📘 সিক্রেটস অব জায়োনিজম > 📄 জায়োনিস্টরাই কি আর্মাগেডনের জন্ম দেবে

📄 জায়োনিস্টরাই কি আর্মাগেডনের জন্ম দেবে


মূল আলোচনায় প্রবেশ করার আগে 'আর্মাগেডন' সম্পর্কে কিছু ধারণা দিয়ে রাখা উচিত। হেনরি ফোর্ডের মূল আলোচনায় এ বিষয়গুলোর উল্লেখ ছিল না, কিন্তু আলোচনা পরিষ্কার করতে এসবের সমন্বয় প্রয়োজন।

আর্মাগেডন একটি হিব্রু শব্দ, যা দ্বারা পৃথিবীর শেষ সময়ে ভয়ংকর একটি যুদ্ধের কথা বোঝানো হয়েছে। এই যুদ্ধে সৃষ্টিকর্তার সৈন্য বাহিনী এবং শয়তানের বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হবে। অনেক পণ্ডিত ও গবেষকের ধারণা অনুযায়ী- এই যুদ্ধের সমাপ্তি হবে মেগিড্ডো পাহাড়ের কাছাকাছি কোনো স্থানে, যা বর্তমানে ইজরাইলের অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর প্রতিটি বড়ো বড়ো ধর্মে এই যুদ্ধের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় পণ্ডিতগণ এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে পারবেন।

খ্রিষ্টান ধর্মে নিউ টেস্টামেন্টের বুক অব রেভালেশনের (১৬: ১৬)-এ বলা হয়েছে- 'অতঃপর তারা সবাই সে স্থানে একত্রিত হবে, যাকে হিব্রুতে বলা হয় আর্মাগেডন।'

কারা এই যুদ্ধে মুখোমুখি হবে, সে প্রসঙ্গে বুক অব রেভালেশনের ১৯ : ১১-১৬ ও ১৯২১-এ বলা আছে, সাদা ঘোড়ার বাহনে চড়ে স্বর্গ হতে কোনো ব্যক্তি নেমে আসবেন, যিনি তার সৈন্য বাহিনী নিয়ে শয়তানের সৈন্য বাহিনীর মুখোমুখি হবেন এবং যুদ্ধে বিজয়ী হবেন। বাইবেলের লুক, মার্ক ও ম্যাথুর বিভিন্ন শ্লোকের পূর্বাভাষ থেকে বোঝা যায়- উল্লেখিত ব্যক্তিই হবেন যিশুখ্রিষ্ট।

ইসলাম ধর্মে পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কাহাফ ও বনি ইজরাইলসহ অসংখ্য হাদিসে পৃথিবীর শেষ সময় এবং আর্মাগেডনের কথা বলা হয়েছে। নবি ঈসা (আ.) সাদা দুই মেঘের (ফেরেস্তাদের কাঁধের) ওপর ভর করে ধরণিতে নেমে আসবেন। অতঃপর ইজরাইলে পৌছে দজ্জাল বাহিনীকে সমূলে পরাজিত করবেন।

কিন্তু ইহুদি ধর্মে এমন কোনো যুদ্ধের নাম বলা হয়নি, যা আর্মাগেডন হতে পারে। তবে তালমুদে মসিহের কথা বলা হয়েছে, যিনি নতুন জন্ম নেওয়া ইজরাইলের বাদশাহ হিসেবে পৃথিবীতে আসবেন। তিনি আসার পর ইজরাইল সামরিক শক্তির শীর্ষবিন্দুতে পৌছে যাবে এবং পুরো পৃথিবী শাসন করবে। বাইবেলের ভাষায়- ইহুদিদের এই মসিকে বলা হয়েছে অ্যান্টি-ক্রাইস্ট এবং ইসলামিক পরিভাষায় দাজ্জাল। এই যুদ্ধ কখন শুরু হবে, তা নির্দিষ্ট করে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। তবে পৃথিবীর শেষ সময়ে বহু নিদর্শনের কথা প্রতিটি ধর্মগ্রন্থে ব্যক্ত করা হয়েছে।

এই আর্মাগেডন এমনই এক যুদ্ধ, যাতে জলবায়ুর ওপর ভয়ংকর বিপর্যয় নেমে আসবে। পুরো আকাশ দীর্ঘ সময়ের জন্য ধোঁয়ায় ঢেকে যাবে। সূর্যালোক দেখা যাবে না। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষের কারণে প্রচুর মানুষ মারা পড়বে। ধরণির জনসংখ্যা গত দুশো বছরে যেভাবে বেড়েছে, ঠিক সেভাবেই তা হঠাৎ করে কমে যাবে। ইজরাইলের পুনঃপ্রতিষ্ঠালাভ এই যুদ্ধের সময়কাল ঘনিয়ে আসার এক বড়ো ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অনেকে হয়তো বিভ্রান্ত হতে পারেন যে, এখানে কোন ইজরাইলের কথা বলা হচ্ছে? কারণ, সেই যে খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে তাদের ১০টি গোত্র অ্যাসিরিয়ানদের আক্রমণে হারিয়ে গেছে, তাদের তো কোনো সন্ধানই পাওয়া যায়নি। আর বর্তমান ইজরাইলে যারা বসবাস করছে, তারা তো জুদাহ রাজ্যের কেবল দুটি গোত্রের উত্তরসূরি। তাহলে বাকিরা এ ভূমিতে কবে ফিরে আসবে?

মূলত পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ জানে না বা তার খবরও রাখে না- বাকি গোত্রের অধিবাসীদের খুঁজে বের করার কাজ নব গঠিত ইজরাইল খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে নিরন্তরভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। গত অর্ধ শতাব্দীতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তজুড়ে বিচ্ছিন্নভাবে এমন কিছু গোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা নিজেদের ইজরাইলের হারিয়ে যাওয়া গোত্রের অধিবাসী বলে দাবি করেছে।

Simcha Jacobovici হলেন এ বিষয়ের ওপর একজন বিশেষজ্ঞ। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ওপরও তার রয়েছে অসামান্য জ্ঞান। ২০০৩ সালে Quest for the Lost Tribes শিরোনামে তিনি একটি ডকুমেন্টারি প্রকাশ করেন, সেখানে এ জাতীয় কিছু গোষ্ঠীর পরিচয় তুলে ধরেছেন। যেমন: তাদের পাওয়া গিয়েছে ইথিওপিয়ার সিমিয়েন পর্বতমালায়; ভারতের মনিপুর ও মুম্বাই; ইরানের ইস্ফাহান ও মাশহাদে; সমরকন্দে। তবে আদৌ তারা হারিয়ে যাওয়া গোত্রদের প্রকৃত উত্তরসূরি কি না, তা নিয়ে খোদ ইজরাইলি প্রশাসনের মনেও যথেষ্ঠ সংশয় রয়েছে। কিন্তু তারপরও তাদের একেবারে ফেলে দিতে পারেনি। বিগত কয়েক দশকে এমন প্রচুরসংখ্যক অধিবাসীকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইজরাইলে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

তাদের কে কোন গোত্রের সদস্য, তা যেহেতু এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, তাই ইজরাইলি প্রশাসন আপাতত তাদের সবাইকে ইহুদি বলে নথিভুক্ত করছে এবং তাদের বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য নিয়মিত প্যালেস্টানিদের ভূমি দখলের প্রচেষ্টা চলেছে।

বেলফোর ঘোষণা
জেরুজালেম দখল জায়োনিস্টদের জন্য একটি স্মরণীয় ঘটনা। ১১ ডিসেম্বর, ১৯১৭ ব্রিটিশ কমান্ডার Edmund Allenby যখন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে শহরটিতে প্রবেশ করেন, তখন পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিরা নিশ্চিত হয়ে যায়, তারা আবারও প্রাচীন ভূমিতে ফিরে যাচ্ছে। এই নব্য ইজরাইলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এক প্রতিশ্রুতি পত্রের মধ্য দিয়ে। ২ নভেম্বর, ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রসচিব Arthur Balfour আমেরিকায় অবস্থানরত Baron Rothschild-এর নিকট একটি প্রতিশ্রুতিপত্র লিখেন- গ্রেট ব্রিটেন যেকোনো মূল্যেই প্যালেস্টাইনে ইহুদিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। এই চিঠি পেয়ে তাদের সদস্যগণ রাস্তায় নেমে নাচ-গান করতে শুরু করে।

২ নভেম্বর, ১৯১৭
প্রিয় লর্ড রথসচাইল্ড,
আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে মহামান্য সরকারের পক্ষ থেকে নিম্নবর্ণিত ঘোষণাটির কথা জানাচ্ছি। এটি ইহুদি ও জায়োনিস্টদের প্রত্যাশার সাথে সহানুভূতিস্বরূপ মন্ত্রিপরিষদে উত্থাপিত ও গৃহীত হয়েছে।
মহামান্য সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য জাতীয় স্বদেশভূমি সৃষ্টির বিষয়টি সহানুভূতির সাথে দেখছে। তাই লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। স্পষ্টত এই ঘোষণা ফিলিস্তিনে বিদ্যমান অইহুদি সম্প্রদায়গুলোর নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকারের বিরুদ্ধে কোনো পক্ষপাতিত্ব করছে না। অনুরূপভাবে এটি অন্যান্য দেশে ইহুদিরা যে আইনগত ও রাজনৈতিক অবস্থায় আছে, তার ওপরও কোনো প্রভাব ফেলবে না।
আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব, যদি দয়া করে এই ঘোষণাটি জায়োনিস্ট ফেডারেশনকে জানিয়ে দেন।

Atlantic Monthly পত্রিকার সম্পাদক Professor Albert T. Clay আমাদের সতর্ক করে বলেন-
'প্যালেস্টাইন যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকান পত্রিকাগুলোতে যে সংবাদ ছাপানো হচ্ছে, তার প্রায় সবই জায়োনিস্টদের বানানো সংবাদ। প্যালেস্টাইনিদের বিশাল এক জনগোষ্ঠী মুসলিম ও খ্রিষ্টান। তারা প্রায় ২,০০০ বছর ধরে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। নিজ ভূমি রক্ষার্থে তারা ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। এ বিষয়টি তারা বিকৃত করে বলছে, সেখানে নাকি মুসলিমরা হাজার হাজার নিরীহ ইহুদিকে হত্যা করছে।'

এর আগে ১৯০২ সালে জায়োনিস্টরা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে Anglo-Palestine Bank প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের হাজার বছরের পুরোনো 'সুদ-বাণিজ্য' শুরু করে। ৬.৫ শতাংশ সুদের বিনিময়ে পাঁচ বছর মেয়াদে তারা প্যালেস্টাইনি কৃষকদের ঋণ দিতে শুরু করে, কিন্তু অধিকাংশ কৃষক এই অর্থ প্রদানে ব্যর্থ হয়। ফলে তাদের আবাদি জমিগুলো জায়োনিস্ট ব্যাংকটির সম্পত্তি হয়ে যায়। ব্রিটিশ কমান্ডারের নেতৃত্বে তারা এই ভূমিগুলো দখল করতে শুরু করে। সে সময় অনেক ইহুদিও জেরুজালেমে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিল; যদিও তারা সংখ্যায় অনেক কম ছিল।

১৮৪২ সালে Dr. Murray M'Cheyne জেরুজালেমে বসবাসরত ইহুদিদের ওপর এক অনুসন্ধান চালান। আন্তর্জাতিক ইহুদি সংগঠনগুলো জেরুজালেমে বসবাসরত এই জনগোষ্ঠীর জন্য বাৎসরিক ভাতার ব্যবস্থা করে। ফলে কাজ না করলেও তাদের জীবিকা ও রুজির অভাব ছিল না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রতিও তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। অন্যদিকে, মুসলিম ও খ্রিষ্টানরা শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক এগিয়ে ছিল। তাই ইহুদিরা নিজেদের সন্তানদের খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে শুরু করে।

জায়োনিস্টরা এই শহর দখল করে নিলে শহরের পুরো রূপ রাতারাতি পালটে যায়। The Council of Jerusalem Jews একটি হিব্রু পত্রিকায় ইহুদি অভিভাবকদের সতর্ক করে কলাম প্রকাশ করে। কলামটিতে তাদের প্রতি কিছু আজ্ঞা প্রকাশ করা হয়-
• যদি কোনো অভিভাবক সন্তানদের খ্রিষ্টান-মুসলিম পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে না আনে, তবে তাদের বাৎসরিক ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
• তাদের চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
• তাদের নাম ব্লাকলিস্টে রাখা হবে এবং মোজেসের অনুসারী বলে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।
• সকল প্রকার ব্যবসায়িক মুনাফা ভোগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
• তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বয়কট করা হবে।
• সকল অফিস-আদালত থেকে ছাঁটাই করা হবে।
• যারা এসব নির্দেশ অমান্য করবে, তাদের নাম শহরের প্রধান ফটকের ওপর ঝুলিয়ে রাখা হবে।
• বিশেষ এক ব্যাজ পরতে হবে, যেন সহজে তাদের সনাক্ত করা যায়।
• জাতীয় পর্যায়ে তাদের কলঙ্কিত করা হবে।
• যদি কোনো রাবাই এ নির্দেশ অমান্য করে, তবে তাকে দায়িত্বচ্যুত করা হবে।

ইহুদিদের কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয়তাবাদ। তারা খুব ভালো করেই জানে, জেরুজালেমের অধিকার খ্রিষ্টানরাও ছাড়তে রাজি নয়। বিশ্বযুদ্ধের ফাঁদে পড়ে ব্রিটেন এই শহরকে ইহুদিদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তারা যে আজীবন জায়োনিস্টদের কথামতো কাজ করে না, তারা তা ভালো করে জানে। বেথেলহাম যিশুখ্রিষ্টের জন্মভূমি। ধর্ম প্রচার করতে তিনি জেরুজালেমে এসেছিলেন। প্যালেস্টাইন তাদের হাতে চলে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে- খ্রিষ্টানরা শহরটির ওপর অধিকার হারাবে। বলশেভিক বিপ্লবে ইহুদিরা যেভাবে রাশিয়ার গির্জাগুলো ধ্বংস করেছে, সেভাবে প্যালেস্টাইনের গির্জা ও মসজিদগুলোতেও আঘাত হানছে।

জেরুজালেম দখলের পরপরই Sir H. Samuel-এর নেতৃত্বে প্যালেস্টাইনে এক ইহুদি সরকার গঠনের কাজ শুরু হয়। একই সঙ্গে জায়োনিস্টরা সুয়েজ খাল দখলের এক ভয়ংকর খেলায় মেতে ওঠে। তিনি বলেন-
'সামরিক শক্তিতে পরিপূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এত বড়ো প্রজেক্টে হাত দেওয়া উচিত নয়। এখন প্রয়োজন ইজরাইলের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন জোগানো। যেরূপ বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে এই রাষ্ট্রের নবজন্ম ঘটেছে, খুব শীঘ্র তেমন আরেকটি যুদ্ধ ঘটতে যাচ্ছে। আমাদের উচিত, এই যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে ইজরাইল রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জন করা।'

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তিনটি বিশেষ কারণে প্যালেস্টাইন ইস্যু আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে।
১. বলশেভিকদের প্যালেস্টাইন অভিমুখে যাত্রা।
২. খতরনাক জায়োনিস্টদের জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা।
৩. বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্যালেস্টাইনের আবির্ভাব।

১৯২০ সালে জেরুজালেমের বিশপ Dr. Mclnnis এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন-
'যে আগন্তুকেরা আজ জেরুজালেম দখল করেছে- তাদের অধিকাংশই রাশিয়ান, পোলিশ ও রোমানিয়ান ইহুদি; কিছুদিন আগেও তাদের বলশেভিক বিপ্লব করতে দেখা গেছে। তারা এই ভূমি দখলের পর লিওন ট্রটস্কি সাহেবের প্রতি সম্মান জানাতে ভোলেনি। তিনিই তো তাদের 'Kingdom of Heaven' তথা এই স্বর্গরাজ্যের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।'

১৯২০ সালের হিসাব অনুযায়ী প্যালেস্টাইনের বর্তমান অধিবাসীরা প্রায় ২,০০০ বছর এ যাবৎ এই ভূমিতে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে ৫ লাখ মুসলিম, ১ লাখ খ্রিষ্টান ও ৬৫ হাজার ইহুদি। পুরো জনসংখ্যার ৭৫ ভাগ মুসলিম, ১৫ ভাগ খ্রিষ্টান ও ১০ ইহুদি। তাদের জীবিকা অর্জনের প্রধান উপায় কৃষিকাজ। তারা যে এই অঞ্চলের প্রকৃত স্থায়ী বাসিন্দা, তা আশা করি খোদ ইউরোপিয়ান পর্যন্ত অস্বীকার করবে না। এই ভূমিকে জায়োনিস্টদের হাতে তুলে দেওয়ার অর্থ হলো- বেলজিয়ামকে মেক্সিকোর হাতে তুলে দেওয়া।

General Allenby প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি স্থানীয়দের অধিকারের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করবেন। বেলফোর ঘোষণা, সান রেমিও সম্মেলন ও প্রেসিডেন্ট উইলসন সবাই এই কথা বলেছিলেন। কিন্তু জায়োনিস্টরা বলল- 'তাদের বের করে দাও!'

Isreal Zangwill বললেন-
'তাদের বের করে দাও! আমরা খুব ভদ্রভাবে বলছি, তারা যেন এই ভূমি ছেড়ে চলে যায়! তাদের জন্য লাখ লাখ বর্গ মাইলের আরব ভূমি পড়ে আছে। ইজরাইলে এক বর্গ ইঞ্চি জায়গাও যে এখন অবশিষ্ট নেই। তাঁবু গুটিয়ে বেদুইনদের মতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভ্রমণ করা তো তাদের জন্মগত অভ্যাস। এবার তারা তা প্রমাণ করে দেখাক।

ইহুদিরা "আরব” শব্দটিকে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করে থাকে। আমাদের মগজে আরবদের ব্যাপারে বিভ্রান্তি ছড়াতে ইহুদিরা যথেচ্ছা মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে থাকে। আমেরিকা তো স্বাধীন হয়েছে মাত্র ১৭৭৬ সালে। সামান্য দেড়শো-দুশো বছরের ব্যবধানে আমরা যদি নিজেদের এই ভূমির স্থায়ী বাসিন্দা বলে দাবি করতে পারি, তাহলে যারা প্যালেস্টাইনে দুই হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে, তারা কেন নিজেদের স্থায়ী অধিবাসী বলে দাবি করতে পারবে না! বিশ্বের নিরপেক্ষ সকল পণ্ডিত আজ নব গঠিত ইজরাইল নিয়ে ভীষণ সঙ্কিত হয়ে পড়েছে। কারণ, তাদের নব আবির্ভাব মানবজাতি তথা এই ধরণির ভবিষ্যতের প্রতি ভয়ংকর খারাপ কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।'

ইহুদিরা যেভাবে জেরুজালেম দখল করে
১৯২১ সালের জুলাই মাসে ইউনির্ভার্সিটি অব দ্যা সাউথ 'Zionism and the Jewish Problem' শিরোনামে ২৯ পৃষ্ঠার একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করে। আর্টিক্যালটির লেখক Dr. John P. Peters দীর্ঘদিন সেন্ট জন দ্যা ডিভাইন ও সেন্ট মাইকেল চার্চের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন-
'যে জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে জায়োনিজম গড়ে উঠেছে, তার সাথে ধর্মীয় গ্রন্থের তেমন কোনো সাদৃশ্য নেই। এই রাজনৈতিক দলটির মূল ক্ষমতাভার যাদের হাতে, তাদের কেউ মূল ধর্মে বিশ্বাসী নয়। ইহুদিদের জাতীয়তাবাদ আমেরিকাসহ পৃথিবীর যেসব অংশে প্রবেশ করেছে, সেখানে তারা আরও বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে।'

Dr. Peters জায়োনিস্টদের বিভিন্ন কার্যক্রমের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তার প্রকাশিত আর্টিক্যালের গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহ এখানে উপস্থান করা হলো-
জায়োনিস্টরা যে প্যালেস্টাইন দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা বর্ণনা করা অনাবশ্যক। তাদের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ১৯০২ সালে। সেবার আমি দ্বিতীয় মেয়াদে প্যালেস্টাইন সফরে যাই। ১৮৯০ সালে যখন প্রথম মেয়াদে প্যালেস্টাইন সফর করি, তখন সামান্য কিছু সেফার্ডিক ইহুদি জেরুজালেমে বসবাস করত। তখন অবধি তা প্রাচীন শহরের রূপেই ছিল। শহরটির মূল প্রাচীরের বাইরে তখনও কোনো ঘরবাড়ি গড়ে ওঠেনি। উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা সবেমাত্র শুরু হয়ছে। রাশিয়ার নিপীড়িত ইহুদিরা প্যালেস্টাইন উপকূলীয় শহর শ্যারনে নিজেদের কলনি প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে কায়িক শ্রমে অনভ্যস্ত ছিল বলে তারা কৃষিকাজ করতে পারত না। তাই সিরিয়ান শ্রমিকদের ভাড়া করে নিজেদের কাজ করিয়ে নিত। আর ইহুদিরা ছাতার নিচে বসে কাজ তদারকি করত এবং প্রখর রোদ থেকে নিজেদের চামড়া রক্ষা করত।

১৯০২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্যালেস্টাইন গিয়ে দেখি, তাদের কলনিগুলো কৃষিকাজে ভীষণ মনোযোগী হয়ে উঠেছে। আরও লক্ষ করলাম, জেরুজালেমের বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় ইহুদিরা ঘড়বাড়ি গড়ে তুলতে শুরু করেছে। এই প্রথম শহরটির প্রধান প্রাচীরের বাইরে সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি নির্মাণ করে। তারা নিজ উদ্যোগে কৃষিকাজ, কায়িক শ্রম এবং বিভিন্ন শিল্পের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলে। আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যেন নিজ চোখে সেসব কেন্দ্র একবার হলেও দেখে যাই। এটা দেখে আমি এতটাই অবাক হই যে, সেখানে কোনো সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদেই নেই। ইহুদি, মুসলিম ও খ্রিষ্টান সব গোত্রের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কৃষিকাজ করে যাচ্ছে। আমি বলব, এটা আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম দৃশ্যগুলোর একটি। সেখানে সাম্প্রদায়িকতার লেশমাত্র ছিল না। সহযোগিতা ও সহমর্মিতা ছিল তাদের সকল কাজের মূল উদ্দীপনা। সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে সুন্দর এক সমাজব্যবস্থা।

দেশে ফিরে আসার পর ওপর থেকে আমাকে চাপ দেওয়া হয়, যেন এ বিষয়টি কোনো পত্রিকায় প্রকাশ না করি। খুব দুঃখ নিয়ে বলতে চাই, এই বল প্রয়োগ আসে আমেরিকার বিশেষ একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি থেকে। ইহুদি, মুসলিম ও খ্রিষ্টান শান্তিতে বসবাস করুক, তা তারা মেনে নিতে পারে না। তাদের অভিযোগ, মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের সংস্পর্শে ইহুদি সম্প্রদায় সংক্রমিত হয়ে পড়েছে। তারা চায়- ইহুদিদের জন্য পৃথক একটি সমাজব্যবস্থা থাকবে। ভূমি দখলের প্রতিযোগিতায় তাদের দ্বিতীয় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না। ১৯১৯ ও ১৯২০ সালে যখন পুনরায় প্যালেস্টাইন সফরে যাই, তখন দেখি ইহুদিরা ভীষণ সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছে। তাদের মাথায় ভূমি দখলের ভূত আগাগোড়া চেপে বসেছে।

দেখলাম, কৃষিকাজে তারা যথেষ্ট উন্নতি করেছে। ফল, ফসল ও শরাব উৎপাদন তাদের সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। উৎপাদন কাজ ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন প্রযুক্তির সংযোজন করেছে। কিন্তু যেসব ভূমি অধিগ্রহণ করে ইহুদিরা কৃষিকাজ করছে, তা কখনোই তাদের ভূমি ছিল না। শ্যারন প্লেইন, এসড্রাইলোন প্লেন ও জর্ডান ভ্যালি হলো প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর ভূ-অঞ্চল; বর্তমানে যা জায়োনিস্টদের দখলে। এই ভূমিগুলো তাদের শস্য-সম্পদে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। তত দিনে জেরুজালেমে ইহুদিদের জনসংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের একদল পরজীবী ছত্রাকের ন্যায় অন্যের ঘাড়ে চেপে বসেছে, আর সামান্য কিছু বিজ্ঞান চর্চায় নিয়োজিত আছে।

শহরটি এখন সাম্প্রদায়িক জায়োনিস্টদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। বোলশেভিজমের চেতনা পুরো প্যালেস্টাইনকে পেয়ে বসেছে। হিব্রু প্রতিষ্ঠানগুলো গির্জা ও মসজিদ নিয়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ইচ্ছা করে খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মগজে সাম্প্রদায়িকতার আগুন প্রজ্বলিত করছে। আমার সৌভাগ্য যে, খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের বিভিন্ন ক্যাম্প সফর করার সুযোগ পেয়েছি, কিন্তু ভাষাগত জটিলতার দরুন তাদের সঙ্গে ঠিকমতো কথাও বলতে পারিনি। আরব-ইজরাইল সংঘাত ঘনীভূত হয়ে উঠেছিল বলে আরও অনেক জায়গায় যেতে পারিনি। পরে না জানি আরবরা আমাকে জায়োনিস্ট গুপ্তচর বলে সন্দেহ করে!

এটা বহু আগে থেকেই জানা ছিল যে, জায়োনিস্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্যালেস্টাইনের ইহুদিদের জন্য নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করত। তারা যেন খ্রিষ্টান বা মুসলিমদের কোনো সহযোগিতা ছাড়াই নির্বিঘ্নে জীবনযাপন করতে পারে, সে জন্যই মূলত এই ভাতার ব্যবস্থা। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক খ্রিষ্টান তার সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে জায়োনিস্টদের পক্ষে কলাম ছাপতে শুরু করেছে। এই বিশ্বাসঘাতকতাই সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে।

তারা যেন জেরুজালেমসহ প্রতিটি পবিত্র শহরে (যেমন: হেবরন, টাইবেরিয়াস, সাফেদ ইত্যাদি) ফিরে যাওয়ার পথে বিশ্ববাসীর সমর্থন পায়, সে জন্য খ্রিষ্টান সংগঠনগুলোকে বড়ো অঙ্কের উপঢৌকন প্রদান করে যাচ্ছে। খ্রিষ্টান গির্জাগুলো তাদের প্রত্যাবর্তনের পক্ষে সাফাই গেয়ে প্রার্থনায় রত হয়ে পড়েছে। পৃথিবীতে অধিকাংশ ক্যাথলিক গির্জা এই পথ অনুসরণ করতে শুরু করেছে। জায়োনিস্ট কমিটি প্যালেস্টাইনের গির্জাগুলোতে আন্তর্জাতিক মহলের বাৎসরিক চাঁদা পাঠানোর পথ বন্ধ করে দিয়েছে।'

কিছুদিন আগে জায়োনিস্ট প্রতিষ্ঠান Hebrew Edition একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল 'Malignant Leprosy'। আর্টিক্যালটি ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ায় সেখানে কী প্রকাশ করা হয় তা জানা যায়: ইহুদি অভিভাবকরা যেন অতি সত্বর তাদের সন্তানদের জ্যান্টাইল পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে আনে, সে বিষয়ে আদেশ-নিষেধ জারি করা হয়। যদিও সেসব প্রতিষ্ঠানে খ্রিষ্টান বা ইসলাম ধর্মের কোনো কিছু শেখানো হয় না, তারপরও ইহুদিরা চায় তাদের সন্তানরা বিধর্মীয় সংস্কৃতির সকল সংস্পর্শ থেকে মুক্ত থাকুক। যদি কোনো অভিভাবক এই নির্দেশ অমান্য করে, তবে তাদের ওপর যে শাস্তি নেমে আসবে, তার ফল শেষ প্রজন্মকে পর্যন্ত ভোগ করতে হবে।

একমাস পর Hebrew Edition দ্বিতীয় আর্টিক্যালটি প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল 'Fight and Win'। যেসব অভিভাবক তাদের সন্তানদের জ্যান্টাইল পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে আনেননি, তাদের সকল সুযোগ শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। নিচে লক্ষ করুন-
'সতর্কবাণী পাওয়ার পরও যে অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের জ্যান্টাইল পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরিয়ে আনেননি, তাদের প্রত্যেকের নাম রাস্তার মুখে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। প্রতিটি পত্রিকায় বড়ো বড়ো করে ছাপানো হবে। রাস্তায় রাস্তায় প্লাকার্ড করে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। বিশ্বাসঘাতক এবং সীমালঙ্ঘনকারী বলে তাদের অভিহিত করা হবে। তাদের নাম প্রতিটি হাসপাতাল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ইহুদি ডাক্তারদের কাছে তারা আর সেবা পাবে না। তাদের নাম ব্লাক লিস্ট করে American Jewish Relief Fund-এর নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তাদের জন্য ভবিষ্যতে আর কোনো ভাতার ব্যবস্থা করা হবে না। আমরা সবাই তাদের এড়িয়ে চলব। তাদের সন্তানদের সঙ্গে আমাদের সন্তানদের বিয়ে হবে না। তাদের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। জাতিগতভাবে আমরা তাদের বর্জন করছি। তাদের জন্য দ্বিতীয় কোনো সুযোগ নেই। সকল দয়া-মায়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের সম্প্রদায়ের একটা শিক্ষা হওয়া উচিত। যদি আমাদের কেউ তাদের প্রতি সামান্য সহানুভূতিও প্রদর্শন করে, তবে তাকেও এই কাতারে ফেলা হবে। আগামী দিনগুলোতে আমাদের মধ্য হতে কেউ যদি এমন কাজ করে, তবে তার ওপরও একই শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া হবে।'

১৯২০ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী জেরুজালেমে তখন ২৮ হাজার ইহুদি, ১৬ হাজার খ্রিষ্টান এবং ১৫ হাজার মুসলিম বসবাস করত। ইংলিশ সরকারের পাহারায় ইহুদিরা নিরাপদে এই শহরে আসতে থাকে। এতে তাদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৯২০ সালে ইস্টার সানডে এবং ইহুদিদের পাসওভার একই দিনে পড়ে। তার সঙ্গে যোগ হয় মুসলমানদের নবি মুসা উৎসব, যা সাত দিন পর্যন্ত পালিত হয়। প্রথমে তারা এক ধর্মীয় বক্তব্য শোনার জন্য হারাম-আস-শরিফে জড়ো হয়। দ্বিতীয় অংশে, মৃত সাগরের পাশে নবি দাউদ (আ.)-এর কাল্পনিক কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে তারা সাত দিনব্যাপী বাৎসরিক উৎসব সম্পন্ন করে। অটোমানরা যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন প্রতিটি সম্প্রদায় যেন নিজেদের ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হতো, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এখানে ব্যর্থ হয়েছে।

যেহেতু ইহুদিরা এখন জেরুজালেমের রাজা, তাই তারা অন্যান্য সম্প্রদায়কে নিজেদের উৎসব পালনে ঘৃণ্য উপায়ে বাধা দিতে শুরু করে। এ কারণে উৎসবের দিন দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। খ্রিষ্টানদের অনেকেই সেদিন ঘরে বসে ছিল, কিছু লোক গির্জায় উপস্থিত ছিল। তারা রাস্তায় নেমে উৎসব করার সাহস পাচ্ছিল না। কারণ, জায়োনিস্টরা তত দিনে সামরিক শক্তিতে সুসজ্জিত হয়ে উঠেছে। তাদের কাছে প্রচুর অস্ত্র ছিল।

কিন্তু মুসলিমরা ঘরে বসে ছিল না। হেবরন থেকে একদল মুসলিম প্লাকার্ড হাতে জাফা শহরের প্রধান ফটকের সামনে হাজির হতে শুরু করে। প্লাকার্ডগুলোতে ধর্মীয় অসিষ্ণুতার বিরুদ্ধে স্লোগান লেখা ছিল। ব্রিটিশ সৈনিকের অনেকে সেদিন সামনে এগিয়ে আসেনি। কারণ, তাদের সবাই ছিল খ্রিষ্টান। কিছুদিন আগেই তারা দেখেছে- ইহুদিরা কীভাবে অকথ্য ভাষায় যিশুকে অপমান করেছে। তা ছাড়া তাদের অনেকে গির্জায় প্রার্থনা করছিল। এমতাবস্থায় ইহুদি ও মুসলিমদের মধ্যে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ইহুদিদের কাছে আধুনিক অস্ত্র থাকলেও তারা যুদ্ধ করতে জানত না। অপর দিকে মুসলিমরা ছিল সংখ্যায় অল্প। তাদের হাতে ছুরি-তরবারি ছাড়া কিছুই ছিল না। তারপরও মুসলিমরা যুদ্ধে অসম্ভব পারদর্শী ছিল। কারণ, আরব জাতটাই এমন। শহরের ভেতরে প্রাচীন সেফার্ডিক বস্তিগুলোতে কিছু স্থানীয় ইহুদি বসবাস করত। শেষে তারাই বলির পাঠা হলো। জায়োনিস্ট ইহুদিরা আলিশান বাড়ি করে একই শহরে থাকত। মুসলিমরা শহরের ঢোকা মাত্রই ওপর থেকে গুলি ছোড়া শুরু হয়। নিরীহ সেফার্ডিকরা আতঙ্কে এদিক-সেদিক দৌড়াতে শুরু করে। অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী- এই দাঙ্গায় দুজন মারা যায়। ইংলিশ বিচারবিভাগ মুসলিম ও ইহুদিদের সমানভাবে অভিযুক্ত করে শাস্তি ভাগ করে দেয়, যদিও তদন্ত প্রতিবেদনে ইহুদিরাই ছিল মূল খলনায়ক। এই পারস্পরিক সংঘাত আদৌ কখনো বন্ধ হবে কি না বলা অসম্ভব।

জায়োনিস্ট কমিটি Sir H. Samuel-কে প্যালেস্টাইনের গভর্নর করে পাঠায়। তার এই আগমন পুরো প্যালেস্টাইনে নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়। তিনি জেরুজালেমে প্রবেশের আগেই তার মাথা উড়িয়ে দেওয়া হবে এবং মুসলমানদের শহর নেবলাসে কোনো ইহুদিকে ঢুকতে দেওয়া হবে না মর্মে কিছু হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তাই H. Samuel পূর্ণ সামরিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে জাফায় প্রথম প্রবেশ করে। আমি নিজে দেখেছি, তার সামনে-পিছে মেশিনগান হাতে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী দাঁড়িয়ে আছে। একই পদ্ধতিতে তিনি নেবলাস হয়ে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন। শহরে প্রবেশ করেই তিনি নতুন আজ্ঞা জারি করেন। যদিও সেই দাঙ্গায় খ্রিষ্টানরা জড়িত ছিল না, কিন্তু তারপরও মুসলিমদের প্রতি তাদের মৌন সমর্থন ছিল। তাই উভয়কেই একই অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। তা ছাড়া ব্রিটিশ বাহিনী নিষ্ক্রিয় থাকায় তাদের এই শহর দেখা-শোনায় অনুপযুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়। এতটুকু দেখার পর আমি প্যালেস্টাইন ত্যাগ করে আমেরিকায় চলে আসি। যতদিন সেখানে ছিলাম, চেষ্টা করেছি সঠিক তথ্যটি সংগ্রহ করতে; যদিও তা সহজ ছিল না।

প্যালেস্টাইনের ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে, তা এত শীঘ্রই বলা সম্ভব হচ্ছে না। তা ছাড়া ব্রিটিশ সরকার যে কতদিন তাদের নিরাপত্তা দিয়ে রাখবে, তাও বিতর্কের বিষয়। সত্যি-ই যদি ব্রিটিশ সরকার সাম্য, সৌহার্দ্য ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে প্যালেস্টাইন শাসন করতে শুরু করে, তবে এই দেশ এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে। কিন্তু জায়োনিস্টরা এটা মেনে নেবে না। জায়োনিস্টদের অত্যাচারে পুরো প্যালেস্টাইন এখন একটি করদরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। হয়তো জায়োনিস্টদের চাপে ব্রিটিশ সরকার একদিন তার সৈন্যবাহিনী সরিয়ে নিতে বাধ্য হবে। তখন নতুন এক পরিস্থিতির জন্ম হবে। ইরাক, সিরিয়া ও মিশর থেকে দলে দলে মুসলিম বাহিনী এই ভূমি স্বাধীন করতে এগিয়ে আসবে। ব্রিটিশ সরকার ইতোমধ্যেই বুঝতে পেরেছে, বিশ্বব্যাপী তার উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার ভিত কেপে উঠছে। মিশরে ইতোমধ্যে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জোরদার হয়েছে। ভারত থেকে যে মুসলিম সৈন্যদের তিনি ইহুদিদের নিরাপত্তার তাগিদে নিয়ে এসেছেন, তারাও কিছুদিন পর বেঁকে বসবে। কারণ, নিজ মুসলমান ভাইদের ওপর তারা কখনো বুলেট চালাবে না। এখন এটা সময়ের ব্যাপার যে, সামনে কী হতে যাচ্ছে।

📘 সিক্রেটস অব জায়োনিজম > 📄 দাঙ্গাবাজ ইহুদিদের অপকর্ম চিত্র

📄 দাঙ্গাবাজ ইহুদিদের অপকর্ম চিত্র


১৮৯৭ সালের জায়োনিস্ট সম্মেলনে Theodor Herzl যে খসড়ালিপি উপস্থাপন করেন, তার দেড় যুগ পার না হতেই পৃথিবীতে একটি বিশ্বযুদ্ধ আঘাত হানে।

১৯০৩ সালে কিশিনেভে বসবাসরত ইহুদিদের সঙ্গে জ্যান্টাইলদের দাঙ্গা বাধে। ফলে সেখানে বহু ইহুদি নিহত হয়। ক্ষতিপূরণস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার উগান্ডায় তাদের একটি উপনিবেশ স্থাপনের প্রস্তাব দেন। Dr. Herzl এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন।

কেন এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হলো, তা নিয়ে তাদের মহলে প্রচণ্ড হইচই পড়ে যায়। কারণ, তাদের লক্ষ্য জেরুজালেম। অন্য কোনো ভূমির কথা তারা ভাবতেই পারে না। ইতঃপূর্বে তাদের আর্জেন্টিনায় উপনিবেশ স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেখানে তারা একই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাহলে উগান্ডা প্রস্তাবে Dr. Herzl রাজি হলেন কেন? এর কিছুদিন পর শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। তখনও কেউ বুঝতে পারেনি এই রক্তাক্ত যুদ্ধের উদ্দেশ্য কি! তবে যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, তাদের আর উগান্ডায় যেতে হয়নি; বরং তারা জেরুজালেমকেই চূড়ান্ত ভূমিরূপে ফিরে পেয়েছে।

প্রশ্ন জাগে, তারা কি এই যুদ্ধের কথা আগেই অনুমান করতে পেরেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর তাদেরই একটি উৎস থেকে উপস্থাপন করা হবে। ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯১৯ American Jewish News-এর প্রধান মুখপাত্র, Litman Rosenthal পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় 'When Prophet Speak' শিরোনামে একটি কলাম প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যিনি বহু বছর আগেই বেলফোর ঘোষণার পূর্ববাণী করেছিলেন। তিনি হলেন Max Nordau। তিনি ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রভাবশালী এক জায়োনিস্ট আন্দোলনকারী। Litman ছিলেন Nordau-এর ঘনিষ্ঠ সহচর। কলামটিতে ষষ্ঠ জায়োনিস্ট সম্মেলনে Nordau সাহেবের দেওয়া একটি বক্তৃতা উপস্থাপন করা হয়, যেখানে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ইজরাইল পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভবিষ্যদ্বাণী করেন। কলামটি নিচে উপস্থাপন করা হলো:

WHEN PROPHET SPEAK
By Litman Rosenthal

দিনটি ছিল শনিবার। ষষ্ঠ জায়োনিস্ট সম্মেলন সমাপ্ত হওয়ার পরদিন। সম্মেলনটি ১৯০৩ সালের আগস্ট মাসে বাসেলে অনুষ্ঠিত হয়। Dr. Herzl টেলিফোনে আমাকে তার সঙ্গে দেখা করার কথা বলেন। হোটেলে প্রবেশ মাত্রই তার মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। কুশলাদি বিনিময়ের পর তিনি রাশিয়ায় জায়োনিস্ট আন্দোলনের খবর জানতে চাইলেন। প্রশ্ন করলাম— 'আপনি কেবল রাশিয়ার খবর জানতে চাচ্ছেন কেন?' জবাবে তিনি বললেন— 'কারণ, আমার ছেলের কাছে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এর ওপর ইহুদিদের অনেক স্বার্থ নির্ভর করছে।'

সম্মেলনে ব্রিটিশ সরকারের প্রস্তাবিত পশ্চিম আফ্রিকার উগান্ডাকে তাদের উপনিবেশ তৈরি করা নিয়ে আলোচনা হয়। (Herzl ও তার প্রতিনিধিগণ ব্রিটিশ সরকারের এই প্রস্তাবনায় রাজি হন— Jewish Encyclopedia, Vol. 12, Page 678)। তবে প্যালেস্টাইনকে বিসর্জন দিয়ে নয়; বরং প্যালেস্টাইনকে ফিরে পাওয়ার ধাপ হিসেবেই একে গ্রহণ করা হয়। এটি ছিল Herzl ও Rosenthal-এর আলোচনার মূল বিষয়বস্তু। Herzl বলেন— 'আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং তা অর্জনের পদ্ধতির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।'

এবার সম্মেলনে Dr. Nordau কী বলেছেন এবং কোন সৌভাগ্যবশত তাতে যোগ দিয়েছিলাম, সেই গল্প নিচে উল্লেখ করা হলো:

'সেবার এক ব্যবসায়িক সফরে ফ্রান্সে গিয়েছিলাম। লিওনস যাওয়ার পথে কিছু সময়ের জন্য প্যারিসে যাত্রা বিরতি করি। প্রতিবারের মতো সেবারও জায়োনিস্ট বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করি। এক বন্ধু বলল, আজ সন্ধ্যায় Dr. Nordau ষষ্ঠ জায়োনিস্ট সম্মেলনে বক্তৃতা দেবেন। তার বক্তৃতা শুনতে ব্যবসায়িক সফরটি দীর্ঘায়িত করলাম। সন্ধ্যার মধ্যেই সম্মেলন কক্ষে হাজির হলাম। কক্ষটি ততক্ষণে জনসমাগমে গিজগিজ করছিল। তিনি সম্মেলন কক্ষে পৌঁছা মাত্রই সবাই দাঁড়িয়ে সংবর্ধনা জানাল। কোনো রকম দৃষ্টিপাত না করে তিনি সরাসরি বক্তৃতা মঞ্চে চলে গেলেন। এরপর বলা শুরু করলেন—

"জানি, আপনারা সবাই একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে ব্যাকুল হয়ে আছেন। প্রশ্নটি হলো— কীভাবে আমি ও Herzl ব্রিটেনের প্রস্তাবিত উগান্ডা প্রস্তাবনায় রাজি হলাম? কেনই-বা প্যলেস্টাইন ইস্যু থেকে সরে এলাম এবং আমাদের সহস্র বছরের পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলাম? এর জবাবে আপনাদের বলতে চাই, উগান্ডা প্রস্তাবনায় রাজি হওয়ার পেছনে অনেকগুলো যৌক্তিক কারণ রয়েছে। আসলে Herzl সাহেবকে এই প্রস্তাবনায় রাজি হওয়ার জন্য আমিই অনুরোধ করি। কেন এমনটা করেছি তা বলার আগে আপনাদের একটি গল্প শোনাতে চাই।

আমি এমন একটি সময়ের কথা বলতে যাচ্ছি, যা আপনাদের অনেকেই জানেন না। তখন ইউরোপের ক্ষমতাধর শক্তিগুলো সেভাস্টোপল দুর্গ দখল করতে নৌ-বহর পাঠানোর পরিকল্পনা করছিল। তখনও স্বাধীন ইতালির জন্ম হয়নি। সার্ডিনিয়ার একটি ছোটো শাসনাঞ্চল হিসেবে এটি পরিচিত ছিল, কিন্তু তখন এর ওপর অন্যান্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল। সার্ডিনিয়াবাসী স্বাধীন ইতালি প্রতিষ্ঠায় ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। এর পেছনে যে কয়জন মহান নেতার পরিচয় পাওয়া যায়, তারা হলেন— Garibaldi, Mazzini ও Cavour।

ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলো সার্ডিনিয়াকে সেভাস্টোপল আক্রমণের আমন্ত্রণ জানায়। প্রথমাবস্থায় সেভাস্টোপল ইস্যুতে সার্ডিনিয়া অস্বীকৃতি জানায়। বিশেষ করে Garibaldi ও Mazzini এই যুদ্ধে জাহাজ পাঠাতে রাজি হয়নি। তারা বলে— "আমাদের পরিকল্পনা ইতালি প্রতিষ্ঠা নিয়ে। সেভাস্টোপলে গিয়ে আমরা কী করব? সেখানে তো আমাদের কোনো কাজ নেই। আমাদের সব শক্তি ও ক্ষমতা শুধু ইতালি প্রতিষ্ঠার পেছনে ব্যয় করা উচিত।"

কিন্তু Cavour ছিলেন ব্যতিক্রমী ও দূরদর্শী একজন নেতা। তিনি বলেন— "আমাদের উচিত ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেভাস্টোপল আক্রমণ করা।" আসলে Hartam নামে তার একজন ব্যক্তিগত সচিব ছিল, যিনি জাতিতে ইহুদি। তিনি কেবল তার ব্যক্তিগত সচিবই ছিলেন না; খুব কাছের বন্ধুও ছিলেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে Cavour সাহেবকে পরামর্শ দিতেন। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সার্ডিনিয়ার অনেকেই Cavour-কে বিশ্বাসঘাতক বলে ডাকতে শুরু করে। অনেকে তার ব্যক্তিগত সচিবকে অভিযুক্তের কাঠগড়ায় নিয়ে আসে। প্রশ্ন করা হয়— বিশ্বাসঘাতকের মতো এমন বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী?

তিনি বলেন— "যে স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে আমাদের এত যুদ্ধ, ত্যাগ-তিতিক্ষা, তার মূলে রয়েছে স্বাধীন ইতালি প্রতিষ্ঠার দৃঢ় বাসনা। এ জন্য আমরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছি। মায়েরা তাদের সন্তানদের বিসর্জন দিয়েছে। আমাদের সব আত্মত্যাগ তখনই পবিত্র বলে গণ্য হবে, যখন চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হব।"

তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, সেভাস্টোপল যুদ্ধের পর একটি শান্তি আলোচনা হবে। সেখানে যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী প্রতিটি দেশ আসন গ্রহণ করবে। সার্ডিনিয়ার হয়তো সেভাস্টোপল নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই, কিন্তু এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শান্তি আলোচনার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। যখন সবাই যুদ্ধের মুনাফা ভাগ-বটোয়ারা নিয়ে দাবি তুলবে, তখন আমরা স্বাধীন ইতালির দাবি করব। এভাবে Cavour উপস্থিত নীতি-নির্ধারকদের বোঝানোর চেষ্টা করেন সেভাস্টোপল আক্রমণ করা হবে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রথম ধাপ।

পুরো কক্ষ এতক্ষণ Nordau সাহেবের বাণী মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামলে সবাই হাততালি দিতে শুরু করে। সবাইকে থামার নির্দেশ দিয়ে তিনি আবারও বলতে শুরু করলেন—

"বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি ব্রিটেন কিশিনেভ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সহমর্মিতাস্বরূপ আমাদের উগান্ডা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমরা জানি উগান্ডা আফ্রিকাতে, আর জায়োনিজমও কখনো আফ্রিকার জন্য তৈরি হয়নি। Herzl সাহেব খুব ভালো করেই জানেন, রাজনৈতিক পরাশক্তিদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কোনো বিকল্প হতে পারে না। এমতাবস্থায় ব্রিটেনকে হাতছাড়া করা উচিত হবে না। আমরা একটি মহাবিপ্লবের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। খুব দ্রুত এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে, যার দরুন আবারও একটি শান্তি আলোচনার আয়োজন করা হবে। সেখানে পৃথিবীর বড়ো বড়ো দেশের প্রতিনিধিরা হাজির হবে। আমরা পুনরায় ষষ্ঠ জায়োনিস্ট সম্মেলনের বিষয়াবলি উপস্থাপন করব। ব্রিটেন পূর্বের ন্যায় আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। এখন উগান্ডাবিষয়ক প্রশ্নে সার্ডিনিয়াকে অনুকরণ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাতে পারি। আর তা হচ্ছে— Herzl, জায়োনিস্ট সম্মেলন, ইংল্যান্ডের উগান্ডা প্রস্তাবনা, ভবিষ্যৎ বিশ্বযুদ্ধ (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ), যুদ্ধপরবর্তী শান্তি আলোচনা এবং সবশেষে ব্রিটেনের সহায়তায় প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।"

শেষ কিছু শব্দ আমাদের কানে বজ্রের ন্যায় আঘাত করে। আমরা অনেকেই বুঝতে পারিনি, একজন মানুষ কীভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তার এই জ্বালাময়ী বক্তৃতা প্যালেস্টাইন পুনরুদ্ধার বিষয়ে জায়োনিস্টদের সকল সংশয় মুহূর্তেই উড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। সবার আবেগ-উৎকণ্ঠাকে তিনি আরও কিছু সময়ের জন্য ধৈর্যে পরিণত করতে সক্ষম হন। এরপর আমরা সবাই তার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সেই কাঙ্ক্ষিত সময়টির জন্য দিনক্ষণ গণনা শুরু করলাম।'

পাঠকদের অবাক লাগতে পারে, Litman Rosenthal-কে কীভাবে এমন একটি কলাম লেখার জন্য অনুমতি দেওয়া হলো! আসলে বেলফোর ঘোষণার পূর্বে এই কলামটি প্রকাশিত হয়নি। ইহুদিদের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে— তারা ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো বিষয় জনসম্মুখে আসতে দেবে না, যতক্ষণ না তার উদ্দেশ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়। এ বিষয়টি পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে বেলফোর ঘোষণার অনেক পরে। ১৯০৩ সালের কর্মসূচিতে স্থান পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো— ১. ভবিষ্যৎ বিশ্বযুদ্ধ ২. শান্তি আলোচনা ৩. নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন।

একই উদাহরণ পাওয়া যায় জার সাম্রাজ্যের পতনের সময়ও। প্রথমে বলা হয় Nicholas Romanovitch-সহ তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েদের যারা হত্যা করে, তারা ছিল সোভিয়েত ডেপুটি, কিন্তু অনুসন্ধানের পর পরিষ্কার হয়— হত্যাকারী পাঁচজনই ছিল ইহুদি। তারা সোভিয়েত ডেপুটি ছদ্মবেশে Nicholas পরিবারকে হত্যা করে। এর পেছনে ছিল আমেরিকান জায়োনিস্টদের বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিয়োগ।

অবশেষে সেই দিনটি চলে আসে, যখন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় রাজপরিবারের সদস্য Archduke Franz Ferdinand সস্ত্রীক আততায়ীর হাতে নিহত হন। দিনটি ছিল ২৮ জুন, ১৯১৪। সেদিন তিনি সস্ত্রীক বসনিয়ার রাজধানী সারাজেভো ভ্রমণ করছিলেন। অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়, সার্ব-বসনিয়ার জাতীয়তাবাদী সংগঠন 'ব্লাক হ্যান্ডসদের' দ্বারা এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে।

২৩ জুলাই এই জাতীয়তাবাদ সন্ত্রাসী সদস্যদের আটক করার জন্য অস্ট্রিয়া সরকার সার্বদের ওপর সামরিক চাপ বৃদ্ধি করে। ঠিক তার পরদিন সার্বরা রাশিয়ানদের নিকট সামরিক সাহায্যের আবেদন করে। রাশিয়া বিনা বাক্যে সেই আবেদনে সাড়া দেয়। ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া সার্বদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধ ঘোষণা করে, যা এক অর্থে রাশিয়ানদের ওপরেও যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর। এরপর অস্ট্রিয়ার সমর্থনে পাশে এসে দাঁড়ায় জার্মানি ও অটোমান। অন্যদিকে রাশিয়ার পক্ষে দাঁড়ায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স।

Nordau সাহেবের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী যুদ্ধ ঠিক সময়ই শুরু হয়। আর যুদ্ধের ফলাফল কী হবে তা তারা ভালো করেই জানত। কারণ, কার ভান্ডারে কতটুকু রসদ মজুদ আছে সে হিসাব তারা আগেই কষে রেখেছিল। প্রতিটি দেশের প্রশাসনিক বিভাগে তাদের যথেষ্টসংখ্যক প্রতিনিধি ছিল। তাদের অতি প্রাচীন একটি সংস্কৃতি হচ্ছে— তারা নিরপেক্ষতার ছুতো ধরে যুদ্ধের উভয় পক্ষকে ঋণ ও রসদ সরবরাহ করত এবং প্রয়োজনীয় মুহূর্তে কাঙ্ক্ষিত একটি পক্ষের রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দিত। এতে তাদের ভান্ডারে যেমন মুনাফা আসত, তেমনি কাঙ্ক্ষিত পক্ষটিও যুদ্ধে জয়লাভ করত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর তারা অপেক্ষা করতে লাগল, কখন মিত্রশক্তির রসদ ফুরিয়ে যাবে। ব্রিটেনের জাহাজগুলো জার্মানির বিরুদ্ধে এমনিতেই প্রতিরোধ গড়তে পারছিল না। তার ওপর রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ায় তারা মাঝপথে যুদ্ধ থেকে সরে পরে। অসহায় হয়ে যায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স।

তাদের অসহায়ত্বের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা পড়ে, যখন ইহুদি ব্যাংকাররা ১৯১৬ সাল থেকে সকল প্রকার ঋণ প্রদান বন্ধ করে দেয়। কিছুদিন পর ফ্রান্সের অভ্যন্তরে সামরিক বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। এর দরুন তারাও যুদ্ধ থেকে সরে পড়ে। বাকি থাকে শুধু ব্রিটেন। তারা যে একাকী এই যুদ্ধে কখনো জিততে পারবে না, তা জায়োনিস্টরা বেশ ভালো করেই জানত। সেই মুহূর্তে ব্রিটেনের জন্য সামরিক শক্তিতে পুষ্ট কোনো মিত্রশক্তির আবশ্যকতা দেখা দেয়। আর এই সুযোগ যে ইহুদিদের সামনে আসবে, তা তারা যুদ্ধের আগ থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল। তাই তারা এতদিন ওত পেতে অতি গোপনে নতুন একটি সামরিক বাহিনী তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। আর তা-ই হলো আজকের আমেরিকা।

এই কাজের পুরো দায়িত্ব অর্পিত হয় Bernard M. Baruch-এর ওপর। তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এ দেশটিকে রণ শক্তিতে এতটা পারদর্শী করে তোলেন যে, যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মাথায় তারা জার্মানিকে সমূলে পরাজিত করে। ব্রিটেনের হাতে তুলে দেয় বিজয় মুকুট। এরপর ব্রিটেনও তাদের প্রতিশ্রুতিস্বরূপ, যুদ্ধ জয়ের বিনিময় হিসেবে জায়োনিস্টদের হাতে তুলে দেয় প্যালেস্টাইনের চাবি।

Mr. Baruch ১৮৭০ সালে দক্ষিণ ক্যারোলিনাতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম Simon Baruch। যুদ্ধ চলাকালে আমেরিকার ৩৫১-৩৫৭টি শিল্প প্রতিষ্ঠান তিনি একাই নিয়ন্ত্রণ করতেন। সে সময় তার মতো ক্ষমতাধর ব্যক্তি আমেরিকায় দ্বিতীয় কেউ ছিল না; এমনকী খোদ প্রেসিডেন্ট সাহেবও নন। যে কোম্পানির ওপর একবার তার চোখ পড়ত, তা দখল করেই ছাড়তেন। যেমন: Liggett & Meyers Tobacco Company, Selby Smelter, Tacoma Smelter ইত্যাদি। তিনি মেক্সিকোতে বিশাল রাবার বাগান গড়ে তোলেন, যেখান থেকে বিভিন্ন স্থানে কাঁচামাল সরবরাহ করা হতো। আয়রন, ইস্পাত ও কপার শিল্পের বাজারগুলোও তার দখলে ছিল।

১৯১২ সালে Woodrow Wilson-এর নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন। তখন থেকে তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সত্যিকারার্থে এটা কোনো সম্পর্ক ছিল না। বলা চলে, প্রেসিডেন্ট সাহেব তার হাতে বন্দি হয়ে পড়েন। মূলত এ দেশে যারা প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়, তাদের সবাই জায়োনিস্টদের পুতুলে পরিণত হয়। এ কথা কেন বলছি, তা পরবর্তী একটি অধ্যায়ে পরিষ্কার করব। যাহোক, এই সুযোগে Mr. Baruch সে সময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি বনে যান। তিনি যা বলেতেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব তা-ই করতেন। অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, কাঁচামাল, রসদ, সেনাবাহিনী ও শ্রমবাজারের মতো পাঁচটি বড়ো বড়ো প্রশাসনিক দপ্তর তিনি একাই চালাতেন।

যেহেতু আমেরিকা যুদ্ধে অংশ নেবে, তাই একটি সু-সংগঠিত সেনাবাহিনী গড়ে তোলা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই যুদ্ধকে ভয় পায় বলে এত দ্রুত সেনাবাহিনী গড়ে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। Mr. Baruch প্রভোস্ট মার্শালকে কিছু উপায় বাতলে দেন। প্রথমে নির্ধারণ করেন, এই বাহিনীতে কোন কোন শ্রেণির জনগোষ্ঠীকে নেওয়া হবে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমেরিকার বেশ কিছু শিল্প সংগঠন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কলমের এক খোঁচায় তাদের অবৈধ বলে আইন জারি করা হয়। এই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা কাজ করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাতারাতি বেকার হয়ে পড়ে। এটাই ছিল তাদের পরিকল্পনা। কারণ, এমন পরিস্থিতিতে একজন বেকারকে যে কাজেরই সুযোগ দেওয়া হবে, তাতেই সে রাজি হবে। অন্তত নিজ পরিবারের জন্য হলেও রাজি হবে; ঠিক তাই ঘটল। এরপর যখন সেনাবাহিনীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়, বেকাররা দলে দলে সেখানে প্রবেশ করতে শুরু করে। এভাবেই তৈরি হয় যুদ্ধকালীন আমেরিকার সেনাবাহিনী।

বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতিস্বরূপ Mr. Baruch প্রেসিডেন্ট সাহেবের থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের একটি বাজেট পাশ করান, যার পুরোটাই ছিল সাধারণ জনগণের ট্যাক্স ও বন্ড ক্রয়ের অর্থ। এত অর্থের বাজেট করেও যুদ্ধ শেষে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের বোনাস দেওয়া তো দূরের কথা, প্রাপ্য মজুরিটুকুও সামরিক বিভাগ মেটাতে পারেনি। তাহলে এত অর্থ গেল কোথায়? যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই দেখা যায়— নিউইয়র্কের ইহুদিদের আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়ে গেছে। সে সময় এই শহরের ৭০ শতাংশ মিলিয়নিয়ার ছিল এই জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা।

সাধারণ মানুষ তাদের দুঃখ-দুর্দশার দরুন প্রেসিডেন্টকে দোষারোপ করতে শুরু করে। কারণ, তার নির্দেশেই সেই শিল্প সংগঠনগুলো বন্ধ এবং সাধারণ মানুষ যুদ্ধে নিহত হয়েছে, অথচ তারা প্রাপ্য মজুরি পায়নি। ফলে চারদিকে ডেমোক্রেটবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, Woodrow Wilson ছিলেন এই দলের সদস্য। বোঝাই যাচ্ছিল এরপর যিনি ক্ষমতায় আসবেন, তিনি অবশ্যই রিপাবলিকান কোনো প্রার্থী হবেন। এবার ইহুদিরা তাদের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী রিপাবলিকানদের পিছে অর্থ বিনিয়োগ শুরু করে। বিনিয়োগ সফলও হয়। ১৯২১ সালে ক্ষমতায় আসে রিপাবলিকান প্রার্থী Warren G. Harding। এদিকে সৈনিকদের বকেয়া মজুরির ফলাফল হিসেবে আমেরিকায় শুরু হয় ইতিহাসের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ধ্বস, যা Great Depression ১৯২৯-১৯৩৯ নামে পরিচিত。

ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় ইহুদিদের নানা অপকর্মের চিত্র

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে বলকান দেশগুলোতে সাধারণ মানুষ যখন ক্ষুধা-দরিদ্রতায় হাহাকার করছিল, তখন আমেরিকা থেকে বেশ কয়েকটি ত্রাণবাহী জাহাজ সেখানে পাঠানো হয়। ত্রাণ বিতরণকালীন অভিজ্ঞতা নিয়ে জাহাজকর্মীদের মুখ হতে পাওয়া একটি অভিজ্ঞতার গল্প নিচে তুলে ধরা হলো—

'যুদ্ধপরবর্তী শান্তি মিশনের অংশ হিসেবে আমাদের জাহাজগুলো প্রয়োজনীয় ত্রাণ-সামগ্রী নিয়ে লিবাও বন্দরে হাজির হয়। চারদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের জাহাজটি ছোটো একটি স্রোতধারার সামনে নোঙর ফেলে ত্রাণ হস্তান্তর শুরু করে। এত এত মানুষ খাবারের জন্য হাহাকার করছিল যে, সুষ্ঠভাবে ত্রাণ বিলি করা অসম্ভব হয়। যখনই তাদের সামনে নতুন একটি আটার ব্যাগ খোলা হচ্ছিল, মানুষ যেন তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। যেটুকু আটা মাটিতে পড়ছিল, সেটুকুর জন্যও মানুষের কাকুতি-মিনতির শেষ ছিল না। ক্ষুধার্ত মানুষরা ধুলো-ময়লা মাখা আটাগুলো পর্যন্ত তাদের পাত্রে ভর্তি করে রাখছিল। আলু বিতরণ শুরু হলে তো মারামারি বেধে যায়। আলুর খোসা পানিতে ছুড়ে মারলে ক্ষুধার্ত মানুষরা তাদের ধাতব পাত্র দড়িতে বেঁধে সেগুলো তুলে আনতে শুরু করে। সাদা বর্ণের শুকনো মানুষগুলো খাবারের জন্য সারা দিন উন্মাদের মতো বড়ো বড়ো চোখ করে দাঁড়িয়ে ছিল।

এর মধ্যে দেখা যায় ডজনখানেক ইহুদির কিছু কুৎসিত দৃশ্য। সবাই যখন খাবারের জন্য লাফালাফি করছে, তখন ভালো কাপড় পরা তাদের একদল সদস্যকে দেখা যায়, যাদের মাথায় ছিল সদ্য ক্রয় করা চকচকে টুপি, হাতে ছিল দামি ঘড়ি এবং পায়ে ছিল দামি জুতা; যেমনটা শহরের সম্পদশালী মানুষদের ব্যবহার করতে দেখা যায়। তাদের আচরণ দেখে মনে হয়, এই জাহাজটি যেন তাদের জন্য সিগারেট নিয়ে এসেছে! তারা আমাদের পাঁচ পাউন্ডের নোট দেখিয়ে বলছে, এক কাটুন সিগারেট হবে অথবা একটি স্বর্ণের ঘড়ির বিনিময়ে নতুন কিছু সাবান হবে? দেখে মনেই হয় না, তারা রাশিয়াতে কোনো রকম নির্যাতনের শিকার হয়েছে।'

খ্রিষ্ট যুগের সূচনা হতে আজ পর্যন্ত যত ঐতিহাসিক যুদ্ধ-বিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে, তার প্রধান কারণ হিসেবে কেন যেন শুধু খ্রিষ্টানদেরই অভিযুক্ত করা হয়। সর্বত্র প্রমাণ করার জোড় প্রচেষ্টা চলছে— খ্রিষ্টবাদ ঐতিহাসিকভাবেই সন্ত্রাসী চেতনায় বিশ্বাসী এবং তারাই পৃথিবীর অধিকাংশ ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মূল হোতা! এ প্রসঙ্গে Rev. M. Malbert, ১৯২১ সালের এপ্রিলে Hebrew Christian Alliance Quarterly থেকে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যার শিরোনাম ছিল 'Persecution Is Not the Monopoly of Christian and Is Contrary to Its Principles।' প্রবন্ধটির গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ নিচে তুলে ধরা হলো—

'অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তাদের সব অপবাদের বিরুদ্ধে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করতে হবে। গত কয়েক হাজার বছরের সকল দাঙ্গা-সংঘাতের দায়ী হিসেবে পৃথিবীবাসী শুধু আমাদেরকেই অভিযুক্ত করেছে। কিন্তু পৃথিবীর প্রথম ধর্মীয় যুদ্ধের সূত্রপাত, ইহুদিদের হাতেই হলেও তারা এই বিষয়টি কখনোই স্বীকার করতে রাজি নয়। সময়ের পরিক্রমায় তারাই নিজেদের যুদ্ধবাজ জাতিতে পরিণত করেছে।

খ্রিষ্টপূর্ব ১২০ সালে Simon-এর পুত্র John Hyrcanus ছিলেন মাক্কাবিয়ান পরিবারের শেষ ভাই। নিজেদের ধর্ম রক্ষার্থে তিনি সিরিয়ান সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। তিনি জেরিজিন পর্বতের ওপর নির্মিত সামারিটান টেম্পল একেবারে ধ্বংস করে দেন। পরে ইডুমিয়ান রাজ্য দখল করেন এবং বন্দিদের ওপর দুটি পথ চাপিয়ে দেন। যথা: হয় ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করো, নয়তো দেশ ছেড়ে চলে যাও। তিনি জোড়পূর্বক একদল যুদ্ধবন্দির ওপর এই ধর্ম চাপিয়ে দেন।'

...John Hyrcanus-এর তৃতীয় পুত্র King Alexander ছিলেন মাক্কাবিয়ান রাজা। একজন পুরহিত হওয়ার পরও তিনি পরকালে বিশ্বাস করতেন না। এ জন্য ফেরাসিস গোত্র তাকে কখনো সহ্য করত না। খ্রিষ্টপূর্ব ৯৫ সালে ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুক্কাতে তিনি প্রতিবারের মতো নিজের পৌরহিত্য জাহির করছিলেন (ইহুদি ক্যালেন্ডারে ৭ম মাসের ১৫তম দিনকে শুক্কাত বলা হয়)। পূজার বেদিতে পানি না ঢেলে তিনি নিজ পায়ে ঢালতে শুরু করেন। বুঝতে পারলেন, এই কাজে সবাই চটে গেছে এবং তার জীবন হুমকির মুখে। অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি সৈন্যবাহিনীকে দ্রুত হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন, আর তারা সেখানে উপস্থিত থাকা ৬০০০ মানুষকে হত্যা করে।

তবে ফেরাসিসদের প্রতিশোধ ছিল আরও ভয়ংকর। পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে তিনি তাদের দলনেতাকে শান্তি আলোচনার প্রস্তাব করেন, কিন্তু কেউ এই শান্তি আলোচনায় বসেনি; বরং সবাই তার মৃত্যুদণ্ডের দাবি তোলে। তারা নিজ দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে সিরিয়ান রাজা Eucaerus-কে প্যালেস্টাইন দখলের জন্য উসকে দেয় এবং তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করে। রাজা Eucaerus প্রায় ৪৩০০০ সৈন্য নিয়ে মাক্কাবিয়ান সাম্রাজ্য জিহিদিয়া আক্রমণ করে। তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় Alexander পরাজিত হয় এবং ইফ্রয়িম পর্বতে আশ্রয় নেয়। পরে সিরিয়ান রাজাও ফেরাসিসদের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করে। তাদের একটি প্রতিশ্রুতিও পূরণ করা হয়নি। বিবেকের তাড়নায় দংশিত হয়ে তাদের প্রায় ৬০০০ সদস্য আবারও Alexander-এর কাছে ফিরে যায় এবং সাম্রাজ্য ফিরে পেতে আবারও যুদ্ধ করে। এই যুদ্ধে তারা সিরিয়ানরা পরাজিত হয়। এরপরও রাজা সাহেবের বিরুদ্ধে তাদের অনেকের পূর্ব অসন্তোষের রেশ থেকে যায়।

...ইহুদিরা অধার্মিকতা বা নাস্তিকতা একদম সহ্য করতে পারে না। তাদের চোখে অন্য ধর্মের প্রত্যেকেই নাস্তিক। একমাত্র তারাই আস্তিকতার ধর্মে বিশ্বাসী। তারা আশেপাশের প্রতিটি শহরকে এই ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করে। যে শহরগুলো ইহুদি ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, সেগুলো ধ্বংস করে দেয়। তৎকালীন সেনহাড্রিনের সদস্য Simon ben Shetach তার শাসনামলে ৮০ জন নারীকে জাদুচর্চার অভিযোগে ডাইনি বলে ক্রুশে ঝুলিয়ে হত্যা করে।

...হিল্লোল ও শাম্মাই হলো খ্রিষ্টপূর্ব বছরগুলোতে তাদের বড়ো দুটি বিদ্যাপীঠ। ধর্মীয় নিয়মনীতিতে মত-পার্থক্যের দরুন তাদের মধ্যে bloody যুদ্ধ প্রায় লেগেই থাকত। যিশুকে ক্রুশে ঝুলিয়ে হত্যা করাও ছিল তাদের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ। তারা বিশ্বাস করে— ঈশ্বরের নিকট সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো খ্রিষ্টান হত্যা!

রাবাই Tarpon একবার বলেছিলেন, গস্পেল এবং এপোস্টলের প্রতিটি বাক্য সৃষ্টিকর্তার নাম উল্লেখপূর্বক পুড়িয়ে ফেলা উচিত। তিনি আরও বলেন, খ্রিষ্টধর্ম পেগানিজমের চেয়েও বিপজ্জনক। প্রয়োজনে তিনি পেগানদের টেম্পলে আশ্রয় নেবেন, কিন্তু ক্যাথলিকদের সংস্পর্শে যাবেন না। Bar-Kosibah তাদের এক ভণ্ড পয়গম্বর, যিনি তার শাসনামলে প্রচুর খ্রিষ্টানকে নির্দয়ভাবে হত্যা করেন। রাজা Justinian-এর শাসনামলে তারা কৈসরিয়ার আশেপাশে বসবাসরত খ্রিষ্টানদের হত্যা এবং তাদের গির্জাগুলো ধ্বংস করে। গভর্নর Stephanus যখন দাঙ্গা হামলার শিকার খ্রিষ্টানদের রক্ষার প্রচেষ্টা করেন, তখন ইহুদিরা তাঁকেও হত্যা করে। ৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে তারা অ্যান্টিও আক্রমণ এবং সেখানে বসবাসরত খ্রিষ্টানদের ধারাল তলোয়ার দিয়ে নির্বিচারে হত্যা করে। রাজা Sinaite-এর শরীর দড়িতে বেঁধে অ্যান্টিওকের রাস্তায় টেনেহিঁচড়ে হত্যা করে।

৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের রাজা ইহুদিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্যালেস্টাইন আক্রমণ করে এবং সেখানে থাকা খ্রিষ্টানদের গণহত্যায় মেতে ওঠে। তখন প্রায় নব্বই হাজার অধিবাসী জেরুজালেম ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে বাইজ্যান্টাইন রাজা Heraclius পুনরায় প্যালেস্টাইন দখল করেন। যখন তার সৈন্যবাহিনী রোমান সাম্রাজ্য পাড়ি দিয়ে জেরুজালেম যাচ্ছিল, তখন এক সম্পদশালী ইহুদি তাকে নৈশ্যভোজের আমন্ত্রণ করে, যার নাম ছিল Benjamin।

তিনি হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি পারস্যের রাজাকে জেরুজালেম দখলের জন্য উসকে দেন। রাজা Heraclius জিজ্ঞেস করেন— 'কেন তুমি নিজ ভূমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে জেরুজালেমকে পারস্যের হাতে তুলে দিলে?' জবাবে তিনি বলেন— 'কারণ, সেখানে থাকা খ্রিষ্টানদের আমরা সহ্য করতে পারি না। এমনকী তারা মুসলিমদের নবি মুহাম্মাদের ওপরও কম অত্যাচার করেনি। তারা আরব নেতাদের মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিল এবং তাঁর অনুসারীদের ছত্রভঙ্গ করার বহু প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। এর মাধ্যমে যিশুর একটি ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণতা পায়— তিনি নিপীড়িত ও নির্যাতিত হয়েছেন, কিন্তু সত্য বাণী প্রচারে পিছপা হননি।'

এই প্রবন্ধ এখানেই শেষ নয়। কেউ যদি নিজ দায়িত্বে প্রবন্ধটি সম্পূর্ণ পাঠ করেন, তবে রক্তচোষা ইহুদি জাতির আরও অনেক ইতিহাস জানতে পারবেন। যখন তাদের ধর্ম পুনর্গঠন নিয়ে বিভিন্ন রাবাইদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হচ্ছিল, তখন রাবাই Isaac M. Wise-কে হুমকি দিয়ে রাবাই Lilienthal বলেন— 'আপনি যদি নিজেকে খ্রিষ্টান বলে মনে করেন, তবে ক্রুশবিদ্ধ হতে প্রস্তুত হোন।' (Isaac Meyer Wise, p. 92)

যারা Gibbson-এর লেখা Rise and Fall of the Roman Empire বইটি পড়েছেন, তারা ১ম খণ্ডের ১৬তম অধ্যায়ে তাদের নির্মমতার আরও অনেক প্রমাণ পাবেন। ইতিহাস প্রমাণ করে— যারা আজ অবধি ধর্মকে ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তারা হলো ইহুদি। বইটির বিশেষ একটি অনুচ্ছেদ নিচে তুলে ধরা হলো—

'সম্রাট Nero Claudius-এর রাজত্ব থেকে Antonius Pius-এর রাজত্বকাল পর্যন্ত রোমানদের কর্তৃত্ব ইহুদিদের অস্থির করে তোলে। যার দরুন তাদের সাথে প্রতিনিয়ত ছোটোখাটো দাঙ্গা লেগেই থাকত। মিশর, সাইপ্রাস ও সাইরিনের শহরগুলোতে তারা যে নির্মম ধ্বংসযজ্ঞের জন্ম দিয়েছে, তা মানব ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যে রাজ্য তাদের আশ্রয় দিয়েছে, সেই রাজ্যের সাথেও ইহুদিরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত মনোভাবের দরুন তারা কেবল রোমান সাম্রাজ্যেরই নয়; বরং গোটা মানবজাতির শত্রুতে পরিণত হয়েছে।

ইহুদিরা তাদের সেই অন্ধ বিশ্বাস আজ অবধি জিয়িয়ে রেখেছে, একদিন মহা প্রতিক্ষিত মশিহ হাজির হবেন। তিনি বিশ্ব সাম্রাজ্য তাদের হাতে তুলে দিয়ে এবং চারদিকে স্বর্গীয় আবহ তৈরি করবেন।'

তাদের উদ্দেশ্য প্যালেস্টাইন। বিংশ শতাব্দীতে অসংখ্য আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠে 'বেলফোর ঘোষণা'। যে দশ সদস্যের বোর্ড থেকে এই ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়, তাদের সাতজনই ছিল এভানজেলিক খ্রিষ্টান; যাদের সঙ্গে বিশেষ এই জাতিগোষ্ঠীটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্যালেস্টাইনে আরব উৎখাত বহু আগেই শুরু হয়েছে, কিন্তু ইহুদিদের জন্য এখনও তা নিরাপদ ভূমিতে পরিণত হয়নি। তাদের কৌশল ও চাপের মুখে ব্রিটেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফেঁসে গিয়েছিল। শুধু কি প্যালেস্টাইন? আরব, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত জুড়ে ২৫০-৩০০ বছরের যে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন, তা নিয়েও ইহুদিদের কম পরিকল্পনা ছিল না。

রণক্ষেত্র ইহুদিদের অর্থ উপার্জনের আদর্শ শস্যক্ষেত্র

পূর্বের একটি অধ্যায়ে বলা হয়েছে, যুদ্ধ ইহুদিদের নিকট অমিত সম্পদ উপার্জনের আদর্শ শস্যক্ষেত্র। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে যতগুলো যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে, প্রতিটির পেছনেই এই জাতিগোষ্ঠীটির বড়ো অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের উভয় পক্ষকেই প্রয়োজনীয় বিভিন্ন রসদ (খাদ্যশস্য, জামা-কাপড়, অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জামাদি) সরবরাহ করে ইহুদিরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছে।

বিষয়টি নিয়ে ১৯১৩ সালে Werner Sombart একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন, যার নাম The Jews and Modern Capitalism। বইটির ৫০ থেকে ৫৩ নম্বর পৃষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ বিশেষ নিচে তুলে ধরা হলো—

'ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপ-আমেরিকার প্রতিটি সৈন্যদলের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও রসদ সরবরাহের মূল কাজটি করত ইহুদিরা। এই বাণিজ্য যেন তাদের একচেটিয়া সম্পদে পরিণত হয়। ইহুদিরা ছিল যেকোনো রাজার নিকট ঋণ লাভের প্রধানতম উৎস। এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যার সব এখানে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। তবে একটি পথ দেখিয়ে দিতে পারি, যা অনুসরণ করে যেকোনো উৎসাহী পাঠক নিজেদের গবেষণা চালিয়ে নিতে পারবেন।

১৪৯২ সালের আগ পর্যন্ত ইহুদিদের বড়ো একটি অংশ স্পেনে বাস করত। তখন স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীগুলোতে ইহুদিরা প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের কাজ করত। সে গল্প এখানে আনতে চাচ্ছি না; বরং সেখান থেকে গল্প শুরু করব, যেখান থেকে ইংল্যান্ড-ইহুদি সম্পর্ক জোরদার হতে শুরু করেছে।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে তারা বিভিন্ন সামরিক বাহিনীর প্রধানতম রসদ সরবরাহকারী গোষ্ঠী হিসেবে চারদিকে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করে। Antonio Fernandez Carvajal হলেন এমন একজন ইহুদি, যিনি কমনওয়েলথ সৈন্যবাহিনীর জন্য রসদ সরবরাহের বিশেষ দায়িত্ব পান। তিনি ১৬৩০ থেকে ১৬৩৫ এর মাঝামাঝি সময়ে লন্ডনে বসবাস শুরু করেন এবং খুব অল্প সময়ে মাঝেই নিজেকে সম্পদশালী বণিকে পরিণত করেন।

১৬৪৯ সালে তাকে ইংল্যান্ড সামরিক বাহিনীর প্রধান খাদ্য-রসদ সরবরাহকারী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এ কাজে তার সহকারী হিসেবে একই জাতিগোষ্ঠীর আরও চারজন সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় তিনি বাৎসরিক ১,০০,০০০ পাউন্ড সমমূল্যের রৌপ্য বাহিরের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতেন। ১৬৮৯ সালে William III রাজা হিসেবে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আরোহণ করেন। সে সময় তার সামরিক বাহিনীর জন্য প্রধান রসদ সরবরাহকারী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন Sir Solomon Medina। তিনি ছিলেন জন্মসূত্রে একজন আরব ইহুদি।

সপ্তদশ শতাব্দীতে স্পেনের সাথে ইংল্যান্ডের যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই ফ্রান্সের সাথে নতুনভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্সের রাজা Louis XIV-এর সামরিক বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের কাজ করত স্ট্রসবার্গের (Strasbourg) ইহুদিরা। Jacob Worms ছিলেন রাজা Louis XIV-এর ডান হাত, যার পরামর্শ ছাড়া তিনি এক কদমও চলতেন না। যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি Maurice বলেন, ইহুদি রসদ সরবরাহকারীদের দক্ষতার দরুন তিনি সামরিক বাহিনীকে যে রূপে সুসজ্জিত করেছেন, ইতঃপূর্বে কখনো তা করা সম্ভব হয়নি। Louis বংশের শেষ দুই রাজার আমলে প্রধান রসদ সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করেছেন Cerf Beer। ১৭২৭ সালে মেটজ (Metz) শহরের ইহুদিরা মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে সেখানকার সামরিক বাহিনীর জন্য ৫,০০০ হাজার নতুন ঘোড়া সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে Abraham Gardis নির্মাণ করেন তার বিখ্যাত কোষাগার 'House of Gardis'। তা ছাড়া কুইবেক প্রদেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি নির্মাণ করেন আরও অনেক কোষাগার; যেখান থেকে ফরাসি বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সময়ে রসদ সরবরাহ করা হতো।

নেপোলিয়নের প্রতিটি যুদ্ধের ইতিহাস যদি ভালোভাবে অধ্যয়ন করা হয়, তবে সেখানেও উভয় দলে একই রসদ সরবরাহকারীর উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া যাবে। দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চালিয়ে যাওয়ার দরুন, উক্ত শতাব্দীতে পুরো ফ্রান্সজুড়ে দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ে। প্যারিস শহরের নগরপাল ইহুদিদের নিকট আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন, যেন এই দুর্ভিক্ষ থেকে তাদের রক্ষা করা হয়। সেখানকার সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করত, একমাত্র ইহুদিদের পক্ষেই এই মহামারি সময়ে খাদ্যাভাব মেটানো সম্ভব। একইভাবে, ১৭২০ সালে ড্রেসডেন শহরে দুর্ভিক্ষ শুরু হলে Jonas Meyer প্রায় ৪০ হাজার বুসেল সমপরিমাণ খাদ্যশস্য সরবরাহ করে শহরটিকে রক্ষা করেন। (১ বুসেল = ১৫.৪২ কেজি প্রায়।)'

জার্মানির ইতিহাস খুব ভালো করে অধ্যয়ন করলে সেখানেও অনেক ইহুদির পরিচয় পাওয়া যাবে, যারা বিভিন্ন সময়ে একচেটিয়াভাবে সেখানকার সামরিক বাহিনীতে রসদ সরবরাহের কাজ করত। যেমন: ১৫৩৭ সালে হেলবারস্টেড শহরের জার্মান সেনা ক্যাম্পে এই কাজের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন Isaac Meyer। খাদ্য-অস্ত্রসহ শত্রু পক্ষের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তিনি সেখানকার সেনা অফিসারদের নিকট সরবরাহ করতেন।

এরপর আসে Joselman von Rosheim-এর নাম, যিনি জার্মান সরকারকে খাদ্য, অস্ত্র ও তথ্য রসদের পাশাপাশি অর্থ ঋণ দিয়ে সাহায্য করতেন। তার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৫৫৮ সালে তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

১৫৫৬ সালে বোহেমিয়ান প্রদেশের ইহুদিরা স্থানীয় সেনা-ক্যাম্পগুলোতে সামরিক পোশাক ও কম্বল সরবরাহের বিষয়টি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। ষোড়শ শতাব্দীতে Lazarus নামে আরও এক বিখ্যাত বোহেমিয়ান ইহুদির নাম শোনা যায়, যে নিজ দায়িত্বে শত্রুপক্ষের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জার্মান সেনাবাহিনীর নিকট সরবরাহ করত। এর দরুন তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানান সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়, যা কাজে লাগিয়ে সেও রসদ সরবরাহের কাজে জড়িয়ে পড়ে।

সেক্সনি রাজ্যে এই কাজটি করত Samuel Julius। তা ছাড়া বিভিন্ন যুদ্ধে কামান ও গান পাউডার সরবরাহের কাজ করত Leimann Gompertz ও Solomon Elias।

অস্ট্রিয়ার সামরিক বাহিনীতেও প্রধান রসদ সরবরাহকারী হিসেবে এমন অসংখ্য ইহুদির পরিচয় খুঁজে পাওয়া যাবে। রাজা Leopold-এর শাসনামলে ইহুদিরা ভিয়েনাতে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং রাতারাতি সেখানকার সামরিক বাহিনীতে রসদ সরবরাহের কাজটি নিজেদের করে নেয়। এমন কিছু বিখ্যাত ইহুদির নাম হলো— Oppenheimers, Wertheimers ও Mayer Herschel。

মধ্যযুগীয় যুদ্ধ থেকে শুরু করে আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত পৃথিবীতে যতগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তার মধ্যে এমন একটি উদাহরণও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে বিশেষ এই জাতিগোষ্ঠীটির অংশগ্রহণ ছিল না। যুদ্ধে তো বহু রাষ্ট্রই অংশগ্রহণ করে। মিত্ররাষ্ট্রকে বাঁচাতে বহু দেশের সামরিক বাহিনী রণক্ষেত্রে যোগদান করে। তারা সম্মুখ সমরে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করে এবং দেশ ও জাতীয়তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে নিজেদের সবটুকু উজার করে দেয়। কিন্তু ইহুদিদের ক্ষেত্রে এই প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন। তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ঠিকই, তবে রণক্ষেত্রে নয়। তারা প্রতিটি যুদ্ধকে অর্থ উপার্জনের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ওপরন্তু অর্থের প্রতি নিজেদের লোলুপ বাসনা চরিতার্থ করতে ইহুদিরা বিভিন্ন রাষ্ট্রকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পারস্পরিক যুদ্ধে জড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। স্বাধীনতাপরবর্তী আমেরিকায় যে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তাতেও ছিল ইহুদিদের বর্ণণাতীত কূটবুদ্ধি ও ষড়যন্ত্রের দৌড়াত্ম্য।

বহু শতাব্দী পূর্বে, ক্যাথলিক ও অর্থডক্সদের অন্তর্দ্বন্দ্ব পুঁজি করে ইউরোপ জুড়ে যে রক্তাক্ষয়ী ধর্মীয় সংঘাতের সূত্রপাত, তার পরিসমাপ্তি আজও ঘটেনি। রক্তের সমুদ্র শুকিয়ে তাতে নতুন রক্ত ঝড়েছে, কিন্তু পরিবর্তন আসেনি সাধারণ মানুষের জীবন প্রবাহে। পরিবর্তন এসেছে শুধু ইহুদিদের সম্পদ ও প্রাচুর্যতায়। কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের রিপোর্টগুলো ভালোভাবে অনুসন্ধান করলে এমন অনেক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যাবে, যেখানে বিভিন্ন সামরিক বাহিনীতে রসদ সরবরাহ করে ইহুদিরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করত। তেলের ড্রাম, কম্বল, রাইফেল, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি খুব পরিচিত কিছু রসদের নাম, যা তারা নিয়মিত সরবরাহ করত। ১৭৭৫ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের সাথে আমেরিকানদের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলেছিল, সেখানেও ছিল এই রসদ ব্যবসায়ীদের উল্লেখযোগ্য অধিপত্য。

এ প্রসঙ্গে প্রথমে যে ব্যক্তির নাম চলে আসে, তিনি হলেন Moses Franks। একসময় তিনি ইংল্যান্ডে থাকতেন এবং ব্রিটিশ সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরুর আগ পর্যন্ত তিনি আমেরিকায় অবস্থিত ব্রিটিশ সেনা-ক্যাম্পগুলোতে প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের সিংহভাগ আঞ্জাম দিতেন। তা ছাড়া কুইবেক, মন্ট্রেল, মেসাচুসেট, নিউইয়র্ক ও ইলয়নসের ক্যাম্পগুলোতে তিনি ছিলেন প্রধান রসদ সরবরাহকারী।

Jacob Franks তখন নিউইয়র্কে বাস করতেন। মূলত Moses Franks-এর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে তার আমেরিকায় আগমন। তিনিও ব্রিটিশ সেনা-ক্যাম্পগুলোতে রসদ সরবরাহের কাজ করতেন। বলে রাখা উচিত, স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর পূর্ব হতে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাথে ফ্রাঙ্ক পরিবারের ছিল বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাই এই যুদ্ধের প্রারম্ভিক পর্যায়ে তারা ব্রিটিশ সেনা-ক্যাম্পগুলোতে রসদ সরবরাহ করত। যেহেতু ইহুদিরা কখনো এক পাত্রে সব ডিম রাখতে রাজি নয়, তাই কিছুদিন পর যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে শুরু করলে তাদেরই আরেকটি অংশ আমেরিকানদের জন্য রসদ সরবরাহ করতে শুরু করে।

David Franks হলেন তাদের একজন। তিনি ছিলেন Jacob Franks-এর পুত্র। শুরুর দিকে তিনি পেনসিলভানিয়ার ব্রিটিশসেনা-ক্যাম্পগুলোতে রসদ সরবরাহের কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে আমেরিকার সেনাবাহিনীতে অর্থ ও রসদ সরবরাহের কাজ শুরু করেন। অসম্ভব ধনী হওয়ার দরুন তিনি আমেরিকার রাজনীতি ও সাম্রাজ্যবাদবিরুধী শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। এই স্বাধীনতাযুদ্ধে মহান যে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম প্রায়ই বিভিন্ন স্থানে উচ্চারিত হয়, তাদের অনেকেই ছিল বিশেষ এই ব্যক্তির সাগরেদ।

মন্ট্রেল শহরে এই পরিবারের এমন আরেকজন সদস্যের নাম জানা যায়, যিনি আমেরিকানদের পক্ষে রসদ সরবরাহ করতেন, তিনি হলেন— David Solesbury Franks। তিনি ছিলেন Moses Franks-এর পৌত্র। রসদ বাণিজ্যে তিনি এতটা দক্ষ ছিলেন যে, কীভাবে সামরিক শক্তিতে দুর্বল একটি জাতির ভাগ্য রাতারাতি পালটে দেওয়া যায়, তা তিনি ভালো করে জানতেন। এ জন্য তাকে একটি উপাধি দেওয়া হয় 'A Blooded Buck' ।

এ ছাড়াও ফ্রাঙ্কস পরিবারের আরও অনেক সদস্যের নাম এই স্বাধীনতাযুদ্ধে জড়িয়ে আছে, যা উল্লেখ করে এই আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছি না। পরবর্তী সময়ে আমেরিকা হয়ে উঠে ইহুদিদের আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্য বিস্তারের দুর্গক্ষেত্র। তবে Bernard M. Baruch প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সামরিক শক্তিতে পরিপূর্ণ আমেরিকান সেনাবাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে এই দুর্গের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সেই থেকে এই বাহিনী কেবল ইহুদিদেরই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে পথে কাজ করে যাচ্ছে।

📘 সিক্রেটস অব জায়োনিজম > 📄 আমেরিকার অর্থব্যবস্থায় ইহুদি দৌরাত্ম্য

📄 আমেরিকার অর্থব্যবস্থায় ইহুদি দৌরাত্ম্য


ইহুদিদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল শক্তিঘর প্রতিষ্ঠিত হয় রথসচাইল্ড পরিবারের হাত ধরে, সপ্তদশ শতাব্দীতে। এটি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুট শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও পরবর্তী সময়ে তা ইংল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এর সাথে যুক্ত হয় আরও কিছু পরিবার। তাদের আধিপত্যও কোনো অংশে কম নয়。

মূলত অর্থ-সম্পদের ভিত্তিতে গড়ে উঠে অর্থনীতি। আর তারই প্রাচুর্যতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে একটি দেশের রাজনৈতিক দল। তাই অর্থনীতির সাথে রাজনীতির সম্পর্ক খুবই গভীর। ইহুদি ব্যাংকাররা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন শাখা খোলার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর অদৃশ্য আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। এর ফলে তারা প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে কলকাঠি নাড়ার অনুমতি পেয়ে যায়। রথসচাইল্ড ছাড়া আরও যে চারটি পরিবার এই শিল্পে একচ্ছত্র ক্ষমতাবান, তাদের নাম হলো: Belmont (বেলমন্ট), Schiff (স্কিফ), Warburg (ওয়াবার্গ) এবং Kahn (খান)।

১৮৩৭ সালে আমেরিকায় রথসচাইল্ড পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করতে হাজির হন August Belmont। তার জন্ম জার্মানির ফ্রাঙ্কফুট শহরে। পরবর্তী সময়ে তার হাত ধরে জন্ম নেয় বেলমন্ট ব্যাংকিং পরিবার। ১৮৬০ থেকে ১৮৭২ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ন্যাশনাল ডেমোক্রেট কমিটির প্রধান সভাপতি。

দ্বিতীয় ব্যক্তিটি হলেন Jacob Schiff। তার জন্মও ফ্রাঙ্কফুট শহরে। জার্মানিতে বাবার ব্যাংকে দীর্ঘকাল শিক্ষানবিশ হয়ে কাজ করার পর ১৮৬৫ সালে তিনি আমেরিকায় প্রবেশ করেন। তার বাবাও ছিলেন রথসচাইল্ড পরিবারের বিশেষ একটি শাখার প্রতিনিধি। তার সংগঠনের হাত ধরে প্রচুর জার্মান মূলধন আমেরিকায় প্রবেশ করে। তার অর্থে তৈরি হয় অনেক নতুন নতুন রাস্তা-ঘাট, সেতু, মহাসড়ক, রেলপথ, উঁচু ভবন, বিমা প্রতিষ্ঠান ও টেলিগ্রাফ প্রতিষ্ঠান।

১৮৭৫ সালে Theresa Loeb-কে বিয়ে করার মধ্য দিয়ে তিনি Kuhn, Loeb & Company-এর প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন। জাপান-রাশিয়া যুদ্ধেও তিনি প্রচুর অর্থ জাপানের পক্ষে বিনিয়োগ করেন। ভেবেছিলেন এই বিনিয়োগের ছুতোতে হয়তো জাপানের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপের সুযোগ পাবেন, কিন্তু জাপান রাজা সতর্ক ব্যক্তি হওয়ায় ইহুদিদের ভাবগতি ভালো করেই জানতেন। তাই নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলিতে অন্যদের হস্তক্ষেপের ন্যূনতম সুযোগ দেননি।

Kuhn, Loeb & Company-এর সঙ্গে জড়িত আরেকজন ব্যক্তি হলেন Otto Herman Kahn। অন্যদের মতো তারও জন্ম ফ্রাঙ্কফুট শহরে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম' তৈরির পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে তিনি আমেরিকায় আগমন করেন। তখন থেকেই আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাকে আমেরিকায় নিয়ে আসার পেছনে গোপনে কাজ করেন Paul Warburg。

এরপর চলে আসে ওয়াবার্গ পরিবারের নাম। ১৯০২ সালে পরিবারটির অন্যতম সদস্য Paul Warburg আমেরিকায় আগমন করেন। তিনি ১৮৬৮ সালে জার্মানির হাম্বার্গ শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কিশোর বয়সেই রপ্ত করেন 'কীভাবে অর্থ (Money) তৈরি করতে হয়।' একটু চিন্তা করে দেখুন, যেখানে প্রাপ্ত বয়সেও অনেকে জানে না কীভাবে অর্থ উপার্জন করতে হয়, সেখানে তিনি কিশোর বয়সেই শিখে ফেলেছেন কীভাবে অর্থ তৈরি করতে হয়!

The Banking House of Warburg ১৭৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাই ছিল তার কিশোরকালীন বিদ্যালয়। ব্যাংকিং শিল্পে তিনি কীভাবে পারদর্শী হয়ে উঠেন, তা ৫ আগস্ট, ১৯১৪ সালে Banking and Currency Committee-তে নিজ মুখে স্বীকার করেন। তার পুরো বক্তব্য একজন শর্টহ্যান্ড লেখক লিপিবদ্ধ করেন। ১২ আগস্ট, ১৯১৪ তার পুরো বক্তব্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়। তার বক্তব্যের গুরত্বপূর্ণ অংশ নিচে উপস্থাপন করা হলো—

'হাম্বার্গ থেকে আমি ইংল্যান্ড চলে আসি। সেখানে Samuel Montague & Co-তে দুই বছর কাজ করি। এরপর দুই মাসের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানে শেয়ার অবলেখকের কাজ করি। শেখার চেষ্টা করি, কীভাবে শেয়ারবাজারকে পুরো দেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা যায় এবং তার সাথে ব্যাংকিং কার্যক্রম সংযুক্ত করা যায়।

এরপর যাই ফ্রান্সে। সেখানে একটি রাশিয়ান ব্যাংকের শাখায় কিছুদিন কাজ করি। কীভাবে বৈদেশিক বাণিজ্যের সাথে ব্যাংকিং কার্যক্রমকে সংযুক্ত করা যায়, তা শিখি। এরপর হাম্বার্গে ফিরে স্থানীয় একটি ব্যাংকে কিছুদিন কাজ করি। পাশাপাশি ভারত, চীন ও জাপানের একাধিক ব্যাংক পরিদর্শন করি।

১৮৯৩ সালে প্রথমবারের মতো আমেরিকায় আসি। কিছুদিন থেকে হাম্বার্গে ফিরে যাই এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করি। ১৯০২ সালে পুনরায় আমেরিকায় আসি এবং Kuhn, Loeb & Co-এর শেয়ারহোল্ডার হই।

এই হলো আমার পুরো ব্যাংকিং শিক্ষাজীবনের ইতিহাস। ১৮৯৫ সালে Solomon Loeb-এর কন্যা Nina Loeb-কে বিয়ে করে তাদের সাথে পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হই। এর মাধ্যমে আমি তাদের পরিবারিক প্রতিষ্ঠান Kuhn, Loeb & Co.-এর শেয়ারহোল্ডার হই।'

Mr. Loeb-এর অপর কন্যাকে বিয়ে করেন Jacob H. Schiff। এটা ইহুদিদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য যে, ব্যবসায় জোট মজুত করতে তারা পারিবারিক সম্পর্ককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এরপর Mr. Schiff তার কন্যা Frieda Schiff-কে বিয়ে দেন Felix Warburg-এর সাথে, যিনি Paul Warburg-এর আপন ভাই。

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ট্রাস্ট কোম্পানি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল— মানুষের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ নিজেদের নিকট জমা রাখা এবং ওয়ারিশবিধি অনুযায়ী তা উত্তরাধিকারীদের নিকট বণ্টন করা। পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলোও মানুষকে ঋণ দেওয়ার কাজ শুরু করে। কিন্তু ১৯০৬ সালে ট্রাস্ট কোম্পানিগুলো জনগণের আস্থা একেবারে হারিয়ে ফেলে। প্রচুর মানুষ জমাকৃত সম্পদ হারিয়ে পথে বসে। ঘটনা শুরু হয় যখন Knickerbocker Trust Co. তাদের 'রিজার্ভ' হারিয়ে ফেলে। এ থেকে পুরো আমেরিকায় শুরু হয় অর্থনৈতিক বিক্ষোভ।

এই বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে মি. ওয়াবার্গ Defects and Needs of Our Banking System শিরোনামে একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করেন। তিনি আর্টিক্যালটি আরও আগেই লিখেছিলেন, কিন্তু প্রকাশ করেন ১৯০৭ সালে, যখন পুরো আমেরিকায় অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। তিনি জানতেন, ট্রাস্ট কোম্পানিগুলো খুব দ্রুত পথে বসবে। মূলত তারাই এই প্রতিষ্ঠানটির পতন ঘটিয়েছে, পুরো বিষয়টাই ছিল সাজানো নাটক!

তার আর্টিক্যালটি Senator Aldrich-এর চোখে পড়ে। তিনি তখন আমেরিকান সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পেশাদার জীবনে ছিলেন খুবই কর্মঠ। বিশ্বাস করতেন আমেরিকান জাতির উন্নয়নে। তবে তিনি ভাবতেন, এই উন্নয়ন কেবল ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমেই করা সম্ভব। তার সাথে রকেফেলার পরিবারেরও বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। তার মেয়ে Abby Aldrich-কে সেই রকেফেলার পরিবারের সদস্য John D. Rockefeller এর সঙ্গে বিয়ে দেন।

১৯০৬ সালে অর্থনৈতিক সংকট চরমে পৌছালে— Nelson Aldrich-কে এর সমাধান খোঁজার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি পরামর্শের জন্য Mr. Warburg-এর শরণাপন্ন হন। উভয়ে একটি গুপ্ত আলোচনার আয়োজন করেন, যার জন্য জর্জিয়ার নিকটবর্তী নির্জন দ্বীপ জ্যাকল আইল্যান্ডকে (Jekyl Island) বাছাই করা হয়। দ্বীপটি ছিল সম্পদশালী ইহুদিদের অবসর সময় কাটানোর জায়গা। এই গুপ্ত আলোচনার বিষয়বস্তু কী ছিল, তা আজ অবধি জানা সম্ভব হয়নি। ১৯১৬ সালে Forbes Magazine-এর লেখক B.C. Forbes এই গুপ্ত আলোচনাটি নিয়ে একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করেন, যার অংশবিশেষ নিচে উপস্থাপন করা হলো—

'কল্পনা করুন আমেরিকার প্রতাপশালী ব্যাংকারদের কথা, যারা বিশ্বস্ত কিছু সহকর্মীকে সাথে নিয়ে রাতের অন্ধকারে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ট্রেনে করে নিউইয়র্ক থেকে ১০০ মাইল দক্ষিণে কোনো একটি স্থানে নেমে যায় এবং সেখান থেকে এক সপ্তাহের জন্য একটি রহস্যেঘেরা দ্বীপে গমন করে। প্রথমবার মিলিত হয়ে তারা কেবল একবারের জন্য নিজেদের পরিচয় বিনিময় করেছে। পাছে ভয় হয়, যদি সাথে থাকা চাকরগুলো সবার পরিচয় জেনে যায়!

সবাই শপথ করে, জ্যাকল আইল্যান্ডে তাদের মাঝে যে আলোচনা হবে, তার উচ্ছিষ্ট অংশটুকু পর্যন্ত সাধারণ মানুষ জানতে পারবে না। Nelson Aldrich-এর নির্দেশে সবাই আলাদা আলাদা গাড়িতে উঠে যায়। তাদের জন্য আগে থেকেই গাড়ির ব্যবস্থা করা ছিল। গাড়িগুলো এমন একটি নির্জন প্লাটফর্মে রাখা হয়েছিল, যেন সাধারণ মানুষ বুঝতে না পারে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তারা সাউদার্ন কান্ট্রিতে হাজির হয়। অন্ধকার থাকাতে সেই দৃশ্য নিউইয়র্কের কোনো সাংবাদিকের চোখে পড়েনি।

গাড়ি থেকে বের হয়ে তারা ছোটো ছোটো কিছু নৌকায় উঠে পড়ে। তাদের আচরণ এমন ছিল, যেন নৌকার মাঝিরা পর্যন্ত বুঝতে না পারে— তারা আমেরিকার বিশিষ্ট ব্যক্তিভাজন!

সঠিক সময়ে তারা জ্যাকল আইল্যান্ডে এসে পৌঁছায়। দ্বীপটি ছিল জনশূন্য, সেখানে অর্ধডজন চাকর-বাকর ছাড়া আর কেউ-ই ছিল না। একে অপরকে জিজ্ঞেস করে, কীভাবে চাকরদের কাছ হতে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখা সম্ভব? একজন বলল— "চলুন, আমরা সবাই আমাদের নামের প্রথম শব্দটি দ্বারা একে অপরকে সম্বোধন করি।" সবাই এতে রাজি হলো।

ফলে আমেরিকার অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সৈনিকের নাম হয়ে যায় Nelson; আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার গুরু এবং Kuhn, Loeb & Co.-এর অন্যতম শেয়ার হোল্ডারের নাম হয়ে যায় Paul।

Nelson গোপনীয়তা রক্ষা করতে Harry, Frank, Paul ও Piatt-কে বলেন, যতদিন না তারা এমন একটি নকশা তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে— যা দ্বারা পুরো আমেরিকাকে একত্রিত করা সম্ভব— ততদিন এই দ্বীপে অবস্থান করবে। তিনি এমন একটি অর্থ ব্যবস্থার কথা জানতে চান, যা শুধু আমেরিকায় নয়; পুরো ইউরোপে গ্রহণ যোগ্যতা পাবে।'

সাত দিনে এই আলোচনা অনেক দূর গড়ায়। তবে যেসব বিষয়ের ওপর আলোচনা ও চুক্তি হয়, তার কোনো কিছুই আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গুপ্ত আলোচনায় বিশেষ চারটি পরিবারের সদস্যগণ ছাড়া আরও যারা উপস্থিত ছিলেন, তারা হলেন: Bernard Baruch, Eugene Meyer, Felix Frankfurter, Benjamin Strong, Julius Rosenwald, Henry Davison, Arthur Shelton ও Frank Vanderlip।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর E.R.A. Seligman নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর ১৯১৯ সালে একটি কলাম প্রকাশ করেন। নিচে এর অংশবিশেষ উপস্থাপন করা হলো—

'আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠনে Mr. Warburg-এর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। শুরুতে যদিও তার পরিকল্পনা কিছুটা দৃষ্টিকটু ছিল, তারপরও সময়ের সাথে সাথে তা আমেরিকার অর্থনীতির মূল গঠনতন্ত্রে পরিণত হয়। খুব দ্রুত তা প্রতিটি প্রদেশের ভিন্ন ভিন্ন অর্থব্যবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এর দরুন দীর্ঘকালীন অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও বাণিজ্যিক জটিলতা থেকে আমেরিকার মানুষ মুক্তি পায়।

১৮৪০ সালে Mr. Samuel Jones কর্তৃক উপস্থাপিত Peel's Bank Act-এর কল্যাণে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড যেমন নোট ইস্যুর অনুমতি পায়, তেমনি Mr. Warburg কর্তৃক উপস্থাপিত Federal Reserve Act আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নোট ইস্যুর অনুমতি প্রদান করে।

Senator Aldrich চেয়েছিলেন— ১২টি আঞ্চলিক শাখা অফিস নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠিত হবে এবং তা সরকারি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে, কিন্তু Warburg চেয়েছেন— ব্যাংকটি সম্পূর্ণ বেসরকারি মালিকানায় পরিচালিত হবে। তিনি বলেন— "সরকারি বা রাজনৈতিক থাবার ভেতর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কখনো প্রত্যাশিত ফলাফল উপহার দিতে পারে না। তাই এই ব্যাংক পরিচালনায় যে দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে, তা সরকারি আজ্ঞার বাহিরে থাকবে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদের বিনিময়ে ব্যাংক তার সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।" যেহেতু Aldrich-এর নিকট অপেক্ষাকৃত ভালো কোনো পরিকল্পনা ছিল না, তাই তিনি উপস্থাপিত দাবি দুটি মেনে নেন।

এটাই হয়তো শেষ প্রজন্ম, যারা বার্টার ট্রেডকে শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছে। এরপর এই সংস্কৃতি বাজার থেকে হারিয়ে যাবে। এর স্থলাভিষিক্ত হবে কাগজি নোটভিত্তিক বিনিময়ব্যবস্থা।' (pp. 387-390, Vol. 4, No. 4, Proceedings of the Academy of Political Science, Columbia University)

এটাই প্রথম ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়; ইউরোপে এমন আরও অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক আছে, যেগুলো ইহুদিদের ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। এ নিয়ে Mr. Warburg একটি প্রবন্ধ লিখেন— American and European Banking Methods and Bank Legislation Compared। সেখানে উল্লেখ করেন—

'শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও ইউরোপের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে রাষ্ট্র বা সরকারের কোনো শেয়ার নেই। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তো পুরোটাই ব্যক্তি মালিকানাধীন। ফ্রান্স ও জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটিতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন সামান্য অধিকার চর্চার সুযোগ পেলেও এর পুরো লভ্যাংশ বণ্টিত হয় ব্যক্তি মালিকদের মাঝেই।'

সেখানে তিনি বেশ কিছু ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাধারণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে, তা Federal Reserve Act-এ অন্তর্ভুক্তির জন্য জোর দাবি তোলেন। বৈশিষ্ট্যগুলো পয়েন্ট আকারে দেখানো হলো—
• কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না।
• রাষ্ট্রীয় নোট ছাপানোর অধিকার কেবল তাদের হাতেই থাকবে।
• জাতীয় সম্পদ (স্বর্ণ-রৌপ্য) সংরক্ষণের অধিকার থাকবে।
• অর্থ বাজারের পরিচালনায় সরকার-প্রশাসন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করবে。

বলে রাখা ভালো, ১৮৩৩ হতে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত আমেরিকার ইতিহাসে কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছিল না। ১০ জুলাই, ১৮৩২ প্রেসিডেন্ট Andrew Jackson একটি দীর্ঘ বক্তৃতা প্রদান করেন। তিনি বলেন—

'সাধারণ মানুষ যদি ব্যাংকিং ও অর্থ ব্যবস্থার কারচুপি সামান্য হলেও বুঝতে পারত, তাহলে পরদিন ভোরেই মহাবিপ্লবের জন্ম হতো। ব্যাংক নামক বিষধর সাপটি যতই বিষাক্ত হোক না কেন, মহান ঈশ্বরকে সাথে নিয়ে আমি তার বিষদাঁত তুলে ছাড়ব। আমি জানি, তারা আমাকে দংশনের অপেক্ষায় ওত পেতে আছে, কিন্তু আমিই তাদের দংশন করব।'

১০ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক অব আমেরিকাকে বন্ধ ঘোষণা করেন। ব্যাংকটির আরও একটি নাম ছিল 'ফার্স্ট ব্যাংক অব আমেরিকা'। এরপর দীর্ঘ ৮০ বছর আমেরিকায় কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছিল না; তবে ইহুদিদের পরিকল্পনার অন্ত ছিল না。

আশা করি, Mr. Taft-এর কথা আপনাদের মনে আছে। তিনি শুধু রাশিয়ানদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাই নয়; অবান্তর কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠারও অনুমোদন দেননি। তাই পরবর্তী নির্বাচনকাল পর্যন্ত ইহুদিদের অপেক্ষা করতে হয়। ১৯১২ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে লড়াই করেন Roosevelt, Taft ও Wilson। যেহেতু এক ঝুড়িতে তারা সব ডিম রাখে না, তাই সকল প্রার্থীর পেছনেই তারা বিনিয়োগ করে। Wilson সাহেবের পেছনে বিনিয়োগ করে Schiff; Taft সাহেবের পেছনে Felix Warburg; Roosevelt-এর পেছনে Mr. Kahn। সবশেষে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন Woodrow Wilson।

ক্ষমতায় এসে Wilson সরকার ইহুদিদের বিনিয়োগ ও প্রচারণা কাজের পুরস্কারস্বরূপ ফেডারেল রিজার্ভ অ্যাক্টকে অনুমোদন করে এবং উত্থাপিত সকল শর্ত মঞ্জুর করে। ব্যাংকটি যেহেতু ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হবে, তাই এর প্রারম্ভিক রিজার্ভ যে শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগকৃত সম্পদেই গঠিত হবে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এই রিজার্ভ কী দিয়ে তৈরি হবে? এ সম্পর্কে সিনেটের একটি আলোচনায় Pomerene ও Bristow যৌথভাবে Mr. Warburg-কে প্রশ্ন করেন।

প্রশ্ন: 'ফেডারেল ব্যাংকের রিজার্ভ কী দিয়ে তৈরি হবে?'
উত্তর: 'এই ব্যাংকের রিজার্ভ স্বর্ণ-রৌপ্য দ্বারা তৈরি হবে।'

কিন্তু যে স্বর্ণ-রৌপ্যের কথা এখানে বলা হয়েছে, তা তো ইউরোপের বিভিন্ন ব্যাংকগুলোতে পড়ে আছে। সেখান থেকে সেগুলোকে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে আসতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন একটি যুদ্ধ। কয়েক মাস পর ১ আগস্ট, ১৯১৪। Senator Owen ঘোষণা করেন— 'আমরা একটি বড়ো ইউরোপিয়ান যুদ্ধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি'। বহিঃরাষ্ট্রের সম্পদ গ্রাসের নিমিত্তে এটা ছিল প্রথম যুদ্ধের ইঙ্গিত।

শুরুতে তিনি চেয়েছিলেন— ব্যাংকটির একটিমাত্র অফিস থাকবে এবং তা নিউইয়র্কে। প্রফেসর Seligman তাকে পরামর্শ দেন— 'নিউইয়র্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাধারণ জনগণ এমনিতেই ক্ষেপে আছে। তার ওপর এখানে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা পায়, তবে তা রাজনৈতিক জনরোষে রূপ নিতে পারে। এমতাবস্থায় ব্যাংকটির শাখা বৃদ্ধি করা উচিত।' তার পরামর্শ অনুযায়ী ব্যাংকটিকে ২টি, ৪টি ও ৮টি করে মোট ১২টি শাখায় বৃদ্ধি করা হয়।

সিনেট সদস্যদের আলোচনায় তিনি বলেন— 'ব্যাংকটির এতগুলো শাখা থাকায় ব্যবস্থাপনা কাজ জটিল হয়ে পড়বে। তাই এর একটি ব্যবস্থাপনা পর্ষদ থাকা উচিত, যা নিউইয়র্কে স্থাপিত হবে এবং সেখান থেকেই সকল শাখা পরিচালিত হবে।' Nelson Aldrich পুরো দেশকে একই অর্থ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার প্রস্তাব করেন, যেন সর্বত্র সুদের হার সমান হয়। কিন্তু Mr. Warburg বলেন— 'অবস্থান ও প্রয়োজনের আলোকে ব্যাংকের প্রতিটি শাখা পৃথক পৃথক সুদ-কাঠামো অনুসরণ করতে পারে।'

এ কারণে দেখা যায়— থিয়েটার, সিনেমা হল ও সংগীত বিপণি তৈরিতে প্রডিউসাররা স্বল্প সুদে ঋণ পেলেও কৃষক-রাখালদের উচ্চসুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। যেখানে সমাজের সংখ্যালঘু একটি দল অর্থের পাহাড় বানিয়েই যাচ্ছে, সেখানে জনসংখ্যার বৃহৎ একটি অংশ নিজেদের সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসছে। ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখবেন, কেবল উৎপাদনমুখী খাতগুলোর ওপর উচ্চ সুদের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর যেগুলো অনুৎপাদনশীল এবং নোংরা সংস্কৃতির জন্ম দেয়, সেগুলোতেই সুদের হার নগণ্য। কেন এই বৈষম্য? এই বৈষম্যের পেছনে কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে? আশা করি, Protocol of the Learned Elder Zion-এর একটি ধারা আপনাদের মনে আছে— 'জ্যান্টাইলদের ভূমিশূন্য করতে হবে; নতুবা তাদের ওপর চির দারিদ্র্যতা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।'

আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নিয়ে ইহুদিদের পরিকল্পনা

'ইহুদিরা ব্যাংকিংশিল্পে খুবই দক্ষ। তাদের মতো আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং জোট গোটা পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। এই জোট এতটা ভয়ংকর যে, ইহুদিরা একদিন গোটা বিশ্ব অর্থনীতির লাগাম টেনে ধরবে।'— Arthur Brisbane

ইহুদিদের সবচেয়ে বড়ো শক্তি হলো আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে তারা পুরো পৃথিবীর অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। বর্তমানে তাদের পুরো ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু জার্মানির ফ্রাঙ্কফুটে অবস্থিত, তবে তা খুব দ্রুতই অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। যে স্বর্ণ (Gold) ইহুদিদের কাছে ঈশ্বরের সমতুল্য, যাকে তারা God of the living বলে সংজ্ঞায়িত করে থাকে, আজ তারা সেই স্বর্ণ জাহাজে বোঝাই করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমেরিকায় নিয়ে আসছে। ইহুদিরা এটা ভেবে খুব ভীত যে, ইউরোপে হয়তো খুব দ্রুতই আরও একটি ভয়ংকর রক্তাক্ত যুদ্ধ সংগঠিত হবে। তাই সময় থাকতে ইহুদিরা অন্যত্র সরে পড়তে শুরু করেছে এবং নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আমেরিকাকে বেছে নিয়েছে।

প্রতিটি দেশেই ইহুদিদের একটি করে ব্যাংক থাকতেই হবে, এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এর বিপরীতে ইহুদিরা এমন একটি প্রক্রিয়া চালু করবে, যার মাধ্যমে পুরো পৃথিবীকে একটি মাত্র কেন্দ্রবিন্দু থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। সেই প্রক্রিয়ার নাম হবে— 'World Banking Chain' ।

যদি আপনি Warburg, Furstenbergs, Sonnenscheins, Sassoons, Samuels ও Belichroeders-এর মতো ইহুদিদের জীবন ইতিহাস ভালো করে অধ্যয়ন করেন, তবে এই বিষয়টি পরিষ্কার বুঝতে পারবেন। যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ে অর্থ জালিয়াতি নিয়ে তাদের আধিপত্যের কোনো কমতি ছিল না। এ সকল কর্মকাণ্ড নিয়ে এই মস্তিষ্ক বিকৃত পাগলদের আবার গর্বেরও কোনো শেষ নেই। তারা বলে— 'আমাদের শক্তি-সামর্থ্যের পরিধি কতটা ব্যাপক, আশা করি তা আজ পুরো পৃথিবী উপলব্ধি করতে পেরেছে। তারা এটাও বুঝতে সক্ষম হয়েছে, আমাদের বাদ দিয়ে কখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।'

Protocols of the Learned Elder Zion-এর ষষ্ঠ তম প্রটোকলে বলা আছে— 'খুব দ্রুতই আমরা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করব। সেখান থেকে তৈরি করব বিশাল সম্পদের আধার। জ্যান্টাইলদের প্রতিটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মূল ভিত্তি হবে আমাদের অর্থ-সম্পদ। প্রতিটি রাষ্ট্র ও তার রাজনৈতিক দলগুলোকে আমরা ঋণের বেড়াজালে বেঁধে ফেলব। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো পতনের সাথে সাথে পুরো ঋণের বোঝা দেশের সাধারণ জনগণের কাঁধে গিয়ে পড়বে, সেখান থেকে নেমে আসবে এক ভয়ংকর অর্থনৈতিক বিপর্যয়।'

একই প্রটোকলের অপর একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— 'একই সময়ে ব্যবসায়-বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণে আমরা জ্যান্টাইলদের আগ্রহী করে তুলব। তবে সবকিছুর পেছনে থাকবে আমাদের ফটকা পরিকল্পনা, যেন তারা ইচ্ছেমতো উৎপাদন করতে না পারে। আমরা তাদের ঋণের পৃথক পৃথক খাত এবং ফসল উৎপাদনের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেবো। ফলে তারা চাইলেও অধিক উৎপাদন করতে পারবে না এবং ঋণের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না...। এভাবে একটা সময় তাদের ভূমিগুলো আমাদের মালিকানায় চলে আসবে। সমাজে ক্ষুধা-দরিদ্রতা ছড়িয়ে দিতে জ্যান্টাইলদের অপ্রয়োজনীয় বিলাসবহুল জীবনব্যবস্থায় উৎসাহী করে তুলব, যা তাদের মস্তিষ্ক থেকে বুদ্ধিবৃত্তি নামক বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে মুছে দেবে। আমরা শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে উৎসাহিত করব, কিন্তু এতে শ্রমিকদের ন্যূনতম কোনো উপকার হবে না। কারণ, একই সময়ে আমরা বাজারে পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দেবো এবং বলব— এ বছর ফসল কম উৎপাদন হয়েছে। আমরা উৎপাদনমুখী কৃষকদের দক্ষতা ধ্বংস করার জন্য তাদের অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন শিল্প কার্যক্রমের প্রতি উৎসাহিত করব এবং অ্যালকোহলের প্রতি নেশাগ্রস্ত করে রাখব।'

২০ নম্বর প্রটোকলে বলা হয়েছে— 'আজ তোমাদের এমন এক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথা বলতে যাচ্ছি, যা প্রতারণা ছাড়া অন্য কিছু নয়, আর এটাই আমরা জ্যান্টাইলদের ওপর চাপিয়ে দেবো। তোমরা সবাই জানো, স্বর্ণ-রৌপ্যই পৃথিবীর প্রকৃত অর্থ, যা হাজার হাজার বছর পৃথিবীর বিভিন্ন রাজ্যে একমাত্র বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। যখনই কেউ এই অর্থব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কিছু করার চেষ্টা করেছে, ধীরে ধীরে তাদের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা বাজার হতে স্বর্ণ-রৌপ্য সরিয়ে দিয়ে মানুষের হাতে নকল অর্থ ধরিয়ে দেবো।'

'প্রতিটি ঋণ একজন সরকারের অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে, যা রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে ধ্বংসের জন্য যথেষ্ঠ। এমতাবস্থায় সরকার জাতীয় দায় থেকে বেরিয়ে আসতে জনগণের ওপর একের পর এক করের বোঝা চাপিয়ে দিতে শুরু করবে। বৈদেশিক ঋণ হলো রক্তচোষা জোঁকের মতো। এটা একবার যদি কোনো রাষ্ট্রের ওপর আঁকড়ে বসে, তবে সমস্ত রক্ত খেয়ে তবেই ছাড়বে। তারপরও জ্যান্টাইল রাষ্ট্রগুলো বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করবে এবং একে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র উপায় বলে বিবেচনা করবে।'

২০ নম্বর প্রটোকলে আরও বলা আছে— 'বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের পরবর্তী প্রভাব কী? বন্ডের বিনিময়ে ঋণ গ্রহণ করলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর তা সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে। যদি পাঁচ শতাংশ সুদের বিনিময়ে কোনো রাষ্ট্র ঋণ নেয়, তবে বিশ বছরে সুদের পরিমাণ হবে আসল অর্থের সমান; চল্লিশ বছরে হবে আসল অঙ্কের দ্বিগুণ, আর ৬০ বছরে হবে তিনগুণ! ফলে ক্রমবর্ধমান সুদের দায় থেকে কোনোদিনই বেরিয়ে আসতে পারবে না।'

আফসোসের বিষয় হলো— অধিকাংশ মানুষ এই নিগুঢ় সত্যগুলো একেবারেই জানে না। প্রতিবছর এত এত কর পরিশোধের পরও জাতীয় দায় থেকে আমরা মুক্তি পাই না। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত ডলার ছাপানো হয়েছে, তার সব যদি ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তারপরও পুরো পৃথিবীর দায় মেটানো সম্ভব নয়।

Protocols of the Learned Elder Zion মূলত রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যকে উপড়ে ফেলার জন্য তৈরি করা হয়। কিন্তু তাদের এই নীলনকশা কেবল রাশিয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকেনি; ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পৃথিবীতে। করব্যবস্থাকে (Tax) কেন্দ্র করে ইহুদিদের যে পরিকল্পনা, তা সংক্ষেপে নিচে উপস্থাপন করা হলো:

১. 'শাসকশ্রেণিতে পরিণত হওয়ার পর আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে সাধারণ জনগণের ওপর আমরা করের বোঝা চাপিয়ে দেবো। এতে সীমিত আয়ের মানুষ প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তুলতে পারবে না। আর এই কাজটা আমাদের করতে হবে না; বরং প্রতিটি দেশের সরকারই নিজ দায়িত্বে এই কাজ করে দেবে। রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও প্রশাসনিক খরচ বহনের নামে তারা নিয়মিত জনগণের থেকে কর আদায় করবে, যার দরুন সাধারণ মানুষ চিরকাল গরিব থেকে যাবে।

২. বিভিন্ন উপায়ে কর আরোপ করা যেতে পারে। যেমন: ক. Progressive Tax : এ প্রক্রিয়ায় আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে করের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। খ. পৈতৃক সম্পদের ওপর কর : পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সম্পদ ব্যবহার করে কেউ যদি উপার্জন করে, তবে তার ওপর কর আরোপ করা হবে। যেমন: মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে বাড়ির মালিকগণ বাসা ভাড়ার ওপর কর প্রদান করবে। গ. মালিকানাস্বত্ব হস্তান্তরের ওপর কর : সম্পদ হস্তান্তরের সময় খরচ (Fee) প্রদান করতে হবে। ঘ. Luxury Tax : সৌখিন পণ্যসামগ্রী ক্রয়ের সময় শুল্ক প্রদান করতে হবে। যেমন: গাড়ি, বিমান, জাহাজ ইত্যাদি।'

আপনাদের প্রশ্ন জাগতে পারে, এত সব তথ্য আমরা কেন জানি না? কেন আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্থব্যবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তিকর সব বিষয় শেখানো হচ্ছে? এ প্রসঙ্গে Elder Zion-এর ৮ নম্বর প্রটোকল দিয়ে এই অধ্যায়টি শেষ করছি— 'আমরা বিশ্বজুড়ে একগাদা অর্থনীতিবিদের জন্ম দেবো, যারা পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে সরকার প্রধানের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবে। অর্থবিজ্ঞান আমাদের প্রধানতম অস্ত্র।'

আদর্শ অর্থের বৈশিষ্ট্য

মানুষ আমৃত্যু যে জিনিসটির পেছনে অধিকাংশ সময় ব্যয় করে তা হলো— অর্থ। অর্থ থেকে জন্ম নেয় অর্থনীতি। কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়, অর্থের সংজ্ঞা কী? দেখা যাবে অনেকে এর সঠিক উত্তর দিতে পারছে না। ডলার, টাকা, রুপি, রিয়াল ইত্যাদি বহুকাল আমাদের চোখে অর্থ বলে পরিচিত হয়ে আসছে; যদিও এগুলো হলো 'কারেন্সি', যা তৈরি হয় বাতাস থেকে। আমাদের অবচেতন মন 'অর্থ ও কারেন্সি' বিষয় দুটি এক করে ফেলেছে, কিন্তু তা এক নয়। এমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, যা দ্বারা বিষয় দুটির মাঝে পার্থক্য গড়ে তোলা সম্ভব। ইতিহাস অধ্যয়ন করলে তিন ধরনের উপকরণ পাওয়া যাবে, যেগুলো বিভিন্ন যুগে অর্থ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যথা: স্বর্ণ-রৌপ্য, কাগজি নোট এবং ভোগ্য পণ্য।

তিনি বইটিতে আদর্শ অর্থের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করেছেন:

১. গ্রহণযোগ্য বিনিময় মাধ্যম: বিনিময় মাধ্যম বলতে একটি তৃতীয় মাধ্যমকে বোঝানো হয়, যা দ্বারা ক্রেতা-বিক্রেতারা তাদের লেনদেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারে। একসময় মানুষ বার্টার ট্রেড পদ্ধতিতে পণ্যের বিপরীতে পণ্য বিনিময় করত, যেমন: দুধের বিপরীতে ডিম, আটার বিপরীতে চাল ইত্যাদি। সেখানে তৃতীয় কোনো মাধ্যম ছিল না। এরপর এক যুগ আসে যখন মানুষ স্বর্ণ-রৌপ্য ও মূল্যবান ধাতব পদার্থকে তৃতীয় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা ব্যবহার করছি কাগজি নোট ও মুদ্রা। এভাবে গড়ে উঠে গ্রহণযোগ্য বিনিময় মাধ্যম এবং অবসান ঘটে বার্টার ট্রেড পদ্ধতির।

২. মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা: বার্টার ট্রেডের একটি বড়ো সমস্যা হলো মূল্য নির্ধারণে অপারগতা। এ কারণে সে যুগের বাণিজ্য একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর আসে স্বর্ণ-রৌপ্য ভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় স্বর্ণ-রৌপ্যকে ওজনের মানদণ্ডে হিসাব করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হতো। তবে প্রতিবারের লেনদেনে স্বর্ণ-রৌপ্য ওজন করা ছিল এক বিরক্তিকর বিষয়। তাই খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দে লিডিয়ার রাজা আলিয়াত (Alyatte) প্রথমবারের মতো ধাতব কয়েন (Coin) তৈরি করেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ, রৌপ্য এবং আরও কিছু ধাতব পদার্থের সংমিশ্রণে তৈরি হতো সে মুদ্রা। বলা হয় এ মুদ্রাই ছিল ইতিহাসে প্রথম জন্ম নেওয়া অর্থ (Money)। বর্তমানে আমরা বিনিময় মাধ্যম হিসেবে কাগজি নোট ব্যবহার করছি। এগুলো দিয়েও পণ্যের মূল্য সহজে নির্ধারণ করা সম্ভব।

৩. হিসাবের একক: হিসাবের একক দ্বারা পরিমাপককে বোঝানো হয়। যেমন: দূরত্ব পরিমাপের একক মিটার, কিলোমিটার, ইঞ্চি বা মাইল। ওজন পরিমাপের একক আউন্স, গ্রাম বা কিলোগ্রাম। পৃথিবীর সর্বত্র এই পরিমাপকগুলো সর্বজনীন স্বীকৃত। কিন্তু টাকা, ডলার, রুপির ক্ষেত্রে সর্বজনীন স্বীকৃত কোনো পরিমাপক নেই। যেমন: এক টাকা বা এক রুপি কখনো এক ডলারের সমান হতে পারে না। কারণ, এগুলোর মূল্য সর্বদা পরিবর্তনশীল। তবে স্বর্ণ-রৌপ্য পরিমাপে এ জাতীয় কোনো সমস্যা হয় না। কারণ, ১০০ গ্রাম স্বর্ণ বা রৌপ্যের ওজন পৃথিবীর সর্বত্রই সমান। ভোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমন। যেমন: এক কেজি আটার ওজন পৃথিবীর সব স্থানে একই হবে। এ ক্ষেত্রে ভোগ্য পণ্যকেও অর্থের সংজ্ঞা নির্ধারণে বিবেচনা করা যেতে পারে।

৪. বিভাজনযোগ্য (খুচরা যোগ্যতা): ১,০০০ টাকার একটি নোটকে ৫০০, ২০০, ১০০, ৫০ ইত্যাদি আকারে খুচরা করা সম্ভব। একইভাবে এক কেজি স্বর্ণ বা রৌপ্যকে ৫০০, ১০০, ৫০ বা ২০ গ্রামে বিভক্ত করা সম্ভব। ভোগ্য পণ্যের বেলাও ওজন দ্বারা বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা সম্ভব। বিভাজনযোগ্যতার বড়ো সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে পণ্যের মূল্য সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব। এটি লেনদেন ও বিনিময় কাজে দারুণ গতীশীলতা নিয়ে আসে।

৫. মূল্যের স্থিতিশীলতা: এটি দ্বারা বোঝানো হয় অর্থের ক্রয় ক্ষমতা সহজে পরিবর্তিত হবে না। উদাহরণস্বরূপ: আপনি ৪০ হাজার টাকা দিয়ে আজ যে পরিমাণ চাল ক্রয় করতে পারছেন, আগামী ১০ বছর পর সে পরিমাণ চাল আর ক্রয় করতে পারবেন না। কারণ, নিয়মিত মুদ্রাস্ফীতির দরুন বাজারের প্রতিটি মুদ্রা হারাচ্ছে তাদের ক্রয়ক্ষমতা। আধুনিক অর্থব্যবস্থায় পৃথিবীর প্রতিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর এবং বিশেষ সব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে বড়ো পরিমাণে নতুন নোট ইস্যু করে থাকে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় Quantitative Easing (QE)। এটি বাজারে নতুন মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি করে চলমান মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও পণ্যমূল্য স্থিতিশীল বা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। অপরদিকে, স্বর্ণ-রৌপ্য যেহেতু চাইলেই উৎপাদন করা যায় না, সেহেতু এ বাজারে স্বর্ণস্ফীতি বা রৌপ্যস্ফীতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তা ছাড়া বিভিন্ন খনি থেকে প্রতি বছর নতুন যে পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য অর্থবাজারে যুক্ত হয়, তার পরিমাণ এতটাই নগণ্য যে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড়ো রকমের কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। বলে রাখা উচিত বর্তমান বাজারে স্বর্ণ-রৌপ্য মূল্যের প্রতিনিয়ত যে উঠানামা, এর মূল কারণ তাদের কাগজি নোটের বিপরীতে মূল্যায়িত করা হচ্ছে। যেহেতু কাগজি নোটগুলো প্রতিনিয়ত তাদের ক্রয় ক্ষমতা হারাচ্ছে, সেহেতু ভোগ্যপণ্যের ন্যায় স্বর্ণ-রৌপ্যের মূল্যও উঠানামা করছে। পচনশীল বৈশিষ্ট্যের দরুন অধিকাংশ ভোগ্যপণ্যকে দীর্ঘকাল সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু পণ্য আছে যাদের তুলনামূলক বেশি দিন সংরক্ষণ করা সম্ভব। যেমন: লবণ, চিনি, মধু ইত্যাদি। এ কারণে রোমান ও তুর্কি সাম্রাজ্যের সামরিক বাহিনীতে প্রতি মাসের বেতনের সাথে কিছু পরিমাণ ভোগ্যপণ্যও প্রদান করা হতো, যা রেশন নামে পরিচিত; বিষয়টি আজও অনেক রাষ্ট্রে চলমান।

৬. স্থিতিশীল বিনিময় হার: বিনিময় হারের উঠানামা মুদ্রা বাজারের একটি নিয়মিত চিত্র। বিনিময় হারের এই উঠানামা কতটা হুমকিস্বরূপ, তা ব্যবসায়ী সম্প্রদায় খুব ভালো করে জানে। ১৯৭১ সালে ব্রেটন উডস চুক্তিনামা রহিত হলে বিনিময় হার নির্ধারণের স্থিতিশীল প্রক্রিয়া একেবারে ভেঙে পড়ে। কিন্তু স্বর্ণ-রৌপ্যভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় এমনটা ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই। লিডিয়ার পর গ্রিক, রোমান, জেরুজালেমসহ আরও অনেক অঞ্চলে ধাতব মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। সে সকল মুদ্রায় স্বর্ণ ও রৌপ্যের পরিমাণ নির্দিষ্ট থাকত বলে তাদের বিনিময় নির্ধারণে কোনো জটিলতা হতো না। যেমন ধরুন, গ্রিকরা তাদের ধাতব মুদ্রায় ব্যবহার করছে ৫০% স্বর্ণ এবং রোমানরা সেখানে ব্যবহার করছে ৭৫% স্বর্ণ। এমতাবস্থায় ৩টি গ্রিক মুদ্রার সমান হবে ২টি রোমান মুদ্রা। বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ছিল বলে আজকের মতো অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থা না থাকলেও সে যুগের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্বময় পরিব্যাপ্তি লাভ করেছিল।

৭. নিজস্ব উপযোগ: যেকোনো ভোগ্য পণ্যের প্রধান উপযোগ হলো ক্ষুধা মেটানোর ক্ষমতা। এমন নয় যে এই উপযোগিতা কৃত্রিম বা সরকারি অধ্যাদেশে তৈরি হয়েছে। কিন্তু কাগজি নোটভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থায় প্রতিটি মুদ্রার উপযোগ সরকারি অধ্যাদেশে তৈরি হয়। যতদিন এগুলো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধীনে থাকবে, ততদিন কাগজি নোটগুলোর জীবন থাকবে। মনে করুন, আপনার অ্যাকাউন্টে পাঁচ লাখ রুপি আছে। কিছুদিন পর চীন এসে ভারত দখল করল এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে রুপিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। যদি না নতুন সরকার পুরাতন রুপিগুলোকে নতুন ইস্যু করা মুদ্রার সাথে পালটে নেওয়ার সুযোগ দেয়, তবে সে রুপির আর কোনো মূল্য থাকবে না। যেমন: সাদ্দাম সরকার পতনের পর সেখানে নতুন দিনারের নোট প্রিন্ট করা শুরু হয়। ফলে পূর্বের বিপুল পরিমাণ ইরাকি দিনারের আর কোনো মূল্য ছিল না। সাধারণ মানুষ কিছু পরিমাণ পুরোনো নোট ব্যাংকে গিয়ে পালটে আনার সুযোগ পেলেও বড়ো একটি অংশ রাস্তায় ফেলে দেয়। আরেকটি উদাহরণ হলো, মোদি সরকার যখন ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট মাসখানেকের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে, তখন নোট দুটিও সাময়িক সময়ের জন্য তাদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কেউ আধিপত্য বিস্তার করুক বা সরকারি অধ্যাদেশে যে পরিবর্তনই আসুক না কেন, স্বর্ণ-রৌপ্য এবং ভোগ্যপণ্যের উপযোগিতায় কোনো পরিবর্তন আসবে না।

৮. সহজ পরিবহনযোগ্যতা: কাগজি নোট বা স্বর্ণ-রৌপ্যকে আপনি চাইলে এক স্থান থেকে অন্যত্র বহন করতে পারেন। যেহেতু স্বর্ণ-রৌপ্য কাগজি নোটের চেয়ে অধিক মূল্য ধরে রাখতে পারে, সেহেতু স্বর্ণ-রৌপ্যই বেশি কার্যকর। তবে ইলেক্ট্রনিক কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে আজ অনেকেই কাগজি নোট পরিবহনের ঝামেলা কাটিয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতি স্বর্ণ-রৌপ্যভিত্তিক অর্থব্যবস্থায়ও প্রয়োগ করা সম্ভব।

এই হলো আদর্শ অর্থের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য। এখানে অর্থ হিসেবে তিনটি উপকরণকে বিবেচনায় আনা হয়েছে: স্বর্ণ-রৌপ্য, কাগজি নোট ও ভোগ্যপণ্য। লক্ষ করুন, এমন কোন উপকরণটি আছে, যার মধ্যে আদর্শ অর্থের সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান? অবশ্যই তা স্বর্ণ-রৌপ্য। ঠিক এ কারণে হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন সম্রাজ্যে এটিই ছিল একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিনিময়ের মাধ্যম। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনালগ্নেও স্বর্ণ-রৌপ্যকে কাগজি নোট ছাপানোর মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের আধিপত্য বিস্তারের গল্প

মাত্র ১০০ বছর আগেও পৃথিবীর বৃহৎ অংশ জুড়ে ছিল স্বর্ণ-রৌপ্য ভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থার ব্যাপক প্রচলন। যেমন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা বিনিময় মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা ব্যবহার করত। তা ছাড়া ১৮৮০-১৯১৪ এবং ১৯৪৬-১৯৭১ সাল পর্যন্ত ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ স্বর্ণ-রৌপ্যকে বাণিজ্যিক কাজে অর্থের মূল্য নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করত। অর্থাৎ প্রতিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে পরিমাণ ধাতব মুদ্রা বা কাগজি নোট ছাপাক না কেন, তার বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য মজুত করত এবং তা দ্বারা আন্তর্জাতিক বিনিময় হার নির্ধারণ করত। যেমন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত ব্রিটেন ও আমেরিকা যথাক্রমে প্রতি ৪.২৫ পাউন্ড এবং ২০.৬৭ ডলার ইস্যুর বিপরীতে মজুত রাখত ১ আউন্স পরিমাণ স্বর্ণ। ফলে ১ পাউন্ড সমপরিমাণ ছিল ৪.৮৬ ডলার। এই পুরো সময়টিকে বলা হতো ক্লাসিকাল গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের (Classical Gold Standard) যুগ। এ সময় মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য।

প্রকৃতির প্রতিটি গঠন উপাদানের যেমন নিজস্ব একটি চক্র রয়েছে, অর্থ ব্যবস্থাও তার ব্যতিক্রম নয়। সেই চক্রের মূল নিয়ামক হলো স্বর্ণ-রৌপ্য। শুনে বিস্মিত হবেন, বতর্মান কাগজি নোটভিত্তিক অর্থব্যবস্থা তার জীবনের শেষ যুগে এসে পৌঁছেছে। খুব দ্রুত শুরু হতে যাচ্ছে ইলেক্ট্রনিক কারেন্সির যুগ। এই চক্র শেষ হলে পুনরায় ফিরে আসবে স্বর্ণ-রৌপ্যের যুগ।

কিছু বিষয় ছোটোকাল থেকে আমাদের মনে গেঁথে আছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের পক্ষে কাজ করে, তাই এটি সরকারি ব্যাংক। এই ব্যাংক নিজ ইচ্ছায় নোট ছাপাতে পারে না। এ জন্য তাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য মজুদ করতে হয় এবং বিশ্বব্যাংক থেকে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু আগের দুটি অধ্যায় উপস্থাপন করা হয়েছে, পৃথিবীতে বহু কেন্দ্রীয় ব্যাংক রয়েছে, যা ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে সরকার বা সাধারণ মানুষের অধিকার চর্চার কোনো সুযোগ নেই।

২৩ ডিসেম্বর ১৯১৩, প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের মন্ত্রিসভা ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমকে (সংক্ষেপে ফেড) আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে অনুমোদন দেয়। সেই সঙ্গে ব্যাংকটিকে ডলার ছাপানো এবং আমেরিকার অর্থনীতি পরিচালনার একচ্ছত্র অধিকারও প্রদান করা হয়। কিছুদিন পর সরকারি অধ্যাদেশে ডলার ব্যতীত অন্য সব বিনিময়মাধ্যম নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু নতুন এই কারেন্সির ওপর আমেরিকার সাধারণ মানুষ বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছিল না। কারণ, মাত্র কয়েক বছর আগে ট্রাস্ট কোম্পানি কেলেঙ্কারির দরুন হাজারো মানুষ তাদের সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছিল। ফলে শুরু থেকেই সবাই ডলারকে এড়িয়ে চলতে লাগল এবং স্বর্ণ-রৌপ্যকে বিনিময় মাধ্যম হিসেবে অধিক প্রাধান্য দিতে থাকল।

বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে, ফেড ডলারের মূল্য ঘোষণা করে— ১ আউন্স স্বর্ণ = ২০ ডলার। অর্থাৎ প্রতি ১ আউন্স স্বর্ণের বিপরীতে ফেড ২০ ডলার ইস্যু করবে। সাধারণ মানুষকে আহ্বান করা হয়, তারা যেন নিজেদের স্বর্ণগুলো ফেডের নিকট জমা রেখে সমপরিমাণ ডলার নিয়ে আসে। ফেড মানুষকে বোঝায়, প্রতিটি ডলার হলো এক-একটি চেক নোট। মানুষ যদি ২০ ডলারের প্রতিটি নোট পুনরায় ফেডকে জমা দেয়, তবে সে তার জমাকৃত সম্পদ ফেরত পাবে। JM 043829043— এ ধরনের যে সংখ্যাটি নোটগুলোর ওপর ছাপানো থাকে, তা দ্বারা বোঝায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই হিসাবটিতে ইস্যুকৃত নোটটির বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ (স্বর্ণ/রৌপ্য) মজুদ করা আছে। চেক নোট (ডলার) ফেরত আসা মাত্রই ব্যাংক গ্রাহককে সে পরিমাণ সম্পদ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে। তা ছাড়া ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংক নোটের দরুন ইতঃপূর্বে আন্তঃপ্রাদেশিক লেনদেনগুলোতে যে জটিলতা তৈরি হতো, তা এখন ডলার ব্যবহারের মাধ্যমে মেটানো সম্ভব হবে। কারণ, এখন থেকে পুরো দেশে একটিমাত্র কারেন্সি ব্যবহৃত হবে। কিন্তু ফেড তার কথা রাখেনি। বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ডলারের বিপরীতে সাধারণ মানুষের যে সম্পদগুলো সে আত্মসাৎ করেছে, তা আর কখনো ফিরিয়ে দেয়নি।

ইতিহাসের অন্যতম এক গোপন আলোচনার মধ্য দিয়ে ফেড প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯১০ সালে জর্জিয়ার উপকূলবর্তী জ্যাকল দ্বীপে এই আলোচনার আয়োজন করা হয়। তবে সেই আলোচনার বিষয়বস্তু কী ছিল এবং উপস্থিত সদস্যরা নিজেদের মধ্যে কী কী চুক্তি করেছিল, তার কোনো তথ্যই আজ পর্যন্ত জনসম্মুখে প্রকাশ পায়নি। The Federal Reserve System: Its Origin and Growth বইয়ের লেখক Paul Warbug হলেন সেই গোপন সম্মেলনে উপস্থিত সদস্যদের একজন। তিনি বইটিতে উল্লেখ করেন— 'আমাদের প্রত্যেক সদস্য এতটাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, আজ পর্যন্ত সে আলোচনার চুক্তিপত্রে লিপিবদ্ধ তথ্যও জনসম্মুখে প্রকাশ পায়নি।' তবে ব্যাংকটির পরবর্তী কার্যক্রম দেখে সাধারণ মানুষ অনুমান করে নিয়েছে, গোপন আলোচনায় নির্ধারিত হয়েছে ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডারদের সংখ্যা, গঠনতন্ত্র ও লভ্যাংশ বণ্টন প্রক্রিয়া।

কী পরিমাণ স্বর্ণের মজুদ নিয়ে ফেড তার প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করে, সে তথ্য জানা সম্ভব না হলেও কিছু কাল্পনিক তথ্যকে পুঁজি করে এগোনো যাক। ধরে যাক, গোপন আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফেডের শেয়ারহোল্ডারগণ সে সময় ২ হাজার টন স্বর্ণ মজুদ করল এবং এর বিপরীতে ১০ বিলিয়ন ডলার প্রিন্ট করল। এখন তা বাজারে সরবরাহ হওয়ার অপেক্ষায় আছে।

১৯১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রশাসনিক ও বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি খরচ মেটাতে প্রেসিডেন্ট উইলসন প্রশাসনের ১০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু তার রাজস্ব ভান্ডারে এত পরিমাণ অর্থ ছিল না। ফলে তিনি ফেডের নিকট এই পরিমাণ ডলারের জন্য আবেদন করলেন। ফেড ব্যক্তি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক হওয়ায় প্রেসিডেন্ট প্রশাসনকে ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে প্রদান করল। ধরুন, তারা প্রেসিডেন্ট প্রশাসনকে ২% সুদে ১০ বছর মেয়াদে ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিলো। তাহলে ১০ বছর পর সুদে-আসলে কী পরিমাণ ডলার পরিশোধ করতে হবে? কম করে হলেও ১২ বিলিয়ন ডলার! সমস্যা হলো তিনি এত ডলার পাবেন কোথায়? বাজারে তো মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলারের অস্তিত্ব আছে। সুদের দরুন যে অতিরিক্ত দায়ের জন্ম হয়েছে, তার বাহ্যিক অস্তিত্ব নেই। তা ছাড়া প্রেসিডেন্ট সাহেবের নিজেরও কোনো প্রিন্টার নেই। সুতরাং, তিনি সর্বোচ্চ ১০ বিলিয়ন ডলারই পরিশোধ করতে পারবেন। বাকিগুলো পরিশোধ করতে পারবেন না। কারণ, পকেটে ৫০ ডলার থাকলে ৫১ ডলার সমমূল্যের পণ্য ক্রয় করা সম্ভব নয়।

সুদের কাছে এখানে সবাই আটকে যায়। কারণ, সুদ থেকে যে অদৃশ্য দায়ের জন্ম হয়, তা সামষ্টিক উপায়ে কখনো পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এরপর শুরু হলো যুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট সাহেবের খরচ বেড়ে গেল কয়েকগুণে। তিনি আবারও ঋণ নিলেন এবং নিতেই থাকলেন। একই সঙ্গে আমেরিকায় আরও অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক গড়ে উঠল। তারাও ফেড থেকে ঋণ নিয়ে তহবিল তৈরি করল। তাদের কাছ থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ঋণ নিল। চারদিক ঋণে ঋণে সয়লাব হয়ে উঠল। প্রতিটি ঋণের ওপর সুদ চেপে বসল। এই সুদ থেকে তৈরি হলো জাতীয় দায়, যার পরিমাণ দিনে দিনে বাড়তেই থাকল। আদৌ কি এই জাতীয় দায় থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব?

ফেডের দিকে তাকানো যাক। ১৯১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর ফেডের নিকট ২ হাজার টন স্বর্ণ ছিল। এর বিপরীতে জানুয়ারি মাসে তারা ১০ বিলিয়ন ডলার প্রিন্ট করে প্রেসিডেন্ট সাহেবকে ঋণ দেয়। প্রথম ঋণের পর প্রেসিডেন্ট সাহেব যখন পুনরায় ঋণের আবেদন করলেন, তখন ফেডের সিন্দুক ফাঁকা! অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তারা আবারও ডলার প্রিন্ট করল এবং তা প্রেসিডেন্ট সাহেবের নিকট পৌঁছে দিলো। এই যে দ্বিতীয়বার ডলার প্রিন্ট করল, তার বিপরীতে কি সমপরিমাণ স্বর্ণ মজুত করেছে? তা ছাড়া প্রতিটি ঋণের ওপর যে সুদ চাপিয়ে দিচ্ছে, তারও বিপরীতে কি স্বর্ণ মজুত করছে?

আবার লক্ষ করুন, সাধারণ মানুষ সরকারের হুকুম মানতে নিজেদের স্বর্ণগুলো ফেডের নিকট জমা দিচ্ছে, আর ফেড প্রিন্টিং মেশিনে ডলার ছাপিয়ে তা সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছে। তারা ডলার তৈরি করছে বাতাস থেকে, আবার তার ওপর সুদ চাপিয়ে ঋণ দিচ্ছে! যখন কেউ সুদ-সমেত ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না, তখন তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কেড়ে নিচ্ছে। এভাবে বিংশ শতাব্দীতে জন্ম নেয় আধুনিক মহাজন বৃত্তি।

১৯৩৩ সালে ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রীয় ঘোষণা জারি করে, সবাই যেন এ বছরের মধ্যে তাদের সকল স্বর্ণ ফেডের নিকট জমা রেখে সমপরিমাণ ডলার সংগ্রহ করে; নতুবা তাদের সম্পদ জব্দ করা হবে। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষ ফেডের কাছে স্বর্ণ জমা রাখতে বাধ্য হয় এবং এর বিনিময়ে সমপরিমাণ ডলার নিয়ে আসে। ৩১ জানুয়ারি ১৯৩৪, প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের কাছ হতে নতুন ঘোষণা আসে। এখন থেকে ১ আউন্স স্বর্ণ সমান ৩৫ ডলার। অর্থাৎ ডলারের মূল্য রাতারাতি ৪০% হ্রাস পেল! কেনই-বা এমনটা হলো! ১৯১৩ সালের পর থেকে ফেড নতুন স্বর্ণ মজুত না করে প্রচুর নোট ইস্যু করেছে। এই মূল্যহীন নোটগুলোকে বলা হয় 'Fiat Money'। তাই নতুন ইস্যুকৃত নোটের সাথে রিজার্ভে থাকা স্বর্ণগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে ডলারের মূল্য হ্রাস করা হয়েছে এবং স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। ঠিক এ কারণে মুদ্রাস্ফীতি বাজারের একটি নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন অর্থের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং বাজারে এর সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, তখনই মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। এর নেতিবাচক প্রভাবগুলোর সাথে কমবেশি আমরা সবাই পরিচিত। যেমন: দ্রব্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া, জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া, সঞ্চয় হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নিয়মিত নতুন নতুন নোট ইস্যু করা এবং বাজারে এর সরবরাহ বৃদ্ধি করা মুদ্রাস্ফীতির প্রধানতম কারণ।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত। যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র ছয় মাস আগে আয়োজন করা হয় Bretton Woods সম্মেলন। বলার অপেক্ষা রাখে না ইহুদিরা ছিল এই সম্মেলনের মধ্যমণি। এতদিন পর্যন্ত ডলার ছিল কেবল আমেরিকার কারেন্সি। এই সম্মেলনে তারা প্রস্তাব করে, ডলার হবে পুরো পৃথিবীর একমাত্র বিনিময়যোগ্য কারেন্সি। বেশিরভাগ রাষ্ট্র এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। সবার এক কথা: ফেড তো চাইলেই ইচ্ছে মতো ডলার প্রিন্ট করতে পারে, সেখানে মনিটরিং-এর কোনো সুযোগ নেই। বিতর্ক চলতে থাকল। ইহুদি প্রতিনিধিরা বলল, প্রতিটি দেশের পৃথক পৃথক কারেন্সি থাকার দরুন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্থবির হয়ে আছে। সবাই যদি একই কারেন্সি ব্যবহারে সম্মত হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গতিশীল হয়ে উঠবে। তা ছাড়া যুদ্ধের আঘাত পুরো ইউরোপকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। এমতাবস্থায় ঘুরে দাঁড়াতে যে সম্পদ প্রয়োজন, তা তাদের নেই।

হিটলারের সাবমেরিনের আঘাতে ইউরোপীয় অনেক স্বর্ণবাহী জাহাজ মেডিটেরিয়ান ও আটলান্টিকে হারিয়ে গেছে। সবাই এখন অর্থ সংকটে। এমতাবস্থায় ডলার হতে পারে সকল সমস্যার সমাধান। ফেড ডলার প্রিন্ট করে ঠিক, তবে নতুন কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরি করা হবে, যেখানে সকল দেশের অংশ গ্রহণের সুযোগ থাকবে। স্বর্ণের বিপরীতে ডলারের মান হবে ১ আউন্স স্বর্ণ = ৩৫ ডলার। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অধিকাংশ রাষ্ট্র এই প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয়।

আলোচনায় বলা হয়, যেহেতু এই মুহূর্তে পৃথিবীর অন্য রাষ্ট্রগুলোর নিকট প্রয়োজনীয় পরিমাণ ডলার নেই, তাই উচিত হবে রাষ্ট্রীয় রিজার্ভে থাকা নিজেদের স্বর্ণগুলো ফেডের নিকট জমা রেখে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার নিয়ে যায়। আর যাদের স্বর্ণ নেই, তারা বন্ড জমা রেখে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ নিতে পারবে। প্রতিটি রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ লেনদেনে নিজস্ব কারেন্সি ব্যবহার করতে পারবে। তবে অবশ্যই স্বর্ণ-রৌপ্য বা ডলারে পরিমাপযোগ্য মূল্য থাকতে হবে। অর্থাৎ কোন দেশ চাইলে স্বর্ণ-রৌপ্যের পরিবর্তে ডলারকে রিজার্ভ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। প্রতিটি দেশের বিনিময় হার নিরূপণ এবং মনিটরিং-এর দায়িত্বে থাকবে আই.এম.এফ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। যদি কোনো দেশ ডলারগুলো ফেডের নিকট ফিরিয়ে দেয়, তবে প্রতি ৩৫ ডলার অনুপাতে সমপরিমাণ স্বর্ণ ফেরত দেওয়া হবে। এরপর থেকে অনেক রাষ্ট্র তাদের রিজার্ভে থাকা স্বর্ণগুলোর একটি নির্দিষ্ট অংশ ফেডের নিকট জমা রেখে ডলার নিতে শুরু করে।

ব্রেটন উডস সম্মেলনের পর ১৯৪৫ সালে ফেডের রিজার্ভে থাকা স্বর্ণের পরিমাণ ছিল ১৭৮৪৮ মেট্রিক টন। ১৯৫০ সালে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২০২৭৯ মেট্রিক টন। কিন্তু আমেরিকানদের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা এই যে শুরু হলো, আর থামল না। এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় নিমজ্জিত থাকার দরুন তাদের ঘাটতি বাজেটের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে। নতুন-নতুন অস্ত্র নির্মাণ, সৈনিকদের বেতন প্রদান, বিভিন্ন রসদ আমদানি ইত্যাদি নানা কাজেও তাদের প্রচুর ডলার অন্যান্য দেশগুলোতে চলে যেতে শুরু করে। ফলে সে সকল ডলারের বিপরীতে যখন ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো স্বর্ণ দাবি করে বসছিল, তখন আমেরিকা হারাতে শুরু করে তাদের স্বর্ণের মজুদ। কারণ, নতুন ডলার প্রিন্ট করলেও ১ আউন্স স্বর্ণ = ৩৫ ডলার হারে তখনও কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

৬০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া আমেরিকার জন্য ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বড়ো কারণ। তারা ভাবতেও পারেনি এই যুদ্ধ এতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। তাদের ঘাটতি বাজেট বাড়তে শুরু করলে নতুন ডলার প্রিন্ট প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। ১৯৬৩ সালে জন এফ কেনেডি নিহত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট পদে আসেন লিন্ডন বি. জনসন। তিনি স্বর্ণের বিপরীতে ডলারকে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কিন্তু ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের বিরুদ্ধে বৈরী আচরণ শুরু করে দেয় কি না, তা নিয়ে তার মনে ছিল যথেষ্ট সংশয়। তাই তিনি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চালাতে শুরু করেন, যেন ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো আপাতত তাদের নিকট স্বর্ণ দাবি না করে।

১৯৬৮ সালের দিকে তাদের রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণ ৯৬৭৯ মেট্রিকটনে নেমে আসে। এমতাবস্থায় ডলার পুনর্মূল্যায়ন না করলে বাকি স্বর্ণগুলো আটকে রাখা যাবে না। ১৯৭১ সালে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন রিচার্ড নিক্সন। ততদিনে তাদের রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৯০৭০ মেট্রিকটন। ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের অব্যাহত স্বর্ণের দাবিকে কূটকৌশলের মাধ্যমে কয়েক বছর দমিয়ে রাখলেও এ বছর আর সম্ভব হচ্ছিল না। বিশেষ করে ফ্রান্সে চাপ ছিল অন্য সবার চেয়ে বেশি। ফলে ১৫ আগস্ট ১৯৭১, প্রেসিডেন্ট নিক্সন ব্রেটন উডস অঙ্গীকারনামা রহিত করেন। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ পরিশোধের প্রক্রিয়া রহিত করেন। এরপর কয়েকদফা ডলারকে পুনর্মূল্যায়িত করা হয়, ১ আউন্স স্বর্ণ = ৩৮/৪০/৪২। কিন্তু ডলারের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৩ সালে চূড়ান্তভাবে ব্রেটন উডস অঙ্গীকারনামাকে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এরপর হতে স্বর্ণের বিপরীতে মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এখন যে প্রক্রিয়ায় বিনিময় হার নির্ধারিত হয়, তা হলো— Floating Exchange Rate System ।

পেট্রো ডলার: William Clark-এর লেখা Petrodollar Warfare: Oil, Iraq and the Future of the Dollar বইটি হতে:

ফেড বুঝতে পারে, আন্তর্জাতিক মহল ডলারের ওপর পুরোপুরি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তারা যদি নতুন কোনো অর্থ ব্যবস্থার ফন্দি করে, তবে তা ডলারের শেষকৃত্যের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এমন পরিস্থিতিতে আমেরিকা জ্বালানি তেলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, যার জন্য ডলার আজও টিকে আছে। ৭০ দশকের প্রথম থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়তে শুরু করে। আমেরিকা সৈন্য বাহিনী নিয়ে আরব দেশের তেলক্ষেত্রগুলো একে একে দখল করতে শুরু করে। যাদের সাথে সমঝোতা হয়েছে, তাদের সাথে যুদ্ধ হয়নি। আর যারা বেঁকে বসেছে তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

১৯৬৭ সালের পর হতে ঘটে যাওয়া আরব-ইজরাইল যুদ্ধগুলোতে আমেরিকা ইজরাইলিদের পক্ষ নেওয়ায় আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে মার্কিনিদের সম্পর্ক তিক্ততায় পৌঁছে। এরই রেশ ধরে ১৯৭৩ সালে ওপেকভুক্ত ১২টি রাষ্ট্র আমেরিকার ওপর তেল অবরোধ জারি করে, যা সে বছরের (৭৩) অক্টোবর হতে শুরু করে পরবর্তী বছরের (৭৪) মার্চ মাস পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। মাত্র ছয় মাসে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের মূল্য $২৫.৯৭ থেকে বেড়ে $৪৬.৬৩-এ গিয়ে পৌঁছে।

মার্কিন প্রশাসন এ পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক চাল চালতে শুরু করে। পারিবারিক দ্বন্দ্বে বাদশাহ ফয়সাল নিহত হলে মার্কিনিদের জন্য পথ আরও সহজ হয়ে যায়। তখন সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইজরাইলের জুজু কাজ করছিল। ইজরাইল তার আশেপাশের ভূ-খণ্ডগুলোতে যেকোনো মূহুর্তে আক্রমণ চালাতে পারে— এমন একটি আতঙ্ক তাদের মধ্যে কাজ করছিল। ১৯৭৫-৭৬ সালে সৌদি-আমেরিকা অস্ত্র-চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মূল বিষয় ছিল, সৌদি রাজ পরিবার রক্ষায় আমেরিকা তাদের সামরিক নিরাপত্তা প্রদান করবে। বিনিময়ে সৌদি আরব তাদের নিকট তেল রপ্তানি করবে। এই তেল পরিশোধন করে আমেরিকা বিশ্ব বাজারে বিক্রি করবে।

ধীরে ধীরে অন্যান্য আরব দেশগুলোও আমেরিকার সাথে বিভিন্ন চুক্তি করে। একপক্ষ দিবে অস্ত্র ও সামরিক নিরাপত্তা, অপরপক্ষ দেবে তেল। এবার ইউরোপীয় বা অন্য কোনো দেশ যদি পরিশোধিত তেল ক্রয় করতে চায়, তবে তা ডলার দিয়েই ক্রয় করতে হবে। অন্য কোনো কারেন্সির বিনিময়ে আমেরিকা তা বিক্রি করবে না। বাধ্য হয়ে প্রতিটি রাষ্ট্র এই নীতি মেনে নেয়। তখন থেকে আমেরিকান ডলারের ভিত্তিমূল্যে স্বর্ণের পরিবর্তে তেল স্থলাভিষিক্ত হয়। এ কারণে ডলারের অপর নাম আজ পেট্রো ডলার। ৭০-এর দশকে আমেরিকা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করে, যাতে করে পেট্রো ডলারের যুগ শেষ হয়ে গেলেও বিনিয়োগকৃত অর্থের বদৌলতে ডলারকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে ব্যবহার করে চীনের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের অনুমতি পাওয়া আমেরিকার জন্য ছিল বড়ো অর্জন।

আমেরিকার সাথে রাজনৈতিক দ্বৈরথের দরুন ২০০০ সালে সাদ্দাম হোসেন ডলার বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনি পুনরায় স্বর্ণভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কথা ব্যক্ত করেন। অর্থাৎ আমেরিকাকে এখন থেকে ডলার নয়; স্বর্ণ দিয়ে তেল কিনে নিতে হবে। এ কারণে আমেরিকান প্রশাসন ২০০১ সালে অর্থনৈতিক হোঁচট খায়। এরপর কী হলো! ডলারকে বাঁচাতে আমেরিকা পুরো ইরাক দখল করে নেয়; একইসঙ্গে তেল ক্ষেত্রগুলোও। একই ভাগ্য বরণ করতে হয় সিরিয়া এবং লিবিয়াকে। গোটা মধ্যপ্রাচ্য ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

📘 সিক্রেটস অব জায়োনিজম > 📄 ইহুদি ঔদ্ধত্যপনা

📄 ইহুদি ঔদ্ধত্যপনা


এখন আমরা এমন একটা সময়ে এসে পৌঁছেছি, যখন বড়োদিন পালনের জন্য ইহুদিদের নিকট অনুমতি প্রার্থনা করতে হয়! ইহুদিরা যে শহরগুলোতে বসবাস করছে, সেখানে তাদের অনুমতি ব্যতীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি, এমনকী গির্জাগুলোতেও বড়োদিন পালন করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যদি তারা আমাদের বড়োদিন পালনে অনুমতি প্রদান করে, তবে একটি বিষয় ফলাও করে প্রচার করা হবে যে, বাহ! ইহুদিরা তো অন্য ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতি অনেক উদার। আদৌ ইহুদিরা আমাদের বড়োদিন পালনের অনুমতি দেবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নই। ১৯২১ সালের ৩১ অক্টোবর, Brooklyn Eagle পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশ পায়, যার কিছু অংশ নিচে তুলে ধরা হলো—

'Canon William Sheafe Chase কিছুদিন আগে জাতীয় শিক্ষাবোর্ডের সচিবের কাছে একটি চিঠি লিখেন। বড়োদিনের প্রাক্কালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইতঃপূর্বে যিশুখ্রিষ্টের জীবনী নিয়ে যে আলোচনা হতো, তা বন্ধের জন্য নতুন কোন নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছে, তা জানতে চেয়ে তিনি এই চিঠি লিখেন। আমেরিকান গির্জা ফেডারেশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, গত বছর কিন্ডার গার্ডেনের এক শিক্ষক বড়োদিন উপলক্ষ্যে ছাত্রদের মাঝে যিশুখ্রিষ্টের জীবনী নিয়ে আলোচনা করেছিলেন বলে তাকে হুঁশিয়ার করা হয়। সেইসঙ্গে এমন কাজ যদি পুনরায় করেন, তবে তৎক্ষণাৎ তাকে বরখাস্ত করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়।'

আমেরিকার সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী, আমেরিকা হলো খ্রিষ্টানদের দেশ। তারপরও হিব্রু সম্প্রদায়ের প্রতি আমেরিকার প্রশাসন যতটা উদারতা দেখিয়েছে, ততটা অন্য কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের প্রতি কখনোই দেখানো হয়নি। খ্রিষ্ট আদর্শকে অক্ষুণ্ণ রেখে পৃথিবীর যেকোনো সম্প্রদায়ের মানুষ আমেরিকায় প্রবেশ করতে পারে, এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমি বিশ্বাস করি, খ্রিষ্ট ধর্মকে আমাদের সমাজব্যবস্থা থেকে মুছে দিতে যে অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে, তার পেছনে পুরো হিব্রুজাতি নেই; বরং তাদের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী রয়েছে। তারা বারবার নিজেদের ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে।

এই হলো আমেরিকার সবচেয়ে বড়ো ধর্মীয় উৎসব পালনের বর্তমান অবস্থা। জাঁকজমকতা আগে যেমন ছিল, এখনও তেমনই থাকবে কিংবা আরও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু যে নিগূঢ় ভাবগাম্ভির্যের মধ্য দিয়ে একসময় বড়োদিন পালিত হতো, ভবিষ্যতের দিনগুলোতে তা হারিয়ে যাবে। ধর্মীয় উৎসব রূপ নেবে বিভিন্ন অশালীন কর্মকাণ্ডে। বিংশ শতাব্দীতে গড়ে উঠা নতুন প্রজন্ম হয়তো বুঝতেই পারবে না, কেন এবং কী কারণে এই দিবস পালন করা হয়। তাদের কাছে সবকিছুই হবে আমোদ-ফুর্তির অংশ।

Dr. William Carter দীর্ঘদিন ব্রোকলিন শহরের Throop Avenue Presbyterian Church-এর পাদরি হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তার লেখা উল্লেখযোগ্য কিছু বইয়ের নাম হলো— The Gate of Janus: an epic story of the world war, Milton and His Masterpiece'ও 'Studies in the Pentateuch। সুবক্তা হিসেবে বিভিন্ন মহলে তার ছিল অসামান্য সুনাম। তা ছাড়া ইতিহাস ও সাহিত্যের ওপর তার মস্তিষ্ক ছিল ঈর্ষণীয় জ্ঞানে পূর্ণ।

Y.M.C.A-এর গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখায় তিনি পারিপার্শ্বিক ঘটনা প্রবাহের ওপর টানা ৩০ সপ্তাহ বক্তৃতা প্রদান করেন। পরে নিউইয়র্ক শিক্ষাবোর্ড তাকে একই বিষয়ের ওপর Erasmus High School-এ নিয়মিত বক্তৃতা প্রদানের অনুরোধ করে। ১৯১১-১৯২১ সাল পর্যন্ত টানা দশ বছর তিনি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সান্ধ্যকালীন ক্লাসগুলোতে চলমান বিভিন্ন বিষয়াবলির ওপর বক্তৃতা প্রদান করেন। শুরুতে খুব একটা সাড়া না পেলেও মাত্র ছয় সপ্তাহের ব্যাবধানে তার শ্রোতা সংখ্যা ৩৫ থেকে ৩৫০-এ গিয়ে পৌঁছায়। প্রতিদিন তিন ধাপে এই বক্তৃতা চলত। প্রথম ধাপে, শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। দ্বিতীয় ধাপে, সমকালীন ঘটনাবলির সাথে মিল রেখে নির্ধারিত বিষয়ের ওপর আলোচনা করতেন। তৃতীয় ধাপে, উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলীরা তাকে আলোচিত বিষয়সমূহের ওপর প্রশ্ন করতেন।

১৫ নভেম্বর, ১৯২০ সালের কথা। উক্ত সপ্তাহে শিক্ষাবোর্ড আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে দেয় 'আমেরিকার বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর পরিচয়।' Dr. Carter বক্তৃতা শুরু করেন— 'বিশ্বযুদ্ধ শুরুর হওয়ার মাত্র এক মাস আগে প্রচুর বিদেশি নাগরিক আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে প্রবেশ করে। সংখ্যাটা প্রায় ১৪,০৩,০০০-এর কাছাকাছি; 'যার মধ্যে ৬ শতাংশ গ্রেট ব্রিটেনের নাগরিক, ২ শতাংশ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এবং ১০ শতাংশ ইহুদি।'

পরবর্তী সপ্তাহে আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারিত হয়, 'অভিবাসীরা আমেরিকার জন্য কী করেছে?' Dr. Carter বলেন— 'ইউরোপের কিছু কিছু মানুষ বহু কষ্টে সামান্য আশ্রয়ের আশায় আমেরিকায় প্রবেশ করেছে, তারপরও আমেরিকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তাদের অবদান সবচেয়ে বেশি। এ দেশের উন্নয়নে তারা নিজেদের সর্বোচ্চটা ঢেলে দিতে ন্যূনতম কার্পণ্য করেননি। তারা প্রত্যেকেই এসেছে অনুন্নত এবং কম উন্নত দেশগুলো থেকে।' (তিনি উন্নত বলতে ইতালির মতো সমপর্যায়ের দেশগুলোকে এবং অনুন্নত বলতে কালো ও বাদামি বর্ণের মানুষদের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।)

আলোচনার এক পর্যায়ে ইহুদিদের প্রসঙ্গ চলে আসে। সমাজ, বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প-সাহিত্য, ধর্মতত্ত্ব, উন্নয়নকর্ম ইত্যাদি নানা বিষয়ে তিনি ইহুদিদের অবদানের কথা উল্লেখ করে ভূয়সী প্রশংসা করেন। সেইসঙ্গে ইহুদিদের বিখ্যাত কিছু ব্যক্তির নামও উল্লেখ করেন। যেমন: Disraeli, Rubinstein, Schiff, Kahn এবং Rabbi Wise। ব্যক্তিগতভাবে যে তারও অনেক ইহুদি বন্ধু-বান্ধবী রয়েছে, সে কথাও উল্লেখ করেন।

কিছু মানুষের কাছে ভয় দুই ধরনের। এক, অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে ন্যায়বিরুদ্ধ কাজ করার ভয়। দুই, অনিবার্য বিপদ জেনেও বিবেকের তাড়নায় সত্য না বলতে পারার ভয়। Dr. Carter-এর ক্ষেত্রে ঘটেছেও তাই। তিনি ইহুদিদের যে এত এত অবদানের কথা উল্লেখ করলেন, তবে তাদের সেই অবদান কোথায়? রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, শিল্প-কলকারখানা ইত্যাদি সব তো জ্যান্টাইলদের রক্ত-ঘামে তৈরি হচ্ছে। অপরদিকে ইহুদিরা নরম-মোলায়েম কেদারায় বসে সুদের ব্যবসায় করে যাচ্ছে। ইহুদিদের খুশি করতে তিনি নাহয় কয়েকটি প্রশংসাসূচক বাক্য বলেছেন, কিন্তু তিনি তো দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ! বিবেকের তাড়নায় সত্য বলা থেকে বিরত থাকতে পারেননি।

রাশিয়া থেকে আগত ইহুদিদের একদল অভিবাসী সম্পর্কে তিনি বলেন— 'প্রত্যেক জাতির মধ্যে খারাপ কিছু উপাদান পাওয়া যায় এবং এটাই স্বাভাবিক। ইহুদিদের বেলাও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। ইহুদিদের প্রায় ১,৪৩,০০০ অভিবাসী রাশিয়া থেকে আমেরিকায় প্রবেশ করেছে। ভুলে গেলে চলবে না, ইহুদিদেরে পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাশিয়ান ইহুদিরা হলো সবচেয়ে খারাপ।'

উপস্থিত শ্রোতাবৃন্দ বরাবরের মতোই স্বাভাবিক ছিলেন। প্রশ্ন-উত্তর পর্ব শুরু হলে দুজন ব্যক্তি তাকে প্রশ্ন করেন, কেন তিনি রাশিয়ান ইহুদিদের নিয়ে এত বেশি সমালোচনা করলেন? উত্তরে তিনি বলেন— 'আমি সকল জাতিগোষ্ঠীর ব্যাপারে নিরপেক্ষ দৃষ্টিপাত করেছি। তা ছাড়া ইহুদি রাশিয়ান জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে পৃথিবীর সবাই একই মন্তব্য করেছে।'

কিছুদিন পর শিক্ষাবোর্ড থেকে নোটিশ পাঠিয়ে বলা হয়, বক্তৃতার বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করার দায়ে তার বিরুদ্ধে কিছু ব্যক্তি অভিযোগ করেছে। পরে খবর নিয়ে জানা যায়, সেই আলোচনাসভায় প্রশ্নকারী দুজনই ইহুদি। ভাবা যায়! ৪০০ শ্রোতার মাধ্য থেকে মাত্র দুজন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, আর এতে চারদিকে তুলকালাম কাণ্ড বেধে যায়। এক সপ্তাহের মধ্যে আরও অনেক অভিযোগ শিক্ষাবোর্ডে জমা হতে শুরু করে। ফলে Dr. Carter-এর বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগে বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। স্বাধীন দেশের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও আজ সবার বাক্-স্বাধীনতা রুদ্ধ। এ জাতীয় ঘটনা ইতঃপূর্বে আরও অনেক ঘটেছে। সুতরাং অবাক হওয়ার কিছু নেই।

তদন্ত কমিটির ডাকে Dr. Carter হাজির হলেন। তার সামনে বসে ছিল সাতজন ইহুদি। এর মধ্যে চারজন স্বীকার করে তারা সেই বক্তৃতা সভায় উপস্থিত ছিল না এবং সেখানে কী আলোচনা হয়েছে, তার কিছুই ভালোভাবে জানে না। এই পুরো তদন্ত কার্যক্রম যার নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছে, তিনি হলেন রাবাই C.H. Levy। তিনি রাবাই ইউনিয়ন, মন্ত্রিপরিষদ ও Kehillah-এর অন্যতম একজন সদস্য। তিনি দীর্ঘকাল ধরে এ দেশে নিজের জাতিগোষ্ঠীর জন্য গুপ্তচর হয়ে কাজ করেছেন। সেই বক্তৃতাসভায় তিনি নিজেও উপস্থিত ছিলেন না।

তদন্ত কার্যক্রম যথারীতি শুরু হলে এক এক করে ছয়টি চিঠি খোলা হয় এবং সবার সামনে তা পাঠ করা হয়। প্রতিটি চিঠির বিষয়বস্তু প্রায় কাছাকাছি; ইহুদিদের ব্যাপারে খারাপ বা ভুল মিশ্রিত কোনো তথ্য যেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা না হয়, চিঠিগুলোতে তা-ই বলা হয়েছে। সবগুলো চিঠি পাঠানো হয়েছিল নিউইয়র্ক শিক্ষা বোর্ড পরিচালনা কমিটির সদস্য Dr. W.L. Ettinger-এর নিকট। চিঠি পাঠ করা শেষ হলে Dr. Carter-কে কিছু বলার সুযোগ দেওয়া হলো। তিনি বললেন—

'মনে হচ্ছে সবগুলো চিঠি কেবল একজন ব্যক্তির নির্দেশনায় লেখা হয়েছে। কারণ, তাদের প্রত্যেকের আপত্তির বিষয়বস্তু এক। যদি পৃথক পৃথক মানুষের থেকে চিঠিগুলো আসত, তবে বিষয়বস্তুতে কিঞ্চিৎ হলেও পার্থক্য পাওয়া যেত।'

তিনি পরোক্ষভাবে Levy সাহেবকে বুঝিয়ে দিয়েছেন সেই ব্যক্তির কথা, যার নির্দেশনায় এগুলো লেখা হয়েছে। এরপর তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কিছু সাক্ষী হাজির করার অনুমতি চাইলেন, কিন্তু তাকে সেই সুযোগ দেওয়া হলো না। অর্থাৎ একটি সম্পূর্ণ ইহুদি ট্রাইব্যুনালের বিপক্ষে বসে আছেন একজন জ্যান্টাইল শিক্ষক। তদন্তের একপর্যায়ে সবাই স্বীকার করতে বাধ্য হলো যে, তিনি বক্তৃতায় যা কিছু বলেছেন, তা ইচ্ছা করে বলেননি এবং তাতে কোনো মিথ্যা তথ্য ছিল না। তা ছাড়া তিনি কোন বিষয়ের ওপর আলোচনা করবেন, তা তো শিক্ষাবোর্ড-ই নির্ধারণ করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তার কিই-বা করার আছে! ট্রাইব্যুনালের সদস্যরা যখন বিতর্কে পেরে উঠছিল না, তখন তারা ভিন্ন পথ অনুসরণ করে। রাবাই Levy হাস্যকর টিপ্পনী কেটে প্রশ্ন করেন—

'মহোদয়, জানতে পারি কি আপনি আদৌ আমেরিকান না অন্য দেশের নাগরিক?'

Dr. Carter ১৫ বছর বয়সে ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকায় আসেন। বেশ কিছুদিন এখানে থাকার পর নাগরিকত্ব পেয়ে যান। তারপর থেকে আমেরিকার বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন। জবাবে তিনি বলেন—

'আমি ত্রিশ বছর আগে এ দেশের নাগরিকত্ব পেয়েছি এবং তার প্রমাণও আছে। আপনি বললে আমি সেই প্রমাণ হাজির করতে পারব। আশা করি আপনি নিজেও আপনার নাগরিকত্বের প্রমাণ হাজির করতে পারবেন।'

তিনি রাবাই Levy-কে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন। জবাবে Levy বলেন—

'আমি দেখে নেব, তোমার মতো নোংরা ইংরেজ কীভাবে নিউইয়র্কের কোনো জনসভায় বক্তৃতা দেয়!'

এমন অপমানজনক বাক্য শুনে Dr. Carter মূহুর্তে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তার চোখে রাগের অভিব্যক্তি ঠিকরে পড়ছিল, কিন্তু পুরো ট্রাইব্যুনাল বিপক্ষে হওয়ায় কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। ভাগ্য ভালো, ট্রাইব্যুনালে সেদিন তিনি ছাড়া আরও একজন জ্যান্টাইলন উপস্থিত ছিলেন; Ernest L. Crandall। তিনি সেই শিক্ষাবোর্ডের সান্ধ্যকালীন শিক্ষা কার্যক্রমের সুপাভাইজার ছিলেন। তিনি রাবাই Levy-কে উদ্দেশ্য করে বলেন—

'একজন ভদ্রলোককে নোংরা ভাষায় যেভাবে অপমান করলেন, তা নিজ চোখে এর আগে কখনো দেখিনি। আপনারা যা করলেন, তার জন্য লজ্জিত হওয়া উচিত। এমন নোংরা বাক্য যদি দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করেন, তবে আপনাদের এখান থেকে বের করে দিতে বাধ্য হব।'

এরপর Crandall সাহেবের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে এ আলোচনা আর দীর্ঘ করতে চাই না। তদন্তে Dr. Carter নির্দোষ প্রমাণিত হন। তাকে সসম্মানে সকল অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। পুনরায় তিনি Erasmus School-এ ফিরে যান। কিছুদিন পর একটি নোটিশের মাধ্যমে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়— আইরিশ ও ইহুদি বিতর্ক নিয়ে তিনি যেন আপত্তিকর কোনো মন্তব্য না করেন, যদিও তা আলোচনার বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিলে যায়।

১৯১৮ সালের পর থেকে আয়ারল্যান্ডজুড়ে স্বাধীনতাযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এটিকে এক প্রকার গৃহযুদ্ধও বলা যায়। আইরিশ অধিবাসীরা চাচ্ছিল তাদের নিয়ে চারদিকে আলোচনা হোক, কিন্তু জায়োনিস্ট সংগঠনগুলো তা চাচ্ছিল না। কারণ, তাদের মনে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসার ভয় ছিল। কারণ, ব্রিটিশ-আয়ারল্যান্ডের মধ্যে যে যুদ্ধের সূত্রপাত, তার পেছনে ছিল এই জাতিগোষ্ঠীটিরই কূট-পরিকল্পনা। সরকারিভাবে আইন পাশ করা হয়, যেন আইরিশ বিতর্ক নিয়ে কোথাও সামান্য টু শব্দ পর্যন্ত করা না হয়।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ বক্তৃতা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পর ডিসেম্বর মাসে Dr. Carter স্বেচ্ছায় এই পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তখন থেকে তার জীবনে শুরু হয় নিত্য অভাব-অনটন। বিবেকের তাড়নায় তিনি অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করা থেকে বিরত থাকতে পারেননি। পরবর্তীকালে এই পদে যাকে নিয়োগ দেওয়া হবে তার আদৌ সেই ভয় থাকবে কি না— নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, তবে আশার আলো খুবই ক্ষীণ। বাক্ স্বাধীনতার নামে এ দেশের পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলো যে বুলি আওড়ায়, তা যে কতটা মিথ্যা তা এই ঘটনা থেকেই বোঝা সম্ভব।

ইহুদিদের মায়াকান্না

'ইহুদি বিতর্ক' ও 'সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন' বিষয় দুটি যে এক নয়, তা একজন সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষও স্বীকার করবে। পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে— যারা নিজেদের সম্পর্কে ন্যূনতম অভিযোগ বা সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সত্য না মিথ্যা, তা কখনোই বিবেচনায় নেওয়া হয় না। তাদের নিয়ে বাজারে কোনো প্রকার বিতর্ক সৃষ্টি করা যাবে না— এটাই মূখ্য বিষয়। আর এ জাতীয় মানুষগুলো ক্ষমতায় গেলে যে কতটা স্বৈরাচারি হতে পারে, সেই শিক্ষা আমরা ইতিহাস থেকেই নিতে পারি। যে বিষয়টি তারা সবচেয়ে বেশি ভয় পায়— তা হলো সত্যের উন্মোচন। কারণ, এটাই একমাত্র বিষয় যা সর্বস্তরের মানুষকে একতাবদ্ধ করতে পারে। তাই সত্যকে ধামাচাপা দিতে প্রায়শই তারা এমন কিছু বাহানা সামনে নিয়ে আসে, যা দ্বারা সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে পুরো ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

পূর্বের একটি অধ্যায়ে বলা হয়েছে— যখন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সামান্যতম সমালোচনার চেষ্টা করে, তখন তাদের ওপর অ্যান্টি-সেমাইট লেবেল চাপিয়ে দেওয়া হয়। বিতর্কের নামে ইহুদিদের ওপর সাম্প্রদায়িক আক্রমণ চালানো হচ্ছে— এমন মায়াকান্নার রুল চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের আবেগ নিজেদের পক্ষে নিয়ে পুরো বিষয়কে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এটা কি বিশ্বাসযোগ্য যে, আজকের যুগে ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে স্বৈরাচারী ইহুদিদের ওপর ধর্মীয় নিপীড়ন চালানো সম্ভব! আজকের দিনে তো একজন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সাহেবও নিউ টেস্টামেন্ট হাতে নিয়ে শপথ গ্রহণ করার মতো ধৃষ্টতা দেখাতে পারে না। উপরন্তু প্রশাসনিক বিভিন্ন পদ থেকে 'খ্রিষ্টান' শব্দটির ব্যবহার বাদ দেওয়া হয়েছে।

১৯২০ সালের মে মাসে আমেরিকার ওহিয়ো প্রদেশের দৈনিক পত্রিকা Daily American Tribune প্রকাশ করে— 'আজকের দিনে যা হচ্ছে, তা ইহুদি নিপীড়ন নয়; খ্রিষ্টান নিপীড়ন।' বিখ্যাত লেখক ও রাজনীতিবিদ Dean Swift বলেন— 'বুঝতে পেরেছি, সহ্য যা করার সব আমাদেরই করতে হবে। আমাদের কোনো কিছু ইহুদিরা সহ্য করবে না।'

এপ্রিল-মে মাসের দিকে The Jewish Times-এর সম্পাদক H. Lissauer একটি কলাম লিখেন, যার শিরোনাম ছিল—

'ক্রুশ চিহ্ন ইহুদিদের জন্য আপত্তিকর। খ্রিষ্টানদের উচিত মাগান ডেভিডকে ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা। আমরা কখনো সামান্য একটি ক্রুশ চিহ্নের নিকট নিজেদের ধর্ম, আদর্শ ও বিবেকবোধকে ঢেলে দিতে পারি না।'

ক্লিভল্যান্ডের পত্রিকা Jewish Independent প্রকাশ করে— 'Gideons-এর যথেচ্ছা ব্যবহার ইহুদিদের জন্য আপত্তিকর।' Gideons বাইবেলে উল্লিখিত এক পয়গম্বর, যিনি একাধারে মহাবীর, যুদ্ধের সেনাপতি ও ন্যায়বিচারক। আমেরিকার সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে তার ছবি ঝুলিয়ে রাখা হতো। তিনি আমাদের নিকট একজন আদর্শ পুরুষের প্রতীক। আমাদের আদালত ঘরগুলোতে Gideons-কে একজন আদর্শ বিচারকের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়। ইহুদিরা দাবি করে, সকল স্থান থেকে যেন তার ছবি সরিয়ে ফেলা হয়। C.A. Johnson একবার চেচিয়ে বলেছিলেন—

'আদালত ঘরে ন্যায্য বিচারের প্রতীক হিসেবে Gidoens-কে স্মরণ করার কী দরকার, নিজে সৎ বিচারক হলেই তো হয়।'

১৯০৯-১০ সালের দিকে আমেরিকার গির্জাগুলো পথভ্রষ্ট ও মানসিক বিকারগ্রস্ত ইহুদিদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে একটি সমন্বিত কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোড়দার করা, কিন্তু ইহুদিদের সংগঠনগুলো ঔদ্ধত্যের সুরে বলে ওঠে—

'খ্রিষ্টানদের এত বড়ো স্পর্ধা, আমাদের জ্ঞান দিতে আসে! আমাদের কোনো জ্ঞানের প্রয়োজন নেই।'

প্রতিশোধস্বরূপ ১৯১১ সালে তারা নিউইয়র্কে একটি আইন পাশ করে— '১৬ বছরের কম বয়সি কাউকে অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া ধর্মীয় কোনো সংগঠনের সাথে জড়িত করা বা নিয়মিত গির্জায় যাওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা যাবে না। এটা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।'

শিকাগো বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ শিকাগো গসপেল মিশন সংগঠনটির একজন নিয়মিত সদস্য ছিলেন। রাবাইরা তাকে নিয়ে একের পর এক নিন্দনীয় কলাম লিখে যাচ্ছিল। যেমন: 'খ্রিষ্টান অভিভাবকদের আজ কী হলো, তারা সন্তানদের একজন ভণ্ড ও দুশ্চরিত্র ধর্ম ব্যবসায়ীর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করতে পাঠাচ্ছে! কীভাবে তারা একজন ধর্ম ব্যবসায়ীর নিকট শিক্ষা আশা করছে!'

একজন শিক্ষক তার ছাত্রদের নৈতিক চরিত্র গঠনে ধর্মের প্রতি উৎসাহী করতেই পারেন। তাই বলে কি তিনি ধর্ম ব্যবসায়ী হয়ে যাবেন? এ দেশের শিক্ষাবোর্ড ইহুদিদের কথামতো সেই অধ্যক্ষকে বিদ্যালয় থেকে চাকরিচ্যুত করে। কিন্তু যখন কোনো রাবাই-এর বিরুদ্ধে মাদক ব্যাবসা, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও কূট-পরামর্শের মতো জঘন্য সব কাজের সাথে জড়িত হওয়ার প্রমাণ মেলে, তখন তাদের ধর্ম ব্যবসায়ী বলা হয় না কেন?

২৬ নভেম্বর, ১৯২০, Jewish Sentinel প্রকাশ করে— 'আমাদের সবচেয়ে পুরাতন এবং বিপজ্জক শত্রু হলো রোমান সম্প্রদায়। তারা যে শাখায় বিচরণ করে, তার প্রত্যেকটি-ই আমাদের জন্য নিষিদ্ধ। যেদিন রোমের সূর্যাস্ত হবে, মনে রাখবেন! সেদিনই জেরুজালেমের সূর্যোদয় হবে।'

ক্লিভল্যান্ড ও লেকউড শহরের খ্রিষ্টানরা যখন বড়োদিন পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন ইহুদিদের পত্রিকাগুলো কটাক্ষ করে বলতে শুরু করে— 'আপনাদের কি ধারণা আছে, ক্লিভল্যান্ড ও লেকউড শহরে কি পরিমাণ ইহুদি বাস করে? যদি আমাদের একজন সদস্যও এ শহরে বাস করে, তবে এখানে সাম্প্রদায়িক কোনো উৎসব হতে পারে না।'

পরবর্তী বছরের পহেলা জানুয়ারি ইহুদিদের পত্রিকাগুলো প্রকাশ করতে শুরু করে— 'আরেকটি বড়োদিন ফিরে আসার পূর্বে আমাদের হাতে মাত্র ৩৬০ দিন বাকি আছে। আমাদের উচিত খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া এবং বাকি সময়টার উপযুক্ত ব্যবহার করা।'

ইহুদি ব্যবসায়ীরা গত কয়েক বছর যাবৎ নতুন এক খেলায় মেতে উঠেছে। ইস্টার সানডে ও বড়োদিন বন্ধ করতে পারেনি বলে ইহুদিদের দোকান ও মার্কেটগুলো যেকোনো উৎসবের দিন এলেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে শুরু করে। যেমন: Levys, Issac, Goldsteins ও Slivermans; কিন্তু নিজেদের উৎসবের দিনগুলো এলে ঠিকই পণ্যের দাম কমিয়ে দেয়।

রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হিসেবে পালন করাতেও ইহুদিরা আমাদের নিয়ে কম বাজে কথা বলেনি। যেমন—

'ছি, ছি! আধুনিক যুগে এসেও খ্রিষ্টানরা কীভাবে পুরাতন একটি কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরে পড়ে আছে! তাদের বিশ্বাসের কী যে শ্রী, রবিবার নাকি মৃত যিশু পুনরায় জীবিত হয়েছিলেন!'

American Israelite পত্রিকা কয়েক বছর আগে একটি কলাম প্রকাশ করে—

'তখন আর কোনো ইহুদিকে লুকিয়ে থাকতে হবে না, যখন প্রতিটি খ্রিষ্টানকে উদারপন্থি ও মুক্তমনা করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।'

একসময় ইউরোপ-আমেরিকার খ্রিষ্টান নারীগণ পর্দা মেনে বাইরে চলাফেরা করত। আজ সে জায়গায় তাদের ছোটো ছোটো কাপড় পড়তে দেখছি। নগ্ন চলচ্চিত্র, নেশা দ্রব্যের যথেচ্ছা ব্যবহার এবং যৌনতার ছড়াছড়িতে আমাদের সমাজ ছেয়ে গেছে। এগুলোর কোনোটিই যিশুর বার্তা ছিল না। এসবই প্রমাণ করে, তারা আমাদের মন থেকে যিশুকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।

এমন কোনো ক্যাথলিক চার্চ নেই, যার ওপর তারা আক্রমণ করেনি। তারা বলে— 'এ কেমন খ্রিষ্টসমাজ, যারা উপাসনা করে এক ইহুদি নারীর!' এটাকে নিছক আক্রমণ বললে ভুল হবে। যিশু মাতা 'কুমারী মেরিকে' নিয়ে তারা কত নোংরা ও অকথ্য গল্পের জন্ম দিয়েছে, তা কল্পনাও করা সম্ভব নয়।

সামাজিক যেকোনো অনুষ্ঠান শুরুর পূর্বে সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা গীত করা পৃথিবীর অতি প্রাচীন একটি সংস্কৃতি, কিন্তু এই সংস্কৃতি আজ লোপ পেতে বসেছে। ইহুদিরা সর্বত্র বাইবেলের বিরোধিতা করে, কিন্তু সুযোগ পেলে নিজেদের ব্যাপারে স্তুতি গাওয়া থেকে বিরত থাকে না। প্রায়শ ইহুদি রাবাইগণ খ্রিষ্টানদের গির্জা ও বিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে জোর গলায় বলে বেড়ায়—

'আমরা বাইবেল লিখেছি এবং তোমাদের জন্য তা আমরাই সংরক্ষণ করেছি। তাই আশীর্বাদ চাইলে ইজরাইলের সেবা করো।'

তা ছাড়া, যে যিশু পৃথিবীর কোটি কোটি খ্রিষ্টানের হৃদয়ে দেবতারূপে এতদিন পর্যন্ত টিকে আছে, তাকে নিয়ে যথেচ্ছা গল্প রচনা করতে ইহুদিদের জুড়ি নেই। তারা এটাও প্রচার করে, যিশু ছিলেন ইহুদি। তিনি কস্মিনকালেও খ্রিষ্টান ছিলেন না। তাই আজ যারা খ্রিষ্টান এবং যিশুর উপাসনা করছে, তারা সবাই বিপথগামী।

এত কিছুর পরেও কি বলতে হবে আমরা ইহুদিদের ওপর ধর্মীয় নিপীড়ন চালাচ্ছি? সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে আজ ইস্টার সানডে, গুড ফ্রাইডে, বড়োদিন, বড়োদিন সংগীত ইত্যাদি পালিত হয় না। তাদের মতে, একটি অদর্শ ও ধর্ম সহিংষ্ণু দেশ গড়ে তোলার পূর্বশর্ত হলো— দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ (সেক্যুলার) হতে হবে। অন্যথায়, সে দেশ কুসংস্কারের বেড়াজালে বন্দি হয়ে পড়বে। কিন্তু ইহুদি রাবাইগণ নির্বিঘ্নে বিভিন্ন শহরে নিয়মিত সেমিনারের আয়োজন করে যাচ্ছে এবং খ্রিষ্টান যুবকদের মধ্যে জুদাইজমের বীজ ঢুকিয়ে দিচ্ছে।

সবশেষে বলতে চাই, ধর্ম পালন এবং ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার। নিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে খ্রিষ্টান ধর্মকে কলুষিত করার যে নিরন্তর প্রয়াশ ইহুদিরা চালিয়ে যাচ্ছে, আশা করছি এই অধ্যায়টি কিছুটা হলেও জ্যান্টাইলদের মধ্যে চিন্তার খোরাক জোগাতে পারবে।

ইহুদি সন্ত্রাসীদের নানা অপকর্মের চিত্র

পূর্বে বলেছি এখনও বলছি, আমার বই লেখার উদ্দেশ্য পুরো ইহুদি সম্প্রদায়কে দোষারোপ করা নয়। তাদের মাঝেও এমন অনেক সদস্য আছে, যারা একজন নীতিবান ও আদর্শ জ্যান্টাইলের ন্যায় পুরো জীবন অতিবাহিত করতে উৎসুক। এ সকল অপরাধ কর্মকাণ্ডের পেছনে তাদের কোনো প্রকার সম্মতি নেই। তবে এটা ঠিক যে, Kehillah, B'nai B'rith, Anti-Defamation League, American Jewish Committee, Zionism ইত্যাদি সংগঠন ও মতবাদগুলো তাদের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এবং তারাই আজ পুরো বিশ্বে এক একটি বিষফোঁড়ায় পরিণত হয়ে উঠেছে। তবে ইহুদিদের পুরো সম্প্রদায়কে দোষারোপ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। এতে সে সকল ইহুদিরাও অভিযুক্ত হবে, যারা আজ বিশ্বশান্তির জন্য জায়োনিস্টদের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। এখানে কেবল অপরাধীদের পরিচয় উপস্থাপনের প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। তবে দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে যে সকল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বিস্তৃতি লাভ করছে, তার মূলে রয়েছে ইহুদিরা; যারা ধর্মকে বিশেষভাবে ব্যবহার করছে।

আমেরিকার এমন কোনো শহুরে মেজিস্ট্রেট ও থানা-আদালত পাওয়া যাবে না, যেখানে ইহুদিদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া যাবে না। থানা-আদালতগুলোতে শত শত ফৌজদারি মামলা হওয়ার পরও পত্র-পত্রিকায় ইহুদিদের নাম দেখা যায় না। উকিল, বিচারক ও আইনজীবীরা যে বহু আগেই তাদের উপঢৌকনের নিকট বিক্রি হয়ে গেছে, সে গল্প তো আগেই উপস্থাপন করা হয়েছে।

১৯০৯ সালে নিউইয়র্কের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার General Bingham চারদিকে ঘটমান বিশেষ এই জাতিগোষ্ঠীটির অপরাধ কর্মের ওপর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যা নিয়ে চতুর্দিকে হইচই পড়ে যায়। তিনি বলেন—

'আমি নিশ্চিত, আমেরিকার নিকৃষ্টতম বিচারব্যবস্থায় এমন অনেক উকিল ও আইনজীবী খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা এই প্রতিবেদনের প্রতিটি তথ্য মিথ্যা প্রমাণ করার প্রচেষ্টা চালাবে।'

প্রতিটি জাতি ও সম্প্রদায়ে অসহায় ও বিপর্যস্ত নারীদের পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ কিছু সংগঠন থাকে। যেমন: খ্রিষ্টানদের এমন কিছু সংগঠনের নাম হলো— Magdalen Home, Protestant Episcopal House of Mercy ও Catholic House of the Good Shepherd। এখানে ব্যতিক্রম কেবল ইহুদিরা।

নিউইয়র্কের সকল মেজিস্ট্রেট আদালতের সংগৃহীত তথ্য মতে, সমাজের দুই-তৃতীয়াংশ অসহায় নারী সমাজ ইহুদি জনগোষ্ঠীর অংশ। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অসহায় নারীদের দায়ভার গ্রহণ ও পূনর্বাসনের জন্য ইহুদিদের নির্দিষ্ট কোনো সংগঠন নেই! একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তারা তা বারবার ভঙ্গ করেছে। সবশেষে মানবিক মূল্যবোধ থেকে Protestant Episcopal House of Mercy সংগঠনটি এই অসহায় নারীদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করে।

নিউইয়র্কের এক ইহুদি আইনজীবীর নাম শোনা যায়, যে ওয়ালস্ট্রিট শেয়ারবাজারের বিভিন্ন সদস্যকে সুকৌশলে কুৎসিত সব কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে ব্লাকমেইলের চেষ্টা করত। পুরো বাজারে সে 'Wolf of Wall Street' নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে এই নেকড়ে বাঘকে ফৌজদারি অপরাধের দায়ে জেলখানায় পাঠানো হলে তাকে রক্ষার এগিয়ে আসে Kehillah। অনেক প্রচেষ্টার পর তাকে জেল থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয়। যেহেতু বয়সে সে বার্ধক্যে পৌছে গেছে, তাই তার সঠিক চিকিৎসা দরকার— এমন একটি অজুহাতে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় মেজিট্রেটের বর্ণণা অনুযায়ী—

'ইহুদিরা এত বেশি আত্মকেন্দ্রিক যে, তাদের প্রতিটি প্রজন্মই জন্মের পর হতে বাবাদের চাপিয়ে দেওয়া ভ্রান্ত শিক্ষার ছায়ায় বড়ো হতে থাকে। খুব অল্প বয়সে ইহুদি সন্তানদের মগজে এমন কিছু খারাপ চেতনার বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, যার দরুন পরিণত বয়সে তাদের হৃদয়ে মনুষ্যত্ব জাগ্রত করা সম্ভব হয় না। পুরো পৃথিবীকে ইহুদিদের সেবায় নিয়োজিত করতে হবে— এটাই তাদের বিশ্বাস। সাব্বাত হলো এমনই একটি উদাহরণ, যা তারা জোরপূর্বক অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা করছে। ইহুদিদের কাছে সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কোনো দাম নেই।'

যে ইহুদিদের কথা এখানে বলা হচ্ছে, তাদের অধিকাংশ মূলত পূর্ব ইউরোপীয় দেশ থেকে আগত। যেমন: রাশিয়া, গ্ল্যাশিয়া ও পোল্যান্ড। নিজ সম্প্রদায়ে মাঝে ইহুদিরা সর্বদা ইডিশ ভাষায় কথা বলে। জ্যান্টাইল ব্যবসায়ীদের সাথে লেনদেন করার পর তারা যে রশিদ ও ক্যাশ মেমো ধরিয়ে দেয়, তাও ঠিক একই ভাষায়। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে শ্রমিকদের জোরপূর্বক কর্মস্থলে আসতে বাধ্য করার জন্য যখন ইহুদিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়, তখন তাদের রক্ষা করতে ইহুদি আইনজীবীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ইহুদিদের রক্ষার জন্যই বিচার বিভাগে প্রতিদিন নিত্যনতুন আইন তৈরি হতে থাকে।

আদালতে দাখিল করা হলে ইহুদি আইনজীবীরা বলে, পূর্ব ইউরোপে দেশগুলোতে বসবাসকালে তারা শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি পালন করত। তাই সেই সংস্কৃতি থেকে ইহুদিরা এখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি। আদালত পরামর্শ দেয়, শনি-রবি উভয় দিবসে যেন ইহুদিরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখে। কিন্তু অর্থের প্রতি তারা এতটা লোভী যে, সপ্তাহে দুই দিন ব্যবসায়-বাণিজ্য বন্ধ থাকবে— এমনটা মেনে নিতে পারেনি। তবে সমঝোতার ভিত্তিতে ইহুদিদের কিছু কিছু সংগঠন এ দিনে সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখতে রাজি হয়। যেমন: The Independent Ladies Garment Merchant Association Incorporated জুনের শেষ হতে আগস্টের শেষ পর্যন্ত রবিবার ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে রাজি হয়। কিন্তু যে শহরগুলোতে জ্যান্টাইলদের কোনো আধিপত্য নেই এবং আইনিব্যবস্থা খুব একটা জোরালো নয়, সেখানে শনিবারকে সাপ্তাহিক ছুটির দিন রেখে রবিবার সকল ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু রেখেছে।

তা ছাড়া রবিবার যেহেতু জ্যান্টাইলদের সব শপিংমল ও ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো বন্ধ থাকে, তাই এ দিনে যদি ইহুদিরা নিজেদের দোকানপাট খোলা রাখতে পারে, তবে প্রতি ঘণ্টায় প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারবে। কারণ, বাজার তখন প্রতিদ্বন্দ্বীশূন্য থাকে। কিছুদিন আগে নিউইয়র্কের পঞ্চম অ্যাভিনিউ রেলওয়েতে একটি বড়ো বিজ্ঞাপন দেখা যায়, যেখানে উল্লেখ ছিল— প্রতি রবিবার, বিকেল ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ইহুদিদের একটি পাইকারি দোকান খোলা থাকবে। বিষয়টি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে যেই না পুলিশ ব্যবস্থা নিতে যাবে, অমনি বিজ্ঞাপনটি অদৃশ্য হয়ে যায়। তারা ভাবে, চুরি-চামারি করেও যদি এ দিনে কয়েক ঘণ্টার জন্য দোকান খোলা রাখা যায়, তাহলেও অনেক নগদ পয়সা উপার্জন করা যাবে।

নিউইয়র্ক প্রশাসন এই অর্থলোভী ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে বিশেষ একটি আইন পাশ করে। Penal Law ২১৪৯ অনুযায়ী—

'সাপ্তাহিক বন্ধের দিনে যদি কোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালু রাখে, তবে শহরের মেজিস্ট্রেটগণ কোনো প্রকার গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া তাদের সকল পণ্য বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। পরবর্তী সময়ে এই পণ্য সমাজের দুঃস্থ, গরিব ও দাতব্য সংস্থার মাঝে বণ্টন করা হবে।'

সত্যি যদি এই আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়, তবে ইহুদি অর্থলোভী ব্যবসায়ীরা উচিত শিক্ষা পাবে।

তৃতীয় মেজিস্ট্রেটের বর্ণণা অনুযায়ী—

'আমেরিকাকে পুড়িয়ে ভষ্মীভূত করবে— এমন একটি উদ্দেশ্য নিয়ে পূর্ব ইউরোপিয়ান ইহুদিরা এ দেশে প্রবেশ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগ প্রতিদিন যেন বেড়েই চলেছে। ইহুদিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অসংখ্য ফৌজদারি মামলায় আমেরিকার আদালতগুলো পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর ইহুদি নারীদের কথা বলে তো লাভ নেই।

তারা এমনভাবে নিজেদের উপস্থাপন করে, যেন সমাজের স্বর্বহারা দুঃখী জনগোষ্ঠী। আমি কখনোই বলব না— তারা অসহায় বা অবলা নারী; বরং তারা নতুন একটি মতবাদকে এ সমাজে চাপিয়ে দিতে চাইছে আর তা হলো— ফেমিনিজম। নারী স্বাধীনতার নাম করে ইহুদি নারীরা সমাজে যে নোংরা সংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে, তা যে অদূর ভবিষ্যতে প্রতিটি সভ্য দেশে বিষফোঁড়ায় রূপ নেবে, তা এখনই বলে রাখছি।

অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রীয় প্রশাসন আজ ইহুদিদের অধীনে চলে গেছে। বাকি অংশটুকু গ্রাস করতেও মনে হয় না খুব বেশি সময় লাগবে। ক্ষমতার প্রতি লোভ সবারই থাকে। কিন্তু এই ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পরই যে ইহুদিরা অত্যাচারী হয়ে উঠে, তার নজির ইতিহাসে ভুরিভুরি পাওয়া যাবে। কিছুদিন আগে নিউইয়র্কের এক লন্ড্রি ব্যবসায়ী আমার নিকট অভিযোগ করেছে, ইহুদিরা সিন্ডিকেট উপায়ে এ শহরের পুরো লন্ড্রি ব্যবসায়কে নিজেদের করে নিয়েছে এবং তাকে সেখান থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। ইতিহাস বারবার এটাই প্রমাণ করে, সুযোগ হাতে পেয়ে প্রতিবারই ইহুদিরা অত্যাচারী হয়ে উঠেছে।

এ শহরের পোস্ট অফিসগুলোতে প্রায় ১১,০০০ কর্মী কাজ করে, যাদের অর্ধেকেরও বেশি ইহুদি। পোস্ট ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেও তারা পৌঁছে গেছে। ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসবের দিনগুলো যেমন: রোশ হাসানা, নববর্ষ, ইয়ম কিপুর, প্রায়শ্চিত্ত দেবোস ইত্যাদি দিনগুলোতে তারা অফিসের যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ রাখে। অপর দিকে বড়োদিন, খ্রিষ্ট নববর্ষ, গুড ফ্রাইডে ইত্যাদি দিনগুলোতে পূর্ণ কর্ম দিবস পালন করে; এমনকী জ্যান্টাইলদেরও সেদিন কোনো ছুটি দেয় না।

প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে ইহুদিরা ইতোমধ্যেই প্রবেশ করতে শুরু করেছে, যা তাদের নতুন শক্তি এনে দিয়েছে। এখন ইহুদিরা নিজেরাই নতুন নতুন আইন তৈরি করতে পারবে এবং সুকৌশলে তা আমাদের জাতীয় পাঠ্যপুস্তকে ঢুকিয়ে দেবে, যা পাঠ করে এ দেশের নতুন প্রজন্ম বড়ো হয়ে উঠবে। তাদের আইন অনুযায়ী শনিবার ইহুদিদের জন্য আদালত ও ফৌজদারি কার্যক্রম বন্ধ থাকবে এবং রবিবার ব্যবসায়িক কার্যক্রম খোলা রাখার অনুমতি থাকবে।'

আরও একজন মেজিস্ট্রেটের বক্তব্য অনুযায়ী—

'কয়েক বছর আগে যখন লন্ডন ভ্রমণে যাই, দেখি-রবিবার সরকারি ছুটির দিনে ইহুদিরা পুরোদমে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই সুযোগ সবার জন্য ছিল না। কেবল ঘেটো অঞ্চলগুলোতে এই দিনে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালু রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সেদিন খুব দূরে নয়, যখন তারা মুক্ত পদাঘাতে সকল ঘেটোর সীমানা পেরিয়ে আমাদের সমাজে বসবাস শুরু করবে এবং ইহুদি আইনসমূহ সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেবে।'

ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ইহুদিদের আক্রমণ

আন্তর্জাতিকভাবে ইহুদিদের চূড়ান্ত আক্রমণ আসে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় চেতনার ওপর। ধর্মীয় চেতনাই ছিল শেষ শিকড়, যা আঁকড়ে ধরে আমরা বহু শতাব্দী অবধি নিজেদের ভ্রাতৃত্ব বন্ধন অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু বিশেষ সেই গোষ্ঠীর কাছে এই ধর্মভীরু চেতনা ছিল ইহুদি সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার পথে সর্বশেষ প্রতিবন্ধকতা। কীভাবে একটি জাতিকে নাস্তিক জাতিতে পরিণত করা যায়, সে সম্পর্কে তাদের প্রটোকলগুলোতে বেশ কিছু দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেমন:

'খোদাভীতি ও সৃষ্টিকর্তাকেন্দ্রিক ধর্মীয় বিশ্বাস মুছে ফেলার জন্য আমরা জ্যান্টাইলদের হৃদয়ে গাণিতিক বিভিন্ন হিসাব-নিকাশের ধারণা প্রতিস্থাপন করব এবং বস্তুবাদী পৃথিবীর প্রতি আকৃষ্ট করে তুলব। নাস্তিক জাতিতে পরিণত হওয়ার দরুন নির্দিষ্ট কোনো শাসনব্যবস্থায় তাদের আর বিশ্বাস থাকবে না। ফলে রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার বিষয়টি হয়ে যাবে জনগণের সম্পত্তি, যা থেকে আমরা ইচ্ছামতো ফায়দা লুটে নেব। আমরা তাদের ওপর এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা চাপিয়ে দেবো, যা তাদের নৈতিক চেতনা পঙ্গু করে দেবে এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পর্যন্ত ধ্বংস করে দেবে।'— ৫ম প্রটোকল

'প্রভাবশালী জ্যান্টাইল পাদরিদের ক্ষমতা হ্রাস করতে বহু আগ থেকেই আমরা তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছি।'— ১৭তম প্রটোকল

'বিশ্ব শাসন ক্ষমতার একক অধিপতি হওয়ার পর আমরা কেবল নিজেদের ধর্ম প্রচার করব। এর বিষয়বস্তু হবে— এক ঈশ্বর; আমরাই সৃষ্টিকর্তার মনোনীত সম্প্রদায় এবং পুরো বিশ্ববাসীর ভাগ্য একমাত্র আমাদের ভাগ্যের সঙ্গেই জড়িত। ফলে আমাদের ধর্ম ব্যতীত পৃথিবীর সকল ধর্ম ধ্বংস হবে এবং সবাই ইহুদি ধর্মে বিশ্বাস স্থাপন শুরু করবে। এর মধ্যে যদি কোনো গোঁড়া নাস্তিকের জন্ম হয়, তবে সে আমাদের জন্য কোনো হুমকির কারণ হবে না।'— ১৪তম প্রটোকল

'সকল ধর্মের সমান অধিকার' বিষয়টি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ইহুদিরা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ইউরোপ তৈরি করল। ১৯০৬ সাল থেকে আমেরিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সিলেবাস থেকে ধর্মীয় শিক্ষা পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার জন্য ইহুদিরা ক্রমান্বয়ে চাপ বৃৃদ্ধিত করতে থাকে। এবার ইহুদি ও আমাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ইহুদি আক্রমণের ঘটনা পর্যায়ক্রমে নিচে তুলে ধরা হলো:

৫৬৬১ (১৮৯৯-১৯০০ খ্রি.) ভার্জিনিয়া প্রদেশের সকল প্রশাসনিক অফিস থেকে 'খ্রিষ্টান' শব্দটি সরিয়ে দিতে ইহুদিরা আন্দোলন করে।

৫৬৬৭ (১৯০৬-১৯০৭ খ্রি.) সংবিধান থেকে যিশুর নাম সরিয়ে দিতে ওকলাহোমায় আন্দোলন করে। ইহুদিদের মতে, সেক্যুলার রাষ্ট্রের সংবিধানে ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহার করা নিন্দনীয়।

৫৬৬৮ (১৯০৭-১৯০৮ খ্রি.) ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র তৈরি দাবিতে চারদিকে ইহুদি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

৫৬৬৯ (১৯০৮-১৯০৯ খ্রি.) কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন দিবসে (Thanks Giving Day) খ্রিষ্ট ধর্মীয় সকল পরিভাষা বর্জন করতে হয়। ইহুদি প্রফেসর Gotthard Deutsch বলেন— 'উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রার্থনা সংগীত চর্চা বন্ধ করতে হবে।'

৫৬৭৩ (১৯১২-১৯১৩ খ্রি.) নিউইয়র্কে ইহুদি জনসংখ্যা হঠাৎ বৃদ্ধি পাওয়ার দরুন সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলোতে সচিব ও কেরানির চাহিদা বাড়তে শুরু করে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করত 'Christian preferred' বা 'Jews please do not apply'। সে বছর ইহুদি সংগঠনগুলো এ নিয়ে গভীর উদবেগ প্রকাশ করে। ইহুদিরা বলে, তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা এসব বিজ্ঞাপন থেকেই বোঝা সম্ভব।

৫৬৭৯ (১৯১৮-১৯১৯ খ্রি.) সামরিক বাহিনীতে নতুন কিছু রাজমিস্ত্রী চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় এবং সেখানে 'Christian preferred' উল্লেখ করা হয়। কেন এমন বিজ্ঞাপন প্রচার করা হলো, তার কৈফিয়ত জানতে Newton D. Baker-কে তলব করে Louis Marshall-এর নিকট পাঠানো হয়। প্রশ্ন হচ্ছে— এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর কয়জনই-বা রাজমিস্ত্রী পেশায় জড়িত!

সৈন্য নিয়োগ বিভাগের দায়িত্বে থাকা Provost Marshall Crowder এক বিবৃতিতে বলেন— 'যারা জন্মসূত্রে আমেরিকান নয়; বিশেষ করে ইহুদিরা, সামান্য কয়েকদিনের পরিশ্রমে একেবারে ভেঙে পড়ে। তাদের পক্ষে সমরিক বাহিনীতে বেশি দিন টিকে থাকা অসম্ভব।' বিষয়টি Louis Marshall-এর কানে পৌঁছামাত্র তিনি Mr. Crowder-কে টেলিগ্রাম করে বিবৃতিটি সরিয়ে নিতে বাধ্য করেন।

ইউনাইটেড শিপিং বোর্ড নতুন কিছু খ্রিষ্টান কর্মী চেয়ে Times পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে তারা বিজ্ঞাপনটি সংশোধন করে প্রকাশ করে, আগ্রহী প্রার্থীরা যেন আবেদনপত্রে ধর্ম ও জাতীয়তা উল্লেখ করে। কেউ এ নিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রদান করেছে কি না, তা ভাইভা বোর্ড খতিয়ে দেখে খ্রিষ্টানদের চাকরিতে প্রাধান্য দেওয়া হয়। কেন ধর্ম ও জাতীয়তা নিয়ে তারা এত বাড়াবাড়ি করল, তা নিয়ে ইহুদি সংগঠনগুলো কৈফিয়ত দাবি করে।

Kehillah বলে— 'আমি যে ইহুদি, এটা শুধু আমি জানলেই চলবে। বাহিরের মানুষ এসব জেনে কী করবে?' পরে প্রেসিডেন্ট সাহেবকে দিয়ে আইন পাশ করিয়ে শিপিং কোম্পানিটিকে শাস্তির মুখোমুখি করা হয়।

একই বছর ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম এবং লিবার্টি লোন কমিটি কিছু খ্রিষ্টান শর্টহ্যান্ড লেখক চেয়ে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। তাৎক্ষণিক Benjamin Strong প্রতিষ্ঠান দুটির চেয়ারম্যানের নিকট প্রতিবাদপত্র প্রেরণ করেন। পরে তারা বাধ্য হয়ে বিজ্ঞাপনটি সরিয়ে নেয়। এমন বিজ্ঞাপনের জন্য ট্রেজারি সেক্রেটারি McAdoo আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চান।

৫৬৮০ (১৯১৯-১৯২০ খ্রি.) এ বছর থেকে ইহুদি প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী নিয়োগের বিজ্ঞাপনগুলোতে ইহুদি প্রার্থীদের কথা উল্লেখ করতে সক্ষম হয়। আগের বছর যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠান খ্রিষ্টান কর্মী চেয়ে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করতে পারত না, সেখানে এ বছর তারা ইহুদি কর্মী চেয়ে বিজ্ঞাপণ প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। এটাই ইহুদিদের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।

৫৬৬৮ (১৯০৭-১৯০৮ খ্রি.) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাইবেল পাঠ ও বড়োদিন উদ্যাপন বন্ধ করার জন্য ইহুদিরা আন্দোলন শুরু করে। গালভেস্টোন, ক্লিভল্যান্ড, এল পাসো এবং ইংগস্টাওন-এর শিক্ষা বোর্ডগুলোকে বাধ্য করে, যেন পরবর্তী বছরের পাঠ্যসূচিতে 'Merchant of Venice' অন্তর্ভুক্ত করা না হয়।

৫৬৬৯ (১৯০৮-১৯০৯ খ্রি.) ইহুদিদের ভীষণ চাপের মুখে পেনসিলভানিয়ার বিদ্যালয়গুলো প্রাত্যহিক বাইবেল পাঠ বন্ধ করতে বাধ্য হয়। নিউ জার্সির বিদ্যালয়গুলোতে বাইবেল পাঠ শিক্ষার্থীদের জন্য ঐচ্ছিক করা হয়। অর্থাৎ ধর্মীয় বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের চাপ দেওয়া যাবে না। লুইসিয়ানার বিদ্যালয়গুলোতে বাইবেল পাঠ বন্ধ করতে স্থানীয় সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। বাল্টিমোরে ইহুদি নারী সমিতি শিক্ষাবোর্ডের নিকট দরখাস্ত করে, যেন বিদ্যালয়গুলোতে বড়োদিনের চর্চা বন্ধ করা হয়। ইহুদিদের চাপের মুখে ফিলাডেলফিয়ার শিক্ষা বোর্ড বড়োদিন চর্চা বন্ধ করে দেয়। রবিবারে ইহুদিরা যেন নিজেদের সকল শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালত চালু রাখতে পারে, তার অনুমতি চেয়ে নিউইয়র্ক হিব্রু পরিষদ স্থানীয় সরকারের নিকট আবেদন করে।

৫৬৭০ (১৯০৯-১৯১০ খ্রি.) পেনসিলভানিয়ার ব্রিজপোর্ট শিক্ষাবোর্ড সেখানকার বিদ্যালয়গুলোতে প্রার্থনা সংগীত গাওয়া বন্ধ করে দেয়। একই ঘটনা কেনটারি বিদ্যালয়গুলোতেও ঘটে। ক্লিভল্যান্ডের কিছু শিক্ষকের প্রচেষ্টায় 'Merchant of Venice' পুনরায় পড়ানো শুরু হলে একদল চরমপন্থি ইহুদি এপ্রিল মাসের গোড়াতে বিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষকে জোড়পূর্বক গল্পটি সরিয়ে নিতে বাধ্য করে।

৫৬৭১ (১৯১০-১৯১১ খ্রি.) ক্যালিফোর্নিয়ার ডেট্রইট শহরে অবস্থিত বিদ্যালয়গুলোতে প্রাত্যহিক বাইবেল পাঠ ও হামদ-নাত গাওয়ার বিরুদ্ধে ইহুদিরা প্রতিবাদ করে। নিউইয়র্কের বিভিন্ন স্থানে শনিবারের কর্ম দিবস বন্ধ রেখে রবিবার সবকিছু খোলার আইনি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।

৫৬৭২ (১৯১১-১৯১২ খ্রি.) কনেকটিকাট প্রদেশের হার্টফোর্ড শহরে অবস্থিত বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মচর্চা বাতিল করা হয়। নিউজার্সির বিদ্যালয়গুলোতে বাইবেল পাঠ ও ধর্মীয় সংগীত বন্ধ করার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব করা হয়। তিনজন প্রভাবশালী রাবাইয়ের অনুরোধে ম্যাসাচুসেট প্রদেশের রক্সবারি জেলার বিদ্যালয়গুলো থেকে Christmas tree ও খ্রিষ্টীয় সকল চিহ্ন সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে হার্টফোর্ড ও কানেকটিকাট শিক্ষাবোর্ড সকল সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি থেকে 'Merchant of Venice' সরিয়ে নেয়।

৫৬৭৩ (১৯১২-১৯১৩ খ্রি.) টেনসি শহরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাইবেল বন্ধ করানো হয়। ভার্জিনিয়া প্রদেশের রিচমন্ড শিক্ষাবোর্ড পুনরায় বাইবেলকে নিজেদের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে। পেনসিলভানিয়ার স্থানীয় সরকারের নিকট আবেদন করা হয়, যেসব শিক্ষক এখনও বাইবেল পড়াচ্ছে, তাদের যেন চাকরিচ্যুত করা হয়। তাদের চাপের মুখে পড়ে শিকাগো ও ম্যাসাচুসেটের শিক্ষাবোর্ড ধর্মীয় শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ জার্সিতে রবিবার কর্ম দিবস হিসেবে বরাদ্দ করার দরখাস্ত করা হয়।

৫৬৭৪ (১৯১৩-১৯১৪ খ্রি.) আমেরিকান সরকার অভিবাসন বিষয়ে নতুন নীতি প্রণয়ন করে। তখন ইহুদিরা জোড় প্রচেষ্টা চালায়, যেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইন পাশ না হয়।

৫৬৭৫ (১৯১৪-১৯১৫ খ্রি.) ক্যালিফোর্নিয়ার শিক্ষাবোর্ডকে কিছু বিষয় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, যেন সেগুলো শিক্ষার্থীদের পড়ানো না হয়।

৫৬৭৬ (১৯১৫-১৯১৬ খ্রি.) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হতে বাইবেল পাঠ বন্ধ করা নিয়ে ইহুদিদের এতসব আন্দোলন এ বছর সফল হয়। এ বছর থেকে ইহুদিরা 'Merchant of Venice'-এর সাথে 'Lamb's Tales' গল্পটিকেও সরিয়ে দেওয়ার আন্দোলনে নামে।

৫৬৭৭ (১৯১৬-১৯১৭ খ্রি.) অভিবাসন আইন নিয়ে ইহুদিরা এ বছর খুব ব্যস্ত ছিল। পরিশেষে সফলও হয়। এই বছর থেকে আমেরিকায় ইহুদিদের প্রবেশে আর কোনো বাধা থাকল না।

১৯১৯ সালের মধ্যে আমেরিকার ১৫০টি শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ইহুদিরা Merchant of Venice' ও 'Lamb's Tales' গল্প দুটিকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হয়। শিকাগো শিক্ষাবোর্ডের নিকট ইহুদিদের পাঠানো চিঠির অংশ বিশেষ নিচে উপস্থাপন করা হলো:

'আমরা জানতে পেরেছি, উচ্চমাধ্যমিক অনেক বিদ্যালয়ে এখনও Merchant of Venice নিয়মিত পড়ানো হচ্ছে। আমরা এই ভেবে ভীত হচ্ছি না যে, গল্পটি পাঠ করানোর দরুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ইহুদি শিক্ষার্থীরা মানসিক হিনম্মন্যতার স্বীকার হবে; বরং জ্যান্টাইল সন্তানদের অবচেতন মনে এটি ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক চেতনার জন্ম দেবে। এটা মানতে হবে, শেক্সপিয়র গল্পটি লিখেছেন কয়েক শত বছর আগে। তখনকার এবং আজকের পারিপার্শিক অবস্থা এক নয়। গল্পটি তিনি তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। এটা কেবল আপনাদের মতো পূর্ণবয়স্করা বুঝতে পারবে; নাবালক বাচ্চার এর কিছুই বুঝবে না।

শেক্সপিয়রকে যেমন আপনারা ভালোবাসেন, তেমনি আমরাও ভালোবাসি। গল্পটির 'Shylock' চরিত্রটি যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা সত্যি নাবালক সন্তানদের মনে সাম্প্রদায়িক মনোভাবের জন্ম দেবে। এই মানসিকতা নিয়ে বড়ো হলে আমরা কখনো একে অপরের বন্ধু হতে পারব না।

আমাদের বিষয়টির গুরুত্ব অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে এই গল্প ভর্তি পরীক্ষার সিলেবাস হতে বাদ দিয়েছে। আসা করি আপনারাও গল্পটি পাঠের ক্ষতিকর দিকগুলো উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে তা অবিলম্বে পাঠ্যসূচি হতে অপসারণ করবেন।'

মজার বিষয় হলো— তারা আগে থেকেই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষদের সঙ্গে আলাপ সেরে রাখত। চিঠি পাঠানো ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা। এটা ঠিক যে, বিদ্যালয়গুলোতে আর এই গল্পটি পড়ানো হবে না। তারপরও কোনো জ্যান্টাইল সন্তান যদি ঘরে বসে এই গল্পটি পাঠ করে, তবে তারা কি আর বাধা দিতে পারবে? মূলত ইহুদিরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে, যেন এই গল্পটি সমাজ থেকে মুছে দেওয়া যায়। মানুষ তো এখন আর বই পড়ে না। সিনেমা হলে গিয়ে সময় কাটাতেই বেশি পছন্দ করে। অতঃপর ইহুদিরা গল্পটির মূল কাহিনি যতটা সম্ভব পরিবর্তন করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে শুরু করে। কিছু উক্তি বাছাই করে তারা এমনভাবে প্রচার শুরু করে, যেন শেক্সপিয়র তাঁর অমৃত বাণীগুলো ইহুদিদের জন্যই রেখে গেছেন! যেমন:

'হ্যা, আমি একজন ইহুদি। ঈশ্বর কি আমাদের দেখার জন্য চোখ দেননি? তিনি কি আমাদের হাত, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, আবেগ, ভালোবাসা, অনুভূতি কিছুই দেননি?'

এরপর ইহুদিদের রোষানলে পড়ে আরেকটি কালজয়ী নাট্য-উপন্যাস, Macbeth। ধীরে ধীরে এমন আরও অনেক গল্প যে এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত হবে, তা সময়-ই দেখিয়ে দেবে। এসব ঘটনা প্রতিদিন-ই ঘটে চলছে। শুধু আমেরিকায় নয়; গোটা পৃথিবীকেই তারা ধর্মনিরপেক্ষ করার জোড় প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। যেখানে ইহুদিরা প্রকাশ্যে কাজ করতে পারছে না, সেখানে কাজ করছে এজেন্ট। আগেই বলেছি, জ্যান্টাইলরা অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করে অভ্যস্ত নয়; বরং অন্যের অধিকার রক্ষায় নিজেকে উৎসর্গ করাই তাদের রীতি। যে উদারপন্থি ও মুক্তমনা নীতিকে আমরা প্রগতির অংশ বলে মনে করেছি, তা-ই আমাদের সর্বহারা করে দিচ্ছে। একমাত্র ধর্মীয় শিক্ষাই পারে একটি জাতিকে আদর্শ ও শালীনরূপে গড়ে তুলতে। যে শিক্ষা নিয়ে আমরা শৈশবের গণ্ডি পেরিয়ে বাস্তব জগতের মুখোমুখি হব, তার সাথে যদি ধর্মীয় জ্ঞানের সমন্বয় না থাকে, তবে একসময় আমরা অসভ্য জাতিতে পরিণত হব। কারণ, তখন আমাদের বিবেকবোধ ও নৈতিকতা বলতে কিছুই থাকবে না। অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে ইহুদিদের আরও কিছু কুকর্মের বিবরণ নিচে উপস্থাপন করা হলো—

৫৬৬৯ (১৯০৮-১৯০৯ খ্রি.) ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইহুদিরা সাব্বাতকে জনসাধারণের মাঝে প্রচার করতে থাকে। ইহুদি উকিলরা অসুস্থতার দোহাই দিয়ে শনিবারের ফৌজদারি মামলাগুলোকে পিছিয়ে দেয়। ব্যবসায়ীগণ এ দিনে নিজেদের কার্যক্রম বন্ধ রেখে বে-আইনিভাবে সবকিছু রবিবার খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। এভাবে ধীরে ধীরে অনেক আমেরিকান এতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।

৫৬৭০ (১৯০৯-১৯১০ খ্রি.) ইহুদিরা শনিবারকে রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন প্রতিষ্ঠায় জোর প্রচেষ্টা চালায়। সেইসঙ্গে শুক্রবার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিস-আদালত যেন অর্ধ দিবস করা হয়, সেই আবেদনও করে। কারণ, সাব্বাত শুরু হয় শুক্রবার বিকাল থেকে, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়।

৫৬৭১ (১৯১০-১৯১১ খ্রি.) নিউইয়র্কের সুপ্রিমকোর্টে হিব্রু শিরোনামে ইহুদিরা একটি দরখাস্ত জমা দেয় 'Agudath Achim Kahal Adath Jeshurun'। তারা ভেবেছিল, বিচারক সাহেব হয়তো শিরোনামটুকু বাদ দিয়ে বাকি অংশ পড়ে নেবেন, কিন্তু তিনি পুরো দরখাস্ত পুনরায় ইংরেজিতে লিখে আনার কড়া নির্দেশ দেন। অন্যদিকে, ইহুদিরা শিকাগো নির্বাচন পিছিয়ে দেয়! কারণ, তা শনিবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

৫৬৭৩ (১৯১২-১৯১৩ খ্রি.) নিউ জার্সি, বেয়ন, হবকন ও ইউনিয়ন হিলসহ আরও অনেক শহরে ইহুদিরা শনিবার রাষ্ট্রীয় ছুটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

৫৬৭৪ (১৯১৩-১৯১৪ খ্রি.) অভিবাসন বিভাগ ইহুদি কর্মীদের জন্য শনিবার ছুটির ব্যবস্থা করে। ইহুদিদের পশু হত্যা প্রথা the Shehitah-এ বছরই প্রথম আলোচনায় আসে।

Kosher food হলো ইহুদিদের এক ধরনের ধর্মীয় ভোজ, যা বিভিন্ন প্রাণী ও পোকামাকড়ের শরীর দিয়ে তৈরি করা হয়। সরকারি স্কুলগুলোতে একসময় এই খাবার নিষিদ্ধ ছিল। কারণ, সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে তা গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। ইহুদিরা প্রতিবাদ করে বলে, তাদের অনেক সন্তানও তো এসব স্কুলে অধ্যয়ন করছে, অন্তত তাদের জন্য যেন এই খাবারের বৈধতা দেওয়া হোক। সেই প্রস্তাবনা বিভিন্ন শিক্ষাবোর্ডের নিকট পৌঁছে দেওয়া হয়।

৫৬৭৭ (১৯১৭-১৯১৮ খ্রি.) হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় শনিবার কেন ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করল, তা নিয়ে প্রচুর সমালোচনা শুনতে হয়। তখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইহুদিদের প্রতি অধিক সচেতন হয়।

এভাবে চলতে থাকলে প্রতিবছরের ক্যালেন্ডার এমনভাবে সাজাতে হবে, যেন সংখ্যালঘু এই সম্প্রদায়টির সাথে কোনো ধরনের ঝামেলা না বাধে। তবে পৃথিবীতে অনেক ভালো ইহুদি খুঁজে পাওয়া যাবে, যারা পরিবর্তিত তালমুদের অনুসারী নয়। কিন্তু এই গোষ্ঠিটি সংখ্যায় খুবই কম। আসলে পয়গম্বর মোজেসের ওপর আসা সেই তাওরাত আজও অক্ষুণ্ণ আছে কি না, তা নিয়ে বহু বিতর্ক রয়েছে। বাজারে এর অনেক ভার্সন খুঁজে পাওয়া যাবে।

একটি বিষয় লক্ষণীয়, ইহুদিদের এই ভালো জ্ঞাতি ভাইদের কখনো মিডিয়ার সামনে দেখা যায় না; মূলত আসতে দেওয়া হয় না। কারণ, ইহুদিরা চায় না, তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত ইহুদিদের মধ্য থেকেই হোক।

ইহুদিদের ধর্মীয় সংগীত 'Kol Nidre' এবং 'Eli, Eli' সম্পর্কে আলোচনা।

সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকার তিনটি শহরের (নিউইয়র্ক, ডেট্রইট, শিকাগো) থিয়েটার হলগুলোতে ইহুদিদের একটি ধর্মীয় সংগীত নিয়মিত পরিবেশিত হতে শোনা যাচ্ছে। প্রতিবার আমাদের এটাই বলা হচ্ছে যে, বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গানটি পরিবেশিত হচ্ছে। কিন্তু কারা এই সংগীতটি শোনার জন্য অনুরোধ করছে? এমন মিথ্যাচারের উদ্দেশ্য কী হতে পারে? সংগীতটির নাম হলো Eli।

১৯২০ সালে Jewish Daily News পত্রিকায় একজন ইহুদি লেখক একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি ইহুদি বর্ষ ৫৬৮১-কে অরাজকতাময় বর্ষ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন—

'নিজেদের জীবনধারায় ইহুদিরা যে একের পর এক ভুল করে চলেছে, তা তারা কখনোই আমলে আনবে না। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে তারা যে বিশৃঙ্খলার জন্ম দিয়েছে, তা বর্ণণাতীত।'

বিগত বছরে বিশ্বজুড়ে ইহুদিরা যে অরাজকতার জন্ম দিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: প্যালেস্টাইনে বিশৃঙ্খলতা, অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ-বিগ্রহে হস্তক্ষেপ, নিজ জাতিগোষ্ঠীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, স্বার্থপরতা, আত্ম-বিভ্রম ইত্যাদি। ইহুদিরা মানসিকভাবে অসুস্থ।

৫৬৮২ সালকে সামনে রেখে বলতে চাই, তাদের আর ইহুদি বলে সম্বোধন না করে ইজরাইলি বলে সম্বোধন করাই শ্রেয়। তাদের বিশ্বাস এই জাতির ভবিষ্যৎ সফলতা কেবল ইজরাইল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে সম্ভব এবং এটাই চূড়ান্ত ঠিকানা। ইহুদিদের পররাষ্ট্রনীতির সার সংক্ষেপ এই যে, পুরো পৃথিবী তাদের আধিপত্য ও বশ্যতা নির্দ্বিধায় মেনে নেবে।

এ জাতির প্রকৃত শত্রু মূলত তারাই, যারা ধর্মের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের মুনাফার পকেট ভারী করছে, যেমন: American Jewish Committe এবং রাজনৈতিক রাবাইগণ। বর্তমানে আমরা এমন এক মহান নেতার জন্য অপেক্ষা করছি, যিনি আমাদের নির্দয়, স্বার্থপর ও দুর্নীতিবাজ সমাজ থেকে মুক্তি দেবে। একই সঙ্গে ধ্বংস করবেন সে সকল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের, যারা আমাদের ধর্মকে কলুষিত করেছে। প্রকৃত মুক্তি তখনই মিলবে, যখন অন্যের সম্পদ জবরদখল করার পরিবর্তে আমরা পরিশ্রমের মাধ্যমে রুটি-রুজি উপার্জন করতে শিখব।

তখন দেখা যাবে— আমরাও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। আসলে 'ইহুদি' ও 'ইজরাইলি ইহুদি' বিষয় দুটির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের মাঝে কিছু বহিরাগত জীবের আগমন ঘটেছে। তাদের সনাক্ত করা হলেও আমাদের নেতাগণ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কারণ তাদের বিশ্বাস, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এ জাতীয় কিছু শক্তিশালী প্রাণীর প্রয়োজন। এই বহিরাগত প্রাণীরা ভবিষ্যতে যে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দেবে, তা এখনই বোঝা যাচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে, সত্যকে দমিয়ে রেখে কখনো একতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। প্রকৃত একতা প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে মিথ্যাকে স্থান দেওয়া যাবে না। সত্য যতই কঠিন হোক না কেন, তা সবাইকে মেনে নিতে হবে। একই আদর্শ ইহুদিদেরও হওয়া উচিত। DEARBORN INDEPENDENT যে সত্য প্রচারের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে, তার উদ্দেশ্য মূলত দুটি। এক, ইহুদিরা যেন নিজেদের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে। দুই, জ্যান্টাইল সম্প্রদায়গুলো যেন বিশেষ এই জাতিগোষ্ঠীটির সকল ছলচাতুরী সম্পর্কে নিজেদের সচেতন করে তুলতে পারে।

আমেরিকার সবচেয়ে বড়ো থিয়েটারের চূড়ায় অঙ্কিত হয়েছে স্টার অব ডেভিডসহ আরও অনেক ইহুদি প্রতিকৃতি। যেকোনো অনুষ্ঠানের শুরুতে কীর্তন করে গাওয়া হয় ইহুদিদেরই লেখা স্মৃতি-সংগীত, যা একসময় অসম্ভব ছিল। তবে Anti-Defamation League-এর ক্ষমতার বলে ইহুদিরা এ কাজ প্রতিটি আজ ছোটো-বড়ো প্রাব প্রতিটি শহরে করে যাচ্ছে।

তাদের 'Kol Nidre' সংগীতটির অর্থ হলো— 'সকল প্রতিশ্রুতি'। ইহুদিদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সংগীত তালমুদ ঘোষণার ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে—

'যে ব্যক্তি এই আকাঙ্ক্ষা করে, তার সকল শপথ ও প্রতিশ্রুতির কোনো মূল্য থাকবে না এবং তা পূরণে সে বাধ্য থাকবে না, তবে সে যেন বছরের শুরুতে 'Kol Nidre' সংগীতের চর্চা করে।'

সত্যি বলতে, এই Kol Nidre সম্পর্কে প্রাচীন তালমুদে পৃথক কোনো ঘোষণা আসেনি। ১৯১৯ সালে নিউইয়র্কে অবস্থিত Hebrew Publishing Company কর্তৃক প্রকাশিত 'Festival Prayers (প্রার্থনা সংগীত)' খণ্ডে প্রথমবারের মতো এই সংগীতটির উপস্থিতি পাওয়া যায়, যা পরবর্তীতে ইহুদি সংগঠনগুলো অনুমোদন করে। ১৯১৯ সালে প্রথমবার সংগীতটি যেভাবে প্রকাশিত হয়—

'বিভিন্ন নিবেদিত নামের ওপর কসম কেটে শপথ, প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার করেছি, এক প্রায়শ্চিত্র দিবস (ইয়ম কিপুর) হতে অপর প্রায়শ্চিত্র দিবস (ইয়ম কিপুর) পর্যন্ত, যা পরিপূর্ণ করতে আমরা সবাই বাধ্য ও অনুগত; নতুবা অনুতপ্ত, তা হতে আজ আমাদের মুক্তি দেওয়া হলো। আজ হতে আর কোনো শপথ আমাদের নিকট শপথ বলে গণ্য হবে না, কোনো প্রতিশ্রুতি পূরণের বাধ্যবাধ্যকতা থাকবে না এবং কোনো অঙ্গীকারের প্রতি আমাদের আনুগত্য থাকবে না।'

এটা যদি ইহুদিদের রহস্যময় অতীতের পরিচয় বহন করে, তবে তা কখনো অবহেলার চোখে দেখা উচিত নয়। এমন একটি সংগীত যা কখনো তাদের গ্রন্থে ছিল না, কিন্তু ১৯১৯ সালের সংশোধিত খণ্ডে প্রকাশ পেয়েছে। তখন বোঝা যায়, এটা নতুন করে সংযোজন করা হয়েছে। ইহুদিদের কাছে এই সংগীতের গুরুত্ব নেহাত কম নয়। বছরের শুরুতে কিছু ইহুদি বেহালা বাদক নিউইয়র্কে হাজির হয় এবং তাদের ঘিরে হাজারো ইহুদি ভক্ত কান্না শুরু করে। বেহালা বাদকের Kol Nidre গাওয়ার মধ্য দিয়ে ভক্তদের কান্নার পরিসমাপ্তি ঘটে। শেষ মুহূর্তে তারা এমনভাবে কাঁদতে শুরু করে, যেন নির্বাসিত জনগোষ্ঠী বহু বছর পর নিজ ভূমিতে ফিরে এসেছে।

এই সংগীত ইহুদিদের হৃদয়ের পবিত্র আবেগ ও ভালোবাসার একটি অংশ। তবে এই সংস্কৃতি জ্যান্টাইল সমাজ ব্যবস্থার জন্য কতটা হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা এই সংগীতের প্রতিটি বাক্যের ওপর গভীরভাবে দৃষ্টিপাত না করলে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এর সাথে যে বাদ্যসুরের চর্চা করা হয়, তা প্রাচীন ও জনপ্রিয়। Jewish Encyclopedia- তে এর প্রেক্ষাপট যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তা থেকে বোঝা যায়— চাইলেও এ সংগীত অর্চনা বন্ধ করা সম্ভব নয় এবং ইহুদিদের পাঠ্যপুস্তক থেকে এটি মুছে দেওয়া অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, সময়ের প্রয়োজনে ইহুদিরা এর প্রতিটি বাক্য ও শব্দ বিন্যাসে পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ, নিয়মিত পরিবর্তন ও পরিমার্জন করাও ইহুদি সংস্কৃতির একটি অংশ।

যদি এমন হতো, ইহুদিদের প্রার্থনা সংগীতে অতীত জীবনে ঘটে যাওয়া সকল ভুল- ত্রুটির জন্য ক্ষমা চাওয়া হচ্ছে, তবে তা ভিন্ন বিষয় ছিল। মানুষ স্বভাবতই ধর্মের প্রতি উদাসীন এবং মন্দ কাজের প্রতি অধিক আগ্রহী। তবে পুনরায় যখন ধর্মের কথা স্মরণ হয়, তখন সৃষ্টিকর্তার প্রতি পূর্বের সকল কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চায় এবং লজ্জিত হয়। এমনটা সব ধর্মেই দেখা যায়।

কিন্তু ইহুদিদের প্রার্থনা সংগীত Kol Nidre যেন অগ্রিম ঘোষণা দিয়ে রাখছে— ভবিষ্যৎ যেকোনো প্রতিজ্ঞা, প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার পালনে তারা আর বাধ্য থাকবে না। এটা যদি সত্যি ইহুদি ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হয়, তবে তাদের সঙ্গে কখনোই ব্যবসায়িক বা সামাজিক লেনদেনে যাওয়া উচিত নয়।

Kol Nidre-এর প্রকৃত প্রেক্ষাপট মূলত ব্যাবিলন থেকে শুরু। সেখানে ইহুদিদের দীর্ঘ একটি সময় বন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়েছিল, যা তাদের মনে ভীষণভাবে দাগ কেটেছিল। কী উদ্দেশ্য নিয়ে Kol Nidre-এর আবির্ভাব, তা অনেকেই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। নতুন একটি ভালো ব্যাখ্যা সামনে দাঁড়ানো মাত্রই পূর্বের ব্যাখ্যাটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

তবে সবাই একটি বিষয়ে একমত, বহু শতাব্দী ধরে রক্তপিপাসু খ্রিষ্টান জাতি পবিত্র যিশুর নামে ইহুদিদের ওপর যে বর্বর নিপীড়ন চালিয়েছে এবং খ্রিষ্টধর্মের প্রতি বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করেছে, তা থেকে পরিত্রাণ লাভের উপায় হিসেবে তারা এই সংগীত-অর্চনা সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। রক্ত-পিপাসু খ্রিষ্টানরা যদি ইহুদিদের খ্রিষ্টধর্মের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে বাধ্য করে, তবে মুখে তারা সে বশ্যতা স্বীকার করলেও মন থেকে কখনো করবে না।

এই সংগীতের সঠিক উৎপত্তিকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বেশ মতোভেদ রয়েছে। ১৯২১ সালের ১১ অক্টোবর Cleveland Jewish World সমাচার থেকে এই সংগীতের ওপর একটি কলাম প্রকাশ করা হয়, যার অংশবিশেষ নিচে তুলে ধরা হলো—

'অনেকে বিশ্বাস করে, স্পেনে যখন ইহুদিদের ওপর প্রথম নির্যাতন শুরু হয়, তখন তারা Kol Nidre সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, নিপীড়ন থেকে রক্ষা পেতে খ্রিষ্টধর্মের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করা ছাড়া তাদের আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তারা নিয়মিত বাঙ্কারে জমায়েত হতে শুরু করে এবং দীর্ঘ আলোচনার ভিত্তিতে এই সংগীত রচনা করে, যা স্বীকার করে আগামী বছরগুলোতে ইহুদিদের যে শপথ বা প্রতিশ্রুতি গ্রহণে বাধ্য করা হবে, তাদের নিকট এর কোনো মূল্য থাকবে না...'

একসময় খ্রিষ্টানরা যখন এই গুপ্ত অবস্থানের কথা জেনে যায় এবং বাঙ্কারের নিচ থেকে শত-সহস্র ইহুদিদের খুঁজে বের করে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাতে শুরু করে, তখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য ইহুদি সদস্যরা Kol Nidre-কে নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ বলে গ্রহণ করতে শুরু করে।

এ সকল বিবৃতির একটিও সঠিক নয়। এই সংগীতের ইতিহাস আরও পুরোনো। স্পেনিশ নিপীড়নেরও বহু শতাব্দী পূর্বে ইয়ম কিপুরের কোনো এক রাতে এই সংগীত রচিত হয়ছ। নবম শতাব্দীতে রাবাই Arman Goun-এর লেখা একটি সংগীতগ্রন্থে প্রথমবারের মতো এর সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি এমন একটি সূত্র উদ্ভাবন করেন, যা দ্বারা প্রমাণ করতে চান, ইয়ম কিপুরের রাতে সৃষ্টিকর্তার নিকট তারা যে সকল প্রতিজ্ঞা-প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করবে, তার কোনোটি পালনে আজ্ঞাবহ থাকবে না। তার সূত্র অনুযায়ী এটা Kol Nidre ছিল না; বরং Kol Nidrim-এর সঠিক রচনাকাল নিয়ে অসংখ্য বিতর্ক থাকলেও সবাই এই মর্মে একমত, তালমুদের প্রাচীন ও আধুনিক সংস্করণ এই সংগীতটিকে পরিপূর্ণ রূপে সমর্থন করে।

এবার আসি ইহুদিদের খুব জনপ্রিয় একটি হামদ 'Eli, Eli' প্রসঙ্গে। Book of Psalm-এর বাইশ নম্বর হামদের প্রথম শ্লোকের প্রেক্ষাপটকে ভিত্তি করে Eli Eli নামটি চয়ন করা হয়েছে। খ্রিষ্টান দেশগুলোতে এটি 'Cry of Christ on the Cross' নামে পরিচিত।

আশা করি আপনাদের Vaudeville Genre-এর কথা মনে আছে, যা দ্বারা আমেরিকার পুরো থিয়েটারশিল্পকে ইহুদিরা নিজেদের করে নিতে সক্ষম হয়। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ইহুদি মালিকানাধীন থিয়েটার ও সিনেমা হলগুলোতে নাটক বা চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পূর্বে এই হামদটি একবারের জন্য হলেও পরিবেশন করা হতো। উপস্থিত দর্শকদের বলা হতো, বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষিতে এ সংগীত পরিবেশন করা হচ্ছে। কিন্তু কারা এ সংগীত পরিবেশনের জন্য অনুরোধ করছে, তা কারও মগজে ঢুকত না। অবশ্য এ নিয়ে তেমন কেউ চিন্তাও করত না।

সত্যি বলতে, বিশেষ কোনো অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে নয়; বরং বিশেষ এক সংগঠনের ক্ষমতাবলে এই সংগীতটি নিয়মিত পরিবেশন করা হতো। তারা হলো Kehillah। এই হামদের প্রতি জ্যান্টাইলদের ন্যূনতম কোনো আগ্রহ নেই, তবুও জোর করে তা শোনানো হচ্ছে। হয়তো জ্যান্টাইলদের ওপর এটা বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলছে না ঠিক, তবে মানসিকভাবে তা ইহুদিদের উসকে দিচ্ছে— যেন তাদের অনাগত সন্তানরা ছোটোকাল থেকেই জ্যান্টাইলদের বিরুদ্ধে এক বিষম ঘৃণা ও অশ্রদ্ধাবোধ নিয়ে বেড়ে ওঠে।

Eli Eli কখনো ধর্মীয় সংগীত হতে পারে না। এই সংগীত জ্যান্টাইলদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ। নিউইয়র্কের যে কফি হাউজগুলোতে ইহুদিরা বলশেভিক বিপ্লবের পরিকল্পনা করত, সেখানে নিয়মিত এ গানের চর্চাও করত। রাশিয়া ও পোল্যান্ডসহ ইউরোপের অসংখ্য দেশে এই সংগীত চর্চার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বলশেভিক বিপ্লব নিয়ে তারা যত পত্রিকা বা ম্যাগাজিন প্রকাশ করত, সেখানে এর বাক্যগুলো নিয়মিত ছাপানো হতো। সহজভাবে বলতে গেল, খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে এই সংগীত ব্যবহার করা হয়। এটা তাদের মস্তিষ্কে মর্ফিনের মতো কাজ করে। গানটি মূলত ইডিশ ভাষায় রচিত। এর অনূদিত অংশ নিচে উপস্থাপন করা হলো—

'হে খোদা! হে খোদা! কেন আমাদের করেছ পরিত্যক্ত? আগুনের তপ্ত শিখায় তারা আমাদের করেছে অগ্নিদগ্ধ, সর্বত্র আমাদের নিয়ে করেছে পরিহাস, তথাপি ধৃষ্টতা করিনি ছেড়ে যেত সে ঐশী গ্রন্থ যাতে আছে আমাদের বাণী ও পথ নির্দেশিকা। হে খোদা! হে খোদা! কেন আমাদের করেছ পরিত্যক্ত? দিন-রাত কেবল এই প্রার্থনা করি, যেন ধর্মের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে বাঁচতে পারি আরও প্রার্থনা করি, যেন তুমি আমাদের পুনরায় রক্ষা করো!

আমাদের সকল পিতামহের দোহাই করে বলছি! আমাদের প্রার্থনা ও আর্তনাদ ফিরিয়ে দিয়ো না, কেবল তোমার করুণা তে আমরা রক্ষা পাব। কেননা ঈশ্বর তুমি, কেবলই এক। শুনো ইজরাইলবাসী, ঈশ্বর শুধু আমাদের, তিনি কেবলই একজন!'

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত এই সংগীত নিয়মিত প্রতিটি থিয়েটার ও সিনেমা হলে পরিবেশন করা হতো। আর অবুঝ খ্রিষ্টানরা অর্থ খরচ করে সেই হলগুলোতে এসব খাদ্য গিলতে যেত। বিগত শতাব্দীর কয়েক দশক ধরে এটি নিয়মিত পরিবেশিত হওয়ার ফলে এই সংস্কৃতি আমেরিকার প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। তারপর তা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চলচ্চিত্র সংস্থার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পৃথিবীজুড়ে। আজ হয়তো এই সংগীত সিনেমা হলগুলোতে নিয়মিত পরিবেশন করা হয় না, কিন্তু ইহুদিদের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক নানান প্রতিকৃতি সাংকেতিক চিহ্ন আকারে বিশ্বের অসংখ্য অলিগলিতে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব প্রতিকৃতি ও সাংকেতিক চিহ্নের অর্থ সাধারণ জ্যান্টাইলরা বুঝতে না পারলেও ইহুদি সন্তানরা বেশ ভালোভাবেই বুঝতে পারে। এর মাধ্যমে তারা নিজ সম্প্রদায়কে জানান দিচ্ছে আমরা আছি, থাকব এবং আমরাই শক্তিশালী।

যারা Eli Eli সংগীতটি শুনেছে, তারা হয়তো ইডিশ ভাষা না জানার দরুন এর অর্থ বুঝতে পারেনি। তবে এর সাথে বাদ্যযন্ত্রের যে সুরলা ধ্বনি পরিবেশন করা হয়, তা যে কতটা হৃদয়স্পর্শী, তা হয়তো অনেকেই উপলব্ধি করতে পেরেছে। এখানে বলা হয়েছে, আগুনের তপ্ত শিখায় 'তারা' আমাদের পুড়িয়ে মেরেছে এবং সর্বত্র করেছে পরিহাস। এই তারা দিয়ে কাদের বোঝানো হচ্ছে? অবশ্যই জ্যান্টাইল জাতিদের! হৃদয়স্পর্শী সুরেলা বাদ্যযন্ত্রের সাথে এ সংগীত গাওয়া সময় যখন তারা ক্রন্দনরত অবস্থায় পৌঁছে যায়, তখন কি মনে হয় না— ইহুদিরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিচ্ছে এবং এ জন্য তারা পূর্ণরূপে প্রস্তুত!

প্রকৃতপক্ষে জ্যান্টাইলদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের বহু বছরের প্রতিক্ষিত যুদ্ধ যে ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, তা চারদিকে তাকালেই উপলব্ধি করা সম্ভব। ইহুদিদের প্রটোকলসমূহের কতটুকু অংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, এই যুদ্ধ তার একটি বড়ো ইঙ্গিত দিচ্ছে। আজকের জ্যান্টাইল সমাজ যে চলচ্চিত্র ও সংগীত সাধনায় মেতে উঠেছে, তা মূলত ইহুদিদের সংস্কৃতি চর্চা ব্যতীত অন্য কিছু নয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00