেরা তাঁর শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলেন কিন্তু সেই দুধও একসময় শুকিয়ে গেল। ইসমা'ঈল প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাঁদছে। সন্তানের কান্না সহ্য করতে না পেরে মা খাদ্যের খোঁজে বের হলেন। একটি পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলেন, এ পাহাড়ই পরে আস-সাফা নামে পরিচিত হয়েছিল। সেই পাহাড়ের উপর উঠে একবার ডানে তাকান, আবার বাঁয়ে তাকান, কিন্তু তিনি কাছাকাছি কোনো মানববসতির সন্ধান পেলেন না। এরপর পাহাড় থেকে নেমে উপত্যকায় ফিরে এলেন, কাপড় গুটিয়ে এবার উঠতে লাগলেন আরেকটি পাহাড়ে, পরবর্তীতে যা আল-মারওয়া নামে পরিচিত হয়। এ পাহাড়ের চূড়ায় উঠেও ডানে-বায়ে তাকাতে লাগলেন। কিন্তু এবারও কাউকে দেখতে পেলেন না।

একদিকে পুত্র ইসমা'ঈল প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতরাচ্ছে, অন্যদিকে মা হাজেরা কিছু পাওয়ার আশায় আস-সাফা ও আল-মারওয়া পাহাড় দুটির মাঝে ছোটাছুটি করছেন। এভাবে ইতিমধ্যে সাতবার দুই পাহাড়ে ওঠানামা করে ফেলেছেন। সপ্তম বার তিনি যখন পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেন, তখন একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন। আওয়াজটি কোথা থেকে এসেছে তা বোঝার জন্য আশেপাশে তাকাতে লাগলেন। হঠাৎ অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলেন যে, শিশু ইসমা'ঈলের পায়ের কাছ থেকে আওয়াজটি আসছে। আল্লাহ তাআলার নির্দেশে জিবরীল সেখানে যমযম কূপ খনন করে দিয়েছেন আর হাজেরা এই কুপের আওয়াজই শুনতে পেয়েছিলেন। প্রচণ্ড খুশিতে তিনি পানির উৎসের দিকে দৌড়ে গেলেন। মরুভূমিটি শুষ্ক ছিল, তাই পানি শুকিয়ে যেতে পারে চিন্তা করে হাজেরা পানি ধরে রাখার জন্য কুয়ার মতো একটি জায়গা তৈরি করলেন। এ ঘটনা বর্ণনা করার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন, 'ইসমা'ঈলের মায়ের উপর আল্লাহ তাআলা রহম করুন। তিনি যদি এভাবেই তা ফেলে রাখতেন তাহলে সেখানে নদী প্রবাহিত হয়ে যেত', অর্থাৎ তিনি কুয়া বানিয়ে পানি ধরে না রাখতেন তাহলে তা থেকে একটি নদী প্রবাহিত হতো।

চোখের সামনে ক্ষুধায় কাতর পুত্রের কষ্ট ও কান্না দেখে নিশ্চয়ই হাজেরা অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন, তাঁর বুক ভেঙে গিয়েছিল, হয়তোবা তিনি কাঁদছিলেনও। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন মু'মিনাহ ও মুত্তাক্বী বান্দী। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল তাঁকে পরীক্ষা করছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য এক মহাপুরস্কার ঠিক করে রেখেছিলেন, কিন্তু হাজেরা তা জানতেন না। তাই তিনি নিশ্চয়ই প্রচণ্ড কষ্টের মাঝে ছিলেন। হাজেরার এই ঘটনা বর্ণনা করার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন, 'আর এ কারণেই আমরা (হাজ্জের সময়) সাফা-মারওয়ায় ওঠানামা করি।' অর্থাৎ আজ পর্যন্ত আমরা হাজেরার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এসেছি। হাজেরা যদি জানতে পারতেন যে এমন এক সময় আসবে যখন সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মুসলিম তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করবে তাহলে তিনি মুখে এক চিলতে হাসি নিয়েই সাফা-মারওয়ায় ওঠানামা করতেন!

এ ঘটনা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। মাঝে মাঝে আল্লাহ আমাদেরকে বিশেষ কিছু পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে পরীক্ষা নেন, কিন্তু আমরা জানি না আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য কী ঠিক করে রেখেছেন। কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, হাজেরাও এক সময় কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন আর সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাআলার উপর তাঁর অগাধ বিশ্বাসের কারণে তাঁকে দেওয়া হয়েছে এক অসাধারণ প্রতিদান।

ইবরাহীম তাঁর স্ত্রী হাজেরা ও সদ্যজাত পুত্র ইসমা'ঈলকে নিয়ে হিজাযের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তিনি তাদেরকে যে জায়গাটিতে নিয়ে যান সে জায়গাটিই এখন মক্কা নামে পরিচিত। ওই সময় মক্কা ছিল জনমানবশূন্য। তবে যে স্থানে কাবা নির্মাণ করা হয়েছিল তা সৃষ্টির শুরু থেকেই পবিত্র ছিল। ইবরাহীম তাঁর স্ত্রী ও পুত্রকে অল্প কিছু পানি ও এক থলে খেজুরসহ সেই নিরিবিলি জায়গায় রেখে আসেন। তারপর কিছু না বলেই সেখান থেকে উল্টো পথে হাঁটা শুরু করেন।

হাজেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর স্বামী তাদেরকে রেখে যাবেন, কিন্তু তিনি এটা আশা করেননি যে এরকম জনমানবহীন মরুভূমির মাঝে তিনি তাদেরকে এভাবে ফেলে চলে যাবেন। তিনি স্বামীর পিছে পিছে গিয়ে প্রশ্ন করেন, 'ইবরাহীম, আপনি কি আমাদেরকে এখানে ফেলে রেখে যাচ্ছেন? এখানে না আছে কোনো জনবসতি, না কোনো ফল-ফসল!'

ইবরাহীম চুপ করে রইলেন।

তাঁর স্ত্রী আবারও একই প্রশ্ন করলেন, ইবরাহীম কোনো উত্তর দিলেন না। তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করা হলো। তখনও তিনি নিশ্চুপ।

হাজেরা প্রশ্ন করলেন, 'তবে কি আল্লাহ তাআলা আপনাকে এ নির্দেশ দিয়েছেন?' এবার উত্তর এল, 'হ্যাঁ।'

হাজেরা বললেন, 'তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। আল্লাহ তাআলাই আমাদের দেখাশোনা করবেন। তিনি আমাদের কখনোই অবহেলা করবেন না।'

হাজেরা জানতেন, যদি আল্লাহ তাআলার আদেশে ইবরাহীম তাদেরকে এমন জনমানবহীন অঞ্চলেও রেখে যান, তবুও দুশ্চিন্তার কিছু নেই, কেননা আল্লাহ তাআলাই এই আদেশ করেছেন। আল্লাহ তাআলার উপর তাঁর এই বিশ্বাস আছে যে আল্লাহ তাআলাই তাঁকে দেখে রাখবেন। যদি সে আদেশ হয় এরকম নিরিবিলি স্থানে একাকী বসবাস করা, তবে সেখানেও আল্লাহর হেফাজতের চাদর তাদের ঘিরে রাখবে।

ইবরাহীম চলে গেলেন। তিনি অনেক দূরে চলে গেলেন, তাঁর স্ত্রী ও ছেলেকে আর দেখা যাচ্ছিল না। তখন কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে একটি দুআ করেন। এই চমৎকার দুআটি আছে কুরআনের সূরা ইবরাহীমে,

“হে আমাদের রব, আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে অনুর্বর উপত্যকায় আবাদ করেছি। হে আমাদের রব, যাতে তারা সালাত কায়েম রাখে। আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং তাদেরকে রিযিক প্রদান করুন ফল-ফলাদি থেকে, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।” (সূরা ইবরাহীম, ১৪: ৩৭)

Maslow's hierarchy of needs নামে একটি তত্ত্ব আছে যেখানে মানুষের বিভিন্ন চাহিদাকে একটি পিরামিড আকারে দেখানো হয়েছে। এই পিরামিডের সবচেয়ে নিচের স্তরে আছে মানুষের শারীরবৃত্তীয় চাহিদা। অর্থাৎ এই তত্ত্ব অনুসারে শারীরিক চাহিদা (যেমন খাদ্যগ্রহণ) মানব জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা। গুরুত্বের দিক থেকে এর পরে আছে যথাক্রমে সামাজিক চাহিদা (সমাজবদ্ধ হয়ে থাকা), আধ্যাত্মিক চাহিদা (ধর্মচর্চা) এবং পিরামিডের চূড়ায় আছে আত্মোপলব্ধি; নিজের সম্ভাবনা ও প্রতিভাকে আবিষ্কার করে তা বিকশিত করতে ধাবিত হওয়া (self-actualization)। মাসলোর এই তত্ত্ব অনুযায়ী বলতে হয়, একজন মানুষ প্রথমে তার শারীরবৃত্তীয় চাহিদা পূরণ করতে সচেষ্ট হবে, তারপর দলবদ্ধ হয়ে থাকতে শুরু করবে, এরপর ধর্মের খোঁজ করবে এবং অবশেষে সে নিজস্ব স্বকীয়তা ও সৃষ্টিশীলতার সন্ধান করতে শুরু করবে।

কিন্তু ইবরাহিমের দুআতে তত্ত্বের এই পিরামিডটিকে সম্পূর্ণ উল্টো রূপে দেখা যায়। তিনি তাঁর পরিবারের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে প্রথমেই যা চেয়েছেন তা হলো-লি ইউক্বীমুস স্বলাহ-যেন তারা সালাত কায়েম করে। অর্থাৎ তিনি প্রথমে অগ্রাধিকার দিয়েছেন আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণের প্রতি। এরপর তিনি দুআ করেছেন, ফাজ 'আল আফ-ইদাতাম মিনান নাস-আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন। এখানে তিনি তাঁর পরিবারের জন্য মানুষের অন্তরে ভালোবাসা গড়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে অনুরোধ করেছেন। এটি হলো তাঁর পরিবারের জন্য সামাজিক চাহিদা। সবশেষে তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে যা চাইলেন তা হলো রিযক অর্থাৎ তাদের শারীরবৃত্তীয় চাহিদাপূরণ-ওয়ারযুকুহুম মিনাস সামারাত-তাদেরকে ফলাদি দ্বারা রুজি দান করুন। তবে এখানে এটাও লক্ষণীয়, ইবরাহীম তাঁর দুআর শেষ অংশে শুধুমাত্র রুজির ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেননি বরং এর সাথে ইবাদাতের ব্যাপারটিও যুক্ত করে দিয়েছেন, তিনি বলেছেন, লা আল্লাহুম ইয়াশকুরুন-যেন, তারা শুকরিয়া আদায় করে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

ইবরাহীম চলে গেলেন। মা হাজেরার কাছে অল্প যে খাবার ছিল তা কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। আর ইসমা'ঈল তখনো ছিলেন দুধের শিশু। হাজেরা তাঁর শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছিলেন কিন্তু সেই দুধও একসময় শুকিয়ে গেল। ইসমা'ঈল প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাঁদছে। সন্তানের কান্না সহ্য করতে না পেরে মা খাদ্যের খোঁজে বের হলেন। একটি পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠতে লাগলেন, এ পাহাড়ই পরে আস-সাফা নামে পরিচিত হয়েছিল। সেই পাহাড়ের উপর উঠে একবার ডানে তাকান, আবার বাঁয়ে তাকান, কিন্তু তিনি কাছাকাছি কোনো মানববসতির সন্ধান পেলেন না। এরপর পাহাড় থেকে নেমে উপত্যকায় ফিরে এলেন, কাপড় গুটিয়ে এবার উঠতে লাগলেন আরেকটি পাহাড়ে, পরবর্তীতে যা আল-মারওয়া নামে পরিচিত হয়। এ পাহাড়ের চূড়ায় উঠেও ডানে-বায়ে তাকাতে লাগলেন। কিন্তু এবারও কাউকে দেখতে পেলেন না।

একদিকে পুত্র ইসমা'ঈল প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতরাচ্ছে, অন্যদিকে মা হাজেরা কিছু পাওয়ার আশায় আস-সাফা ও আল-মারওয়া পাহাড় দুটির মাঝে ছোটাছুটি করছেন। এভাবে ইতিমধ্যে সাতবার দুই পাহাড়ে ওঠানামা করে ফেলেছেন। সপ্তম বার তিনি যখন পাহাড়ের চূড়ায় উঠলেন, তখন একটি আওয়াজ শুনতে পেলেন। আওয়াজটি কোথা থেকে এসেছে তা বোঝার জন্য আশেপাশে তাকাতে লাগলেন। হঠাৎ অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলেন যে, শিশু ইসমা'ঈলের পায়ের কাছ থেকে আওয়াজটি আসছে। আল্লাহ তাআলার নির্দেশে জিবরীল সেখানে যমযম কূপ খনন করে দিয়েছেন আর হাজেরা এই কুপের আওয়াজই শুনতে পেয়েছিলেন। প্রচণ্ড খুশিতে তিনি পানির উৎসের দিকে দৌড়ে গেলেন। মরুভূমিটি শুষ্ক ছিল, তাই পানি শুকিয়ে যেতে পারে চিন্তা করে হাজেরা পানি ধরে রাখার জন্য কুয়ার মতো একটি জায়গা তৈরি করলেন। এ ঘটনা বর্ণনা করার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন, 'ইসমা'ঈলের মায়ের উপর আল্লাহ তাআলা রহম করুন। তিনি যদি এভাবেই তা ফেলে রাখতেন তাহলে সেখানে নদী প্রবাহিত হয়ে যেত', অর্থাৎ তিনি কুয়া বানিয়ে পানি ধরে না রাখতেন তাহলে তা থেকে একটি নদী প্রবাহিত হতো।

চোখের সামনে ক্ষুধায় কাতর পুত্রের কষ্ট ও কান্না দেখে নিশ্চয়ই হাজেরা অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন, তাঁর বুক ভেঙে গিয়েছিল, হয়তোবা তিনি কাঁদছিলেনও। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন মু'মিনাহ ও মুত্তাক্বী বান্দী। আল্লাহ আযযা ওয়াজাল তাঁকে পরীক্ষা করছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য এক মহাপুরস্কার ঠিক করে রেখেছিলেন, কিন্তু হাজেরা তা জানতেন না। তাই তিনি নিশ্চয়ই প্রচণ্ড কষ্টের মাঝে ছিলেন। হাজেরার এই ঘটনা বর্ণনা করার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন, 'আর এ কারণেই আমরা (হাজ্জের সময়) সাফা-মারওয়ায় ওঠানামা করি।' অর্থাৎ আজ পর্যন্ত আমরা হাজেরার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এসেছি। হাজেরা যদি জানতে পারতেন যে এমন এক সময় আসবে যখন সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মুসলিম তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করবে তাহলে তিনি মুখে এক চিলতে হাসি নিয়েই সাফা-মারওয়ায় ওঠানামা করতেন!

এ ঘটনা থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। মাঝে মাঝে আল্লাহ আমাদেরকে বিশেষ কিছু পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে পরীক্ষা নেন, কিন্তু আমরা জানি না আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য কী ঠিক করে রেখেছেন। কোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, হাজেরাও এক সময় কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন আর সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাআলার উপর তাঁর অগাধ বিশ্বাসের কারণে তাঁকে দেওয়া হয়েছে এক অসাধারণ প্রতিদান।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 মক্কায় জনবসতি স্থাপন

📄 মক্কায় জনবসতি স্থাপন


যমযম কূপ সৃষ্টি হলো, মরুভূমিতে পানির অভাব দূর হলো, আর স্বাভাবিকভাবেই শুরু হলো প্রাণের সমাগম। পাখিরা কূপের চারপাশে উড়তে লাগল। সেখানে তখন জুরহুম নামে একটি যাযাবর গোত্র ছিল। এদের আদি নিবাস ছিল ইয়েমেন, কিন্তু তারা ইয়েমেন ত্যাগ করে এখানে চলে আসে। ইয়েমেনের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, বিভিন্ন সময়ে ব্যাপকহারে লোকজন এ স্থান ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এ রকম একটি ঘটনা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। তখন ইয়েমেনে সাবা জাতির বসবাস ছিল, তারাই প্রথমবারের মতো সেখানে একটি বাঁধ তৈরি করেছিল। যে মরুভূমিতে বৃষ্টি হয় না বললেই চলে সে মরুভূমিতেই বাঁধ দেওয়ার কারণে সারাবছর পানি সরবরাহ তৈরি হলো। পানির এই সহজলভ্যতা আরবের মাঝে এক বিশাল জাতির জন্ম দিল। কুরআনে বর্ণিত আছে, তাদের ব্যাপক সম্পদ আর চাষাবাদের কারণে তাদের ভ্রমণ করতে কোনো কষ্টই হতো না। কেননা, তারা বিভিন্ন জায়গাজুড়ে অনেকগুলো উপনিবেশ স্থাপন করেছিল, তাই তাদের থাকা-খাওয়ার জায়গার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু এ জাতির লোকেরা আল্লাহ তাআলার অবাধ্য ছিল। তাই আল্লাহ তাআলা তাদের বাঁধ ধ্বংস করে দেন, এর ফলে পুরো এলাকা পানিতে ভেসে যায় এবং লোকজন ইয়েমেন ত্যাগ করে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা যেমন আন-নাজদ, আল-হিজায, ইরাক, আশ-শাম, মদীনা ইত্যাদি এলাকাসমূহে ছড়িয়ে পড়ে।

জুরহুম গোত্র অবশেষে হিজাযে এসে বসতি স্থাপন করে। তবে তারা সেই প্লাবনের আগে এসেছিল নাকি পরে এসেছিল-সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। মক্কা ও এর আশেপাশের এলাকা সম্পর্কে জুরহুম গোত্রের ভালো ধারণা ছিল। তারা ভালো করেই জানতো যে, ওই এলাকায় পানির কোনো উৎস নেই। তাই ওই এলাকার আকাশে ব্যাপক হারে পাখিদের ঘোরাঘুরি করতে দেখে তারা অবাক হয়ে গেল। সেখানে কী ঘটছে দেখার জন্য দুইজন লোক পাঠাল। তারা ফিরে এসে জানাল যে সেখানে একটি কূপ রয়েছে। এরপর জুরহুম গোত্রের লোকেরা যমযম কূপের কাছে চলে গেল। মা হাজেরার দিকে ছুঁড়ে দিল একটি অদ্ভুত প্রশ্ন। আর তিনিও তাদের অদ্ভুত প্রশ্নের জবাবে অদ্ভুত একটি উত্তরই দিয়েছিলেন। তারা জিজ্ঞেস করেছিল, 'আমরা কি এখানে বসতি স্থাপন করতে পারি?'

জুরহুম ছিল যোদ্ধাদের গোত্র আর তারা কিনা বসতি স্থাপনের জন্য এক মহিলার অনুমতির তোয়াক্কা করছে! বিবি হাজেরা ছিলেন এমন একজন মহিলা যার সাথে ওই সময় একমাত্র শিশু সন্তান ইসমাঈল ছাড়া আর কোনো পুরুষ ব্যক্তি ছিল না। তারা চাইলেই হাজেরাকে সেখান থেকে এক ধাক্কায় বের করে দিতে পারত। কিন্তু তারা বেশ ভদ্রতা করে তাঁর কাছে অনুমতি চাইল। হাজেরা বললেন, 'ঠিক আছে তোমরা থাকতে পারো, তবে আমার একটি শর্ত আছে আর তা হলো এই কূপ আমার অধীনে থাকবে।' মজার ব্যাপার, তিনি ছিলেন একাকী এক মহিলা, যার তাদের সাথে পেরে ওঠার কোনো ক্ষমতাই নেই, তিনিই কিনা তাদের সাথে দর কষাকষি করছেন আর শর্তারোপ করছেন, যেখানে কিনা তারা চাইলেই তাঁকে সেখান থেকে হটিয়ে দিতে পারত! যাই হোক, জুরহুম গোত্রও তাঁর এ শর্তে রাজি হয়ে গেল।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'হাজেরা মনে মনে চাইছিলেন এই গোত্র এখানে বসতি স্থাপন করুক।'² তিনি চাচ্ছিলেন এখানে একটা জনবসতি গড়ে উঠুক, কিন্তু এটাও চাচ্ছিলেন যেন বিষয়টা যথাযথভাবে হয়। অবশেষে জুরহুম গোত্র যমযম কূপের নিকটস্থ এলাকায় বসতি স্থাপন করে আর এ এলাকাটি পরবর্তীতে মক্কা নামে পরিচয় লাভ করে। ইসমাঈল তাদের মাঝেই বড় হয়ে উঠতে লাগলেন। জুরহুম গোত্রের ভাষা ছিল আরবি, ইসমাঈল সেটাও রপ্ত করে ফেললেন। তাঁর পিতা ইবরাহীম ছিলেন ইরাকের অধিবাসী আর সে সময় ইরাকে অন্য ভাষা চালু ছিল। ইসমাঈল জুরহুম গোত্রের এক মহিলাকে বিয়ে করেন, আর এখান থেকেই শুরু হয় রাসূলুল্লাহর বংশধারা। সে সময় মক্কার রাজনৈতিক নেতৃত্ব জুরহুম গোত্রের হাতে ছিল। পরবর্তীতে ইবরাহীম মক্কায় এসে পুত্র ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে কাবাঘর নির্মাণ করেন। মক্কার ধর্মীয় নেতৃত্ব ছিল ইসমাঈলের হাতে, আর তা যুগ যুগ ধরে তাঁর উত্তরসূরিদের মাঝে বহাল ছিল। জুরহুম গোত্রের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকলেও ধর্মীয় কর্তৃত্ব কখনোই তারা লাভ করেনি।

টিকাঃ
২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৩।

যমযম কূপ সৃষ্টি হলো, মরুভূমিতে পানির অভাব দূর হলো, আর স্বাভাবিকভাবেই শুরু হলো প্রাণের সমাগম। পাখিরা কূপের চারপাশে উড়তে লাগল। সেখানে তখন জুরহুম নামে একটি যাযাবর গোত্র ছিল। এদের আদি নিবাস ছিল ইয়েমেন, কিন্তু তারা ইয়েমেন ত্যাগ করে এখানে চলে আসে। ইয়েমেনের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, বিভিন্ন সময়ে ব্যাপকহারে লোকজন এ স্থান ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এ রকম একটি ঘটনা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। তখন ইয়েমেনে সাবা জাতির বসবাস ছিল, তারাই প্রথমবারের মতো সেখানে একটি বাঁধ তৈরি করেছিল। যে মরুভূমিতে বৃষ্টি হয় না বললেই চলে সে মরুভূমিতেই বাঁধ দেওয়ার কারণে সারাবছর পানি সরবরাহ তৈরি হলো। পানির এই সহজলভ্যতা আরবের মাঝে এক বিশাল জাতির জন্ম দিল। কুরআনে বর্ণিত আছে, তাদের ব্যাপক সম্পদ আর চাষাবাদের কারণে তাদের ভ্রমণ করতে কোনো কষ্টই হতো না। কেননা, তারা বিভিন্ন জায়গাজুড়ে অনেকগুলো উপনিবেশ স্থাপন করেছিল, তাই তাদের থাকা-খাওয়ার জায়গার কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু এ জাতির লোকেরা আল্লাহ তাআলার অবাধ্য ছিল। তাই আল্লাহ তাআলা তাদের বাঁধ ধ্বংস করে দেন, এর ফলে পুরো এলাকা পানিতে ভেসে যায় এবং লোকজন ইয়েমেন ত্যাগ করে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকা যেমন আন-নাজদ, আল-হিজায, ইরাক, আশ-শাম, মদীনা ইত্যাদি এলাকাসমূহে ছড়িয়ে পড়ে।

জুরহুম গোত্র অবশেষে হিজাযে এসে বসতি স্থাপন করে। তবে তারা সেই প্লাবনের আগে এসেছিল নাকি পরে এসেছিল-সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। মক্কা ও এর আশেপাশের এলাকা সম্পর্কে জুরহুম গোত্রের ভালো ধারণা ছিল। তারা ভালো করেই জানতো যে, ওই এলাকায় পানির কোনো উৎস নেই। তাই ওই এলাকার আকাশে ব্যাপক হারে পাখিদের ঘোরাঘুরি করতে দেখে তারা অবাক হয়ে গেল। সেখানে কী ঘটছে দেখার জন্য দুইজন লোক পাঠাল। তারা ফিরে এসে জানাল যে সেখানে একটি কূপ রয়েছে। এরপর জুরহুম গোত্রের লোকেরা যমযম কূপের কাছে চলে গেল। মা হাজেরার দিকে ছুঁড়ে দিল একটি অদ্ভুত প্রশ্ন। আর তিনিও তাদের অদ্ভুত প্রশ্নের জবাবে অদ্ভুত একটি উত্তরই দিয়েছিলেন। তারা জিজ্ঞেস করেছিল, 'আমরা কি এখানে বসতি স্থাপন করতে পারি?'

জুরহুম ছিল যোদ্ধাদের গোত্র আর তারা কিনা বসতি স্থাপনের জন্য এক মহিলার অনুমতির তোয়াক্কা করছে! বিবি হাজেরা ছিলেন এমন একজন মহিলা যার সাথে ওই সময় একমাত্র শিশু সন্তান ইসমাঈল ছাড়া আর কোনো পুরুষ ব্যক্তি ছিল না। তারা চাইলেই হাজেরাকে সেখান থেকে এক ধাক্কায় বের করে দিতে পারত। কিন্তু তারা বেশ ভদ্রতা করে তাঁর কাছে অনুমতি চাইল। হাজেরা বললেন, 'ঠিক আছে তোমরা থাকতে পারো, তবে আমার একটি শর্ত আছে আর তা হলো এই কূপ আমার অধীনে থাকবে।' মজার ব্যাপার, তিনি ছিলেন একাকী এক মহিলা, যার তাদের সাথে পেরে ওঠার কোনো ক্ষমতাই নেই, তিনিই কিনা তাদের সাথে দর কষাকষি করছেন আর শর্তারোপ করছেন, যেখানে কিনা তারা চাইলেই তাঁকে সেখান থেকে হটিয়ে দিতে পারত! যাই হোক, জুরহুম গোত্রও তাঁর এ শর্তে রাজি হয়ে গেল।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'হাজেরা মনে মনে চাইছিলেন এই গোত্র এখানে বসতি স্থাপন করুক।'² তিনি চাচ্ছিলেন এখানে একটা জনবসতি গড়ে উঠুক, কিন্তু এটাও চাচ্ছিলেন যেন বিষয়টা যথাযথভাবে হয়। অবশেষে জুরহুম গোত্র যমযম কূপের নিকটস্থ এলাকায় বসতি স্থাপন করে আর এ এলাকাটি পরবর্তীতে মক্কা নামে পরিচয় লাভ করে। ইসমাঈল তাদের মাঝেই বড় হয়ে উঠতে লাগলেন। জুরহুম গোত্রের ভাষা ছিল আরবি, ইসমাঈল সেটাও রপ্ত করে ফেললেন। তাঁর পিতা ইবরাহীম ছিলেন ইরাকের অধিবাসী আর সে সময় ইরাকে অন্য ভাষা চালু ছিল। ইসমাঈল জুরহুম গোত্রের এক মহিলাকে বিয়ে করেন, আর এখান থেকেই শুরু হয় রাসূলুল্লাহর বংশধারা। সে সময় মক্কার রাজনৈতিক নেতৃত্ব জুরহুম গোত্রের হাতে ছিল। পরবর্তীতে ইবরাহীম মক্কায় এসে পুত্র ইসমাঈলকে সাথে নিয়ে কাবাঘর নির্মাণ করেন। মক্কার ধর্মীয় নেতৃত্ব ছিল ইসমাঈলের হাতে, আর তা যুগ যুগ ধরে তাঁর উত্তরসূরিদের মাঝে বহাল ছিল। জুরহুম গোত্রের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকলেও ধর্মীয় কর্তৃত্ব কখনোই তারা লাভ করেনি।

টিকাঃ
২. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৩।

📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 মক্কার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস

📄 মক্কার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস


📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) > 📄 কুরাইশ বংশের উৎপত্তি

📄 কুরাইশ বংশের উৎপত্তি


জুরহুম গোত্র দীর্ঘ দিন ধরে মক্কায় ছিল। ধীরে ধীরে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের স্থলে বনু খুযা'আ গোত্রকে পাঠান। বনু খুযাআ জুরহুম গোত্রকে মক্কা থেকে বের করে দেয়। বনু খুযাআ ছিল একটি ইয়েমেনি গোত্র এবং অন্যান্য গোত্রসমূহের মতো এটিও ইয়েমেন ত্যাগ করেছিল। অবশেষে তারা হিজাযে কর্তৃত্ব স্থাপন করে। এদিকে জুরহুম মক্কা ছেড়ে যাওয়ার আগে দুটো কাজ করলো, প্রথমত, তারা যমযম কূপের মুখ বন্ধ করে এর সমস্ত চিহ্ন মুছে দিল। দ্বিতীয়ত, আল-কাবার ভেতরে যে মূল্যবান সম্পদগুলো ছিল সেগুলো তারা সাথে করে নিয়ে গেল।

জুরহুম গোত্র চলে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই মক্কার শাসন ক্ষমতা চলে গেল বনু খুযাআর হাতে। যদিও সে সময় ইসমাঈলের বংশধররা সংখ্যায় অনেকগুণ বেড়ে যায় এবং অনেক গোত্রে বিভক্ত হয়ে সমগ্র আরবে ছড়িয়ে পড়ে। মক্কায় একটিমাত্র শাখা গোত্র রয়ে যায় আর এই শাখা গোত্রটির নাম হলো কুরাইশ। অর্থাৎ ইসমাঈল থেকে উদ্ভূত গোত্রগুলোর একটি হলো কুরাইশ। তবে মক্কার কর্তৃত্ব তখনো কুরাইশদের হাতে নয়, বরং বনু খুযাআর হাতেই ছিল।

বনু খুযাআর অন্যতম নেতা ছিল আমর ইবন লুহাই আল খুযাই। আরবের ধর্মীয় পটভূমির আলোচনায় তাকে নিয়ে আলোচনা করা হবে। অন্যদিকে কুরাইশদের নেতা ছিল কুসাই ইবন কালব-সে সকল কুরাইশকে ঐক্যবদ্ধ করে বনু খুযাআর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং তাদেরকে পরাজিত করে মক্কা থেকে বের করে দেয়। প্রথমবারের মতো মক্কার রাজনৈতিক ও ধর্মীয়-উভয় নেতৃত্ব কুসাই তথা কুরাইশদের হস্তগত হয়। কুসাইর হাতে তখন কাবা ঘরের অভিভাবকত্ব চলে আসে। সে একই সাথে কাবা ঘরের সিকায়াহ ও নিফাদা এর ব্যাপারে কর্তৃত্বশীল হয়। সিকায়াহ ও নিফাদা হলো কাবায় আগত হাজীদের খাবার ও পানি পান করানোর দায়িত্ব।

এই কাজগুলো সাধারণভাবে খুব আহামরি মনে না হলেও আরবে আল্লাহ তাআলার অতিথিদেরকে আপ্যায়ন করতে পারাটা অত্যন্ত সম্মানজনক একটি ব্যাপার ছিল। এই দায়িত্ব লাভের মাধ্যমে হাজ্জ করতে আগত হাজীদের মেহমানদারির দায়িত্ব বর্তায় কুরাইশদের উপর। তৎকালীন কুরাইশদের রাজনৈতিক পরিষদ আন-নাদওয়ার কর্তৃত্বও কুসাই ইবন কালবের হাতে ছিল। আন-নাদওয়া ছিল অনেকটা বর্তমান যুগের সংসদের মতো। তার হাতে আরও ছিল আল-লিওয়ার নিয়ন্ত্রণ। আল-লিওয়া ছিল যুদ্ধের ব্যানার, অর্থাৎ যুদ্ধ ঘোষণা দেওয়ার সকল ক্ষমতাও ছিল কুসাইয়ের হাতে। এক কথায় বলা যায় যে কুসাই ইবন কালব ছিল তৎকালীন মক্কার একচ্ছত্র অধিপতি।

কুসাই ইবন কালবের মৃত্যুর পর এসব ক্ষমতা তার সন্তানরা নিজেদের মাঝে ভাগ করে নেয়। কুসাইয়ের নাতি আমর পৈত্রিক সূত্রে হাজীদের খাবার ও পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করার দায়িত্ব লাভ করেন। সচরাচর শুধুমাত্র স্যুপ দিয়ে হাজীদের আপ্যায়ন করা হতো। কিন্তু আমর এ খাবারে কিছুটা নতুনত্ব আনেন। তিনি রুটি ছিঁড়ে স্যুপের মধ্যে ভেজানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে খাবারটির স্বাদ আরও বেড়ে গিয়েছিল। কোনো কিছু ভেঙ্গে গুঁড়ো করার পদ্ধতিকে আরবিতে 'হাশম' বলা হয়। এই হাশম থেকেই তখন আমরকে হাশিম নামে ডাকা হতো। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর প্রপিতামহ। হাশিম বিয়ে করেছিলেন মদীনার এক মহিলাকে। এরপর তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনে যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। গাযাতে তাকে দাফন করা হয়। এর মধ্যে তার স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে তিনি এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। পুত্রের নাম রাখা হয়েছিল 'শায়বা'। শায়বা মানে হলো বৃদ্ধ লোক। ছোটো শিশুর এরূপ অদ্ভুত নামকরণের কারণ হলো জন্ম থেকেই তার মাথার কিছু চুল ধূসর ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর শায়বার মা ইয়াসরিবে পিতামাতার কাছেই থেকে গিয়েছিলেন। তাই শায়বার ছোটবেলা কেটেছিল ইয়াসরিবে তার নানাবাড়িতে। আর এই ইয়াসরিবে যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ হিজরত করলেন তখন সেই ইয়াসিরবের নাম বদলে হয়ে গেলো মদীনা।

জুরহুম গোত্র দীর্ঘ দিন ধরে মক্কায় ছিল। ধীরে ধীরে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে। তখন আল্লাহ তাআলা তাদের স্থলে বনু খুযা'আ গোত্রকে পাঠান। বনু খুযাআ জুরহুম গোত্রকে মক্কা থেকে বের করে দেয়। বনু খুযাআ ছিল একটি ইয়েমেনি গোত্র এবং অন্যান্য গোত্রসমূহের মতো এটিও ইয়েমেন ত্যাগ করেছিল। অবশেষে তারা হিজাযে কর্তৃত্ব স্থাপন করে। এদিকে জুরহুম মক্কা ছেড়ে যাওয়ার আগে দুটো কাজ করলো, প্রথমত, তারা যমযম কূপের মুখ বন্ধ করে এর সমস্ত চিহ্ন মুছে দিল। দ্বিতীয়ত, আল-কাবার ভেতরে যে মূল্যবান সম্পদগুলো ছিল সেগুলো তারা সাথে করে নিয়ে গেল।

জুরহুম গোত্র চলে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই মক্কার শাসন ক্ষমতা চলে গেল বনু খুযাআর হাতে। যদিও সে সময় ইসমাঈলের বংশধররা সংখ্যায় অনেকগুণ বেড়ে যায় এবং অনেক গোত্রে বিভক্ত হয়ে সমগ্র আরবে ছড়িয়ে পড়ে। মক্কায় একটিমাত্র শাখা গোত্র রয়ে যায় আর এই শাখা গোত্রটির নাম হলো কুরাইশ। অর্থাৎ ইসমাঈল থেকে উদ্ভূত গোত্রগুলোর একটি হলো কুরাইশ। তবে মক্কার কর্তৃত্ব তখনো কুরাইশদের হাতে নয়, বরং বনু খুযাআর হাতেই ছিল।

বনু খুযাআর অন্যতম নেতা ছিল আমর ইবন লুহাই আল খুযাই। আরবের ধর্মীয় পটভূমির আলোচনায় তাকে নিয়ে আলোচনা করা হবে। অন্যদিকে কুরাইশদের নেতা ছিল কুসাই ইবন কালব-সে সকল কুরাইশকে ঐক্যবদ্ধ করে বনু খুযাআর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং তাদেরকে পরাজিত করে মক্কা থেকে বের করে দেয়। প্রথমবারের মতো মক্কার রাজনৈতিক ও ধর্মীয়-উভয় নেতৃত্ব কুসাই তথা কুরাইশদের হস্তগত হয়। কুসাইর হাতে তখন কাবা ঘরের অভিভাবকত্ব চলে আসে। সে একই সাথে কাবা ঘরের সিকায়াহ ও নিফাদা এর ব্যাপারে কর্তৃত্বশীল হয়। সিকায়াহ ও নিফাদা হলো কাবায় আগত হাজীদের খাবার ও পানি পান করানোর দায়িত্ব।

এই কাজগুলো সাধারণভাবে খুব আহামরি মনে না হলেও আরবে আল্লাহ তাআলার অতিথিদেরকে আপ্যায়ন করতে পারাটা অত্যন্ত সম্মানজনক একটি ব্যাপার ছিল। এই দায়িত্ব লাভের মাধ্যমে হাজ্জ করতে আগত হাজীদের মেহমানদারির দায়িত্ব বর্তায় কুরাইশদের উপর। তৎকালীন কুরাইশদের রাজনৈতিক পরিষদ আন-নাদওয়ার কর্তৃত্বও কুসাই ইবন কালবের হাতে ছিল। আন-নাদওয়া ছিল অনেকটা বর্তমান যুগের সংসদের মতো। তার হাতে আরও ছিল আল-লিওয়ার নিয়ন্ত্রণ। আল-লিওয়া ছিল যুদ্ধের ব্যানার, অর্থাৎ যুদ্ধ ঘোষণা দেওয়ার সকল ক্ষমতাও ছিল কুসাইয়ের হাতে। এক কথায় বলা যায় যে কুসাই ইবন কালব ছিল তৎকালীন মক্কার একচ্ছত্র অধিপতি।

কুসাই ইবন কালবের মৃত্যুর পর এসব ক্ষমতা তার সন্তানরা নিজেদের মাঝে ভাগ করে নেয়। কুসাইয়ের নাতি আমর পৈত্রিক সূত্রে হাজীদের খাবার ও পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করার দায়িত্ব লাভ করেন। সচরাচর শুধুমাত্র স্যুপ দিয়ে হাজীদের আপ্যায়ন করা হতো। কিন্তু আমর এ খাবারে কিছুটা নতুনত্ব আনেন। তিনি রুটি ছিঁড়ে স্যুপের মধ্যে ভেজানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে খাবারটির স্বাদ আরও বেড়ে গিয়েছিল। কোনো কিছু ভেঙ্গে গুঁড়ো করার পদ্ধতিকে আরবিতে 'হাশম' বলা হয়। এই হাশম থেকেই তখন আমরকে হাশিম নামে ডাকা হতো। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর প্রপিতামহ। হাশিম বিয়ে করেছিলেন মদীনার এক মহিলাকে। এরপর তিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনে যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। গাযাতে তাকে দাফন করা হয়। এর মধ্যে তার স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে তিনি এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। পুত্রের নাম রাখা হয়েছিল 'শায়বা'। শায়বা মানে হলো বৃদ্ধ লোক। ছোটো শিশুর এরূপ অদ্ভুত নামকরণের কারণ হলো জন্ম থেকেই তার মাথার কিছু চুল ধূসর ছিল। স্বামীর মৃত্যুর পর শায়বার মা ইয়াসরিবে পিতামাতার কাছেই থেকে গিয়েছিলেন। তাই শায়বার ছোটবেলা কেটেছিল ইয়াসরিবে তার নানাবাড়িতে। আর এই ইয়াসরিবে যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ হিজরত করলেন তখন সেই ইয়াসিরবের নাম বদলে হয়ে গেলো মদীনা।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00