📄 মৃত্যুর আধ্যাত্মিক রহস্য
পার্থিব জীবন ছলনার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।' সূরা আলে ইমরান: ১৮৫
মৃত্যু হলো চিরস্থায়িত্বের সাথে বিবাহের মতো। -জালালুদ্দিন রুমি
মানুষের রুহ চিরন্তন, যা আল্লাহর ফুঁকে দেওয়া নিশ্বাস থেকে উদ্গত। আমাদের শরীর আমাদের মূল পরিচয় নয়; বরং শরীর হলো রুহের বাহন মাত্র। আমাদের শরীর কাদামাটি দিয়ে তৈরি এবং পৃথিবী হলো একটি চুল্লি, যেখানে আমাদের পুড়িয়ে মৃৎশিল্পের আকৃতি দেওয়া হয়। এ পৃথিবী আমাদের ঠিকানা নয়; বরং পৃথিবী হলো এমন এক খোলস-যেখানে আমরা সেই আকৃতি লাভ করি, যে আকৃতি আল্লাহ আমাদের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন。
মৃত্যুই জীবনের শেষ নয়; বরং মৃত্যু হলো রূপান্তরের একটি প্রক্রিয়ামাত্র, যেখানে আমরা আমাদের খোলসকে ঝেড়ে ফেলে রুহের প্রকৃত রূপে পরিণত হই। জীবন্ত সবকিছুরই যাত্রা শুরু হয় একটি মৃত্যু, একটি ক্ষতি বা একটি ত্যাগ থেকে। মৃত্যুর সার থেকেই জীবনের যাত্রা শুরু। একটি প্রজাপতিকে অস্তিত্ব লাভ করতে হলে তার খোলসকে ভেঙে বেরিয়ে আসতে হয়। একটি চারাগাছের বেড়ে উঠার পেছনে তার বীজ ফেটে যাওয়ার অতীত থাকে।
নতুন করে জেগে উঠার লক্ষ্যেই জীবন-মৃত্যুর সম্মুখীন হয়। মৃত্যু হলো এমন এক সেতু, যার অপর প্রান্তে রয়েছে চিরজীবনের শুরু। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর অবশ্যই তোমার জন্য পরবর্তী সময় পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে উত্তম।' সূরা আদ-দোহা: ৪
মাতৃগর্ভের অন্ধকারে বাস করা কোনো শিশুকে আপনি যদি আলো ঝলমলে পাহাড়, সমুদ্র ও নক্ষত্রে ভরা দুনিয়ার জগতের কথা বলেন, তাহলে তার জন্য এটি বিশ্বাস করা হবে কঠিন। সেই শিশুর মতোই দুনিয়ার মাতৃগর্ভে বাস করা আমাদের পক্ষে চিরস্থায়ী বাস্তব জগৎ সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করা সম্ভব নয়। অথচ মাতৃগর্ভের শিশুর জন্য যেমন ভূমিষ্ঠ হওয়া অনিবার্য সত্য, আমাদেরও তেমনি পরকালের চিরন্তন জগতে প্রবেশ করা অনিবার্য সত্য। আমাদের শরীর অবশ্যই একদিন মারা যাবে, কিন্তু আমাদের রুহ কখনো মারা যাবে না; বেঁচে থাকবে চিরকাল। মৃত্যু শেষকথা নয়; বরং মৃত্যু হলো সেই আল্লাহর একটি নিদর্শন, যার কোনো শেষ বা মৃত্যু নেই।
দুনিয়াতে আমরা অনেক মৃত্যু অবলোকন করি, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দুনিয়াতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়; কেবল আল্লাহই চিরস্থায়ী। এখানকার সবকিছুই একদিন আল্লাহর কাছে ফিরে যাবে। দুনিয়ার জীবন একটি পরীক্ষাক্ষেত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ সূরা বাকারা: ১৫৫
মানুষের অবস্থা সমুদ্রসৈকতে নির্মিত বালুর ঘরের মতো, যেকোনো সময় সমুদ্রের ঢেউ এ ঘরকে তার কোলে টেনে নিয়ে যেতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
‘তিনিই রাত্রিকালে তোমাদের আত্মাকে নিয়ে নেন; আর দিনের বেলা যা তোমরা করো, তা তিনি জানেন। অতঃপর দিনের বেলা তিনি তোমাদের জাগিয়ে দেন, যাতে জীবনের নির্দিষ্টকাল পূর্ণ হয়। অতঃপর, তাঁর পানেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তিনি তোমাদের নিকট বর্ণনা করে দেবেন—যা তোমরা করছিলে।’ সূরা আনআম: ৬০
জীবন কত তুচ্ছ
জীবনের প্রতি আকর্ষণের চাদর বাস্তবতার সূর্যকে ঢেকে রাখতে চায়। আমরা যখন সত্যিকার অর্থে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করতে শিখি এবং মৃত্যুকে সানন্দে বরণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাই, তখনই কেবল জীবনের প্রকৃত রং আমাদের কাছে ধরা দেয়। বিশ্ববিখ্যাত বীর আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটের মৃত্যুর ঘটনায় এটি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট যখন ভয়ানকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন তিনি দুনিয়ার সেরা ডাক্তার, কবিরাজ, হেকিমকে ডাকলেন এবং তার অর্জিত বিপুল ধন-সম্পদ দেওয়ার বিনিময়ে আরোগ্য লাভ করতে চাইলেন, কিন্তু কোনো চিকিৎসা দিয়েই কোনো কাজ হলো না। জগদ্বিখ্যাত বীর মৃত্যুশয্যায় কাতরাচ্ছেন; অথচ কেউ কিছু করতে পারছে না।
অবশেষে আলেকজান্ডার নিজ ভাগ্যকে মেনে নিলেন। তিনি আত্মীয়স্বজন ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডাকলেন এবং তার মৃত্যুর পর তিনটি ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে বললেন। প্রথমটি হলো, তার কফিন কবর পর্যন্ত বহন করবে ডাক্তারগণ। দ্বিতীয়টি হলো, তার কবর পর্যন্ত রাস্তাটি সাজানো হবে তার উপার্জিত বিপুল সম্পদরাজি দিয়ে। তৃতীয়টি হলো, তার হাত দুটি যেন তার কফিনের বাইরে ঝোলানো থাকে।
আলেকজান্ডার ব্যাখ্যা করলেন, ডাক্তারদের কফিন বহন করানোর মাধ্যমে তিনি পৃথিবীকে এই বার্তা দিতে চান-যখন মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, তখন দুনিয়ার কোনো চিকিৎসক মৃত্যুকে রুখতে পারে না। কবর পর্যন্ত রাস্তায় মণি-মুক্তো ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি এই বার্তা দিতে চান, বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের জীবনের জন্য সামান্য সময়ও কিনে নিতে পারলেন না। হাত দুটি কফিনের বাইরে ঝুলিয়ে রাখার মাধ্যমে তিনি এটি বলতে চান যে, তিনি দুনিয়াতে এসেছিলেন খালি হাতে, ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে; দুনিয়ার কোনো সম্পদই তিনি সাথে নিয়ে যেতে পারেননি।
আলেকজান্ডার দেখলেন, তার সীমাহীন সম্পদ ও ঐতিহাসিক বিজয়গাথা তাকে মৃত্যু থেকে বাঁচাতে পারেনি। এ ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা লাভ করতে পারি, দুনিয়ার অর্জিত সম্পদরাজি আমাদের কোনো কাজে আসবে না। সময় এত মূল্যবান যে, তা কখনো ফিরে পাওয়া যায় না। আমরা পাপ করলে ক্ষমা পেতে পারি, অসুস্থ হলে সুস্থতা পেতে পারি, নিঃস্ব হয়ে গেলে আবার প্রাচুর্য অর্জন করতে পারি, কিন্তু সময় চলে গেলে তা ফিরে আসে না। আমরা দান, ভালোবাসা, জ্ঞান ও সৎকর্মের যে চারা দুনিয়াতে রোপণ করব, কেবল তা-ই পরকালীন জীবনে বিশাল বৃক্ষ হয়ে দেখা দেবে। আমাদের কবরে আমাদের সাথে কিছুই যাবে না; যাবে কেবল আমাদের সৎকর্ম।
'ধন-সম্পদ আর সন্তানাদি পার্থিব জীবনের শোভা-সৌন্দর্য, আর স্থায়ী সৎ কাজ তোমার প্রতিপালকের নিকট প্রতিদানে উত্তম, প্রত্যাশাতেও উত্তম।' সূরা কাহাফ : ৪৬
আমাদের ভাগ্য, দুনিয়াবি সাফল্য, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব সবকিছুই পেছনে রয়ে যাবে। যেমনটি একজন সাধক বলেছেন- 'তুমি ভালোবাসো দুনিয়ার এমন সব মানুষকে, যারা হয় তোমাকে দাফন করবে, নয়তো তুমি তাদের দাফন করবে। এর অন্যথা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।'
পৃথিবী আমাদের প্রকৃত বাড়ি নয়
আমাদের শরীর একটি বাহন এবং এটি আল্লাহর দেওয়া ঋণ। এ দুনিয়া হলো আল্লাহর কাছ থেকে আল্লাহর দিকে যাওয়ার পথের একটি বাসস্টপ। নিচের ঘটনায় এটি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
এক ব্যক্তি আবু হুসেইন নামক এক সুফির সাথে দেখা করার জন্য কুফার পথে রওয়ানা হলো। লোকটি আবু হুসেইনের বাড়িতে প্রবেশ করে দেখতে পেল, বাড়ির ভেতর কোনো আসবাবপত্র নেই। লোকটি হতভম্ব হয়ে আবু হুসেইনকে জিজ্ঞেস করল-'আপনার বাড়িতে কোনো আসবাবপত্র দেখছি না, ব্যাপার কী?' আবু হুসেইন হেসে বললেন-'আচ্ছা তুমি আগে বলো, তুমি এত দূর এসেছ, সাথে কোনো আসবাবপত্র আনোনি কেন?' লোকটি জবাবে বলল- 'আমি তো কেবল পথিক মাত্র। আসবাবপত্র দিয়ে আমি কী করব?' এবার আবু হুসেইন জবাবে বললেন-'আমিও তো এ দুনিয়ায় কেবল একজন পথিক মাত্র। আমি খুব অল্প কয়েকদিনের জন্য এ দুনিয়াতে এসেছি, তারপর আমার আসল বাড়িতে ফিরে যাব। কাজেই আমার তো কোনো আসবাবপত্রের প্রয়োজন নেই।'
আমাদের আসল বাড়ি সেটা নয়, যেটা টাকা দিয়ে কেনা যায়; আমাদের আসল বাড়ি রয়েছে আল্লাহর কাছে। মহানবি বলেছেন-
'দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আমার জন্য নয়। দুনিয়াতে আমি একজন পথিকের ন্যায়, যে একটি গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করে এবং তারপর তার নিজস্ব পথে চলে যায়।'
অনেক স্কলার মানুষের জীবনের সংক্ষিপ্ততার বর্ণনা এভাবে দিয়ে থাকেন-যখন মানবশিশু ভূমিষ্ঠ হয়, তখন তার কানে আজান দেওয়া হয়; কিন্তু কোনো নামাজ অনুষ্ঠিত হয় না। মানুষ যখন মারা যায়, তখন আজান দেওয়া হয় না, কিন্তু তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এর কারণ হলো এই যে, মানবশিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময়ে দেওয়া আজানের নামাজ অনুষ্ঠিত হয় তার মৃত্যুর সময়। কাজেই আজান ও নামাজের মধ্যকার সময় যত সংক্ষিপ্ত, আমাদের দুনিয়ার জীবনও ততই সংক্ষিপ্ত।
আমরা আমাদের বাড়ি, দেশ বা শরীরের বাসিন্দা নই; বরং আমরা হলাম পথিক মাত্র। কোনো পথিক যেমন তার হোটেলরুমকে সাজায় না। কারণ, সেখানে তার অবস্থানকাল হয় বড়োই সংক্ষিপ্ত, তেমনি কোনো মানুষেরও তার দুনিয়ার জীবনকে খুব বেশি সাজানো ঠিক না। কারণ, দুনিয়ার এ ঠিকানা বড়োই স্বল্প সময়ের জন্য; বরং আমাদের রুহকে সাজানো উচিত সৎকর্ম দিয়ে। কেননা, সৎকর্মই হলো একমাত্র মুদ্রা-যা সময় ও স্থানকে অতিক্রম করে পরকালে আমাদের সাথে গিয়ে মিলিত হবে। অতএব, নশ্বর দুনিয়ার জন্য নয়; বিনিয়োগ করতে হবে অবিনশ্বর পরকালের জন্য।
জীবনের অস্থায়িত্ব ও আল্লাহর করুণা
ইসলামে জীবনের অস্থায়িত্বকে শাস্তি হিসেবে দেখা হয় না; বরং আল্লাহর সমন্বিত করুণার একটি অংশ হিসেবেই দেখা হয়। জীবনের অস্থায়িত্ব ও সব নাটকীয়তা আমাদের কাছে আশা হিসেবে হাজির হয়, মৃত্যু আমাদের আল্লাহর করুণার কথাই মনে করিয়ে দেয়। কেননা, যদি সবকিছু অবিনশ্বর হতো, তাহলে আমাদের ব্যথা-বেদনা ও ক্ষতিগুলোও অবিনশ্বর থেকে যেত।
মৃত্যু আমাদের সব আনন্দ-সুখের ভেলাকে ভাসমান কোনো কিছুর কাছে নয়; বরং সেই আল্লাহর কাছে নোঙর করতে শেখায়, যার ভালোবাসা অসীম ও চিরস্থায়ী। মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়-কেবল একটি জিনিসই প্রকৃত ও অপরিবর্তিত, আর তা হলো আল্লাহ। জগতের অস্তিত্বশীল সবকিছু; তা ভালো হোক বা মন্দ-একদিন ধ্বংস হবেই।
আমরা যখন আমাদের প্রবৃত্তি ও মরণশীল শরীরের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমাদের ভেতর ফুঁকে দেওয়া আল্লাহর নিশ্বাসের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করি, তখন মৃত্যুর ভয় তেমনিভাবে বাতাসে মিলিয়ে যায়; যেমনিভাবে রোদ উঠলে তুষারকণা মিলিয়ে যায়। আমাদের রুহের মৃত্যু নেই। রুহ দুনিয়ার সময়কে অতিক্রম করেও জীবিত থাকে। এই জগৎ কেবল আমাদের খোলসকে ভেঙে ফেলতে পারে, রুহের কোনো ক্ষতি করার সামর্থ্য এ জগতের কারও নেই।
মেঘ ছিন্নভিন্ন হয়ে বৃষ্টিতে পরিণত হয়, তবুও সে প্রকৃতির কাছে অভিযোগ দায়ের করে না। কারণ, বৃষ্টির মাধ্যমেই তো দুনিয়ার গাছপালা সজীব হয়ে থাকে। স্বর্ণ কখনো পোড়ানোর অভিযোগে আগুনকে অভিশাপ দেয় না। কারণ, আগুনই তো স্বর্ণকে বিশুদ্ধ করে তোলে। গর্ভফুল পড়ে যাওয়ার জন্য কোনো মা ব্যথিত হয় না। কারণ, বিনিময়ে সে একটি শিশুসন্তান লাভ করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি।' সূরা ইনশিরাহ : ৫
যা কিছু আমরা হারাই, তার জন্য শোক প্রকাশ করতে হয় না। মহান আল্লাহ বলেন-
'আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তরে ভালো কিছু দেখেন, তাহলে তোমাদের কাছ থেকে যা নেওয়া হয়েছে, তা থেকে উত্তম কিছু তোমাদের দান করবেন আর তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।' সূরা আনফাল : ৭০
শীতকালে গাছের পাতা ঝরে পড়ে এ কারণে যে, বসন্তে সেখানে নতুন পাতা গজাবে। তেমনিভাবে আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে কিছু কেড়ে নেন কিছু দেওয়ার জন্যই। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুকেই শক্ত করে আঁকড়ে না ধরার মধ্যেই সত্যিকারের শান্তি লুকিয়ে আছে।
কবি আরু বারজাক বলেছেন-
'যদি হারানোর ব্যথা তোমাকে খুব তীব্রভাবে ভোগায়, তাহলে হারানোর মতো কিছুর প্রতি আর কখনো খুব বেশি সংযুক্ত হয়ো না।'
যা কিছু ধ্বংসশীল, তাকে ছেড়ে দিন এবং যা চিরস্থায়ী, তাকে আঁকড়ে ধরুন। প্রকৃতপক্ষে ধ্বংসশীল সবকিছুই ধ্বংসহীন আল্লাহর স্মরণের সামনে বাধাস্বরূপ। কাজেই দুনিয়াবি উপকরণের প্রতি ঝোঁক যত কমানো যাবে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ততই সহজ হবে।
মৃত্যু প্রকৃত সত্যকে উন্মোচন করে
একজন স্কলার বলেছেন-
'জীবন ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্নের মতো। যখন আমরা মারা যাই, তখন মূলত ঘুম থেকে জেগে উঠি এবং মেকআপ ছাড়া সত্যিকারের জগৎকে আবলোকন করি। মৃত্যু আমাদের মুখোশ খুলে দেয়। সমস্ত মিথ্যাকে মৃত্যু হত্যা করে। কেননা, মিথ্যাকে বিলুপ্ত করার জন্যই সত্যের আগমন ঘটে।' সূরা বনি ইসরাইল : ৮১
যে নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করে দেয়, সত্যের ভেতর বাস করে; জীবন তাকে যেখানেই নিয়ে যাক না কেন, সব সময় ভালোবাসাই রোপণ করে যায়। তার জন্য মৃত্যু কোনো ভয়ের ব্যাপার নয়। কেননা, মৃত্যু তো হলো ভালোবাসার আদি উৎস (আল ওয়াদুদ) আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ারই অপর নাম। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে গুনাহ করে আবার অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে, আশা করা যায়-মৃত্যুর সময় মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু যারা অপরের প্রতি জুলুম করে, অপরের অধিকারকে গ্রাস করে, ঘৃণার চর্চা করে, তাদের জন্য মৃত্যু হবে বেদনাদায়ক। মৃত্যু হলো বিচার দিবসে প্রবেশের দরজা, যে দিবসে আল্লাহ মানুষের সৎকর্ম ও অসৎকর্মকে দাঁড়িপাল্লায় মাপবেন।
আপনি যত ধনবান, বিখ্যাত বা সৌন্দর্যমণ্ডিতই হন না কেন, মৃত্যু থেকে পালানোর কোনো সুযোগ আপনার নেই। প্রত্যেককেই কবরের স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়-আমাদের সম্পদরাজি, আমাদের ভালোবাসার মানুষ বা আমাদের সন্তানাদি মৃত্যু থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে না। মৃত্যুর কাছে বয়স, বর্ণ, লিঙ্গ বা ধর্মের কোনো ভেদাভেদ নেই। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'কেউ জানে না কোন স্থানে সে মারা যাবে।' সূরা লোকমান: ৩৪
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
'অতঃপর নির্ধারিত সময়ে যখন তাদের মৃত্যু এসে যাবে, তখন এক মুহূর্তও বিলম্বিত কিংবা ত্বরান্বিত করতে পারবে না।' সূরা নাহল: ৬১
আমরা যখন মৃত্যু থেকে পালানোর চেষ্টা করি, তখন মূলত মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যাই। মহান আল্লাহ বলেন-
'তোমরা যদি মৃত্যু বা হত্যা থেকে পলায়ন করো, তবে এ পলায়ন কোনো কাজে আসবে না।' সূরা আহজাব : ১৬
কারণ, 'তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের পেয়ে বসবেই।' সূরা নিসা : ৭৮
আপনি কেন মৃত্যুকে ভয় পাবেন
কেউ মৃত্যুকে ভয় পায় মানে হলো-সে আল্লাহ ছাড়া অন্য এমন কিছুকে আঁকড়ে ধরেছে, যার ভিত্তি বড়োই নড়বড়ে। আমাদের সুখ যদি এমন কিছুর ওপর নির্ভরশীল হয়-যার ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, তাহলে আমরা কখনোই সন্তোষ লাভ করতে পারব না। আমাদের শান্তি মূলত নির্ভর করে আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের ওপর। কারণ, আল্লাহ চিরস্থায়ী ও পরিবর্তনহীন।
ইসলামের মূল ভিত্তি হলো আত্মসমর্পণ। কারণ, কেবল দুনিয়ার মিথ্যা আকর্ষণগুলোকে সমর্পণ করার মাধ্যমেই আমরা সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে থাকি। এক দৃষ্টিতে, মৃত্যু আপনাকে হয় ভয় অথবা ঈমানের দিকে ঠেলে দেয়। যখন আমরা একবার ঠিকমতো বুঝে নিতে পারি যে, ভবিষ্যতের ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এবং যখন আমরা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করতে সক্ষম হই, কেবল তখনই সত্যিকারের স্বাধীনতার সন্ধান পাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর যে তার রবের প্রতি ঈমান আনে, তার কোনো ক্ষতি বা জুলুমের ভয় থাকবে না।' সূরা জিন : ১৩
কিন্তু আমরা যখন দুনিয়ার অজানা ভবিষ্যৎ গড়ার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করি, তখন দুশ্চিন্তা ও হতাশা আমাদের গ্রাস করে ফেলে। কেবল আল্লাহর অসীমত্বকে স্মরণ ও তাঁর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণই আমাদের প্রকৃত প্রশান্তি এনে দিতে পারে। মৃত্যুচিন্তা আমাদের সেই পথের দিকে এগিয়ে দেয়। মহানবি আমাদের সর্বদা মৃত্যুচিন্তা করতে বলেছেন এবং কবরস্থান পরিদর্শন করতে বলেছেন। কারণ, গোরস্থান এমন এক জায়গা, যেটি নীরব হলেও তার বার্তা নীরব নয়। আমরা মাটির ওপরের চেয়ে মাটির নিচে বেশি সময় অতিবাহিত করব।
আপনি একদিন মারা যাবেন
মৃত্যু হলো সবচেয়ে বড়ো শিক্ষক। কেননা, এটি আমাদের চিরস্থায়ী আল্লাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে শেখায়। মহান আল্লাহ বলেন-
'পৃথিবীপৃষ্ঠে যা আছে সবই ধ্বংসশীল, কিন্তু চিরস্থায়ী তোমার প্রতিপালকের চেহারা; যিনি মহীয়ান, গরীয়ান।' সূরা আর-রহমান : ২৬-২৭
আমরা যখন মৃত্যুকে স্মরণ করি, তখন আসলে জীবনের তুলনায় মৃত্যুকে বেশি গুরুত্ব দিই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।' সূরা আনকাবুত : ৫৭
কিন্তু প্রশ্ন হলো-কতজন মৃত্যুর মিষ্টতার স্বাদ আস্বাদন করবে?
যখন মৃত্যু সামনে এসে দাঁড়াবে, তখন অবহেলায় নষ্ট করা সময়গুলোর কথা আমাদের মনে পড়বে। মৃত্যুর সময় আমাদের সব গোপনীয়তা, সব গুনাহ ও দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। সেই সব বিষয় আমাদের মুখোমুখি এসে দাঁড়াবে, যা আমাদের করার কথা ছিল, কিন্তু করা হয়ে ওঠেনি।
'যতদিন পারো বেঁচে থাকো, কিন্তু জেনে রেখ, একদিন তুমি মারা যাবে। যাকে ইচ্ছা ভালোবাসো, কিন্তু জেনে রেখ, একদিন তুমি বিচ্ছেদের সম্মুখীন হবে। যা মনে চায় করো, কিন্তু জেনে রেখ, একদিন তোমাকে সবকিছুর জবাব দিতে হবে।'
মুত্যুর অনিবার্যতা আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে-আমরা কি এমনভাবে জীবনযাপন করছি যে, প্রতিটি দিনই হয়তো হতে পারে আমাদের শেষ দিন? মৃত্যু আমাদের ভাবতে শেখায়-আমরা কি অর্থবহ জীবনযাপন করছি, নাকি মূল্যবান সময়গুলো হেলায় কাটিয়ে চলেছি?
আলি বলেন-
'জীবনের জন্য এমনভাবে কাজ করবে, যেন তুমি চিরকাল বাঁচবে; পরকালের জন্য এমনভাবে কাজ করবে, যেন তুমি কালকেই মারা যাবে।'
মহানবি বলেছেন- 'মৃত্যুর কথা এমনভাবে স্মরণ করো, যেন তুমি দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত সময় থেকে পূর্ণ সুবিধা নিতে পারো।'
মহান আল্লাহ বলেন- 'তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন-কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম। তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।' সূরা মুলক: ২
আমরা কোথায় ও কখন মারা যাব, তা ঠিক করার সুযোগ আমাদের হাতে নেই। তবে আমরা কীভাবে বেঁচে থাকব, তা ঠিক করার সুযোগ আমাদের হাতে রয়েছে। একবার এক ব্যক্তি মুহাম্মাদ-কে জিজ্ঞেস করলেন-'কবে বিচার দিবস অনুষ্ঠিত হবে?' রাসূলুল্লাহ জবাবে পালটা প্রশ্ন করলেন- 'তুমি তার জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ?' নবিজি মূলত আমাদের করণীয়র দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। অন্য একসময় রাসূল বলেছেন-
'যখন কিয়ামত এসে যাবে, তখন যদি তোমার কাছে খেজুর গাছের একটি চারাও থেকে যায় এবং সেটি রোপণ করা সম্ভব হয়, তাহলে তোমার উচিত চারাটি রোপণ করা।'
পবিত্র কুরআনে কিয়ামত দিবসের কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে-যেদিন সকল মানুষ পুনরুত্থিত হবে এবং আল্লাহর সামনে বিচারের মুখোমুখি হবে। সেদিন প্রত্যেককেই দুনিয়াতে তার কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। কুরআনের সেদিনের ভয়াবহতার বিবরণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উঠে এসেছে।
কুরআন বলেছে- 'পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে।' সূরা জিলজাল : ১
'মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো। পর্বতগুলো হবে ধুনিত রঙিন পশমের ন্যায়।' সূরা কারিয়া: ৪-৫
'সমুদ্রগুলোকে অগ্নি-উত্তাল করা হবে।' সূরা আত-তাকভির: ৬
'তারকাগুলো তাদের উজ্জ্বলতা হারিয়ে খসে পড়বে।' সূরা আত-তাকভির: ২
'সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে।' সূরা কিয়ামাহ : ৯
'আকাশকে গুটিয়ে নেওয়া হবে, যেভাবে গুটিয়ে রাখা হয় দলিলপত্রাদি।' সূরা আম্বিয়া: ১০৪
'মৃতরা জীবন লাভ করবে এবং আল্লাহর দিকে ছুটে আসবে।' সূরা ইয়াসিন : ৫১
সেদিন সৃষ্টিজগতের সকল কিছু আল্লাহর সামনে মাথানত করে দাঁড়াবে। এদিন দুনিয়ার বিচারের অসম দাঁড়িপাল্লাকে আল্লাহর করুণা ও অনুগ্রহের সাহায্যে নিখুঁতভাবে সমান করে স্থাপন করা হবে।
কেউ জানে না, কবে সে মারা যাবে এবং কবে কিয়ামত সংঘটিত হবে। আমাদের হাতে কেবল সেই ক্ষমতা আছে-যা দিয়ে আমরা নিজের বর্তমান জীবনকে বদলাতে পারি। কাজেই মৃত্যু নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে আমাদের উচিত বর্তমানকে উন্নততর করার কাজে আত্মনিয়োগ করা। পারস্য কবি আবু সাইদ আবুল খাইর যথার্থই বলেছেন-
'যখন তুমি ভূমিষ্ঠ হয়েছ, তখন তুমি কেঁদেছ; কিন্তু সবাই হেসেছে। এমনভাবে তোমার জীবনটা গঠন করো, যেন মৃত্যুর সময় তুমি হাসবে, কিন্তু সবাই কাঁদবে।'
যদি কখনো আপনি জানতে পারেন যে আজ রাতেই আপনারা মৃত্যু হবে এবং আগামীকাল সকালে আপনি আর জেগে উঠবেন না, তখন আপনার মনে কী অনুভূতির সৃষ্টি হবে? আপনি কি মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে ভেঙে পড়বেন? নাকি আল্লাহর ক্ষমা ও করুণা পেতে তাঁর দরজায় ধরনা দেবেন? যেহেতু আমরা জানি না মৃত্যু কখন আমাদের কাছে এসে উপস্থিত হবে, সেহেতু আমাদের এমনভাবে জীবনযাপন করা উচিত, যেন আজ রাতই হতে যাচ্ছে আমার জীবনের শেষ রাত।
মৃত্যুর জন্য আমাদের সৃষ্টি হয়নি
আল্লাহ যদি কেবল জীবনের জন্য আমাদের সৃষ্টি করতেন, তাহলে মৃত্যু বলতে কোনো কিছু থাকত না। প্রকৃতপক্ষে মৃত্যু জীবনের বিপরীত কিছু নয়; বরং মৃত্যু হলো অস্তিত্বহীনতা। আমরা যে কেবল জীবনের জন্য সৃষ্টি হইনি, তার প্রমাণই হলো মৃত্যু। জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন-
'আমার আত্মা ভিন্ন কোথাও থেকে আগত-আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত। তাই অবশেষে সেখানেই আমার যাত্রা সমাপ্ত করব বলে ঠিক করেছি।'
মৃত্যু শূন্যতার জগতে প্রবেশের নাম নয়; বরং মৃত্যু হলো চিরন্তন জগতে নতুন করে জন্ম নেওয়ার দরজা মাত্র। চিরস্থায়ী জগতে জন্ম নেওয়ার জন্য এ পথ আমাদের পাড়ি দিতেই হবে। চোখ মেলে তাকিয়ে যেমন আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠি, তেমনি মৃত্যুর মাধ্যমে আমরা নতুন জগতের জন্য জেগে উঠি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ প্রসঙ্গে চমৎকারভাবে বলেছেন-
'মৃত্যু মানে আলো নিভে যাওয়া নয়; বরং মৃত্যু হলো আলো নিভিয়ে দেওয়া। কেননা, ভোর চলে এসেছে।'
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'অতঃপর তোমরা ভূমিকে দেখ শুষ্ক, মৃত। অতঃপর আমি যখন তাতে পানি বর্ষণ করি, তখন তাতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়, তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়, আর তা উদ্গত করে সকল নয়নজুড়ানো (জোড়ায় জোড়ায়) উদ্ভিদ।' সূরা হজ: ৫
মৃত শীত যেমন জীবন্ত বসন্তের আগমন ঘটায়, তেমনি মৃত্যুও নতুন জীবনের আগমনি বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়। শাইখ সিদি মুহাম্মাদ আল জামাল সুন্দরভাবে বলেছেন-
'মৃত্যুর পদধ্বনি শোনো, যেটি আসলে পরকালীন জীবনেরই গান।'
দুনিয়াতে আপনি যা কিছু রেখে যাচ্ছেন, তার জন্য শোক করবেন না। কারণ, এই জগৎ কেবল পরবর্তী জগতেরই সুগন্ধ মাত্র।
'পরকালের তুলনায় দুনিয়ার জীবন হলো ততটুকু, সমুদ্রে একটি আঙুল ডুবিয়ে তুললে সেই আঙুলে যতটুকু পানি লেগে থাকে।'
মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো ঘরে ফেরার আনন্দ উদ্যাপন। আল্লাহর স্মরণকে সাথে নিয়ে মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ ও আমাদের মধ্যকার পর্দা সরে যায় এবং আমরা আল্লাহর চেহারা ও সৌন্দর্য অবলোকনের সুযোগ পাই। মুমিনের কাছে মৃত্যু অপরিচিত কিছু নয়। কারণ, আমরা অপরিচিত কোথাও যাচ্ছি না; বরং আমরা আমাদের আদি উৎসের কাছে ফিরে যাচ্ছি।
‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।’ সূরা বাকারা: ১৫৬
আমরা যখন আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে সক্ষম হই, তখন আমাদের মৃত্যুর মানে দাঁড়ায় চূড়ান্ত স্বাধীনতা। মুমিনের মৃত্যু তো হলো প্রবৃত্তির খাঁচা ভেঙে চির মুক্তি লাভের অপর নাম। মৃত্যুর মাধ্যমে রুহ ডানা মেলে উড়ে যায় তার প্রভুর কাছে। মৃত্যু সমাপ্তি নয়; বরং চিরকালীন জীবনের শুরু মাত্র।
টিকাঃ
১৭৯. তিরমিজি
১৮০. Al-Ghazali, Abu Hamid. Dear Beloved Son-Ayyuhal Walad.
১৮১. তিরমিজি
১৮২. বুখারি
১৮৩. আলবানি
১৮৪. মুসলিম, আহমদ
📄 জান্নাত ও জাহান্নামের রহস্য
জান্নাতে যাওয়ার পথ তোমার ভেতরেই রয়েছে। তোমার ভালোবাসার ডানাগুলোকে ভালোভাবে ঝাঁকুনি দাও, যাতে এগুলো শক্ত হয়। এ ডানাই তোমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে; সিঁড়ির প্রয়োজন হবে না। -জালালুদ্দিন রুমি
মহান আল্লাহ বলেন- 'আমি প্রত্যেকটি বস্তু সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়।' সূরা আজ-জারিয়াত: ৪৯
এর কারণ সম্ভবত এই যে, সৃষ্টিজগতের সবকিছুর মান নির্ণীত হয় তার বিপরীত বস্তুর সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে। ভেতর ছাড়া বাহির হয় না, সাদা ছাড়া কালো হয় না, নারী ছাড়া পুরুষ হয় না। অন্ধকার না থাকলে আলোর কি কোনো মূল্য থাকে? জাহান্নাম না থাকলে জান্নাতের কি কোনো মর্যাদা থাকে? যদি রঙের বৈপরীত্য না থাকত, তাহলে আমাদের চোখ কোনো কিছু দেখতে পারত না। যদি শব্দের তরঙ্গ না থাকত, তাহলে আমাদের কান কোনো কিছু শুনতে পারত না। কারণ, আমাদের মনের বোঝাপড়া নির্ভর করে বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যকার সম্পর্ক, বাস্তবতা ও সংযুক্ততার ওপর। এজন্যই আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টির মাঝে দ্বৈততা সৃষ্টি করেছেন, যাতে মানুষ আল্লাহর গুণগুলোকে তাঁর সৃষ্টির ওপর প্রয়োগ করতে পারে এবং এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রেমে পড়ার স্বাদ অনুভব করতে পারে।
যেহেতু ভালোবাসা কখনো জোর করে হয় না, সেহেতু আল্লাহ আমাদের ইচ্ছার স্বাধীনতা দান করেছেন, যাতে আমরা প্রকৃত ভালোবাসার স্বাদ অনুভব করতে পারি। জাহান্নাম হলো আমাদের স্বাধীন ইচ্ছারই উপজাত (বাইপ্রোডাক্ট)। কারণ, আল্লাহ যেহেতু আমাদের ইচ্ছার স্বাধীনতা দান করেছেন, সেহেতু তাঁর থেকে বিমুখ হওয়ার স্বাধীনতাও আমরা ভোগ করে যাচ্ছি।
দুনিয়া হলো পরকালের শস্যক্ষেত্র। এখানে যে শস্য আমরা রোপণ করব, তার ফসল দিয়েই পরকালে নিজের গোলা ভরব। যদি পরকালকে কেবল শাস্তি ও পুরস্কারের জায়গা হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে আল্লাহর বার্তাগুলোর নির্যাসকে সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারব না। মূলত জান্নাত ও জাহান্নাম শুধু বস্তুগত বিষয় নয়; বরং এ দুটি হলো আল্লাহর কাছাকাছি ও আল্লাহর কাছ থেকে দূরে থাকার অনুভূতিরই বাস্তব রূপায়ণ। অন্যকথায়, জান্নাত ও জাহান্নাম হলো সেই আয়না, যেখানে আল্লাহর সাথে আমাদের আত্মার সম্পর্ক প্রতিফলিত হয়।
জান্নাত ও জাহান্নামের গভীরতম অর্থ
জান্নাত ও জাহান্নাম কেবল বস্তুগত গন্তব্য নয়; বরং আধ্যাত্মিক বাস্তবতাও। জান্নাত ও জাহান্নামের প্রকৃত রূপের বর্ণনা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কারণ, এগুলো এমন বাস্তবতা-যা মানবীয় অনুভূতির বহু ঊর্ধ্বে। পবিত্র কুরআন ও মহানবি ﷺ-এর হাদিসে জান্নাত ও জাহান্নামের সেই বর্ণনাগুলো এসেছে, যা মানবীয় অনুভূতি ধারণ করতে সক্ষম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেই বর্ণনাগুলো জান্নাত ও জাহান্নামের প্রকৃত রূপের ছিটেফোঁটা মাত্র।
পরকাল গঠিত হবে দুনিয়ার জীবনের ওপর ভিত্তি করে। দুনিয়াতে যে সৎকর্মের বীজ আমরা বপন করে চলেছি, সে বীজগুলোই জান্নাতের বাগানে মহিরুহ হয়ে দেখা দেবে। জান্নাতের বাসিন্দাদের আল্লাহ তায়ালা বলবেন-
'বিগত দিনসমূহে তোমরা যা অগ্রে প্রেরণ করেছ, তার বিনিময়ে তোমরা তৃপ্তি সহকারে খাও এবং পান করো।' সূরা হাক্কাহ : ২৪
আপনি যদি দুনিয়াতে আল্লাহর সাথে বিচ্ছেদ ও প্রত্যাখ্যানের জীবনযাপন করেন, তাহলে পরকালেও একই জীবনের সম্মুখীন হবেন। জাহান্নাম হলো বিচ্ছেদের অপর নাম, যেখানে মানুষের সামনে এমন এক আবরণ পড়ে যাবে, যার ফলে সে আল্লাহর সর্বব্যাপী ভালোবাসা ও দয়া থেকে বঞ্চিত হবে। অন্যদিকে জান্নাত হলো আল্লাহর নৈকট্যের অপর নাম, যেখানে মানুষ আল্লাহর ভালোবাসা ও প্রশান্তির সমুদ্রে নিজেকে বিলীন করার অপার্থিব আনন্দ অনুভব করবে।
'ভবিষ্যতের ভেতর জান্নাত ও জাহান্নামকে তালাশ করো না। জান্নাত ও জাহান্নাম তো এখনই বর্তমান। আমরা যখন কোনো প্রত্যাশা, পুরস্কার বা সমঝোতা ছাড়াই ভালোবাসার চর্চা করি, তখন জান্নাতেই থাকি। আর যখন ঝগড়া করি বা ঘৃণার চর্চা করি, তখন জাহান্নামে অবস্থান করি।' -শামস তিবরিজি (জালালুদ্দিন রুমির আধ্যাত্মিক শিক্ষক)
দুনিয়াতের আমাদের উদ্দেশ্য কেবল জান্নাতে পৌঁছা নয়; বরং আমাদের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে জানা, তাঁকে ভালোবাসা এবং তাঁর ইবাদত করা।
আপনি যদি জানতে চান, আল্লাহর কাছে আপনার অবস্থান কোথায়? তাহলে খুঁজে দেখতে হবে, আপনার কাছে আল্লাহর অবস্থান কোথায়। আমরা যদি কেবল পুরস্কারের আশায় আল্লাহর ইবাদত করি, তাহলে আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কটা হবে নিরস লেনদেনের সম্পর্ক-যেখানে ভালোবাসা ও আবেগের কোনো স্থান থাকবে না। ফলে আল্লাহর সৃষ্টি-বৈচিত্র্যের সামগ্রিক উদ্দেশ্যের পেছনে যে প্রাণসত্তা রয়েছে, তার স্বাদ অনুভব করতে পারব না।
আমরা যদি কেবলই জান্নাতের পুরস্কার লাভের জন্য ইবাদত করি, তাহলে তা আল্লাহর নৈকট্য ও ভালোবাসা অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কুরআনের কোথাও আল্লাহ বলেননি, জান্নাতের কামনা করার জন্য আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে; বরং কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, তাঁর ইবাদত করার জন্যই আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। যাতে আমরা আমাদের কুপ্রবৃত্তিকে পরাভূত করতে পারি এবং হৃদয়কে ত্রুটিমুক্ত করে আল্লাহর ভালোবাসামাখা চেহারা অবলোকনের জন্য উপযুক্ততা অর্জন করতে পারি। বিশিষ্ট সাধক রাবেয়া বসরি বলেছেন-
'হে আল্লাহ! আমি যদি জাহান্নামের ভয়ে আপনার ইবাদত করি, তাহলে আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করুন। আমি যদি জান্নাত লাভের আশায় আপনার ইবাদত করি, তাহলে আমাকে জান্নাত থেকে দূরে রাখুন। কিন্তু আমি যদি কেবল আপনারই জন্য আপনার ইবাদত করি, তাহলে আপনার চিরস্থায়ী সৌন্দর্য থেকে আমাকে বিমুখ করবেন না।'
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন-
'আল্লাহ ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কানন-কুঞ্জের, যার তলদেশে প্রবাহিত হবে প্রস্রবণ। তারা সেগুলোর মাঝেই থাকবে। আর এসব কানন-কুঞ্জে থাকবে পরিচ্ছন্ন থাকার ঘর। বস্তুত এ সমুদয়ের মাঝে সবচেয়ে বড়ো হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। এটাই হলো মহাসাফল্য।'
দেখা যাচ্ছে-বান্দার জন্য জান্নাতের সবচেয়ে বড়ো উপহার হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। অনেক স্কলার বলেছেন-আল্লাহ যদি জাহান্নামের ভেতর তাঁর চেহারা প্রদর্শন করেন, তাহলে জাহান্নামের আগুন নিভে গিয়ে নয়নাভিরাম বাগানে পরিণত হয়ে যাবে এবং আল্লাহ যদি জান্নাত থেকে তাঁর উপস্থিতিকে সরিয়ে নেন, তাহলে সীমাহীন আনন্দের জান্নাত পুরোপুরি অর্থহীন হয়ে পড়বে। জান্নাতের সকল সৌন্দর্যের উৎস হলো এর স্রষ্টার নৈকট্য।
জান্নাত-জাহান্নামের আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী রূপ
জান্নাত হলো এমন একটি জায়গা, যেখানে আপনি আল্লাহর গুণাবলির বস্তুগত প্রতিফলনের ভেতর মোড়ানো থাকবেন। জান্নাতের জগতে আপনি আল্লাহর দয়ার ছায়ায় ঢাকা থাকবেন। আল্লাহর মহিমার প্রাসাদে বসবাস করবেন। আল্লাহর উদারতার বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করবেন। আল্লাহর অনুগ্রহে নদী থেকে পানি পান করবেন। আল্লাহর সৌন্দর্যের রেশমি কাপড় দিয়ে জড়ানো থাকবেন। আল্লাহর শান্তিময়তার খাটে হেলান দিয়ে বসবেন এবং আল্লাহর ভালোবাসার মদ পান করবেন। আল্লাহর সত্যের ঝরনায় সাঁতার কাটবেন। আল্লাহর মহত্ত্বের বৃক্ষরাজি দিয়ে ঘেরা থাকবেন এবং আল্লাহর প্রজ্ঞার খেজুর ও ডালিম খাবেন। এসবের চাইতেও বড়ো যে জিনিসটি পাবেন, তা রাসূলুল্লাহ -এর কথায় এভাবে উঠে এসেছে-
'তুমি তোমার প্রভুকে তেমনিভাবে দেখতে পাবে, যেমন দেখ পূর্ণিমার চাঁদকে।'
জান্নাত হলো সেই জায়গা, যেখানে অদৃশ্য দৃশ্যমান হবে, আল্লাহর গুণগুলো জীবন্ত হয়ে উঠবে; যেখানে দুশ্চিন্তা, হতাশা বা দুঃখের কোনো স্থান থাকবে না। কারণ, সেখানে মানুষ চাওয়ার আগেই সবকিছু পেয়ে যাবে।
আল্লাহর খাঁটি বান্দারা দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন-
'যারা বলে-“আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ।" অতঃপর সে কথার ওপর সুদৃঢ় থাকে, ফেরেশতারা তাদের নিকট অবতীর্ণ হয় আর বলে-“তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না, আর জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো, যার ওয়াদা তোমাদের দেওয়া হয়েছে।"' সূরা হামিম সিজদা: ৩০
জান্নাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আমার খাঁটি বান্দাদের জন্য আমি জান্নাতকে এমনভাবে প্রস্তুত করেছি-যা কোনো চোখ কখনো দেখেনি, কোনো কান কখনো শোনোনি, কোনো অন্তর কখনো অনুধাবন করেনি।'
জান্নাত সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন- 'কোনো ব্যক্তিই জানে না, চোখ জুড়ানো কী (জিনিস) তাদের জন্য লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাদের কাজের পুরস্কার হিসেবে।' সূরা আস-সিজদা : ১৭
জান্নাতে আমরা নতুন সৃষ্টি হিসেবে আবির্ভূত হব। সেখানে আমরা এমন গঠনে গঠিত থাকব-যা এখন আমাদের কাছে অজানা। জান্নাত এমন একটি জগৎ, যা বর্তমান জগৎ থেকে এতখানি ভিন্ন যে, মানুষের বুদ্ধিমত্তা সে জগতের বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম নয়। আমরা দুনিয়ার সাফল্য কামনা করে থাকি, কিন্তু আল্লাহ আমাদের পরকালীন সাফল্য দিতে চান।
'তোমরা দুনিয়ার সম্পদ কামনা করছ; অথচ আল্লাহ চান আখিরাত। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাবান।' সূরা আনফাল : ৬৭
আল্লাহর মহত্ত্ব এত বিস্তৃত যে, দুনিয়ার জগৎ সে মহত্ত্বকে ধারণ করার জন্য যথেষ্ট বড়ো নয়। আল্লাহর অসীম করুণার স্বাদ কেবল জান্নাতেই পাওয়া সম্ভব। কেননা, জান্নাতই একমাত্র জায়গা-যা আল্লাহর অসীমত্বকে ধারণ করতে পারে।
জান্নাতে চার ধরনের নদী আছে বলে আল্লাহ তায়ালা আমাদের জানিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন- 'মুত্তাকিদের যে জান্নাতের ওয়াদা দেওয়া হয়েছে, তার উপমা হলো- তাতে আছে নির্মল পানির ঝরনা, আর আছে দুধের নদী-যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়। আছে পানকারীদের জন্য সুস্বাদু মদের নদী আর পরিশোধিত মধুর নদী। তাদের জন্য সেখানে আছে সব রকম ফলমূল আর তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে ক্ষমা।' সূরা মুহাম্মাদ: ১৫
অনেকে বলেন-পানি, দুধ, মধু ও মদ চার রকম জ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করে; প্রাকৃতিক, আধ্যাত্মিক, জ্ঞানগত ও ইন্দ্রিয়গত।
যেখানে জান্নাতের মানে হলো আল্লাহর নৈকট্য, সেখানে জাহান্নামের মানে আল্লাহর নিকট থেকে বিচ্ছেদ। জাহান্নামের ভয়াবহতার কিছু বর্ণনা কুরআনে এভাবে উঠে এসেছে—
‘তারা বলবে—হে আমাদের প্রতিপালক! দুর্ভাগ্য আমাদের পরাস্ত করেছিল, আর আমরা ছিলাম এক পথভ্রষ্ট জাতি।’ সূরা মুমিনুন : ১০৬
‘সেদিন অপরাধীদের জন্য কোনো সুসংবাদ থাকবে না। আর তারা বলবে—হায়! কোনো বাধা যদি তা আটকে দিত।’ সূরা ফুরকান: ২২
‘জাহান্নামিরা জান্নাতিদের ডেকে বলবে—“আমাদের কিছু পানি ঢেলে দাও কিংবা আল্লাহ তোমাদের যে রিজিক দিয়েছেন, তা থেকে কিছু দাও।” তারা বলবে—“আল্লাহ এ দুটো অবিশ্বাসীদের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন।”’ সূরা আ'রাফ: ৫০
জাহান্নাম হলো আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছেদেরই অপর নাম, আর জান্নাত হলো আল্লাহ ও আমাদের মধ্যকার স্থাপিত পর্দাকে উন্মোচন করে আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার অপর নাম।
আমরা নিজেরাই নিজেদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করি
ইসলাম প্রতিটি মানুষকে সহজাতভাবে ভালো (ফিতরাত) হিসেবে বিবেচনা করে, যার জীবনপথ আল্লাহর পথের অনুকূলে বহমান। তাই জান্নাতকে সাধারণভাবে সকল মানুষের গন্তব্য হিসেবে ধরা হয়। আর জাহান্নাম তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, যারা মানুষ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও অবশেষে তারা মনুষ্যত্বকে পরিত্যাগ করে ঘৃণা, স্বার্থপরতা ও বিচ্ছেদের মধ্যে জীবনযাপন করেছে।
শয়তানের লক্ষ্য হলো আমাদের কুপ্রবৃত্তির গোড়ায় পানি সিঞ্চন করে আমাদের ভেতর বিচ্ছেদ ও অহংকার সৃষ্টি করা। আমরা যতই অহংকার, লোভ ও হিংসার বীজ বপন করব, ততই আমাদের হৃদয়ের দুয়ার সংকুচিত হবে। ফলে আমাদের হৃদয়ে আলো পৌঁছবে কম। অন্যদিকে আল্লাহর জন্য দুনিয়াতে আমরা যা কিছু করব, তা আখিরাতের ভূমিতে বীজ হিসেবে রোপিত হবে এবং বিচার দিবসে সেখান থেকে আমরা ফল সংগ্রহ করতে পারব।
'অতঃপর কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে তা দেখতে পাবে এবং কেই অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে তাও দেখতে পাবে।' সূরা জিলজাল : ৮
আল্লাহ চান না আমরা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হই; বরং তিনি আমাদের পছন্দের স্বাধীনতা দান করেছেন। আমরা চাইলে আল্লাহর কাছ থেকে বিচ্ছেদের জীবনযাপন করতে পারি, আবার চাইলে তাঁর সাথে একান্ত সম্পর্কের ভেতর দিয়ে জীবনযাপন করতে পারি। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করেন না; বরং মানুষই নিজের ওপর জুলুম করে।' সূরা ইউনুস: ৪৪
আমাদের ইচ্ছার স্বাধীনতাই আমাদের জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে। কুরআনে কোথাও বলা নেই, গাছ বা পশুপাখি জাহান্নামে যাবে। বৃক্ষলতা, পশুপাখি বা কীটপতঙ্গ জাহান্নামে যাবে না। কেননা, তাদের মানুষের মতো ভালো-মন্দ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে জাহান্নামিরাই তাদের কর্মের মাধ্যমে নিজের জন্য জাহান্নামের শিখা জ্বালিয়ে দেয়।
মানুষ যদি ভুল না করত, তাহলে আল্লাহর দয়া, অনুগ্রহ, ক্ষমা ও মমতার স্বাদ অনুভব করতে পারত না। সম্ভবত এ কারণেই আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছার স্বাধীনতা দিয়েছেন, ভুল করার সুযোগ দিয়েছেন। এক দৃষ্টিতে সৎকর্মের উচ্চ অবস্থান তুলে ধরার জন্যই অসৎকর্ম প্রয়োজনীয় বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। একটি নৈতিকতাসম্পন্ন জগতের জন্য সৎকর্মের পাশাপাশি অসৎকর্মেরও অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাপের অনুপস্থিতিই যেমন ঠান্ডা, আলোর অনুপস্থিতি যেমন অন্ধকার, তেমনি আল্লাহর কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নামই মন্দ কাজ। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমার কোনো কল্যাণ হলে তা হয় আল্লাহর তরফ থেকে এবং তোমার কোনো অকল্যাণ হলে তা হয় তোমার নিজের কারণে।' সূরা নিসা : ৭৯
অন্যকথায়, মন্দ হলো মানুষের ভুল ধারণার পর্দাবিশেষ। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেকে এবং পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। যেখানে মোতায়েন আছে পাষাণ হৃদয় ও কঠোর স্বভাবের ফেরেশতা।' সূরা আত-তাহরিম : ৬
এখানে মহান আল্লাহ আরও স্পষ্ট করে বলেছেন-আমরাই আমাদের জাহান্নামের আগুনের নির্মাতা। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'নিশ্চয় তোমরা এবং আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদের পূজা করো, সেগুলো তো জাহান্নামের জ্বালানি। তোমরা সেখানে প্রবেশ করবে।' সূরা আম্বিয়া : ৯৮
কেবল সেই জায়গা নয়, যেটি হবে আল্লাহর ওপর অবিশ্বাসীদের ঠিকানা; বরং জাহান্নাম হলো মনের সেই অবস্থা, যা অবিশ্বাসীরা নিজেদের ভেতর বহন করে চলেছে।
আল্লাহর রহমতের নুর থেকে নিজের চোখ বন্ধ করার মাধ্যমে আমরা নিজেদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করি। আমরা যখন আল্লাহর নুর থেকে নিজেদের মুখ ফিরিয়ে নিই, তখন আমাদের হৃদয়ের পাপড়ি বুজে যায় এবং আল্লাহর নুরের কাছ থেকে সৃষ্ট দূরত্বের কারণে হৃদয় শুষ্ক ও বিবর্ণ হয়ে যায়।
'মুত্তাকিদের জন্য জান্নাতকে নিকটে আনা হবে-তা মোটেই দূরে থাকবে না।' সূরা ক্বাফ: ৩১
অন্যদিকে জাহান্নাম তৈরি হয়েছে তাদের জন্য, যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে, প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার কাছে নিজের ইচ্ছা, জীবন ও মৃত্যুকে সমর্পণ করে এবং আল্লাহকেন্দ্রিক জীবনযাপন না করে প্রবৃত্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন করে। আপনি যদি আল্লাহকে ছাড়া দুনিয়ায় জীবনযাপন করেন, তাহলে আপনার পরকালও হবে আল্লাহর অনুগ্রহ ও ভালোবাসা থেকে বিচ্ছিন্ন। বিচার দিবসে আল্লাহ আপনার ওপর জুলুম করবেন না; বরং আপনার কাজেরই উপযুক্ত প্রতিদান দেবেন। সেদিন আল্লাহ তায়ালা বলবেন-
'আজ তোমরা অজুহাত পেশ করো না। তোমরা যা করতে, তোমাদের তারই প্রতিফল দেওয়া হবে।' সূরা আত-তাহরিম : ৭
যদি আপনি আল্লাহর কাছে চান-জাহান্নাম বলতে কোনো কিছু না থাকুক, তাহলে মূলত পরোক্ষভাবে চাইছেন যে, আপনার ইচ্ছার স্বাধীনতা তুলে নেওয়া হোক। আপনি একদিকে নিজের পছন্দমাফিক চলার স্বাধীনতা চাইবেন, আবার অন্যদিকে জাহান্নামের অস্তিত্ব না থাকার কামনা করবেন—এটি হয় না। কেননা, এটি হলে আল্লাহকে ন্যায়বিচারক হিসেবে পাওয়া সম্ভব হবে না। মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা থাকলে একদল লোক ভালো পথে চলবে, আরেকদল লোক মন্দ পথে চলবে-এটাই স্বাভাবিক। এমন অবস্থায় দুই ধরনের মানুষের জন্য দুই রকমের প্রতিফলের ব্যবস্থা না থাকলে আল্লাহ ন্যায়বিচারক হবেন কী করে? আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তবে কি আমি মুসলিমদের অবাধ্যদের মতোই গণ্য করব? তোমাদের কী হলো? তোমরা কেমন সিদ্ধান্ত দিচ্ছ!' সূরা কালাম : ৩৫-৩৬
জান্নাত ও জাহান্নাম হলো দাঁড়িপাল্লার দুটি দিকের প্রতিফল। ভালো ও মন্দ কর্মের দুই রকম প্রতিফল স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধির অনিবার্য দাবি। মানুষের মর্যাদা ফেরেশতাদের চেয়ে ঊর্ধ্বে এ কারণে যে, মানুষ আল্লাহর ইবাদত না করার স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ইবাদত করে। মানুষের মর্যাদা পশুর চাইতেও নিচে নেমে যায় তখন, যখন সে তার স্বাধীন ইচ্ছাকে ব্যবহার করে নিজের কুপ্রবৃত্তির কামনাকে চরিতার্থ করতে করতেই জীবন পার করে দেয়।
আপনি যদি প্রবৃত্তির দাসত্ব করেন আর জান্নাত কামনা করেন, তাহলে বোকার স্বর্গে বাস করছেন। আলোর কাছে অন্ধকারের কোনো স্থান নেই। কেননা, আলো জ্বললে অন্ধকার সেখানে থাকতে পারে না। আল্লাহ কারও জান্নাতের পথে বাধা সৃষ্টি করেন না; বরং আমরাই জান্নাতের সামনে এমন পর্দা টেনে দিই যে, একসময় সেই পর্দা ভেদ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে ওঠে।
যারা আল্লাহর কাছে পথনির্দেশনা চায়, আল্লাহ তাদের জন্য রহমতের দরজা বন্ধ করেন না। আল্লাহ যেখানে ডানে যেতে বলেছেন-সেখানে যদি আমরা বামে যাই, তাহলে কখনো গন্তব্যে পৌঁছতে পারব না। আমরা যদি আল্লাহর দিকনির্দেশনা উপেক্ষা করে চলতে থাকি, তাহলে একসময় পথ হারিয়ে ফেলব। এই পথভ্রষ্টতার জন্য আল্লাহ দায়ী নন; বরং আমরাই দায়ী।
আল্লাহ আমাদের জন্য যে মমতামাখা পথ সাজিয়ে রেখেছেন, সে পথে চলতে তিনি আমাদের বাধ্য করেন না। কিন্তু তিনি ভালোবাসেন বলে নানা উপায়ে আমাদের সঠিক পথে ফিরে আসার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। পবিত্র কুরআনে বারবারই সে কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকী আমরা যদি আল্লাহর কাছ থেকে একশো কোটি পদক্ষেপও দূরে চলে যাই, তবুও তাঁর কাছে ফিরে আসার দরজা আমাদের জন্য সব সময়ই খোলা থাকে। আল্লাহ খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন-এমন কোনো পাপ নেই, যা ক্ষমার অযোগ্য। মহান আল্লাহ বলেন- 'হে আমার বান্দারা! তোমরা দিনে ও রাতে গুনাহ করে থাকো এবং আমি সব গুনাহ ক্ষমা করে দিই। কাজেই তোমরা আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দেবো।'
যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আমাদের মনে রাখতে হবে, তা হলো-জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়ই তৈরি হয়েছে আল্লাহর গুনাহগার বান্দাদের জন্য। জাহান্নাম তৈরি হয়েছে অহংকারী গুনাহগারদের জন্য এবং জান্নাত তৈরি হয়েছে অনুতপ্ত ও তওবাকারী গুনাহগারদের জন্য। পবিত্র কুরআন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, প্রেমময় আল্লাহ চান, আমরা যেন আমাদের আদি উৎস জান্নাতে ফিরে যাই। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ -এর একটি হাদিস রয়েছে- 'একবার রাসূল দেখলেন, এক মা তার শিশুসন্তানকে বুকের দুধ পান করাচ্ছে। তিনি সাহাবিদের বললেন-"তোমরা কি ভাবতে পারো, এই মা তার শিশুকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে?" সাহাবিরা জবাবে বললেন-“না; বরং সে পারলে এটি রোধ করবে।” রাসূল বললেন-“একজন মা তার শিশুসন্তানকে যতটা মায়া করে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তারচেয়ে বেশি মায়া করেন।"'
অপরের চূড়ান্ত পরিণাম সম্পর্কে আমরা জানি না
আমরা জানি না-কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে। কেননা, আমাদের বিচার হবে নিজের হৃদয়ের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে। আর আল্লাহ ছাড়া হৃদয়কে দেখার সক্ষমতা কারও নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'সেদিন তো ধন-সম্পদ কাজে লাগবে না, না সন্তান-সন্ততি; অবশ্য যে বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে আল্লাহর কাছে হাজির হবে।' সূরা আশ-শুআরা: ৮৮-৮৯
বিচার দিবসে কে মুক্তি পাবে আর কে পাবে না-সেটা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তাই কুরআনে আল্লাহ অপরের সম্পর্কে অনুমান করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'হে ঈমানদারগণ! তোমরা বেশি বেশি অনুমান করা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, কিছু কিছু অনুমান অপরাধ।' সূরা হুজুরাত : ১২
মহানবি অপরের সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামত দিতে নিষেধ করেছেন- 'তোমরা কেউ অপরকে কাফির হিসেবে অভিযুক্ত করবে না। যদি সে কাফির না হয়ে থাকে, তাহলে সে অভিযোগ অভিযোগকারীর ওপর আরোপিত হবে।'
মহান আল্লাহ বলেন- 'এবং তোমাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে সামান্যই।' সূরা বনি ইসরাইল : ৮৫
কাজেই সীমিত জ্ঞান নিয়ে আমরা কী করে অন্যের ব্যাপারে চূড়ান্ত মত দিতে পারি? কুরআন মানুষকে সরল-সঠিক পথের দিকে আহ্বান করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কাউকে বিচার করার চূড়ান্ত এখতিয়ার রয়েছে কেবল আল্লাহর হাতেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'কর্মফল দিবস সম্পর্কে কি তুমি জানো? সেদিন কারও অপরের জন্য কিছু করার সামর্থ্য থাকবে না এবং সেই দিন সমস্ত কর্তৃত্ব হবে আল্লাহর।' সূরা মুতাফফিফিন: ১৮-১৯
অর্থাৎ সেদিন সকল ক্ষমতা-কর্তৃত্ব কেবল আল্লাহর জন্য নির্ধারিত হবে এবং আল্লাহ ছাড়া সকলে হবে শক্তি ও ক্ষমতাহীন।
অপরের গন্তব্য যা-ই হোক না কেন, তার ওপর ভিত্তি করে মুসলিমের কর্মপন্থার কোনো হেরফের হয় না। অপরের ধর্ম ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়; বরং আমাদের ধর্ম ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই অপরের প্রতি আমাদের ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধার বিষয়টি নির্ধারিত হওয়া উচিত। যেহেতু আমরা বিশ্বাস করি-প্রতিটি মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি এবং প্রতিটি মানুষের প্রতি আল্লাহ তাঁর রহমত ও ভালোবাসার বারিধারা বর্ষণ করে চলেছেন, সেহেতু প্রতিটি মানুষই আমাদের কাছে সম্মান ও মর্যাদার পাত্র; তার ধর্মীয় বিশ্বাস যা-ই হোক না কেন।
আল্লাহর রহমত সবকিছুর ওপর পরিব্যাপ্ত
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর আমার রহমত সর্বব্যাপী পরিব্যাপ্ত।' সূরা আ'রাফ: ১৫৬
অর্থাৎ আল্লাহর রহমত থেকে কেউ-ই বঞ্চিত নয়। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে চান না; তাই তিনি বান্দার সামান্য সৎকর্মেরও বিশাল পুরস্কার দান করেন। রাসূলুল্লাহ বলেছেন- 'নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্ম ও মন্দ কর্মের হিসাব রাখেন এবং এগুলোকে পরিষ্কার রাখেন। কোনো ব্যক্তি কোনো ভালো কাজ করার সংকল্প করলে কাজটি না করার আগেই আল্লাহ তাকে সে কাজটি সম্পন্ন করার সওয়াব দিয়ে থাকেন। যখন বান্দা কাজটি সম্পন্ন করে, তখন আল্লাহ তাকে সে কাজটির দশ থেকে সাতশোগুণ পর্যন্ত; এমনকী তারও বেশি সওয়াব দিয়ে থাকেন। বান্দা যখন খারাপ কোনো কাজ করার সংকল্প করে-কিন্তু কাজটি সম্পন্ন করে না, তখন আল্লাহ তার জন্য একটি সৎকর্মের সওয়াব লিখেন। যখন সে কাজটি করে ফেলে, তখন আল্লাহ কেবল একটি মন্দকর্মের গুনাহ লিখেন।'
আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সীমাহীনভাবে ভালোবাসেন। মহানবি বলেছেন- 'দুনিয়ার সব মায়া-মমতা আল্লাহর ময়া-মমতার তুলনায় একশো ভাগের একভাগ মাত্র। বাকি নিরানব্বই ভাগ মায়া-মমতা আল্লাহ বিচার দিবসের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছেন।'
যদিও আমাদের কর্মগুলো দাঁড়িপাল্লায় মাপা হবে এবং হৃদয়ের অবস্থানকে বিবেচনা করা হবে, তবুও আমরা কখনো আমাদের কর্ম দিয়ে জান্নাত অর্জন করতে পারব না। কেননা, যতখানি ইবাদত করা উচিত, ততখানি ইবাদত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
দুনিয়ার কর্ম দিয়ে জান্নাতকে কেনা সম্ভব নয়। জান্নাত অর্জন করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়; যদি না আল্লাহ দয়া করে তাকে জান্নাত না দান করেন।
মহানবি বলেছেন-
'তোমাদের কেউ কেবল নিজের আমল দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।' সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন- 'এমনকী আপনিও হে আল্লাহর রাসূল?' রাসূল জবাবে বললেন-'এমনকী আমিও; যদি না আল্লাহ তাঁর মহিমা ও রহমত দিয়ে আমাকে পরিব্যাপ্ত করেন!'
এ কারণে মুমিন কখনো তার সৎকর্ম নিয়ে অহংকার করে না। কারণ, সে জানে-তার সৎকর্ম তাকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়; কেবল আল্লাহর দয়া, করুণা, ক্ষমা ও ভালোবাসাই তাকে জান্নাতে নিতে পারে।
টিকাঃ
১৮৫. সূরা আত-তুর: ২৩
১৮৬. তিরমিজি
১৮৭. বুখারি, মুসলিম
১৮৯. হাদিসে কুদসি
১৯০. বুখারি
১৯১. বুখারি, মুসলিম
১৯২. বুখারি
১৯৩. বুখারি
১৯৪. মুসলিম
📄 আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন
আল্লাহ আপনাকে ততখানি ভালোবাসেন, যতখানি আপনি কল্পনাও করতে পারেন না। আপনি মূল্যবান। আপনি গুরুত্বপূর্ণ। সমগ্র বিশ্বজগৎ সৃষ্টি হয়েছে আপনার জন্য, যাতে আপনি আল্লাহর ইবাদত এবং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আপনার ভেতর বহন করা মূল্যবান সম্পদরাজিকে আবিষ্কার করতে পারেন।
আল্লাহর ভালোবাসা কখনো বদলে যায় না; বরং আমরা যে অনুভূতি দিয়ে আল্লাহর ভালোবাসাকে অনুভব করি, সে অনুভূতিই বদলে যায়।
আল্লাহর ভালোবাসা নিঃশর্ত ও অমূল্য; একে কোনো কিছু দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। তবে আমাদের সৎকর্মগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সৎকর্মের মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর ভালোবাসার স্বাদ অনুভব করতে পারি।
বিশ্বজগতের স্রষ্টা মহামহিম আল্লাহ আপনার ভেতর রুহকে ফুঁকে দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি নিজের ভালোবাসার গোপন রহস্যকে আপনার আত্মার ভেতর রোপণ করে দিয়েছেন। সৃষ্টিজগতের প্রভু তাঁর অপার ভালোবাসা দিয়ে সমগ্র সৃষ্টিজগতের মধ্য থেকে আপনাকে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে পছন্দ করেছেন। আপনার সৃষ্টি হয়েছে আল্লাহর মাধ্যমে, আল্লাহরই জন্য। অন্য কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য আপনাকে সৃষ্টি করা হয়নি কিংবা আপনার সংস্কৃতি ও সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্যেও আপনাকে সৃষ্টি করা হয়নি। আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে আপনার সমগ্র হৃদয় দিয়ে আল্লাহকে জানার জন্য, আল্লাহকে ভালোবাসার জন্য এবং আল্লাহর ইবাদত করার জন্য। আপনাকে এজন্য সৃষ্টি করা হয়েছে-যাতে আপনি আল্লাহর প্রশংসার ভেতর ডুবে থাকেন, আল্লাহর রহমতের সাগরে সাঁতরে বেড়ান এবং আপনার হৃদয়ের গহিনে থাকা আধ্যাত্মিক মণি-মুক্তোগুলোকে আবিষ্কার করেন।
আপনি গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্বজগতের স্রষ্টা তাঁর অসীম করুণা ও ভালোবাসার নুর থেকে আপনাকে সুপরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি করেছেন। যে আল্লাহর নিশ্বাস আপনাকে জীবন দান করেছে, আপনার মূল্য নির্ধারিত হয় তার ভিত্তিতে।
আপনি আপনার শরীরটা আপনি নন, যে শরীর একসময় ভেঙে পড়বে; বরং আপনি হলেন সেই আত্মা, যার বিনাশ নেই। জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন- 'ভাবছ, তুমি এ বিশ্বজগতের একজন নাগরিক। ভাবছ, তুমি এ ধূলিকণার জগতের মালিক। তুমি মূলত নিজের জন্য ধূলিকণার একটি প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করেছ এবং এভাবে তোমার সত্যিকার উৎসের কথা ভুলে গেছ।'
আল্লাহ আপনাকে ততখানি ভালোবাসেন, যতখানি আপনি কল্পনাও করতে পারেন না। আপনি মূল্যবান। আপনি গুরুত্বপূর্ণ। সমগ্র বিশ্বজগৎ সৃষ্টি হয়েছে আপনার জন্য, যাতে আপনি আল্লাহর ইবাদত ও আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আপনার ভেতর বহন করা মূল্যবান সম্পদরাজিকে আবিষ্কার করতে পারেন।
আল্লাহ আপনাকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসেন
আল্লাহ যেহেতু তাঁর সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল নন, সেহেতু আমাদের কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর গুণগুলো প্রভাবিত হয় না। আমরা যখন গুনাহ করি, তখন আল্লাহ আমাদের ওপর তাঁর ভালোবাসাকে কমিয়ে দেন না; বরং গুনাহ করার মাধ্যমে আমরা নিজেরাই আল্লাহর ভালোবাসার সামনে একটি আবরণ স্থাপন করি। আল্লাহর ভালোবাসা কখনো বদলে যায় না; বরং আমরা যে অনুভূতি দিয়ে আল্লাহর ভালোবাসাকে অনুভব করি, সে অনুভূতিই বদলে যায়।
ইসলামের স্তম্ভ ও মূলনীতিগুলো হলো কাপড় পরিষ্কার করার মতো, যা আমাদের গুনাহ, আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ও দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণের ময়লাকে ধুয়ে পরিষ্কার করে দেয়। আপনি যখন একবার উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন- আল্লাহর কাছে আপনি গুরুত্বপূর্ণ, তখন দুনিয়ার যেকোনো স্বীকৃতি ও সাফল্য আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হবে।
আল্লাহর ভালোবাসা নিঃশর্ত ও অমূল্য; একে কোনো কিছু দিয়ে কেনা সম্ভব নয়। তবে আমাদের সৎকর্মগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সৎকর্মের মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর ভালোবাসার স্বাদ অনুভব করতে পারি। বাতাসের মাধ্যমে চলার জন্য যেমন একটি নৌকাকে পাল তুলতে হয়, তেমনি আল্লাহর অবারিত ভালোবাসার মাধ্যমে জীবনের পথ চলতে হলে আমাদের হাত ও হৃদয়কে প্রার্থনা ও আত্মসমর্পণের দিকে বাড়িয়ে ধরতে হয়।
আপনার যা কিছু প্রয়োজন, তা ইতোমধ্যেই পেয়ে গেছেন
সুবিশাল বিশ্বজগতের মধ্যে আপনি একটি ক্ষুদ্র বিশ্বজগৎ। আপনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের একটি প্রতিফলন। আল্লাহর অনুগ্রহ প্রতিটি মুহূর্তে আপনার সাথেই রয়েছেন। আপনি যে-ই হন, যেখানেই থাকুন, তিনি আপনার খুব নিকটে রয়েছেন। তাঁর কাছে কোনো কিছুর অভাব নেই। প্রাণসম্পন্ন সবকিছুই তাঁর প্রাণের প্রতিফলন। অস্তিত্বশীল সবকিছুই তাঁর একত্বের প্রতিফলন। আপনি যা চান, তা ইতোমধ্যেই আপনার ভেতরে রয়েছে। ইসলামের বিধানগুলো কেবল আপনার সীমাবদ্ধতাকে দূর করে দেয়, যাতে আপনি আল্লাহর ভালোবাসাকে গ্রহণ করার উপযুক্ত হতে পারেন।
আল্লাহর নামগুলো ইতোমধ্যে আমাদের হৃদয়ের জমিনে রোপিত হয়ে আছে। আমাদের কাজ হলো-আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সেই জমিনে পানি সিঞ্চন করা। জান্নাত সেই জায়গা নয়, যেখানে আমরা মৃত্যুর পিঠে চড়ে পৌঁছাই; বরং জান্নাতকে আমরা নিজেদের ভেতরেই বহন করে চলেছি। ভবিষ্যতের জান্নাতকে অর্জন করার জন্য আমাদের ইবাদত করতে বলা হয়নি; বরং আমাদের ইবাদত করতে বলা হয়েছে আল্লাহর ভালোবাসার গুণগুলো প্রয়োগের মাধ্যমে দুনিয়াতেই জান্নাতের প্রতিফলন ঘটানোর জন্য।
আপনার জীবনের উদ্দেশ্য
আপনার জীবনের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহকে জানা, আল্লাহকে ভালোবাসা ও আল্লাহর ইবাদত করা। দৃশ্যমান সমগ্র সৃষ্টিজগৎ আল্লাহর অসীম চেহারার প্রতিফলন। আল্লাহ কাবা ঘরের ভেতর লুকিয়ে রয়েছেন-বিষয়টি এমন নয়; বরং তিনি সর্বদা আরশে আজিমে অধিষ্ঠিত তার কুরসি পরিব্যাপ্ত করে আছে সমস্ত আকাশ-কমিন।
আল্লাহ তাঁর সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্যের প্রতিফলন হিসেবে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি দুনিয়াতে আপনাকে প্রেরণ করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য, নিজেকে জানার জন্য, জীবনের পবিত্রতা রক্ষার জন্য, অসহায়কে সাহায্য করার জন্য এবং হৃদয় দিয়ে সকল মানুষ ও সৃষ্টিকে ভালোবাসার জন্য। আল্লাহ আপনার জীবনের কলসকে তাঁর অপার করুণার পানি দিয়ে পূর্ণ করে দিয়েছেন, যাতে আপনি পিপাসার্ত হৃদয়গুলোকে ভালোবাসার পানি সরবরাহ করতে পারেন।
আল্লাহর আপনাকে পড়ে যাওয়া মানুষের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে বলেছেন, অসুস্থ মানুষের জন্য ডাক্তারের ভূমিকা পালন করতে বলেছেন। আল্লাহর ভালোবাসা ও অনুগ্রহকে শুধু বিশ্বাসীদের নিকট নয়, নির্বিশেষে সকল মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতে বলা হয়েছে। আর এজন্য আপনার কমফোর্ট জোন থেকে আপনাকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং দিশাহীন, নৈরাশ্যের অন্ধকারের যাত্রীদের জন্য আলোকবর্তিকার ভূমিকা পালন করতে হবে।
মহান আল্লাহ বলেন- 'আল্লাহর পথে চেষ্টা-সাধনা করো তোমার জান ও মাল দিয়ে।' (সূরা আস-সফ : ১১)। কিন্তু আপনি যা বিশ্বাস করেন, তা অপরকেও বিশ্বাস করানোর বাধ্যবাধকতা আপনার ওপর আরোপিত হয়নি। আপনি আপনার বিশ্বাসকে সংহত করুন। মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিন, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। মানুষকে আল্লাহর ভালোবাসার দিকে আহ্বান করুন এবং তাদের নিজেদের পথ নিজেদের ঠিক করে নেওয়ার সুযোগ দিন। সকল মানুষের কান্নার ভাষা এক, সকল মানুষের রক্তের রং এক। কাজেই দুনিয়াতে আল্লাহর ভালোবাসার প্রবাহের ব্যাপারে বিশ্বাসের ভিত্তিতে বৈষম্য করা নয়।
মুসলিম হতে হলে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষ-গরিব, অভাবগ্রস্ত, বিপদাপন্ন, অসুস্থ, দুঃখী, দুর্বল, ইয়াতিম, ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী-সকলের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। মুসলিম কখনো বর্ণান্ধ হতে পারে না; বরং মানুষের বৈচিত্র্যের ভেতর সে আল্লাহর নিদর্শন দেখতে পায়।
'আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের ভিন্নতা। নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য।' (সূরা রূম: ২২)। সকল মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি। কাজেই কী করে এক মানুষের তুলনায় অন্য মানুষ বেশি মূল্যবান হতে পারে-যেখানে একই আল্লাহ তাঁর একই নিশ্বাসকে একই রকমভাবে সবার ভেতরে ফুঁকে দিয়েছেন? কাজেই মানুষে মানুষে বাহ্যিক প্রভেদকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। নির্বিশেষে সকল মানুষকে আল্লাহর নিঃশর্ত ভালোবাসার প্রবাহের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে এবং তাদের ওপর সেই ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
আমরা একের ভেতরে বহু। আমরা একটি বীজ থেকে উৎসারিত বহু ফলের সমাহার। কাজেই আপনি যে-ই হন, যেখানেই থাকুন, আমি আপনাকে ভালোবাসি। আমি কী করে কাউকে ভালো না বেসে পারি, যে ভালোবাসা থেকেই তৈরি? আমি কী করে ভালোবাসাকে না ভালোবেসে পারি?
আল্লাহ তায়ালা ঠিক আপনাকেই বলছেন-
'তোমরা ভয় করো না। আমি তো তোমাদের সাথেই আছি। আমি সবকিছু শুনি ও দেখি।' (সূরা ত্ব-হা: ৪৬)।
মহান আল্লাহ ঠিক আপনাকেই বলছেন-
'আমি তোমাকে আমার নিজের জন্য তৈরি করেছি।' (সূরা ত্ব-হা: ৪১)।
আল্লাহ বলেননি, দুনিয়ার জীবন আপনার জন্য কুসুমাস্তীর্ণ হবে। তবে তিনি বলেছেন-
'আর ধৈর্যধারণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।' (সূরা আনফাল : ৪৬)।
আপনি বিপদে পড়বেন; দুঃখ, কষ্ট ও বেদনা আপনাকে তাড়িত করবে। আপনাকে নানাভাবে পরীক্ষা করা হবে। কিন্তু ভয় পাবেন না। কেননা, আল্লাহ আপনার পাশেই রয়েছেন। প্রিয়নবি মুহাম্মাদ ﷺ খুব সুন্দরভাবে বলেছেন-
'আল্লাহর বিধিনিষেধের রক্ষা করবে, আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ রাখবে, তাহলে আল্লাহকে তুমি কাছে পাবে। তোমার কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে আল্লাহর নিকট চাও, আর সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে আল্লাহর নিকটই করো। আর জেনে রেখো, যদি সমগ্র জগৎ তোমার কোনো উপকারের উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে তারা তোমার ততটুকু উপকারই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। অপরদিকে যদি সমগ্র জগৎ তোমার কোনো ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে একতাবদ্ধ হয়, তাহলে ততটুকু ক্ষতিই করতে সক্ষম হবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং লিখিত কাগজসমূহ শুকিয়ে গেছে।' ১৯৫
আল্লাহ আপনার নিয়ে এক নিখুঁত প্রেমের গল্প লিখেছেন। আপনি যা কিছুর মুখোমুখি হন, যত পাহাড়, সমুদ্র বা মরুভূমি আপনার সামনে এসে দাঁড়ায়, সবকিছুই আপনার সামনে এ কারণে রাখা হয়েছে, যাতে আপনি নিজেকে এবং আপনার প্রভুকে জানতে পারেন। প্রতিটি আনন্দ-ব্যথা, প্রতিটি সাফল্য-ব্যর্থতা, প্রতিটি চড়াই-উতরাই আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। আপনার সামনে যা আসে, তার মধ্যে আল্লাহর দিকে ফেরার আহ্বান লুকিয়ে আছে।
আল্লাহ আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছেন। তিনি আপনার কণ্ঠের শিরার চাইতেও নিকটে অবস্থান করেন। তিনি আপনার ফুসফুসের নিশ্বাসের চাইতেও কাছে রয়েছেন। আল্লাহ এখানেই, তিনি আপনার অতি নিকটে, আপনার জন্য অপেক্ষমাণ। কাজেই তাঁর কাছে ফিরে আসতে এক মুহূর্তও বিলম্ব করবেন না।
‘হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি ফিরে এসো তোমার রবের প্রতি সন্তুষ্টচিত্তে, সন্তোষভাজন হয়ে।’ (সূরা ফাজর: ২৮)।
আল্লাহর কাছে আপনি গুরুত্বপূর্ণ এবং তিনি আপনাকে শর্তহীনভাবে ভালোবাসেন। আল্লাহ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে, সুপরিকল্পিতভাবে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন। কাজেই আল্লাহর কাছে ফিরে আসুন। আপনি যত দূরেই যান না কেন, যত নষ্টই হন না কেন, আল্লাহ তাঁর ক্ষমা ও ভালোবাসা নিয়ে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। আল্লাহকে ভালোবাসতে দিন, আপনার ব্যথাগুলোকে উপশম করতে দিন, আপনার আত্মার ভেতরে থাকা মণি-মুক্তোগুলোকে অবমুক্ত করার সুযোগ দিন। আপনি যখনই পথভ্রষ্ট হন, তখনই আল্লাহর কাছে ফিরে আসুন। আপনি যখনই হোঁচট খেয়ে পড়ে যান, তখনই আল্লাহর কাছে ফিরে আসুন। ফিরে আসুন আল্লাহর ভালোবাসার সাগরের কাছে এবং তাঁর সীমাহীন দয়া ও অনুগ্রহের ঢেউকে আলিঙ্গন করুন।
টিকাঃ
১৯৫. তিরমিজি