📘 সিক্রেটস অব জায়োনিজম > 📄 অর্থ : ইহুদি ক্ষমতার মূল উৎস

📄 অর্থ : ইহুদি ক্ষমতার মূল উৎস


যে কয়টি পরিবারের হাত ধরে ইহুদিরা আজ এতটা ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছে, তাদের মধ্যে রথচাইল্ড অন্যতম। সপ্তদশ শতাব্দীর পর থেকে বিশেষ এই জাতিগোষ্ঠীটির যে আকস্মিক উত্থান, তার পেছনে এই পরিবারটির উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তা ছাড়া ইজরাইল পুনঃপ্রতিষ্ঠা, লিগ অব নেশনস ও জাতিসংঘ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে তাদের ছিল প্রভাবশালী ভূমিকা। ইউরোপের প্রতিটি যুদ্ধে উভয় পক্ষকেই তারা ঋণ দিত। যে দেশ বিজয়ী হতো, তাদের কাছ থেকে উচ্চহারে সুদের ভিত্তিতে ঋণের অর্থ ফেরত নিত। অন্যদিকে, পরাজিত দেশটির সকল সম্পদ তাদের দায় মেটানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। এভাবে রথচাইল্ড ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী পরিবারে পরিণত হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় (১৭৭৫-১৭৮৩) আমেরিকার বিপক্ষশক্তি ব্রিটিশ সেন্যবাহিনীকে ২০ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদান করে।

Mayer Amschel Rothschild হলেন বিখ্যাত এই পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। ১৭৪৪ সালে তিনি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৭৬৩ সালে দুষ্প্রাপ্য মুদ্রার (Rare Coin) ব্যবসায় শুরু করেন। এর সাথে ছিল 'Money Exchange'-এর বাণিজ্য। সেখান থেকেও প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। তার ব্যবসায়িক দক্ষতার কারণে Prince Wilhelm তাকে জার্মানির অর্থ বিভাগে নিয়োগ দেয়। যে অর্থ তিনি আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বিপক্ষশক্তিকে ঋণ দিয়েছিলেন, সেই অর্থই পরবর্তী সময়ে ফরাসি বিপ্লবে (১৭৮৯-১৭৯৯) বিনিয়োগ করেন।

তার ছিল পাঁচ ছেলে। এদের মধ্যে চারজনকে সামান্য কিছু অর্থ দিয়ে চার দেশে প্রেরণ করেন। বড়ো ছেলে Amschel Mayer তার সাথে ফ্রাঙ্কফুটে থেকে যায়। বাকিরা- Solomon Mayer ভিয়েনাতে, Nathan Mayer লন্ডনে, Carl Mayer নেপোলিতে এবং James Mayer প্যারিসে পাড়ি জমায়। এবার পাঁচ ছেলে প্রত্যেকেই স্ব স্ব দেশের একজন উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক কর্মকর্তার মেয়েকে বিয়ে করে, যা তাদের প্রতিটি দেশের প্রশাসনিক দপ্তরে প্রবেশের পথ সহজ করে দেয়।

তারপর পারিবারিক সম্পদ ব্যবহার করে তারা নিজ নিজ রাষ্ট্রকে উচ্চ সুদে ঋণ দিতে শুরু করে। যেমন: ওয়াটারলু যুদ্ধে ব্রিটেনকে ঋণ দেয় Nathan। এ ছাড়াও বিগত কয়েক শতকে ইউরোপে যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে, তার প্রত্যেকটিতেই এই পরিবার প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছে। তারা এত পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেছে যে, একসময় প্রতিটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও শেয়ার বাজারগুলো সম্পূর্ণ নিজেদের করে নেয়। তারা প্রতিষ্ঠা করে 'Red-Shield', যা ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী আর্থিক সংগঠন।

প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও তাদের ভয়ংকর ভূমিকা ছিল; এমনকী হিটলারের ইহুদি নিধনে প্রজেক্টেও তারা প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে রথচাইল্ড পরিবারের সম্পদের সঠিক আঙ্কিক পরিমাণ নিরূপণ করা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যে অর্থের কল্যাণে তারা এতটা সম্পদশালী হয়েছে, তার অপর নাম 'ব্লাড মানি'। কারণ, অর্থের লোভে তারা গোটা ইউরোপকে অসংখ্যবার রক্তাক্ত করেছে। বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে অর্থ ব্যবসার ধারা পৃথিবীর প্রতিটি দেশে প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়েছে। যে ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমকে কেন্দ্র করে আজ বিশ্বজুড়ে ডলারভিত্তিক অর্থব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তাতেও রথচাইল্ড পরিবারের বিশাল ভূমিকা রয়েছে।

১৮৩৭ সালে তাদের প্রথম প্রতিনিধি August Belmont আমেরিকায় প্রবেশ করে। গৃহযুদ্ধ চলাকালে তিনি Democratic National Committe-এর চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমান Morningside Heights চার্চে তার নামে একটি স্মৃতিসৌধ 'Belmont Memorial' সংরক্ষিত আছে।

১৯১৪ সালের বিশ্বযুদ্ধ আরও আগেই শুরু হওয়ার কথা ছিল। শুধু তাদের ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কল্যাণে যুদ্ধ কিছুটা বিলম্বে শুরু হয়। উল্লেখ্য, পূর্বনির্ধারিত সময়ে শুরু হলে অনেক দেশকে তারা এই যুদ্ধে সামিল পারত না; যাদের সাথে অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে। যেমন: ১৯১১ সালে রথচাইল্ড পরিবারের ফাঁস হয়ে যাওয়া একটি চিঠি থেকে জানা যায়- তারা জার্মান সম্রাট Kaiser-কে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়।

Jewish Encyclopedia অনুযায়ী- 'কৃষি কাজে ইহুদিরা স্বভাবত কম আগ্রহী, তবে মূল্যবান খনিজ শিল্পে তাদের যথেষ্ট উৎসাহ রয়েছে। যেমন: Rothschild পারদ শিল্পকে, Barnato Brothers and Werner, Beit & Company হিরাশিল্পকে এবং Lewisohn Brothers and Guggenheim Sons তামা ও রূপাশিল্পকে বহু বছর যাবৎ নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে।'

Encyclopedia-তে আরও উল্লেখ আছে- 'ঋণের সুদ প্রতিটি রাষ্ট্রের ওপর এক ক্রমবর্ধনশীল জাতীয় দায় জন্ম দেয়। আর ধীরে ধীরে তা এতটা প্রকট আকার ধারণ করে, সেখান থেকে অধিকাংশ রাষ্ট্রই বের হয়ে আসতে পারে না। ইহুদিরা আন্তর্জাতিক ঋণ-ব্যবসায়কে পুঁজি করে গড়ে তুলেছে নিজেদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব। এখন অনেক জ্যান্টাইল প্রতিষ্ঠান অধিক মুনাফার লোভে একই পথ অনুসরণ করতে শুরু করেছে; যা ইহুদিদের ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।'

রথচাইল্ডের একটি বাণী আছে- এক পাত্রে সব ডিম রাখতে নেই। তারা সকল রাজনৈতিক দলের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করে; চাই তা ক্ষমতাসীন হোক কিংবা বিরোধী দল। ফলে যুদ্ধ কিংবা নির্বাচনে যে দল যেভাবেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, মূল ক্ষমতা তাদের হাতেই থেকে যায়।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অনুমান করা হচ্ছিল Kuhn, Loeb & Company খুব দ্রুতই ওয়ালস্ট্রিটকে নিজেদের করে নিতে যাচ্ছে। E. H. Harriman যখন আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে রেলপথ নির্মাণের জন্য মূলধন সন্ধান করছিলেন, তখন Kuhn, Loeb & Company তাদের শেয়ারগুলো অবলেখন করে মূলধনের ব্যবস্থা করে দেয়। আমেরিকার আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট রয়েছে, যেখানে তারা একই উপায়ে কাজ করে যাচ্ছে। পরে নিজেরাই সেই শেয়ারগুলোর মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে জ্যান্টাইলদের নিকট বিক্রি করে দেয়।

এই ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন Jacob Schiff। তিনি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুটে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন রথচাইল্ডের একজন ব্রোকার। তার প্রধান দুই সহকারী ছিলেন Otto Khan ও Felix Warburg। Otto Khan-এর জন্ম মেইনহামে। ছোটোকাল থেকে তিনি আরেক ইহুদি ব্যাংকিং পরিবার Speyers-এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আর Felix Warburg পরিণত বয়সে Jacob Schiff পরিবারের একজন সদস্যকে বিয়ে করেন। এভাবে তারা নিজেদের মাঝে গড়ে তোলে এক শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন, যাতে তাদের সম্পদ কোনোভাবেই জ্যান্টাইলদের হাতে চলে না যায়। Amschel Rothschild তার যে পাঁচ ছেলেকে পাঁচ দেশে প্রেরণ করেন, তাদের সন্তানরাও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজেদের চাচাতো ভাই-বোনদের মধ্যে বিয়ে করে নেয়।

শুধু আমেরিকাতেই নয়; যে স্থানগুলো পরবর্তী সময়ে অর্থ-বাণিজ্যের কেন্দ্র বিন্দু হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, তার প্রতিটি স্থানেই তারা নিজেদের কার্যক্রম প্রসারিত করেছে। দক্ষিণ আমেরিকা, মেক্সিকো, জাপান ও রাশিয়া হলো এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

তারা মেক্সিকোতে অর্থনৈতিক উপদেষ্টারূপে হাজির হয়। জাপান-রাশিয়া যুদ্ধে Jacob Schiff প্রচুর অর্থ পাঠিয়ে জাপানকে সহযোগিতা করে, যেন এখান থেকেই রাশিয়ার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বসিয়ে দেওয়া যায়। মূলত, জাপান-রাশিয়া যুদ্ধই ইহুদিদের জন্য বলশেভিক আন্দোলনের পথ সহজ করে দেয়। জাপানের কারাগারগুলোতে যে সকল রাশিয়ান সৈন্যরা বন্দি ছিল, জার সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষেপিয়ে দেওয়াই ছিল এই অর্থ বিনিয়োগের অন্যতম উদ্দেশ্য। তারা এই সুযোগে জাাপনকেও কবজা করতে চেয়েছিল। কিন্তু জাপান রাজা সতর্ক ব্যক্তি হওয়ায় ইহুদিদের ভাবগতি ভালো করেই জানতেন। তাই তিনি এই অর্থ সাহায্যের বিষয়টিকে একটি ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে গ্রহণ করেন এবং অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে নাক গলানো থেকে তাদের দূরে রাখেন। এ বিষয়টি তাদের ভীষণভাবে ক্ষেপিয়ে তোলে। ফলে ইহুদিরা প্রতিশোধের জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করে। আর এখান থেকেই জাপান-আমেরিকা দ্বন্দ্বের সূচনা।

তারা যেসব অন্ধকার পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে নিজেদের করে নিয়েছে, তার বর্ণনা দিতে গেলে অনেক নোংরা গল্প বেড়িয়ে আসবে। Robins, Lamars ও Arnsteins-এর মতো ইহুদিদের অন্যান্য সদস্যরাও যেভাবে ওয়ালস্ট্রিটে থাবা বসিয়েছে, তা কখনো ভোলার মতো নয়। বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থনীতিতে তারল্য ফিরিয়ে আনতে আমেরিকান সরকার লিবার্টি বন্ড ইস্যু করেন, কিন্তু তার দুই বছর না পেরোতেই ১২ মিলিয়ন ডলারের স্টক ও বন্ড আত্মসাৎ হয়। এ নিয়ে অনেক বিতর্ক হলেও অনুসন্ধানি রিপোর্টে কারও নাম প্রকাশ পায়নি।

ওয়ালস্ট্রিটের শেয়ার কেনা-বেচার কাজে তখন এক শ্রেণির 'ম্যাসেঞ্জারবয়' কাজ করত। তারা স্টক ও বন্ডের দলিল এক হাউস থেকে অন্য হাউসে নিয়ে যেত এবং সঠিক ব্যক্তির নিকট মালিকানা বুঝিয়ে দিত। কোনো দলিল হারিয়ে গেলে তার মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া খুব কঠিন হতো। কারণ, জমির দলিলের মতো এসব কাগজেও হাতবদল ও জালিয়াতির সুযোগ ছিল। ফলে ম্যাসেঞ্জারবয়ের কাজটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

১৯১৮ সাল। বসন্তের শুরু থেকে গ্রীষ্মের প্রথম পর্যন্ত অনেক ম্যাসেঞ্জারবয় ওয়ালস্ট্রিট বাজার থেকে গায়েব হওয়া শুরু করে। ওয়ালস্ট্রিট খুব ছোট্ট একটি জেলাশহর। এই ছোট্ট শহরের বিভিন্ন গলিতে স্টক ব্রোকাররা অফিস খুলে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করত। অনেক সময় একটি অফিস থেকে অন্য অফিসের দূরত্ব কোনো একটি ভবনের এক ফ্লোর থেকে অন্য ফ্লোরের দূরত্বের সমান হতো। তাহলে এমন কী হলো, যার জন্য ছোট্ট একটি পথ পাড়ি দিতেই ম্যাসেঞ্জারবয়রা গায়েব হয়ে যাচ্ছে! ব্যাপারটা যেন এমন, মাটিই তাদের শুষে নিচ্ছে।

বিষয়টি তখনই ঘটা শুরু করে, যখন ওয়ালস্ট্রিটে প্রতি মাসে ২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন হচ্ছিল। সরকারের আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের প্রতিটি মানুষ অল্প হলেও কিছু বন্ড ক্রয় করতে শুরু করে। এমনও হয়েছে, প্রতিদিন ২ মিলিয়নের বেশি শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে। এমন সময় দায়িত্বশীল ম্যাসেঞ্জারবয়দের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে ওঠে। যদি কোনো ব্যক্তি স্টক দলিল সময়মতো হাতে না পেত, তবে তার সব অর্থ জলে যাওয়ার মতো অবস্থা হতো।

এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে মানুষ প্রতিটি স্টকের বিমা করা শুরু করে। তবে সে সময় যে পরিমাণ স্টক ও বন্ড সিকিউরিটিজ চুরি হচ্ছিল, তাতে বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এতটা ক্ষতি বহন করা সম্ভব ছিল না। ওয়ালস্ট্রিট কমিটি আইনি তৎপরতা শুরু করে। তারা গোয়েন্দাকর্মী নিয়োগ এবং হারিয়ে যাওয়া সিকিউরিটিজগুলো উদ্ধারের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে ইতোমধ্যে শেয়ারবাজারের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা কোনো এক অজানা কারণে প্রকাশ করা হয়নি। কারণ, এতে হয়তো সাধারণ মানুষ আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে এবং স্টক ও বন্ড ক্রয়ে অনিচ্ছুক হয়ে পড়বে। কিন্তু নিউইয়র্কের এমন কোনো কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন ছিল না, যারা এই তথ্য জানত না।

১৯২০ সালের শুরুতে তাদের কিছু সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের স্বীকারোক্তি থেকে এমন কিছু তথ্য জানা যায়, যা আমেরিকার ইতিহাসে কখনোই ঘটেনি। একটি তরুণ সংগঠনের পরিচয় পাওয়া যায়, যাদের নিউইয়র্কের প্রভাশালী ইহুদিচক্র বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ দিয়ে ওয়ালস্ট্রিটে ম্যাসেঞ্জারবয় হিসেবে চাকরির জন্য পাঠাত। নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে তারা খ্রিষ্টানদের নাম ব্যবহার করত। ফলে ব্রোকার হাউসগুলো তাদের চাকরি দিতে কোনো রকম দ্বিধাবোধ করত না।

আশা করি এখন আর বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, কেন তারা সামান্য পথ পাড়ি দিতেই অদৃশ্য হয়ে যেত। ছদ্মবেশি ম্যাসেঞ্জারবয়রা শেয়ার দলিলগুলো তুলে দিত তাদের সন্ত্রাসী সংগঠনের হাতে, যার নাম 'Confidence Men'। এটির আরও একটি নাম ছিল 'Bank-roll Men'। কিন্তু পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার পরও তাদের কোনোরূপ শাস্তি দেওয়া হয়নি। কারণ, অসংখ্য উকিল ও আইনজীবীদের দ্বারা এই সংগঠনটি সুরক্ষিত ছিল। চুরি হয়ে যাওয়া স্টক ও বন্ডগুলোকে নেওয়া হতো ক্লিভল্যান্ড, বোস্টন, ওয়াশিংটন, ফিলাডেলফিয়া ও কানাডায়। এর বিনিময়ে সংগঠন ও ম্যাসেঞ্জারবয়দের দেওয়া হতো মোটা অঙ্কের কমিশন।

একবার কোনো এক ম্যাসেঞ্জারবয় চুরি করা স্টক ও বন্ডগুলো সামান্য অর্থের বিনিময়ে তাদের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়নি। সে দলিলগুলো নিয়ে পালিয়ে যায় এবং নতুন কোনো গোষ্ঠীর নিকট উচ্চমূল্যে বিক্রির পরিকল্পনা করে। তাকে খুঁজে বের করতে গুপ্তঘাতক নিয়োগ করা হয়। অনেক কষ্টে তাকে খুঁজে পাওয়া গেলেও দলিলগুলো আর উদ্ধার করা যায়নি। ফলে তাকে তৎক্ষণাত হত্যা না করে বাঁচিয়ে রাখা হয়। ছদ্মবেশে তার সাথে বন্ধুত্ব করে বেশ কিছুদিন মজা করা হয়, মদ ও সুন্দরী নারীর নেশায় ভুলিয়ে রাখা হয়। সবশেষে জানা যায়, দলিলগুলোর তার কোটের আস্তরণের নিচে সেলাই করা আছে। এর পরপরই তাকে হত্যা করা হয়। তার মৃতদেহ উদ্ধারের পর ডজনখানেক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।

জ্যান্টাইল ম্যাসেঞ্জারবয়দেরও তারা বিভিন্ন প্রলোভনে নিজেদের সংগঠনে যুক্ত করার চেষ্টা করত। একবার যদি কেউ যুক্ত হয়েছে, তবে তার আর ফিরে আসার উপায় নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমনই এক জ্যান্টাইলের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, যখন সে এই সংগঠনটি থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলে, তখন তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। দলের সর্দার পরিষ্কার জানিয়ে দেয়-
'আমি বিশ্বাসঘাতকতা একদমই পছন্দ করি না। যদি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো, তবে তোমাকে খুন করব। আর যদি আমি নিজে তোমাকে খুন না করি, তবে আমার দলের কেউ না কেউ অবশ্যই খুন করবে। কারণ, আমরা চাই না আমাদের পরিচয় প্রকাশিত হোক।'

এত সব প্রমাণ ও স্বীকারোক্তির পরও এই দলপতিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্যদিকে যেসব ম্যাসেঞ্জারবয় সংগঠন থেকে বেড়িয়ে আসতে চাইছে, উলটো তাদেরকেই শাস্তির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। সামান্য সংখ্যক ইহুদি এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় ধরা পড়ে। কিছুদিন যেতে না যেতেই তারাও জেল থেকে মুক্তি পায়। কারণ, বড়ো বড়ো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে আছে।

এটাই হলো আমাদের বিচারব্যবস্থার বর্তমান রূপ। অর্থ-বিত্তের জোরে ইহুদিদের হাজারটা অপরাধও মাফ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যে জ্যান্টাইলরা অভাবের তাড়নায় তাদের ফাঁদে পা দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে, তাদেরকেই ভোগ করতে হচ্ছে অনিশ্চিত কারাজীবন।

ওয়ালস্ট্রিট দখল করা নিয়ে ইহুদিদের পরিকল্পনা
আমেরিকায় ইহুদি বিতর্ক শুরু হয়েছে মূলত একটি শহরকে কেন্দ্র করে, তা হলো 'নিউইয়র্ক'। ইহুদিদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য হলো- যখন তারা কোথাও যাবে, তখন একত্রে যাবে এবং সেখানে নিজেদের খুঁটি প্রতিষ্ঠিত করবে। গুটি কয়েক ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এবং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ছাড়া এই শহরের বাকি সব প্রতিষ্ঠান আজ তাদের দখলে। পুলিশ কমিশনার General Bingham-এর তথ্য অনুযায়ী- তৎকালীন নিউইয়র্কের প্রায় ৫০ ভাগ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য ইহুদি জনগোষ্ঠীটিই দায়ী।

কার্যগত পার্থক্যের দিক দিয়ে ইহুদিরা যেখানে স্বল্পমেয়াদে ঋণ দেয়, সেখানে জ্যান্টাইলরা দেয় দীর্ঘমেয়াদে। ফলে অর্থের তারল্য ইহুদিদের নিকট সব সময়ই বেশি থাকে। তাই যেকোনো সংকটকালীন মুহূর্তে তারাই প্রথম অর্থ বিনিয়োগের ক্ষমতা রাখে। এ জন্য দেখবেন, ইউরোপ-আমেরিকার বেশিরভাগ রাজপথ, রেলপথ ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রথম ইহুদিরাই বিনিয়োগ করত। তাদের ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো অল্প পরিমাণ অবিহিত মূল্যে বিভিন্ন পাবলিক প্রকল্পের শেয়ার অবলিখন করে নিত। পরে কৃত্রিম উপায়ে (স্পেকুলেশান সৃষ্টির মাধ্যমে) শেয়ারগুলোর মূল্য বাড়িয়ে দিত এবং তা বর্ধিত মূল্যে ওয়ালস্ট্রিটে বিক্রি করত। ফলে কী হতো? প্রকল্পগুলোর সকল দায়দায়িত্ব সাধারণ জনগণের কাঁধে চলে যেত। আর মাঝখান থেকে ইহুদিরা বিশাল অঙ্কের মুনাফা নিজেদের করে নিত। অন্যদিকে, জ্যান্টাইল প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগকৃত অর্থ আদৌ ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা বা সেই অর্থ ফেরত পাবে কি না, তা প্রায় সময়ই অনিশ্চিত থাকত। কারণ, ঋণ নিয়ে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে অর্থ ও সম্পদ নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার নজির বাজারে কম ছিল না।

ওয়াল স্ট্রিটের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাংকটি হলো Kuhn, Loeb & Company, যার সদস্যগণ হলেন- Jacob Schiff, Mortimer, Otto H. Kahn, Paul M. ও M. Warburg। এ ছাড়াও ওয়ালস্ট্রিটের অন্যান্য প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: Speyer & Company; J. and W. Seligman & Company; Lazard Freres; Ladenburg, Thalmann & Company; Hallgarten & Company; Knauth, Nachod & Kuhne; Goldman, Sachs & Company।

ইহুদিরা এতটাই ধূর্ত ও কৌশলী, বাজার যেন তাদের অন্ধকার অংশটুকু দেখতে না পারে, সে ব্যবস্থা পূর্বেই করে রেখেছে। শুধু ভোগ্য পণ্যের বাজার নয়; খনিজ পণ্যের ওপরও তারা একক আধিপত্য বিস্তার করেছে। যেমন: লোহা, ইস্পাত, সোনা, রুপা, তেল ইত্যাদি।

মজার বিষয় হলো- আজকের ওয়ালস্ট্রিট বাজারে যে বড়ো বড়ো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, তার কোনোটিরই ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে এখন আর ইহুদিদের দেখা যায় না। ছোটোখাটো কিছু প্রতিষ্ঠান বাদে সকল বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠান এখন জ্যান্টাইলদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীটি কেন ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা থেকে সরে এলো? এমনকী ইহুদিরাও আজ জ্যান্টাইল প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্থ-সম্পদ জমা করছে! হঠাৎ এমনটা হওয়ার কারণ কী?

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে যথেষ্ট দুর্নাম কামিয়েছে; Joseph G. Robin-এর ব্যাংকিং ব্যর্থতা অন্যতম উদাহরণ। তার আসল নাম হলো Robonovitch। তিনি জনগণের জমাকৃত অর্থ রাশিয়ার বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতেন। একসময় সেই প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে দেউলিয়া হওয়া শুরু করে, যা পূর্ব পরিকল্পিত ছিল কি না জানা যায়নি। তবে তার এমন বিনিয়োগের জন্য অসংখ্য আমানতকারী সর্বহারা হয়ে যায়। আদালতও Dr. Robin-এর প্রতিষ্ঠানটিকে কিছু বলতে পারছে না। কারণ, দেউলিয়া তো হয়েছে রাশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো!

এমন অসংখ্য ঘটনা তখন আমেরিকার আকাশে-বাতাসে উড়ছিল, তাই একসময় সাধারণ মানুষ ইহুদিদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্থ জমানো বন্ধ করে দেয়। সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং শিল্পে ফিরিয়ে আনতে 'জ্যান্টাইল ফ্রন্ট' বিষয়টি আবারও কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। এ কারণে দেখা যায় ক্যাশিয়ার, ম্যানেজার, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার, অপারেটর, মার্কেটার ইত্যাদি পদগুলোতে যারা বসে আছে, তারা হলো খ্রিষ্টান, হিন্দু বা মুসলমান। এসব দেখে সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করে, এসব জ্যান্টাইলদের প্রতিষ্ঠান!

খুব ধীর গতিতে হলেও ওয়ালস্ট্রিট শেয়ারবাজার আজ ইহুদিদের দখলে চলে গেছে, যদিও এর শুরুটা সহজ ছিল না। Sereno S. Pratt-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মে, ১৭৯২ সালে ওয়ালস্ট্রিটের ২২ নম্বর গলিতে একটি ছোট্ট অফিস প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শেয়ার বাজারে তার যাত্রা শুরু। প্রতিদিন কাজের শেষে একদল ব্রোকার নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে ওয়ালস্ট্রিট-এর ৬৮ নাম্বার গলিতে Buttonwood গাছের নিচে জড়ো হতো। ৮ মার্চ, ১৮১৭ এরূপ ২৪ জন শেয়ার ব্রোকার নিজেদের মধ্যে আলোচনার সাপেক্ষে ওয়ালস্ট্রিট শেয়ার বাজারের একটি গঠতন্ত্র তৈরি করে; যা 'Buttonwood Agreement' নামে পরিচিত।

ওয়ালস্ট্রিট মূলত একটি প্রাইভেট স্টক মার্কেট। ব্রোকারগণ কমিশনের ভিত্তিতে এ বাজারে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির শেয়ার কেনা-বেচা করত। এর সদস্যসংখ্যা ১১০০ জনে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ এই ১১০০ জন সদস্যই কেবল ওয়ালস্ট্রিট বাজারের 'ফার্স্ট ফ্লোরে' প্রথম শ্রেণির ব্রোকার হিসেবে নিজেদের এবং মক্কেল প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার কেনা-বেচার কাজ করতে পারবে। ১৯২০ সালে এই প্রতিটি সদস্যপদের মূল্য ছিল প্রায় ১০০০০০ ডলার।

সদস্যপদ গ্রহণ ও হস্তান্তর নিয়ে ছিল যথেষ্ট কঠোরতা। মাত্র দুটি উপায়ে একজন বহিরাগত এ বাজারের সদস্যপদ লাভ করতে পারত।
এক. যদি কোনো সদস্য মারা যায়, তবে তার সদস্যপদ উত্তরাধিকারীর নিকট হস্তান্তরিত হতো।
দুই. যদি কোনো সদস্য দেউলিয়া হয়ে যায় বা ইচ্ছাকৃত অবসর গ্রহণ করতে চায়, তবে তার সদস্যপদ ক্রয়ের মাধ্যমে।

৪০ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিচালক কমিটি দ্বারা এই বাজার পরিচালিত হতো। এই কমিটিতে বহু বছর কোনো ইহুদি জায়গা পায়নি। ১৯১৫-১৬ সালের দিকে প্রথমবারের মতো একজন ইহুদি ব্রোকার কমিটিতে জায়গা পায়। পরিচালক কমিটির ১৫ জন সদস্য নিয়ে আরেকটি ছোটো কমিটি ছিল, যারা শেয়ার বাজারে নিবন্ধিত সদস্যদের দেখভাল করত। নতুন কোনো ব্যক্তি এই বাজারের সদস্য হতে চাইলে তাকে অবশ্যই এই কমিটির নিকট আবেদন করতে হতো। যেহেতু শেয়ার বাজারের সদস্য সংখ্যা ১১০০ এবং এর সাথে নতুন কোনো পদ সংযোজন করা হবে না, তাই কেউ ইচ্ছা করলেই এর সদস্য হতে পারত না। যদি আবেদনের মাধ্যমে নতুন কেউ সদস্যপদ লাভ করতে চায়, তবে তাকে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের সমর্থন পেতে হবে। আর ইহুদিদের প্রতি তো বহু আগ থেকেই জ্যান্টাইলদের মনে ক্ষোভ জমে আছে, তাই কেউ চাইত না এই বাজারে ইহুদিদের আগমন ঘটুক।

মূলত ধৈর্য ও অধ্যবসায় তাদের চরিত্রের চরম দুটি গুণ, যার দরুন তারা যা চেয়েছে তাই পেয়েছে। সেই শুরুর দিকে ওয়ালস্ট্রিটে তাদের সদস্য ছিল মাত্র পাঁচজন কী সাতজন। কিন্তু বিংশ শতাব্দী শুরু হতে না হতেই তা দুশো ছাড়িয়ে যায়। আর আজ তো এ বাজার তাদেরই দখলে। প্রশ্ন হলো- কীভাবে এত বিধিনিষেধ সত্ত্বেও তাদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে?

প্রথমত, ইহুদিরা তাদের সদস্যপদ কোনো জ্যান্টাইলের নিকট হস্তান্তর করত না। দ্বিতীয়ত, শেয়ারবাজারে যখন মন্দা দেখা দিত, তখন কিছু জ্যান্টাইল সদস্য দেউলিয়া হতো। ফলে তাদের পদটি নিলামে তোলা হতো। তারা এই সময়টির অপেক্ষায় ওত পতে থাকত। তারা যে অর্থে নিলাম ডাকত, তা দ্বারা দেউলিয়া হওয়া সদস্যটি সকল ঋণ ও দায় মিটিয়ে নিজের জন্য অতিরিক্ত কিছু জমা রাখতে পারত। এই অতিরিক্ত অর্থের লোভে জ্যান্টাইল প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়ে ইহুদিদের কাছে সদস্যপদ বিক্রি করত।

তৃতীয়ত, ইহুদিরা নিজেদের নাম পরিবর্তন করে খ্রিষ্টানদের নাম ব্যবহার করত, যা দেখে মনে হতো তারাও অ্যাংলো-সেক্সনের জাতিভুক্ত। নাম পরিবর্তন করা ইহুদিদের হাজার বছরের ঐতিহ্য। যখন কোনো সম্প্রদায় ইহুদিদের বর্জন করে, সেখানে পুনরায় প্রবেশ করতে তারা সেই সম্প্রদায়দের নাম ব্যবহার করত।

১৯০৫ সালে যখন রাশিয়া থেকে ইহুদিদের বের করে দেওয়া হয়, তখন তারা রাশিয়ান নাম ব্যবহার করে পুনরায় প্রবেশ করে। শেয়ারবাজার তাদের বর্জন করলে খ্রিষ্টানদের নাম যেমন: Smith, Adam, Robin ইত্যাদি ব্যবহার করে সদস্যপদ লাভের আবেদন করতে শুরু করে। কেউ বুঝতেও পারে না, তার পাশে যে লোকটি দাঁড়িয়ে আছে বা একটু আগে সে যার সাথে কথা বলল, সে একজন ইহুদি। সময়ের সাথে সাথে শেয়ারবাজারে তাদের সদস্যসংখ্যা কীভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, নিচে ছকটিতে দেখানো হলো।

| বছর | শেয়ারবাজারের মোট সদস্য সংখ্যা | ইহুদিদের সদস্য সংখ্যা |
| :----- | :-------------------------- | :------------------- |
| ১৮৭২ | ১,০০৯ | ৬০ |
| ১৮৭৩ | ১,০০৬ | ৪৯ |
| ১৮৯০ | ১,১০০ | ৮৭ |
| ১৮৯৩ | ১,১০০ | ১০৬ |
| ১৯১৯ | ১,১০০ | ২৭৬ |

লক্ষ করলে বুঝবেন, শেষের কয়েক বছরে তাদের সদস্যসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মূল কারণ, তাদের ছদ্মনাম কৌশল। স্পেকুলেশান ও গেম্বলিং মানে বোঝায়, অধিক ঝুঁকি আছে জেনেও অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আসায় ঝুঁকিযুক্ত শেয়ারগুলোতে অর্থ বিনিয়োগ করা। এই শেয়ারগুলোর বিক্রয়মূল্য অভিহিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম থাকে। ইতিহাস থেকে জানা যায়- ইহুদিরা যতবার এই ঝুঁকিযুক্ত শেয়ারগুলো ক্রয় করেছে, ততবারই লাভবান হয়েছে। এর কারণ, তাদের নিকট প্রচুর তথ্য থাকত, যা দ্বারা বুঝে যেত কখন কোন শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি এবং হ্রাস পাবে।

ওয়ালস্ট্রিটের ৩০ নাম্বার গলিতে গড়ে উঠেছে 'ক্লাব মার্কেট', যেখানে তাদের ব্রোকারগণ তেল, গ্যাস, লোহা ইত্যাদি খনিজ পদার্থের বাণিজ্য করে থাকে। এ ছাড়াও এমন আরও অনেক গলি আছে, যেখানে তারা ছোটো ছোটো ক্যাম্প করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার সিকিউরিটিজ লেনদেন করে যাচ্ছে। মিথ্যা ও ভুল তথ্য প্রচারের মাধ্যমে ইহুদিরা সাধারণ মানুষকে এই বাজারের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে। সাধারণ মানুষও তাদের কথায় প্ররোচিত হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উপার্জিত অর্থ এই বাজারে বিনিয়োগ করছে।

এমন অনেকে আছে যারা নিজেদের বাড়ি, শস্যজমি ও কলকারখানা বন্ধ রেখে সামান্য কিছু মুনাফার আসায় ব্রোকারদের হাতে অর্থ তুলে দিয়েছে। তাদের তেমন কোনো ধারণাই নেই- এই বাজারে কী হচ্ছে; যে কোম্পানির শেয়ার কিনছে তার দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু।

ইহুদি ব্রোকারগণ একদিকে কমিশন খাচ্ছে, আবার যদি কোনো প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যায়, তার শেয়ারগুলোও অনেক কম মূল্যে কিনে নিচ্ছে। সত্যি বলতে, এই বাজারে দয়া-মায়ার কোনো স্থান নেই। এটি শুধু চোর-ডাকাতদের বাজার। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও পত্রিকা অফিসের এমন কেউ নেই, যে ওয়ালস্ট্রিটের কালো অধ্যায় সম্পর্কে অবহিত নয়। যেভাবে আজ এই বাজারের ওপর আক্রমণ এসেছে, একইভাবে পৃথিবীর আরও অনেক শেয়ারবাজারেও আক্রমণ আসবে, হয়তো ইহুদিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে; কোনো কিছুই নজরের বাইরে নয়।

ইহুদিদের হাজার বছরের ছদ্মনাম সংস্কৃতি
এ পর্যন্ত অনেকবার বলা হয়েছে- জ্যান্টাইলরা যখন ব্যবসায়-বাণিজ্যে ইহুদিদের অংশগ্রহণের ওপর নিষেদ্ধাজ্ঞা আরোপ করত, তখন তারা নিজেদের পরিচয় খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন ছদ্মনামের আড়ালে গোপন করত। তাদের এই নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়; এটা হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতি।

সেমেটিক অঞ্চলগুলোতে আরবি নাম, ইউরোপের দেশগুলোতে অ্যাংলো-সেক্সনদের নাম ইহুদিদের হর-হামেশাই ব্যবহার করতে দেখা যেত। প্রাচীনকাল থেকে তাদের মনে একটি বিশ্বাস ছিল, নতুন নাম ভাগ্যে নতুন কিছু নিয়ে আসবে এবং হাজার অনিষ্ট থেকে মুক্তি দেবে। তারা এমনও বিশ্বাস করত, অসুস্থ্য ব্যক্তির নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম রাখলে সে হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবে। পবিত্র বাইবেলেও এমন কিছু উদাহরণ পাওয়া যায়। যেমন: Abram হয়ে যায় Abraham এবং Jacob হয়ে যায় Israel।

Madansky ভাইয়েরা নিজেদের নাম Max, Benjamin, Solomon, Jacob-এর পর 'May' যোগ করে নতুন নাম রাখে। ফলে Max হয়ে যায় Max May এবং Benjamin হয়ে যায় Benjamin May। এই নামগুলো শুনে মনে হতে পারে Madansky ভাইয়েরা অ্যাংলো-সেক্সনের জাতভুক্ত; যদিও তাদের উৎপত্তি এশিয়া মহাদেশে।

এমনও হয়েছে, রাতারাতি এক ঘোষণার মাধ্যমে ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসরত ইহুদিদের বিশেষ কিছু নাম পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে, যা তারা নিজেরাও জানত না। যেমন: লস অ্যাঞ্জেলসের বিখ্যাত অভিনেতা Elmo Lincoln একবার আইনি কোনো কাজে তার স্ত্রীকে নিয়ে আদালতে যান। গিয়ে দেখেন তার নাম Otto Linknhelt হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে।

এভাবে Levy হয়ে গেলেন Lytton, যিনি ছিলেন আমেরিকার একটি বিখ্যাত বিপণি বিতানের মালিক। সেকালের একজন বিখ্যাত সংগীতশিল্পীর গল্প শোনা যায়, যিনি বিয়ের আগে জানতেন তার স্ত্রী স্পেনিশ। কিন্তু বিয়ের পর জানলেন, তার স্ত্রী ইহুদি এবং তার নাম Bergenstein। মূলত তাদের প্রতিটি নামের পেছনে বেশ ভালো কিছু ইতিহাস লুকিয়ে থাকে, যা সবার পক্ষে উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে Belmont নামটির ইতিহাস উপস্থাপন করা যাক।

যেমন: উনিশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত জার্মান ইহুদিরা নিজেদের পারিবারিক নাম ব্যবহার করত না। তারা বলত- 'Joseph ben Jacob' অর্থাৎ Jacob-এর পুত্র Joseph। বাবার নাম তারা উপাধি হিসেবে ব্যবহার করত। কিন্তু নেপোলিয়নের শাসনামলে সেনহাড্রিনের এক ঘোষণায় ইহুদিদের নাম নির্ধারণ সংস্কৃতিতে বড়ো পরিবর্তন আসে। তাদের জন্য কিছু উপনামের তালিকা তৈরি করে দেওয়া হয়। মণিমুক্তা, পশু-পাখি, গাছপালা, কীটপতঙ্গ ইত্যাদির নামগুলো ইহুদিরা উপাধি হিসেবে ব্যবহার করত। যেমন: Goldstein, Silberberg, Mandelbaum, Lilienthal, Ochs, Wolf ও Loewe।

কিছু জার্মান তাদের বাবার নামের সঙ্গে 'Son' যোগ করে নিজেদের নাম নির্ধারণ করত। যেমন: Jacobson, Isaacson। আবার অনেকে তাদের আশেপাশের শহর-বন্দর ও নদীর নাম অনুকরণে নিজেদের নাম নির্ধারণ করত। যেমন: বার্লিনের অধিবাসীরা তাদের নাম রাখে Berliner, সোহানবার্গের অধিবাসীরা রাখে Schoenberg। এর অর্থ 'সুন্দর পাহাড়'। এই নামটিকে ফরাসি ভাষায় পরিবর্তন করলে হয় Belmont। অর্থাৎ Schoenberg ও Belmont শব্দ দুটির অর্থ 'সুন্দর পাহাড়'।

এই Belmont পরবর্তী সময়ে Rothschilds-এর প্রতিনিধি হয়ে আমেরিকায় গমন করেন। তাহলে বিখ্যাত পরিবার Rothschilds নামের উৎস কী? সত্যি বলতে এই নামটির ইতিহাস উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। যতদূর জানা যায়, ফ্রাঙ্কফুটের কোনো এক ইহুদি পরিবার তার ঘরের সামনে লাল রং-এর একটি ঢাল ঝুলিয়ে রাখত, সেখান থেকে Red Shield-কে তাদের পারিবারিক লোগো হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

বলশেভিক বিপ্লবে তারা নিজেদের নামগুলো রাশিয়ান ভাষায় পালটে ফেলে। যেমন: Leo Bronstein হয়ে যায় Leo Trotsky; জার্মান শব্দ Apfelbaum হয়ে যায় Zinoviev; হিব্রু শব্দ Cohen হয়ে যায় Volodarsky; Goldman হয়ে যায় Izgoev এবং Feldman হয়ে যায় Vladimirov। সাধারণ একটি নামের পেছনেও যে এত ইতিহাস লুকিয়ে থাকতে পারে, তা কি সাধারণ মানুষের পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব?

যদি একজন পোলিশ ইহুদির নাম হয় Zuckermandle, সে কখনো হাঙ্গেরিতে প্রবেশ করবে না। কারণ, উভয় দেশের পারস্পরিক বিরোধের দরুন এই নাম যেকোনো সময় তাকে বিপদে ফেলতে পারে। তাই নাম পালটে সে হয়ে যায় Zukors, যা হাঙ্গেরিয়ান শব্দ। কিন্তু যখন সে আমেরিকায় প্রবেশ করবে, তখন Mr. Zuckermandle নামটি অপরিবর্তিত রাখলে কোনো সমস্যা নেই।

মূলত তিনটি কারণে ইহুদিদের নাম পরিবর্তন করতে দেখা যায়। এক. তারা যে অন্য দেশের নাগরিক, তা বুঝতে না দেওয়া। দুই. ব্যবসায়িক কাজে যেন কোনো বাধা না আসে। তিন. সামাজিক কারণ। তাদের একটি নাম কীভাবে বহু নামে রূপ নিয়েছে, তার কিছু উদাহরণ Jewish Encyclopedia থেকে উপস্থাপন করা হলো-
• Asher থেকে হয়েছে Archer, Ansell, Asherson.
• Baruch থেকে হয়েছে Benedict, Beniton, Berthold.
• David থেকে হয়েছে Davis, Davison, Davies, Davidson.
• Isaac থেকে হয়েছে Sachs, Saxe, Sace, Seckel.
• Jacob থেকে হয়েছে Jackson, Jacobi, Jacobus, Jacof Kaplan, Kauffmann, Marchant, Merchant.
• Jonah থেকে হয়েছে Jones, Joseph, Jonas.
• Judah থেকে হয়েছে Jewell, Leo, Leon, Lionel, Lyon, Leoni, Judith.
• Levi থেকে হয়েছে Leopold, Levine, Lewis, Loewe, Low, Lowy.
• Moses থেকে হয়েছে Mortiz, Moss, Mortimer, Max, Mack, Moskin, Mosse.
• Solomon থেকে হয়েছে Salmon, Salome, Saloman, Salmuth.

আরও অনেক নাম Jewish Encyclopedia তে আছে, যা বিভিন্ন সময়ে তারা পরিবর্তন করেছে। যেমন: Barnett, Barnard, Beer, Hirschel, Mann, Mendel, Mandell, Mendlsohn ইত্যাদি। নতুন কোনো নাম গ্রহণের পর ইহুদিরা প্রচারণায় নেমে যেত, যেন তা সাধারণ মানুষের মনে দ্রুত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। কাজ ও ব্যবসায়ের প্রকারভেদে তাদের রয়েছে পৃথক পৃথক নামের শ্রেণি।

সামরিক রসদ বাণিজ্যে Lucile, Mme ও Grande নামগুলো প্রায়ই ব্যবহৃত হতো। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের নাম নির্ধারণেও তারা কম কলাকৌশল জাহির করেনি। যেমন : Reuben Abraham Cohen যখন চাইল তার অস্ত্রগুলো যুদ্ধের প্রথমেই বিক্রি হয়ে যাক, তখন দোকানের নাম পালটে রাখলেন R. A. Le Can, যা অনেকটা ফরাসি ধাঁচের। একইভাবে Mr. Barondesky হয়ে গেল Barondes বা La Baron।

অনেক সময় তারা নিজেদের চামড়ার রং-এর ওপর ভিত্তি করে নাম নির্ধারণ করে। যেমন, সাদা বর্ণের ইহুদিরা নিজেদের নামে Millers শব্দটি ব্যবহার করে। Aarons হয়ে যায় Arnold ও Allingham। আবার Cohens থেকে হয় Druce, Freeman, Montagu, Rothbury ও Cooke।

Cohens নামটি তাদের মাঝে খুব প্রচলিত। দেখা যায়- যে রাস্তা থেকে পুরাতন কাপড় সংগ্রহ করছে, তার নাম Cohen। যে পশু জবাই করছে, তার নাম Cohen। একজন আইনজীবী, তার নামও Cohens। এত সব Cohens-কে তারা নিজ পেশার নাম অনুযায়ী আলাদা করতে শুরু করে যেমন: Attorney Cohan। একই উপায়ে Kaplan হয়ে গেল Chaplin। ফলে, Charlie Kaplin হয়ে গেল Charlie Chaplin। তাদের নিকট সে একজন বড়ো অভিনেতা, কিন্তু জ্যান্টাইলদের নিকট ‘গরিব ইংলিশ বালক’। এমনি আরেকজন বিখ্যাত অভিনেতা Rev. Stephen S. Wise। তার জন্ম হাঙ্গেরিতে হওয়ায় সেখানে তার পারিবারিক নাম ছিল Weisz। কখনো এই নামটিকে জার্মান ভাষায় বলা হতো Weiss। এই নামটি আমেরিকান ভাষায় রূপান্তর করলে হয় White। তবে White অপেক্ষা Wise অধিকতর ভালো বলে নামটি হয়ে গেল Rev. Stephen S. Wise।

চলচ্চিত্র জগতে Mr. Selwyn জনপ্রিয় আরেকটি নাম। তার প্রকৃত নাম Schlesinger। তবে এই নামে আরও অনেকে ছিল বলে অন্যরা তাদের নাম পরিবর্তন করে রেখেছে Sinclairs। আমেরিকান রাবাইদের অনেকে কমবেশি বিভিন্ন সময়ে নিজেদের নাম পরিবর্তন করেছে। যেমন: Rabbi Posnansky হয়ে গেলেন Rabbi Posner এবং Kalen হয়ে গেল Kalensky।

এমনও দেখা গেছে, টাকা ধার করার সময় তারা ছদ্মনাম ব্যবহার করত, যেন টাকা নিয়ে ভেগে যাওয়া যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের চাকরি শেষে ইহুদিরা নতুন নাম গ্রহণ করত, যেন নতুন কর্মক্ষেত্রে পুরোনো কাজের অভিযোগ শুনতে না হয়।

আশা করি ‘Kosher’ শব্দটি মনে আছে। যে ধর্মীয় প্রক্রিয়ায় ইহুদিরা পশু জবাই করে তাকে Kosher বলে। তবে এ প্রক্রিয়াটি সমাজে বসবাসরত অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সমস্যা তাদের ধর্মীয় আইনে নয়; বরং কসাইখানাগুলোতে। কারণ, অধিকাংশ কসাইখানায় মুনাফাকে অধিক প্রাধান্য দেওয়া হতো। তাই পশু হত্যা বর্বর পর্যায়ে রূপ নিত। জ্যান্টাইলরা যখন Kosher সংস্কৃতি বন্ধ করতে আন্দোলন শুরু করে, তখন ইহুদিরা এই শব্দের পারিভাষা পালটে ফেলে। প্রচার করতে শুরু করে- Kosher হলো- 'শহরের সবচেয়ে ভালো খাবারের স্থান!'

ইহুদিরা যাই করুক না কেন, তাদের প্রতিটি কাজের মধ্যেই একটি শিল্প থাকে; এর জন্য সাধুবাদ জানানো উচিত। এ জাতীয় কূটকৌশল সাধারণত জ্যান্টাইলদের মাথায় কখনো আসে না। এ জন্য ইহুদিরা সব সময় আমাদের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে থাকে। ক্ষমতা, অর্থ-সম্পদ বা প্রতিপত্তি যাই বলি না কেন, সবকিছুতে ইহুদিরা জ্যান্টাইলদের চেয়ে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু এভাবে বড়ো হয়ে লাভ কী? মানুষকে ধোঁকা দিয়ে সম্পদ দখল করে নিজেরটা বাড়িয়ে লাভ কী?

সত্যি বলতে যদি জ্যান্টাইলরাও ইহুদিদের পথ অবলম্বন করত, তাহলে তারাও অনুরূপ সম্পদের মালিক হতে পারত। কিন্তু এতে তো সমাজের চতুর্দিকে নোংরামি, নগ্নতা, খুন-খারাপি, অত্যাচার-অনাচারে ভরে উঠত। তখন মানুষ আর পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকত না। শান্তিতে বেঁচে থাকতে চাইলে আমাদের মধ্যকার শয়তানদের অবশ্যই সনাক্ত করতে হবে।

প্রথমে তাদের ভালো হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। যদি শত চেষ্টা করেও শোধরানো সম্ভব না হয়, তবে তাদের চূড়ান্ত ভাগাড়ে নিয়ে ফেলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। তবে এ জন্য প্রথমে নিজেদের শিক্ষিত ও বুদ্ধিমানরূপে গড়ে তুলতে হবে। না হয় বছরের পর ইহুদিদের ধোঁকার স্বীকার হয়ে যেতে হবে।

আদর্শ অর্থের বৈশিষ্ট্য
মানুষ আমৃত্যু যে জিনিসটির পেছনে অধিকাংশ সময় ব্যয় করে তা হলো- অর্থ। অর্থ থেকে জন্ম নেয় অর্থনীতি। কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়, অর্থের সংজ্ঞা কী? দেখা যাবে অনেকে এর সঠিক উত্তর দিতে পারছে না। ডলার, টাকা, রুপি, রিয়াল ইত্যাদি বহুকাল আমাদের চোখে অর্থ বলে পরিচিত হয়ে আসছে; যদিও এগুলো হলো 'কারেন্সি', যা তৈরি হয় বাতাস থেকে।

আমাদের অবচেতন মন 'অর্থ ও কারেন্সি' বিষয় দুটি এক করে ফেলেছে, কিন্তু তা এক নয়। এমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, যা দ্বারা বিষয় দুটির মাঝে পার্থক্য গড়ে তোলা সম্ভব। ইতিহাস অধ্যয়ন করলে তিন ধরনের উপকরণ পাওয়া যাবে, যেগুলো বিভিন্ন যুগে অর্থ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যথা: স্বর্ণ-রৌপ্য, কাগজি নোট এবং ভোগ্য পণ্য।

হেনরি ফোর্ডের মূল বইয়ে এই অধ্যায়টি ছিল না। পূর্বের দুটি অধ্যায়ের উপস্থাপিত বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার করার স্বার্থে এই অধ্যায়টি সংযোজন করা হয়েছে। সম্প্রতি অর্থ ব্যবস্থার ওপর Michael Maloney-এর লেখা Gold & Silver বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ইতোমধ্যে তা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অতিরিক্ত অংশটুকু এই জনপ্রিয় বইয়ের সারাংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হলো।

তিনি বইটিতে আদর্শ অর্থের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করেছেন:
১. গ্রহণযোগ্য বিনিময়মাধ্যম: বিনিময় মাধ্যম বলতে একটি তৃতীয় মাধ্যমকে বোঝানো হয়, যা দ্বারা ক্রেতা-বিক্রেতারা তাদের লেনদেন সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করতে পারে। একসময় মানুষ বার্টার ট্রেড পদ্ধতিতে পণ্যের বিপরীতে পণ্য বিনিময় করত, যেমন: দুধের বিপরীতে ডিম, আটার বিপরীতে চাল ইত্যাদি। সেখানে তৃতীয় কোনো মাধ্যম ছিল না। এরপর এক যুগ আসে যখন মানুষ স্বর্ণ-রৌপ্য ও মূল্যবান ধাতব পদার্থকে তৃতীয় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা ব্যবহার করছি কাগজি নোট ও মুদ্রা। এভাবে গড়ে উঠে গ্রহণযোগ্য বিনিময় মাধ্যম এবং অবসান ঘটে বার্টার ট্রেড পদ্ধতির।

২. মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা: বার্টার ট্রেডের একটি বড়ো সমস্যা হলো মূল্য নির্ধারণে অপারগতা। এ কারণে সে যুগের বাণিজ্য একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর আসে স্বর্ণ-রৌপ্য ভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় স্বর্ণ-রৌপ্যকে ওজনের মানদণ্ডে হিসাব করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হতো। তবে প্রতিবারের লেনদেনে স্বর্ণ-রৌপ্য ওজন করা ছিল এক বিরক্তিকর বিষয়। তাই খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দে লিডিয়ার রাজা আলিয়াত (Alyatte) প্রথমবারের মতো ধাতব কয়েন (Coin) তৈরি করেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ, রৌপ্য এবং আরও কিছু ধাতব পদার্থের সংমিশ্রণে তৈরি হতো সে মুদ্রা। বলা হয় এ মুদ্রাই ছিল ইতিহাসে প্রথম জন্ম নেওয়া অর্থ (Money)। বর্তমানে আমরা বিনিময় মাধ্যম হিসেবে কাগজি নোট ব্যবহার করছি। এগুলো দিয়েও পণ্যের মূল্য সহজে নির্ধারণ করা সম্ভব।

৩. হিসাবের একক: হিসাবের একক দ্বারা পরিমাপককে বোঝানো হয়। যেমন: দূরত্ব পরিমাপের একক মিটার, কিলোমিটার, ইঞ্চি বা মাইল। ওজন পরিমাপের একক আউন্স, গ্রাম বা কিলোগ্রাম। পৃথিবীর সর্বত্র এই পরিমাপকগুলো সর্বজনীন স্বীকৃত। কিন্তু টাকা, ডলার, রুপির ক্ষেত্রে সর্বজনীন স্বীকৃত কোনো পরিমাপক নেই। যেমন: এক টাকা বা এক রুপি কখনো এক ডলারের সমান হতে পারে না। কারণ, এগুলোর মূল্য সর্বদা পরিবর্তনশীল। তবে স্বর্ণ-রৌপ্য পরিমাপে এ জাতীয় কোনো সমস্যা হয় না। কারণ, ১০০ গ্রাম স্বর্ণ বা রৌপ্যের ওজন পৃথিবীর সর্বত্রই সমান। ভোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমন। যেমন : এক কেজি আটার ওজন পৃথিবীর সব স্থানে একই হবে। এ ক্ষেত্রে ভোগ্য পণ্যকেও অর্থের সংজ্ঞা নির্ধারণে বিবেচনা করা যেতে পারে।

৪. বিভাজনযোগ্য (খুচরা যোগ্যতা) : ১,০০০ টাকার একটি নোটকে ৫০০, ৩০০, ২৫০, ৫০ ইত্যাদি আকারে খুচরা করা সম্ভব। একইভাবে এক কেজি স্বর্ণ বা রৌপ্যকে ৫০০, ১০০, ৫০ বা ২০ গ্রামে বিভক্ত করা সম্ভব। ভোগ্য পণ্যের বেলাও ওজন দ্বারা বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা সম্ভব। বিভাজনযোগ্যতার বড়ো সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে পণ্যের মূল্য সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব। এটি লেনদেন ও বিনিময় কাজে দারুণ গতীশীলতা নিয়ে আসে।

৫. মূল্যের স্থিতীশীলতা : এটি দ্বারা বোঝানো হয় অর্থের ক্রয় ক্ষমতা সহজে পরিবর্তিত হবে না। উদাহরণস্বরূপ: আপনি ৪০ হাজার টাকা দিয়ে আজ যে পরিমাণ চাল ক্রয় করতে পারছেন, আগামী ১০ বছর পর সে পরিমাণ চাল আর ক্রয় করতে পারবেন না। কারণ, নিয়মিত মুদ্রাস্ফিতির দরুন বাজারের প্রতিটি মুদ্রা হারাচ্ছে তাদের ক্রয়ক্ষমতা। আধুনিক অর্থব্যবস্থায় পৃথিবীর প্রতিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর এবং বিশেষ সব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে বড়ো পরিমাণে নতুন নোট ইস্যু করে থাকে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় Quantitative Easing (QE)। এটি বাজারে নতুন মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি করে চলমান মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও পণ্যমূল্য স্থীতিশীল বা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে।

অপরদিকে, স্বর্ণ-রৌপ্য যেহেতু চাইলেই উৎপাদন করা যায় না, সেহেতু এ বাজারে স্বর্ণস্ফিতি বা রৌপ্যস্ফিতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তা ছাড়া বিভিন্ন খনি থেকে প্রতি বছর নতুন যে পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য অর্থবাজারে যুক্ত হয়, তার পরিমাণে এতটাই নগণ্য যে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড়ো রকমের কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। বলে রাখা উচিত বর্তমান বাজারে স্বণ-রৌপ্য মূল্যের প্রতিনিয়ত যে উঠানামা, এর মূল কারণ তাদের কাগজি নোটের বিপরীতে মূল্যায়িত করা হচ্ছে। যেহেতু কাগজি নোটগুলো প্রতিনিয়ত তাদের ক্রয় ক্ষমতা হারাচ্ছে, সেহেতু ভোগ্যপণ্যের ন্যায় স্বর্ণ-রৌপ্যের মূল্যও উঠানামা করছে।

পচনশীল বৈশিষ্ট্যের দরুণ অধিকাংশ ভোগ্যপণ্যকে দীর্ঘকাল সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু পণ্য আছে যাদের তুলনামূলক বেশি দিন সংরক্ষণ করা সম্ভব। যেমন: লবণ, চিনি, মধু ইত্যাদি। এ কারণে রোমান ও থকি সম্রাজ্যের সামরিক বাহিনীতে প্রতি মাসের বেতনের সাথে কিছু পরিমাণ ভোগ্যপণ্যও প্রদান করা হতো, যা রেশন নামে পারিচিত; বিষয়টি আজও অনেক রাষ্ট্রে চলমান।

৬. স্থিতিশীল বিনিময় হার: বিনিময় হারের উঠানামা মুদ্রা বাজারের একটি নিয়মিত চিত্র। বিনিময় হারের এই উঠানামা কতটা হুমকিস্বরূপ, তা ব্যবসায়ী সম্প্রদায় খুব ভালো করে জানে। ১৯৭১ সালে ব্রিটন উত্স চুক্তিনামা রহিত হলে বিনিময় হার নির্ধারণের স্থিতিশীল প্রক্রিয়া একেবারে ভেঙে পরে। কিন্তু স্বর্ণ-রৌপ্যভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় এমনটা ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই। লিডিয়ার পর গ্রিক, রোমান, জেরুজালেমসহ আরও অনেক অঞ্চলে ধাতব মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। সে সকল মুদ্রায় স্বর্ণ ও রৌপ্যের পরিমাণ নির্দিষ্ট থাকত বলে তাদের বিনিময় নির্ধারণে কোনো জটিলতা হতো না। যেমন ধরুন, গ্রিকরা তাদের ধাতব মুদ্রায় ব্যবহার করছে ৫০% স্বর্ণ এবং রোমানরা সেখানে ব্যবহার করছে ৭৫% স্বর্ণ। এমতাবস্থায় ৩টি গ্রিক মুদ্রার সমান হবে ২টি রোমান মুদ্রা। বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ছিল বলে আজকের মতো অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থা না থাকলেও সে যুগের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্বময় পরিব্যাপ্তি লাভ করেছিল।

৭. নিজস্ব উপযোগ: যেকোন ভোগ্য পণ্যের প্রধান উপযোগ হলো ক্ষুধা মেটানোর ক্ষমতা। এমন নয় যে এই উপযোগিতা কৃত্রিম বা সরকারি অধ্যাদেশে তৈরি হয়েছে। কিন্তু কাগজি নোটভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থায় প্রতিটি মুদ্রার উপযোগ সরকারি অধ্যাদেশে তৈরি হয়। যতদিন এগুলো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধীনে থাকবে, ততদিন কাগজি নোটগুলোর জীবন থাকবে।

মনে করুন, আপনার একাউন্টে পাঁচ লাখ রুপি আছে। কিছুদিন পর চীন এসে ভারত দখল করল এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে রুপিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। যদি না নতুন সরকার পুরাতন রুপিগুলোকে নতুন ইস্যু করা মুদ্রার সাথে পালটে নেওয়ার সুযোগ দেয়, তবে সে রুপির আর কোনো মূল্য থাকবে না। যেমন: সাদ্দাম সরকার পতনের সেখানে নতুন দিনারের নোট প্রিন্ট করা শুরু হয়। ফলে পূর্বের বিপুল পরিমাণ ইরাকি দিনারের আর কোনো মূল্য ছিল না। সাধারণ মানুষ কিছু পরিমাণ পুরোনো নোট ব্যাংকে গিয়ে পালটে আনার সুযোগ পেলেও বড়ো একটি অংশ রাস্তায় ফেলে দেয়। আরেকটি উদাহরণ হলো, মোদি সরকার যখন ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট মাসখানেকের জন্যে বন্ধ ঘোষণা করে, তখন নোট দুটিও সাময়িক সময়ের জন্যে তাদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কেউ আধিপত্য বিস্তার করুক বা সরকারি অধ্যাদেশে যে পরিবর্তনই আসুক না কেন, স্বর্ণ-রৌপ্য এবং ভোগ্যপণ্যের উপযোগিতায় কোনো পরিবর্তন আসবে না।

৮. সহজ পরিবহনযোগ্যতা: কাগজি নোট বা স্বর্ণ-রৌপ্যকে আপনি চাইলে এক স্থান থেকে অন্যত্র বহন করতে পারেন। যেহেতু স্বর্ণ-রৌপ্য কাগজি নোটের চেয়ে অধিক মূল্য ধরে রাখতে পারে, সেহেতু স্বর্ণ-রৌপ্যই বেশি কার্যকর। তবে ইলেক্ট্রনিক কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে আজ অনেকেই কাগজি নোট পরিবহনের ঝামেলা কাটিয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতি স্বর্ণ-রৌপ্যভিত্তিক অর্থব্যবস্থায়ও প্রয়োগ করা সম্ভব।

এই হলো আদর্শ অর্থের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য। এখানে অর্থ হিসেবে তিনটি উপকরণকে বিবেচনায় আনা হয়েছে: স্বর্ণ-রৌপ্য, কাগজি নোট ও ভোগ্যপণ্য। লক্ষ করুন, এমন কোনো উপকরণটি আছে, যার মধ্যে আদর্শ অর্থের সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান? অবশ্যই তা স্বর্ণ-রৌপ্য। ঠিক এ কারণে হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন সম্রাজ্যে এটিই ছিল একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিনিময়ের মাধ্যম। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনালগ্নেও স্বর্ণ-রৌপ্যকে কাগজি নোট ছাপানোর মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

📘 সিক্রেটস অব জায়োনিজম > 📄 জায়োনিস্টরাই কি আর্মাগেডনের জন্ম দেবে

📄 জায়োনিস্টরাই কি আর্মাগেডনের জন্ম দেবে


মূল আলোচনায় প্রবেশ করার আগে 'আর্মাগেডন' সম্পর্কে কিছু ধারণা দিয়ে রাখা উচিত। হেনরি ফোর্ডের মূল আলোচনায় এ বিষয়গুলোর উল্লেখ ছিল না, কিন্তু আলোচনা পরিষ্কার করতে এসবের সমন্বয় প্রয়োজন।

আর্মাগেডন একটি হিব্রু শব্দ, যা দ্বারা পৃথিবীর শেষ সময়ে ভয়ংকর একটি যুদ্ধের কথা বোঝানো হয়েছে। এই যুদ্ধে সৃষ্টিকর্তার সৈন্য বাহিনী এবং শয়তানের বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হবে। অনেক পণ্ডিত ও গবেষকের ধারণা অনুযায়ী- এই যুদ্ধের সমাপ্তি হবে মেগিড্ডো পাহাড়ের কাছাকাছি কোনো স্থানে, যা বর্তমানে ইজরাইলের অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর প্রতিটি বড়ো বড়ো ধর্মে এই যুদ্ধের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় পণ্ডিতগণ এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে পারবেন।

খ্রিষ্টান ধর্মে নিউ টেস্টামেন্টের বুক অব রেভালেশনের (১৬: ১৬)-এ বলা হয়েছে- 'অতঃপর তারা সবাই সে স্থানে একত্রিত হবে, যাকে হিব্রুতে বলা হয় আর্মাগেডন।'

কারা এই যুদ্ধে মুখোমুখি হবে, সে প্রসঙ্গে বুক অব রেভালেশনের ১৯ : ১১-১৬ ও ১৯২১-এ বলা আছে, সাদা ঘোড়ার বাহনে চড়ে স্বর্গ হতে কোনো ব্যক্তি নেমে আসবেন, যিনি তার সৈন্য বাহিনী নিয়ে শয়তানের সৈন্য বাহিনীর মুখোমুখি হবেন এবং যুদ্ধে বিজয়ী হবেন। বাইবেলের লুক, মার্ক ও ম্যাথুর বিভিন্ন শ্লোকের পূর্বাভাষ থেকে বোঝা যায়- উল্লেখিত ব্যক্তিই হবেন যিশুখ্রিষ্ট।

ইসলাম ধর্মে পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কাহাফ ও বনি ইজরাইলসহ অসংখ্য হাদিসে পৃথিবীর শেষ সময় এবং আর্মাগেডনের কথা বলা হয়েছে। নবি ঈসা (আ.) সাদা দুই মেঘের (ফেরেস্তাদের কাঁধের) ওপর ভর করে ধরণিতে নেমে আসবেন। অতঃপর ইজরাইলে পৌছে দজ্জাল বাহিনীকে সমূলে পরাজিত করবেন।

কিন্তু ইহুদি ধর্মে এমন কোনো যুদ্ধের নাম বলা হয়নি, যা আর্মাগেডন হতে পারে। তবে তালমুদে মসিহের কথা বলা হয়েছে, যিনি নতুন জন্ম নেওয়া ইজরাইলের বাদশাহ হিসেবে পৃথিবীতে আসবেন। তিনি আসার পর ইজরাইল সামরিক শক্তির শীর্ষবিন্দুতে পৌছে যাবে এবং পুরো পৃথিবী শাসন করবে। বাইবেলের ভাষায়- ইহুদিদের এই মসিকে বলা হয়েছে অ্যান্টি-ক্রাইস্ট এবং ইসলামিক পরিভাষায় দাজ্জাল। এই যুদ্ধ কখন শুরু হবে, তা নির্দিষ্ট করে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। তবে পৃথিবীর শেষ সময়ে বহু নিদর্শনের কথা প্রতিটি ধর্মগ্রন্থে ব্যক্ত করা হয়েছে।

এই আর্মাগেডন এমনই এক যুদ্ধ, যাতে জলবায়ুর ওপর ভয়ংকর বিপর্যয় নেমে আসবে। পুরো আকাশ দীর্ঘ সময়ের জন্য ধোঁয়ায় ঢেকে যাবে। সূর্যালোক দেখা যাবে না। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষের কারণে প্রচুর মানুষ মারা পড়বে। ধরণির জনসংখ্যা গত দুশো বছরে যেভাবে বেড়েছে, ঠিক সেভাবেই তা হঠাৎ করে কমে যাবে। ইজরাইলের পুনঃপ্রতিষ্ঠালাভ এই যুদ্ধের সময়কাল ঘনিয়ে আসার এক বড়ো ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অনেকে হয়তো বিভ্রান্ত হতে পারেন যে, এখানে কোন ইজরাইলের কথা বলা হচ্ছে? কারণ, সেই যে খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে তাদের ১০টি গোত্র অ্যাসিরিয়ানদের আক্রমণে হারিয়ে গেছে, তাদের তো কোনো সন্ধানই পাওয়া যায়নি। আর বর্তমান ইজরাইলে যারা বসবাস করছে, তারা তো জুদাহ রাজ্যের কেবল দুটি গোত্রের উত্তরসূরি। তাহলে বাকিরা এ ভূমিতে কবে ফিরে আসবে?

মূলত পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ জানে না বা তার খবরও রাখে না- বাকি গোত্রের অধিবাসীদের খুঁজে বের করার কাজ নব গঠিত ইজরাইল খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে নিরন্তরভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। গত অর্ধ শতাব্দীতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তজুড়ে বিচ্ছিন্নভাবে এমন কিছু গোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা নিজেদের ইজরাইলের হারিয়ে যাওয়া গোত্রের অধিবাসী বলে দাবি করেছে।

Simcha Jacobovici হলেন এ বিষয়ের ওপর একজন বিশেষজ্ঞ। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ওপরও তার রয়েছে অসামান্য জ্ঞান। ২০০৩ সালে Quest for the Lost Tribes শিরোনামে তিনি একটি ডকুমেন্টারি প্রকাশ করেন, সেখানে এ জাতীয় কিছু গোষ্ঠীর পরিচয় তুলে ধরেছেন। যেমন: তাদের পাওয়া গিয়েছে ইথিওপিয়ার সিমিয়েন পর্বতমালায়; ভারতের মনিপুর ও মুম্বাই; ইরানের ইস্ফাহান ও মাশহাদে; সমরকন্দে। তবে আদৌ তারা হারিয়ে যাওয়া গোত্রদের প্রকৃত উত্তরসূরি কি না, তা নিয়ে খোদ ইজরাইলি প্রশাসনের মনেও যথেষ্ঠ সংশয় রয়েছে। কিন্তু তারপরও তাদের একেবারে ফেলে দিতে পারেনি। বিগত কয়েক দশকে এমন প্রচুরসংখ্যক অধিবাসীকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইজরাইলে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

তাদের কে কোন গোত্রের সদস্য, তা যেহেতু এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, তাই ইজরাইলি প্রশাসন আপাতত তাদের সবাইকে ইহুদি বলে নথিভুক্ত করছে এবং তাদের বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য নিয়মিত প্যালেস্টানিদের ভূমি দখলের প্রচেষ্টা চলেছে।

বেলফোর ঘোষণা
জেরুজালেম দখল জায়োনিস্টদের জন্য একটি স্মরণীয় ঘটনা। ১১ ডিসেম্বর, ১৯১৭ ব্রিটিশ কমান্ডার Edmund Allenby যখন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে শহরটিতে প্রবেশ করেন, তখন পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিরা নিশ্চিত হয়ে যায়, তারা আবারও প্রাচীন ভূমিতে ফিরে যাচ্ছে। এই নব্য ইজরাইলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এক প্রতিশ্রুতি পত্রের মধ্য দিয়ে। ২ নভেম্বর, ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রসচিব Arthur Balfour আমেরিকায় অবস্থানরত Baron Rothschild-এর নিকট একটি প্রতিশ্রুতিপত্র লিখেন- গ্রেট ব্রিটেন যেকোনো মূল্যেই প্যালেস্টাইনে ইহুদিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। এই চিঠি পেয়ে তাদের সদস্যগণ রাস্তায় নেমে নাচ-গান করতে শুরু করে।

২ নভেম্বর, ১৯১৭
প্রিয় লর্ড রথসচাইল্ড,
আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে মহামান্য সরকারের পক্ষ থেকে নিম্নবর্ণিত ঘোষণাটির কথা জানাচ্ছি। এটি ইহুদি ও জায়োনিস্টদের প্রত্যাশার সাথে সহানুভূতিস্বরূপ মন্ত্রিপরিষদে উত্থাপিত ও গৃহীত হয়েছে।
মহামান্য সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য জাতীয় স্বদেশভূমি সৃষ্টির বিষয়টি সহানুভূতির সাথে দেখছে। তাই লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। স্পষ্টত এই ঘোষণা ফিলিস্তিনে বিদ্যমান অইহুদি সম্প্রদায়গুলোর নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকারের বিরুদ্ধে কোনো পক্ষপাতিত্ব করছে না। অনুরূপভাবে এটি অন্যান্য দেশে ইহুদিরা যে আইনগত ও রাজনৈতিক অবস্থায় আছে, তার ওপরও কোনো প্রভাব ফেলবে না।
আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব, যদি দয়া করে এই ঘোষণাটি জায়োনিস্ট ফেডারেশনকে জানিয়ে দেন।

Atlantic Monthly পত্রিকার সম্পাদক Professor Albert T. Clay আমাদের সতর্ক করে বলেন-
'প্যালেস্টাইন যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকান পত্রিকাগুলোতে যে সংবাদ ছাপানো হচ্ছে, তার প্রায় সবই জায়োনিস্টদের বানানো সংবাদ। প্যালেস্টাইনিদের বিশাল এক জনগোষ্ঠী মুসলিম ও খ্রিষ্টান। তারা প্রায় ২,০০০ বছর ধরে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। নিজ ভূমি রক্ষার্থে তারা ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। এ বিষয়টি তারা বিকৃত করে বলছে, সেখানে নাকি মুসলিমরা হাজার হাজার নিরীহ ইহুদিকে হত্যা করছে।'

এর আগে ১৯০২ সালে জায়োনিস্টরা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে Anglo-Palestine Bank প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের হাজার বছরের পুরোনো 'সুদ-বাণিজ্য' শুরু করে। ৬.৫ শতাংশ সুদের বিনিময়ে পাঁচ বছর মেয়াদে তারা প্যালেস্টাইনি কৃষকদের ঋণ দিতে শুরু করে, কিন্তু অধিকাংশ কৃষক এই অর্থ প্রদানে ব্যর্থ হয়। ফলে তাদের আবাদি জমিগুলো জায়োনিস্ট ব্যাংকটির সম্পত্তি হয়ে যায়। ব্রিটিশ কমান্ডারের নেতৃত্বে তারা এই ভূমিগুলো দখল করতে শুরু করে। সে সময় অনেক ইহুদিও জেরুজালেমে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিল; যদিও তারা সংখ্যায় অনেক কম ছিল।

১৮৪২ সালে Dr. Murray M'Cheyne জেরুজালেমে বসবাসরত ইহুদিদের ওপর এক অনুসন্ধান চালান। আন্তর্জাতিক ইহুদি সংগঠনগুলো জেরুজালেমে বসবাসরত এই জনগোষ্ঠীর জন্য বাৎসরিক ভাতার ব্যবস্থা করে। ফলে কাজ না করলেও তাদের জীবিকা ও রুজির অভাব ছিল না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রতিও তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। অন্যদিকে, মুসলিম ও খ্রিষ্টানরা শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক এগিয়ে ছিল। তাই ইহুদিরা নিজেদের সন্তানদের খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে শুরু করে।

জায়োনিস্টরা এই শহর দখল করে নিলে শহরের পুরো রূপ রাতারাতি পালটে যায়। The Council of Jerusalem Jews একটি হিব্রু পত্রিকায় ইহুদি অভিভাবকদের সতর্ক করে কলাম প্রকাশ করে। কলামটিতে তাদের প্রতি কিছু আজ্ঞা প্রকাশ করা হয়-
• যদি কোনো অভিভাবক সন্তানদের খ্রিষ্টান-মুসলিম পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে না আনে, তবে তাদের বাৎসরিক ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
• তাদের চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
• তাদের নাম ব্লাকলিস্টে রাখা হবে এবং মোজেসের অনুসারী বলে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।
• সকল প্রকার ব্যবসায়িক মুনাফা ভোগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
• তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বয়কট করা হবে।
• সকল অফিস-আদালত থেকে ছাঁটাই করা হবে।
• যারা এসব নির্দেশ অমান্য করবে, তাদের নাম শহরের প্রধান ফটকের ওপর ঝুলিয়ে রাখা হবে।
• বিশেষ এক ব্যাজ পরতে হবে, যেন সহজে তাদের সনাক্ত করা যায়।
• জাতীয় পর্যায়ে তাদের কলঙ্কিত করা হবে।
• যদি কোনো রাবাই এ নির্দেশ অমান্য করে, তবে তাকে দায়িত্বচ্যুত করা হবে।

ইহুদিদের কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয়তাবাদ। তারা খুব ভালো করেই জানে, জেরুজালেমের অধিকার খ্রিষ্টানরাও ছাড়তে রাজি নয়। বিশ্বযুদ্ধের ফাঁদে পড়ে ব্রিটেন এই শহরকে ইহুদিদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তারা যে আজীবন জায়োনিস্টদের কথামতো কাজ করে না, তারা তা ভালো করে জানে। বেথেলহাম যিশুখ্রিষ্টের জন্মভূমি। ধর্ম প্রচার করতে তিনি জেরুজালেমে এসেছিলেন। প্যালেস্টাইন তাদের হাতে চলে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে- খ্রিষ্টানরা শহরটির ওপর অধিকার হারাবে। বলশেভিক বিপ্লবে ইহুদিরা যেভাবে রাশিয়ার গির্জাগুলো ধ্বংস করেছে, সেভাবে প্যালেস্টাইনের গির্জা ও মসজিদগুলোতেও আঘাত হানছে।

জেরুজালেম দখলের পরপরই Sir H. Samuel-এর নেতৃত্বে প্যালেস্টাইনে এক ইহুদি সরকার গঠনের কাজ শুরু হয়। একই সঙ্গে জায়োনিস্টরা সুয়েজ খাল দখলের এক ভয়ংকর খেলায় মেতে ওঠে। তিনি বলেন-
'সামরিক শক্তিতে পরিপূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এত বড়ো প্রজেক্টে হাত দেওয়া উচিত নয়। এখন প্রয়োজন ইজরাইলের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন জোগানো। যেরূপ বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে এই রাষ্ট্রের নবজন্ম ঘটেছে, খুব শীঘ্র তেমন আরেকটি যুদ্ধ ঘটতে যাচ্ছে। আমাদের উচিত, এই যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে ইজরাইল রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জন করা।'

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তিনটি বিশেষ কারণে প্যালেস্টাইন ইস্যু আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে।
১. বলশেভিকদের প্যালেস্টাইন অভিমুখে যাত্রা।
২. খতরনাক জায়োনিস্টদের জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা।
৩. বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্যালেস্টাইনের আবির্ভাব।

১৯২০ সালে জেরুজালেমের বিশপ Dr. Mclnnis এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন-
'যে আগন্তুকেরা আজ জেরুজালেম দখল করেছে- তাদের অধিকাংশই রাশিয়ান, পোলিশ ও রোমানিয়ান ইহুদি; কিছুদিন আগেও তাদের বলশেভিক বিপ্লব করতে দেখা গেছে। তারা এই ভূমি দখলের পর লিওন ট্রটস্কি সাহেবের প্রতি সম্মান জানাতে ভোলেনি। তিনিই তো তাদের 'Kingdom of Heaven' তথা এই স্বর্গরাজ্যের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।'

১৯২০ সালের হিসাব অনুযায়ী প্যালেস্টাইনের বর্তমান অধিবাসীরা প্রায় ২,০০০ বছর এ যাবৎ এই ভূমিতে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে ৫ লাখ মুসলিম, ১ লাখ খ্রিষ্টান ও ৬৫ হাজার ইহুদি। পুরো জনসংখ্যার ৭৫ ভাগ মুসলিম, ১৫ ভাগ খ্রিষ্টান ও ১০ ইহুদি। তাদের জীবিকা অর্জনের প্রধান উপায় কৃষিকাজ। তারা যে এই অঞ্চলের প্রকৃত স্থায়ী বাসিন্দা, তা আশা করি খোদ ইউরোপিয়ান পর্যন্ত অস্বীকার করবে না। এই ভূমিকে জায়োনিস্টদের হাতে তুলে দেওয়ার অর্থ হলো- বেলজিয়ামকে মেক্সিকোর হাতে তুলে দেওয়া।

General Allenby প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি স্থানীয়দের অধিকারের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করবেন। বেলফোর ঘোষণা, সান রেমিও সম্মেলন ও প্রেসিডেন্ট উইলসন সবাই এই কথা বলেছিলেন। কিন্তু জায়োনিস্টরা বলল- 'তাদের বের করে দাও!'

Isreal Zangwill বললেন-
'তাদের বের করে দাও! আমরা খুব ভদ্রভাবে বলছি, তারা যেন এই ভূমি ছেড়ে চলে যায়! তাদের জন্য লাখ লাখ বর্গ মাইলের আরব ভূমি পড়ে আছে। ইজরাইলে এক বর্গ ইঞ্চি জায়গাও যে এখন অবশিষ্ট নেই। তাঁবু গুটিয়ে বেদুইনদের মতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভ্রমণ করা তো তাদের জন্মগত অভ্যাস। এবার তারা তা প্রমাণ করে দেখাক।

ইহুদিরা "আরব” শব্দটিকে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করে থাকে। আমাদের মগজে আরবদের ব্যাপারে বিভ্রান্তি ছড়াতে ইহুদিরা যথেচ্ছা মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে থাকে। আমেরিকা তো স্বাধীন হয়েছে মাত্র ১৭৭৬ সালে। সামান্য দেড়শো-দুশো বছরের ব্যবধানে আমরা যদি নিজেদের এই ভূমির স্থায়ী বাসিন্দা বলে দাবি করতে পারি, তাহলে যারা প্যালেস্টাইনে দুই হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে, তারা কেন নিজেদের স্থায়ী অধিবাসী বলে দাবি করতে পারবে না! বিশ্বের নিরপেক্ষ সকল পণ্ডিত আজ নব গঠিত ইজরাইল নিয়ে ভীষণ সঙ্কিত হয়ে পড়েছে। কারণ, তাদের নব আবির্ভাব মানবজাতি তথা এই ধরণির ভবিষ্যতের প্রতি ভয়ংকর খারাপ কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।'

ইহুদিরা যেভাবে জেরুজালেম দখল করে
১৯২১ সালের জুলাই মাসে ইউনির্ভার্সিটি অব দ্যা সাউথ 'Zionism and the Jewish Problem' শিরোনামে ২৯ পৃষ্ঠার একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করে। আর্টিক্যালটির লেখক Dr. John P. Peters দীর্ঘদিন সেন্ট জন দ্যা ডিভাইন ও সেন্ট মাইকেল চার্চের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন-
'যে জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে জায়োনিজম গড়ে উঠেছে, তার সাথে ধর্মীয় গ্রন্থের তেমন কোনো সাদৃশ্য নেই। এই রাজনৈতিক দলটির মূল ক্ষমতাভার যাদের হাতে, তাদের কেউ মূল ধর্মে বিশ্বাসী নয়। ইহুদিদের জাতীয়তাবাদ আমেরিকাসহ পৃথিবীর যেসব অংশে প্রবেশ করেছে, সেখানে তারা আরও বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে।'

Dr. Peters জায়োনিস্টদের বিভিন্ন কার্যক্রমের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তার প্রকাশিত আর্টিক্যালের গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহ এখানে উপস্থান করা হলো-
জায়োনিস্টরা যে প্যালেস্টাইন দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা বর্ণনা করা অনাবশ্যক। তাদের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ১৯০২ সালে। সেবার আমি দ্বিতীয় মেয়াদে প্যালেস্টাইন সফরে যাই। ১৮৯০ সালে যখন প্রথম মেয়াদে প্যালেস্টাইন সফর করি, তখন সামান্য কিছু সেফার্ডিক ইহুদি জেরুজালেমে বসবাস করত। তখন অবধি তা প্রাচীন শহরের রূপেই ছিল। শহরটির মূল প্রাচীরের বাইরে তখনও কোনো ঘরবাড়ি গড়ে ওঠেনি। উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা সবেমাত্র শুরু হয়ছে। রাশিয়ার নিপীড়িত ইহুদিরা প্যালেস্টাইন উপকূলীয় শহর শ্যারনে নিজেদের কলনি প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে কায়িক শ্রমে অনভ্যস্ত ছিল বলে তারা কৃষিকাজ করতে পারত না। তাই সিরিয়ান শ্রমিকদের ভাড়া করে নিজেদের কাজ করিয়ে নিত। আর ইহুদিরা ছাতার নিচে বসে কাজ তদারকি করত এবং প্রখর রোদ থেকে নিজেদের চামড়া রক্ষা করত।

১৯০২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্যালেস্টাইন গিয়ে দেখি, তাদের কলনিগুলো কৃষিকাজে ভীষণ মনোযোগী হয়ে উঠেছে। আরও লক্ষ করলাম, জেরুজালেমের বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় ইহুদিরা ঘড়বাড়ি গড়ে তুলতে শুরু করেছে। এই প্রথম শহরটির প্রধান প্রাচীরের বাইরে সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি নির্মাণ করে। তারা নিজ উদ্যোগে কৃষিকাজ, কায়িক শ্রম এবং বিভিন্ন শিল্পের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলে। আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যেন নিজ চোখে সেসব কেন্দ্র একবার হলেও দেখে যাই। এটা দেখে আমি এতটাই অবাক হই যে, সেখানে কোনো সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদেই নেই। ইহুদি, মুসলিম ও খ্রিষ্টান সব গোত্রের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কৃষিকাজ করে যাচ্ছে। আমি বলব, এটা আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম দৃশ্যগুলোর একটি। সেখানে সাম্প্রদায়িকতার লেশমাত্র ছিল না। সহযোগিতা ও সহমর্মিতা ছিল তাদের সকল কাজের মূল উদ্দীপনা। সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে সুন্দর এক সমাজব্যবস্থা।

দেশে ফিরে আসার পর ওপর থেকে আমাকে চাপ দেওয়া হয়, যেন এ বিষয়টি কোনো পত্রিকায় প্রকাশ না করি। খুব দুঃখ নিয়ে বলতে চাই, এই বল প্রয়োগ আসে আমেরিকার বিশেষ একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি থেকে। ইহুদি, মুসলিম ও খ্রিষ্টান শান্তিতে বসবাস করুক, তা তারা মেনে নিতে পারে না। তাদের অভিযোগ, মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের সংস্পর্শে ইহুদি সম্প্রদায় সংক্রমিত হয়ে পড়েছে। তারা চায়- ইহুদিদের জন্য পৃথক একটি সমাজব্যবস্থা থাকবে। ভূমি দখলের প্রতিযোগিতায় তাদের দ্বিতীয় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না। ১৯১৯ ও ১৯২০ সালে যখন পুনরায় প্যালেস্টাইন সফরে যাই, তখন দেখি ইহুদিরা ভীষণ সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছে। তাদের মাথায় ভূমি দখলের ভূত আগাগোড়া চেপে বসেছে।

দেখলাম, কৃষিকাজে তারা যথেষ্ট উন্নতি করেছে। ফল, ফসল ও শরাব উৎপাদন তাদের সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। উৎপাদন কাজ ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন প্রযুক্তির সংযোজন করেছে। কিন্তু যেসব ভূমি অধিগ্রহণ করে ইহুদিরা কৃষিকাজ করছে, তা কখনোই তাদের ভূমি ছিল না। শ্যারন প্লেইন, এসড্রাইলোন প্লেন ও জর্ডান ভ্যালি হলো প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর ভূ-অঞ্চল; বর্তমানে যা জায়োনিস্টদের দখলে। এই ভূমিগুলো তাদের শস্য-সম্পদে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। তত দিনে জেরুজালেমে ইহুদিদের জনসংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের একদল পরজীবী ছত্রাকের ন্যায় অন্যের ঘাড়ে চেপে বসেছে, আর সামান্য কিছু বিজ্ঞান চর্চায় নিয়োজিত আছে।

শহরটি এখন সাম্প্রদায়িক জায়োনিস্টদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। বোলশেভিজমের চেতনা পুরো প্যালেস্টাইনকে পেয়ে বসেছে। হিব্রু প্রতিষ্ঠানগুলো গির্জা ও মসজিদ নিয়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ইচ্ছা করে খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মগজে সাম্প্রদায়িকতার আগুন প্রজ্বলিত করছে। আমার সৌভাগ্য যে, খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের বিভিন্ন ক্যাম্প সফর করার সুযোগ পেয়েছি, কিন্তু ভাষাগত জটিলতার দরুন তাদের সঙ্গে ঠিকমতো কথাও বলতে পারিনি। আরব-ইজরাইল সংঘাত ঘনীভূত হয়ে উঠেছিল বলে আরও অনেক জায়গায় যেতে পারিনি। পরে না জানি আরবরা আমাকে জায়োনিস্ট গুপ্তচর বলে সন্দেহ করে!

এটা বহু আগে থেকেই জানা ছিল যে, জায়োনিস্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্যালেস্টাইনের ইহুদিদের জন্য নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করত। তারা যেন খ্রিষ্টান বা মুসলিমদের কোনো সহযোগিতা ছাড়াই নির্বিঘ্নে জীবনযাপন করতে পারে, সে জন্যই মূলত এই ভাতার ব্যবস্থা। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক খ্রিষ্টান তার সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে জায়োনিস্টদের পক্ষে কলাম ছাপতে শুরু করেছে। এই বিশ্বাসঘাতকতাই সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে।

তারা যেন জেরুজালেমসহ প্রতিটি পবিত্র শহরে (যেমন: হেবরন, টাইবেরিয়াস, সাফেদ ইত্যাদি) ফিরে যাওয়ার পথে বিশ্ববাসীর সমর্থন পায়, সে জন্য খ্রিষ্টান সংগঠনগুলোকে বড়ো অঙ্কের উপঢৌকন প্রদান করে যাচ্ছে। খ্রিষ্টান গির্জাগুলো তাদের প্রত্যাবর্তনের পক্ষে সাফাই গেয়ে প্রার্থনায় রত হয়ে পড়েছে। পৃথিবীতে অধিকাংশ ক্যাথলিক গির্জা এই পথ অনুসরণ করতে শুরু করেছে। জায়োনিস্ট কমিটি প্যালেস্টাইনের গির্জাগুলোতে আন্তর্জাতিক মহলের বাৎসরিক চাঁদা পাঠানোর পথ বন্ধ করে দিয়েছে।'

কিছুদিন আগে জায়োনিস্ট প্রতিষ্ঠান Hebrew Edition একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল 'Malignant Leprosy'। আর্টিক্যালটি ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ায় সেখানে কী প্রকাশ করা হয় তা জানা যায়: ইহুদি অভিভাবকরা যেন অতি সত্বর তাদের সন্তানদের জ্যান্টাইল পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে আনে, সে বিষয়ে আদেশ-নিষেধ জারি করা হয়। যদিও সেসব প্রতিষ্ঠানে খ্রিষ্টান বা ইসলাম ধর্মের কোনো কিছু শেখানো হয় না, তারপরও ইহুদিরা চায় তাদের সন্তানরা বিধর্মীয় সংস্কৃতির সকল সংস্পর্শ থেকে মুক্ত থাকুক। যদি কোনো অভিভাবক এই নির্দেশ অমান্য করে, তবে তাদের ওপর যে শাস্তি নেমে আসবে, তার ফল শেষ প্রজন্মকে পর্যন্ত ভোগ করতে হবে।

একমাস পর Hebrew Edition দ্বিতীয় আর্টিক্যালটি প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল 'Fight and Win'। যেসব অভিভাবক তাদের সন্তানদের জ্যান্টাইল পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে আনেননি, তাদের সকল সুযোগ শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। নিচে লক্ষ করুন-
'সতর্কবাণী পাওয়ার পরও যে অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের জ্যান্টাইল পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরিয়ে আনেননি, তাদের প্রত্যেকের নাম রাস্তার মুখে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। প্রতিটি পত্রিকায় বড়ো বড়ো করে ছাপানো হবে। রাস্তায় রাস্তায় প্লাকার্ড করে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। বিশ্বাসঘাতক এবং সীমালঙ্ঘনকারী বলে তাদের অভিহিত করা হবে। তাদের নাম প্রতিটি হাসপাতাল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ইহুদি ডাক্তারদের কাছে তারা আর সেবা পাবে না। তাদের নাম ব্লাক লিস্ট করে American Jewish Relief Fund-এর নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তাদের জন্য ভবিষ্যতে আর কোনো ভাতার ব্যবস্থা করা হবে না। আমরা সবাই তাদের এড়িয়ে চলব। তাদের সন্তানদের সঙ্গে আমাদের সন্তানদের বিয়ে হবে না। তাদের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। জাতিগতভাবে আমরা তাদের বর্জন করছি। তাদের জন্য দ্বিতীয় কোনো সুযোগ নেই। সকল দয়া-মায়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের সম্প্রদায়ের একটা শিক্ষা হওয়া উচিত। যদি আমাদের কেউ তাদের প্রতি সামান্য সহানুভূতিও প্রদর্শন করে, তবে তাকেও এই কাতারে ফেলা হবে। আগামী দিনগুলোতে আমাদের মধ্য হতে কেউ যদি এমন কাজ করে, তবে তার ওপরও একই শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া হবে।'

১৯২০ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী জেরুজালেমে তখন ২৮ হাজার ইহুদি, ১৬ হাজার খ্রিষ্টান এবং ১৫ হাজার মুসলিম বসবাস করত। ইংলিশ সরকারের পাহারায় ইহুদিরা নিরাপদে এই শহরে আসতে থাকে। এতে তাদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৯২০ সালে ইস্টার সানডে এবং ইহুদিদের পাসওভার একই দিনে পড়ে। তার সঙ্গে যোগ হয় মুসলমানদের নবি মুসা উৎসব, যা সাত দিন পর্যন্ত পালিত হয়। প্রথমে তারা এক ধর্মীয় বক্তব্য শোনার জন্য হারাম-আস-শরিফে জড়ো হয়। দ্বিতীয় অংশে, মৃত সাগরের পাশে নবি দাউদ (আ.)-এর কাল্পনিক কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে তারা সাত দিনব্যাপী বাৎসরিক উৎসব সম্পন্ন করে। অটোমানরা যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন প্রতিটি সম্প্রদায় যেন নিজেদের ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হতো, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এখানে ব্যর্থ হয়েছে।

যেহেতু ইহুদিরা এখন জেরুজালেমের রাজা, তাই তারা অন্যান্য সম্প্রদায়কে নিজেদের উৎসব পালনে ঘৃণ্য উপায়ে বাধা দিতে শুরু করে। এ কারণে উৎসবের দিন দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। খ্রিষ্টানদের অনেকেই সেদিন ঘরে বসে ছিল, কিছু লোক গির্জায় উপস্থিত ছিল। তারা রাস্তায় নেমে উৎসব করার সাহস পাচ্ছিল না। কারণ, জায়োনিস্টরা তত দিনে সামরিক শক্তিতে সুসজ্জিত হয়ে উঠেছে। তাদের কাছে প্রচুর অস্ত্র ছিল।

কিন্তু মুসলিমরা ঘরে বসে ছিল না। হেবরন থেকে একদল মুসলিম প্লাকার্ড হাতে জাফা শহরের প্রধান ফটকের সামনে হাজির হতে শুরু করে। প্লাকার্ডগুলোতে ধর্মীয় অসিষ্ণুতার বিরুদ্ধে স্লোগান লেখা ছিল। ব্রিটিশ সৈনিকের অনেকে সেদিন সামনে এগিয়ে আসেনি। কারণ, তাদের সবাই ছিল খ্রিষ্টান। কিছুদিন আগেই তারা দেখেছে- ইহুদিরা কীভাবে অকথ্য ভাষায় যিশুকে অপমান করেছে। তা ছাড়া তাদের অনেকে গির্জায় প্রার্থনা করছিল। এমতাবস্থায় ইহুদি ও মুসলিমদের মধ্যে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ইহুদিদের কাছে আধুনিক অস্ত্র থাকলেও তারা যুদ্ধ করতে জানত না। অপর দিকে মুসলিমরা ছিল সংখ্যায় অল্প। তাদের হাতে ছুরি-তরবারি ছাড়া কিছুই ছিল না। তারপরও মুসলিমরা যুদ্ধে অসম্ভব পারদর্শী ছিল। কারণ, আরব জাতটাই এমন। শহরের ভেতরে প্রাচীন সেফার্ডিক বস্তিগুলোতে কিছু স্থানীয় ইহুদি বসবাস করত। শেষে তারাই বলির পাঠা হলো। জায়োনিস্ট ইহুদিরা আলিশান বাড়ি করে একই শহরে থাকত। মুসলিমরা শহরের ঢোকা মাত্রই ওপর থেকে গুলি ছোড়া শুরু হয়। নিরীহ সেফার্ডিকরা আতঙ্কে এদিক-সেদিক দৌড়াতে শুরু করে। অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী- এই দাঙ্গায় দুজন মারা যায়। ইংলিশ বিচারবিভাগ মুসলিম ও ইহুদিদের সমানভাবে অভিযুক্ত করে শাস্তি ভাগ করে দেয়, যদিও তদন্ত প্রতিবেদনে ইহুদিরাই ছিল মূল খলনায়ক। এই পারস্পরিক সংঘাত আদৌ কখনো বন্ধ হবে কি না বলা অসম্ভব।

জায়োনিস্ট কমিটি Sir H. Samuel-কে প্যালেস্টাইনের গভর্নর করে পাঠায়। তার এই আগমন পুরো প্যালেস্টাইনে নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়। তিনি জেরুজালেমে প্রবেশের আগেই তার মাথা উড়িয়ে দেওয়া হবে এবং মুসলমানদের শহর নেবলাসে কোনো ইহুদিকে ঢুকতে দেওয়া হবে না মর্মে কিছু হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তাই H. Samuel পূর্ণ সামরিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে জাফায় প্রথম প্রবেশ করে। আমি নিজে দেখেছি, তার সামনে-পিছে মেশিনগান হাতে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী দাঁড়িয়ে আছে। একই পদ্ধতিতে তিনি নেবলাস হয়ে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন। শহরে প্রবেশ করেই তিনি নতুন আজ্ঞা জারি করেন। যদিও সেই দাঙ্গায় খ্রিষ্টানরা জড়িত ছিল না, কিন্তু তারপরও মুসলিমদের প্রতি তাদের মৌন সমর্থন ছিল। তাই উভয়কেই একই অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। তা ছাড়া ব্রিটিশ বাহিনী নিষ্ক্রিয় থাকায় তাদের এই শহর দেখা-শোনায় অনুপযুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়। এতটুকু দেখার পর আমি প্যালেস্টাইন ত্যাগ করে আমেরিকায় চলে আসি। যতদিন সেখানে ছিলাম, চেষ্টা করেছি সঠিক তথ্যটি সংগ্রহ করতে; যদিও তা সহজ ছিল না।

প্যালেস্টাইনের ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে, তা এত শীঘ্রই বলা সম্ভব হচ্ছে না। তা ছাড়া ব্রিটিশ সরকার যে কতদিন তাদের নিরাপত্তা দিয়ে রাখবে, তাও বিতর্কের বিষয়। সত্যি-ই যদি ব্রিটিশ সরকার সাম্য, সৌহার্দ্য ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে প্যালেস্টাইন শাসন করতে শুরু করে, তবে এই দেশ এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে। কিন্তু জায়োনিস্টরা এটা মেনে নেবে না। জায়োনিস্টদের অত্যাচারে পুরো প্যালেস্টাইন এখন একটি করদরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। হয়তো জায়োনিস্টদের চাপে ব্রিটিশ সরকার একদিন তার সৈন্যবাহিনী সরিয়ে নিতে বাধ্য হবে। তখন নতুন এক পরিস্থিতির জন্ম হবে। ইরাক, সিরিয়া ও মিশর থেকে দলে দলে মুসলিম বাহিনী এই ভূমি স্বাধীন করতে এগিয়ে আসবে। ব্রিটিশ সরকার ইতোমধ্যেই বুঝতে পেরেছে, বিশ্বব্যাপী তার উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার ভিত কেপে উঠছে। মিশরে ইতোমধ্যে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জোরদার হয়েছে। ভারত থেকে যে মুসলিম সৈন্যদের তিনি ইহুদিদের নিরাপত্তার তাগিদে নিয়ে এসেছেন, তারাও কিছুদিন পর বেঁকে বসবে। কারণ, নিজ মুসলমান ভাইদের ওপর তারা কখনো বুলেট চালাবে না। এখন এটা সময়ের ব্যাপার যে, সামনে কী হতে যাচ্ছে।

📘 সিক্রেটস অব জায়োনিজম > 📄 দাঙ্গাবাজ ইহুদিদের অপকর্ম চিত্র

📄 দাঙ্গাবাজ ইহুদিদের অপকর্ম চিত্র


১৮৯৭ সালের জায়োনিস্ট সম্মেলনে Theodor Herzl যে খসড়ালিপি উপস্থাপন করেন, তার দেড় যুগ পার না হতেই পৃথিবীতে একটি বিশ্বযুদ্ধ আঘাত হানে।

১৯০৩ সালে কিশিনেভে বসবাসরত ইহুদিদের সঙ্গে জ্যান্টাইলদের দাঙ্গা বাধে। ফলে সেখানে বহু ইহুদি নিহত হয়। ক্ষতিপূরণস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার উগান্ডায় তাদের একটি উপনিবেশ স্থাপনের প্রস্তাব দেন। Dr. Herzl এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন।

কেন এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হলো, তা নিয়ে তাদের মহলে প্রচণ্ড হইচই পড়ে যায়। কারণ, তাদের লক্ষ্য জেরুজালেম। অন্য কোনো ভূমির কথা তারা ভাবতেই পারে না। ইতঃপূর্বে তাদের আর্জেন্টিনায় উপনিবেশ স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেখানে তারা একই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাহলে উগান্ডা প্রস্তাবে Dr. Herzl রাজি হলেন কেন? এর কিছুদিন পর শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। তখনও কেউ বুঝতে পারেনি এই রক্তাক্ত যুদ্ধের উদ্দেশ্য কি! তবে যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, তাদের আর উগান্ডায় যেতে হয়নি; বরং তারা জেরুজালেমকেই চূড়ান্ত ভূমিরূপে ফিরে পেয়েছে।

প্রশ্ন জাগে, তারা কি এই যুদ্ধের কথা আগেই অনুমান করতে পেরেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর তাদেরই একটি উৎস থেকে উপস্থাপন করা হবে। ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯১৯ American Jewish News-এর প্রধান মুখপাত্র, Litman Rosenthal পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় 'When Prophet Speak' শিরোনামে একটি কলাম প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যিনি বহু বছর আগেই বেলফোর ঘোষণার পূর্ববাণী করেছিলেন। তিনি হলেন Max Nordau। তিনি ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রভাবশালী এক জায়োনিস্ট আন্দোলনকারী। Litman ছিলেন Nordau-এর ঘনিষ্ঠ সহচর। কলামটিতে ষষ্ঠ জায়োনিস্ট সম্মেলনে Nordau সাহেবের দেওয়া একটি বক্তৃতা উপস্থাপন করা হয়, যেখানে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ইজরাইল পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভবিষ্যদ্বাণী করেন। কলামটি নিচে উপস্থাপন করা হলো:

WHEN PROPHET SPEAK
By Litman Rosenthal

দিনটি ছিল শনিবার। ষষ্ঠ জায়োনিস্ট সম্মেলন সমাপ্ত হওয়ার পরদিন। সম্মেলনটি ১৯০৩ সালের আগস্ট মাসে বাসেলে অনুষ্ঠিত হয়। Dr. Herzl টেলিফোনে আমাকে তার সঙ্গে দেখা করার কথা বলেন। হোটেলে প্রবেশ মাত্রই তার মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। কুশলাদি বিনিময়ের পর তিনি রাশিয়ায় জায়োনিস্ট আন্দোলনের খবর জানতে চাইলেন। প্রশ্ন করলাম— 'আপনি কেবল রাশিয়ার খবর জানতে চাচ্ছেন কেন?' জবাবে তিনি বললেন— 'কারণ, আমার ছেলের কাছে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এর ওপর ইহুদিদের অনেক স্বার্থ নির্ভর করছে।'

সম্মেলনে ব্রিটিশ সরকারের প্রস্তাবিত পশ্চিম আফ্রিকার উগান্ডাকে তাদের উপনিবেশ তৈরি করা নিয়ে আলোচনা হয়। (Herzl ও তার প্রতিনিধিগণ ব্রিটিশ সরকারের এই প্রস্তাবনায় রাজি হন— Jewish Encyclopedia, Vol. 12, Page 678)। তবে প্যালেস্টাইনকে বিসর্জন দিয়ে নয়; বরং প্যালেস্টাইনকে ফিরে পাওয়ার ধাপ হিসেবেই একে গ্রহণ করা হয়। এটি ছিল Herzl ও Rosenthal-এর আলোচনার মূল বিষয়বস্তু। Herzl বলেন— 'আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং তা অর্জনের পদ্ধতির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।'

এবার সম্মেলনে Dr. Nordau কী বলেছেন এবং কোন সৌভাগ্যবশত তাতে যোগ দিয়েছিলাম, সেই গল্প নিচে উল্লেখ করা হলো:

'সেবার এক ব্যবসায়িক সফরে ফ্রান্সে গিয়েছিলাম। লিওনস যাওয়ার পথে কিছু সময়ের জন্য প্যারিসে যাত্রা বিরতি করি। প্রতিবারের মতো সেবারও জায়োনিস্ট বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করি। এক বন্ধু বলল, আজ সন্ধ্যায় Dr. Nordau ষষ্ঠ জায়োনিস্ট সম্মেলনে বক্তৃতা দেবেন। তার বক্তৃতা শুনতে ব্যবসায়িক সফরটি দীর্ঘায়িত করলাম। সন্ধ্যার মধ্যেই সম্মেলন কক্ষে হাজির হলাম। কক্ষটি ততক্ষণে জনসমাগমে গিজগিজ করছিল। তিনি সম্মেলন কক্ষে পৌঁছা মাত্রই সবাই দাঁড়িয়ে সংবর্ধনা জানাল। কোনো রকম দৃষ্টিপাত না করে তিনি সরাসরি বক্তৃতা মঞ্চে চলে গেলেন। এরপর বলা শুরু করলেন—

"জানি, আপনারা সবাই একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে ব্যাকুল হয়ে আছেন। প্রশ্নটি হলো— কীভাবে আমি ও Herzl ব্রিটেনের প্রস্তাবিত উগান্ডা প্রস্তাবনায় রাজি হলাম? কেনই-বা প্যলেস্টাইন ইস্যু থেকে সরে এলাম এবং আমাদের সহস্র বছরের পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলাম? এর জবাবে আপনাদের বলতে চাই, উগান্ডা প্রস্তাবনায় রাজি হওয়ার পেছনে অনেকগুলো যৌক্তিক কারণ রয়েছে। আসলে Herzl সাহেবকে এই প্রস্তাবনায় রাজি হওয়ার জন্য আমিই অনুরোধ করি। কেন এমনটা করেছি তা বলার আগে আপনাদের একটি গল্প শোনাতে চাই।

আমি এমন একটি সময়ের কথা বলতে যাচ্ছি, যা আপনাদের অনেকেই জানেন না। তখন ইউরোপের ক্ষমতাধর শক্তিগুলো সেভাস্টোপল দুর্গ দখল করতে নৌ-বহর পাঠানোর পরিকল্পনা করছিল। তখনও স্বাধীন ইতালির জন্ম হয়নি। সার্ডিনিয়ার একটি ছোটো শাসনাঞ্চল হিসেবে এটি পরিচিত ছিল, কিন্তু তখন এর ওপর অন্যান্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল। সার্ডিনিয়াবাসী স্বাধীন ইতালি প্রতিষ্ঠায় ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। এর পেছনে যে কয়জন মহান নেতার পরিচয় পাওয়া যায়, তারা হলেন— Garibaldi, Mazzini ও Cavour।

ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলো সার্ডিনিয়াকে সেভাস্টোপল আক্রমণের আমন্ত্রণ জানায়। প্রথমাবস্থায় সেভাস্টোপল ইস্যুতে সার্ডিনিয়া অস্বীকৃতি জানায়। বিশেষ করে Garibaldi ও Mazzini এই যুদ্ধে জাহাজ পাঠাতে রাজি হয়নি। তারা বলে— "আমাদের পরিকল্পনা ইতালি প্রতিষ্ঠা নিয়ে। সেভাস্টোপলে গিয়ে আমরা কী করব? সেখানে তো আমাদের কোনো কাজ নেই। আমাদের সব শক্তি ও ক্ষমতা শুধু ইতালি প্রতিষ্ঠার পেছনে ব্যয় করা উচিত।"

কিন্তু Cavour ছিলেন ব্যতিক্রমী ও দূরদর্শী একজন নেতা। তিনি বলেন— "আমাদের উচিত ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেভাস্টোপল আক্রমণ করা।" আসলে Hartam নামে তার একজন ব্যক্তিগত সচিব ছিল, যিনি জাতিতে ইহুদি। তিনি কেবল তার ব্যক্তিগত সচিবই ছিলেন না; খুব কাছের বন্ধুও ছিলেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে Cavour সাহেবকে পরামর্শ দিতেন। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সার্ডিনিয়ার অনেকেই Cavour-কে বিশ্বাসঘাতক বলে ডাকতে শুরু করে। অনেকে তার ব্যক্তিগত সচিবকে অভিযুক্তের কাঠগড়ায় নিয়ে আসে। প্রশ্ন করা হয়— বিশ্বাসঘাতকের মতো এমন বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী?

তিনি বলেন— "যে স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে আমাদের এত যুদ্ধ, ত্যাগ-তিতিক্ষা, তার মূলে রয়েছে স্বাধীন ইতালি প্রতিষ্ঠার দৃঢ় বাসনা। এ জন্য আমরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছি। মায়েরা তাদের সন্তানদের বিসর্জন দিয়েছে। আমাদের সব আত্মত্যাগ তখনই পবিত্র বলে গণ্য হবে, যখন চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হব।"

তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, সেভাস্টোপল যুদ্ধের পর একটি শান্তি আলোচনা হবে। সেখানে যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী প্রতিটি দেশ আসন গ্রহণ করবে। সার্ডিনিয়ার হয়তো সেভাস্টোপল নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই, কিন্তু এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শান্তি আলোচনার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। যখন সবাই যুদ্ধের মুনাফা ভাগ-বটোয়ারা নিয়ে দাবি তুলবে, তখন আমরা স্বাধীন ইতালির দাবি করব। এভাবে Cavour উপস্থিত নীতি-নির্ধারকদের বোঝানোর চেষ্টা করেন সেভাস্টোপল আক্রমণ করা হবে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রথম ধাপ।

পুরো কক্ষ এতক্ষণ Nordau সাহেবের বাণী মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামলে সবাই হাততালি দিতে শুরু করে। সবাইকে থামার নির্দেশ দিয়ে তিনি আবারও বলতে শুরু করলেন—

"বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি ব্রিটেন কিশিনেভ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সহমর্মিতাস্বরূপ আমাদের উগান্ডা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমরা জানি উগান্ডা আফ্রিকাতে, আর জায়োনিজমও কখনো আফ্রিকার জন্য তৈরি হয়নি। Herzl সাহেব খুব ভালো করেই জানেন, রাজনৈতিক পরাশক্তিদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কোনো বিকল্প হতে পারে না। এমতাবস্থায় ব্রিটেনকে হাতছাড়া করা উচিত হবে না। আমরা একটি মহাবিপ্লবের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। খুব দ্রুত এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে, যার দরুন আবারও একটি শান্তি আলোচনার আয়োজন করা হবে। সেখানে পৃথিবীর বড়ো বড়ো দেশের প্রতিনিধিরা হাজির হবে। আমরা পুনরায় ষষ্ঠ জায়োনিস্ট সম্মেলনের বিষয়াবলি উপস্থাপন করব। ব্রিটেন পূর্বের ন্যায় আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। এখন উগান্ডাবিষয়ক প্রশ্নে সার্ডিনিয়াকে অনুকরণ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাতে পারি। আর তা হচ্ছে— Herzl, জায়োনিস্ট সম্মেলন, ইংল্যান্ডের উগান্ডা প্রস্তাবনা, ভবিষ্যৎ বিশ্বযুদ্ধ (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ), যুদ্ধপরবর্তী শান্তি আলোচনা এবং সবশেষে ব্রিটেনের সহায়তায় প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।"

শেষ কিছু শব্দ আমাদের কানে বজ্রের ন্যায় আঘাত করে। আমরা অনেকেই বুঝতে পারিনি, একজন মানুষ কীভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তার এই জ্বালাময়ী বক্তৃতা প্যালেস্টাইন পুনরুদ্ধার বিষয়ে জায়োনিস্টদের সকল সংশয় মুহূর্তেই উড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। সবার আবেগ-উৎকণ্ঠাকে তিনি আরও কিছু সময়ের জন্য ধৈর্যে পরিণত করতে সক্ষম হন। এরপর আমরা সবাই তার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সেই কাঙ্ক্ষিত সময়টির জন্য দিনক্ষণ গণনা শুরু করলাম।'

পাঠকদের অবাক লাগতে পারে, Litman Rosenthal-কে কীভাবে এমন একটি কলাম লেখার জন্য অনুমতি দেওয়া হলো! আসলে বেলফোর ঘোষণার পূর্বে এই কলামটি প্রকাশিত হয়নি। ইহুদিদের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে— তারা ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো বিষয় জনসম্মুখে আসতে দেবে না, যতক্ষণ না তার উদ্দেশ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়। এ বিষয়টি পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে বেলফোর ঘোষণার অনেক পরে। ১৯০৩ সালের কর্মসূচিতে স্থান পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো— ১. ভবিষ্যৎ বিশ্বযুদ্ধ ২. শান্তি আলোচনা ৩. নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন।

একই উদাহরণ পাওয়া যায় জার সাম্রাজ্যের পতনের সময়ও। প্রথমে বলা হয় Nicholas Romanovitch-সহ তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েদের যারা হত্যা করে, তারা ছিল সোভিয়েত ডেপুটি, কিন্তু অনুসন্ধানের পর পরিষ্কার হয়— হত্যাকারী পাঁচজনই ছিল ইহুদি। তারা সোভিয়েত ডেপুটি ছদ্মবেশে Nicholas পরিবারকে হত্যা করে। এর পেছনে ছিল আমেরিকান জায়োনিস্টদের বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিয়োগ।

অবশেষে সেই দিনটি চলে আসে, যখন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় রাজপরিবারের সদস্য Archduke Franz Ferdinand সস্ত্রীক আততায়ীর হাতে নিহত হন। দিনটি ছিল ২৮ জুন, ১৯১৪। সেদিন তিনি সস্ত্রীক বসনিয়ার রাজধানী সারাজেভো ভ্রমণ করছিলেন। অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়, সার্ব-বসনিয়ার জাতীয়তাবাদী সংগঠন 'ব্লাক হ্যান্ডসদের' দ্বারা এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে।

২৩ জুলাই এই জাতীয়তাবাদ সন্ত্রাসী সদস্যদের আটক করার জন্য অস্ট্রিয়া সরকার সার্বদের ওপর সামরিক চাপ বৃদ্ধি করে। ঠিক তার পরদিন সার্বরা রাশিয়ানদের নিকট সামরিক সাহায্যের আবেদন করে। রাশিয়া বিনা বাক্যে সেই আবেদনে সাড়া দেয়। ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া সার্বদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধ ঘোষণা করে, যা এক অর্থে রাশিয়ানদের ওপরেও যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর। এরপর অস্ট্রিয়ার সমর্থনে পাশে এসে দাঁড়ায় জার্মানি ও অটোমান। অন্যদিকে রাশিয়ার পক্ষে দাঁড়ায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স।

Nordau সাহেবের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী যুদ্ধ ঠিক সময়ই শুরু হয়। আর যুদ্ধের ফলাফল কী হবে তা তারা ভালো করেই জানত। কারণ, কার ভান্ডারে কতটুকু রসদ মজুদ আছে সে হিসাব তারা আগেই কষে রেখেছিল। প্রতিটি দেশের প্রশাসনিক বিভাগে তাদের যথেষ্টসংখ্যক প্রতিনিধি ছিল। তাদের অতি প্রাচীন একটি সংস্কৃতি হচ্ছে— তারা নিরপেক্ষতার ছুতো ধরে যুদ্ধের উভয় পক্ষকে ঋণ ও রসদ সরবরাহ করত এবং প্রয়োজনীয় মুহূর্তে কাঙ্ক্ষিত একটি পক্ষের রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দিত। এতে তাদের ভান্ডারে যেমন মুনাফা আসত, তেমনি কাঙ্ক্ষিত পক্ষটিও যুদ্ধে জয়লাভ করত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর তারা অপেক্ষা করতে লাগল, কখন মিত্রশক্তির রসদ ফুরিয়ে যাবে। ব্রিটেনের জাহাজগুলো জার্মানির বিরুদ্ধে এমনিতেই প্রতিরোধ গড়তে পারছিল না। তার ওপর রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ায় তারা মাঝপথে যুদ্ধ থেকে সরে পরে। অসহায় হয়ে যায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স।

তাদের অসহায়ত্বের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা পড়ে, যখন ইহুদি ব্যাংকাররা ১৯১৬ সাল থেকে সকল প্রকার ঋণ প্রদান বন্ধ করে দেয়। কিছুদিন পর ফ্রান্সের অভ্যন্তরে সামরিক বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। এর দরুন তারাও যুদ্ধ থেকে সরে পড়ে। বাকি থাকে শুধু ব্রিটেন। তারা যে একাকী এই যুদ্ধে কখনো জিততে পারবে না, তা জায়োনিস্টরা বেশ ভালো করেই জানত। সেই মুহূর্তে ব্রিটেনের জন্য সামরিক শক্তিতে পুষ্ট কোনো মিত্রশক্তির আবশ্যকতা দেখা দেয়। আর এই সুযোগ যে ইহুদিদের সামনে আসবে, তা তারা যুদ্ধের আগ থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল। তাই তারা এতদিন ওত পেতে অতি গোপনে নতুন একটি সামরিক বাহিনী তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। আর তা-ই হলো আজকের আমেরিকা।

এই কাজের পুরো দায়িত্ব অর্পিত হয় Bernard M. Baruch-এর ওপর। তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এ দেশটিকে রণ শক্তিতে এতটা পারদর্শী করে তোলেন যে, যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মাথায় তারা জার্মানিকে সমূলে পরাজিত করে। ব্রিটেনের হাতে তুলে দেয় বিজয় মুকুট। এরপর ব্রিটেনও তাদের প্রতিশ্রুতিস্বরূপ, যুদ্ধ জয়ের বিনিময় হিসেবে জায়োনিস্টদের হাতে তুলে দেয় প্যালেস্টাইনের চাবি।

Mr. Baruch ১৮৭০ সালে দক্ষিণ ক্যারোলিনাতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম Simon Baruch। যুদ্ধ চলাকালে আমেরিকার ৩৫১-৩৫৭টি শিল্প প্রতিষ্ঠান তিনি একাই নিয়ন্ত্রণ করতেন। সে সময় তার মতো ক্ষমতাধর ব্যক্তি আমেরিকায় দ্বিতীয় কেউ ছিল না; এমনকী খোদ প্রেসিডেন্ট সাহেবও নন। যে কোম্পানির ওপর একবার তার চোখ পড়ত, তা দখল করেই ছাড়তেন। যেমন: Liggett & Meyers Tobacco Company, Selby Smelter, Tacoma Smelter ইত্যাদি। তিনি মেক্সিকোতে বিশাল রাবার বাগান গড়ে তোলেন, যেখান থেকে বিভিন্ন স্থানে কাঁচামাল সরবরাহ করা হতো। আয়রন, ইস্পাত ও কপার শিল্পের বাজারগুলোও তার দখলে ছিল।

১৯১২ সালে Woodrow Wilson-এর নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন। তখন থেকে তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সত্যিকারার্থে এটা কোনো সম্পর্ক ছিল না। বলা চলে, প্রেসিডেন্ট সাহেব তার হাতে বন্দি হয়ে পড়েন। মূলত এ দেশে যারা প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়, তাদের সবাই জায়োনিস্টদের পুতুলে পরিণত হয়। এ কথা কেন বলছি, তা পরবর্তী একটি অধ্যায়ে পরিষ্কার করব। যাহোক, এই সুযোগে Mr. Baruch সে সময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি বনে যান। তিনি যা বলেতেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব তা-ই করতেন। অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, কাঁচামাল, রসদ, সেনাবাহিনী ও শ্রমবাজারের মতো পাঁচটি বড়ো বড়ো প্রশাসনিক দপ্তর তিনি একাই চালাতেন।

যেহেতু আমেরিকা যুদ্ধে অংশ নেবে, তাই একটি সু-সংগঠিত সেনাবাহিনী গড়ে তোলা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই যুদ্ধকে ভয় পায় বলে এত দ্রুত সেনাবাহিনী গড়ে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। Mr. Baruch প্রভোস্ট মার্শালকে কিছু উপায় বাতলে দেন। প্রথমে নির্ধারণ করেন, এই বাহিনীতে কোন কোন শ্রেণির জনগোষ্ঠীকে নেওয়া হবে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমেরিকার বেশ কিছু শিল্প সংগঠন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কলমের এক খোঁচায় তাদের অবৈধ বলে আইন জারি করা হয়। এই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা কাজ করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাতারাতি বেকার হয়ে পড়ে। এটাই ছিল তাদের পরিকল্পনা। কারণ, এমন পরিস্থিতিতে একজন বেকারকে যে কাজেরই সুযোগ দেওয়া হবে, তাতেই সে রাজি হবে। অন্তত নিজ পরিবারের জন্য হলেও রাজি হবে; ঠিক তাই ঘটল। এরপর যখন সেনাবাহিনীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়, বেকাররা দলে দলে সেখানে প্রবেশ করতে শুরু করে। এভাবেই তৈরি হয় যুদ্ধকালীন আমেরিকার সেনাবাহিনী।

বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতিস্বরূপ Mr. Baruch প্রেসিডেন্ট সাহেবের থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের একটি বাজেট পাশ করান, যার পুরোটাই ছিল সাধারণ জনগণের ট্যাক্স ও বন্ড ক্রয়ের অর্থ। এত অর্থের বাজেট করেও যুদ্ধ শেষে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের বোনাস দেওয়া তো দূরের কথা, প্রাপ্য মজুরিটুকুও সামরিক বিভাগ মেটাতে পারেনি। তাহলে এত অর্থ গেল কোথায়? যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই দেখা যায়— নিউইয়র্কের ইহুদিদের আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়ে গেছে। সে সময় এই শহরের ৭০ শতাংশ মিলিয়নিয়ার ছিল এই জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা।

সাধারণ মানুষ তাদের দুঃখ-দুর্দশার দরুন প্রেসিডেন্টকে দোষারোপ করতে শুরু করে। কারণ, তার নির্দেশেই সেই শিল্প সংগঠনগুলো বন্ধ এবং সাধারণ মানুষ যুদ্ধে নিহত হয়েছে, অথচ তারা প্রাপ্য মজুরি পায়নি। ফলে চারদিকে ডেমোক্রেটবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, Woodrow Wilson ছিলেন এই দলের সদস্য। বোঝাই যাচ্ছিল এরপর যিনি ক্ষমতায় আসবেন, তিনি অবশ্যই রিপাবলিকান কোনো প্রার্থী হবেন। এবার ইহুদিরা তাদের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী রিপাবলিকানদের পিছে অর্থ বিনিয়োগ শুরু করে। বিনিয়োগ সফলও হয়। ১৯২১ সালে ক্ষমতায় আসে রিপাবলিকান প্রার্থী Warren G. Harding। এদিকে সৈনিকদের বকেয়া মজুরির ফলাফল হিসেবে আমেরিকায় শুরু হয় ইতিহাসের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ধ্বস, যা Great Depression ১৯২৯-১৯৩৯ নামে পরিচিত。

ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় ইহুদিদের নানা অপকর্মের চিত্র

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে বলকান দেশগুলোতে সাধারণ মানুষ যখন ক্ষুধা-দরিদ্রতায় হাহাকার করছিল, তখন আমেরিকা থেকে বেশ কয়েকটি ত্রাণবাহী জাহাজ সেখানে পাঠানো হয়। ত্রাণ বিতরণকালীন অভিজ্ঞতা নিয়ে জাহাজকর্মীদের মুখ হতে পাওয়া একটি অভিজ্ঞতার গল্প নিচে তুলে ধরা হলো—

'যুদ্ধপরবর্তী শান্তি মিশনের অংশ হিসেবে আমাদের জাহাজগুলো প্রয়োজনীয় ত্রাণ-সামগ্রী নিয়ে লিবাও বন্দরে হাজির হয়। চারদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের জাহাজটি ছোটো একটি স্রোতধারার সামনে নোঙর ফেলে ত্রাণ হস্তান্তর শুরু করে। এত এত মানুষ খাবারের জন্য হাহাকার করছিল যে, সুষ্ঠভাবে ত্রাণ বিলি করা অসম্ভব হয়। যখনই তাদের সামনে নতুন একটি আটার ব্যাগ খোলা হচ্ছিল, মানুষ যেন তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। যেটুকু আটা মাটিতে পড়ছিল, সেটুকুর জন্যও মানুষের কাকুতি-মিনতির শেষ ছিল না। ক্ষুধার্ত মানুষরা ধুলো-ময়লা মাখা আটাগুলো পর্যন্ত তাদের পাত্রে ভর্তি করে রাখছিল। আলু বিতরণ শুরু হলে তো মারামারি বেধে যায়। আলুর খোসা পানিতে ছুড়ে মারলে ক্ষুধার্ত মানুষরা তাদের ধাতব পাত্র দড়িতে বেঁধে সেগুলো তুলে আনতে শুরু করে। সাদা বর্ণের শুকনো মানুষগুলো খাবারের জন্য সারা দিন উন্মাদের মতো বড়ো বড়ো চোখ করে দাঁড়িয়ে ছিল।

এর মধ্যে দেখা যায় ডজনখানেক ইহুদির কিছু কুৎসিত দৃশ্য। সবাই যখন খাবারের জন্য লাফালাফি করছে, তখন ভালো কাপড় পরা তাদের একদল সদস্যকে দেখা যায়, যাদের মাথায় ছিল সদ্য ক্রয় করা চকচকে টুপি, হাতে ছিল দামি ঘড়ি এবং পায়ে ছিল দামি জুতা; যেমনটা শহরের সম্পদশালী মানুষদের ব্যবহার করতে দেখা যায়। তাদের আচরণ দেখে মনে হয়, এই জাহাজটি যেন তাদের জন্য সিগারেট নিয়ে এসেছে! তারা আমাদের পাঁচ পাউন্ডের নোট দেখিয়ে বলছে, এক কাটুন সিগারেট হবে অথবা একটি স্বর্ণের ঘড়ির বিনিময়ে নতুন কিছু সাবান হবে? দেখে মনেই হয় না, তারা রাশিয়াতে কোনো রকম নির্যাতনের শিকার হয়েছে।'

খ্রিষ্ট যুগের সূচনা হতে আজ পর্যন্ত যত ঐতিহাসিক যুদ্ধ-বিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে, তার প্রধান কারণ হিসেবে কেন যেন শুধু খ্রিষ্টানদেরই অভিযুক্ত করা হয়। সর্বত্র প্রমাণ করার জোড় প্রচেষ্টা চলছে— খ্রিষ্টবাদ ঐতিহাসিকভাবেই সন্ত্রাসী চেতনায় বিশ্বাসী এবং তারাই পৃথিবীর অধিকাংশ ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মূল হোতা! এ প্রসঙ্গে Rev. M. Malbert, ১৯২১ সালের এপ্রিলে Hebrew Christian Alliance Quarterly থেকে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যার শিরোনাম ছিল 'Persecution Is Not the Monopoly of Christian and Is Contrary to Its Principles।' প্রবন্ধটির গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ নিচে তুলে ধরা হলো—

'অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তাদের সব অপবাদের বিরুদ্ধে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করতে হবে। গত কয়েক হাজার বছরের সকল দাঙ্গা-সংঘাতের দায়ী হিসেবে পৃথিবীবাসী শুধু আমাদেরকেই অভিযুক্ত করেছে। কিন্তু পৃথিবীর প্রথম ধর্মীয় যুদ্ধের সূত্রপাত, ইহুদিদের হাতেই হলেও তারা এই বিষয়টি কখনোই স্বীকার করতে রাজি নয়। সময়ের পরিক্রমায় তারাই নিজেদের যুদ্ধবাজ জাতিতে পরিণত করেছে।

খ্রিষ্টপূর্ব ১২০ সালে Simon-এর পুত্র John Hyrcanus ছিলেন মাক্কাবিয়ান পরিবারের শেষ ভাই। নিজেদের ধর্ম রক্ষার্থে তিনি সিরিয়ান সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। তিনি জেরিজিন পর্বতের ওপর নির্মিত সামারিটান টেম্পল একেবারে ধ্বংস করে দেন। পরে ইডুমিয়ান রাজ্য দখল করেন এবং বন্দিদের ওপর দুটি পথ চাপিয়ে দেন। যথা: হয় ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করো, নয়তো দেশ ছেড়ে চলে যাও। তিনি জোড়পূর্বক একদল যুদ্ধবন্দির ওপর এই ধর্ম চাপিয়ে দেন।'

...John Hyrcanus-এর তৃতীয় পুত্র King Alexander ছিলেন মাক্কাবিয়ান রাজা। একজন পুরহিত হওয়ার পরও তিনি পরকালে বিশ্বাস করতেন না। এ জন্য ফেরাসিস গোত্র তাকে কখনো সহ্য করত না। খ্রিষ্টপূর্ব ৯৫ সালে ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুক্কাতে তিনি প্রতিবারের মতো নিজের পৌরহিত্য জাহির করছিলেন (ইহুদি ক্যালেন্ডারে ৭ম মাসের ১৫তম দিনকে শুক্কাত বলা হয়)। পূজার বেদিতে পানি না ঢেলে তিনি নিজ পায়ে ঢালতে শুরু করেন। বুঝতে পারলেন, এই কাজে সবাই চটে গেছে এবং তার জীবন হুমকির মুখে। অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি সৈন্যবাহিনীকে দ্রুত হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন, আর তারা সেখানে উপস্থিত থাকা ৬০০০ মানুষকে হত্যা করে।

তবে ফেরাসিসদের প্রতিশোধ ছিল আরও ভয়ংকর। পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে তিনি তাদের দলনেতাকে শান্তি আলোচনার প্রস্তাব করেন, কিন্তু কেউ এই শান্তি আলোচনায় বসেনি; বরং সবাই তার মৃত্যুদণ্ডের দাবি তোলে। তারা নিজ দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে সিরিয়ান রাজা Eucaerus-কে প্যালেস্টাইন দখলের জন্য উসকে দেয় এবং তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করে। রাজা Eucaerus প্রায় ৪৩০০০ সৈন্য নিয়ে মাক্কাবিয়ান সাম্রাজ্য জিহিদিয়া আক্রমণ করে। তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় Alexander পরাজিত হয় এবং ইফ্রয়িম পর্বতে আশ্রয় নেয়। পরে সিরিয়ান রাজাও ফেরাসিসদের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করে। তাদের একটি প্রতিশ্রুতিও পূরণ করা হয়নি। বিবেকের তাড়নায় দংশিত হয়ে তাদের প্রায় ৬০০০ সদস্য আবারও Alexander-এর কাছে ফিরে যায় এবং সাম্রাজ্য ফিরে পেতে আবারও যুদ্ধ করে। এই যুদ্ধে তারা সিরিয়ানরা পরাজিত হয়। এরপরও রাজা সাহেবের বিরুদ্ধে তাদের অনেকের পূর্ব অসন্তোষের রেশ থেকে যায়।

...ইহুদিরা অধার্মিকতা বা নাস্তিকতা একদম সহ্য করতে পারে না। তাদের চোখে অন্য ধর্মের প্রত্যেকেই নাস্তিক। একমাত্র তারাই আস্তিকতার ধর্মে বিশ্বাসী। তারা আশেপাশের প্রতিটি শহরকে এই ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করে। যে শহরগুলো ইহুদি ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, সেগুলো ধ্বংস করে দেয়। তৎকালীন সেনহাড্রিনের সদস্য Simon ben Shetach তার শাসনামলে ৮০ জন নারীকে জাদুচর্চার অভিযোগে ডাইনি বলে ক্রুশে ঝুলিয়ে হত্যা করে।

...হিল্লোল ও শাম্মাই হলো খ্রিষ্টপূর্ব বছরগুলোতে তাদের বড়ো দুটি বিদ্যাপীঠ। ধর্মীয় নিয়মনীতিতে মত-পার্থক্যের দরুন তাদের মধ্যে bloody যুদ্ধ প্রায় লেগেই থাকত। যিশুকে ক্রুশে ঝুলিয়ে হত্যা করাও ছিল তাদের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ। তারা বিশ্বাস করে— ঈশ্বরের নিকট সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো খ্রিষ্টান হত্যা!

রাবাই Tarpon একবার বলেছিলেন, গস্পেল এবং এপোস্টলের প্রতিটি বাক্য সৃষ্টিকর্তার নাম উল্লেখপূর্বক পুড়িয়ে ফেলা উচিত। তিনি আরও বলেন, খ্রিষ্টধর্ম পেগানিজমের চেয়েও বিপজ্জনক। প্রয়োজনে তিনি পেগানদের টেম্পলে আশ্রয় নেবেন, কিন্তু ক্যাথলিকদের সংস্পর্শে যাবেন না। Bar-Kosibah তাদের এক ভণ্ড পয়গম্বর, যিনি তার শাসনামলে প্রচুর খ্রিষ্টানকে নির্দয়ভাবে হত্যা করেন। রাজা Justinian-এর শাসনামলে তারা কৈসরিয়ার আশেপাশে বসবাসরত খ্রিষ্টানদের হত্যা এবং তাদের গির্জাগুলো ধ্বংস করে। গভর্নর Stephanus যখন দাঙ্গা হামলার শিকার খ্রিষ্টানদের রক্ষার প্রচেষ্টা করেন, তখন ইহুদিরা তাঁকেও হত্যা করে। ৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে তারা অ্যান্টিও আক্রমণ এবং সেখানে বসবাসরত খ্রিষ্টানদের ধারাল তলোয়ার দিয়ে নির্বিচারে হত্যা করে। রাজা Sinaite-এর শরীর দড়িতে বেঁধে অ্যান্টিওকের রাস্তায় টেনেহিঁচড়ে হত্যা করে।

৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের রাজা ইহুদিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্যালেস্টাইন আক্রমণ করে এবং সেখানে থাকা খ্রিষ্টানদের গণহত্যায় মেতে ওঠে। তখন প্রায় নব্বই হাজার অধিবাসী জেরুজালেম ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে বাইজ্যান্টাইন রাজা Heraclius পুনরায় প্যালেস্টাইন দখল করেন। যখন তার সৈন্যবাহিনী রোমান সাম্রাজ্য পাড়ি দিয়ে জেরুজালেম যাচ্ছিল, তখন এক সম্পদশালী ইহুদি তাকে নৈশ্যভোজের আমন্ত্রণ করে, যার নাম ছিল Benjamin।

তিনি হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি পারস্যের রাজাকে জেরুজালেম দখলের জন্য উসকে দেন। রাজা Heraclius জিজ্ঞেস করেন— 'কেন তুমি নিজ ভূমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে জেরুজালেমকে পারস্যের হাতে তুলে দিলে?' জবাবে তিনি বলেন— 'কারণ, সেখানে থাকা খ্রিষ্টানদের আমরা সহ্য করতে পারি না। এমনকী তারা মুসলিমদের নবি মুহাম্মাদের ওপরও কম অত্যাচার করেনি। তারা আরব নেতাদের মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিল এবং তাঁর অনুসারীদের ছত্রভঙ্গ করার বহু প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। এর মাধ্যমে যিশুর একটি ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণতা পায়— তিনি নিপীড়িত ও নির্যাতিত হয়েছেন, কিন্তু সত্য বাণী প্রচারে পিছপা হননি।'

এই প্রবন্ধ এখানেই শেষ নয়। কেউ যদি নিজ দায়িত্বে প্রবন্ধটি সম্পূর্ণ পাঠ করেন, তবে রক্তচোষা ইহুদি জাতির আরও অনেক ইতিহাস জানতে পারবেন। যখন তাদের ধর্ম পুনর্গঠন নিয়ে বিভিন্ন রাবাইদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হচ্ছিল, তখন রাবাই Isaac M. Wise-কে হুমকি দিয়ে রাবাই Lilienthal বলেন— 'আপনি যদি নিজেকে খ্রিষ্টান বলে মনে করেন, তবে ক্রুশবিদ্ধ হতে প্রস্তুত হোন।' (Isaac Meyer Wise, p. 92)

যারা Gibbson-এর লেখা Rise and Fall of the Roman Empire বইটি পড়েছেন, তারা ১ম খণ্ডের ১৬তম অধ্যায়ে তাদের নির্মমতার আরও অনেক প্রমাণ পাবেন। ইতিহাস প্রমাণ করে— যারা আজ অবধি ধর্মকে ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তারা হলো ইহুদি। বইটির বিশেষ একটি অনুচ্ছেদ নিচে তুলে ধরা হলো—

'সম্রাট Nero Claudius-এর রাজত্ব থেকে Antonius Pius-এর রাজত্বকাল পর্যন্ত রোমানদের কর্তৃত্ব ইহুদিদের অস্থির করে তোলে। যার দরুন তাদের সাথে প্রতিনিয়ত ছোটোখাটো দাঙ্গা লেগেই থাকত। মিশর, সাইপ্রাস ও সাইরিনের শহরগুলোতে তারা যে নির্মম ধ্বংসযজ্ঞের জন্ম দিয়েছে, তা মানব ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যে রাজ্য তাদের আশ্রয় দিয়েছে, সেই রাজ্যের সাথেও ইহুদিরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত মনোভাবের দরুন তারা কেবল রোমান সাম্রাজ্যেরই নয়; বরং গোটা মানবজাতির শত্রুতে পরিণত হয়েছে।

ইহুদিরা তাদের সেই অন্ধ বিশ্বাস আজ অবধি জিয়িয়ে রেখেছে, একদিন মহা প্রতিক্ষিত মশিহ হাজির হবেন। তিনি বিশ্ব সাম্রাজ্য তাদের হাতে তুলে দিয়ে এবং চারদিকে স্বর্গীয় আবহ তৈরি করবেন।'

তাদের উদ্দেশ্য প্যালেস্টাইন। বিংশ শতাব্দীতে অসংখ্য আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠে 'বেলফোর ঘোষণা'। যে দশ সদস্যের বোর্ড থেকে এই ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়, তাদের সাতজনই ছিল এভানজেলিক খ্রিষ্টান; যাদের সঙ্গে বিশেষ এই জাতিগোষ্ঠীটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্যালেস্টাইনে আরব উৎখাত বহু আগেই শুরু হয়েছে, কিন্তু ইহুদিদের জন্য এখনও তা নিরাপদ ভূমিতে পরিণত হয়নি। তাদের কৌশল ও চাপের মুখে ব্রিটেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফেঁসে গিয়েছিল। শুধু কি প্যালেস্টাইন? আরব, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত জুড়ে ২৫০-৩০০ বছরের যে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন, তা নিয়েও ইহুদিদের কম পরিকল্পনা ছিল না。

রণক্ষেত্র ইহুদিদের অর্থ উপার্জনের আদর্শ শস্যক্ষেত্র

পূর্বের একটি অধ্যায়ে বলা হয়েছে, যুদ্ধ ইহুদিদের নিকট অমিত সম্পদ উপার্জনের আদর্শ শস্যক্ষেত্র। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে যতগুলো যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে, প্রতিটির পেছনেই এই জাতিগোষ্ঠীটির বড়ো অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের উভয় পক্ষকেই প্রয়োজনীয় বিভিন্ন রসদ (খাদ্যশস্য, জামা-কাপড়, অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জামাদি) সরবরাহ করে ইহুদিরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছে।

বিষয়টি নিয়ে ১৯১৩ সালে Werner Sombart একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন, যার নাম The Jews and Modern Capitalism। বইটির ৫০ থেকে ৫৩ নম্বর পৃষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ বিশেষ নিচে তুলে ধরা হলো—

'ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপ-আমেরিকার প্রতিটি সৈন্যদলের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও রসদ সরবরাহের মূল কাজটি করত ইহুদিরা। এই বাণিজ্য যেন তাদের একচেটিয়া সম্পদে পরিণত হয়। ইহুদিরা ছিল যেকোনো রাজার নিকট ঋণ লাভের প্রধানতম উৎস। এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যার সব এখানে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। তবে একটি পথ দেখিয়ে দিতে পারি, যা অনুসরণ করে যেকোনো উৎসাহী পাঠক নিজেদের গবেষণা চালিয়ে নিতে পারবেন।

১৪৯২ সালের আগ পর্যন্ত ইহুদিদের বড়ো একটি অংশ স্পেনে বাস করত। তখন স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীগুলোতে ইহুদিরা প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের কাজ করত। সে গল্প এখানে আনতে চাচ্ছি না; বরং সেখান থেকে গল্প শুরু করব, যেখান থেকে ইংল্যান্ড-ইহুদি সম্পর্ক জোরদার হতে শুরু করেছে।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে তারা বিভিন্ন সামরিক বাহিনীর প্রধানতম রসদ সরবরাহকারী গোষ্ঠী হিসেবে চারদিকে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করে। Antonio Fernandez Carvajal হলেন এমন একজন ইহুদি, যিনি কমনওয়েলথ সৈন্যবাহিনীর জন্য রসদ সরবরাহের বিশেষ দায়িত্ব পান। তিনি ১৬৩০ থেকে ১৬৩৫ এর মাঝামাঝি সময়ে লন্ডনে বসবাস শুরু করেন এবং খুব অল্প সময়ে মাঝেই নিজেকে সম্পদশালী বণিকে পরিণত করেন।

১৬৪৯ সালে তাকে ইংল্যান্ড সামরিক বাহিনীর প্রধান খাদ্য-রসদ সরবরাহকারী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এ কাজে তার সহকারী হিসেবে একই জাতিগোষ্ঠীর আরও চারজন সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় তিনি বাৎসরিক ১,০০,০০০ পাউন্ড সমমূল্যের রৌপ্য বাহিরের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতেন। ১৬৮৯ সালে William III রাজা হিসেবে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আরোহণ করেন। সে সময় তার সামরিক বাহিনীর জন্য প্রধান রসদ সরবরাহকারী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন Sir Solomon Medina। তিনি ছিলেন জন্মসূত্রে একজন আরব ইহুদি।

সপ্তদশ শতাব্দীতে স্পেনের সাথে ইংল্যান্ডের যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই ফ্রান্সের সাথে নতুনভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্সের রাজা Louis XIV-এর সামরিক বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের কাজ করত স্ট্রসবার্গের (Strasbourg) ইহুদিরা। Jacob Worms ছিলেন রাজা Louis XIV-এর ডান হাত, যার পরামর্শ ছাড়া তিনি এক কদমও চলতেন না। যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি Maurice বলেন, ইহুদি রসদ সরবরাহকারীদের দক্ষতার দরুন তিনি সামরিক বাহিনীকে যে রূপে সুসজ্জিত করেছেন, ইতঃপূর্বে কখনো তা করা সম্ভব হয়নি। Louis বংশের শেষ দুই রাজার আমলে প্রধান রসদ সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করেছেন Cerf Beer। ১৭২৭ সালে মেটজ (Metz) শহরের ইহুদিরা মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে সেখানকার সামরিক বাহিনীর জন্য ৫,০০০ হাজার নতুন ঘোড়া সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে Abraham Gardis নির্মাণ করেন তার বিখ্যাত কোষাগার 'House of Gardis'। তা ছাড়া কুইবেক প্রদেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি নির্মাণ করেন আরও অনেক কোষাগার; যেখান থেকে ফরাসি বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সময়ে রসদ সরবরাহ করা হতো।

নেপোলিয়নের প্রতিটি যুদ্ধের ইতিহাস যদি ভালোভাবে অধ্যয়ন করা হয়, তবে সেখানেও উভয় দলে একই রসদ সরবরাহকারীর উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া যাবে। দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চালিয়ে যাওয়ার দরুন, উক্ত শতাব্দীতে পুরো ফ্রান্সজুড়ে দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ে। প্যারিস শহরের নগরপাল ইহুদিদের নিকট আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন, যেন এই দুর্ভিক্ষ থেকে তাদের রক্ষা করা হয়। সেখানকার সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করত, একমাত্র ইহুদিদের পক্ষেই এই মহামারি সময়ে খাদ্যাভাব মেটানো সম্ভব। একইভাবে, ১৭২০ সালে ড্রেসডেন শহরে দুর্ভিক্ষ শুরু হলে Jonas Meyer প্রায় ৪০ হাজার বুসেল সমপরিমাণ খাদ্যশস্য সরবরাহ করে শহরটিকে রক্ষা করেন। (১ বুসেল = ১৫.৪২ কেজি প্রায়।)'

জার্মানির ইতিহাস খুব ভালো করে অধ্যয়ন করলে সেখানেও অনেক ইহুদির পরিচয় পাওয়া যাবে, যারা বিভিন্ন সময়ে একচেটিয়াভাবে সেখানকার সামরিক বাহিনীতে রসদ সরবরাহের কাজ করত। যেমন: ১৫৩৭ সালে হেলবারস্টেড শহরের জার্মান সেনা ক্যাম্পে এই কাজের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন Isaac Meyer। খাদ্য-অস্ত্রসহ শত্রু পক্ষের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তিনি সেখানকার সেনা অফিসারদের নিকট সরবরাহ করতেন।

এরপর আসে Joselman von Rosheim-এর নাম, যিনি জার্মান সরকারকে খাদ্য, অস্ত্র ও তথ্য রসদের পাশাপাশি অর্থ ঋণ দিয়ে সাহায্য করতেন। তার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৫৫৮ সালে তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

১৫৫৬ সালে বোহেমিয়ান প্রদেশের ইহুদিরা স্থানীয় সেনা-ক্যাম্পগুলোতে সামরিক পোশাক ও কম্বল সরবরাহের বিষয়টি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। ষোড়শ শতাব্দীতে Lazarus নামে আরও এক বিখ্যাত বোহেমিয়ান ইহুদির নাম শোনা যায়, যে নিজ দায়িত্বে শত্রুপক্ষের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জার্মান সেনাবাহিনীর নিকট সরবরাহ করত। এর দরুন তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানান সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়, যা কাজে লাগিয়ে সেও রসদ সরবরাহের কাজে জড়িয়ে পড়ে।

সেক্সনি রাজ্যে এই কাজটি করত Samuel Julius। তা ছাড়া বিভিন্ন যুদ্ধে কামান ও গান পাউডার সরবরাহের কাজ করত Leimann Gompertz ও Solomon Elias।

অস্ট্রিয়ার সামরিক বাহিনীতেও প্রধান রসদ সরবরাহকারী হিসেবে এমন অসংখ্য ইহুদির পরিচয় খুঁজে পাওয়া যাবে। রাজা Leopold-এর শাসনামলে ইহুদিরা ভিয়েনাতে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং রাতারাতি সেখানকার সামরিক বাহিনীতে রসদ সরবরাহের কাজটি নিজেদের করে নেয়। এমন কিছু বিখ্যাত ইহুদির নাম হলো— Oppenheimers, Wertheimers ও Mayer Herschel。

মধ্যযুগীয় যুদ্ধ থেকে শুরু করে আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত পৃথিবীতে যতগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তার মধ্যে এমন একটি উদাহরণও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে বিশেষ এই জাতিগোষ্ঠীটির অংশগ্রহণ ছিল না। যুদ্ধে তো বহু রাষ্ট্রই অংশগ্রহণ করে। মিত্ররাষ্ট্রকে বাঁচাতে বহু দেশের সামরিক বাহিনী রণক্ষেত্রে যোগদান করে। তারা সম্মুখ সমরে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করে এবং দেশ ও জাতীয়তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে নিজেদের সবটুকু উজার করে দেয়। কিন্তু ইহুদিদের ক্ষেত্রে এই প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন। তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ঠিকই, তবে রণক্ষেত্রে নয়। তারা প্রতিটি যুদ্ধকে অর্থ উপার্জনের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ওপরন্তু অর্থের প্রতি নিজেদের লোলুপ বাসনা চরিতার্থ করতে ইহুদিরা বিভিন্ন রাষ্ট্রকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পারস্পরিক যুদ্ধে জড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। স্বাধীনতাপরবর্তী আমেরিকায় যে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তাতেও ছিল ইহুদিদের বর্ণণাতীত কূটবুদ্ধি ও ষড়যন্ত্রের দৌড়াত্ম্য।

বহু শতাব্দী পূর্বে, ক্যাথলিক ও অর্থডক্সদের অন্তর্দ্বন্দ্ব পুঁজি করে ইউরোপ জুড়ে যে রক্তাক্ষয়ী ধর্মীয় সংঘাতের সূত্রপাত, তার পরিসমাপ্তি আজও ঘটেনি। রক্তের সমুদ্র শুকিয়ে তাতে নতুন রক্ত ঝড়েছে, কিন্তু পরিবর্তন আসেনি সাধারণ মানুষের জীবন প্রবাহে। পরিবর্তন এসেছে শুধু ইহুদিদের সম্পদ ও প্রাচুর্যতায়। কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের রিপোর্টগুলো ভালোভাবে অনুসন্ধান করলে এমন অনেক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যাবে, যেখানে বিভিন্ন সামরিক বাহিনীতে রসদ সরবরাহ করে ইহুদিরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করত। তেলের ড্রাম, কম্বল, রাইফেল, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি খুব পরিচিত কিছু রসদের নাম, যা তারা নিয়মিত সরবরাহ করত। ১৭৭৫ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের সাথে আমেরিকানদের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলেছিল, সেখানেও ছিল এই রসদ ব্যবসায়ীদের উল্লেখযোগ্য অধিপত্য。

এ প্রসঙ্গে প্রথমে যে ব্যক্তির নাম চলে আসে, তিনি হলেন Moses Franks। একসময় তিনি ইংল্যান্ডে থাকতেন এবং ব্রিটিশ সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরুর আগ পর্যন্ত তিনি আমেরিকায় অবস্থিত ব্রিটিশ সেনা-ক্যাম্পগুলোতে প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের সিংহভাগ আঞ্জাম দিতেন। তা ছাড়া কুইবেক, মন্ট্রেল, মেসাচুসেট, নিউইয়র্ক ও ইলয়নসের ক্যাম্পগুলোতে তিনি ছিলেন প্রধান রসদ সরবরাহকারী।

Jacob Franks তখন নিউইয়র্কে বাস করতেন। মূলত Moses Franks-এর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে তার আমেরিকায় আগমন। তিনিও ব্রিটিশ সেনা-ক্যাম্পগুলোতে রসদ সরবরাহের কাজ করতেন। বলে রাখা উচিত, স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর পূর্ব হতে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাথে ফ্রাঙ্ক পরিবারের ছিল বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাই এই যুদ্ধের প্রারম্ভিক পর্যায়ে তারা ব্রিটিশ সেনা-ক্যাম্পগুলোতে রসদ সরবরাহ করত। যেহেতু ইহুদিরা কখনো এক পাত্রে সব ডিম রাখতে রাজি নয়, তাই কিছুদিন পর যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে শুরু করলে তাদেরই আরেকটি অংশ আমেরিকানদের জন্য রসদ সরবরাহ করতে শুরু করে।

David Franks হলেন তাদের একজন। তিনি ছিলেন Jacob Franks-এর পুত্র। শুরুর দিকে তিনি পেনসিলভানিয়ার ব্রিটিশসেনা-ক্যাম্পগুলোতে রসদ সরবরাহের কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে আমেরিকার সেনাবাহিনীতে অর্থ ও রসদ সরবরাহের কাজ শুরু করেন। অসম্ভব ধনী হওয়ার দরুন তিনি আমেরিকার রাজনীতি ও সাম্রাজ্যবাদবিরুধী শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। এই স্বাধীনতাযুদ্ধে মহান যে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম প্রায়ই বিভিন্ন স্থানে উচ্চারিত হয়, তাদের অনেকেই ছিল বিশেষ এই ব্যক্তির সাগরেদ।

মন্ট্রেল শহরে এই পরিবারের এমন আরেকজন সদস্যের নাম জানা যায়, যিনি আমেরিকানদের পক্ষে রসদ সরবরাহ করতেন, তিনি হলেন— David Solesbury Franks। তিনি ছিলেন Moses Franks-এর পৌত্র। রসদ বাণিজ্যে তিনি এতটা দক্ষ ছিলেন যে, কীভাবে সামরিক শক্তিতে দুর্বল একটি জাতির ভাগ্য রাতারাতি পালটে দেওয়া যায়, তা তিনি ভালো করে জানতেন। এ জন্য তাকে একটি উপাধি দেওয়া হয় 'A Blooded Buck' ।

এ ছাড়াও ফ্রাঙ্কস পরিবারের আরও অনেক সদস্যের নাম এই স্বাধীনতাযুদ্ধে জড়িয়ে আছে, যা উল্লেখ করে এই আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছি না। পরবর্তী সময়ে আমেরিকা হয়ে উঠে ইহুদিদের আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্য বিস্তারের দুর্গক্ষেত্র। তবে Bernard M. Baruch প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সামরিক শক্তিতে পরিপূর্ণ আমেরিকান সেনাবাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে এই দুর্গের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সেই থেকে এই বাহিনী কেবল ইহুদিদেরই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে পথে কাজ করে যাচ্ছে।

📘 সিক্রেটস অব জায়োনিজম > 📄 আমেরিকার অর্থব্যবস্থায় ইহুদি দৌরাত্ম্য

📄 আমেরিকার অর্থব্যবস্থায় ইহুদি দৌরাত্ম্য


ইহুদিদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূল শক্তিঘর প্রতিষ্ঠিত হয় রথসচাইল্ড পরিবারের হাত ধরে, সপ্তদশ শতাব্দীতে। এটি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুট শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও পরবর্তী সময়ে তা ইংল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এর সাথে যুক্ত হয় আরও কিছু পরিবার। তাদের আধিপত্যও কোনো অংশে কম নয়。

মূলত অর্থ-সম্পদের ভিত্তিতে গড়ে উঠে অর্থনীতি। আর তারই প্রাচুর্যতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে একটি দেশের রাজনৈতিক দল। তাই অর্থনীতির সাথে রাজনীতির সম্পর্ক খুবই গভীর। ইহুদি ব্যাংকাররা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন শাখা খোলার পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর অদৃশ্য আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। এর ফলে তারা প্রতিটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে কলকাঠি নাড়ার অনুমতি পেয়ে যায়। রথসচাইল্ড ছাড়া আরও যে চারটি পরিবার এই শিল্পে একচ্ছত্র ক্ষমতাবান, তাদের নাম হলো: Belmont (বেলমন্ট), Schiff (স্কিফ), Warburg (ওয়াবার্গ) এবং Kahn (খান)।

১৮৩৭ সালে আমেরিকায় রথসচাইল্ড পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করতে হাজির হন August Belmont। তার জন্ম জার্মানির ফ্রাঙ্কফুট শহরে। পরবর্তী সময়ে তার হাত ধরে জন্ম নেয় বেলমন্ট ব্যাংকিং পরিবার। ১৮৬০ থেকে ১৮৭২ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ন্যাশনাল ডেমোক্রেট কমিটির প্রধান সভাপতি。

দ্বিতীয় ব্যক্তিটি হলেন Jacob Schiff। তার জন্মও ফ্রাঙ্কফুট শহরে। জার্মানিতে বাবার ব্যাংকে দীর্ঘকাল শিক্ষানবিশ হয়ে কাজ করার পর ১৮৬৫ সালে তিনি আমেরিকায় প্রবেশ করেন। তার বাবাও ছিলেন রথসচাইল্ড পরিবারের বিশেষ একটি শাখার প্রতিনিধি। তার সংগঠনের হাত ধরে প্রচুর জার্মান মূলধন আমেরিকায় প্রবেশ করে। তার অর্থে তৈরি হয় অনেক নতুন নতুন রাস্তা-ঘাট, সেতু, মহাসড়ক, রেলপথ, উঁচু ভবন, বিমা প্রতিষ্ঠান ও টেলিগ্রাফ প্রতিষ্ঠান।

১৮৭৫ সালে Theresa Loeb-কে বিয়ে করার মধ্য দিয়ে তিনি Kuhn, Loeb & Company-এর প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন। জাপান-রাশিয়া যুদ্ধেও তিনি প্রচুর অর্থ জাপানের পক্ষে বিনিয়োগ করেন। ভেবেছিলেন এই বিনিয়োগের ছুতোতে হয়তো জাপানের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপের সুযোগ পাবেন, কিন্তু জাপান রাজা সতর্ক ব্যক্তি হওয়ায় ইহুদিদের ভাবগতি ভালো করেই জানতেন। তাই নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলিতে অন্যদের হস্তক্ষেপের ন্যূনতম সুযোগ দেননি।

Kuhn, Loeb & Company-এর সঙ্গে জড়িত আরেকজন ব্যক্তি হলেন Otto Herman Kahn। অন্যদের মতো তারও জন্ম ফ্রাঙ্কফুট শহরে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেম' তৈরির পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে তিনি আমেরিকায় আগমন করেন। তখন থেকেই আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাকে আমেরিকায় নিয়ে আসার পেছনে গোপনে কাজ করেন Paul Warburg。

এরপর চলে আসে ওয়াবার্গ পরিবারের নাম। ১৯০২ সালে পরিবারটির অন্যতম সদস্য Paul Warburg আমেরিকায় আগমন করেন। তিনি ১৮৬৮ সালে জার্মানির হাম্বার্গ শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কিশোর বয়সেই রপ্ত করেন 'কীভাবে অর্থ (Money) তৈরি করতে হয়।' একটু চিন্তা করে দেখুন, যেখানে প্রাপ্ত বয়সেও অনেকে জানে না কীভাবে অর্থ উপার্জন করতে হয়, সেখানে তিনি কিশোর বয়সেই শিখে ফেলেছেন কীভাবে অর্থ তৈরি করতে হয়!

The Banking House of Warburg ১৭৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটাই ছিল তার কিশোরকালীন বিদ্যালয়। ব্যাংকিং শিল্পে তিনি কীভাবে পারদর্শী হয়ে উঠেন, তা ৫ আগস্ট, ১৯১৪ সালে Banking and Currency Committee-তে নিজ মুখে স্বীকার করেন। তার পুরো বক্তব্য একজন শর্টহ্যান্ড লেখক লিপিবদ্ধ করেন। ১২ আগস্ট, ১৯১৪ তার পুরো বক্তব্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়। তার বক্তব্যের গুরত্বপূর্ণ অংশ নিচে উপস্থাপন করা হলো—

'হাম্বার্গ থেকে আমি ইংল্যান্ড চলে আসি। সেখানে Samuel Montague & Co-তে দুই বছর কাজ করি। এরপর দুই মাসের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানে শেয়ার অবলেখকের কাজ করি। শেখার চেষ্টা করি, কীভাবে শেয়ারবাজারকে পুরো দেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা যায় এবং তার সাথে ব্যাংকিং কার্যক্রম সংযুক্ত করা যায়।

এরপর যাই ফ্রান্সে। সেখানে একটি রাশিয়ান ব্যাংকের শাখায় কিছুদিন কাজ করি। কীভাবে বৈদেশিক বাণিজ্যের সাথে ব্যাংকিং কার্যক্রমকে সংযুক্ত করা যায়, তা শিখি। এরপর হাম্বার্গে ফিরে স্থানীয় একটি ব্যাংকে কিছুদিন কাজ করি। পাশাপাশি ভারত, চীন ও জাপানের একাধিক ব্যাংক পরিদর্শন করি।

১৮৯৩ সালে প্রথমবারের মতো আমেরিকায় আসি। কিছুদিন থেকে হাম্বার্গে ফিরে যাই এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করি। ১৯০২ সালে পুনরায় আমেরিকায় আসি এবং Kuhn, Loeb & Co-এর শেয়ারহোল্ডার হই।

এই হলো আমার পুরো ব্যাংকিং শিক্ষাজীবনের ইতিহাস। ১৮৯৫ সালে Solomon Loeb-এর কন্যা Nina Loeb-কে বিয়ে করে তাদের সাথে পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হই। এর মাধ্যমে আমি তাদের পরিবারিক প্রতিষ্ঠান Kuhn, Loeb & Co.-এর শেয়ারহোল্ডার হই।'

Mr. Loeb-এর অপর কন্যাকে বিয়ে করেন Jacob H. Schiff। এটা ইহুদিদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য যে, ব্যবসায় জোট মজুত করতে তারা পারিবারিক সম্পর্ককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এরপর Mr. Schiff তার কন্যা Frieda Schiff-কে বিয়ে দেন Felix Warburg-এর সাথে, যিনি Paul Warburg-এর আপন ভাই。

উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ট্রাস্ট কোম্পানি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল— মানুষের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ নিজেদের নিকট জমা রাখা এবং ওয়ারিশবিধি অনুযায়ী তা উত্তরাধিকারীদের নিকট বণ্টন করা। পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলোও মানুষকে ঋণ দেওয়ার কাজ শুরু করে। কিন্তু ১৯০৬ সালে ট্রাস্ট কোম্পানিগুলো জনগণের আস্থা একেবারে হারিয়ে ফেলে। প্রচুর মানুষ জমাকৃত সম্পদ হারিয়ে পথে বসে। ঘটনা শুরু হয় যখন Knickerbocker Trust Co. তাদের 'রিজার্ভ' হারিয়ে ফেলে। এ থেকে পুরো আমেরিকায় শুরু হয় অর্থনৈতিক বিক্ষোভ।

এই বিক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে মি. ওয়াবার্গ Defects and Needs of Our Banking System শিরোনামে একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করেন। তিনি আর্টিক্যালটি আরও আগেই লিখেছিলেন, কিন্তু প্রকাশ করেন ১৯০৭ সালে, যখন পুরো আমেরিকায় অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। তিনি জানতেন, ট্রাস্ট কোম্পানিগুলো খুব দ্রুত পথে বসবে। মূলত তারাই এই প্রতিষ্ঠানটির পতন ঘটিয়েছে, পুরো বিষয়টাই ছিল সাজানো নাটক!

তার আর্টিক্যালটি Senator Aldrich-এর চোখে পড়ে। তিনি তখন আমেরিকান সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পেশাদার জীবনে ছিলেন খুবই কর্মঠ। বিশ্বাস করতেন আমেরিকান জাতির উন্নয়নে। তবে তিনি ভাবতেন, এই উন্নয়ন কেবল ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমেই করা সম্ভব। তার সাথে রকেফেলার পরিবারেরও বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। তার মেয়ে Abby Aldrich-কে সেই রকেফেলার পরিবারের সদস্য John D. Rockefeller এর সঙ্গে বিয়ে দেন।

১৯০৬ সালে অর্থনৈতিক সংকট চরমে পৌছালে— Nelson Aldrich-কে এর সমাধান খোঁজার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি পরামর্শের জন্য Mr. Warburg-এর শরণাপন্ন হন। উভয়ে একটি গুপ্ত আলোচনার আয়োজন করেন, যার জন্য জর্জিয়ার নিকটবর্তী নির্জন দ্বীপ জ্যাকল আইল্যান্ডকে (Jekyl Island) বাছাই করা হয়। দ্বীপটি ছিল সম্পদশালী ইহুদিদের অবসর সময় কাটানোর জায়গা। এই গুপ্ত আলোচনার বিষয়বস্তু কী ছিল, তা আজ অবধি জানা সম্ভব হয়নি। ১৯১৬ সালে Forbes Magazine-এর লেখক B.C. Forbes এই গুপ্ত আলোচনাটি নিয়ে একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করেন, যার অংশবিশেষ নিচে উপস্থাপন করা হলো—

'কল্পনা করুন আমেরিকার প্রতাপশালী ব্যাংকারদের কথা, যারা বিশ্বস্ত কিছু সহকর্মীকে সাথে নিয়ে রাতের অন্ধকারে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ট্রেনে করে নিউইয়র্ক থেকে ১০০ মাইল দক্ষিণে কোনো একটি স্থানে নেমে যায় এবং সেখান থেকে এক সপ্তাহের জন্য একটি রহস্যেঘেরা দ্বীপে গমন করে। প্রথমবার মিলিত হয়ে তারা কেবল একবারের জন্য নিজেদের পরিচয় বিনিময় করেছে। পাছে ভয় হয়, যদি সাথে থাকা চাকরগুলো সবার পরিচয় জেনে যায়!

সবাই শপথ করে, জ্যাকল আইল্যান্ডে তাদের মাঝে যে আলোচনা হবে, তার উচ্ছিষ্ট অংশটুকু পর্যন্ত সাধারণ মানুষ জানতে পারবে না। Nelson Aldrich-এর নির্দেশে সবাই আলাদা আলাদা গাড়িতে উঠে যায়। তাদের জন্য আগে থেকেই গাড়ির ব্যবস্থা করা ছিল। গাড়িগুলো এমন একটি নির্জন প্লাটফর্মে রাখা হয়েছিল, যেন সাধারণ মানুষ বুঝতে না পারে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তারা সাউদার্ন কান্ট্রিতে হাজির হয়। অন্ধকার থাকাতে সেই দৃশ্য নিউইয়র্কের কোনো সাংবাদিকের চোখে পড়েনি।

গাড়ি থেকে বের হয়ে তারা ছোটো ছোটো কিছু নৌকায় উঠে পড়ে। তাদের আচরণ এমন ছিল, যেন নৌকার মাঝিরা পর্যন্ত বুঝতে না পারে— তারা আমেরিকার বিশিষ্ট ব্যক্তিভাজন!

সঠিক সময়ে তারা জ্যাকল আইল্যান্ডে এসে পৌঁছায়। দ্বীপটি ছিল জনশূন্য, সেখানে অর্ধডজন চাকর-বাকর ছাড়া আর কেউ-ই ছিল না। একে অপরকে জিজ্ঞেস করে, কীভাবে চাকরদের কাছ হতে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখা সম্ভব? একজন বলল— "চলুন, আমরা সবাই আমাদের নামের প্রথম শব্দটি দ্বারা একে অপরকে সম্বোধন করি।" সবাই এতে রাজি হলো।

ফলে আমেরিকার অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সৈনিকের নাম হয়ে যায় Nelson; আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার গুরু এবং Kuhn, Loeb & Co.-এর অন্যতম শেয়ার হোল্ডারের নাম হয়ে যায় Paul।

Nelson গোপনীয়তা রক্ষা করতে Harry, Frank, Paul ও Piatt-কে বলেন, যতদিন না তারা এমন একটি নকশা তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে— যা দ্বারা পুরো আমেরিকাকে একত্রিত করা সম্ভব— ততদিন এই দ্বীপে অবস্থান করবে। তিনি এমন একটি অর্থ ব্যবস্থার কথা জানতে চান, যা শুধু আমেরিকায় নয়; পুরো ইউরোপে গ্রহণ যোগ্যতা পাবে।'

সাত দিনে এই আলোচনা অনেক দূর গড়ায়। তবে যেসব বিষয়ের ওপর আলোচনা ও চুক্তি হয়, তার কোনো কিছুই আজ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। গুপ্ত আলোচনায় বিশেষ চারটি পরিবারের সদস্যগণ ছাড়া আরও যারা উপস্থিত ছিলেন, তারা হলেন: Bernard Baruch, Eugene Meyer, Felix Frankfurter, Benjamin Strong, Julius Rosenwald, Henry Davison, Arthur Shelton ও Frank Vanderlip।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর E.R.A. Seligman নতুন কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর ১৯১৯ সালে একটি কলাম প্রকাশ করেন। নিচে এর অংশবিশেষ উপস্থাপন করা হলো—

'আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠনে Mr. Warburg-এর অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। শুরুতে যদিও তার পরিকল্পনা কিছুটা দৃষ্টিকটু ছিল, তারপরও সময়ের সাথে সাথে তা আমেরিকার অর্থনীতির মূল গঠনতন্ত্রে পরিণত হয়। খুব দ্রুত তা প্রতিটি প্রদেশের ভিন্ন ভিন্ন অর্থব্যবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। এর দরুন দীর্ঘকালীন অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা ও বাণিজ্যিক জটিলতা থেকে আমেরিকার মানুষ মুক্তি পায়।

১৮৪০ সালে Mr. Samuel Jones কর্তৃক উপস্থাপিত Peel's Bank Act-এর কল্যাণে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড যেমন নোট ইস্যুর অনুমতি পায়, তেমনি Mr. Warburg কর্তৃক উপস্থাপিত Federal Reserve Act আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নোট ইস্যুর অনুমতি প্রদান করে।

Senator Aldrich চেয়েছিলেন— ১২টি আঞ্চলিক শাখা অফিস নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গঠিত হবে এবং তা সরকারি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে, কিন্তু Warburg চেয়েছেন— ব্যাংকটি সম্পূর্ণ বেসরকারি মালিকানায় পরিচালিত হবে। তিনি বলেন— "সরকারি বা রাজনৈতিক থাবার ভেতর থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কখনো প্রত্যাশিত ফলাফল উপহার দিতে পারে না। তাই এই ব্যাংক পরিচালনায় যে দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হবে, তা সরকারি আজ্ঞার বাহিরে থাকবে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদের বিনিময়ে ব্যাংক তার সকল অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।" যেহেতু Aldrich-এর নিকট অপেক্ষাকৃত ভালো কোনো পরিকল্পনা ছিল না, তাই তিনি উপস্থাপিত দাবি দুটি মেনে নেন।

এটাই হয়তো শেষ প্রজন্ম, যারা বার্টার ট্রেডকে শেষবারের মতো দেখে নিচ্ছে। এরপর এই সংস্কৃতি বাজার থেকে হারিয়ে যাবে। এর স্থলাভিষিক্ত হবে কাগজি নোটভিত্তিক বিনিময়ব্যবস্থা।' (pp. 387-390, Vol. 4, No. 4, Proceedings of the Academy of Political Science, Columbia University)

এটাই প্রথম ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়; ইউরোপে এমন আরও অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক আছে, যেগুলো ইহুদিদের ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। এ নিয়ে Mr. Warburg একটি প্রবন্ধ লিখেন— American and European Banking Methods and Bank Legislation Compared। সেখানে উল্লেখ করেন—

'শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও ইউরোপের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে রাষ্ট্র বা সরকারের কোনো শেয়ার নেই। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তো পুরোটাই ব্যক্তি মালিকানাধীন। ফ্রান্স ও জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুটিতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন সামান্য অধিকার চর্চার সুযোগ পেলেও এর পুরো লভ্যাংশ বণ্টিত হয় ব্যক্তি মালিকদের মাঝেই।'

সেখানে তিনি বেশ কিছু ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাধারণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে, তা Federal Reserve Act-এ অন্তর্ভুক্তির জন্য জোর দাবি তোলেন। বৈশিষ্ট্যগুলো পয়েন্ট আকারে দেখানো হলো—
• কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না।
• রাষ্ট্রীয় নোট ছাপানোর অধিকার কেবল তাদের হাতেই থাকবে।
• জাতীয় সম্পদ (স্বর্ণ-রৌপ্য) সংরক্ষণের অধিকার থাকবে।
• অর্থ বাজারের পরিচালনায় সরকার-প্রশাসন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করবে。

বলে রাখা ভালো, ১৮৩৩ হতে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত আমেরিকার ইতিহাসে কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছিল না। ১০ জুলাই, ১৮৩২ প্রেসিডেন্ট Andrew Jackson একটি দীর্ঘ বক্তৃতা প্রদান করেন। তিনি বলেন—

'সাধারণ মানুষ যদি ব্যাংকিং ও অর্থ ব্যবস্থার কারচুপি সামান্য হলেও বুঝতে পারত, তাহলে পরদিন ভোরেই মহাবিপ্লবের জন্ম হতো। ব্যাংক নামক বিষধর সাপটি যতই বিষাক্ত হোক না কেন, মহান ঈশ্বরকে সাথে নিয়ে আমি তার বিষদাঁত তুলে ছাড়ব। আমি জানি, তারা আমাকে দংশনের অপেক্ষায় ওত পেতে আছে, কিন্তু আমিই তাদের দংশন করব।'

১০ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক অব আমেরিকাকে বন্ধ ঘোষণা করেন। ব্যাংকটির আরও একটি নাম ছিল 'ফার্স্ট ব্যাংক অব আমেরিকা'। এরপর দীর্ঘ ৮০ বছর আমেরিকায় কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছিল না; তবে ইহুদিদের পরিকল্পনার অন্ত ছিল না。

আশা করি, Mr. Taft-এর কথা আপনাদের মনে আছে। তিনি শুধু রাশিয়ানদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাই নয়; অবান্তর কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠারও অনুমোদন দেননি। তাই পরবর্তী নির্বাচনকাল পর্যন্ত ইহুদিদের অপেক্ষা করতে হয়। ১৯১২ সালের নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে লড়াই করেন Roosevelt, Taft ও Wilson। যেহেতু এক ঝুড়িতে তারা সব ডিম রাখে না, তাই সকল প্রার্থীর পেছনেই তারা বিনিয়োগ করে। Wilson সাহেবের পেছনে বিনিয়োগ করে Schiff; Taft সাহেবের পেছনে Felix Warburg; Roosevelt-এর পেছনে Mr. Kahn। সবশেষে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন Woodrow Wilson।

ক্ষমতায় এসে Wilson সরকার ইহুদিদের বিনিয়োগ ও প্রচারণা কাজের পুরস্কারস্বরূপ ফেডারেল রিজার্ভ অ্যাক্টকে অনুমোদন করে এবং উত্থাপিত সকল শর্ত মঞ্জুর করে। ব্যাংকটি যেহেতু ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হবে, তাই এর প্রারম্ভিক রিজার্ভ যে শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগকৃত সম্পদেই গঠিত হবে, তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এই রিজার্ভ কী দিয়ে তৈরি হবে? এ সম্পর্কে সিনেটের একটি আলোচনায় Pomerene ও Bristow যৌথভাবে Mr. Warburg-কে প্রশ্ন করেন।

প্রশ্ন: 'ফেডারেল ব্যাংকের রিজার্ভ কী দিয়ে তৈরি হবে?'
উত্তর: 'এই ব্যাংকের রিজার্ভ স্বর্ণ-রৌপ্য দ্বারা তৈরি হবে।'

কিন্তু যে স্বর্ণ-রৌপ্যের কথা এখানে বলা হয়েছে, তা তো ইউরোপের বিভিন্ন ব্যাংকগুলোতে পড়ে আছে। সেখান থেকে সেগুলোকে জাহাজে করে আমেরিকায় নিয়ে আসতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন একটি যুদ্ধ। কয়েক মাস পর ১ আগস্ট, ১৯১৪। Senator Owen ঘোষণা করেন— 'আমরা একটি বড়ো ইউরোপিয়ান যুদ্ধের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি'। বহিঃরাষ্ট্রের সম্পদ গ্রাসের নিমিত্তে এটা ছিল প্রথম যুদ্ধের ইঙ্গিত।

শুরুতে তিনি চেয়েছিলেন— ব্যাংকটির একটিমাত্র অফিস থাকবে এবং তা নিউইয়র্কে। প্রফেসর Seligman তাকে পরামর্শ দেন— 'নিউইয়র্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাধারণ জনগণ এমনিতেই ক্ষেপে আছে। তার ওপর এখানে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা পায়, তবে তা রাজনৈতিক জনরোষে রূপ নিতে পারে। এমতাবস্থায় ব্যাংকটির শাখা বৃদ্ধি করা উচিত।' তার পরামর্শ অনুযায়ী ব্যাংকটিকে ২টি, ৪টি ও ৮টি করে মোট ১২টি শাখায় বৃদ্ধি করা হয়।

সিনেট সদস্যদের আলোচনায় তিনি বলেন— 'ব্যাংকটির এতগুলো শাখা থাকায় ব্যবস্থাপনা কাজ জটিল হয়ে পড়বে। তাই এর একটি ব্যবস্থাপনা পর্ষদ থাকা উচিত, যা নিউইয়র্কে স্থাপিত হবে এবং সেখান থেকেই সকল শাখা পরিচালিত হবে।' Nelson Aldrich পুরো দেশকে একই অর্থ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার প্রস্তাব করেন, যেন সর্বত্র সুদের হার সমান হয়। কিন্তু Mr. Warburg বলেন— 'অবস্থান ও প্রয়োজনের আলোকে ব্যাংকের প্রতিটি শাখা পৃথক পৃথক সুদ-কাঠামো অনুসরণ করতে পারে।'

এ কারণে দেখা যায়— থিয়েটার, সিনেমা হল ও সংগীত বিপণি তৈরিতে প্রডিউসাররা স্বল্প সুদে ঋণ পেলেও কৃষক-রাখালদের উচ্চসুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। যেখানে সমাজের সংখ্যালঘু একটি দল অর্থের পাহাড় বানিয়েই যাচ্ছে, সেখানে জনসংখ্যার বৃহৎ একটি অংশ নিজেদের সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসছে। ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখবেন, কেবল উৎপাদনমুখী খাতগুলোর ওপর উচ্চ সুদের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর যেগুলো অনুৎপাদনশীল এবং নোংরা সংস্কৃতির জন্ম দেয়, সেগুলোতেই সুদের হার নগণ্য। কেন এই বৈষম্য? এই বৈষম্যের পেছনে কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে? আশা করি, Protocol of the Learned Elder Zion-এর একটি ধারা আপনাদের মনে আছে— 'জ্যান্টাইলদের ভূমিশূন্য করতে হবে; নতুবা তাদের ওপর চির দারিদ্র্যতা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।'

আন্তর্জাতিক অর্থনীতি নিয়ে ইহুদিদের পরিকল্পনা

'ইহুদিরা ব্যাংকিংশিল্পে খুবই দক্ষ। তাদের মতো আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং জোট গোটা পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। এই জোট এতটা ভয়ংকর যে, ইহুদিরা একদিন গোটা বিশ্ব অর্থনীতির লাগাম টেনে ধরবে।'— Arthur Brisbane

ইহুদিদের সবচেয়ে বড়ো শক্তি হলো আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমে তারা পুরো পৃথিবীর অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে। বর্তমানে তাদের পুরো ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু জার্মানির ফ্রাঙ্কফুটে অবস্থিত, তবে তা খুব দ্রুতই অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। যে স্বর্ণ (Gold) ইহুদিদের কাছে ঈশ্বরের সমতুল্য, যাকে তারা God of the living বলে সংজ্ঞায়িত করে থাকে, আজ তারা সেই স্বর্ণ জাহাজে বোঝাই করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমেরিকায় নিয়ে আসছে। ইহুদিরা এটা ভেবে খুব ভীত যে, ইউরোপে হয়তো খুব দ্রুতই আরও একটি ভয়ংকর রক্তাক্ত যুদ্ধ সংগঠিত হবে। তাই সময় থাকতে ইহুদিরা অন্যত্র সরে পড়তে শুরু করেছে এবং নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আমেরিকাকে বেছে নিয়েছে।

প্রতিটি দেশেই ইহুদিদের একটি করে ব্যাংক থাকতেই হবে, এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। এর বিপরীতে ইহুদিরা এমন একটি প্রক্রিয়া চালু করবে, যার মাধ্যমে পুরো পৃথিবীকে একটি মাত্র কেন্দ্রবিন্দু থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। সেই প্রক্রিয়ার নাম হবে— 'World Banking Chain' ।

যদি আপনি Warburg, Furstenbergs, Sonnenscheins, Sassoons, Samuels ও Belichroeders-এর মতো ইহুদিদের জীবন ইতিহাস ভালো করে অধ্যয়ন করেন, তবে এই বিষয়টি পরিষ্কার বুঝতে পারবেন। যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ে অর্থ জালিয়াতি নিয়ে তাদের আধিপত্যের কোনো কমতি ছিল না। এ সকল কর্মকাণ্ড নিয়ে এই মস্তিষ্ক বিকৃত পাগলদের আবার গর্বেরও কোনো শেষ নেই। তারা বলে— 'আমাদের শক্তি-সামর্থ্যের পরিধি কতটা ব্যাপক, আশা করি তা আজ পুরো পৃথিবী উপলব্ধি করতে পেরেছে। তারা এটাও বুঝতে সক্ষম হয়েছে, আমাদের বাদ দিয়ে কখনো শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।'

Protocols of the Learned Elder Zion-এর ষষ্ঠ তম প্রটোকলে বলা আছে— 'খুব দ্রুতই আমরা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করব। সেখান থেকে তৈরি করব বিশাল সম্পদের আধার। জ্যান্টাইলদের প্রতিটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মূল ভিত্তি হবে আমাদের অর্থ-সম্পদ। প্রতিটি রাষ্ট্র ও তার রাজনৈতিক দলগুলোকে আমরা ঋণের বেড়াজালে বেঁধে ফেলব। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো পতনের সাথে সাথে পুরো ঋণের বোঝা দেশের সাধারণ জনগণের কাঁধে গিয়ে পড়বে, সেখান থেকে নেমে আসবে এক ভয়ংকর অর্থনৈতিক বিপর্যয়।'

একই প্রটোকলের অপর একটি অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— 'একই সময়ে ব্যবসায়-বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণে আমরা জ্যান্টাইলদের আগ্রহী করে তুলব। তবে সবকিছুর পেছনে থাকবে আমাদের ফটকা পরিকল্পনা, যেন তারা ইচ্ছেমতো উৎপাদন করতে না পারে। আমরা তাদের ঋণের পৃথক পৃথক খাত এবং ফসল উৎপাদনের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দেবো। ফলে তারা চাইলেও অধিক উৎপাদন করতে পারবে না এবং ঋণের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না...। এভাবে একটা সময় তাদের ভূমিগুলো আমাদের মালিকানায় চলে আসবে। সমাজে ক্ষুধা-দরিদ্রতা ছড়িয়ে দিতে জ্যান্টাইলদের অপ্রয়োজনীয় বিলাসবহুল জীবনব্যবস্থায় উৎসাহী করে তুলব, যা তাদের মস্তিষ্ক থেকে বুদ্ধিবৃত্তি নামক বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে মুছে দেবে। আমরা শ্রমিকদের নিয়মিত বেতন-মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে উৎসাহিত করব, কিন্তু এতে শ্রমিকদের ন্যূনতম কোনো উপকার হবে না। কারণ, একই সময়ে আমরা বাজারে পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দেবো এবং বলব— এ বছর ফসল কম উৎপাদন হয়েছে। আমরা উৎপাদনমুখী কৃষকদের দক্ষতা ধ্বংস করার জন্য তাদের অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন শিল্প কার্যক্রমের প্রতি উৎসাহিত করব এবং অ্যালকোহলের প্রতি নেশাগ্রস্ত করে রাখব।'

২০ নম্বর প্রটোকলে বলা হয়েছে— 'আজ তোমাদের এমন এক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কথা বলতে যাচ্ছি, যা প্রতারণা ছাড়া অন্য কিছু নয়, আর এটাই আমরা জ্যান্টাইলদের ওপর চাপিয়ে দেবো। তোমরা সবাই জানো, স্বর্ণ-রৌপ্যই পৃথিবীর প্রকৃত অর্থ, যা হাজার হাজার বছর পৃথিবীর বিভিন্ন রাজ্যে একমাত্র বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। যখনই কেউ এই অর্থব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কিছু করার চেষ্টা করেছে, ধীরে ধীরে তাদের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা বাজার হতে স্বর্ণ-রৌপ্য সরিয়ে দিয়ে মানুষের হাতে নকল অর্থ ধরিয়ে দেবো।'

'প্রতিটি ঋণ একজন সরকারের অদক্ষতা ও অদূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে, যা রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে ধ্বংসের জন্য যথেষ্ঠ। এমতাবস্থায় সরকার জাতীয় দায় থেকে বেরিয়ে আসতে জনগণের ওপর একের পর এক করের বোঝা চাপিয়ে দিতে শুরু করবে। বৈদেশিক ঋণ হলো রক্তচোষা জোঁকের মতো। এটা একবার যদি কোনো রাষ্ট্রের ওপর আঁকড়ে বসে, তবে সমস্ত রক্ত খেয়ে তবেই ছাড়বে। তারপরও জ্যান্টাইল রাষ্ট্রগুলো বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করবে এবং একে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র উপায় বলে বিবেচনা করবে।'

২০ নম্বর প্রটোকলে আরও বলা আছে— 'বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের পরবর্তী প্রভাব কী? বন্ডের বিনিময়ে ঋণ গ্রহণ করলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর তা সুদে-আসলে পরিশোধ করতে হবে। যদি পাঁচ শতাংশ সুদের বিনিময়ে কোনো রাষ্ট্র ঋণ নেয়, তবে বিশ বছরে সুদের পরিমাণ হবে আসল অর্থের সমান; চল্লিশ বছরে হবে আসল অঙ্কের দ্বিগুণ, আর ৬০ বছরে হবে তিনগুণ! ফলে ক্রমবর্ধমান সুদের দায় থেকে কোনোদিনই বেরিয়ে আসতে পারবে না।'

আফসোসের বিষয় হলো— অধিকাংশ মানুষ এই নিগুঢ় সত্যগুলো একেবারেই জানে না। প্রতিবছর এত এত কর পরিশোধের পরও জাতীয় দায় থেকে আমরা মুক্তি পাই না। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত ডলার ছাপানো হয়েছে, তার সব যদি ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তারপরও পুরো পৃথিবীর দায় মেটানো সম্ভব নয়।

Protocols of the Learned Elder Zion মূলত রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যকে উপড়ে ফেলার জন্য তৈরি করা হয়। কিন্তু তাদের এই নীলনকশা কেবল রাশিয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকেনি; ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পৃথিবীতে। করব্যবস্থাকে (Tax) কেন্দ্র করে ইহুদিদের যে পরিকল্পনা, তা সংক্ষেপে নিচে উপস্থাপন করা হলো:

১. 'শাসকশ্রেণিতে পরিণত হওয়ার পর আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে সাধারণ জনগণের ওপর আমরা করের বোঝা চাপিয়ে দেবো। এতে সীমিত আয়ের মানুষ প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ে তুলতে পারবে না। আর এই কাজটা আমাদের করতে হবে না; বরং প্রতিটি দেশের সরকারই নিজ দায়িত্বে এই কাজ করে দেবে। রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও প্রশাসনিক খরচ বহনের নামে তারা নিয়মিত জনগণের থেকে কর আদায় করবে, যার দরুন সাধারণ মানুষ চিরকাল গরিব থেকে যাবে।

২. বিভিন্ন উপায়ে কর আরোপ করা যেতে পারে। যেমন: ক. Progressive Tax : এ প্রক্রিয়ায় আয় বৃদ্ধির সাথে সাথে করের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। খ. পৈতৃক সম্পদের ওপর কর : পৈতৃক সূত্রে পাওয়া সম্পদ ব্যবহার করে কেউ যদি উপার্জন করে, তবে তার ওপর কর আরোপ করা হবে। যেমন: মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে বাড়ির মালিকগণ বাসা ভাড়ার ওপর কর প্রদান করবে। গ. মালিকানাস্বত্ব হস্তান্তরের ওপর কর : সম্পদ হস্তান্তরের সময় খরচ (Fee) প্রদান করতে হবে। ঘ. Luxury Tax : সৌখিন পণ্যসামগ্রী ক্রয়ের সময় শুল্ক প্রদান করতে হবে। যেমন: গাড়ি, বিমান, জাহাজ ইত্যাদি।'

আপনাদের প্রশ্ন জাগতে পারে, এত সব তথ্য আমরা কেন জানি না? কেন আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্থব্যবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তিকর সব বিষয় শেখানো হচ্ছে? এ প্রসঙ্গে Elder Zion-এর ৮ নম্বর প্রটোকল দিয়ে এই অধ্যায়টি শেষ করছি— 'আমরা বিশ্বজুড়ে একগাদা অর্থনীতিবিদের জন্ম দেবো, যারা পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রে সরকার প্রধানের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবে। অর্থবিজ্ঞান আমাদের প্রধানতম অস্ত্র।'

আদর্শ অর্থের বৈশিষ্ট্য

মানুষ আমৃত্যু যে জিনিসটির পেছনে অধিকাংশ সময় ব্যয় করে তা হলো— অর্থ। অর্থ থেকে জন্ম নেয় অর্থনীতি। কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়, অর্থের সংজ্ঞা কী? দেখা যাবে অনেকে এর সঠিক উত্তর দিতে পারছে না। ডলার, টাকা, রুপি, রিয়াল ইত্যাদি বহুকাল আমাদের চোখে অর্থ বলে পরিচিত হয়ে আসছে; যদিও এগুলো হলো 'কারেন্সি', যা তৈরি হয় বাতাস থেকে। আমাদের অবচেতন মন 'অর্থ ও কারেন্সি' বিষয় দুটি এক করে ফেলেছে, কিন্তু তা এক নয়। এমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, যা দ্বারা বিষয় দুটির মাঝে পার্থক্য গড়ে তোলা সম্ভব। ইতিহাস অধ্যয়ন করলে তিন ধরনের উপকরণ পাওয়া যাবে, যেগুলো বিভিন্ন যুগে অর্থ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যথা: স্বর্ণ-রৌপ্য, কাগজি নোট এবং ভোগ্য পণ্য।

তিনি বইটিতে আদর্শ অর্থের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করেছেন:

১. গ্রহণযোগ্য বিনিময় মাধ্যম: বিনিময় মাধ্যম বলতে একটি তৃতীয় মাধ্যমকে বোঝানো হয়, যা দ্বারা ক্রেতা-বিক্রেতারা তাদের লেনদেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারে। একসময় মানুষ বার্টার ট্রেড পদ্ধতিতে পণ্যের বিপরীতে পণ্য বিনিময় করত, যেমন: দুধের বিপরীতে ডিম, আটার বিপরীতে চাল ইত্যাদি। সেখানে তৃতীয় কোনো মাধ্যম ছিল না। এরপর এক যুগ আসে যখন মানুষ স্বর্ণ-রৌপ্য ও মূল্যবান ধাতব পদার্থকে তৃতীয় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা ব্যবহার করছি কাগজি নোট ও মুদ্রা। এভাবে গড়ে উঠে গ্রহণযোগ্য বিনিময় মাধ্যম এবং অবসান ঘটে বার্টার ট্রেড পদ্ধতির।

২. মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা: বার্টার ট্রেডের একটি বড়ো সমস্যা হলো মূল্য নির্ধারণে অপারগতা। এ কারণে সে যুগের বাণিজ্য একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর আসে স্বর্ণ-রৌপ্য ভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় স্বর্ণ-রৌপ্যকে ওজনের মানদণ্ডে হিসাব করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হতো। তবে প্রতিবারের লেনদেনে স্বর্ণ-রৌপ্য ওজন করা ছিল এক বিরক্তিকর বিষয়। তাই খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দে লিডিয়ার রাজা আলিয়াত (Alyatte) প্রথমবারের মতো ধাতব কয়েন (Coin) তৈরি করেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ, রৌপ্য এবং আরও কিছু ধাতব পদার্থের সংমিশ্রণে তৈরি হতো সে মুদ্রা। বলা হয় এ মুদ্রাই ছিল ইতিহাসে প্রথম জন্ম নেওয়া অর্থ (Money)। বর্তমানে আমরা বিনিময় মাধ্যম হিসেবে কাগজি নোট ব্যবহার করছি। এগুলো দিয়েও পণ্যের মূল্য সহজে নির্ধারণ করা সম্ভব।

৩. হিসাবের একক: হিসাবের একক দ্বারা পরিমাপককে বোঝানো হয়। যেমন: দূরত্ব পরিমাপের একক মিটার, কিলোমিটার, ইঞ্চি বা মাইল। ওজন পরিমাপের একক আউন্স, গ্রাম বা কিলোগ্রাম। পৃথিবীর সর্বত্র এই পরিমাপকগুলো সর্বজনীন স্বীকৃত। কিন্তু টাকা, ডলার, রুপির ক্ষেত্রে সর্বজনীন স্বীকৃত কোনো পরিমাপক নেই। যেমন: এক টাকা বা এক রুপি কখনো এক ডলারের সমান হতে পারে না। কারণ, এগুলোর মূল্য সর্বদা পরিবর্তনশীল। তবে স্বর্ণ-রৌপ্য পরিমাপে এ জাতীয় কোনো সমস্যা হয় না। কারণ, ১০০ গ্রাম স্বর্ণ বা রৌপ্যের ওজন পৃথিবীর সর্বত্রই সমান। ভোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমন। যেমন: এক কেজি আটার ওজন পৃথিবীর সব স্থানে একই হবে। এ ক্ষেত্রে ভোগ্য পণ্যকেও অর্থের সংজ্ঞা নির্ধারণে বিবেচনা করা যেতে পারে।

৪. বিভাজনযোগ্য (খুচরা যোগ্যতা): ১,০০০ টাকার একটি নোটকে ৫০০, ২০০, ১০০, ৫০ ইত্যাদি আকারে খুচরা করা সম্ভব। একইভাবে এক কেজি স্বর্ণ বা রৌপ্যকে ৫০০, ১০০, ৫০ বা ২০ গ্রামে বিভক্ত করা সম্ভব। ভোগ্য পণ্যের বেলাও ওজন দ্বারা বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা সম্ভব। বিভাজনযোগ্যতার বড়ো সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে পণ্যের মূল্য সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব। এটি লেনদেন ও বিনিময় কাজে দারুণ গতীশীলতা নিয়ে আসে।

৫. মূল্যের স্থিতিশীলতা: এটি দ্বারা বোঝানো হয় অর্থের ক্রয় ক্ষমতা সহজে পরিবর্তিত হবে না। উদাহরণস্বরূপ: আপনি ৪০ হাজার টাকা দিয়ে আজ যে পরিমাণ চাল ক্রয় করতে পারছেন, আগামী ১০ বছর পর সে পরিমাণ চাল আর ক্রয় করতে পারবেন না। কারণ, নিয়মিত মুদ্রাস্ফীতির দরুন বাজারের প্রতিটি মুদ্রা হারাচ্ছে তাদের ক্রয়ক্ষমতা। আধুনিক অর্থব্যবস্থায় পৃথিবীর প্রতিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর এবং বিশেষ সব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে বড়ো পরিমাণে নতুন নোট ইস্যু করে থাকে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় Quantitative Easing (QE)। এটি বাজারে নতুন মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি করে চলমান মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও পণ্যমূল্য স্থিতিশীল বা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। অপরদিকে, স্বর্ণ-রৌপ্য যেহেতু চাইলেই উৎপাদন করা যায় না, সেহেতু এ বাজারে স্বর্ণস্ফীতি বা রৌপ্যস্ফীতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তা ছাড়া বিভিন্ন খনি থেকে প্রতি বছর নতুন যে পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য অর্থবাজারে যুক্ত হয়, তার পরিমাণ এতটাই নগণ্য যে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড়ো রকমের কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। বলে রাখা উচিত বর্তমান বাজারে স্বর্ণ-রৌপ্য মূল্যের প্রতিনিয়ত যে উঠানামা, এর মূল কারণ তাদের কাগজি নোটের বিপরীতে মূল্যায়িত করা হচ্ছে। যেহেতু কাগজি নোটগুলো প্রতিনিয়ত তাদের ক্রয় ক্ষমতা হারাচ্ছে, সেহেতু ভোগ্যপণ্যের ন্যায় স্বর্ণ-রৌপ্যের মূল্যও উঠানামা করছে। পচনশীল বৈশিষ্ট্যের দরুন অধিকাংশ ভোগ্যপণ্যকে দীর্ঘকাল সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু পণ্য আছে যাদের তুলনামূলক বেশি দিন সংরক্ষণ করা সম্ভব। যেমন: লবণ, চিনি, মধু ইত্যাদি। এ কারণে রোমান ও তুর্কি সাম্রাজ্যের সামরিক বাহিনীতে প্রতি মাসের বেতনের সাথে কিছু পরিমাণ ভোগ্যপণ্যও প্রদান করা হতো, যা রেশন নামে পরিচিত; বিষয়টি আজও অনেক রাষ্ট্রে চলমান।

৬. স্থিতিশীল বিনিময় হার: বিনিময় হারের উঠানামা মুদ্রা বাজারের একটি নিয়মিত চিত্র। বিনিময় হারের এই উঠানামা কতটা হুমকিস্বরূপ, তা ব্যবসায়ী সম্প্রদায় খুব ভালো করে জানে। ১৯৭১ সালে ব্রেটন উডস চুক্তিনামা রহিত হলে বিনিময় হার নির্ধারণের স্থিতিশীল প্রক্রিয়া একেবারে ভেঙে পড়ে। কিন্তু স্বর্ণ-রৌপ্যভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় এমনটা ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই। লিডিয়ার পর গ্রিক, রোমান, জেরুজালেমসহ আরও অনেক অঞ্চলে ধাতব মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। সে সকল মুদ্রায় স্বর্ণ ও রৌপ্যের পরিমাণ নির্দিষ্ট থাকত বলে তাদের বিনিময় নির্ধারণে কোনো জটিলতা হতো না। যেমন ধরুন, গ্রিকরা তাদের ধাতব মুদ্রায় ব্যবহার করছে ৫০% স্বর্ণ এবং রোমানরা সেখানে ব্যবহার করছে ৭৫% স্বর্ণ। এমতাবস্থায় ৩টি গ্রিক মুদ্রার সমান হবে ২টি রোমান মুদ্রা। বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ছিল বলে আজকের মতো অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থা না থাকলেও সে যুগের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্বময় পরিব্যাপ্তি লাভ করেছিল।

৭. নিজস্ব উপযোগ: যেকোনো ভোগ্য পণ্যের প্রধান উপযোগ হলো ক্ষুধা মেটানোর ক্ষমতা। এমন নয় যে এই উপযোগিতা কৃত্রিম বা সরকারি অধ্যাদেশে তৈরি হয়েছে। কিন্তু কাগজি নোটভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থায় প্রতিটি মুদ্রার উপযোগ সরকারি অধ্যাদেশে তৈরি হয়। যতদিন এগুলো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধীনে থাকবে, ততদিন কাগজি নোটগুলোর জীবন থাকবে। মনে করুন, আপনার অ্যাকাউন্টে পাঁচ লাখ রুপি আছে। কিছুদিন পর চীন এসে ভারত দখল করল এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে রুপিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। যদি না নতুন সরকার পুরাতন রুপিগুলোকে নতুন ইস্যু করা মুদ্রার সাথে পালটে নেওয়ার সুযোগ দেয়, তবে সে রুপির আর কোনো মূল্য থাকবে না। যেমন: সাদ্দাম সরকার পতনের পর সেখানে নতুন দিনারের নোট প্রিন্ট করা শুরু হয়। ফলে পূর্বের বিপুল পরিমাণ ইরাকি দিনারের আর কোনো মূল্য ছিল না। সাধারণ মানুষ কিছু পরিমাণ পুরোনো নোট ব্যাংকে গিয়ে পালটে আনার সুযোগ পেলেও বড়ো একটি অংশ রাস্তায় ফেলে দেয়। আরেকটি উদাহরণ হলো, মোদি সরকার যখন ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট মাসখানেকের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে, তখন নোট দুটিও সাময়িক সময়ের জন্য তাদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কেউ আধিপত্য বিস্তার করুক বা সরকারি অধ্যাদেশে যে পরিবর্তনই আসুক না কেন, স্বর্ণ-রৌপ্য এবং ভোগ্যপণ্যের উপযোগিতায় কোনো পরিবর্তন আসবে না।

৮. সহজ পরিবহনযোগ্যতা: কাগজি নোট বা স্বর্ণ-রৌপ্যকে আপনি চাইলে এক স্থান থেকে অন্যত্র বহন করতে পারেন। যেহেতু স্বর্ণ-রৌপ্য কাগজি নোটের চেয়ে অধিক মূল্য ধরে রাখতে পারে, সেহেতু স্বর্ণ-রৌপ্যই বেশি কার্যকর। তবে ইলেক্ট্রনিক কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে আজ অনেকেই কাগজি নোট পরিবহনের ঝামেলা কাটিয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতি স্বর্ণ-রৌপ্যভিত্তিক অর্থব্যবস্থায়ও প্রয়োগ করা সম্ভব।

এই হলো আদর্শ অর্থের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য। এখানে অর্থ হিসেবে তিনটি উপকরণকে বিবেচনায় আনা হয়েছে: স্বর্ণ-রৌপ্য, কাগজি নোট ও ভোগ্যপণ্য। লক্ষ করুন, এমন কোন উপকরণটি আছে, যার মধ্যে আদর্শ অর্থের সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান? অবশ্যই তা স্বর্ণ-রৌপ্য। ঠিক এ কারণে হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন সম্রাজ্যে এটিই ছিল একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিনিময়ের মাধ্যম। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনালগ্নেও স্বর্ণ-রৌপ্যকে কাগজি নোট ছাপানোর মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমের আধিপত্য বিস্তারের গল্প

মাত্র ১০০ বছর আগেও পৃথিবীর বৃহৎ অংশ জুড়ে ছিল স্বর্ণ-রৌপ্য ভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থার ব্যাপক প্রচলন। যেমন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা বিনিময় মাধ্যম হিসেবে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা ব্যবহার করত। তা ছাড়া ১৮৮০-১৯১৪ এবং ১৯৪৬-১৯৭১ সাল পর্যন্ত ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ স্বর্ণ-রৌপ্যকে বাণিজ্যিক কাজে অর্থের মূল্য নির্ধারণের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করত। অর্থাৎ প্রতিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে পরিমাণ ধাতব মুদ্রা বা কাগজি নোট ছাপাক না কেন, তার বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য মজুত করত এবং তা দ্বারা আন্তর্জাতিক বিনিময় হার নির্ধারণ করত। যেমন: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত ব্রিটেন ও আমেরিকা যথাক্রমে প্রতি ৪.২৫ পাউন্ড এবং ২০.৬৭ ডলার ইস্যুর বিপরীতে মজুত রাখত ১ আউন্স পরিমাণ স্বর্ণ। ফলে ১ পাউন্ড সমপরিমাণ ছিল ৪.৮৬ ডলার। এই পুরো সময়টিকে বলা হতো ক্লাসিকাল গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের (Classical Gold Standard) যুগ। এ সময় মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য।

প্রকৃতির প্রতিটি গঠন উপাদানের যেমন নিজস্ব একটি চক্র রয়েছে, অর্থ ব্যবস্থাও তার ব্যতিক্রম নয়। সেই চক্রের মূল নিয়ামক হলো স্বর্ণ-রৌপ্য। শুনে বিস্মিত হবেন, বতর্মান কাগজি নোটভিত্তিক অর্থব্যবস্থা তার জীবনের শেষ যুগে এসে পৌঁছেছে। খুব দ্রুত শুরু হতে যাচ্ছে ইলেক্ট্রনিক কারেন্সির যুগ। এই চক্র শেষ হলে পুনরায় ফিরে আসবে স্বর্ণ-রৌপ্যের যুগ।

কিছু বিষয় ছোটোকাল থেকে আমাদের মনে গেঁথে আছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের পক্ষে কাজ করে, তাই এটি সরকারি ব্যাংক। এই ব্যাংক নিজ ইচ্ছায় নোট ছাপাতে পারে না। এ জন্য তাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য মজুদ করতে হয় এবং বিশ্বব্যাংক থেকে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু আগের দুটি অধ্যায় উপস্থাপন করা হয়েছে, পৃথিবীতে বহু কেন্দ্রীয় ব্যাংক রয়েছে, যা ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে সরকার বা সাধারণ মানুষের অধিকার চর্চার কোনো সুযোগ নেই।

২৩ ডিসেম্বর ১৯১৩, প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের মন্ত্রিসভা ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমকে (সংক্ষেপে ফেড) আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে অনুমোদন দেয়। সেই সঙ্গে ব্যাংকটিকে ডলার ছাপানো এবং আমেরিকার অর্থনীতি পরিচালনার একচ্ছত্র অধিকারও প্রদান করা হয়। কিছুদিন পর সরকারি অধ্যাদেশে ডলার ব্যতীত অন্য সব বিনিময়মাধ্যম নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু নতুন এই কারেন্সির ওপর আমেরিকার সাধারণ মানুষ বিশ্বাস স্থাপন করতে পারছিল না। কারণ, মাত্র কয়েক বছর আগে ট্রাস্ট কোম্পানি কেলেঙ্কারির দরুন হাজারো মানুষ তাদের সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছিল। ফলে শুরু থেকেই সবাই ডলারকে এড়িয়ে চলতে লাগল এবং স্বর্ণ-রৌপ্যকে বিনিময় মাধ্যম হিসেবে অধিক প্রাধান্য দিতে থাকল।

বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে, ফেড ডলারের মূল্য ঘোষণা করে— ১ আউন্স স্বর্ণ = ২০ ডলার। অর্থাৎ প্রতি ১ আউন্স স্বর্ণের বিপরীতে ফেড ২০ ডলার ইস্যু করবে। সাধারণ মানুষকে আহ্বান করা হয়, তারা যেন নিজেদের স্বর্ণগুলো ফেডের নিকট জমা রেখে সমপরিমাণ ডলার নিয়ে আসে। ফেড মানুষকে বোঝায়, প্রতিটি ডলার হলো এক-একটি চেক নোট। মানুষ যদি ২০ ডলারের প্রতিটি নোট পুনরায় ফেডকে জমা দেয়, তবে সে তার জমাকৃত সম্পদ ফেরত পাবে। JM 043829043— এ ধরনের যে সংখ্যাটি নোটগুলোর ওপর ছাপানো থাকে, তা দ্বারা বোঝায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই হিসাবটিতে ইস্যুকৃত নোটটির বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ (স্বর্ণ/রৌপ্য) মজুদ করা আছে। চেক নোট (ডলার) ফেরত আসা মাত্রই ব্যাংক গ্রাহককে সে পরিমাণ সম্পদ ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে। তা ছাড়া ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংক নোটের দরুন ইতঃপূর্বে আন্তঃপ্রাদেশিক লেনদেনগুলোতে যে জটিলতা তৈরি হতো, তা এখন ডলার ব্যবহারের মাধ্যমে মেটানো সম্ভব হবে। কারণ, এখন থেকে পুরো দেশে একটিমাত্র কারেন্সি ব্যবহৃত হবে। কিন্তু ফেড তার কথা রাখেনি। বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ডলারের বিপরীতে সাধারণ মানুষের যে সম্পদগুলো সে আত্মসাৎ করেছে, তা আর কখনো ফিরিয়ে দেয়নি।

ইতিহাসের অন্যতম এক গোপন আলোচনার মধ্য দিয়ে ফেড প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯১০ সালে জর্জিয়ার উপকূলবর্তী জ্যাকল দ্বীপে এই আলোচনার আয়োজন করা হয়। তবে সেই আলোচনার বিষয়বস্তু কী ছিল এবং উপস্থিত সদস্যরা নিজেদের মধ্যে কী কী চুক্তি করেছিল, তার কোনো তথ্যই আজ পর্যন্ত জনসম্মুখে প্রকাশ পায়নি। The Federal Reserve System: Its Origin and Growth বইয়ের লেখক Paul Warbug হলেন সেই গোপন সম্মেলনে উপস্থিত সদস্যদের একজন। তিনি বইটিতে উল্লেখ করেন— 'আমাদের প্রত্যেক সদস্য এতটাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে, আজ পর্যন্ত সে আলোচনার চুক্তিপত্রে লিপিবদ্ধ তথ্যও জনসম্মুখে প্রকাশ পায়নি।' তবে ব্যাংকটির পরবর্তী কার্যক্রম দেখে সাধারণ মানুষ অনুমান করে নিয়েছে, গোপন আলোচনায় নির্ধারিত হয়েছে ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডারদের সংখ্যা, গঠনতন্ত্র ও লভ্যাংশ বণ্টন প্রক্রিয়া।

কী পরিমাণ স্বর্ণের মজুদ নিয়ে ফেড তার প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করে, সে তথ্য জানা সম্ভব না হলেও কিছু কাল্পনিক তথ্যকে পুঁজি করে এগোনো যাক। ধরে যাক, গোপন আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফেডের শেয়ারহোল্ডারগণ সে সময় ২ হাজার টন স্বর্ণ মজুদ করল এবং এর বিপরীতে ১০ বিলিয়ন ডলার প্রিন্ট করল। এখন তা বাজারে সরবরাহ হওয়ার অপেক্ষায় আছে।

১৯১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রশাসনিক ও বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি খরচ মেটাতে প্রেসিডেন্ট উইলসন প্রশাসনের ১০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন পড়ে, কিন্তু তার রাজস্ব ভান্ডারে এত পরিমাণ অর্থ ছিল না। ফলে তিনি ফেডের নিকট এই পরিমাণ ডলারের জন্য আবেদন করলেন। ফেড ব্যক্তি মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক হওয়ায় প্রেসিডেন্ট প্রশাসনকে ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে প্রদান করল। ধরুন, তারা প্রেসিডেন্ট প্রশাসনকে ২% সুদে ১০ বছর মেয়াদে ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ দিলো। তাহলে ১০ বছর পর সুদে-আসলে কী পরিমাণ ডলার পরিশোধ করতে হবে? কম করে হলেও ১২ বিলিয়ন ডলার! সমস্যা হলো তিনি এত ডলার পাবেন কোথায়? বাজারে তো মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলারের অস্তিত্ব আছে। সুদের দরুন যে অতিরিক্ত দায়ের জন্ম হয়েছে, তার বাহ্যিক অস্তিত্ব নেই। তা ছাড়া প্রেসিডেন্ট সাহেবের নিজেরও কোনো প্রিন্টার নেই। সুতরাং, তিনি সর্বোচ্চ ১০ বিলিয়ন ডলারই পরিশোধ করতে পারবেন। বাকিগুলো পরিশোধ করতে পারবেন না। কারণ, পকেটে ৫০ ডলার থাকলে ৫১ ডলার সমমূল্যের পণ্য ক্রয় করা সম্ভব নয়।

সুদের কাছে এখানে সবাই আটকে যায়। কারণ, সুদ থেকে যে অদৃশ্য দায়ের জন্ম হয়, তা সামষ্টিক উপায়ে কখনো পরিশোধ করা সম্ভব নয়। এরপর শুরু হলো যুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট সাহেবের খরচ বেড়ে গেল কয়েকগুণে। তিনি আবারও ঋণ নিলেন এবং নিতেই থাকলেন। একই সঙ্গে আমেরিকায় আরও অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংক গড়ে উঠল। তারাও ফেড থেকে ঋণ নিয়ে তহবিল তৈরি করল। তাদের কাছ থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ঋণ নিল। চারদিক ঋণে ঋণে সয়লাব হয়ে উঠল। প্রতিটি ঋণের ওপর সুদ চেপে বসল। এই সুদ থেকে তৈরি হলো জাতীয় দায়, যার পরিমাণ দিনে দিনে বাড়তেই থাকল। আদৌ কি এই জাতীয় দায় থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব?

ফেডের দিকে তাকানো যাক। ১৯১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর ফেডের নিকট ২ হাজার টন স্বর্ণ ছিল। এর বিপরীতে জানুয়ারি মাসে তারা ১০ বিলিয়ন ডলার প্রিন্ট করে প্রেসিডেন্ট সাহেবকে ঋণ দেয়। প্রথম ঋণের পর প্রেসিডেন্ট সাহেব যখন পুনরায় ঋণের আবেদন করলেন, তখন ফেডের সিন্দুক ফাঁকা! অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তারা আবারও ডলার প্রিন্ট করল এবং তা প্রেসিডেন্ট সাহেবের নিকট পৌঁছে দিলো। এই যে দ্বিতীয়বার ডলার প্রিন্ট করল, তার বিপরীতে কি সমপরিমাণ স্বর্ণ মজুত করেছে? তা ছাড়া প্রতিটি ঋণের ওপর যে সুদ চাপিয়ে দিচ্ছে, তারও বিপরীতে কি স্বর্ণ মজুত করছে?

আবার লক্ষ করুন, সাধারণ মানুষ সরকারের হুকুম মানতে নিজেদের স্বর্ণগুলো ফেডের নিকট জমা দিচ্ছে, আর ফেড প্রিন্টিং মেশিনে ডলার ছাপিয়ে তা সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছে। তারা ডলার তৈরি করছে বাতাস থেকে, আবার তার ওপর সুদ চাপিয়ে ঋণ দিচ্ছে! যখন কেউ সুদ-সমেত ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না, তখন তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কেড়ে নিচ্ছে। এভাবে বিংশ শতাব্দীতে জন্ম নেয় আধুনিক মহাজন বৃত্তি।

১৯৩৩ সালে ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রীয় ঘোষণা জারি করে, সবাই যেন এ বছরের মধ্যে তাদের সকল স্বর্ণ ফেডের নিকট জমা রেখে সমপরিমাণ ডলার সংগ্রহ করে; নতুবা তাদের সম্পদ জব্দ করা হবে। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষ ফেডের কাছে স্বর্ণ জমা রাখতে বাধ্য হয় এবং এর বিনিময়ে সমপরিমাণ ডলার নিয়ে আসে। ৩১ জানুয়ারি ১৯৩৪, প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের কাছ হতে নতুন ঘোষণা আসে। এখন থেকে ১ আউন্স স্বর্ণ সমান ৩৫ ডলার। অর্থাৎ ডলারের মূল্য রাতারাতি ৪০% হ্রাস পেল! কেনই-বা এমনটা হলো! ১৯১৩ সালের পর থেকে ফেড নতুন স্বর্ণ মজুত না করে প্রচুর নোট ইস্যু করেছে। এই মূল্যহীন নোটগুলোকে বলা হয় 'Fiat Money'। তাই নতুন ইস্যুকৃত নোটের সাথে রিজার্ভে থাকা স্বর্ণগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে ডলারের মূল্য হ্রাস করা হয়েছে এবং স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। ঠিক এ কারণে মুদ্রাস্ফীতি বাজারের একটি নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন অর্থের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং বাজারে এর সরবরাহ বৃদ্ধি পায়, তখনই মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। এর নেতিবাচক প্রভাবগুলোর সাথে কমবেশি আমরা সবাই পরিচিত। যেমন: দ্রব্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া, জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়া, সঞ্চয় হ্রাস পাওয়া ইত্যাদি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক নিয়মিত নতুন নতুন নোট ইস্যু করা এবং বাজারে এর সরবরাহ বৃদ্ধি করা মুদ্রাস্ফীতির প্রধানতম কারণ।

১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত। যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র ছয় মাস আগে আয়োজন করা হয় Bretton Woods সম্মেলন। বলার অপেক্ষা রাখে না ইহুদিরা ছিল এই সম্মেলনের মধ্যমণি। এতদিন পর্যন্ত ডলার ছিল কেবল আমেরিকার কারেন্সি। এই সম্মেলনে তারা প্রস্তাব করে, ডলার হবে পুরো পৃথিবীর একমাত্র বিনিময়যোগ্য কারেন্সি। বেশিরভাগ রাষ্ট্র এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। সবার এক কথা: ফেড তো চাইলেই ইচ্ছে মতো ডলার প্রিন্ট করতে পারে, সেখানে মনিটরিং-এর কোনো সুযোগ নেই। বিতর্ক চলতে থাকল। ইহুদি প্রতিনিধিরা বলল, প্রতিটি দেশের পৃথক পৃথক কারেন্সি থাকার দরুন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য স্থবির হয়ে আছে। সবাই যদি একই কারেন্সি ব্যবহারে সম্মত হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য গতিশীল হয়ে উঠবে। তা ছাড়া যুদ্ধের আঘাত পুরো ইউরোপকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। এমতাবস্থায় ঘুরে দাঁড়াতে যে সম্পদ প্রয়োজন, তা তাদের নেই।

হিটলারের সাবমেরিনের আঘাতে ইউরোপীয় অনেক স্বর্ণবাহী জাহাজ মেডিটেরিয়ান ও আটলান্টিকে হারিয়ে গেছে। সবাই এখন অর্থ সংকটে। এমতাবস্থায় ডলার হতে পারে সকল সমস্যার সমাধান। ফেড ডলার প্রিন্ট করে ঠিক, তবে নতুন কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা তৈরি করা হবে, যেখানে সকল দেশের অংশ গ্রহণের সুযোগ থাকবে। স্বর্ণের বিপরীতে ডলারের মান হবে ১ আউন্স স্বর্ণ = ৩৫ ডলার। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অধিকাংশ রাষ্ট্র এই প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য হয়।

আলোচনায় বলা হয়, যেহেতু এই মুহূর্তে পৃথিবীর অন্য রাষ্ট্রগুলোর নিকট প্রয়োজনীয় পরিমাণ ডলার নেই, তাই উচিত হবে রাষ্ট্রীয় রিজার্ভে থাকা নিজেদের স্বর্ণগুলো ফেডের নিকট জমা রেখে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার নিয়ে যায়। আর যাদের স্বর্ণ নেই, তারা বন্ড জমা রেখে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ নিতে পারবে। প্রতিটি রাষ্ট্র তার অভ্যন্তরীণ লেনদেনে নিজস্ব কারেন্সি ব্যবহার করতে পারবে। তবে অবশ্যই স্বর্ণ-রৌপ্য বা ডলারে পরিমাপযোগ্য মূল্য থাকতে হবে। অর্থাৎ কোন দেশ চাইলে স্বর্ণ-রৌপ্যের পরিবর্তে ডলারকে রিজার্ভ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। প্রতিটি দেশের বিনিময় হার নিরূপণ এবং মনিটরিং-এর দায়িত্বে থাকবে আই.এম.এফ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। যদি কোনো দেশ ডলারগুলো ফেডের নিকট ফিরিয়ে দেয়, তবে প্রতি ৩৫ ডলার অনুপাতে সমপরিমাণ স্বর্ণ ফেরত দেওয়া হবে। এরপর থেকে অনেক রাষ্ট্র তাদের রিজার্ভে থাকা স্বর্ণগুলোর একটি নির্দিষ্ট অংশ ফেডের নিকট জমা রেখে ডলার নিতে শুরু করে।

ব্রেটন উডস সম্মেলনের পর ১৯৪৫ সালে ফেডের রিজার্ভে থাকা স্বর্ণের পরিমাণ ছিল ১৭৮৪৮ মেট্রিক টন। ১৯৫০ সালে তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ২০২৭৯ মেট্রিক টন। কিন্তু আমেরিকানদের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা এই যে শুরু হলো, আর থামল না। এই যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলায় নিমজ্জিত থাকার দরুন তাদের ঘাটতি বাজেটের পরিমাণ বাড়তে শুরু করে। নতুন-নতুন অস্ত্র নির্মাণ, সৈনিকদের বেতন প্রদান, বিভিন্ন রসদ আমদানি ইত্যাদি নানা কাজেও তাদের প্রচুর ডলার অন্যান্য দেশগুলোতে চলে যেতে শুরু করে। ফলে সে সকল ডলারের বিপরীতে যখন ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো স্বর্ণ দাবি করে বসছিল, তখন আমেরিকা হারাতে শুরু করে তাদের স্বর্ণের মজুদ। কারণ, নতুন ডলার প্রিন্ট করলেও ১ আউন্স স্বর্ণ = ৩৫ ডলার হারে তখনও কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

৬০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া আমেরিকার জন্য ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বড়ো কারণ। তারা ভাবতেও পারেনি এই যুদ্ধ এতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। তাদের ঘাটতি বাজেট বাড়তে শুরু করলে নতুন ডলার প্রিন্ট প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। ১৯৬৩ সালে জন এফ কেনেডি নিহত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট পদে আসেন লিন্ডন বি. জনসন। তিনি স্বর্ণের বিপরীতে ডলারকে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কিন্তু ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো তাদের বিরুদ্ধে বৈরী আচরণ শুরু করে দেয় কি না, তা নিয়ে তার মনে ছিল যথেষ্ট সংশয়। তাই তিনি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া চালাতে শুরু করেন, যেন ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো আপাতত তাদের নিকট স্বর্ণ দাবি না করে।

১৯৬৮ সালের দিকে তাদের রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণ ৯৬৭৯ মেট্রিকটনে নেমে আসে। এমতাবস্থায় ডলার পুনর্মূল্যায়ন না করলে বাকি স্বর্ণগুলো আটকে রাখা যাবে না। ১৯৭১ সালে নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন রিচার্ড নিক্সন। ততদিনে তাদের রিজার্ভে স্বর্ণের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৯০৭০ মেট্রিকটন। ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের অব্যাহত স্বর্ণের দাবিকে কূটকৌশলের মাধ্যমে কয়েক বছর দমিয়ে রাখলেও এ বছর আর সম্ভব হচ্ছিল না। বিশেষ করে ফ্রান্সে চাপ ছিল অন্য সবার চেয়ে বেশি। ফলে ১৫ আগস্ট ১৯৭১, প্রেসিডেন্ট নিক্সন ব্রেটন উডস অঙ্গীকারনামা রহিত করেন। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে স্বর্ণ পরিশোধের প্রক্রিয়া রহিত করেন। এরপর কয়েকদফা ডলারকে পুনর্মূল্যায়িত করা হয়, ১ আউন্স স্বর্ণ = ৩৮/৪০/৪২। কিন্তু ডলারের ওপর আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭৩ সালে চূড়ান্তভাবে ব্রেটন উডস অঙ্গীকারনামাকে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এরপর হতে স্বর্ণের বিপরীতে মুদ্রার বিনিময় হার নির্ধারণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এখন যে প্রক্রিয়ায় বিনিময় হার নির্ধারিত হয়, তা হলো— Floating Exchange Rate System ।

পেট্রো ডলার: William Clark-এর লেখা Petrodollar Warfare: Oil, Iraq and the Future of the Dollar বইটি হতে:

ফেড বুঝতে পারে, আন্তর্জাতিক মহল ডলারের ওপর পুরোপুরি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তারা যদি নতুন কোনো অর্থ ব্যবস্থার ফন্দি করে, তবে তা ডলারের শেষকৃত্যের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এমন পরিস্থিতিতে আমেরিকা জ্বালানি তেলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, যার জন্য ডলার আজও টিকে আছে। ৭০ দশকের প্রথম থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়তে শুরু করে। আমেরিকা সৈন্য বাহিনী নিয়ে আরব দেশের তেলক্ষেত্রগুলো একে একে দখল করতে শুরু করে। যাদের সাথে সমঝোতা হয়েছে, তাদের সাথে যুদ্ধ হয়নি। আর যারা বেঁকে বসেছে তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

১৯৬৭ সালের পর হতে ঘটে যাওয়া আরব-ইজরাইল যুদ্ধগুলোতে আমেরিকা ইজরাইলিদের পক্ষ নেওয়ায় আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে মার্কিনিদের সম্পর্ক তিক্ততায় পৌঁছে। এরই রেশ ধরে ১৯৭৩ সালে ওপেকভুক্ত ১২টি রাষ্ট্র আমেরিকার ওপর তেল অবরোধ জারি করে, যা সে বছরের (৭৩) অক্টোবর হতে শুরু করে পরবর্তী বছরের (৭৪) মার্চ মাস পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। মাত্র ছয় মাসে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের মূল্য $২৫.৯৭ থেকে বেড়ে $৪৬.৬৩-এ গিয়ে পৌঁছে।

মার্কিন প্রশাসন এ পর্যায়ে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক চাল চালতে শুরু করে। পারিবারিক দ্বন্দ্বে বাদশাহ ফয়সাল নিহত হলে মার্কিনিদের জন্য পথ আরও সহজ হয়ে যায়। তখন সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে ইজরাইলের জুজু কাজ করছিল। ইজরাইল তার আশেপাশের ভূ-খণ্ডগুলোতে যেকোনো মূহুর্তে আক্রমণ চালাতে পারে— এমন একটি আতঙ্ক তাদের মধ্যে কাজ করছিল। ১৯৭৫-৭৬ সালে সৌদি-আমেরিকা অস্ত্র-চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মূল বিষয় ছিল, সৌদি রাজ পরিবার রক্ষায় আমেরিকা তাদের সামরিক নিরাপত্তা প্রদান করবে। বিনিময়ে সৌদি আরব তাদের নিকট তেল রপ্তানি করবে। এই তেল পরিশোধন করে আমেরিকা বিশ্ব বাজারে বিক্রি করবে।

ধীরে ধীরে অন্যান্য আরব দেশগুলোও আমেরিকার সাথে বিভিন্ন চুক্তি করে। একপক্ষ দিবে অস্ত্র ও সামরিক নিরাপত্তা, অপরপক্ষ দেবে তেল। এবার ইউরোপীয় বা অন্য কোনো দেশ যদি পরিশোধিত তেল ক্রয় করতে চায়, তবে তা ডলার দিয়েই ক্রয় করতে হবে। অন্য কোনো কারেন্সির বিনিময়ে আমেরিকা তা বিক্রি করবে না। বাধ্য হয়ে প্রতিটি রাষ্ট্র এই নীতি মেনে নেয়। তখন থেকে আমেরিকান ডলারের ভিত্তিমূল্যে স্বর্ণের পরিবর্তে তেল স্থলাভিষিক্ত হয়। এ কারণে ডলারের অপর নাম আজ পেট্রো ডলার। ৭০-এর দশকে আমেরিকা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করে, যাতে করে পেট্রো ডলারের যুগ শেষ হয়ে গেলেও বিনিয়োগকৃত অর্থের বদৌলতে ডলারকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে ব্যবহার করে চীনের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের অনুমতি পাওয়া আমেরিকার জন্য ছিল বড়ো অর্জন।

আমেরিকার সাথে রাজনৈতিক দ্বৈরথের দরুন ২০০০ সালে সাদ্দাম হোসেন ডলার বর্জনের ঘোষণা দেন। তিনি পুনরায় স্বর্ণভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার কথা ব্যক্ত করেন। অর্থাৎ আমেরিকাকে এখন থেকে ডলার নয়; স্বর্ণ দিয়ে তেল কিনে নিতে হবে। এ কারণে আমেরিকান প্রশাসন ২০০১ সালে অর্থনৈতিক হোঁচট খায়। এরপর কী হলো! ডলারকে বাঁচাতে আমেরিকা পুরো ইরাক দখল করে নেয়; একইসঙ্গে তেল ক্ষেত্রগুলোও। একই ভাগ্য বরণ করতে হয় সিরিয়া এবং লিবিয়াকে। গোটা মধ্যপ্রাচ্য ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00