📄 শিল্প সংস্কৃতি : ইহুদি ছোবল
থিয়েটারশিল্প পৃথিবীর অতি প্রাচীন একটি সংস্কৃতি, যা বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। সাধারণত নাটক-চলচ্চিত্রে মানুষ যা দেখে, মানুষ তা নিয়েই কল্পনার জগৎ তৈরি করে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মগজে নতুন নতুন মতাদর্শ ও চিন্তা-চেতনার বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া সম্ভব। এ কারণে বিশেষ এই শিল্পটি ইহুদিদের পরিকল্পনায় কখনো উপেক্ষিত হয়নি। বলশেভিক বিপ্লব রাশিয়ার সব শিল্প প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিলেও থিয়েটার ও পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অক্ষত রেখেছে।
চলচ্চিত্র শিল্প (Movie Industry) বাজারে আসার পূর্বে থিয়েটার হলগুলো নিয়মিত ৩০ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের বিভিন্ন নাটক তৈরি করত, যা দেখার জন্য প্রতি সপ্তাহে লাখো মানুষ ভিড় করত। বিনোদনের নামে থিয়েটারে যিশুকে যতটা ছোটো করে উপস্থাপন করা হতো, তা কোনো বিবেকবান খ্রিষ্টানের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষ বোঝেই না, তাদের অবচেতন মনে কীভাবে শয়তানি চেতনার বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যিশু ও মেরিকে ছোটো করে আজ পর্যন্ত যত বেশি নাটক তৈরি করেছে, যার বর্ণনা এখানে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়।
১৯১৮-১৯ সালের দিকে ইহুদিরা মাঝারি মানের একটি থিয়েটার থেকে টিকেট বিক্রি করে ৪৫০০-৫০০০ ডলার উপার্জন করত। এ রকম অসংখ্য থিয়েটার গোটা আমেরিকার বিভিন্ন শহরতলিতে গড়ে ওঠে। সুতরাং প্রতিদিন বা প্রতি মাসে তারা কত ডলার উপার্জন করত, তা হিসাব করে দেখুন। অন্যদিকে, নির্বোধ জ্যান্টাইলরা কষ্টে তাদের উপার্জিত মজুরির একটি বড়ো অংশ নিয়মিত এই সব কুৎসিত নাটক ও চলচ্চিত্রের পেছনে খরচ করত।
এই শিল্প ইহুদিদের দখলে যাওয়ার পর চারদিকে যে নগ্ন সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে, তা সবার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরে জন্ম নেয় চলচ্চিত্র শিল্প, যা গোড়া থেকেই ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আজকের সমাজে শেক্সপিয়রকে নিয়ে কোনো রকম আলোচনা হয় না।
সমাজ-সচেতনতামূলক গল্প নিয়ে হাজির হলে প্রডিউসারগণ ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি প্রদর্শন করেন। সবকিছু জ্যাজ সংগীত ও যৌন আবেদনময়ী নৃত্যের নোংরামিতে ছেয়ে গেছে।
Sheridan, Sothern, McCullough, Madame Janauschek, Mary Anderson, Frank Mayo এবং John T. Raymond ছিল সোনালি দিনের কিছু থিয়েটারশিল্পী। তারা চলে যাওয়ার পর এই শিল্প নতুন কোনো যোগ্য উত্তরসূরি খুঁজে পায়নি। বর্তমানে যে নতুন অভিনেতারা থিয়েটার শিল্পে আসছে, তাদের অধিকাংশরই গড় বয়স ১৩ থেকে ১৭। পরিচালক ও প্রডিউসারগণ এই কম বয়সিদের প্রতি অধিক আগ্রহী। কারণ, তাদের নিজেদের মতো করে গড়ে তোলা সম্ভব; তা ছাড়া পারিশ্রমিকও কম। বলা চলে তারা থিয়েটার মালিকদের হাতের পুতুল।
যেকোনো চলচ্চিত্রে নায়ক-নায়িকাদের আবেদনময়ী শয়নকক্ষের চিত্র প্রদর্শন যেন দৈনন্দিন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঐতিহাসিক গল্পগুলো ইচ্ছামতো পরিবর্তনে মাধ্যমে যৌন আবেদন যুক্ত করে নিয়মিত চলচ্চিত্র বানানো হচ্ছে। এরপরও বলা হয়, সত্য কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র! কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা, তা বোঝা এখন আর আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ঐতিহাসিক সেই গল্পগুলোতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনা হয় না, যেগুলো ইহুদিদের বীরত্ব নিয়ে লেখা হয়েছে। যেমন: Ben Hur। এর বাইরের সব নাটক বা চলচ্চিত্রে নগ্নতা প্রদর্শনের মাধ্যমে যৌনক্ষুধা তৈরি এবং যিশুকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে উপস্থাপন করে আমাদের মাথায় নাস্তিকতার বিষ ঢেলে দেওয়া যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে অভিনেত্রীদের নগ্নরূপে উপস্থাপনের জন্য ব্যবহার করা হয়, তাদের অধিকাংশই জ্যান্টাইল। খুব কম খরচের বিনিময়ে পরিচালক ও প্রডিউসারগণ তাদের বাজার থেকে কিনে আনে। এভাবে সংস্কৃতি জগতে শুরু হয় নতুন এক বিবর্তন। এই অপ-সংস্কৃতিগুলো কৌশলে জ্যান্টাইলদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। সচেতন ও বিবেকসম্পন্ন মানুষ থিয়েটারে যাওয়ার পরিবর্তে লাইব্রেরিকে শ্রেয় বলে মনে করবে। কারণ, নাটক-চলচ্চিত্র ও থিয়েটারে এখন নৈতিকতার ক্ষুধা মেটানো সম্ভব নয়। শেক্সপিয়র আজ কেবল থিয়েটার থেকেই নয়; পাঠ্যপুস্তক থেকেও হারিয়ে গেছে। যে প্রক্রিয়ায় ইহুদিরা থিয়েটার শিল্পে বিবর্তন এনেছে, তাকে চার ভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা:
১. ইহুদিরা নতুন নতুন যন্ত্র-সামগ্রী সংযোজনের মাধ্যমে প্রতিটি থিয়েটার মঞ্চকে জমকালো রঙিন সাজ দিয়েছে। লাইট, ক্যামেরা, লেন্স, ঝাড়বাতি, বাদ্যযন্ত্র, ঝকঝকে জামা-কাপড়, মঞ্চ, পর্দা প্রভৃতি সংযোজনের মাধ্যমে থিয়েটারগুলোতে এক 'Realistic Effect' নিয়ে এসেছে। আগে দর্শকরা যেখানে ২ ঘণ্টা চলচিত্রের পুরোটা সময় ধরে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকত, এখন সেখানে নতুন কোনো প্রযুক্তির খেলার দিকে তাকিয়ে থাকে।
প্রতিভাধর অভিনেতাদের আজ তেমন একটা প্রয়োজন পড়ে না। ফলে কোনো রকম প্রতিভা ছাড়াই অনেক নতুন মুখ নিয়মিত নাটক-চলচ্চিত্রগুলোতে স্থান পাচ্ছে। এমনও আছে, যাদের দু-তিনটি নাটকে অভিনয় করার পর আর খুঁজে পাওয়া যায় না; এমনকী দর্শকরাও তাদের চেহারা মনে রাখে না। কেন্দ্রীয় চরিত্রের থিয়েটারগুলোতে দলগত সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনের সময় যে পার্শ্ব চরিত্রদের দেখা যায়, তারা যেন কিছু সময় পর হাওয়া হয়ে যায়। যেমন: 'Floradora Girls'। থিয়েটারগুলোতে জ্যান্টাইল অভিনেতারা আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হচ্ছে। আর যুবকরা তো প্রযুক্তির খেলা দেখার পাশাপাশি অপেক্ষা করে, কখন ছোটো ছোটো জামা পরে নতুন কোনো অভিনেত্রী মঞ্চে আসবে?
২. থিয়েটার হলগুলোতে আজ যে শয়তানি চর্চা শুরু হয়েছে, তা খুব দ্রুত প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে পড়বে। টিকেট মূল্যের ওপর ভিত্তি করে থিয়েটারগুলোকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। সম্পদশালীদের জন্য উঁচু হল এবং গরিবদের জন্য নিচু হল। অশ্লীলতার প্রদর্শন উঁচু শ্রেণির হলগুলোতে যতটা হয়, ততটা নিচু শ্রেণির ঘরগুলোতে হয় না। অর্থাৎ নিষিদ্ধ শয়তানের রূপ কে-কতটা দেখবে, তা টিকেট কেনার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে।
'Aphrodite' নাটকের শেষ সিজন তার একটি অকাট্য প্রমাণ। 'Aphrodite' হলো গ্রিকদের সৌন্দর্য ও ভালোবাসার দেবী। এই চরিত্রটি চূড়ান্ত নগ্নতা দিয়ে উপস্থাপন করেছে। আরও আকর্ষণীয় করার জন্য অভিনেত্রীকে চিতাবাঘ, হরিণ ও গাছপালার চামড়া পরানো হয়। নাটকটি যখন প্রথম মুক্তি পায়, তখন নিউইয়র্ক পুলিশ এর বিরুদ্ধে মামলা করে। এটিকে বাজার হতে উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। সাথে সাথেই ইহুদিদের পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলো নাটকটির পক্ষে জ্যান্টাইলদের সমর্থন লাভের জন্য খুব সুন্দর করে, কাব্যিক ছন্দে আর্টিক্যাল প্রকাশ করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মুক্ত সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে তারা সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়। তারপর মামলা আদালতে তোলা হলে শুরু হয় নতুন নাটক। কারণ, প্রধান বিচারপতি, সহকারী বিচারপতি এবং গণ্যমান্য উকিল সবাই তো ইহুদি! মাদকদ্রব্য বিক্রি করা অবৈধ। কারণ, তা চোখে দেখা যায়, কিন্তু নৈতিকতায় বিষ ঢালতে সমস্যা নেই। কারণ, তা চোখে দেখা যায় না। ফলে মামলাটি খারিজ হতে বেশি সময় লাগল না। প্যারিস ও ভিয়েনাসহ ইউরোপের আরও অনেক শহরের অবস্থা আজ একই রকম। রাতভর বায়েজিদের নৃত্যানুষ্ঠান, অশ্লীল সব কৌতুক এবং অর্ধনগ্ন ঝলমলে কাপড় পরা যুবতি মেয়েদের আসরে প্যারিস তথা ইউরোপীয় শহরগুলোর অলি-গলি ভরে গেছে। শুধু কি থিয়েটারশিল্প? বই, ম্যাগাজিন ও পত্রিকার প্রচ্ছদ ছাপাতেও নগ্ন তরুণীদের ব্যবহার করা হচ্ছে!
৩. থিয়েটারশিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করতে ইহুদিদের উদ্ভাবিত নতুন কৌশল হলো 'স্টার'। এখানে স্টার অর্থ আলোচিত ও অনুকরণীয় অভিনেতা-গোষ্ঠী, যাদের আমরা জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকা বলে অবিহিত করি। পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দায়িত্ব থাকে, এই স্টারদের পছন্দ-অপছন্দ এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন যেন এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে জ্যান্টাইলরা তাদের আদর্শ বলে মনে করে। ফলে এই স্টারদের অনুকরণে অনেক উঠতি বয়সি যুবক-যুবতি নিজেদের স্টারদের মতো করে সাজিয়ে নেয়। এতে থিয়েটার হাউজগুলোর নতুন নতুন মুখ খুঁজে পেতে তেমন কোনো কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু আজ যাদের স্টার হিসেবে দেখছি, কালও যে একই অবস্থায় দেখব, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পরিচালক ও প্রডিউসারগণ এখানে খুব সূক্ষ্ম একটি খেলা খেলে। অভিনেতারা যদি পরিচালকদের পছন্দমতো গল্পে অভিনয় করতে রাজি না হয়, তাহলে পরেরদিন থেকেই তাদের স্টার খেতাব মুছে যাবে। স্টার হতে গেলে নোংরা-নগ্নতায় ভরা গল্পে অভিনয় করতে হবে। সেইসঙ্গে অর্জন করতে হবে পরিচালকদের ব্যক্তিগত অনুগ্রহ!
বর্তমান থিয়েটার শিল্পে আর কখনো Mary Anderson বা Julia Marlowe-এর মতো গুণী অভিনেত্রীদের দেখা পাওয়া যাবে না। সত্যিকারের অভিনেতা হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে তাদের দীর্ঘ সময় লেগেছিল। তারা কোনো পরিচালক বা প্রডিউসারের ব্যক্তিগত অনুগ্রহের দানপাত্র হতে চায়নি। তারা শুরুতে জন-সমর্থন জুগিয়েছে এবং একটু একটু করে অভিনয় শিল্পে পারদর্শী হয়েছে। সেই সময় অভিনয়শিল্পে এত যান্ত্রিকতা, কৃত্রিমতা ও নগ্নতা ছিল না। সেখানে ছিল শুধু নৈতিকতার খোরাক। আফসোস! তাদের মতো উত্তরসূরি আর গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।
আজ পত্রিকা ও ম্যাগাজিনগুলোতে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে ছোটো-বড়ো অনেক অডিশনের আয়োজন করা হয়। সকাল-বিকাল অডিশনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত অভিনেতাদের খোঁজা হয়। সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের কিছু নাটক চলচিত্রের জন্য গ্রহণ করে এবং কাজ শেষে ছুড়ে ফেলা হয়। তাদের ব্যক্তিগত সম্মান বলতে কিছুই নেই।
৪. ১৮৮৫ সালের পর থেকে থিয়েটার শিল্পে দুটি নতুন বিষয়ের সংযোজন ঘটে: বক্স অফিস ও বুকিং এজেন্সি। থিয়েটার শিল্পকে বাণিজ্যিকীকরণ এবং মুনাফার পরিমাণ বৃদ্ধি করাই এর মূল উদ্দেশ্য। বুকিং এজেন্সিগুলো সম্ভাব্য ক্রেতাদের সন্ধান করে, যারা পুরো এক মৌসুম বা একাধিক মৌসুমের জন্য থিয়েটার হলগুলো কিনে নেয়। এতে কয়েক মৌসুমের জন্য থিয়েটারগুলো দর্শক পেয়ে যায়। ফলে তাদের আর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার সম্ভাবনা থাকে না। তাদের মূলনীতি— দর্শক যা দেখতে চায় তা-ই দেখাও; হোক তা বস্তাপঁচা জিনিস।
বুকিং এজেন্সি সবচেয়ে বড়ো আঘাত হানে 'থিয়েটার ট্রাস্ট' সংস্কৃতির ওপর। থিয়েটার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে, নতুন নতুন গল্প-নাটক ও তারকা অভিনেতা তৈরি করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী নিয়মিত অনুদানের ব্যবস্থা করত, যা থিয়েটার ট্রাস্ট নামে পরিচিত ছিল। এর কারণে থিয়েটার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনসাধারণের এক বন্ধুসুলভ সম্পর্ক তৈরি হতো।
সমাজের বিভিন্ন স্তরে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি, মানুষের মনের কথা, সমাজের আনন্দ-বেদনা প্রভৃতিকে পুঁজি করে তৈরি হতো গল্প-নাটক। তা ছাড়া শেক্সপিয়ারের কালজয়ী নাটকগুলোতেও খুঁজে পাওয়া যেত সমাজের বাস্তব চিত্র। তখনকার থিয়েটারগুলো শিক্ষণীয় বহু বিষয়ে পরিপূর্ণ ছিল। অর্থের জন্য নয়, হৃদয়ের আবেগ থেকে মানুষ অভিনয় শিল্পে আসত।
বুকিং এজেন্সি থিয়েটার শিল্পে নিয়ে আসে এক বাণিজ্যিক সংস্কৃতি, যা ধ্বংস করে দেয় এই পুরো শিল্পকে। যেখানে মুনাফার প্রসঙ্গ আসে, সেখানে শিল্প অবশ্যই নিজের গুণগত মান হারাবে। আজ যারা অভিনয় শিল্পে আসছে, তারা কেবল শারীরিক সৌন্দর্য বা পারিবারিক ক্ষমতা খাটিয়েই আসছে। বিপরীত দিকে দক্ষ অভিনেতা হওয়ার পরও নিজেকে প্রমাণ করতে পারছে না— এ যুগে এমন অনেক উদাহরণও পাওয়া যাবে। কারণ, তার পেছনে কেউ অর্থ বিনিয়োগ করতে রাজি নয়।
দর্শকদের বিভিন্ন প্রকার আনন্দের খোরাক জোগাতে 'Vaudeville' নামে বিশেষ এক থিয়েটারশৈলী তৈরি করা হয়। নাটক, গান, নৃত্য, কৌতুক, জাদু প্রদর্শনী, পশু-পাখিদের সার্কাস, ক্রীড়াবিদ, সুন্দরী নারী ইত্যাদির সমন্বয়ে সংগীতে হয় এই 'Vaudeville'। সবকিছু আছে, শুধু নেই নৈতিকতার উপাদান। Klaw & Erlanger- বুকিং হাউসটি কমিশনের বিনিময়ে বিভিন্ন থিয়েটার মালিকের সঙ্গে প্রডিউসারদের পরিচয় করিয়ে দিত। যেহেতু Vaudeville সাধারণ মানুষের নিকট ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে, সেহেতু প্রডিউসারদেরও আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। এভাবেই ইহুদিদের হাত ধরে গড়ে উঠে নতুন এক থিয়েটার ট্রাস্ট।
আরেকটি মজার বিষয় হচ্ছে— বুকিং হাউসগুলো থিয়েটার দলগুলোর মধ্যে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চাপিয়ে দিয়েছে। যেসব থিয়েটার যত বেশি হাস্যরস ও দর্শক জোগাতে সক্ষম, প্রডিউসারদের কাছ থেকে সেগুলো তত বেশি বাজেট লাভ করবে। এবার থিয়েটারগুলোতে নিত্য-নতুন বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান চালু হওয়া শুরু করে। তা ছাড়া বাজারে তো এখন অল্প খরচে অনেক অভিনেতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব। ফলে নতুন এই অনুষ্ঠানগুলো চালিয়ে নিতে তাদের তেমন কোনো আর্থিক সমস্যা হয় না। আর দর্শকরাও এসব অখাদ্য আনন্দ উপভোগ করতে থাকে। সারাদিন পরিশ্রম করে তারা ইহুদি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যে মজুরি পাচ্ছে, তার একটি বড়ো অংশ আবার তাদেরই পেটে চালিয়ে দিচ্ছে।
ইহুদিরা যেভাবে থিয়েটার শিল্পকে ধ্বংস করল
নতুন যে ট্রাস্ট সংগঠনটির কথা পূর্বে বলা হয়েছে, তার সদস্যরা হচ্ছেন— Klaw, Erlange, Nixon, Zimmerman, Hayman, Frohman, Rich, Harris ও Josheph Boork। ১৮৯৬ সালে এই ট্রাস্ট সংগঠনটি আমেরিকার ৩৭টি গুরুত্বপূর্ণ থিয়েটারকে নিজেদের করে নেয়। এর ফলে থিয়েটারগুলো বহু আগেই পরবর্তী মৌসুমের জন্য ভাড়া হয়ে যেত। নতুন মৌসুমের জন্য কী ধরনের গল্প-নাটক সংগীতে করা হবে, তা ট্রাস্টের সদস্যরা আগেই ঠিক করে দিত। তা ছাড়া যদি কোনো ব্যাবসা-প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন বাণিজ্যিক চুক্তিতে থিয়েটারগুলো ভাড়া করতে চাইত, তবে তা ট্রাস্টের মাধ্যমে করা হতো। বিনিময়ে সংগঠনটি সপ্তাহে ৪৫০ হতে ১০০০ ডলার পর্যন্ত রয়েলেটি উপার্জন করত।
এই ট্রাস্টের নিবন্ধনের বাইরে যেসব স্বাধীন থিয়েটার ছিল, তাদের অবস্থা দিন দিন খারাপ হওয়া শুরু করে। টিকেট বিক্রি একেবারেই কমে যায়। আর্থিক ক্ষতির কারণে তাদের সদস্যরা বাধ্য হয়ে অন্য থিয়েটারগুলোতে যোগ দেওয়া শুরু করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে, 'Motion Technology'-কে কাজে লাগিয়ে ইহুদিরা আমেরিকার বাজারে চলচ্চিত্র শিল্পের যাত্রা শুরু করে। এই শিল্পের লাগাম শুরু থেকেই ইহুদিদের হাতে রয়েছে। কারণ, তারাই এর জন্মদাতা।
জ্যান্টাইলদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের কোনো কৌশলগত যুদ্ধে যাওয়ার প্রয়োজন পরেনি; বরং যে থিয়েটারগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে বন্ধ হয়েছিল, তাদের সদস্যরা চাকরির আশায় এই শিল্পে হাত পাততে শুরু করে।
তবে চলচিত্র শিল্পের উত্থান ঘটানো অত সহজ কাজ ছিল না। কারণ, থিয়েটারশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে চারদিকে জোরালো আন্দোলন শুরু হয়। Nat C. Goodwin, Joseph Jefferson, James A. Herne, James O'Neil, Richard Mansfield, Francis Wilson, Mrs. Fiske এবং James K. Hackett হলেন এমন কিছু ব্যক্তি, যারা দীর্ঘ সময় ধরে এই আন্দোলন টিকিয়ে রেখেছিলেন। সময়ের পরিক্রমায় আস্তে আস্তে তারা সবাই এই আন্দোলন থেকে সরে আসে।
প্রথমে সরে আসে Nat C. Goodwin. তিনি ছিলেন এই আন্দোলনের প্রথম আহ্বায়ক। তবে তার বেশ কিছু দুর্বলতাও ছিল। যেমন: ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত কাজে তাকে প্রায়-ই নিউইয়র্কে যেতে হতো। নিকারবোকার থিয়েটারের ওপর তার বেশ লোভও ছিল। ইহুদিরা তাকে এই থিয়েটারের ম্যানেজার হওয়ার প্রস্তাব দেয়। ফলে আন্দোলনে ইস্তফা দিয়ে তিনি ট্রাস্ট সংগঠনটির গোলামে পরিণত হন।
Joseph Jefferson শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থিয়েটার শিল্পীদের সাথে এবং একই সঙ্গে ট্রাস্ট সংগঠনটিরও সদস্য ছিলেন। এককথায় তিনি ছিলেন গুপ্তচর।
Richard Mansfield ও Francis Wilson প্রতি রাতে থিয়েটার ঘরগুলোতে জ্বালাময়ী কিছু বাণী শোনাতেন। অনেক মানুষ রাতভর তাদের বাণী শোনার অপেক্ষা করত, কিন্তু অসংগঠিত একটি জনগোষ্ঠী এমন কিই-বা করতে পারে? মানুষ যে কথা শুনতে আসছে, এটাই তাদের জন্য পুরস্কার ছিল।
১৮৯৮ সালের দিকে Francis Wilson-এর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করলে ফিলাডেলফিয়া ট্রাস্ট সংগঠন তাকে ৫০ হাজার ডলারের পারিতোষিক অর্থাৎ বকশিস প্রস্তাব করে। তিনি প্রস্তাবে রাজি হন এবং এটা দিয়ে ব্যাবসা শুরু করেন। এরপর পুরো আন্দোলন ভেস্তে যায়। বাকি যে সদস্যরা ছিল, তারাও কোনো একসময় এই আন্দোলন থেকে সরে পড়ে।
সবাই আত্মসমর্পণ করলেও Mrs. Fiske একা এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার স্বামী Harrison Grey Fiske-এর সাহায্য চাইলেন। তার স্বামীর নিউইয়র্কের নাম করা পত্রিকা প্রতিষ্ঠান Dramatic Mirror-এর সম্পাদক ছিলেন। তিনি একটি কলামে উল্লেখ করেন—
'থিয়েটার শিল্পের মৃত্যু সেদিন হয়েছে, যেদিন এর নিয়ন্ত্রণ একদল অযোগ্য ও অদক্ষ লোকের হাতে চলে গেছে। এর মাধ্যমে আমাদের গৌরব, ঐতিহ্য ও শালীনতার সূর্যাস্ত ঘটেছে। এরপরও কি আমরা এটিকে সুস্থ-সুন্দর বিনোদনের মাধ্যম বলব? যারা এই শিল্পকে নিজেদের করে নিয়েছে, তারা এটি পরিচালনায় একেবারে অদক্ষ। আমাদের সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্র এই সন্ত্রাসী চক্রের দরুন ইতঃপূর্বেেও বহুবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।' (Dramatic Mirror, December 25, 1897; Reprinted in March 19, 1898)
আগেও বলা হয়েছে, যখন কোনো ইহুদির ওপর আক্রমণ আসে, তখন তাকে রক্ষায় পুরো সম্প্রদায় এগিয়ে আসে। এবার তাদের পত্রিকা ও ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠানগুলো Dramatic Mirror-এর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক আর্টিক্যাল প্রকাশ শুরু করে। হোটেল, স্টেশন, অফিস-আদালত সব জায়গা থেকে এই পত্রিকাটি বর্জন করা হয়। বিজ্ঞাপনদাতারাও সরে পড়ে। সবশেষে Mr. Fiske-কে চাকরিচ্যুত করা হয়।
তিনি সেই কলামে আরও অনেক তথ্য উপস্থাপন করেন। যেমন: গোপন ছদ্মনাম ব্যবহার করে কারা এই শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করছে, কারা এটিকে নিয়ে সিন্ডিকেট বাণিজ্য করছে, কীভাবে তারা টিকেটের মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে? সেইসঙ্গে তিনি সেই সকল ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করেন, যারা ইতঃপূর্বে সন্ত্রাসী তৎপরতায় অভিযুক্ত হয়েছে। তিনি এটাও উল্লেখ করেন— প্রচারণার কাজে বিভিন্ন শহরের পত্রিকাগুলোতে তারা এতটা উচ্চমূল্যে বিজ্ঞাপন দিত যে, দ্বিতীয় কোনো থিয়েটার প্রতিষ্ঠান সেখানে বিজ্ঞাপন ছাপানোর সুযোগই পেত না। পুরো বাজার শয়তান আর ভণ্ডে ছেয়ে গেছে।
এই খবরের প্রতিশোধ নিতে ট্রাস্ট সংগঠনটি Mr. Fiske-এর বিরুদ্ধে ১০ হাজার ডলারের মানহানি মামলা করে।
অবাক করা বিষয়— মামলাটি আদালতে তোলা হলে বিচারপতি সাহেব সাক্ষ্য শোনার ন্যূনতম প্রয়োজনবোধও করেননি; এমনকী তাকে কিছু বলার সুযোগ পর্যন্ত দেননি! যাদের অভিযুক্ত করে কলাম ছাপিয়েছিলেন, তাদের অতীত ইতিহাস অনুসন্ধানের ন্যূনতম আগ্রহ পর্যন্ত কেউ দেখায়নি। আদালত কক্ষে উপস্থিত এক মহিলা চেঁচিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলে তাকেও থামিয়ে দেওয়া হয়।
সেদিন আদালতে অন্যতম আসামি Abraham L. Erlanger হাজির ছিলেন না। ফলে তাকে আর জেরা করা হয়নি। তিনি বাদে যতজন সেখানে উপস্থিত ছিল, তাদের জেরা করার সময় গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো বিচারক সাহেব 'overruled' করে যান। একে একে সবাই খালাস পায়। আর বিশাল অঙ্কের মানহানি মামলায় Mr. Fiske-কে অভিযুক্ত করা হয়।
তবে তিনি যে ভয়ংকর সত্য প্রকাশের সাহস দেখিয়েছিলেন, তার গুরুত্ব যদি সেই যুগের মানুষরা উপলব্ধি করতে পারত, তাহলে জ্যান্টাইল যুব সমাজের নৈতিকতাবোধ কখনো ধ্বংস হতো না। তিনি ঠিকই বলেছিলেন, এই শিল্পে অশ্লীলতার যাত্রা তাদের হাত ধরেই হয়েছে, যারা একসময় জুতা পালিশ, পত্রিকা বিক্রি এবং টোকাইয়ের কাজ করত। সেকালে এই শিল্পের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন Morris Gest। তিনি ছিলেন রাশিয়ান ইহুদি। আমেরিকার সবচেয়ে বড়ো প্রোডাকশন হাউস তার হাতে গড়ে ওঠে। থিয়েটার জগতের প্রথম দুটি অশ্লীল নাটক 'Aphrodite' ও 'Mecca' তার বিনিয়োগকৃত অর্থেই নির্মিত হয়। মজার বিষয় হচ্ছে, নাটক দুটির সব টিকেট এক বছর আগেই বিক্রি হয়; যার অধিকাংশ ক্রেতা ছিল জ্যান্টাইল।
Mr. Gest-এর সফলতার বড়ো কারণ হলো— তিনি হাতের কাছে যা পেয়েছেন তাই করেছেন। রাশিয়া থেকে আমেরিকায় আসার পর প্রথমে তিনি বোস্টনে পত্রিকা বিক্রির কাজ করতেন। এরপর প্রপারটি বয়ের কাজ শুরু করেন (যারা বিশেষ কোনো চরিত্র ছাড়া নাটক-সিনেমাতে অংশগ্রহণ করে, তাদের প্রপারটি বয় বলা হয়)। ১৯০৬ সাল থেকে তিনি চোরাই পথে থিয়েটারের টিকিট বিক্রির কাজ শুরু করেন। এ জন্য বেশ কয়েকবার পুলিশের হাতে ধরাও খান। একসময় তাকে থিয়েটার অঞ্চলগুলোতে নিষিদ্ধ করা হয়। এ রকম হাজারো কুৎসিত গল্প তার নামের সঙ্গে মিশে আছে।
প্রডিউসার হিসেবে তিনি দর্শকদের তা-ই দিয়েছেন, যা তারা দেখতে চেয়েছে। সমাজে যখন অশ্লীলতা সবে জায়গা পেতে শুরু করেছে, তখন তিনিও নিঃসংকোচে নিজের থিয়েটারগুলোতে অশ্লীলতার সংযোজন করেন। আর জ্যান্টাইল যুবকরাও খুব আগ্রহ নিয়ে এই অনুষ্ঠানগুলো দেখতে যেত। এর দরুন সব টিকেট আগেই বিক্রি হয়ে যেত।
এমন আরেকজন ব্যক্তি হলেন Sam Harris। তিনি দীর্ঘদিন Cohan & Harris প্রতিষ্ঠানটির একজন জুনিয়র অংশীদার হিসেবে কাজ করেছেন। Sam Harris একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির দর্শককে টার্গেট করেন, যারা মারামারি, রক্তারক্তি ও ভয়ংকর শারীরিক কসরতের প্রদর্শন দেখতে পছন্দ করত। তাদের জন্য 'Atrocious Melodrama' নামে নতুন একটি শৈলী তিনি থিয়েটার শিল্পে নিয়ে আসেন। সেকালের সেরা বক্সিং তারকাদের সঙ্গে তিনি চুক্তি করেন। যেমন: Dixon ও Terry McGovern। তা ছাড়া সুঠাম দেহের সকল যুবকদের তিনি থিয়েটারে আমন্ত্রণ জানাতেন। তাদের দিয়ে ভয়ংকর সব শারীরিক কসরত (Stunt) প্রদর্শনের আয়োজন করা হতো। Sam Harris নিজের প্রোডাকশন হাউসকে শক্তিশালী করতে Al H. Woods-কে অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব করেন।
Mr. Woods ব্যক্তি হিসেবে কিছুটা অসংযত হলেও শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতায় তার বেশ অবদান রয়েছে। তিনি একসময় নিউইয়র্কের একটি নাট্যদলের হয়ে পিয়ানো বাজাতেন। তার নেতৃত্বে থিয়েটার জগতে কালজয়ী দুটি নাটকের জন্ম হয়: 'The Girl from Rector's' ও 'The Girl in the Taxi'। ভিয়েনার থিয়েটার প্রতিষ্ঠান এবং অপেরা হাউসগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। তবে এটাও ঠিক, সেখানে তখন অশ্লীলতা ও নগ্নতার জমজমাট প্রদর্শন হতো। এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করতে গিয়ে তিনি নিজেও একসময় অশ্লীলতার মাঝে হারিয়ে যান।
Al Woods-এর মতো হাতেগোনা কয়েকজন ব্যক্তি বাদে এই শিল্পটি একদল অশিক্ষিত, মূর্খ ও নৈতিকতাহীন মানুষদের হাতে পড়ে। যারা সাহিত্যের কিছুই বোঝে না, তারাই আমাদের সাহিত্য শেখাচ্ছে। যারা দর্শনের কিছুই জানে না, তারাই দর্শন শেখাচ্ছে। যাদের কোনো নৈতিকতাবোধ নেই, তারাই আবার নৈতিকতার ছবক দিচ্ছে।
Devid Belasco থিয়েটার জগতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। অভিনয় দক্ষতার জন্য তাকে বিভিন্ন মহল থেকে আমন্ত্রণ জানানো হতো। খুব অল্প সময়ে তিনি দর্শকদের মন জয় করে ফেলেন। তিনি যখন যিশুর চারিত্রে অভিনয় করতেন, তখন অনেকেই তার মাঝে যিশুর ছায়া খুঁজে পেত।
আঠারো শতকের শেষের দিকে ট্রাস্টের বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সিরাকিউস থিয়েটারের ম্যনেজার Samuel Shubert ছিলেন এই ট্রাস্টের একজন সদস্য। জীবনের প্রথম দিকে থিয়েটার হলগুলোতে তিনি চা-নাস্তা তৈরির কাজ করতেন। কিছুদিন পর তিনি চোরাই পথে টিকেট বিক্রির কাজ শুরু করেন। এই টাকা জমিয়ে একসময় নিজের নামে একটি থিয়েটার খুলে বসেন। তার থিয়েটারের মূল বিষয় ছিল 'Burlesque and Comed' অর্থাৎ যৌন-আবেদনময়ী কৌতুক নাটক।
১৯০০ সালে Belasco ও Shubert ট্রাস্টের বিভিন্ন সদস্যের সঙ্গে ঝগড়া করে বেরিয়ে আসেন। নিউইয়র্কে তাদের ভক্তের অভাব ছিল না। থিয়েটারগুলোতে তখন খ্রিষ্টানরা সুবিধা করতে পারছিল না বলে অনেকে ক্ষেপে গিয়েছিল। এই ক্ষোভটাকে তারা সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায়। Shubert নাট্যগল্প সংগীতে, টিকেট বিক্রি ও থিয়েটার প্রচারণার কাজ করত। Belasco সেই গল্প অনুযায়ী ছোটোখাটো থিয়েটারগুলোতে অভিনয় করত। যিশু, পবিত্র আত্মা, খ্রিষ্টান পুরোহিত ইত্যাদি নানা চরিত্রে তিনি দর্শকদের আকর্ষণ করার চেষ্টা চালাতেন। তার শারীরিক গঠন, কম্পমান কণ্ঠ, রুপালি চুল এবং লাজুক দৃষ্টি খ্রিষ্টান মেয়েদের মনে ছোবল মারত। অভিনয় শেষে তিনি ট্রাস্ট সংগঠনটির কুৎসিত বিভিন্ন গল্প এবং কীভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন, তা তুলে ধরেন। ধীরে ধীরে সংগঠনটির প্রতি মানুষের অনীহা বাড়তে শুরু করে। তা ছাড়া উনিশ শতকের শুরুতে বার্ধক্যের কারণে সংগঠনটির অনেক সদস্য মারা যায়।
বাজারের এমন অবস্থা দেখে ১৯০৭ সালে ম্যানহ্যাটনে তিনি নিজেই একটি থিয়েটার খুলে বসেন। তত দিনে সবাই তার অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে পড়েছিল। শুরু থেকেই তিনি সফলতা পাচ্ছিলেন। ১৯১০ সালে পুরোনো ট্রাস্ট সংগঠনটি একেবারে ভেঙে যায়। এবার সেই সদস্যরা একে একে বেলাস্কো থিয়েটারে যোগ দেওয়া শুরু করে। এভাবে জন্ম নেয় নতুন আরেকটি ট্রাস্ট সংগঠন।
মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো খ্রিষ্টান অভিনেতারা থিয়েটার শিল্পে জায়গা পাবে। নতুন সংগঠনটি হয়তো পৃষ্ঠপোষকতা করবে। কিন্তু এখানেও তাদের বোকা বানানো হয়। মানুষ বুঝল না, সংগঠনটি নতুন হলেও ভেতরের মানুষগুলো পালটায়নি। খ্রিষ্টানদের ছদ্মনাম ব্যবহার করে তারা আবারও এই ট্রাস্টে যোগ দেয়। তাই সাধারণ মানুষ তাদের সনাক্ত করতে পারেনি। লেখক, নাট্যকারসহ কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো আগের মতো এবারও তাদের দখলে গেল। পার্শ্ব চরিত্রে কিছু সুন্দরী খ্রিষ্টান তরুণীকে নিয়ে আসা হতো। তবে তাদের অভিনয় যেন ইহুদিদের মতো হয়, তার জন্য আগে থেকেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তারা নিজেদের পৌরাণিক গল্পগুলো নিয়ে নাট্যশালার আয়োজন করত। ধীরে ধীরে মানুষ আবারও থিয়েটারের দিকে ফিরেতে শুরু করল। যারা কিছুদিন আগেই ইহুদিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল, তারা বুঝতেই পারল না, এই অভিনেতাদের আসল পরিচয় তাদের ছদ্মনামের নিচে লুকিয়ে আছে।
একসময় মানুষ যখন সবকিছু স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়, তখন সবাই ছন্মনামের খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে আসা শুরু করে। সে সময়ের বেশ কিছু জনপ্রিয় অভিনেতা হলেন: Al Jolson, Charlie Chaplin, Louis Mann, Sam Bernard, David Warfield, Joe Weber, Barney Bernard, Ed Wynne, Israel Leopold, Lou Fields, Eddie Cantor এবং Robert Warwick |
একইভাবে জনপ্রিয় কিছু অভিনেত্রী হলেন: Theda Bara, Nora Bayers, Olga Nethersole, Irene Franklin, Gertrude Hoffman, Mizi Hajos, Fanny Brice, Bertha Kalisch, Jose Collins, Ethel Levy, Belle Baker, Constance Collier এবং Anne Held। এমন আরও অনেকে আছেন, যাদের সত্যিকারের পরিচয় কখনো প্রকাশ পায়নি। কারণ, তারা ছদ্মনামেই খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
এত কিছুর পরও তাদের স্বাদ মিটল না। এবার তারা থিয়েটারকে কেবল নাট্যশিল্পে আবদ্ধ না রেখে ছড়িয়ে দিতে চাইল সংগীত, নৃত্য-সংগীত ও চলচ্চিত্রে। এর জন্য দরকার পড়ে আলাদা আলাদা গান, কবিতা ও গল্প-উপন্যাসসের। কিন্তু তাদের ভালো কোনো সুরকার, গল্প লেখক ও মঞ্চ ডিজাইনার ছিল না। ফলে বিখ্যাত কিছু জ্যান্টাইল কবি, গীতিকার, সুরকার, নাট্য লেখক ও গল্প লেখকদের তারা অর্থের বিনিময়ে আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করে। এমন কিছু ব্যক্তির নাম নিচে উল্লেখ করা হলো—
Victor Herbert ও Gustav Kerker আমেরিকার সংগীত শিল্পে জনপ্রিয় দুটি নাম। বিখ্যাত গল্প The Lion and The Mouse-এর লেখক Charles Klein। এমন আরও অনেকে হলেন Jack Lait, Montague Glass, Samuel Shipman, Jules Eckert Goodman এবং Aaron Hoffman ।
তাদের নির্দেশনায় বাধ্য হয়ে জ্যান্টাইল লেখকরাও একসময় যৌন গল্প লিখতে শুরু করে। যে গল্পে যৌনতার ন্যূনতম সংস্পর্শ নেই, তার প্রতি পরিচালক, প্রডিউসার ও ট্রাস্ট বোর্ড কোনো রকম ভ্রুক্ষেপ করে না। কোনো অভিনেতা যদি এসব গল্পে অভিনয় করতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তাকে একেবারে বের করে দেওয়া হয়।
Shuberts নিউইয়র্কসহ আশপাশের বেশ কিছু থিয়েটার প্রতিষ্ঠান ইজারা নেওয়া শুরু করে। গান, গল্প, অভিনয়ের মতো শিল্পের কোনো শাখায় তার ন্যূনতম জ্ঞান ছিল না। তবে কীভাবে টিকেটের মূল্য বাড়াতে হয় এবং দর্শকদের থিয়েটারে আনতে হয়, তিনি তা খুব ভালো করেই জানতেন।
১৯২০ সালে থিয়েটার শিল্পে বড়ো ধরনের ধ্বস নামে। প্রায় ৩০০০ থিয়েটারশিল্পী তাদের পেশা পরিবর্তন করতে অন্যত্র চলে যায়। অনেকে থিয়েটার হলগুলো বিক্রি করা শুরু করে। এমন কঠিন অবস্থার মধ্যেই Shuberts নিউইয়র্কে ৬টি থিয়েটার হল ও ৪০টি নতুন নাটক তৈরির আগাম ঘোষণা দেয়। এমন হটকারী সিদ্ধান্তের কারণে অনেকে তাকে পাগলও বলতে থাকে, কিন্তু তিনি কী তৈরি করবেন তা সাধারণ মানুষ তখনও বুঝতে পারেনি। তার চিন্তা ছিল গল্প-নাটক যাই হোক, তাতে যদি নগ্নতার মিশ্রণ থাকে, তাহলে দর্শকের অভাব হবে না।
১৯১০ সালের পর থেকে 'চলচ্চিত্র' নামক একটি নতুন শিল্পের জন্ম হয়, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় 'Motion Picture'। নতুন নাটক তৈরির আগাম ঘোষণা দেওয়ার অর্থ হচ্ছে— তিনি ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র শিল্পেও ক্ষমতাধর হতে চলেছেন। এ পর্যায়ে এসে নৈতিকাধর্মী থিয়েটার শিল্পের চূড়ান্ত মৃত্যু হয়। আজ একজন অভিনয় শিল্পীর দক্ষতা মাপা হয়— পরিচালকের নির্দেশে তিনি কতটুকু অভিনয় করতে পারছেন তার ওপর। মহিলা শিল্পীদের জামা-কাপড় নির্ধারণে আজ আর কোনো নিয়মনীতি নেই। গান ও নৃত্য প্রদর্শনে যে যুবতিদের মঞ্চে উঠানো হয়, তাদের খামারের মুরগি বললেও ভুল হবে না।
সাধারণ মানুষ আজ আর নৈতিকতার জন্য আন্দোলন করে না। ইহুদিরা আঁচ করতে পেরেছিল, তাদের যৌনতা ভরা চলচ্চিত্রশিল্প নিয়ে জ্যন্টাইল সম্পাদকরা একসময় মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তাই তাদের ঘুষ দিয়ে নিজেদের দলভুক্ত করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু এমন অনেক সম্পাদক ছিল, যারা তাদের অর্থের সামনে বিক্রি হয়ে যায়নি। যেমন: S. Metclafe, Hillery Bill, Frederick F. Schrader, Norman Hapgood এবং James O' Donnell Bennett। তারা যথাক্রমে Life, New York Press, Washington Post, New York Evening Globe ও Chicago Record-Herald পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
সম্পাদকদের কাবু করতে না পারায় ইহুদিরা পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলো কাবু করতে শুরু করে। আর এটাই ছিল তুলনামূলক সহজ কাজ। প্রথমে তারা বড়ো অঙ্কের অর্থ অনুদানের লোভ দেখিয়ে দলে ভেড়ানো শুরু করে। এতে কাজ না হলে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। এভাবে একে একে সবাই ইহুদিদের পায়ের নিচে ধারণা দিতে বাধ্য হয়। তারপর যেসব সম্পাদক তাদের বিরুদ্ধে লিখতে পারে বলে আশঙ্কা হয়, তাদের সবাইকে একে একে চাকরিচ্যুত করা হয়। এভাবে থিয়েটার ও চলচ্চিত্রশিল্প হয়ে উঠে ইহুদিদের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার উপার্জনের সম্ভাবনমায় উৎস।
ইহুদিদের নগ্নতার থাবায় চলচ্চিত্রশিল্প
Anthony Comstock-এর নাম শুনেছেন কখনো? তিনি মিডিয়া জগতের বিখ্যাত কোনো ব্যক্তিত্ব নন। তার নাম উচ্চারিত হলে চারদিকে হাসির ধুম পড়ে যেত। পত্রিকায় তাকে নিয়ে অনেক ব্যঙ্গ কলাম লেখা হতো। অথচ বাস্তবে তিনি ছিলেন অশ্লীলতা, নোংরামি এবং সকল অসামাজিক কাজের বিরুদ্ধে একজন প্রতিবাদী ব্যক্তি। পেশায় ছিলেন পোস্টাল পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সদস্য। এসব অপসংস্কৃতি যেন সমাজে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য তিনি 'সেন্সর বোর্ড' তৈরির প্রস্তাব করেন। আর এ কারণেই তিনি ইহুদি নিয়ন্ত্রিত চলচ্চিত্রশিল্পের কাছে চিরশত্রু বনে যান। সাধারণ মানুষ যেন তার কথায় কর্ণপাত না করে, এ জন্য পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়। ১৯১৫ সালে তিনি মারা যান।
ব্যাপারটা এমন নয়— তারা ইচ্ছা করে খারাপ ও নোংরা জিনিস তৈরি করে। মূলত তাদের রুচিবোধটাই এমন। ইহুদিরা নোংরামির কতটা নীচু স্তরে পৌছে গেছে, তা তারা উপলব্ধিও করতে পারে না। এটা সত্যি— এখনও কিছু ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে। তবে তাদের সহমর্মিতা জানানো ছাড়া আর কিছুই করার নেই। কারণ, দর্শকসমাজ আজ সুস্থধারার চলচ্চিত্রের দিকে ফিরেও তাকায় না। সেন্সর বোর্ড প্রতিষ্ঠা পেলে ইহুদিদের নগ্নতা ভরা চলচ্চিত্র শিল্প ভয়ানক হুমকির মুখে পড়ত। তাই তারা সুকৌশলে এটাকে ঠেকিয়ে দিতে চেষ্টা করে।
১৯০৯ সালে নিউইয়র্ক শহরে National Board of Review of Motion Pictures প্রতিষ্ঠিত হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অশালীন ও নগ্ন চলচ্চিত্রের নির্মাণ ঠেকাতে চারদিকে যখন আন্দোলন শুরু হয়, তখন চাপের মুখে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথমে এর নাম ছিল Motion Picture Censorship। মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো অশ্লীল চলচ্চিত্রের নির্মাণ বন্ধ হবে। কিন্তু সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল এই বিশেষ চলচ্চিত্র নির্মাতা গোষ্ঠীটির স্বার্থ রক্ষা করা এবং কিছু একটা বুঝিয়ে সাধারণ মানুষদের আন্দোলনকে কবর দেওয়া। Frederick Boyd Stevenson সংগঠনটির একজন সাবেক কর্মী। ব্রুকলাইনের Eagle ম্যাগাজিনে তিনি উল্লেখ করেন—
'চলচ্চিত্র শিল্পের নাটাই ধরে যে যৌনতা সমাজে প্রবেশ করেছে, তার দরুন সন্ত্রাসী তৎপরতা প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্দোলন ও মামলা-মোকাদ্দমা করেও যৌনতার আঠালো থাবা থেকে এই শিল্পকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না। যেখানে একটি সুস্থ-শালীন চলচ্চিত্র থেকে আয় হয় ১,০০,০০০ ডলার, সেখানে যৌনতা ভরা একটি চলচ্চিত্র থেকে আয় হয় ২,৫০,০০০ থেকে ২৫,০০,০০০ ডলার। তাহলে বাজারে কোন চলচ্চিত্র বৃদ্ধি পাবে?'
Dr. James Empringham নিউইয়র্কের World ম্যাগাজিনের একটি কলামে লিখেন— 'কিছুদিন আগে চলচ্চিত্রশিল্প নিয়ে আমেরিকার বিভিন্ন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান একটি সম্মেলনের আয়োজন করে। আমাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। অবাক করা ব্যাপার— উপস্থিত ৫০০ জন সদস্যের মধ্যে কেবল আমিই ছিলাম খ্রিষ্টান, আর বাদ বাকি সবাই ইহুদি।'
শতাব্দীর শুরুতে মাত্র ১০টি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আমেরিকার প্রায় ৯০ ভাগ চলচ্চিত্র নির্মাণ করত। এর ৮৫ ভাগ সদস্যই ছিল ইহুদি। দর্শকসংখ্যা বাড়াতে পৃথিবীজুড়ে তারা অসংখ্য শাখা প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে তৈরি করে দশ হাজার সিনেমা হল। যে গ্রাম্য মানুষ একসময় থিয়েটারও দেখতে যেত না, তারা আজ দল বেঁধে সিনেমা হলে যাচ্ছে।
বাজারে সুন্দর ও সুস্থধারার চলচ্চিত্রের অভাব নেই— এটা শুনে পাঠকরা হয়তো চোখ কপালে তুলবেন। সত্যি বলতে শিক্ষামূলক, মার্জিত ও সুস্থধারার অনেক চলচ্চিত্র এখনও তৈরি হচ্ছে, তবে তা দর্শক মহলে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। হল মালিক এমন কোনো চলচ্চিত্র প্রদর্শনে রাজি হবে না, যেখানে বাণিজ্যিক ঝুঁকি রয়েছে। সবার মনে এমন একটি ধারণা গেঁথে বসেছে, নগ্নতা ও যৌনতার সংস্পর্শ না থাকলে দর্শক সিনেমা হলে আসবে না।
তবে এই ধারণার বিরুদ্ধে সমুচিত জবাব দেন David Wark Griffith। ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে তিনি একটি শিক্ষণীয় চলচ্চিত্র তৈরি করেন। ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে বেশ কয়েকটি সিনেমা হল ভাড়া নেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিকভাবে বেশ সফল হয়। সেইসঙ্গে দর্শকরাও দারুণ মুগ্ধ হয়।
তাহলে ইহুদিরা এমন চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে না কেন? আপনাদের বুঝতে হবে— যাদের মধ্যে শিক্ষা, সাহিত্য, আদর্শ ও নৈতিকতার জ্ঞান নেই, তারা কখনো নোংরামি ছাড়া অন্য কিছু করতে পারে না। যে মাছ ধরতে জানে না, সে তো কেবল পানি-ই ঘোলা করবে। 'শিল্প' বিষয়টা কী, তা-ই তো ইহুদিরা জানে না। তারা বলে— দর্শক যা চাচ্ছে, আমরা তা-ই তৈরি করছি। এটা ঠিক যে, বর্তমান যুব সমাজের বিরাট একটা অংশ নৈতিকতা-বিবর্জিত। সমাজের এই অধঃপতন কীভাবে হয়েছে, তা ইতোমধ্যেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যিশুকে আজ আমরা কজনই-বা স্মরণ করি! প্রতি সপ্তাহে কজন গির্জায় যাই? এমতাবস্থায় যৌনতা ভরা চলচ্চিত্রে দর্শকের অভাব হওয়ার কথা নয়।
Carl Laemmle একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং Universal Film Company- এর মহাপরিচালক। জন্মসূত্রে তিনি জার্মান ইহুদি। আমেরিকান দর্শকরা কোন ধরনের চলচ্চিত্র দেখতে আগ্রহী, তা জানার জন্য 'What Do You Want?' শিরোনামে তিনি একটি জরিপ করেন। Mr. Laemmle ধারণা করেছিলেন, হয়তো ৯৫ শতাংশ দর্শক বলবে তারা সুস্থধারার চলচ্চিত্র দেখতে আগ্রহী, কিন্তু ৬০ শতাংশ দর্শকই যৌনতাময় চলচ্চিত্রকে সমর্থন করে!
'কোকেন' যেমন একজন মাদকাসক্তের দৈনন্দিন চাহিদা, তেমনি যৌন চলচ্চিত্রও নৈতিকতা-বিবর্জিত সমাজের দৈনন্দিন চাহিদা। মাদকাসক্ত রোগীর সুস্থতার জন্য তাকে যেমন কোকেন থেকে দূরে রাখা উচিত, তেমনি সমাজে নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে যৌন দৃশ্যের প্রদর্শন বন্ধ করা উচিত। দর্শক যা চাচ্ছে, তা-ই তাদের দিচ্ছি— এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না।
অশ্লীল চলচ্চিত্রের নির্মাণ ঠেকাতে আমেরিকার বার কাউন্সিলে বেশ কয়েকটি প্রোডাকশান হাউসের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলা ঠেকাতে যে উকিল ও আইনজীবীগণ হাজির হন, তারা সবাই ছিলেন ইহুদি। যেমন: Meyers, Ludvigh, Kolm, Friend ও Rosenthal; এমনকী একজন রাবাইকে পর্যন্ত এই আন্দোলন ঠেকানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি খুব চৌকসভাবে একটি বক্তৃতা দেন। তার কিছুটা অংশ তুলে ধরা হলো—
'আমি একজন ইহুদি। আপনাদের কি মনে আছে, অশ্লীল থিয়েটারগুলো ইতঃপূর্বে আমাদের ধর্মকে ছোটো করে কত নাট্যশালার আয়োজন করেছে? দর্শকদের নিকট আমাদের ধর্মকে কতটা হাস্যরসাত্মক বানিয়েছে? আমাদের হৃদয়ে তা কতটা কষ্টের দাগ কেটেছে?'
তাদের ধর্মকে যদি কেউ ছোটো করে থাকে, তবে সেটা তারাই করেছে। আগেই বলেছি, শিল্পকলা সম্পর্কে খ্রিষ্টান শিল্পীদের যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। নিছক একটি ধর্মের পেছনে লাগার কোনো প্রয়োজন তাদের পড়েনি।
তিনি আরও বলেন— 'বিষয়টির সমাধান করতে আমরা B'nai B'rith নামে এক সংগঠন তৈরি করি। সংগঠনটি বর্তমানে Anti-Defamation League নামে পরিচিত, যার সদর দপ্তর শিকাগোতে অবস্থিত। আমরা একত্রিত হয়ে ক্যাথলিক গির্জা, সমাজের ধর্মীয় সব সংগঠন এবং নির্মাতা প্রতিষ্ঠানদের নিকট চিঠি পাঠাই, যেন আমাদের ধর্মকে অবজ্ঞা করে আর কোনো চলচ্চিত্র তৈরি না হয়। পৌরাণিক চরিত্রগুলো উপস্থাপন করতে সমস্যা নেই, কিন্তু তাদের নিয়ে যেন ব্যঙ্গ চিত্র করা না হয়। এরপর আমরা প্রতিটি পৌরসভা কর্তৃপক্ষের নিকট চিঠি পাঠাই এবং ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করি, যেন এমন কোনো চলচ্চিত্র বা নাটকের অনুমতি দেওয়া না হয়, যেখানে আমাদের ধর্মকে অশ্লীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ফলাফল কী? আমরা কোনো কংগ্রেস বা আদালতে মামলা করতে যাইনি। আমরা কিন্তু আপনাদের মতো দলবেঁধে আন্দোলনও করিনি। আমরা সবাই একতাবদ্ধ হয়েছিলাম এবং একত্রিত হয়ে ধর্মবিরোধী চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ করেছি।'
সত্যিই যদি ধর্মকে অপবিত্রতার হাত থেকে রক্ষা করা Anti-Defamation Leauge-এর উদ্দেশ্য হয়, তাহলে খ্রিষ্টান ধর্মকে যখন কলুষিত করা হয়, তখন তারা চুপ থাকে কেন? রাবাই যদি খ্রিষ্টানদের এত উপদেশ দিতে পারেন, তাহলে নিজেদের কেন এই উপদেশ দিচ্ছেন না?
রাবাই আরও বলেছেন— 'অশ্লীল-নোংরা থিয়েটারগুলো ইতঃপূর্বে বহুবার তাদের ধর্মকে ছোটো করেছে।'
বিশ্বাস করা যায়, আমেরিকার মাটিতে ইহুদি ধর্মকে ছোটো করা হয়েছে! এটা তো কোনো খ্রিষ্টানের পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব! ভিনগ্রহের কোনো এলিয়েন যদি করে থাকে, তবেই মেনে নেওয়া সম্ভব। তাহলে তাদের ধর্মকে কীভাবে ছোটো করা হলো? উত্তর শুনলে পিলে চমকে যাওয়ার মতো অবস্থা হবে।
কোনো জনসমাবেশে যদি যিশুকে স্মরণ করা হয়, তবে তা ইহুদিদের জন্য চরম অপমানকর বিবেচনা করা হয়। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যদি জাতির উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদানকালে যিশুর নাম উল্লেখ করেন কিংবা কোনো চলচ্চিত্রে খ্রিষ্টধর্মকে মর্যাদার সঙ্গে প্রচার করা হয়, তবে সেটাকেও চরম অপমানকর মনে করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, সেকালে Life of the Savior নামক একটি চলচ্চিত্রের প্রচারণা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ, উক্ত সিনেমায় যিশু ও খ্রিষ্টান ধর্মকে বড়ো করে উপস্থান করা হয়েছে।
Way Down East ও The Shepherd of the Hills চলচ্চিত্র দুটিকে কেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল? কারণ, গ্রাম্য জীবন, কৃষি সংস্কৃতি ও জীবন-প্রবাহ সম্পর্কে ইহুদিদের কোনো ধারণা ছিল না। গ্রামের মানুষদেরও যে একটা জীবন আছে, তা তারা বুঝতেই চাইত না। তাদের জন্ম হয়েছে বিভিন্ন শহুরের অলিতে-গলিতে, যেমন: ফ্রাঙ্কফুট, হ্যানয়, ওয়ারস, নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস ইত্যাদি। কৃষকরা তো তাদের কাছে হাসির পাত্র।
ইহুদিরা ভাবে— এই ধরনের চলচ্চিত্র দিয়ে তাদের বক্স অফিসে পয়সা আসবে না। সুতরাং এসবের পেছনে সময় নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া তারা এটাও চায় না— এমন কোনো চলচ্চিত্রের প্রদর্শন হোক, যেখানে পুঁজিবাদ ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে গ্রাম্য কৃষকদের নিষ্পেষিত জীবনচিত্র ফুটে ওঠে।
চলচ্চিত্রশিল্প থেকে শালীনতা ও নৈতিকতা যে বহু আগেই বিদায় নিয়েছে, তা আমরা ভালো করে জানি। তারপরও অনেক সংগঠন এ পর্যন্ত ছোটোখাটো বহু আন্দোলন করেছে, কিন্তু ফলাফল কিছুই হয়নি। কারণ, আমরা সমস্যার মূল শিকড়ে পৌছাতে পারিনি। কে জানে, যারা আন্দোলন করছে তারা হয়তো ইহুদিদেরই কিছু সদস্য! আমরা যদি এসব সংগঠন ও সদস্যদের চিহ্নিত করতে না পারি, তাহলে বছরের পর বছর আন্দোলন করেও কোনো সমাধান হবে না।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র শিল্পে ইহুদিদের একচেটিয়া আধিপত্য
একটা সময় ছিল, যখন ইহুদিরা খ্রিষ্টান ছদ্মবেশে ব্যাবসা-বাণিজ্য করত, যেন তাদের কেউ অবজ্ঞা না করে। তবে আজ তারা অনেক সাবলম্বী। সমাজে এখন নিজ পরিচয়ে কাজ করতে পারে। সম্পদ তো অনেক হলো, এবার কিছু খ্যাতি কামানো দরকার! সেই কাজটা করে দিয়েছে চলচ্চিত্র শিল্প, যা আজ তাদের মিলিয়ন ডলার উপার্জনের রাস্তা করে দিয়েছে। এখন তাদের প্রথম লক্ষ্য, যেভাবেই হোক সিনেমা হলগুলোতে দর্শক বাড়াতে হবে। দেখবেন, দিন-রাত সিনেমা হলগুলোতে মানুষের উপচে পরা ভিড়। এমন তো নয়— প্রতিদিন-ই সুন্দর সুন্দর চলচ্চিত্র, গল্পনাট্য ও প্রমাণ্যচিত্র প্রদর্শন হচ্ছে, তাহলে মানুষ হলগুলোতে প্রতিদিন কী দেখার জন্য এত ভিড় করে?
কেউ না কেউ তো আছেই, যে আমাদের মগজ নিয়ন্ত্রণ করছে। এটা ঠিক, আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক কিছুই ইহুদিরা আবিষ্কার করেছে, কিন্তু তার অধিকাংশই মানব সভ্যতার কোনো উপকারে আসেনি। কারণ, এগুলো দিয়ে কেবল সভ্যতাকে ধ্বংসই করা যায়; গড়া সম্ভব নয়।
যে প্রতিষ্ঠানগুলো আজ পুরো পৃথিবীর চলচ্চিত্রশিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: The Famous Players, Selznick, Selwyn, Goldwyn, Fox Film Company, The Jesse L. Lasky Feature Play Company, United Artists' Corporation, The Universal Film Company, The Metro, Vitagraph, Seligs, Thomas H. Ince Studios, Artcraft, Paramount Picture ইত্যাদি। এবার প্রতিষ্ঠানগুলো কাদের হাতে জন্ম নিয়েছে এবং কারা পরিচালনা করছে, তা নিচে উপস্থাপন করা হলো—
The Famous Players প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালক হলেন Adolph Zukor। তিনি একজন হাঙ্গেরিয়ান ইহুদি। চলচ্চিত্র জগতে আসার আগে নিউইয়র্কের হ্যাস্টার স্ট্রিটে পশমি পণ্যের ব্যাবসা করতেন। মানুষের ঘরে ঘরে পণ্য ফেরি করতেন। জীবনের প্রথম সঞ্চিত অর্থ তিনি 'নিকেল থিয়েটারে' বিনিয়োগ করেন এবং Marcus Loew-এর সাথে যৌথভাবে কাজ শুরু করেন।
Adolph Zukor পরবর্তীকালে আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিজের ক্ষমতা বিস্তৃত করেন। যেমন : Famous Players-Lasky Corporation, The Oliver Morosco Photoplay Company, Paramount Pictures Corporation এবং Artcraft Pictures। এভাবে ধীরে ধীরে তিনি আমেরিকার অন্যতম ধনকুবের হয়ে ওঠেন।
অনেকে বলে United Artists Corporation জ্যান্টাইলদের প্রতিষ্ঠান, কিন্তু American Hebrew ম্যাগাজিনের একটি আর্টিক্যাল অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালক হলেন Hiram Abrams। এটি একসময় চারজন তারকা অভিনেতা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের নাম হলো Mary Pickford, Douglas Fairbanks, Charlie Chaplin ও David Wark Griffith। জন্মসূত্রে Hiram Abrams রাশিয়ান ইহুদি। ওরেগন শহরে থাকাকালে তিনি সংবাদপত্র বিক্রি করতেন। কিছুদিন পর 'Penny Arcade' নিয়ে কাজ শুরু করেন। Paramount Pictures Corporation-এর তিনি একজন যৌথ প্রতিষ্ঠাতা এবং এর কিছুদিন পরই প্রেসিডেন্ট হন।
Fox Film Corporation ও Fox Circuit Theater প্রতিষ্ঠান দুটি William Fox-এর একক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো। তিনি একজন হাঙ্গেরিয়ান ইহুদি। ধারণা করা হয়— তার প্রকৃত নাম William Fuchs। একসময় তিনি স্পঞ্জ কাপড়ের বাণিজ্য করতেন। তা ছাড়া 'Penny Arcade' বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে তিনি পেশাজীবন শুরু করেন। এটি অনেকটা বায়েস্কোপের মতো। বাক্সের ভেতর নাটাইয়ের একটি রিলে অনেকগুলো পর্ন ছবি স্থিরচিত্র আকারে সাজানো থাকত। বাক্সের ফুটায় চোখ রাখা মাত্রই রিল ঘুরিয়ে স্থির চিত্রগুলো পর্যায়ক্রমে দেখানো হতো। কিছু কয়েনের বিনিময়ে যে কেউ-ই এসব দেখতে পারত।
Metro Pictures Corporation গড়ে তোলার পেছনে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন Marcus Loew। সেকালে তিনি আমেরিকার ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও শেয়ারহোল্ডার ছিলেন।
চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাসে Marcus Loew ও Adolph Zukor খুব পরিচিত দুটি নাম। তারা উভয়েই একসময় পশমি পণ্যের বাণিজ্য করতেন। Zukor একাই চলচ্চিত্র শিল্পে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছিলেন, যদিও পরবর্তীকালে Loew-এর প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেন। তিনি সবচেয়ে বেশি তৈরি করতেন Vaudeville শ্রেণির চলচ্চিত্র, যা মূলত নীচু শ্রেণির হলগুলোতে দেখানো হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি একাই ১০৫টি সিনেমা হল গড়ে তোলেন।
Goldwyn Film Corporation পরিচালনা করতেন Samuel Goldwyn, যিনি ছিলেন একজন পোলিশ ইহুদি। চলচ্চিত্র শিল্পে আসার পূর্বে তিনি বিভিন্ন পণ্যের পাইকারি ব্যবসায় করতেন। ১৯১২ সালে Jesse Lasky ও Cecil DeMille-এর সাথে ২০০০০ ডলার বিনিয়োগ করে তার প্রথম চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এতে তিনি এতটাই লাভ করেন যে, পরবর্তীকালে ২০০০০০০০ ডলার বিনিয়োগ করে Shuberts, A.H.Woods ও Selwyns-কে সাথে নিয়ে আরও একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সেখানে মূলত জ্যান্টাইল লেখকদের গল্প-উপন্যাস নিয়ে নাটক-চলচ্চিত্র তৈরি করা হতো।
Universal Film Company বাজারের অনেকের নিকট Universal City নামে পরিচিত। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠে Carl Laemmle-এর একক নিদের্শনায়। তিনি একজন জার্মান ইহুদি। ১৯০৬ সালে এই শিল্পে তিনি প্রথম পা রাখেন। পূর্বে তার কাপড়ের ব্যাবসা ছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন নতুন ট্রাস্ট সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়, তখন তিনি সুকৌশলে সেখানে প্রবেশ করেন। পরে ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস Universal City প্রতিষ্ঠা করেন।
Select Picture Corporation ও Selznick Pictures প্রতিষ্ঠান দুটি গড়ে উঠে Lewis J. Selznick-এর একক নেতৃত্বে, যিনি ছিলেন একজন রাশিয়ান ইহুদি। একসময় তিনি World Film Corporation-এর সহকারী পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন।
এরা ছাড়াও ইহুদিদের আরও অনেক সদস্য রয়েছে, যারা সরঞ্জামাদি প্রস্তুত, অভিনেতা বাছাই, শুটিং স্থান নির্ধারণ, সিনেমা হল তৈরি, বিজ্ঞাপনের প্রচার, বাজারে টিকেটের চাহিদা বৃদ্ধি করাসহ এ জাতীয় বিভিন্ন কাজ করত।
আমাদের চারপাশে আজ অনেকের দেখা মিলবে, যাদের নিকট চলচ্চিত্রই একমাত্র বিনোদন মাধ্যম। অনেকে আছে, যাদের দিনে একবার হলেও সিনেমা হলে যেতে হয়। আবার কেউ কেউ আছে, যাদের দুপুর ও রাতে দুইবার যেতে হয়। এখন তো প্রায় সিনেমা হলগুলোই দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। অনেকে তো দিনের ৩/৪ ঘণ্টা সময় শুধু এসব দেখেই কাটিয়ে দেয়। মূলত আমাদের মস্তিষ্কে নাটক-সিনেমার প্রতি এক অদম্য ক্ষুধার জন্ম নিয়েছে। বাজারে এসবের চাহিদা এতটা বেড়েছে—
এতগুলো প্রতিষ্ঠান মিলেও এই চাহিদার জোগান দিতে সক্ষম হচ্ছে না। তাই মানুষ একই নাটক-চলচ্চিত্র বারবার দেখে সময় কাটাচ্ছে। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, ভালো জিনিস প্রতিদিন তৈরি করা যায় না। তাই আজ যেসব চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে, তার মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটা হয়তো ভালো, আর বাদবাকি সব বস্তাপঁচা জিনিস। মানুষ কষ্ট করে যে অর্থ উপার্জন করে, তা নোংরামিতে ভরা চলচ্চিত্র দেখে নষ্ট করে।
চলচ্চিত্রে ইহুদি চরিত্রগুলো তখনই আনা হয়, যখন তা তাদের জন্য মঙ্গলকর হয়।
১৯১১ সালে Triangle Shirtwaist Factory-তে আগুন ধরে প্রায় ১৫০ জন পোশাককর্মী মারা যায়, যাদের বেশিরভাগই ছিল নারী। এই গল্পের ওপর ভিত্তি করে নিউইয়র্ক মেয়র একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দেন; যার নাম হবে 'The Locked Door'। গল্প লেখার দায়িত্ব পেলেন একজন ইহুদি, যিনি বিভিন্ন Holocausts-এর ওপর আগেও অনেক গল্প লিখেছেন। দুর্ঘটনায় যে নারীরা মারা যায়, তাদের চরিত্রে তিনি ইহুদি মেয়েদের চরিত্র ঢুকিয়ে দেন, যাদের নামমাত্র মূল্যে পোশাক শিল্পের মালিকরা খাটিয়ে মারছে। আগুন লাগার পর তারা বেরিয়ে আসার কোনো পথ পায়নি। কারণ, প্রধান ফটক বন্ধ ছিল। ঠিক এ রকম সুবিধাজনক জায়গাগুলোতে তারা নিজেদের চরিত্র প্রবেশ করায়। আর যখন রাবাইদের ভূমিকা আসে, তখন পূর্ণ ধর্মীয় সম্মানের সঙ্গে তাদের উপস্থাপন করা হয়।
চলচ্চিত্র শিল্পে খ্রিষ্টান ধর্মকে কতটা নোংরা করা হয়েছে, তা বিগত অধ্যায়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। শুধু যিশুকে ব্যঙ্গ করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি; ধর্মীয় গুরু ফাদার ও পোপদের নিয়েও অনেক নোংরা চরিত্রের জন্ম দিয়েছে। খুনি, সন্ত্রাসী, পর্নগ্রাফি, ড্রাগ ব্যবসায় ইত্যাদি প্রতিটি চরিত্রে তাদের উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে ইহুদিদের দুটি লাভ হয়েছে:
এক. খ্রিষ্টানদের ধর্মভক্তি হ্রাস পেয়েছে।
দুই. পকেটে মুনাফার অঙ্ক ভারী হয়েছে।
আজ অনেককে বলতে শোনা যায়— 'ধর্ম বলতে কিছু নেই, এটা মানুষের সৃষ্টি। যারা নিজেদের ধার্মিক বা ধর্মীয় গুরু বলে দাবি করে, তারা আসলে ধর্ম বিক্রি করে অর্থ উপার্জনের রাস্তা করছে।' মূলত এই নাস্তিকতার প্রসার ইহুদিদের হাত ধরেই হয়েছে।
সবকিছু যে ইহুদিদের দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের অংশ, তা কি বুঝতে কষ্ট হচ্ছে? এই শিল্পে এখন একটি বিষয় নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। অনেক খ্রিষ্টান লেখক ইহুদিদের জন্য গল্প লিখছে। অথচ তারাই একসময় ইহুদিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। আর আজ তারা হলোকাস্ট ও পৌরাণিক কাহিনিগুলো নিয়ে একের পর এক গল্প লিখে যাচ্ছে। বুঝতেই পারছেন, মানুষকে ইহুদিতন্ত্রে ধাবিত করতে তারা কতটা সফল হয়েছে।
(শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গত ৭০ বছরে শুধু হলোকাস্টের ওপর হলিউডে ২৩০টিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যেন মানুষের মনে ইহুদিদের প্রতি সহানুভূতি তৈরি করা যায়।)
আজ কে স্টার হবে, তা প্রডিউসার ও পরিচালকদের ওপর নির্ভর করে। যদি কোনো অভিনেতা তাদের গল্পে অভিনয় করতে রাজি না হয়, তাহলে সে সেখানেই বাদ পড়ে। তাই অনেক অভিনেতাকে আজ বিভিন্ন নোংরা পথ পাড়ি দিয়ে স্টারের খেতাব অর্জন করতে হচ্ছে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতেও অনেকে স্টার হচ্ছেন। যেমন: সিনেমা পরিচালক ও প্রডিউসারের ছেলেমেয়ে ও আত্মীয়স্বজন।
আরেকটি বিষয় খেয়াল করার মতো। সবাইকে কিন্তু একই শ্রেণির স্টার বানানো হয় না। কাউকে প্রথম শ্রেণির, কাউকে দ্বিতীয় শ্রেণির, কাউকে তৃতীয় শ্রেণির। বাদবাকিরা থাকে পার্শ্ব চরিত্রে। এর ফলে কী হয়? প্রতি শ্রেণির স্টারের জন্য নির্দিষ্ট একটি পারিশ্রমিক বরাদ্দ করা হয়। দ্বিতীয় শ্রেণির কোনো স্টার চাইলেও প্রথম শ্রেণির মতো পারিশ্রমিক দাবি করতে পারবে না। আর পার্শ্ব চরিত্রের অভিনেতারা তো পরিচালক ও প্রডিউসারদের দয়া-মায়ার ওপর নির্ভর করে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন— প্রত্যেক অভিনেতাই নিজস্ব অবস্থান থেকে যথেষ্ট ভালো অভিনয় করছে। তারপরও সবাই একই শ্রেণির স্টার হতে পারছে না। মূলত এই বিভাজন আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প তৈরি করেছে। নাটক- চলচ্চিত্রের চাহিদা বাজারে যত বাড়বে, স্টারদের এমন বিভাজন ততই বাড়বে।
সংগীতশিল্প ধ্বংসে ইহুদিদের পরিকল্পনা
New York Times প্রতিষ্ঠানটির মালিক আমেরিকার একজন প্রতাপশালী ইহুদি। তবুও ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি কলাম প্রকাশ করে, যার ফলে তাদের অ্যান্টি-সেমেটিক বলে অভিযুক্ত করা হয়। কলামটির কিছু অংশ উপস্থাপন করা হলো: 'Irving Berling ও Leo Feist-সহ আরও কিছু উচ্চপদস্থ ব্যক্তি সাতটি সংগীত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমেরিকার প্রায় ৮০ ভাগ কপিরাইটযুক্ত সংগীত নকল করে বাজারে পরিবেশন করছে। একই সঙ্গে তা পর্ন চলচ্চিত্রের আবহ সংগীত (Background Music) হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। টেক্সাস প্রদেশের Federal District Court-এ এ নিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পিয়ানো থেকে শুরু করে জনপ্রিয় অনেক বাদ্যযন্ত্রের সুর তারা যথেচ্ছা নকল করে যাচ্ছে। দেখা যায়— দুই-তিনটি সংগীতের সুর একত্রিত করে তারা একটি নতুন সুর তৈরি করছে।
অভিযুক্ত সংগীত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো : Consolidated Music Corporation, 144 West Thirty-seventh street, Irving Berlin Inc, 1567 Broadway; Leo Feist Inc, 231 West Fortieth Street, T. B. Harms, Francis, Day and Hunter Inc, 62 West Forty-fifth street, Shapiro, Bernstein & Company, 218 West Forty-seventh street, Watterson, Berlin & Synder Inc, 1571 Broadway and M. Witmark & Sons Inc, 144 West Thirty-seventh street.
এই প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত Consolidated Music Corporation-এর মাধ্যমে সংঘবদ্ধ হয়ে নিজেদের পরিচালনা করছে।'
১৮৮০-এর দশকে ইউরোপ-আমেরিকার সংগীত শিল্পে বড়ো ধরনের এক বিপ্লব ঘটে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই শিল্পে অনেক ভারী ভারী বাদ্যযন্ত্রের আগমন ঘটতে দেখা যায়। জন্ম নেয় জনপ্রিয় অনেক সংগীত রীতি। যেমন : Monkey Talk, Jungle Sequals, Grunts & Squaks, Gasps ইত্যাদি। এই সময় বিভিন্ন ব্যান্ড হাউজগুলোর মাঝে কাঁদা ছোড়াছুড়ির ঘটনাও শুরু হয়। হঠাৎ আবির্ভূত হওয়া একটি শক্তির দাপটে বাজারের জনপ্রিয় অনেক ব্যান্ড দল তাসের ঘরের ন্যায় ভেঙে পড়তে থাকে। দিশেহারা হয়ে পড়ে সেই হাউসগুলোতে কর্মরত বাদক, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীরা। সুযোগ বুঝে সেই দাপুটে শক্তিটি অর্থের জোরে তাদের নিজেদের দলে ভিড়িয়ে নেয়। তাদের মেধাকে ব্যবহার করে তৈরি করে নতুন সব অর্কেস্ট্রা এবং সংগীত রীতি, যা আজ অবধি বাজারে টিকে আছে। বর্তমান এই শিল্পে যে ধাতবযন্ত্রকেন্দ্রিক নির্ভরতা, তা তাদের হাত ধরেই হয়েছে। এ ছাড়া জ্যাজ সংগীতের পুরোটাই ইহুদিদের আবিষ্কার।
ওপরে যে সাতটি প্রতিষ্ঠানের নাম বলা হয়েছে, তারা একাই আমেরিকার ৮০ ভাগ সংগীতশিল্প নিয়ন্ত্রণ করছে। বাকি যে ২০ ভাগ রয়েছে— তাও ইহুদিদের ছোটোখাটো প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে। অবাক না হয়ে পারা যায় না— যেদিকে তাকাই, সেদিকেই ইহুদিদের সংগীত দল! অথচ তারা আদৌ সংগীতের ব্যাকরণ বুঝে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তথাপি এটাও যে অর্থ উপার্জনের খনি হতে পারে, তা ইহুদিরা আগেই আঁচ করতে পেরেছিল।
হঠাৎ এই অশুভ শক্তিটির আগমন বুঝতে পেরে তৎকালীন সংগীত বিশেষজ্ঞগণ যেসব আশঙ্কা বাণী ব্যক্ত করেছিলেন, তা New York Times-এর সেই কলামটিতে ছাপানো হয়। যেমন :
'পশ্চিমা সংগীতশিল্প ইহুদিদের সংক্রমণে যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আমেরিকার অবস্থা তারচেয়েও খতরনাক। আজ যদি তাদের এই শিল্প থেকে নিষিদ্ধ করা হয়, তবে পুরো সংগীতশিল্পকেই বন্ধ করে দিতে হবে। এই শিল্প যেন নীরস-নিস্তেজ হয়ে পড়বে। তাদের ছলনাময়ী সংগীত সুগভীর দক্ষতায় আমাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। প্রথমত, তাদের কিছু সারেগামা আছে, যা মানুষের মনে ত্বরিত আনন্দ তৈরি করে; যদিও তা ক্ষণস্থায়ী। এ ক্ষেত্রে তারা উচ্চ ধাতব সুর (High Metalic Music) ব্যবহার করে। দ্বিতীয়ত, তাদের সংগীতের আরেক শ্রেণি চিকন ও আবেগি সুরের মাধ্যমে হতাশাগ্রস্ত মানুষদের সাময়িক আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করে। এটা মনে নেশাগ্রস্তের ন্যায় আবহ তৈরি করে। তৃতীয়ত, আবেগপ্রবণ (Romantic) ও কল্পনাপ্রেমী মানুষদের জন্য তাদের আরেকটা শ্রেণি রয়েছে। তারা দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের হিব্রু শিল্পকে ফুটিয়ে তুলেছে এবং তা যুবসমাজের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
আজকের সংগীতশিল্পকে যারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তারা মূলত ইউরোপিয়ান ইহুদি। আজকের তরুণ প্রজন্ম প্রকৃতপক্ষে তাই গাচ্ছে, যা তারা শিখিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের বড়ো বড়ো ব্যান্ড হাউসগুলো ছাড়াও সংগীত পরিবেশনকারী কোম্পানিগুলোও তাদের আজ্ঞাধীন হয়েছে। যখনই কোনো প্রতিভাবান শিল্পীর আবির্ভাব হয়, তখন তাদের অর্থের জোড়ে কিনে নেওয়া হয়। তা ছাড়া বাজারে সংগীতের প্রতিটি বিপণিবিতানেও ইহুদিদের আধিপত্যের কমতি নেই। শহরের বিভিন্ন অলিতে-গলিতে, এমনকী পাড়া-মহল্লার আশেপাশে গড়ে উঠা বিপণিবিতানগুলোতেও তাদের এজেন্টরা বসে আছে। অথচ তাদের অধিকাংশই জ্যান্টাইল এজেন্ট! তারা কেবল সেসব সংগীতের অ্যালবাম বিক্রি করে, যার অর্ডার ইহুদিদের কাছ থেকে আসে। ফলে প্রতিভাবান কোনো খ্রিষ্টান চাইলেও তার সংগীত সাধারণ মানুষের কাছে পৌছাতে পারবে না। কারণ, তার পেছনে কোনো পৃষ্ঠপোষক নেই। ফলে তাকে বাধ্য হয়ে সেই অপশক্তির নিকট ধরনা দিতে হচ্ছে। যেমন: তাদের অন্যতম একটি প্রতাপশালী প্রতিষ্ঠান হলো Tin Pan Alley, যা আজ অবধি বাজারে টিকে আছে।'
একটি বিষয় বলে রাখা উচিত, ইহুদিরা সহজে নতুন কোনো গান বা সুর তৈরি করে না; আসলে তাদের সেই ক্ষমতাও নেই। তারা অন্য গানের সুর চুরি করে নতুন সুর করে এবং তা দিয়ে নতুন গান তৈরি করে। পুরাতন গানের বই, সারেগাম নোট, অপেরা স্বরলিপি, পল্লিগীতি ইত্যাদি সব খুঁজে খুঁজে তারা নিজেদের কাছে জমা করে। এসব মৌলিক সংগীতকে নিজেদের ধাতব যন্ত্রের (Metalic Instrument) নিচে রেখে বহুমাত্রিক সুর তৈরি করে। এভাবে তারা সংগীতজগতে নিজেদের আবির্ভাব ঘটিয়েছে। বর্তমান যুগে আপনারা যেসব গান শুনছেন, তার অধিকাংশই শেষ প্রজন্ম বা তার আগের প্রজন্মের গেয়ে যাওয়া গানের বিকৃত রূপ। এই চৌর্যবৃত্তির ওপর প্রশ্ন করা হলে তারা বলে— 'আমরা তো চুরি করছি না, কেবল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংগীতে পরিবর্তন আনছি।'
সাধারণত জ্যান্টাইলদের সংগীতানুষ্ঠানগুলোতে কেবল সম্পদশালীরাই যাওয়ার সুযোগ পায়। কারণ, জ্যান্টাইলরা যা তৈরি করে তা নিখাদ মৌলিক সংগীত। এ জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। তাই তাদের প্রতিটি অনুষ্ঠানের টিকেটের মূল্যও অনেক বেশি হয়।
১৮৮০ সালের একটি ঘটনা। জ্যান্টাইলদের একটি সংগীত ধনী-গরিব সবার মাঝে প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়, কিন্তু ধনীরা সেই সংগীত শুনতে পেলেও ব্যয়বহুল হওয়ায় গরিবরা তা থেকে বঞ্চিত হয়। ইহুদিরা এই সুযোগটিই লুফে নেয়। তারা পরিকল্পনা করল প্রতিটি গান নকল করার। কিন্তু গানগুলোর সারেগাম এতটাই কঠিন ছিল, তারা তা ভাঙতেই পারল না। ফলে নতুন আরেকটি পরিকল্পনা আটল; সুর একই থাকবে, সাথে নতুন গীতিকবিতা জুড়ে দেওয়া হবে এবং জ্যাজ ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে মূল সুরের মাঝে সামান্য বৈচিত্র্য আনা হবে।
মজার বিষয় হচ্ছে— তারা এখানেও চরমভাবে পরাজিত হলো, এমনকী নিজেদের হাসির পাত্র বানিয়ে ছাড়ল। মানুষকে ধোঁকা দিতে তারা ইংরেজি বাক্যের পরিবর্তে ইডিশ বাক্য ব্যবহার করল। তাই তাদের শিল্পীরা কী উচ্চারণ করছিল, তার একটা শব্দও সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেনি। শুধু নাক টেনে সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুরো সময়টা পার করে দেয়। প্রথমে একক সংগীত পরে যৌথ সংগীত; প্রতিটি গানেই ছিল একই সুর। দর্শক-শ্রোতারা এই রম্য অভিনয় দেখে হাসতে হাসতে ভেঙে পড়েছিল।
এরূপ পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ১৮৮৫ সালে Tin Pan Alley নিউইয়র্ক শহরে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। তারা ভালো কণ্ঠশিল্পী, লেখক ও প্রতিভাবান সুরকারের সমন্বয়ে একটি পরিপূর্ণ দল গঠন করে। অবুঝ শিল্পীরা ভেবেছিল— নামকরা এই সংগীত প্রতিষ্ঠানটি হয়তো বাজারে তাদের প্রতিষ্ঠিত হতে পৃষ্ঠপোষকতা করে যাবে। কিন্তু তাদের যে কেবল ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই এই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা অনেক পরে বুঝতে পারে। শুরু হয় মৌলিক সংগীত রচনা এবং বাজারের বিখ্যাত সব সংগীতের সারেগাম উদ্ধারের মিশন।
এই উদ্যোগের পেছনে প্রথমে যার নাম আসে, তিনি হলেন Julius Witmark। তার হাতে সংগীতশিল্প প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকতার ছোঁয়া পায়। তার সংগীত প্রতিষ্ঠানের নাম M. Witmark & Sons, যা ১৮৮৬ সালে নিউইয়র্ক শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে তিনি ছিলেন একজন ব্যালাড (Bllad/লোকসংগীত শিল্পী)।
এরপর আসে Irving Berlin-এর নাম। তার প্রকৃত নাম Isadore Baline। পেশা ছিল গান লেখা ও সুর করা। ১৮৯৫-১৯১৮ সাল পর্যন্ত সংগীত শিল্পের ইতিহাসে 'Rag-time' বলা হয়। এই সময়টিতে জ্যাজ সংগীত পুরো আমেরিকায় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ওঠে। Irving Berlin ছিলেন এই সংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ। তার বিশেষ একটি কৃতি হলো— ১৯১১ সালে পরিবেশিত 'Alexander's Rag-Time Band' গানটি। এর জনপ্রিয়তা আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। এই একটি গানই তাকে রাতারাতি অগাথ সম্পদের মালিক বানিয়ে দেয়। এই সংগীতের পেছনে Joe Frisco-এর অবদান নেহায়েত কম নয়। তাকে সে সময় বলা হতো জ্যাজ সংগীতের স্বঘোষিত বাদশাহ।
কিন্তু আপনি যদি তার জনপ্রিয় অ্যালবাম 'Berlin Big Hits'-এর গানগুলোর ওপর গবেষণা করেন, তবে দেখবেন— প্রতিটি গানের সুরই জোড়া-তালি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। আরও ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে— প্রতিটি গানে ব্যবহার করা হয়েছে অকথ্য অশ্লীল শব্দ। অনেকের মনে হবে এই গানগুলো যেন পর্ন ছবির ধারা বিবরণী। এমন কয়েকেটি গান হলো: 'Harem Life'; 'You Cannot Make Your Shimmy Shake on Tea'; 'I Like it' এবং 'Mary Green, seventeen'।
খুব ভালো হতো, যদি পুরো একটি গান এখানে তুলে ধরা সম্ভব হতো। কিন্তু অকথ্য ভাষা দিয়ে এই বইটি নোংরা না করাই ভালো। গানগুলো শুনে অনেকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছে, ইনি কি সেই মাতা মেরি, যিনি যিশুকে গর্ভে ধারণ করেছিলনে!
সংগীত শিল্পে তাদের দ্রুত সফলতা অর্জনের আরেকটি বড়ো কারণ রয়েছে। তাদের অশালীন ও অকথ্য গানগুলো সহজেই তরুণ সমাজের মাঝে জায়গা করে নিয়েছে। তারা মুখে যা উচ্চারণ করছে, তার অর্থ হয়তো নিজেরাও জানে না। তারা গানের কথার চেয়ে সুরের প্রতি অধিক আগ্রহী। তাই জনপ্রিয় সব মৌলিক সংগীতের সুরগুলো ব্যবহার করে একাধিক সংগীত তৈরি করে যাচ্ছে। এটা ঠিক যে, তাদের তৈরি করা নতুন গানগুলোর সুর-তাল-লয়ের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়, তবে সুরের ছন্দ ও কাঠামো একই থাকে।
বিভিন্ন শ্রোতার চাহিদার ধরন অনুযায়ী তারা সংগীত বাজারকে কয়েক শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে। প্রথম শ্রেণিতে থাকছে তরুণ শ্রোতা এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে বয়স্ক শ্রোতা। এর মধ্যে রয়েছে আরও অনেক বিভাজন। যেমন: কেউ উচ্চ ধাতব গান পছন্দ করে, কেউ চিকন সুরের গান পছন্দ করে, কেউ-বা মাঝারি সুরের গান পছন্দ করে। এবার তারা কোনো একটি মৌলিক গানের ছন্দ ঠিক রেখে সুর-তাল-লয়-এর মধ্যে পার্থক্য এনে প্রতিটি শ্রেণির জন্য আলাদা আলাদা গান ও সুর তৈরি করে। এভাবেই ছোট্ট একটি কৌশল ব্যবহার করে এবং খুব অল্প পরিশ্রমে তারা একাধিক গান তৈরি করে চলেছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রকৃত শিল্পীরা কখনো পেরে উঠছে না। কারণ, তারা চৌর্যবৃত্তিতে অভ্যস্ত নয়।
মানুষ এখন মৌলিক সংগীত নিয়ে একেবারেই গবেষণা করে না। ফলে এই শিল্পে বিশেষজ্ঞ না হলে কারও পক্ষে ইহুদিদের চৌর্যকর্ম উদ্ধার করা সম্ভব নয়। আর যারা সাধারণ শ্রোতা, তাদের পক্ষে তো কখনোই নয়। এবার কিছু বিখ্যাত গানের নাম জানিয়ে রাখছি, যা চাইলে যাচাই করে দেখতে পারেন: I'll Say She Does; You Cannot Shake That Shimmy Here; Sugar Baby; In Room 202; Can You Tame Wild Wimmen? চাইলে আরও অনেক গানের নাম এই তালিকায় আনা সম্ভব।
সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক সম্প্রদায়, অভিভাবক শ্রেণি ও সুশীলসমাজ আজ একটি বিষয় ভেবে খুবই বিচলিত, কী এমন নেশা যুবসমাজকে পেয়ে বসেছে যে, তাদের একদল সারাক্ষণ কেবল হতাশার গান শুনতেই পছন্দ করে? আরেক দল তো অশ্লীল ভাষার মধ্যেই ডুবে আছে!
যখন আমাদের সন্তানদের ড্রাগের নেশা পেয়ে বসেছিল, তখন কিন্তু শাসন করেও লাভ হয়নি। কারণ, ড্রাগ নিজ দায়িত্বে তাদের হাতে এসে হাজির। যতদিন না মূল উৎসে আঘাত হানা সম্ভব, ততদিন এই অপশক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। ড্রাগের মতো সংগীতশিল্পও এখন আমাদের যুবসমাজকে পেয়ে বসেছে। আজ যেকোনো সামাজিক পালা-পার্বন বা অনুষ্ঠানে এই গানগুলো উচ্চ শব্দে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর ফলাফলও আমরা অনুধাবণ করতে পারছি। এসব গান কখনো আমাদের মনে চিরস্থায়ী আনন্দের জোগান দিতে পারে না; বরং আমাদের থেকে অধ্যাত্মিকতা নামক বিষয়টি ধ্বংসের মাধ্যমে কামুক করে তুলছে।
ইডিশদের খেলায় চিরস্থায়ী বলতে কিছু নেই। আপনি যেকোনো একটি পিয়ানো ক্লাবে যান, তাদের জিজ্ঞেস করুন তিন সপ্তাহ আগে কোন গানটি জনপ্রিয় ছিল? দেখবেন সে বলতে পারছে না। কারণ, সব সংগীতের ছন্দ তো একই রকম। কোনটা বাদ দিয়ে সে কোনটার নাম বলবে? শুধু যে সংগীত শিল্পের বেলায় এমনটা ঘটছে তা নয়; থিয়েটার, চলচ্চিত্র, পোশাক-আশাক, খাদ্য, রুচি, ফ্যাশন ইত্যাদি সবকিছুতে একই রূপ। এত কিছুর পরও আমরা মাঝে মাঝে ভালো জিনিস পাচ্ছি। হয়তো কোনো নির্মাতা তার সর্বস্ব উজাড় করে, মুনাফার প্রতি মায়া না করে কেবল নিজেরে শখ মেটাতে নান্দনিকতার জন্ম দিচ্ছে!
জাতিগতভাবে আজ আমরা এতটা বিভক্ত হয়ে পড়েছি যে, চাইলেও এই শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখতে পারব না। এর কারণ আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এমতাবস্থায় ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগ ব্যতীত এই অপসংস্কৃতি থেকে নিজেদের মুক্ত রাখার ভিন্ন কোনো উপায় নেই।
সংগীত শিল্পে অশ্লীলতা সংযোজনের ইতিহাস
সংগীত চর্চা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। আমাদের পূর্বপুরুষদের যুগেও এই শিল্পের চর্চা ছিল এবং সেখানেও আবেগ, বিরহ, ভালোবাসা ও দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ছিল। সে যুগেও তরুণরা চলার পথে গুণগুণ করে গান গাইত, কিন্তু তখনকার গানের লিপি আর আজকের গানের লিপির মধ্যে রয়েছে অনেক ফাঁরাক। সত্যি বলতে, এটাকে জনপ্রিয় শিল্পরূপে জ্যান্টাইলরাই প্রতিষ্ঠা করেছে। আর ইহুদিরা এই শিল্পকে নোংরা-আবর্জনা দিয়ে ভর্তি করছে। প্রেমের গান এখন আর ভালোবাসার জন্ম দেয় না; জন্ম দেয় কাম-উদ্দীপনার।
তরুণ সমাজ হয়তো বলবে— 'বর্তমানে আমরা যেসব জনপ্রিয় গান শুনছি, তার মধ্যে খারাপের তো কিছু দেখছি না। এসব শুনে তো আমাদের ভালোই লাগে!' তাদের উদ্দেশ্যে বলা প্রয়োজন, পছন্দ-অপছন্দ কিন্তু মানুষের অভ্যাসের একটি অংশ। এই অভ্যাস যে দুই-এক বছরে তৈরি হয়েছে, তা নয়। আগের অধ্যায়ে 'Rag-time' নিয়ে সামান্য আলোচনা করা হয়েছে। এটা এমনই একটি সময়কাল, যখন সংগীত শিল্পে খুব পরিকল্পিত উপায়ে নোংরা আবর্জনার আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে। সেই ইতিহাস তরুণসমাজ মোটেও জানে না। যে প্রজন্মগুলো এই বিপ্লবপরবর্তী সময়কালে বড়ো হয়েছে, তারা এসব সংগীত শুনেই বড়ো হয়েছে। তারা কী করে বুঝবে কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ!
১৮৮০ সালের পূর্বেও এই নোংরা সংগীত সংস্কৃতির চর্চা ছিল, তবে তা একটি ভৌগলিক সীমারেখায় আবদ্ধ ছিল। সমাজ থেকে বহুদূরে নির্দিষ্ট কোনো বায়েজিখানায় এসব নোংরা গানের চর্চা হতো। মুক্ত উদ্যানে বা জনসম্মুখে এসব গান পরিবেশনের কথা কল্পনাও করা যেত না। কিন্তু ১৮৮০ সালের পর হঠাৎ এক বিবর্তন এসে আমাদের পুরো সভ্য সংস্কৃতিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।
পুরোনো গানের কথা কখনো ভোলা সম্ভব নয়। সেসব গান বহু যুগ পরেও অমর হয়ে থাকে। কিন্তু বাজারে আজকে যা জনপ্রিয় গান, তার কথা এক-দুই মাস পর কেউ মনে রাখবে কি না সন্দেহ। আপনাদের হয়তো 'Listen to the Mocking Bird' গানটির কথা মনে আছে। বহু বছর পরও তা আমাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। তবে যে পাখির কথা এখানে বলা হয়েছে, তা এখন হাঁস-মুরগির গানে পরিণত হয়েছে।
আরও আছে Ben Bolt, Nellie Grey, Juanita, The Old Folks at Home, The Hazel Dell, When You and I were Young, Maggie, Silver Threads Among the Gold। এগুলো আমাদের যুগের বিখ্যাত কিছু আবেদনময়ী গান। আজকের তরুণ সমাজ যারা এই অধ্যায়টি পাঠ করছে, তাদের উচিত নিজ উদ্দ্যোগে এই গানগুলো শোনার চেষ্টা করা। তারপর এগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন, বর্তমানে আপনারা কী ধরনের গানের চর্চা করছেন।
এমন আরও কিছু গান হলো— Annie Rooney, Down Went McGinty to the Bottom of the Sea, She's Only a Bird in a Gilded Cage, After the Ball is over। এদের মধ্যে নোংরামির কোনো ছায়া নেই।
মনোবিজ্ঞানীরা বলে, হতাশা ও বিরহের গান কিছুটা হলেও মানুষের মনে অলসতার জন্ম দেয়। তথাপি, My Wild Irish Rose ও In the Baggage Coach Ahead বিরহের গান দুটিতে এমন কিছু খুঁজে পাবেন না, যা আপনাকে খারাপের দিকে উসকে দেবে।
Jim Thornton-এর বিখ্যাত কিছু গান হলো— In the Shade of the Old Apple Tree, When the Sunset Turns the Ocean's Blue to Gold, Down by the Old Mill Stream, My Sweetheart's the Man in the Moon। আরও আছে Paul Dresser-এর বিখ্যাত গান, On the Banks of the Wabash এবং Charles Lawlor-এর বিখ্যাত গান, The Sidewalks of New York। এগুলো হলো সংগীত ইতিহাসের সম্পদ।
একসময় এ দেশে পাশ্চাত্য ও ভারতীয় সংগীতেরও ভালো চর্চা ছিল। যেমন : Cheyenne, Hop on My Pony; Arawanna; Trail of the Lonesome Pine।
এরপর আসে আফ্রিকান সংগীত; যা আমাদের সমাজে সাপ হয়ে ঢুকে সর্বস্তরে বিষ পৌঁছে দেয়। এমন কিছু গান হলো— Congo; High Up in the Coconut Tree এবং Under the Bamboo Tree।
আফ্রিকান সংগীতের কাল থেকেই 'Rag-time'-এর আবির্ভাব। সংগীতশিল্প পরিবেশনে সংযোজন ঘটে 'Cake Walk' সংস্কৃতির (একটি নৃত্য দল, যেখানে মূলত নারীদের উপস্থিতি থাকে)। এমন একটি গানের উদাহরণ হচ্ছে— There'll Be a Hot Time in the Old Town Tonight। গানের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে আবির্ভাব ঘটে একটি নতুন শব্দের 'ma baby'। সবার কানে বাজতে শুরু করে 'ma baby'। অপ্রয়োজনীয় ও অকথ্য বিষয়বস্তু দ্বারা গানের বাক্যগুলো শুরু হয়।
এরপর এসেছে 'Vamp Music'-এর যুগ। হাজারো নির্বোধ মেয়ে তাদের সৌন্দর্য বিকিয়ে দিতে মডেলিং পেশায় অংশগ্রহণ শুরু করে। Vamp সংস্কৃতির প্রথম আবির্ভাব হয় একটি ফরাসি উপন্যাসে, যা পরে নিষিদ্ধ করা হয়। সেখানে থিয়েটার প্রডিউসার Morris Gest গ্রিকদের প্রেমের দেবী 'Aphrodite'-কে নগ্নরূপে উপস্থাপন করে। ইহুদিরা যেভাবে তাদের সংগীত শিল্পে হেরেমবাসিনী মেয়েদের কাল্পনিক চরিত্র উপস্থান করেছে, তা Vamp-এর সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে গেছে। এই কাজে তারা আমেরিকার সাদা চামড়ার কম বয়সি মেয়েদের যথেচ্ছা ব্যবহার করতে কুণ্ঠিত হতো না। দর্শকদের মনে ঢুকিয়ে দিয়েছে— হেরেমবাসী মেয়েদের প্রকৃত চরিত্র হয়তো তা-ই, যা তারা উপস্থান করেছে।
এত সব অধঃপতনের পরও আমরা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারছি না। কারণ, Anti-Defamation League। এই প্রতিষ্ঠানটি থিয়েটার, চলচ্চিত্র, ক্রীড়া, শিক্ষা, নেশাজ দ্রব্য ইত্যাদি প্রতিটি কাজেই ইহুদিদের অভিভাবক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। তারা খুব ভালো করেই জানে, কোন পথে আমাদের আটকাতে হবে। কোথাকার আগুন পরে কোথায় গিয়ে লাগে— এই ভয়ে জ্যান্টাইলরা প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।
সংগীত ও চলচ্চিত্র শিল্পে ইহুদিদের আবির্ভাবের মধ্যে যথেষ্ট মিল আছে। তাদের বিরুদ্ধে পূর্ব থেকেই জ্যান্টাইলদের বিরূপ ধারণা ছিল, তাই ইহুদি সংগীতশিল্পী বা তাদের কোনো অনুষ্ঠানের নাম শুনলে তারা উলটো দিকে পথ ধরত। তাদের থেকে দূরত্বের সর্বাত্মক মাপকাঠি বজায় রাখত, কিন্তু এখানেও তারা ধরা খায়। কারণ, ইহুদিদের রয়েছে 'ছদ্মনাম' কৌশল। এই একই কৌশলে তারা চলচ্চিত্র, থিয়েটার, শেয়ারবাজার ও ক্রীড়াশিল্পকেও নিজেদের করে নিতে থাকে। তারা বিভিন্ন ছদ্মনামে নিজেদের ব্যান্ডগুলোকে আমাদের মাঝে পরিচিত করা শুরু করে। যেমন: Geological Society এবং Scientific Society |
অমর শিল্প তৈরি করলে তো দ্রুত অর্থ উপার্জন সম্ভব নয়। তাই তাদের অমরত্বের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন প্রচুর গান, যা থেকে কাঁচা পয়সা উপার্জন করা সম্ভব। 'Rocked in the Cradle of the Deep'-এর সাথে I'm Always Chasing Rainbows গানটিকে মিলিয়ে দেখুন। এই দুটির গানের মিল বোঝার জন্য অন্তত সংগীত বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। এমন নয়, 'Rocked in the Cradle of the Deep' নকল করে দ্বিতীয় গানটি তৈরি করা হয়েছে। মূলত দুটো গানই নকল হয়েছে 'Opus of Chopin' থেকে। এটা নিয়ে আদালতে দীর্ঘদিন মামলা হয়েছিল, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এরপর থেকে তারা গান চুরি করার অলিখিত বৈধতা পায়। গানের বাক্য যদি হুবহু না মেলে, তাহলে তাকে আর নকল বলা যায় না— এটাই ছিল আদালতের কথা। আর এটাও ঠিক, আইনজীবীরা তো আর সংগীত বিশেষজ্ঞ নয় যে গান চুরি ধরতে পারবে!
এমন নয় যে, বাজারে এসব উগ্র-সংগীতের উপচেপড়া চাহিদা রয়েছে। আপনাদের হয়তো মনে আছে, বইটির একদম শুরুর দিকে উল্লেখ করা হয়েছে—
'বিক্রয় শিল্পে ইহুদিদের মতো দক্ষ জাতি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। বিক্রয় কাজে প্রতিবন্ধকতা তারা কোনোভাবে সহ্য করতে পারে না। একদিক দিয়ে আটকালে তারা নতুন আরেকটি পথ খুঁজে বের করে। বিজ্ঞাপন সংস্কৃতির আবির্ভাবও ইহুদিদেরই হাত ধরেই।'
এটাই সংগীত শিল্পে তাদের সফলতার মূল কারণ। পণ্যের বিক্রয় বৃদ্ধি করতে প্রয়োজনে তারা নোংরা কাজ করতেও প্রস্তুত। এর প্রমাণ হচ্ছে— ইহুদিদের বিজ্ঞাপন হাউসগুলো। তারা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে অশালীন ভঙ্গিমায় নারী মডেলদের উপস্থাপন করছে। তাদের শারীরিক সৌন্দর্যকে পণ্য বানিয়ে বিলবোর্ড, পোস্টার, ফ্লায়ার, ব্রসিউর ও ম্যাগাজিন ছাপাচ্ছে এবং তা সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে। স্বভাবতই সমাজের হাতেগোনা কয়েকজন বুদ্ধিদীপ্ত নীতিবান মানুষ ব্যতীত সবাই এসব বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ছে। তারা যেসব মিউজিক ভিডিও তৈরি করছে, তাতে উঠতি বয়সি অনেক তরুণ-তরুণী অবচেতন মনে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এসব কারণে তারা এই শিল্পে অল্প সময়ে প্রচুর অর্থকড়ি উপার্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এখন যদি অর্থকে সফলতার মাপকাঠি ধরা হয়, তবে বলতে হবে ইহুদিরাই সফল।
তাদের আরও একটি বিশেষণ হলো— নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকা। অনেক পণ্যের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ যা পছন্দ করে, মূলত সেটাকেই জনপ্রিয় পণ্য বলা হয়। কিন্তু এমন যদি হয়— বাজারে কেবল একটি পণ্য রয়েছে এবং সাধারণ মানুষ তা ক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে, তখন আর তাকে জনপ্রিয় পণ্য বলা চলে না। আজকের বাজারে যে গানগুলোকে আমরা জনপ্রিয় সংগীত বলে অভিহিত করছি, তা কেবল মাত্রাতিরিক্ত পুনরাবৃত্তির ফলাফল।
বিদেশি কোনো রাজকীয় অতিথি যখন আমেরিকা ভ্রমণে আসে, তখন তাদের আতিথেয়তায় জ্যাজ সংগীত পরিবেশন করা হয়। Prince of Wales যখন আমেরিকা ভ্রমণে আসেন, তার দেখাশোনার কাজে যে ছেলেটিকে রাখা হয়েছিল, তার নাম Rose। রোজের আমন্ত্রণে তিনি ইডিশ সংগীত নির্মাণ হাউস পরিদর্শনে হাজির হন। Prince of Wales ইডিশ সংগীত শুনে অসম্ভব মুগ্ধ হন; যদিও সেগুলো চুরি করে তৈরি করা ছিল। এরপর থেকে তিনি ইডিশ সংগীতের ভক্ত হয়ে যান।
আশা করি ইতোমধ্যেই উপলব্ধি করতে পারছেন, Charlie Chaplin-এর যে কমেডি চলচ্চিত্রগুলো আমরা দেখি, তার সাথে যে আবহ সংগীত (ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক) জুড়ে দেওয়া হয়, তা সম্পূর্ণ জ্যাজ মিউজিক। কমেডি ছাড়া বিভিন্ন চলচ্চিত্রের থিম সংগীত তৈরিতেও আজ জ্যাজ বাদ্যযন্ত্রসমূহ ব্যবহৃত হচ্ছে। চলচ্চিত্রের কোনো একটি অংশে দেখবেন, পেছন থেকে গান ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং গল্পের নায়ক তার সাথে ঠোঁট নেড়ে নেড়ে গান গাওয়ার অভিনয় করছে। এগুলোও জ্যাজ সংগীত।
মনে করুন, আপনার বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেওয়ার জন্য কোনো একটি রেস্টুরেন্ট বা কফি হাউসে গেলেন। খেয়াল করবেন— পেছন থেকে বাদকদল সংগীত বাজাচ্ছে, এর সাথে চলচ্চিত্রের নায়ক ঠোঁট নেড়ে নেড়ে অভিনয় করছে। আপনি বুঝতেও পারবেন না, কীভাবে এই সংগীতগুলো আপনার অবচেতন মনে জায়গা করে নিচ্ছে। একসময় আপনি নিজেও এই সংগীতগুলো গুনগুন করে গাইতে শুরু করবেন। শপিংমল, কফিশপ, সেলুন, রেস্তোরাঁ ইত্যাদি যেখানেই যান না কেন দেখবেন, একই গান বাজছে কিংবা একই ছন্দের বিভিন্ন গান বাজছে।
ধরুন আপনার ছোট্ট মেয়েকে সাথে নিয়ে কিছু জামা কিনতে গেলেন। বাসায় এসে চেয়ারে আরাম করে বসামাত্র দেখবেন, আপনার মেয়ে শপিংমলে শোনা গানটি বিরবির করে গাচ্ছে। অর্থাৎ আপনি চাইলেও এই উগ্র সংগীতচর্চা এড়িয়ে যেতে পারছেন না।
ইহুদিদের প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির সংগীত রীতিতে বিভক্ত যেমন: Vamps, Harems, Hooch ও Hula Hula। তারা প্রতিটি সংগীত রীতির মধ্যে ইচ্ছা করেই প্রতিযোগিতা বাধিয়ে দিয়েছে, ঠিক যেমনটা মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানগুলো একই প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য ব্রান্ড বাজারে এনে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাধিয়ে দেয়।
এখন কারও যদি Harem শুনতে ভালো না লাগে, তবে তার জন্য রয়েছে Vamp। অর্থাৎ আপনি যা-ই খুঁজুন না কেন, একটি দোকানেই সবকিছু পাবেন। আর বাজারে এই একটি দোকান বাদে আর কোনো দোকানের অস্তিত্ব নেই।
নোংরা গান লিখতে তো আর সৃজনশীলতা লাগে না! তাই হাজার হাজার গান তৈরি করতে ইহুদিদের তেমন পরিশ্রমও করতে হয় না। যদি এমন হয়— তাদের তৈরি করা কোনো গানে অশ্লীলতার আবহ নেই, তবে বুঝবেন সেই গানটি অন্য কোথাও থেকে চুরি করা হয়েছে! তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বছরব্যাপী যে পরিমাণ গান তৈরি করে, তার সিংহভাগ অন্য কোথাও থেকে চুরি করা।
ইহুদিরা পরিকল্পিতভাবে কিছু সমালোচক গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছে। নতুন কোনো ইডিশ সংগীত মুক্তি পেলে তাদের ভাড়া করা সমালোচকদের একপক্ষ সেই গানের পক্ষে সাফাই গায়, অপর পক্ষ বিপক্ষে সাফাই গায়। আর জ্যান্টাইল সমাজ আগ্রহ ভরে বসে থাকে বিতর্কসভার চূড়ান্ত ফলাফল কী হয়, তা জানার জন্য। তারা সেই গানই ক্রয় করতে বাজারে যায়, যার পক্ষ বিতর্কে বিজয়ী হয়েছে। এই যখন অবস্থা, তখন তাদের গর্দভ বলার চেয়ে মস্তিষ্ক-বিকৃত জ্যান্টাইল বলাই শ্রেয়।
এভাবেই Tin Pan Alley প্রতিষ্ঠান আমেরিকার পুরো সংগীত বাজার নিজেদের করে নিয়েছে। আমেরিকার পর তাদের অপসংস্কৃতির আগ্রাসন পৃথিবীর কোন অংশে গিয়ে পড়বে, তা বলা খুবই কঠিন। তবে নিশ্চিত করে বলা যায়, ধীরে ধীরে তা পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে।
ক্রীড়াশিল্পে ইহুদি জুয়াড়িদের দৌরাত্ম্য
প্রথমেই বলে রাখি, খেলাধুলায় ইহুদিদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। ইহুদিদের মধ্য থেকে কেউ ভালো ক্রীড়াবিদ হতে পারেনি। এটা তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নয়। শারীরিক বা স্নায়ুবিক কোনো দুর্বলতার কারণে যে তারা খেলাধুলায় কম আসক্তি অনুভব করে তা নয়। হয়তো এটাও ইহুদি জাতিগত বৈশিষ্ট্য! কলেজ ও বিদ্যালয়গুলোতে ইহুদিদের সন্তানরা কেবল তখনই খেলাধুলায় অংশ নেয়, যখন তাদের নিয়ে কেউ কটু কথা বলে।
তবে শারীরিক খেলাধুলায় পারদর্শী না হলেও ইহুদিরা জুয়া খেলায় যথেষ্ট পারদর্শী। তাদের জুয়াড়িদের নোংরা থাবায় জনপ্রিয় প্রতিটি খেলাই বহুবার কুলষিত হয়েছে। দঙ্গল খেলায় (Wrestling) কিছু পেশিবহুল খেলোয়ারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দেয়। মুষ্টিযুদ্ধের (Boxing) খেলায়ও একই ঘটনা ঘটে। প্রতিবছর ঘোড়াদৌড় খেলার জন্য কেবল প্রশিক্ষণ মাঠেই হাজারো ঘোড়া আহত হয়, পরে অযত্ন-অবহেলায় সেগুলো মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। কেন নিরীহ একটি প্রাণীকে নিয়ে এমন কুৎসিত খেলার আয়োজন করা হলো? কারণ, এতে রয়েছে প্রচুর মুনাফা উপার্জনের সম্ভাবনা। বাস্কেটবলও তাদের নোংরা হাতের স্পর্শ থেকে মুক্তি পায়নি।
১৮৭৫ সালে বেসবল খেলা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ধাক্কা খায়। জুয়া, গুন্ডামি, মাদকসেবন ও অব্যবস্থাপনার কারণে জনগণ কমিটির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। একই অব্যবস্থাপনা ঘটতে দেখা যায় ১৯১৯ ও ১৯২১ সালেও। দর্শকরা মাঠ ছেড়ে বেড়িয়ে এসে টিকেট আগুনে পুরিয়ে দেয়। বিতর্কের সূত্রপাত হয় ১৯১৯ সালে, যখন শিকাগো আমেরিকান ক্লাবের কাছে শিকাগো ন্যাশনালস ক্লাব পরাজিত হয়। গ্যালারিতে রটে যায়, উভয় দলের মধ্যে অর্থের লেনদেন হয়েছে। বেড়িয়ে আসে কিছু পরিচিত ইহুদি ব্যক্তির নাম। তখন বিক্ষুব্ধ দর্শক মাঠ থেকে বেরিয়ে আসে।
১৯২০ সালে শিকাগো বনাম ফিলাডেলফিয়া জাতীয় দলের খেলা শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিন শিকাগো ক্লাবের নিকট এক অদ্ভুত খবর আসে। কিছু পরিচিত ইহুদি জুয়াড়ি ফিলাডেলফিয়া ক্লাবের পেছনে বড়ো অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছে। শিকাগো ক্লাব বিষয়টি দ্রুত ম্যাচ রেফারি Grover C. Alexander-কে জানায়। তিনি খেলা শুরুর আগ মুহূর্তে টুর্নামেন্ট পরিচালনা কমিটিকে পুরো বিষয়টি অভিহিত করেন, কিন্তু তারপরও সেই খেলা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। ফলে জুয়াড়িরা নির্বিঘ্নে উপার্জন করে নেয় নগদ কাঁচা পয়সা।
খেলা শেষে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। অবাক করা বিষয়, তদন্ত রিপোর্টে শিকাগো ক্লাবের আটজন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়! চারদিকে এ নিয়ে প্রচণ্ড আন্দোলন শুরু হয়। ফলে দ্বিতীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং প্রথম কমিটির ফলাফল বাতিল করা হয়। দ্বিতীয় কমিটির অনুসন্ধানে নতুন পাঁচজন অভিযুক্তের নাম উঠে আসে, যাদের সবাই ছিল ইহুদি। তাদের নাম হলো : Carl, Benny, Ben, Louis ও Levi। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হয়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি Replogle বলেন— 'উল্লেখকৃত ব্যক্তিরা ছাড়াও তো আরও অনেক অপরাধী আছে। তাদেরও খুঁজে বের করতে হবে। শুধু এই পাঁচজনকে শাস্তি দিয়ে কিই-বা এমন হবে!' তবে তাদের যেন কোনো প্রকার সাজা দেওয়া না হয়, সে জন্য শিকাগোর বিখ্যাত ইহুদি আইনজীবী Alfred S. Austrian পেছন থেকে কাজ করেন।
Albert D. Lasker হলেন American Jewish Committee-এর অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য। তিনি সেই বিখ্যাত 'Lasker Plan'-এর রচয়িতা, যার মাধ্যমে পুরো বেসবল খেলার নিয়ন্ত্রণ ইহুদিদের হাতে চলে যায়। তবে একটি বিষয় বলে রাখা ভালো— এই পরিকল্পনার প্রকৃত রচয়িতা কিন্তু তিনি ছিলেন না। এর প্রকৃত রচয়িতা ছিলেন Alfred S. Austrian; যিনি Mr. Lasker ও Replogle-এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তিনি Lasker সাহেবকে নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে পরিকল্পনাটি চালিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
১৯২০ সালে শিকাগো বনাম ফিলাডেলফিয়ার পাতানো খেলার মূল কারিগর ছিলেন তিনিই। খেলার রেফারি Hendryx-কে তদন্ত কাজে ডাকা হলে তিনি কী জবানবন্দি দিয়েছেন, তা কখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এরপর আসে Arnold Rothstein-এর নাম। একাধিক ক্যাসিনো ছাড়াও তার ড্রাগ ও নেশাজ দ্রব্যের অবৈধ্য ব্যাবসা ছিল। তিনি নিউইয়র্ক ন্যাশনাল ক্লাবের অন্যতম স্টকহোল্ডার ছিলেন। তাকে বলা হতো একজন 'পিচ্ছিল ইহুদি'। কারণ, তিনি সব সময় হাত ফসকে বেরিয়ে যেতেন। তাকে কেন যে আটকে রাখা যেত না, সেই ব্যাখ্যা কেউ-ই দিতে পারে না।
দ্বিতীয় কমিটির রিপোর্টে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলে— উকিল সাহেব আদালতে তার বিপক্ষে সাক্ষী তলব করে, কিন্তু বিচারালয়ে সেই সাক্ষীকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। শিকাগো বা নিউইয়র্কের কোনো পত্রিকা প্রতিষ্ঠান যেন তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক কিছু না লিখে, সে জন্য তাদের কাছে আগে থেকেই প্রচুর উৎকোচ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। এমন পরিস্থতিতে কেউ যে তার বিরুদ্ধে কলাম প্রকাশ লিখবে না, এটাই স্বাভাবিক। তা ছাড়া এ ঘটনায় Mr. Austrian ছিলেন তার পক্ষের আইনজীবী।
২৮ জুলাই, ১৯২১, Evening Mail-এর সাংবাদিক Hugh S. Fullerton একটি কলামে প্রকাশ করেন—
'খেলার মাঠে দুর্নীতির দায়ে যে একবার অভিযুক্ত হয়েছে, তাকে কেবল একটি থেকে নয়; বরং সব ধরনের খেলা থেকেই বহিষ্কার করা উচিত। কারণ, তাদের নোংরা হাতের ছোঁয়ায় প্রতিটি শিল্পই প্রাণ হারাবে। নিউইয়র্কে Rothstein নামে একজন জুয়াড়ি আছে, যার ভয়ে পুরো শহর আতঙ্কগ্রস্ত। খেলার মাঠে যে বড়ো বড়ো জুয়া লেনদেনের গল্প শোনা যায়, তার প্রতিটির সঙ্গেই সে জড়িত বলে ধারণা করা হয়। কিছুদিন আগের বেসবল কেলেঙ্কারির সঙ্গেও সে সরাসরি জড়িত ছিল। সেই খেলাকে কেন্দ্র করে অন্তত ২ লাখ ডলারের লেনদেন হয়েছে, কিন্তু তার ক্ষমতার ভয়ে কেউ মামলা করতে পারছে না। এরপরও প্রতিটি খেলায় তার জন্য ভিআইপি বক্সসহ অনেক সুবিধা বরাদ্দ থাকে।'
এই কলামে তিনি আরও কয়েকজন জুয়াড়ির নাম উল্লেখ করে তাদের নিউইয়র্ক ক্লাবগুলো থেকে বয়কট করার সুপারিশ করেন।
এরপর আসে Harry Grabiner-এর নাম। তিনি হোয়াইট সক্স ক্লাবের ম্যানেজার Charles A. Comisky-এর স্থলাভীষিক্ত হয়ে ক্লাবটির দায়িত্বে আসেন। বেসবল খেলায় ক্লাবগুলোকে উৎসাহিত করতে 'Honor Systm' নামক একটি নতুন পদ্ধতি চালু করা হয়।
এ নিয়ম অনুযায়ী হোম ক্লাবটি তার টিকেট বিক্রির একটি অংশ ভ্রমণকারী দলকে প্রদান করবে। টিকেটের মূল্য, আসন ও অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে একটি গ্যালারিকে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করা হয়। যেমন : box gate, pass gate, grandstand gate ও bleacher gate। কী পরিমাণ টিকেট বিক্রি হলো— তা খেলা শুরুর আগে, মাঝামাঝি সময়ে ও খেলা শেষে উভয় দলের দুজন প্রতিনিধি পর্যবেক্ষণ করে। এরপর পূর্বনির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী নিজেদের মধ্যে অর্থ ভাগাভাগি করে নেয়।
Grabiner ক্লাবটির পরিচালনা দায়িত্বে আসার পর থেকে ভ্রমণকারী দলগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠে— টিকেট বিক্রি নিয়ে যে হিসাব দেখানো হচ্ছে, তা অনেকটাই সন্দেহজনক। স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকের পরিমাণ আর প্রকাশিত টিকেট বিক্রির হিসাবের মধ্যে বিশাল ফাঁরাক দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ তদারকি করতে বেসবল কমিটি ও ভ্রমণকারী দল গুপ্তচর বসায়। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর সন্দেহ সত্য প্রমাণিত হয়। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা বেসবল এখন বিনোদনের নাম করে টিকেট বাণিজ্য করছে! দুষ্টচক্র এই শিল্পে এমনভাবে প্রবেশ করেছে যে, এখন পুরো খেলাটাই বর্জন করতে হবে।
বেসবল জগতে সবার মুখে মুখে যে জুয়াড়ির নাম শোনা যায়, তিনি হলেন Abe Attell। তার মতো দক্ষ ফিক্সার মাঠে দ্বিতীয়জন ছিল না। স্বয়ং ইহুদি মহলগুলোও তাকে ফিক্সার বলতে দ্বিধাবোধ করত না। তাদের ১০ জনের একটি সংঘবদ্ধ টিম ছিল, যারা প্রতিটি খেলা শুরুর পূর্বে চাঁদা তুলে জুয়া খেলত। এমনও শোনা যায়, World Baseball Series-এর কোনো কোনো খেলাকে কেন্দ্র করে তারা ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত চাঁদা তুলেছে। অসংখ্য প্রমাণাদি থাকার পরও আদালত তাকে শাস্তি দিতে পারেনি।
এরপর আসে Barney Dreyfuss-এর নাম। তিনি পিটসবার্গ ন্যাশনাল লিগ ক্লাবের অন্যতম মালিক ছিলেন। 'Lasker Plan' বাস্তবায়নে সক্রিয় হওয়ার পর থেকে তিনি বেসবল জগতে বিতর্কিত হতে শুরু করেন। যদি প্রশ্ন করা হয়, বেসবল শিল্প ধ্বংস হওয়ার প্রধান কারণ কী? উত্তর একটাই, মাত্রাতিরিক্ত ইহুদি। তারপরও তদন্ত রিপোর্টগুলোতে হাতেগোনা মাত্র কয়েকজনের নাম প্রকাশিত হয়েছে। এমন শত শত তদন্ত কমিটি তৈরি করেও কাজ হবে না। কারণ, তাদের গুন্ডামি এতটা বেড়ে গেছে, অনেক ক্লাবমালিক খেলোয়ারদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাটুকুও হরণ করতে বাধ্য হয়েছে।
যে খেলোয়াড়দের তারা ছোটো থেকে লালন-পালন করে বড়ো করেছে, জুয়াড়ি দলগুলো অর্থের লোভ দেখিয়ে তাদের কিনে নেবে— এমন আশঙ্কা ক্লাবগুলোকে সর্বক্ষণ তটস্থ রেখেছে। এমনকী ম্যাচ রেফারিরাও তাদের লালসার হাত থেকে মুক্তি পায়নি। যে রেফারিরা ফিক্সারদের লোভনীয় প্রস্তাবে রাজি হয়নি, তাদের কতটা অপমান ও লাঞ্ছনার স্বীকার হতে হয়েছে, তা কেবল তারাই জানে।
যদিও ইহুদিদের চরিত্রে খেলোয়াড়সূলভ আচরণের লেশমাত্র দেখা যায় না, তারপরও বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের দেখা যেত। Benny Leonard হলেন একজন ইহুদি বক্সিং খেলোয়াড়। পেশাদার জীবনে জিতেছেন অসংখ্য পুরস্কার। তবে মজার বিষয় হলো— পুরো ক্রীড়া জীবনে তিনি একবারের জন্যেও শরীরে আঘাত পাননি, কিন্তু অনেক বিখ্যাত বক্সিং খেলোয়াড় আছেন, শারীরিক আঘাতের দরুন যাদের খেলাই ছেড়ে দিতে হয়েছে।
Kid Lavinge-এর কানে ঘুষি লাগার কারণে তিনি শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেন। বুকে সজোড়ে ঘুষি লাগায় Ad Wolgast-কে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। Battling Nelson এতটাই আঘাত পান, শরীরে বড়ো ধরনের অস্ত্রপচার করতে হয়। অথচ Benny Leonard, Willie Ritchie ও Freddie Welsh-এর মতো খেলোয়াড়রা সারা জীবনে একটি আঘাতও পাননি! এটা নিয়ে তারা আবার গর্বও করেন! এর পেছনের গল্প হলো— তারা যা খেলেছে, তার সবই ছিল পাতানো খেলা। প্রকৃত খেলোয়াড়রা শারীরিক আঘাতের ঝুঁকি নিয়েই খেলতে আসেন, কিন্তু তারা আসেন নাটক করতে।
ইউরোপ-আমেরিকার অধিকাংশ ক্রীড়াশিল্প এখন ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে। মঞ্চে বা মাঠে যে খেলাগুলো আমরা দেখি— বিশেষত মুষ্টিযুদ্ধ সম্পর্কিত খেলাগুলো তার অধিকাংশই বানানো নাটক। খেলা শুরু হওয়ার আগে একদল খেলোয়াড়কে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। তারপর তাদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেওয়া হয়। আমরা দেখি— একজনের ঘুষি খেয়ে অন্যজন লুটিয়ে পড়ছে। কিছুক্ষণ পর সে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখে ঘুষি মারছে। এভাবে কিছুক্ষণ অভিনয় করার পর সে-ই জয়ী হয়, যাকে আগে থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে। তারাই বক্সিং ও রেসলিং টুর্নামেন্টের আয়োজন করছে, রেফারি নিয়োগ দিচ্ছে, খেলোয়াড় বাছাই করছে, প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, কে কোন খেলায় বিজয়ী হবে তা নির্ধারণ করে রাখছে এবং টিকেট মূল্য বাড়ানোর জন্য কালোবাজারিদের ভাড়া করেছে। এসবের কোনো কিছুই সাধারণ মানুষ জানে না। এমতাবস্থায় বাজি ধরে জয়লাভ করা একজন জ্যান্টাইলের পক্ষে কীভাবে সম্ভব?
চলচ্চিত্র শিল্পের ন্যায় এখানেও পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু খেলোয়াড়কে বাছাই করে বাজারে 'স্টার' বানায়, যেন জুয়াড়িদের মাঠ গরম রাখা যায়। ধীরে ধীরে ক্রীড়াশিল্পও যে 'বক্স অফিস' কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ পৃথিবীতে যদি গাধার চেয়েও কোনো নির্বোধ প্রাণী থেকে থাকে, তাহলে জ্যান্টাইল খেলোয়াড়দের সে নামেই সম্বোধন করা উচিত। তারা খুব কাছ থেকেই দেখছে— ইহুদি জুয়াড়িদের দৌড়াত্ম্যে আমাদের প্রতিটি ক্রিড়াশিল্প আজ কতটা ধ্বংসের মুখে। তারপরও কোনো খেলোয়াড় যদি জুয়াড়িদের সঙ্গে হাত মেলায়, তাহলে তাকে আর কিই-বা বলা যেতে পারে? চাইলে এমন অজস্র উদাহরণ এখানে তুলে ধরা সম্ভব!
Jack Johnson-এর নাম আশা করি অনেকে শুনেছেন। বক্সিং খেলায় তিনি চ্যাম্পিয়নশিপ খেতাবও পেয়েছিলেন। এই ভদ্রলোক বিলাসিতার দোষে পুরস্কারের অর্থ এত দ্রুত খরচ করে ফেলে যে, অচিরেই দরিদ্রতা নেমে আসে। এমতাবস্থায় একদিন Frazee ও Curley তাকে একটি পাতানো খেলায় অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেয়। বলা হলো Jess Willard-এর সঙ্গে পরবর্তী খেলায় যদি সে হেরে যায়, তাহলে তাকে ৩৫,০০০ ডলার দেওয়া হবে। Jes Willard তখন দুর্বলশ্রেণির একজন খেলোয়ার ছিল। কেউ তাকে পাত্তাই দিত না। কিন্তু সে Jack Johnson-এর মতো খেলোয়াড়কে হারিয়ে দিলো! জুয়াড়ি দুজন প্রচুর অর্থের বাজি ধরে পুরোটাই জিতে নিল। এই জুয়াড়ি হলো সেই Harry Frazee, যারা নিজেকে সৃষ্টিকর্তার মনোনীত সম্প্রদায়ের অধিবাসী বলে দাবি করে। সেই যে Jack Johnson-এর ক্রীড়া-জীবনে ভাটা পড়ল, পরে আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
এতে যে জুয়াড়ি দলের খেলোয়াড়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, তা নয়। কারণ, পৃথিবীতে গরিব মানুষের শেষ নেই। তাদের মধ্যে পেশিবহুল ও শক্ত-সামর্থ্যবান পুরুষেরও অভাব নেই। তা ছাড়া অল্প সময়ে শরীরের পেশিগুলোকে ফুলিয়ে নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় ড্রাগ তো জুয়াড়িদের কাছে আছেই। সুতরাং অল্প সময়ে নতুন খেলোয়াড় তৈরি করে নেওয়া তাদের জন্য কোনো ব্যাপারই না। শুধু ড্রাগ দিয়ে তো আর স্টার বানানো যায় না। এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের রয়েছে সমুদ্র পরিমাণ অর্থ। তাদের এত পরিমাণ অর্থ রয়েছে যে, তা দিয়ে প্রতিটি ক্লাব কিনে নেওয়া সম্ভব।
ম্যাচ পাতানোর অভিযোগে যখন কোনো খেলোয়াড়কে আদালতে তোলা হয়, তখন জুয়াড়িরা ঘাপটি মেরে বসে থাকে। খেলোয়াড়দের রক্ষা করার কোনো তাগিদ জুয়াড়িদের থাকে না। আর কেনই-বা রক্ষা করতে যাবে! যে পরিমাণ অর্থ খরচ করে আইনজীবী ভাড়া করবে, তা দিয়ে তো নতুন আরেকজন খেলোয়াড় তৈরি করতে পারবে। ফলে সেই আদিকাল থেকে নিরীহ মানুষরাই কেবল ক্রসফায়ারের স্বীকার বা বলির পাঠা হয়ে আসছে। আর প্রকৃত অপরাধীরা আইনকে বৃদ্ধাঙুল দেখিয়ে আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের চক্রান্তে আমাদের কত প্রতিভাবান খেলোয়াড় যে বলির পাঠা হয়ে হারিয়ে গেছে, তার তালিকা উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। এই মাত্রাতিরিক্ত জুয়াড়ি এবং সৃষ্টিকর্তার তথাকথিত মনোনীত সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের যদি ক্রীড়াজগৎ থেকে বিতাড়িত করা সম্ভব না হয়, তবে হয়তো একদিন ক্রীড়াজগৎ-ই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কারণ, দূষণ বা নোংরামির বাহন কখনো সুস্থ বিনোদনের মাধ্যম হতে পারে না।
হুইস্কি উৎপাদন শিল্প নিয়ে ইহুদিদের ষড়যন্ত্র
একটা সময় ছিল যখন হুইস্কিকে বলা হতো আভিজাত্যের প্রতীক। এটি ছিল ইউরোপ- আমেরিকার খুব জনপ্রিয় পানীয়। পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় যেকোনো অনুষ্ঠানেই এর প্রচলন ছিল। এর উৎপাদন প্রক্রিয়াতে ছিল নান্দনিক সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ।
আমাদের পূর্বপুরুষরা ঘোড়া ও গল্পের বই যেমন পছন্দ করত, তেমনিভাবে শরাবও পছন্দ করত। প্রাচীন লেখক ও রাজাদের কাছে এটা ছিল গর্বের প্রতীক। কারণ, স্বাস্থ্য মান ও ভেজালশূন্যতা প্রাধান্য দিয়ে পরিশুদ্ধ আঙুরের রস থেকে এই শরাব তৈরি হতো। সে সময় বাজারে এমন অনেক শরাব পাওয়া যেত, যার সাথে বহু প্রজন্মের প্রাকৃতিক নির্যাস মিশে থাকত।
বলে রাখা ভালো, হুইস্কি ও শরাব উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আহামরি কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য কেবল ভাষাগত ব্যবহারে। যেমন: হুইস্কি হলো সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। আর শরাব সাহিত্যিক ভাষা, যা ব্যবহৃত হয় গল্প-কবিতা-উপন্যাসে। বিশুদ্ধ পানি ও ফলের রস ছাড়া আরও একটি উপাদান হুইস্কি উৎপাদনশিল্পে বিশেষভাবে জরুরি তা হলো— ধৈর্য। মানুষ কেবল শখ ও আবেগ থেকেই এই শিল্পে কাজ করত। এই শিল্পে কাজ করতে যে নান্দনিক দক্ষতার প্রয়োজন, তা অর্জন করতে দীর্ঘ সময়, পরিশ্রম ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। বাণিজ্যিক মুনাফা এখানে ছিল গৌণ বিষয়।
তাহলে এমন কী ঘটল, যার দরুন সচেতন মানুষেরা আজ হুইস্কি বর্জন করা শুরু করেছে! হঠাৎ এই অনীহার কারণ কী? মানবসমাজ কি আগের চেয়ে বেশি পরিশুদ্ধ হয়ে গেছে? যা ছিল আভিজাত্যের প্রতীক, তার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে সরকারের কেন এত কড়াকড়ি? কেন তার স্বাস্থ্যমান নিয়ে এত প্রশ্ন তোলা হচ্ছে?
কারণ, এই শিল্পে আজ ইহুদিদের থাবা পড়েছে। যে হুইস্কিকে আজকের সুশীলসমাজ বর্জন করছে, তার সাথে কয়েক প্রজন্ম আগের হুইস্কির রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। শুধু তাই নয়; আমাদের প্রাত্যহিক খাদ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত এমন কোনো ভোগ্যপণ্য নেই, যা তাদের অশুভ থাবা থেকে মুক্তি পেয়েছে। হয়তো অনেকে হুইস্কি পান করে না। কিন্তু কীভাবে এর গুণগত মান নষ্ট করে এটিকে একটি অস্বাস্থ্যকর পানীয়তে পরিণত করা হলো, তার ইতিহাস জেনে রাখা উচিত। কারণ, এর সাথে চারপাশে ঘটমান অনেক ঘটনার সাদৃশ্য মেলানো সম্ভব হবে।
যে নান্দনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হুইস্কি উৎপাদন করা হয়, তা ভাষায় বর্ণনা করা সত্যি-ই কঠিন। গল্প-সাহিত্যে (ইউরোপীয় সাহিত্য) যে অমর পানীয়ের কথা শোনা যায়, তা মূলত তিনটি অঞ্চলে তৈরি হতো। স্কটল্যান্ডের গ্যানলিভেটে, আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাব্লিনে ও আমেরিকার কেনটাকি প্রদেশের ব্লুগ্রাস শহরে। প্রথমত, এই অঞ্চলগুলো ইহুদিমুক্ত ছিল। দ্বিতীয়ত, এখানকার জ্যান্টাইলরা ভালো হুইস্কির জন্য অন্তত ১০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষ করত। তৃতীয়ত, এখানকার খাবার পানি ছিল অতি বিশুদ্ধ। এ কারণে এখানকার হুইস্কি ব্রান্ডগুলোর বিশ্বজোড়া খ্যাতি ছিল। যেমন: Pepper, Crow, Taylor ইত্যাদি।
অনেকেই হয়তো Bourbon Whisky-এর নাম শুনে থাকবে। এটি বিশ্বের জনপ্রিয় ব্রান্ডগুলোর একটি। এটি তৈরি হতো হুইস্কি উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত আমেরিকার কেনটাকি প্রদেশে। একবার এর মূল কারিগর উৎপাদন খরচ কমাতে প্রতিষ্ঠানটিকে ইলিনয়েসে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করে। কিন্তু ইলিনয়স ও বোরনের পানি এক নয় জেনে তিনি হতাশ হন। বোরনের পানি গ্লেন ক্রেকের চুনাপাথর মিশ্রিত পানি আর ইলিনয়সে পাচ্ছে শস্য কাজে ব্যবহৃত নদীর পানি। সামান্য এই পার্থক্যেই হারিয়ে যেতে পারে সু-বিখ্যাত একটি ব্রান্ডের বিশেষত্ব। তাই তিনি কারখানা স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাতিল করেন। এ কারণে আঞ্চলিক বিশেষত্বের জন্য একই হুইস্কি পৃথক পৃথক নামে পরিচিত। যেমন: 'রাম' সবচেয়ে ভালো হয় জ্যামাইকাতে, 'পোর্ট শরাব' ভালো হয় পর্তুগালের ডোরো শহরে, 'শ্যাম্পেইন' ভালো হয় ফ্রান্সের রাইহেম শহরে এবং 'বিয়ার' ভালো হয় ব্যাভারিয়াতে।
যেই না বিশুদ্ধ 'হুইস্কি' বাজার থেকে গায়েব হয়ে গেল, অমনি 'বিয়ার' এসে জায়গা দখল করে নিল। শুরুতে কেবল সচেতন মানুষই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিল। ফল ও সবজি রস হতে মিষ্টিজাত উপাদানসমূহ আলাদা করে ভারী পানীয় তৈরির যে কার্যপদ্ধতি, তাকে গাজন প্রক্রিয়া বলা হয়। প্রাকৃতিক উপায়ে এই কাজ করা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। কিন্তু ইহুদিরা এমন সব কৌশল উদ্ভাবন করে, যা দ্বারা কৃত্রিম উপায়ে অতি অল্প সময়ে গাজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়। এভাবেই তারা অতি অল্প সময়ে প্রচুর হুইস্কি উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করে। ফলে তাদের উৎপাদন ব্যয় বহুলাংশে কমে যায়। কারণ, আগে যে পানীয় তৈরিতে লাগত ১০ বছর, তা এখন হচ্ছে ১০ দিনে! কিন্তু তারপরও স্বাদ-রস-গন্ধে তাদের আলাদা করার কোনো উপায় নেই।
যেহেতু ভালো হুইস্কি তৈরি হতে দীর্ঘ সময় লাগে, তাই এর বিক্রয়মূল্য বেশি হবে— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইহুদিদের উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় স্বল্পমূল্যে বিক্রি করতে পারত। তা ছাড়া বাজারজাতকরণে ইহুদিদের মতো দক্ষ জাতি যে গোটা দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নেই, তা আগেই বলা হয়েছে। বিভিন্ন দোকান, সুপারস্টোর, সেলুন ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের সাথে তারা গড়ে তোলে মজবুত ব্যবসায়িক জোট। ইহুদিদের পানীয় বিক্রি করে এসব ব্যবসায়ীরা বেশ ভালো উপার্জন করত। কারণ, বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় এসব পণ্য বেশি বিক্রি হতো। আবার বিক্রি বেশি হওয়ায় তাদের কমিশনের পরিমাণও বেশি হতো। ফলে এ জাতীয় হুইস্কি খুব দ্রুত বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। আগে যেখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বছরে এক বোতল হুইস্কি কিনতেই হিমসিম খেতো, আজ পানির দরে কিনতে পারছে। অপর দিকে ভালো জ্যান্টাইল প্রতিষ্ঠানগুলো; যারা নিজেদের আবেগ ও ভালোবাসা পুঁজি করে দীর্ঘ সময় নিয়ে প্রাচীন গৌরবময় হুইস্কি উৎপাদন ধারা অব্যাহত রেখেছিল, তারা বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে হারিয়ে যেতে শুরু করে। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না— তারা যা পান করছে, তা কৃত্রিমতায় ভরা বিষাক্ত পানীয় বৈ কিছু নয়।
বিষয়টির ওপর ১৯১৬ সালে John Foster Fraster তার লেখা The Conquering Jew বইয়ে উল্লেখ করেন—
'ইহুদিরা হলো আমেরিকান হুইস্কি শিল্পের রাজা। National Liquor Dealer-এর তালিকাভুক্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শতকরা ৮০ ভাগ সদস্যই এই গোত্রের সদস্য। শুধু তাই নয়; এখানকার যে প্রদেশগুলোতে তামাকের ভালো চাষ হয়, সেই অঞ্চলগুলোতে তারা অন্য প্রতিষ্ঠানকে ভিড়তে পর্যন্ত দেয় না। ফলে স্বল্পমূল্যে ইহুদিদের কাছে তামাক বিক্রি করা ছাড়া কৃষকদের ভিন্ন কোনো উপায় থাকে না। এর দরুন ইদানীং সিগারেট শিল্পে তাদের দাপট বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। American Tobacco Company যে পরিমাণ সিগারেট তৈরি করে, তা দিয়ে দেশের কেবল ১৫ ভাগ চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। বাকি ৮৫ ভাগ আসে ইহুদিদের গুদাম থেকে।'
১৯০৪ সালে আমেরিকার Bureau of Chemistry-এর প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন Dr. Wiley. সে বছর তিনি বাজারে চলমান হুইস্কি বিতর্কের ওপর একটি বিবৃতি প্রদান করেন। এর অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো—
'ভালো হুইস্কি প্রস্তুত করা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার, যা অনেকাংশে ব্যয়বহুল। এ প্রক্রিয়ায় অন্তত চার বছর সময় লাগে, যেন অ্যালকোহল অন্যান্য খাদ্য উপাদান জারণ (Oxidation) প্রক্রিয়া সম্পাদন করে— জৈব উপায়ে পানীয় রঙিন করতে পারে। এ জন্য উপাদানগুলো দীর্ঘদিন গুদামজাত করতে হয়, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়।
ইহুদিরা কৃত্রিম উপায়ে কিছু কৌশল আবিষ্কার করে, যা দ্বারা মাত্র কয়েক ঘণ্টায় হুইস্কি তৈরি করা সম্ভব। একই পানীয় জ্যানটাইলদের প্রস্তুত করতে লাগে কয়েক বছর। প্রথম ধাপে, ফল বা সবজি রসের সাথে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি মিশিয়ে পরিমাণ বাড়ানো হয়। দ্বিতীয় ধাপে, দগ্ধ চিনি ও কেমিক্যাল মিশিয়ে পানীয় রঙিন করা হয়। তৃতীয় ধাপে, রুচিকর স্বাদ ও গন্ধ সংযোজন করা হয়। এভাবে মাত্র কয়েক ঘণ্টার বা কয়েক দিনে প্রচুর পানীয় উৎপাদন করা সম্ভব, যা আপাত দৃষ্টিতে স্বাদে-গন্ধে সত্যিকারের হুইস্কি বলে মনে হবে। তবে এতে রয়েছে প্রচুর স্বাস্থ্যঝুঁকি। খাঁটি হুইস্কির যুগ বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে তা কেবল গল্প-উপন্যাসেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব।'
Jewish Encyclopedia-তে উল্লেখ আছে—
'১৮৯৬ সালে রাশিয়ান সরকার হুইস্কিশিল্পকে রাষ্ট্রীয়করণ করায় অনেক ইহুদি পরিবারের ভাগ্যে দুর্দশা নেমে আসে।'
অতি মুনাফালোভী এই সম্প্রদায়টির হাত থেকে ভদকাশিল্প পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে রাশিয়ার সরকার তা রাষ্ট্রীয়করণ করে। পোল্যান্ড ও রোমানিয়াতেও একই ঘটনা ঘটে।
তাদের ব্যাংকাররা রোমানিয়ান কৃষকদের জমি আত্মসাৎ করে ভদকা ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিত। পরে একই কৃষকদের দিয়ে স্বল্প মজুরির বিনিময়ে সেই জমিগুলোতে ভদকা তৈরির মূল উপকরণ চাষ করানো হতো। বিষয়টি জানতে পেরে আমেরিকার সুশীলসমাজ হুইস্কি শিল্প রক্ষায় প্রেসিডেন্ট দপ্তরে জোর দাবি জানাতে থাকে। এরপর সরকারি দপ্তর থেকে ঘোষণা আসে, যারা এই শিল্পে জড়িত হবে; হোক উৎপাদনকারী বা খুচরা ব্যবসায়ী— সবাইকে যোগ্যতা প্রমাণ করে লাইসেন্স নিতে হবে। যদি এর বাইরে কারও দোকানে বা গুদামে হুইস্কি মজুদের সন্ধান পাওয়া যায়, তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু ইহুদিরা তো পারদের মতো! তাদের কোনো কিছু দিয়েই আটকে রাখার উপায় নেই। তাদের যে জালেই আটকানো হোক না কেন, ঠিকই ছিদ্র গলে বেড়িয়ে আসবে। লাইসেন্স আইন বলবৎ হওয়ায় ইহুদিদের বৈধ বাণিজ্যের পথ বন্ধ হয়ে গেলেও অবৈধ উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায়নি। এ পর্যায়ে তারা খুব সূক্ষ্ম একটি খেলা খেলে। এর চূড়ান্ত পরিণতি কী ছিল তা অধ্যায়টির শেষাংশে দেখতে পাবেন। তাদের পরিকল্পিত চক্রান্তটি তিনটি ধাপে নিচে উপস্থাপন করা হলো।
প্রথম ধাপ
ইহুদিরা সে সময়ের বিখ্যাত সব হুইস্কি ব্রান্ডের লোগো নকল করে নিজেদের বোতলে লাগিয়ে বাজারে সরবরাহ করতে শুরু করে। বাজারের বিপণন চক্রটির সঙ্গে ইহুদিদের ভালো সম্পর্ক ছিল বলে তারা আপসে বিষয়টি মেনে নেয়। কিন্তু চাইলেও তো আর মূল্য কমাতে পারছে না! কারণ, মূল্য তালিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। যদি আপসে নকল পানীয়ের মূল্য কমায়, তারপরও বিষয়টি প্রকৃত উৎপাদনকারীর কানে চলে যাবে।
ফলে কোম্পানির যে গাড়িগুলো এক গুদাম থেকে অন্য গুদামে এবং দূরবর্তী স্থানে হুইস্কি পৌঁছে দিত, সেসব গাড়ির চালকদের সঙ্গে আঁতাত করতে শুরু করে। তারা চালকদের সঙ্গে চুক্তি করে গাড়িগুলোকে বিভিন্ন ঝোপঝাড় বা জঙ্গলে নিয়ে আসত। তারপর গাড়ির হুইস্কিগুলো পালটে নিজেদের বোতল সেখানে উঠিয়ে দিত। পুলিশি তদন্তে পাওয়া যায়, James E. Pepper-এর বোতলগুলোতে যে হুইস্কি পাওয়া যাচ্ছে, তা ইহুদিদের উৎপাদিত পানীয়। সে সময় বেশ কয়েকজন অপরাধীর নামও প্রকাশ পেয়েছিল, কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া বেশি দূর এগোতে পারেনি।
দেখা গেল, লাইসেন্স করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। যে ভেজাল বন্ধ করতে সুশীল সমাজের এত আন্দোলন, তা আগের মতোই রয়ে গেছে। ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে— এই নোংরা কাজে এমন সব বিখ্যাত হুইস্কি ব্রান্ড জড়িয়ে পড়েছে, যাদের রক্ষায় একসময় মানুষ আন্দোলন করেছিল। শুধু হুইস্কিই নয়; যত ধরনের পানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে, তত দিনে প্রায় সবকটি-ই বিষাক্ত হয়ে পড়েছে।
১৯১৩-১৪ সালে Bonfort's Wine & Spirits Circular প্রতিষ্ঠানটি একটি কলাম প্রকাশ করে। তাতে উল্লেখ্য করা হয়—
'বিখ্যাত সব ব্রান্ডের নামে যেসব হুইস্কি ও স্পিরিট আজ বাজারে বিক্রি হচ্ছে, তা সবই ভেজালে পরিপূর্ণ। এই বাজার এতটা লাভজনক, একটি মহল মৌমাছির ন্যায় ঝাঁকে ঝাঁকে এই শিল্পের ওপর চেপে বসেছে। অবৈধ ও ভেজাল মিশ্রিত পানীয় আমাদের সমাজে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে তারা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক বিভিন্ন পার্বণ ও ধর্মীয় উৎসবগুলোতে ঐতিহ্য রক্ষার্থে আজ আমরা যেসব হুইস্কি পান করছি, তা রাসায়নিক উপাদানে তৈরি পানীয় ব্যতীত আর কিছুই নয়। এর মধ্যে ফলমূল বা ভেষজ উদ্ভিদের সামান্যতম নির্যাস নেই। কেবল কণ্ঠ ও গলনালিকে শান্ত করতে আমরা বাজারের এসব নোংরা ও বিষাক্ত সব পানীয় গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছি। এমতাবস্থায় আমরা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।'
পরিস্থিতি যখন এতটা জটিল, তখন সুশীলসমাজ হুইস্কি পান করাই ছেড়ে দেয় এবং সবাইকে এ পানীয় বর্জনে আহ্বান জানায়। এই বর্জন আন্দোলন ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পরে এবং এর সঙ্গে অনেক সংগঠন যুক্ত হয়। এই আন্দোলনে Young Men's Christian Association-এর অবদান কখনো ভোলার নয়। ক্রীতদাস বিতর্কের পর হুইস্কি-বিতর্ক আমেরিকার সবচেয়ে বড়ো সমস্যায় রূপ নেয়। প্রবল আন্দোলনের মুখে আমেরিকান প্রশাসন বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এই পানীয় উৎপাদন ও বণ্টন প্রক্রিয়ায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বাধ্য হয়।
দ্বিতীয় ধাপ
১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত Central Conference of American Rabbis-এ রাবাই Leo M. Franklin-এর বক্তব্যের খানিকটা অংশ তুলে ধরা হলো—
'ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে বিনয়ের সাথে সম্মানিত কংগ্রেস সভাসদগণের নিকট আর্জি জানাতে চাই, ধর্মীয় উৎসব এবং শাস্ত্রীয় আচার পালনের নিমিত্তে সংশোধিত হুইস্কি আইনে ইহুদিদের কিঞ্চিৎ ছাড় দেওয়া উচিত। আমাদের বিভিন্ন ধর্মীয় আচারে শরাব একটি ঐতিহ্যময় ও বাধ্যতামূলক বিষয়। শরাবহীন খিডিস রাতগুলো আজ তার সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। ধর্মীয় আচার পালনে হাজার বছর ধরে এ রাতে আমরা আঙুরের রস পান করে আসছি। আমাদের প্রার্থনা শুরু হয় আঙ্গুর রস দিয়ে তৈরি বিশেষ এক শরাব পানের মধ্য দিয়ে।
আমাদের বিশ্বাস, দেশ ও জনগণের স্বার্থে যা ভালো, আপনারা তা-ই করছেন। বিগত কয়েক দশকে হুইস্কিশিল্প যে প্রাচীন গুণমান হারিয়ে বসেছে, তা বলা বাহুল্য। কিন্তু তারপরও অন্যান্যদের ন্যায় আমরাও এ দেশের নাগরিক। এ দেশের জল-হাওয়ায় নিজেদের সঁপে দিয়েছি এবং দেশের সংবিধানের ওপর পূর্ণ শ্রদ্ধা ব্যক্ত করছি। মহামান্য সভাসদগণ, যে সংবিধানের বাস্তবায়নে আপনারা অহর্নিশ কাজ করে যাচ্ছেন, সেখানে উল্লিখিত ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি কি আপনারা ভুলে গেছেন? আজও মিলিয়ন মিলিয়ন ইহুদি নাগরিক এ দেশের উন্নয়নে রাত-দিন কাজ করে যাচ্ছে। তারা এ দেশকে মনে-প্রাণে নিজেদের দেশ বলে স্বীকার করে নিয়েছে। তাহলে আপনারা কীভাবে তাদের আবেগের বিষয়টি (হুইস্কি) নতুন আইন পাসের সময় উহ্য রাখতে পারলেন?
আমি এতটুকু বাড়িয়ে বলছি না। গত এক বছরে অসংখ্য রাবাইয়ের পক্ষ থেকে ১৫০টি চিঠি আমার নিকট এসেছে, যেখানে সবাই হুইস্কি উৎপাদনের অনুমতি চেয়ে আর্জি করেছে। আমি সত্যতা যাচাই করে দেখেছি, প্রতি দশটির মধ্যে নয়টি চিঠির উদ্দেশ্য ধর্মীয় উৎসব ও শাস্ত্রীয় আচার পালনে হুইস্কির উৎপাদনের অনুমতি লাভ করা। যেহেতু নতুন আইন অনুযায়ী অনুমতি ব্যতীত এই পানীয় উৎপাদন পুরোপুরি নিষিদ্ধ, তাই আপনাদের অনুমোদন একান্ত আবশ্যক।
গত কয়েক দশকে এই শিল্প নিয়ে যে বিতর্কের জন্ম হয়েছে, তা আমরা অস্বীকার করছি না। সেই ভেজাল উৎপাদকদের মধ্যে যে আমাদেরও কিছু সদস্য জড়িয়ে ছিল, তাও অস্বীকার করছি না। তবে আমাদের পাশাপাশি খ্রিষ্টানদেরও তো অনেক সদস্য এ প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল। তা ছাড়া গুটিকয়েক অপরাধীর জন্য পুরো একটি সম্প্রদায় শাস্তি পাবে— এটাও সভ্য সমাজে কাম্য নয়। আশা করি, কংগ্রেস সভাসদগণ বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করবেন এবং সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনপূর্বক আমাদের ধর্মীয় আচার পালনে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করবেন।'
তাদের আর্জি কংগ্রেস পার্লামেন্টে উঠলে সভাসদগণের মধ্যে এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। একপক্ষ এই শিল্প পুনরায় চালু করার পক্ষে, অন্যপক্ষ এর বিপরীত দিকে অবস্থান নেয়। সবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, এই শিল্প কেবল ইহুদিদের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এতে জ্যান্টাইলদের কোনো অংশগ্রহণ থাকবে না। তবে ইহুদিদের সবাই ইচ্ছেমতো হুইস্কি উৎপাদন করতে পারবে না। এই অনুমতি কেবল রাবাইদের জন্য প্রযোজ্য। তারা প্রত্যেকে সিনাগাগের জন্য বাৎসরিক ১০ গ্যালন হুইস্কি উৎপাদন করতে পারবে।
তৃতীয় ধাপ
বাৎসরিক ১০ গ্যালন পরিমাণে খুব বেশি নয়, কিন্তু ইহুদিদের জন্য ছোট্ট একটি ছিদ্রই যথেষ্ঠ। যেহেতু রাবাই ব্যতীত অন্য কেউ এই পানীয় উৎপাদন করতে পারবে না, তাই তারা দলবেঁধে সরকারি দপ্তরগুলোতে নিজেদের নাম তালিকাভুক্ত করতে শুরু করে। ফিলাডেলফিয়া, ফ্লেরিডা, নিয়ইয়র্কসহ আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মতো অজস্র সিনাগাগ গড়ে উঠা শুরু করে। সরকারি নিয়ম ছিল— অনন্ত ৫০ জন উপাসনাকারী না হলে নতুন কোনো সিনাগাগ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই একই ব্যক্তি নিজের নাম অসংখ্যবার পরিবর্তন করে একাধিক সিনাগাগের অধীনে তালিকাভুক্ত হতে শুরু করে। ধরুন, ফ্লোরিডা প্রদেশের অরল্যান্ড শহরে ৫০ জন ইহুদি বাস করে। কিন্তু তারা নিজেদের নাম একাধিবার পরিবর্তন করে সরকারের খাতায় ৩০০ জনের নাম দেখায় এবং ছয়টি সিনাগাগ খোলার অনুমোতি নেয়। একই সঙ্গে জন্ম নেয় ছয়জন রাবাই, যাদের কাছে ৬০ গ্যালন হুইস্কি উৎপাদনের অনুমতি থাকবে।
যদিও প্রত্যেককে ১০ গ্যালন উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাবাইদের বাড়িতে শত শত লিটার হুইস্কি পাওয়া যেত। Rabbi Cohen নিজেদের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, বেশি উৎপাদন করা হচ্ছে যেন কিছু নষ্ট হয়ে গেলেও শাস্ত্রীয় আচার পালনের দিনে কোনো ঘাটতি না পড়ে। নাম পরিবর্তন করে রাবাইদের সংখ্যা বৃদ্ধির যে পরিকল্পনা, তার মূল হোতাও এই ব্যক্তিই ছিলেন।
অপরদিকে, সাধারণ মানুষকে হুইস্কির প্রতি পুনরায় আবেগপ্রবণ করে তুলতে তারা থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও সংগীত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করতে শুরু করে।
১৫ বা ২০ মিনিটের এমন কোনো নাটক পাওয়া যেত না, যেখানে হুইস্কিকে একবারের জন্যও উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে এর চাহিদা বাড়তে শুরু করে। কিন্তু বাজারে তো হুইস্কির অস্তিত্ব নেই, আছে কেবল ইহুদিদের বাড়িতে। জ্যান্টাইল যুবকরা অতি গোপনে সেসব বাড়িতে গিয়ে বোতলে বোতলে পানীয় নিয়ে আসত। ফলে তাদের কাঁচা অর্থ উপার্জনের রাস্তা বন্ধ হলো না। এই গোপনীয়তা বেশি দিন চাপা থাকল না। আইন মন্ত্রণালয় তৎক্ষণাৎ এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। যেমন: ১৯১৯-২০ সালে নিউইয়র্কের এক কোম্পানিতে পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে ৪ মিলিয়ন ডলারের অবৈধ্য হুইস্কি জব্দ করে, যা শাস্ত্রীয় আচার পালনের নিমিত্তে তৈরি করা হয়েছিল! দেশজুড়ে অসংখ্য রাবাই গ্রেফতার হয়। পরে দেখা যায়, সরকারি খাতায় তাদের প্রত্যেকেরই একাধিক নাম রয়েছে। রচেস্টার, ফ্লিন্ট, মিশিগান ও পোর্ট হিউরনের সে সময়কার কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করলে এমন অসংখ্য তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। অধিকাংশ পত্রিকার শিরোনাম ছিল এমন— অবৈধ্য হুইস্কি রাখার অভিযোগে রাবাই আটক।
কিন্তু পক্ষপাতিত্বপূর্ণ মেরুদণ্ডহীন প্রশাসন থেকে যে বেশি কিছু প্রত্যাশা করা যায় না, তা কে না বোঝে? তারপরও কিছু রাবাইকে দীর্ঘ মেয়াদে শাস্তি প্রদান করা সম্ভব হয়েছিল। কিছুদিন পর কংগ্রেস থেকে পুনরায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এত জনপ্রিয় একটি পানীয়কে নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে বর্জন করা সম্ভব নয়। যারা অবৈধ্য প্রক্রিয়ায় উৎপাদন করার, তারা ঠিকই চালিয়ে যাবে। তাই নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে এর মান নিয়ন্ত্রণের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা উচিত।
ফলে এই শিল্পের বাজার পুনরায় খুলে দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়, কিন্তু তত দিনে তো জ্যান্টাইল প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হয়ে বা হাত গুটিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। যাদের হাত ধরে একসময় গড়ে উঠেছিল বাজারের বিখ্যাত সব হুইস্কি ব্রান্ড, তাদের অনেকেই তখন এই ব্যবসায় পুনরায় ফিরে আসতে ইচ্ছুক নয়। ইহুদিদের যেহেতু কাঁচা পয়সার অভাব ছিল না, তাই এই ব্রান্ডগুলো তারা একে একে কিনে নিতে শুরু করে। এমন কিছু ব্রান্ডের নাম নিচে লেখা হলো—
Old 66, Highland Rye, T.W. Samuel Old Style Sour Mash, Bridgewater Sour Mash and Rye Whiskes, T. J. Monarch, Davies County Sour Mash Whiskies, Louis Hunter 1870, Crystal Wedding, Gannymede 76, Jig-Saw Kentucky Corn Whisky, Lynndale Whisky, Brunswick Rye and Bourbon, Red Top Rye, White House Club, Green River, Sunnybrook, Mount Vernon, Belle of Nelson, James E. Pepper, Cedar Brook, Great Western Distillery, Old Grove Whisky, Old Ryan Whisky এবং Bucha Gin।
এমন আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম হলো: Bernheim, Rexinger & Company, Elias Bloch & Sons, J. & A. Freiberg, Freiberg & Workum, Helfferich & Sons, Hoffheimer Brothers Company, Elias Hyman & Sons, Kaufman, Bare & Company; Klein Brothers; A. Loeb & Co.; H. Rosenthal & Sons; Seligman Distilling Company; Straus, Pritz & Company; S. N. Weil & Company; F. Westheimer & Sons এবং আরও অনেক।
এত এত ব্রান্ড ও প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে খাঁটি হুইস্কি খুঁজে পাওয়া সহজ কাজ নয়। মজার বিষয় হলো ক্রেতাসমাজ এখন অনেক কম মূল্যে বাজারে বিখ্যাত সব পানীয় পান করতে পারছে। তবে তারা বুঝতে পারেনি, এই পানীয়গুলো কারা তৈরি করছে। খুব অল্প সময়ে পুরো বাজার হুইস্কিতে সয়লাব হয়ে গেল। নোংরা-বিষাক্ত হুইস্কি আমাদের পুরো যুবসমাজকে মাতাল করে ছাড়ল, যার দরুন খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা এখন সমাজে নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর যে সংস্কৃতি, তার জন্ম মূলত এই হুইস্কি শিল্প থেকে; যা অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর দূরবর্তী বিভিন্ন প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। জাতি ভাবে— এই শিল্প বন্ধ করেও যখন পার পাওয়া যায়নি, তখন পরিবার ও সামাজ রক্ষায় নিজেদের সচেতন করে গড়ে তোলা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
টিকাঃ
২৯. খিডিস (Kiddush)- সাব্বাত রাতের বিশেষ এক প্রার্থনা পর্ব, যেখানে পরিবারের সকল সদস্য শরাব হাতে দাঁড়িয়ে থাকে এবং গৃহকর্তা বিশেষ এক প্রার্থনাবাণী পাঠ করে।
থিয়েটারশিল্প পৃথিবীর অতি প্রাচীন একটি সংস্কৃতি, যা বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। সাধারণত নাটক-চলচ্চিত্রে মানুষ যা দেখে, মানুষ তা নিয়েই কল্পনার জগৎ তৈরি করে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মগজে নতুন নতুন মতাদর্শ ও চিন্তা-চেতনার বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া সম্ভব। এ কারণে বিশেষ এই শিল্পটি ইহুদিদের পরিকল্পনায় কখনো উপেক্ষিত হয়নি। বলশেভিক বিপ্লব রাশিয়ার সব শিল্প প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিলেও থিয়েটার ও পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অক্ষত রেখেছে।
চলচ্চিত্র শিল্প (Movie Industry) বাজারে আসার পূর্বে থিয়েটার হলগুলো নিয়মিত ৩০ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের বিভিন্ন নাটক তৈরি করত, যা দেখার জন্য প্রতি সপ্তাহে লাখো মানুষ ভিড় করত। বিনোদনের নামে থিয়েটারে যিশুকে যতটা ছোটো করে উপস্থাপন করা হতো, তা কোনো বিবেকবান খ্রিষ্টানের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষ বোঝেই না, তাদের অবচেতন মনে কীভাবে শয়তানি চেতনার বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যিশু ও মেরিকে ছোটো করে আজ পর্যন্ত যত বেশি নাটক তৈরি করেছে, যার বর্ণনা এখানে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়।
১৯১৮-১৯ সালের দিকে ইহুদিরা মাঝারি মানের একটি থিয়েটার থেকে টিকেট বিক্রি করে ৪৫০০-৫০০০ ডলার উপার্জন করত। এ রকম অসংখ্য থিয়েটার গোটা আমেরিকার বিভিন্ন শহরতলিতে গড়ে ওঠে। সুতরাং প্রতিদিন বা প্রতি মাসে তারা কত ডলার উপার্জন করত, তা হিসাব করে দেখুন। অন্যদিকে, নির্বোধ জ্যান্টাইলরা কষ্টে তাদের উপার্জিত মজুরির একটি বড়ো অংশ নিয়মিত এই সব কুৎসিত নাটক ও চলচ্চিত্রের পেছনে খরচ করত।
এই শিল্প ইহুদিদের দখলে যাওয়ার পর চারদিকে যে নগ্ন সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে, তা সবার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরে জন্ম নেয় চলচ্চিত্র শিল্প, যা গোড়া থেকেই ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আজকের সমাজে শেক্সপিয়রকে নিয়ে কোনো রকম আলোচনা হয় না।
সমাজ-সচেতনতামূলক গল্প নিয়ে হাজির হলে প্রডিউসারগণ ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি প্রদর্শন করেন। সবকিছু জ্যাজ সংগীত ও যৌন আবেদনময়ী নৃত্যের নোংরামিতে ছেয়ে গেছে।
Sheridan, Sothern, McCullough, Madame Janauschek, Mary Anderson, Frank Mayo এবং John T. Raymond ছিল সোনালি দিনের কিছু থিয়েটারশিল্পী। তারা চলে যাওয়ার পর এই শিল্প নতুন কোনো যোগ্য উত্তরসূরি খুঁজে পায়নি। বর্তমানে যে নতুন অভিনেতারা থিয়েটার শিল্পে আসছে, তাদের অধিকাংশরই গড় বয়স ১৩ থেকে ১৭। পরিচালক ও প্রডিউসারগণ এই কম বয়সিদের প্রতি অধিক আগ্রহী। কারণ, তাদের নিজেদের মতো করে গড়ে তোলা সম্ভব; তা ছাড়া পারিশ্রমিকও কম। বলা চলে তারা থিয়েটার মালিকদের হাতের পুতুল।
যেকোনো চলচ্চিত্রে নায়ক-নায়িকাদের আবেদনময়ী শয়নকক্ষের চিত্র প্রদর্শন যেন দৈনন্দিন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঐতিহাসিক গল্পগুলো ইচ্ছামতো পরিবর্তনে মাধ্যমে যৌন আবেদন যুক্ত করে নিয়মিত চলচ্চিত্র বানানো হচ্ছে। এরপরও বলা হয়, সত্য কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র! কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা, তা বোঝা এখন আর আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ঐতিহাসিক সেই গল্পগুলোতে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনা হয় না, যেগুলো ইহুদিদের বীরত্ব নিয়ে লেখা হয়েছে। যেমন: Ben Hur। এর বাইরের সব নাটক বা চলচ্চিত্রে নগ্নতা প্রদর্শনের মাধ্যমে যৌনক্ষুধা তৈরি এবং যিশুকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে উপস্থাপন করে আমাদের মাথায় নাস্তিকতার বিষ ঢেলে দেওয়া যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে অভিনেত্রীদের নগ্নরূপে উপস্থাপনের জন্য ব্যবহার করা হয়, তাদের অধিকাংশই জ্যান্টাইল। খুব কম খরচের বিনিময়ে পরিচালক ও প্রডিউসারগণ তাদের বাজার থেকে কিনে আনে। এভাবে সংস্কৃতি জগতে শুরু হয় নতুন এক বিবর্তন। এই অপ-সংস্কৃতিগুলো কৌশলে জ্যান্টাইলদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। সচেতন ও বিবেকসম্পন্ন মানুষ থিয়েটারে যাওয়ার পরিবর্তে লাইব্রেরিকে শ্রেয় বলে মনে করবে। কারণ, নাটক-চলচ্চিত্র ও থিয়েটারে এখন নৈতিকতার ক্ষুধা মেটানো সম্ভব নয়। শেক্সপিয়র আজ কেবল থিয়েটার থেকেই নয়; পাঠ্যপুস্তক থেকেও হারিয়ে গেছে। যে প্রক্রিয়ায় ইহুদিরা থিয়েটার শিল্পে বিবর্তন এনেছে, তাকে চার ভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা:
১. ইহুদিরা নতুন নতুন যন্ত্র-সামগ্রী সংযোজনের মাধ্যমে প্রতিটি থিয়েটার মঞ্চকে জমকালো রঙিন সাজ দিয়েছে। লাইট, ক্যামেরা, লেন্স, ঝাড়বাতি, বাদ্যযন্ত্র, ঝকঝকে জামা-কাপড়, মঞ্চ, পর্দা প্রভৃতি সংযোজনের মাধ্যমে থিয়েটারগুলোতে এক 'Realistic Effect' নিয়ে এসেছে। আগে দর্শকরা যেখানে ২ ঘণ্টা চলচিত্রের পুরোটা সময় ধরে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকত, এখন সেখানে নতুন কোনো প্রযুক্তির খেলার দিকে তাকিয়ে থাকে।
প্রতিভাধর অভিনেতাদের আজ তেমন একটা প্রয়োজন পড়ে না। ফলে কোনো রকম প্রতিভা ছাড়াই অনেক নতুন মুখ নিয়মিত নাটক-চলচ্চিত্রগুলোতে স্থান পাচ্ছে। এমনও আছে, যাদের দু-তিনটি নাটকে অভিনয় করার পর আর খুঁজে পাওয়া যায় না; এমনকী দর্শকরাও তাদের চেহারা মনে রাখে না। কেন্দ্রীয় চরিত্রের থিয়েটারগুলোতে দলগত সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনের সময় যে পার্শ্ব চরিত্রদের দেখা যায়, তারা যেন কিছু সময় পর হাওয়া হয়ে যায়। যেমন: 'Floradora Girls'। থিয়েটারগুলোতে জ্যান্টাইল অভিনেতারা আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হচ্ছে। আর যুবকরা তো প্রযুক্তির খেলা দেখার পাশাপাশি অপেক্ষা করে, কখন ছোটো ছোটো জামা পরে নতুন কোনো অভিনেত্রী মঞ্চে আসবে?
২. থিয়েটার হলগুলোতে আজ যে শয়তানি চর্চা শুরু হয়েছে, তা খুব দ্রুত প্রতিটি ঘরে ছড়িয়ে পড়বে। টিকেট মূল্যের ওপর ভিত্তি করে থিয়েটারগুলোকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। সম্পদশালীদের জন্য উঁচু হল এবং গরিবদের জন্য নিচু হল। অশ্লীলতার প্রদর্শন উঁচু শ্রেণির হলগুলোতে যতটা হয়, ততটা নিচু শ্রেণির ঘরগুলোতে হয় না। অর্থাৎ নিষিদ্ধ শয়তানের রূপ কে-কতটা দেখবে, তা টিকেট কেনার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে।
'Aphrodite' নাটকের শেষ সিজন তার একটি অকাট্য প্রমাণ। 'Aphrodite' হলো গ্রিকদের সৌন্দর্য ও ভালোবাসার দেবী। এই চরিত্রটি চূড়ান্ত নগ্নতা দিয়ে উপস্থাপন করেছে। আরও আকর্ষণীয় করার জন্য অভিনেত্রীকে চিতাবাঘ, হরিণ ও গাছপালার চামড়া পরানো হয়। নাটকটি যখন প্রথম মুক্তি পায়, তখন নিউইয়র্ক পুলিশ এর বিরুদ্ধে মামলা করে। এটিকে বাজার হতে উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। সাথে সাথেই ইহুদিদের পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলো নাটকটির পক্ষে জ্যান্টাইলদের সমর্থন লাভের জন্য খুব সুন্দর করে, কাব্যিক ছন্দে আর্টিক্যাল প্রকাশ করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত মুক্ত সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে তারা সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়। তারপর মামলা আদালতে তোলা হলে শুরু হয় নতুন নাটক। কারণ, প্রধান বিচারপতি, সহকারী বিচারপতি এবং গণ্যমান্য উকিল সবাই তো ইহুদি! মাদকদ্রব্য বিক্রি করা অবৈধ। কারণ, তা চোখে দেখা যায়, কিন্তু নৈতিকতায় বিষ ঢালতে সমস্যা নেই। কারণ, তা চোখে দেখা যায় না। ফলে মামলাটি খারিজ হতে বেশি সময় লাগল না। প্যারিস ও ভিয়েনাসহ ইউরোপের আরও অনেক শহরের অবস্থা আজ একই রকম। রাতভর বায়েজিদের নৃত্যানুষ্ঠান, অশ্লীল সব কৌতুক এবং অর্ধনগ্ন ঝলমলে কাপড় পরা যুবতি মেয়েদের আসরে প্যারিস তথা ইউরোপীয় শহরগুলোর অলি-গলি ভরে গেছে। শুধু কি থিয়েটারশিল্প? বই, ম্যাগাজিন ও পত্রিকার প্রচ্ছদ ছাপাতেও নগ্ন তরুণীদের ব্যবহার করা হচ্ছে!
৩. থিয়েটারশিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করতে ইহুদিদের উদ্ভাবিত নতুন কৌশল হলো 'স্টার'। এখানে স্টার অর্থ আলোচিত ও অনুকরণীয় অভিনেতা-গোষ্ঠী, যাদের আমরা জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকা বলে অবিহিত করি। পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দায়িত্ব থাকে, এই স্টারদের পছন্দ-অপছন্দ এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন যেন এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে জ্যান্টাইলরা তাদের আদর্শ বলে মনে করে। ফলে এই স্টারদের অনুকরণে অনেক উঠতি বয়সি যুবক-যুবতি নিজেদের স্টারদের মতো করে সাজিয়ে নেয়। এতে থিয়েটার হাউজগুলোর নতুন নতুন মুখ খুঁজে পেতে তেমন কোনো কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু আজ যাদের স্টার হিসেবে দেখছি, কালও যে একই অবস্থায় দেখব, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পরিচালক ও প্রডিউসারগণ এখানে খুব সূক্ষ্ম একটি খেলা খেলে। অভিনেতারা যদি পরিচালকদের পছন্দমতো গল্পে অভিনয় করতে রাজি না হয়, তাহলে পরেরদিন থেকেই তাদের স্টার খেতাব মুছে যাবে। স্টার হতে গেলে নোংরা-নগ্নতায় ভরা গল্পে অভিনয় করতে হবে। সেইসঙ্গে অর্জন করতে হবে পরিচালকদের ব্যক্তিগত অনুগ্রহ!
বর্তমান থিয়েটার শিল্পে আর কখনো Mary Anderson বা Julia Marlowe-এর মতো গুণী অভিনেত্রীদের দেখা পাওয়া যাবে না। সত্যিকারের অভিনেতা হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে তাদের দীর্ঘ সময় লেগেছিল। তারা কোনো পরিচালক বা প্রডিউসারের ব্যক্তিগত অনুগ্রহের দানপাত্র হতে চায়নি। তারা শুরুতে জন-সমর্থন জুগিয়েছে এবং একটু একটু করে অভিনয় শিল্পে পারদর্শী হয়েছে। সেই সময় অভিনয়শিল্পে এত যান্ত্রিকতা, কৃত্রিমতা ও নগ্নতা ছিল না। সেখানে ছিল শুধু নৈতিকতার খোরাক। আফসোস! তাদের মতো উত্তরসূরি আর গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না।
আজ পত্রিকা ও ম্যাগাজিনগুলোতে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে ছোটো-বড়ো অনেক অডিশনের আয়োজন করা হয়। সকাল-বিকাল অডিশনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত অভিনেতাদের খোঁজা হয়। সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের কিছু নাটক চলচিত্রের জন্য গ্রহণ করে এবং কাজ শেষে ছুড়ে ফেলা হয়। তাদের ব্যক্তিগত সম্মান বলতে কিছুই নেই।
৪. ১৮৮৫ সালের পর থেকে থিয়েটার শিল্পে দুটি নতুন বিষয়ের সংযোজন ঘটে: বক্স অফিস ও বুকিং এজেন্সি। থিয়েটার শিল্পকে বাণিজ্যিকীকরণ এবং মুনাফার পরিমাণ বৃদ্ধি করাই এর মূল উদ্দেশ্য। বুকিং এজেন্সিগুলো সম্ভাব্য ক্রেতাদের সন্ধান করে, যারা পুরো এক মৌসুম বা একাধিক মৌসুমের জন্য থিয়েটার হলগুলো কিনে নেয়। এতে কয়েক মৌসুমের জন্য থিয়েটারগুলো দর্শক পেয়ে যায়। ফলে তাদের আর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার সম্ভাবনা থাকে না। তাদের মূলনীতি— দর্শক যা দেখতে চায় তা-ই দেখাও; হোক তা বস্তাপঁচা জিনিস।
বুকিং এজেন্সি সবচেয়ে বড়ো আঘাত হানে 'থিয়েটার ট্রাস্ট' সংস্কৃতির ওপর। থিয়েটার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে, নতুন নতুন গল্প-নাটক ও তারকা অভিনেতা তৈরি করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী নিয়মিত অনুদানের ব্যবস্থা করত, যা থিয়েটার ট্রাস্ট নামে পরিচিত ছিল। এর কারণে থিয়েটার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন স্তরের জনসাধারণের এক বন্ধুসুলভ সম্পর্ক তৈরি হতো।
সমাজের বিভিন্ন স্তরে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি, মানুষের মনের কথা, সমাজের আনন্দ-বেদনা প্রভৃতিকে পুঁজি করে তৈরি হতো গল্প-নাটক। তা ছাড়া শেক্সপিয়ারের কালজয়ী নাটকগুলোতেও খুঁজে পাওয়া যেত সমাজের বাস্তব চিত্র। তখনকার থিয়েটারগুলো শিক্ষণীয় বহু বিষয়ে পরিপূর্ণ ছিল। অর্থের জন্য নয়, হৃদয়ের আবেগ থেকে মানুষ অভিনয় শিল্পে আসত।
বুকিং এজেন্সি থিয়েটার শিল্পে নিয়ে আসে এক বাণিজ্যিক সংস্কৃতি, যা ধ্বংস করে দেয় এই পুরো শিল্পকে। যেখানে মুনাফার প্রসঙ্গ আসে, সেখানে শিল্প অবশ্যই নিজের গুণগত মান হারাবে। আজ যারা অভিনয় শিল্পে আসছে, তারা কেবল শারীরিক সৌন্দর্য বা পারিবারিক ক্ষমতা খাটিয়েই আসছে। বিপরীত দিকে দক্ষ অভিনেতা হওয়ার পরও নিজেকে প্রমাণ করতে পারছে না— এ যুগে এমন অনেক উদাহরণও পাওয়া যাবে। কারণ, তার পেছনে কেউ অর্থ বিনিয়োগ করতে রাজি নয়।
দর্শকদের বিভিন্ন প্রকার আনন্দের খোরাক জোগাতে 'Vaudeville' নামে বিশেষ এক থিয়েটারশৈলী তৈরি করা হয়। নাটক, গান, নৃত্য, কৌতুক, জাদু প্রদর্শনী, পশু-পাখিদের সার্কাস, ক্রীড়াবিদ, সুন্দরী নারী ইত্যাদির সমন্বয়ে সংগীতে হয় এই 'Vaudeville'। সবকিছু আছে, শুধু নেই নৈতিকতার উপাদান। Klaw & Erlanger- বুকিং হাউসটি কমিশনের বিনিময়ে বিভিন্ন থিয়েটার মালিকের সঙ্গে প্রডিউসারদের পরিচয় করিয়ে দিত। যেহেতু Vaudeville সাধারণ মানুষের নিকট ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে, সেহেতু প্রডিউসারদেরও আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। এভাবেই ইহুদিদের হাত ধরে গড়ে উঠে নতুন এক থিয়েটার ট্রাস্ট।
আরেকটি মজার বিষয় হচ্ছে— বুকিং হাউসগুলো থিয়েটার দলগুলোর মধ্যে এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চাপিয়ে দিয়েছে। যেসব থিয়েটার যত বেশি হাস্যরস ও দর্শক জোগাতে সক্ষম, প্রডিউসারদের কাছ থেকে সেগুলো তত বেশি বাজেট লাভ করবে। এবার থিয়েটারগুলোতে নিত্য-নতুন বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান চালু হওয়া শুরু করে। তা ছাড়া বাজারে তো এখন অল্প খরচে অনেক অভিনেতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব। ফলে নতুন এই অনুষ্ঠানগুলো চালিয়ে নিতে তাদের তেমন কোনো আর্থিক সমস্যা হয় না। আর দর্শকরাও এসব অখাদ্য আনন্দ উপভোগ করতে থাকে। সারাদিন পরিশ্রম করে তারা ইহুদি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যে মজুরি পাচ্ছে, তার একটি বড়ো অংশ আবার তাদেরই পেটে চালিয়ে দিচ্ছে।
ইহুদিরা যেভাবে থিয়েটার শিল্পকে ধ্বংস করল
নতুন যে ট্রাস্ট সংগঠনটির কথা পূর্বে বলা হয়েছে, তার সদস্যরা হচ্ছেন— Klaw, Erlange, Nixon, Zimmerman, Hayman, Frohman, Rich, Harris ও Josheph Boork। ১৮৯৬ সালে এই ট্রাস্ট সংগঠনটি আমেরিকার ৩৭টি গুরুত্বপূর্ণ থিয়েটারকে নিজেদের করে নেয়। এর ফলে থিয়েটারগুলো বহু আগেই পরবর্তী মৌসুমের জন্য ভাড়া হয়ে যেত। নতুন মৌসুমের জন্য কী ধরনের গল্প-নাটক সংগীতে করা হবে, তা ট্রাস্টের সদস্যরা আগেই ঠিক করে দিত। তা ছাড়া যদি কোনো ব্যাবসা-প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠন বাণিজ্যিক চুক্তিতে থিয়েটারগুলো ভাড়া করতে চাইত, তবে তা ট্রাস্টের মাধ্যমে করা হতো। বিনিময়ে সংগঠনটি সপ্তাহে ৪৫০ হতে ১০০০ ডলার পর্যন্ত রয়েলেটি উপার্জন করত।
এই ট্রাস্টের নিবন্ধনের বাইরে যেসব স্বাধীন থিয়েটার ছিল, তাদের অবস্থা দিন দিন খারাপ হওয়া শুরু করে। টিকেট বিক্রি একেবারেই কমে যায়। আর্থিক ক্ষতির কারণে তাদের সদস্যরা বাধ্য হয়ে অন্য থিয়েটারগুলোতে যোগ দেওয়া শুরু করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে, 'Motion Technology'-কে কাজে লাগিয়ে ইহুদিরা আমেরিকার বাজারে চলচ্চিত্র শিল্পের যাত্রা শুরু করে। এই শিল্পের লাগাম শুরু থেকেই ইহুদিদের হাতে রয়েছে। কারণ, তারাই এর জন্মদাতা।
জ্যান্টাইলদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের কোনো কৌশলগত যুদ্ধে যাওয়ার প্রয়োজন পরেনি; বরং যে থিয়েটারগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে বন্ধ হয়েছিল, তাদের সদস্যরা চাকরির আশায় এই শিল্পে হাত পাততে শুরু করে।
তবে চলচিত্র শিল্পের উত্থান ঘটানো অত সহজ কাজ ছিল না। কারণ, থিয়েটারশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে চারদিকে জোরালো আন্দোলন শুরু হয়। Nat C. Goodwin, Joseph Jefferson, James A. Herne, James O'Neil, Richard Mansfield, Francis Wilson, Mrs. Fiske এবং James K. Hackett হলেন এমন কিছু ব্যক্তি, যারা দীর্ঘ সময় ধরে এই আন্দোলন টিকিয়ে রেখেছিলেন। সময়ের পরিক্রমায় আস্তে আস্তে তারা সবাই এই আন্দোলন থেকে সরে আসে।
প্রথমে সরে আসে Nat C. Goodwin. তিনি ছিলেন এই আন্দোলনের প্রথম আহ্বায়ক। তবে তার বেশ কিছু দুর্বলতাও ছিল। যেমন: ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত কাজে তাকে প্রায়-ই নিউইয়র্কে যেতে হতো। নিকারবোকার থিয়েটারের ওপর তার বেশ লোভও ছিল। ইহুদিরা তাকে এই থিয়েটারের ম্যানেজার হওয়ার প্রস্তাব দেয়। ফলে আন্দোলনে ইস্তফা দিয়ে তিনি ট্রাস্ট সংগঠনটির গোলামে পরিণত হন।
Joseph Jefferson শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থিয়েটার শিল্পীদের সাথে এবং একই সঙ্গে ট্রাস্ট সংগঠনটিরও সদস্য ছিলেন। এককথায় তিনি ছিলেন গুপ্তচর।
Richard Mansfield ও Francis Wilson প্রতি রাতে থিয়েটার ঘরগুলোতে জ্বালাময়ী কিছু বাণী শোনাতেন। অনেক মানুষ রাতভর তাদের বাণী শোনার অপেক্ষা করত, কিন্তু অসংগঠিত একটি জনগোষ্ঠী এমন কিই-বা করতে পারে? মানুষ যে কথা শুনতে আসছে, এটাই তাদের জন্য পুরস্কার ছিল।
১৮৯৮ সালের দিকে Francis Wilson-এর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করলে ফিলাডেলফিয়া ট্রাস্ট সংগঠন তাকে ৫০ হাজার ডলারের পারিতোষিক অর্থাৎ বকশিস প্রস্তাব করে। তিনি প্রস্তাবে রাজি হন এবং এটা দিয়ে ব্যাবসা শুরু করেন। এরপর পুরো আন্দোলন ভেস্তে যায়। বাকি যে সদস্যরা ছিল, তারাও কোনো একসময় এই আন্দোলন থেকে সরে পড়ে।
সবাই আত্মসমর্পণ করলেও Mrs. Fiske একা এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তার স্বামী Harrison Grey Fiske-এর সাহায্য চাইলেন। তার স্বামীর নিউইয়র্কের নাম করা পত্রিকা প্রতিষ্ঠান Dramatic Mirror-এর সম্পাদক ছিলেন। তিনি একটি কলামে উল্লেখ করেন—
'থিয়েটার শিল্পের মৃত্যু সেদিন হয়েছে, যেদিন এর নিয়ন্ত্রণ একদল অযোগ্য ও অদক্ষ লোকের হাতে চলে গেছে। এর মাধ্যমে আমাদের গৌরব, ঐতিহ্য ও শালীনতার সূর্যাস্ত ঘটেছে। এরপরও কি আমরা এটিকে সুস্থ-সুন্দর বিনোদনের মাধ্যম বলব? যারা এই শিল্পকে নিজেদের করে নিয়েছে, তারা এটি পরিচালনায় একেবারে অদক্ষ। আমাদের সমাজ ও অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্র এই সন্ত্রাসী চক্রের দরুন ইতঃপূর্বেেও বহুবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।' (Dramatic Mirror, December 25, 1897; Reprinted in March 19, 1898)
আগেও বলা হয়েছে, যখন কোনো ইহুদির ওপর আক্রমণ আসে, তখন তাকে রক্ষায় পুরো সম্প্রদায় এগিয়ে আসে। এবার তাদের পত্রিকা ও ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠানগুলো Dramatic Mirror-এর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক আর্টিক্যাল প্রকাশ শুরু করে। হোটেল, স্টেশন, অফিস-আদালত সব জায়গা থেকে এই পত্রিকাটি বর্জন করা হয়। বিজ্ঞাপনদাতারাও সরে পড়ে। সবশেষে Mr. Fiske-কে চাকরিচ্যুত করা হয়।
তিনি সেই কলামে আরও অনেক তথ্য উপস্থাপন করেন। যেমন: গোপন ছদ্মনাম ব্যবহার করে কারা এই শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করছে, কারা এটিকে নিয়ে সিন্ডিকেট বাণিজ্য করছে, কীভাবে তারা টিকেটের মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে? সেইসঙ্গে তিনি সেই সকল ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করেন, যারা ইতঃপূর্বে সন্ত্রাসী তৎপরতায় অভিযুক্ত হয়েছে। তিনি এটাও উল্লেখ করেন— প্রচারণার কাজে বিভিন্ন শহরের পত্রিকাগুলোতে তারা এতটা উচ্চমূল্যে বিজ্ঞাপন দিত যে, দ্বিতীয় কোনো থিয়েটার প্রতিষ্ঠান সেখানে বিজ্ঞাপন ছাপানোর সুযোগই পেত না। পুরো বাজার শয়তান আর ভণ্ডে ছেয়ে গেছে।
এই খবরের প্রতিশোধ নিতে ট্রাস্ট সংগঠনটি Mr. Fiske-এর বিরুদ্ধে ১০ হাজার ডলারের মানহানি মামলা করে।
অবাক করা বিষয়— মামলাটি আদালতে তোলা হলে বিচারপতি সাহেব সাক্ষ্য শোনার ন্যূনতম প্রয়োজনবোধও করেননি; এমনকী তাকে কিছু বলার সুযোগ পর্যন্ত দেননি! যাদের অভিযুক্ত করে কলাম ছাপিয়েছিলেন, তাদের অতীত ইতিহাস অনুসন্ধানের ন্যূনতম আগ্রহ পর্যন্ত কেউ দেখায়নি। আদালত কক্ষে উপস্থিত এক মহিলা চেঁচিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করলে তাকেও থামিয়ে দেওয়া হয়।
সেদিন আদালতে অন্যতম আসামি Abraham L. Erlanger হাজির ছিলেন না। ফলে তাকে আর জেরা করা হয়নি। তিনি বাদে যতজন সেখানে উপস্থিত ছিল, তাদের জেরা করার সময় গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো বিচারক সাহেব 'overruled' করে যান। একে একে সবাই খালাস পায়। আর বিশাল অঙ্কের মানহানি মামলায় Mr. Fiske-কে অভিযুক্ত করা হয়।
তবে তিনি যে ভয়ংকর সত্য প্রকাশের সাহস দেখিয়েছিলেন, তার গুরুত্ব যদি সেই যুগের মানুষরা উপলব্ধি করতে পারত, তাহলে জ্যান্টাইল যুব সমাজের নৈতিকতাবোধ কখনো ধ্বংস হতো না। তিনি ঠিকই বলেছিলেন, এই শিল্পে অশ্লীলতার যাত্রা তাদের হাত ধরেই হয়েছে, যারা একসময় জুতা পালিশ, পত্রিকা বিক্রি এবং টোকাইয়ের কাজ করত। সেকালে এই শিল্পের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন Morris Gest। তিনি ছিলেন রাশিয়ান ইহুদি। আমেরিকার সবচেয়ে বড়ো প্রোডাকশন হাউস তার হাতে গড়ে ওঠে। থিয়েটার জগতের প্রথম দুটি অশ্লীল নাটক 'Aphrodite' ও 'Mecca' তার বিনিয়োগকৃত অর্থেই নির্মিত হয়। মজার বিষয় হচ্ছে, নাটক দুটির সব টিকেট এক বছর আগেই বিক্রি হয়; যার অধিকাংশ ক্রেতা ছিল জ্যান্টাইল।
Mr. Gest-এর সফলতার বড়ো কারণ হলো— তিনি হাতের কাছে যা পেয়েছেন তাই করেছেন। রাশিয়া থেকে আমেরিকায় আসার পর প্রথমে তিনি বোস্টনে পত্রিকা বিক্রির কাজ করতেন। এরপর প্রপারটি বয়ের কাজ শুরু করেন (যারা বিশেষ কোনো চরিত্র ছাড়া নাটক-সিনেমাতে অংশগ্রহণ করে, তাদের প্রপারটি বয় বলা হয়)। ১৯০৬ সাল থেকে তিনি চোরাই পথে থিয়েটারের টিকিট বিক্রির কাজ শুরু করেন। এ জন্য বেশ কয়েকবার পুলিশের হাতে ধরাও খান। একসময় তাকে থিয়েটার অঞ্চলগুলোতে নিষিদ্ধ করা হয়। এ রকম হাজারো কুৎসিত গল্প তার নামের সঙ্গে মিশে আছে।
প্রডিউসার হিসেবে তিনি দর্শকদের তা-ই দিয়েছেন, যা তারা দেখতে চেয়েছে। সমাজে যখন অশ্লীলতা সবে জায়গা পেতে শুরু করেছে, তখন তিনিও নিঃসংকোচে নিজের থিয়েটারগুলোতে অশ্লীলতার সংযোজন করেন। আর জ্যান্টাইল যুবকরাও খুব আগ্রহ নিয়ে এই অনুষ্ঠানগুলো দেখতে যেত। এর দরুন সব টিকেট আগেই বিক্রি হয়ে যেত।
এমন আরেকজন ব্যক্তি হলেন Sam Harris। তিনি দীর্ঘদিন Cohan & Harris প্রতিষ্ঠানটির একজন জুনিয়র অংশীদার হিসেবে কাজ করেছেন। Sam Harris একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির দর্শককে টার্গেট করেন, যারা মারামারি, রক্তারক্তি ও ভয়ংকর শারীরিক কসরতের প্রদর্শন দেখতে পছন্দ করত। তাদের জন্য 'Atrocious Melodrama' নামে নতুন একটি শৈলী তিনি থিয়েটার শিল্পে নিয়ে আসেন। সেকালের সেরা বক্সিং তারকাদের সঙ্গে তিনি চুক্তি করেন। যেমন: Dixon ও Terry McGovern। তা ছাড়া সুঠাম দেহের সকল যুবকদের তিনি থিয়েটারে আমন্ত্রণ জানাতেন। তাদের দিয়ে ভয়ংকর সব শারীরিক কসরত (Stunt) প্রদর্শনের আয়োজন করা হতো। Sam Harris নিজের প্রোডাকশন হাউসকে শক্তিশালী করতে Al H. Woods-কে অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব করেন।
Mr. Woods ব্যক্তি হিসেবে কিছুটা অসংযত হলেও শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতায় তার বেশ অবদান রয়েছে। তিনি একসময় নিউইয়র্কের একটি নাট্যদলের হয়ে পিয়ানো বাজাতেন। তার নেতৃত্বে থিয়েটার জগতে কালজয়ী দুটি নাটকের জন্ম হয়: 'The Girl from Rector's' ও 'The Girl in the Taxi'। ভিয়েনার থিয়েটার প্রতিষ্ঠান এবং অপেরা হাউসগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। তবে এটাও ঠিক, সেখানে তখন অশ্লীলতা ও নগ্নতার জমজমাট প্রদর্শন হতো। এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করতে গিয়ে তিনি নিজেও একসময় অশ্লীলতার মাঝে হারিয়ে যান।
Al Woods-এর মতো হাতেগোনা কয়েকজন ব্যক্তি বাদে এই শিল্পটি একদল অশিক্ষিত, মূর্খ ও নৈতিকতাহীন মানুষদের হাতে পড়ে। যারা সাহিত্যের কিছুই বোঝে না, তারাই আমাদের সাহিত্য শেখাচ্ছে। যারা দর্শনের কিছুই জানে না, তারাই দর্শন শেখাচ্ছে। যাদের কোনো নৈতিকতাবোধ নেই, তারাই আবার নৈতিকতার ছবক দিচ্ছে।
Devid Belasco থিয়েটার জগতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। অভিনয় দক্ষতার জন্য তাকে বিভিন্ন মহল থেকে আমন্ত্রণ জানানো হতো। খুব অল্প সময়ে তিনি দর্শকদের মন জয় করে ফেলেন। তিনি যখন যিশুর চারিত্রে অভিনয় করতেন, তখন অনেকেই তার মাঝে যিশুর ছায়া খুঁজে পেত।
আঠারো শতকের শেষের দিকে ট্রাস্টের বিভিন্ন সদস্যের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সিরাকিউস থিয়েটারের ম্যনেজার Samuel Shubert ছিলেন এই ট্রাস্টের একজন সদস্য। জীবনের প্রথম দিকে থিয়েটার হলগুলোতে তিনি চা-নাস্তা তৈরির কাজ করতেন। কিছুদিন পর তিনি চোরাই পথে টিকেট বিক্রির কাজ শুরু করেন। এই টাকা জমিয়ে একসময় নিজের নামে একটি থিয়েটার খুলে বসেন। তার থিয়েটারের মূল বিষয় ছিল 'Burlesque and Comed' অর্থাৎ যৌন-আবেদনময়ী কৌতুক নাটক।
১৯০০ সালে Belasco ও Shubert ট্রাস্টের বিভিন্ন সদস্যের সঙ্গে ঝগড়া করে বেরিয়ে আসেন। নিউইয়র্কে তাদের ভক্তের অভাব ছিল না। থিয়েটারগুলোতে তখন খ্রিষ্টানরা সুবিধা করতে পারছিল না বলে অনেকে ক্ষেপে গিয়েছিল। এই ক্ষোভটাকে তারা সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায়। Shubert নাট্যগল্প সংগীতে, টিকেট বিক্রি ও থিয়েটার প্রচারণার কাজ করত। Belasco সেই গল্প অনুযায়ী ছোটোখাটো থিয়েটারগুলোতে অভিনয় করত। যিশু, পবিত্র আত্মা, খ্রিষ্টান পুরোহিত ইত্যাদি নানা চরিত্রে তিনি দর্শকদের আকর্ষণ করার চেষ্টা চালাতেন। তার শারীরিক গঠন, কম্পমান কণ্ঠ, রুপালি চুল এবং লাজুক দৃষ্টি খ্রিষ্টান মেয়েদের মনে ছোবল মারত। অভিনয় শেষে তিনি ট্রাস্ট সংগঠনটির কুৎসিত বিভিন্ন গল্প এবং কীভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন, তা তুলে ধরেন। ধীরে ধীরে সংগঠনটির প্রতি মানুষের অনীহা বাড়তে শুরু করে। তা ছাড়া উনিশ শতকের শুরুতে বার্ধক্যের কারণে সংগঠনটির অনেক সদস্য মারা যায়।
বাজারের এমন অবস্থা দেখে ১৯০৭ সালে ম্যানহ্যাটনে তিনি নিজেই একটি থিয়েটার খুলে বসেন। তত দিনে সবাই তার অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে পড়েছিল। শুরু থেকেই তিনি সফলতা পাচ্ছিলেন। ১৯১০ সালে পুরোনো ট্রাস্ট সংগঠনটি একেবারে ভেঙে যায়। এবার সেই সদস্যরা একে একে বেলাস্কো থিয়েটারে যোগ দেওয়া শুরু করে। এভাবে জন্ম নেয় নতুন আরেকটি ট্রাস্ট সংগঠন।
মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো খ্রিষ্টান অভিনেতারা থিয়েটার শিল্পে জায়গা পাবে। নতুন সংগঠনটি হয়তো পৃষ্ঠপোষকতা করবে। কিন্তু এখানেও তাদের বোকা বানানো হয়। মানুষ বুঝল না, সংগঠনটি নতুন হলেও ভেতরের মানুষগুলো পালটায়নি। খ্রিষ্টানদের ছদ্মনাম ব্যবহার করে তারা আবারও এই ট্রাস্টে যোগ দেয়। তাই সাধারণ মানুষ তাদের সনাক্ত করতে পারেনি। লেখক, নাট্যকারসহ কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো আগের মতো এবারও তাদের দখলে গেল। পার্শ্ব চরিত্রে কিছু সুন্দরী খ্রিষ্টান তরুণীকে নিয়ে আসা হতো। তবে তাদের অভিনয় যেন ইহুদিদের মতো হয়, তার জন্য আগে থেকেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তারা নিজেদের পৌরাণিক গল্পগুলো নিয়ে নাট্যশালার আয়োজন করত। ধীরে ধীরে মানুষ আবারও থিয়েটারের দিকে ফিরেতে শুরু করল। যারা কিছুদিন আগেই ইহুদিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল, তারা বুঝতেই পারল না, এই অভিনেতাদের আসল পরিচয় তাদের ছদ্মনামের নিচে লুকিয়ে আছে।
একসময় মানুষ যখন সবকিছু স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়, তখন সবাই ছন্মনামের খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে আসা শুরু করে। সে সময়ের বেশ কিছু জনপ্রিয় অভিনেতা হলেন: Al Jolson, Charlie Chaplin, Louis Mann, Sam Bernard, David Warfield, Joe Weber, Barney Bernard, Ed Wynne, Israel Leopold, Lou Fields, Eddie Cantor এবং Robert Warwick |
একইভাবে জনপ্রিয় কিছু অভিনেত্রী হলেন: Theda Bara, Nora Bayers, Olga Nethersole, Irene Franklin, Gertrude Hoffman, Mizi Hajos, Fanny Brice, Bertha Kalisch, Jose Collins, Ethel Levy, Belle Baker, Constance Collier এবং Anne Held। এমন আরও অনেকে আছেন, যাদের সত্যিকারের পরিচয় কখনো প্রকাশ পায়নি। কারণ, তারা ছদ্মনামেই খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
এত কিছুর পরও তাদের স্বাদ মিটল না। এবার তারা থিয়েটারকে কেবল নাট্যশিল্পে আবদ্ধ না রেখে ছড়িয়ে দিতে চাইল সংগীত, নৃত্য-সংগীত ও চলচ্চিত্রে। এর জন্য দরকার পড়ে আলাদা আলাদা গান, কবিতা ও গল্প-উপন্যাসসের। কিন্তু তাদের ভালো কোনো সুরকার, গল্প লেখক ও মঞ্চ ডিজাইনার ছিল না। ফলে বিখ্যাত কিছু জ্যান্টাইল কবি, গীতিকার, সুরকার, নাট্য লেখক ও গল্প লেখকদের তারা অর্থের বিনিময়ে আমন্ত্রণ জানাতে শুরু করে। এমন কিছু ব্যক্তির নাম নিচে উল্লেখ করা হলো—
Victor Herbert ও Gustav Kerker আমেরিকার সংগীত শিল্পে জনপ্রিয় দুটি নাম। বিখ্যাত গল্প The Lion and The Mouse-এর লেখক Charles Klein। এমন আরও অনেকে হলেন Jack Lait, Montague Glass, Samuel Shipman, Jules Eckert Goodman এবং Aaron Hoffman ।
তাদের নির্দেশনায় বাধ্য হয়ে জ্যান্টাইল লেখকরাও একসময় যৌন গল্প লিখতে শুরু করে। যে গল্পে যৌনতার ন্যূনতম সংস্পর্শ নেই, তার প্রতি পরিচালক, প্রডিউসার ও ট্রাস্ট বোর্ড কোনো রকম ভ্রুক্ষেপ করে না। কোনো অভিনেতা যদি এসব গল্পে অভিনয় করতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তাকে একেবারে বের করে দেওয়া হয়।
Shuberts নিউইয়র্কসহ আশপাশের বেশ কিছু থিয়েটার প্রতিষ্ঠান ইজারা নেওয়া শুরু করে। গান, গল্প, অভিনয়ের মতো শিল্পের কোনো শাখায় তার ন্যূনতম জ্ঞান ছিল না। তবে কীভাবে টিকেটের মূল্য বাড়াতে হয় এবং দর্শকদের থিয়েটারে আনতে হয়, তিনি তা খুব ভালো করেই জানতেন।
১৯২০ সালে থিয়েটার শিল্পে বড়ো ধরনের ধ্বস নামে। প্রায় ৩০০০ থিয়েটারশিল্পী তাদের পেশা পরিবর্তন করতে অন্যত্র চলে যায়। অনেকে থিয়েটার হলগুলো বিক্রি করা শুরু করে। এমন কঠিন অবস্থার মধ্যেই Shuberts নিউইয়র্কে ৬টি থিয়েটার হল ও ৪০টি নতুন নাটক তৈরির আগাম ঘোষণা দেয়। এমন হটকারী সিদ্ধান্তের কারণে অনেকে তাকে পাগলও বলতে থাকে, কিন্তু তিনি কী তৈরি করবেন তা সাধারণ মানুষ তখনও বুঝতে পারেনি। তার চিন্তা ছিল গল্প-নাটক যাই হোক, তাতে যদি নগ্নতার মিশ্রণ থাকে, তাহলে দর্শকের অভাব হবে না।
১৯১০ সালের পর থেকে 'চলচ্চিত্র' নামক একটি নতুন শিল্পের জন্ম হয়, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় 'Motion Picture'। নতুন নাটক তৈরির আগাম ঘোষণা দেওয়ার অর্থ হচ্ছে— তিনি ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র শিল্পেও ক্ষমতাধর হতে চলেছেন। এ পর্যায়ে এসে নৈতিকাধর্মী থিয়েটার শিল্পের চূড়ান্ত মৃত্যু হয়। আজ একজন অভিনয় শিল্পীর দক্ষতা মাপা হয়— পরিচালকের নির্দেশে তিনি কতটুকু অভিনয় করতে পারছেন তার ওপর। মহিলা শিল্পীদের জামা-কাপড় নির্ধারণে আজ আর কোনো নিয়মনীতি নেই। গান ও নৃত্য প্রদর্শনে যে যুবতিদের মঞ্চে উঠানো হয়, তাদের খামারের মুরগি বললেও ভুল হবে না।
সাধারণ মানুষ আজ আর নৈতিকতার জন্য আন্দোলন করে না। ইহুদিরা আঁচ করতে পেরেছিল, তাদের যৌনতা ভরা চলচ্চিত্রশিল্প নিয়ে জ্যন্টাইল সম্পাদকরা একসময় মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তাই তাদের ঘুষ দিয়ে নিজেদের দলভুক্ত করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু এমন অনেক সম্পাদক ছিল, যারা তাদের অর্থের সামনে বিক্রি হয়ে যায়নি। যেমন: S. Metclafe, Hillery Bill, Frederick F. Schrader, Norman Hapgood এবং James O' Donnell Bennett। তারা যথাক্রমে Life, New York Press, Washington Post, New York Evening Globe ও Chicago Record-Herald পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন।
সম্পাদকদের কাবু করতে না পারায় ইহুদিরা পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলো কাবু করতে শুরু করে। আর এটাই ছিল তুলনামূলক সহজ কাজ। প্রথমে তারা বড়ো অঙ্কের অর্থ অনুদানের লোভ দেখিয়ে দলে ভেড়ানো শুরু করে। এতে কাজ না হলে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। এভাবে একে একে সবাই ইহুদিদের পায়ের নিচে ধারণা দিতে বাধ্য হয়। তারপর যেসব সম্পাদক তাদের বিরুদ্ধে লিখতে পারে বলে আশঙ্কা হয়, তাদের সবাইকে একে একে চাকরিচ্যুত করা হয়। এভাবে থিয়েটার ও চলচ্চিত্রশিল্প হয়ে উঠে ইহুদিদের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার উপার্জনের সম্ভাবনমায় উৎস।
ইহুদিদের নগ্নতার থাবায় চলচ্চিত্রশিল্প
Anthony Comstock-এর নাম শুনেছেন কখনো? তিনি মিডিয়া জগতের বিখ্যাত কোনো ব্যক্তিত্ব নন। তার নাম উচ্চারিত হলে চারদিকে হাসির ধুম পড়ে যেত। পত্রিকায় তাকে নিয়ে অনেক ব্যঙ্গ কলাম লেখা হতো। অথচ বাস্তবে তিনি ছিলেন অশ্লীলতা, নোংরামি এবং সকল অসামাজিক কাজের বিরুদ্ধে একজন প্রতিবাদী ব্যক্তি। পেশায় ছিলেন পোস্টাল পুলিশ ডিপার্টমেন্টের সদস্য। এসব অপসংস্কৃতি যেন সমাজে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য তিনি 'সেন্সর বোর্ড' তৈরির প্রস্তাব করেন। আর এ কারণেই তিনি ইহুদি নিয়ন্ত্রিত চলচ্চিত্রশিল্পের কাছে চিরশত্রু বনে যান। সাধারণ মানুষ যেন তার কথায় কর্ণপাত না করে, এ জন্য পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়। ১৯১৫ সালে তিনি মারা যান।
ব্যাপারটা এমন নয়— তারা ইচ্ছা করে খারাপ ও নোংরা জিনিস তৈরি করে। মূলত তাদের রুচিবোধটাই এমন। ইহুদিরা নোংরামির কতটা নীচু স্তরে পৌছে গেছে, তা তারা উপলব্ধিও করতে পারে না। এটা সত্যি— এখনও কিছু ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে। তবে তাদের সহমর্মিতা জানানো ছাড়া আর কিছুই করার নেই। কারণ, দর্শকসমাজ আজ সুস্থধারার চলচ্চিত্রের দিকে ফিরেও তাকায় না। সেন্সর বোর্ড প্রতিষ্ঠা পেলে ইহুদিদের নগ্নতা ভরা চলচ্চিত্র শিল্প ভয়ানক হুমকির মুখে পড়ত। তাই তারা সুকৌশলে এটাকে ঠেকিয়ে দিতে চেষ্টা করে।
১৯০৯ সালে নিউইয়র্ক শহরে National Board of Review of Motion Pictures প্রতিষ্ঠিত হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অশালীন ও নগ্ন চলচ্চিত্রের নির্মাণ ঠেকাতে চারদিকে যখন আন্দোলন শুরু হয়, তখন চাপের মুখে এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথমে এর নাম ছিল Motion Picture Censorship। মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো অশ্লীল চলচ্চিত্রের নির্মাণ বন্ধ হবে। কিন্তু সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল এই বিশেষ চলচ্চিত্র নির্মাতা গোষ্ঠীটির স্বার্থ রক্ষা করা এবং কিছু একটা বুঝিয়ে সাধারণ মানুষদের আন্দোলনকে কবর দেওয়া। Frederick Boyd Stevenson সংগঠনটির একজন সাবেক কর্মী। ব্রুকলাইনের Eagle ম্যাগাজিনে তিনি উল্লেখ করেন—
'চলচ্চিত্র শিল্পের নাটাই ধরে যে যৌনতা সমাজে প্রবেশ করেছে, তার দরুন সন্ত্রাসী তৎপরতা প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্দোলন ও মামলা-মোকাদ্দমা করেও যৌনতার আঠালো থাবা থেকে এই শিল্পকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না। যেখানে একটি সুস্থ-শালীন চলচ্চিত্র থেকে আয় হয় ১,০০,০০০ ডলার, সেখানে যৌনতা ভরা একটি চলচ্চিত্র থেকে আয় হয় ২,৫০,০০০ থেকে ২৫,০০,০০০ ডলার। তাহলে বাজারে কোন চলচ্চিত্র বৃদ্ধি পাবে?'
Dr. James Empringham নিউইয়র্কের World ম্যাগাজিনের একটি কলামে লিখেন— 'কিছুদিন আগে চলচ্চিত্রশিল্প নিয়ে আমেরিকার বিভিন্ন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান একটি সম্মেলনের আয়োজন করে। আমাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। অবাক করা ব্যাপার— উপস্থিত ৫০০ জন সদস্যের মধ্যে কেবল আমিই ছিলাম খ্রিষ্টান, আর বাদ বাকি সবাই ইহুদি।'
শতাব্দীর শুরুতে মাত্র ১০টি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আমেরিকার প্রায় ৯০ ভাগ চলচ্চিত্র নির্মাণ করত। এর ৮৫ ভাগ সদস্যই ছিল ইহুদি। দর্শকসংখ্যা বাড়াতে পৃথিবীজুড়ে তারা অসংখ্য শাখা প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে তৈরি করে দশ হাজার সিনেমা হল। যে গ্রাম্য মানুষ একসময় থিয়েটারও দেখতে যেত না, তারা আজ দল বেঁধে সিনেমা হলে যাচ্ছে।
বাজারে সুন্দর ও সুস্থধারার চলচ্চিত্রের অভাব নেই— এটা শুনে পাঠকরা হয়তো চোখ কপালে তুলবেন। সত্যি বলতে শিক্ষামূলক, মার্জিত ও সুস্থধারার অনেক চলচ্চিত্র এখনও তৈরি হচ্ছে, তবে তা দর্শক মহলে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। হল মালিক এমন কোনো চলচ্চিত্র প্রদর্শনে রাজি হবে না, যেখানে বাণিজ্যিক ঝুঁকি রয়েছে। সবার মনে এমন একটি ধারণা গেঁথে বসেছে, নগ্নতা ও যৌনতার সংস্পর্শ না থাকলে দর্শক সিনেমা হলে আসবে না।
তবে এই ধারণার বিরুদ্ধে সমুচিত জবাব দেন David Wark Griffith। ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে তিনি একটি শিক্ষণীয় চলচ্চিত্র তৈরি করেন। ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে বেশ কয়েকটি সিনেমা হল ভাড়া নেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিকভাবে বেশ সফল হয়। সেইসঙ্গে দর্শকরাও দারুণ মুগ্ধ হয়।
তাহলে ইহুদিরা এমন চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে না কেন? আপনাদের বুঝতে হবে— যাদের মধ্যে শিক্ষা, সাহিত্য, আদর্শ ও নৈতিকতার জ্ঞান নেই, তারা কখনো নোংরামি ছাড়া অন্য কিছু করতে পারে না। যে মাছ ধরতে জানে না, সে তো কেবল পানি-ই ঘোলা করবে। 'শিল্প' বিষয়টা কী, তা-ই তো ইহুদিরা জানে না। তারা বলে— দর্শক যা চাচ্ছে, আমরা তা-ই তৈরি করছি। এটা ঠিক যে, বর্তমান যুব সমাজের বিরাট একটা অংশ নৈতিকতা-বিবর্জিত। সমাজের এই অধঃপতন কীভাবে হয়েছে, তা ইতোমধ্যেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যিশুকে আজ আমরা কজনই-বা স্মরণ করি! প্রতি সপ্তাহে কজন গির্জায় যাই? এমতাবস্থায় যৌনতা ভরা চলচ্চিত্রে দর্শকের অভাব হওয়ার কথা নয়।
Carl Laemmle একজন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং Universal Film Company- এর মহাপরিচালক। জন্মসূত্রে তিনি জার্মান ইহুদি। আমেরিকান দর্শকরা কোন ধরনের চলচ্চিত্র দেখতে আগ্রহী, তা জানার জন্য 'What Do You Want?' শিরোনামে তিনি একটি জরিপ করেন। Mr. Laemmle ধারণা করেছিলেন, হয়তো ৯৫ শতাংশ দর্শক বলবে তারা সুস্থধারার চলচ্চিত্র দেখতে আগ্রহী, কিন্তু ৬০ শতাংশ দর্শকই যৌনতাময় চলচ্চিত্রকে সমর্থন করে!
'কোকেন' যেমন একজন মাদকাসক্তের দৈনন্দিন চাহিদা, তেমনি যৌন চলচ্চিত্রও নৈতিকতা-বিবর্জিত সমাজের দৈনন্দিন চাহিদা। মাদকাসক্ত রোগীর সুস্থতার জন্য তাকে যেমন কোকেন থেকে দূরে রাখা উচিত, তেমনি সমাজে নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে যৌন দৃশ্যের প্রদর্শন বন্ধ করা উচিত। দর্শক যা চাচ্ছে, তা-ই তাদের দিচ্ছি— এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না।
অশ্লীল চলচ্চিত্রের নির্মাণ ঠেকাতে আমেরিকার বার কাউন্সিলে বেশ কয়েকটি প্রোডাকশান হাউসের বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলা ঠেকাতে যে উকিল ও আইনজীবীগণ হাজির হন, তারা সবাই ছিলেন ইহুদি। যেমন: Meyers, Ludvigh, Kolm, Friend ও Rosenthal; এমনকী একজন রাবাইকে পর্যন্ত এই আন্দোলন ঠেকানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি খুব চৌকসভাবে একটি বক্তৃতা দেন। তার কিছুটা অংশ তুলে ধরা হলো—
'আমি একজন ইহুদি। আপনাদের কি মনে আছে, অশ্লীল থিয়েটারগুলো ইতঃপূর্বে আমাদের ধর্মকে ছোটো করে কত নাট্যশালার আয়োজন করেছে? দর্শকদের নিকট আমাদের ধর্মকে কতটা হাস্যরসাত্মক বানিয়েছে? আমাদের হৃদয়ে তা কতটা কষ্টের দাগ কেটেছে?'
তাদের ধর্মকে যদি কেউ ছোটো করে থাকে, তবে সেটা তারাই করেছে। আগেই বলেছি, শিল্পকলা সম্পর্কে খ্রিষ্টান শিল্পীদের যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। নিছক একটি ধর্মের পেছনে লাগার কোনো প্রয়োজন তাদের পড়েনি।
তিনি আরও বলেন— 'বিষয়টির সমাধান করতে আমরা B'nai B'rith নামে এক সংগঠন তৈরি করি। সংগঠনটি বর্তমানে Anti-Defamation League নামে পরিচিত, যার সদর দপ্তর শিকাগোতে অবস্থিত। আমরা একত্রিত হয়ে ক্যাথলিক গির্জা, সমাজের ধর্মীয় সব সংগঠন এবং নির্মাতা প্রতিষ্ঠানদের নিকট চিঠি পাঠাই, যেন আমাদের ধর্মকে অবজ্ঞা করে আর কোনো চলচ্চিত্র তৈরি না হয়। পৌরাণিক চরিত্রগুলো উপস্থাপন করতে সমস্যা নেই, কিন্তু তাদের নিয়ে যেন ব্যঙ্গ চিত্র করা না হয়। এরপর আমরা প্রতিটি পৌরসভা কর্তৃপক্ষের নিকট চিঠি পাঠাই এবং ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করি, যেন এমন কোনো চলচ্চিত্র বা নাটকের অনুমতি দেওয়া না হয়, যেখানে আমাদের ধর্মকে অশ্লীলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
ফলাফল কী? আমরা কোনো কংগ্রেস বা আদালতে মামলা করতে যাইনি। আমরা কিন্তু আপনাদের মতো দলবেঁধে আন্দোলনও করিনি। আমরা সবাই একতাবদ্ধ হয়েছিলাম এবং একত্রিত হয়ে ধর্মবিরোধী চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ করেছি।'
সত্যিই যদি ধর্মকে অপবিত্রতার হাত থেকে রক্ষা করা Anti-Defamation Leauge-এর উদ্দেশ্য হয়, তাহলে খ্রিষ্টান ধর্মকে যখন কলুষিত করা হয়, তখন তারা চুপ থাকে কেন? রাবাই যদি খ্রিষ্টানদের এত উপদেশ দিতে পারেন, তাহলে নিজেদের কেন এই উপদেশ দিচ্ছেন না?
রাবাই আরও বলেছেন— 'অশ্লীল-নোংরা থিয়েটারগুলো ইতঃপূর্বে বহুবার তাদের ধর্মকে ছোটো করেছে।'
বিশ্বাস করা যায়, আমেরিকার মাটিতে ইহুদি ধর্মকে ছোটো করা হয়েছে! এটা তো কোনো খ্রিষ্টানের পক্ষে কল্পনা করাও অসম্ভব! ভিনগ্রহের কোনো এলিয়েন যদি করে থাকে, তবেই মেনে নেওয়া সম্ভব। তাহলে তাদের ধর্মকে কীভাবে ছোটো করা হলো? উত্তর শুনলে পিলে চমকে যাওয়ার মতো অবস্থা হবে।
কোনো জনসমাবেশে যদি যিশুকে স্মরণ করা হয়, তবে তা ইহুদিদের জন্য চরম অপমানকর বিবেচনা করা হয়। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট যদি জাতির উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদানকালে যিশুর নাম উল্লেখ করেন কিংবা কোনো চলচ্চিত্রে খ্রিষ্টধর্মকে মর্যাদার সঙ্গে প্রচার করা হয়, তবে সেটাকেও চরম অপমানকর মনে করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, সেকালে Life of the Savior নামক একটি চলচ্চিত্রের প্রচারণা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ, উক্ত সিনেমায় যিশু ও খ্রিষ্টান ধর্মকে বড়ো করে উপস্থান করা হয়েছে।
Way Down East ও The Shepherd of the Hills চলচ্চিত্র দুটিকে কেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল? কারণ, গ্রাম্য জীবন, কৃষি সংস্কৃতি ও জীবন-প্রবাহ সম্পর্কে ইহুদিদের কোনো ধারণা ছিল না। গ্রামের মানুষদেরও যে একটা জীবন আছে, তা তারা বুঝতেই চাইত না। তাদের জন্ম হয়েছে বিভিন্ন শহুরের অলিতে-গলিতে, যেমন: ফ্রাঙ্কফুট, হ্যানয়, ওয়ারস, নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস ইত্যাদি। কৃষকরা তো তাদের কাছে হাসির পাত্র।
ইহুদিরা ভাবে— এই ধরনের চলচ্চিত্র দিয়ে তাদের বক্স অফিসে পয়সা আসবে না। সুতরাং এসবের পেছনে সময় নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া তারা এটাও চায় না— এমন কোনো চলচ্চিত্রের প্রদর্শন হোক, যেখানে পুঁজিবাদ ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণে গ্রাম্য কৃষকদের নিষ্পেষিত জীবনচিত্র ফুটে ওঠে।
চলচ্চিত্রশিল্প থেকে শালীনতা ও নৈতিকতা যে বহু আগেই বিদায় নিয়েছে, তা আমরা ভালো করে জানি। তারপরও অনেক সংগঠন এ পর্যন্ত ছোটোখাটো বহু আন্দোলন করেছে, কিন্তু ফলাফল কিছুই হয়নি। কারণ, আমরা সমস্যার মূল শিকড়ে পৌছাতে পারিনি। কে জানে, যারা আন্দোলন করছে তারা হয়তো ইহুদিদেরই কিছু সদস্য! আমরা যদি এসব সংগঠন ও সদস্যদের চিহ্নিত করতে না পারি, তাহলে বছরের পর বছর আন্দোলন করেও কোনো সমাধান হবে না।
আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র শিল্পে ইহুদিদের একচেটিয়া আধিপত্য
একটা সময় ছিল, যখন ইহুদিরা খ্রিষ্টান ছদ্মবেশে ব্যাবসা-বাণিজ্য করত, যেন তাদের কেউ অবজ্ঞা না করে। তবে আজ তারা অনেক সাবলম্বী। সমাজে এখন নিজ পরিচয়ে কাজ করতে পারে। সম্পদ তো অনেক হলো, এবার কিছু খ্যাতি কামানো দরকার! সেই কাজটা করে দিয়েছে চলচ্চিত্র শিল্প, যা আজ তাদের মিলিয়ন ডলার উপার্জনের রাস্তা করে দিয়েছে। এখন তাদের প্রথম লক্ষ্য, যেভাবেই হোক সিনেমা হলগুলোতে দর্শক বাড়াতে হবে। দেখবেন, দিন-রাত সিনেমা হলগুলোতে মানুষের উপচে পরা ভিড়। এমন তো নয়— প্রতিদিন-ই সুন্দর সুন্দর চলচ্চিত্র, গল্পনাট্য ও প্রমাণ্যচিত্র প্রদর্শন হচ্ছে, তাহলে মানুষ হলগুলোতে প্রতিদিন কী দেখার জন্য এত ভিড় করে?
কেউ না কেউ তো আছেই, যে আমাদের মগজ নিয়ন্ত্রণ করছে। এটা ঠিক, আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক কিছুই ইহুদিরা আবিষ্কার করেছে, কিন্তু তার অধিকাংশই মানব সভ্যতার কোনো উপকারে আসেনি। কারণ, এগুলো দিয়ে কেবল সভ্যতাকে ধ্বংসই করা যায়; গড়া সম্ভব নয়।
যে প্রতিষ্ঠানগুলো আজ পুরো পৃথিবীর চলচ্চিত্রশিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: The Famous Players, Selznick, Selwyn, Goldwyn, Fox Film Company, The Jesse L. Lasky Feature Play Company, United Artists' Corporation, The Universal Film Company, The Metro, Vitagraph, Seligs, Thomas H. Ince Studios, Artcraft, Paramount Picture ইত্যাদি। এবার প্রতিষ্ঠানগুলো কাদের হাতে জন্ম নিয়েছে এবং কারা পরিচালনা করছে, তা নিচে উপস্থাপন করা হলো—
The Famous Players প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালক হলেন Adolph Zukor। তিনি একজন হাঙ্গেরিয়ান ইহুদি। চলচ্চিত্র জগতে আসার আগে নিউইয়র্কের হ্যাস্টার স্ট্রিটে পশমি পণ্যের ব্যাবসা করতেন। মানুষের ঘরে ঘরে পণ্য ফেরি করতেন। জীবনের প্রথম সঞ্চিত অর্থ তিনি 'নিকেল থিয়েটারে' বিনিয়োগ করেন এবং Marcus Loew-এর সাথে যৌথভাবে কাজ শুরু করেন।
Adolph Zukor পরবর্তীকালে আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিজের ক্ষমতা বিস্তৃত করেন। যেমন : Famous Players-Lasky Corporation, The Oliver Morosco Photoplay Company, Paramount Pictures Corporation এবং Artcraft Pictures। এভাবে ধীরে ধীরে তিনি আমেরিকার অন্যতম ধনকুবের হয়ে ওঠেন।
অনেকে বলে United Artists Corporation জ্যান্টাইলদের প্রতিষ্ঠান, কিন্তু American Hebrew ম্যাগাজিনের একটি আর্টিক্যাল অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালক হলেন Hiram Abrams। এটি একসময় চারজন তারকা অভিনেতা দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের নাম হলো Mary Pickford, Douglas Fairbanks, Charlie Chaplin ও David Wark Griffith। জন্মসূত্রে Hiram Abrams রাশিয়ান ইহুদি। ওরেগন শহরে থাকাকালে তিনি সংবাদপত্র বিক্রি করতেন। কিছুদিন পর 'Penny Arcade' নিয়ে কাজ শুরু করেন। Paramount Pictures Corporation-এর তিনি একজন যৌথ প্রতিষ্ঠাতা এবং এর কিছুদিন পরই প্রেসিডেন্ট হন।
Fox Film Corporation ও Fox Circuit Theater প্রতিষ্ঠান দুটি William Fox-এর একক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো। তিনি একজন হাঙ্গেরিয়ান ইহুদি। ধারণা করা হয়— তার প্রকৃত নাম William Fuchs। একসময় তিনি স্পঞ্জ কাপড়ের বাণিজ্য করতেন। তা ছাড়া 'Penny Arcade' বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে তিনি পেশাজীবন শুরু করেন। এটি অনেকটা বায়েস্কোপের মতো। বাক্সের ভেতর নাটাইয়ের একটি রিলে অনেকগুলো পর্ন ছবি স্থিরচিত্র আকারে সাজানো থাকত। বাক্সের ফুটায় চোখ রাখা মাত্রই রিল ঘুরিয়ে স্থির চিত্রগুলো পর্যায়ক্রমে দেখানো হতো। কিছু কয়েনের বিনিময়ে যে কেউ-ই এসব দেখতে পারত।
Metro Pictures Corporation গড়ে তোলার পেছনে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন Marcus Loew। সেকালে তিনি আমেরিকার ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের মালিক ও শেয়ারহোল্ডার ছিলেন।
চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাসে Marcus Loew ও Adolph Zukor খুব পরিচিত দুটি নাম। তারা উভয়েই একসময় পশমি পণ্যের বাণিজ্য করতেন। Zukor একাই চলচ্চিত্র শিল্পে বহুদূর এগিয়ে গিয়েছিলেন, যদিও পরবর্তীকালে Loew-এর প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেন। তিনি সবচেয়ে বেশি তৈরি করতেন Vaudeville শ্রেণির চলচ্চিত্র, যা মূলত নীচু শ্রেণির হলগুলোতে দেখানো হতো। পরবর্তী সময়ে তিনি একাই ১০৫টি সিনেমা হল গড়ে তোলেন।
Goldwyn Film Corporation পরিচালনা করতেন Samuel Goldwyn, যিনি ছিলেন একজন পোলিশ ইহুদি। চলচ্চিত্র শিল্পে আসার পূর্বে তিনি বিভিন্ন পণ্যের পাইকারি ব্যবসায় করতেন। ১৯১২ সালে Jesse Lasky ও Cecil DeMille-এর সাথে ২০০০০ ডলার বিনিয়োগ করে তার প্রথম চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এতে তিনি এতটাই লাভ করেন যে, পরবর্তীকালে ২০০০০০০০ ডলার বিনিয়োগ করে Shuberts, A.H.Woods ও Selwyns-কে সাথে নিয়ে আরও একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সেখানে মূলত জ্যান্টাইল লেখকদের গল্প-উপন্যাস নিয়ে নাটক-চলচ্চিত্র তৈরি করা হতো।
Universal Film Company বাজারের অনেকের নিকট Universal City নামে পরিচিত। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠে Carl Laemmle-এর একক নিদের্শনায়। তিনি একজন জার্মান ইহুদি। ১৯০৬ সালে এই শিল্পে তিনি প্রথম পা রাখেন। পূর্বে তার কাপড়ের ব্যাবসা ছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন নতুন ট্রাস্ট সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়, তখন তিনি সুকৌশলে সেখানে প্রবেশ করেন। পরে ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস Universal City প্রতিষ্ঠা করেন।
Select Picture Corporation ও Selznick Pictures প্রতিষ্ঠান দুটি গড়ে উঠে Lewis J. Selznick-এর একক নেতৃত্বে, যিনি ছিলেন একজন রাশিয়ান ইহুদি। একসময় তিনি World Film Corporation-এর সহকারী পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন।
এরা ছাড়াও ইহুদিদের আরও অনেক সদস্য রয়েছে, যারা সরঞ্জামাদি প্রস্তুত, অভিনেতা বাছাই, শুটিং স্থান নির্ধারণ, সিনেমা হল তৈরি, বিজ্ঞাপনের প্রচার, বাজারে টিকেটের চাহিদা বৃদ্ধি করাসহ এ জাতীয় বিভিন্ন কাজ করত।
আমাদের চারপাশে আজ অনেকের দেখা মিলবে, যাদের নিকট চলচ্চিত্রই একমাত্র বিনোদন মাধ্যম। অনেকে আছে, যাদের দিনে একবার হলেও সিনেমা হলে যেতে হয়। আবার কেউ কেউ আছে, যাদের দুপুর ও রাতে দুইবার যেতে হয়। এখন তো প্রায় সিনেমা হলগুলোই দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। অনেকে তো দিনের ৩/৪ ঘণ্টা সময় শুধু এসব দেখেই কাটিয়ে দেয়। মূলত আমাদের মস্তিষ্কে নাটক-সিনেমার প্রতি এক অদম্য ক্ষুধার জন্ম নিয়েছে। বাজারে এসবের চাহিদা এতটা বেড়েছে—
এতগুলো প্রতিষ্ঠান মিলেও এই চাহিদার জোগান দিতে সক্ষম হচ্ছে না। তাই মানুষ একই নাটক-চলচ্চিত্র বারবার দেখে সময় কাটাচ্ছে। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, ভালো জিনিস প্রতিদিন তৈরি করা যায় না। তাই আজ যেসব চলচ্চিত্র তৈরি হচ্ছে, তার মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটা হয়তো ভালো, আর বাদবাকি সব বস্তাপঁচা জিনিস। মানুষ কষ্ট করে যে অর্থ উপার্জন করে, তা নোংরামিতে ভরা চলচ্চিত্র দেখে নষ্ট করে।
চলচ্চিত্রে ইহুদি চরিত্রগুলো তখনই আনা হয়, যখন তা তাদের জন্য মঙ্গলকর হয়।
১৯১১ সালে Triangle Shirtwaist Factory-তে আগুন ধরে প্রায় ১৫০ জন পোশাককর্মী মারা যায়, যাদের বেশিরভাগই ছিল নারী। এই গল্পের ওপর ভিত্তি করে নিউইয়র্ক মেয়র একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দেন; যার নাম হবে 'The Locked Door'। গল্প লেখার দায়িত্ব পেলেন একজন ইহুদি, যিনি বিভিন্ন Holocausts-এর ওপর আগেও অনেক গল্প লিখেছেন। দুর্ঘটনায় যে নারীরা মারা যায়, তাদের চরিত্রে তিনি ইহুদি মেয়েদের চরিত্র ঢুকিয়ে দেন, যাদের নামমাত্র মূল্যে পোশাক শিল্পের মালিকরা খাটিয়ে মারছে। আগুন লাগার পর তারা বেরিয়ে আসার কোনো পথ পায়নি। কারণ, প্রধান ফটক বন্ধ ছিল। ঠিক এ রকম সুবিধাজনক জায়গাগুলোতে তারা নিজেদের চরিত্র প্রবেশ করায়। আর যখন রাবাইদের ভূমিকা আসে, তখন পূর্ণ ধর্মীয় সম্মানের সঙ্গে তাদের উপস্থাপন করা হয়।
চলচ্চিত্র শিল্পে খ্রিষ্টান ধর্মকে কতটা নোংরা করা হয়েছে, তা বিগত অধ্যায়ে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। শুধু যিশুকে ব্যঙ্গ করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি; ধর্মীয় গুরু ফাদার ও পোপদের নিয়েও অনেক নোংরা চরিত্রের জন্ম দিয়েছে। খুনি, সন্ত্রাসী, পর্নগ্রাফি, ড্রাগ ব্যবসায় ইত্যাদি প্রতিটি চরিত্রে তাদের উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে ইহুদিদের দুটি লাভ হয়েছে:
এক. খ্রিষ্টানদের ধর্মভক্তি হ্রাস পেয়েছে।
দুই. পকেটে মুনাফার অঙ্ক ভারী হয়েছে।
আজ অনেককে বলতে শোনা যায়— 'ধর্ম বলতে কিছু নেই, এটা মানুষের সৃষ্টি। যারা নিজেদের ধার্মিক বা ধর্মীয় গুরু বলে দাবি করে, তারা আসলে ধর্ম বিক্রি করে অর্থ উপার্জনের রাস্তা করছে।' মূলত এই নাস্তিকতার প্রসার ইহুদিদের হাত ধরেই হয়েছে।
সবকিছু যে ইহুদিদের দীর্ঘ ষড়যন্ত্রের অংশ, তা কি বুঝতে কষ্ট হচ্ছে? এই শিল্পে এখন একটি বিষয় নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। অনেক খ্রিষ্টান লেখক ইহুদিদের জন্য গল্প লিখছে। অথচ তারাই একসময় ইহুদিদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। আর আজ তারা হলোকাস্ট ও পৌরাণিক কাহিনিগুলো নিয়ে একের পর এক গল্প লিখে যাচ্ছে। বুঝতেই পারছেন, মানুষকে ইহুদিতন্ত্রে ধাবিত করতে তারা কতটা সফল হয়েছে।
(শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গত ৭০ বছরে শুধু হলোকাস্টের ওপর হলিউডে ২৩০টিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, যেন মানুষের মনে ইহুদিদের প্রতি সহানুভূতি তৈরি করা যায়।)
আজ কে স্টার হবে, তা প্রডিউসার ও পরিচালকদের ওপর নির্ভর করে। যদি কোনো অভিনেতা তাদের গল্পে অভিনয় করতে রাজি না হয়, তাহলে সে সেখানেই বাদ পড়ে। তাই অনেক অভিনেতাকে আজ বিভিন্ন নোংরা পথ পাড়ি দিয়ে স্টারের খেতাব অর্জন করতে হচ্ছে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতেও অনেকে স্টার হচ্ছেন। যেমন: সিনেমা পরিচালক ও প্রডিউসারের ছেলেমেয়ে ও আত্মীয়স্বজন।
আরেকটি বিষয় খেয়াল করার মতো। সবাইকে কিন্তু একই শ্রেণির স্টার বানানো হয় না। কাউকে প্রথম শ্রেণির, কাউকে দ্বিতীয় শ্রেণির, কাউকে তৃতীয় শ্রেণির। বাদবাকিরা থাকে পার্শ্ব চরিত্রে। এর ফলে কী হয়? প্রতি শ্রেণির স্টারের জন্য নির্দিষ্ট একটি পারিশ্রমিক বরাদ্দ করা হয়। দ্বিতীয় শ্রেণির কোনো স্টার চাইলেও প্রথম শ্রেণির মতো পারিশ্রমিক দাবি করতে পারবে না। আর পার্শ্ব চরিত্রের অভিনেতারা তো পরিচালক ও প্রডিউসারদের দয়া-মায়ার ওপর নির্ভর করে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন— প্রত্যেক অভিনেতাই নিজস্ব অবস্থান থেকে যথেষ্ট ভালো অভিনয় করছে। তারপরও সবাই একই শ্রেণির স্টার হতে পারছে না। মূলত এই বিভাজন আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প তৈরি করেছে। নাটক- চলচ্চিত্রের চাহিদা বাজারে যত বাড়বে, স্টারদের এমন বিভাজন ততই বাড়বে।
সংগীতশিল্প ধ্বংসে ইহুদিদের পরিকল্পনা
New York Times প্রতিষ্ঠানটির মালিক আমেরিকার একজন প্রতাপশালী ইহুদি। তবুও ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি কলাম প্রকাশ করে, যার ফলে তাদের অ্যান্টি-সেমেটিক বলে অভিযুক্ত করা হয়। কলামটির কিছু অংশ উপস্থাপন করা হলো: 'Irving Berling ও Leo Feist-সহ আরও কিছু উচ্চপদস্থ ব্যক্তি সাতটি সংগীত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমেরিকার প্রায় ৮০ ভাগ কপিরাইটযুক্ত সংগীত নকল করে বাজারে পরিবেশন করছে। একই সঙ্গে তা পর্ন চলচ্চিত্রের আবহ সংগীত (Background Music) হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। টেক্সাস প্রদেশের Federal District Court-এ এ নিয়ে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পিয়ানো থেকে শুরু করে জনপ্রিয় অনেক বাদ্যযন্ত্রের সুর তারা যথেচ্ছা নকল করে যাচ্ছে। দেখা যায়— দুই-তিনটি সংগীতের সুর একত্রিত করে তারা একটি নতুন সুর তৈরি করছে।
অভিযুক্ত সংগীত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো : Consolidated Music Corporation, 144 West Thirty-seventh street, Irving Berlin Inc, 1567 Broadway; Leo Feist Inc, 231 West Fortieth Street, T. B. Harms, Francis, Day and Hunter Inc, 62 West Forty-fifth street, Shapiro, Bernstein & Company, 218 West Forty-seventh street, Watterson, Berlin & Synder Inc, 1571 Broadway and M. Witmark & Sons Inc, 144 West Thirty-seventh street.
এই প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত Consolidated Music Corporation-এর মাধ্যমে সংঘবদ্ধ হয়ে নিজেদের পরিচালনা করছে।'
১৮৮০-এর দশকে ইউরোপ-আমেরিকার সংগীত শিল্পে বড়ো ধরনের এক বিপ্লব ঘটে। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এই শিল্পে অনেক ভারী ভারী বাদ্যযন্ত্রের আগমন ঘটতে দেখা যায়। জন্ম নেয় জনপ্রিয় অনেক সংগীত রীতি। যেমন : Monkey Talk, Jungle Sequals, Grunts & Squaks, Gasps ইত্যাদি। এই সময় বিভিন্ন ব্যান্ড হাউজগুলোর মাঝে কাঁদা ছোড়াছুড়ির ঘটনাও শুরু হয়। হঠাৎ আবির্ভূত হওয়া একটি শক্তির দাপটে বাজারের জনপ্রিয় অনেক ব্যান্ড দল তাসের ঘরের ন্যায় ভেঙে পড়তে থাকে। দিশেহারা হয়ে পড়ে সেই হাউসগুলোতে কর্মরত বাদক, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীরা। সুযোগ বুঝে সেই দাপুটে শক্তিটি অর্থের জোরে তাদের নিজেদের দলে ভিড়িয়ে নেয়। তাদের মেধাকে ব্যবহার করে তৈরি করে নতুন সব অর্কেস্ট্রা এবং সংগীত রীতি, যা আজ অবধি বাজারে টিকে আছে। বর্তমান এই শিল্পে যে ধাতবযন্ত্রকেন্দ্রিক নির্ভরতা, তা তাদের হাত ধরেই হয়েছে। এ ছাড়া জ্যাজ সংগীতের পুরোটাই ইহুদিদের আবিষ্কার।
ওপরে যে সাতটি প্রতিষ্ঠানের নাম বলা হয়েছে, তারা একাই আমেরিকার ৮০ ভাগ সংগীতশিল্প নিয়ন্ত্রণ করছে। বাকি যে ২০ ভাগ রয়েছে— তাও ইহুদিদের ছোটোখাটো প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে। অবাক না হয়ে পারা যায় না— যেদিকে তাকাই, সেদিকেই ইহুদিদের সংগীত দল! অথচ তারা আদৌ সংগীতের ব্যাকরণ বুঝে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তথাপি এটাও যে অর্থ উপার্জনের খনি হতে পারে, তা ইহুদিরা আগেই আঁচ করতে পেরেছিল।
হঠাৎ এই অশুভ শক্তিটির আগমন বুঝতে পেরে তৎকালীন সংগীত বিশেষজ্ঞগণ যেসব আশঙ্কা বাণী ব্যক্ত করেছিলেন, তা New York Times-এর সেই কলামটিতে ছাপানো হয়। যেমন :
'পশ্চিমা সংগীতশিল্প ইহুদিদের সংক্রমণে যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আমেরিকার অবস্থা তারচেয়েও খতরনাক। আজ যদি তাদের এই শিল্প থেকে নিষিদ্ধ করা হয়, তবে পুরো সংগীতশিল্পকেই বন্ধ করে দিতে হবে। এই শিল্প যেন নীরস-নিস্তেজ হয়ে পড়বে। তাদের ছলনাময়ী সংগীত সুগভীর দক্ষতায় আমাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে। প্রথমত, তাদের কিছু সারেগামা আছে, যা মানুষের মনে ত্বরিত আনন্দ তৈরি করে; যদিও তা ক্ষণস্থায়ী। এ ক্ষেত্রে তারা উচ্চ ধাতব সুর (High Metalic Music) ব্যবহার করে। দ্বিতীয়ত, তাদের সংগীতের আরেক শ্রেণি চিকন ও আবেগি সুরের মাধ্যমে হতাশাগ্রস্ত মানুষদের সাময়িক আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করে। এটা মনে নেশাগ্রস্তের ন্যায় আবহ তৈরি করে। তৃতীয়ত, আবেগপ্রবণ (Romantic) ও কল্পনাপ্রেমী মানুষদের জন্য তাদের আরেকটা শ্রেণি রয়েছে। তারা দক্ষতার সঙ্গে নিজেদের হিব্রু শিল্পকে ফুটিয়ে তুলেছে এবং তা যুবসমাজের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছে।
আজকের সংগীতশিল্পকে যারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তারা মূলত ইউরোপিয়ান ইহুদি। আজকের তরুণ প্রজন্ম প্রকৃতপক্ষে তাই গাচ্ছে, যা তারা শিখিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের বড়ো বড়ো ব্যান্ড হাউসগুলো ছাড়াও সংগীত পরিবেশনকারী কোম্পানিগুলোও তাদের আজ্ঞাধীন হয়েছে। যখনই কোনো প্রতিভাবান শিল্পীর আবির্ভাব হয়, তখন তাদের অর্থের জোড়ে কিনে নেওয়া হয়। তা ছাড়া বাজারে সংগীতের প্রতিটি বিপণিবিতানেও ইহুদিদের আধিপত্যের কমতি নেই। শহরের বিভিন্ন অলিতে-গলিতে, এমনকী পাড়া-মহল্লার আশেপাশে গড়ে উঠা বিপণিবিতানগুলোতেও তাদের এজেন্টরা বসে আছে। অথচ তাদের অধিকাংশই জ্যান্টাইল এজেন্ট! তারা কেবল সেসব সংগীতের অ্যালবাম বিক্রি করে, যার অর্ডার ইহুদিদের কাছ থেকে আসে। ফলে প্রতিভাবান কোনো খ্রিষ্টান চাইলেও তার সংগীত সাধারণ মানুষের কাছে পৌছাতে পারবে না। কারণ, তার পেছনে কোনো পৃষ্ঠপোষক নেই। ফলে তাকে বাধ্য হয়ে সেই অপশক্তির নিকট ধরনা দিতে হচ্ছে। যেমন: তাদের অন্যতম একটি প্রতাপশালী প্রতিষ্ঠান হলো Tin Pan Alley, যা আজ অবধি বাজারে টিকে আছে।'
একটি বিষয় বলে রাখা উচিত, ইহুদিরা সহজে নতুন কোনো গান বা সুর তৈরি করে না; আসলে তাদের সেই ক্ষমতাও নেই। তারা অন্য গানের সুর চুরি করে নতুন সুর করে এবং তা দিয়ে নতুন গান তৈরি করে। পুরাতন গানের বই, সারেগাম নোট, অপেরা স্বরলিপি, পল্লিগীতি ইত্যাদি সব খুঁজে খুঁজে তারা নিজেদের কাছে জমা করে। এসব মৌলিক সংগীতকে নিজেদের ধাতব যন্ত্রের (Metalic Instrument) নিচে রেখে বহুমাত্রিক সুর তৈরি করে। এভাবে তারা সংগীতজগতে নিজেদের আবির্ভাব ঘটিয়েছে। বর্তমান যুগে আপনারা যেসব গান শুনছেন, তার অধিকাংশই শেষ প্রজন্ম বা তার আগের প্রজন্মের গেয়ে যাওয়া গানের বিকৃত রূপ। এই চৌর্যবৃত্তির ওপর প্রশ্ন করা হলে তারা বলে— 'আমরা তো চুরি করছি না, কেবল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংগীতে পরিবর্তন আনছি।'
সাধারণত জ্যান্টাইলদের সংগীতানুষ্ঠানগুলোতে কেবল সম্পদশালীরাই যাওয়ার সুযোগ পায়। কারণ, জ্যান্টাইলরা যা তৈরি করে তা নিখাদ মৌলিক সংগীত। এ জন্য প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। তাই তাদের প্রতিটি অনুষ্ঠানের টিকেটের মূল্যও অনেক বেশি হয়।
১৮৮০ সালের একটি ঘটনা। জ্যান্টাইলদের একটি সংগীত ধনী-গরিব সবার মাঝে প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়, কিন্তু ধনীরা সেই সংগীত শুনতে পেলেও ব্যয়বহুল হওয়ায় গরিবরা তা থেকে বঞ্চিত হয়। ইহুদিরা এই সুযোগটিই লুফে নেয়। তারা পরিকল্পনা করল প্রতিটি গান নকল করার। কিন্তু গানগুলোর সারেগাম এতটাই কঠিন ছিল, তারা তা ভাঙতেই পারল না। ফলে নতুন আরেকটি পরিকল্পনা আটল; সুর একই থাকবে, সাথে নতুন গীতিকবিতা জুড়ে দেওয়া হবে এবং জ্যাজ ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে মূল সুরের মাঝে সামান্য বৈচিত্র্য আনা হবে।
মজার বিষয় হচ্ছে— তারা এখানেও চরমভাবে পরাজিত হলো, এমনকী নিজেদের হাসির পাত্র বানিয়ে ছাড়ল। মানুষকে ধোঁকা দিতে তারা ইংরেজি বাক্যের পরিবর্তে ইডিশ বাক্য ব্যবহার করল। তাই তাদের শিল্পীরা কী উচ্চারণ করছিল, তার একটা শব্দও সাধারণ মানুষ বুঝতে পারেনি। শুধু নাক টেনে সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুরো সময়টা পার করে দেয়। প্রথমে একক সংগীত পরে যৌথ সংগীত; প্রতিটি গানেই ছিল একই সুর। দর্শক-শ্রোতারা এই রম্য অভিনয় দেখে হাসতে হাসতে ভেঙে পড়েছিল।
এরূপ পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ১৮৮৫ সালে Tin Pan Alley নিউইয়র্ক শহরে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। তারা ভালো কণ্ঠশিল্পী, লেখক ও প্রতিভাবান সুরকারের সমন্বয়ে একটি পরিপূর্ণ দল গঠন করে। অবুঝ শিল্পীরা ভেবেছিল— নামকরা এই সংগীত প্রতিষ্ঠানটি হয়তো বাজারে তাদের প্রতিষ্ঠিত হতে পৃষ্ঠপোষকতা করে যাবে। কিন্তু তাদের যে কেবল ব্যবহারের উদ্দেশ্যেই এই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা অনেক পরে বুঝতে পারে। শুরু হয় মৌলিক সংগীত রচনা এবং বাজারের বিখ্যাত সব সংগীতের সারেগাম উদ্ধারের মিশন।
এই উদ্যোগের পেছনে প্রথমে যার নাম আসে, তিনি হলেন Julius Witmark। তার হাতে সংগীতশিল্প প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকতার ছোঁয়া পায়। তার সংগীত প্রতিষ্ঠানের নাম M. Witmark & Sons, যা ১৮৮৬ সালে নিউইয়র্ক শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে তিনি ছিলেন একজন ব্যালাড (Bllad/লোকসংগীত শিল্পী)।
এরপর আসে Irving Berlin-এর নাম। তার প্রকৃত নাম Isadore Baline। পেশা ছিল গান লেখা ও সুর করা। ১৮৯৫-১৯১৮ সাল পর্যন্ত সংগীত শিল্পের ইতিহাসে 'Rag-time' বলা হয়। এই সময়টিতে জ্যাজ সংগীত পুরো আমেরিকায় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ওঠে। Irving Berlin ছিলেন এই সংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ। তার বিশেষ একটি কৃতি হলো— ১৯১১ সালে পরিবেশিত 'Alexander's Rag-Time Band' গানটি। এর জনপ্রিয়তা আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। এই একটি গানই তাকে রাতারাতি অগাথ সম্পদের মালিক বানিয়ে দেয়। এই সংগীতের পেছনে Joe Frisco-এর অবদান নেহায়েত কম নয়। তাকে সে সময় বলা হতো জ্যাজ সংগীতের স্বঘোষিত বাদশাহ।
কিন্তু আপনি যদি তার জনপ্রিয় অ্যালবাম 'Berlin Big Hits'-এর গানগুলোর ওপর গবেষণা করেন, তবে দেখবেন— প্রতিটি গানের সুরই জোড়া-তালি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। আরও ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে— প্রতিটি গানে ব্যবহার করা হয়েছে অকথ্য অশ্লীল শব্দ। অনেকের মনে হবে এই গানগুলো যেন পর্ন ছবির ধারা বিবরণী। এমন কয়েকেটি গান হলো: 'Harem Life'; 'You Cannot Make Your Shimmy Shake on Tea'; 'I Like it' এবং 'Mary Green, seventeen'।
খুব ভালো হতো, যদি পুরো একটি গান এখানে তুলে ধরা সম্ভব হতো। কিন্তু অকথ্য ভাষা দিয়ে এই বইটি নোংরা না করাই ভালো। গানগুলো শুনে অনেকে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছে, ইনি কি সেই মাতা মেরি, যিনি যিশুকে গর্ভে ধারণ করেছিলনে!
সংগীত শিল্পে তাদের দ্রুত সফলতা অর্জনের আরেকটি বড়ো কারণ রয়েছে। তাদের অশালীন ও অকথ্য গানগুলো সহজেই তরুণ সমাজের মাঝে জায়গা করে নিয়েছে। তারা মুখে যা উচ্চারণ করছে, তার অর্থ হয়তো নিজেরাও জানে না। তারা গানের কথার চেয়ে সুরের প্রতি অধিক আগ্রহী। তাই জনপ্রিয় সব মৌলিক সংগীতের সুরগুলো ব্যবহার করে একাধিক সংগীত তৈরি করে যাচ্ছে। এটা ঠিক যে, তাদের তৈরি করা নতুন গানগুলোর সুর-তাল-লয়ের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়, তবে সুরের ছন্দ ও কাঠামো একই থাকে।
বিভিন্ন শ্রোতার চাহিদার ধরন অনুযায়ী তারা সংগীত বাজারকে কয়েক শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে। প্রথম শ্রেণিতে থাকছে তরুণ শ্রোতা এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে বয়স্ক শ্রোতা। এর মধ্যে রয়েছে আরও অনেক বিভাজন। যেমন: কেউ উচ্চ ধাতব গান পছন্দ করে, কেউ চিকন সুরের গান পছন্দ করে, কেউ-বা মাঝারি সুরের গান পছন্দ করে। এবার তারা কোনো একটি মৌলিক গানের ছন্দ ঠিক রেখে সুর-তাল-লয়-এর মধ্যে পার্থক্য এনে প্রতিটি শ্রেণির জন্য আলাদা আলাদা গান ও সুর তৈরি করে। এভাবেই ছোট্ট একটি কৌশল ব্যবহার করে এবং খুব অল্প পরিশ্রমে তারা একাধিক গান তৈরি করে চলেছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রকৃত শিল্পীরা কখনো পেরে উঠছে না। কারণ, তারা চৌর্যবৃত্তিতে অভ্যস্ত নয়।
মানুষ এখন মৌলিক সংগীত নিয়ে একেবারেই গবেষণা করে না। ফলে এই শিল্পে বিশেষজ্ঞ না হলে কারও পক্ষে ইহুদিদের চৌর্যকর্ম উদ্ধার করা সম্ভব নয়। আর যারা সাধারণ শ্রোতা, তাদের পক্ষে তো কখনোই নয়। এবার কিছু বিখ্যাত গানের নাম জানিয়ে রাখছি, যা চাইলে যাচাই করে দেখতে পারেন: I'll Say She Does; You Cannot Shake That Shimmy Here; Sugar Baby; In Room 202; Can You Tame Wild Wimmen? চাইলে আরও অনেক গানের নাম এই তালিকায় আনা সম্ভব।
সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক সম্প্রদায়, অভিভাবক শ্রেণি ও সুশীলসমাজ আজ একটি বিষয় ভেবে খুবই বিচলিত, কী এমন নেশা যুবসমাজকে পেয়ে বসেছে যে, তাদের একদল সারাক্ষণ কেবল হতাশার গান শুনতেই পছন্দ করে? আরেক দল তো অশ্লীল ভাষার মধ্যেই ডুবে আছে!
যখন আমাদের সন্তানদের ড্রাগের নেশা পেয়ে বসেছিল, তখন কিন্তু শাসন করেও লাভ হয়নি। কারণ, ড্রাগ নিজ দায়িত্বে তাদের হাতে এসে হাজির। যতদিন না মূল উৎসে আঘাত হানা সম্ভব, ততদিন এই অপশক্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। ড্রাগের মতো সংগীতশিল্পও এখন আমাদের যুবসমাজকে পেয়ে বসেছে। আজ যেকোনো সামাজিক পালা-পার্বন বা অনুষ্ঠানে এই গানগুলো উচ্চ শব্দে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর ফলাফলও আমরা অনুধাবণ করতে পারছি। এসব গান কখনো আমাদের মনে চিরস্থায়ী আনন্দের জোগান দিতে পারে না; বরং আমাদের থেকে অধ্যাত্মিকতা নামক বিষয়টি ধ্বংসের মাধ্যমে কামুক করে তুলছে।
ইডিশদের খেলায় চিরস্থায়ী বলতে কিছু নেই। আপনি যেকোনো একটি পিয়ানো ক্লাবে যান, তাদের জিজ্ঞেস করুন তিন সপ্তাহ আগে কোন গানটি জনপ্রিয় ছিল? দেখবেন সে বলতে পারছে না। কারণ, সব সংগীতের ছন্দ তো একই রকম। কোনটা বাদ দিয়ে সে কোনটার নাম বলবে? শুধু যে সংগীত শিল্পের বেলায় এমনটা ঘটছে তা নয়; থিয়েটার, চলচ্চিত্র, পোশাক-আশাক, খাদ্য, রুচি, ফ্যাশন ইত্যাদি সবকিছুতে একই রূপ। এত কিছুর পরও আমরা মাঝে মাঝে ভালো জিনিস পাচ্ছি। হয়তো কোনো নির্মাতা তার সর্বস্ব উজাড় করে, মুনাফার প্রতি মায়া না করে কেবল নিজেরে শখ মেটাতে নান্দনিকতার জন্ম দিচ্ছে!
জাতিগতভাবে আজ আমরা এতটা বিভক্ত হয়ে পড়েছি যে, চাইলেও এই শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখতে পারব না। এর কারণ আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এমতাবস্থায় ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগ ব্যতীত এই অপসংস্কৃতি থেকে নিজেদের মুক্ত রাখার ভিন্ন কোনো উপায় নেই।
সংগীত শিল্পে অশ্লীলতা সংযোজনের ইতিহাস
সংগীত চর্চা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। আমাদের পূর্বপুরুষদের যুগেও এই শিল্পের চর্চা ছিল এবং সেখানেও আবেগ, বিরহ, ভালোবাসা ও দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ছিল। সে যুগেও তরুণরা চলার পথে গুণগুণ করে গান গাইত, কিন্তু তখনকার গানের লিপি আর আজকের গানের লিপির মধ্যে রয়েছে অনেক ফাঁরাক। সত্যি বলতে, এটাকে জনপ্রিয় শিল্পরূপে জ্যান্টাইলরাই প্রতিষ্ঠা করেছে। আর ইহুদিরা এই শিল্পকে নোংরা-আবর্জনা দিয়ে ভর্তি করছে। প্রেমের গান এখন আর ভালোবাসার জন্ম দেয় না; জন্ম দেয় কাম-উদ্দীপনার।
তরুণ সমাজ হয়তো বলবে— 'বর্তমানে আমরা যেসব জনপ্রিয় গান শুনছি, তার মধ্যে খারাপের তো কিছু দেখছি না। এসব শুনে তো আমাদের ভালোই লাগে!' তাদের উদ্দেশ্যে বলা প্রয়োজন, পছন্দ-অপছন্দ কিন্তু মানুষের অভ্যাসের একটি অংশ। এই অভ্যাস যে দুই-এক বছরে তৈরি হয়েছে, তা নয়। আগের অধ্যায়ে 'Rag-time' নিয়ে সামান্য আলোচনা করা হয়েছে। এটা এমনই একটি সময়কাল, যখন সংগীত শিল্পে খুব পরিকল্পিত উপায়ে নোংরা আবর্জনার আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে। সেই ইতিহাস তরুণসমাজ মোটেও জানে না। যে প্রজন্মগুলো এই বিপ্লবপরবর্তী সময়কালে বড়ো হয়েছে, তারা এসব সংগীত শুনেই বড়ো হয়েছে। তারা কী করে বুঝবে কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ!
১৮৮০ সালের পূর্বেও এই নোংরা সংগীত সংস্কৃতির চর্চা ছিল, তবে তা একটি ভৌগলিক সীমারেখায় আবদ্ধ ছিল। সমাজ থেকে বহুদূরে নির্দিষ্ট কোনো বায়েজিখানায় এসব নোংরা গানের চর্চা হতো। মুক্ত উদ্যানে বা জনসম্মুখে এসব গান পরিবেশনের কথা কল্পনাও করা যেত না। কিন্তু ১৮৮০ সালের পর হঠাৎ এক বিবর্তন এসে আমাদের পুরো সভ্য সংস্কৃতিকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়।
পুরোনো গানের কথা কখনো ভোলা সম্ভব নয়। সেসব গান বহু যুগ পরেও অমর হয়ে থাকে। কিন্তু বাজারে আজকে যা জনপ্রিয় গান, তার কথা এক-দুই মাস পর কেউ মনে রাখবে কি না সন্দেহ। আপনাদের হয়তো 'Listen to the Mocking Bird' গানটির কথা মনে আছে। বহু বছর পরও তা আমাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। তবে যে পাখির কথা এখানে বলা হয়েছে, তা এখন হাঁস-মুরগির গানে পরিণত হয়েছে।
আরও আছে Ben Bolt, Nellie Grey, Juanita, The Old Folks at Home, The Hazel Dell, When You and I were Young, Maggie, Silver Threads Among the Gold। এগুলো আমাদের যুগের বিখ্যাত কিছু আবেদনময়ী গান। আজকের তরুণ সমাজ যারা এই অধ্যায়টি পাঠ করছে, তাদের উচিত নিজ উদ্দ্যোগে এই গানগুলো শোনার চেষ্টা করা। তারপর এগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন, বর্তমানে আপনারা কী ধরনের গানের চর্চা করছেন।
এমন আরও কিছু গান হলো— Annie Rooney, Down Went McGinty to the Bottom of the Sea, She's Only a Bird in a Gilded Cage, After the Ball is over। এদের মধ্যে নোংরামির কোনো ছায়া নেই।
মনোবিজ্ঞানীরা বলে, হতাশা ও বিরহের গান কিছুটা হলেও মানুষের মনে অলসতার জন্ম দেয়। তথাপি, My Wild Irish Rose ও In the Baggage Coach Ahead বিরহের গান দুটিতে এমন কিছু খুঁজে পাবেন না, যা আপনাকে খারাপের দিকে উসকে দেবে।
Jim Thornton-এর বিখ্যাত কিছু গান হলো— In the Shade of the Old Apple Tree, When the Sunset Turns the Ocean's Blue to Gold, Down by the Old Mill Stream, My Sweetheart's the Man in the Moon। আরও আছে Paul Dresser-এর বিখ্যাত গান, On the Banks of the Wabash এবং Charles Lawlor-এর বিখ্যাত গান, The Sidewalks of New York। এগুলো হলো সংগীত ইতিহাসের সম্পদ।
একসময় এ দেশে পাশ্চাত্য ও ভারতীয় সংগীতেরও ভালো চর্চা ছিল। যেমন : Cheyenne, Hop on My Pony; Arawanna; Trail of the Lonesome Pine।
এরপর আসে আফ্রিকান সংগীত; যা আমাদের সমাজে সাপ হয়ে ঢুকে সর্বস্তরে বিষ পৌঁছে দেয়। এমন কিছু গান হলো— Congo; High Up in the Coconut Tree এবং Under the Bamboo Tree।
আফ্রিকান সংগীতের কাল থেকেই 'Rag-time'-এর আবির্ভাব। সংগীতশিল্প পরিবেশনে সংযোজন ঘটে 'Cake Walk' সংস্কৃতির (একটি নৃত্য দল, যেখানে মূলত নারীদের উপস্থিতি থাকে)। এমন একটি গানের উদাহরণ হচ্ছে— There'll Be a Hot Time in the Old Town Tonight। গানের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে আবির্ভাব ঘটে একটি নতুন শব্দের 'ma baby'। সবার কানে বাজতে শুরু করে 'ma baby'। অপ্রয়োজনীয় ও অকথ্য বিষয়বস্তু দ্বারা গানের বাক্যগুলো শুরু হয়।
এরপর এসেছে 'Vamp Music'-এর যুগ। হাজারো নির্বোধ মেয়ে তাদের সৌন্দর্য বিকিয়ে দিতে মডেলিং পেশায় অংশগ্রহণ শুরু করে। Vamp সংস্কৃতির প্রথম আবির্ভাব হয় একটি ফরাসি উপন্যাসে, যা পরে নিষিদ্ধ করা হয়। সেখানে থিয়েটার প্রডিউসার Morris Gest গ্রিকদের প্রেমের দেবী 'Aphrodite'-কে নগ্নরূপে উপস্থাপন করে। ইহুদিরা যেভাবে তাদের সংগীত শিল্পে হেরেমবাসিনী মেয়েদের কাল্পনিক চরিত্র উপস্থান করেছে, তা Vamp-এর সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে গেছে। এই কাজে তারা আমেরিকার সাদা চামড়ার কম বয়সি মেয়েদের যথেচ্ছা ব্যবহার করতে কুণ্ঠিত হতো না। দর্শকদের মনে ঢুকিয়ে দিয়েছে— হেরেমবাসী মেয়েদের প্রকৃত চরিত্র হয়তো তা-ই, যা তারা উপস্থান করেছে।
এত সব অধঃপতনের পরও আমরা তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারছি না। কারণ, Anti-Defamation League। এই প্রতিষ্ঠানটি থিয়েটার, চলচ্চিত্র, ক্রীড়া, শিক্ষা, নেশাজ দ্রব্য ইত্যাদি প্রতিটি কাজেই ইহুদিদের অভিভাবক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। তারা খুব ভালো করেই জানে, কোন পথে আমাদের আটকাতে হবে। কোথাকার আগুন পরে কোথায় গিয়ে লাগে— এই ভয়ে জ্যান্টাইলরা প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।
সংগীত ও চলচ্চিত্র শিল্পে ইহুদিদের আবির্ভাবের মধ্যে যথেষ্ট মিল আছে। তাদের বিরুদ্ধে পূর্ব থেকেই জ্যান্টাইলদের বিরূপ ধারণা ছিল, তাই ইহুদি সংগীতশিল্পী বা তাদের কোনো অনুষ্ঠানের নাম শুনলে তারা উলটো দিকে পথ ধরত। তাদের থেকে দূরত্বের সর্বাত্মক মাপকাঠি বজায় রাখত, কিন্তু এখানেও তারা ধরা খায়। কারণ, ইহুদিদের রয়েছে 'ছদ্মনাম' কৌশল। এই একই কৌশলে তারা চলচ্চিত্র, থিয়েটার, শেয়ারবাজার ও ক্রীড়াশিল্পকেও নিজেদের করে নিতে থাকে। তারা বিভিন্ন ছদ্মনামে নিজেদের ব্যান্ডগুলোকে আমাদের মাঝে পরিচিত করা শুরু করে। যেমন: Geological Society এবং Scientific Society |
অমর শিল্প তৈরি করলে তো দ্রুত অর্থ উপার্জন সম্ভব নয়। তাই তাদের অমরত্বের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন প্রচুর গান, যা থেকে কাঁচা পয়সা উপার্জন করা সম্ভব। 'Rocked in the Cradle of the Deep'-এর সাথে I'm Always Chasing Rainbows গানটিকে মিলিয়ে দেখুন। এই দুটির গানের মিল বোঝার জন্য অন্তত সংগীত বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। এমন নয়, 'Rocked in the Cradle of the Deep' নকল করে দ্বিতীয় গানটি তৈরি করা হয়েছে। মূলত দুটো গানই নকল হয়েছে 'Opus of Chopin' থেকে। এটা নিয়ে আদালতে দীর্ঘদিন মামলা হয়েছিল, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এরপর থেকে তারা গান চুরি করার অলিখিত বৈধতা পায়। গানের বাক্য যদি হুবহু না মেলে, তাহলে তাকে আর নকল বলা যায় না— এটাই ছিল আদালতের কথা। আর এটাও ঠিক, আইনজীবীরা তো আর সংগীত বিশেষজ্ঞ নয় যে গান চুরি ধরতে পারবে!
এমন নয় যে, বাজারে এসব উগ্র-সংগীতের উপচেপড়া চাহিদা রয়েছে। আপনাদের হয়তো মনে আছে, বইটির একদম শুরুর দিকে উল্লেখ করা হয়েছে—
'বিক্রয় শিল্পে ইহুদিদের মতো দক্ষ জাতি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। বিক্রয় কাজে প্রতিবন্ধকতা তারা কোনোভাবে সহ্য করতে পারে না। একদিক দিয়ে আটকালে তারা নতুন আরেকটি পথ খুঁজে বের করে। বিজ্ঞাপন সংস্কৃতির আবির্ভাবও ইহুদিদেরই হাত ধরেই।'
এটাই সংগীত শিল্পে তাদের সফলতার মূল কারণ। পণ্যের বিক্রয় বৃদ্ধি করতে প্রয়োজনে তারা নোংরা কাজ করতেও প্রস্তুত। এর প্রমাণ হচ্ছে— ইহুদিদের বিজ্ঞাপন হাউসগুলো। তারা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে অশালীন ভঙ্গিমায় নারী মডেলদের উপস্থাপন করছে। তাদের শারীরিক সৌন্দর্যকে পণ্য বানিয়ে বিলবোর্ড, পোস্টার, ফ্লায়ার, ব্রসিউর ও ম্যাগাজিন ছাপাচ্ছে এবং তা সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে। স্বভাবতই সমাজের হাতেগোনা কয়েকজন বুদ্ধিদীপ্ত নীতিবান মানুষ ব্যতীত সবাই এসব বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ছে। তারা যেসব মিউজিক ভিডিও তৈরি করছে, তাতে উঠতি বয়সি অনেক তরুণ-তরুণী অবচেতন মনে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এসব কারণে তারা এই শিল্পে অল্প সময়ে প্রচুর অর্থকড়ি উপার্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এখন যদি অর্থকে সফলতার মাপকাঠি ধরা হয়, তবে বলতে হবে ইহুদিরাই সফল।
তাদের আরও একটি বিশেষণ হলো— নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকা। অনেক পণ্যের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ যা পছন্দ করে, মূলত সেটাকেই জনপ্রিয় পণ্য বলা হয়। কিন্তু এমন যদি হয়— বাজারে কেবল একটি পণ্য রয়েছে এবং সাধারণ মানুষ তা ক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে, তখন আর তাকে জনপ্রিয় পণ্য বলা চলে না। আজকের বাজারে যে গানগুলোকে আমরা জনপ্রিয় সংগীত বলে অভিহিত করছি, তা কেবল মাত্রাতিরিক্ত পুনরাবৃত্তির ফলাফল।
বিদেশি কোনো রাজকীয় অতিথি যখন আমেরিকা ভ্রমণে আসে, তখন তাদের আতিথেয়তায় জ্যাজ সংগীত পরিবেশন করা হয়। Prince of Wales যখন আমেরিকা ভ্রমণে আসেন, তার দেখাশোনার কাজে যে ছেলেটিকে রাখা হয়েছিল, তার নাম Rose। রোজের আমন্ত্রণে তিনি ইডিশ সংগীত নির্মাণ হাউস পরিদর্শনে হাজির হন। Prince of Wales ইডিশ সংগীত শুনে অসম্ভব মুগ্ধ হন; যদিও সেগুলো চুরি করে তৈরি করা ছিল। এরপর থেকে তিনি ইডিশ সংগীতের ভক্ত হয়ে যান।
আশা করি ইতোমধ্যেই উপলব্ধি করতে পারছেন, Charlie Chaplin-এর যে কমেডি চলচ্চিত্রগুলো আমরা দেখি, তার সাথে যে আবহ সংগীত (ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক) জুড়ে দেওয়া হয়, তা সম্পূর্ণ জ্যাজ মিউজিক। কমেডি ছাড়া বিভিন্ন চলচ্চিত্রের থিম সংগীত তৈরিতেও আজ জ্যাজ বাদ্যযন্ত্রসমূহ ব্যবহৃত হচ্ছে। চলচ্চিত্রের কোনো একটি অংশে দেখবেন, পেছন থেকে গান ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং গল্পের নায়ক তার সাথে ঠোঁট নেড়ে নেড়ে গান গাওয়ার অভিনয় করছে। এগুলোও জ্যাজ সংগীত।
মনে করুন, আপনার বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেওয়ার জন্য কোনো একটি রেস্টুরেন্ট বা কফি হাউসে গেলেন। খেয়াল করবেন— পেছন থেকে বাদকদল সংগীত বাজাচ্ছে, এর সাথে চলচ্চিত্রের নায়ক ঠোঁট নেড়ে নেড়ে অভিনয় করছে। আপনি বুঝতেও পারবেন না, কীভাবে এই সংগীতগুলো আপনার অবচেতন মনে জায়গা করে নিচ্ছে। একসময় আপনি নিজেও এই সংগীতগুলো গুনগুন করে গাইতে শুরু করবেন। শপিংমল, কফিশপ, সেলুন, রেস্তোরাঁ ইত্যাদি যেখানেই যান না কেন দেখবেন, একই গান বাজছে কিংবা একই ছন্দের বিভিন্ন গান বাজছে।
ধরুন আপনার ছোট্ট মেয়েকে সাথে নিয়ে কিছু জামা কিনতে গেলেন। বাসায় এসে চেয়ারে আরাম করে বসামাত্র দেখবেন, আপনার মেয়ে শপিংমলে শোনা গানটি বিরবির করে গাচ্ছে। অর্থাৎ আপনি চাইলেও এই উগ্র সংগীতচর্চা এড়িয়ে যেতে পারছেন না।
ইহুদিদের প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির সংগীত রীতিতে বিভক্ত যেমন: Vamps, Harems, Hooch ও Hula Hula। তারা প্রতিটি সংগীত রীতির মধ্যে ইচ্ছা করেই প্রতিযোগিতা বাধিয়ে দিয়েছে, ঠিক যেমনটা মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানগুলো একই প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য ব্রান্ড বাজারে এনে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাধিয়ে দেয়।
এখন কারও যদি Harem শুনতে ভালো না লাগে, তবে তার জন্য রয়েছে Vamp। অর্থাৎ আপনি যা-ই খুঁজুন না কেন, একটি দোকানেই সবকিছু পাবেন। আর বাজারে এই একটি দোকান বাদে আর কোনো দোকানের অস্তিত্ব নেই।
নোংরা গান লিখতে তো আর সৃজনশীলতা লাগে না! তাই হাজার হাজার গান তৈরি করতে ইহুদিদের তেমন পরিশ্রমও করতে হয় না। যদি এমন হয়— তাদের তৈরি করা কোনো গানে অশ্লীলতার আবহ নেই, তবে বুঝবেন সেই গানটি অন্য কোথাও থেকে চুরি করা হয়েছে! তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বছরব্যাপী যে পরিমাণ গান তৈরি করে, তার সিংহভাগ অন্য কোথাও থেকে চুরি করা।
ইহুদিরা পরিকল্পিতভাবে কিছু সমালোচক গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছে। নতুন কোনো ইডিশ সংগীত মুক্তি পেলে তাদের ভাড়া করা সমালোচকদের একপক্ষ সেই গানের পক্ষে সাফাই গায়, অপর পক্ষ বিপক্ষে সাফাই গায়। আর জ্যান্টাইল সমাজ আগ্রহ ভরে বসে থাকে বিতর্কসভার চূড়ান্ত ফলাফল কী হয়, তা জানার জন্য। তারা সেই গানই ক্রয় করতে বাজারে যায়, যার পক্ষ বিতর্কে বিজয়ী হয়েছে। এই যখন অবস্থা, তখন তাদের গর্দভ বলার চেয়ে মস্তিষ্ক-বিকৃত জ্যান্টাইল বলাই শ্রেয়।
এভাবেই Tin Pan Alley প্রতিষ্ঠান আমেরিকার পুরো সংগীত বাজার নিজেদের করে নিয়েছে। আমেরিকার পর তাদের অপসংস্কৃতির আগ্রাসন পৃথিবীর কোন অংশে গিয়ে পড়বে, তা বলা খুবই কঠিন। তবে নিশ্চিত করে বলা যায়, ধীরে ধীরে তা পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে।
ক্রীড়াশিল্পে ইহুদি জুয়াড়িদের দৌরাত্ম্য
প্রথমেই বলে রাখি, খেলাধুলায় ইহুদিদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। ইহুদিদের মধ্য থেকে কেউ ভালো ক্রীড়াবিদ হতে পারেনি। এটা তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নয়। শারীরিক বা স্নায়ুবিক কোনো দুর্বলতার কারণে যে তারা খেলাধুলায় কম আসক্তি অনুভব করে তা নয়। হয়তো এটাও ইহুদি জাতিগত বৈশিষ্ট্য! কলেজ ও বিদ্যালয়গুলোতে ইহুদিদের সন্তানরা কেবল তখনই খেলাধুলায় অংশ নেয়, যখন তাদের নিয়ে কেউ কটু কথা বলে।
তবে শারীরিক খেলাধুলায় পারদর্শী না হলেও ইহুদিরা জুয়া খেলায় যথেষ্ট পারদর্শী। তাদের জুয়াড়িদের নোংরা থাবায় জনপ্রিয় প্রতিটি খেলাই বহুবার কুলষিত হয়েছে। দঙ্গল খেলায় (Wrestling) কিছু পেশিবহুল খেলোয়ারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে মঞ্চে দাঁড় করিয়ে দেয়। মুষ্টিযুদ্ধের (Boxing) খেলায়ও একই ঘটনা ঘটে। প্রতিবছর ঘোড়াদৌড় খেলার জন্য কেবল প্রশিক্ষণ মাঠেই হাজারো ঘোড়া আহত হয়, পরে অযত্ন-অবহেলায় সেগুলো মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। কেন নিরীহ একটি প্রাণীকে নিয়ে এমন কুৎসিত খেলার আয়োজন করা হলো? কারণ, এতে রয়েছে প্রচুর মুনাফা উপার্জনের সম্ভাবনা। বাস্কেটবলও তাদের নোংরা হাতের স্পর্শ থেকে মুক্তি পায়নি।
১৮৭৫ সালে বেসবল খেলা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ধাক্কা খায়। জুয়া, গুন্ডামি, মাদকসেবন ও অব্যবস্থাপনার কারণে জনগণ কমিটির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। একই অব্যবস্থাপনা ঘটতে দেখা যায় ১৯১৯ ও ১৯২১ সালেও। দর্শকরা মাঠ ছেড়ে বেড়িয়ে এসে টিকেট আগুনে পুরিয়ে দেয়। বিতর্কের সূত্রপাত হয় ১৯১৯ সালে, যখন শিকাগো আমেরিকান ক্লাবের কাছে শিকাগো ন্যাশনালস ক্লাব পরাজিত হয়। গ্যালারিতে রটে যায়, উভয় দলের মধ্যে অর্থের লেনদেন হয়েছে। বেড়িয়ে আসে কিছু পরিচিত ইহুদি ব্যক্তির নাম। তখন বিক্ষুব্ধ দর্শক মাঠ থেকে বেরিয়ে আসে।
১৯২০ সালে শিকাগো বনাম ফিলাডেলফিয়া জাতীয় দলের খেলা শুরু হওয়ার ঠিক আগের দিন শিকাগো ক্লাবের নিকট এক অদ্ভুত খবর আসে। কিছু পরিচিত ইহুদি জুয়াড়ি ফিলাডেলফিয়া ক্লাবের পেছনে বড়ো অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছে। শিকাগো ক্লাব বিষয়টি দ্রুত ম্যাচ রেফারি Grover C. Alexander-কে জানায়। তিনি খেলা শুরুর আগ মুহূর্তে টুর্নামেন্ট পরিচালনা কমিটিকে পুরো বিষয়টি অভিহিত করেন, কিন্তু তারপরও সেই খেলা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। ফলে জুয়াড়িরা নির্বিঘ্নে উপার্জন করে নেয় নগদ কাঁচা পয়সা।
খেলা শেষে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। অবাক করা বিষয়, তদন্ত রিপোর্টে শিকাগো ক্লাবের আটজন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়! চারদিকে এ নিয়ে প্রচণ্ড আন্দোলন শুরু হয়। ফলে দ্বিতীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং প্রথম কমিটির ফলাফল বাতিল করা হয়। দ্বিতীয় কমিটির অনুসন্ধানে নতুন পাঁচজন অভিযুক্তের নাম উঠে আসে, যাদের সবাই ছিল ইহুদি। তাদের নাম হলো : Carl, Benny, Ben, Louis ও Levi। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হয়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি Replogle বলেন— 'উল্লেখকৃত ব্যক্তিরা ছাড়াও তো আরও অনেক অপরাধী আছে। তাদেরও খুঁজে বের করতে হবে। শুধু এই পাঁচজনকে শাস্তি দিয়ে কিই-বা এমন হবে!' তবে তাদের যেন কোনো প্রকার সাজা দেওয়া না হয়, সে জন্য শিকাগোর বিখ্যাত ইহুদি আইনজীবী Alfred S. Austrian পেছন থেকে কাজ করেন।
Albert D. Lasker হলেন American Jewish Committee-এর অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য। তিনি সেই বিখ্যাত 'Lasker Plan'-এর রচয়িতা, যার মাধ্যমে পুরো বেসবল খেলার নিয়ন্ত্রণ ইহুদিদের হাতে চলে যায়। তবে একটি বিষয় বলে রাখা ভালো— এই পরিকল্পনার প্রকৃত রচয়িতা কিন্তু তিনি ছিলেন না। এর প্রকৃত রচয়িতা ছিলেন Alfred S. Austrian; যিনি Mr. Lasker ও Replogle-এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তিনি Lasker সাহেবকে নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে পরিকল্পনাটি চালিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
১৯২০ সালে শিকাগো বনাম ফিলাডেলফিয়ার পাতানো খেলার মূল কারিগর ছিলেন তিনিই। খেলার রেফারি Hendryx-কে তদন্ত কাজে ডাকা হলে তিনি কী জবানবন্দি দিয়েছেন, তা কখনো প্রকাশ করা হয়নি।
এরপর আসে Arnold Rothstein-এর নাম। একাধিক ক্যাসিনো ছাড়াও তার ড্রাগ ও নেশাজ দ্রব্যের অবৈধ্য ব্যাবসা ছিল। তিনি নিউইয়র্ক ন্যাশনাল ক্লাবের অন্যতম স্টকহোল্ডার ছিলেন। তাকে বলা হতো একজন 'পিচ্ছিল ইহুদি'। কারণ, তিনি সব সময় হাত ফসকে বেরিয়ে যেতেন। তাকে কেন যে আটকে রাখা যেত না, সেই ব্যাখ্যা কেউ-ই দিতে পারে না।
দ্বিতীয় কমিটির রিপোর্টে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলে— উকিল সাহেব আদালতে তার বিপক্ষে সাক্ষী তলব করে, কিন্তু বিচারালয়ে সেই সাক্ষীকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। শিকাগো বা নিউইয়র্কের কোনো পত্রিকা প্রতিষ্ঠান যেন তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক কিছু না লিখে, সে জন্য তাদের কাছে আগে থেকেই প্রচুর উৎকোচ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। এমন পরিস্থতিতে কেউ যে তার বিরুদ্ধে কলাম প্রকাশ লিখবে না, এটাই স্বাভাবিক। তা ছাড়া এ ঘটনায় Mr. Austrian ছিলেন তার পক্ষের আইনজীবী।
২৮ জুলাই, ১৯২১, Evening Mail-এর সাংবাদিক Hugh S. Fullerton একটি কলামে প্রকাশ করেন—
'খেলার মাঠে দুর্নীতির দায়ে যে একবার অভিযুক্ত হয়েছে, তাকে কেবল একটি থেকে নয়; বরং সব ধরনের খেলা থেকেই বহিষ্কার করা উচিত। কারণ, তাদের নোংরা হাতের ছোঁয়ায় প্রতিটি শিল্পই প্রাণ হারাবে। নিউইয়র্কে Rothstein নামে একজন জুয়াড়ি আছে, যার ভয়ে পুরো শহর আতঙ্কগ্রস্ত। খেলার মাঠে যে বড়ো বড়ো জুয়া লেনদেনের গল্প শোনা যায়, তার প্রতিটির সঙ্গেই সে জড়িত বলে ধারণা করা হয়। কিছুদিন আগের বেসবল কেলেঙ্কারির সঙ্গেও সে সরাসরি জড়িত ছিল। সেই খেলাকে কেন্দ্র করে অন্তত ২ লাখ ডলারের লেনদেন হয়েছে, কিন্তু তার ক্ষমতার ভয়ে কেউ মামলা করতে পারছে না। এরপরও প্রতিটি খেলায় তার জন্য ভিআইপি বক্সসহ অনেক সুবিধা বরাদ্দ থাকে।'
এই কলামে তিনি আরও কয়েকজন জুয়াড়ির নাম উল্লেখ করে তাদের নিউইয়র্ক ক্লাবগুলো থেকে বয়কট করার সুপারিশ করেন।
এরপর আসে Harry Grabiner-এর নাম। তিনি হোয়াইট সক্স ক্লাবের ম্যানেজার Charles A. Comisky-এর স্থলাভীষিক্ত হয়ে ক্লাবটির দায়িত্বে আসেন। বেসবল খেলায় ক্লাবগুলোকে উৎসাহিত করতে 'Honor Systm' নামক একটি নতুন পদ্ধতি চালু করা হয়।
এ নিয়ম অনুযায়ী হোম ক্লাবটি তার টিকেট বিক্রির একটি অংশ ভ্রমণকারী দলকে প্রদান করবে। টিকেটের মূল্য, আসন ও অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে একটি গ্যালারিকে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করা হয়। যেমন : box gate, pass gate, grandstand gate ও bleacher gate। কী পরিমাণ টিকেট বিক্রি হলো— তা খেলা শুরুর আগে, মাঝামাঝি সময়ে ও খেলা শেষে উভয় দলের দুজন প্রতিনিধি পর্যবেক্ষণ করে। এরপর পূর্বনির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী নিজেদের মধ্যে অর্থ ভাগাভাগি করে নেয়।
Grabiner ক্লাবটির পরিচালনা দায়িত্বে আসার পর থেকে ভ্রমণকারী দলগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠে— টিকেট বিক্রি নিয়ে যে হিসাব দেখানো হচ্ছে, তা অনেকটাই সন্দেহজনক। স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকের পরিমাণ আর প্রকাশিত টিকেট বিক্রির হিসাবের মধ্যে বিশাল ফাঁরাক দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ তদারকি করতে বেসবল কমিটি ও ভ্রমণকারী দল গুপ্তচর বসায়। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর সন্দেহ সত্য প্রমাণিত হয়। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা বেসবল এখন বিনোদনের নাম করে টিকেট বাণিজ্য করছে! দুষ্টচক্র এই শিল্পে এমনভাবে প্রবেশ করেছে যে, এখন পুরো খেলাটাই বর্জন করতে হবে।
বেসবল জগতে সবার মুখে মুখে যে জুয়াড়ির নাম শোনা যায়, তিনি হলেন Abe Attell। তার মতো দক্ষ ফিক্সার মাঠে দ্বিতীয়জন ছিল না। স্বয়ং ইহুদি মহলগুলোও তাকে ফিক্সার বলতে দ্বিধাবোধ করত না। তাদের ১০ জনের একটি সংঘবদ্ধ টিম ছিল, যারা প্রতিটি খেলা শুরুর পূর্বে চাঁদা তুলে জুয়া খেলত। এমনও শোনা যায়, World Baseball Series-এর কোনো কোনো খেলাকে কেন্দ্র করে তারা ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত চাঁদা তুলেছে। অসংখ্য প্রমাণাদি থাকার পরও আদালত তাকে শাস্তি দিতে পারেনি।
এরপর আসে Barney Dreyfuss-এর নাম। তিনি পিটসবার্গ ন্যাশনাল লিগ ক্লাবের অন্যতম মালিক ছিলেন। 'Lasker Plan' বাস্তবায়নে সক্রিয় হওয়ার পর থেকে তিনি বেসবল জগতে বিতর্কিত হতে শুরু করেন। যদি প্রশ্ন করা হয়, বেসবল শিল্প ধ্বংস হওয়ার প্রধান কারণ কী? উত্তর একটাই, মাত্রাতিরিক্ত ইহুদি। তারপরও তদন্ত রিপোর্টগুলোতে হাতেগোনা মাত্র কয়েকজনের নাম প্রকাশিত হয়েছে। এমন শত শত তদন্ত কমিটি তৈরি করেও কাজ হবে না। কারণ, তাদের গুন্ডামি এতটা বেড়ে গেছে, অনেক ক্লাবমালিক খেলোয়ারদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাটুকুও হরণ করতে বাধ্য হয়েছে।
যে খেলোয়াড়দের তারা ছোটো থেকে লালন-পালন করে বড়ো করেছে, জুয়াড়ি দলগুলো অর্থের লোভ দেখিয়ে তাদের কিনে নেবে— এমন আশঙ্কা ক্লাবগুলোকে সর্বক্ষণ তটস্থ রেখেছে। এমনকী ম্যাচ রেফারিরাও তাদের লালসার হাত থেকে মুক্তি পায়নি। যে রেফারিরা ফিক্সারদের লোভনীয় প্রস্তাবে রাজি হয়নি, তাদের কতটা অপমান ও লাঞ্ছনার স্বীকার হতে হয়েছে, তা কেবল তারাই জানে।
যদিও ইহুদিদের চরিত্রে খেলোয়াড়সূলভ আচরণের লেশমাত্র দেখা যায় না, তারপরও বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের দেখা যেত। Benny Leonard হলেন একজন ইহুদি বক্সিং খেলোয়াড়। পেশাদার জীবনে জিতেছেন অসংখ্য পুরস্কার। তবে মজার বিষয় হলো— পুরো ক্রীড়া জীবনে তিনি একবারের জন্যেও শরীরে আঘাত পাননি, কিন্তু অনেক বিখ্যাত বক্সিং খেলোয়াড় আছেন, শারীরিক আঘাতের দরুন যাদের খেলাই ছেড়ে দিতে হয়েছে।
Kid Lavinge-এর কানে ঘুষি লাগার কারণে তিনি শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেন। বুকে সজোড়ে ঘুষি লাগায় Ad Wolgast-কে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। Battling Nelson এতটাই আঘাত পান, শরীরে বড়ো ধরনের অস্ত্রপচার করতে হয়। অথচ Benny Leonard, Willie Ritchie ও Freddie Welsh-এর মতো খেলোয়াড়রা সারা জীবনে একটি আঘাতও পাননি! এটা নিয়ে তারা আবার গর্বও করেন! এর পেছনের গল্প হলো— তারা যা খেলেছে, তার সবই ছিল পাতানো খেলা। প্রকৃত খেলোয়াড়রা শারীরিক আঘাতের ঝুঁকি নিয়েই খেলতে আসেন, কিন্তু তারা আসেন নাটক করতে।
ইউরোপ-আমেরিকার অধিকাংশ ক্রীড়াশিল্প এখন ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে। মঞ্চে বা মাঠে যে খেলাগুলো আমরা দেখি— বিশেষত মুষ্টিযুদ্ধ সম্পর্কিত খেলাগুলো তার অধিকাংশই বানানো নাটক। খেলা শুরু হওয়ার আগে একদল খেলোয়াড়কে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা হয়। তারপর তাদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেওয়া হয়। আমরা দেখি— একজনের ঘুষি খেয়ে অন্যজন লুটিয়ে পড়ছে। কিছুক্ষণ পর সে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখে ঘুষি মারছে। এভাবে কিছুক্ষণ অভিনয় করার পর সে-ই জয়ী হয়, যাকে আগে থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে। তারাই বক্সিং ও রেসলিং টুর্নামেন্টের আয়োজন করছে, রেফারি নিয়োগ দিচ্ছে, খেলোয়াড় বাছাই করছে, প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, কে কোন খেলায় বিজয়ী হবে তা নির্ধারণ করে রাখছে এবং টিকেট মূল্য বাড়ানোর জন্য কালোবাজারিদের ভাড়া করেছে। এসবের কোনো কিছুই সাধারণ মানুষ জানে না। এমতাবস্থায় বাজি ধরে জয়লাভ করা একজন জ্যান্টাইলের পক্ষে কীভাবে সম্ভব?
চলচ্চিত্র শিল্পের ন্যায় এখানেও পত্রিকা প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু খেলোয়াড়কে বাছাই করে বাজারে 'স্টার' বানায়, যেন জুয়াড়িদের মাঠ গরম রাখা যায়। ধীরে ধীরে ক্রীড়াশিল্পও যে 'বক্স অফিস' কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ পৃথিবীতে যদি গাধার চেয়েও কোনো নির্বোধ প্রাণী থেকে থাকে, তাহলে জ্যান্টাইল খেলোয়াড়দের সে নামেই সম্বোধন করা উচিত। তারা খুব কাছ থেকেই দেখছে— ইহুদি জুয়াড়িদের দৌড়াত্ম্যে আমাদের প্রতিটি ক্রিড়াশিল্প আজ কতটা ধ্বংসের মুখে। তারপরও কোনো খেলোয়াড় যদি জুয়াড়িদের সঙ্গে হাত মেলায়, তাহলে তাকে আর কিই-বা বলা যেতে পারে? চাইলে এমন অজস্র উদাহরণ এখানে তুলে ধরা সম্ভব!
Jack Johnson-এর নাম আশা করি অনেকে শুনেছেন। বক্সিং খেলায় তিনি চ্যাম্পিয়নশিপ খেতাবও পেয়েছিলেন। এই ভদ্রলোক বিলাসিতার দোষে পুরস্কারের অর্থ এত দ্রুত খরচ করে ফেলে যে, অচিরেই দরিদ্রতা নেমে আসে। এমতাবস্থায় একদিন Frazee ও Curley তাকে একটি পাতানো খেলায় অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেয়। বলা হলো Jess Willard-এর সঙ্গে পরবর্তী খেলায় যদি সে হেরে যায়, তাহলে তাকে ৩৫,০০০ ডলার দেওয়া হবে। Jes Willard তখন দুর্বলশ্রেণির একজন খেলোয়ার ছিল। কেউ তাকে পাত্তাই দিত না। কিন্তু সে Jack Johnson-এর মতো খেলোয়াড়কে হারিয়ে দিলো! জুয়াড়ি দুজন প্রচুর অর্থের বাজি ধরে পুরোটাই জিতে নিল। এই জুয়াড়ি হলো সেই Harry Frazee, যারা নিজেকে সৃষ্টিকর্তার মনোনীত সম্প্রদায়ের অধিবাসী বলে দাবি করে। সেই যে Jack Johnson-এর ক্রীড়া-জীবনে ভাটা পড়ল, পরে আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
এতে যে জুয়াড়ি দলের খেলোয়াড়ের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, তা নয়। কারণ, পৃথিবীতে গরিব মানুষের শেষ নেই। তাদের মধ্যে পেশিবহুল ও শক্ত-সামর্থ্যবান পুরুষেরও অভাব নেই। তা ছাড়া অল্প সময়ে শরীরের পেশিগুলোকে ফুলিয়ে নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় ড্রাগ তো জুয়াড়িদের কাছে আছেই। সুতরাং অল্প সময়ে নতুন খেলোয়াড় তৈরি করে নেওয়া তাদের জন্য কোনো ব্যাপারই না। শুধু ড্রাগ দিয়ে তো আর স্টার বানানো যায় না। এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের রয়েছে সমুদ্র পরিমাণ অর্থ। তাদের এত পরিমাণ অর্থ রয়েছে যে, তা দিয়ে প্রতিটি ক্লাব কিনে নেওয়া সম্ভব।
ম্যাচ পাতানোর অভিযোগে যখন কোনো খেলোয়াড়কে আদালতে তোলা হয়, তখন জুয়াড়িরা ঘাপটি মেরে বসে থাকে। খেলোয়াড়দের রক্ষা করার কোনো তাগিদ জুয়াড়িদের থাকে না। আর কেনই-বা রক্ষা করতে যাবে! যে পরিমাণ অর্থ খরচ করে আইনজীবী ভাড়া করবে, তা দিয়ে তো নতুন আরেকজন খেলোয়াড় তৈরি করতে পারবে। ফলে সেই আদিকাল থেকে নিরীহ মানুষরাই কেবল ক্রসফায়ারের স্বীকার বা বলির পাঠা হয়ে আসছে। আর প্রকৃত অপরাধীরা আইনকে বৃদ্ধাঙুল দেখিয়ে আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের চক্রান্তে আমাদের কত প্রতিভাবান খেলোয়াড় যে বলির পাঠা হয়ে হারিয়ে গেছে, তার তালিকা উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। এই মাত্রাতিরিক্ত জুয়াড়ি এবং সৃষ্টিকর্তার তথাকথিত মনোনীত সম্প্রদায়ের অধিবাসীদের যদি ক্রীড়াজগৎ থেকে বিতাড়িত করা সম্ভব না হয়, তবে হয়তো একদিন ক্রীড়াজগৎ-ই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কারণ, দূষণ বা নোংরামির বাহন কখনো সুস্থ বিনোদনের মাধ্যম হতে পারে না।
হুইস্কি উৎপাদন শিল্প নিয়ে ইহুদিদের ষড়যন্ত্র
একটা সময় ছিল যখন হুইস্কিকে বলা হতো আভিজাত্যের প্রতীক। এটি ছিল ইউরোপ- আমেরিকার খুব জনপ্রিয় পানীয়। পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় যেকোনো অনুষ্ঠানেই এর প্রচলন ছিল। এর উৎপাদন প্রক্রিয়াতে ছিল নান্দনিক সৌন্দর্যের বহিঃপ্রকাশ।
আমাদের পূর্বপুরুষরা ঘোড়া ও গল্পের বই যেমন পছন্দ করত, তেমনিভাবে শরাবও পছন্দ করত। প্রাচীন লেখক ও রাজাদের কাছে এটা ছিল গর্বের প্রতীক। কারণ, স্বাস্থ্য মান ও ভেজালশূন্যতা প্রাধান্য দিয়ে পরিশুদ্ধ আঙুরের রস থেকে এই শরাব তৈরি হতো। সে সময় বাজারে এমন অনেক শরাব পাওয়া যেত, যার সাথে বহু প্রজন্মের প্রাকৃতিক নির্যাস মিশে থাকত।
বলে রাখা ভালো, হুইস্কি ও শরাব উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আহামরি কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য কেবল ভাষাগত ব্যবহারে। যেমন: হুইস্কি হলো সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা। আর শরাব সাহিত্যিক ভাষা, যা ব্যবহৃত হয় গল্প-কবিতা-উপন্যাসে। বিশুদ্ধ পানি ও ফলের রস ছাড়া আরও একটি উপাদান হুইস্কি উৎপাদনশিল্পে বিশেষভাবে জরুরি তা হলো— ধৈর্য। মানুষ কেবল শখ ও আবেগ থেকেই এই শিল্পে কাজ করত। এই শিল্পে কাজ করতে যে নান্দনিক দক্ষতার প্রয়োজন, তা অর্জন করতে দীর্ঘ সময়, পরিশ্রম ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন। বাণিজ্যিক মুনাফা এখানে ছিল গৌণ বিষয়।
তাহলে এমন কী ঘটল, যার দরুন সচেতন মানুষেরা আজ হুইস্কি বর্জন করা শুরু করেছে! হঠাৎ এই অনীহার কারণ কী? মানবসমাজ কি আগের চেয়ে বেশি পরিশুদ্ধ হয়ে গেছে? যা ছিল আভিজাত্যের প্রতীক, তার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে সরকারের কেন এত কড়াকড়ি? কেন তার স্বাস্থ্যমান নিয়ে এত প্রশ্ন তোলা হচ্ছে?
কারণ, এই শিল্পে আজ ইহুদিদের থাবা পড়েছে। যে হুইস্কিকে আজকের সুশীলসমাজ বর্জন করছে, তার সাথে কয়েক প্রজন্ম আগের হুইস্কির রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। শুধু তাই নয়; আমাদের প্রাত্যহিক খাদ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত এমন কোনো ভোগ্যপণ্য নেই, যা তাদের অশুভ থাবা থেকে মুক্তি পেয়েছে। হয়তো অনেকে হুইস্কি পান করে না। কিন্তু কীভাবে এর গুণগত মান নষ্ট করে এটিকে একটি অস্বাস্থ্যকর পানীয়তে পরিণত করা হলো, তার ইতিহাস জেনে রাখা উচিত। কারণ, এর সাথে চারপাশে ঘটমান অনেক ঘটনার সাদৃশ্য মেলানো সম্ভব হবে।
যে নান্দনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হুইস্কি উৎপাদন করা হয়, তা ভাষায় বর্ণনা করা সত্যি-ই কঠিন। গল্প-সাহিত্যে (ইউরোপীয় সাহিত্য) যে অমর পানীয়ের কথা শোনা যায়, তা মূলত তিনটি অঞ্চলে তৈরি হতো। স্কটল্যান্ডের গ্যানলিভেটে, আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাব্লিনে ও আমেরিকার কেনটাকি প্রদেশের ব্লুগ্রাস শহরে। প্রথমত, এই অঞ্চলগুলো ইহুদিমুক্ত ছিল। দ্বিতীয়ত, এখানকার জ্যান্টাইলরা ভালো হুইস্কির জন্য অন্তত ১০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষ করত। তৃতীয়ত, এখানকার খাবার পানি ছিল অতি বিশুদ্ধ। এ কারণে এখানকার হুইস্কি ব্রান্ডগুলোর বিশ্বজোড়া খ্যাতি ছিল। যেমন: Pepper, Crow, Taylor ইত্যাদি।
অনেকেই হয়তো Bourbon Whisky-এর নাম শুনে থাকবে। এটি বিশ্বের জনপ্রিয় ব্রান্ডগুলোর একটি। এটি তৈরি হতো হুইস্কি উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত আমেরিকার কেনটাকি প্রদেশে। একবার এর মূল কারিগর উৎপাদন খরচ কমাতে প্রতিষ্ঠানটিকে ইলিনয়েসে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করে। কিন্তু ইলিনয়স ও বোরনের পানি এক নয় জেনে তিনি হতাশ হন। বোরনের পানি গ্লেন ক্রেকের চুনাপাথর মিশ্রিত পানি আর ইলিনয়সে পাচ্ছে শস্য কাজে ব্যবহৃত নদীর পানি। সামান্য এই পার্থক্যেই হারিয়ে যেতে পারে সু-বিখ্যাত একটি ব্রান্ডের বিশেষত্ব। তাই তিনি কারখানা স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাতিল করেন। এ কারণে আঞ্চলিক বিশেষত্বের জন্য একই হুইস্কি পৃথক পৃথক নামে পরিচিত। যেমন: 'রাম' সবচেয়ে ভালো হয় জ্যামাইকাতে, 'পোর্ট শরাব' ভালো হয় পর্তুগালের ডোরো শহরে, 'শ্যাম্পেইন' ভালো হয় ফ্রান্সের রাইহেম শহরে এবং 'বিয়ার' ভালো হয় ব্যাভারিয়াতে।
যেই না বিশুদ্ধ 'হুইস্কি' বাজার থেকে গায়েব হয়ে গেল, অমনি 'বিয়ার' এসে জায়গা দখল করে নিল। শুরুতে কেবল সচেতন মানুষই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছিল। ফল ও সবজি রস হতে মিষ্টিজাত উপাদানসমূহ আলাদা করে ভারী পানীয় তৈরির যে কার্যপদ্ধতি, তাকে গাজন প্রক্রিয়া বলা হয়। প্রাকৃতিক উপায়ে এই কাজ করা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। কিন্তু ইহুদিরা এমন সব কৌশল উদ্ভাবন করে, যা দ্বারা কৃত্রিম উপায়ে অতি অল্প সময়ে গাজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়। এভাবেই তারা অতি অল্প সময়ে প্রচুর হুইস্কি উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করে। ফলে তাদের উৎপাদন ব্যয় বহুলাংশে কমে যায়। কারণ, আগে যে পানীয় তৈরিতে লাগত ১০ বছর, তা এখন হচ্ছে ১০ দিনে! কিন্তু তারপরও স্বাদ-রস-গন্ধে তাদের আলাদা করার কোনো উপায় নেই।
যেহেতু ভালো হুইস্কি তৈরি হতে দীর্ঘ সময় লাগে, তাই এর বিক্রয়মূল্য বেশি হবে— এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইহুদিদের উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় স্বল্পমূল্যে বিক্রি করতে পারত। তা ছাড়া বাজারজাতকরণে ইহুদিদের মতো দক্ষ জাতি যে গোটা দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নেই, তা আগেই বলা হয়েছে। বিভিন্ন দোকান, সুপারস্টোর, সেলুন ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের সাথে তারা গড়ে তোলে মজবুত ব্যবসায়িক জোট। ইহুদিদের পানীয় বিক্রি করে এসব ব্যবসায়ীরা বেশ ভালো উপার্জন করত। কারণ, বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় এসব পণ্য বেশি বিক্রি হতো। আবার বিক্রি বেশি হওয়ায় তাদের কমিশনের পরিমাণও বেশি হতো। ফলে এ জাতীয় হুইস্কি খুব দ্রুত বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। আগে যেখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বছরে এক বোতল হুইস্কি কিনতেই হিমসিম খেতো, আজ পানির দরে কিনতে পারছে। অপর দিকে ভালো জ্যান্টাইল প্রতিষ্ঠানগুলো; যারা নিজেদের আবেগ ও ভালোবাসা পুঁজি করে দীর্ঘ সময় নিয়ে প্রাচীন গৌরবময় হুইস্কি উৎপাদন ধারা অব্যাহত রেখেছিল, তারা বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে হারিয়ে যেতে শুরু করে। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না— তারা যা পান করছে, তা কৃত্রিমতায় ভরা বিষাক্ত পানীয় বৈ কিছু নয়।
বিষয়টির ওপর ১৯১৬ সালে John Foster Fraster তার লেখা The Conquering Jew বইয়ে উল্লেখ করেন—
'ইহুদিরা হলো আমেরিকান হুইস্কি শিল্পের রাজা। National Liquor Dealer-এর তালিকাভুক্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শতকরা ৮০ ভাগ সদস্যই এই গোত্রের সদস্য। শুধু তাই নয়; এখানকার যে প্রদেশগুলোতে তামাকের ভালো চাষ হয়, সেই অঞ্চলগুলোতে তারা অন্য প্রতিষ্ঠানকে ভিড়তে পর্যন্ত দেয় না। ফলে স্বল্পমূল্যে ইহুদিদের কাছে তামাক বিক্রি করা ছাড়া কৃষকদের ভিন্ন কোনো উপায় থাকে না। এর দরুন ইদানীং সিগারেট শিল্পে তাদের দাপট বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। American Tobacco Company যে পরিমাণ সিগারেট তৈরি করে, তা দিয়ে দেশের কেবল ১৫ ভাগ চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। বাকি ৮৫ ভাগ আসে ইহুদিদের গুদাম থেকে।'
১৯০৪ সালে আমেরিকার Bureau of Chemistry-এর প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন Dr. Wiley. সে বছর তিনি বাজারে চলমান হুইস্কি বিতর্কের ওপর একটি বিবৃতি প্রদান করেন। এর অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো—
'ভালো হুইস্কি প্রস্তুত করা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার, যা অনেকাংশে ব্যয়বহুল। এ প্রক্রিয়ায় অন্তত চার বছর সময় লাগে, যেন অ্যালকোহল অন্যান্য খাদ্য উপাদান জারণ (Oxidation) প্রক্রিয়া সম্পাদন করে— জৈব উপায়ে পানীয় রঙিন করতে পারে। এ জন্য উপাদানগুলো দীর্ঘদিন গুদামজাত করতে হয়, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়।
ইহুদিরা কৃত্রিম উপায়ে কিছু কৌশল আবিষ্কার করে, যা দ্বারা মাত্র কয়েক ঘণ্টায় হুইস্কি তৈরি করা সম্ভব। একই পানীয় জ্যানটাইলদের প্রস্তুত করতে লাগে কয়েক বছর। প্রথম ধাপে, ফল বা সবজি রসের সাথে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি মিশিয়ে পরিমাণ বাড়ানো হয়। দ্বিতীয় ধাপে, দগ্ধ চিনি ও কেমিক্যাল মিশিয়ে পানীয় রঙিন করা হয়। তৃতীয় ধাপে, রুচিকর স্বাদ ও গন্ধ সংযোজন করা হয়। এভাবে মাত্র কয়েক ঘণ্টার বা কয়েক দিনে প্রচুর পানীয় উৎপাদন করা সম্ভব, যা আপাত দৃষ্টিতে স্বাদে-গন্ধে সত্যিকারের হুইস্কি বলে মনে হবে। তবে এতে রয়েছে প্রচুর স্বাস্থ্যঝুঁকি। খাঁটি হুইস্কির যুগ বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে তা কেবল গল্প-উপন্যাসেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব।'
Jewish Encyclopedia-তে উল্লেখ আছে—
'১৮৯৬ সালে রাশিয়ান সরকার হুইস্কিশিল্পকে রাষ্ট্রীয়করণ করায় অনেক ইহুদি পরিবারের ভাগ্যে দুর্দশা নেমে আসে।'
অতি মুনাফালোভী এই সম্প্রদায়টির হাত থেকে ভদকাশিল্প পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে রাশিয়ার সরকার তা রাষ্ট্রীয়করণ করে। পোল্যান্ড ও রোমানিয়াতেও একই ঘটনা ঘটে।
তাদের ব্যাংকাররা রোমানিয়ান কৃষকদের জমি আত্মসাৎ করে ভদকা ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিত। পরে একই কৃষকদের দিয়ে স্বল্প মজুরির বিনিময়ে সেই জমিগুলোতে ভদকা তৈরির মূল উপকরণ চাষ করানো হতো। বিষয়টি জানতে পেরে আমেরিকার সুশীলসমাজ হুইস্কি শিল্প রক্ষায় প্রেসিডেন্ট দপ্তরে জোর দাবি জানাতে থাকে। এরপর সরকারি দপ্তর থেকে ঘোষণা আসে, যারা এই শিল্পে জড়িত হবে; হোক উৎপাদনকারী বা খুচরা ব্যবসায়ী— সবাইকে যোগ্যতা প্রমাণ করে লাইসেন্স নিতে হবে। যদি এর বাইরে কারও দোকানে বা গুদামে হুইস্কি মজুদের সন্ধান পাওয়া যায়, তবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু ইহুদিরা তো পারদের মতো! তাদের কোনো কিছু দিয়েই আটকে রাখার উপায় নেই। তাদের যে জালেই আটকানো হোক না কেন, ঠিকই ছিদ্র গলে বেড়িয়ে আসবে। লাইসেন্স আইন বলবৎ হওয়ায় ইহুদিদের বৈধ বাণিজ্যের পথ বন্ধ হয়ে গেলেও অবৈধ উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায়নি। এ পর্যায়ে তারা খুব সূক্ষ্ম একটি খেলা খেলে। এর চূড়ান্ত পরিণতি কী ছিল তা অধ্যায়টির শেষাংশে দেখতে পাবেন। তাদের পরিকল্পিত চক্রান্তটি তিনটি ধাপে নিচে উপস্থাপন করা হলো।
প্রথম ধাপ
ইহুদিরা সে সময়ের বিখ্যাত সব হুইস্কি ব্রান্ডের লোগো নকল করে নিজেদের বোতলে লাগিয়ে বাজারে সরবরাহ করতে শুরু করে। বাজারের বিপণন চক্রটির সঙ্গে ইহুদিদের ভালো সম্পর্ক ছিল বলে তারা আপসে বিষয়টি মেনে নেয়। কিন্তু চাইলেও তো আর মূল্য কমাতে পারছে না! কারণ, মূল্য তালিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। যদি আপসে নকল পানীয়ের মূল্য কমায়, তারপরও বিষয়টি প্রকৃত উৎপাদনকারীর কানে চলে যাবে।
ফলে কোম্পানির যে গাড়িগুলো এক গুদাম থেকে অন্য গুদামে এবং দূরবর্তী স্থানে হুইস্কি পৌঁছে দিত, সেসব গাড়ির চালকদের সঙ্গে আঁতাত করতে শুরু করে। তারা চালকদের সঙ্গে চুক্তি করে গাড়িগুলোকে বিভিন্ন ঝোপঝাড় বা জঙ্গলে নিয়ে আসত। তারপর গাড়ির হুইস্কিগুলো পালটে নিজেদের বোতল সেখানে উঠিয়ে দিত। পুলিশি তদন্তে পাওয়া যায়, James E. Pepper-এর বোতলগুলোতে যে হুইস্কি পাওয়া যাচ্ছে, তা ইহুদিদের উৎপাদিত পানীয়। সে সময় বেশ কয়েকজন অপরাধীর নামও প্রকাশ পেয়েছিল, কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া বেশি দূর এগোতে পারেনি।
দেখা গেল, লাইসেন্স করেও কোনো লাভ হচ্ছে না। যে ভেজাল বন্ধ করতে সুশীল সমাজের এত আন্দোলন, তা আগের মতোই রয়ে গেছে। ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে— এই নোংরা কাজে এমন সব বিখ্যাত হুইস্কি ব্রান্ড জড়িয়ে পড়েছে, যাদের রক্ষায় একসময় মানুষ আন্দোলন করেছিল। শুধু হুইস্কিই নয়; যত ধরনের পানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে, তত দিনে প্রায় সবকটি-ই বিষাক্ত হয়ে পড়েছে।
১৯১৩-১৪ সালে Bonfort's Wine & Spirits Circular প্রতিষ্ঠানটি একটি কলাম প্রকাশ করে। তাতে উল্লেখ্য করা হয়—
'বিখ্যাত সব ব্রান্ডের নামে যেসব হুইস্কি ও স্পিরিট আজ বাজারে বিক্রি হচ্ছে, তা সবই ভেজালে পরিপূর্ণ। এই বাজার এতটা লাভজনক, একটি মহল মৌমাছির ন্যায় ঝাঁকে ঝাঁকে এই শিল্পের ওপর চেপে বসেছে। অবৈধ ও ভেজাল মিশ্রিত পানীয় আমাদের সমাজে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে তারা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক বিভিন্ন পার্বণ ও ধর্মীয় উৎসবগুলোতে ঐতিহ্য রক্ষার্থে আজ আমরা যেসব হুইস্কি পান করছি, তা রাসায়নিক উপাদানে তৈরি পানীয় ব্যতীত আর কিছুই নয়। এর মধ্যে ফলমূল বা ভেষজ উদ্ভিদের সামান্যতম নির্যাস নেই। কেবল কণ্ঠ ও গলনালিকে শান্ত করতে আমরা বাজারের এসব নোংরা ও বিষাক্ত সব পানীয় গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছি। এমতাবস্থায় আমরা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।'
পরিস্থিতি যখন এতটা জটিল, তখন সুশীলসমাজ হুইস্কি পান করাই ছেড়ে দেয় এবং সবাইকে এ পানীয় বর্জনে আহ্বান জানায়। এই বর্জন আন্দোলন ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পরে এবং এর সঙ্গে অনেক সংগঠন যুক্ত হয়। এই আন্দোলনে Young Men's Christian Association-এর অবদান কখনো ভোলার নয়। ক্রীতদাস বিতর্কের পর হুইস্কি-বিতর্ক আমেরিকার সবচেয়ে বড়ো সমস্যায় রূপ নেয়। প্রবল আন্দোলনের মুখে আমেরিকান প্রশাসন বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে এই পানীয় উৎপাদন ও বণ্টন প্রক্রিয়ায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বাধ্য হয়।
দ্বিতীয় ধাপ
১৯২১ সালের এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত Central Conference of American Rabbis-এ রাবাই Leo M. Franklin-এর বক্তব্যের খানিকটা অংশ তুলে ধরা হলো—
'ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে বিনয়ের সাথে সম্মানিত কংগ্রেস সভাসদগণের নিকট আর্জি জানাতে চাই, ধর্মীয় উৎসব এবং শাস্ত্রীয় আচার পালনের নিমিত্তে সংশোধিত হুইস্কি আইনে ইহুদিদের কিঞ্চিৎ ছাড় দেওয়া উচিত। আমাদের বিভিন্ন ধর্মীয় আচারে শরাব একটি ঐতিহ্যময় ও বাধ্যতামূলক বিষয়। শরাবহীন খিডিস রাতগুলো আজ তার সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। ধর্মীয় আচার পালনে হাজার বছর ধরে এ রাতে আমরা আঙুরের রস পান করে আসছি। আমাদের প্রার্থনা শুরু হয় আঙ্গুর রস দিয়ে তৈরি বিশেষ এক শরাব পানের মধ্য দিয়ে।
আমাদের বিশ্বাস, দেশ ও জনগণের স্বার্থে যা ভালো, আপনারা তা-ই করছেন। বিগত কয়েক দশকে হুইস্কিশিল্প যে প্রাচীন গুণমান হারিয়ে বসেছে, তা বলা বাহুল্য। কিন্তু তারপরও অন্যান্যদের ন্যায় আমরাও এ দেশের নাগরিক। এ দেশের জল-হাওয়ায় নিজেদের সঁপে দিয়েছি এবং দেশের সংবিধানের ওপর পূর্ণ শ্রদ্ধা ব্যক্ত করছি। মহামান্য সভাসদগণ, যে সংবিধানের বাস্তবায়নে আপনারা অহর্নিশ কাজ করে যাচ্ছেন, সেখানে উল্লিখিত ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়টি কি আপনারা ভুলে গেছেন? আজও মিলিয়ন মিলিয়ন ইহুদি নাগরিক এ দেশের উন্নয়নে রাত-দিন কাজ করে যাচ্ছে। তারা এ দেশকে মনে-প্রাণে নিজেদের দেশ বলে স্বীকার করে নিয়েছে। তাহলে আপনারা কীভাবে তাদের আবেগের বিষয়টি (হুইস্কি) নতুন আইন পাসের সময় উহ্য রাখতে পারলেন?
আমি এতটুকু বাড়িয়ে বলছি না। গত এক বছরে অসংখ্য রাবাইয়ের পক্ষ থেকে ১৫০টি চিঠি আমার নিকট এসেছে, যেখানে সবাই হুইস্কি উৎপাদনের অনুমতি চেয়ে আর্জি করেছে। আমি সত্যতা যাচাই করে দেখেছি, প্রতি দশটির মধ্যে নয়টি চিঠির উদ্দেশ্য ধর্মীয় উৎসব ও শাস্ত্রীয় আচার পালনে হুইস্কির উৎপাদনের অনুমতি লাভ করা। যেহেতু নতুন আইন অনুযায়ী অনুমতি ব্যতীত এই পানীয় উৎপাদন পুরোপুরি নিষিদ্ধ, তাই আপনাদের অনুমোদন একান্ত আবশ্যক।
গত কয়েক দশকে এই শিল্প নিয়ে যে বিতর্কের জন্ম হয়েছে, তা আমরা অস্বীকার করছি না। সেই ভেজাল উৎপাদকদের মধ্যে যে আমাদেরও কিছু সদস্য জড়িয়ে ছিল, তাও অস্বীকার করছি না। তবে আমাদের পাশাপাশি খ্রিষ্টানদেরও তো অনেক সদস্য এ প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল। তা ছাড়া গুটিকয়েক অপরাধীর জন্য পুরো একটি সম্প্রদায় শাস্তি পাবে— এটাও সভ্য সমাজে কাম্য নয়। আশা করি, কংগ্রেস সভাসদগণ বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করবেন এবং সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনপূর্বক আমাদের ধর্মীয় আচার পালনে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করবেন।'
তাদের আর্জি কংগ্রেস পার্লামেন্টে উঠলে সভাসদগণের মধ্যে এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। একপক্ষ এই শিল্প পুনরায় চালু করার পক্ষে, অন্যপক্ষ এর বিপরীত দিকে অবস্থান নেয়। সবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, এই শিল্প কেবল ইহুদিদের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এতে জ্যান্টাইলদের কোনো অংশগ্রহণ থাকবে না। তবে ইহুদিদের সবাই ইচ্ছেমতো হুইস্কি উৎপাদন করতে পারবে না। এই অনুমতি কেবল রাবাইদের জন্য প্রযোজ্য। তারা প্রত্যেকে সিনাগাগের জন্য বাৎসরিক ১০ গ্যালন হুইস্কি উৎপাদন করতে পারবে।
তৃতীয় ধাপ
বাৎসরিক ১০ গ্যালন পরিমাণে খুব বেশি নয়, কিন্তু ইহুদিদের জন্য ছোট্ট একটি ছিদ্রই যথেষ্ঠ। যেহেতু রাবাই ব্যতীত অন্য কেউ এই পানীয় উৎপাদন করতে পারবে না, তাই তারা দলবেঁধে সরকারি দপ্তরগুলোতে নিজেদের নাম তালিকাভুক্ত করতে শুরু করে। ফিলাডেলফিয়া, ফ্লেরিডা, নিয়ইয়র্কসহ আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মতো অজস্র সিনাগাগ গড়ে উঠা শুরু করে। সরকারি নিয়ম ছিল— অনন্ত ৫০ জন উপাসনাকারী না হলে নতুন কোনো সিনাগাগ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই একই ব্যক্তি নিজের নাম অসংখ্যবার পরিবর্তন করে একাধিক সিনাগাগের অধীনে তালিকাভুক্ত হতে শুরু করে। ধরুন, ফ্লোরিডা প্রদেশের অরল্যান্ড শহরে ৫০ জন ইহুদি বাস করে। কিন্তু তারা নিজেদের নাম একাধিবার পরিবর্তন করে সরকারের খাতায় ৩০০ জনের নাম দেখায় এবং ছয়টি সিনাগাগ খোলার অনুমোতি নেয়। একই সঙ্গে জন্ম নেয় ছয়জন রাবাই, যাদের কাছে ৬০ গ্যালন হুইস্কি উৎপাদনের অনুমতি থাকবে।
যদিও প্রত্যেককে ১০ গ্যালন উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাবাইদের বাড়িতে শত শত লিটার হুইস্কি পাওয়া যেত। Rabbi Cohen নিজেদের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, বেশি উৎপাদন করা হচ্ছে যেন কিছু নষ্ট হয়ে গেলেও শাস্ত্রীয় আচার পালনের দিনে কোনো ঘাটতি না পড়ে। নাম পরিবর্তন করে রাবাইদের সংখ্যা বৃদ্ধির যে পরিকল্পনা, তার মূল হোতাও এই ব্যক্তিই ছিলেন।
অপরদিকে, সাধারণ মানুষকে হুইস্কির প্রতি পুনরায় আবেগপ্রবণ করে তুলতে তারা থিয়েটার, চলচ্চিত্র ও সংগীত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করতে শুরু করে।
১৫ বা ২০ মিনিটের এমন কোনো নাটক পাওয়া যেত না, যেখানে হুইস্কিকে একবারের জন্যও উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে এর চাহিদা বাড়তে শুরু করে। কিন্তু বাজারে তো হুইস্কির অস্তিত্ব নেই, আছে কেবল ইহুদিদের বাড়িতে। জ্যান্টাইল যুবকরা অতি গোপনে সেসব বাড়িতে গিয়ে বোতলে বোতলে পানীয় নিয়ে আসত। ফলে তাদের কাঁচা অর্থ উপার্জনের রাস্তা বন্ধ হলো না। এই গোপনীয়তা বেশি দিন চাপা থাকল না। আইন মন্ত্রণালয় তৎক্ষণাৎ এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে শুরু করে। যেমন: ১৯১৯-২০ সালে নিউইয়র্কের এক কোম্পানিতে পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে ৪ মিলিয়ন ডলারের অবৈধ্য হুইস্কি জব্দ করে, যা শাস্ত্রীয় আচার পালনের নিমিত্তে তৈরি করা হয়েছিল! দেশজুড়ে অসংখ্য রাবাই গ্রেফতার হয়। পরে দেখা যায়, সরকারি খাতায় তাদের প্রত্যেকেরই একাধিক নাম রয়েছে। রচেস্টার, ফ্লিন্ট, মিশিগান ও পোর্ট হিউরনের সে সময়কার কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করলে এমন অসংখ্য তথ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। অধিকাংশ পত্রিকার শিরোনাম ছিল এমন— অবৈধ্য হুইস্কি রাখার অভিযোগে রাবাই আটক।
কিন্তু পক্ষপাতিত্বপূর্ণ মেরুদণ্ডহীন প্রশাসন থেকে যে বেশি কিছু প্রত্যাশা করা যায় না, তা কে না বোঝে? তারপরও কিছু রাবাইকে দীর্ঘ মেয়াদে শাস্তি প্রদান করা সম্ভব হয়েছিল। কিছুদিন পর কংগ্রেস থেকে পুনরায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এত জনপ্রিয় একটি পানীয়কে নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে বর্জন করা সম্ভব নয়। যারা অবৈধ্য প্রক্রিয়ায় উৎপাদন করার, তারা ঠিকই চালিয়ে যাবে। তাই নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে এর মান নিয়ন্ত্রণের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা উচিত।
ফলে এই শিল্পের বাজার পুনরায় খুলে দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়, কিন্তু তত দিনে তো জ্যান্টাইল প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হয়ে বা হাত গুটিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। যাদের হাত ধরে একসময় গড়ে উঠেছিল বাজারের বিখ্যাত সব হুইস্কি ব্রান্ড, তাদের অনেকেই তখন এই ব্যবসায় পুনরায় ফিরে আসতে ইচ্ছুক নয়। ইহুদিদের যেহেতু কাঁচা পয়সার অভাব ছিল না, তাই এই ব্রান্ডগুলো তারা একে একে কিনে নিতে শুরু করে। এমন কিছু ব্রান্ডের নাম নিচে লেখা হলো—
Old 66, Highland Rye, T.W. Samuel Old Style Sour Mash, Bridgewater Sour Mash and Rye Whiskes, T. J. Monarch, Davies County Sour Mash Whiskies, Louis Hunter 1870, Crystal Wedding, Gannymede 76, Jig-Saw Kentucky Corn Whisky, Lynndale Whisky, Brunswick Rye and Bourbon, Red Top Rye, White House Club, Green River, Sunnybrook, Mount Vernon, Belle of Nelson, James E. Pepper, Cedar Brook, Great Western Distillery, Old Grove Whisky, Old Ryan Whisky এবং Bucha Gin।
এমন আরও কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম হলো: Bernheim, Rexinger & Company, Elias Bloch & Sons, J. & A. Freiberg, Freiberg & Workum, Helfferich & Sons, Hoffheimer Brothers Company, Elias Hyman & Sons, Kaufman, Bare & Company; Klein Brothers; A. Loeb & Co.; H. Rosenthal & Sons; Seligman Distilling Company; Straus, Pritz & Company; S. N. Weil & Company; F. Westheimer & Sons এবং আরও অনেক।
এত এত ব্রান্ড ও প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে খাঁটি হুইস্কি খুঁজে পাওয়া সহজ কাজ নয়। মজার বিষয় হলো ক্রেতাসমাজ এখন অনেক কম মূল্যে বাজারে বিখ্যাত সব পানীয় পান করতে পারছে। তবে তারা বুঝতে পারেনি, এই পানীয়গুলো কারা তৈরি করছে। খুব অল্প সময়ে পুরো বাজার হুইস্কিতে সয়লাব হয়ে গেল। নোংরা-বিষাক্ত হুইস্কি আমাদের পুরো যুবসমাজকে মাতাল করে ছাড়ল, যার দরুন খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা এখন সমাজে নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর যে সংস্কৃতি, তার জন্ম মূলত এই হুইস্কি শিল্প থেকে; যা অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর দূরবর্তী বিভিন্ন প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। জাতি ভাবে— এই শিল্প বন্ধ করেও যখন পার পাওয়া যায়নি, তখন পরিবার ও সামাজ রক্ষায় নিজেদের সচেতন করে গড়ে তোলা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
টিকাঃ
২৯. খিডিস (Kiddush)- সাব্বাত রাতের বিশেষ এক প্রার্থনা পর্ব, যেখানে পরিবারের সকল সদস্য শরাব হাতে দাঁড়িয়ে থাকে এবং গৃহকর্তা বিশেষ এক প্রার্থনাবাণী পাঠ করে।
📄 অর্থ : ইহুদি ক্ষমতার মূল উৎস
যে কয়টি পরিবারের হাত ধরে ইহুদিরা আজ এতটা ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছে, তাদের মধ্যে রথচাইল্ড অন্যতম। সপ্তদশ শতাব্দীর পর থেকে বিশেষ এই জাতিগোষ্ঠীটির যে আকস্মিক উত্থান, তার পেছনে এই পরিবারটির উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তা ছাড়া ইজরাইল পুনঃপ্রতিষ্ঠা, লিগ অব নেশনস ও জাতিসংঘ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে তাদের ছিল প্রভাবশালী ভূমিকা। ইউরোপের প্রতিটি যুদ্ধে উভয় পক্ষকেই তারা ঋণ দিত। যে দেশ বিজয়ী হতো, তাদের কাছ থেকে উচ্চহারে সুদের ভিত্তিতে ঋণের অর্থ ফেরত নিত। অন্যদিকে, পরাজিত দেশটির সকল সম্পদ তাদের দায় মেটানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। এভাবে রথচাইল্ড ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী পরিবারে পরিণত হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় (১৭৭৫-১৭৮৩) আমেরিকার বিপক্ষশক্তি ব্রিটিশ সেন্যবাহিনীকে ২০ মিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদান করে।
Mayer Amschel Rothschild হলেন বিখ্যাত এই পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। ১৭৪৪ সালে তিনি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৭৬৩ সালে দুষ্প্রাপ্য মুদ্রার (Rare Coin) ব্যবসায় শুরু করেন। এর সাথে ছিল 'Money Exchange'-এর বাণিজ্য। সেখান থেকেও প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। তার ব্যবসায়িক দক্ষতার কারণে Prince Wilhelm তাকে জার্মানির অর্থ বিভাগে নিয়োগ দেয়। যে অর্থ তিনি আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বিপক্ষশক্তিকে ঋণ দিয়েছিলেন, সেই অর্থই পরবর্তী সময়ে ফরাসি বিপ্লবে (১৭৮৯-১৭৯৯) বিনিয়োগ করেন।
তার ছিল পাঁচ ছেলে। এদের মধ্যে চারজনকে সামান্য কিছু অর্থ দিয়ে চার দেশে প্রেরণ করেন। বড়ো ছেলে Amschel Mayer তার সাথে ফ্রাঙ্কফুটে থেকে যায়। বাকিরা- Solomon Mayer ভিয়েনাতে, Nathan Mayer লন্ডনে, Carl Mayer নেপোলিতে এবং James Mayer প্যারিসে পাড়ি জমায়। এবার পাঁচ ছেলে প্রত্যেকেই স্ব স্ব দেশের একজন উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক কর্মকর্তার মেয়েকে বিয়ে করে, যা তাদের প্রতিটি দেশের প্রশাসনিক দপ্তরে প্রবেশের পথ সহজ করে দেয়।
তারপর পারিবারিক সম্পদ ব্যবহার করে তারা নিজ নিজ রাষ্ট্রকে উচ্চ সুদে ঋণ দিতে শুরু করে। যেমন: ওয়াটারলু যুদ্ধে ব্রিটেনকে ঋণ দেয় Nathan। এ ছাড়াও বিগত কয়েক শতকে ইউরোপে যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে, তার প্রত্যেকটিতেই এই পরিবার প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছে। তারা এত পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেছে যে, একসময় প্রতিটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও শেয়ার বাজারগুলো সম্পূর্ণ নিজেদের করে নেয়। তারা প্রতিষ্ঠা করে 'Red-Shield', যা ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী আর্থিক সংগঠন।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও তাদের ভয়ংকর ভূমিকা ছিল; এমনকী হিটলারের ইহুদি নিধনে প্রজেক্টেও তারা প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে রথচাইল্ড পরিবারের সম্পদের সঠিক আঙ্কিক পরিমাণ নিরূপণ করা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যে অর্থের কল্যাণে তারা এতটা সম্পদশালী হয়েছে, তার অপর নাম 'ব্লাড মানি'। কারণ, অর্থের লোভে তারা গোটা ইউরোপকে অসংখ্যবার রক্তাক্ত করেছে। বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে অর্থ ব্যবসার ধারা পৃথিবীর প্রতিটি দেশে প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়েছে। যে ফেডারেল রিজার্ভ সিস্টেমকে কেন্দ্র করে আজ বিশ্বজুড়ে ডলারভিত্তিক অর্থব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তাতেও রথচাইল্ড পরিবারের বিশাল ভূমিকা রয়েছে।
১৮৩৭ সালে তাদের প্রথম প্রতিনিধি August Belmont আমেরিকায় প্রবেশ করে। গৃহযুদ্ধ চলাকালে তিনি Democratic National Committe-এর চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমান Morningside Heights চার্চে তার নামে একটি স্মৃতিসৌধ 'Belmont Memorial' সংরক্ষিত আছে।
১৯১৪ সালের বিশ্বযুদ্ধ আরও আগেই শুরু হওয়ার কথা ছিল। শুধু তাদের ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কল্যাণে যুদ্ধ কিছুটা বিলম্বে শুরু হয়। উল্লেখ্য, পূর্বনির্ধারিত সময়ে শুরু হলে অনেক দেশকে তারা এই যুদ্ধে সামিল পারত না; যাদের সাথে অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে আছে। যেমন: ১৯১১ সালে রথচাইল্ড পরিবারের ফাঁস হয়ে যাওয়া একটি চিঠি থেকে জানা যায়- তারা জার্মান সম্রাট Kaiser-কে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানায়।
Jewish Encyclopedia অনুযায়ী- 'কৃষি কাজে ইহুদিরা স্বভাবত কম আগ্রহী, তবে মূল্যবান খনিজ শিল্পে তাদের যথেষ্ট উৎসাহ রয়েছে। যেমন: Rothschild পারদ শিল্পকে, Barnato Brothers and Werner, Beit & Company হিরাশিল্পকে এবং Lewisohn Brothers and Guggenheim Sons তামা ও রূপাশিল্পকে বহু বছর যাবৎ নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে।'
Encyclopedia-তে আরও উল্লেখ আছে- 'ঋণের সুদ প্রতিটি রাষ্ট্রের ওপর এক ক্রমবর্ধনশীল জাতীয় দায় জন্ম দেয়। আর ধীরে ধীরে তা এতটা প্রকট আকার ধারণ করে, সেখান থেকে অধিকাংশ রাষ্ট্রই বের হয়ে আসতে পারে না। ইহুদিরা আন্তর্জাতিক ঋণ-ব্যবসায়কে পুঁজি করে গড়ে তুলেছে নিজেদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব। এখন অনেক জ্যান্টাইল প্রতিষ্ঠান অধিক মুনাফার লোভে একই পথ অনুসরণ করতে শুরু করেছে; যা ইহুদিদের ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।'
রথচাইল্ডের একটি বাণী আছে- এক পাত্রে সব ডিম রাখতে নেই। তারা সকল রাজনৈতিক দলের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করে; চাই তা ক্ষমতাসীন হোক কিংবা বিরোধী দল। ফলে যুদ্ধ কিংবা নির্বাচনে যে দল যেভাবেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, মূল ক্ষমতা তাদের হাতেই থেকে যায়।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অনুমান করা হচ্ছিল Kuhn, Loeb & Company খুব দ্রুতই ওয়ালস্ট্রিটকে নিজেদের করে নিতে যাচ্ছে। E. H. Harriman যখন আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে রেলপথ নির্মাণের জন্য মূলধন সন্ধান করছিলেন, তখন Kuhn, Loeb & Company তাদের শেয়ারগুলো অবলেখন করে মূলধনের ব্যবস্থা করে দেয়। আমেরিকার আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট রয়েছে, যেখানে তারা একই উপায়ে কাজ করে যাচ্ছে। পরে নিজেরাই সেই শেয়ারগুলোর মূল্য বাড়িয়ে দিয়ে জ্যান্টাইলদের নিকট বিক্রি করে দেয়।
এই ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা হলেন Jacob Schiff। তিনি জার্মানির ফ্রাঙ্কফুটে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন রথচাইল্ডের একজন ব্রোকার। তার প্রধান দুই সহকারী ছিলেন Otto Khan ও Felix Warburg। Otto Khan-এর জন্ম মেইনহামে। ছোটোকাল থেকে তিনি আরেক ইহুদি ব্যাংকিং পরিবার Speyers-এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আর Felix Warburg পরিণত বয়সে Jacob Schiff পরিবারের একজন সদস্যকে বিয়ে করেন। এভাবে তারা নিজেদের মাঝে গড়ে তোলে এক শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন, যাতে তাদের সম্পদ কোনোভাবেই জ্যান্টাইলদের হাতে চলে না যায়। Amschel Rothschild তার যে পাঁচ ছেলেকে পাঁচ দেশে প্রেরণ করেন, তাদের সন্তানরাও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর নিজেদের চাচাতো ভাই-বোনদের মধ্যে বিয়ে করে নেয়।
শুধু আমেরিকাতেই নয়; যে স্থানগুলো পরবর্তী সময়ে অর্থ-বাণিজ্যের কেন্দ্র বিন্দু হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, তার প্রতিটি স্থানেই তারা নিজেদের কার্যক্রম প্রসারিত করেছে। দক্ষিণ আমেরিকা, মেক্সিকো, জাপান ও রাশিয়া হলো এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
তারা মেক্সিকোতে অর্থনৈতিক উপদেষ্টারূপে হাজির হয়। জাপান-রাশিয়া যুদ্ধে Jacob Schiff প্রচুর অর্থ পাঠিয়ে জাপানকে সহযোগিতা করে, যেন এখান থেকেই রাশিয়ার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বসিয়ে দেওয়া যায়। মূলত, জাপান-রাশিয়া যুদ্ধই ইহুদিদের জন্য বলশেভিক আন্দোলনের পথ সহজ করে দেয়। জাপানের কারাগারগুলোতে যে সকল রাশিয়ান সৈন্যরা বন্দি ছিল, জার সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষেপিয়ে দেওয়াই ছিল এই অর্থ বিনিয়োগের অন্যতম উদ্দেশ্য। তারা এই সুযোগে জাাপনকেও কবজা করতে চেয়েছিল। কিন্তু জাপান রাজা সতর্ক ব্যক্তি হওয়ায় ইহুদিদের ভাবগতি ভালো করেই জানতেন। তাই তিনি এই অর্থ সাহায্যের বিষয়টিকে একটি ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে গ্রহণ করেন এবং অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ে নাক গলানো থেকে তাদের দূরে রাখেন। এ বিষয়টি তাদের ভীষণভাবে ক্ষেপিয়ে তোলে। ফলে ইহুদিরা প্রতিশোধের জন্য অপেক্ষা করতে শুরু করে। আর এখান থেকেই জাপান-আমেরিকা দ্বন্দ্বের সূচনা।
তারা যেসব অন্ধকার পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে নিজেদের করে নিয়েছে, তার বর্ণনা দিতে গেলে অনেক নোংরা গল্প বেড়িয়ে আসবে। Robins, Lamars ও Arnsteins-এর মতো ইহুদিদের অন্যান্য সদস্যরাও যেভাবে ওয়ালস্ট্রিটে থাবা বসিয়েছে, তা কখনো ভোলার মতো নয়। বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থনীতিতে তারল্য ফিরিয়ে আনতে আমেরিকান সরকার লিবার্টি বন্ড ইস্যু করেন, কিন্তু তার দুই বছর না পেরোতেই ১২ মিলিয়ন ডলারের স্টক ও বন্ড আত্মসাৎ হয়। এ নিয়ে অনেক বিতর্ক হলেও অনুসন্ধানি রিপোর্টে কারও নাম প্রকাশ পায়নি।
ওয়ালস্ট্রিটের শেয়ার কেনা-বেচার কাজে তখন এক শ্রেণির 'ম্যাসেঞ্জারবয়' কাজ করত। তারা স্টক ও বন্ডের দলিল এক হাউস থেকে অন্য হাউসে নিয়ে যেত এবং সঠিক ব্যক্তির নিকট মালিকানা বুঝিয়ে দিত। কোনো দলিল হারিয়ে গেলে তার মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া খুব কঠিন হতো। কারণ, জমির দলিলের মতো এসব কাগজেও হাতবদল ও জালিয়াতির সুযোগ ছিল। ফলে ম্যাসেঞ্জারবয়ের কাজটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯১৮ সাল। বসন্তের শুরু থেকে গ্রীষ্মের প্রথম পর্যন্ত অনেক ম্যাসেঞ্জারবয় ওয়ালস্ট্রিট বাজার থেকে গায়েব হওয়া শুরু করে। ওয়ালস্ট্রিট খুব ছোট্ট একটি জেলাশহর। এই ছোট্ট শহরের বিভিন্ন গলিতে স্টক ব্রোকাররা অফিস খুলে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় করত। অনেক সময় একটি অফিস থেকে অন্য অফিসের দূরত্ব কোনো একটি ভবনের এক ফ্লোর থেকে অন্য ফ্লোরের দূরত্বের সমান হতো। তাহলে এমন কী হলো, যার জন্য ছোট্ট একটি পথ পাড়ি দিতেই ম্যাসেঞ্জারবয়রা গায়েব হয়ে যাচ্ছে! ব্যাপারটা যেন এমন, মাটিই তাদের শুষে নিচ্ছে।
বিষয়টি তখনই ঘটা শুরু করে, যখন ওয়ালস্ট্রিটে প্রতি মাসে ২০ মিলিয়ন ডলারের বেশি লেনদেন হচ্ছিল। সরকারের আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের প্রতিটি মানুষ অল্প হলেও কিছু বন্ড ক্রয় করতে শুরু করে। এমনও হয়েছে, প্রতিদিন ২ মিলিয়নের বেশি শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে। এমন সময় দায়িত্বশীল ম্যাসেঞ্জারবয়দের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে ওঠে। যদি কোনো ব্যক্তি স্টক দলিল সময়মতো হাতে না পেত, তবে তার সব অর্থ জলে যাওয়ার মতো অবস্থা হতো।
এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে মানুষ প্রতিটি স্টকের বিমা করা শুরু করে। তবে সে সময় যে পরিমাণ স্টক ও বন্ড সিকিউরিটিজ চুরি হচ্ছিল, তাতে বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এতটা ক্ষতি বহন করা সম্ভব ছিল না। ওয়ালস্ট্রিট কমিটি আইনি তৎপরতা শুরু করে। তারা গোয়েন্দাকর্মী নিয়োগ এবং হারিয়ে যাওয়া সিকিউরিটিজগুলো উদ্ধারের জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে ইতোমধ্যে শেয়ারবাজারের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা কোনো এক অজানা কারণে প্রকাশ করা হয়নি। কারণ, এতে হয়তো সাধারণ মানুষ আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে এবং স্টক ও বন্ড ক্রয়ে অনিচ্ছুক হয়ে পড়বে। কিন্তু নিউইয়র্কের এমন কোনো কোনো সন্ত্রাসী সংগঠন ছিল না, যারা এই তথ্য জানত না।
১৯২০ সালের শুরুতে তাদের কিছু সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের স্বীকারোক্তি থেকে এমন কিছু তথ্য জানা যায়, যা আমেরিকার ইতিহাসে কখনোই ঘটেনি। একটি তরুণ সংগঠনের পরিচয় পাওয়া যায়, যাদের নিউইয়র্কের প্রভাশালী ইহুদিচক্র বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ দিয়ে ওয়ালস্ট্রিটে ম্যাসেঞ্জারবয় হিসেবে চাকরির জন্য পাঠাত। নিজেদের পরিচয় গোপন রাখতে তারা খ্রিষ্টানদের নাম ব্যবহার করত। ফলে ব্রোকার হাউসগুলো তাদের চাকরি দিতে কোনো রকম দ্বিধাবোধ করত না।
আশা করি এখন আর বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, কেন তারা সামান্য পথ পাড়ি দিতেই অদৃশ্য হয়ে যেত। ছদ্মবেশি ম্যাসেঞ্জারবয়রা শেয়ার দলিলগুলো তুলে দিত তাদের সন্ত্রাসী সংগঠনের হাতে, যার নাম 'Confidence Men'। এটির আরও একটি নাম ছিল 'Bank-roll Men'। কিন্তু পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার পরও তাদের কোনোরূপ শাস্তি দেওয়া হয়নি। কারণ, অসংখ্য উকিল ও আইনজীবীদের দ্বারা এই সংগঠনটি সুরক্ষিত ছিল। চুরি হয়ে যাওয়া স্টক ও বন্ডগুলোকে নেওয়া হতো ক্লিভল্যান্ড, বোস্টন, ওয়াশিংটন, ফিলাডেলফিয়া ও কানাডায়। এর বিনিময়ে সংগঠন ও ম্যাসেঞ্জারবয়দের দেওয়া হতো মোটা অঙ্কের কমিশন।
একবার কোনো এক ম্যাসেঞ্জারবয় চুরি করা স্টক ও বন্ডগুলো সামান্য অর্থের বিনিময়ে তাদের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়নি। সে দলিলগুলো নিয়ে পালিয়ে যায় এবং নতুন কোনো গোষ্ঠীর নিকট উচ্চমূল্যে বিক্রির পরিকল্পনা করে। তাকে খুঁজে বের করতে গুপ্তঘাতক নিয়োগ করা হয়। অনেক কষ্টে তাকে খুঁজে পাওয়া গেলেও দলিলগুলো আর উদ্ধার করা যায়নি। ফলে তাকে তৎক্ষণাত হত্যা না করে বাঁচিয়ে রাখা হয়। ছদ্মবেশে তার সাথে বন্ধুত্ব করে বেশ কিছুদিন মজা করা হয়, মদ ও সুন্দরী নারীর নেশায় ভুলিয়ে রাখা হয়। সবশেষে জানা যায়, দলিলগুলোর তার কোটের আস্তরণের নিচে সেলাই করা আছে। এর পরপরই তাকে হত্যা করা হয়। তার মৃতদেহ উদ্ধারের পর ডজনখানেক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়।
জ্যান্টাইল ম্যাসেঞ্জারবয়দেরও তারা বিভিন্ন প্রলোভনে নিজেদের সংগঠনে যুক্ত করার চেষ্টা করত। একবার যদি কেউ যুক্ত হয়েছে, তবে তার আর ফিরে আসার উপায় নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমনই এক জ্যান্টাইলের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, যখন সে এই সংগঠনটি থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলে, তখন তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। দলের সর্দার পরিষ্কার জানিয়ে দেয়-
'আমি বিশ্বাসঘাতকতা একদমই পছন্দ করি না। যদি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করো, তবে তোমাকে খুন করব। আর যদি আমি নিজে তোমাকে খুন না করি, তবে আমার দলের কেউ না কেউ অবশ্যই খুন করবে। কারণ, আমরা চাই না আমাদের পরিচয় প্রকাশিত হোক।'
এত সব প্রমাণ ও স্বীকারোক্তির পরও এই দলপতিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অন্যদিকে যেসব ম্যাসেঞ্জারবয় সংগঠন থেকে বেড়িয়ে আসতে চাইছে, উলটো তাদেরকেই শাস্তির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। সামান্য সংখ্যক ইহুদি এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় ধরা পড়ে। কিছুদিন যেতে না যেতেই তারাও জেল থেকে মুক্তি পায়। কারণ, বড়ো বড়ো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে আছে।
এটাই হলো আমাদের বিচারব্যবস্থার বর্তমান রূপ। অর্থ-বিত্তের জোরে ইহুদিদের হাজারটা অপরাধও মাফ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যে জ্যান্টাইলরা অভাবের তাড়নায় তাদের ফাঁদে পা দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে, তাদেরকেই ভোগ করতে হচ্ছে অনিশ্চিত কারাজীবন।
ওয়ালস্ট্রিট দখল করা নিয়ে ইহুদিদের পরিকল্পনা
আমেরিকায় ইহুদি বিতর্ক শুরু হয়েছে মূলত একটি শহরকে কেন্দ্র করে, তা হলো 'নিউইয়র্ক'। ইহুদিদের জাতিগত বৈশিষ্ট্য হলো- যখন তারা কোথাও যাবে, তখন একত্রে যাবে এবং সেখানে নিজেদের খুঁটি প্রতিষ্ঠিত করবে। গুটি কয়েক ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এবং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ছাড়া এই শহরের বাকি সব প্রতিষ্ঠান আজ তাদের দখলে। পুলিশ কমিশনার General Bingham-এর তথ্য অনুযায়ী- তৎকালীন নিউইয়র্কের প্রায় ৫০ ভাগ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য ইহুদি জনগোষ্ঠীটিই দায়ী।
কার্যগত পার্থক্যের দিক দিয়ে ইহুদিরা যেখানে স্বল্পমেয়াদে ঋণ দেয়, সেখানে জ্যান্টাইলরা দেয় দীর্ঘমেয়াদে। ফলে অর্থের তারল্য ইহুদিদের নিকট সব সময়ই বেশি থাকে। তাই যেকোনো সংকটকালীন মুহূর্তে তারাই প্রথম অর্থ বিনিয়োগের ক্ষমতা রাখে। এ জন্য দেখবেন, ইউরোপ-আমেরিকার বেশিরভাগ রাজপথ, রেলপথ ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রথম ইহুদিরাই বিনিয়োগ করত। তাদের ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো অল্প পরিমাণ অবিহিত মূল্যে বিভিন্ন পাবলিক প্রকল্পের শেয়ার অবলিখন করে নিত। পরে কৃত্রিম উপায়ে (স্পেকুলেশান সৃষ্টির মাধ্যমে) শেয়ারগুলোর মূল্য বাড়িয়ে দিত এবং তা বর্ধিত মূল্যে ওয়ালস্ট্রিটে বিক্রি করত। ফলে কী হতো? প্রকল্পগুলোর সকল দায়দায়িত্ব সাধারণ জনগণের কাঁধে চলে যেত। আর মাঝখান থেকে ইহুদিরা বিশাল অঙ্কের মুনাফা নিজেদের করে নিত। অন্যদিকে, জ্যান্টাইল প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগকৃত অর্থ আদৌ ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা বা সেই অর্থ ফেরত পাবে কি না, তা প্রায় সময়ই অনিশ্চিত থাকত। কারণ, ঋণ নিয়ে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে অর্থ ও সম্পদ নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার নজির বাজারে কম ছিল না।
ওয়াল স্ট্রিটের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাংকটি হলো Kuhn, Loeb & Company, যার সদস্যগণ হলেন- Jacob Schiff, Mortimer, Otto H. Kahn, Paul M. ও M. Warburg। এ ছাড়াও ওয়ালস্ট্রিটের অন্যান্য প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: Speyer & Company; J. and W. Seligman & Company; Lazard Freres; Ladenburg, Thalmann & Company; Hallgarten & Company; Knauth, Nachod & Kuhne; Goldman, Sachs & Company।
ইহুদিরা এতটাই ধূর্ত ও কৌশলী, বাজার যেন তাদের অন্ধকার অংশটুকু দেখতে না পারে, সে ব্যবস্থা পূর্বেই করে রেখেছে। শুধু ভোগ্য পণ্যের বাজার নয়; খনিজ পণ্যের ওপরও তারা একক আধিপত্য বিস্তার করেছে। যেমন: লোহা, ইস্পাত, সোনা, রুপা, তেল ইত্যাদি।
মজার বিষয় হলো- আজকের ওয়ালস্ট্রিট বাজারে যে বড়ো বড়ো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো আছে, তার কোনোটিরই ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে এখন আর ইহুদিদের দেখা যায় না। ছোটোখাটো কিছু প্রতিষ্ঠান বাদে সকল বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠান এখন জ্যান্টাইলদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীটি কেন ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা থেকে সরে এলো? এমনকী ইহুদিরাও আজ জ্যান্টাইল প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্থ-সম্পদ জমা করছে! হঠাৎ এমনটা হওয়ার কারণ কী?
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে যথেষ্ট দুর্নাম কামিয়েছে; Joseph G. Robin-এর ব্যাংকিং ব্যর্থতা অন্যতম উদাহরণ। তার আসল নাম হলো Robonovitch। তিনি জনগণের জমাকৃত অর্থ রাশিয়ার বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতেন। একসময় সেই প্রতিষ্ঠানগুলো একে একে দেউলিয়া হওয়া শুরু করে, যা পূর্ব পরিকল্পিত ছিল কি না জানা যায়নি। তবে তার এমন বিনিয়োগের জন্য অসংখ্য আমানতকারী সর্বহারা হয়ে যায়। আদালতও Dr. Robin-এর প্রতিষ্ঠানটিকে কিছু বলতে পারছে না। কারণ, দেউলিয়া তো হয়েছে রাশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো!
এমন অসংখ্য ঘটনা তখন আমেরিকার আকাশে-বাতাসে উড়ছিল, তাই একসময় সাধারণ মানুষ ইহুদিদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে অর্থ জমানো বন্ধ করে দেয়। সাধারণ মানুষকে ব্যাংকিং শিল্পে ফিরিয়ে আনতে 'জ্যান্টাইল ফ্রন্ট' বিষয়টি আবারও কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। এ কারণে দেখা যায় ক্যাশিয়ার, ম্যানেজার, ব্রাঞ্চ ম্যানেজার, অপারেটর, মার্কেটার ইত্যাদি পদগুলোতে যারা বসে আছে, তারা হলো খ্রিষ্টান, হিন্দু বা মুসলমান। এসব দেখে সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করে, এসব জ্যান্টাইলদের প্রতিষ্ঠান!
খুব ধীর গতিতে হলেও ওয়ালস্ট্রিট শেয়ারবাজার আজ ইহুদিদের দখলে চলে গেছে, যদিও এর শুরুটা সহজ ছিল না। Sereno S. Pratt-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৭ মে, ১৭৯২ সালে ওয়ালস্ট্রিটের ২২ নম্বর গলিতে একটি ছোট্ট অফিস প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শেয়ার বাজারে তার যাত্রা শুরু। প্রতিদিন কাজের শেষে একদল ব্রোকার নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে ওয়ালস্ট্রিট-এর ৬৮ নাম্বার গলিতে Buttonwood গাছের নিচে জড়ো হতো। ৮ মার্চ, ১৮১৭ এরূপ ২৪ জন শেয়ার ব্রোকার নিজেদের মধ্যে আলোচনার সাপেক্ষে ওয়ালস্ট্রিট শেয়ার বাজারের একটি গঠতন্ত্র তৈরি করে; যা 'Buttonwood Agreement' নামে পরিচিত।
ওয়ালস্ট্রিট মূলত একটি প্রাইভেট স্টক মার্কেট। ব্রোকারগণ কমিশনের ভিত্তিতে এ বাজারে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির শেয়ার কেনা-বেচা করত। এর সদস্যসংখ্যা ১১০০ জনে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ এই ১১০০ জন সদস্যই কেবল ওয়ালস্ট্রিট বাজারের 'ফার্স্ট ফ্লোরে' প্রথম শ্রেণির ব্রোকার হিসেবে নিজেদের এবং মক্কেল প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার কেনা-বেচার কাজ করতে পারবে। ১৯২০ সালে এই প্রতিটি সদস্যপদের মূল্য ছিল প্রায় ১০০০০০ ডলার।
সদস্যপদ গ্রহণ ও হস্তান্তর নিয়ে ছিল যথেষ্ট কঠোরতা। মাত্র দুটি উপায়ে একজন বহিরাগত এ বাজারের সদস্যপদ লাভ করতে পারত।
এক. যদি কোনো সদস্য মারা যায়, তবে তার সদস্যপদ উত্তরাধিকারীর নিকট হস্তান্তরিত হতো।
দুই. যদি কোনো সদস্য দেউলিয়া হয়ে যায় বা ইচ্ছাকৃত অবসর গ্রহণ করতে চায়, তবে তার সদস্যপদ ক্রয়ের মাধ্যমে।
৪০ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিচালক কমিটি দ্বারা এই বাজার পরিচালিত হতো। এই কমিটিতে বহু বছর কোনো ইহুদি জায়গা পায়নি। ১৯১৫-১৬ সালের দিকে প্রথমবারের মতো একজন ইহুদি ব্রোকার কমিটিতে জায়গা পায়। পরিচালক কমিটির ১৫ জন সদস্য নিয়ে আরেকটি ছোটো কমিটি ছিল, যারা শেয়ার বাজারে নিবন্ধিত সদস্যদের দেখভাল করত। নতুন কোনো ব্যক্তি এই বাজারের সদস্য হতে চাইলে তাকে অবশ্যই এই কমিটির নিকট আবেদন করতে হতো। যেহেতু শেয়ার বাজারের সদস্য সংখ্যা ১১০০ এবং এর সাথে নতুন কোনো পদ সংযোজন করা হবে না, তাই কেউ ইচ্ছা করলেই এর সদস্য হতে পারত না। যদি আবেদনের মাধ্যমে নতুন কেউ সদস্যপদ লাভ করতে চায়, তবে তাকে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের সমর্থন পেতে হবে। আর ইহুদিদের প্রতি তো বহু আগ থেকেই জ্যান্টাইলদের মনে ক্ষোভ জমে আছে, তাই কেউ চাইত না এই বাজারে ইহুদিদের আগমন ঘটুক।
মূলত ধৈর্য ও অধ্যবসায় তাদের চরিত্রের চরম দুটি গুণ, যার দরুন তারা যা চেয়েছে তাই পেয়েছে। সেই শুরুর দিকে ওয়ালস্ট্রিটে তাদের সদস্য ছিল মাত্র পাঁচজন কী সাতজন। কিন্তু বিংশ শতাব্দী শুরু হতে না হতেই তা দুশো ছাড়িয়ে যায়। আর আজ তো এ বাজার তাদেরই দখলে। প্রশ্ন হলো- কীভাবে এত বিধিনিষেধ সত্ত্বেও তাদের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে?
প্রথমত, ইহুদিরা তাদের সদস্যপদ কোনো জ্যান্টাইলের নিকট হস্তান্তর করত না। দ্বিতীয়ত, শেয়ারবাজারে যখন মন্দা দেখা দিত, তখন কিছু জ্যান্টাইল সদস্য দেউলিয়া হতো। ফলে তাদের পদটি নিলামে তোলা হতো। তারা এই সময়টির অপেক্ষায় ওত পতে থাকত। তারা যে অর্থে নিলাম ডাকত, তা দ্বারা দেউলিয়া হওয়া সদস্যটি সকল ঋণ ও দায় মিটিয়ে নিজের জন্য অতিরিক্ত কিছু জমা রাখতে পারত। এই অতিরিক্ত অর্থের লোভে জ্যান্টাইল প্রতিষ্ঠানগুলো বাধ্য হয়ে ইহুদিদের কাছে সদস্যপদ বিক্রি করত।
তৃতীয়ত, ইহুদিরা নিজেদের নাম পরিবর্তন করে খ্রিষ্টানদের নাম ব্যবহার করত, যা দেখে মনে হতো তারাও অ্যাংলো-সেক্সনের জাতিভুক্ত। নাম পরিবর্তন করা ইহুদিদের হাজার বছরের ঐতিহ্য। যখন কোনো সম্প্রদায় ইহুদিদের বর্জন করে, সেখানে পুনরায় প্রবেশ করতে তারা সেই সম্প্রদায়দের নাম ব্যবহার করত।
১৯০৫ সালে যখন রাশিয়া থেকে ইহুদিদের বের করে দেওয়া হয়, তখন তারা রাশিয়ান নাম ব্যবহার করে পুনরায় প্রবেশ করে। শেয়ারবাজার তাদের বর্জন করলে খ্রিষ্টানদের নাম যেমন: Smith, Adam, Robin ইত্যাদি ব্যবহার করে সদস্যপদ লাভের আবেদন করতে শুরু করে। কেউ বুঝতেও পারে না, তার পাশে যে লোকটি দাঁড়িয়ে আছে বা একটু আগে সে যার সাথে কথা বলল, সে একজন ইহুদি। সময়ের সাথে সাথে শেয়ারবাজারে তাদের সদস্যসংখ্যা কীভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, নিচে ছকটিতে দেখানো হলো।
| বছর | শেয়ারবাজারের মোট সদস্য সংখ্যা | ইহুদিদের সদস্য সংখ্যা |
| :----- | :-------------------------- | :------------------- |
| ১৮৭২ | ১,০০৯ | ৬০ |
| ১৮৭৩ | ১,০০৬ | ৪৯ |
| ১৮৯০ | ১,১০০ | ৮৭ |
| ১৮৯৩ | ১,১০০ | ১০৬ |
| ১৯১৯ | ১,১০০ | ২৭৬ |
লক্ষ করলে বুঝবেন, শেষের কয়েক বছরে তাদের সদস্যসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মূল কারণ, তাদের ছদ্মনাম কৌশল। স্পেকুলেশান ও গেম্বলিং মানে বোঝায়, অধিক ঝুঁকি আছে জেনেও অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আসায় ঝুঁকিযুক্ত শেয়ারগুলোতে অর্থ বিনিয়োগ করা। এই শেয়ারগুলোর বিক্রয়মূল্য অভিহিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম থাকে। ইতিহাস থেকে জানা যায়- ইহুদিরা যতবার এই ঝুঁকিযুক্ত শেয়ারগুলো ক্রয় করেছে, ততবারই লাভবান হয়েছে। এর কারণ, তাদের নিকট প্রচুর তথ্য থাকত, যা দ্বারা বুঝে যেত কখন কোন শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি এবং হ্রাস পাবে।
ওয়ালস্ট্রিটের ৩০ নাম্বার গলিতে গড়ে উঠেছে 'ক্লাব মার্কেট', যেখানে তাদের ব্রোকারগণ তেল, গ্যাস, লোহা ইত্যাদি খনিজ পদার্থের বাণিজ্য করে থাকে। এ ছাড়াও এমন আরও অনেক গলি আছে, যেখানে তারা ছোটো ছোটো ক্যাম্প করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার সিকিউরিটিজ লেনদেন করে যাচ্ছে। মিথ্যা ও ভুল তথ্য প্রচারের মাধ্যমে ইহুদিরা সাধারণ মানুষকে এই বাজারের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে। সাধারণ মানুষও তাদের কথায় প্ররোচিত হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উপার্জিত অর্থ এই বাজারে বিনিয়োগ করছে।
এমন অনেকে আছে যারা নিজেদের বাড়ি, শস্যজমি ও কলকারখানা বন্ধ রেখে সামান্য কিছু মুনাফার আসায় ব্রোকারদের হাতে অর্থ তুলে দিয়েছে। তাদের তেমন কোনো ধারণাই নেই- এই বাজারে কী হচ্ছে; যে কোম্পানির শেয়ার কিনছে তার দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু।
ইহুদি ব্রোকারগণ একদিকে কমিশন খাচ্ছে, আবার যদি কোনো প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যায়, তার শেয়ারগুলোও অনেক কম মূল্যে কিনে নিচ্ছে। সত্যি বলতে, এই বাজারে দয়া-মায়ার কোনো স্থান নেই। এটি শুধু চোর-ডাকাতদের বাজার। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও পত্রিকা অফিসের এমন কেউ নেই, যে ওয়ালস্ট্রিটের কালো অধ্যায় সম্পর্কে অবহিত নয়। যেভাবে আজ এই বাজারের ওপর আক্রমণ এসেছে, একইভাবে পৃথিবীর আরও অনেক শেয়ারবাজারেও আক্রমণ আসবে, হয়তো ইহুদিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদে; কোনো কিছুই নজরের বাইরে নয়।
ইহুদিদের হাজার বছরের ছদ্মনাম সংস্কৃতি
এ পর্যন্ত অনেকবার বলা হয়েছে- জ্যান্টাইলরা যখন ব্যবসায়-বাণিজ্যে ইহুদিদের অংশগ্রহণের ওপর নিষেদ্ধাজ্ঞা আরোপ করত, তখন তারা নিজেদের পরিচয় খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন ছদ্মনামের আড়ালে গোপন করত। তাদের এই নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়; এটা হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতি।
সেমেটিক অঞ্চলগুলোতে আরবি নাম, ইউরোপের দেশগুলোতে অ্যাংলো-সেক্সনদের নাম ইহুদিদের হর-হামেশাই ব্যবহার করতে দেখা যেত। প্রাচীনকাল থেকে তাদের মনে একটি বিশ্বাস ছিল, নতুন নাম ভাগ্যে নতুন কিছু নিয়ে আসবে এবং হাজার অনিষ্ট থেকে মুক্তি দেবে। তারা এমনও বিশ্বাস করত, অসুস্থ্য ব্যক্তির নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম রাখলে সে হয়তো সুস্থ হয়ে উঠবে। পবিত্র বাইবেলেও এমন কিছু উদাহরণ পাওয়া যায়। যেমন: Abram হয়ে যায় Abraham এবং Jacob হয়ে যায় Israel।
Madansky ভাইয়েরা নিজেদের নাম Max, Benjamin, Solomon, Jacob-এর পর 'May' যোগ করে নতুন নাম রাখে। ফলে Max হয়ে যায় Max May এবং Benjamin হয়ে যায় Benjamin May। এই নামগুলো শুনে মনে হতে পারে Madansky ভাইয়েরা অ্যাংলো-সেক্সনের জাতভুক্ত; যদিও তাদের উৎপত্তি এশিয়া মহাদেশে।
এমনও হয়েছে, রাতারাতি এক ঘোষণার মাধ্যমে ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসরত ইহুদিদের বিশেষ কিছু নাম পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে, যা তারা নিজেরাও জানত না। যেমন: লস অ্যাঞ্জেলসের বিখ্যাত অভিনেতা Elmo Lincoln একবার আইনি কোনো কাজে তার স্ত্রীকে নিয়ে আদালতে যান। গিয়ে দেখেন তার নাম Otto Linknhelt হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে।
এভাবে Levy হয়ে গেলেন Lytton, যিনি ছিলেন আমেরিকার একটি বিখ্যাত বিপণি বিতানের মালিক। সেকালের একজন বিখ্যাত সংগীতশিল্পীর গল্প শোনা যায়, যিনি বিয়ের আগে জানতেন তার স্ত্রী স্পেনিশ। কিন্তু বিয়ের পর জানলেন, তার স্ত্রী ইহুদি এবং তার নাম Bergenstein। মূলত তাদের প্রতিটি নামের পেছনে বেশ ভালো কিছু ইতিহাস লুকিয়ে থাকে, যা সবার পক্ষে উদ্ঘাটন করা সম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে Belmont নামটির ইতিহাস উপস্থাপন করা যাক।
যেমন: উনিশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত জার্মান ইহুদিরা নিজেদের পারিবারিক নাম ব্যবহার করত না। তারা বলত- 'Joseph ben Jacob' অর্থাৎ Jacob-এর পুত্র Joseph। বাবার নাম তারা উপাধি হিসেবে ব্যবহার করত। কিন্তু নেপোলিয়নের শাসনামলে সেনহাড্রিনের এক ঘোষণায় ইহুদিদের নাম নির্ধারণ সংস্কৃতিতে বড়ো পরিবর্তন আসে। তাদের জন্য কিছু উপনামের তালিকা তৈরি করে দেওয়া হয়। মণিমুক্তা, পশু-পাখি, গাছপালা, কীটপতঙ্গ ইত্যাদির নামগুলো ইহুদিরা উপাধি হিসেবে ব্যবহার করত। যেমন: Goldstein, Silberberg, Mandelbaum, Lilienthal, Ochs, Wolf ও Loewe।
কিছু জার্মান তাদের বাবার নামের সঙ্গে 'Son' যোগ করে নিজেদের নাম নির্ধারণ করত। যেমন: Jacobson, Isaacson। আবার অনেকে তাদের আশেপাশের শহর-বন্দর ও নদীর নাম অনুকরণে নিজেদের নাম নির্ধারণ করত। যেমন: বার্লিনের অধিবাসীরা তাদের নাম রাখে Berliner, সোহানবার্গের অধিবাসীরা রাখে Schoenberg। এর অর্থ 'সুন্দর পাহাড়'। এই নামটিকে ফরাসি ভাষায় পরিবর্তন করলে হয় Belmont। অর্থাৎ Schoenberg ও Belmont শব্দ দুটির অর্থ 'সুন্দর পাহাড়'।
এই Belmont পরবর্তী সময়ে Rothschilds-এর প্রতিনিধি হয়ে আমেরিকায় গমন করেন। তাহলে বিখ্যাত পরিবার Rothschilds নামের উৎস কী? সত্যি বলতে এই নামটির ইতিহাস উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি। যতদূর জানা যায়, ফ্রাঙ্কফুটের কোনো এক ইহুদি পরিবার তার ঘরের সামনে লাল রং-এর একটি ঢাল ঝুলিয়ে রাখত, সেখান থেকে Red Shield-কে তাদের পারিবারিক লোগো হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
বলশেভিক বিপ্লবে তারা নিজেদের নামগুলো রাশিয়ান ভাষায় পালটে ফেলে। যেমন: Leo Bronstein হয়ে যায় Leo Trotsky; জার্মান শব্দ Apfelbaum হয়ে যায় Zinoviev; হিব্রু শব্দ Cohen হয়ে যায় Volodarsky; Goldman হয়ে যায় Izgoev এবং Feldman হয়ে যায় Vladimirov। সাধারণ একটি নামের পেছনেও যে এত ইতিহাস লুকিয়ে থাকতে পারে, তা কি সাধারণ মানুষের পক্ষে কল্পনা করা সম্ভব?
যদি একজন পোলিশ ইহুদির নাম হয় Zuckermandle, সে কখনো হাঙ্গেরিতে প্রবেশ করবে না। কারণ, উভয় দেশের পারস্পরিক বিরোধের দরুন এই নাম যেকোনো সময় তাকে বিপদে ফেলতে পারে। তাই নাম পালটে সে হয়ে যায় Zukors, যা হাঙ্গেরিয়ান শব্দ। কিন্তু যখন সে আমেরিকায় প্রবেশ করবে, তখন Mr. Zuckermandle নামটি অপরিবর্তিত রাখলে কোনো সমস্যা নেই।
মূলত তিনটি কারণে ইহুদিদের নাম পরিবর্তন করতে দেখা যায়। এক. তারা যে অন্য দেশের নাগরিক, তা বুঝতে না দেওয়া। দুই. ব্যবসায়িক কাজে যেন কোনো বাধা না আসে। তিন. সামাজিক কারণ। তাদের একটি নাম কীভাবে বহু নামে রূপ নিয়েছে, তার কিছু উদাহরণ Jewish Encyclopedia থেকে উপস্থাপন করা হলো-
• Asher থেকে হয়েছে Archer, Ansell, Asherson.
• Baruch থেকে হয়েছে Benedict, Beniton, Berthold.
• David থেকে হয়েছে Davis, Davison, Davies, Davidson.
• Isaac থেকে হয়েছে Sachs, Saxe, Sace, Seckel.
• Jacob থেকে হয়েছে Jackson, Jacobi, Jacobus, Jacof Kaplan, Kauffmann, Marchant, Merchant.
• Jonah থেকে হয়েছে Jones, Joseph, Jonas.
• Judah থেকে হয়েছে Jewell, Leo, Leon, Lionel, Lyon, Leoni, Judith.
• Levi থেকে হয়েছে Leopold, Levine, Lewis, Loewe, Low, Lowy.
• Moses থেকে হয়েছে Mortiz, Moss, Mortimer, Max, Mack, Moskin, Mosse.
• Solomon থেকে হয়েছে Salmon, Salome, Saloman, Salmuth.
আরও অনেক নাম Jewish Encyclopedia তে আছে, যা বিভিন্ন সময়ে তারা পরিবর্তন করেছে। যেমন: Barnett, Barnard, Beer, Hirschel, Mann, Mendel, Mandell, Mendlsohn ইত্যাদি। নতুন কোনো নাম গ্রহণের পর ইহুদিরা প্রচারণায় নেমে যেত, যেন তা সাধারণ মানুষের মনে দ্রুত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়। কাজ ও ব্যবসায়ের প্রকারভেদে তাদের রয়েছে পৃথক পৃথক নামের শ্রেণি।
সামরিক রসদ বাণিজ্যে Lucile, Mme ও Grande নামগুলো প্রায়ই ব্যবহৃত হতো। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের নাম নির্ধারণেও তারা কম কলাকৌশল জাহির করেনি। যেমন : Reuben Abraham Cohen যখন চাইল তার অস্ত্রগুলো যুদ্ধের প্রথমেই বিক্রি হয়ে যাক, তখন দোকানের নাম পালটে রাখলেন R. A. Le Can, যা অনেকটা ফরাসি ধাঁচের। একইভাবে Mr. Barondesky হয়ে গেল Barondes বা La Baron।
অনেক সময় তারা নিজেদের চামড়ার রং-এর ওপর ভিত্তি করে নাম নির্ধারণ করে। যেমন, সাদা বর্ণের ইহুদিরা নিজেদের নামে Millers শব্দটি ব্যবহার করে। Aarons হয়ে যায় Arnold ও Allingham। আবার Cohens থেকে হয় Druce, Freeman, Montagu, Rothbury ও Cooke।
Cohens নামটি তাদের মাঝে খুব প্রচলিত। দেখা যায়- যে রাস্তা থেকে পুরাতন কাপড় সংগ্রহ করছে, তার নাম Cohen। যে পশু জবাই করছে, তার নাম Cohen। একজন আইনজীবী, তার নামও Cohens। এত সব Cohens-কে তারা নিজ পেশার নাম অনুযায়ী আলাদা করতে শুরু করে যেমন: Attorney Cohan। একই উপায়ে Kaplan হয়ে গেল Chaplin। ফলে, Charlie Kaplin হয়ে গেল Charlie Chaplin। তাদের নিকট সে একজন বড়ো অভিনেতা, কিন্তু জ্যান্টাইলদের নিকট ‘গরিব ইংলিশ বালক’। এমনি আরেকজন বিখ্যাত অভিনেতা Rev. Stephen S. Wise। তার জন্ম হাঙ্গেরিতে হওয়ায় সেখানে তার পারিবারিক নাম ছিল Weisz। কখনো এই নামটিকে জার্মান ভাষায় বলা হতো Weiss। এই নামটি আমেরিকান ভাষায় রূপান্তর করলে হয় White। তবে White অপেক্ষা Wise অধিকতর ভালো বলে নামটি হয়ে গেল Rev. Stephen S. Wise।
চলচ্চিত্র জগতে Mr. Selwyn জনপ্রিয় আরেকটি নাম। তার প্রকৃত নাম Schlesinger। তবে এই নামে আরও অনেকে ছিল বলে অন্যরা তাদের নাম পরিবর্তন করে রেখেছে Sinclairs। আমেরিকান রাবাইদের অনেকে কমবেশি বিভিন্ন সময়ে নিজেদের নাম পরিবর্তন করেছে। যেমন: Rabbi Posnansky হয়ে গেলেন Rabbi Posner এবং Kalen হয়ে গেল Kalensky।
এমনও দেখা গেছে, টাকা ধার করার সময় তারা ছদ্মনাম ব্যবহার করত, যেন টাকা নিয়ে ভেগে যাওয়া যায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের চাকরি শেষে ইহুদিরা নতুন নাম গ্রহণ করত, যেন নতুন কর্মক্ষেত্রে পুরোনো কাজের অভিযোগ শুনতে না হয়।
আশা করি ‘Kosher’ শব্দটি মনে আছে। যে ধর্মীয় প্রক্রিয়ায় ইহুদিরা পশু জবাই করে তাকে Kosher বলে। তবে এ প্রক্রিয়াটি সমাজে বসবাসরত অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সমস্যা তাদের ধর্মীয় আইনে নয়; বরং কসাইখানাগুলোতে। কারণ, অধিকাংশ কসাইখানায় মুনাফাকে অধিক প্রাধান্য দেওয়া হতো। তাই পশু হত্যা বর্বর পর্যায়ে রূপ নিত। জ্যান্টাইলরা যখন Kosher সংস্কৃতি বন্ধ করতে আন্দোলন শুরু করে, তখন ইহুদিরা এই শব্দের পারিভাষা পালটে ফেলে। প্রচার করতে শুরু করে- Kosher হলো- 'শহরের সবচেয়ে ভালো খাবারের স্থান!'
ইহুদিরা যাই করুক না কেন, তাদের প্রতিটি কাজের মধ্যেই একটি শিল্প থাকে; এর জন্য সাধুবাদ জানানো উচিত। এ জাতীয় কূটকৌশল সাধারণত জ্যান্টাইলদের মাথায় কখনো আসে না। এ জন্য ইহুদিরা সব সময় আমাদের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে থাকে। ক্ষমতা, অর্থ-সম্পদ বা প্রতিপত্তি যাই বলি না কেন, সবকিছুতে ইহুদিরা জ্যান্টাইলদের চেয়ে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু এভাবে বড়ো হয়ে লাভ কী? মানুষকে ধোঁকা দিয়ে সম্পদ দখল করে নিজেরটা বাড়িয়ে লাভ কী?
সত্যি বলতে যদি জ্যান্টাইলরাও ইহুদিদের পথ অবলম্বন করত, তাহলে তারাও অনুরূপ সম্পদের মালিক হতে পারত। কিন্তু এতে তো সমাজের চতুর্দিকে নোংরামি, নগ্নতা, খুন-খারাপি, অত্যাচার-অনাচারে ভরে উঠত। তখন মানুষ আর পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকত না। শান্তিতে বেঁচে থাকতে চাইলে আমাদের মধ্যকার শয়তানদের অবশ্যই সনাক্ত করতে হবে।
প্রথমে তাদের ভালো হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। যদি শত চেষ্টা করেও শোধরানো সম্ভব না হয়, তবে তাদের চূড়ান্ত ভাগাড়ে নিয়ে ফেলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। তবে এ জন্য প্রথমে নিজেদের শিক্ষিত ও বুদ্ধিমানরূপে গড়ে তুলতে হবে। না হয় বছরের পর ইহুদিদের ধোঁকার স্বীকার হয়ে যেতে হবে।
আদর্শ অর্থের বৈশিষ্ট্য
মানুষ আমৃত্যু যে জিনিসটির পেছনে অধিকাংশ সময় ব্যয় করে তা হলো- অর্থ। অর্থ থেকে জন্ম নেয় অর্থনীতি। কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়, অর্থের সংজ্ঞা কী? দেখা যাবে অনেকে এর সঠিক উত্তর দিতে পারছে না। ডলার, টাকা, রুপি, রিয়াল ইত্যাদি বহুকাল আমাদের চোখে অর্থ বলে পরিচিত হয়ে আসছে; যদিও এগুলো হলো 'কারেন্সি', যা তৈরি হয় বাতাস থেকে।
আমাদের অবচেতন মন 'অর্থ ও কারেন্সি' বিষয় দুটি এক করে ফেলেছে, কিন্তু তা এক নয়। এমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, যা দ্বারা বিষয় দুটির মাঝে পার্থক্য গড়ে তোলা সম্ভব। ইতিহাস অধ্যয়ন করলে তিন ধরনের উপকরণ পাওয়া যাবে, যেগুলো বিভিন্ন যুগে অর্থ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যথা: স্বর্ণ-রৌপ্য, কাগজি নোট এবং ভোগ্য পণ্য।
হেনরি ফোর্ডের মূল বইয়ে এই অধ্যায়টি ছিল না। পূর্বের দুটি অধ্যায়ের উপস্থাপিত বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার করার স্বার্থে এই অধ্যায়টি সংযোজন করা হয়েছে। সম্প্রতি অর্থ ব্যবস্থার ওপর Michael Maloney-এর লেখা Gold & Silver বইটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ইতোমধ্যে তা বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অতিরিক্ত অংশটুকু এই জনপ্রিয় বইয়ের সারাংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হলো।
তিনি বইটিতে আদর্শ অর্থের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করেছেন:
১. গ্রহণযোগ্য বিনিময়মাধ্যম: বিনিময় মাধ্যম বলতে একটি তৃতীয় মাধ্যমকে বোঝানো হয়, যা দ্বারা ক্রেতা-বিক্রেতারা তাদের লেনদেন সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করতে পারে। একসময় মানুষ বার্টার ট্রেড পদ্ধতিতে পণ্যের বিপরীতে পণ্য বিনিময় করত, যেমন: দুধের বিপরীতে ডিম, আটার বিপরীতে চাল ইত্যাদি। সেখানে তৃতীয় কোনো মাধ্যম ছিল না। এরপর এক যুগ আসে যখন মানুষ স্বর্ণ-রৌপ্য ও মূল্যবান ধাতব পদার্থকে তৃতীয় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা ব্যবহার করছি কাগজি নোট ও মুদ্রা। এভাবে গড়ে উঠে গ্রহণযোগ্য বিনিময় মাধ্যম এবং অবসান ঘটে বার্টার ট্রেড পদ্ধতির।
২. মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা: বার্টার ট্রেডের একটি বড়ো সমস্যা হলো মূল্য নির্ধারণে অপারগতা। এ কারণে সে যুগের বাণিজ্য একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল। এরপর আসে স্বর্ণ-রৌপ্য ভিত্তিক বিনিময় ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় স্বর্ণ-রৌপ্যকে ওজনের মানদণ্ডে হিসাব করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হতো। তবে প্রতিবারের লেনদেনে স্বর্ণ-রৌপ্য ওজন করা ছিল এক বিরক্তিকর বিষয়। তাই খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০ অব্দে লিডিয়ার রাজা আলিয়াত (Alyatte) প্রথমবারের মতো ধাতব কয়েন (Coin) তৈরি করেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ, রৌপ্য এবং আরও কিছু ধাতব পদার্থের সংমিশ্রণে তৈরি হতো সে মুদ্রা। বলা হয় এ মুদ্রাই ছিল ইতিহাসে প্রথম জন্ম নেওয়া অর্থ (Money)। বর্তমানে আমরা বিনিময় মাধ্যম হিসেবে কাগজি নোট ব্যবহার করছি। এগুলো দিয়েও পণ্যের মূল্য সহজে নির্ধারণ করা সম্ভব।
৩. হিসাবের একক: হিসাবের একক দ্বারা পরিমাপককে বোঝানো হয়। যেমন: দূরত্ব পরিমাপের একক মিটার, কিলোমিটার, ইঞ্চি বা মাইল। ওজন পরিমাপের একক আউন্স, গ্রাম বা কিলোগ্রাম। পৃথিবীর সর্বত্র এই পরিমাপকগুলো সর্বজনীন স্বীকৃত। কিন্তু টাকা, ডলার, রুপির ক্ষেত্রে সর্বজনীন স্বীকৃত কোনো পরিমাপক নেই। যেমন: এক টাকা বা এক রুপি কখনো এক ডলারের সমান হতে পারে না। কারণ, এগুলোর মূল্য সর্বদা পরিবর্তনশীল। তবে স্বর্ণ-রৌপ্য পরিমাপে এ জাতীয় কোনো সমস্যা হয় না। কারণ, ১০০ গ্রাম স্বর্ণ বা রৌপ্যের ওজন পৃথিবীর সর্বত্রই সমান। ভোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমন। যেমন : এক কেজি আটার ওজন পৃথিবীর সব স্থানে একই হবে। এ ক্ষেত্রে ভোগ্য পণ্যকেও অর্থের সংজ্ঞা নির্ধারণে বিবেচনা করা যেতে পারে।
৪. বিভাজনযোগ্য (খুচরা যোগ্যতা) : ১,০০০ টাকার একটি নোটকে ৫০০, ৩০০, ২৫০, ৫০ ইত্যাদি আকারে খুচরা করা সম্ভব। একইভাবে এক কেজি স্বর্ণ বা রৌপ্যকে ৫০০, ১০০, ৫০ বা ২০ গ্রামে বিভক্ত করা সম্ভব। ভোগ্য পণ্যের বেলাও ওজন দ্বারা বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা সম্ভব। বিভাজনযোগ্যতার বড়ো সুবিধা হলো, এর মাধ্যমে পণ্যের মূল্য সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব। এটি লেনদেন ও বিনিময় কাজে দারুণ গতীশীলতা নিয়ে আসে।
৫. মূল্যের স্থিতীশীলতা : এটি দ্বারা বোঝানো হয় অর্থের ক্রয় ক্ষমতা সহজে পরিবর্তিত হবে না। উদাহরণস্বরূপ: আপনি ৪০ হাজার টাকা দিয়ে আজ যে পরিমাণ চাল ক্রয় করতে পারছেন, আগামী ১০ বছর পর সে পরিমাণ চাল আর ক্রয় করতে পারবেন না। কারণ, নিয়মিত মুদ্রাস্ফিতির দরুন বাজারের প্রতিটি মুদ্রা হারাচ্ছে তাদের ক্রয়ক্ষমতা। আধুনিক অর্থব্যবস্থায় পৃথিবীর প্রতিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর এবং বিশেষ সব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে বড়ো পরিমাণে নতুন নোট ইস্যু করে থাকে। এ প্রক্রিয়াকে বলা হয় Quantitative Easing (QE)। এটি বাজারে নতুন মুদ্রার সরবরাহ বৃদ্ধি করে চলমান মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও পণ্যমূল্য স্থীতিশীল বা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে।
অপরদিকে, স্বর্ণ-রৌপ্য যেহেতু চাইলেই উৎপাদন করা যায় না, সেহেতু এ বাজারে স্বর্ণস্ফিতি বা রৌপ্যস্ফিতি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তা ছাড়া বিভিন্ন খনি থেকে প্রতি বছর নতুন যে পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য অর্থবাজারে যুক্ত হয়, তার পরিমাণে এতটাই নগণ্য যে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড়ো রকমের কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। বলে রাখা উচিত বর্তমান বাজারে স্বণ-রৌপ্য মূল্যের প্রতিনিয়ত যে উঠানামা, এর মূল কারণ তাদের কাগজি নোটের বিপরীতে মূল্যায়িত করা হচ্ছে। যেহেতু কাগজি নোটগুলো প্রতিনিয়ত তাদের ক্রয় ক্ষমতা হারাচ্ছে, সেহেতু ভোগ্যপণ্যের ন্যায় স্বর্ণ-রৌপ্যের মূল্যও উঠানামা করছে।
পচনশীল বৈশিষ্ট্যের দরুণ অধিকাংশ ভোগ্যপণ্যকে দীর্ঘকাল সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু পণ্য আছে যাদের তুলনামূলক বেশি দিন সংরক্ষণ করা সম্ভব। যেমন: লবণ, চিনি, মধু ইত্যাদি। এ কারণে রোমান ও থকি সম্রাজ্যের সামরিক বাহিনীতে প্রতি মাসের বেতনের সাথে কিছু পরিমাণ ভোগ্যপণ্যও প্রদান করা হতো, যা রেশন নামে পারিচিত; বিষয়টি আজও অনেক রাষ্ট্রে চলমান।
৬. স্থিতিশীল বিনিময় হার: বিনিময় হারের উঠানামা মুদ্রা বাজারের একটি নিয়মিত চিত্র। বিনিময় হারের এই উঠানামা কতটা হুমকিস্বরূপ, তা ব্যবসায়ী সম্প্রদায় খুব ভালো করে জানে। ১৯৭১ সালে ব্রিটন উত্স চুক্তিনামা রহিত হলে বিনিময় হার নির্ধারণের স্থিতিশীল প্রক্রিয়া একেবারে ভেঙে পরে। কিন্তু স্বর্ণ-রৌপ্যভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় এমনটা ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই। লিডিয়ার পর গ্রিক, রোমান, জেরুজালেমসহ আরও অনেক অঞ্চলে ধাতব মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। সে সকল মুদ্রায় স্বর্ণ ও রৌপ্যের পরিমাণ নির্দিষ্ট থাকত বলে তাদের বিনিময় নির্ধারণে কোনো জটিলতা হতো না। যেমন ধরুন, গ্রিকরা তাদের ধাতব মুদ্রায় ব্যবহার করছে ৫০% স্বর্ণ এবং রোমানরা সেখানে ব্যবহার করছে ৭৫% স্বর্ণ। এমতাবস্থায় ৩টি গ্রিক মুদ্রার সমান হবে ২টি রোমান মুদ্রা। বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ছিল বলে আজকের মতো অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবস্থা না থাকলেও সে যুগের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্বময় পরিব্যাপ্তি লাভ করেছিল।
৭. নিজস্ব উপযোগ: যেকোন ভোগ্য পণ্যের প্রধান উপযোগ হলো ক্ষুধা মেটানোর ক্ষমতা। এমন নয় যে এই উপযোগিতা কৃত্রিম বা সরকারি অধ্যাদেশে তৈরি হয়েছে। কিন্তু কাগজি নোটভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থায় প্রতিটি মুদ্রার উপযোগ সরকারি অধ্যাদেশে তৈরি হয়। যতদিন এগুলো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধীনে থাকবে, ততদিন কাগজি নোটগুলোর জীবন থাকবে।
মনে করুন, আপনার একাউন্টে পাঁচ লাখ রুপি আছে। কিছুদিন পর চীন এসে ভারত দখল করল এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে রুপিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। যদি না নতুন সরকার পুরাতন রুপিগুলোকে নতুন ইস্যু করা মুদ্রার সাথে পালটে নেওয়ার সুযোগ দেয়, তবে সে রুপির আর কোনো মূল্য থাকবে না। যেমন: সাদ্দাম সরকার পতনের সেখানে নতুন দিনারের নোট প্রিন্ট করা শুরু হয়। ফলে পূর্বের বিপুল পরিমাণ ইরাকি দিনারের আর কোনো মূল্য ছিল না। সাধারণ মানুষ কিছু পরিমাণ পুরোনো নোট ব্যাংকে গিয়ে পালটে আনার সুযোগ পেলেও বড়ো একটি অংশ রাস্তায় ফেলে দেয়। আরেকটি উদাহরণ হলো, মোদি সরকার যখন ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট মাসখানেকের জন্যে বন্ধ ঘোষণা করে, তখন নোট দুটিও সাময়িক সময়ের জন্যে তাদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় কেউ আধিপত্য বিস্তার করুক বা সরকারি অধ্যাদেশে যে পরিবর্তনই আসুক না কেন, স্বর্ণ-রৌপ্য এবং ভোগ্যপণ্যের উপযোগিতায় কোনো পরিবর্তন আসবে না।
৮. সহজ পরিবহনযোগ্যতা: কাগজি নোট বা স্বর্ণ-রৌপ্যকে আপনি চাইলে এক স্থান থেকে অন্যত্র বহন করতে পারেন। যেহেতু স্বর্ণ-রৌপ্য কাগজি নোটের চেয়ে অধিক মূল্য ধরে রাখতে পারে, সেহেতু স্বর্ণ-রৌপ্যই বেশি কার্যকর। তবে ইলেক্ট্রনিক কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে আজ অনেকেই কাগজি নোট পরিবহনের ঝামেলা কাটিয়ে উঠেছে। এ পদ্ধতি স্বর্ণ-রৌপ্যভিত্তিক অর্থব্যবস্থায়ও প্রয়োগ করা সম্ভব।
এই হলো আদর্শ অর্থের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য। এখানে অর্থ হিসেবে তিনটি উপকরণকে বিবেচনায় আনা হয়েছে: স্বর্ণ-রৌপ্য, কাগজি নোট ও ভোগ্যপণ্য। লক্ষ করুন, এমন কোনো উপকরণটি আছে, যার মধ্যে আদর্শ অর্থের সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান? অবশ্যই তা স্বর্ণ-রৌপ্য। ঠিক এ কারণে হাজার বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন সম্রাজ্যে এটিই ছিল একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিনিময়ের মাধ্যম। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সূচনালগ্নেও স্বর্ণ-রৌপ্যকে কাগজি নোট ছাপানোর মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
📄 জায়োনিস্টরাই কি আর্মাগেডনের জন্ম দেবে
মূল আলোচনায় প্রবেশ করার আগে 'আর্মাগেডন' সম্পর্কে কিছু ধারণা দিয়ে রাখা উচিত। হেনরি ফোর্ডের মূল আলোচনায় এ বিষয়গুলোর উল্লেখ ছিল না, কিন্তু আলোচনা পরিষ্কার করতে এসবের সমন্বয় প্রয়োজন।
আর্মাগেডন একটি হিব্রু শব্দ, যা দ্বারা পৃথিবীর শেষ সময়ে ভয়ংকর একটি যুদ্ধের কথা বোঝানো হয়েছে। এই যুদ্ধে সৃষ্টিকর্তার সৈন্য বাহিনী এবং শয়তানের বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হবে। অনেক পণ্ডিত ও গবেষকের ধারণা অনুযায়ী- এই যুদ্ধের সমাপ্তি হবে মেগিড্ডো পাহাড়ের কাছাকাছি কোনো স্থানে, যা বর্তমানে ইজরাইলের অন্তর্ভুক্ত। পৃথিবীর প্রতিটি বড়ো বড়ো ধর্মে এই যুদ্ধের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় পণ্ডিতগণ এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলতে পারবেন।
খ্রিষ্টান ধর্মে নিউ টেস্টামেন্টের বুক অব রেভালেশনের (১৬: ১৬)-এ বলা হয়েছে- 'অতঃপর তারা সবাই সে স্থানে একত্রিত হবে, যাকে হিব্রুতে বলা হয় আর্মাগেডন।'
কারা এই যুদ্ধে মুখোমুখি হবে, সে প্রসঙ্গে বুক অব রেভালেশনের ১৯ : ১১-১৬ ও ১৯২১-এ বলা আছে, সাদা ঘোড়ার বাহনে চড়ে স্বর্গ হতে কোনো ব্যক্তি নেমে আসবেন, যিনি তার সৈন্য বাহিনী নিয়ে শয়তানের সৈন্য বাহিনীর মুখোমুখি হবেন এবং যুদ্ধে বিজয়ী হবেন। বাইবেলের লুক, মার্ক ও ম্যাথুর বিভিন্ন শ্লোকের পূর্বাভাষ থেকে বোঝা যায়- উল্লেখিত ব্যক্তিই হবেন যিশুখ্রিষ্ট।
ইসলাম ধর্মে পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কাহাফ ও বনি ইজরাইলসহ অসংখ্য হাদিসে পৃথিবীর শেষ সময় এবং আর্মাগেডনের কথা বলা হয়েছে। নবি ঈসা (আ.) সাদা দুই মেঘের (ফেরেস্তাদের কাঁধের) ওপর ভর করে ধরণিতে নেমে আসবেন। অতঃপর ইজরাইলে পৌছে দজ্জাল বাহিনীকে সমূলে পরাজিত করবেন।
কিন্তু ইহুদি ধর্মে এমন কোনো যুদ্ধের নাম বলা হয়নি, যা আর্মাগেডন হতে পারে। তবে তালমুদে মসিহের কথা বলা হয়েছে, যিনি নতুন জন্ম নেওয়া ইজরাইলের বাদশাহ হিসেবে পৃথিবীতে আসবেন। তিনি আসার পর ইজরাইল সামরিক শক্তির শীর্ষবিন্দুতে পৌছে যাবে এবং পুরো পৃথিবী শাসন করবে। বাইবেলের ভাষায়- ইহুদিদের এই মসিকে বলা হয়েছে অ্যান্টি-ক্রাইস্ট এবং ইসলামিক পরিভাষায় দাজ্জাল। এই যুদ্ধ কখন শুরু হবে, তা নির্দিষ্ট করে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি। তবে পৃথিবীর শেষ সময়ে বহু নিদর্শনের কথা প্রতিটি ধর্মগ্রন্থে ব্যক্ত করা হয়েছে।
এই আর্মাগেডন এমনই এক যুদ্ধ, যাতে জলবায়ুর ওপর ভয়ংকর বিপর্যয় নেমে আসবে। পুরো আকাশ দীর্ঘ সময়ের জন্য ধোঁয়ায় ঢেকে যাবে। সূর্যালোক দেখা যাবে না। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও দুর্ভিক্ষের কারণে প্রচুর মানুষ মারা পড়বে। ধরণির জনসংখ্যা গত দুশো বছরে যেভাবে বেড়েছে, ঠিক সেভাবেই তা হঠাৎ করে কমে যাবে। ইজরাইলের পুনঃপ্রতিষ্ঠালাভ এই যুদ্ধের সময়কাল ঘনিয়ে আসার এক বড়ো ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অনেকে হয়তো বিভ্রান্ত হতে পারেন যে, এখানে কোন ইজরাইলের কথা বলা হচ্ছে? কারণ, সেই যে খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে তাদের ১০টি গোত্র অ্যাসিরিয়ানদের আক্রমণে হারিয়ে গেছে, তাদের তো কোনো সন্ধানই পাওয়া যায়নি। আর বর্তমান ইজরাইলে যারা বসবাস করছে, তারা তো জুদাহ রাজ্যের কেবল দুটি গোত্রের উত্তরসূরি। তাহলে বাকিরা এ ভূমিতে কবে ফিরে আসবে?
মূলত পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ জানে না বা তার খবরও রাখে না- বাকি গোত্রের অধিবাসীদের খুঁজে বের করার কাজ নব গঠিত ইজরাইল খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে নিরন্তরভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। গত অর্ধ শতাব্দীতে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তজুড়ে বিচ্ছিন্নভাবে এমন কিছু গোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা নিজেদের ইজরাইলের হারিয়ে যাওয়া গোত্রের অধিবাসী বলে দাবি করেছে।
Simcha Jacobovici হলেন এ বিষয়ের ওপর একজন বিশেষজ্ঞ। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ওপরও তার রয়েছে অসামান্য জ্ঞান। ২০০৩ সালে Quest for the Lost Tribes শিরোনামে তিনি একটি ডকুমেন্টারি প্রকাশ করেন, সেখানে এ জাতীয় কিছু গোষ্ঠীর পরিচয় তুলে ধরেছেন। যেমন: তাদের পাওয়া গিয়েছে ইথিওপিয়ার সিমিয়েন পর্বতমালায়; ভারতের মনিপুর ও মুম্বাই; ইরানের ইস্ফাহান ও মাশহাদে; সমরকন্দে। তবে আদৌ তারা হারিয়ে যাওয়া গোত্রদের প্রকৃত উত্তরসূরি কি না, তা নিয়ে খোদ ইজরাইলি প্রশাসনের মনেও যথেষ্ঠ সংশয় রয়েছে। কিন্তু তারপরও তাদের একেবারে ফেলে দিতে পারেনি। বিগত কয়েক দশকে এমন প্রচুরসংখ্যক অধিবাসীকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইজরাইলে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
তাদের কে কোন গোত্রের সদস্য, তা যেহেতু এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, তাই ইজরাইলি প্রশাসন আপাতত তাদের সবাইকে ইহুদি বলে নথিভুক্ত করছে এবং তাদের বসতবাড়ি নির্মাণের জন্য নিয়মিত প্যালেস্টানিদের ভূমি দখলের প্রচেষ্টা চলেছে।
বেলফোর ঘোষণা
জেরুজালেম দখল জায়োনিস্টদের জন্য একটি স্মরণীয় ঘটনা। ১১ ডিসেম্বর, ১৯১৭ ব্রিটিশ কমান্ডার Edmund Allenby যখন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে শহরটিতে প্রবেশ করেন, তখন পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ইহুদিরা নিশ্চিত হয়ে যায়, তারা আবারও প্রাচীন ভূমিতে ফিরে যাচ্ছে। এই নব্য ইজরাইলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এক প্রতিশ্রুতি পত্রের মধ্য দিয়ে। ২ নভেম্বর, ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রসচিব Arthur Balfour আমেরিকায় অবস্থানরত Baron Rothschild-এর নিকট একটি প্রতিশ্রুতিপত্র লিখেন- গ্রেট ব্রিটেন যেকোনো মূল্যেই প্যালেস্টাইনে ইহুদিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। এই চিঠি পেয়ে তাদের সদস্যগণ রাস্তায় নেমে নাচ-গান করতে শুরু করে।
২ নভেম্বর, ১৯১৭
প্রিয় লর্ড রথসচাইল্ড,
আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে মহামান্য সরকারের পক্ষ থেকে নিম্নবর্ণিত ঘোষণাটির কথা জানাচ্ছি। এটি ইহুদি ও জায়োনিস্টদের প্রত্যাশার সাথে সহানুভূতিস্বরূপ মন্ত্রিপরিষদে উত্থাপিত ও গৃহীত হয়েছে।
মহামান্য সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য জাতীয় স্বদেশভূমি সৃষ্টির বিষয়টি সহানুভূতির সাথে দেখছে। তাই লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। স্পষ্টত এই ঘোষণা ফিলিস্তিনে বিদ্যমান অইহুদি সম্প্রদায়গুলোর নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকারের বিরুদ্ধে কোনো পক্ষপাতিত্ব করছে না। অনুরূপভাবে এটি অন্যান্য দেশে ইহুদিরা যে আইনগত ও রাজনৈতিক অবস্থায় আছে, তার ওপরও কোনো প্রভাব ফেলবে না।
আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব, যদি দয়া করে এই ঘোষণাটি জায়োনিস্ট ফেডারেশনকে জানিয়ে দেন।
Atlantic Monthly পত্রিকার সম্পাদক Professor Albert T. Clay আমাদের সতর্ক করে বলেন-
'প্যালেস্টাইন যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকান পত্রিকাগুলোতে যে সংবাদ ছাপানো হচ্ছে, তার প্রায় সবই জায়োনিস্টদের বানানো সংবাদ। প্যালেস্টাইনিদের বিশাল এক জনগোষ্ঠী মুসলিম ও খ্রিষ্টান। তারা প্রায় ২,০০০ বছর ধরে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। নিজ ভূমি রক্ষার্থে তারা ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। এ বিষয়টি তারা বিকৃত করে বলছে, সেখানে নাকি মুসলিমরা হাজার হাজার নিরীহ ইহুদিকে হত্যা করছে।'
এর আগে ১৯০২ সালে জায়োনিস্টরা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে Anglo-Palestine Bank প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের হাজার বছরের পুরোনো 'সুদ-বাণিজ্য' শুরু করে। ৬.৫ শতাংশ সুদের বিনিময়ে পাঁচ বছর মেয়াদে তারা প্যালেস্টাইনি কৃষকদের ঋণ দিতে শুরু করে, কিন্তু অধিকাংশ কৃষক এই অর্থ প্রদানে ব্যর্থ হয়। ফলে তাদের আবাদি জমিগুলো জায়োনিস্ট ব্যাংকটির সম্পত্তি হয়ে যায়। ব্রিটিশ কমান্ডারের নেতৃত্বে তারা এই ভূমিগুলো দখল করতে শুরু করে। সে সময় অনেক ইহুদিও জেরুজালেমে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিল; যদিও তারা সংখ্যায় অনেক কম ছিল।
১৮৪২ সালে Dr. Murray M'Cheyne জেরুজালেমে বসবাসরত ইহুদিদের ওপর এক অনুসন্ধান চালান। আন্তর্জাতিক ইহুদি সংগঠনগুলো জেরুজালেমে বসবাসরত এই জনগোষ্ঠীর জন্য বাৎসরিক ভাতার ব্যবস্থা করে। ফলে কাজ না করলেও তাদের জীবিকা ও রুজির অভাব ছিল না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রতিও তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। অন্যদিকে, মুসলিম ও খ্রিষ্টানরা শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক এগিয়ে ছিল। তাই ইহুদিরা নিজেদের সন্তানদের খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে শুরু করে।
জায়োনিস্টরা এই শহর দখল করে নিলে শহরের পুরো রূপ রাতারাতি পালটে যায়। The Council of Jerusalem Jews একটি হিব্রু পত্রিকায় ইহুদি অভিভাবকদের সতর্ক করে কলাম প্রকাশ করে। কলামটিতে তাদের প্রতি কিছু আজ্ঞা প্রকাশ করা হয়-
• যদি কোনো অভিভাবক সন্তানদের খ্রিষ্টান-মুসলিম পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে না আনে, তবে তাদের বাৎসরিক ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
• তাদের চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেওয়া হবে।
• তাদের নাম ব্লাকলিস্টে রাখা হবে এবং মোজেসের অনুসারী বলে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।
• সকল প্রকার ব্যবসায়িক মুনাফা ভোগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
• তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম বয়কট করা হবে।
• সকল অফিস-আদালত থেকে ছাঁটাই করা হবে।
• যারা এসব নির্দেশ অমান্য করবে, তাদের নাম শহরের প্রধান ফটকের ওপর ঝুলিয়ে রাখা হবে।
• বিশেষ এক ব্যাজ পরতে হবে, যেন সহজে তাদের সনাক্ত করা যায়।
• জাতীয় পর্যায়ে তাদের কলঙ্কিত করা হবে।
• যদি কোনো রাবাই এ নির্দেশ অমান্য করে, তবে তাকে দায়িত্বচ্যুত করা হবে।
ইহুদিদের কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয়তাবাদ। তারা খুব ভালো করেই জানে, জেরুজালেমের অধিকার খ্রিষ্টানরাও ছাড়তে রাজি নয়। বিশ্বযুদ্ধের ফাঁদে পড়ে ব্রিটেন এই শহরকে ইহুদিদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তারা যে আজীবন জায়োনিস্টদের কথামতো কাজ করে না, তারা তা ভালো করে জানে। বেথেলহাম যিশুখ্রিষ্টের জন্মভূমি। ধর্ম প্রচার করতে তিনি জেরুজালেমে এসেছিলেন। প্যালেস্টাইন তাদের হাতে চলে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে- খ্রিষ্টানরা শহরটির ওপর অধিকার হারাবে। বলশেভিক বিপ্লবে ইহুদিরা যেভাবে রাশিয়ার গির্জাগুলো ধ্বংস করেছে, সেভাবে প্যালেস্টাইনের গির্জা ও মসজিদগুলোতেও আঘাত হানছে।
জেরুজালেম দখলের পরপরই Sir H. Samuel-এর নেতৃত্বে প্যালেস্টাইনে এক ইহুদি সরকার গঠনের কাজ শুরু হয়। একই সঙ্গে জায়োনিস্টরা সুয়েজ খাল দখলের এক ভয়ংকর খেলায় মেতে ওঠে। তিনি বলেন-
'সামরিক শক্তিতে পরিপূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এত বড়ো প্রজেক্টে হাত দেওয়া উচিত নয়। এখন প্রয়োজন ইজরাইলের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন জোগানো। যেরূপ বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে এই রাষ্ট্রের নবজন্ম ঘটেছে, খুব শীঘ্র তেমন আরেকটি যুদ্ধ ঘটতে যাচ্ছে। আমাদের উচিত, এই যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে ইজরাইল রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জন করা।'
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তিনটি বিশেষ কারণে প্যালেস্টাইন ইস্যু আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে।
১. বলশেভিকদের প্যালেস্টাইন অভিমুখে যাত্রা।
২. খতরনাক জায়োনিস্টদের জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা।
৩. বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্যালেস্টাইনের আবির্ভাব।
১৯২০ সালে জেরুজালেমের বিশপ Dr. Mclnnis এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন-
'যে আগন্তুকেরা আজ জেরুজালেম দখল করেছে- তাদের অধিকাংশই রাশিয়ান, পোলিশ ও রোমানিয়ান ইহুদি; কিছুদিন আগেও তাদের বলশেভিক বিপ্লব করতে দেখা গেছে। তারা এই ভূমি দখলের পর লিওন ট্রটস্কি সাহেবের প্রতি সম্মান জানাতে ভোলেনি। তিনিই তো তাদের 'Kingdom of Heaven' তথা এই স্বর্গরাজ্যের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।'
১৯২০ সালের হিসাব অনুযায়ী প্যালেস্টাইনের বর্তমান অধিবাসীরা প্রায় ২,০০০ বছর এ যাবৎ এই ভূমিতে বসবাস করছে। তাদের মধ্যে ৫ লাখ মুসলিম, ১ লাখ খ্রিষ্টান ও ৬৫ হাজার ইহুদি। পুরো জনসংখ্যার ৭৫ ভাগ মুসলিম, ১৫ ভাগ খ্রিষ্টান ও ১০ ইহুদি। তাদের জীবিকা অর্জনের প্রধান উপায় কৃষিকাজ। তারা যে এই অঞ্চলের প্রকৃত স্থায়ী বাসিন্দা, তা আশা করি খোদ ইউরোপিয়ান পর্যন্ত অস্বীকার করবে না। এই ভূমিকে জায়োনিস্টদের হাতে তুলে দেওয়ার অর্থ হলো- বেলজিয়ামকে মেক্সিকোর হাতে তুলে দেওয়া।
General Allenby প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি স্থানীয়দের অধিকারের প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করবেন। বেলফোর ঘোষণা, সান রেমিও সম্মেলন ও প্রেসিডেন্ট উইলসন সবাই এই কথা বলেছিলেন। কিন্তু জায়োনিস্টরা বলল- 'তাদের বের করে দাও!'
Isreal Zangwill বললেন-
'তাদের বের করে দাও! আমরা খুব ভদ্রভাবে বলছি, তারা যেন এই ভূমি ছেড়ে চলে যায়! তাদের জন্য লাখ লাখ বর্গ মাইলের আরব ভূমি পড়ে আছে। ইজরাইলে এক বর্গ ইঞ্চি জায়গাও যে এখন অবশিষ্ট নেই। তাঁবু গুটিয়ে বেদুইনদের মতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভ্রমণ করা তো তাদের জন্মগত অভ্যাস। এবার তারা তা প্রমাণ করে দেখাক।
ইহুদিরা "আরব” শব্দটিকে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করে থাকে। আমাদের মগজে আরবদের ব্যাপারে বিভ্রান্তি ছড়াতে ইহুদিরা যথেচ্ছা মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে থাকে। আমেরিকা তো স্বাধীন হয়েছে মাত্র ১৭৭৬ সালে। সামান্য দেড়শো-দুশো বছরের ব্যবধানে আমরা যদি নিজেদের এই ভূমির স্থায়ী বাসিন্দা বলে দাবি করতে পারি, তাহলে যারা প্যালেস্টাইনে দুই হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে, তারা কেন নিজেদের স্থায়ী অধিবাসী বলে দাবি করতে পারবে না! বিশ্বের নিরপেক্ষ সকল পণ্ডিত আজ নব গঠিত ইজরাইল নিয়ে ভীষণ সঙ্কিত হয়ে পড়েছে। কারণ, তাদের নব আবির্ভাব মানবজাতি তথা এই ধরণির ভবিষ্যতের প্রতি ভয়ংকর খারাপ কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে।'
ইহুদিরা যেভাবে জেরুজালেম দখল করে
১৯২১ সালের জুলাই মাসে ইউনির্ভার্সিটি অব দ্যা সাউথ 'Zionism and the Jewish Problem' শিরোনামে ২৯ পৃষ্ঠার একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করে। আর্টিক্যালটির লেখক Dr. John P. Peters দীর্ঘদিন সেন্ট জন দ্যা ডিভাইন ও সেন্ট মাইকেল চার্চের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন-
'যে জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে জায়োনিজম গড়ে উঠেছে, তার সাথে ধর্মীয় গ্রন্থের তেমন কোনো সাদৃশ্য নেই। এই রাজনৈতিক দলটির মূল ক্ষমতাভার যাদের হাতে, তাদের কেউ মূল ধর্মে বিশ্বাসী নয়। ইহুদিদের জাতীয়তাবাদ আমেরিকাসহ পৃথিবীর যেসব অংশে প্রবেশ করেছে, সেখানে তারা আরও বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে।'
Dr. Peters জায়োনিস্টদের বিভিন্ন কার্যক্রমের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তার প্রকাশিত আর্টিক্যালের গুরুত্বপূর্ণ অংশসমূহ এখানে উপস্থান করা হলো-
জায়োনিস্টরা যে প্যালেস্টাইন দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা বর্ণনা করা অনাবশ্যক। তাদের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ১৯০২ সালে। সেবার আমি দ্বিতীয় মেয়াদে প্যালেস্টাইন সফরে যাই। ১৮৯০ সালে যখন প্রথম মেয়াদে প্যালেস্টাইন সফর করি, তখন সামান্য কিছু সেফার্ডিক ইহুদি জেরুজালেমে বসবাস করত। তখন অবধি তা প্রাচীন শহরের রূপেই ছিল। শহরটির মূল প্রাচীরের বাইরে তখনও কোনো ঘরবাড়ি গড়ে ওঠেনি। উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা সবেমাত্র শুরু হয়ছে। রাশিয়ার নিপীড়িত ইহুদিরা প্যালেস্টাইন উপকূলীয় শহর শ্যারনে নিজেদের কলনি প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে কায়িক শ্রমে অনভ্যস্ত ছিল বলে তারা কৃষিকাজ করতে পারত না। তাই সিরিয়ান শ্রমিকদের ভাড়া করে নিজেদের কাজ করিয়ে নিত। আর ইহুদিরা ছাতার নিচে বসে কাজ তদারকি করত এবং প্রখর রোদ থেকে নিজেদের চামড়া রক্ষা করত।
১৯০২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে প্যালেস্টাইন গিয়ে দেখি, তাদের কলনিগুলো কৃষিকাজে ভীষণ মনোযোগী হয়ে উঠেছে। আরও লক্ষ করলাম, জেরুজালেমের বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় ইহুদিরা ঘড়বাড়ি গড়ে তুলতে শুরু করেছে। এই প্রথম শহরটির প্রধান প্রাচীরের বাইরে সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি নির্মাণ করে। তারা নিজ উদ্যোগে কৃষিকাজ, কায়িক শ্রম এবং বিভিন্ন শিল্পের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলে। আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যেন নিজ চোখে সেসব কেন্দ্র একবার হলেও দেখে যাই। এটা দেখে আমি এতটাই অবাক হই যে, সেখানে কোনো সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদেই নেই। ইহুদি, মুসলিম ও খ্রিষ্টান সব গোত্রের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কৃষিকাজ করে যাচ্ছে। আমি বলব, এটা আমার দেখা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম দৃশ্যগুলোর একটি। সেখানে সাম্প্রদায়িকতার লেশমাত্র ছিল না। সহযোগিতা ও সহমর্মিতা ছিল তাদের সকল কাজের মূল উদ্দীপনা। সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে সুন্দর এক সমাজব্যবস্থা।
দেশে ফিরে আসার পর ওপর থেকে আমাকে চাপ দেওয়া হয়, যেন এ বিষয়টি কোনো পত্রিকায় প্রকাশ না করি। খুব দুঃখ নিয়ে বলতে চাই, এই বল প্রয়োগ আসে আমেরিকার বিশেষ একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি থেকে। ইহুদি, মুসলিম ও খ্রিষ্টান শান্তিতে বসবাস করুক, তা তারা মেনে নিতে পারে না। তাদের অভিযোগ, মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের সংস্পর্শে ইহুদি সম্প্রদায় সংক্রমিত হয়ে পড়েছে। তারা চায়- ইহুদিদের জন্য পৃথক একটি সমাজব্যবস্থা থাকবে। ভূমি দখলের প্রতিযোগিতায় তাদের দ্বিতীয় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবে না। ১৯১৯ ও ১৯২০ সালে যখন পুনরায় প্যালেস্টাইন সফরে যাই, তখন দেখি ইহুদিরা ভীষণ সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছে। তাদের মাথায় ভূমি দখলের ভূত আগাগোড়া চেপে বসেছে।
দেখলাম, কৃষিকাজে তারা যথেষ্ট উন্নতি করেছে। ফল, ফসল ও শরাব উৎপাদন তাদের সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। উৎপাদন কাজ ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন প্রযুক্তির সংযোজন করেছে। কিন্তু যেসব ভূমি অধিগ্রহণ করে ইহুদিরা কৃষিকাজ করছে, তা কখনোই তাদের ভূমি ছিল না। শ্যারন প্লেইন, এসড্রাইলোন প্লেন ও জর্ডান ভ্যালি হলো প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর ভূ-অঞ্চল; বর্তমানে যা জায়োনিস্টদের দখলে। এই ভূমিগুলো তাদের শস্য-সম্পদে পরিপূর্ণ করে তুলেছে। তত দিনে জেরুজালেমে ইহুদিদের জনসংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের একদল পরজীবী ছত্রাকের ন্যায় অন্যের ঘাড়ে চেপে বসেছে, আর সামান্য কিছু বিজ্ঞান চর্চায় নিয়োজিত আছে।
শহরটি এখন সাম্প্রদায়িক জায়োনিস্টদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। বোলশেভিজমের চেতনা পুরো প্যালেস্টাইনকে পেয়ে বসেছে। হিব্রু প্রতিষ্ঠানগুলো গির্জা ও মসজিদ নিয়ে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ইচ্ছা করে খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মগজে সাম্প্রদায়িকতার আগুন প্রজ্বলিত করছে। আমার সৌভাগ্য যে, খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের বিভিন্ন ক্যাম্প সফর করার সুযোগ পেয়েছি, কিন্তু ভাষাগত জটিলতার দরুন তাদের সঙ্গে ঠিকমতো কথাও বলতে পারিনি। আরব-ইজরাইল সংঘাত ঘনীভূত হয়ে উঠেছিল বলে আরও অনেক জায়গায় যেতে পারিনি। পরে না জানি আরবরা আমাকে জায়োনিস্ট গুপ্তচর বলে সন্দেহ করে!
এটা বহু আগে থেকেই জানা ছিল যে, জায়োনিস্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্যালেস্টাইনের ইহুদিদের জন্য নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করত। তারা যেন খ্রিষ্টান বা মুসলিমদের কোনো সহযোগিতা ছাড়াই নির্বিঘ্নে জীবনযাপন করতে পারে, সে জন্যই মূলত এই ভাতার ব্যবস্থা। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক খ্রিষ্টান তার সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে জায়োনিস্টদের পক্ষে কলাম ছাপতে শুরু করেছে। এই বিশ্বাসঘাতকতাই সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে।
তারা যেন জেরুজালেমসহ প্রতিটি পবিত্র শহরে (যেমন: হেবরন, টাইবেরিয়াস, সাফেদ ইত্যাদি) ফিরে যাওয়ার পথে বিশ্ববাসীর সমর্থন পায়, সে জন্য খ্রিষ্টান সংগঠনগুলোকে বড়ো অঙ্কের উপঢৌকন প্রদান করে যাচ্ছে। খ্রিষ্টান গির্জাগুলো তাদের প্রত্যাবর্তনের পক্ষে সাফাই গেয়ে প্রার্থনায় রত হয়ে পড়েছে। পৃথিবীতে অধিকাংশ ক্যাথলিক গির্জা এই পথ অনুসরণ করতে শুরু করেছে। জায়োনিস্ট কমিটি প্যালেস্টাইনের গির্জাগুলোতে আন্তর্জাতিক মহলের বাৎসরিক চাঁদা পাঠানোর পথ বন্ধ করে দিয়েছে।'
কিছুদিন আগে জায়োনিস্ট প্রতিষ্ঠান Hebrew Edition একটি আর্টিক্যাল প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল 'Malignant Leprosy'। আর্টিক্যালটি ইংরেজিতে অনূদিত হওয়ায় সেখানে কী প্রকাশ করা হয় তা জানা যায়: ইহুদি অভিভাবকরা যেন অতি সত্বর তাদের সন্তানদের জ্যান্টাইল পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে আনে, সে বিষয়ে আদেশ-নিষেধ জারি করা হয়। যদিও সেসব প্রতিষ্ঠানে খ্রিষ্টান বা ইসলাম ধর্মের কোনো কিছু শেখানো হয় না, তারপরও ইহুদিরা চায় তাদের সন্তানরা বিধর্মীয় সংস্কৃতির সকল সংস্পর্শ থেকে মুক্ত থাকুক। যদি কোনো অভিভাবক এই নির্দেশ অমান্য করে, তবে তাদের ওপর যে শাস্তি নেমে আসবে, তার ফল শেষ প্রজন্মকে পর্যন্ত ভোগ করতে হবে।
একমাস পর Hebrew Edition দ্বিতীয় আর্টিক্যালটি প্রকাশ করে, যার শিরোনাম ছিল 'Fight and Win'। যেসব অভিভাবক তাদের সন্তানদের জ্যান্টাইল পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে আনেননি, তাদের সকল সুযোগ শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। নিচে লক্ষ করুন-
'সতর্কবাণী পাওয়ার পরও যে অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের জ্যান্টাইল পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরিয়ে আনেননি, তাদের প্রত্যেকের নাম রাস্তার মুখে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। প্রতিটি পত্রিকায় বড়ো বড়ো করে ছাপানো হবে। রাস্তায় রাস্তায় প্লাকার্ড করে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। বিশ্বাসঘাতক এবং সীমালঙ্ঘনকারী বলে তাদের অভিহিত করা হবে। তাদের নাম প্রতিটি হাসপাতাল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ইহুদি ডাক্তারদের কাছে তারা আর সেবা পাবে না। তাদের নাম ব্লাক লিস্ট করে American Jewish Relief Fund-এর নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তাদের জন্য ভবিষ্যতে আর কোনো ভাতার ব্যবস্থা করা হবে না। আমরা সবাই তাদের এড়িয়ে চলব। তাদের সন্তানদের সঙ্গে আমাদের সন্তানদের বিয়ে হবে না। তাদের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক থাকবে না। জাতিগতভাবে আমরা তাদের বর্জন করছি। তাদের জন্য দ্বিতীয় কোনো সুযোগ নেই। সকল দয়া-মায়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের সম্প্রদায়ের একটা শিক্ষা হওয়া উচিত। যদি আমাদের কেউ তাদের প্রতি সামান্য সহানুভূতিও প্রদর্শন করে, তবে তাকেও এই কাতারে ফেলা হবে। আগামী দিনগুলোতে আমাদের মধ্য হতে কেউ যদি এমন কাজ করে, তবে তার ওপরও একই শাস্তি চাপিয়ে দেওয়া হবে।'
১৯২০ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী জেরুজালেমে তখন ২৮ হাজার ইহুদি, ১৬ হাজার খ্রিষ্টান এবং ১৫ হাজার মুসলিম বসবাস করত। ইংলিশ সরকারের পাহারায় ইহুদিরা নিরাপদে এই শহরে আসতে থাকে। এতে তাদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৯২০ সালে ইস্টার সানডে এবং ইহুদিদের পাসওভার একই দিনে পড়ে। তার সঙ্গে যোগ হয় মুসলমানদের নবি মুসা উৎসব, যা সাত দিন পর্যন্ত পালিত হয়। প্রথমে তারা এক ধর্মীয় বক্তব্য শোনার জন্য হারাম-আস-শরিফে জড়ো হয়। দ্বিতীয় অংশে, মৃত সাগরের পাশে নবি দাউদ (আ.)-এর কাল্পনিক কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে তারা সাত দিনব্যাপী বাৎসরিক উৎসব সম্পন্ন করে। অটোমানরা যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন প্রতিটি সম্প্রদায় যেন নিজেদের ধর্মীয় উৎসব পালন করতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হতো, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এখানে ব্যর্থ হয়েছে।
যেহেতু ইহুদিরা এখন জেরুজালেমের রাজা, তাই তারা অন্যান্য সম্প্রদায়কে নিজেদের উৎসব পালনে ঘৃণ্য উপায়ে বাধা দিতে শুরু করে। এ কারণে উৎসবের দিন দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। খ্রিষ্টানদের অনেকেই সেদিন ঘরে বসে ছিল, কিছু লোক গির্জায় উপস্থিত ছিল। তারা রাস্তায় নেমে উৎসব করার সাহস পাচ্ছিল না। কারণ, জায়োনিস্টরা তত দিনে সামরিক শক্তিতে সুসজ্জিত হয়ে উঠেছে। তাদের কাছে প্রচুর অস্ত্র ছিল।
কিন্তু মুসলিমরা ঘরে বসে ছিল না। হেবরন থেকে একদল মুসলিম প্লাকার্ড হাতে জাফা শহরের প্রধান ফটকের সামনে হাজির হতে শুরু করে। প্লাকার্ডগুলোতে ধর্মীয় অসিষ্ণুতার বিরুদ্ধে স্লোগান লেখা ছিল। ব্রিটিশ সৈনিকের অনেকে সেদিন সামনে এগিয়ে আসেনি। কারণ, তাদের সবাই ছিল খ্রিষ্টান। কিছুদিন আগেই তারা দেখেছে- ইহুদিরা কীভাবে অকথ্য ভাষায় যিশুকে অপমান করেছে। তা ছাড়া তাদের অনেকে গির্জায় প্রার্থনা করছিল। এমতাবস্থায় ইহুদি ও মুসলিমদের মধ্যে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। ইহুদিদের কাছে আধুনিক অস্ত্র থাকলেও তারা যুদ্ধ করতে জানত না। অপর দিকে মুসলিমরা ছিল সংখ্যায় অল্প। তাদের হাতে ছুরি-তরবারি ছাড়া কিছুই ছিল না। তারপরও মুসলিমরা যুদ্ধে অসম্ভব পারদর্শী ছিল। কারণ, আরব জাতটাই এমন। শহরের ভেতরে প্রাচীন সেফার্ডিক বস্তিগুলোতে কিছু স্থানীয় ইহুদি বসবাস করত। শেষে তারাই বলির পাঠা হলো। জায়োনিস্ট ইহুদিরা আলিশান বাড়ি করে একই শহরে থাকত। মুসলিমরা শহরের ঢোকা মাত্রই ওপর থেকে গুলি ছোড়া শুরু হয়। নিরীহ সেফার্ডিকরা আতঙ্কে এদিক-সেদিক দৌড়াতে শুরু করে। অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী- এই দাঙ্গায় দুজন মারা যায়। ইংলিশ বিচারবিভাগ মুসলিম ও ইহুদিদের সমানভাবে অভিযুক্ত করে শাস্তি ভাগ করে দেয়, যদিও তদন্ত প্রতিবেদনে ইহুদিরাই ছিল মূল খলনায়ক। এই পারস্পরিক সংঘাত আদৌ কখনো বন্ধ হবে কি না বলা অসম্ভব।
জায়োনিস্ট কমিটি Sir H. Samuel-কে প্যালেস্টাইনের গভর্নর করে পাঠায়। তার এই আগমন পুরো প্যালেস্টাইনে নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়। তিনি জেরুজালেমে প্রবেশের আগেই তার মাথা উড়িয়ে দেওয়া হবে এবং মুসলমানদের শহর নেবলাসে কোনো ইহুদিকে ঢুকতে দেওয়া হবে না মর্মে কিছু হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তাই H. Samuel পূর্ণ সামরিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে জাফায় প্রথম প্রবেশ করে। আমি নিজে দেখেছি, তার সামনে-পিছে মেশিনগান হাতে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী দাঁড়িয়ে আছে। একই পদ্ধতিতে তিনি নেবলাস হয়ে জেরুজালেমে প্রবেশ করেন। শহরে প্রবেশ করেই তিনি নতুন আজ্ঞা জারি করেন। যদিও সেই দাঙ্গায় খ্রিষ্টানরা জড়িত ছিল না, কিন্তু তারপরও মুসলিমদের প্রতি তাদের মৌন সমর্থন ছিল। তাই উভয়কেই একই অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। তা ছাড়া ব্রিটিশ বাহিনী নিষ্ক্রিয় থাকায় তাদের এই শহর দেখা-শোনায় অনুপযুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়। এতটুকু দেখার পর আমি প্যালেস্টাইন ত্যাগ করে আমেরিকায় চলে আসি। যতদিন সেখানে ছিলাম, চেষ্টা করেছি সঠিক তথ্যটি সংগ্রহ করতে; যদিও তা সহজ ছিল না।
প্যালেস্টাইনের ভবিষ্যৎ কী হতে যাচ্ছে, তা এত শীঘ্রই বলা সম্ভব হচ্ছে না। তা ছাড়া ব্রিটিশ সরকার যে কতদিন তাদের নিরাপত্তা দিয়ে রাখবে, তাও বিতর্কের বিষয়। সত্যি-ই যদি ব্রিটিশ সরকার সাম্য, সৌহার্দ্য ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে প্যালেস্টাইন শাসন করতে শুরু করে, তবে এই দেশ এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে। কিন্তু জায়োনিস্টরা এটা মেনে নেবে না। জায়োনিস্টদের অত্যাচারে পুরো প্যালেস্টাইন এখন একটি করদরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। হয়তো জায়োনিস্টদের চাপে ব্রিটিশ সরকার একদিন তার সৈন্যবাহিনী সরিয়ে নিতে বাধ্য হবে। তখন নতুন এক পরিস্থিতির জন্ম হবে। ইরাক, সিরিয়া ও মিশর থেকে দলে দলে মুসলিম বাহিনী এই ভূমি স্বাধীন করতে এগিয়ে আসবে। ব্রিটিশ সরকার ইতোমধ্যেই বুঝতে পেরেছে, বিশ্বব্যাপী তার উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থার ভিত কেপে উঠছে। মিশরে ইতোমধ্যে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জোরদার হয়েছে। ভারত থেকে যে মুসলিম সৈন্যদের তিনি ইহুদিদের নিরাপত্তার তাগিদে নিয়ে এসেছেন, তারাও কিছুদিন পর বেঁকে বসবে। কারণ, নিজ মুসলমান ভাইদের ওপর তারা কখনো বুলেট চালাবে না। এখন এটা সময়ের ব্যাপার যে, সামনে কী হতে যাচ্ছে।
📄 দাঙ্গাবাজ ইহুদিদের অপকর্ম চিত্র
১৮৯৭ সালের জায়োনিস্ট সম্মেলনে Theodor Herzl যে খসড়ালিপি উপস্থাপন করেন, তার দেড় যুগ পার না হতেই পৃথিবীতে একটি বিশ্বযুদ্ধ আঘাত হানে।
১৯০৩ সালে কিশিনেভে বসবাসরত ইহুদিদের সঙ্গে জ্যান্টাইলদের দাঙ্গা বাধে। ফলে সেখানে বহু ইহুদি নিহত হয়। ক্ষতিপূরণস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার উগান্ডায় তাদের একটি উপনিবেশ স্থাপনের প্রস্তাব দেন। Dr. Herzl এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন।
কেন এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হলো, তা নিয়ে তাদের মহলে প্রচণ্ড হইচই পড়ে যায়। কারণ, তাদের লক্ষ্য জেরুজালেম। অন্য কোনো ভূমির কথা তারা ভাবতেই পারে না। ইতঃপূর্বে তাদের আর্জেন্টিনায় উপনিবেশ স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেখানে তারা একই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাহলে উগান্ডা প্রস্তাবে Dr. Herzl রাজি হলেন কেন? এর কিছুদিন পর শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। তখনও কেউ বুঝতে পারেনি এই রক্তাক্ত যুদ্ধের উদ্দেশ্য কি! তবে যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, তাদের আর উগান্ডায় যেতে হয়নি; বরং তারা জেরুজালেমকেই চূড়ান্ত ভূমিরূপে ফিরে পেয়েছে।
প্রশ্ন জাগে, তারা কি এই যুদ্ধের কথা আগেই অনুমান করতে পেরেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর তাদেরই একটি উৎস থেকে উপস্থাপন করা হবে। ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯১৯ American Jewish News-এর প্রধান মুখপাত্র, Litman Rosenthal পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় 'When Prophet Speak' শিরোনামে একটি কলাম প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যিনি বহু বছর আগেই বেলফোর ঘোষণার পূর্ববাণী করেছিলেন। তিনি হলেন Max Nordau। তিনি ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রভাবশালী এক জায়োনিস্ট আন্দোলনকারী। Litman ছিলেন Nordau-এর ঘনিষ্ঠ সহচর। কলামটিতে ষষ্ঠ জায়োনিস্ট সম্মেলনে Nordau সাহেবের দেওয়া একটি বক্তৃতা উপস্থাপন করা হয়, যেখানে তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ইজরাইল পুনঃপ্রতিষ্ঠার ভবিষ্যদ্বাণী করেন। কলামটি নিচে উপস্থাপন করা হলো:
WHEN PROPHET SPEAK
By Litman Rosenthal
দিনটি ছিল শনিবার। ষষ্ঠ জায়োনিস্ট সম্মেলন সমাপ্ত হওয়ার পরদিন। সম্মেলনটি ১৯০৩ সালের আগস্ট মাসে বাসেলে অনুষ্ঠিত হয়। Dr. Herzl টেলিফোনে আমাকে তার সঙ্গে দেখা করার কথা বলেন। হোটেলে প্রবেশ মাত্রই তার মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। কুশলাদি বিনিময়ের পর তিনি রাশিয়ায় জায়োনিস্ট আন্দোলনের খবর জানতে চাইলেন। প্রশ্ন করলাম— 'আপনি কেবল রাশিয়ার খবর জানতে চাচ্ছেন কেন?' জবাবে তিনি বললেন— 'কারণ, আমার ছেলের কাছে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এর ওপর ইহুদিদের অনেক স্বার্থ নির্ভর করছে।'
সম্মেলনে ব্রিটিশ সরকারের প্রস্তাবিত পশ্চিম আফ্রিকার উগান্ডাকে তাদের উপনিবেশ তৈরি করা নিয়ে আলোচনা হয়। (Herzl ও তার প্রতিনিধিগণ ব্রিটিশ সরকারের এই প্রস্তাবনায় রাজি হন— Jewish Encyclopedia, Vol. 12, Page 678)। তবে প্যালেস্টাইনকে বিসর্জন দিয়ে নয়; বরং প্যালেস্টাইনকে ফিরে পাওয়ার ধাপ হিসেবেই একে গ্রহণ করা হয়। এটি ছিল Herzl ও Rosenthal-এর আলোচনার মূল বিষয়বস্তু। Herzl বলেন— 'আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং তা অর্জনের পদ্ধতির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।'
এবার সম্মেলনে Dr. Nordau কী বলেছেন এবং কোন সৌভাগ্যবশত তাতে যোগ দিয়েছিলাম, সেই গল্প নিচে উল্লেখ করা হলো:
'সেবার এক ব্যবসায়িক সফরে ফ্রান্সে গিয়েছিলাম। লিওনস যাওয়ার পথে কিছু সময়ের জন্য প্যারিসে যাত্রা বিরতি করি। প্রতিবারের মতো সেবারও জায়োনিস্ট বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করি। এক বন্ধু বলল, আজ সন্ধ্যায় Dr. Nordau ষষ্ঠ জায়োনিস্ট সম্মেলনে বক্তৃতা দেবেন। তার বক্তৃতা শুনতে ব্যবসায়িক সফরটি দীর্ঘায়িত করলাম। সন্ধ্যার মধ্যেই সম্মেলন কক্ষে হাজির হলাম। কক্ষটি ততক্ষণে জনসমাগমে গিজগিজ করছিল। তিনি সম্মেলন কক্ষে পৌঁছা মাত্রই সবাই দাঁড়িয়ে সংবর্ধনা জানাল। কোনো রকম দৃষ্টিপাত না করে তিনি সরাসরি বক্তৃতা মঞ্চে চলে গেলেন। এরপর বলা শুরু করলেন—
"জানি, আপনারা সবাই একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে ব্যাকুল হয়ে আছেন। প্রশ্নটি হলো— কীভাবে আমি ও Herzl ব্রিটেনের প্রস্তাবিত উগান্ডা প্রস্তাবনায় রাজি হলাম? কেনই-বা প্যলেস্টাইন ইস্যু থেকে সরে এলাম এবং আমাদের সহস্র বছরের পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলাম? এর জবাবে আপনাদের বলতে চাই, উগান্ডা প্রস্তাবনায় রাজি হওয়ার পেছনে অনেকগুলো যৌক্তিক কারণ রয়েছে। আসলে Herzl সাহেবকে এই প্রস্তাবনায় রাজি হওয়ার জন্য আমিই অনুরোধ করি। কেন এমনটা করেছি তা বলার আগে আপনাদের একটি গল্প শোনাতে চাই।
আমি এমন একটি সময়ের কথা বলতে যাচ্ছি, যা আপনাদের অনেকেই জানেন না। তখন ইউরোপের ক্ষমতাধর শক্তিগুলো সেভাস্টোপল দুর্গ দখল করতে নৌ-বহর পাঠানোর পরিকল্পনা করছিল। তখনও স্বাধীন ইতালির জন্ম হয়নি। সার্ডিনিয়ার একটি ছোটো শাসনাঞ্চল হিসেবে এটি পরিচিত ছিল, কিন্তু তখন এর ওপর অন্যান্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল। সার্ডিনিয়াবাসী স্বাধীন ইতালি প্রতিষ্ঠায় ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল। এর পেছনে যে কয়জন মহান নেতার পরিচয় পাওয়া যায়, তারা হলেন— Garibaldi, Mazzini ও Cavour।
ইউরোপের শক্তিধর দেশগুলো সার্ডিনিয়াকে সেভাস্টোপল আক্রমণের আমন্ত্রণ জানায়। প্রথমাবস্থায় সেভাস্টোপল ইস্যুতে সার্ডিনিয়া অস্বীকৃতি জানায়। বিশেষ করে Garibaldi ও Mazzini এই যুদ্ধে জাহাজ পাঠাতে রাজি হয়নি। তারা বলে— "আমাদের পরিকল্পনা ইতালি প্রতিষ্ঠা নিয়ে। সেভাস্টোপলে গিয়ে আমরা কী করব? সেখানে তো আমাদের কোনো কাজ নেই। আমাদের সব শক্তি ও ক্ষমতা শুধু ইতালি প্রতিষ্ঠার পেছনে ব্যয় করা উচিত।"
কিন্তু Cavour ছিলেন ব্যতিক্রমী ও দূরদর্শী একজন নেতা। তিনি বলেন— "আমাদের উচিত ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সেভাস্টোপল আক্রমণ করা।" আসলে Hartam নামে তার একজন ব্যক্তিগত সচিব ছিল, যিনি জাতিতে ইহুদি। তিনি কেবল তার ব্যক্তিগত সচিবই ছিলেন না; খুব কাছের বন্ধুও ছিলেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে Cavour সাহেবকে পরামর্শ দিতেন। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সার্ডিনিয়ার অনেকেই Cavour-কে বিশ্বাসঘাতক বলে ডাকতে শুরু করে। অনেকে তার ব্যক্তিগত সচিবকে অভিযুক্তের কাঠগড়ায় নিয়ে আসে। প্রশ্ন করা হয়— বিশ্বাসঘাতকের মতো এমন বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ কী?
তিনি বলেন— "যে স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে আমাদের এত যুদ্ধ, ত্যাগ-তিতিক্ষা, তার মূলে রয়েছে স্বাধীন ইতালি প্রতিষ্ঠার দৃঢ় বাসনা। এ জন্য আমরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছি। মায়েরা তাদের সন্তানদের বিসর্জন দিয়েছে। আমাদের সব আত্মত্যাগ তখনই পবিত্র বলে গণ্য হবে, যখন চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হব।"
তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, সেভাস্টোপল যুদ্ধের পর একটি শান্তি আলোচনা হবে। সেখানে যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী প্রতিটি দেশ আসন গ্রহণ করবে। সার্ডিনিয়ার হয়তো সেভাস্টোপল নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই, কিন্তু এই যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শান্তি আলোচনার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে। যখন সবাই যুদ্ধের মুনাফা ভাগ-বটোয়ারা নিয়ে দাবি তুলবে, তখন আমরা স্বাধীন ইতালির দাবি করব। এভাবে Cavour উপস্থিত নীতি-নির্ধারকদের বোঝানোর চেষ্টা করেন সেভাস্টোপল আক্রমণ করা হবে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রথম ধাপ।
পুরো কক্ষ এতক্ষণ Nordau সাহেবের বাণী মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামলে সবাই হাততালি দিতে শুরু করে। সবাইকে থামার নির্দেশ দিয়ে তিনি আবারও বলতে শুরু করলেন—
"বর্তমান বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি ব্রিটেন কিশিনেভ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সহমর্মিতাস্বরূপ আমাদের উগান্ডা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমরা জানি উগান্ডা আফ্রিকাতে, আর জায়োনিজমও কখনো আফ্রিকার জন্য তৈরি হয়নি। Herzl সাহেব খুব ভালো করেই জানেন, রাজনৈতিক পরাশক্তিদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কোনো বিকল্প হতে পারে না। এমতাবস্থায় ব্রিটেনকে হাতছাড়া করা উচিত হবে না। আমরা একটি মহাবিপ্লবের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। খুব দ্রুত এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে, যার দরুন আবারও একটি শান্তি আলোচনার আয়োজন করা হবে। সেখানে পৃথিবীর বড়ো বড়ো দেশের প্রতিনিধিরা হাজির হবে। আমরা পুনরায় ষষ্ঠ জায়োনিস্ট সম্মেলনের বিষয়াবলি উপস্থাপন করব। ব্রিটেন পূর্বের ন্যায় আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। এখন উগান্ডাবিষয়ক প্রশ্নে সার্ডিনিয়াকে অনুকরণ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাতে পারি। আর তা হচ্ছে— Herzl, জায়োনিস্ট সম্মেলন, ইংল্যান্ডের উগান্ডা প্রস্তাবনা, ভবিষ্যৎ বিশ্বযুদ্ধ (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ), যুদ্ধপরবর্তী শান্তি আলোচনা এবং সবশেষে ব্রিটেনের সহায়তায় প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।"
শেষ কিছু শব্দ আমাদের কানে বজ্রের ন্যায় আঘাত করে। আমরা অনেকেই বুঝতে পারিনি, একজন মানুষ কীভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তার এই জ্বালাময়ী বক্তৃতা প্যালেস্টাইন পুনরুদ্ধার বিষয়ে জায়োনিস্টদের সকল সংশয় মুহূর্তেই উড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। সবার আবেগ-উৎকণ্ঠাকে তিনি আরও কিছু সময়ের জন্য ধৈর্যে পরিণত করতে সক্ষম হন। এরপর আমরা সবাই তার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সেই কাঙ্ক্ষিত সময়টির জন্য দিনক্ষণ গণনা শুরু করলাম।'
পাঠকদের অবাক লাগতে পারে, Litman Rosenthal-কে কীভাবে এমন একটি কলাম লেখার জন্য অনুমতি দেওয়া হলো! আসলে বেলফোর ঘোষণার পূর্বে এই কলামটি প্রকাশিত হয়নি। ইহুদিদের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে— তারা ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো বিষয় জনসম্মুখে আসতে দেবে না, যতক্ষণ না তার উদ্দেশ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়। এ বিষয়টি পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে বেলফোর ঘোষণার অনেক পরে। ১৯০৩ সালের কর্মসূচিতে স্থান পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো— ১. ভবিষ্যৎ বিশ্বযুদ্ধ ২. শান্তি আলোচনা ৩. নিজেদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন।
একই উদাহরণ পাওয়া যায় জার সাম্রাজ্যের পতনের সময়ও। প্রথমে বলা হয় Nicholas Romanovitch-সহ তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েদের যারা হত্যা করে, তারা ছিল সোভিয়েত ডেপুটি, কিন্তু অনুসন্ধানের পর পরিষ্কার হয়— হত্যাকারী পাঁচজনই ছিল ইহুদি। তারা সোভিয়েত ডেপুটি ছদ্মবেশে Nicholas পরিবারকে হত্যা করে। এর পেছনে ছিল আমেরিকান জায়োনিস্টদের বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিয়োগ।
অবশেষে সেই দিনটি চলে আসে, যখন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় রাজপরিবারের সদস্য Archduke Franz Ferdinand সস্ত্রীক আততায়ীর হাতে নিহত হন। দিনটি ছিল ২৮ জুন, ১৯১৪। সেদিন তিনি সস্ত্রীক বসনিয়ার রাজধানী সারাজেভো ভ্রমণ করছিলেন। অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়, সার্ব-বসনিয়ার জাতীয়তাবাদী সংগঠন 'ব্লাক হ্যান্ডসদের' দ্বারা এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে।
২৩ জুলাই এই জাতীয়তাবাদ সন্ত্রাসী সদস্যদের আটক করার জন্য অস্ট্রিয়া সরকার সার্বদের ওপর সামরিক চাপ বৃদ্ধি করে। ঠিক তার পরদিন সার্বরা রাশিয়ানদের নিকট সামরিক সাহায্যের আবেদন করে। রাশিয়া বিনা বাক্যে সেই আবেদনে সাড়া দেয়। ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া সার্বদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধ ঘোষণা করে, যা এক অর্থে রাশিয়ানদের ওপরেও যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর। এরপর অস্ট্রিয়ার সমর্থনে পাশে এসে দাঁড়ায় জার্মানি ও অটোমান। অন্যদিকে রাশিয়ার পক্ষে দাঁড়ায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স।
Nordau সাহেবের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী যুদ্ধ ঠিক সময়ই শুরু হয়। আর যুদ্ধের ফলাফল কী হবে তা তারা ভালো করেই জানত। কারণ, কার ভান্ডারে কতটুকু রসদ মজুদ আছে সে হিসাব তারা আগেই কষে রেখেছিল। প্রতিটি দেশের প্রশাসনিক বিভাগে তাদের যথেষ্টসংখ্যক প্রতিনিধি ছিল। তাদের অতি প্রাচীন একটি সংস্কৃতি হচ্ছে— তারা নিরপেক্ষতার ছুতো ধরে যুদ্ধের উভয় পক্ষকে ঋণ ও রসদ সরবরাহ করত এবং প্রয়োজনীয় মুহূর্তে কাঙ্ক্ষিত একটি পক্ষের রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দিত। এতে তাদের ভান্ডারে যেমন মুনাফা আসত, তেমনি কাঙ্ক্ষিত পক্ষটিও যুদ্ধে জয়লাভ করত।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর তারা অপেক্ষা করতে লাগল, কখন মিত্রশক্তির রসদ ফুরিয়ে যাবে। ব্রিটেনের জাহাজগুলো জার্মানির বিরুদ্ধে এমনিতেই প্রতিরোধ গড়তে পারছিল না। তার ওপর রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ায় তারা মাঝপথে যুদ্ধ থেকে সরে পরে। অসহায় হয়ে যায় ব্রিটেন ও ফ্রান্স।
তাদের অসহায়ত্বের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা পড়ে, যখন ইহুদি ব্যাংকাররা ১৯১৬ সাল থেকে সকল প্রকার ঋণ প্রদান বন্ধ করে দেয়। কিছুদিন পর ফ্রান্সের অভ্যন্তরে সামরিক বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। এর দরুন তারাও যুদ্ধ থেকে সরে পড়ে। বাকি থাকে শুধু ব্রিটেন। তারা যে একাকী এই যুদ্ধে কখনো জিততে পারবে না, তা জায়োনিস্টরা বেশ ভালো করেই জানত। সেই মুহূর্তে ব্রিটেনের জন্য সামরিক শক্তিতে পুষ্ট কোনো মিত্রশক্তির আবশ্যকতা দেখা দেয়। আর এই সুযোগ যে ইহুদিদের সামনে আসবে, তা তারা যুদ্ধের আগ থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল। তাই তারা এতদিন ওত পেতে অতি গোপনে নতুন একটি সামরিক বাহিনী তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। আর তা-ই হলো আজকের আমেরিকা।
এই কাজের পুরো দায়িত্ব অর্পিত হয় Bernard M. Baruch-এর ওপর। তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এ দেশটিকে রণ শক্তিতে এতটা পারদর্শী করে তোলেন যে, যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাত্র ছয় মাসের মাথায় তারা জার্মানিকে সমূলে পরাজিত করে। ব্রিটেনের হাতে তুলে দেয় বিজয় মুকুট। এরপর ব্রিটেনও তাদের প্রতিশ্রুতিস্বরূপ, যুদ্ধ জয়ের বিনিময় হিসেবে জায়োনিস্টদের হাতে তুলে দেয় প্যালেস্টাইনের চাবি।
Mr. Baruch ১৮৭০ সালে দক্ষিণ ক্যারোলিনাতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম Simon Baruch। যুদ্ধ চলাকালে আমেরিকার ৩৫১-৩৫৭টি শিল্প প্রতিষ্ঠান তিনি একাই নিয়ন্ত্রণ করতেন। সে সময় তার মতো ক্ষমতাধর ব্যক্তি আমেরিকায় দ্বিতীয় কেউ ছিল না; এমনকী খোদ প্রেসিডেন্ট সাহেবও নন। যে কোম্পানির ওপর একবার তার চোখ পড়ত, তা দখল করেই ছাড়তেন। যেমন: Liggett & Meyers Tobacco Company, Selby Smelter, Tacoma Smelter ইত্যাদি। তিনি মেক্সিকোতে বিশাল রাবার বাগান গড়ে তোলেন, যেখান থেকে বিভিন্ন স্থানে কাঁচামাল সরবরাহ করা হতো। আয়রন, ইস্পাত ও কপার শিল্পের বাজারগুলোও তার দখলে ছিল।
১৯১২ সালে Woodrow Wilson-এর নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেন। তখন থেকে তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সত্যিকারার্থে এটা কোনো সম্পর্ক ছিল না। বলা চলে, প্রেসিডেন্ট সাহেব তার হাতে বন্দি হয়ে পড়েন। মূলত এ দেশে যারা প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়, তাদের সবাই জায়োনিস্টদের পুতুলে পরিণত হয়। এ কথা কেন বলছি, তা পরবর্তী একটি অধ্যায়ে পরিষ্কার করব। যাহোক, এই সুযোগে Mr. Baruch সে সময়ের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি বনে যান। তিনি যা বলেতেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব তা-ই করতেন। অর্থ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, কাঁচামাল, রসদ, সেনাবাহিনী ও শ্রমবাজারের মতো পাঁচটি বড়ো বড়ো প্রশাসনিক দপ্তর তিনি একাই চালাতেন।
যেহেতু আমেরিকা যুদ্ধে অংশ নেবে, তাই একটি সু-সংগঠিত সেনাবাহিনী গড়ে তোলা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই যুদ্ধকে ভয় পায় বলে এত দ্রুত সেনাবাহিনী গড়ে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। Mr. Baruch প্রভোস্ট মার্শালকে কিছু উপায় বাতলে দেন। প্রথমে নির্ধারণ করেন, এই বাহিনীতে কোন কোন শ্রেণির জনগোষ্ঠীকে নেওয়া হবে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমেরিকার বেশ কিছু শিল্প সংগঠন বন্ধ করে দেওয়া হয়। কলমের এক খোঁচায় তাদের অবৈধ বলে আইন জারি করা হয়। এই শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা কাজ করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাতারাতি বেকার হয়ে পড়ে। এটাই ছিল তাদের পরিকল্পনা। কারণ, এমন পরিস্থিতিতে একজন বেকারকে যে কাজেরই সুযোগ দেওয়া হবে, তাতেই সে রাজি হবে। অন্তত নিজ পরিবারের জন্য হলেও রাজি হবে; ঠিক তাই ঘটল। এরপর যখন সেনাবাহিনীতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়, বেকাররা দলে দলে সেখানে প্রবেশ করতে শুরু করে। এভাবেই তৈরি হয় যুদ্ধকালীন আমেরিকার সেনাবাহিনী।
বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতিস্বরূপ Mr. Baruch প্রেসিডেন্ট সাহেবের থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলারের একটি বাজেট পাশ করান, যার পুরোটাই ছিল সাধারণ জনগণের ট্যাক্স ও বন্ড ক্রয়ের অর্থ। এত অর্থের বাজেট করেও যুদ্ধ শেষে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের বোনাস দেওয়া তো দূরের কথা, প্রাপ্য মজুরিটুকুও সামরিক বিভাগ মেটাতে পারেনি। তাহলে এত অর্থ গেল কোথায়? যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই দেখা যায়— নিউইয়র্কের ইহুদিদের আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়ে গেছে। সে সময় এই শহরের ৭০ শতাংশ মিলিয়নিয়ার ছিল এই জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা।
সাধারণ মানুষ তাদের দুঃখ-দুর্দশার দরুন প্রেসিডেন্টকে দোষারোপ করতে শুরু করে। কারণ, তার নির্দেশেই সেই শিল্প সংগঠনগুলো বন্ধ এবং সাধারণ মানুষ যুদ্ধে নিহত হয়েছে, অথচ তারা প্রাপ্য মজুরি পায়নি। ফলে চারদিকে ডেমোক্রেটবিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, Woodrow Wilson ছিলেন এই দলের সদস্য। বোঝাই যাচ্ছিল এরপর যিনি ক্ষমতায় আসবেন, তিনি অবশ্যই রিপাবলিকান কোনো প্রার্থী হবেন। এবার ইহুদিরা তাদের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী রিপাবলিকানদের পিছে অর্থ বিনিয়োগ শুরু করে। বিনিয়োগ সফলও হয়। ১৯২১ সালে ক্ষমতায় আসে রিপাবলিকান প্রার্থী Warren G. Harding। এদিকে সৈনিকদের বকেয়া মজুরির ফলাফল হিসেবে আমেরিকায় শুরু হয় ইতিহাসের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ধ্বস, যা Great Depression ১৯২৯-১৯৩৯ নামে পরিচিত。
ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় ইহুদিদের নানা অপকর্মের চিত্র
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে বলকান দেশগুলোতে সাধারণ মানুষ যখন ক্ষুধা-দরিদ্রতায় হাহাকার করছিল, তখন আমেরিকা থেকে বেশ কয়েকটি ত্রাণবাহী জাহাজ সেখানে পাঠানো হয়। ত্রাণ বিতরণকালীন অভিজ্ঞতা নিয়ে জাহাজকর্মীদের মুখ হতে পাওয়া একটি অভিজ্ঞতার গল্প নিচে তুলে ধরা হলো—
'যুদ্ধপরবর্তী শান্তি মিশনের অংশ হিসেবে আমাদের জাহাজগুলো প্রয়োজনীয় ত্রাণ-সামগ্রী নিয়ে লিবাও বন্দরে হাজির হয়। চারদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের জাহাজটি ছোটো একটি স্রোতধারার সামনে নোঙর ফেলে ত্রাণ হস্তান্তর শুরু করে। এত এত মানুষ খাবারের জন্য হাহাকার করছিল যে, সুষ্ঠভাবে ত্রাণ বিলি করা অসম্ভব হয়। যখনই তাদের সামনে নতুন একটি আটার ব্যাগ খোলা হচ্ছিল, মানুষ যেন তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। যেটুকু আটা মাটিতে পড়ছিল, সেটুকুর জন্যও মানুষের কাকুতি-মিনতির শেষ ছিল না। ক্ষুধার্ত মানুষরা ধুলো-ময়লা মাখা আটাগুলো পর্যন্ত তাদের পাত্রে ভর্তি করে রাখছিল। আলু বিতরণ শুরু হলে তো মারামারি বেধে যায়। আলুর খোসা পানিতে ছুড়ে মারলে ক্ষুধার্ত মানুষরা তাদের ধাতব পাত্র দড়িতে বেঁধে সেগুলো তুলে আনতে শুরু করে। সাদা বর্ণের শুকনো মানুষগুলো খাবারের জন্য সারা দিন উন্মাদের মতো বড়ো বড়ো চোখ করে দাঁড়িয়ে ছিল।
এর মধ্যে দেখা যায় ডজনখানেক ইহুদির কিছু কুৎসিত দৃশ্য। সবাই যখন খাবারের জন্য লাফালাফি করছে, তখন ভালো কাপড় পরা তাদের একদল সদস্যকে দেখা যায়, যাদের মাথায় ছিল সদ্য ক্রয় করা চকচকে টুপি, হাতে ছিল দামি ঘড়ি এবং পায়ে ছিল দামি জুতা; যেমনটা শহরের সম্পদশালী মানুষদের ব্যবহার করতে দেখা যায়। তাদের আচরণ দেখে মনে হয়, এই জাহাজটি যেন তাদের জন্য সিগারেট নিয়ে এসেছে! তারা আমাদের পাঁচ পাউন্ডের নোট দেখিয়ে বলছে, এক কাটুন সিগারেট হবে অথবা একটি স্বর্ণের ঘড়ির বিনিময়ে নতুন কিছু সাবান হবে? দেখে মনেই হয় না, তারা রাশিয়াতে কোনো রকম নির্যাতনের শিকার হয়েছে।'
খ্রিষ্ট যুগের সূচনা হতে আজ পর্যন্ত যত ঐতিহাসিক যুদ্ধ-বিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে, তার প্রধান কারণ হিসেবে কেন যেন শুধু খ্রিষ্টানদেরই অভিযুক্ত করা হয়। সর্বত্র প্রমাণ করার জোড় প্রচেষ্টা চলছে— খ্রিষ্টবাদ ঐতিহাসিকভাবেই সন্ত্রাসী চেতনায় বিশ্বাসী এবং তারাই পৃথিবীর অধিকাংশ ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মূল হোতা! এ প্রসঙ্গে Rev. M. Malbert, ১৯২১ সালের এপ্রিলে Hebrew Christian Alliance Quarterly থেকে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যার শিরোনাম ছিল 'Persecution Is Not the Monopoly of Christian and Is Contrary to Its Principles।' প্রবন্ধটির গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ নিচে তুলে ধরা হলো—
'অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তাদের সব অপবাদের বিরুদ্ধে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করতে হবে। গত কয়েক হাজার বছরের সকল দাঙ্গা-সংঘাতের দায়ী হিসেবে পৃথিবীবাসী শুধু আমাদেরকেই অভিযুক্ত করেছে। কিন্তু পৃথিবীর প্রথম ধর্মীয় যুদ্ধের সূত্রপাত, ইহুদিদের হাতেই হলেও তারা এই বিষয়টি কখনোই স্বীকার করতে রাজি নয়। সময়ের পরিক্রমায় তারাই নিজেদের যুদ্ধবাজ জাতিতে পরিণত করেছে।
খ্রিষ্টপূর্ব ১২০ সালে Simon-এর পুত্র John Hyrcanus ছিলেন মাক্কাবিয়ান পরিবারের শেষ ভাই। নিজেদের ধর্ম রক্ষার্থে তিনি সিরিয়ান সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হন। তিনি জেরিজিন পর্বতের ওপর নির্মিত সামারিটান টেম্পল একেবারে ধ্বংস করে দেন। পরে ইডুমিয়ান রাজ্য দখল করেন এবং বন্দিদের ওপর দুটি পথ চাপিয়ে দেন। যথা: হয় ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করো, নয়তো দেশ ছেড়ে চলে যাও। তিনি জোড়পূর্বক একদল যুদ্ধবন্দির ওপর এই ধর্ম চাপিয়ে দেন।'
...John Hyrcanus-এর তৃতীয় পুত্র King Alexander ছিলেন মাক্কাবিয়ান রাজা। একজন পুরহিত হওয়ার পরও তিনি পরকালে বিশ্বাস করতেন না। এ জন্য ফেরাসিস গোত্র তাকে কখনো সহ্য করত না। খ্রিষ্টপূর্ব ৯৫ সালে ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুক্কাতে তিনি প্রতিবারের মতো নিজের পৌরহিত্য জাহির করছিলেন (ইহুদি ক্যালেন্ডারে ৭ম মাসের ১৫তম দিনকে শুক্কাত বলা হয়)। পূজার বেদিতে পানি না ঢেলে তিনি নিজ পায়ে ঢালতে শুরু করেন। বুঝতে পারলেন, এই কাজে সবাই চটে গেছে এবং তার জীবন হুমকির মুখে। অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি সৈন্যবাহিনীকে দ্রুত হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন, আর তারা সেখানে উপস্থিত থাকা ৬০০০ মানুষকে হত্যা করে।
তবে ফেরাসিসদের প্রতিশোধ ছিল আরও ভয়ংকর। পরিস্থিতি ঠান্ডা করতে তিনি তাদের দলনেতাকে শান্তি আলোচনার প্রস্তাব করেন, কিন্তু কেউ এই শান্তি আলোচনায় বসেনি; বরং সবাই তার মৃত্যুদণ্ডের দাবি তোলে। তারা নিজ দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে সিরিয়ান রাজা Eucaerus-কে প্যালেস্টাইন দখলের জন্য উসকে দেয় এবং তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করে। রাজা Eucaerus প্রায় ৪৩০০০ সৈন্য নিয়ে মাক্কাবিয়ান সাম্রাজ্য জিহিদিয়া আক্রমণ করে। তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় Alexander পরাজিত হয় এবং ইফ্রয়িম পর্বতে আশ্রয় নেয়। পরে সিরিয়ান রাজাও ফেরাসিসদের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করে। তাদের একটি প্রতিশ্রুতিও পূরণ করা হয়নি। বিবেকের তাড়নায় দংশিত হয়ে তাদের প্রায় ৬০০০ সদস্য আবারও Alexander-এর কাছে ফিরে যায় এবং সাম্রাজ্য ফিরে পেতে আবারও যুদ্ধ করে। এই যুদ্ধে তারা সিরিয়ানরা পরাজিত হয়। এরপরও রাজা সাহেবের বিরুদ্ধে তাদের অনেকের পূর্ব অসন্তোষের রেশ থেকে যায়।
...ইহুদিরা অধার্মিকতা বা নাস্তিকতা একদম সহ্য করতে পারে না। তাদের চোখে অন্য ধর্মের প্রত্যেকেই নাস্তিক। একমাত্র তারাই আস্তিকতার ধর্মে বিশ্বাসী। তারা আশেপাশের প্রতিটি শহরকে এই ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করে। যে শহরগুলো ইহুদি ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, সেগুলো ধ্বংস করে দেয়। তৎকালীন সেনহাড্রিনের সদস্য Simon ben Shetach তার শাসনামলে ৮০ জন নারীকে জাদুচর্চার অভিযোগে ডাইনি বলে ক্রুশে ঝুলিয়ে হত্যা করে।
...হিল্লোল ও শাম্মাই হলো খ্রিষ্টপূর্ব বছরগুলোতে তাদের বড়ো দুটি বিদ্যাপীঠ। ধর্মীয় নিয়মনীতিতে মত-পার্থক্যের দরুন তাদের মধ্যে bloody যুদ্ধ প্রায় লেগেই থাকত। যিশুকে ক্রুশে ঝুলিয়ে হত্যা করাও ছিল তাদের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ। তারা বিশ্বাস করে— ঈশ্বরের নিকট সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো খ্রিষ্টান হত্যা!
রাবাই Tarpon একবার বলেছিলেন, গস্পেল এবং এপোস্টলের প্রতিটি বাক্য সৃষ্টিকর্তার নাম উল্লেখপূর্বক পুড়িয়ে ফেলা উচিত। তিনি আরও বলেন, খ্রিষ্টধর্ম পেগানিজমের চেয়েও বিপজ্জনক। প্রয়োজনে তিনি পেগানদের টেম্পলে আশ্রয় নেবেন, কিন্তু ক্যাথলিকদের সংস্পর্শে যাবেন না। Bar-Kosibah তাদের এক ভণ্ড পয়গম্বর, যিনি তার শাসনামলে প্রচুর খ্রিষ্টানকে নির্দয়ভাবে হত্যা করেন। রাজা Justinian-এর শাসনামলে তারা কৈসরিয়ার আশেপাশে বসবাসরত খ্রিষ্টানদের হত্যা এবং তাদের গির্জাগুলো ধ্বংস করে। গভর্নর Stephanus যখন দাঙ্গা হামলার শিকার খ্রিষ্টানদের রক্ষার প্রচেষ্টা করেন, তখন ইহুদিরা তাঁকেও হত্যা করে। ৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে তারা অ্যান্টিও আক্রমণ এবং সেখানে বসবাসরত খ্রিষ্টানদের ধারাল তলোয়ার দিয়ে নির্বিচারে হত্যা করে। রাজা Sinaite-এর শরীর দড়িতে বেঁধে অ্যান্টিওকের রাস্তায় টেনেহিঁচড়ে হত্যা করে।
৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের রাজা ইহুদিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্যালেস্টাইন আক্রমণ করে এবং সেখানে থাকা খ্রিষ্টানদের গণহত্যায় মেতে ওঠে। তখন প্রায় নব্বই হাজার অধিবাসী জেরুজালেম ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যায়। ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে বাইজ্যান্টাইন রাজা Heraclius পুনরায় প্যালেস্টাইন দখল করেন। যখন তার সৈন্যবাহিনী রোমান সাম্রাজ্য পাড়ি দিয়ে জেরুজালেম যাচ্ছিল, তখন এক সম্পদশালী ইহুদি তাকে নৈশ্যভোজের আমন্ত্রণ করে, যার নাম ছিল Benjamin।
তিনি হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি পারস্যের রাজাকে জেরুজালেম দখলের জন্য উসকে দেন। রাজা Heraclius জিজ্ঞেস করেন— 'কেন তুমি নিজ ভূমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে জেরুজালেমকে পারস্যের হাতে তুলে দিলে?' জবাবে তিনি বলেন— 'কারণ, সেখানে থাকা খ্রিষ্টানদের আমরা সহ্য করতে পারি না। এমনকী তারা মুসলিমদের নবি মুহাম্মাদের ওপরও কম অত্যাচার করেনি। তারা আরব নেতাদের মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিল এবং তাঁর অনুসারীদের ছত্রভঙ্গ করার বহু প্রচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। এর মাধ্যমে যিশুর একটি ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণতা পায়— তিনি নিপীড়িত ও নির্যাতিত হয়েছেন, কিন্তু সত্য বাণী প্রচারে পিছপা হননি।'
এই প্রবন্ধ এখানেই শেষ নয়। কেউ যদি নিজ দায়িত্বে প্রবন্ধটি সম্পূর্ণ পাঠ করেন, তবে রক্তচোষা ইহুদি জাতির আরও অনেক ইতিহাস জানতে পারবেন। যখন তাদের ধর্ম পুনর্গঠন নিয়ে বিভিন্ন রাবাইদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হচ্ছিল, তখন রাবাই Isaac M. Wise-কে হুমকি দিয়ে রাবাই Lilienthal বলেন— 'আপনি যদি নিজেকে খ্রিষ্টান বলে মনে করেন, তবে ক্রুশবিদ্ধ হতে প্রস্তুত হোন।' (Isaac Meyer Wise, p. 92)
যারা Gibbson-এর লেখা Rise and Fall of the Roman Empire বইটি পড়েছেন, তারা ১ম খণ্ডের ১৬তম অধ্যায়ে তাদের নির্মমতার আরও অনেক প্রমাণ পাবেন। ইতিহাস প্রমাণ করে— যারা আজ অবধি ধর্মকে ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তারা হলো ইহুদি। বইটির বিশেষ একটি অনুচ্ছেদ নিচে তুলে ধরা হলো—
'সম্রাট Nero Claudius-এর রাজত্ব থেকে Antonius Pius-এর রাজত্বকাল পর্যন্ত রোমানদের কর্তৃত্ব ইহুদিদের অস্থির করে তোলে। যার দরুন তাদের সাথে প্রতিনিয়ত ছোটোখাটো দাঙ্গা লেগেই থাকত। মিশর, সাইপ্রাস ও সাইরিনের শহরগুলোতে তারা যে নির্মম ধ্বংসযজ্ঞের জন্ম দিয়েছে, তা মানব ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যে রাজ্য তাদের আশ্রয় দিয়েছে, সেই রাজ্যের সাথেও ইহুদিরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত মনোভাবের দরুন তারা কেবল রোমান সাম্রাজ্যেরই নয়; বরং গোটা মানবজাতির শত্রুতে পরিণত হয়েছে।
ইহুদিরা তাদের সেই অন্ধ বিশ্বাস আজ অবধি জিয়িয়ে রেখেছে, একদিন মহা প্রতিক্ষিত মশিহ হাজির হবেন। তিনি বিশ্ব সাম্রাজ্য তাদের হাতে তুলে দিয়ে এবং চারদিকে স্বর্গীয় আবহ তৈরি করবেন।'
তাদের উদ্দেশ্য প্যালেস্টাইন। বিংশ শতাব্দীতে অসংখ্য আন্দোলনের সূত্রপাত হলেও সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠে 'বেলফোর ঘোষণা'। যে দশ সদস্যের বোর্ড থেকে এই ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়, তাদের সাতজনই ছিল এভানজেলিক খ্রিষ্টান; যাদের সঙ্গে বিশেষ এই জাতিগোষ্ঠীটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্যালেস্টাইনে আরব উৎখাত বহু আগেই শুরু হয়েছে, কিন্তু ইহুদিদের জন্য এখনও তা নিরাপদ ভূমিতে পরিণত হয়নি। তাদের কৌশল ও চাপের মুখে ব্রিটেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ফেঁসে গিয়েছিল। শুধু কি প্যালেস্টাইন? আরব, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত জুড়ে ২৫০-৩০০ বছরের যে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন, তা নিয়েও ইহুদিদের কম পরিকল্পনা ছিল না。
রণক্ষেত্র ইহুদিদের অর্থ উপার্জনের আদর্শ শস্যক্ষেত্র
পূর্বের একটি অধ্যায়ে বলা হয়েছে, যুদ্ধ ইহুদিদের নিকট অমিত সম্পদ উপার্জনের আদর্শ শস্যক্ষেত্র। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে যতগুলো যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে, প্রতিটির পেছনেই এই জাতিগোষ্ঠীটির বড়ো অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের উভয় পক্ষকেই প্রয়োজনীয় বিভিন্ন রসদ (খাদ্যশস্য, জামা-কাপড়, অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জামাদি) সরবরাহ করে ইহুদিরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছে।
বিষয়টি নিয়ে ১৯১৩ সালে Werner Sombart একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন, যার নাম The Jews and Modern Capitalism। বইটির ৫০ থেকে ৫৩ নম্বর পৃষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ বিশেষ নিচে তুলে ধরা হলো—
'ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপ-আমেরিকার প্রতিটি সৈন্যদলের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও রসদ সরবরাহের মূল কাজটি করত ইহুদিরা। এই বাণিজ্য যেন তাদের একচেটিয়া সম্পদে পরিণত হয়। ইহুদিরা ছিল যেকোনো রাজার নিকট ঋণ লাভের প্রধানতম উৎস। এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যার সব এখানে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। তবে একটি পথ দেখিয়ে দিতে পারি, যা অনুসরণ করে যেকোনো উৎসাহী পাঠক নিজেদের গবেষণা চালিয়ে নিতে পারবেন।
১৪৯২ সালের আগ পর্যন্ত ইহুদিদের বড়ো একটি অংশ স্পেনে বাস করত। তখন স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীগুলোতে ইহুদিরা প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের কাজ করত। সে গল্প এখানে আনতে চাচ্ছি না; বরং সেখান থেকে গল্প শুরু করব, যেখান থেকে ইংল্যান্ড-ইহুদি সম্পর্ক জোরদার হতে শুরু করেছে।
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে তারা বিভিন্ন সামরিক বাহিনীর প্রধানতম রসদ সরবরাহকারী গোষ্ঠী হিসেবে চারদিকে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করে। Antonio Fernandez Carvajal হলেন এমন একজন ইহুদি, যিনি কমনওয়েলথ সৈন্যবাহিনীর জন্য রসদ সরবরাহের বিশেষ দায়িত্ব পান। তিনি ১৬৩০ থেকে ১৬৩৫ এর মাঝামাঝি সময়ে লন্ডনে বসবাস শুরু করেন এবং খুব অল্প সময়ে মাঝেই নিজেকে সম্পদশালী বণিকে পরিণত করেন।
১৬৪৯ সালে তাকে ইংল্যান্ড সামরিক বাহিনীর প্রধান খাদ্য-রসদ সরবরাহকারী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এ কাজে তার সহকারী হিসেবে একই জাতিগোষ্ঠীর আরও চারজন সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় তিনি বাৎসরিক ১,০০,০০০ পাউন্ড সমমূল্যের রৌপ্য বাহিরের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতেন। ১৬৮৯ সালে William III রাজা হিসেবে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আরোহণ করেন। সে সময় তার সামরিক বাহিনীর জন্য প্রধান রসদ সরবরাহকারী হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন Sir Solomon Medina। তিনি ছিলেন জন্মসূত্রে একজন আরব ইহুদি।
সপ্তদশ শতাব্দীতে স্পেনের সাথে ইংল্যান্ডের যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই ফ্রান্সের সাথে নতুনভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্সের রাজা Louis XIV-এর সামরিক বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের কাজ করত স্ট্রসবার্গের (Strasbourg) ইহুদিরা। Jacob Worms ছিলেন রাজা Louis XIV-এর ডান হাত, যার পরামর্শ ছাড়া তিনি এক কদমও চলতেন না। যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি Maurice বলেন, ইহুদি রসদ সরবরাহকারীদের দক্ষতার দরুন তিনি সামরিক বাহিনীকে যে রূপে সুসজ্জিত করেছেন, ইতঃপূর্বে কখনো তা করা সম্ভব হয়নি। Louis বংশের শেষ দুই রাজার আমলে প্রধান রসদ সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করেছেন Cerf Beer। ১৭২৭ সালে মেটজ (Metz) শহরের ইহুদিরা মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে সেখানকার সামরিক বাহিনীর জন্য ৫,০০০ হাজার নতুন ঘোড়া সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে Abraham Gardis নির্মাণ করেন তার বিখ্যাত কোষাগার 'House of Gardis'। তা ছাড়া কুইবেক প্রদেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি নির্মাণ করেন আরও অনেক কোষাগার; যেখান থেকে ফরাসি বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সময়ে রসদ সরবরাহ করা হতো।
নেপোলিয়নের প্রতিটি যুদ্ধের ইতিহাস যদি ভালোভাবে অধ্যয়ন করা হয়, তবে সেখানেও উভয় দলে একই রসদ সরবরাহকারীর উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া যাবে। দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চালিয়ে যাওয়ার দরুন, উক্ত শতাব্দীতে পুরো ফ্রান্সজুড়ে দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ে। প্যারিস শহরের নগরপাল ইহুদিদের নিকট আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন, যেন এই দুর্ভিক্ষ থেকে তাদের রক্ষা করা হয়। সেখানকার সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করত, একমাত্র ইহুদিদের পক্ষেই এই মহামারি সময়ে খাদ্যাভাব মেটানো সম্ভব। একইভাবে, ১৭২০ সালে ড্রেসডেন শহরে দুর্ভিক্ষ শুরু হলে Jonas Meyer প্রায় ৪০ হাজার বুসেল সমপরিমাণ খাদ্যশস্য সরবরাহ করে শহরটিকে রক্ষা করেন। (১ বুসেল = ১৫.৪২ কেজি প্রায়।)'
জার্মানির ইতিহাস খুব ভালো করে অধ্যয়ন করলে সেখানেও অনেক ইহুদির পরিচয় পাওয়া যাবে, যারা বিভিন্ন সময়ে একচেটিয়াভাবে সেখানকার সামরিক বাহিনীতে রসদ সরবরাহের কাজ করত। যেমন: ১৫৩৭ সালে হেলবারস্টেড শহরের জার্মান সেনা ক্যাম্পে এই কাজের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন Isaac Meyer। খাদ্য-অস্ত্রসহ শত্রু পক্ষের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তিনি সেখানকার সেনা অফিসারদের নিকট সরবরাহ করতেন।
এরপর আসে Joselman von Rosheim-এর নাম, যিনি জার্মান সরকারকে খাদ্য, অস্ত্র ও তথ্য রসদের পাশাপাশি অর্থ ঋণ দিয়ে সাহায্য করতেন। তার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৫৫৮ সালে তাকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
১৫৫৬ সালে বোহেমিয়ান প্রদেশের ইহুদিরা স্থানীয় সেনা-ক্যাম্পগুলোতে সামরিক পোশাক ও কম্বল সরবরাহের বিষয়টি এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। ষোড়শ শতাব্দীতে Lazarus নামে আরও এক বিখ্যাত বোহেমিয়ান ইহুদির নাম শোনা যায়, যে নিজ দায়িত্বে শত্রুপক্ষের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জার্মান সেনাবাহিনীর নিকট সরবরাহ করত। এর দরুন তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানান সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়, যা কাজে লাগিয়ে সেও রসদ সরবরাহের কাজে জড়িয়ে পড়ে।
সেক্সনি রাজ্যে এই কাজটি করত Samuel Julius। তা ছাড়া বিভিন্ন যুদ্ধে কামান ও গান পাউডার সরবরাহের কাজ করত Leimann Gompertz ও Solomon Elias।
অস্ট্রিয়ার সামরিক বাহিনীতেও প্রধান রসদ সরবরাহকারী হিসেবে এমন অসংখ্য ইহুদির পরিচয় খুঁজে পাওয়া যাবে। রাজা Leopold-এর শাসনামলে ইহুদিরা ভিয়েনাতে আশ্রয় গ্রহণ করে এবং রাতারাতি সেখানকার সামরিক বাহিনীতে রসদ সরবরাহের কাজটি নিজেদের করে নেয়। এমন কিছু বিখ্যাত ইহুদির নাম হলো— Oppenheimers, Wertheimers ও Mayer Herschel。
মধ্যযুগীয় যুদ্ধ থেকে শুরু করে আমেরিকার স্বাধীনতাযুদ্ধ পর্যন্ত পৃথিবীতে যতগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তার মধ্যে এমন একটি উদাহরণও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে বিশেষ এই জাতিগোষ্ঠীটির অংশগ্রহণ ছিল না। যুদ্ধে তো বহু রাষ্ট্রই অংশগ্রহণ করে। মিত্ররাষ্ট্রকে বাঁচাতে বহু দেশের সামরিক বাহিনী রণক্ষেত্রে যোগদান করে। তারা সম্মুখ সমরে নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করে এবং দেশ ও জাতীয়তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে নিজেদের সবটুকু উজার করে দেয়। কিন্তু ইহুদিদের ক্ষেত্রে এই প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন। তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ঠিকই, তবে রণক্ষেত্রে নয়। তারা প্রতিটি যুদ্ধকে অর্থ উপার্জনের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ওপরন্তু অর্থের প্রতি নিজেদের লোলুপ বাসনা চরিতার্থ করতে ইহুদিরা বিভিন্ন রাষ্ট্রকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পারস্পরিক যুদ্ধে জড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। স্বাধীনতাপরবর্তী আমেরিকায় যে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তাতেও ছিল ইহুদিদের বর্ণণাতীত কূটবুদ্ধি ও ষড়যন্ত্রের দৌড়াত্ম্য।
বহু শতাব্দী পূর্বে, ক্যাথলিক ও অর্থডক্সদের অন্তর্দ্বন্দ্ব পুঁজি করে ইউরোপ জুড়ে যে রক্তাক্ষয়ী ধর্মীয় সংঘাতের সূত্রপাত, তার পরিসমাপ্তি আজও ঘটেনি। রক্তের সমুদ্র শুকিয়ে তাতে নতুন রক্ত ঝড়েছে, কিন্তু পরিবর্তন আসেনি সাধারণ মানুষের জীবন প্রবাহে। পরিবর্তন এসেছে শুধু ইহুদিদের সম্পদ ও প্রাচুর্যতায়। কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের রিপোর্টগুলো ভালোভাবে অনুসন্ধান করলে এমন অনেক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যাবে, যেখানে বিভিন্ন সামরিক বাহিনীতে রসদ সরবরাহ করে ইহুদিরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করত। তেলের ড্রাম, কম্বল, রাইফেল, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি খুব পরিচিত কিছু রসদের নাম, যা তারা নিয়মিত সরবরাহ করত। ১৭৭৫ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের সাথে আমেরিকানদের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলেছিল, সেখানেও ছিল এই রসদ ব্যবসায়ীদের উল্লেখযোগ্য অধিপত্য。
এ প্রসঙ্গে প্রথমে যে ব্যক্তির নাম চলে আসে, তিনি হলেন Moses Franks। একসময় তিনি ইংল্যান্ডে থাকতেন এবং ব্রিটিশ সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরুর আগ পর্যন্ত তিনি আমেরিকায় অবস্থিত ব্রিটিশ সেনা-ক্যাম্পগুলোতে প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহের সিংহভাগ আঞ্জাম দিতেন। তা ছাড়া কুইবেক, মন্ট্রেল, মেসাচুসেট, নিউইয়র্ক ও ইলয়নসের ক্যাম্পগুলোতে তিনি ছিলেন প্রধান রসদ সরবরাহকারী।
Jacob Franks তখন নিউইয়র্কে বাস করতেন। মূলত Moses Franks-এর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে তার আমেরিকায় আগমন। তিনিও ব্রিটিশ সেনা-ক্যাম্পগুলোতে রসদ সরবরাহের কাজ করতেন। বলে রাখা উচিত, স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর পূর্ব হতে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সাথে ফ্রাঙ্ক পরিবারের ছিল বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। তাই এই যুদ্ধের প্রারম্ভিক পর্যায়ে তারা ব্রিটিশ সেনা-ক্যাম্পগুলোতে রসদ সরবরাহ করত। যেহেতু ইহুদিরা কখনো এক পাত্রে সব ডিম রাখতে রাজি নয়, তাই কিছুদিন পর যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে শুরু করলে তাদেরই আরেকটি অংশ আমেরিকানদের জন্য রসদ সরবরাহ করতে শুরু করে।
David Franks হলেন তাদের একজন। তিনি ছিলেন Jacob Franks-এর পুত্র। শুরুর দিকে তিনি পেনসিলভানিয়ার ব্রিটিশসেনা-ক্যাম্পগুলোতে রসদ সরবরাহের কাজ করতেন। পরবর্তী সময়ে আমেরিকার সেনাবাহিনীতে অর্থ ও রসদ সরবরাহের কাজ শুরু করেন। অসম্ভব ধনী হওয়ার দরুন তিনি আমেরিকার রাজনীতি ও সাম্রাজ্যবাদবিরুধী শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। এই স্বাধীনতাযুদ্ধে মহান যে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম প্রায়ই বিভিন্ন স্থানে উচ্চারিত হয়, তাদের অনেকেই ছিল বিশেষ এই ব্যক্তির সাগরেদ।
মন্ট্রেল শহরে এই পরিবারের এমন আরেকজন সদস্যের নাম জানা যায়, যিনি আমেরিকানদের পক্ষে রসদ সরবরাহ করতেন, তিনি হলেন— David Solesbury Franks। তিনি ছিলেন Moses Franks-এর পৌত্র। রসদ বাণিজ্যে তিনি এতটা দক্ষ ছিলেন যে, কীভাবে সামরিক শক্তিতে দুর্বল একটি জাতির ভাগ্য রাতারাতি পালটে দেওয়া যায়, তা তিনি ভালো করে জানতেন। এ জন্য তাকে একটি উপাধি দেওয়া হয় 'A Blooded Buck' ।
এ ছাড়াও ফ্রাঙ্কস পরিবারের আরও অনেক সদস্যের নাম এই স্বাধীনতাযুদ্ধে জড়িয়ে আছে, যা উল্লেখ করে এই আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছি না। পরবর্তী সময়ে আমেরিকা হয়ে উঠে ইহুদিদের আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্য বিস্তারের দুর্গক্ষেত্র। তবে Bernard M. Baruch প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সামরিক শক্তিতে পরিপূর্ণ আমেরিকান সেনাবাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে এই দুর্গের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সেই থেকে এই বাহিনী কেবল ইহুদিদেরই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনে পথে কাজ করে যাচ্ছে।