📄 আমেরিকার অর্থব্যবস্থায় ইহুদি দৌরাত্ম্য
ইহুদিদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল শক্তিঘর প্রতিষ্ঠিত হয় রথসচাইল্ড পরিবারের হাত ধরে, সপ্তদশ শতাব্দীতে। এটি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুট শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও পরবর্তী সময়ে তা ইংল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এর সাথে যুক্ত হয় আরও কিছু পরিবার। তাদের আধিপত্যও কোনো অংশে কম নয়。
মূলত অর্থ-সম্পদের ভিত্তিতে গড়ে উঠে অর্থনীতি। আর তারই প্রাচুর্যতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে একটি দেশের রাজনৈতিক দল। তাই অর্থনীতির সাথে রাজনীতির সম্পর্ক খুবই গভীর। ইহুদি ব্যাংকাররা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন শাখা খোলার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর অদৃশ্য আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। এর ফলে তারা প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে কলকাঠি নাড়ার অনুমতি পেয়ে যায়। রথসচাইল্ড ছাড়া আরও যে চারটি পরিবার এই শিল্পে একচ্ছত্র ক্ষমতাবান, তাদের নাম হলো: Belmont (বেলমন্ট), Schiff (স্কিফ), Warburg (ওয়াবার্গ) এবং Kahn (খান)।
১৮৩৭ সালে আমেরিকায় রথসচাইল্ড পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করতে হাজির হন August Belmont। তার জন্ম জার্মানির ফ্রাঙ্কফুট শহরে। পরবর্তী সময়ে তার হাত ধরে জন্ম নেয় বেলমন্ট ব্যাংকিং পরিবার। ১৮৬০ থেকে ১৮৭২ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ন্যাশনাল ডেমোক্রেট কমিটির প্রধান সভাপতি。
দ্বিতীয় ব্যক্তিটি হলেন Jacob Schiff। তার জন্মও ফ্রাঙ্কফুট শহরে। জার্মানিতে বাবার ব্যাংকে দীর্ঘকাল শিক্ষানবিশ হয়ে কাজ করার পর ১৮৬৫ সালে তিনি আমেরিকায় প্রবেশ করেন। তার বাবাও ছিলেন রথসচাইল্ড পরিবারের বিশেষ একটি শাখার প্রতিনিধি। তার সংগঠনের হাত ধরে প্রচুর জার্মান মূলধন আমেরিকায় প্রবেশ করে। তার অর্থে তৈরি হয় অনেক নতুন নতুন রাস্তা-ঘাট, সেতু, মহাসড়ক, রেলপথ, উঁচু ভবন, বিমা প্রতিষ্ঠান ও টেলিগ্রাফ প্রতিষ্ঠান।
১৮৭৫ সালে Theresa Loeb-কে বিয়ে করার মধ্য দিয়ে তিনি Kuhn, Loeb & Company-এর প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন। জাপান-রাশিয়া যুদ্ধেও তিনি প্রচুর অর্থ জাপানের পক্ষে বিনিয়োগ করেন। ভেবেছিলেন এই বিনিয়োগের ছুতোতে হয়তো জাপানের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপের সুযোগ পাবেন, কিন্তু জাপান রাজা সতর্ক ব্যক্তি হওয়ায় ইহুদিদের ভাবগতি ভালো করেই জানতেন। তাই নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলিতে অন্যদের হস্তক্ষেপের ন্যূনতম সুযোগ দেননি।
Kuhn, Loeb & Company-এর সঙ্গে জড়িত আরেকজন ব্যক্তি হলেন Otto Herman Kahn। অন্যদের মতো তারও জন্ম ফ্রাঙ্কফুট শহরে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম' তৈরির পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে তিনি আমেরিকায় আগমন করেন। তখন থেকেই আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাকে আমেরিকায় নিয়ে আসার পেছনে গোপনে কাজ করেন Paul Warburg。
এরপর চলে আসে ওয়াবার্গ পরিবারের নাম। ১৯০২ সালে পরিবারটির অন্যতম সদস্য Paul Warburg আমেরিকায় আগমন করেন। তিনি ১৮৬৮ সালে জার্মানির হাম্বার্গ শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কিশোর বয়সেই রপ্ত করেন 'কীভাবে অর্থ (Money) তৈরি করতে হয়।' একটু চিন্তা করে দেখুন, যেখানে প্রাপ্ত বয়সেও অনেকে জানে না কীভাবে অর্থ উপার্জন করতে হয়, সেখানে তিনি কিশোর বয়সেই শিখে ফেলেছেন কীভাবে অর্থ তৈরি করতে হয়!
The Banking House of Warburg ১৭৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাই ছিল তার কিশোরকালীন বিদ্যালয়। ব্যাংকিং শিল্পে তিনি কীভাবে পারদর্শী হয়ে উঠেন, তা ৫ আগস্ট, ১৯১৪ সালে Banking and Currency Committee-তে নিজ মুখে স্বীকার করেন। তার পুরো বক্তব্য একজন শর্টহ্যান্ড লেখক লিপিবদ্ধ করেন। ১২ আগস্ট, ১৯১৪ তার পুরো বক্তব্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়। তার বক্তব্যের গুরত্বপূর্ণ অংশ নিচে উপস্থাপন করা হলো—
'হাম্বার্গ থেকে আমি ইংল্যান্ড চলে আসি। সেখানে Samuel Montague & Co-তে দুই বছর কাজ করি। এরপর দুই মাসের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানে শেয়ার অবলেখকের কাজ করি। শেখার চেষ্টা করি, কীভাবে শেয়ারবাজারকে পুরো দেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা যায় এবং তার সাথে ব্যাংকিং কার্যক্রম সংযুক্ত করা যায়।
এরপর যাই ফ্রান্সে। সেখানে একটি রাশিয়ান ব্যাংকের শাখায় কিছুদিন কাজ করি। কীভাবে বৈদেশিক বাণিজ্যের সাথে ব্যাংকিং কার্যক্রমকে সংযুক্ত করা যায়, তা শিখি। এরপর হাম্বার্গে ফিরে স্থানীয় একটি ব্যাংকে কিছুদিন কাজ করি। পাশাপাশি ভারত, চীন ও জাপানের একাধিক ব্যাংক পরিদর্শন করি।
১৮৯৩ সালে প্রথমবারের মতো আমেরিকায় আসি। কিছুদিন থেকে হাম্বার্গে ফিরে যাই এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করি। ১৯০২ সালে পুনরায় আমেরিকায় আসি এবং Kuhn, Loeb & Co-এর শেয়ারহোল্ডার হই।
এই হলো আমার পুরো ব্যাংকিং শিক্ষাজীবনের ইতিহাস। ১৮৯৫ সালে Solomon Loeb-এর কন্যা Nina Loeb-কে বিয়ে করে তাদের সাথে পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হই। এর মাধ্যমে আমি তাদের পরিবারিক প্রতিষ্ঠান Kuhn, Loeb & Co.-এর শেয়ারহোল্ডার হই।'
Mr. Loeb-এর অপর কন্যাকে বিয়ে করেন Jacob H. Schiff। এটা ইহুদিদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য যে, ব্যবসায় জোট মজুত করতে তারা পারিবারিক সম্পর্ককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এরপর Mr. Schiff তার কন্যা Frieda Schiff-কে বিয়ে দেন Felix Warburg-এর সাথে, যিনি Paul Warburg-এর আপন ভাই。
উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ট্রাস্ট কোম্পানি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল— মানুষের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ নিজেদের নিকট জমা রাখা এবং ওয়ারিশবিধি অনুযায়ী তা উত্তরাধিকারীদের নিকট বণ্টন করা। পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলোও মানুষকে ঋণ দেওয়ার কাজ শুরু করে। কিন্তু ১৯০৬ সালে ট্রাস্ট কোম্পানিগুলো জনগণের আস্থা একেবারে হারিয়ে ফেলে। প্রচুর মানুষ জমাকৃত সম্পদ হারিয়ে পথে বসে। ঘটনা শুরু হয় যখন Knickerbocker Trust Co. তাদের 'রিজার্ভ' হারিয়ে ফেলে। এ থেকে পুরো আমেরিকায় শুরু হয় অর্থনৈতিক বিক্ষোভ।
এই বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে মি. ওয়াবার্গ Defects and Needs of Our Banking System শিরোনামে একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করেন। তিনি আর্টিক্যালটি আরও আগেই লিখেছিলেন, কিন্তু প্রকাশ করেন ১৯০৭ সালে, যখন পুরো আমেরিকায় অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। তিনি জানতেন, ট্রাস্ট কোম্পানিগুলো খুব দ্রুত পথে বসবে। মূলত তারাই এই প্রতিষ্ঠানটির পতন ঘটিয়েছে, পুরো বিষয়টাই ছিল সাজানো নাটক!
তার আর্টিক্যালটি Senator Aldrich-এর চোখে পড়ে। তিনি তখন আমেরিকান সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পেশাদার জীবনে ছিলেন খুবই কর্মঠ। বিশ্বাস করতেন আমেরিকান জাতির উন্নয়নে। তবে তিনি ভাবতেন, এই উন্নয়ন কেবল ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমেই করা সম্ভব। তার সাথে রকেফেলার পরিবারেরও বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। তার মেয়ে Abby Aldrich-কে সেই রকেফেলার পরিবারের সদস্য John D. Rockefeller এর সঙ্গে বিয়ে দেন।
১৯০৬ সালে অর্থনৈতিক সংকট চরমে পৌছালে— Nelson Aldrich-কে এর সমাধান খোঁজার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি পরামর্শের জন্য Mr. Warburg-এর শরণাপন্ন হন। উভয়ে একটি গুপ্ত আলোচনার আয়োজন করেন, যার জন্য জর্জিয়ার নিকটবর্তী নির্জন দ্বীপ জ্যাকল আইল্যান্ডকে (Jekyl Island) বাছাই করা হয়। দ্বীপটি ছিল সম্পদশালী ইহুদিদের অবসর সময় কাটানোর জায়গা। এই গুপ্ত আলোচনার বিষয়বস্তু কী ছিল, তা আজ অবধি জানা সম্ভব হয়নি। ১৯১৬ সালে Forbes Magazine-এর লেখক B.C. Forbes এই গুপ্ত আলোচনাটি নিয়ে একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করেন, যার অংশবিশেষ নিচে উপস্থাপন করা হলো—
'কল্পনা করুন আমেরিকার প্রতাপশালী ব্যাংকারদের কথা, যারা বিশ্বস্ত কিছু সহকর্মীকে সাথে নিয়ে রাতের অন্ধকারে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ট্রেনে করে নিউইয়র্ক থেকে ১০০ মাইল দক্ষিণে কোনো একটি স্থানে নেমে যায় এবং সেখান থেকে এক সপ্তাহের জন্য একটি রহস্যেঘেরা দ্বীপে গমন করে। প্রথমবার মিলিত হয়ে তারা কেবল একবারের জন্য নিজেদের পরিচয় বিনিময় করেছে। পাছে ভয় হয়, যদি সাথে থাকা চাকরগুলো সবার পরিচয় জেনে যায়!
সবাই শপথ করে, জ্যাকল আইল্যান্ডে তাদের মাঝে যে আলোচনা হবে, তার উচ্ছিষ্ট অংশটুকু পর্যন্ত সাধারণ মানুষ জানতে পারবে না। Nelson Aldrich-এর নির্দেশে সবাই আলাদা আলাদা গাড়িতে উঠে যায়। তাদের জন্য আগে থেকেই গাড়ির ব্যবস্থা করা ছিল। গাড়িগুলো এমন একটি নির্জন প্লাটফর্মে রাখা হয়েছিল, যেন সাধারণ মানুষ বুঝতে না পারে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তারা সাউদার্ন কান্ট্রিতে হাজির হয়। অন্ধকার থাকাতে সেই দৃশ্য নিউইয়র্কের কোনো সাংবাদিকের চোখে পড়েনি।
গাড়ি থেকে বের হয়ে তারা ছোটো ছোটো কিছু নৌকায় উঠে পড়ে। তাদের আচরণ এমন ছিল, যেন নৌকার মাঝিরা পর্যন্ত বুঝতে না পারে— তারা আমেরিকার বিশিষ্ট ব্যক্তিভাজন!
সঠিক সময়ে তারা জ্যাকল আইল্যান্ডে এসে পৌঁছায়। দ্বীপটি ছিল জনশূন্য, সেখানে অর্ধডজন চাকর-বাকর ছাড়া আর কেউ-ই ছিল না। একে অপরকে জিজ্ঞেস করে, কীভাবে চাকরদের কাছ হতে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখা সম্ভব? একজন বলল— "চলুন, আমরা সবাই আমাদের নামের প্রথম শব্দটি দ্বারা একে অপরকে সম্বোধন করি।" সবাই এতে রাজি হলো।
ফলে আমেরিকার অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সৈনিকের নাম হয়ে যায় Nelson; আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার গুরু এবং Kuhn, Loeb & Co.-এর অন্যতম শেয়ার হোল্ডারের নাম হয়ে যায় Paul।
Nelson গোপনীয়তা রক্ষা করতে Harry, Frank, Paul ও Piatt-কে বলেন, যতদিন না তারা এমন একটি নকশা তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে— যা দ্বারা পুরো আমেরিকাকে একত্রিত করা সম্ভব— ততদিন এই দ্বীপে অবস্থান করবে। তিনি এমন একটি অর্থ ব্যবস্থার কথা জানতে চান, যা শুধু আমেরিকায় নয়; পুরো ইউরোপে গ্রহণ যোগ্যতা পাবে।'
সাত দিনে এই আলোচনা অনেক দূর গড়ায়। তবে যেসব বিষয়ের ওপর আলোচনা ও চুক্তি হয়, তার কোনো কিছুই আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গুপ্ত আলোচনায় বিশেষ চারটি পরিবারের সদস্যগণ ছাড়া আরও যারা উপস্থিত ছিলেন, তারা হলেন: Bernard Baruch, Eugene Meyer, Felix Frankfurter, Benjamin Strong, Julius Rosenwald, Henry Davison, Arthur Shelton ও Frank Vanderlip।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর E.R.A. Seligman নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর ১৯১৯ সালে একটি কলাম প্রকাশ করেন। নিচে এর অংশবিশেষ উপস্থাপন করা হলো—
'আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠনে Mr. Warburg-এর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। শুরুতে যদিও তার পরিকল্পনা কিছুটা দৃষ্টিকটু ছিল, তারপরও সময়ের সাথে সাথে তা আমেরিকার অর্থনীতির মূল গঠনতন্ত্রে পরিণত হয়। খুব দ্রুত তা প্রতিটি প্রদেশের ভিন্ন ভিন্ন অর্থব্যবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এর দরুন দীর্ঘকালীন অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও বাণিজ্যিক জটিলতা থেকে আমেরিকার মানুষ মুক্তি পায়।
১৮৪০ সালে Mr. Samuel Jones কর্তৃক উপস্থাপিত Peel's Bank Act-এর কল্যাণে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড যেমন নোট ইস্যুর অনুমতি পায়, তেমনি Mr. Warburg কর্তৃক উপস্থাপিত Federal Reserve Act আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নোট ইস্যুর অনুমতি প্রদান করে।
Senator Aldrich চেয়েছিলেন— ১২টি আঞ্চলিক শাখা অফিস নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠিত হবে এবং তা সরকারি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে, কিন্তু Warburg চেয়েছেন— ব্যাংকটি সম্পূর্ণ বেসরকারি মালিকানায় পরিচালিত হবে। তিনি বলেন— "সরকারি বা রাজনৈতিক থাবার ভেতর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কখনো প্রত্যাশিত ফলাফল উপহার দিতে পারে না। তাই এই ব্যাংক পরিচালনায় যে দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে, তা সরকারি আজ্ঞার বাহিরে থাকবে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদের বিনিময়ে ব্যাংক তার সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।" যেহেতু Aldrich-এর নিকট অপেক্ষাকৃত ভালো কোনো পরিকল্পনা ছিল না, তাই তিনি উপস্থাপিত দাবি দুটি মেনে নেন।
এটাই হয়তো শেষ প্রজন্ম, যারা বার্টার ট্রেডকে শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছে। এরপর এই সংস্কৃতি বাজার থেকে হারিয়ে যাবে। এর স্থলাভিষিক্ত হবে কাগজি নোটভিত্তিক বিনিময়ব্যবস্থা।' (pp. 387-390, Vol. 4, No. 4, Proceedings of the Academy of Political Science, Columbia University)
এটাই প্রথম ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়; ইউরোপে এমন আরও অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক আছে, যেগুলো ইহুদিদের ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। এ নিয়ে Mr. Warburg একটি প্রবন্ধ লিখেন— American and European Banking Methods and Bank Legislation Compared। সেখানে উল্লেখ করেন—
'শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও ইউরোপের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে রাষ্ট্র বা সরকারের কোনো শেয়ার নেই। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তো পুরোটাই ব্যক্তি মালিকানাধীন। ফ্রান্স ও জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটিতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন সামান্য অধিকার চর্চার সুযোগ পেলেও এর পুরো লভ্যাংশ বণ্টিত হয় ব্যক্তি মালিকদের মাঝেই।'
সেখানে তিনি বেশ কিছু ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাধারণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে, তা Federal Reserve Act-এ অন্তর্ভুক্তির জন্য জোর দাবি তোলেন। বৈশিষ্ট্যগুলো পয়েন্ট আকারে দেখানো হলো—
• কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না।
• রাষ্ট্রীয় নোট ছাপানোর অধিকার কেবল তাদের হাতেই থাকবে।
• জাতীয় সম্পদ (স্বর্ণ-রৌপ্য) সংরক্ষণের অধিকার থাকবে।
• অর্থ বাজারের পরিচালনায় সরকার-প্রশাসন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করবে。
বলে রাখা ভালো, ১৮৩৩ হতে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত আমেরিকার ইতিহাসে কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছিল না। ১০ জুলাই, ১৮৩২ প্রেসিডেন্ট Andrew Jackson একটি দীর্ঘ বক্তৃতা প্রদান করেন। তিনি বলেন—
'সাধারণ মানুষ যদি ব্যাংকিং ও অর্থ ব্যবস্থার কারচুপি সামান্য হলেও বুঝতে পারত, তাহলে পরদিন ভোরেই মহাবিপ্লবের জন্ম হতো। ব্যাংক নামক বিষধর সাপটি যতই বিষাক্ত হোক না কেন, মহান ঈশ্বরকে সাথে নিয়ে আমি তার বিষদাঁত তুলে ছাড়ব। আমি জানি, তারা আমাকে দংশনের অপেক্ষায় ওত পেতে আছে, কিন্তু আমিই তাদের দংশন করব।'
১০ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক অব আমেরিকাকে বন্ধ ঘোষণা করেন। ব্যাংকটির আরও একটি নাম ছিল 'ফার্স্ট ব্যাংক অব আমেরিকা'। এরপর দীর্ঘ ৮০ বছর আমেরিকায় কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছিল না; তবে ইহুদিদের পরিকল্পনার অন্ত ছিল না。
আশা করি, Mr. Taft-এর কথা আপনাদের মনে আছে। তিনি শুধু রাশিয়ানদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাই নয়; অবান্তর কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠারও অনুমোদন দেননি। তাই পরবর্তী নির্বাচনকাল পর্যন্ত ইহুদিদের অপেক্ষা করতে হয়। ১৯১২ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে লড়াই করেন Roosevelt, Taft ও Wilson। যেহেতু এক ঝুড়িতে তারা সব ডিম রাখে না, তাই সকল প্রার্থীর পেছনেই তারা বিনিয়োগ করে। Wilson সাহেবের পেছনে বিনিয়োগ করে Schiff; Taft সাহেবের পেছনে Felix Warburg; Roosevelt-এর পেছনে Mr. Kahn। সবশেষে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন Woodrow Wilson।
ক্ষমতায় এসে Wilson সরকার ইহুদিদের বিনিয়োগ ও প্রচারণা কাজের পুরস্কারস্বরূপ ফেডারেল রিজার্ভ অ্যাক্টকে অনুমোদন করে এবং উত্থাপিত সকল শর্ত মঞ্জুর করে। ব্যাংকটি যেহেতু ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হবে, তাই এর প্রারম্ভিক রিজার্ভ যে শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগকৃত সম্পদেই গঠিত হবে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এই রিজার্ভ কী দিয়ে তৈরি হবে? এ সম্পর্কে সিনেটের একটি আলোচনায় Pomerene ও Bristow যৌথভাবে Mr. Warburg-কে প্রশ্ন করেন।
প্রশ্ন: 'ফেডারেল ব্যাংকের রিজার্ভ কী দিয়ে তৈরি হবে?'
উত্তর: 'এই ব্যাংকের রিজার্ভ স্বর্ণ-রৌপ্য দ্বারা তৈরি হবে।'
কিন্তু যে স্বর্ণ-রৌপ্যের কথা এখানে বলা হয়েছে, তা তো ইউরোপের বিভিন্ন ব্যাংকগুলোতে পড়ে আছে। সেখান থেকে সেগুলোকে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে আসতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন একটি যুদ্ধ। কয়েক মাস পর ১ আগস্ট, ১৯১৪। Senator Owen ঘোষণা করেন— 'আমরা একটি বড়ো ইউরোপিয়ান যুদ্ধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি'। বহিঃরাষ্ট্রের সম্পদ গ্রাসের নিমিত্তে এটা ছিল প্রথম যুদ্ধের ইঙ্গিত।
শুরুতে তিনি চেয়েছিলেন— ব্যাংকটির একটিমাত্র অফিস থাকবে এবং তা নিউইয়র্কে। প্রফেসর Seligman তাকে পরামর্শ দেন— 'নিউইয়র্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাধারণ জনগণ এমনিতেই ক্ষেপে আছে। তার ওপর এখানে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা পায়, তবে তা রাজনৈতিক জনরোষে রূপ নিতে পারে। এমতাবস্থায় ব্যাংকটির শাখা বৃদ্ধি করা উচিত।' তার পরামর্শ অনুযায়ী ব্যাংকটিকে ২টি, ৪টি ও ৮টি করে মোট ১২টি শাখায় বৃদ্ধি করা হয়।
সিনেট সদস্যদের আলোচনায় তিনি বলেন— 'ব্যাংকটির এতগুলো শাখা থাকায় ব্যবস্থাপনা কাজ জটিল হয়ে পড়বে। তাই এর একটি ব্যবস্থাপনা পর্ষদ থাকা উচিত, যা নিউইয়র্কে স্থাপিত হবে এবং সেখান থেকেই সকল শাখা পরিচালিত হবে।' Nelson Aldrich পুরো দেশকে একই অর্থ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার প্রস্তাব করেন, যেন সর্বত্র সুদের হার সমান হয়। কিন্তু Mr. Warburg বলেন— 'অবস্থান ও প্রয়োজনের আলোকে ব্যাংকের প্রতিটি শাখা পৃথক পৃথক সুদ-কাঠামো অনুসরণ করতে পারে।'
এ কারণে দেখা যায়— থিয়েটার, সিনেমা হল ও সংগীত বিপণি তৈরিতে প্রডিউসাররা স্বল্প সুদে ঋণ পেলেও কৃষক-রাখালদের উচ্চসুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। যেখানে সমাজের সংখ্যালঘু একটি দল অর্থের পাহাড় বানিয়েই যাচ্ছে, সেখানে জনসংখ্যার বৃহৎ একটি অংশ নিজেদের সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসছে। ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখবেন, কেবল উৎপাদনমুখী খাতগুলোর ওপর উচ্চ সুদের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর যেগুলো অনুৎপাদনশীল এবং নোংরা সংস্কৃতির জন্ম দেয়, সেগুলোতেই সুদের হার নগণ্য। কেন এই বৈষম্য? এই বৈষম্যের পেছনে কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে? আশা করি, Protocol of the Learned Elder Zion-এর একটি ধারা আপনাদের মনে আছে— 'জ্যান্টাইলদের ভূমিশূন্য করতে হবে; নতুবা তাদের ওপর চির দারিদ্র্যতা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।'
আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নিয়ে ইহুদিদের পরিকল্পনা
'ইহুদিরা ব্যাংকিংশিল্পে খুবই দক্ষ। তাদের মতো আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং জোট গোটা পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। এই জোট এতটা ভয়ংকর যে, ইহুদিরা একদিন গোটা বিশ্ব অর্থনীতির লাগাম টেনে ধরবে।'— Arthur Brisbane
ইহুদিদের সবচেয়ে বড়ো শক্তি হলো আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে তারা পুরো পৃথিবীর অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। বর্তমানে তাদের পুরো ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু জার্মানির ফ্রাঙ্কফুটে অবস্থিত, তবে তা খুব দ্রুতই অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। যে স্বর্ণ (Gold) ইহুদিদের কাছে ঈশ্বরের সমতুল্য, যাকে তারা God of the living বলে সংজ্ঞায়িত করে থাকে, আজ তারা সেই স্বর্ণ জাহাজে বোঝাই করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমেরিকায় নিয়ে আসছে। ইহুদিরা এটা ভেবে খুব ভীত যে, ইউরোপে হয়তো খুব দ্রুতই আরও একটি ভয়ংকর রক্তাক্ত যুদ্ধ সংগঠিত হবে। তাই সময় থাকতে ইহুদিরা অন্যত্র সরে পড়তে শুরু করেছে এবং নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আমেরিকাকে বেছে নিয়েছে।
প্রতিটি দেশেই ইহুদিদের একটি করে ব্যাংক থাকতেই হবে, এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এর বিপরীতে ইহুদিরা এমন একটি প্রক্রিয়া চালু করবে, যার মাধ্যমে পুরো পৃথিবীকে একটি মাত্র কেন্দ্রবিন্দু থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। সেই প্রক্রিয়ার নাম হবে— 'World Banking Chain' ।
যদি আপনি Warburg, Furstenbergs, Sonnenscheins, Sassoons, Samuels ও Belichroeders-এর মতো ইহুদিদের জীবন ইতিহাস ভালো করে অধ্যয়ন করেন, তবে এই বিষয়টি পরিষ্কার বুঝতে পারবেন। যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ে অর্থ জালিয়াতি নিয়ে তাদের আধিপত্যের কোনো কমতি ছিল না। এ সকল কর্মকাণ্ড নিয়ে এই মস্তিষ্ক বিকৃত পাগলদের আবার গর্বেরও কোনো শেষ নেই। তারা বলে— 'আমাদের শক্তি-সামর্থ্যের পরিধি কতটা ব্যাপক, আশা করি তা আজ পুরো পৃথিবী উপলব্ধি করতে পেরেছে। তারা এটাও বুঝতে সক্ষম হয়েছে, আমাদের বাদ দিয়ে কখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।'
Protocols of the Learned Elder Zion-এর ষষ্ঠ তম প্রটোকলে বলা আছে— 'খুব দ্রুতই আমরা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করব। সেখান থেকে তৈরি করব বিশাল সম্পদের আধার। জ্যান্টাইলদের প্রতিটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মূল ভিত্তি হবে আমাদের অর্থ-সম্পদ। প্রতিটি রাষ্ট্র ও তার রাজনৈতিক দলগুলোকে আমরা ঋণের বেড়াজালে বেঁধে ফেলব। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো পতনের সাথে সাথে পুরো ঋণের বোঝা দেশের সাধারণ জনগণের কাঁধে গিয়ে পড়বে, সেখান থেকে নেমে আসবে এক ভয়ংকর অর্থনৈতিক বিপর্যয়।'
একই প্রটোকলের অপর একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— 'একই সময়ে ব্যবসায়-বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণে আমরা জ্যান্টাইলদের আগ্রহী করে তুলব। তবে সবকিছুর পেছনে থাকবে আমাদের ফটকা পরিকল্পনা, যেন তারা ইচ্ছেমতো উৎপাদন করতে না পারে। আমরা তাদের ঋণের পৃথক পৃথক খাত এবং ফসল উৎপাদনের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেবো। ফলে তারা চাইলেও অধিক উৎপাদন করতে পারবে না এবং ঋণের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না...। এভাবে একটা সময় তাদের ভূমিগুলো আমাদের মালিকানায় চলে আসবে। সমাজে ক্ষুধা-দরিদ্রতা ছড়িয়ে দিতে জ্যান্টাইলদের অপ্রয়োজনীয় বিলাসবহুল জীবনব্যবস্থায় উৎসাহী করে তুলব, যা তাদের মস্তিষ্ক থেকে বুদ্ধিবৃত্তি নামক বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে মুছে দেবে। আমরা শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে উৎসাহিত করব, কিন্তু এতে শ্রমিকদের ন্যূনতম কোনো উপকার হবে না। কারণ, একই সময়ে আমরা বাজারে পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দেবো এবং বলব— এ বছর ফসল কম উৎপাদন হয়েছে। আমরা উৎপাদনমুখী কৃষকদের দক্ষতা ধ্বংস করার জন্য তাদের অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন শিল্প কার্যক্রমের প্রতি উৎসাহিত করব এবং অ্যালকোহলের প্রতি নেশাগ্রস্ত করে রাখব।'
২০ নম্বর প্রটোকলে বলা হয়েছে— 'আজ তোমাদের এমন এক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথা বলতে যাচ্ছি, যা প্রতারণা ছাড়া অন্য কিছু নয়, আর এটাই আমরা জ্যান্টাইলদের ওপর চাপিয়ে দেবো। তোমরা সবাই জানো, স্বর্ণ-রৌপ্যই পৃথিবীর প্রকৃত অর্থ, যা হাজার হাজার বছর পৃথিবীর বিভিন্ন রাজ্যে একমাত্র বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। যখনই কেউ এই অর্থব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কিছু করার চেষ্টা করেছে, ধীরে ধীরে তাদের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা বাজার হতে স্বর্ণ-রৌপ্য সরিয়ে দিয়ে মানুষের হাতে নকল অর্থ ধরিয়ে দেবো।'
'প্রতিটি ঋণ একজন সরকারের অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে, যা রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে ধ্বংসের জন্য যথেষ্ঠ। এমতাবস্থায় সরকার জাতীয় দায় থেকে বেরিয়ে আসতে জনগণের ওপর একের পর এক করের বোঝা চাপিয়ে দিতে শুরু করবে। বৈদেশিক ঋণ হলো রক্তচোষা জোঁকের মতো। এটা একবার যদি কোনো রাষ্ট্রের ওপর আঁকড়ে বসে, তবে সমস্ত রক্ত খেয়ে তবেই ছাড়বে। তারপরও জ্যান্টাইল রাষ্ট্রগুলো বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করবে এবং একে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র উপায় বলে বিবেচনা করবে।'
২০ নম্বর প্রটোকলে আরও বলা আছে— 'বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের পরবর্তী প্রভাব কী? বন্ডের বিনিময়ে ঋণ গ্রহণ করলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর তা সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে। যদি পাঁচ শতাংশ সুদের বিনিময়ে কোনো রাষ্ট্র ঋণ নেয়, তবে বিশ বছরে সুদের পরিমাণ হবে আসল অর্থের সমান; চল্লিশ বছরে হবে আসল অঙ্কের দ্বিগুণ, আর ৬০ বছরে হবে তিনগুণ! ফলে ক্রমবর্ধমান সুদের দায় থেকে কোনোদিনই বেরিয়ে আসতে পারবে না।'
আফসোসের বিষয় হলো— অধিকাংশ মানুষ এই নিগুঢ় সত্যগুলো একেবারেই জানে না। প্রতিবছর এত এত কর পরিশোধের পরও জাতীয় দায় থেকে আমরা মুক্তি পাই না। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত ডলার ছাপানো হয়েছে, তার সব যদি ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তারপরও পুরো পৃথিবীর দায় মেটানো সম্ভব নয়।
Protocols of the Learned Elder Zion মূলত রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যকে উপড়ে ফেলার জন্য তৈরি করা হয়। কিন্তু তাদের এই নীলনকশা কেবল রাশিয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকেনি; ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পৃথিবীতে। করব্যবস্থাকে (Tax) কেন্দ্র করে ইহুদিদের যে পরিকল্পনা, তা সংক্ষেপে নিচে উপস্থাপন করা হলো:
১. 'শাসকশ্রেণিতে পরিণত হওয়ার পর আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে সাধারণ জনগণের ওপর আমরা করের বোঝা চাপিয়ে দেবো। এতে সীমিত আয়ের মানুষ প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তুলতে পারবে না। আর এই কাজটা আমাদের করতে হবে না; বরং প্রতিটি দেশের সরকারই নিজ দায়িত্বে এই কাজ করে দেবে। রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও প্রশাসনিক খরচ বহনের নামে তারা নিয়মিত জনগণের থেকে কর আদায় করবে, যার দরুন সাধারণ মানুষ চিরকাল গরিব থেকে যাবে।
২. বিভিন্ন উপায়ে কর আরোপ করা যেতে পারে। যেমন: ক. Progressive Tax : এ প্রক্রিয়ায় আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে করের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। খ. পৈতৃক সম্পদের ওপর কর : পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সম্পদ ব্যবহার করে কেউ যদি উপার্জন করে, তবে তার ওপর কর আরোপ করা হবে। যেমন: মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে বাড়ির মালিকগণ বাসা ভাড়ার ওপর কর প্রদান করবে। গ. মালিকানাস্বত্ব হস্তান্তরের ওপর কর : সম্পদ হস্তান্তরের সময় খরচ (Fee) প্রদান করতে হবে। ঘ. Luxury Tax : সৌখিন পণ্যসামগ্রী ক্রয়ের সময় শুল্ক প্রদান করতে হবে। যেমন: গাড়ি, বিমান, জাহাজ ইত্যাদি।'
আপনাদের প্রশ্ন জাগতে পারে, এত সব তথ্য আমরা কেন জানি না? কেন আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্থব্যবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তিকর সব বিষয় শেখানো হচ্ছে? এ প্রসঙ্গে Elder Zion-এর ৮ নম্বর প্রটোকল দিয়ে এই অধ্যায়টি শেষ করছি— 'আমরা বিশ্বজুড়ে একগাদা অর্থনীতিবিদের জন্ম দেবো, যারা পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে সরকার প্রধানের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবে। অর্থবিজ্ঞান আমাদের প্রধানতম অস্ত্র।'
আদর্শ অর্থের বৈশিষ্ট্য
মানুষ আমৃত্যু যে জিনিসটির পেছনে অধিকাংশ সময় ব্যয় করে তা হলো— অর্থ। অর্থ থেকে জন্ম নেয় অর্থনীতি। কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়, অর্থের সংজ্ঞা কী? দেখা যাবে অনেকে এর সঠিক উত্তর দিতে পারছে না। ডলার, টাকা, রুপি, রিয়াল ইত্যাদি বহুকাল আমাদের চোখে অর্থ বলে পরিচিত হয়ে আসছে; যদিও এগুলো হলো 'কারেন্সি', যা তৈরি হয় বাতাস থেকে। আমাদের অবচেতন মন 'অর্থ ও কারেন্সি' বিষয় দুটি এক করে ফেলেছে, কিন্তু তা এক নয়। এমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, যা দ্বারা বিষয় দুটির মাঝে পার্থক্য গড়ে তোলা সম্ভব। ইতিহাস অধ্যয়ন করলে তিন ধরনের উপকরণ পাওয়া যাবে, যেগুলো বিভিন্ন যুগে অর্থ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যথা: স্বর্ণ-রৌপ্য, কাগজি নোট এবং ভোগ্য পণ্য।
তিনি বইটিতে আদর্শ অর্থের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করেছেন:
১. গ্রহণযোগ্য বিনিময় মাধ্যম: বিনিময় মাধ্যম বলতে একটি তৃতীয় মাধ্যমকে বোঝানো হয়, যা দ্বারা ক্রেতা-বিক্রেতারা তাদের লেনদেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারে। একসময় মানুষ বার্টার ট্রেড পদ্ধতিতে পণ্যের বিপরীতে পণ্য বিনিময় করত, যেমন: দুধের বিপরীতে ডিম, আটার বিপরীতে চাল ইত্যাদি। সেখানে তৃতীয় কোনো মাধ্যম ছিল না। এরপর এক যুগ আসে যখন মানুষ স্বর্ণ-রৌপ্য ও মূল্যবান ধাতব পদার্থকে তৃতীয় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা ব্যবহার করছি কাগজি নোট ও মুদ্রা। এভাবে গড়ে উঠে গ্রহণযোগ্য বিনিময় মাধ্যম এবং অবসান ঘটে বার্টার ট্রেড পদ্ধতির।
২. মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা: বার্টার ট্রেডের একটি বড়ো সমস্যা হলো মূল্য নির্ধারণে অপারগতা। এ কারণে সে যুগের বাণিজ্য একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর আসে স্বর্ণ-রৌপ্য ভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় স্বর্ণ-রৌপ্যকে ওজনের মানদণ্ডে হিসাব করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হতো। তবে প্রতিবারের লেনদেনে স্বর্ণ-রৌপ্য ওজন করা ছিল এক বিরক্তিকর বিষয়। তাই খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দে লিডিয়ার রাজা আলিয়াত (Alyatte) প্রথমবারের মতো ধাতব কয়েন (Coin) তৈরি করেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ, রৌপ্য এবং আরও কিছু ধাতব পদার্থের সংমিশ্রণে তৈরি হতো সে মুদ্রা। বলা হয় এ মুদ্রাই ছিল ইতিহাসে প্রথম জন্ম নেওয়া অর্থ (Money)। বর্তমানে আমরা বিনিময় মাধ্যম হিসেবে কাগজি নোট ব্যবহার করছি। এগুলো দিয়েও পণ্যের মূল্য সহজে নির্ধারণ করা সম্ভব।
৩. হিসাবের একক: হিসাবের একক দ্বারা পরিমাপককে বোঝানো হয়। যেমন: দূরত্ব পরিমাপের একক মিটার, কিলোমিটার, ইঞ্চি বা মাইল। ওজন পরিমাপের একক আউন্স, গ্রাম বা কিলোগ্রাম। পৃথিবীর সর্বত্র এই পরিমাপকগুলো সর্বজনীন স্বীকৃত। কিন্তু টাকা, ডলার, রুপির ক্ষেত্রে সর্বজনীন স্বীকৃত কোনো পরিমাপক নেই। যেমন: এক টাকা বা এক রুপি কখনো এক ডলারের সমান হতে পারে না। কারণ, এগুলোর মূল্য সর্বদা পরিবর্তনশীল। তবে স্বর্ণ-রৌপ্য পরিমাপে এ জাতীয় কোনো সমস্যা হয় না। কারণ, ১০০ গ্রাম স্বর্ণ বা রৌপ্যের ওজন পৃথিবীর সর্বত্রই সমান। ভোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমন। যেমন: এক কেজি আটার ওজন পৃথিবীর সব স্থানে একই হবে। এ ক্ষেত্রে ভোগ্য পণ্যকেও অর্থের সংজ্ঞা নির্ধারণে বিবেচনা করা যেতে পারে।
৪. বিভাজনযোগ্য (খুচরা যোগ্যতা): ১,০০০ টাকার একটি নোটকে ৫০০, ২০০, ১০০, ৫০ ইত্যাদি আকারে খুচরা করা সম্ভব। একইভাবে এক কেজি স্বর্ণ বা রৌপ্যকে ৫০০, ১০০, ৫০ বা ২০ গ্রামে বিভক্ত করা সম্ভব। ভোগ্য পণ্যের বেলাও ওজন দ্বারা বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা সম্ভব। বিভাজনযোগ্যতার বড়ো সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে পণ্যের মূল্য সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব। এটি লেনদেন ও বিনিময় কাজে দারুণ গতীশীলতা নিয়ে আসে।
৫. মূল্যের স্থিতিশীলতা: এটি দ্বারা বোঝানো হয় অর্থের ক্রয় ক্ষমতা সহজে পরিবর্তিত হবে না। উদাহরণস্বরূপ: আপনি ৪০ হাজার টাকা দিয়ে আজ যে পরিমাণ চাল ক্রয় করতে পারছেন, আগামী ১০ বছর পর সে পরিমাণ চাল আর ক্রয় করতে পারবেন না। কারণ, নিয়মিত মুদ্রাস্ফীতির দরুন বাজারের প্রতিটি মুদ্রা হারাচ্ছে তাদের ক্রয়ক্ষমতা। আধুনিক অর্থব্যবস্থায় পৃথিবীর প্রতিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর এবং বিশেষ সব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে বড়ো পরিমাণে নতুন নোট ইস্যু করে থাকে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় Quantitative Easing (QE)। এটি বাজারে নতুন মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি করে চলমান মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও পণ্যমূল্য স্থিতিশীল বা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। অপরদিকে, স্বর্ণ-রৌপ্য যেহেতু চাইলেই উৎপাদন করা যায় না, সেহেতু এ বাজারে স্বর্ণস্ফীতি বা রৌপ্যস্ফীতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তা ছাড়া বিভিন্ন খনি থেকে প্রতি বছর নতুন যে পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য অর্থবাজারে যুক্ত হয়, তার পরিমাণ এতটাই নগণ্য যে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড়ো রকমের কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। বলে রাখা উচিত বর্তমান বাজারে স্বর্ণ-রৌপ্য মূল্যের প্রতিনিয়ত যে উঠানামা, এর মূল কারণ তাদের কাগজি নোটের বিপরীতে মূল্যায়িত করা হচ্ছে। যেহেতু কাগজি নোটগুলো প্রতিনিয়ত তাদের ক্রয় ক্ষমতা হারাচ্ছে, সেহেতু ভোগ্যপণ্যের ন্যায় স্বর্ণ-রৌপ্যের মূল্যও উঠানামা করছে। পচনশীল বৈশিষ্ট্যের দরুন অধিকাংশ ভোগ্যপণ্যকে দীর্ঘকাল সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু পণ্য আছে যাদের তুলনামূলক বেশি দিন সংরক্ষণ করা সম্ভব। যেমন: লবণ, চিনি, মধু ইত্যাদি। এ কারণে রোমান ও তুর্কি সাম্রাজ্যের সামরিক বাহিনীতে প্রতি মাসের বেতনের সাথে কিছু পরিমাণ ভোগ্যপণ্যও প্রদান করা হতো, যা রেশন নামে পরিচিত; বিষয়টি আজও অনেক রাষ্ট্রে চলমান।
৬. স্থিতিশীল বিনিময় হার: বিনিময় হারের উঠানামা মুদ্রা বাজারের একটি নিয়মিত চিত্র। বিনিময় হারের এই উঠানামা কতটা হুমকিস্বরূপ, তা ব্যবসায়ী সম্প্রদায় খুব ভালো করে জানে। ১৯৭১ সালে ব্রেটন উডস চুক্তিনামা রহিত হলে বিনিময় হার নির্ধারণের স্থিতিশীল প্রক্রিয়া একেবারে ভেঙে পড়ে। কিন্তু স্বর্ণ-রৌপ্যভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় এমনটা ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই। লিডিয়ার পর গ্রিক, রোমান, জেরুজালেমসহ আরও অনেক অঞ্চলে ধাতব মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। সে সকল মুদ্রায় স্বর্ণ ও রৌপ্যের পরিমাণ নির্দিষ্ট থাকত বলে তাদের বিনিময় নির্ধারণে কোনো জটিলতা হতো না। যেমন ধরুন, গ্রিকরা তাদের ধাতব মুদ্রায় ব্যবহার করছে ৫০% স্বর্ণ এবং রোমানরা সেখানে ব্যবহার করছে ৭৫% স্বর্ণ। এমতাবস্থায় ৩টি গ্রিক মুদ্রার সমান হবে ২টি রোমান মুদ্রা। বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ছিল বলে আজকের মতো অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থা না থাকলেও সে যুগের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্বময় পরিব্যাপ্তি লাভ করেছিল।
৭. নিজস্ব উপযোগ: যেকোনো ভোগ্য পণ্যের প্রধান উপযোগ হলো ক্ষুধা মেটানোর ক্ষমতা। এমন নয় যে এই উপযোগিতা কৃত্রিম বা সরকারি অধ্যাদেশে তৈরি হয়েছে। কিন্তু কাগজি নোটভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থায় প্রতিটি মুদ্রার উপযোগ সরকারি অধ্যাদেশে তৈরি হয়। যতদিন এগুলো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধীনে থাকবে, ততদিন কাগজি নোটগুলোর জীবন থাকবে। মনে করুন, আপনার অ্যাকাউন্টে পাঁচ লাখ রুপি আছে। কিছুদিন পর চীন এসে ভারত দখল করল এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে রুপিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। যদি না নতুন সরকার পুরাতন রুপিগুলোকে নতুন ইস্যু করা মুদ্রার সাথে পালটে নেওয়ার সুযোগ দেয়, তবে সে রুপির আর কোনো মূল্য থাকবে না। যেমন: সাদ্দাম সরকার পতনের পর সেখানে নতুন দিনারের নোট প্রিন্ট করা শুরু হয়। ফলে পূর্বের বিপুল পরিমাণ ইরাকি দিনারের আর কোনো মূল্য ছিল না। সাধারণ মানুষ কিছু পরিমাণ পুরোনো নোট ব্যাংকে গিয়ে পালটে আনার সুযোগ পেলেও বড়ো একটি অংশ রাস্তায় ফেলে দেয়। আরেকটি উদাহরণ হলো, মোদি সরকার যখন ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট মাসখানেকের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে, তখন নোট দুটিও সাময়িক সময়ের জন্য তাদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কেউ আধিপত্য বিস্তার করুক বা সরকারি অধ্যাদেশে যে পরিবর্তনই আসুক না কেন, স্বর্ণ-রৌপ্য এবং ভোগ্যপণ্যের উপযোগিতায় কোনো পরিবর্তন আসবে না।
৮. সহজ পরিবহনযোগ্যতা: কাগজি নোট বা স্বর্ণ-রৌপ্যকে আপনি চাইলে এক স্থান থেকে অন্যত্র বহন করতে পারেন। যেহেতু স্বর্ণ-রৌপ্য কাগজি নোটের চেয়ে অধিক মূল্য ধরে রাখতে পারে, সেহেতু স্বর্ণ-রৌপ্যই বেশি কার্যকর। তবে ইলেক্ট্রনিক কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে আজ অনেকেই কাগজি নোট পরিবহনের ঝামেলা কাটিয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতি স্বর্ণ-রৌপ্যভিত্তিক অর্থব্যবস্থায়ও প্রয়োগ করা সম্ভব।
এই হলো আদর্শ অর্থের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য। এখানে অর্থ হিসেবে তিনটি উপকরণকে বিবেচনায় আনা হয়েছে: স্বর্ণ-রৌপ্য, কাগজি নোট ও ভোগ্যপণ্য। লক্ষ করুন, এমন কোন উপকরণটি আছে, যার মধ্যে আদর্শ অর্থের সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান? অবশ্যই তা স্বর্ণ-রৌপ্য। ঠিক এ কারণে হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন সম্রাজ্যে এটিই ছিল একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিনিময়ের মাধ্যম। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনালগ্নেও স্বর্ণ-রৌপ্যকে কাগজি নোট ছাপানোর মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের আধিপত্য বিস্তারের গল্প
মাত্র ১০০ বছর আগেও পৃথিবীর বৃহৎ অংশ জুড়ে ছিল স্বর্ণ-রৌপ্য ভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থার ব্যাপক প্রচলন। যেমন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা বিনিময় মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা ব্যবহার করত। তা ছাড়া ১৮৮০-১৯১৪ এবং ১৯৪৬-১৯৭১ সাল পর্যন্ত ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ স্বর্ণ-রৌপ্যকে বাণিজ্যিক কাজে অর্থের মূল্য নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করত। অর্থাৎ প্রতিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে পরিমাণ ধাতব মুদ্রা বা কাগজি নোট ছাপাক না কেন, তার বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য মজুত করত এবং তা দ্বারা আন্তর্জাতিক বিনিময় হার নির্ধারণ করত। যেমন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত ব্রিটেন ও আমেরিকা যথাক্রমে প্রতি ৪.২৫ পাউন্ড এবং ২০.৬৭ ডলার ইস্যুর বিপরীতে মজুত রাখত ১ আউন্স পরিমাণ স্বর্ণ। ফলে ১ পাউন্ড সমপরিমাণ ছিল ৪.৮৬ ডলার। এই পুরো সময়টিকে বলা হতো ক্লাসিকাল গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের (Classical Gold Standard) যুগ। এ সময় মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য।
প্রকৃতির প্রতিটি গঠন উপাদানের যেমন নিজস্ব একটি চক্র রয়েছে, অর্থ ব্যবস্থাও তার ব্যতিক্রম নয়। সেই চক্রের মূল নিয়ামক হলো স্বর্ণ-রৌপ্য। শুনে বিস্মিত হবেন, বতর্মান কাগজি নোটভিত্তিক অর্থব্যবস্থা তার জীবনের শেষ যুগে এসে পৌঁছেছে। খুব দ্রুত শুরু হতে যাচ্ছে ইলেক্ট্রনিক কারেন্সির যুগ। এই চক্র শেষ হলে পুনরায় ফিরে আসবে স্বর্ণ-রৌপ্যের যুগ।
কিছু বিষয় ছোটোকাল থেকে আমাদের মনে গেঁথে আছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের পক্ষে কাজ করে, তাই এটি সরকারি ব্যাংক। এই ব্যাংক নিজ ইচ্ছায় নোট ছাপাতে পারে না। এ জন্য তাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য মজুদ করতে হয় এবং বিশ্বব্যাংক থেকে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু আগের দুটি অধ্যায় উপস্থাপন করা হয়েছে, পৃথিবীতে বহু কেন্দ্রীয় ব্যাংক রয়েছে, যা ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে সরকার বা সাধারণ মানুষের অধিকার চর্চার কোনো সুযোগ নেই।
২৩ ডিসেম্বর ১৯১৩, প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের মন্ত্রিসভা ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমকে (সংক্ষেপে ফেড) আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে অনুমোদন দেয়। সেই সঙ্গে ব্যাংকটিকে ডলার ছাপানো এবং আমেরিকার অর্থনীতি পরিচালনার একচ্ছত্র অধিকারও প্রদান করা হয়। কিছুদিন পর সরকারি অধ্যাদেশে ডলার ব্যতীত অন্য সব বিনিময়মাধ্যম নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু নতুন এই কারেন্সির ওপর আমেরিকার সাধারণ মানুষ বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছিল না। কারণ, মাত্র কয়েক বছর আগে ট্রাস্ট কোম্পানি কেলেঙ্কারির দরুন হাজারো মানুষ তাদের সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছিল। ফলে শুরু থেকেই সবাই ডলারকে এড়িয়ে চলতে লাগল এবং স্বর্ণ-রৌপ্যকে বিনিময় মাধ্যম হিসেবে অধিক প্রাধান্য দিতে থাকল।
বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে, ফেড ডলারের মূল্য ঘোষণা করে— ১ আউন্স স্বর্ণ = ২০ ডলার। অর্থাৎ প্রতি ১ আউন্স স্বর্ণের বিপরীতে ফেড ২০ ডলার ইস্যু করবে। সাধারণ মানুষকে আহ্বান করা হয়, তারা যেন নিজেদের স্বর্ণগুলো ফেডের নিকট জমা রেখে সমপরিমাণ ডলার নিয়ে আসে। ফেড মানুষকে বোঝায়, প্রতিটি ডলার হলো এক-একটি চেক নোট। মানুষ যদি ২০ ডলারের প্রতিটি নোট পুনরায় ফেডকে জমা দেয়, তবে সে তার জমাকৃত সম্পদ ফেরত পাবে। JM 043829043— এ ধরনের যে সংখ্যাটি নোটগুলোর ওপর ছাপানো থাকে, তা দ্বারা বোঝায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই হিসাবটিতে ইস্যুকৃত নোটটির বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ (স্বর্ণ/রৌপ্য) মজুদ করা আছে। চেক নোট (ডলার) ফেরত আসা মাত্রই ব্যাংক গ্রাহককে সে পরিমাণ সম্পদ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে। তা ছাড়া ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংক নোটের দরুন ইতঃপূর্বে আন্তঃপ্রাদেশিক লেনদেনগুলোতে যে জটিলতা তৈরি হতো, তা এখন ডলার ব্যবহারের মাধ্যমে মেটানো সম্ভব হবে। কারণ, এখন থেকে পুরো দেশে একটিমাত্র কারেন্সি ব্যবহৃত হবে। কিন্তু ফেড তার কথা রাখেনি। বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ডলারের বিপরীতে সাধারণ মানুষের যে সম্পদগুলো সে আত্মসাৎ করেছে, তা আর কখনো ফিরিয়ে দেয়নি।
ইতিহাসের অন্যতম এক গোপন আলোচনার মধ্য দিয়ে ফেড প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯১০ সালে জর্জিয়ার উপকূলবর্তী জ্যাকল দ্বীপে এই আলোচনার আয়োজন করা হয়। তবে সেই আলোচনার বিষয়বস্তু কী ছিল এবং উপস্থিত সদস্যরা নিজেদের মধ্যে কী কী চুক্তি করেছিল, তার কোনো তথ্যই আজ পর্যন্ত জনসম্মুখে প্রকাশ পায়নি। The Federal Reserve System: Its Origin and Growth বইয়ের লেখক Paul Warbug হলেন সেই গোপন সম্মেলনে উপস্থিত সদস্যদের একজন। তিনি বইটিতে উল্লেখ করেন— 'আমাদের প্রত্যেক সদস্য এতটাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, আজ পর্যন্ত সে আলোচনার চুক্তিপত্রে লিপিবদ্ধ তথ্যও জনসম্মুখে প্রকাশ পায়নি।' তবে ব্যাংকটির পরবর্তী কার্যক্রম দেখে সাধারণ মানুষ অনুমান করে নিয়েছে, গোপন আলোচনায় নির্ধারিত হয়েছে ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডারদের সংখ্যা, গঠনতন্ত্র ও লভ্যাংশ বণ্টন প্রক্রিয়া।
কী পরিমাণ স্বর্ণের মজুদ নিয়ে ফেড তার প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করে, সে তথ্য জানা সম্ভব না হলেও কিছু কাল্পনিক তথ্যকে পুঁজি করে এগোনো যাক। ধরে যাক, গোপন আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফেডের শেয়ারহোল্ডারগণ সে সময় ২ হাজার টন স্বর্ণ মজুদ করল এবং এর বিপরীতে ১০ বিলিয়ন ডলার প্রিন্ট করল। এখন তা বাজারে সরবরাহ হওয়ার অপেক্ষায় আছে।
১৯১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রশাসনিক ও বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি খরচ মেটাতে প্রেসিডেন্ট উইলসন প্রশাসনের ১০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু তার রাজস্ব ভান্ডারে এত পরিমাণ অর্থ ছিল না। ফলে তিনি ফেডের নিকট এই পরিমাণ ডলারের জন্য আবেদন করলেন। ফেড ব্যক্তি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক হওয়ায় প্রেসিডেন্ট প্রশাসনকে ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে প্রদান করল। ধরুন, তারা প্রেসিডেন্ট প্রশাসনকে ২% সুদে ১০ বছর মেয়াদে ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিলো। তাহলে ১০ বছর পর সুদে-আসলে কী পরিমাণ ডলার পরিশোধ করতে হবে? কম করে হলেও ১২ বিলিয়ন ডলার! সমস্যা হলো তিনি এত ডলার পাবেন কোথায়? বাজারে তো মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলারের অস্তিত্ব আছে। সুদের দরুন যে অতিরিক্ত দায়ের জন্ম হয়েছে, তার বাহ্যিক অস্তিত্ব নেই। তা ছাড়া প্রেসিডেন্ট সাহেবের নিজেরও কোনো প্রিন্টার নেই। সুতরাং, তিনি সর্বোচ্চ ১০ বিলিয়ন ডলারই পরিশোধ করতে পারবেন। বাকিগুলো পরিশোধ করতে পারবেন না। কারণ, পকেটে ৫০ ডলার থাকলে ৫১ ডলার সমমূল্যের পণ্য ক্রয় করা সম্ভব নয়।
সুদের কাছে এখানে সবাই আটকে যায়। কারণ, সুদ থেকে যে অদৃশ্য দায়ের জন্ম হয়, তা সামষ্টিক উপায়ে কখনো পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এরপর শুরু হলো যুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট সাহেবের খরচ বেড়ে গেল কয়েকগুণে। তিনি আবারও ঋণ নিলেন এবং নিতেই থাকলেন। একই সঙ্গে আমেরিকায় আরও অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক গড়ে উঠল। তারাও ফেড থেকে ঋণ নিয়ে তহবিল তৈরি করল। তাদের কাছ থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ঋণ নিল। চারদিক ঋণে ঋণে সয়লাব হয়ে উঠল। প্রতিটি ঋণের ওপর সুদ চেপে বসল। এই সুদ থেকে তৈরি হলো জাতীয় দায়, যার পরিমাণ দিনে দিনে বাড়তেই থাকল। আদৌ কি এই জাতীয় দায় থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব?
ফেডের দিকে তাকানো যাক। ১৯১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর ফেডের নিকট ২ হাজার টন স্বর্ণ ছিল। এর বিপরীতে জানুয়ারি মাসে তারা ১০ বিলিয়ন ডলার প্রিন্ট করে প্রেসিডেন্ট সাহেবকে ঋণ দেয়। প্রথম ঋণের পর প্রেসিডেন্ট সাহেব যখন পুনরায় ঋণের আবেদন করলেন, তখন ফেডের সিন্দুক ফাঁকা! অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তারা আবারও ডলার প্রিন্ট করল এবং তা প্রেসিডেন্ট সাহেবের নিকট পৌঁছে দিলো। এই যে দ্বিতীয়বার ডলার প্রিন্ট করল, তার বিপরীতে কি সমপরিমাণ স্বর্ণ মজুত করেছে? তা ছাড়া প্রতিটি ঋণের ওপর যে সুদ চাপিয়ে দিচ্ছে, তারও বিপরীতে কি স্বর্ণ মজুত করছে?
আবার লক্ষ করুন, সাধারণ মানুষ সরকারের হুকুম মানতে নিজেদের স্বর্ণগুলো ফেডের নিকট জমা দিচ্ছে, আর ফেড প্রিন্টিং মেশিনে ডলার ছাপিয়ে তা সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছে। তারা ডলার তৈরি করছে বাতাস থেকে, আবার তার ওপর সুদ চাপিয়ে ঋণ দিচ্ছে! যখন কেউ সুদ-সমেত ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না, তখন তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কেড়ে নিচ্ছে। এভাবে বিংশ শতাব্দীতে জন্ম নেয় আধুনিক মহাজন বৃত্তি।
১৯৩৩ সালে ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রীয় ঘোষণা জারি করে, সবাই যেন এ বছরের মধ্যে তাদের সকল স্বর্ণ ফেডের নিকট জমা রেখে সমপরিমাণ ডলার সংগ্রহ করে; নতুবা তাদের সম্পদ জব্দ করা হবে। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষ ফেডের কাছে স্বর্ণ জমা রাখতে বাধ্য হয় এবং এর বিনিময়ে সমপরিমাণ ডলার নিয়ে আসে। ৩১ জানুয়ারি ১৯৩৪, প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের কাছ হতে নতুন ঘোষণা আসে। এখন থেকে ১ আউন্স স্বর্ণ সমান ৩৫ ডলার। অর্থাৎ ডলারের মূল্য রাতারাতি ৪০% হ্রাস পেল! কেনই-বা এমনটা হলো! ১৯১৩ সালের পর থেকে ফেড নতুন স্বর্ণ মজুত না করে প্রচুর নোট ইস্যু করেছে। এই মূল্যহীন নোটগুলোকে বলা হয় 'Fiat Money'। তাই নতুন ইস্যুকৃত নোটের সাথে রিজার্ভে থাকা স্বর্ণগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে ডলারের মূল্য হ্রাস করা হয়েছে এবং স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। ঠিক এ কারণে মুদ্রাস্ফীতি বাজারের একটি নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন অর্থের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং বাজারে এর সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, তখনই মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। এর নেতিবাচক প্রভাবগুলোর সাথে কমবেশি আমরা সবাই পরিচিত। যেমন: দ্রব্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া, জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া, সঞ্চয় হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নিয়মিত নতুন নতুন নোট ইস্যু করা এবং বাজারে এর সরবরাহ বৃদ্ধি করা মুদ্রাস্ফীতির প্রধানতম কারণ।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত। যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র ছয় মাস আগে আয়োজন করা হয় Bretton Woods সম্মেলন। বলার অপেক্ষা রাখে না ইহুদিরা ছিল এই সম্মেলনের মধ্যমণি। এতদিন পর্যন্ত ডলার ছিল কেবল আমেরিকার কারেন্সি। এই সম্মেলনে তারা প্রস্তাব করে, ডলার হবে পুরো পৃথিবীর একমাত্র বিনিময়যোগ্য কারেন্সি। বেশিরভাগ রাষ্ট্র এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। সবার এক কথা: ফেড তো চাইলেই ইচ্ছে মতো ডলার প্রিন্ট করতে পারে, সেখানে মনিটরিং-এর কোনো সুযোগ নেই। বিতর্ক চলতে থাকল। ইহুদি প্রতিনিধিরা বলল, প্রতিটি দেশের পৃথক পৃথক কারেন্সি থাকার দরুন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্থবির হয়ে আছে। সবাই যদি একই কারেন্সি ব্যবহারে সম্মত হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গতিশীল হয়ে উঠবে। তা ছাড়া যুদ্ধের আঘাত পুরো ইউরোপকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। এমতাবস্থায় ঘুরে দাঁড়াতে যে সম্পদ প্রয়োজন, তা তাদের নেই।
হিটলারের সাবমেরিনের আঘাতে ইউরোপীয় অনেক স্বর্ণবাহী জাহাজ মেডিটেরিয়ান ও আটলান্টিকে হারিয়ে গেছে। সবাই এখন অর্থ সংকটে। এমতাবস্থায় ডলার হতে পারে সকল সমস্যার সমাধান। ফেড ডলার প্রিন্ট করে ঠিক, তবে নতুন কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরি করা হবে, যেখানে সকল দেশের অংশ গ্রহণের সুযোগ থাকবে। স্বর্ণের বিপরীতে ডলারের মান হবে ১ আউন্স স্বর্ণ = ৩৫ ডলার। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অধিকাংশ রাষ্ট্র এই প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয়।
আলোচনায় বলা হয়, যেহেতু এই মুহূর্তে পৃথিবীর অন্য রাষ্ট্রগুলোর নিকট প্রয়োজনীয় পরিমাণ ডলার নেই, তাই উচিত হবে রাষ্ট্রীয় রিজার্ভে থাকা নিজেদের স্বর্ণগুলো ফেডের নিকট জমা রেখে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার নিয়ে যায়। আর যাদের স্বর্ণ নেই, তারা বন্ড জমা রেখে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ নিতে পারবে। প্রতিটি রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ লেনদেনে নিজস্ব কারেন্সি ব্যবহার করতে পারবে। তবে অবশ্যই স্বর্ণ-রৌপ্য বা ডলারে পরিমাপযোগ্য মূল্য থাকতে হবে। অর্থাৎ কোন দেশ চাইলে স্বর্ণ-রৌপ্যের পরিবর্তে ডলারকে রিজার্ভ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। প্রতিটি দেশের বিনিময় হার নিরূপণ এবং মনিটরিং-এর দায়িত্বে থাকবে আই.এম.এফ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। যদি কোনো দেশ ডলারগুলো ফেডের নিকট ফিরিয়ে দেয়, তবে প্রতি ৩৫ ডলার অনুপাতে সমপরিমাণ স্বর্ণ ফেরত দেওয়া হবে। এরপর থেকে অনেক রাষ্ট্র তাদের রিজার্ভে থাকা স্বর্ণগুলোর একটি নির্দিষ্ট অংশ ফেডের নিকট জমা রেখে ডলার নিতে শুরু করে।
ব্রেটন উডস সম্মেলনের পর ১৯৪৫ সালে ফেডের রিজার্ভে থাকা স্বর্ণের পরিমাণ ছিল ১৭৮৪৮ মেট্রিক টন। ১৯৫০ সালে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২০২৭৯ মেট্রিক টন। কিন্তু আমেরিকানদের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা এই যে শুরু হলো, আর থামল না। এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় নিমজ্জিত থাকার দরুন তাদের ঘাটতি বাজেটের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে। নতুন-নতুন অস্ত্র নির্মাণ, সৈনিকদের বেতন প্রদান, বিভিন্ন রসদ আমদানি ইত্যাদি নানা কাজেও তাদের প্রচুর ডলার অন্যান্য দেশগুলোতে চলে যেতে শুরু করে। ফলে সে সকল ডলারের বিপরীতে যখন ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো স্বর্ণ দাবি করে বসছিল, তখন আমেরিকা হারাতে শুরু করে তাদের স্বর্ণের মজুদ। কারণ, নতুন ডলার প্রিন্ট করলেও ১ আউন্স স্বর্ণ = ৩৫ ডলার হারে তখনও কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
৬০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া আমেরিকার জন্য ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বড়ো কারণ। তারা ভাবতেও পারেনি এই যুদ্ধ এতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। তাদের ঘাটতি বাজেট বাড়তে শুরু করলে নতুন ডলার প্রিন্ট প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। ১৯৬৩ সালে জন এফ কেনেডি নিহত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট পদে আসেন লিন্ডন বি. জনসন। তিনি স্বর্ণের বিপরীতে ডলারকে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কিন্তু ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের বিরুদ্ধে বৈরী আচরণ শুরু করে দেয় কি না, তা নিয়ে তার মনে ছিল যথেষ্ট সংশয়। তাই তিনি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চালাতে শুরু করেন, যেন ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো আপাতত তাদের নিকট স্বর্ণ দাবি না করে।
১৯৬৮ সালের দিকে তাদের রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণ ৯৬৭৯ মেট্রিকটনে নেমে আসে। এমতাবস্থায় ডলার পুনর্মূল্যায়ন না করলে বাকি স্বর্ণগুলো আটকে রাখা যাবে না। ১৯৭১ সালে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন রিচার্ড নিক্সন। ততদিনে তাদের রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৯০৭০ মেট্রিকটন। ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের অব্যাহত স্বর্ণের দাবিকে কূটকৌশলের মাধ্যমে কয়েক বছর দমিয়ে রাখলেও এ বছর আর সম্ভব হচ্ছিল না। বিশেষ করে ফ্রান্সে চাপ ছিল অন্য সবার চেয়ে বেশি। ফলে ১৫ আগস্ট ১৯৭১, প্রেসিডেন্ট নিক্সন ব্রেটন উডস অঙ্গীকারনামা রহিত করেন। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ পরিশোধের প্রক্রিয়া রহিত করেন। এরপর কয়েকদফা ডলারকে পুনর্মূল্যায়িত করা হয়, ১ আউন্স স্বর্ণ = ৩৮/৪০/৪২। কিন্তু ডলারের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৩ সালে চূড়ান্তভাবে ব্রেটন উডস অঙ্গীকারনামাকে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এরপর হতে স্বর্ণের বিপরীতে মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এখন যে প্রক্রিয়ায় বিনিময় হার নির্ধারিত হয়, তা হলো— Floating Exchange Rate System ।
পেট্রো ডলার: William Clark-এর লেখা Petrodollar Warfare: Oil, Iraq and the Future of the Dollar বইটি হতে:
ফেড বুঝতে পারে, আন্তর্জাতিক মহল ডলারের ওপর পুরোপুরি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তারা যদি নতুন কোনো অর্থ ব্যবস্থার ফন্দি করে, তবে তা ডলারের শেষকৃত্যের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এমন পরিস্থিতিতে আমেরিকা জ্বালানি তেলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, যার জন্য ডলার আজও টিকে আছে। ৭০ দশকের প্রথম থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়তে শুরু করে। আমেরিকা সৈন্য বাহিনী নিয়ে আরব দেশের তেলক্ষেত্রগুলো একে একে দখল করতে শুরু করে। যাদের সাথে সমঝোতা হয়েছে, তাদের সাথে যুদ্ধ হয়নি। আর যারা বেঁকে বসেছে তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
১৯৬৭ সালের পর হতে ঘটে যাওয়া আরব-ইজরাইল যুদ্ধগুলোতে আমেরিকা ইজরাইলিদের পক্ষ নেওয়ায় আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে মার্কিনিদের সম্পর্ক তিক্ততায় পৌঁছে। এরই রেশ ধরে ১৯৭৩ সালে ওপেকভুক্ত ১২টি রাষ্ট্র আমেরিকার ওপর তেল অবরোধ জারি করে, যা সে বছরের (৭৩) অক্টোবর হতে শুরু করে পরবর্তী বছরের (৭৪) মার্চ মাস পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। মাত্র ছয় মাসে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের মূল্য $২৫.৯৭ থেকে বেড়ে $৪৬.৬৩-এ গিয়ে পৌঁছে।
মার্কিন প্রশাসন এ পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক চাল চালতে শুরু করে। পারিবারিক দ্বন্দ্বে বাদশাহ ফয়সাল নিহত হলে মার্কিনিদের জন্য পথ আরও সহজ হয়ে যায়। তখন সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইজরাইলের জুজু কাজ করছিল। ইজরাইল তার আশেপাশের ভূ-খণ্ডগুলোতে যেকোনো মূহুর্তে আক্রমণ চালাতে পারে— এমন একটি আতঙ্ক তাদের মধ্যে কাজ করছিল। ১৯৭৫-৭৬ সালে সৌদি-আমেরিকা অস্ত্র-চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মূল বিষয় ছিল, সৌদি রাজ পরিবার রক্ষায় আমেরিকা তাদের সামরিক নিরাপত্তা প্রদান করবে। বিনিময়ে সৌদি আরব তাদের নিকট তেল রপ্তানি করবে। এই তেল পরিশোধন করে আমেরিকা বিশ্ব বাজারে বিক্রি করবে।
ধীরে ধীরে অন্যান্য আরব দেশগুলোও আমেরিকার সাথে বিভিন্ন চুক্তি করে। একপক্ষ দিবে অস্ত্র ও সামরিক নিরাপত্তা, অপরপক্ষ দেবে তেল। এবার ইউরোপীয় বা অন্য কোনো দেশ যদি পরিশোধিত তেল ক্রয় করতে চায়, তবে তা ডলার দিয়েই ক্রয় করতে হবে। অন্য কোনো কারেন্সির বিনিময়ে আমেরিকা তা বিক্রি করবে না। বাধ্য হয়ে প্রতিটি রাষ্ট্র এই নীতি মেনে নেয়। তখন থেকে আমেরিকান ডলারের ভিত্তিমূল্যে স্বর্ণের পরিবর্তে তেল স্থলাভিষিক্ত হয়। এ কারণে ডলারের অপর নাম আজ পেট্রো ডলার। ৭০-এর দশকে আমেরিকা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করে, যাতে করে পেট্রো ডলারের যুগ শেষ হয়ে গেলেও বিনিয়োগকৃত অর্থের বদৌলতে ডলারকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে ব্যবহার করে চীনের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের অনুমতি পাওয়া আমেরিকার জন্য ছিল বড়ো অর্জন।
আমেরিকার সাথে রাজনৈতিক দ্বৈরথের দরুন ২০০০ সালে সাদ্দাম হোসেন ডলার বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনি পুনরায় স্বর্ণভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কথা ব্যক্ত করেন। অর্থাৎ আমেরিকাকে এখন থেকে ডলার নয়; স্বর্ণ দিয়ে তেল কিনে নিতে হবে। এ কারণে আমেরিকান প্রশাসন ২০০১ সালে অর্থনৈতিক হোঁচট খায়। এরপর কী হলো! ডলারকে বাঁচাতে আমেরিকা পুরো ইরাক দখল করে নেয়; একইসঙ্গে তেল ক্ষেত্রগুলোও। একই ভাগ্য বরণ করতে হয় সিরিয়া এবং লিবিয়াকে। গোটা মধ্যপ্রাচ্য ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
📄 ইহুদি ঔদ্ধত্যপনা
এখন আমরা এমন একটা সময়ে এসে পৌঁছেছি, যখন বড়োদিন পালনের জন্য ইহুদিদের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করতে হয়! ইহুদিরা যে শহরগুলোতে বসবাস করছে, সেখানে তাদের অনুমতি ব্যতীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি, এমনকী গির্জাগুলোতেও বড়োদিন পালন করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যদি তারা আমাদের বড়োদিন পালনে অনুমতি প্রদান করে, তবে একটি বিষয় ফলাও করে প্রচার করা হবে যে, বাহ! ইহুদিরা তো অন্য ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতি অনেক উদার। আদৌ ইহুদিরা আমাদের বড়োদিন পালনের অনুমতি দেবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নই। ১৯২১ সালের ৩১ অক্টোবর, Brooklyn Eagle পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশ পায়, যার কিছু অংশ নিচে তুলে ধরা হলো—
'Canon William Sheafe Chase কিছুদিন আগে জাতীয় শিক্ষাবোর্ডের সচিবের কাছে একটি চিঠি লিখেন। বড়োদিনের প্রাক্কালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইতঃপূর্বে যিশুখ্রিষ্টের জীবনী নিয়ে যে আলোচনা হতো, তা বন্ধের জন্য নতুন কোন নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছে, তা জানতে চেয়ে তিনি এই চিঠি লিখেন। আমেরিকান গির্জা ফেডারেশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, গত বছর কিন্ডার গার্ডেনের এক শিক্ষক বড়োদিন উপলক্ষ্যে ছাত্রদের মাঝে যিশুখ্রিষ্টের জীবনী নিয়ে আলোচনা করেছিলেন বলে তাকে হুঁশিয়ার করা হয়। সেইসঙ্গে এমন কাজ যদি পুনরায় করেন, তবে তৎক্ষণাৎ তাকে বরখাস্ত করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়।'
আমেরিকার সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী, আমেরিকা হলো খ্রিষ্টানদের দেশ। তারপরও হিব্রু সম্প্রদায়ের প্রতি আমেরিকার প্রশাসন যতটা উদারতা দেখিয়েছে, ততটা অন্য কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের প্রতি কখনোই দেখানো হয়নি। খ্রিষ্ট আদর্শকে অক্ষুণ্ণ রেখে পৃথিবীর যেকোনো সম্প্রদায়ের মানুষ আমেরিকায় প্রবেশ করতে পারে, এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমি বিশ্বাস করি, খ্রিষ্ট ধর্মকে আমাদের সমাজব্যবস্থা থেকে মুছে দিতে যে অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে, তার পেছনে পুরো হিব্রুজাতি নেই; বরং তাদের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী রয়েছে। তারা বারবার নিজেদের ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে।
এই হলো আমেরিকার সবচেয়ে বড়ো ধর্মীয় উৎসব পালনের বর্তমান অবস্থা। জাঁকজমকতা আগে যেমন ছিল, এখনও তেমনই থাকবে কিংবা আরও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু যে নিগূঢ় ভাবগাম্ভির্যের মধ্য দিয়ে একসময় বড়োদিন পালিত হতো, ভবিষ্যতের দিনগুলোতে তা হারিয়ে যাবে। ধর্মীয় উৎসব রূপ নেবে বিভিন্ন অশালীন কর্মকাণ্ডে। বিংশ শতাব্দীতে গড়ে উঠা নতুন প্রজন্ম হয়তো বুঝতেই পারবে না, কেন এবং কী কারণে এই দিবস পালন করা হয়। তাদের কাছে সবকিছুই হবে আমোদ-ফুর্তির অংশ।
Dr. William Carter দীর্ঘদিন ব্রোকলিন শহরের Throop Avenue Presbyterian Church-এর পাদরি হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তার লেখা উল্লেখযোগ্য কিছু বইয়ের নাম হলো— The Gate of Janus: an epic story of the world war, Milton and His Masterpiece'ও 'Studies in the Pentateuch। সুবক্তা হিসেবে বিভিন্ন মহলে তার ছিল অসামান্য সুনাম। তা ছাড়া ইতিহাস ও সাহিত্যের ওপর তার মস্তিষ্ক ছিল ঈর্ষণীয় জ্ঞানে পূর্ণ।
Y.M.C.A-এর গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখায় তিনি পারিপার্শ্বিক ঘটনা প্রবাহের ওপর টানা ৩০ সপ্তাহ বক্তৃতা প্রদান করেন। পরে নিউইয়র্ক শিক্ষাবোর্ড তাকে একই বিষয়ের ওপর Erasmus High School-এ নিয়মিত বক্তৃতা প্রদানের অনুরোধ করে। ১৯১১-১৯২১ সাল পর্যন্ত টানা দশ বছর তিনি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সান্ধ্যকালীন ক্লাসগুলোতে চলমান বিভিন্ন বিষয়াবলির ওপর বক্তৃতা প্রদান করেন। শুরুতে খুব একটা সাড়া না পেলেও মাত্র ছয় সপ্তাহের ব্যাবধানে তার শ্রোতা সংখ্যা ৩৫ থেকে ৩৫০-এ গিয়ে পৌঁছায়। প্রতিদিন তিন ধাপে এই বক্তৃতা চলত। প্রথম ধাপে, শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। দ্বিতীয় ধাপে, সমকালীন ঘটনাবলির সাথে মিল রেখে নির্ধারিত বিষয়ের ওপর আলোচনা করতেন। তৃতীয় ধাপে, উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলীরা তাকে আলোচিত বিষয়সমূহের ওপর প্রশ্ন করতেন।
১৫ নভেম্বর, ১৯২০ সালের কথা। উক্ত সপ্তাহে শিক্ষাবোর্ড আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে দেয় 'আমেরিকার বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর পরিচয়।' Dr. Carter বক্তৃতা শুরু করেন— 'বিশ্বযুদ্ধ শুরুর হওয়ার মাত্র এক মাস আগে প্রচুর বিদেশি নাগরিক আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে প্রবেশ করে। সংখ্যাটা প্রায় ১৪,০৩,০০০-এর কাছাকাছি; 'যার মধ্যে ৬ শতাংশ গ্রেট ব্রিটেনের নাগরিক, ২ শতাংশ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এবং ১০ শতাংশ ইহুদি।'
পরবর্তী সপ্তাহে আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারিত হয়, 'অভিবাসীরা আমেরিকার জন্য কী করেছে?' Dr. Carter বলেন— 'ইউরোপের কিছু কিছু মানুষ বহু কষ্টে সামান্য আশ্রয়ের আশায় আমেরিকায় প্রবেশ করেছে, তারপরও আমেরিকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তাদের অবদান সবচেয়ে বেশি। এ দেশের উন্নয়নে তারা নিজেদের সর্বোচ্চটা ঢেলে দিতে ন্যূনতম কার্পণ্য করেননি। তারা প্রত্যেকেই এসেছে অনুন্নত এবং কম উন্নত দেশগুলো থেকে।' (তিনি উন্নত বলতে ইতালির মতো সমপর্যায়ের দেশগুলোকে এবং অনুন্নত বলতে কালো ও বাদামি বর্ণের মানুষদের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।)
আলোচনার এক পর্যায়ে ইহুদিদের প্রসঙ্গ চলে আসে। সমাজ, বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প-সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব, উন্নয়নকর্ম ইত্যাদি নানা বিষয়ে তিনি ইহুদিদের অবদানের কথা উল্লেখ করে ভূয়সী প্রশংসা করেন। সেইসঙ্গে ইহুদিদের বিখ্যাত কিছু ব্যক্তির নামও উল্লেখ করেন। যেমন: Disraeli, Rubinstein, Schiff, Kahn এবং Rabbi Wise। ব্যক্তিগতভাবে যে তারও অনেক ইহুদি বন্ধু-বান্ধবী রয়েছে, সে কথাও উল্লেখ করেন।
কিছু মানুষের কাছে ভয় দুই ধরনের। এক, অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে ন্যায়বিরুদ্ধ কাজ করার ভয়। দুই, অনিবার্য বিপদ জেনেও বিবেকের তাড়নায় সত্য না বলতে পারার ভয়। Dr. Carter-এর ক্ষেত্রে ঘটেছেও তাই। তিনি ইহুদিদের যে এত এত অবদানের কথা উল্লেখ করলেন, তবে তাদের সেই অবদান কোথায়? রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, শিল্প-কলকারখানা ইত্যাদি সব তো জ্যান্টাইলদের রক্ত-ঘামে তৈরি হচ্ছে। অপরদিকে ইহুদিরা নরম-মোলায়েম কেদারায় বসে সুদের ব্যবসায় করে যাচ্ছে। ইহুদিদের খুশি করতে তিনি নাহয় কয়েকটি প্রশংসাসূচক বাক্য বলেছেন, কিন্তু তিনি তো দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ! বিবেকের তাড়নায় সত্য বলা থেকে বিরত থাকতে পারেননি।
রাশিয়া থেকে আগত ইহুদিদের একদল অভিবাসী সম্পর্কে তিনি বলেন— 'প্রত্যেক জাতির মধ্যে খারাপ কিছু উপাদান পাওয়া যায় এবং এটাই স্বাভাবিক। ইহুদিদের বেলাও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ইহুদিদের প্রায় ১,৪৩,০০০ অভিবাসী রাশিয়া থেকে আমেরিকায় প্রবেশ করেছে। ভুলে গেলে চলবে না, ইহুদিদেরে পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাশিয়ান ইহুদিরা হলো সবচেয়ে খারাপ।'
উপস্থিত শ্রোতাবৃন্দ বরাবরের মতোই স্বাভাবিক ছিলেন। প্রশ্ন-উত্তর পর্ব শুরু হলে দুজন ব্যক্তি তাকে প্রশ্ন করেন, কেন তিনি রাশিয়ান ইহুদিদের নিয়ে এত বেশি সমালোচনা করলেন? উত্তরে তিনি বলেন— 'আমি সকল জাতিগোষ্ঠীর ব্যাপারে নিরপেক্ষ দৃষ্টিপাত করেছি। তা ছাড়া ইহুদি রাশিয়ান জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে পৃথিবীর সবাই একই মন্তব্য করেছে।'
কিছুদিন পর শিক্ষাবোর্ড থেকে নোটিশ পাঠিয়ে বলা হয়, বক্তৃতার বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করার দায়ে তার বিরুদ্ধে কিছু ব্যক্তি অভিযোগ করেছে। পরে খবর নিয়ে জানা যায়, সেই আলোচনাসভায় প্রশ্নকারী দুজনই ইহুদি। ভাবা যায়! ৪০০ শ্রোতার মাধ্য থেকে মাত্র দুজন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, আর এতে চারদিকে তুলকালাম কাণ্ড বেধে যায়। এক সপ্তাহের মধ্যে আরও অনেক অভিযোগ শিক্ষাবোর্ডে জমা হতে শুরু করে। ফলে Dr. Carter-এর বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগে বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। স্বাধীন দেশের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও আজ সবার বাক্-স্বাধীনতা রুদ্ধ। এ জাতীয় ঘটনা ইতঃপূর্বে আরও অনেক ঘটেছে। সুতরাং অবাক হওয়ার কিছু নেই।
তদন্ত কমিটির ডাকে Dr. Carter হাজির হলেন। তার সামনে বসে ছিল সাতজন ইহুদি। এর মধ্যে চারজন স্বীকার করে তারা সেই বক্তৃতা সভায় উপস্থিত ছিল না এবং সেখানে কী আলোচনা হয়েছে, তার কিছুই ভালোভাবে জানে না। এই পুরো তদন্ত কার্যক্রম যার নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছে, তিনি হলেন রাবাই C.H. Levy। তিনি রাবাই ইউনিয়ন, মন্ত্রিপরিষদ ও Kehillah-এর অন্যতম একজন সদস্য। তিনি দীর্ঘকাল ধরে এ দেশে নিজের জাতিগোষ্ঠীর জন্য গুপ্তচর হয়ে কাজ করেছেন। সেই বক্তৃতাসভায় তিনি নিজেও উপস্থিত ছিলেন না।
তদন্ত কার্যক্রম যথারীতি শুরু হলে এক এক করে ছয়টি চিঠি খোলা হয় এবং সবার সামনে তা পাঠ করা হয়। প্রতিটি চিঠির বিষয়বস্তু প্রায় কাছাকাছি; ইহুদিদের ব্যাপারে খারাপ বা ভুল মিশ্রিত কোনো তথ্য যেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা না হয়, চিঠিগুলোতে তা-ই বলা হয়েছে। সবগুলো চিঠি পাঠানো হয়েছিল নিউইয়র্ক শিক্ষা বোর্ড পরিচালনা কমিটির সদস্য Dr. W.L. Ettinger-এর নিকট। চিঠি পাঠ করা শেষ হলে Dr. Carter-কে কিছু বলার সুযোগ দেওয়া হলো। তিনি বললেন—
'মনে হচ্ছে সবগুলো চিঠি কেবল একজন ব্যক্তির নির্দেশনায় লেখা হয়েছে। কারণ, তাদের প্রত্যেকের আপত্তির বিষয়বস্তু এক। যদি পৃথক পৃথক মানুষের থেকে চিঠিগুলো আসত, তবে বিষয়বস্তুতে কিঞ্চিৎ হলেও পার্থক্য পাওয়া যেত।'
তিনি পরোক্ষভাবে Levy সাহেবকে বুঝিয়ে দিয়েছেন সেই ব্যক্তির কথা, যার নির্দেশনায় এগুলো লেখা হয়েছে। এরপর তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কিছু সাক্ষী হাজির করার অনুমতি চাইলেন, কিন্তু তাকে সেই সুযোগ দেওয়া হলো না। অর্থাৎ একটি সম্পূর্ণ ইহুদি ট্রাইব্যুনালের বিপক্ষে বসে আছেন একজন জ্যান্টাইল শিক্ষক। তদন্তের একপর্যায়ে সবাই স্বীকার করতে বাধ্য হলো যে, তিনি বক্তৃতায় যা কিছু বলেছেন, তা ইচ্ছা করে বলেননি এবং তাতে কোনো মিথ্যা তথ্য ছিল না। তা ছাড়া তিনি কোন বিষয়ের ওপর আলোচনা করবেন, তা তো শিক্ষাবোর্ড-ই নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তার কিই-বা করার আছে! ট্রাইব্যুনালের সদস্যরা যখন বিতর্কে পেরে উঠছিল না, তখন তারা ভিন্ন পথ অনুসরণ করে। রাবাই Levy হাস্যকর টিপ্পনী কেটে প্রশ্ন করেন—
'মহোদয়, জানতে পারি কি আপনি আদৌ আমেরিকান না অন্য দেশের নাগরিক?'
Dr. Carter ১৫ বছর বয়সে ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকায় আসেন। বেশ কিছুদিন এখানে থাকার পর নাগরিকত্ব পেয়ে যান। তারপর থেকে আমেরিকার বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। জবাবে তিনি বলেন—
'আমি ত্রিশ বছর আগে এ দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছি এবং তার প্রমাণও আছে। আপনি বললে আমি সেই প্রমাণ হাজির করতে পারব। আশা করি আপনি নিজেও আপনার নাগরিকত্বের প্রমাণ হাজির করতে পারবেন।'
তিনি রাবাই Levy-কে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন। জবাবে Levy বলেন—
'আমি দেখে নেব, তোমার মতো নোংরা ইংরেজ কীভাবে নিউইয়র্কের কোনো জনসভায় বক্তৃতা দেয়!'
এমন অপমানজনক বাক্য শুনে Dr. Carter মূহুর্তে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তার চোখে রাগের অভিব্যক্তি ঠিকরে পড়ছিল, কিন্তু পুরো ট্রাইব্যুনাল বিপক্ষে হওয়ায় কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। ভাগ্য ভালো, ট্রাইব্যুনালে সেদিন তিনি ছাড়া আরও একজন জ্যান্টাইলন উপস্থিত ছিলেন; Ernest L. Crandall। তিনি সেই শিক্ষাবোর্ডের সান্ধ্যকালীন শিক্ষা কার্যক্রমের সুপাভাইজার ছিলেন। তিনি রাবাই Levy-কে উদ্দেশ্য করে বলেন—
'একজন ভদ্রলোককে নোংরা ভাষায় যেভাবে অপমান করলেন, তা নিজ চোখে এর আগে কখনো দেখিনি। আপনারা যা করলেন, তার জন্য লজ্জিত হওয়া উচিত। এমন নোংরা বাক্য যদি দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করেন, তবে আপনাদের এখান থেকে বের করে দিতে বাধ্য হব।'
এরপর Crandall সাহেবের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে এ আলোচনা আর দীর্ঘ করতে চাই না। তদন্তে Dr. Carter নির্দোষ প্রমাণিত হন। তাকে সসম্মানে সকল অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। পুনরায় তিনি Erasmus School-এ ফিরে যান। কিছুদিন পর একটি নোটিশের মাধ্যমে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়— আইরিশ ও ইহুদি বিতর্ক নিয়ে তিনি যেন আপত্তিকর কোনো মন্তব্য না করেন, যদিও তা আলোচনার বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিলে যায়।
১৯১৮ সালের পর থেকে আয়ারল্যান্ডজুড়ে স্বাধীনতাযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এটিকে এক প্রকার গৃহযুদ্ধও বলা যায়। আইরিশ অধিবাসীরা চাচ্ছিল তাদের নিয়ে চারদিকে আলোচনা হোক, কিন্তু জায়োনিস্ট সংগঠনগুলো তা চাচ্ছিল না। কারণ, তাদের মনে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসার ভয় ছিল। কারণ, ব্রিটিশ-আয়ারল্যান্ডের মধ্যে যে যুদ্ধের সূত্রপাত, তার পেছনে ছিল এই জাতিগোষ্ঠীটিরই কূট-পরিকল্পনা। সরকারিভাবে আইন পাশ করা হয়, যেন আইরিশ বিতর্ক নিয়ে কোথাও সামান্য টু শব্দ পর্যন্ত করা না হয়।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ বক্তৃতা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পর ডিসেম্বর মাসে Dr. Carter স্বেচ্ছায় এই পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তখন থেকে তার জীবনে শুরু হয় নিত্য অভাব-অনটন। বিবেকের তাড়নায় তিনি অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করা থেকে বিরত থাকতে পারেননি। পরবর্তীকালে এই পদে যাকে নিয়োগ দেওয়া হবে তার আদৌ সেই ভয় থাকবে কি না— নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, তবে আশার আলো খুবই ক্ষীণ। বাক্ স্বাধীনতার নামে এ দেশের পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলো যে বুলি আওড়ায়, তা যে কতটা মিথ্যা তা এই ঘটনা থেকেই বোঝা সম্ভব।
ইহুদিদের মায়াকান্না
'ইহুদি বিতর্ক' ও 'সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন' বিষয় দুটি যে এক নয়, তা একজন সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষও স্বীকার করবে। পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে— যারা নিজেদের সম্পর্কে ন্যূনতম অভিযোগ বা সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা, তা কখনোই বিবেচনায় নেওয়া হয় না। তাদের নিয়ে বাজারে কোনো প্রকার বিতর্ক সৃষ্টি করা যাবে না— এটাই মূখ্য বিষয়। আর এ জাতীয় মানুষগুলো ক্ষমতায় গেলে যে কতটা স্বৈরাচারি হতে পারে, সেই শিক্ষা আমরা ইতিহাস থেকেই নিতে পারি। যে বিষয়টি তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়— তা হলো সত্যের উন্মোচন। কারণ, এটাই একমাত্র বিষয় যা সর্বস্তরের মানুষকে একতাবদ্ধ করতে পারে। তাই সত্যকে ধামাচাপা দিতে প্রায়শই তারা এমন কিছু বাহানা সামনে নিয়ে আসে, যা দ্বারা সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে পুরো ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব।
পূর্বের একটি অধ্যায়ে বলা হয়েছে— যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সামান্যতম সমালোচনার চেষ্টা করে, তখন তাদের ওপর অ্যান্টি-সেমাইট লেবেল চাপিয়ে দেওয়া হয়। বিতর্কের নামে ইহুদিদের ওপর সাম্প্রদায়িক আক্রমণ চালানো হচ্ছে— এমন মায়াকান্নার রুল চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের আবেগ নিজেদের পক্ষে নিয়ে পুরো বিষয়কে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এটা কি বিশ্বাসযোগ্য যে, আজকের যুগে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে স্বৈরাচারী ইহুদিদের ওপর ধর্মীয় নিপীড়ন চালানো সম্ভব! আজকের দিনে তো একজন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সাহেবও নিউ টেস্টামেন্ট হাতে নিয়ে শপথ গ্রহণ করার মতো ধৃষ্টতা দেখাতে পারে না। উপরন্তু প্রশাসনিক বিভিন্ন পদ থেকে 'খ্রিষ্টান' শব্দটির ব্যবহার বাদ দেওয়া হয়েছে।
১৯২০ সালের মে মাসে আমেরিকার ওহিয়ো প্রদেশের দৈনিক পত্রিকা Daily American Tribune প্রকাশ করে— 'আজকের দিনে যা হচ্ছে, তা ইহুদি নিপীড়ন নয়; খ্রিষ্টান নিপীড়ন।' বিখ্যাত লেখক ও রাজনীতিবিদ Dean Swift বলেন— 'বুঝতে পেরেছি, সহ্য যা করার সব আমাদেরই করতে হবে। আমাদের কোনো কিছু ইহুদিরা সহ্য করবে না।'
এপ্রিল-মে মাসের দিকে The Jewish Times-এর সম্পাদক H. Lissauer একটি কলাম লিখেন, যার শিরোনাম ছিল—
'ক্রুশ চিহ্ন ইহুদিদের জন্য আপত্তিকর। খ্রিষ্টানদের উচিত মাগান ডেভিডকে ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা। আমরা কখনো সামান্য একটি ক্রুশ চিহ্নের নিকট নিজেদের ধর্ম, আদর্শ ও বিবেকবোধকে ঢেলে দিতে পারি না।'
ক্লিভল্যান্ডের পত্রিকা Jewish Independent প্রকাশ করে— 'Gideons-এর যথেচ্ছা ব্যবহার ইহুদিদের জন্য আপত্তিকর।' Gideons বাইবেলে উল্লিখিত এক পয়গম্বর, যিনি একাধারে মহাবীর, যুদ্ধের সেনাপতি ও ন্যায়বিচারক। আমেরিকার সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে তার ছবি ঝুলিয়ে রাখা হতো। তিনি আমাদের নিকট একজন আদর্শ পুরুষের প্রতীক। আমাদের আদালত ঘরগুলোতে Gideons-কে একজন আদর্শ বিচারকের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়। ইহুদিরা দাবি করে, সকল স্থান থেকে যেন তার ছবি সরিয়ে ফেলা হয়। C.A. Johnson একবার চেচিয়ে বলেছিলেন—
'আদালত ঘরে ন্যায্য বিচারের প্রতীক হিসেবে Gidoens-কে স্মরণ করার কী দরকার, নিজে সৎ বিচারক হলেই তো হয়।'
১৯০৯-১০ সালের দিকে আমেরিকার গির্জাগুলো পথভ্রষ্ট ও মানসিক বিকারগ্রস্ত ইহুদিদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোড়দার করা, কিন্তু ইহুদিদের সংগঠনগুলো ঔদ্ধত্যের সুরে বলে ওঠে—
'খ্রিষ্টানদের এত বড়ো স্পর্ধা, আমাদের জ্ঞান দিতে আসে! আমাদের কোনো জ্ঞানের প্রয়োজন নেই।'
প্রতিশোধস্বরূপ ১৯১১ সালে তারা নিউইয়র্কে একটি আইন পাশ করে— '১৬ বছরের কম বয়সি কাউকে অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া ধর্মীয় কোনো সংগঠনের সাথে জড়িত করা বা নিয়মিত গির্জায় যাওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা যাবে না। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।'
শিকাগো বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ শিকাগো গসপেল মিশন সংগঠনটির একজন নিয়মিত সদস্য ছিলেন। রাবাইরা তাকে নিয়ে একের পর এক নিন্দনীয় কলাম লিখে যাচ্ছিল। যেমন: 'খ্রিষ্টান অভিভাবকদের আজ কী হলো, তারা সন্তানদের একজন ভণ্ড ও দুশ্চরিত্র ধর্ম ব্যবসায়ীর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করতে পাঠাচ্ছে! কীভাবে তারা একজন ধর্ম ব্যবসায়ীর নিকট শিক্ষা আশা করছে!'
একজন শিক্ষক তার ছাত্রদের নৈতিক চরিত্র গঠনে ধর্মের প্রতি উৎসাহী করতেই পারেন। তাই বলে কি তিনি ধর্ম ব্যবসায়ী হয়ে যাবেন? এ দেশের শিক্ষাবোর্ড ইহুদিদের কথামতো সেই অধ্যক্ষকে বিদ্যালয় থেকে চাকরিচ্যুত করে। কিন্তু যখন কোনো রাবাই-এর বিরুদ্ধে মাদক ব্যাবসা, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও কূট-পরামর্শের মতো জঘন্য সব কাজের সাথে জড়িত হওয়ার প্রমাণ মেলে, তখন তাদের ধর্ম ব্যবসায়ী বলা হয় না কেন?
২৬ নভেম্বর, ১৯২০, Jewish Sentinel প্রকাশ করে— 'আমাদের সবচেয়ে পুরাতন এবং বিপজ্জক শত্রু হলো রোমান সম্প্রদায়। তারা যে শাখায় বিচরণ করে, তার প্রত্যেকটি-ই আমাদের জন্য নিষিদ্ধ। যেদিন রোমের সূর্যাস্ত হবে, মনে রাখবেন! সেদিনই জেরুজালেমের সূর্যোদয় হবে।'
ক্লিভল্যান্ড ও লেকউড শহরের খ্রিষ্টানরা যখন বড়োদিন পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন ইহুদিদের পত্রিকাগুলো কটাক্ষ করে বলতে শুরু করে— 'আপনাদের কি ধারণা আছে, ক্লিভল্যান্ড ও লেকউড শহরে কি পরিমাণ ইহুদি বাস করে? যদি আমাদের একজন সদস্যও এ শহরে বাস করে, তবে এখানে সাম্প্রদায়িক কোনো উৎসব হতে পারে না।'
পরবর্তী বছরের পহেলা জানুয়ারি ইহুদিদের পত্রিকাগুলো প্রকাশ করতে শুরু করে— 'আরেকটি বড়োদিন ফিরে আসার পূর্বে আমাদের হাতে মাত্র ৩৬০ দিন বাকি আছে। আমাদের উচিত খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া এবং বাকি সময়টার উপযুক্ত ব্যবহার করা।'
ইহুদি ব্যবসায়ীরা গত কয়েক বছর যাবৎ নতুন এক খেলায় মেতে উঠেছে। ইস্টার সানডে ও বড়োদিন বন্ধ করতে পারেনি বলে ইহুদিদের দোকান ও মার্কেটগুলো যেকোনো উৎসবের দিন এলেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে শুরু করে। যেমন: Levys, Issac, Goldsteins ও Slivermans; কিন্তু নিজেদের উৎসবের দিনগুলো এলে ঠিকই পণ্যের দাম কমিয়ে দেয়।
রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হিসেবে পালন করাতেও ইহুদিরা আমাদের নিয়ে কম বাজে কথা বলেনি। যেমন—
'ছি, ছি! আধুনিক যুগে এসেও খ্রিষ্টানরা কীভাবে পুরাতন একটি কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরে পড়ে আছে! তাদের বিশ্বাসের কী যে শ্রী, রবিবার নাকি মৃত যিশু পুনরায় জীবিত হয়েছিলেন!'
American Israelite পত্রিকা কয়েক বছর আগে একটি কলাম প্রকাশ করে—
'তখন আর কোনো ইহুদিকে লুকিয়ে থাকতে হবে না, যখন প্রতিটি খ্রিষ্টানকে উদারপন্থি ও মুক্তমনা করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।'
একসময় ইউরোপ-আমেরিকার খ্রিষ্টান নারীগণ পর্দা মেনে বাইরে চলাফেরা করত। আজ সে জায়গায় তাদের ছোটো ছোটো কাপড় পড়তে দেখছি। নগ্ন চলচ্চিত্র, নেশা দ্রব্যের যথেচ্ছা ব্যবহার এবং যৌনতার ছড়াছড়িতে আমাদের সমাজ ছেয়ে গেছে। এগুলোর কোনোটিই যিশুর বার্তা ছিল না। এসবই প্রমাণ করে, তারা আমাদের মন থেকে যিশুকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
এমন কোনো ক্যাথলিক চার্চ নেই, যার ওপর তারা আক্রমণ করেনি। তারা বলে— 'এ কেমন খ্রিষ্টসমাজ, যারা উপাসনা করে এক ইহুদি নারীর!' এটাকে নিছক আক্রমণ বললে ভুল হবে। যিশু মাতা 'কুমারী মেরিকে' নিয়ে তারা কত নোংরা ও অকথ্য গল্পের জন্ম দিয়েছে, তা কল্পনাও করা সম্ভব নয়।
সামাজিক যেকোনো অনুষ্ঠান শুরুর পূর্বে সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা গীত করা পৃথিবীর অতি প্রাচীন একটি সংস্কৃতি, কিন্তু এই সংস্কৃতি আজ লোপ পেতে বসেছে। ইহুদিরা সর্বত্র বাইবেলের বিরোধিতা করে, কিন্তু সুযোগ পেলে নিজেদের ব্যাপারে স্তুতি গাওয়া থেকে বিরত থাকে না। প্রায়শ ইহুদি রাবাইগণ খ্রিষ্টানদের গির্জা ও বিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে জোর গলায় বলে বেড়ায়—
'আমরা বাইবেল লিখেছি এবং তোমাদের জন্য তা আমরাই সংরক্ষণ করেছি। তাই আশীর্বাদ চাইলে ইজরাইলের সেবা করো।'
তা ছাড়া, যে যিশু পৃথিবীর কোটি কোটি খ্রিষ্টানের হৃদয়ে দেবতারূপে এতদিন পর্যন্ত টিকে আছে, তাকে নিয়ে যথেচ্ছা গল্প রচনা করতে ইহুদিদের জুড়ি নেই। তারা এটাও প্রচার করে, যিশু ছিলেন ইহুদি। তিনি কস্মিনকালেও খ্রিষ্টান ছিলেন না। তাই আজ যারা খ্রিষ্টান এবং যিশুর উপাসনা করছে, তারা সবাই বিপথগামী।
এত কিছুর পরেও কি বলতে হবে আমরা ইহুদিদের ওপর ধর্মীয় নিপীড়ন চালাচ্ছি? সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে আজ ইস্টার সানডে, গুড ফ্রাইডে, বড়োদিন, বড়োদিন সংগীত ইত্যাদি পালিত হয় না। তাদের মতে, একটি অদর্শ ও ধর্ম সহিংষ্ণু দেশ গড়ে তোলার পূর্বশর্ত হলো— দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ (সেক্যুলার) হতে হবে। অন্যথায়, সে দেশ কুসংস্কারের বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়বে। কিন্তু ইহুদি রাবাইগণ নির্বিঘ্নে বিভিন্ন শহরে নিয়মিত সেমিনারের আয়োজন করে যাচ্ছে এবং খ্রিষ্টান যুবকদের মধ্যে জুদাইজমের বীজ ঢুকিয়ে দিচ্ছে।
সবশেষে বলতে চাই, ধর্ম পালন এবং ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার। নিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে খ্রিষ্টান ধর্মকে কলুষিত করার যে নিরন্তর প্রয়াশ ইহুদিরা চালিয়ে যাচ্ছে, আশা করছি এই অধ্যায়টি কিছুটা হলেও জ্যান্টাইলদের মধ্যে চিন্তার খোরাক জোগাতে পারবে।
ইহুদি সন্ত্রাসীদের নানা অপকর্মের চিত্র
পূর্বে বলেছি এখনও বলছি, আমার বই লেখার উদ্দেশ্য পুরো ইহুদি সম্প্রদায়কে দোষারোপ করা নয়। তাদের মাঝেও এমন অনেক সদস্য আছে, যারা একজন নীতিবান ও আদর্শ জ্যান্টাইলের ন্যায় পুরো জীবন অতিবাহিত করতে উৎসুক। এ সকল অপরাধ কর্মকাণ্ডের পেছনে তাদের কোনো প্রকার সম্মতি নেই। তবে এটা ঠিক যে, Kehillah, B'nai B'rith, Anti-Defamation League, American Jewish Committee, Zionism ইত্যাদি সংগঠন ও মতবাদগুলো তাদের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এবং তারাই আজ পুরো বিশ্বে এক একটি বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়ে উঠেছে। তবে ইহুদিদের পুরো সম্প্রদায়কে দোষারোপ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। এতে সে সকল ইহুদিরাও অভিযুক্ত হবে, যারা আজ বিশ্বশান্তির জন্য জায়োনিস্টদের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। এখানে কেবল অপরাধীদের পরিচয় উপস্থাপনের প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। তবে দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে যে সকল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিস্তৃতি লাভ করছে, তার মূলে রয়েছে ইহুদিরা; যারা ধর্মকে বিশেষভাবে ব্যবহার করছে।
আমেরিকার এমন কোনো শহুরে মেজিস্ট্রেট ও থানা-আদালত পাওয়া যাবে না, যেখানে ইহুদিদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যাবে না। থানা-আদালতগুলোতে শত শত ফৌজদারি মামলা হওয়ার পরও পত্র-পত্রিকায় ইহুদিদের নাম দেখা যায় না। উকিল, বিচারক ও আইনজীবীরা যে বহু আগেই তাদের উপঢৌকনের নিকট বিক্রি হয়ে গেছে, সে গল্প তো আগেই উপস্থাপন করা হয়েছে।
১৯০৯ সালে নিউইয়র্কের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার General Bingham চারদিকে ঘটমান বিশেষ এই জাতিগোষ্ঠীটির অপরাধ কর্মের ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যা নিয়ে চতুর্দিকে হইচই পড়ে যায়। তিনি বলেন—
'আমি নিশ্চিত, আমেরিকার নিকৃষ্টতম বিচারব্যবস্থায় এমন অনেক উকিল ও আইনজীবী খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা এই প্রতিবেদনের প্রতিটি তথ্য মিথ্যা প্রমাণ করার প্রচেষ্টা চালাবে।'
প্রতিটি জাতি ও সম্প্রদায়ে অসহায় ও বিপর্যস্ত নারীদের পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ কিছু সংগঠন থাকে। যেমন: খ্রিষ্টানদের এমন কিছু সংগঠনের নাম হলো— Magdalen Home, Protestant Episcopal House of Mercy ও Catholic House of the Good Shepherd। এখানে ব্যতিক্রম কেবল ইহুদিরা।
নিউইয়র্কের সকল মেজিস্ট্রেট আদালতের সংগৃহীত তথ্য মতে, সমাজের দুই-তৃতীয়াংশ অসহায় নারী সমাজ ইহুদি জনগোষ্ঠীর অংশ। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অসহায় নারীদের দায়ভার গ্রহণ ও পূনর্বাসনের জন্য ইহুদিদের নির্দিষ্ট কোনো সংগঠন নেই! একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তারা তা বারবার ভঙ্গ করেছে। সবশেষে মানবিক মূল্যবোধ থেকে Protestant Episcopal House of Mercy সংগঠনটি এই অসহায় নারীদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
নিউইয়র্কের এক ইহুদি আইনজীবীর নাম শোনা যায়, যে ওয়ালস্ট্রিট শেয়ারবাজারের বিভিন্ন সদস্যকে সুকৌশলে কুৎসিত সব কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে ব্লাকমেইলের চেষ্টা করত। পুরো বাজারে সে 'Wolf of Wall Street' নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে এই নেকড়ে বাঘকে ফৌজদারি অপরাধের দায়ে জেলখানায় পাঠানো হলে তাকে রক্ষার এগিয়ে আসে Kehillah। অনেক প্রচেষ্টার পর তাকে জেল থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয়। যেহেতু বয়সে সে বার্ধক্যে পৌছে গেছে, তাই তার সঠিক চিকিৎসা দরকার— এমন একটি অজুহাতে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় মেজিট্রেটের বর্ণণা অনুযায়ী—
'ইহুদিরা এত বেশি আত্মকেন্দ্রিক যে, তাদের প্রতিটি প্রজন্মই জন্মের পর হতে বাবাদের চাপিয়ে দেওয়া ভ্রান্ত শিক্ষার ছায়ায় বড়ো হতে থাকে। খুব অল্প বয়সে ইহুদি সন্তানদের মগজে এমন কিছু খারাপ চেতনার বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যার দরুন পরিণত বয়সে তাদের হৃদয়ে মনুষ্যত্ব জাগ্রত করা সম্ভব হয় না। পুরো পৃথিবীকে ইহুদিদের সেবায় নিয়োজিত করতে হবে— এটাই তাদের বিশ্বাস। সাব্বাত হলো এমনই একটি উদাহরণ, যা তারা জোরপূর্বক অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা করছে। ইহুদিদের কাছে সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কোনো দাম নেই।'
যে ইহুদিদের কথা এখানে বলা হচ্ছে, তাদের অধিকাংশ মূলত পূর্ব ইউরোপীয় দেশ থেকে আগত। যেমন: রাশিয়া, গ্ল্যাশিয়া ও পোল্যান্ড। নিজ সম্প্রদায়ে মাঝে ইহুদিরা সর্বদা ইডিশ ভাষায় কথা বলে। জ্যান্টাইল ব্যবসায়ীদের সাথে লেনদেন করার পর তারা যে রশিদ ও ক্যাশ মেমো ধরিয়ে দেয়, তাও ঠিক একই ভাষায়। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শ্রমিকদের জোরপূর্বক কর্মস্থলে আসতে বাধ্য করার জন্য যখন ইহুদিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়, তখন তাদের রক্ষা করতে ইহুদি আইনজীবীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ইহুদিদের রক্ষার জন্যই বিচার বিভাগে প্রতিদিন নিত্যনতুন আইন তৈরি হতে থাকে।
আদালতে দাখিল করা হলে ইহুদি আইনজীবীরা বলে, পূর্ব ইউরোপে দেশগুলোতে বসবাসকালে তারা শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি পালন করত। তাই সেই সংস্কৃতি থেকে ইহুদিরা এখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি। আদালত পরামর্শ দেয়, শনি-রবি উভয় দিবসে যেন ইহুদিরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখে। কিন্তু অর্থের প্রতি তারা এতটা লোভী যে, সপ্তাহে দুই দিন ব্যবসায়-বাণিজ্য বন্ধ থাকবে— এমনটা মেনে নিতে পারেনি। তবে সমঝোতার ভিত্তিতে ইহুদিদের কিছু কিছু সংগঠন এ দিনে সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখতে রাজি হয়। যেমন: The Independent Ladies Garment Merchant Association Incorporated জুনের শেষ হতে আগস্টের শেষ পর্যন্ত রবিবার ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে রাজি হয়। কিন্তু যে শহরগুলোতে জ্যান্টাইলদের কোনো আধিপত্য নেই এবং আইনিব্যবস্থা খুব একটা জোরালো নয়, সেখানে শনিবারকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন রেখে রবিবার সকল ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু রেখেছে।
তা ছাড়া রবিবার যেহেতু জ্যান্টাইলদের সব শপিংমল ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো বন্ধ থাকে, তাই এ দিনে যদি ইহুদিরা নিজেদের দোকানপাট খোলা রাখতে পারে, তবে প্রতি ঘণ্টায় প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারবে। কারণ, বাজার তখন প্রতিদ্বন্দ্বীশূন্য থাকে। কিছুদিন আগে নিউইয়র্কের পঞ্চম অ্যাভিনিউ রেলওয়েতে একটি বড়ো বিজ্ঞাপন দেখা যায়, যেখানে উল্লেখ ছিল— প্রতি রবিবার, বিকেল ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ইহুদিদের একটি পাইকারি দোকান খোলা থাকবে। বিষয়টি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে যেই না পুলিশ ব্যবস্থা নিতে যাবে, অমনি বিজ্ঞাপনটি অদৃশ্য হয়ে যায়। তারা ভাবে, চুরি-চামারি করেও যদি এ দিনে কয়েক ঘণ্টার জন্য দোকান খোলা রাখা যায়, তাহলেও অনেক নগদ পয়সা উপার্জন করা যাবে।
নিউইয়র্ক প্রশাসন এই অর্থলোভী ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে বিশেষ একটি আইন পাশ করে। Penal Law ২১৪৯ অনুযায়ী—
'সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে যদি কোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালু রাখে, তবে শহরের মেজিস্ট্রেটগণ কোনো প্রকার গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া তাদের সকল পণ্য বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। পরবর্তী সময়ে এই পণ্য সমাজের দুঃস্থ, গরিব ও দাতব্য সংস্থার মাঝে বণ্টন করা হবে।'
সত্যি যদি এই আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে ইহুদি অর্থলোভী ব্যবসায়ীরা উচিত শিক্ষা পাবে।
তৃতীয় মেজিস্ট্রেটের বর্ণণা অনুযায়ী—
'আমেরিকাকে পুড়িয়ে ভষ্মীভূত করবে— এমন একটি উদ্দেশ্য নিয়ে পূর্ব ইউরোপিয়ান ইহুদিরা এ দেশে প্রবেশ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগ প্রতিদিন যেন বেড়েই চলেছে। ইহুদিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অসংখ্য ফৌজদারি মামলায় আমেরিকার আদালতগুলো পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর ইহুদি নারীদের কথা বলে তো লাভ নেই।
তারা এমনভাবে নিজেদের উপস্থাপন করে, যেন সমাজের স্বর্বহারা দুঃখী জনগোষ্ঠী। আমি কখনোই বলব না— তারা অসহায় বা অবলা নারী; বরং তারা নতুন একটি মতবাদকে এ সমাজে চাপিয়ে দিতে চাইছে আর তা হলো— ফেমিনিজম। নারী স্বাধীনতার নাম করে ইহুদি নারীরা সমাজে যে নোংরা সংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে, তা যে অদূর ভবিষ্যতে প্রতিটি সভ্য দেশে বিষফোঁড়ায় রূপ নেবে, তা এখনই বলে রাখছি।
অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রীয় প্রশাসন আজ ইহুদিদের অধীনে চলে গেছে। বাকি অংশটুকু গ্রাস করতেও মনে হয় না খুব বেশি সময় লাগবে। ক্ষমতার প্রতি লোভ সবারই থাকে। কিন্তু এই ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পরই যে ইহুদিরা অত্যাচারী হয়ে উঠে, তার নজির ইতিহাসে ভুরিভুরি পাওয়া যাবে। কিছুদিন আগে নিউইয়র্কের এক লন্ড্রি ব্যবসায়ী আমার নিকট অভিযোগ করেছে, ইহুদিরা সিন্ডিকেট উপায়ে এ শহরের পুরো লন্ড্রি ব্যবসায়কে নিজেদের করে নিয়েছে এবং তাকে সেখান থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। ইতিহাস বারবার এটাই প্রমাণ করে, সুযোগ হাতে পেয়ে প্রতিবারই ইহুদিরা অত্যাচারী হয়ে উঠেছে।
এ শহরের পোস্ট অফিসগুলোতে প্রায় ১১,০০০ কর্মী কাজ করে, যাদের অর্ধেকেরও বেশি ইহুদি। পোস্ট ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও তারা পৌঁছে গেছে। ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসবের দিনগুলো যেমন: রোশ হাসানা, নববর্ষ, ইয়ম কিপুর, প্রায়শ্চিত্ত দেবোস ইত্যাদি দিনগুলোতে তারা অফিসের যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ রাখে। অপর দিকে বড়োদিন, খ্রিষ্ট নববর্ষ, গুড ফ্রাইডে ইত্যাদি দিনগুলোতে পূর্ণ কর্ম দিবস পালন করে; এমনকী জ্যান্টাইলদেরও সেদিন কোনো ছুটি দেয় না।
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ইহুদিরা ইতোমধ্যেই প্রবেশ করতে শুরু করেছে, যা তাদের নতুন শক্তি এনে দিয়েছে। এখন ইহুদিরা নিজেরাই নতুন নতুন আইন তৈরি করতে পারবে এবং সুকৌশলে তা আমাদের জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে ঢুকিয়ে দেবে, যা পাঠ করে এ দেশের নতুন প্রজন্ম বড়ো হয়ে উঠবে। তাদের আইন অনুযায়ী শনিবার ইহুদিদের জন্য আদালত ও ফৌজদারি কার্যক্রম বন্ধ থাকবে এবং রবিবার ব্যবসায়িক কার্যক্রম খোলা রাখার অনুমতি থাকবে।'
আরও একজন মেজিস্ট্রেটের বক্তব্য অনুযায়ী—
'কয়েক বছর আগে যখন লন্ডন ভ্রমণে যাই, দেখি-রবিবার সরকারি ছুটির দিনে ইহুদিরা পুরোদমে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই সুযোগ সবার জন্য ছিল না। কেবল ঘেটো অঞ্চলগুলোতে এই দিনে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সেদিন খুব দূরে নয়, যখন তারা মুক্ত পদাঘাতে সকল ঘেটোর সীমানা পেরিয়ে আমাদের সমাজে বসবাস শুরু করবে এবং ইহুদি আইনসমূহ সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেবে।'
ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ইহুদিদের আক্রমণ
আন্তর্জাতিকভাবে ইহুদিদের চূড়ান্ত আক্রমণ আসে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় চেতনার ওপর। ধর্মীয় চেতনাই ছিল শেষ শিকড়, যা আঁকড়ে ধরে আমরা বহু শতাব্দী অবধি নিজেদের ভ্রাতৃত্ব বন্ধন অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু বিশেষ সেই গোষ্ঠীর কাছে এই ধর্মভীরু চেতনা ছিল ইহুদি সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার পথে সর্বশেষ প্রতিবন্ধকতা। কীভাবে একটি জাতিকে নাস্তিক জাতিতে পরিণত করা যায়, সে সম্পর্কে তাদের প্রটোকলগুলোতে বেশ কিছু দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেমন:
'খোদাভীতি ও সৃষ্টিকর্তাকেন্দ্রিক ধর্মীয় বিশ্বাস মুছে ফেলার জন্য আমরা জ্যান্টাইলদের হৃদয়ে গাণিতিক বিভিন্ন হিসাব-নিকাশের ধারণা প্রতিস্থাপন করব এবং বস্তুবাদী পৃথিবীর প্রতি আকৃষ্ট করে তুলব। নাস্তিক জাতিতে পরিণত হওয়ার দরুন নির্দিষ্ট কোনো শাসনব্যবস্থায় তাদের আর বিশ্বাস থাকবে না। ফলে রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার বিষয়টি হয়ে যাবে জনগণের সম্পত্তি, যা থেকে আমরা ইচ্ছামতো ফায়দা লুটে নেব। আমরা তাদের ওপর এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা চাপিয়ে দেবো, যা তাদের নৈতিক চেতনা পঙ্গু করে দেবে এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পর্যন্ত ধ্বংস করে দেবে।'— ৫ম প্রটোকল
'প্রভাবশালী জ্যান্টাইল পাদরিদের ক্ষমতা হ্রাস করতে বহু আগ থেকেই আমরা তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছি।'— ১৭তম প্রটোকল
'বিশ্ব শাসন ক্ষমতার একক অধিপতি হওয়ার পর আমরা কেবল নিজেদের ধর্ম প্রচার করব। এর বিষয়বস্তু হবে— এক ঈশ্বর; আমরাই সৃষ্টিকর্তার মনোনীত সম্প্রদায় এবং পুরো বিশ্ববাসীর ভাগ্য একমাত্র আমাদের ভাগ্যের সঙ্গেই জড়িত। ফলে আমাদের ধর্ম ব্যতীত পৃথিবীর সকল ধর্ম ধ্বংস হবে এবং সবাই ইহুদি ধর্মে বিশ্বাস স্থাপন শুরু করবে। এর মধ্যে যদি কোনো গোঁড়া নাস্তিকের জন্ম হয়, তবে সে আমাদের জন্য কোনো হুমকির কারণ হবে না।'— ১৪তম প্রটোকল
'সকল ধর্মের সমান অধিকার' বিষয়টি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ইহুদিরা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ইউরোপ তৈরি করল। ১৯০৬ সাল থেকে আমেরিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সিলেবাস থেকে ধর্মীয় শিক্ষা পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার জন্য ইহুদিরা ক্রমান্বয়ে চাপ বৃৃদ্ধিত করতে থাকে। এবার ইহুদি ও আমাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ইহুদি আক্রমণের ঘটনা পর্যায়ক্রমে নিচে তুলে ধরা হলো:
৫৬৬১ (১৮৯৯-১৯০০ খ্রি.) ভার্জিনিয়া প্রদেশের সকল প্রশাসনিক অফিস থেকে 'খ্রিষ্টান' শব্দটি সরিয়ে দিতে ইহুদিরা আন্দোলন করে।
৫৬৬৭ (১৯০৬-১৯০৭ খ্রি.) সংবিধান থেকে যিশুর নাম সরিয়ে দিতে ওকলাহোমায় আন্দোলন করে। ইহুদিদের মতে, সেক্যুলার রাষ্ট্রের সংবিধানে ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহার করা নিন্দনীয়।
৫৬৬৮ (১৯০৭-১৯০৮ খ্রি.) ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র তৈরি দাবিতে চারদিকে ইহুদি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
৫৬৬৯ (১৯০৮-১৯০৯ খ্রি.) কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন দিবসে (Thanks Giving Day) খ্রিষ্ট ধর্মীয় সকল পরিভাষা বর্জন করতে হয়। ইহুদি প্রফেসর Gotthard Deutsch বলেন— 'উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রার্থনা সংগীত চর্চা বন্ধ করতে হবে।'
৫৬৭৩ (১৯১২-১৯১৩ খ্রি.) নিউইয়র্কে ইহুদি জনসংখ্যা হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ার দরুন সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলোতে সচিব ও কেরানির চাহিদা বাড়তে শুরু করে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করত 'Christian preferred' বা 'Jews please do not apply'। সে বছর ইহুদি সংগঠনগুলো এ নিয়ে গভীর উদবেগ প্রকাশ করে। ইহুদিরা বলে, তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা এসব বিজ্ঞাপন থেকেই বোঝা সম্ভব।
৫৬৭৯ (১৯১৮-১৯১৯ খ্রি.) সামরিক বাহিনীতে নতুন কিছু রাজমিস্ত্রী চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় এবং সেখানে 'Christian preferred' উল্লেখ করা হয়। কেন এমন বিজ্ঞাপন প্রচার করা হলো, তার কৈফিয়ত জানতে Newton D. Baker-কে তলব করে Louis Marshall-এর নিকট পাঠানো হয়। প্রশ্ন হচ্ছে— এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর কয়জনই-বা রাজমিস্ত্রী পেশায় জড়িত!
সৈন্য নিয়োগ বিভাগের দায়িত্বে থাকা Provost Marshall Crowder এক বিবৃতিতে বলেন— 'যারা জন্মসূত্রে আমেরিকান নয়; বিশেষ করে ইহুদিরা, সামান্য কয়েকদিনের পরিশ্রমে একেবারে ভেঙে পড়ে। তাদের পক্ষে সমরিক বাহিনীতে বেশি দিন টিকে থাকা অসম্ভব।' বিষয়টি Louis Marshall-এর কানে পৌঁছামাত্র তিনি Mr. Crowder-কে টেলিগ্রাম করে বিবৃতিটি সরিয়ে নিতে বাধ্য করেন।
ইউনাইটেড শিপিং বোর্ড নতুন কিছু খ্রিষ্টান কর্মী চেয়ে Times পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে তারা বিজ্ঞাপনটি সংশোধন করে প্রকাশ করে, আগ্রহী প্রার্থীরা যেন আবেদনপত্রে ধর্ম ও জাতীয়তা উল্লেখ করে। কেউ এ নিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রদান করেছে কি না, তা ভাইভা বোর্ড খতিয়ে দেখে খ্রিষ্টানদের চাকরিতে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কেন ধর্ম ও জাতীয়তা নিয়ে তারা এত বাড়াবাড়ি করল, তা নিয়ে ইহুদি সংগঠনগুলো কৈফিয়ত দাবি করে।
Kehillah বলে— 'আমি যে ইহুদি, এটা শুধু আমি জানলেই চলবে। বাহিরের মানুষ এসব জেনে কী করবে?' পরে প্রেসিডেন্ট সাহেবকে দিয়ে আইন পাশ করিয়ে শিপিং কোম্পানিটিকে শাস্তির মুখোমুখি করা হয়।
একই বছর ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম এবং লিবার্টি লোন কমিটি কিছু খ্রিষ্টান শর্টহ্যান্ড লেখক চেয়ে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। তাৎক্ষণিক Benjamin Strong প্রতিষ্ঠান দুটির চেয়ারম্যানের নিকট প্রতিবাদপত্র প্রেরণ করেন। পরে তারা বাধ্য হয়ে বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে নেয়। এমন বিজ্ঞাপনের জন্য ট্রেজারি সেক্রেটারি McAdoo আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান।
৫৬৮০ (১৯১৯-১৯২০ খ্রি.) এ বছর থেকে ইহুদি প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞাপনগুলোতে ইহুদি প্রার্থীদের কথা উল্লেখ করতে সক্ষম হয়। আগের বছর যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান খ্রিষ্টান কর্মী চেয়ে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করতে পারত না, সেখানে এ বছর তারা ইহুদি কর্মী চেয়ে বিজ্ঞাপণ প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। এটাই ইহুদিদের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।
৫৬৬৮ (১৯০৭-১৯০৮ খ্রি.) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাইবেল পাঠ ও বড়োদিন উদ্যাপন বন্ধ করার জন্য ইহুদিরা আন্দোলন শুরু করে। গালভেস্টোন, ক্লিভল্যান্ড, এল পাসো এবং ইংগস্টাওন-এর শিক্ষা বোর্ডগুলোকে বাধ্য করে, যেন পরবর্তী বছরের পাঠ্যসূচিতে 'Merchant of Venice' অন্তর্ভুক্ত করা না হয়।
৫৬৬৯ (১৯০৮-১৯০৯ খ্রি.) ইহুদিদের ভীষণ চাপের মুখে পেনসিলভানিয়ার বিদ্যালয়গুলো প্রাত্যহিক বাইবেল পাঠ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। নিউ জার্সির বিদ্যালয়গুলোতে বাইবেল পাঠ শিক্ষার্থীদের জন্য ঐচ্ছিক করা হয়। অর্থাৎ ধর্মীয় বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের চাপ দেওয়া যাবে না। লুইসিয়ানার বিদ্যালয়গুলোতে বাইবেল পাঠ বন্ধ করতে স্থানীয় সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। বাল্টিমোরে ইহুদি নারী সমিতি শিক্ষাবোর্ডের নিকট দরখাস্ত করে, যেন বিদ্যালয়গুলোতে বড়োদিনের চর্চা বন্ধ করা হয়। ইহুদিদের চাপের মুখে ফিলাডেলফিয়ার শিক্ষা বোর্ড বড়োদিন চর্চা বন্ধ করে দেয়। রবিবারে ইহুদিরা যেন নিজেদের সকল শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালত চালু রাখতে পারে, তার অনুমতি চেয়ে নিউইয়র্ক হিব্রু পরিষদ স্থানীয় সরকারের নিকট আবেদন করে।
৫৬৭০ (১৯০৯-১৯১০ খ্রি.) পেনসিলভানিয়ার ব্রিজপোর্ট শিক্ষাবোর্ড সেখানকার বিদ্যালয়গুলোতে প্রার্থনা সংগীত গাওয়া বন্ধ করে দেয়। একই ঘটনা কেনটারি বিদ্যালয়গুলোতেও ঘটে। ক্লিভল্যান্ডের কিছু শিক্ষকের প্রচেষ্টায় 'Merchant of Venice' পুনরায় পড়ানো শুরু হলে একদল চরমপন্থি ইহুদি এপ্রিল মাসের গোড়াতে বিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষকে জোড়পূর্বক গল্পটি সরিয়ে নিতে বাধ্য করে।
৫৬৭১ (১৯১০-১৯১১ খ্রি.) ক্যালিফোর্নিয়ার ডেট্রইট শহরে অবস্থিত বিদ্যালয়গুলোতে প্রাত্যহিক বাইবেল পাঠ ও হামদ-নাত গাওয়ার বিরুদ্ধে ইহুদিরা প্রতিবাদ করে। নিউইয়র্কের বিভিন্ন স্থানে শনিবারের কর্ম দিবস বন্ধ রেখে রবিবার সবকিছু খোলার আইনি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।
৫৬৭২ (১৯১১-১৯১২ খ্রি.) কনেকটিকাট প্রদেশের হার্টফোর্ড শহরে অবস্থিত বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মচর্চা বাতিল করা হয়। নিউজার্সির বিদ্যালয়গুলোতে বাইবেল পাঠ ও ধর্মীয় সংগীত বন্ধ করার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব করা হয়। তিনজন প্রভাবশালী রাবাইয়ের অনুরোধে ম্যাসাচুসেট প্রদেশের রক্সবারি জেলার বিদ্যালয়গুলো থেকে Christmas tree ও খ্রিষ্টীয় সকল চিহ্ন সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে হার্টফোর্ড ও কানেকটিকাট শিক্ষাবোর্ড সকল সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি থেকে 'Merchant of Venice' সরিয়ে নেয়।
৫৬৭৩ (১৯১২-১৯১৩ খ্রি.) টেনসি শহরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাইবেল বন্ধ করানো হয়। ভার্জিনিয়া প্রদেশের রিচমন্ড শিক্ষাবোর্ড পুনরায় বাইবেলকে নিজেদের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে। পেনসিলভানিয়ার স্থানীয় সরকারের নিকট আবেদন করা হয়, যেসব শিক্ষক এখনও বাইবেল পড়াচ্ছে, তাদের যেন চাকরিচ্যুত করা হয়। তাদের চাপের মুখে পড়ে শিকাগো ও ম্যাসাচুসেটের শিক্ষাবোর্ড ধর্মীয় শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ জার্সিতে রবিবার কর্ম দিবস হিসেবে বরাদ্দ করার দরখাস্ত করা হয়।
৫৬৭৪ (১৯১৩-১৯১৪ খ্রি.) আমেরিকান সরকার অভিবাসন বিষয়ে নতুন নীতি প্রণয়ন করে। তখন ইহুদিরা জোড় প্রচেষ্টা চালায়, যেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইন পাশ না হয়।
৫৬৭৫ (১৯১৪-১৯১৫ খ্রি.) ক্যালিফোর্নিয়ার শিক্ষাবোর্ডকে কিছু বিষয় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, যেন সেগুলো শিক্ষার্থীদের পড়ানো না হয়।
৫৬৭৬ (১৯১৫-১৯১৬ খ্রি.) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে বাইবেল পাঠ বন্ধ করা নিয়ে ইহুদিদের এতসব আন্দোলন এ বছর সফল হয়। এ বছর থেকে ইহুদিরা 'Merchant of Venice'-এর সাথে 'Lamb's Tales' গল্পটিকেও সরিয়ে দেওয়ার আন্দোলনে নামে।
৫৬৭৭ (১৯১৬-১৯১৭ খ্রি.) অভিবাসন আইন নিয়ে ইহুদিরা এ বছর খুব ব্যস্ত ছিল। পরিশেষে সফলও হয়। এই বছর থেকে আমেরিকায় ইহুদিদের প্রবেশে আর কোনো বাধা থাকল না।
১৯১৯ সালের মধ্যে আমেরিকার ১৫০টি শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ইহুদিরা Merchant of Venice' ও 'Lamb's Tales' গল্প দুটিকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়। শিকাগো শিক্ষাবোর্ডের নিকট ইহুদিদের পাঠানো চিঠির অংশ বিশেষ নিচে উপস্থাপন করা হলো:
'আমরা জানতে পেরেছি, উচ্চমাধ্যমিক অনেক বিদ্যালয়ে এখনও Merchant of Venice নিয়মিত পড়ানো হচ্ছে। আমরা এই ভেবে ভীত হচ্ছি না যে, গল্পটি পাঠ করানোর দরুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ইহুদি শিক্ষার্থীরা মানসিক হিনম্মন্যতার স্বীকার হবে; বরং জ্যান্টাইল সন্তানদের অবচেতন মনে এটি ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক চেতনার জন্ম দেবে। এটা মানতে হবে, শেক্সপিয়র গল্পটি লিখেছেন কয়েক শত বছর আগে। তখনকার এবং আজকের পারিপার্শিক অবস্থা এক নয়। গল্পটি তিনি তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। এটা কেবল আপনাদের মতো পূর্ণবয়স্করা বুঝতে পারবে; নাবালক বাচ্চার এর কিছুই বুঝবে না।
শেক্সপিয়রকে যেমন আপনারা ভালোবাসেন, তেমনি আমরাও ভালোবাসি। গল্পটির 'Shylock' চরিত্রটি যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা সত্যি নাবালক সন্তানদের মনে সাম্প্রদায়িক মনোভাবের জন্ম দেবে। এই মানসিকতা নিয়ে বড়ো হলে আমরা কখনো একে অপরের বন্ধু হতে পারব না।
আমাদের বিষয়টির গুরুত্ব অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে এই গল্প ভর্তি পরীক্ষার সিলেবাস হতে বাদ দিয়েছে। আসা করি আপনারাও গল্পটি পাঠের ক্ষতিকর দিকগুলো উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে তা অবিলম্বে পাঠ্যসূচি হতে অপসারণ করবেন।'
মজার বিষয় হলো— তারা আগে থেকেই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষদের সঙ্গে আলাপ সেরে রাখত। চিঠি পাঠানো ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা। এটা ঠিক যে, বিদ্যালয়গুলোতে আর এই গল্পটি পড়ানো হবে না। তারপরও কোনো জ্যান্টাইল সন্তান যদি ঘরে বসে এই গল্পটি পাঠ করে, তবে তারা কি আর বাধা দিতে পারবে? মূলত ইহুদিরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে, যেন এই গল্পটি সমাজ থেকে মুছে দেওয়া যায়। মানুষ তো এখন আর বই পড়ে না। সিনেমা হলে গিয়ে সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করে। অতঃপর ইহুদিরা গল্পটির মূল কাহিনি যতটা সম্ভব পরিবর্তন করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে শুরু করে। কিছু উক্তি বাছাই করে তারা এমনভাবে প্রচার শুরু করে, যেন শেক্সপিয়র তাঁর অমৃত বাণীগুলো ইহুদিদের জন্যই রেখে গেছেন! যেমন:
'হ্যা, আমি একজন ইহুদি। ঈশ্বর কি আমাদের দেখার জন্য চোখ দেননি? তিনি কি আমাদের হাত, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, আবেগ, ভালোবাসা, অনুভূতি কিছুই দেননি?'
এরপর ইহুদিদের রোষানলে পড়ে আরেকটি কালজয়ী নাট্য-উপন্যাস, Macbeth। ধীরে ধীরে এমন আরও অনেক গল্প যে এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত হবে, তা সময়-ই দেখিয়ে দেবে। এসব ঘটনা প্রতিদিন-ই ঘটে চলছে। শুধু আমেরিকায় নয়; গোটা পৃথিবীকেই তারা ধর্মনিরপেক্ষ করার জোড় প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। যেখানে ইহুদিরা প্রকাশ্যে কাজ করতে পারছে না, সেখানে কাজ করছে এজেন্ট। আগেই বলেছি, জ্যান্টাইলরা অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করে অভ্যস্ত নয়; বরং অন্যের অধিকার রক্ষায় নিজেকে উৎসর্গ করাই তাদের রীতি। যে উদারপন্থি ও মুক্তমনা নীতিকে আমরা প্রগতির অংশ বলে মনে করেছি, তা-ই আমাদের সর্বহারা করে দিচ্ছে। একমাত্র ধর্মীয় শিক্ষাই পারে একটি জাতিকে আদর্শ ও শালীনরূপে গড়ে তুলতে। যে শিক্ষা নিয়ে আমরা শৈশবের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব জগতের মুখোমুখি হব, তার সাথে যদি ধর্মীয় জ্ঞানের সমন্বয় না থাকে, তবে একসময় আমরা অসভ্য জাতিতে পরিণত হব। কারণ, তখন আমাদের বিবেকবোধ ও নৈতিকতা বলতে কিছুই থাকবে না। অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে ইহুদিদের আরও কিছু কুকর্মের বিবরণ নিচে উপস্থাপন করা হলো—
৫৬৬৯ (১৯০৮-১৯০৯ খ্রি.) ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইহুদিরা সাব্বাতকে জনসাধারণের মাঝে প্রচার করতে থাকে। ইহুদি উকিলরা অসুস্থতার দোহাই দিয়ে শনিবারের ফৌজদারি মামলাগুলোকে পিছিয়ে দেয়। ব্যবসায়ীগণ এ দিনে নিজেদের কার্যক্রম বন্ধ রেখে বে-আইনিভাবে সবকিছু রবিবার খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এভাবে ধীরে ধীরে অনেক আমেরিকান এতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
৫৬৭০ (১৯০৯-১৯১০ খ্রি.) ইহুদিরা শনিবারকে রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন প্রতিষ্ঠায় জোর প্রচেষ্টা চালায়। সেইসঙ্গে শুক্রবার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিস-আদালত যেন অর্ধ দিবস করা হয়, সেই আবেদনও করে। কারণ, সাব্বাত শুরু হয় শুক্রবার বিকাল থেকে, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়।
৫৬৭১ (১৯১০-১৯১১ খ্রি.) নিউইয়র্কের সুপ্রিমকোর্টে হিব্রু শিরোনামে ইহুদিরা একটি দরখাস্ত জমা দেয় 'Agudath Achim Kahal Adath Jeshurun'। তারা ভেবেছিল, বিচারক সাহেব হয়তো শিরোনামটুকু বাদ দিয়ে বাকি অংশ পড়ে নেবেন, কিন্তু তিনি পুরো দরখাস্ত পুনরায় ইংরেজিতে লিখে আনার কড়া নির্দেশ দেন। অন্যদিকে, ইহুদিরা শিকাগো নির্বাচন পিছিয়ে দেয়! কারণ, তা শনিবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
৫৬৭৩ (১৯১২-১৯১৩ খ্রি.) নিউ জার্সি, বেয়ন, হবকন ও ইউনিয়ন হিলসহ আরও অনেক শহরে ইহুদিরা শনিবার রাষ্ট্রীয় ছুটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
৫৬৭৪ (১৯১৩-১৯১৪ খ্রি.) অভিবাসন বিভাগ ইহুদি কর্মীদের জন্য শনিবার ছুটির ব্যবস্থা করে। ইহুদিদের পশু হত্যা প্রথা the Shehitah-এ বছরই প্রথম আলোচনায় আসে।
Kosher food হলো ইহুদিদের এক ধরনের ধর্মীয় ভোজ, যা বিভিন্ন প্রাণী ও পোকামাকড়ের শরীর দিয়ে তৈরি করা হয়। সরকারি স্কুলগুলোতে একসময় এই খাবার নিষিদ্ধ ছিল। কারণ, সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে তা গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। ইহুদিরা প্রতিবাদ করে বলে, তাদের অনেক সন্তানও তো এসব স্কুলে অধ্যয়ন করছে, অন্তত তাদের জন্য যেন এই খাবারের বৈধতা দেওয়া হোক। সেই প্রস্তাবনা বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ডের নিকট পৌঁছে দেওয়া হয়।
৫৬৭৭ (১৯১৭-১৯১৮ খ্রি.) হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় শনিবার কেন ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করল, তা নিয়ে প্রচুর সমালোচনা শুনতে হয়। তখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইহুদিদের প্রতি অধিক সচেতন হয়।
এভাবে চলতে থাকলে প্রতিবছরের ক্যালেন্ডার এমনভাবে সাজাতে হবে, যেন সংখ্যালঘু এই সম্প্রদায়টির সাথে কোনো ধরনের ঝামেলা না বাধে। তবে পৃথিবীতে অনেক ভালো ইহুদি খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা পরিবর্তিত তালমুদের অনুসারী নয়। কিন্তু এই গোষ্ঠিটি সংখ্যায় খুবই কম। আসলে পয়গম্বর মোজেসের ওপর আসা সেই তাওরাত আজও অক্ষুণ্ণ আছে কি না, তা নিয়ে বহু বিতর্ক রয়েছে। বাজারে এর অনেক ভার্সন খুঁজে পাওয়া যাবে।
একটি বিষয় লক্ষণীয়, ইহুদিদের এই ভালো জ্ঞাতি ভাইদের কখনো মিডিয়ার সামনে দেখা যায় না; মূলত আসতে দেওয়া হয় না। কারণ, ইহুদিরা চায় না, তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত ইহুদিদের মধ্য থেকেই হোক।
ইহুদিদের ধর্মীয় সংগীত 'Kol Nidre' এবং 'Eli, Eli' সম্পর্কে আলোচনা।
সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকার তিনটি শহরের (নিউইয়র্ক, ডেট্রইট, শিকাগো) থিয়েটার হলগুলোতে ইহুদিদের একটি ধর্মীয় সংগীত নিয়মিত পরিবেশিত হতে শোনা যাচ্ছে। প্রতিবার আমাদের এটাই বলা হচ্ছে যে, বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গানটি পরিবেশিত হচ্ছে। কিন্তু কারা এই সংগীতটি শোনার জন্য অনুরোধ করছে? এমন মিথ্যাচারের উদ্দেশ্য কী হতে পারে? সংগীতটির নাম হলো Eli।
১৯২০ সালে Jewish Daily News পত্রিকায় একজন ইহুদি লেখক একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি ইহুদি বর্ষ ৫৬৮১-কে অরাজকতাময় বর্ষ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন—
'নিজেদের জীবনধারায় ইহুদিরা যে একের পর এক ভুল করে চলেছে, তা তারা কখনোই আমলে আনবে না। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে তারা যে বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছে, তা বর্ণণাতীত।'
বিগত বছরে বিশ্বজুড়ে ইহুদিরা যে অরাজকতার জন্ম দিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: প্যালেস্টাইনে বিশৃঙ্খলতা, অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ-বিগ্রহে হস্তক্ষেপ, নিজ জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, স্বার্থপরতা, আত্ম-বিভ্রম ইত্যাদি। ইহুদিরা মানসিকভাবে অসুস্থ।
৫৬৮২ সালকে সামনে রেখে বলতে চাই, তাদের আর ইহুদি বলে সম্বোধন না করে ইজরাইলি বলে সম্বোধন করাই শ্রেয়। তাদের বিশ্বাস এই জাতির ভবিষ্যৎ সফলতা কেবল ইজরাইল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সম্ভব এবং এটাই চূড়ান্ত ঠিকানা। ইহুদিদের পররাষ্ট্রনীতির সার সংক্ষেপ এই যে, পুরো পৃথিবী তাদের আধিপত্য ও বশ্যতা নির্দ্বিধায় মেনে নেবে।
এ জাতির প্রকৃত শত্রু মূলত তারাই, যারা ধর্মের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের মুনাফার পকেট ভারী করছে, যেমন: American Jewish Committe এবং রাজনৈতিক রাবাইগণ। বর্তমানে আমরা এমন এক মহান নেতার জন্য অপেক্ষা করছি, যিনি আমাদের নির্দয়, স্বার্থপর ও দুর্নীতিবাজ সমাজ থেকে মুক্তি দেবে। একই সঙ্গে ধ্বংস করবেন সে সকল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের, যারা আমাদের ধর্মকে কলুষিত করেছে। প্রকৃত মুক্তি তখনই মিলবে, যখন অন্যের সম্পদ জবরদখল করার পরিবর্তে আমরা পরিশ্রমের মাধ্যমে রুটি-রুজি উপার্জন করতে শিখব।
তখন দেখা যাবে— আমরাও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। আসলে 'ইহুদি' ও 'ইজরাইলি ইহুদি' বিষয় দুটির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের মাঝে কিছু বহিরাগত জীবের আগমন ঘটেছে। তাদের সনাক্ত করা হলেও আমাদের নেতাগণ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কারণ তাদের বিশ্বাস, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এ জাতীয় কিছু শক্তিশালী প্রাণীর প্রয়োজন। এই বহিরাগত প্রাণীরা ভবিষ্যতে যে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দেবে, তা এখনই বোঝা যাচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে, সত্যকে দমিয়ে রেখে কখনো একতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। প্রকৃত একতা প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে মিথ্যাকে স্থান দেওয়া যাবে না। সত্য যতই কঠিন হোক না কেন, তা সবাইকে মেনে নিতে হবে। একই আদর্শ ইহুদিদেরও হওয়া উচিত। DEARBORN INDEPENDENT যে সত্য প্রচারের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে, তার উদ্দেশ্য মূলত দুটি। এক, ইহুদিরা যেন নিজেদের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে। দুই, জ্যান্টাইল সম্প্রদায়গুলো যেন বিশেষ এই জাতিগোষ্ঠীটির সকল ছলচাতুরী সম্পর্কে নিজেদের সচেতন করে তুলতে পারে।
আমেরিকার সবচেয়ে বড়ো থিয়েটারের চূড়ায় অঙ্কিত হয়েছে স্টার অব ডেভিডসহ আরও অনেক ইহুদি প্রতিকৃতি। যেকোনো অনুষ্ঠানের শুরুতে কীর্তন করে গাওয়া হয় ইহুদিদেরই লেখা স্মৃতি-সংগীত, যা একসময় অসম্ভব ছিল। তবে Anti-Defamation League-এর ক্ষমতার বলে ইহুদিরা এ কাজ প্রতিটি আজ ছোটো-বড়ো প্রাব প্রতিটি শহরে করে যাচ্ছে।
তাদের 'Kol Nidre' সংগীতটির অর্থ হলো— 'সকল প্রতিশ্রুতি'। ইহুদিদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সংগীত তালমুদ ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে—
'যে ব্যক্তি এই আকাঙ্ক্ষা করে, তার সকল শপথ ও প্রতিশ্রুতির কোনো মূল্য থাকবে না এবং তা পূরণে সে বাধ্য থাকবে না, তবে সে যেন বছরের শুরুতে 'Kol Nidre' সংগীতের চর্চা করে।'
সত্যি বলতে, এই Kol Nidre সম্পর্কে প্রাচীন তালমুদে পৃথক কোনো ঘোষণা আসেনি। ১৯১৯ সালে নিউইয়র্কে অবস্থিত Hebrew Publishing Company কর্তৃক প্রকাশিত 'Festival Prayers (প্রার্থনা সংগীত)' খণ্ডে প্রথমবারের মতো এই সংগীতটির উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা পরবর্তীতে ইহুদি সংগঠনগুলো অনুমোদন করে। ১৯১৯ সালে প্রথমবার সংগীতটি যেভাবে প্রকাশিত হয়—
'বিভিন্ন নিবেদিত নামের ওপর কসম কেটে শপথ, প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার করেছি, এক প্রায়শ্চিত্র দিবস (ইয়ম কিপুর) হতে অপর প্রায়শ্চিত্র দিবস (ইয়ম কিপুর) পর্যন্ত, যা পরিপূর্ণ করতে আমরা সবাই বাধ্য ও অনুগত; নতুবা অনুতপ্ত, তা হতে আজ আমাদের মুক্তি দেওয়া হলো। আজ হতে আর কোনো শপথ আমাদের নিকট শপথ বলে গণ্য হবে না, কোনো প্রতিশ্রুতি পূরণের বাধ্যবাধ্যকতা থাকবে না এবং কোনো অঙ্গীকারের প্রতি আমাদের আনুগত্য থাকবে না।'
এটা যদি ইহুদিদের রহস্যময় অতীতের পরিচয় বহন করে, তবে তা কখনো অবহেলার চোখে দেখা উচিত নয়। এমন একটি সংগীত যা কখনো তাদের গ্রন্থে ছিল না, কিন্তু ১৯১৯ সালের সংশোধিত খণ্ডে প্রকাশ পেয়েছে। তখন বোঝা যায়, এটা নতুন করে সংযোজন করা হয়েছে। ইহুদিদের কাছে এই সংগীতের গুরুত্ব নেহাত কম নয়। বছরের শুরুতে কিছু ইহুদি বেহালা বাদক নিউইয়র্কে হাজির হয় এবং তাদের ঘিরে হাজারো ইহুদি ভক্ত কান্না শুরু করে। বেহালা বাদকের Kol Nidre গাওয়ার মধ্য দিয়ে ভক্তদের কান্নার পরিসমাপ্তি ঘটে। শেষ মুহূর্তে তারা এমনভাবে কাঁদতে শুরু করে, যেন নির্বাসিত জনগোষ্ঠী বহু বছর পর নিজ ভূমিতে ফিরে এসেছে।
এই সংগীত ইহুদিদের হৃদয়ের পবিত্র আবেগ ও ভালোবাসার একটি অংশ। তবে এই সংস্কৃতি জ্যান্টাইল সমাজ ব্যবস্থার জন্য কতটা হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা এই সংগীতের প্রতিটি বাক্যের ওপর গভীরভাবে দৃষ্টিপাত না করলে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এর সাথে যে বাদ্যসুরের চর্চা করা হয়, তা প্রাচীন ও জনপ্রিয়। Jewish Encyclopedia- তে এর প্রেক্ষাপট যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তা থেকে বোঝা যায়— চাইলেও এ সংগীত অর্চনা বন্ধ করা সম্ভব নয় এবং ইহুদিদের পাঠ্যপুস্তক থেকে এটি মুছে দেওয়া অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, সময়ের প্রয়োজনে ইহুদিরা এর প্রতিটি বাক্য ও শব্দ বিন্যাসে পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ, নিয়মিত পরিবর্তন ও পরিমার্জন করাও ইহুদি সংস্কৃতির একটি অংশ।
যদি এমন হতো, ইহুদিদের প্রার্থনা সংগীতে অতীত জীবনে ঘটে যাওয়া সকল ভুল- ত্রুটির জন্য ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে, তবে তা ভিন্ন বিষয় ছিল। মানুষ স্বভাবতই ধর্মের প্রতি উদাসীন এবং মন্দ কাজের প্রতি অধিক আগ্রহী। তবে পুনরায় যখন ধর্মের কথা স্মরণ হয়, তখন সৃষ্টিকর্তার প্রতি পূর্বের সকল কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চায় এবং লজ্জিত হয়। এমনটা সব ধর্মেই দেখা যায়।
কিন্তু ইহুদিদের প্রার্থনা সংগীত Kol Nidre যেন অগ্রিম ঘোষণা দিয়ে রাখছে— ভবিষ্যৎ যেকোনো প্রতিজ্ঞা, প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার পালনে তারা আর বাধ্য থাকবে না। এটা যদি সত্যি ইহুদি ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হয়, তবে তাদের সঙ্গে কখনোই ব্যবসায়িক বা সামাজিক লেনদেনে যাওয়া উচিত নয়।
Kol Nidre-এর প্রকৃত প্রেক্ষাপট মূলত ব্যাবিলন থেকে শুরু। সেখানে ইহুদিদের দীর্ঘ একটি সময় বন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়েছিল, যা তাদের মনে ভীষণভাবে দাগ কেটেছিল। কী উদ্দেশ্য নিয়ে Kol Nidre-এর আবির্ভাব, তা অনেকেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। নতুন একটি ভালো ব্যাখ্যা সামনে দাঁড়ানো মাত্রই পূর্বের ব্যাখ্যাটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
তবে সবাই একটি বিষয়ে একমত, বহু শতাব্দী ধরে রক্তপিপাসু খ্রিষ্টান জাতি পবিত্র যিশুর নামে ইহুদিদের ওপর যে বর্বর নিপীড়ন চালিয়েছে এবং খ্রিষ্টধর্মের প্রতি বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করেছে, তা থেকে পরিত্রাণ লাভের উপায় হিসেবে তারা এই সংগীত-অর্চনা সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। রক্ত-পিপাসু খ্রিষ্টানরা যদি ইহুদিদের খ্রিষ্টধর্মের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে বাধ্য করে, তবে মুখে তারা সে বশ্যতা স্বীকার করলেও মন থেকে কখনো করবে না।
এই সংগীতের সঠিক উৎপত্তিকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বেশ মতোভেদ রয়েছে। ১৯২১ সালের ১১ অক্টোবর Cleveland Jewish World সমাচার থেকে এই সংগীতের ওপর একটি কলাম প্রকাশ করা হয়, যার অংশবিশেষ নিচে তুলে ধরা হলো—
'অনেকে বিশ্বাস করে, স্পেনে যখন ইহুদিদের ওপর প্রথম নির্যাতন শুরু হয়, তখন তারা Kol Nidre সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, নিপীড়ন থেকে রক্ষা পেতে খ্রিষ্টধর্মের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করা ছাড়া তাদের আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তারা নিয়মিত বাঙ্কারে জমায়েত হতে শুরু করে এবং দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে এই সংগীত রচনা করে, যা স্বীকার করে আগামী বছরগুলোতে ইহুদিদের যে শপথ বা প্রতিশ্রুতি গ্রহণে বাধ্য করা হবে, তাদের নিকট এর কোনো মূল্য থাকবে না...'
একসময় খ্রিষ্টানরা যখন এই গুপ্ত অবস্থানের কথা জেনে যায় এবং বাঙ্কারের নিচ থেকে শত-সহস্র ইহুদিদের খুঁজে বের করে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাতে শুরু করে, তখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য ইহুদি সদস্যরা Kol Nidre-কে নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ বলে গ্রহণ করতে শুরু করে।
এ সকল বিবৃতির একটিও সঠিক নয়। এই সংগীতের ইতিহাস আরও পুরোনো। স্পেনিশ নিপীড়নেরও বহু শতাব্দী পূর্বে ইয়ম কিপুরের কোনো এক রাতে এই সংগীত রচিত হয়ছ। নবম শতাব্দীতে রাবাই Arman Goun-এর লেখা একটি সংগীতগ্রন্থে প্রথমবারের মতো এর সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি এমন একটি সূত্র উদ্ভাবন করেন, যা দ্বারা প্রমাণ করতে চান, ইয়ম কিপুরের রাতে সৃষ্টিকর্তার নিকট তারা যে সকল প্রতিজ্ঞা-প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করবে, তার কোনোটি পালনে আজ্ঞাবহ থাকবে না। তার সূত্র অনুযায়ী এটা Kol Nidre ছিল না; বরং Kol Nidrim-এর সঠিক রচনাকাল নিয়ে অসংখ্য বিতর্ক থাকলেও সবাই এই মর্মে একমত, তালমুদের প্রাচীন ও আধুনিক সংস্করণ এই সংগীতটিকে পরিপূর্ণ রূপে সমর্থন করে।
এবার আসি ইহুদিদের খুব জনপ্রিয় একটি হামদ 'Eli, Eli' প্রসঙ্গে। Book of Psalm-এর বাইশ নম্বর হামদের প্রথম শ্লোকের প্রেক্ষাপটকে ভিত্তি করে Eli Eli নামটি চয়ন করা হয়েছে। খ্রিষ্টান দেশগুলোতে এটি 'Cry of Christ on the Cross' নামে পরিচিত।
আশা করি আপনাদের Vaudeville Genre-এর কথা মনে আছে, যা দ্বারা আমেরিকার পুরো থিয়েটারশিল্পকে ইহুদিরা নিজেদের করে নিতে সক্ষম হয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ইহুদি মালিকানাধীন থিয়েটার ও সিনেমা হলগুলোতে নাটক বা চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পূর্বে এই হামদটি একবারের জন্য হলেও পরিবেশন করা হতো। উপস্থিত দর্শকদের বলা হতো, বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষিতে এ সংগীত পরিবেশন করা হচ্ছে। কিন্তু কারা এ সংগীত পরিবেশনের জন্য অনুরোধ করছে, তা কারও মগজে ঢুকত না। অবশ্য এ নিয়ে তেমন কেউ চিন্তাও করত না।
সত্যি বলতে, বিশেষ কোনো অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে নয়; বরং বিশেষ এক সংগঠনের ক্ষমতাবলে এই সংগীতটি নিয়মিত পরিবেশন করা হতো। তারা হলো Kehillah। এই হামদের প্রতি জ্যান্টাইলদের ন্যূনতম কোনো আগ্রহ নেই, তবুও জোর করে তা শোনানো হচ্ছে। হয়তো জ্যান্টাইলদের ওপর এটা বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলছে না ঠিক, তবে মানসিকভাবে তা ইহুদিদের উসকে দিচ্ছে— যেন তাদের অনাগত সন্তানরা ছোটোকাল থেকেই জ্যান্টাইলদের বিরুদ্ধে এক বিষম ঘৃণা ও অশ্রদ্ধাবোধ নিয়ে বেড়ে ওঠে।
Eli Eli কখনো ধর্মীয় সংগীত হতে পারে না। এই সংগীত জ্যান্টাইলদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ। নিউইয়র্কের যে কফি হাউজগুলোতে ইহুদিরা বলশেভিক বিপ্লবের পরিকল্পনা করত, সেখানে নিয়মিত এ গানের চর্চাও করত। রাশিয়া ও পোল্যান্ডসহ ইউরোপের অসংখ্য দেশে এই সংগীত চর্চার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বলশেভিক বিপ্লব নিয়ে তারা যত পত্রিকা বা ম্যাগাজিন প্রকাশ করত, সেখানে এর বাক্যগুলো নিয়মিত ছাপানো হতো। সহজভাবে বলতে গেল, খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে এই সংগীত ব্যবহার করা হয়। এটা তাদের মস্তিষ্কে মর্ফিনের মতো কাজ করে। গানটি মূলত ইডিশ ভাষায় রচিত। এর অনূদিত অংশ নিচে উপস্থাপন করা হলো—
'হে খোদা! হে খোদা! কেন আমাদের করেছ পরিত্যক্ত? আগুনের তপ্ত শিখায় তারা আমাদের করেছে অগ্নিদগ্ধ, সর্বত্র আমাদের নিয়ে করেছে পরিহাস, তথাপি ধৃষ্টতা করিনি ছেড়ে যেত সে ঐশী গ্রন্থ যাতে আছে আমাদের বাণী ও পথ নির্দেশিকা। হে খোদা! হে খোদা! কেন আমাদের করেছ পরিত্যক্ত? দিন-রাত কেবল এই প্রার্থনা করি, যেন ধর্মের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে বাঁচতে পারি আরও প্রার্থনা করি, যেন তুমি আমাদের পুনরায় রক্ষা করো!
আমাদের সকল পিতামহের দোহাই করে বলছি! আমাদের প্রার্থনা ও আর্তনাদ ফিরিয়ে দিয়ো না, কেবল তোমার করুণা তে আমরা রক্ষা পাব। কেননা ঈশ্বর তুমি, কেবলই এক। শুনো ইজরাইলবাসী, ঈশ্বর শুধু আমাদের, তিনি কেবলই একজন!'
বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত এই সংগীত নিয়মিত প্রতিটি থিয়েটার ও সিনেমা হলে পরিবেশন করা হতো। আর অবুঝ খ্রিষ্টানরা অর্থ খরচ করে সেই হলগুলোতে এসব খাদ্য গিলতে যেত। বিগত শতাব্দীর কয়েক দশক ধরে এটি নিয়মিত পরিবেশিত হওয়ার ফলে এই সংস্কৃতি আমেরিকার প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। তারপর তা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চলচ্চিত্র সংস্থার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পৃথিবীজুড়ে। আজ হয়তো এই সংগীত সিনেমা হলগুলোতে নিয়মিত পরিবেশন করা হয় না, কিন্তু ইহুদিদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নানান প্রতিকৃতি সাংকেতিক চিহ্ন আকারে বিশ্বের অসংখ্য অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব প্রতিকৃতি ও সাংকেতিক চিহ্নের অর্থ সাধারণ জ্যান্টাইলরা বুঝতে না পারলেও ইহুদি সন্তানরা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারে। এর মাধ্যমে তারা নিজ সম্প্রদায়কে জানান দিচ্ছে আমরা আছি, থাকব এবং আমরাই শক্তিশালী।
যারা Eli Eli সংগীতটি শুনেছে, তারা হয়তো ইডিশ ভাষা না জানার দরুন এর অর্থ বুঝতে পারেনি। তবে এর সাথে বাদ্যযন্ত্রের যে সুরলা ধ্বনি পরিবেশন করা হয়, তা যে কতটা হৃদয়স্পর্শী, তা হয়তো অনেকেই উপলব্ধি করতে পেরেছে। এখানে বলা হয়েছে, আগুনের তপ্ত শিখায় 'তারা' আমাদের পুড়িয়ে মেরেছে এবং সর্বত্র করেছে পরিহাস। এই তারা দিয়ে কাদের বোঝানো হচ্ছে? অবশ্যই জ্যান্টাইল জাতিদের! হৃদয়স্পর্শী সুরেলা বাদ্যযন্ত্রের সাথে এ সংগীত গাওয়া সময় যখন তারা ক্রন্দনরত অবস্থায় পৌঁছে যায়, তখন কি মনে হয় না— ইহুদিরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিচ্ছে এবং এ জন্য তারা পূর্ণরূপে প্রস্তুত!
প্রকৃতপক্ষে জ্যান্টাইলদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের বহু বছরের প্রতিক্ষিত যুদ্ধ যে ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, তা চারদিকে তাকালেই উপলব্ধি করা সম্ভব। ইহুদিদের প্রটোকলসমূহের কতটুকু অংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, এই যুদ্ধ তার একটি বড়ো ইঙ্গিত দিচ্ছে। আজকের জ্যান্টাইল সমাজ যে চলচ্চিত্র ও সংগীত সাধনায় মেতে উঠেছে, তা মূলত ইহুদিদের সংস্কৃতি চর্চা ব্যতীত অন্য কিছু নয়।
📄 ইহুদি সমাজে ঘেটো ব্যবস্থা
পৃথক জাতীয়তাবাদ নীতি ও কাহালভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার প্রতি ইহুদিরা কতটা অনুগত, তা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই প্রতিটি বিষয় ইহুদিদের হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ, যা আজ পর্যন্ত নিজেদের রক্ত প্রবাহে অক্ষুণ্ণ রেখেছে। একই কথা পুনরায় বলার বিশেষ কিছু কারণ রয়েছে।
প্রাচীন ঐতিহ্য ও ধর্মীয় অনুশাসন কখনো এক নয়। যখন কোনো মানব সম্প্রদায় তাদের আঞ্চলিক ও সাংস্কৃতিক জীবনশৈলীকে বংশপরম্পরায় বহন করে থাকে, তখন তাকে বলা হয় ঐতিহ্য। এটা মূলত অঞ্চলকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। অপরদিকে, ধর্মীয় অনুশাসন হলো সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত জীবনবিধান। একজন মানুষ কীভাবে তার প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত করবে, ভালো ও খারাপের পার্থক্য বুঝবে এবং সকল কাজে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তার শাশ্বত পাথেয় হলো ধর্মীয় অনুশাসন। এটা মূলত গ্রন্থকেন্দ্রিক।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দস্যুর আক্রমণ, সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন, জীবিকার তাগিদ ইত্যাদি নানা কারণে মানুষ যখন তার জন্মভূমি ছেড়ে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়, তখন নতুন সংস্কৃতির ছোঁয়ায় জীবন প্রবাহে পরিবর্তন আসবে এটাই স্বাভাবিক। এ কারণে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সর্বদা প্রবহমান ও পরিবর্তনশীল। শত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধর্মীয় বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রেখেছে— এমন অসংখ্য নজির পৃথিবীতে পাওয়া যাবে। এ কারণে খ্রিষ্টবাদ ও ইসলাম আন্তর্জাতিক ধর্মে রূপলাভ করেছে। যদি কোনো সামাজিক রীতিনীতি বা প্রাচীন ঐতিহ্য ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, তবে তা গ্রহণ করতে কোনো সমস্যা নেই। এ কারণে তাদের মাঝে পৃথক জাতীয়তাবাদ নীতি বলতে কিছু ছিল না। পৃথিবীর যে অংশের মানুষের সাথে তারা বসবাস করেছে, সেখানেই তারা মিশে গেছে। মুসলিম, খ্রিষ্টান, মূর্তিপূজক এবং ভিন্ন ধর্মের মানুষ একই পাড়ায় বসবাস করেছে, কিন্তু তাদের মাঝে সৌহার্দ্যের কোনো অভাব ছিল না। সামান্য কিছু বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি হলেও তা অল্পতে শেষ হয়ে যেত।
এবার ইহুদিদের সম্পর্কে আসি। ধর্মীয় বিশ্বাসের চেয়ে প্রাচীন ঐতিহ্য ও সামাজিক রীতিনীতির গুরুত্বই ইহুদিদের নিকট অধিক বেশি। এ কারণে প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে তারা ধর্মগ্রন্থে পরিবর্তন এনেছে। তবে যাযাবর জাতি হয়েও যে ইহুদিরা আজ অবধি নিজেদের জ্যান্টাইল সম্প্রদায় হতে অচ্ছুত রাখতে পেরেছে, এ জন্য অবশ্যই প্রসংশা করা উচিত। এর পেছনে অবশ্য ইহুদিদের বিশেষ একটি সমাজ ব্যবস্থার অবদান রয়েছে, যার নাম 'ঘেটো'। এটি অনেকটা গ্রাম বা মহল্লার মতো, যেখানে সংঘবদ্ধ উপায়ে বসবাসের জন্য গড়ে তোলে পৃথক কোনো উপনিবেশ। যতদিন পর্যন্ত না ইজরাইল পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, ততদিন ইহুদিরা এই উপায়ে বসবাস করবে— এটাই ছিল প্রতিজ্ঞা।
এ সম্পর্কে নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল পার্কের পাশে অবস্থিত Congregation Shearith Israel সিনাগাগটির রাবাই David de Sola Pool তার একটি বিবৃতিতে বলেন— 'ঘেটোভিত্তিক সমাজব্যবস্থা বাঁচিয়ে রাখা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। ইহুদি জাতীয়তাবাদের প্রকৃত স্বাদ কেবল এই সমাজ ব্যবস্থার মাঝেই নিহীত। মুখে দাড়ি রাখা, মাথা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা, ধর্মীয় বই সঙ্গে রাখা, দ্রুত পদক্ষেপে রাস্তায় হাঁটা ও সাব্বতাসহ সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিয়মিত পালন করা কেবল এই সমাজ ব্যবস্থার কল্যাণেই সম্ভব হচ্ছে।'
অপর একটি বিবৃতিতে রাবাই Dr. M. H. Segal বলেন— 'শেষ বিশ্বযুদ্ধটি পোল্যান্ড ও লিথুনিয়ায় বসবাসরত ইহুদিদের পুনরায় তাদের পূর্ব সমাজব্যবস্থায় ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে ইহুেিদর অভিবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি। এই অভিবাসীরা পৃথিবীর যেখানে গিয়েছে, সেখানেই ঘোটো সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জোড় প্রচেষ্টা চালিয়েছে। বলা বাহুল্য, এই মধ্যযুগীয় সংস্কৃতির কল্যাণে ইহুদিরা আজও নিজেদের প্রাচীন ঐতিহ্যকে সগর্বে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে।'
নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জাতীয়তা টিকিয়ে রাখার অধিকার পৃথিবীর প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর আছে। কিন্তু সমস্যা হয় যখন এই পৃথক জাতিসত্তা নীতি সহ্যের চরমসীমা অতিক্রম করে এবং স্বাধীন একটি সমাজ ব্যবস্থার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঘেটোভিত্তিক সমাজব্যবস্থা বাঁচিয়ে রাখার আন্দোলনে Israel Friedlaender হলেন অন্যতম এক পথিকৃৎ। ১৯০৯ সালে The Problem of Judaism in America শিরোনামে তিনি একটি বক্তৃতা প্রদান করেন। সেখানে বলেন—
'যেকোনো স্বাধীন রাষ্ট্রে ইহুদিবাদ প্রতিষ্ঠার কিছু উপায় আছে— ১. অ্যান্টি-সেমিটিজম ছড়িয়ে দিতে হবে। ২. ইহুদি অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। ৩. স্বাধীন দেশগুলোতে ঘটো সংস্কৃতি জোরদার করতে হবে।'
কিছুদিন পর তিনি একটি আর্টিক্যাল প্রকশ করেন, যার নাম 'The Americanization of the Jewish Immigrant।' সেখানে তিনি বলেন—
'যতই অনাকর্ষণীয় বা কুৎসিত হোক না কেন, আমাদের প্রাচীন ও সেকেলে পোশাক রীতি বজায় রাখা উচিত। পৃথিবী যতই আধুনিক হোক না কেন, আমরা প্রাচীন শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে পারি না।'
তার পরামর্শে সে সময় পোল্যান্ড থেকে প্রায় ২,৫০,০০০ ইহুদি অভিবাসী হিসেবে আমেরিকায় প্রবেশ করে, যাদের পোশাক-আশাকে ছিল সেই প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি প্রজন্ম যেন এই সংস্কৃতিকে নিজেদের রক্তে ধারণ করে বড়ো হয়, সে জন্য একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত ইহুদি সন্তাদের এ জাতীয় পোশাক পরিধান করতে বাধ্য করা হয়। আগেই বলেছি, যদি এমন হতো— তারা কেবল নিজেদের নিয়ে পড়ে আছে; ইহুদিদের সামাজিক রীতিনীতি অন্যান্যদের জীবন-প্রবাহে কোনো সমস্যা তৈরি করছে না, তবে এ নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। কিন্তু দিনে দিনে ইহুদিরা যে আমাদের ওপর চড়াও হয়ে উঠছে, তা চতুর্দিকে চলমান বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের দিকে তাকালেই উপলব্ধি করা সম্ভব।
যেমন: বেশ কিছুদিন আগে আমেরিকার এক বিজ্ঞাপনী সংস্থা তার ইহুদি মক্কেলের জন্য একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করে, যেখানে তারা 'আমেরিকানিজম' শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করে। তৎক্ষণাৎ এই খবর Anti-Defamation League ও B'nai B'rith সংগঠন দুটির নিকট চলে যায়। তারা বিজ্ঞাপন সংস্থাটিকে মাফ চাইয়ে ছাড়ে এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করে দেয়, যেন এমন ভুল দ্বিতীয়বার না হয়।
ইহুদিরা বিশ্বাস করে, সংখ্যায় অতি অল্প হয়েও তাদের যে শক্তি, তা কেবল ঐক্যবদ্ধ জাতীয়তার ফলেই সম্ভব হয়েছে। যদি ঘেটো সংস্কৃতি সমাজ থেকে হারিয়ে যায়, তবে এই ঐক্যবদ্ধ শক্তিও হুমকির মুখে পড়বে। যে আধ্যাত্মিক ও অতিমানবীয় শক্তি তারা অর্জন করেছে, তা খড়কুটার ন্যায় দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই এ সমাজ ব্যবস্থার গুরুত্ব বর্ণণা করতে গিয়ে রবাই David de Sola Pool বলেন—
'আমাদের নতুন প্রজন্মগুলো এমন সব পারিপার্শিক অবস্থার মধ্য দিয়ে বড়ো হচ্ছে, যেখানে ধর্মীয় অনুশাসনের ছিটেফোঁটা পর্যন্ত নেই। চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়, আগামী দিনগুলোতে এই অনুশাসন মেনে চলা প্রতিটি ইহুদির জন্য আরও অনেক কঠিন হয়ে পড়বে। নিজ জাতিসত্তার প্রকৃত পরিচয় পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আমাদের পুনরায় মধ্যযুগীয় ঘেটোভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া উচিত; নতুবা একদিন আমরা খড়কুটার ন্যায় দুর্বল হয়ে পড়ব।'
'The beginning of the decay' আর্টিক্যালটিতে Israel Friedlaender উল্লেখ করেন—
'ইহুদিদের ধর্মীয় ও জাতিতাত্ত্বিক অধঃপতন সেদিন থেকে শুরু হয়েছে, যেদিন থেকে তারা ঘেটো সংস্কৃতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে জ্যান্টাইলদের সমাজব্যবস্থায় প্রবেশ করতে শুরু করেছে।'
কীভাবে এই অধঃপতনের সূচনা ঘটেছে, সে সম্পর্কে David de Sola Polo বলেন—
'জ্যান্টাইলরা যেভাবে তাদের মস্তক অনাবৃত রেখে প্রার্থনা করে, ইহুদিরাও আজ একই উপায়ে প্রার্থনা করছে। হিব্রু ভাষাকে উপেক্ষা করে অন্যদের ন্যায় তারাও আজ ইংরেজিতে সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করছে। সাব্বাতের গুরুত্ব আমাদের অনেকের নিকট বহুলাংশে কমে গেছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে আজ যে সংগীত ব্যবহার করা হচ্ছে, তাও জ্যান্টাইলদের হাতে তৈরি হচ্ছে।'
এ জন্য Mr. Friedlaender তার বিভিন্ন বিবৃতিতে বলেছেন—
'ইতিহাসজুড়ে যে সকল ধর্মীয় সহিংসতার দরুন আমরা অসংখ্যবার রক্তাক্ত হয়েছি, তা একদিক থেকে আমাদের অনেক উপকারও করেছে। এটা আমাদের বুঝিয়েছে, জাতীয় একতা ও জাতিতাত্ত্বিক পরিচয়ের গুরুত্ব কতটুকু। সংখ্যায় অধিক হয়েও কেবল একতার অভাবেই যে অনেক জাতি বিলিন হয়ে গেছে, এমন অনেক উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় চোখ বোলালেই পাওয়া যায়। যখনই আমরা জাতীয় স্বার্থকে ছোটো করে ব্যক্তি স্বার্থকে বড়ো করে দেখছি, তখনই বিপদে পড়তে হয়েছে। সে সময় সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। কারণ, সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। তাই নিজেদের শক্তিশালী করতে আমাদের পুনরায় ঘেটোভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় ফিরে আসতে হবে।'
Cyril M. Picciotto তার আর্টিক্যাল 'Conceptions of the State and the Jewish Question'-এ উল্লেখ করেন—
'আধ্যাত্মিকতা হরিয়ে গেলে আর কখনো ইহুদিবাদ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। তাই আমাদের মধ্য হতে এমন একটি দল থাকা বাঞ্চনীয়, যারা সবাইকে ধর্মের পথে আহ্বান করবে এবং ধর্মীয় অনুশাসনে উৎসাহিত করবে। আরেকটি দল থাকবে রাজনৈতিক সকল কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে। তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে যেকোনো ধ্বংসাত্মক কাজে অংশ নিতে প্রস্তুত থাকবে। সাম্প্রতিক বলশেভিক বিপ্লব এমনই একটি উদাহরণ।'
রাবাই Segal তার আর্টিক্যাল 'The Future of Judaism'-এ উল্লেখ করেন— 'আগাগোড়া ভণ্ডামিতে পরিপূর্ণ যে বিজাতীয় সমাজব্যবস্থায় আজ আমরা বসবাস করছি, তার চেয়ে মধ্যযুগীয় নিপীড়িত সমাজব্যবস্থা অনেক মধুর ছিল। নির্যাতনের স্বীকার হলেও সে সমাজব্যবস্থা আমাদের শিখিয়েছে— কীভাবে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রেখে একতাবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে হয়।'
তিনি আরও বলেন—
'কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রগুলোতে আমাদের প্রাচীন সংস্কৃতি ও অনুশাসন মেনে চলা যেন একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র শাসনের পূর্ণ ক্ষমতা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠদের হাতে চলে যায়, তবে সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হবে এটাই স্বাভাবিক। উঁচু পদগুলোতে সংখ্যালঘুরা জায়গা করে নিতে না পারলে একদিন তারা হারিয়ে যাবে, এ ব্যপারে কোনো সন্দেহ নেই। তবে পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রে আজও অনেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দেখা মেলে, যারা বহু বছর ধরে সেখানে টিকে আছে। এর কারণ, জাতীয়তাবাদ নীতি এবং সাম্প্রদায়িক শিক্ষাব্যবস্থা। কেবল নির্যাতন-নিপীড়নে একটি জাতি ধ্বংস হয় না, প্রকৃত ধ্বংস হয়— যখন তারা নিজেদের শিকড় হারিয়ে ফেলে। এ কারণে বলতে চাই, মধ্যযুগীয় ঘেটোভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া ব্যতীত আমাদের আর কোনো উপায় নেই।'
আশা করি, ইহুদিদের নিকট ঘেটোভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার গুরুত্ব কতটুকু, তা আপনারা বুঝতে পারছেন। তবে একটু ভালোভাবে লক্ষ করলে ইহুদিদের প্রত্যেকটি কাজের মাঝেই দুমুখো নীতির ছাপ খুঁজে পাবেন। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বাইবেল পাঠ উঠিয়ে দিয়েছে, কিন্তু নিজ সন্তানদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে আইন পাশ করেছে— গির্জায় যাওয়া কিংবা ধর্মীয় বই পাঠে খ্রিষ্টান অভিভাবকরা সন্তানদের জোর করতে পারবে না, কিন্তু নিজেদের বেলায় ঘটেছে এর উলটো। সম-অধিকারের নামে ইহুদিরা নারী সমাজকে দিয়ে উগ্রতার চাষ করাচ্ছে, কিন্তু তারা পুরো পরিবার এক হয়ে ঠিকই সাব্বাত পালন করছে। জ্যান্টাইল তরুণদের শরীরে আধুনিকতা ও নাস্তিকতার রং ছিটিয়ে দিলেও নিজেদের জন্য বেঁধে দিয়েছে ঘেটোভিত্তিক সমাজব্যবস্থা।
আসলে জাতীয়তাবাদের চেতনায় ইহুদিরা নিজেদের অবস্থান যতটা শক্ত করতে পেরেছে, জ্যান্টাইল সমাজ তা পারেনি। তবে একই ভূখণ্ড যে বহুজাতিক মানুষ একত্রে বসবাস করতে পারে না— এমনটা ভাবা কখনো উচিত নয়। কারণ, পৃথিবীতে এমন অনেক স্থান রয়েছে, যেখানে শ'খানেক মানুষ একত্রে বসবাস করছে। এমনকী তাদের রয়েছে বহুরূপী ভাষা; তবুও তারা শান্তিতে বসবাস করছে! তাহলে ইহুদিরা কেন পারবে না? আসলে সমস্যাটা মানসিকতায়।
আজ পর্যন্ত ইহুদিদের যতজন সদস্য এই মানসিক সমস্যা হতে বেরিয়ে আসতে পেরেছে, তারাই আমাদের সাথে আনন্দচিত্তে মিশে যেতে পেরেছে। তাই বলে তারা যে, ধর্ম জলাঞ্জলি দিয়ে এসেছে তা কিন্তু নয়। আমাদের সাথে প্রতিনিয়ত উঠাবসা করলেও তারা কখনো সাব্বাত পালনে ছাড় দেয় না এবং উৎসবের দিনগুলোতে সিনাগাগে যাওয়ার কথা ভুলে যায় না।
তবে ইহুদিদের অধিকাংশ সদস্য এই চেতনা গ্রহণ করতে পারেনি। তাদের বিশ্বাস, এই জাতীয়তাবাদ কখনো ইউরোপ-আমেরিকায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সাময়িক সময়ের জন্য বাধ্য হয়ে ইহুদিরা এই অঞ্চলগুলোতে খুঁটি গেড়ে বসলেও দ্রুতই তাদের জেরুজালেম ফিরে যেতে হবে; নতুবা ইহুদিদের আত্মা পরিপূর্ণতা পাবে না এবং মহান মসিহের সাথে সাক্ষাৎ মিলবে না। তাই খুব সুচতুর উপায়ে তাদের জ্যান্টাইল সমাজে কাজ করে যেতে হবে। ঠিক যেমন Cyril M. Picciotto বলেছেন— 'একটি দল থাকবে যারা নিয়মিত ধর্মের প্রতি আহ্বান করবে; দ্বিতীয় দলটি বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক চালিয়ে যাবে এবং শেষ দলটি ধ্বংসাত্মক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর শক্তিধর সব রাষ্ট্রের পতন ঘটাবে, যা জেরুজালেমে ফিরে যাওয়ার পথ সহজতর করবে।'
**ইহুদিদের কিছু গুপ্ত সংগঠনের পরিচয়**
অনেকে বলে— ইহুদিদের গুপ্ত সংগঠনগুলো চারপাশ থেকে আমাদের অক্টোপাসের মতো পেচিয়ে ধরেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষকে যখন এমন কয়েকটি সংগঠনের নাম জিজ্ঞেস করা হয়, তখন তারা কিছুই বলতে পারে না। The Jewish Kehillah, American Jewish Committee ও B'nai B'rith-এর নাম কয়জন শুনেছে? ভালোভাবে জরিপ করলে এক শতাংশ মানুষও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা এদের নাম পর্যন্ত শুনেছে। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতি এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নে তাদের রয়েছে অসীম ক্ষমতা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী— ১৯২০ সাল পর্যন্ত আমেরিকাতে তাদের ৬,১০০টি সংগঠন গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে ৩,৬৩৭টি কেবল নিউইয়র্কে-ই অবস্থিত। তাদের যে সংগঠনটির সঙ্গে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি পরিচিত তা হলো— B'nai B'rith। সংগঠনটির আরও এক নাম আছে— Independent Order of B'nai B'rith, যার সদর দপ্তর শিকাগোতে অবস্থিত। ১৮৪৩ সালে Henry Jones-এর হাত ধরে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। Mr. Jones একবার তার কিছু বন্ধুর সঙ্গে এসেক্সের কোনো মদের দোকানে বসে এমন একটি সংগঠন তৈরির পরিকল্পনা করেন, যা বিশ্বব্যাপী ইহুদিদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে। সংগঠনটির নাম হিব্রুতে করা হয় B'nai B'rith; অর্থাৎ ভাইদের চুক্তিনামা। পরিচালনা পর্ষদে থাকা সবাই একে অন্যকে 'ভাই' বলে সম্বোধন করে থাকে। ইতোমধ্যে তাদের শাখা প্রতিষ্ঠান ভারত, প্যালেস্টাইন, পারস্য, আরব ও ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পৌছে গেছে। সাম্প্রাদায়িকতার বিষ ঢেলে দিয়ে প্রতিটি দেশে ইহুদিরা যে অন্তর্কোন্দলের জন্ম দিয়েছে, তার শেষ কোথায় তা কেউ জানে না।
তাদের প্রতিটি সংগঠনকে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করছে Alliance Israelite Universal। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জমজ ভাইয়ের মতো Kehillah ও Jewish Committee সংগঠন দুটি গড়ে ওঠে। তখন General Bingham মেট্রোপলিটন পুলিশ বিভাগের ক্ষমতায় ছিলেন। তার নির্দেশে নিউইয়র্কে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ওপর তদন্ত শুরু হয়।
উনিশ শতাব্দীর শুরুতে একদল আমেরিকান পর্ন বাণিজ্যে মেতে ওঠে। শিশু পর্ন থেকে শুরু করে তারা সব ধরনের পর্ন নির্মাণ করত। সেখানে সাদা চামড়ার মেয়েদের বিশেষভাবে ব্যবহার করা হতো। এই পুরো অপরাধ চক্রটিকে তখন বলা হতো— 'White Slave Traffic'। তদন্ত রিপোর্টে প্রকাশিত হয়, এই অপরাধ চক্রের সাথে জড়িত ৫০ ভাগেরও অধিক সদস্য হলো ইহুদি। এই রিপোর্ট প্রকাশ পাওয়ার পরপরই তাদের গুপ্ত সংগঠনগুলো নড়েচড়ে বসে।
ইহুদিরা চায় না বিশ্ববাসী তাদের কু-কর্মের কথা জেনে যাক। তারা Mr. Bingham-কে চাপ দিতে শুরু করে, যেন এ নিয়ে আর কোনো রিপোর্ট প্রকাশ করা না হয়। সামনের দিনগুলোতে তাদের যেন এ জাতীয় অযাচিত কোনো সমস্যার মুখোমুখি হতে না হয়, সে জন্য ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় American Jewish Committee। পরে এর শাখা ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর আরও বহু দেশে।
'Kehillah' শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে 'Kahal' শব্দ থেকে, যার অর্থ সম্প্রদায়, জনসমাবেশ বা নির্বাচিত সরকার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর শান্তি আলোচনার মধ্য দিয়ে পোল্যান্ড ও রুমানিয়াতে Kahal প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে তা নিউইয়র্কেও বিস্তার পায়। অর্থাৎ আমেরিকায় বসবাসরত খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের জন্য রয়েছে পৃথক বিচারব্যবস্থা। পৃথিবীতে সংগঠনটির যতগুলো শাখা রয়েছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হলো নিউইয়র্কের শাখাটি। ক্যাথলিকদের জন্য ভ্যাটিকান, মুসলিমদের জন্য মক্কা এবং ইহুদিদের জন্য নিউইয়র্ক একই অর্থ বহন করে। এই শহরটি জেরুজালেমের চেয়েও অধিক নিরাপদ। সংগঠনটি গড়ে তোলার উদ্দেশ্য হলো—
'নিউইয়র্কে ইহুদিদের আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সর্বস্তরে নিজেদের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা।'
এটি মূলত ইহুদিদের একটি মৈত্রী সংগঠন। নিউইয়র্কে গড়ে উঠা ইহুদিদের বিভিন্ন ব্যাবসা, শিল্প, ব্যাংকিং, গুপ্ত, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও স্বেচ্ছা সংগঠনগুলো এর সদস্য। সংগঠনটি যতটা না রক্ষণাত্মক, তার চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক। পুরো নিউইয়র্ককে তারা ১৮টি জেলায় বিভক্ত করেছে এবং প্রতিটি জেলাকে কেন্দ্র করে নতুন কিছু ঘেটো গড়ে তুলেছে। এখান থেকে পাশ হওয়া আইনগুলো পৌঁছে যায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলা অফিসে।
প্রথম বছর ২২২ টি সংগঠন Kehillah-এর উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। এদের মধ্যে ৭৪টি সিনাগাগ, ১৮টি দাতব্য সংস্থা, ৪২টি সমবায় সংগঠন, ৪০টি ক্লাব, ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ৯টি সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ৯টি সংগীত প্রতিষ্ঠান, ৯টি জায়োনিস্ট সংগঠন ও ৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। পরবর্তী বছর আরও ২৩৮ টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ১৩৩ টি প্রার্থনা গৃহ, ৫৮ টি ক্লাব সংগঠন, ৪৪ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ৩ টি সামাজিক প্রতিষ্ঠান এর সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রতিবছর-ই এর সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে এর কত হাজার সদস্য রয়েছে, তা গণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়। এত বড়ো একটি সংগঠন হওয়ার পরও অধিকাংশ মানুষ Kehillah সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। প্রথম জায়োনিস্ট সম্মেলনে Judha L. Magnes সংগঠনটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন—
'ইহুদিদের স্বার্থ, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই ধরনের একটি সংগঠন গড়ে তোলা আবশ্যক।'
তার এই বক্তব্যে সমর্থন জানিয়ে রাবাই Asher উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠেন—
'গোটা আমেরিকার স্বার্থ এক, আর আমাদের স্বার্থ হবে আরেক।'
১৯১৭-১৮ সালে নিউইয়র্কের একটি অ্যাজেন্সি সেখানে বসবাসরত ইহুদিদের জনসংখ্যা প্রকাশ করে। সেখানে দেখানো হয়— ম্যানহ্যাটন- ৬,৯৬,০০০, ব্রোকলাইন- ৫,৬৮,০০০, ব্রোনক্স- ২,১১,০০০, কুইন্স- ২৩,০০০, রিচমন্ড- ৫,০০০ সর্বমোট ১৫,০৩,০০০ জন ইহুদি। এরা প্রায় তিন বছর আগে নিউইয়র্ক শহরে বাস করত। এবার ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে নিউইয়র্ককে ১৮টি জেলায় ও ১০০টি ঘেটোতে বিভক্ত করা হয়েছে।
এই ঘেটোগুলোর মধ্যে বেশ কিছু বিভাজন রয়েছে। যেমন: বাণিজ্যিক, প্রশাসনিক, আবাসিক এলাকা ইত্যাদি। West Side and Harlem District-এ তাদের আবাসিক ঘেটোগুলো অবস্থিত।
১৯১৫ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী নিউইয়র্কের প্রতি বর্গমাইলে ১৬,০০০ মানুষ বসবাস করত, যার এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৫,৩৩৩ জনই ছিল ইহুদিদের সদস্য। কিছু কিছু জায়গায় বর্গমাইল প্রতি ইহুদিদের জনসংখ্যা ছিল ২০,০০০-৩০,০০০-এর বেশিও। বোঝাই যাচ্ছে, এই শহরে তাদের সদস্য সংখ্যা কতটা সমৃদ্ধ।
মূলত সংগঠনটি প্রতিষ্ঠাকালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদের সদস্যদের এখানে জড়ো করা হয়েছিল, যেন মার্কিন প্রশাসনের বিশেষ নজর আকর্ষণ করা যায়। পরে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সোভিয়েত প্রতিষ্ঠার জন্য রাশিয়া ও পোল্যান্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি হলেও আমেরিকার সকল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কাজের কেন্দ্রবিন্দু নিউইয়র্ক। তাই এই শহরটিকে নিয়েই ইহুদিদের এত পরিকল্পনা। কেউ যদি আমেরিকার সাথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য করতে চায়, তবে নিউইয়র্ক শহর কেন্দ্র করেই করতে হবে। তাই আজ হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাদে এই শহরের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ইহুদিদের দখলে।
আমেরিকার প্রতি দশজনের মধ্যে নয়জন ইহুদি American Jewish Commitee-এর সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। কোথাও যদি তাদের ৩০ থেকে ৭৫ জনের একটি গোষ্ঠী থাকে, তবে তা পরিচালনার জন্য অবশ্যই একজন দলপতি, রাবাই বা অফিসার থাকবে, যে Kehillah-এর প্রধান সদরদপ্তরের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবে। মজার বিষয় হলো— তাদের তালিকায় এমন অনেক খ্রিষ্টান পাদরির নাম রয়েছে, যাদের প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করা হবে বলে পরিকল্পনাভুক্ত করা হয়েছে; এমনকী কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে পরিকল্পনাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
শুরুতে তাদের কিছু দুশ্চিন্তা ছিল। যদি সাধারণ মানুষ সংগঠনটির কথা জেনে যায়, তাহলে আন্দোলন শুরু করতে পারে। পরে সেই ভয় কেটে যায়। কারণ, প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়, আদালত, সংবাদপত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবকিছুই ইহুদিদের সদস্য দিয়ে ভরে গেছে। কীভাবে সাধারণ মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হয়, তা ইহুদিদের ভালো করেই জানা আছে। মূলত আমেরিকানদের মতো ব্রেইন ওয়াশড জাতি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই।
১৯১৮ সালের সম্মেলনে সংগঠনের সদস্য হিসেবে যারা উপস্থিত ছিলেন, তাদের কয়েকজনের পরিচয় দেওয়া হলো: Jacob H. Schiff, ব্যাংকার; Louis Marshall, আইনজীবী এবং American Jewish Committee-এর প্রেসিডেন্ট; Otto A. Rosalsky, নিম্ন আদালতের বিচারক; Adolph S. Ochs, নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার মালিক; Otto H. Kahn, তিনি Kuhn, Loeb & Company-এর সদস্য; Benjamin Schlesinger, কয়েকদিন আগেই লেনিনের সাথে বৈঠক শেষ করে রাশিয়া হতে এসেছেন; Joseph Schlossberg হলেন Amalgamated Clothings Workers-এর মহা পরিচালক; গধি চরহব, বলশেভিক বিপ্লবের উপদেষ্টা; Joseph Barondess, শ্রমিক নেতা; Judge Mack, তিনি আমেরিকার War Risk Insurance-এর প্রধান পরিচালক।
এ ছাড়াও আরও অনেক ইহুদি সংগঠন এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে। যেমন: Central Conference of American Rabbis, Easter Council of Reform Rabbis, Independent Order of B'rith, Independent Order of B'rith Sholom, Independent Order Free Sons of Israel, Independent Order B'rith Abraham, Federation of American Zionists, Orthodox Jews, Reform Jews, Apostate Jews, Zionist Jews, American Jews, Rich Jews, Poor Jews, Red Revoulationary Jews এবং আরও অনেক।
এই প্রতিটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান একত্রিত হয়েছে ইহুদিদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে। প্রশ্ন হচ্ছে— তারা কী এমন বিপদ বা হুমকি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে চাইছে? এ দেশে কি এমন কেউ আছে, যে অন্যের অধিকার হরণ করতে চায়? আমেরিকার সাধারণ মানুষরা কি এমন বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে, যা তারা পাচ্ছে না? তাহলে তারা কাদের বিরুদ্ধে এবং কী উদ্দেশ্যে সংগঠিত হচ্ছে? কোন অত্যাচার-নির্যাতনের দোহাই দিয়ে তারা এই মায়াকান্না দেখাচ্ছে?
যদি American Jewish Committee নিয়ে অনুসন্ধান করা যায়, তবে তাদের মাঝেও একই উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে। সংগঠনটি ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পুরো আমেরিকাকে ১২টি জেলায় বিভক্ত করেছে। সর্বশেষ জেলাটি হলো নিউইয়র্ক, যা তারা District XII বলে। এবার সাংগঠনিক উদ্দেশ্যগুলো নিচে উপস্থাপন করা হলো— ১. ইহুদিরা যেন বিশ্বের কোথাও কোনো প্রকার নাগরিক অধিকার হতে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা। ২. কোথাও যেন বৈষম্যের স্বীকার হতে না হয়, সে জন্য প্রয়োজনে আইনি সাহায্যের ব্যবস্থা করা। ৩. অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষায় সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। ৪. যেকোনো সামাজিক নিপীড়ন ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত হতে রক্ষা করা।
মূলত ইহুদিদের নিরাপত্তার অর্থ হলো— জ্যান্টাইল সমাজ কখনো তাদের বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে পারবে না। এককথায় অবারিত স্বাধীনতা। রাবাই Elias L. Solomon-এর একটি উক্তি নিচে উল্লেখ করা হলো—
'আমেরিকার বাইরে এমন কোনো ইহুদি নেই, যে তার ভাগ্যের জন্য এই দেশটির দিকে তাকিয়ে নেই। ইহুদিদের নিকট এই দেশ হলো অনন্ত স্বাধীনতার দেশ। এটা এ জন্য নয় যে, আমেরিকার মানুষ আমাদের স্বাধীনতার জন্য আত্মাহুতি দিচ্ছে; বরং প্রকৃতি আমাদের জন্য এভাবেই গড়ে তুলেছে।'
তারা বর্হিবিশ্বের নিকট আমেরিকাকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেন এটি একটি স্বর্গরাজ্য; এখানে যা ইচ্ছা করা সম্ভব। সবার জন্য আমেরিকা একটি স্বাধীন ও উন্মুক্ত দেশ। এখানে সকল ঐতিহ্য ও কৃষ্টি-কালচার গ্রহণীয়। স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে উদারপন্থি নীতি দেশের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একটা বিষয় ভাবুন, আমরা যদি সত্যিই স্বাধীনভাবে বাঁচতে চাই, তাহলে এত আইনের কড়াকড়ি থাকতে হবে কেন? মূলত এসব ছিল তাদেরই পরিকল্পনার অংশ, যা দ্বারা আমেরিকাকে সেক্যুলার রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে। সামনেই এর প্রমাণ পাবেন।
ইহুদি বর্ষ ৫৬৮৮ (১৯০৭-১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দ) অনুযায়ী— 'আমেরিকার সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ধর্মনিরপেক্ষকরণ এবং তা হতে খ্রিষ্টান ও সকল ধর্মের চিহ্ন সরিয়ে দেওয়া ইহুদিদের সাংবিধানিক অধিকার।'
ইহুদিদের প্রটোকলের একটি ধারায় বলা হয়েছে— পৃথিবীর সকল ধর্ম মুছে দিয়ে একমাত্র ইহুদিবাদ প্রতিষ্ঠা করাই তাদের হাজার বছরের উদ্দেশ্য। প্রথম ধাপে মানুষকে নাস্তিক্যবাদে ধাবিত করতে হবে। এ জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা ও উদারপন্থি নীতি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। এভাবে একটি-দুটি প্রজন্ম পেরিয়ে গেলে মানুষের মনে ধর্মীয় চেতনা এমনিতেই হ্রাস পেতে শুরু করবে।
কিছু মানুষ থাকবে যারা নিজ ঘরে ধর্ম পালন করা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। রাস্তায় নেমে কথা বলার মতো সাহস তাদের হবে না; তার ওপর নগ্নতা ভরা যৌন চলচ্চিত্রের প্রদর্শন তো আছেই। একসময় মানুষ ধর্ম কী, তা-ই ভুলে যাবে; প্রতিষ্ঠা পাবে নাস্তিক্যবাদ। যখন আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না, তখনই ইহুদিরা নিজেদের ধর্ম নিয়ে আবির্ভূত হবে।'
আমেরিকানদের কপালে ঠিক এমনটাই ঘটেছে। আজ সরকারি অফিসগুলোতে 'Christmas Tree' এবং 'Christmas carols'-এর কোনো আয়োজন করা হয় না। যিশুখ্রিষ্টের ক্রুশচিহ্ন এখন আর কোনো সরকারি অফিসে ঝুলিয়ে রাখা হয় না। ধর্মের ওপর এত কেন বল প্রয়োগ, তা নিয়ে তদন্ত করতে গেলে তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়। যদি কেউ মুখ খুলতে চায়, তবে তাকে অ্যান্টি-সেমাইট বলে থামিয়ে দেওয়া হয়। Justice Brewer তার একটি আর্টিক্যালে উল্লেখ করেন—
'খ্রিষ্টধর্ম আমেরিকায় বহু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে। যারা এই ধর্মকে নিয়ে কুৎসিত বিভিন্ন ঘটনার জন্ম দিয়েছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলো— Herbert Friedenwald নিউইয়র্ক, Isaac Hassler ফিলাডেলফিয়া ও Rabbi Ephraim Frisch আরক্যানসাস থেকে।'
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাইবেল পাঠ এবং বড়োদিনের সংগীত অর্চনা বন্ধ করতে Central Conference of American Rabbis সংগঠনটি আইনি প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, কিন্তু নিউইয়র্কে পালটা আন্দোলনের মুখোমুখি হলে তারা বিষয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেয়। ফিলাডেলফিয়া, সিনসিনাটি, স্টেন্ট পাওয়েল ও আরও অনেক জায়গায় ইহুদিরা পালটা আন্দোলনের মুখোমুখি হয়েছে।'
এগুলোই ইহুদিদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। আমেরিকার ডজনখানেক প্রদেশ ও শতশত শহরে তাদের এই পরিকল্পনা ইতোমধ্যে সফল হয়েছে। কিছু জায়গায় তারা ব্যর্থ হয়েছে, তবে সাময়িক সময়ের জন্য।
যদি কেউ ইহুদিদের পরিকল্পনায় সম্মতি না দেয়, তবে তার ওপর সেই পুরোনো কায়দায় অর্থনৈতিক অবরোধসহ বিভিন্ন ধরনের চাপ আসতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত তারা আনুগত্য প্রকাশ করতে বাধ্য হয়।
একটি বিষয় বলে রাখা জরুরি, এখানে কিন্তু ইহুদিরা সরাসরি কাজ করছে না; বরং তারা জ্যান্টাইল ফ্রন্ট ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যেন ইহুদিদের কেউ দোষারোপ করতে না পারে। আমেরিকান সরকার, প্রাদেশিক সরকার ও সিটি মেয়রকে ব্যবহারের মাধ্যমে তারা এই উদ্দেশ্যগুলো আদায় করে নিচ্ছে। এর পাশাপাশি পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলো তো রয়েছেই। মানুষ চিন্তা করে পায় না— তাদের ক্ষমতাধর খ্রিষ্টান ভাইয়েরা কেন নিজ ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলছে!
এবার ইহুদিদের এমন কিছু অধিকারের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেবো, যার জন্য তারা দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছে এবং ইতোমধ্যে সফলও হয়েছে।
১. পৃথিবীর যেকোনো স্থান থেকে আমেরিকায় ইহুদিদের পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার। Kehillah গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে নিউইয়র্ক শ্রমিক ইউনিয়নের প্রধান হিসেবে কাজ করেছে। Kehillah দাবি জানিয়েছে, আমেরিকায় প্রবেশে যেন তাদের কোনো সদস্যকে আইনি ঝামেলা পোহাতে না হয়। পৃথিবীর যেখানেই থাকুক না কেন— রাশিয়া, পোল্যান্ড, সিরিয়া, আরব বা মরক্কো, আমেরিকায় যেন তারা নিরাপদে প্রবেশে করতে পারে। অর্থাৎ তাদের ভিসার কোনো প্রয়োজন নেই। ইতোমধ্যে এই প্রচেষ্টায় সফল হয়েছে।
২. শহর, উপ-শহর, রাষ্ট্রীয় ও সরকারি সকল পর্যায়ে ইহুদি ধর্মকে স্বীকৃতি প্রদান। ইহুদিরা দাবি জানিয়েছে, ইহুদি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বাৎসরিক উৎসবের দিনগুলোতে তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় ছুটির ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন: ইয়ম কিপুর। এ জন্য তাদের কোনো বেতন কাটা যাবে না। এ দিন হলো বাৎসরিক ক্যালেন্ডারের সপ্তম মাসের দশম দিন, যেদিন তারা পাপমুক্তির জন্য প্রার্থনা করে থাকে। কিন্তু যদি কোনো ক্যাথলিক খ্রিষ্টান তার লেটেন দিবসগুলো পালনের জন্য কর্ম-বিরতি পালন করে, তবে তার বেতন কাটা যাবে। খ্রিষ্টান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী একটানা ৪০ দিন তাদের রোজা রাখতে হয়, যা লেটেন দিবস নামে পরিচিত। কেন উভয় ধর্মের এক নীতি হলো না?
৩. শহর, উপ-শহর, রাষ্ট্রীয় সরকারি সকল স্থান থেকে খ্রিষ্টধর্ম অপসারণ। ১৯১৪-১৫ সালের দিকে ওকলাহোমার ইহুদিরা আদালতে একটি মামলা করে, যেন রাষ্ট্রীয় সংবিধান থেকে খ্রিষ্টধর্ম ও যিশুকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিছুদিন পর একজন রাবাই আরক্যানসাস গভর্নরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, কেন Thanksgiving Day Proclamation- তে তিনি যিশুর নাম উল্লেখ করলেন?
৪. রাষ্ট্রীয়ভাবে সাব্বাত দিবসকে স্বীকৃতি প্রদান। আমেরিকায় সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলো রবিবার। এই দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিসসহ কল-কারখানা বন্ধ থাকে। তারা বহু বছর চেষ্টা করেছে— সাপ্তাহিক ছুটির দিন শনিবার করতে। তারপরও যখন ইহুদিরা নিজেদের দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়, তখন জোরপূর্বক নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলো শনিবার বন্ধ রেখে রবিবার খোলা রাখতে শুরু করে। ইহুদি বিচারকগণ শারীরিক অসুস্থতার ভান করে শনিবারে আদালতে আসা বন্ধ করে দেয়। ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো শনিবারে আংশিক বা পুরোপুরি কার্যক্রম বন্ধ রাখে।
৫. রবিবার সরকারি ছুটির দিন হলেও এ দিনে তাদের সকল ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক থিয়েটার খোলা থাকবে। Jewish Sabbath Alliance-এর প্রধান Rabbi Bernard Drachman বলেন— 'পবিত্র সাব্বাত পালন করাতে যা করা দরকার, আমরা তাই করব।' এ জন্য তিনি নিউইয়র্কের সকল সদস্যদের একত্রিত করে সমঝোতা করেন যে, সাব্বাত ইস্যুতে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। ইহুদি নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত যত খ্রিষ্টান আছে, তারা শনিবার ছুটি পালন করে রবিবার কাজে উপস্থিত হবে। এভাবে তারা কোনো কোনো শহরে ছোটো পরিসরে হলেও সাব্বাত দিবস প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।
৬. সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পুলিশ স্টেশন, রাস্তা, পার্ক, দোকান, শপিংমল ইত্যাদির কোথাও বড়োদিন পালন করা যাবে না; এমনকী Christmas tree-ও প্রদর্শন করা যাবে না। নিউইয়র্কের যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খ্রিষ্টান ধর্ম পাঠ করানো হয়, সেগুলোকে তারা সাম্প্রদায়িক বলে আখ্যায়িত করে। সেখানে যেন আর বড়োদিনের সংগীত অর্চনা করা না হয়, সে জন্য আদালতে মামলা করে। ইহুদিরা নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার পরিষদকে বাধ্য করে, যেন সেখানে Christmas tree না রাখা হয়। এ ছাড়াও আরও তিনটি বিদ্যালয়ের প্রিন্সিপালকে বড়োদিন পালন বন্ধ করে Christmas tree সরিয়ে নিতে বাধ্য করে।
৭. যদি কেউ ইহুদি ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করে বা কোনো কটূক্তি করে, তবে অবশ্যই তাকে চাকরিচ্যুত করতে হবে। প্রয়োজনে জনসম্মুখে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। নিউইয়র্কে সে সময় ঘটে যাওয়া কিছু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য City Magistrate Cornell কেন ইহুদি যুবকদের দোষারোপ করলেন, তা নিয়ে ইহুদিদের সংগঠন Kehillah উঠেপড়ে লাগে। এই ঘটনার কিছুদিন আগে কোনো এক পুলিশ কমিশনার বিংগহামে অবস্থানবরত ইহুদিদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ব্যাপক সমালোচনা করলে সিটি মেয়রের সাহায্যে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
৮. সরকারি আদালতগুলোতে ইহুদিদের জন্য পৃথক বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ইতোমধ্যে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার জন্য ইহুদি ধর্মাবলম্বী অপরাধীরা সহজেই ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। নিউ জার্সিতেও তাদের জন্য পৃথক বিচারব্যবস্থা করা হয়েছে।
৯. ইহুদি ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, এমন সকল বিষয় স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচি থেকে সরিয়ে দিতে হবে। Kehillah বাধ্য করেছে, যেন আমেরিকার সকল স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচি থেকে শেক্সপিয়ারের "Merchant of Venice" এবং লাম্বের "Tales from Shakespeare" বাদ দেওয়া হয়। টেক্সাস, ক্লিভল্যান্ড, ওহিও, ইয়ংগস্টাওন, এল পাসো, গালভস্টোনসহ আরও অনেক শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের জোড়াজোড়ির কাছে আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। তাদের প্রস্তাবিত নিয়মমাফিক পাঠ্যসূচি সাজিয়ে নিয়েছে। প্রতিটি লাইব্রেরিতে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে ইহুদিদের বিরুদ্ধে লেখা প্রতিটি বই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
১০. যেকোনো পোস্টার বা বিজ্ঞানের শুরুতে "Christian" পারিভাষিক কোনো শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। এর পরিবর্তে ব্যবহার করতে হবে 'State, Religion বা Nationality'। একবার American Jewish Committee-এর প্রেসিডেন্ট Louis Marshall তার পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন ছাপাতে Christian পারিভাষিক একটি শব্দ ব্যবহার করেন; যা ইহুদিদের নীতির মধ্যে পড়ে না। পরবর্তী সময়ে এ কাজের জন্য তিনি Charles M. Schwab, Bejamin Strong ও McAdoo ইত্যাদি বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন।
১৯২০ সালে একবার ইহুদিদের বেশ কিছু পত্রিকা প্রতিষ্ঠান না বুঝে খ্রিষ্টানদের থেকে অধিক বিজ্ঞাপন পাওয়ার আসায় Chrisitan শব্দটি ব্যবহার করে। তৎক্ষণাৎ Kehillah হতে সেই পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বার্তা পাঠানো হয়, যেন তারা অবিলম্বে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং এমন কাজ দ্বিতীয়বার না করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
এগুলোই হলো ইহুদিদের দাবি-দাওয়ার পরিচয়। এত সব আন্দোলন চালাতে যে বিশাল অর্থ-সাহায্যের প্রয়োজন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু ইহুদিদের আছে অজস্র ব্যাংক। প্রতিবছর তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশের একটি অংশ এসব আন্দোলন চালানোর ফান্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ইহুদিরা আজ শুধু আমেরিকাই নয়; পুরো পৃথিবীকে নিজেদের কবজায় নিয়ে এসেছে।
ইহুদিদের বিরুদ্ধে জ্যান্টাইলদের যে বৈরী আচরণ, তা নিছক কাকতালীয় ঘটনা নয়। কারণ, তারা পৃথিবীর যে অংশেই একত্রে বসবাস করেছে, সেখানেই পারস্পরিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে। এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা ইহুদিরা বংশ পরম্পরায় নিজেদের চরিত্রে জড়িয়ে রেখেছে। এর দরুন জ্যান্টাইলদের সাথে ইহুদিদের দ্বন্দ্ব চিরকাল অব্যাহত থেকেছে এবং থাকবে। এ থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নেই।' Jesse H. Holmes, in The American Hebrew
**আশাহত এক ইহুদির চোখে তার সম্প্রদায়ের চিত্র**
এই অধ্যায়ে আমরা ইহুদিদের মঙ্গল কামনায় একজন ইহুদির বক্তব্য উপস্থাপন করব। তিনি হলেন Bert Levy, যিনি Jewish Women's Councils ও B'nai B'rith-এর সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বক্তব্য প্রদান করেন। সেই বক্তৃতায় তিনি এমন কিছু অকাট্য সত্য তুলে ধরেন, যা তার জ্ঞাতি ভাইদের মাঝে প্রবলভাবে বিদ্যমান। তিনি সেই বক্তব্যের শিরোনাম নির্ধারণ করেন— 'স্বজাতির মঙ্গল কামনায়'। এবার বক্তব্যটি নিচে উপস্থাপন করা হলো:
**স্বজাতির মঙ্গল কামনায়**
'বহু দূরের পথ পাড়ি দিয়ে, ব্যথাতুর-বিষন্ন হৃদয়ে, স্বজাতির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা বুকে ধারণ করে আমি এ দেশে প্রবেশ করি। পোলিশ ও রাশিয়ান পিতা-মাতার সন্তান হওয়ায় খুব ছোটোকাল থেকেই কোথেকে যেন দুঃখের এক খণ্ড কালো মেঘ আমার হৃদয়ে জেঁকে বসে। আমার পিতা-মাতা জীবদ্দশায় যে নিপীড়নের সাক্ষী হয়েছেন, সে দুঃখ-ই হয়তো পৈতৃকসূত্রে আমার বুকে এসে স্থান পেয়েছে। বাল্যকাল থেকে সহপাঠীদের অ্যান্টি-সেমিটিক আচরণ আমাকে আরও বেশি অভিমানি করে তুলেছে।
কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পৌঁছালে একটি দেশের নাম নিয়মিত শুনতে পেতাম, যেখানে আমার জাতির প্রতি কোনো প্রকার অবহেলা বা বৈষম্য করা হয় না। সেখানে তারা উড়ে বেড়াতে পারে স্বাধীন পাখির ন্যায়। সে দেশটির নাম নিউ জেরুজালেম (নিউইয়র্ক)।
যদি আমেরিকার কোনো বই বা ম্যাগাজিন হাতে পেতাম, গভীর ভালোবাসায় লাজুক হাসি মেখে সেটিকে বুকে জড়িয়ে ধরতাম। গর্বের সাথে ম্যাগাজিনের পাতাগুলোতে হাত বোলাতাম, যেখানে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখার জন্য আমার স্বজাতিদের মুখচ্ছবি বড়ো করে ছাপানো হতো। এই হাজার মুখচ্ছবির মাঝে একদিন নিজেও জায়গা করে নেব— এটাই ছিল আমার দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন।
বাবা আমার কত কাছের বন্ধু ছিলেন, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। সেই বাবাকে ছেড়ে পরিস্থিতির চাপে একসময় নিউ জেরুজালেমে চলে আসার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বন্দর থেকে জাহাজ ছাড়ার আগ মুহূর্তে শেষবারের মতো বাবার চেহারার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বাবা আমাকে কাছে ডেকে বললেন—
"কখনো ভুলে যেয়ো না তুমি একজন ইহুদি। যখন তোমার ভালোবাসা ও সহানুভূতির প্রয়োজন হবে, তখন নিজ জ্ঞাতি-ভাইদের নিকট ফিরে যাবে এবং কোনো অবস্থায় আরবা কানফোট৩০ পরিধান করা বন্ধ করবে না।"
শেষ মুহূর্তের উপদেশবাণীগুলো বুকে নিয়ে জাহাজে উঠে পড়ি। কিন্তু তার অশ্রুময় মুখায়ব প্রতি মুহূর্তে যেন তির হয়ে আমার বুকে বাঁধতে থাকে। জাহাজের এক কোণে বসে কতক্ষণ কেঁদেছিলাম জানি না। ভাবতে খুবই কষ্ট হচ্ছিল যে, বাবা আর আমার পাশে নেই। শত কষ্ট ও হতাশার মাঝে আমি তার বাণীগুলো বিশ্বাস করে নিলাম, ইহুদিরাই আমার ভাই-বোন।
দূর থেকে আমেরিকার দ্বীপগুলো যখন ভেসে উঠতে শুরু করল, তখন কল্পনার জগতে নতুন এক পৃথিবীর চিত্র আঁকতে শুরু করলাম। মনে হচ্ছিল— Robert Louis Stevenson- এর রূপকথার রাজ্যটি দূরের দ্বীপগুলোর পেছন থেকে উঁকি দিচ্ছে। দীর্ঘকাল যাবৎ নিপীড়নের জাঁতাকলে প্রাণ-সর্বস্ব থাকার পর যখন জানতে পারলাম, আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই স্বাধীন এক রাজ্যে প্রবেশ করতে যাচ্ছি, তখন আমার হৃদয়ে যে দোলা বইতে শুরু করে, সে অনুভূতি বলে বোঝাতে পারব না।
নীল সাগরের তারাময় সেই রাত্রিতে স্রষ্টা যেন আমাদের খুব কাছে নেমে এসেছিল। তার নিজ গুণে রাঙিয়ে দেওয়া সেই রাত্রির সৌন্দর্যকে ইঞ্জিনের প্রতিটি কম্পনময় আওয়াজ যেন বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছিল। জাহাজের ডেকে বসে একটি সংগীতদল সুর তুলেছিল বিখ্যাত অপেরা শিল্পী Puccini-এর রচিত গান La Boheme-এর। জাহাজের প্রত্যেক যাত্রী নীরব হয়ে সে সুর উপভোগ করছিল; সাথে আমিও। হয়তো সবাই তখন অতীত চারণে ব্যস্ত ছিল। কেউ সুখের, কেউ বা দুঃখের।
আমার হৃদয়ের মানসপটে তখন অজস্র তারা ভেসে উঠেছিল, যার প্রত্যেকটি-ই বহন করছিল এক একটি দুঃখের চিত্র। চারদিকে বইছিল সুনসান নীরবতা। জাহাজের পাটাতনে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পরার শব্দ কানে ভেসে আসছিল। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে হাভার্ডফেরত এক যাত্রী ডেকের ওপর উঠে বললেন—
"ওহ! এটা শয়তান ইহুদি ছাড়া আর কারও কাজ নয়।" বলেই তিনি পড়ে গেলেন এবং কিছুটা আঘাত পেলেন।
এই ইহুদিবিদ্বেষী মন্তব্যটা আমার হৃদয়ে যেন বিষমাখা তির হয়ে আঘাত হেনেছিল। পরে যখন শুনলাম তিনি ইহুদিদের দ্বারা আহত হয়েছেন, তখন স্বজাতীর কথা ভেবে মনে মনে ভীষণ লজ্জিত হলাম। তাকে যে কেবিনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানে গেলাম। তার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে একেবারে বিমোহিত হয়ে গেলাম। প্রবীণ সেই ব্যক্তিটি জীবনের পুরোটা সময় ধর্ম-মত নির্বিশেষে সকলের পরোপকারে ব্যয় করেছেন এবং জীবনের অন্তিম মুহূর্তে কেবল একটিবারের জন্য জেরুজালেমে যেতে চাইছেন, যেন সেখানকার পবিত্র পাথরগুলো ছুয়ে জীবনের সকল পাপের জন্য ক্ষমা চেয়ে ক্রন্দন করতে পারেন।
কিছুক্ষণ পর তিনি আমাকে কার্ড খেলায় অংশগ্রহণ করতে বলেন। তাকে মনে করিয়ে দিলাম, "আমিও একজন শয়তান ইহুদি।"
বললেন— সে রাতে তিনি যা বলেছেন, তার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আচমকা তা মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে এবং তা নিছক একটি বাক্য ছাড়া অন্য কিছু যেন না ভাবি।
আমরা খুব দ্রুত বন্ধু হয়ে গেলাম। রুমের এক কোণে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে তার খুব কাছে চলে আসলাম। কথায় কথায় তার মনে আমার স্বজাতি সম্পর্কে ভালো ধারণা জন্মানোর চেষ্টা করলাম। আমার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে তিনি বললেন—
"এক বছর তোমার স্বজাতিদের সাথে আমেরিকায় থাকো, তারপর তোমার মনোভাব কী হয়, তা আমাকে জানিয়ো।"
তারপর আমেরিকার বিভিন্ন বড়ো বড়ো শহরে হেঁটেছি এবং স্বজাতীয় ভাইদের কান্নার সুরে বলেছি— "নিজেদের সংযত করো!" নিউইয়র্কে পা ফেলার পরপরই জানতে পারলাম, আমার বাবা পরলোকগমন করেছেন। ধর্মীয় আচার অনুযায়ী পরলোকগত পিতা-মাতার উদ্দেশ্যে কাদ্দিশ৩১ প্রার্থনা সংগীত গাইতে হয়। প্রতিটি পুরুষ, যার শরীরে ইহুদিদের রক্ত রয়েছে, তাদের জন্য এ সংগীত অর্চনা করা বাধ্যতামূলক। ধর্ম-কর্ম থেকে দূরে থাকলেও সবাইকে একদিন এই সংগীত গাইতে হবে, এ থেকে কোনো পরিত্রাণ নেই।
এই প্রার্থনা সংগীত অন্তত দশজন প্রাপ্তবয়স্ক ইহুদির উপস্থিতিতে অর্চনা করতে হয়, আর এই সমাবেশকে বলা হয় মিনিয়ান৩২। ভেবেছিলাম, এমন একটি শহরে খুব সহজেই এই কাজটি করতে পারব। সেই ম্যাগাজিন ও পত্রিকাগুলোতে আমার যে বিখ্যাত জ্ঞাতি-ভাইদের মুখচ্ছবি দেখেছিলাম এবং যাদের নাম পুরো পৃথিবীর সবাই জানত— এমন একজনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম; ঠিকানা সংগ্রহ করা কোনো কঠিন কাজ ছিল না।
অফিসের দরজায় পৌঁছালে দারোয়ান আমার উদ্দেশ্য জানতে চাইল। বললাম— কাদ্দিশ অর্চনার জন্য আমি এক মিনিয়ানের আয়োজন করতে চাই। দারোয়ান ছিল একজন হিব্রু। সে চোখের ইশারায় আমাকে আরও কিছু হিব্রু ক্লার্কের টেবিল দেখিয়ে দিলো। সবার চোখ যেন আমাকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরায় পরিপূর্ণ। মশকরা করে তারা আমার নাম দিলো “Greehorns” (গ্রাম থেকে শহরে আগন্তুক লোকেদের দেখে যেমন গ্রাম ভূত বলে কটাক্ষ করা হয়)। এত সব ভেংচি কাটা মুখায়বের ধাক্কা পেরিয়ে আমি সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির সামনে উপস্থিত হলাম।
এক মিনিট কথা বলে বুঝলাম, তিনি শুধু পোশাক-আশাকেই ইহুদি। এ ধর্মের শিল্প, ঐতিহ্য, ও ভালোবাসার প্রতি তার ন্যূনতম কোনো আকর্ষণ নেই। মিনিয়ান কী, সেটাই তিনি জানেন না। উদ্দেশ্য শুনে অবজ্ঞার স্বরে তিনি আমাকে পাশের একটি দোকানে চলে যেতে বললেন। বুঝতে পারলাম, স্বজাতিদের পাশে থেকেও আমি আজ খুব অপরিচিত। নিউইয়র্কের রাস্তায় হাঁটার সময় খেয়াল করলাম, আমার জ্ঞাতি-ভাই-বোনেরা কী পরিমাণ ব্যস্ত। সবাই কেবল নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। ধর্মীয় বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসার ছাপ যেন তাদের মন থেকে হারিয়ে গেছে।
“ওহ খোদা! এরা কি ইজরাইলের সন্তান? এরা কি সেই জাতি, যারা নিপীড়নের শিকার হয়ে পৃথিবীর চতুষ্কোণে ছড়িয়ে পরেছিল?"
বিলাপ করে সেদিন শুধু এসবই বলছিলাম।
ক্লান্ত-ক্ষুধার্থ শরীরে এক হোটেলে হাজির হলাম। মার্বেল পাথরের তৈরি মেঝে, ফুলেল সুবাস, চাকচিক্যময় কারুকাজ, আলোকসজ্জা, অর্কেস্ট্রা দল ইত্যাদি সবই আমার নিকট মিথ্যে বলে মনে হলো। কোনো কিছুতেই আনন্দ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। যে টেবিলে বসতে গেলাম, বলা হলো— এটা দখল হয়ে গেছে। বসার জন্য একটি টেবিলও পেলাম না। ডায়মন্ডের গহনা আর ঝকমকে গাউন পরিহিত ইহুদি নারীরা তাদের মতোই অমার্জিত ও কুরুচিপূর্ণ পুরুষদের সাথে প্রতিটি টেবিলে বসে আছে। মুখ ভর্তি খাবার ও হুইস্কি খেতে খেতে তারা শরীর দুলিয়ে গাচ্ছে Mississippi ও Georgia। তারা কি দেখতে পায়নি, তাদেরই স্বজাতি এক ইহুদি সেদিন ক্ষুধায় কাতরাচ্ছিল! আমার বাবার বলে দেওয়া আরবা কানফোট পরেই আমি সেদিন তাদের সামনে হাঁটছিলাম, তারপরও তারা আমাকে চিনতে পারেনি!
এরপর রাস্তা, মহাসড়ক, উপসড়ক, যানবাহন বা দোকানপাট যেখানেই হাজির হয়েছি, আমাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যদি কারও পথের সামনে পড়েছি, তো ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এত সব রূঢ় ব্যবহার দেখেও তাদের অভিসাপ দিইনি; বরং হৃদয়ের গভীর থেকে চিৎকার করে কেঁদে বলেছি—
“ওহে আমার ভাই-বোনেরা! স্বজাতির মঙ্গল কামনায় তোমরা নিজেদের সংযত করো!"
আজ আমরা আমেরিকায় যে স্বাধীনতা আমরা পাচ্ছি, তা ইতঃপূর্বে অন্য কোনো দেশে পাইনি। আফসোস হচ্ছে, আমরা এ স্বাধীনতার পূর্ণ অপব্যবহার করছি। পত্রিকার পাতায় খুনি, ঘুষখোর, ডাকাত, জুয়াড়ি, অবৈধ্য অস্ত্রধারী ইত্যাদি বিভিন্ন অভিযোগের তির আমাদের সম্প্রদায়ের দিকে ছুড়ে মারা হয়। এটা ঠিক যে, অন্যান্য সকল সম্প্রদায়ের মাঝেও এ জাতীয় অনেক অপরাধী খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে আমরা অন্য সবার চেয়ে আলাদা। আমাদের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এমনিতেই আলাদা। তাই ভদ্র ও মার্জিত উপায়ে নিজেদের শুধরে নেওয়ার এটাই ভালো সময়। এর চেয়ে বেশি দুঃখের আর কী হতে পারে, যখন আমাদের স্বজাতিরা ইহুদিদের মতো মুখায়ব থাকার পরও খ্রিষ্টানদের সাথে মিলিয়ে নিজেদের নাম রাখছে!
কখনো ভাবতে পারি না, আমার স্বজাতিরা দেরি করে থিয়েটারে এসে একদম সামনের সারিতে যেয়ে আসন গ্রহণ করবে। সবার সমানে দাঁড়িয়ে গায়ের কোট ও হাত মোজা খুলে সেখানে আসন গ্রহণ করবে, যার দরুন সাধারণ দর্শকেরা বিরক্ত হবে। কিন্তু তিনি যদি ধৈর্যসহকারে টিকেট কাউন্টারে দাঁড়িয়ে টিকেট ক্রয় করতেন এবং যানবাহনে চলাচলের সময় বৃদ্ধ কোনো মহিলাকে আসন ছেড়ে দিতেন, তবে তিনি খুব সহজেই সাধারণ মানুষের বন্ধু হতে পারতেন। তবে অধিকাংশ ইহুদি আজ খুবই আক্রমণাত্মক ব্যক্তিত্বের অধিকারী। এটা ঠিক যে, এই ব্যক্তিত্বের দরুন তারা অনেকে দ্রুত বাড়ি-গাড়ি, সম্পদ ও প্রতিপত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তারপরও এই ব্যক্তিত্ব ইহুদিদের অনেকটা নিষ্ঠুর ও নির্মম করে তুলেছে।
বাবার কথাগুলো স্মরণ করে খুব কষ্ট হয়— “যখন তোমার ভালোবাসা ও সহানুভূতির প্রয়োজন হবে, তখন নিজ জ্ঞাতি-ভাইদের নিকট ফিরে যাবে।"
কিন্তু এ দেশে আমি যতবার বিপদে পড়েছি, তার প্রত্যেকটির জন্য আমার ইহুদি ভাইয়েরাই দায়ী। আমি ধোঁকা খাই এক মতলববাজ উকিলের কাছে, একদল নীতিহীন কেরানির কাছে, উদাসীন এক টিকেট কালেক্টরের কাছে এবং সবশেষে হোটেল বালকদের কাছে। যদি এমন হতো, এই প্রতিটি দুঃখ আমাকে সহ্য করতে হয়েছে জ্যান্টাইলদের কারণে, তাহলে নীরবে মেনে নিতাম।
এমন একটা সময় ছিল, যখন আমার পকেটে কোনো পয়সা ছিল না। কাজের জন্য ব্যাকুল হয়ে এদিক-ওদিক ছুটেছি। এক হিব্রু সাহেবের দোকানে গিয়ে বলি— “আমি এক গোঁড়া ইহুদি। ধর্মীয় বিধান মেনে পুরোটা জীবন পার করছি। ধর্মের জ্ঞাতি-ভাই হিসেবে আপনার নিকট আমি একটি চাকরি দাবি করছি।" তিনি আমার কথা শুনে হা...হা...হা... করে হাসতে শুরু করলেন।
তিনি বলেন— "আমার জ্ঞাতি-ভাই! আমরা এখন আধুনিক যুগে বাস করি। এই যুগে ইহুদিতন্ত্র কেউ মেনে চলে না এবং মানারও প্রয়োজন নেই। আমি ইহুদি হয়েও খ্রিষ্টানদের অর্চনায় অভ্যস্ত। এতে আমার ব্যাবসা ভালোই চলে।"
তার কথা শুনে মনে হচ্ছিল, বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে উঠপাখির মতো মাথা তুলে তিনি জানানোর চেষ্টা করছেন, তিনি সবার চেয়ে আলাদা।
তাকে বুঝিয়ে বললাম, ইহুদিতন্ত্র কেবল ধর্মীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটা শরীরের রুধি ধারার মাঝে প্রবহিত। যদি কোনো চিতাবাঘ নিয়মিত সিনাগাগে যাওয়া বন্ধ করে গির্জায় যাওয়া শুরু করে— তবে এটা নয় যে, সে খ্রিষ্টান হয়ে গেছে। সে আগেও চিতা ছিল, এখনও তা-ই আছে। এভাবে কথা বলার দরুন নিশ্চিত ছিলাম, সেই দোকানে কাজ করার সুযোগ পাব না।
এরপর আরও অনেক অফিসে চাকরির জন্য ধরনা দিলাম। সবশেষে বুঝলাম, ইহুদিতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আমার স্বজাতিদের মন থেকে একেবারে হারিয়ে গেছে। নিপীড়নের হাত থেকে রক্ষা পেতে একসময় বহু পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের নিয়ে এ দেশে পাড়ি জমিয়েছিল, কিন্তু সেই সন্তানরা আজ বধ্য উন্মাদের মতো থিয়েটার হলগুলোতে রাতের পর রাত আমোদ-ফুর্তি করে কাটাচ্ছে। ঘরে বসে অভিভাবকগণ যেখানে সন্তানদের মঙ্গল কামনায় ব্যস্ত, সেখানে তাদের সন্তানরা উগ্র আমোদ-ফুর্তিতে ব্যস্ত। লেখক, অভিনেতা, সমালোচক, শিল্পী, কারিগর ইত্যাদি বিভিন্ন অঙ্গনে তারা প্রতিষ্ঠা লাভ করছে, তবে নিজ নামে নয়; খ্রিষ্টানদের ছদ্মনামে।
ক্লান্ত পায়ে বহু পথ হাঁটার পর— সিটি হলের এক তরল দুধের দোকানে এসে থামলাম। এক সেন্টের সমপরিমাণ তরল দুধ আমাকে বিনা পয়সায় দেওয়া হলো, যার স্বাদ অন্য কিছুর সাথে তুলনা করা সম্ভব নয়। আমার পাশে বসে এক ভদ্রলোক ঠোঁট চাটতে চাটতে বলল—
“এটা খুব প্রশংসনীয় কাজ। যিনি বিনামূল্যে এভাবে তরল দুধ বিতরণ করছেন, তার দরুন অনেক ছোটো ছোটো শিশুর জীবন রক্ষা পাচ্ছে। তিনি একজন সম্পদশালী ইহুদি। ঈশ্বর তার মঙ্গল করুক। আমার তিনটি সন্তান আছে।"
স্বজাতি সম্পর্কে হঠাৎ এমন প্রশংসার বাণী শুনে হৃদয়ে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। আমি সে লোকটির পাশে আরও এক ঘণ্টা বসেছিলাম এবং কীভাবে সেই ইহুদি ব্যক্তিটি ধর্ম-মত নির্বিশেষে লাখো শিশুর প্রাণ রক্ষা করছে, সেই গল্প শুনলাম। আমেরিকায় আগমনের পর এটাই ছিল প্রথম কোনো ঘটনা, যার দরুন আমি গর্ববোধ করছি।
এরপর ছোটো এক পার্কে গিয়ে বসলাম। আমার পাশ ঘেঁষে ছোট্ট একটি মিছিল চলে গেল। সেই মিছিলটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমের মাঝে এক আশ্চর্য সুন্দর স্বপ্ন দেখলাম।
দেখলাম, এটা ছোট্ট কোনো মিছিল নয়; বরং একটি প্যারেড। বিভিন্ন প্লাটুনে বিভক্ত হয়ে আমার স্বজাতিরা সেখানে প্যারেড করছে। প্রথম প্লাটুনে, কমান্ডারের পেছনে পতাকাবাহী সদস্যটির হাতে বড়ো একটি ব্যানার, যাতে লিখা ছিল— “স্বজাতির মঙ্গল কামনায়”। সে প্লাটুনে প্রত্যেক সদস্যের হাতে ছিল একটি করে সিল্কের ব্যানার, সেখানে স্বর্ণাক্ষরে লেখা ছিল তাদের প্রকৃত ইহুদি নাম। এদের পর আসে জুয়াড়ি ইহুদিদের প্লাটুন। তাদের হাতে থাকা ব্যানারই বুঝিয়ে দিচ্ছিল, তারা কোনো নোংরা কাজের প্রতিনিধিত্ব করছে।
এরপর আসে একদল দাস-দাসী, যাদের সামনে রয়েছে ক্ষমতালোভী ও সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ। তদের হাতে থাকা প্লেকার্ডে লেখা ছিল— "শর্ত সাপেক্ষে আমরা কাজে ফেরত যাব।” এরপর আসে একদল সুদি ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন সিন্ডিকেট শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকগণ। প্যারেডের এ অংশটি ছিল অনেক বড়ো। তারা এসেছে সাধারণ ও মার্জিত বেশভুশায়। তাদের হাতে থাকা ব্যানারগুলোতে লিখা ছিল— “আমরা আর মিথ্যে বলব না, আর অতিরিক্ত সুদের বাণিজ্য করব না" এবং আরও অনেক প্রতিজ্ঞা। উপস্থিত জনতা খুশি হয়ে বলল— "Missouri! Missouri!"
এরপর আসে Hebrew Firebugs Union-এর একটি দল। তাদের পরনে ছিল জেল কয়েদিদের পোশাক। সেটি ছিল একদল আক্রমণাত্মক সৈন্যবাহিনী; সংখ্যায় ছিল হাজার হাজার। তাদের ব্যানারের লেখা ছিল— “আমরা নিজেদের সংযত করে চলব, "নিজেদের শুধরে নেব এবং আরম্বরপূর্ণ জীবন পরিত্যাগ করব।”
হঠাৎ এক ইহুদি পুলিশ কর্মকর্তার ঝাঁকুনিতে আমার ঘুম ভাঙে। তিনি আমাকে জোড় করে থানায় নিয়ে গেলেন। পার্কে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য দায়িত্বরত এক ইহুদি মেজিস্ট্রেককে জরিমানা দিতে বললেন। কিন্তু আমার পকেট যে পুরো ফাঁকা। মেজিস্ট্রেট সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন— “অকর্মণ্য-আগাছা, পরেরবার থেকে পার্কে গিয়ে সজাগ থাকবে।”
সজাগ থাকবে! এর চেয়ে বাজে উপদেশ আর কী হতে পারে? স্বজাতির মঙ্গল কামনায় যে স্বপ্ন দেখছিলাম, তার ব্যাঘাত ঘটল অপর এক স্বজাতি ভাইয়ের আঘাতে। এরপর সেই থানাতে ঘটল এক আকস্মিক ঘটনা। সেখানে উপস্থিত প্রৌঢ় বয়স্ক এক বিদ্বান ইহুদি আমার বেশভুশা দেখে কাছে এলেন। আমার চেহারা দেখেই তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, নতুন দেশে আমি কী বিপদের মুখে পড়েছি। তিনি আমাকে বস্তির মতো এক ঘেটোতে নিয়ে গেলনে। রাতের খাবারের পর তিনি আমাকে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়লেন। পাড়ার সকল ইহুদিদের তাদের প্রথম নামে ডাকতে শুরু করলেন। এক এক করে অনেকে জমা হলো। বাবার মৃত্যু উপলক্ষ্যে কাদ্দিশ অর্চনা সেখানেই শেষ করলাম।
তখন থেকে হতো-দরিদ্র গরিব ইহুদিদের আমার বন্ধু করে নিয়েছি। কারণ, প্রকৃত ধর্মের স্বাদ-গন্ধ কেবল এই দলটির মাঝেই পেয়েছি। দারিদ্র্য-পীড়িত এই দলটি জীবনে বহু নির্মমতা দেখেছে, কিন্তু তারপরও ধর্মীয় অনুশাসন পালন করা ভোলেনি। প্রৌঢ়-বয়স্ক-বিদ্বান ইহুদিরা বহু দিন ঠোঁট আওড়িয়ে আমাকে অমৃত বাণী শুনিয়েছে। তারা আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন— “ঈশ্বরের ওপর ভরসা রেখ এবং ভবিষ্যতের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করো।” এতসব হতাশার মাঝে সেদিন নিজেকে তাদের মাঝে আবিষ্কার করতে খুব গর্ববোধ হয়।
প্রকৃত ইহুদিদের নিকট স্বর্গ, পার্থিব কোনোটিই উপেক্ষিত নয়। স্বর্গ-নরকের ভয় আছে বলে তারা সকল কু-কর্ম হতে নিজেদের পৃথক রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করছে। মৃত্যু নিয়েও আমাদের রয়েছে সুন্দর দর্শন। মৃত্যুরপর আর কোনো শারীরিক যন্ত্রণা নেই। শারীরিক মুখোশ থেকে বেরিয়ে যারা একবার রৌদ্রোজ্জ্বল নতুন সে পৃথিবীতে প্রবেশ করবে, তাদের আর কোনো কষ্ট নেই। পৃথক এ দুটি জগতের মাঝে মৃত্যু একমাত্র প্রতিবন্ধকতা, যা অতিক্রম করে মানুষ অমরত্বের জগতে পৌঁছে যায়। The Old Curiosity Shop অধ্যায়ে মৃত্যু সম্পর্কে Charles Dickens বলেন—
“একবার যিনি মারা যান, তার জন্য আশেপাশের আত্মীয়স্বজন যতই বিলাপ করুক না কেন, তার মৃত্যুপরবর্তী জীবনে কোনো রকম পরিবর্তন আসে না। তা মূলত পার্থিব জীবনের কৃতকর্মের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। গরিব-দুঃখী ইহুদিদের নিকট এগুলো অমৃত বাণী, যার দরুন তারা আজও ভালো কাজ করার অনুপ্রেরণা পায় এবং নোংরা বস্তিতে থেকেও প্যালেস্টাইনের সুগন্ধ শুকতে পায়।”
শহরের অপর প্রান্তে থাকা আমার স্বজাতীয়দের বড়ো এক অংশের হয়তো প্রচুর সম্পদ হয়েছে, কিন্তু তাদের মনে ধর্মের কোনো স্থান নেই। তারাই আজ উদ্ভ্রান্তের মতো বিবেক-বিবর্জিত নিষ্ঠুরতাকে পুঁজি করে বিশ্ব দখলের পথে ছুটে চলেছে। প্রকৃতপক্ষে তারাই জ্যান্টাইলদের মনে অ্যান্টি-সেমেটিক মনোবৃত্তির জন্ম দিয়েছে। ধর্ম নিয়ে কথা বলতে গেলে, দেখিয়ে দেয় তাদের ঘরেও তালমুদ আছে, কিন্তু তারা তা কখনো পড়ে দেখে না; অনুসরণ করা তো দূরের কথা।
এই সম্পদশালী ইহুদিদের পিতা-মাতারা কী পরিমাণ নিপীড়ন সহ্য করে, বহু সাগর পাড়ি দিয়ে এ দেশে থাকার সৌভাগ্য পেয়েছে, সেই মর্ম তারা বুঝবে না। যে কমেডিয়ানগণ Vaudeville Genre সংগীতে করে থিয়েটার বাণিজ্য করে রাতারাতি বহু অর্থ উপার্জন করছে, তাদের দশজনের মধ্যে নয়জনই ইহুদি সন্তান। গল্প-উপন্যাস, কৌতুক-অভিনয়, নাটক, চলচ্চিত্র ইত্যাদি নানা ছলে তারা আদি পিতা-মাতাদের নিপীড়নের চিত্র সাধারণ দর্শকদের সামনে ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত। তাদের নিকট সবকিছু যেন অর্থ উপার্জনের রাস্তায় রূপ নিয়েছে।
প্রৌঢ় বয়স্ক দরিদ্র ইহুদিদের জীবনে আমোদ-প্রমোদের কোনো স্থান নেই। তারা দিন আনে দিন খায়। একই সঙ্গে চালিয়ে যায় ধর্মীয় অনুশীলন। একদিন এক মুরগির খামারের পেছনে অন্ধকার একটি স্থানে বসে দেখছিলাম, এক ১০৪ বছরের বৃদ্ধ তালমুদের ৬০ তম পৃষ্ঠার ওপর কিছু গরিব যুবককে জ্ঞান প্রদান করছে। সেখানে একটি যুবক তার সবজির ভ্যান পাশে রেখে বৃদ্ধের নিকট জ্ঞান লাভের জন্য বসে আছে। যুবক জানে, ভ্যানের ওপর যে সবজিগুলো পড়ে আছে তা পঁচনশীল। তারপরও জ্ঞান লাভের জন্য সেখানে বসে আছে। পাশ থেকে অসংখ্য শিশু-বাচ্চা সেই ভ্যানগাড়িটি নিয়ে খেলা করতে শুরু করে, তারপরও সে নির্বিকার। এমন সময় অন্য পাশ থেকে কোনো বৃদ্ধ কাগজে মোড়ে এক টুকরো মুরগির মাংস সেই যুবককে উপহার দেয়, যেন সে তালমুদের প্রতি আরও মনোযোগী হওয়ার উৎসাহ পায়। এই গরিবদের জীবনে ফুর্তি করার কোনো অবকাশ নেই। আমি সেই বিদেশি বন্ধুকে ডেকে বলতে চাই, প্রকৃত ইহুদিদের স্বাদ আমি এই গরিবদের মাঝেই খুঁজে পেয়েছি।
সম্পদশালী ইহুদিদের দুর্ব্যবহার, অসভ্যতা ও নোংরামি দেখে যখন লজ্জিত হই, তখন বলতে চাই, কোনো ইহুদিকে যদি ধর্মের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয়, তবে যেন এই গরিবদের বিচারের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তালমুদের কিছু বাণী রাবাই Myers-এর মুখে প্রায় শোনা যায়; যার অর্থ বুঝতে পারা কারও জন্যই কঠিন নয়:
"Which is the path, both right and wise, That for himself a man should find? That which himself much dignifies, And brings him honor from mankind."
টিকাঃ
৩০. আরবা কানফোট (Arba Kanfoth)- ইহুদিদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক।
৩১. কাদ্দিশ (Kaddish)- পারিবারিক বা প্রিয় কোনো ব্যক্তির মৃত্যুতে তার আত্মার সন্তুষ্টির জন্য সৃষ্টিকর্তার স্মৃতি গেয়ে ইহুদিরা যে প্রার্থনা সংগীত করে, তাকে কাদ্দিশ বলে।
৩২. মিনিয়ান (Minyan)- কাদ্দিশ পালনে আয়োজিত সমবেত সংগীত মঞ্চকে কাদ্দিশ বলা হয়। এ জন্য ১৩ বয়সোর্ধ্ব অন্তত দশজন ইহুদি সদস্যের উপস্থিতি আবশ্যক।
📄 জ্যানটাইলদের প্রতি ইহুদি দৃষ্টিভঙ্গি
ইহুদি বিতর্ক নিয়ে আমরা ততদিন পর্যন্ত কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারব না, যতদিন না তারা নিজ উদ্যোগে এ বিতর্কের সমাধানে এগিয়ে আসে। জ্যান্টাইলদের পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ইহুদিদের অভিযোগ—
'মেনে নিলাম আপনারা যা প্রকাশ করছেন তা সত্য এবং কিছুসংখ্যক ইহুদি সত্যিই অপরাধী। তাই বলে প্রতিবার নাম প্রকাশের সময় 'ইহুদি' শব্দটি উল্লেখ করতে হবে কেন? আপনারা চাইলে Al Wood, Morris Gest, Louis Marshall, Samuel Untermyer, Edward Lauterbach ও Felix Warburg নামগুলোকে অপরাধী বলে সাব্যস্ত করতে পারেন। যখন আপনার ইহুদি উচ্চারণ করেন, তখন কি পুরো সম্প্রদায়কে এক কাতারে নিয়ে আসা হচ্ছে না? এর দরুন পুরো সম্প্রদায় অভিযুক্ত হচ্ছে।'
এমন যদি হতো, শুধু জড়িত ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে এবং জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে না, তবুও কিন্তু সমাজে আহামরি কোনো পরিবর্তন আসত না। হাজারো বছর ধরে জ্যান্টাইলদের সাথে ইহুদিদের যে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব, তার কোনো অবসান হতো না। কিছুদিন পরপর ইউরোপজুড়ে যে অ্যান্টি-সেমেটিক আন্দোলন জেগে উঠে, তা থেকে ইহুদিরা কখনো পরিত্রাণ পেত না। জ্যান্টাইল প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষত DEARBORN INDEPENDENT ইহুদিদের সমালোচনা করে যে অসংখ্য আর্টিক্যাল প্রকাশ করেছে, তার উদ্দেশ্য— জ্যান্টাইলদের মনে ইহুদিবিদ্বেষী চেতনা জাগিয়ে তোলা নয়; এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য হলো— ইহুদি বিতর্ক সম্পর্কে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সজাগ করে তোলা। মূলত পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, নিরপেক্ষ ও সত্য তথ্য প্রকাশ করতে গেলেও তা ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জ্যান্টাইলদের মনে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দেবে। এ পর্যন্ত পত্রিকা প্রতিষ্ঠানটি ইহুদিদের সম্পর্কে যে পরিমাণ তথ্য ছাপিয়েছে, তার একটিও যদি ভুল হতো, তবে এত দিনেও তারা কোনো মামলা করলা না কেন?
এ ক্ষেত্রে ইহুদিরা নিরুপায়। জ্যান্টাইল পত্রিকাগুলো দ্বারা প্রকাশিত তথ্যসমূহ ভুল প্রমাণিত করার জন্য কোনো রকম তথ্য-প্রমাণ ইহুদিদের হাতে নেই। তারা চায়, প্রকাশিত আর্টিক্যাল ও কলামগুলো সমাজের মানুষ না পড়ুক। তারা অনেক প্রচেষ্টা চালিয়েছে আমাদের প্রতিষ্ঠানকে বাজারে হাস্যরসের পাত্র বানানো যায় কি না। তা ছাড়া নিজ জ্ঞাতিগোষ্ঠীর জন্য জ্যান্টাইলের ছাপানো এ জাতীয় আর্টিক্যাল ও কলাম পড়া তো একেবারে নিষিদ্ধ, যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, ইহুদিরা চায় না— অ্যান্টি-সেমিটিক বিক্ষোভ তাদের সম্প্রদায়ের মধ্য জাগ্রত হোক। আমাদের অভিযোগসমূহ শোনার পর ইহুদি সংগঠনগুলো যে জবাব দিলো, তা শুনে সত্যি অবাক হবেন। এমন কয়েকটি জবাব সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ নিচে উপস্থান করা হলো—
১. 'তোমরা যা বলছ, তার সবই সত্যি তবুও তোমরা আমাদের অভিযুক্ত করতে পারো না।' সাংবাদিকতা শিল্পে ইহুদিদের বেশ কিছু মূলনীতি রয়েছে, যার একটি হলো— ইহুদিরা কখনো গণ-আলোচনার বিষয়বস্তু হতে পারবে না। যদি তাদের নিয়ে কোনো বিতর্ক হয়, তবে তা কেবল ভালোর জন্যই হতে হবে। ইহুদিদের প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে— এমন কোনো বিতর্ক জনসম্মুখে আনা যাবে না। এর উদ্দেশ্য হলো— ইহুদিদের অপকর্মগুলো যেন জনসম্মুখে প্রকাশ না পায়। শুধু জ্যান্টাইলরাই নয়; ইহুদিদের কোনো মুখপাত্র পর্যন্ত এমন কোনো কাজ করতে পারবে না।
২. 'আপনারা যা বলছেন, তার সবই সত্যি। কিন্তু আপনারা যে সমাধান চাইছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। আপনাদের জন্য ইহুদিরা কখনো পরিবর্তিত হবে না; বরং আমাদের জন্য আপনাদের পরিবর্তন হতে হবে।' তারা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছে, ইহুদিরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি এবং তাদের প্রয়োজনে আমাদেরকেই পরিবর্তীত হতে হবে। তাহলে থিয়েটার ও চলচ্চিত্র শিল্পে ইহুদিরা যে নগ্ন সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, তা কি আমাদের মেনে নিতে হবে? পুঁজিবাজার ও অর্থবাজারকে পৃথক করে যে ধ্বংসাত্মক সমাজ ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে, তা কি আমাদের মেনে নিতে হবে? সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় তারা যেভাবে আমাদের ব্যক্তিগত সম্পদ দখল করে যাচ্ছে, তা কি আমাদের মেনে নিতে হবে? খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল মিশিয়ে ইহুদিরা প্রতিদিন বিষ পান করাচ্ছে, তা কি আমাদের মেনে নিতে হবে?
তারা নিজেদের যে Mosaic Law-এর অনুসারী দাবি করে থাকে, সত্যি বলতে মোজেস যদি এই যুগে বেচে থাকতেন, তবে তিনি কখনো ইহুদিদের এই বানানো আইনসমূহ গ্রহণ করতেন না।
৩. 'আপনাদের দাখিল করা অভিযোগসমূহের সমাধান তখনই সম্ভব, যখন আমরা চাইব। কিন্তু আমাদের এমন কোনো প্রয়োজন পড়েনি যে, আপনাদের অভিযোগগুলো মাথা পেতে নিতে হবে।'
যারা নিজেদের প্রকৃত ইহুদি বলে দাবি করে, তাদের ওপর অভিসম্পাত বর্ষণের কথা হাজার বছর আগে ওল্ড টেস্টামেন্টে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলো জিহুদিয়া (Judah), প্যালেস্টাইনে ফিরে যাওয়ার অর্থ হলো— বিশ্ব ভ্রক্ষ্মাণ্ড ধ্বংসের পথ পরিষ্কার করা। ইহুদিরা যে নিজেদের মোজেসের অনুসারী বলে দাবি করে, সেই মোজেস কখনো জিহুদিয়ার ওপর সন্তুষ্ট ছিলেন না। নিজেদের মাঝে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ইজরাইলবাসী একত্রিত হয়ে এই গোত্রটিকে হাজার বছর আগে বহিষ্কার করে। এমন নয় যে, তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে; বরং শাস্তিস্বরূপ ইজরাইল থেকে নির্বাসিত করা হয়েছে। তাহলে কীসের ভিত্তিতে আজকের জায়োনিস্টরা দাবি করে, তারা প্যালেস্টাইনের প্রকৃত মালিক?
যখন কেউ বাইবেল পড়বে, তার খুব সতর্কতার সাথে বাইবেল পড়া উচিত। ইহুদিরা দাবি করে তারা পয়গম্বর Abraham-এর অনুসারী। একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই, ওল্ড টেস্টামেন্টের নয়-দশমাংশ হলো ইজরাইলি গ্রন্থ, যা ইজরাইলবাসীর জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। Abraham, Isaac, Jacob, Moses, Joshua, Gideon, Samuel, Esther ও Mordecai সবাই ছিলেন ইজরাইলবাসীর পয়গম্বর। তারা কেবল জুদাহদের জন্য পয়গম্বর হয়ে আসেনি। এমনকী যিশু যে অনুসারীদের খুঁজে পান, তাদের অবস্থান ছিল গ্যালিলি অঞ্চলে, যা ছিল জুদাহ থেকে অনেক দূরে। তাঁর অনুসারীদের মধ্যে কেবল একজনকে পাওয়া যায়, যিনি বেনজামিন প্রদেশ হতে যিশুর অনুসারী হতে গ্যালিলিতে আসেন। তার নাম হলো St. Paul। তিনি হলেন যিশুর একমাত্র ইহুদি অনুসারী।
আমেরিকান ইহুদিদের উচিত, নিজেদের চরিত্রে আত্মসমালোচনার অভ্যাস গড়ে তোলা। তারা যদি জীবনের অর্ধেকটা সময় কেবল নিজেদের সমালোচনায় ব্যয় করত, তবে কখনোই এত সব আক্রমণের মুখোমুখি হতে হতো না; বরং সাধারণ মানুষের উন্নয়নকল্পে তারা বিশেষ অবদান রাখতে পারত। যেখানে ইহুদিরা জ্যান্টাইলদের যেকোনো কাজের প্রতি উচ্চ সংবেদনশীল মনোভাব পোষণ করে, সেখানে নিজেদের সকল ভুলত্রুটিতে থাকে নীরব।
ইহুদিদের ওপর আসা যেকোনো অভিযোগ ও সমালোচনা মোকাবিলা করতে তারা বদ্ধপরিকর। কিন্তু অসংযত জীবন পরিহার করে ইহুদিরা যে সুন্দর সমাজব্যবস্থায় ফিরে আসবে, এমনটা তাদের মাঝে কখনো দেখা যায় না। এমন নয় যে, জ্যান্টাইলরা ইহুদিবিদ্বেষী হয়ে জন্মগ্রহণ করে; বরং তাদের নিয়মিত কার্যকলাপই জ্যান্টাইলদের ধীরে ধীরে ইহুদিবিদ্বেষী করে তুলে।
-Walter Lippmann, in The American Hebrew
**জ্যান্টাইলদের দৈনন্দিন জীবনচক্রে ইহুদিদের দৌরাত্ম্য**
একটা সময় ছিল, যখন অর্থের চেয়ে সৃজনশীলতায় মানুষ বেশি আনন্দ খুঁজে পেত। বেছে বেছে এমন জিনিসকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করত, যা করে আনন্দ পাওয়া যেত। অর্থের চেয়ে মানসিক প্রশান্তি-ই ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ তার মনস্তত্ত্বকে বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে পূর্ণরূপে ব্যবহার করত। নিজেকে স্রষ্টারূপে কল্পনা করতে পারাটা তাদের কাছে ছিল গর্বের বিষয়।
মনের সুখে গান গেয়ে সকাল-সন্ধ্যা মাঠে কাজ করে যেত কৃষাণের দল। রোগে-শোকে তাদের সাহায্য করতে মাঠে এগিয়ে আসত কৃষাণীর দল। তাদের মাঝে পারস্পরিক সম্মান, মায়া, ভালোবাসা ইত্যাদি কোনোটির কমতি ছিল না। মৌসুম শেষে তারা য ত টুকু ফসল পেত, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকত। তাদের মনে অতি লোভ বলতে কোনো বিষয় ছিল না। তা ছাড়া একের বিপদে অন্যজন এগিয়ে আসা ছিল সামাজিক রীতি।
গৃহপালিত প্রাণীগুলোর প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। নিজ সন্তানের মৃত্যুতে কৃষাণির বুক চিরে যতটা আর্তনাদ শোনা যেত, ততটাই আর্তচিৎকার ভেসে উঠত দুই মাসের একটা বাছুর মারা গেলেও। পাড়া-প্রতিবেশীরা সবাই তাকে সহমর্মিতা জানাতে ছুটে আসত। এমনও দিন যেত, যখন ক্ষরা বা অতি বৃষ্টির দরুন মাঠের সব ফসল নষ্ট হয়ে যেত, তবুও তাদের গোয়াল ঘরে থাকা নিষ্পাপ প্রাণীগুলো কখনো অভুক্ত থাকেনি। সন্তানদের অভুক্ত না রাখতে বাবা-মায়েরা যেমন কম খেয়ে দিনানিপাত করত, তেমনি নিষ্পাপ এই প্রাণীগুলোর জন্যও তারাও অর্ধভুক্ত থাকত।
অভাব-দরিদ্রতা কেবল পেট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল; বুক পেরিয়ে মগজ পর্যন্ত উঠতে পারেনি। কারণ, এই চিন্তা বুক পেরিয়ে মাথায় উঠে গেলে— তা লোভ-লালসায় রূপ নিতে পারে, যা পৃথিবীর সকল ধন-সম্পদ দিয়েও মেটানো সম্ভব নয়। এই সুন্দর সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়ার একমাত্র উপায় হলো— মানুষের মগজে লোভ-লালসার বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া। এটাই একমাত্র অস্ত্র, যা পৃথিবীর যেকোনো সুন্দর সমাজব্যবস্থাকে মুহূর্তে ধ্বংস করে দিতে পারে। আর ইহুদিদের সুদি ব্যাংকগুলো এই বিশেষ অস্ত্রের পেছনেই কাজ করেছে।
ডলারভিত্তিক অর্থব্যবস্থা চালু হওয়ায় আমেরিকার প্রতিটি মানুষ এটিকে বিনিময় মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। নিরূপায় হয়ে কৃষকরা নিজেদের সকল সম্পদ (স্বর্ণ- রৌপ্য) তুলে দেয় ব্যাংকের হাতে। সেইসঙ্গে সঙিন করে নেয় বিভিন্ন অঙ্কের ঋণ। আগেই বলা হয়েছে, ফেড চালু হওয়ার পর বাছাই করে করে শুধু উৎপাদনশীল খাতগুলোর ওপরই অধিক সুদের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়।
এই সুদের বর্ধিত খরচ মেটাতে কৃষকরা উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয় মূল্য বাড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়। এই ধাক্কায় মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের দাম মুহূর্মুহু করে বাড়তে শুরু করে। সীমিত আয়ের মানুষদের ছটফটিয়ে মরে যাওয়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়। এদিকে কৃষকেরই-বা কী করার আছে? তাদেরও তো বর্ধিতমূল্যে পণ্য বিক্রি করতে হবে! নতুবা সুদের অর্থ পরিশোধ করবে কীভাবে? সমাজে যারা অভিজাত এলাকায় বসবাস করে, তারা কি আদৌ গ্রামের এই কৃষকদের আর্তনাদ শুনতে পায়?
ইহুদিভিত্তিক পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজদের কাজে নেমে পড়ে। তাদের হাতে আছে কলম, যা পৃথিবীর যেকোনো মরণাস্ত্রের চেয়ে অধিক ধ্বংসাত্মক। তারা একের পর এক কলাম প্রকাশ করতে শুরু করে। যেখানে গ্রামের কৃষকদের অতি মুনাফালোভী, মজুতদার, অন্ন ডাকাত ইত্যাদি বলে প্রচার শুরু করে। সামাজিক বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে এগিয়ে আসে আমেরিকান প্রশাসন।
সরকারিভাবে প্রতিটি পণ্যের বিক্রয়মূল্য বেঁধে দেওয়া হয়, যেন শহরে বসবাসরত মধ্যবিত্তদের কোনো সমস্যা না হয়। কিন্তু সরকারি ভাবে যে বিক্রয়মূল্য বেঁধে দেওয়া হয়, তা দিয়ে কৃষকদের উৎপাদন খরচই উঠে না। তার ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের দরুন ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তো রয়েছেই! রাগে-দুঃখে তারা নিজেদের শস্যখেত নিজেরাই পুড়িয়ে দেয়। দুধ-ডিমের অপ্রত্যাশিত কম বিক্রয়মূল্য দেখে কৃষকরা নিজের হাতেই সব নষ্ট করতে শুরু করে।
তবে পৃথিবীতে তো বেঁচে থাকতে হবে! শুরু হয় খাদ্যে ভেজাল মেশানোর যুগ। যে কৃষকরা একসময় নিজের রক্ত-ঘামে ভেজা হাতে ফসল ফলাত, সেই হাত দিয়েই তারা আজ খাদ্যে বিষ মেশাতে শুরু করে। নিজেদের এই অধঃপতন দেখে ভগ্ন হৃদয়ে সন্তানদের বলছে— 'শহরে গিয়ে পড়ালেখা করে অন্য কোনো কাজ করো; কৃষক হওয়ার প্রয়োজন নেই।' এভাবেই আমাদের সমাজ থেকে হারিয়ে যায় সৃজনশীলতার স্বর্ণালি অধ্যায়। সেই সন্তানরা পড়ালেখা করে আজ যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে, তার সবই প্রায় ইহুদিদের অঙ্গ সংগঠন!
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ইহুদিদের ষড়যন্ত্রের গল্প তো আগেই বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রতিটি শিক্ষাবোর্ডের ওপর কমিউনিস্টরা সিংহাসন গেঁড়ে বসেছে। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে গড়ে তুলেছে ফেমিনিস্ট সোসাইটি। বলে রাখছি, এই তথাকথিত নারীবাদী ফেমিনিস্ট সোসাইটি একদিন প্রতিটি রাষ্ট্রের-ই মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। সমাজের যে নারীরা একসময় স্বামীর বুকে আশ্রয় খুঁজত, আজ সেই নারীরা ইহুদিদের প্ররোচনায় পড়ে অর্ধনগ্ন হয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। তাদের চোখে যিশু তো নারী অধিকার লুণ্ঠনকারী দোসর!
ধর্মীয় শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়ার দরুন ফেমিনিজমের মতো নতুন নতুন অজস্র পরগাছা পুরো পৃথিবীজুড়ে গড়ে উঠবে। নতুন প্রজন্ম হয়তো আর জানতে পারবে না, যিশুর প্রকৃত পরিচয় কী এবং কেন তিনি এই পৃথিবীতে এসেছিলেন। তারা বুঝবে না, কেন বাইবেলে মেয়েদের শালীন ও পর্দানশীল হতে বলা হয়েছে। শিক্ষাঙ্গন থেকে বহু আগেই প্রার্থনা সংগীতের চর্চা উঠে গেছে। লাইব্রেরিগুলোতে ধর্মতত্ত্বের পরিবর্তে ইহুদি সাহিত্য জায়গা করে নিয়েছে। সেখানে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে মনগড়া সব গল্পের বই।
ইহুদিরা ধর্মের শিকড় কেটে দেওয়ার যত চেষ্টাই করুক না কেন, এই পৃথিবী থেকে তো সৃষ্টিকর্তার পরিচয় মুছে দেওয়া সম্ভব নয়। সামান্য চিন্তাশীল মানুষও যদি হৃদয়ের চোখ দিয়ে প্রকৃতির দিকে তাকাতে শুরু করে, তবে অবশ্যই মহান সৃষ্টিকর্তার সাড়া খুঁজে পাবে। তাই শিকড় কাটতে হলে প্রতিটি মানুষকে হৃদয় শূন্য করতে হবে। যেহেতু তা করা সম্ভব নয়, তাই এই আবেগকে নিয়ে ইহুদিরা ভিন্ন খেলায় মেতে উঠেছে। গির্জাগুলোতে আজ পাদরিদের চেয়ে রাবাইদের দৌরাত্ম্য যেন অধিক বেশি। তারা বলে— 'আমরাই সৃষ্টি কর্তার মনোনীত সম্প্রায়। আমরা তোমাদের নিকট রক্ষাকর্তা পাঠিয়েছি। আমরা তোমাদের নিকট বাইবেল পাঠিয়েছি। সুতরাং ইজরাইল যাও এবং আশীর্বাদ নিয়ে এসো।'
Karl Marx-এর ধ্বংসাত্মক সমাজতন্ত্রের নাম করে ইহুদিরা পুরো রাশিয়াজুড়ে কী তাণ্ডব চালিয়েছে, সে গল্প আশা করি আপনাদের মনে আছে। 'ন্যায়ভিত্তিক' সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নাম করে তারা রাশিয়ার সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ করেছে। আগেই বলেছি, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এই পৃথিবী এমন এক সময় পার করেছে, যখন অর্থনীতির ওপর লেখা দশটি বইয়ের মধ্যে আটটি-ই লিখেছে ইহুদি লেখকরা। সেগুলো আজ পৃথিবীর বিখ্যাত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হচ্ছে। নতুন প্রজন্মগুলো গড়ে উঠছে মানসিক প্রতিবন্ধিরূপে।
স্কুল-কলেজ ও গির্জাগুলো আজ যেন কমিউনিস্টদের দূর্গ হয়ে উঠেছে। আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্ত-ঘামে নির্মিত যে সমাজ, তা নিজেদের অজ্ঞতার জন্যই ধ্বংস হতে বসেছে। যে জাতির ইতিহাসে শিক্ষা নেই, সে জাতিকে মেরুদণ্ডহীন বলাই শ্রেয়। আমরা হলাম তেমনই এক মেরুদণ্ডহীন জাতি।
১৯১৭-১৮ সালের দিকে কোনো এক ম্যাগাজিন পত্রিকা একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে, যাতে কিছু প্রশ্ন করা হয়। যেমন: আমাদের সমাজের কী হয়েছে? আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কী পড়ানো হচ্ছে? আমাদের তরুণ-তরুণীরা এত উগ্রতায় মত্ত হয়ে পড়ছে কেন?
এর উত্তর খুবই সহজ; শিক্ষা ব্যবস্থা। বলশেভিক আন্দোলনকারীরা ইতোমধ্যে পৃথিবীর অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু বামপন্থি দলের জন্ম দিয়েছে। প্রতিটি জায়গায় একদল প্রফেসর এবং তাদের অনুগত কিছু শিষ্য শিক্ষার্থীদের মাঝে লেনিন-ট্রটস্কিকে বিপর্যস্ত মানবতার আদর্শ নেতা হিসেবে উপস্থাপনে চেষ্টা করে যাচ্ছে; অনেকাংশে সফলও হয়েছে। অনেক সময় বিভিন্ন প্রফেসরকে তারা অর্থের বিনিময়ে কিনেও নেয়, যা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পর্যন্ত জানে না। পরে এই শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঝান্ডা হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। খুব অল্পতে উঠতি বয়সি শিক্ষার্থীরা নিজেদের নেতা-কর্মী বলে ভাবতে শেখে। তারা কল্পনা করে, তাদের হাতেই দুনিয়া পালটে যাবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারে না, এই ক্ষমতার দৌড় কতটুকু। তারা নিজেদের রুশ বিপ্লবের লাল পতাকাবাহী বলে কল্পনা করে। তাদের দ্বারা বিপ্লব চালিয়ে নিতে ইহুদিভিত্তিক ব্যাংকগুলো থেকে আসতে থাকে পানির মতো বিনিয়োগ।
রুশ বিপ্লবে ছাত্র রাজনীতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সে কথা কেবল তারাই বলতে পারবে, যারা এই বিপ্লব নিজ চোখে দেখেছে। তাই বিপ্লবকালে খাদ্য সংকট যেন মহামারি রূপ ধারণ না করে, সে জন্য Maxim Gorky ছাত্র রাজনীতিবিদদের জন্য নিয়মিত খাদ্যের ব্যবস্থা করতেন। বলতে বাধা নেই, এই বামপন্থি দলগুলোর সহায়তার বলে-ই ইহুদিদের বিষাক্ত সংস্কৃতি আমাদের সমাজকে প্রতিনিয়ত কলুষিত করে যাচ্ছে।
তর্ক-বিতর্ক কখনো সকল সমস্যার সমাধান হতে পারে না। আমরা যে মানসিক দাসত্বের বন্ধনে ইতোমধ্যেই আটকে পড়েছি, তা থেকে নিজেদের রক্ষা করার একটাই উপায়; শিক্ষার আলো জাগ্রত করা। অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের চাদরে যে ইউরোপ একসময় চাপা পড়েছিল, সেও আলোর সন্ধান পেয়েছে কেবল প্রকৃত শিক্ষার বদৌলতে।
মহান সৃষ্টিকর্তা এ পর্যন্ত আমাদের মাঝে অসংখ্য পয়গম্বর পাঠিয়েছেন, যাদের কল্যাণে এই অসভ্য মানবজাতি সভ্যতার সন্ধান পেয়েছে। যে মনীষীদের কল্যাণে আমরা আজকের আলোকিত সমাজব্যবস্থা পেয়েছি, তাদের গল্প সন্তানদের শোনাতে হবে। যদিও এই সমাজের চৌকাঠগুলোতে ঘুণ ধরেছে, তবুও আশা রাখি— উপযুক্ত পদক্ষেপ নিলে চৌকাঠগুলো ঘুণমুক্ত করা সম্ভব হবে। আমাদের সন্তানরা যদি জানত, তাদের শরীরের কাদের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, তাদের ইতিহাস কতটা গৌরবময়, তাহলে কখনো এই মানবরূপী ভণ্ড ইহুদিদের বানোয়াট সব মতবাদে নিজেদের উজার করে দিত না।
প্রকৃত খ্রিষ্টানরূপে এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে চাইলে ইজরাইলের ইতিহাস নিয়েও অধ্যয়ন করতে হবে। আব্রাহাম, জ্যাকব, মোজেস, জোসেফ ও ইজরাইলের ১২টি গোত্রের প্রতিটির পরিচয় জানতে হবে। কেন তাদের ওপর অভিশাপ এলো এবং কেন তাদের জেরুজালেম থেকে বিতাড়িত করা হলো; সব জানতে হবে। এই শিক্ষার কোনো শেষ নেই; নতুবা ইহুদি শয়তানরা ভালো মানুষরূপে প্রতিবার আমাদের ধোঁকা দিয়ে যাবে।
**ইহুদি বিতর্ক নিয়ে জ্যান্টাইলদের প্রতি কিছু সতর্কবাণী**
আমাদের একটি সমস্যায় প্রায়ই পড়তে হয়, যখন চিন্তা করি নন-ইহুদি সম্প্রদায়দের একত্রে কী বলে সম্বোধন করা উচিত?
জ্যান্টাইল শব্দটি এ ক্ষেত্রে প্রকৃত সমাধান হতে পারে না। যখন আমরা ইহুদিদের কোনো সদস্যকে উদ্দেশ্য করে মন্তব্য করি, তখন সে ভালো করেই জানে, সে একজন ইহুদি। ইহুদিদের প্রতিটি সদস্য একে অপরকে সনাক্ত করতে সক্ষম। এ কারণে যদি ইহুদিদের কোনো এক সদস্যকে উদ্দেশ্য করে কেউ সমালোচনা করে, তবে তাকে রক্ষায় পুরো জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ে। পৃথিবীর যেখানেই ইহুদিরা অবস্থান করুক না কেন, নিজ জ্ঞাতি-ভাইদের সকল প্রয়োজনীয় তথ্য তাদের নিকট মজুদ থাকে। দূরত্ব বাড়লেও ইহুদিদের বন্ধন কখনো দুর্বল হয় না।
এ জাতীয় বৈশিষ্ট্য জ্যান্টাইলদের মাঝে পাওয়া যাবে না। পুরো বিশ্বে ইহুদিদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য যেমন এক ও নির্দিষ্ট, জ্যান্টাইলদের বেলায় তেমনটা নয়। এ কারণে জ্যান্টাইলদের পক্ষে একতাবদ্ধ জাতিতে পরিণত হওয়া সম্ভব নয়। জ্যান্টাইলদের রয়েছে বহু ভাষা, ধর্ম, জাতীয়তা ও সংস্কৃতি। এ কারণে প্রকৃতিগতভাবেই জ্যান্টাইলরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত, যা থেকে তাদের কোনো মুক্তি নেই।
তাদের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ইহুদিরা হাতিয়ে নিচ্ছে বিভিন্ন রকমের সুবিধা, যা ইতিহাসে অসংখ্যবার প্রমাণিত হয়েছে। তারপরও জ্যান্টাইলদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছে, যারা এই জাতিগোষ্ঠীটির নানান অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গেয়ে তাদের সকল উদ্দেশ্যের প্রতি পূর্ণ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও যাবে। এ কারণে বলতে হয়—
'স্রষ্টা কিছু কিছু মানুষের অন্তরে সীলমোহর মেরে দিয়েছেন, যারা চোখ থাকতেও দেখে না এবং কান থাকতেও শুনতে পায় না।'
আন্তর্জাতিক বিশ্বে ইহুদিরা যে ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করেছে, তা দেখে মনে হয়—তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে কখনেই সফল হওয়া যাবে না। খ্রিষ্টানদের অবস্থা আজ এমন, যেন ইহুদিদের পরিয়ে দেওয়া চশমা ব্যতীত বাইবেল পাঠ করা অসম্ভব। এ কারণে তারাও বিশ্বাস করে, ইহুদিরা স্রষ্টা মনোনীত সম্প্রদায় এবং একদিন তারাই বিশ্বশাসন করবে। অন্ধের মতো বাইবেলের এমন সব ব্যাখ্যা মেনে নেওয়ার দরুন খ্রিষ্টানরা আজ ভয়ানক রকমের বিভ্রান্তিতে পড়েছে।
ইহুদিদের 'শান্তি! শান্তি!' নামক মিথ্যে বুলির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা ইতোমধ্যে অনেকটা সময় পার করেছি। সততা ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার নামে তারা যা করছে, তা এককথায় ভণ্ডামি। গত কয়েক দশক ধরে Kehillah, American Jewish Committee, Anti-Defamation League-সহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে তাল মিলিয়ে জ্যান্টাইল সমাজ বহু লজ্জার জন্ম দিয়েছে।
বর্তমানে আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে বিশ্ব গণমাধ্যমের সিংহভাগ অংশই ইহুদিরা নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে চাইলেও ঘুমিয়ে থাকা জ্যান্টাইল জাতিকে জাগিয়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। যেখানে আমাদের সন্তানরা ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থায় জীবনের এক-তৃতীয়াংশ সময় পার করছে, সেখানে পরিণত বয়সে বিশেষ এই জাতিগোষ্ঠীটির বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক কার্যক্রমের ব্যপারে তাদের মস্তিষ্কে আমূল পরিবর্তন আনা সহজ কোনো কাজ নয়।
বলে রাখা উচিত, যেকোনো বড়ো ধরনের বিপ্লবের শুরুটা কিন্তু অল্প কিছুসংখ্যক মানুষের হাত ধরেই হয়। আমরা যদি নিয়মিত ইহুদিদের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত থাকি এবং তাদের উৎপাদিত পণ্যসমূহ (যা বিষাক্ত) বর্জনের তালিকায় নিয়ে আসি, তবেই তা জায়োনিস্টদের অন্তরে কাঁপুনি ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আরও ভালো হয়, যদি আমরা পুনরায় আমাদের হারিয়ে যাওয়া নৈতিকতাকে জাগিয়ে তুলতে পারি।
আধুনিক অর্থব্যবস্থা চালু হওয়ার পূর্বে আমাদের পূর্বপুরুষগণ যেভাবে ব্যবসায়-বাণিজ্য করত, আমাদের উচিত সে প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়া। ব্যবসায়ে অধিক মুনাফা উপার্জনের পরিবর্তে আমাদের উচিত, পণ্যের গুণগত মানের দিকে লক্ষ্য স্থির রাখা। তবে এটা ঠিক, ইহুদিরা কখনো হাল ছাড়বে না। তারা চারদিক দিয়ে আমাদের আক্রমণ করে যাবে এবং মনুষত্বহীন জাতিতে পরিণত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
একটা যুগ ছিল যখন ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ে মূল্য তালিকার পরিবর্তে পণ্যের গুণগত মানকে বেশি প্রধান্য দিত, সে সময়ে বাজার ছিল জ্যান্টাইলদের নিয়ন্ত্রণে। এরপর আসে ইহুদি বণিকদের যুগ, যাদের দৌড়াত্ম্যে বাজার হয়ে পড়ে একচেটিয়া।
নকল করার কাজে ইহুদিরা কতটা দক্ষ, তা ইতোমধ্যেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অসহায় ক্রেতারা না বুঝে, পণ্যের গুণগত মানের কথা না ভেবে, ঝাঁকে ঝাঁকে ইহুদি বিপণিগুলোতে হাজির হতে শুরু করে। অপরদিকে বিক্রি কমে যাওয়ার দরুন জ্যান্টাইল বণিকরা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে তারাও ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পারে, সস্তা মূল্যে তারা যা খাচ্ছে তা কেবলই বিষ, তখন তারা পুনরায় জ্যান্টাইলদের বিপণিগুলোতে ফিরে আসতে শুরু করে। কিন্তু ততদিনে চারদিক ভেজাল পণ্যের ব্যবসায়ীতে ভরে গেছে।
ইহুদিদের ধ্বংসাত্মক আক্রমণ হতে নিজেদের রক্ষা করার আরেকটি উপায় হলো— তথাকথিত উদারপন্থি ও মুক্তচিন্তাধার নীতির নামে যে মতবাদগুলো নিয়মিত সমাজে ঢুকে পড়ছে, তা গ্রহণ করার পূর্বে এর উৎস, উদ্দেশ্য ও ইতিহাস পূর্ণরূপে অধ্যয়ন করা। আমোদ- বিনোদনের খোরাক হিসেবে যেসব চলচ্চিত্র, নাটক-থিয়েটার ও কৌতুক-অভিনয়ের পেছনে আমরা নির্বোধের মতো সময় পার করছি, বুঝতে পারছি না এর ভেতরে কী ভয়ংকর ষড়যন্ত্র কাজ করছে। সুকৌশলে উশৃঙ্খলতা ও সাম্প্রাদায়িকতার বিষ আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সংবাদপত্রে যা নিয়মিত পাঠ করছি, তার কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা, তা বোঝা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ইহুদিদের অনুমতি ছাড়া আজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় বই পাঠ করানো যেন একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, কীভাবে পবিত্র ধর্মগ্রন্থগুলো পাঠ করে ব্যাখ্যা করতে হবে, সে কায়দা-কানুনও এখন ইহুদিদের কাছে শিখতে হচ্ছে! বুঝতে পারছি না, আমাদের সন্তানরা যে সকল গল্প, কবিতা ও উপন্যাসের বই নিয়মিত পাঠ করছে, তার ছলে না জানি কোন চেতনার বিষ মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ধীরে ধীরে আমাদের প্রকৃত নেতাদের পরিচয় একেবারে ভুলতে বসেছি। আমরা একদল মানুষের অনুসরণ করতে শুরু করেছি, যারা কিনা আমাদের ভাষায় ঠিকমতো কথাও বলতে পারে না। আজ না আছে এমন কেউ, যে আমাদের সঠিক পথের নির্দেশনা দেবে, আর না আছে এমন কেউ, যে ঈশ্বরের নিকট সঠিক পথের প্রার্থনা করবে। পুরো মাঠ আজ বিরান ভূমি। সেখানে সবাই নখ-দন্তহীন অসহায় বাঘের সমতুল্য। এমতাবস্থায় আমরা যদি হিংস্র কোনো প্রাণী দ্বারা আক্রমণের স্বীকার হই, তবে আমাদের রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসবে না।
আমাদের যে পুনরায় পূর্বের সমাজব্যবস্থায় ফিরে যেতে হবে, তা এখন আর বিবেকের দাবি নয়; বরং সময়ের দাবি। এর চেয়ে আরও অধঃপতনের দিকে চলে গেলে সমাজকে আর শুধরে নেওয়া সম্ভব হবে না। আমাদের স্কুল-কলেজগুলোকে এক্ষুনি ইহুদিদের শয়তানি প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। আমাদের সন্তানদের শিক্ষা কার্যক্রম এবং সিলেবাসের ওপর ইহুদিরা যে প্রভাব বিস্তার করেছে, তা এক্ষুনি সরিয়ে দিতে হবে। আমাদের আদালত ব্যবস্থাকে তাদের থাবা থেকে সরিয়ে নিরপেক্ষরূপে গড়ে তুলতে হবে। ধর্মীয় উপাসনায়গুলোতে পূর্বের পবিত্র সব রীতি পুনরায় চালু করতে হবে। মত প্রকাশের প্রকৃত স্বাধীনতা তথা প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিতে হবে।
১৯২২ সালের জানুয়ারিতে Atlantic Monthly পত্রিকায় নিউইয়র্কের এক রাবাইয়ের মন্তব্য প্রকাশ করা হয়। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ইহুদিরা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত সম্প্রদায়। তারপরও এ জাতির সদস্য হতে পেরে তিনি ভীষণ গর্বিত। এ জাতির ওপর সহস্র বছর ধরে যে নিপীড়ন চলেছে, তার প্রধানতম কারণ হলো— জ্যান্টাইলদের অ্যান্টি-সেমিটিক মনোভাব। কিন্তু আগের অধ্যায়গুলোতে তুলে ধরা হয়েছে, কেন ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এত সব নিপীড়ন চালিয়েছে।
এতসব কিছুর পরও ইহুদিদের জন্য সম্মান উপার্জনের একটি পথ খোলা আছে। আর তা হলো— সত্য স্বীকার করা। ইহুদিদের প্রকৃত ইতিহাস; কেন সাধারণ মানুষ তাদের এত বেশি ঘৃণা করে এবং কেন তাদের এত নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে, এসবের প্রকৃত ইতিহাস কেবল ইহুদিদের কাছ থেকেই জানা সম্ভব। আমরা তাদের ব্যাপারে যা বলি এবং যেসব তথ্য প্রকাশ করি, তার অধিকাংশই মূলত ব্যক্তিগত অনুসন্ধান এবং ঐতিহাসিক দলিলের ওপর ভিত্তি করে। আমরা ইহুদিদের সম্পর্কে জানতে যেখানে বিভিন্ন দলিলের অনুসন্ধান করি, সেখানে তারা সকল ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। সুতরাং ইহুদিদের ব্যাপারে প্রকৃত তথ্য কেবল তাদের মুখ থেকেই জানা সম্ভব। কিন্তু ইতিহাস বলে, ইহুদিরা সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সত্যকে। তাদের ক্ষমতার ভিত্তি কেবল মিথ্যা ও ধোঁকাবাজি।
বাইবেলে ইহুদিদের সম্পর্কে হাজার বছর পূর্বে যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, তা এখন বাস্তবায়ন হতে চলেছে। নব্য ইজরাইল প্রতিষ্ঠার পথে তারা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। তবে এই নব্য ইজরাইল বিশ্ব মানবতার জন্য কতটা হুমকিস্বরূপ, তা দিনে দিনে আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে।
আলোচনার শেষাংশে বলতে চাই, যে হাজার হাজার পাঠক ও সমালোচক DEARBORN INDEPENDENT-এর নিকট তাদের মতামত পাঠিয়েছেন, তাদের একটি বিষয় বেশ ভালো লেগেছে, তারা কেউ-ই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে অপ্রীতিকর মন্তব্য করেনি। শুরুর দিকে বেশ কিছু রাবাই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে বহু উসকানিমূলক মন্তব্য ছড়ালেও ধীরে ধীরে নীরব হয়ে গেছে। অর্থাৎ তারা নতুন কোনো ফন্দি তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
যে আলোচনার দ্বার বহুকাল মানবসমাজে রুদ্ধ অবস্থায় পড়েছিল, তা উন্মুক্ত করতে DEARBORN INDEPENDENT-এর যে প্রচেষ্টা, তা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে সাধারণ মানুষ আরও বেশি মুক্ত আলোচনামুখী হয়ে উঠবে— এটাই প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যাশা। এই আলোচনায় যুক্ত হতে হবে আন্তর্জাতিক পত্রিকা সংস্থাগুলোকে; নতুবা সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। মনে রাখতে হবে, সত্য যতই তিক্ত হোক না কেন, এটাই একমাত্র ওষুধ, যা পুরো মানবজাতিকে অশুভ শয়তানের বিরুদ্ধে এক করতে পারে।