📘 সীরাহ (রেইনড্রপস) 📄 সীরাহশাস্ত্র ও হাদীসশাস্ত্রের পার্থক্য

📄 সীরাহশাস্ত্র ও হাদীসশাস্ত্রের পার্থক্য


সীরাহ ও হাদীসশাস্ত্র জ্ঞানের দুটি ভিন্ন শাখা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই দুটি শাখার মধ্যে অনেক সাদৃশ্য দেখা যায়, কিন্তু এই দুইটি শাখার নিয়মরীতি একে অপর থেকে অনেকাংশে আলাদা। হাদীসের আলিমগণ নিয়মনীতির ব্যাপারে বেশ কঠোরতা অবলম্বন করেন। কিন্তু সীরাহর আলিমগণ এ ব্যাপারে বেশ ছাড় দেন। এর কারণ হলো, হাদীসের সত্যতা বা ইসনাদ যাচাই করার পর তা থেকে হুকুম-আহকাম প্রতিপাদন করতে হয়, তাই মুহাদ্দিসগণ সর্বদা হাদীসের সত্যতা যাচাইয়ের ব্যাপারে সতর্ক থাকার চেষ্টা করেন যেন হাদীসগুলোর ইসনাদ ঠিক থাকে। দুর্বল ইসনাদের হাদীসের উপর ভিত্তি করে যেন কাউকে ইবাদাত করতে না হয় তা চিন্তা করেই আলিমগণ হাদীসের নিয়মনীতির ব্যাপারে এত কড়াকড়ি আরোপ করেন।

কিন্তু সীরাহর ক্ষেত্রে ব্যাপারটি এমন নয়। সীরাহকে ইতিহাসগ্রন্থ হিসেবে দেখা হয়, তাই হুকুম-আহকামের উপর এর কোনো প্রভাব থাকে না। যেহেতু সীরাহর উপর ভিত্তি করে কোনো হুকুম-আহকাম নির্ধারণ করা হয় না তাই এর নিয়মকানুনের ব্যাপারে সীরাহর রচয়িতাগণ এতটা কড়াকড়ি করেন না। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল, যিনি হাদীসশাস্ত্রের একজন আলিম ছিলেন, তিনি বলেছেন, 'যখন আমরা ইতিহাস নিয়ে কথা বলি তখন বেশ ছাড় দিই।' তাই দেখা যায় যে, সীরাহর রচয়িতাগণ এমন অনেক বর্ণনা সীরাহর অন্তর্ভুক্ত করেন, যেগুলো তাঁরা হাদীস হিসেবে হয়তো গ্রহণ নাও করতে পারেন। সুতরাং সীরাহ ও হাদীসের ক্ষেত্রে এটাই ছিল পূর্ববর্তী আলিমগণের গৃহীত পন্থা। সীরাত ইবন ইসহাক, সীরাতে ইবন সাদ সহ পূর্ববর্তী আলিমদের সীরাহ গ্রন্থগুলো এসব নিয়মকানুনের উপর ভিত্তি করেই লেখা হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু আলিম সীরাহ রচনার ক্ষেত্রে নতুন একটি ধারা সংযোজন করেছেন। তারা সীরাহর ক্ষেত্রেও হাদীসের নিয়ম প্রয়োগ করতে চান। এর পেছনে তারা যুক্তি দেখিয়েছেন, 'আমরা এমন একটি সময়ে বাস করছি যখন রাসূলুল্লাহর সীরাহ হলো আমাদের জন্য আহকামের অন্যতম একটি উৎস। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের সময় খিলাফাত প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাই কোনো হুকুম-আহকাম ধার্য করার জন্য তারা রাসূলুল্লাহর জীবনী অধ্যয়ন করতেন না, বরং তারা সীরাহ থেকে সাধারণ শিক্ষা লাভ করতেন, বিশেষ কোনো হুকুম বা মাসআলা নয়, কারণ দ্বীন ইসলাম তখন প্রতিষ্ঠিত অবস্থাতেই ছিল।'

কিন্তু বর্তমান সময়ে ব্যাপারটি ভিন্ন। কীভাবে দাওয়া করতে হবে, ইসলামকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে হলে কী কী পর্যায় অতিক্রম করতে হবে প্রভৃতি বিষয়াদি জানার জন্য অবশ্যই সীরাহ অধ্যয়ন করতে হবে। তাই সীরাহ একটি ফিকহশাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এ কারণে তারা বলেন যে হাদীসের নিয়মকানুনগুলো সীরাহর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা উচিত।

উদাহরণস্বরুপ, সহীহ সীরাহ আন নাব্যুওউয়াহ নামক বইটিতে হাদীসের নিয়মকানুন প্রয়োগ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থ, যেমন, বুখারি, মুসলিম, সুনান আবু দাউদ প্রভৃতিতে সীরাহ সম্পর্কিত যে হাদীসগুলো আছে সেগুলো একত্রিত করেছেন এবং এর উপর ভিত্তি করেই রাসূলুল্লাহর সীরাহ রচনা করেছেন। অর্থাৎ পূর্ববর্তী আলিমদের রচিত সীরাহ, যেমন, সীরাতে ইবন ইসহাক বা সীরাতে ইবন হিশাম ইত্যাদি থেকে সাহায্য নেওয়ার বদলে তারা বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থসমূহের সাহায্য নিয়েছেন। সাঈদ হাওয়া হাদীসের উপর ভিত্তি করে আল-আসাস ফীস সুন্নাহ নামক একটি বই লিখেছেন। এরকম আরও কিছু বই রয়েছে যেগুলো এই রীতি অনুসরণ করেছে।

এদিক দিয়ে ইবন কাসির অন্যান্য সীরাহ গ্রন্থ থেকে বেশ আলাদা, কারণ ইবন কাসির পূর্ববর্তী আলিমদের রচিত সীরাহর বই থেকে যেমন তথ্য সংগ্রহ করেছেন, ঠিক তেমনি হাদীসগ্রন্থগুলো থেকেও সাহায্য নিয়েছেন। তাই তাঁর বইয়ে যেমন বুখারি থেকে বর্ণিত হাদীস দেখা যায় তেমনি ইবন ইসহাক থেকে বর্ণিত বর্ণনাও দেখা যায়। এই বইয়ে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটকে মাথায় রেখে সীরাহ থেকে শিক্ষাগুলো প্রতিপাদন করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফন্ট সাইজ
15px
17px