📘 সিক্রেটস অব ডিভাইন লাভ > 📄 জান্নাত ও জাহান্নামের রহস্য

📄 জান্নাত ও জাহান্নামের রহস্য


জান্নাতে যাওয়ার পথ তোমার ভেতরেই রয়েছে। তোমার ভালোবাসার ডানাগুলোকে ভালোভাবে ঝাঁকুনি দাও, যাতে এগুলো শক্ত হয়। এ ডানাই তোমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে; সিঁড়ির প্রয়োজন হবে না। -জালালুদ্দিন রুমি

মহান আল্লাহ বলেন- 'আমি প্রত্যেকটি বস্তু সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়।' সূরা আজ-জারিয়াত: ৪৯
এর কারণ সম্ভবত এই যে, সৃষ্টিজগতের সবকিছুর মান নির্ণীত হয় তার বিপরীত বস্তুর সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে। ভেতর ছাড়া বাহির হয় না, সাদা ছাড়া কালো হয় না, নারী ছাড়া পুরুষ হয় না। অন্ধকার না থাকলে আলোর কি কোনো মূল্য থাকে? জাহান্নাম না থাকলে জান্নাতের কি কোনো মর্যাদা থাকে? যদি রঙের বৈপরীত্য না থাকত, তাহলে আমাদের চোখ কোনো কিছু দেখতে পারত না। যদি শব্দের তরঙ্গ না থাকত, তাহলে আমাদের কান কোনো কিছু শুনতে পারত না। কারণ, আমাদের মনের বোঝাপড়া নির্ভর করে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যকার সম্পর্ক, বাস্তবতা ও সংযুক্ততার ওপর। এজন্যই আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির মাঝে দ্বৈততা সৃষ্টি করেছেন, যাতে মানুষ আল্লাহর গুণগুলোকে তাঁর সৃষ্টির ওপর প্রয়োগ করতে পারে এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রেমে পড়ার স্বাদ অনুভব করতে পারে।

যেহেতু ভালোবাসা কখনো জোর করে হয় না, সেহেতু আল্লাহ আমাদের ইচ্ছার স্বাধীনতা দান করেছেন, যাতে আমরা প্রকৃত ভালোবাসার স্বাদ অনুভব করতে পারি। জাহান্নাম হলো আমাদের স্বাধীন ইচ্ছারই উপজাত (বাইপ্রোডাক্ট)। কারণ, আল্লাহ যেহেতু আমাদের ইচ্ছার স্বাধীনতা দান করেছেন, সেহেতু তাঁর থেকে বিমুখ হওয়ার স্বাধীনতাও আমরা ভোগ করে যাচ্ছি।
দুনিয়া হলো পরকালের শস্যক্ষেত্র। এখানে যে শস্য আমরা রোপণ করব, তার ফসল দিয়েই পরকালে নিজের গোলা ভরব। যদি পরকালকে কেবল শাস্তি ও পুরস্কারের জায়গা হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে আল্লাহর বার্তাগুলোর নির্যাসকে সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারব না। মূলত জান্নাত ও জাহান্নাম শুধু বস্তুগত বিষয় নয়; বরং এ দুটি হলো আল্লাহর কাছাকাছি ও আল্লাহর কাছ থেকে দূরে থাকার অনুভূতিরই বাস্তব রূপায়ণ। অন্যকথায়, জান্নাত ও জাহান্নাম হলো সেই আয়না, যেখানে আল্লাহর সাথে আমাদের আত্মার সম্পর্ক প্রতিফলিত হয়।

জান্নাত ও জাহান্নামের গভীরতম অর্থ
জান্নাত ও জাহান্নাম কেবল বস্তুগত গন্তব্য নয়; বরং আধ্যাত্মিক বাস্তবতাও। জান্নাত ও জাহান্নামের প্রকৃত রূপের বর্ণনা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কারণ, এগুলো এমন বাস্তবতা-যা মানবীয় অনুভূতির বহু ঊর্ধ্বে। পবিত্র কুরআন ও মহানবি ﷺ-এর হাদিসে জান্নাত ও জাহান্নামের সেই বর্ণনাগুলো এসেছে, যা মানবীয় অনুভূতি ধারণ করতে সক্ষম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই বর্ণনাগুলো জান্নাত ও জাহান্নামের প্রকৃত রূপের ছিটেফোঁটা মাত্র।
পরকাল গঠিত হবে দুনিয়ার জীবনের ওপর ভিত্তি করে। দুনিয়াতে যে সৎকর্মের বীজ আমরা বপন করে চলেছি, সে বীজগুলোই জান্নাতের বাগানে মহিরুহ হয়ে দেখা দেবে। জান্নাতের বাসিন্দাদের আল্লাহ তায়ালা বলবেন-
'বিগত দিনসমূহে তোমরা যা অগ্রে প্রেরণ করেছ, তার বিনিময়ে তোমরা তৃপ্তি সহকারে খাও এবং পান করো।' সূরা হাক্কাহ : ২৪

আপনি যদি দুনিয়াতে আল্লাহর সাথে বিচ্ছেদ ও প্রত্যাখ্যানের জীবনযাপন করেন, তাহলে পরকালেও একই জীবনের সম্মুখীন হবেন। জাহান্নাম হলো বিচ্ছেদের অপর নাম, যেখানে মানুষের সামনে এমন এক আবরণ পড়ে যাবে, যার ফলে সে আল্লাহর সর্বব্যাপী ভালোবাসা ও দয়া থেকে বঞ্চিত হবে। অন্যদিকে জান্নাত হলো আল্লাহর নৈকট্যের অপর নাম, যেখানে মানুষ আল্লাহর ভালোবাসা ও প্রশান্তির সমুদ্রে নিজেকে বিলীন করার অপার্থিব আনন্দ অনুভব করবে।
'ভবিষ্যতের ভেতর জান্নাত ও জাহান্নামকে তালাশ করো না। জান্নাত ও জাহান্নাম তো এখনই বর্তমান। আমরা যখন কোনো প্রত্যাশা, পুরস্কার বা সমঝোতা ছাড়াই ভালোবাসার চর্চা করি, তখন জান্নাতেই থাকি। আর যখন ঝগড়া করি বা ঘৃণার চর্চা করি, তখন জাহান্নামে অবস্থান করি।' -শামস তিবরিজি (জালালুদ্দিন রুমির আধ্যাত্মিক শিক্ষক)

দুনিয়াতের আমাদের উদ্দেশ্য কেবল জান্নাতে পৌঁছা নয়; বরং আমাদের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে জানা, তাঁকে ভালোবাসা এবং তাঁর ইবাদত করা।
আপনি যদি জানতে চান, আল্লাহর কাছে আপনার অবস্থান কোথায়? তাহলে খুঁজে দেখতে হবে, আপনার কাছে আল্লাহর অবস্থান কোথায়। আমরা যদি কেবল পুরস্কারের আশায় আল্লাহর ইবাদত করি, তাহলে আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কটা হবে নিরস লেনদেনের সম্পর্ক-যেখানে ভালোবাসা ও আবেগের কোনো স্থান থাকবে না। ফলে আল্লাহর সৃষ্টি-বৈচিত্র্যের সামগ্রিক উদ্দেশ্যের পেছনে যে প্রাণসত্তা রয়েছে, তার স্বাদ অনুভব করতে পারব না।
আমরা যদি কেবলই জান্নাতের পুরস্কার লাভের জন্য ইবাদত করি, তাহলে তা আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কুরআনের কোথাও আল্লাহ বলেননি, জান্নাতের কামনা করার জন্য আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে; বরং কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, তাঁর ইবাদত করার জন্যই আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। যাতে আমরা আমাদের কুপ্রবৃত্তিকে পরাভূত করতে পারি এবং হৃদয়কে ত্রুটিমুক্ত করে আল্লাহর ভালোবাসামাখা চেহারা অবলোকনের জন্য উপযুক্ততা অর্জন করতে পারি। বিশিষ্ট সাধক রাবেয়া বসরি বলেছেন-
'হে আল্লাহ! আমি যদি জাহান্নামের ভয়ে আপনার ইবাদত করি, তাহলে আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করুন। আমি যদি জান্নাত লাভের আশায় আপনার ইবাদত করি, তাহলে আমাকে জান্নাত থেকে দূরে রাখুন। কিন্তু আমি যদি কেবল আপনারই জন্য আপনার ইবাদত করি, তাহলে আপনার চিরস্থায়ী সৌন্দর্য থেকে আমাকে বিমুখ করবেন না।'

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন-
'আল্লাহ ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কানন-কুঞ্জের, যার তলদেশে প্রবাহিত হবে প্রস্রবণ। তারা সেগুলোর মাঝেই থাকবে। আর এসব কানন-কুঞ্জে থাকবে পরিচ্ছন্ন থাকার ঘর। বস্তুত এ সমুদয়ের মাঝে সবচেয়ে বড়ো হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। এটাই হলো মহাসাফল্য।'
দেখা যাচ্ছে-বান্দার জন্য জান্নাতের সবচেয়ে বড়ো উপহার হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। অনেক স্কলার বলেছেন-আল্লাহ যদি জাহান্নামের ভেতর তাঁর চেহারা প্রদর্শন করেন, তাহলে জাহান্নামের আগুন নিভে গিয়ে নয়নাভিরাম বাগানে পরিণত হয়ে যাবে এবং আল্লাহ যদি জান্নাত থেকে তাঁর উপস্থিতিকে সরিয়ে নেন, তাহলে সীমাহীন আনন্দের জান্নাত পুরোপুরি অর্থহীন হয়ে পড়বে। জান্নাতের সকল সৌন্দর্যের উৎস হলো এর স্রষ্টার নৈকট্য।

জান্নাত-জাহান্নামের আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী রূপ
জান্নাত হলো এমন একটি জায়গা, যেখানে আপনি আল্লাহর গুণাবলির বস্তুগত প্রতিফলনের ভেতর মোড়ানো থাকবেন। জান্নাতের জগতে আপনি আল্লাহর দয়ার ছায়ায় ঢাকা থাকবেন। আল্লাহর মহিমার প্রাসাদে বসবাস করবেন। আল্লাহর উদারতার বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করবেন। আল্লাহর অনুগ্রহে নদী থেকে পানি পান করবেন। আল্লাহর সৌন্দর্যের রেশমি কাপড় দিয়ে জড়ানো থাকবেন। আল্লাহর শান্তিময়তার খাটে হেলান দিয়ে বসবেন এবং আল্লাহর ভালোবাসার মদ পান করবেন। আল্লাহর সত্যের ঝরনায় সাঁতার কাটবেন। আল্লাহর মহত্ত্বের বৃক্ষরাজি দিয়ে ঘেরা থাকবেন এবং আল্লাহর প্রজ্ঞার খেজুর ও ডালিম খাবেন। এসবের চাইতেও বড়ো যে জিনিসটি পাবেন, তা রাসূলুল্লাহ -এর কথায় এভাবে উঠে এসেছে-
'তুমি তোমার প্রভুকে তেমনিভাবে দেখতে পাবে, যেমন দেখ পূর্ণিমার চাঁদকে।'
জান্নাত হলো সেই জায়গা, যেখানে অদৃশ্য দৃশ্যমান হবে, আল্লাহর গুণগুলো জীবন্ত হয়ে উঠবে; যেখানে দুশ্চিন্তা, হতাশা বা দুঃখের কোনো স্থান থাকবে না। কারণ, সেখানে মানুষ চাওয়ার আগেই সবকিছু পেয়ে যাবে।

আল্লাহর খাঁটি বান্দারা দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন-
'যারা বলে-“আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ।" অতঃপর সে কথার ওপর সুদৃঢ় থাকে, ফেরেশতারা তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় আর বলে-“তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না, আর জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো, যার ওয়াদা তোমাদের দেওয়া হয়েছে।"' সূরা হামিম সিজদা: ৩০
জান্নাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আমার খাঁটি বান্দাদের জন্য আমি জান্নাতকে এমনভাবে প্রস্তুত করেছি-যা কোনো চোখ কখনো দেখেনি, কোনো কান কখনো শোনোনি, কোনো অন্তর কখনো অনুধাবন করেনি।'
জান্নাত সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- 'কোনো ব্যক্তিই জানে না, চোখ জুড়ানো কী (জিনিস) তাদের জন্য লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাদের কাজের পুরস্কার হিসেবে।' সূরা আস-সিজদা : ১৭

জান্নাতে আমরা নতুন সৃষ্টি হিসেবে আবির্ভূত হব। সেখানে আমরা এমন গঠনে গঠিত থাকব-যা এখন আমাদের কাছে অজানা। জান্নাত এমন একটি জগৎ, যা বর্তমান জগৎ থেকে এতখানি ভিন্ন যে, মানুষের বুদ্ধিমত্তা সে জগতের বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম নয়। আমরা দুনিয়ার সাফল্য কামনা করে থাকি, কিন্তু আল্লাহ আমাদের পরকালীন সাফল্য দিতে চান।
'তোমরা দুনিয়ার সম্পদ কামনা করছ; অথচ আল্লাহ চান আখিরাত। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাবান।' সূরা আনফাল : ৬৭
আল্লাহর মহত্ত্ব এত বিস্তৃত যে, দুনিয়ার জগৎ সে মহত্ত্বকে ধারণ করার জন্য যথেষ্ট বড়ো নয়। আল্লাহর অসীম করুণার স্বাদ কেবল জান্নাতেই পাওয়া সম্ভব। কেননা, জান্নাতই একমাত্র জায়গা-যা আল্লাহর অসীমত্বকে ধারণ করতে পারে।

জান্নাতে চার ধরনের নদী আছে বলে আল্লাহ তায়ালা আমাদের জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন- 'মুত্তাকিদের যে জান্নাতের ওয়াদা দেওয়া হয়েছে, তার উপমা হলো- তাতে আছে নির্মল পানির ঝরনা, আর আছে দুধের নদী-যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়। আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু মদের নদী আর পরিশোধিত মধুর নদী। তাদের জন্য সেখানে আছে সব রকম ফলমূল আর তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে ক্ষমা।' সূরা মুহাম্মাদ: ১৫
অনেকে বলেন-পানি, দুধ, মধু ও মদ চার রকম জ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করে; প্রাকৃতিক, আধ্যাত্মিক, জ্ঞানগত ও ইন্দ্রিয়গত।

যেখানে জান্নাতের মানে হলো আল্লাহর নৈকট্য, সেখানে জাহান্নামের মানে আল্লাহর নিকট থেকে বিচ্ছেদ। জাহান্নামের ভয়াবহতার কিছু বর্ণনা কুরআনে এভাবে উঠে এসেছে—
‘তারা বলবে—হে আমাদের প্রতিপালক! দুর্ভাগ্য আমাদের পরাস্ত করেছিল, আর আমরা ছিলাম এক পথভ্রষ্ট জাতি।’ সূরা মুমিনুন : ১০৬
‘সেদিন অপরাধীদের জন্য কোনো সুসংবাদ থাকবে না। আর তারা বলবে—হায়! কোনো বাধা যদি তা আটকে দিত।’ সূরা ফুরকান: ২২
‘জাহান্নামিরা জান্নাতিদের ডেকে বলবে—“আমাদের কিছু পানি ঢেলে দাও কিংবা আল্লাহ তোমাদের যে রিজিক দিয়েছেন, তা থেকে কিছু দাও।” তারা বলবে—“আল্লাহ এ দুটো অবিশ্বাসীদের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন।”’ সূরা আ'রাফ: ৫০
জাহান্নাম হলো আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছেদেরই অপর নাম, আর জান্নাত হলো আল্লাহ ও আমাদের মধ্যকার স্থাপিত পর্দাকে উন্মোচন করে আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার অপর নাম।

আমরা নিজেরাই নিজেদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করি
ইসলাম প্রতিটি মানুষকে সহজাতভাবে ভালো (ফিতরাত) হিসেবে বিবেচনা করে, যার জীবনপথ আল্লাহর পথের অনুকূলে বহমান। তাই জান্নাতকে সাধারণভাবে সকল মানুষের গন্তব্য হিসেবে ধরা হয়। আর জাহান্নাম তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, যারা মানুষ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও অবশেষে তারা মনুষ্যত্বকে পরিত্যাগ করে ঘৃণা, স্বার্থপরতা ও বিচ্ছেদের মধ্যে জীবনযাপন করেছে।
শয়তানের লক্ষ্য হলো আমাদের কুপ্রবৃত্তির গোড়ায় পানি সিঞ্চন করে আমাদের ভেতর বিচ্ছেদ ও অহংকার সৃষ্টি করা। আমরা যতই অহংকার, লোভ ও হিংসার বীজ বপন করব, ততই আমাদের হৃদয়ের দুয়ার সংকুচিত হবে। ফলে আমাদের হৃদয়ে আলো পৌঁছবে কম। অন্যদিকে আল্লাহর জন্য দুনিয়াতে আমরা যা কিছু করব, তা আখিরাতের ভূমিতে বীজ হিসেবে রোপিত হবে এবং বিচার দিবসে সেখান থেকে আমরা ফল সংগ্রহ করতে পারব।
'অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে এবং কেই অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।' সূরা জিলজাল : ৮

আল্লাহ চান না আমরা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হই; বরং তিনি আমাদের পছন্দের স্বাধীনতা দান করেছেন। আমরা চাইলে আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছেদের জীবনযাপন করতে পারি, আবার চাইলে তাঁর সাথে একান্ত সম্পর্কের ভেতর দিয়ে জীবনযাপন করতে পারি। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করেন না; বরং মানুষই নিজের ওপর জুলুম করে।' সূরা ইউনুস: ৪৪
আমাদের ইচ্ছার স্বাধীনতাই আমাদের জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে। কুরআনে কোথাও বলা নেই, গাছ বা পশুপাখি জাহান্নামে যাবে। বৃক্ষলতা, পশুপাখি বা কীটপতঙ্গ জাহান্নামে যাবে না। কেননা, তাদের মানুষের মতো ভালো-মন্দ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে জাহান্নামিরাই তাদের কর্মের মাধ্যমে নিজের জন্য জাহান্নামের শিখা জ্বালিয়ে দেয়।

মানুষ যদি ভুল না করত, তাহলে আল্লাহর দয়া, অনুগ্রহ, ক্ষমা ও মমতার স্বাদ অনুভব করতে পারত না। সম্ভবত এ কারণেই আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দিয়েছেন, ভুল করার সুযোগ দিয়েছেন। এক দৃষ্টিতে সৎকর্মের উচ্চ অবস্থান তুলে ধরার জন্যই অসৎকর্ম প্রয়োজনীয় বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। একটি নৈতিকতাসম্পন্ন জগতের জন্য সৎকর্মের পাশাপাশি অসৎকর্মেরও অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাপের অনুপস্থিতিই যেমন ঠান্ডা, আলোর অনুপস্থিতি যেমন অন্ধকার, তেমনি আল্লাহর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নামই মন্দ কাজ। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমার কোনো কল্যাণ হলে তা হয় আল্লাহর তরফ থেকে এবং তোমার কোনো অকল্যাণ হলে তা হয় তোমার নিজের কারণে।' সূরা নিসা : ৭৯
অন্যকথায়, মন্দ হলো মানুষের ভুল ধারণার পর্দাবিশেষ। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেকে এবং পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। যেখানে মোতায়েন আছে পাষাণ হৃদয় ও কঠোর স্বভাবের ফেরেশতা।' সূরা আত-তাহরিম : ৬

এখানে মহান আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেছেন-আমরাই আমাদের জাহান্নামের আগুনের নির্মাতা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের পূজা করো, সেগুলো তো জাহান্নামের জ্বালানি। তোমরা সেখানে প্রবেশ করবে।' সূরা আম্বিয়া : ৯৮
কেবল সেই জায়গা নয়, যেটি হবে আল্লাহর ওপর অবিশ্বাসীদের ঠিকানা; বরং জাহান্নাম হলো মনের সেই অবস্থা, যা অবিশ্বাসীরা নিজেদের ভেতর বহন করে চলেছে।
আল্লাহর রহমতের নুর থেকে নিজের চোখ বন্ধ করার মাধ্যমে আমরা নিজেদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করি। আমরা যখন আল্লাহর নুর থেকে নিজেদের মুখ ফিরিয়ে নিই, তখন আমাদের হৃদয়ের পাপড়ি বুজে যায় এবং আল্লাহর নুরের কাছ থেকে সৃষ্ট দূরত্বের কারণে হৃদয় শুষ্ক ও বিবর্ণ হয়ে যায়।
'মুত্তাকিদের জন্য জান্নাতকে নিকটে আনা হবে-তা মোটেই দূরে থাকবে না।' সূরা ক্বাফ: ৩১
অন্যদিকে জাহান্নাম তৈরি হয়েছে তাদের জন্য, যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে, প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার কাছে নিজের ইচ্ছা, জীবন ও মৃত্যুকে সমর্পণ করে এবং আল্লাহকেন্দ্রিক জীবনযাপন না করে প্রবৃত্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন করে। আপনি যদি আল্লাহকে ছাড়া দুনিয়ায় জীবনযাপন করেন, তাহলে আপনার পরকালও হবে আল্লাহর অনুগ্রহ ও ভালোবাসা থেকে বিচ্ছিন্ন। বিচার দিবসে আল্লাহ আপনার ওপর জুলুম করবেন না; বরং আপনার কাজেরই উপযুক্ত প্রতিদান দেবেন। সেদিন আল্লাহ তায়ালা বলবেন-
'আজ তোমরা অজুহাত পেশ করো না। তোমরা যা করতে, তোমাদের তারই প্রতিফল দেওয়া হবে।' সূরা আত-তাহরিম : ৭

যদি আপনি আল্লাহর কাছে চান-জাহান্নাম বলতে কোনো কিছু না থাকুক, তাহলে মূলত পরোক্ষভাবে চাইছেন যে, আপনার ইচ্ছার স্বাধীনতা তুলে নেওয়া হোক। আপনি একদিকে নিজের পছন্দমাফিক চলার স্বাধীনতা চাইবেন, আবার অন্যদিকে জাহান্নামের অস্তিত্ব না থাকার কামনা করবেন—এটি হয় না। কেননা, এটি হলে আল্লাহকে ন্যায়বিচারক হিসেবে পাওয়া সম্ভব হবে না। মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা থাকলে একদল লোক ভালো পথে চলবে, আরেকদল লোক মন্দ পথে চলবে-এটাই স্বাভাবিক। এমন অবস্থায় দুই ধরনের মানুষের জন্য দুই রকমের প্রতিফলের ব্যবস্থা না থাকলে আল্লাহ ন্যায়বিচারক হবেন কী করে? আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তবে কি আমি মুসলিমদের অবাধ্যদের মতোই গণ্য করব? তোমাদের কী হলো? তোমরা কেমন সিদ্ধান্ত দিচ্ছ!' সূরা কালাম : ৩৫-৩৬
জান্নাত ও জাহান্নাম হলো দাঁড়িপাল্লার দুটি দিকের প্রতিফল। ভালো ও মন্দ কর্মের দুই রকম প্রতিফল স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধির অনিবার্য দাবি। মানুষের মর্যাদা ফেরেশতাদের চেয়ে ঊর্ধ্বে এ কারণে যে, মানুষ আল্লাহর ইবাদত না করার স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ইবাদত করে। মানুষের মর্যাদা পশুর চাইতেও নিচে নেমে যায় তখন, যখন সে তার স্বাধীন ইচ্ছাকে ব্যবহার করে নিজের কুপ্রবৃত্তির কামনাকে চরিতার্থ করতে করতেই জীবন পার করে দেয়।

আপনি যদি প্রবৃত্তির দাসত্ব করেন আর জান্নাত কামনা করেন, তাহলে বোকার স্বর্গে বাস করছেন। আলোর কাছে অন্ধকারের কোনো স্থান নেই। কেননা, আলো জ্বললে অন্ধকার সেখানে থাকতে পারে না। আল্লাহ কারও জান্নাতের পথে বাধা সৃষ্টি করেন না; বরং আমরাই জান্নাতের সামনে এমন পর্দা টেনে দিই যে, একসময় সেই পর্দা ভেদ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে।
যারা আল্লাহর কাছে পথনির্দেশনা চায়, আল্লাহ তাদের জন্য রহমতের দরজা বন্ধ করেন না। আল্লাহ যেখানে ডানে যেতে বলেছেন-সেখানে যদি আমরা বামে যাই, তাহলে কখনো গন্তব্যে পৌঁছতে পারব না। আমরা যদি আল্লাহর দিকনির্দেশনা উপেক্ষা করে চলতে থাকি, তাহলে একসময় পথ হারিয়ে ফেলব। এই পথভ্রষ্টতার জন্য আল্লাহ দায়ী নন; বরং আমরাই দায়ী।
আল্লাহ আমাদের জন্য যে মমতামাখা পথ সাজিয়ে রেখেছেন, সে পথে চলতে তিনি আমাদের বাধ্য করেন না। কিন্তু তিনি ভালোবাসেন বলে নানা উপায়ে আমাদের সঠিক পথে ফিরে আসার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। পবিত্র কুরআনে বারবারই সে কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকী আমরা যদি আল্লাহর কাছ থেকে একশো কোটি পদক্ষেপও দূরে চলে যাই, তবুও তাঁর কাছে ফিরে আসার দরজা আমাদের জন্য সব সময়ই খোলা থাকে। আল্লাহ খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন-এমন কোনো পাপ নেই, যা ক্ষমার অযোগ্য। মহান আল্লাহ বলেন- 'হে আমার বান্দারা! তোমরা দিনে ও রাতে গুনাহ করে থাকো এবং আমি সব গুনাহ ক্ষমা করে দিই। কাজেই তোমরা আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দেবো।'

যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আমাদের মনে রাখতে হবে, তা হলো-জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়ই তৈরি হয়েছে আল্লাহর গুনাহগার বান্দাদের জন্য। জাহান্নাম তৈরি হয়েছে অহংকারী গুনাহগারদের জন্য এবং জান্নাত তৈরি হয়েছে অনুতপ্ত ও তওবাকারী গুনাহগারদের জন্য। পবিত্র কুরআন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, প্রেমময় আল্লাহ চান, আমরা যেন আমাদের আদি উৎস জান্নাতে ফিরে যাই। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ -এর একটি হাদিস রয়েছে- 'একবার রাসূল দেখলেন, এক মা তার শিশুসন্তানকে বুকের দুধ পান করাচ্ছে। তিনি সাহাবিদের বললেন-"তোমরা কি ভাবতে পারো, এই মা তার শিশুকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে?" সাহাবিরা জবাবে বললেন-“না; বরং সে পারলে এটি রোধ করবে।” রাসূল বললেন-“একজন মা তার শিশুসন্তানকে যতটা মায়া করে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তারচেয়ে বেশি মায়া করেন।"'

অপরের চূড়ান্ত পরিণাম সম্পর্কে আমরা জানি না
আমরা জানি না-কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে। কেননা, আমাদের বিচার হবে নিজের হৃদয়ের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। আর আল্লাহ ছাড়া হৃদয়কে দেখার সক্ষমতা কারও নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'সেদিন তো ধন-সম্পদ কাজে লাগবে না, না সন্তান-সন্ততি; অবশ্য যে বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে আল্লাহর কাছে হাজির হবে।' সূরা আশ-শুআরা: ৮৮-৮৯
বিচার দিবসে কে মুক্তি পাবে আর কে পাবে না-সেটা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তাই কুরআনে আল্লাহ অপরের সম্পর্কে অনুমান করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা বেশি বেশি অনুমান করা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, কিছু কিছু অনুমান অপরাধ।' সূরা হুজুরাত : ১২
মহানবি অপরের সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামত দিতে নিষেধ করেছেন- 'তোমরা কেউ অপরকে কাফির হিসেবে অভিযুক্ত করবে না। যদি সে কাফির না হয়ে থাকে, তাহলে সে অভিযোগ অভিযোগকারীর ওপর আরোপিত হবে।'
মহান আল্লাহ বলেন- 'এবং তোমাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে সামান্যই।' সূরা বনি ইসরাইল : ৮৫
কাজেই সীমিত জ্ঞান নিয়ে আমরা কী করে অন্যের ব্যাপারে চূড়ান্ত মত দিতে পারি? কুরআন মানুষকে সরল-সঠিক পথের দিকে আহ্বান করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কাউকে বিচার করার চূড়ান্ত এখতিয়ার রয়েছে কেবল আল্লাহর হাতেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'কর্মফল দিবস সম্পর্কে কি তুমি জানো? সেদিন কারও অপরের জন্য কিছু করার সামর্থ্য থাকবে না এবং সেই দিন সমস্ত কর্তৃত্ব হবে আল্লাহর।' সূরা মুতাফফিফিন: ১৮-১৯
অর্থাৎ সেদিন সকল ক্ষমতা-কর্তৃত্ব কেবল আল্লাহর জন্য নির্ধারিত হবে এবং আল্লাহ ছাড়া সকলে হবে শক্তি ও ক্ষমতাহীন।

অপরের গন্তব্য যা-ই হোক না কেন, তার ওপর ভিত্তি করে মুসলিমের কর্মপন্থার কোনো হেরফের হয় না। অপরের ধর্ম ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়; বরং আমাদের ধর্ম ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই অপরের প্রতি আমাদের ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধার বিষয়টি নির্ধারিত হওয়া উচিত। যেহেতু আমরা বিশ্বাস করি-প্রতিটি মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি এবং প্রতিটি মানুষের প্রতি আল্লাহ তাঁর রহমত ও ভালোবাসার বারিধারা বর্ষণ করে চলেছেন, সেহেতু প্রতিটি মানুষই আমাদের কাছে সম্মান ও মর্যাদার পাত্র; তার ধর্মীয় বিশ্বাস যা-ই হোক না কেন।

আল্লাহর রহমত সবকিছুর ওপর পরিব্যাপ্ত
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর আমার রহমত সর্বব্যাপী পরিব্যাপ্ত।' সূরা আ'রাফ: ১৫৬
অর্থাৎ আল্লাহর রহমত থেকে কেউ-ই বঞ্চিত নয়। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে চান না; তাই তিনি বান্দার সামান্য সৎকর্মেরও বিশাল পুরস্কার দান করেন। রাসূলুল্লাহ বলেছেন- 'নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্ম ও মন্দ কর্মের হিসাব রাখেন এবং এগুলোকে পরিষ্কার রাখেন। কোনো ব্যক্তি কোনো ভালো কাজ করার সংকল্প করলে কাজটি না করার আগেই আল্লাহ তাকে সে কাজটি সম্পন্ন করার সওয়াব দিয়ে থাকেন। যখন বান্দা কাজটি সম্পন্ন করে, তখন আল্লাহ তাকে সে কাজটির দশ থেকে সাতশোগুণ পর্যন্ত; এমনকী তারও বেশি সওয়াব দিয়ে থাকেন। বান্দা যখন খারাপ কোনো কাজ করার সংকল্প করে-কিন্তু কাজটি সম্পন্ন করে না, তখন আল্লাহ তার জন্য একটি সৎকর্মের সওয়াব লিখেন। যখন সে কাজটি করে ফেলে, তখন আল্লাহ কেবল একটি মন্দকর্মের গুনাহ লিখেন।'

আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সীমাহীনভাবে ভালোবাসেন। মহানবি বলেছেন- 'দুনিয়ার সব মায়া-মমতা আল্লাহর ময়া-মমতার তুলনায় একশো ভাগের একভাগ মাত্র। বাকি নিরানব্বই ভাগ মায়া-মমতা আল্লাহ বিচার দিবসের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন।'
যদিও আমাদের কর্মগুলো দাঁড়িপাল্লায় মাপা হবে এবং হৃদয়ের অবস্থানকে বিবেচনা করা হবে, তবুও আমরা কখনো আমাদের কর্ম দিয়ে জান্নাত অর্জন করতে পারব না। কেননা, যতখানি ইবাদত করা উচিত, ততখানি ইবাদত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
দুনিয়ার কর্ম দিয়ে জান্নাতকে কেনা সম্ভব নয়। জান্নাত অর্জন করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়; যদি না আল্লাহ দয়া করে তাকে জান্নাত না দান করেন।
মহানবি বলেছেন-
'তোমাদের কেউ কেবল নিজের আমল দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।' সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন- 'এমনকী আপনিও হে আল্লাহর রাসূল?' রাসূল জবাবে বললেন-'এমনকী আমিও; যদি না আল্লাহ তাঁর মহিমা ও রহমত দিয়ে আমাকে পরিব্যাপ্ত করেন!'
এ কারণে মুমিন কখনো তার সৎকর্ম নিয়ে অহংকার করে না। কারণ, সে জানে-তার সৎকর্ম তাকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়; কেবল আল্লাহর দয়া, করুণা, ক্ষমা ও ভালোবাসাই তাকে জান্নাতে নিতে পারে।

টিকাঃ
১৮৫. সূরা আত-তুর: ২৩
১৮৬. তিরমিজি
১৮৭. বুখারি, মুসলিম
১৮৯. হাদিসে কুদসি
১৯০. বুখারি
১৯১. বুখারি, মুসলিম
১৯২. বুখারি
১৯৩. বুখারি
১৯৪. মুসলিম

📘 সিক্রেটস অব ডিভাইন লাভ > 📄 আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন

📄 আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন


আল্লাহ আপনাকে ততখানি ভালোবাসেন, যতখানি আপনি কল্পনাও করতে পারেন না। আপনি মূল্যবান। আপনি গুরুত্বপূর্ণ। সমগ্র বিশ্বজগৎ সৃষ্টি হয়েছে আপনার জন্য, যাতে আপনি আল্লাহর ইবাদত এবং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আপনার ভেতর বহন করা মূল্যবান সম্পদরাজিকে আবিষ্কার করতে পারেন।

আল্লাহর ভালোবাসা কখনো বদলে যায় না; বরং আমরা যে অনুভূতি দিয়ে আল্লাহর ভালোবাসাকে অনুভব করি, সে অনুভূতিই বদলে যায়।

আল্লাহর ভালোবাসা নিঃশর্ত ও অমূল্য; একে কোনো কিছু দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। তবে আমাদের সৎকর্মগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সৎকর্মের মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর ভালোবাসার স্বাদ অনুভব করতে পারি।

বিশ্বজগতের স্রষ্টা মহামহিম আল্লাহ আপনার ভেতর রুহকে ফুঁকে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি নিজের ভালোবাসার গোপন রহস্যকে আপনার আত্মার ভেতর রোপণ করে দিয়েছেন। সৃষ্টিজগতের প্রভু তাঁর অপার ভালোবাসা দিয়ে সমগ্র সৃষ্টিজগতের মধ্য থেকে আপনাকে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে পছন্দ করেছেন। আপনার সৃষ্টি হয়েছে আল্লাহর মাধ্যমে, আল্লাহরই জন্য। অন্য কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য আপনাকে সৃষ্টি করা হয়নি কিংবা আপনার সংস্কৃতি ও সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্যেও আপনাকে সৃষ্টি করা হয়নি। আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে আপনার সমগ্র হৃদয় দিয়ে আল্লাহকে জানার জন্য, আল্লাহকে ভালোবাসার জন্য এবং আল্লাহর ইবাদত করার জন্য। আপনাকে এজন্য সৃষ্টি করা হয়েছে-যাতে আপনি আল্লাহর প্রশংসার ভেতর ডুবে থাকেন, আল্লাহর রহমতের সাগরে সাঁতরে বেড়ান এবং আপনার হৃদয়ের গহিনে থাকা আধ্যাত্মিক মণি-মুক্তোগুলোকে আবিষ্কার করেন।

আপনি গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্বজগতের স্রষ্টা তাঁর অসীম করুণা ও ভালোবাসার নুর থেকে আপনাকে সুপরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করেছেন। যে আল্লাহর নিশ্বাস আপনাকে জীবন দান করেছে, আপনার মূল্য নির্ধারিত হয় তার ভিত্তিতে।

আপনি আপনার শরীরটা আপনি নন, যে শরীর একসময় ভেঙে পড়বে; বরং আপনি হলেন সেই আত্মা, যার বিনাশ নেই। জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন- 'ভাবছ, তুমি এ বিশ্বজগতের একজন নাগরিক। ভাবছ, তুমি এ ধূলিকণার জগতের মালিক। তুমি মূলত নিজের জন্য ধূলিকণার একটি প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করেছ এবং এভাবে তোমার সত্যিকার উৎসের কথা ভুলে গেছ।'

আল্লাহ আপনাকে ততখানি ভালোবাসেন, যতখানি আপনি কল্পনাও করতে পারেন না। আপনি মূল্যবান। আপনি গুরুত্বপূর্ণ। সমগ্র বিশ্বজগৎ সৃষ্টি হয়েছে আপনার জন্য, যাতে আপনি আল্লাহর ইবাদত ও আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আপনার ভেতর বহন করা মূল্যবান সম্পদরাজিকে আবিষ্কার করতে পারেন।

আল্লাহ আপনাকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসেন

আল্লাহ যেহেতু তাঁর সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল নন, সেহেতু আমাদের কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর গুণগুলো প্রভাবিত হয় না। আমরা যখন গুনাহ করি, তখন আল্লাহ আমাদের ওপর তাঁর ভালোবাসাকে কমিয়ে দেন না; বরং গুনাহ করার মাধ্যমে আমরা নিজেরাই আল্লাহর ভালোবাসার সামনে একটি আবরণ স্থাপন করি। আল্লাহর ভালোবাসা কখনো বদলে যায় না; বরং আমরা যে অনুভূতি দিয়ে আল্লাহর ভালোবাসাকে অনুভব করি, সে অনুভূতিই বদলে যায়।

ইসলামের স্তম্ভ ও মূলনীতিগুলো হলো কাপড় পরিষ্কার করার মতো, যা আমাদের গুনাহ, আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ও দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণের ময়লাকে ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়। আপনি যখন একবার উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন- আল্লাহর কাছে আপনি গুরুত্বপূর্ণ, তখন দুনিয়ার যেকোনো স্বীকৃতি ও সাফল্য আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হবে।

আল্লাহর ভালোবাসা নিঃশর্ত ও অমূল্য; একে কোনো কিছু দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। তবে আমাদের সৎকর্মগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সৎকর্মের মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর ভালোবাসার স্বাদ অনুভব করতে পারি। বাতাসের মাধ্যমে চলার জন্য যেমন একটি নৌকাকে পাল তুলতে হয়, তেমনি আল্লাহর অবারিত ভালোবাসার মাধ্যমে জীবনের পথ চলতে হলে আমাদের হাত ও হৃদয়কে প্রার্থনা ও আত্মসমর্পণের দিকে বাড়িয়ে ধরতে হয়।

আপনার যা কিছু প্রয়োজন, তা ইতোমধ্যেই পেয়ে গেছেন

সুবিশাল বিশ্বজগতের মধ্যে আপনি একটি ক্ষুদ্র বিশ্বজগৎ। আপনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের একটি প্রতিফলন। আল্লাহর অনুগ্রহ প্রতিটি মুহূর্তে আপনার সাথেই রয়েছেন। আপনি যে-ই হন, যেখানেই থাকুন, তিনি আপনার খুব নিকটে রয়েছেন। তাঁর কাছে কোনো কিছুর অভাব নেই। প্রাণসম্পন্ন সবকিছুই তাঁর প্রাণের প্রতিফলন। অস্তিত্বশীল সবকিছুই তাঁর একত্বের প্রতিফলন। আপনি যা চান, তা ইতোমধ্যেই আপনার ভেতরে রয়েছে। ইসলামের বিধানগুলো কেবল আপনার সীমাবদ্ধতাকে দূর করে দেয়, যাতে আপনি আল্লাহর ভালোবাসাকে গ্রহণ করার উপযুক্ত হতে পারেন।

আল্লাহর নামগুলো ইতোমধ্যে আমাদের হৃদয়ের জমিনে রোপিত হয়ে আছে। আমাদের কাজ হলো-আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সেই জমিনে পানি সিঞ্চন করা। জান্নাত সেই জায়গা নয়, যেখানে আমরা মৃত্যুর পিঠে চড়ে পৌঁছাই; বরং জান্নাতকে আমরা নিজেদের ভেতরেই বহন করে চলেছি। ভবিষ্যতের জান্নাতকে অর্জন করার জন্য আমাদের ইবাদত করতে বলা হয়নি; বরং আমাদের ইবাদত করতে বলা হয়েছে আল্লাহর ভালোবাসার গুণগুলো প্রয়োগের মাধ্যমে দুনিয়াতেই জান্নাতের প্রতিফলন ঘটানোর জন্য।

আপনার জীবনের উদ্দেশ্য

আপনার জীবনের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে জানা, আল্লাহকে ভালোবাসা ও আল্লাহর ইবাদত করা। দৃশ্যমান সমগ্র সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর অসীম চেহারার প্রতিফলন। আল্লাহ কাবা ঘরের ভেতর লুকিয়ে রয়েছেন-বিষয়টি এমন নয়; বরং তিনি সর্বদা আরশে আজিমে অধিষ্ঠিত তার কুরসি পরিব্যাপ্ত করে আছে সমস্ত আকাশ-কমিন।

আল্লাহ তাঁর সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্যের প্রতিফলন হিসেবে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি দুনিয়াতে আপনাকে প্রেরণ করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য, নিজেকে জানার জন্য, জীবনের পবিত্রতা রক্ষার জন্য, অসহায়কে সাহায্য করার জন্য এবং হৃদয় দিয়ে সকল মানুষ ও সৃষ্টিকে ভালোবাসার জন্য। আল্লাহ আপনার জীবনের কলসকে তাঁর অপার করুণার পানি দিয়ে পূর্ণ করে দিয়েছেন, যাতে আপনি পিপাসার্ত হৃদয়গুলোকে ভালোবাসার পানি সরবরাহ করতে পারেন।

আল্লাহর আপনাকে পড়ে যাওয়া মানুষের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে বলেছেন, অসুস্থ মানুষের জন্য ডাক্তারের ভূমিকা পালন করতে বলেছেন। আল্লাহর ভালোবাসা ও অনুগ্রহকে শুধু বিশ্বাসীদের নিকট নয়, নির্বিশেষে সকল মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতে বলা হয়েছে। আর এজন্য আপনার কমফোর্ট জোন থেকে আপনাকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং দিশাহীন, নৈরাশ্যের অন্ধকারের যাত্রীদের জন্য আলোকবর্তিকার ভূমিকা পালন করতে হবে।

মহান আল্লাহ বলেন- 'আল্লাহর পথে চেষ্টা-সাধনা করো তোমার জান ও মাল দিয়ে।' (সূরা আস-সফ : ১১)। কিন্তু আপনি যা বিশ্বাস করেন, তা অপরকেও বিশ্বাস করানোর বাধ্যবাধকতা আপনার ওপর আরোপিত হয়নি। আপনি আপনার বিশ্বাসকে সংহত করুন। মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিন, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। মানুষকে আল্লাহর ভালোবাসার দিকে আহ্বান করুন এবং তাদের নিজেদের পথ নিজেদের ঠিক করে নেওয়ার সুযোগ দিন। সকল মানুষের কান্নার ভাষা এক, সকল মানুষের রক্তের রং এক। কাজেই দুনিয়াতে আল্লাহর ভালোবাসার প্রবাহের ব্যাপারে বিশ্বাসের ভিত্তিতে বৈষম্য করা নয়।

মুসলিম হতে হলে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষ-গরিব, অভাবগ্রস্ত, বিপদাপন্ন, অসুস্থ, দুঃখী, দুর্বল, ইয়াতিম, ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী-সকলের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। মুসলিম কখনো বর্ণান্ধ হতে পারে না; বরং মানুষের বৈচিত্র্যের ভেতর সে আল্লাহর নিদর্শন দেখতে পায়।

'আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা। নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য।' (সূরা রূম: ২২)। সকল মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি। কাজেই কী করে এক মানুষের তুলনায় অন্য মানুষ বেশি মূল্যবান হতে পারে-যেখানে একই আল্লাহ তাঁর একই নিশ্বাসকে একই রকমভাবে সবার ভেতরে ফুঁকে দিয়েছেন? কাজেই মানুষে মানুষে বাহ্যিক প্রভেদকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। নির্বিশেষে সকল মানুষকে আল্লাহর নিঃশর্ত ভালোবাসার প্রবাহের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে এবং তাদের ওপর সেই ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।

আমরা একের ভেতরে বহু। আমরা একটি বীজ থেকে উৎসারিত বহু ফলের সমাহার। কাজেই আপনি যে-ই হন, যেখানেই থাকুন, আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমি কী করে কাউকে ভালো না বেসে পারি, যে ভালোবাসা থেকেই তৈরি? আমি কী করে ভালোবাসাকে না ভালোবেসে পারি?

আল্লাহ তায়ালা ঠিক আপনাকেই বলছেন-
'তোমরা ভয় করো না। আমি তো তোমাদের সাথেই আছি। আমি সবকিছু শুনি ও দেখি।' (সূরা ত্ব-হা: ৪৬)।

মহান আল্লাহ ঠিক আপনাকেই বলছেন-
'আমি তোমাকে আমার নিজের জন্য তৈরি করেছি।' (সূরা ত্ব-হা: ৪১)।

আল্লাহ বলেননি, দুনিয়ার জীবন আপনার জন্য কুসুমাস্তীর্ণ হবে। তবে তিনি বলেছেন-
'আর ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।' (সূরা আনফাল : ৪৬)।

আপনি বিপদে পড়বেন; দুঃখ, কষ্ট ও বেদনা আপনাকে তাড়িত করবে। আপনাকে নানাভাবে পরীক্ষা করা হবে। কিন্তু ভয় পাবেন না। কেননা, আল্লাহ আপনার পাশেই রয়েছেন। প্রিয়নবি মুহাম্মাদ ﷺ খুব সুন্দরভাবে বলেছেন-
'আল্লাহর বিধিনিষেধের রক্ষা করবে, আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ রাখবে, তাহলে আল্লাহকে তুমি কাছে পাবে। তোমার কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আল্লাহর নিকট চাও, আর সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে আল্লাহর নিকটই করো। আর জেনে রেখো, যদি সমগ্র জগৎ তোমার কোনো উপকারের উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে তারা তোমার ততটুকু উপকারই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। অপরদিকে যদি সমগ্র জগৎ তোমার কোনো ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে একতাবদ্ধ হয়, তাহলে ততটুকু ক্ষতিই করতে সক্ষম হবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং লিখিত কাগজসমূহ শুকিয়ে গেছে।' ১৯৫

আল্লাহ আপনার নিয়ে এক নিখুঁত প্রেমের গল্প লিখেছেন। আপনি যা কিছুর মুখোমুখি হন, যত পাহাড়, সমুদ্র বা মরুভূমি আপনার সামনে এসে দাঁড়ায়, সবকিছুই আপনার সামনে এ কারণে রাখা হয়েছে, যাতে আপনি নিজেকে এবং আপনার প্রভুকে জানতে পারেন। প্রতিটি আনন্দ-ব্যথা, প্রতিটি সাফল্য-ব্যর্থতা, প্রতিটি চড়াই-উতরাই আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। আপনার সামনে যা আসে, তার মধ্যে আল্লাহর দিকে ফেরার আহ্বান লুকিয়ে আছে।

আল্লাহ আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছেন। তিনি আপনার কণ্ঠের শিরার চাইতেও নিকটে অবস্থান করেন। তিনি আপনার ফুসফুসের নিশ্বাসের চাইতেও কাছে রয়েছেন। আল্লাহ এখানেই, তিনি আপনার অতি নিকটে, আপনার জন্য অপেক্ষমাণ। কাজেই তাঁর কাছে ফিরে আসতে এক মুহূর্তও বিলম্ব করবেন না।

‘হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি ফিরে এসো তোমার রবের প্রতি সন্তুষ্টচিত্তে, সন্তোষভাজন হয়ে।’ (সূরা ফাজর: ২৮)।

আল্লাহর কাছে আপনি গুরুত্বপূর্ণ এবং তিনি আপনাকে শর্তহীনভাবে ভালোবাসেন। আল্লাহ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে, সুপরিকল্পিতভাবে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। কাজেই আল্লাহর কাছে ফিরে আসুন। আপনি যত দূরেই যান না কেন, যত নষ্টই হন না কেন, আল্লাহ তাঁর ক্ষমা ও ভালোবাসা নিয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। আল্লাহকে ভালোবাসতে দিন, আপনার ব্যথাগুলোকে উপশম করতে দিন, আপনার আত্মার ভেতরে থাকা মণি-মুক্তোগুলোকে অবমুক্ত করার সুযোগ দিন। আপনি যখনই পথভ্রষ্ট হন, তখনই আল্লাহর কাছে ফিরে আসুন। আপনি যখনই হোঁচট খেয়ে পড়ে যান, তখনই আল্লাহর কাছে ফিরে আসুন। ফিরে আসুন আল্লাহর ভালোবাসার সাগরের কাছে এবং তাঁর সীমাহীন দয়া ও অনুগ্রহের ঢেউকে আলিঙ্গন করুন।

টিকাঃ
১৯৫. তিরমিজি

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00