📘 সিক্রেটস অব ডিভাইন লাভ > 📄 জাকাত : আল্লাহর দান বিতরণ

📄 জাকাত : আল্লাহর দান বিতরণ


যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি সাধন ও নিজেদের মনে (ঈমানের) দৃঢ়তা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের তুলনা সেই বাগানের ন্যায়-যা উচ্চভূমিতে অবস্থিত, তাতে মুষলধারে বৃষ্টিপাতের ফলে দ্বিগুণ ফল ধরে। যদি তাতে বৃষ্টিপাত না-ও হয়, তবে শিশিরবিন্দুই যথেষ্ট। তোমরা যা কিছুই করো, আল্লাহ তার সম্যকদ্রষ্টা। সূরা বাকারা : ২৬৫
তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করবে, যা নিজের জন্য পছন্দ করো।

যখন আপনার কাছে এমন কিছু আছে-যা অপর কোনো ব্যক্তির প্রয়োজন, তখন সেই ব্যক্তির প্রার্থনার জবাব আল্লাহ আপনার মাধ্যমে দেন। যখন অপরের কোনো প্রয়োজন পূরণের প্রশ্নে আপনি 'হ্যাঁ' বলেন, তখন আপনি আল্লাহর ভালোবাসা, বদান্যতা, উদারতা ও প্রাচুর্যের উপকরণে পরিণত হয়ে যান। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমরা কখনো কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তা ব্যয় করবে-যা তোমরা ভালোবাসো।' সূরা আলে ইমরান: ৯২
আল্লাহ আমাদের প্রিয়বস্তুগুলো দান করতে বলেছেন। কারণ, সৃষ্টিকে ভালোবাসা হলো আল্লাহকে ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন-
'সে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, যে মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।'

কেবল দুআ ও প্রশংসাবাণী উচ্চারণের মাধ্যমে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায় না; বরং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আপনাকে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দানশীল ও সহানুভূতিশীল হতে হবে। আল্লাহ কুরআনে দুই ধরনের দানের কথা বলেছেন: সাদাকা ও জাকাত। সাদাকা হলো সেই দান, যা আদায় করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। আর জাকাত হলো সেই দান, যা আদায় করা বাধ্যতামূলক।
সাদাকা হলো অপরের কল্যাণার্থে খাঁটি সংকল্পের ভিত্তিতে প্রদান করা উপহার। অন্যদিকে জাকাত হলো একটি বাধ্যতামূলক কাজ, যা শর্তহীনভাবে আল্লাহর বান্দাদের নিকট বিতরণ করতে হয়।
'একজন মুমিন কোনো গাছ রোপণ করলে বা কোনো বীজ বপন করলে সেই গাছ থেকে পাওয়া ফল যখন অন্য মানুষ ও পশুপাখি খায়, তখন সেটি মুমিনের দান হিসেবে গণ্য হয়।'

কেবল অর্থদানই সাদাকা নয়; বরং কল্যাণকর যেকোনো কাজ করা বা সেই কাজটিকে উৎসাহ দেওয়া বা কোনো কল্যাণকর কাজে অংশ নেওয়াও সাদাকা। তাই রাস্তা থেকে ক্ষতিকর কোনো কিছু সরিয়ে দেওয়া, বয়স্ক লোকদের সাথে ধৈর্যপূর্ণ আচরণ করা, অন্ধ লোককে পথ দেখানো-সবই সাদাকার অংশ। এমনকী মহানবি ﷺ বলেছেন-
'তোমার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দেওয়াও একটি সাদাকা।'
হতাশ ব্যক্তিকে আশা দেওয়া, বেদনার্ত ব্যক্তির প্রতি মমতা প্রদর্শন করা, দুর্বলের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা, মজলুমের পক্ষে কণ্ঠ উচ্চকিত করা এবং নির্বিশেষে সকলের প্রতি হাসি ও আনন্দ উপহার দেওয়া-এ সবই সাদাকার অন্তর্ভুক্ত।

কথা বলার মাধ্যমে সাদাকা
মুহাম্মাদ ﷺ বলেছেন-'একটি সুন্দর কথা একটি সাদাকা।' আমাদের কথা বলার সক্ষমতা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি উপহার। কাজেই আমাদের জিহ্বাকে বাজে ও বেহুদা কথা, গিবত ও ক্ষতিকর কথা থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। সুফিরা বলেন-
'কোনো কথা বলার আগে কথাটিকে তিনটি দরজা দিয়ে অতিক্রম করাও। প্রথম দরজায় নিজেকে প্রশ্ন করো-এটি কি সত্য? দ্বিতীয় দরজায় নিজেকে প্রশ্ন করো-এটি কি প্রয়োজনীয়? এবং তৃতীয় দরজায় প্রশ্ন করো-এটি কি কল্যাণকর?'
আমাদের কথা বলার সক্ষমতাকে অবশ্যই অন্যদের প্রেরণা, উৎসাহ ও পথনির্দেশ প্রদানের কাজে ব্যয় করতে হবে। প্রতিটি কথারই একটি শক্তি রয়েছে। তাই তো আলি বলেন-
'কেবল তখনই কথা বলো, যখন তোমার বলা কথা নীরবতার চেয়ে বেশি সুন্দর হয়।'
সৃষ্টিজগতের সবকিছু অস্তিত্বশীল হয়েছে আল্লাহর কথা 'হও'-এর মাধ্যমে। অতএব খেয়াল রাখুন, আপনার জিহ্বা হলো একটি ছুরির মতো। এ জিহ্বা কাউকে হত্যা করতে পারে, আবার ডাক্তারের হাতে পড়লে তা দিয়ে কারও প্রাণ রক্ষাও পেতে পারে।

জাকাত : আপনার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহের করো
প্রয়োজনমাফিক অভাবগ্রস্তদের প্রতি দানের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি, দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে সামর্থ্যবান মুসলিমদের বছরে একবার সকল সম্পদের শতকরা ২.৫ ভাগ গরিবদের দান করার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তাকে জাকাত বলা হয়। এক্ষেত্রে একটি বিষয় হলো-জাকাত প্রদান করা তার জন্যই অবশ্য কর্তব্য, যার সারা বছরের ব্যয় মেটানোর পর নিসাব পরিমাণ সম্পদ উদ্বৃত্ত থাকে। জাকাত কেবল ৮ ধরনের মানুষকে দেওয়া যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'জাকাত তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত, জাকাত বিতরণের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য, ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদকারী ও মুসাফিরের জন্য। এ আল্লাহর বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' সূরা তাওবা : ৬০
তবে জাকাত বা সাদাকা যা-ই হোক না কেন, তা অবশ্যই বৈধ পথে উপার্জিত (হালাল) হতে হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, নিজ পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূর্ণ করার পরই কেবল জাকাত প্রদান করা বাধ্যতামূলক। এটি সাধারণ কোনো দান নয়; বরং আমাদের ওপর আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহের করো, যা সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য ব্যয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জাকাতের আরেকটি অর্থ হলো-'যা পরিশুদ্ধ করে'। শরীর থেকে যেমন বর্জ্য পদার্থ বেরিয়ে গেলে শরীর পবিত্র হয়, তেমনি জাকাত পুরো সম্পদকে পবিত্রতা দান করে।
'তোমাদের নিজেদের কল্যাণে ব্যয় করো। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।' সূরা আত-তাগাবুন: ১৬
কৃতজ্ঞতা ও ঈমানের শত্রু হলো লোভ। এজন্য রাসূলুল্লাহ বলেছেন- 'আমি এ ভয় করি না যে, আমার মৃত্যুর পর তোমরা অন্য কারও উপাসনা শুরু করে দেবে; বরং এ ভয় করি, তোমরা দুনিয়াবি সম্পদের জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।'
আমরা যখন অপরকে দান করি, তখন বস্তুগত দুনিয়ার প্রতি আমাদের আকর্ষণের বাঁধন ঢিল হতে শুরু করে। জাকাত সমাজে সম্পদ প্রদান ও গ্রহণের মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে। আমরা যদি নিশ্বাস গ্রহণ করি, কিন্তু না ছাড়ি, তাহলে আমাদের শরীরে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে, জাকাত না প্রদান করলে সমাজে একই রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। জাকাত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের প্রতি একটি অনুগ্রহ। কেননা, জাকাতের মাধ্যমে আমার আমাদের ধন-সম্পদকে পরিশুদ্ধ করি। আমরা আমাদের প্রবৃত্তিকে যত কম তৃপ্ত করব, আমাদের আত্মা ততই আধ্যাত্মিক পথে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের কাছে যা কিছু আছে, তার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নিকটবর্তী হই না; বরং যা কিছু আমরা দান করি, তার মাধ্যমেই আল্লাহর নিকটবর্তী হই। যেহেতু আমাদের কাছে যা কিছু আছে তার সবই ধ্বংসশীল, সেহেতু যা কিছু আমরা দান করে দিই, কেবল তা-ই আমাদের জন্য থেকে যায়।

মুহাম্মাদ ও তাঁর স্ত্রীর কথোপকথনের মাধ্যমে এ কথাটি অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। একবার রাসূল -এর স্ত্রী একটি জবাই করা ভেড়ার গোশত বিলিয়ে দিলেন। রাসূল তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন-'কিছু কি বাকি আছে?' স্ত্রী জবাবে বললেন-'এটির ঘাড় ছাড়া কোনো কিছু আর অবশিষ্ট নেই।' রাসূল জবাবে বললেন-'এর সবকিছুই আছে (আল্লাহর হিসাবে), এর ঘাড়টি ছাড়া।' রাসূলুল্লাহ বলতে চেয়েছেন-যা কিছু আমরা আল্লাহর পথে দান করি, প্রকৃতপক্ষে সেগুলোই কেবল রয়ে যায়।
আমরা এ জগতে যে সৎকর্মের বীজ বপন করি, তা কখনো নষ্ট হয়ে যায় না; বরং সেগুলো মৃত্যুপরবর্তী জগতে আমাদের জন্য বিশাল সঞ্চয় হয়ে দেখা দেবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'অতএব, তোমাদের যা দেওয়া হয়েছে, তা পার্থিব জীবনের ভোগ মাত্র। আর যা আল্লাহর কাছে রয়েছে, তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী। এগুলো তাদের জন্য, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের পালকর্তার ওপর ভরসা করে।' সূরা আশ-শূরা: ৩৬
আমরা যখন কবরে প্রবেশ করব, তখন আমাদের সঞ্চিত ধন-সম্পদ আমাদের সাথে যাবে না; বরং যে দান ও সৎ কাজ দুনিয়াতে করব, তা-ই আমাদের সাথে যাবে।
'দান সম্পদ কমায় না।'
জাকাত শব্দটির যে শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে, তার অর্থ-বৃদ্ধি, বহুগুণ ইত্যাদি। আমরা যখন আল্লাহর জন্য দান করি, তখন মূলত আমরা আল্লাহর উদারতা ও দয়ার জন্য নিজের দরজা খুলে দিই এবং আরও সম্পদ প্রাপ্তির জন্য নিজেকে উপযুক্ত করে তুলি। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'বলো, আমার প্রতিপালক তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিজিক প্রশস্ত করে দেন, আর যার জন্য ইচ্ছা সীমিত করেন। তোমরা যা কিছু (সৎ কাজে) ব্যয় করো, তিনি তার বিনিময় দেবেন। তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ রিজিকদাতা।' সূরা সাবা : ৩৯
এ আয়াতে আল্লাহ দানের বিনিময় দেবেন বলেছেন। অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, তিনি বিনিময় হিসেবে বহুগুণ বেশি দান করবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'এমন কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে-ফলে তিনি তার জন্য বহুগুণে বাড়িয়ে দেবেন? আর আল্লাহ সংকীর্ণ ও প্রসারিত করেন এবং তাঁরই নিকট তোমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে।' সূরা বাকারা: ২৪৫

আপনার জাকাতের মালিক আপনি নন
প্রদানকারীকে নয়; বরং গ্রহণকারীকেই জাকাতের মালিক বলা হয়। কারণ, আল্লাহ অভাবগ্রস্তদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে চান। জাকাত কোনো দান নয়; বরং এটি গরিবের পাওনা। যতক্ষণ এটি পরিশোধ না করছেন, ততক্ষণ আপনি দায়মুক্ত নন। জাকাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যা কিছু উপার্জন করি, তার মালিক আমরা নই; বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া আমাদের জন্য ঋণ। যখন আমরা কাউকে কোনো কিছু দান করি, তখন নিজের থেকে দিই না; বরং আল্লাহর দেওয়া সম্পদ থেকে দিই। আমরা আমাদের সম্পদের মালিক নই; বরং আল্লাহর সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক মাত্র।

সুফি-সাধকরা বলেন, ‘ইসলামের চারটি মাত্রা রয়েছে। যথা— ১. যা আমার, তা আমার এবং যা তোমার, তা তোমার। ২. যা আমার, তা তোমার এবং যা তোমার, তাও তোমার। ৩. কোনো কিছুই আমার নয়, তোমারও নয়। ৪. আমার ও তোমার বলতে কিছু নেই; শুধু রয়েছে আমাদের।
কাজেই আপনি যদি আমাকে কিছু দান করেন, তবে প্রকৃতপক্ষে আপনি আমাকে দান করছেন না; বরং আল্লাহই আমাদের দান করছেন। দান গ্রহণের সময় আমি আল্লাহর আর রাজ্জাক নামের স্বাদ অনুভব করি, আর দান করার সময় আপনি আল্লাহর আল কারিম নামের স্বাদ অনুভব করেন।
নিজের উদারতার মালিকানা দাবি করবেন না। কেননা, আমাদের উদারতা হলো আল্লাহর উদারতারই বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ তায়ালা বলেন— ‘হে ঈমানদারগণ! দানের কথা মনে করিয়ে দিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে তোমরা নিজেদের দানকে সে ব্যক্তির ন্যায় ব্যর্থ করে দিয়ো না, যে নিজের ধন ব্যয় করে লোক দেখানোর জন্য।’ সূরা বাকারা : ২৬৪

মনে রাখতে হবে, এ জগতের সেবায় নিয়োজিত হওয়ার সুযোগ দিয়ে আল্লাহ আমাদের ধন্য করেছেন। আমাদের দানের তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই; বরং দান করার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করা আমাদেরই প্রয়োজন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান করো, তবে তা উত্তম। আর যদি গোপনে করো এবং অভাবগ্রস্তদের দান করো, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম; অধিকন্তু তিনি তোমাদের কিছু গুনাহ মোচন করে দেবেন। বস্তুত যা কিছু তোমরা করছ, আল্লাহ তার খবর রাখেন।' সূরা বাকারা : ২৭১
গোপন দান দান-গ্রহীতার মর্যাদা সমুন্নত রাখে এবং দাতাকে অহংকার থেকে সুরক্ষা দেয়। দান করার সুযোগ পাওয়ার জন্য দাতারই উচিত আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা। যদি কেউ অভাবগ্রস্ত না হতো, তাহলে আমরা আল্লাহর উদারতা, মমতা ও ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ পেতাম না। তাই অভাবগ্রস্তদের দান করতে পারাই সৌভাগ্যের ব্যাপার।

আল্লাহ আমাদের যে অনুগ্রহ করেছেন, তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে অপরের প্রতি সেবামূলক কাজের মাধ্যমে। যখন আমরা অন্যের সেবা করি, তখন নিজের ভেতরের দয়া ও মমতার বীজে পানি সিঞ্চন করি। মহান আল্লাহ বলেন-
'তোমরা ভালো কাজ করলে নিজেদের কল্যাণের জন্যই তা করবে।' সূরা বনি ইসরাইল : ৭
আমরা যখন অপরকে দান করি, তখন মূলত নিজেকেই দান করি এবং আল্লাহর দৃষ্টিতে নিজের মর্যাদাকে সমুন্নত করি; যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'হে আদমসন্তন! তোমরা ব্যয় করো, আমি তোমাদের জন্য ব্যয় করব।'

দানের প্রতিটি কণাই মূল্যবান
দান করতে গিয়ে আমাদের মনে হতে পারে, মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় আমার সামর্থ্য তো নেহায়েত তুচ্ছ। সামান্য সামর্থ্য দিয়ে কী করে মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসব! এমন অনুভূতি সৃষ্টি হলে খেয়াল করতে হবে, সবকিছুর সৃষ্টি খুব ক্ষুদ্র অবস্থা থেকেই হয়ে থাকে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মাটির কণা থেকে পাহাড়ের সৃষ্টি হয়। অতি ক্ষুদ্রাকৃতির ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলনে মানবশিশু অস্তিত্ব লাভ করে। এমনকী যে বিগব্যাংয়ের মাধ্যমে মহাশূন্যে এ বিশ্বের অস্তিত্ব সৃষ্টি হয়েছে, তার আকৃতি একটি মটর দানার সমান। একটি খাঁটি হৃদয় ও নিষ্কলুষ সংকল্প থেকে আল্লাহ যা সৃষ্টি করতে পারেন-তা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, তাকে অবমূল্যায়ন করবেন না। যেমনটি আলি বলেছেন-
'আল্লাহর সাথে ব্যাবসা করো, তুমি অবশ্যই লাভবান হবে।'
পবিত্র কুরআনে একই কথা ধ্বনিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা উৎপন্ন করল সাতটি শিষ; প্রতিটি শিষে রয়েছে একশো দানা। আর আল্লাহ যাকে চান, তার জন্য বাড়িয়ে দেন এবং আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।' সূরা বাকারা: ২৬১
আল্লাহ আমাদের সাধ্য মোতাবেক দান করতে বলেছেন। মহান আল্লাহ বলেন- 'সচ্ছল ব্যক্তি তার সচ্ছলতা অনুসারে ব্যয় করবে। আর যার রিজিক সীমিত করা হয়েছে, সে ব্যয় করবে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে। আল্লাহ তাকে যতটা দিয়েছেন, তার অতিরিক্ত বোঝা তার ওপর চাপান না। আল্লাহ কষ্টের পর আরাম দেন।' সূরা তালাক: ৭
আজ যে ছোট্ট পদক্ষেপ আমরা ফেলছি, আগামীকাল তা কয়েক মাইল দূরের পথ পাড়ি দেবে। আপনার অর্থ দান করুন, সময় দান করুন। অর্থাৎ আপনার দান করা উচিত-এমন সবকিছু দান করুন। কেননা, আপনি কেবল শূন্য ও রিক্ত অবস্থায়ই আল্লাহর সীমাহীন অনুগ্রহের স্বাদ অনুভব করতে পারবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তিনি তোমাদের সেসব কিছুই দান করেছেন, যা তোমরা চেয়েছ (তোমাদের প্রয়োজনের সবকিছু পেয়েছ)। আর তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করতে চাইলে কখনো তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। মানুষ অবশ্যই বড়োই জালিম, বড়োই অকৃতজ্ঞ।' সূরা ইবরাহিম : ৩৪
মনে রাখা দরকার-যা কিছু আমরা আল্লাহর পথে দান করছি, তা ক্ষয়িষ্ণু ও ভঙ্গুর। কিন্তু বিনিময়ে আল্লাহ আমাদের যা কিছু দান করবেন, তা চিরস্থায়ী ও অসীম। বৃষ্টির একটি ফোঁটাকেও যেমন সাগর অভিবাদন জানায়, তেমনি আমাদের সামান্য দানেও আল্লাহ খুশি হন। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'অতএব, কেউ অণু পরিমাণও সৎ কাজ করলে সে তা দেখবে, আবার কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কাজ করলেও সে তা দেখবে।' সূরা জিলজাল : ৭-৮
কাজেই কোনো ভালো কাজই তুচ্ছ নয়। আলি বলেন- 'তোমার দান যদি সামান্যও হয়, তুমি লজ্জা পেয়ো না। কারণ, অভাবগ্রস্তকে ফিরিয়ে দেওয়া আরও বেশি লজ্জার।'
আল্লাহর দৃষ্টিতে কোনো সৎকর্মই ছোটো নয়। মহানবি বলেছেন- 'প্রতিটি প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের পুরস্কার রয়েছে।'
আমরা হয়তো সামান্য দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে পৃথিবীকে বদলে দিতে পারব না, তবে আমরা যতই ভালোবাসা রোপণ করব, ততই সুগন্ধি ফুল ফুটতে থাকবে। তাই তো রাসূলুল্লাহ বলেছেন- 'জেনে রেখ, আল্লাহর কাছে তোমাদের সেই সৎকর্ম বেশি পছন্দনীয়- যা ছোটো, কিন্তু তোমরা নিয়মিত করে থাকো।'

দানের সুফলের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
দান কেবল আমাদের চেতনাকেই জাগ্রত করে না; বরং শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তিও এনে দেয়। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ-এর কিছু গবেষক আবিষ্কার করেছেন, দান মানুষের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সেন্টারকে উদ্দীপিত করে, যেটি Mesolimbic Pathway নামে পরিচিত। আমরা যখন অপরকে দান করি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক থেকে Dopamine I Endorphins হরমোন নির্গত হয়, যা মস্তিষ্কে ব্যথার সিগন্যাল যেতে বাধা দেয় এবং সৎকর্মের সুখানুভূতি সৃষ্টি করে। ফলে আমরা গভীর প্রশান্তি বোধ করি। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দান করলে আমাদের আয়ু বৃদ্ধি পায়, মানসিক অবস্থা দৃঢ় হয়, সামাজিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পায় এবং মানসিক চাপ কমে যায়। উপরন্তু দান করলে এর প্রতি আকর্ষণ আমাদের চারপাশের অন্যান্য লোকের মধ্যেও দেখা যায়। ফলে পুরো সমাজের ওপরই দানের একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। এ কারণে যখন আমরা হতাশা বোধ করি, নিরুৎসাহিত হয়ে যাই, জীবনের মানে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হই, তখন বেশি বেশি দান করতে বলা হয়েছে—
যারা স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে, তাদের জন্য সেই দানের পুরস্কার রয়েছে তাদের প্রভুর কাছে। তাদের কোনো ভয় নেই, আর তারা চিন্তিতও হবে না। সূরা বাকারা : ২৭৪

আমাদের জীবনের অধিকাংশ দুশ্চিন্তার জন্ম হয় নিজের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্বারোপের গর্ভ থেকে। যেমনটি একজন স্কলার বলেছেন—
‘নিজেকে নিয়ে কম চিন্তা করার নাম বিনয় নয়; নিজেকে “কম” চিন্তা করার নামই বিনয়।’
যখন আমরা নিজের দৃষ্টিকে বৃহত্তর ক্যানভাসের ওপর নিবদ্ধ করি, তখন মাথা থেকে বিশাল বোঝাগুলো একে একে নেমে যেতে থাকে। তাই যখনই আমরা দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ বোধ করব, তখনই কিছু না কিছু দান করব। কারণ, আমরা যখন নিজেদের ওপর করা অনুগ্রহগুলোকে অপরের সাথে ভাগ করে নেব, তখন প্রকৃতপক্ষে নিজেরই উপকার করব। এজন্যই প্রবাদ আছে—
'If you want to go fast, go alone; but if you want to go far, go together. অর্থাৎ যদি দ্রুত যেতে চাও, তবে একাকী চলো; কিন্তু যদি অনেক দূর যেতে চাও, তাহলে অপরের সাথে চলো।'

মানুষের প্রশংসার জন্য দান নয়
আলি বলেছেন- 'দুনিয়াতে এমনভাবে বাস করো, যেন দুনিয়া তোমার ভেতর প্রবেশ করতে না পারে। কারণ, একটি নৌকা যখন পানির ওপর থাকে, তখন নৌকাটি ভালোভাবে চলে; কিন্তু নৌকার ভেতর পানি উঠলে সেটি ডুবে যায়।'
জাকাত ও সাদাকা হলো আমাদের হৃদয়ের জাহাজে অনুপ্রবেশ করা লোভ, কৃপণতা ও আত্মকেন্দ্রিকতাকে ফেলে দেওয়ার নামান্তর। যে ব্যক্তি খ্যাতি অর্জনের জন্য নয়; বরং আল্লাহর সামনে নিজেকে পরিশুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরার জন্য দান করে, তার ঈমানের জাহাজ চলমান থাকে। যেমনটি আল্লাহ বলেছেন-
'যে তার সম্পদ দান করে আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে, আর তার প্রতি কারও এমন কোনো অনুগ্রহ নেই-যার প্রতিদান দিতে হবে-কেবল তার মহান রবের সন্তুষ্টির প্রত্যাশায়; আর অচিরেই সে সন্তোষ লাভ করবে।' সূরা লাইল: ১৮-২১
সুনাম ও খ্যাতি অর্জনের জন্য নয়; বরং আমাদের কেবল আল্লাহর ভালোবাসার প্রতিফলন হিসেবে দান করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তারা বলে-"আমরা তো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের খাদ্য দান করি। আমরা তোমাদের থেকে কোনো প্রতিদান চাই না এবং কোনো শোকরও করি না।"' সূরা আদ-দাহর : ৯

সূর্য পৃথিবীকে যেভাবে দান করে
জাকাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আল্লাহই একমাত্র দাতা এবং তিনিই একমাত্র চিরস্থায়ী। কারণ, 'আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর (সূরা আন-নুর: ৬৪)।' যেহেতু সবকিছু আল্লাহরই সৃষ্টি এবং সবকিছু আল্লাহর কাছেই ফিরে যাবে, তাহলে এ জগতের কোন জিনিসটির মালিক আমরা? আমরা এ দুনিয়ার তত্ত্বাবধায়ক মাত্র; এর বেশি কিছু নই। কোনো বৈষম্য না করে নির্বিশেষে সকল মানুষের প্রতি আল্লাহ যে করুণা করেছেন, তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং অপরের সাথে তা ভাগাভাগি করে নেওয়াই আমাদের কাজ।
মহানবি বলেছেন- 'সেই ব্যক্তি মুমিন নয়, যে তার উদরপূর্তি করে খায়, কিন্তু তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে।'
মুসলিম হিসেবে আমাদের দান করতে হবে তেমনভাবে, যেমনভাবে সূর্য পৃথিবীকে দান করে মুক্ত ও শর্তহীনভাবে। সূর্য কখনো পৃথিবীকে এ কথা বলে না যে, তুমি আমার কাছে ঋণী।
সকল মানুষ ও সৃষ্টজীব একটি শরীরের ভিন্ন ভিন্ন কোষের মতো। মহানবি বলেছেন- 'মুসলিম জাতি একটি শরীরের মতো। এর একটি অংশ বেদনা বোধ করলে সমগ্র শরীর বেদনা বোধ করে।'
এজন্যই পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে- 'যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে, সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে।' সূরা মায়েদা : ৩২
মানুষের সেবা করা মানে আল্লাহরই সেবা করা আর মানুষকে অবহেলা করার মানে আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। এটি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে মহানবি-এর একটি হাদিসে- 'আল্লাহ বলবেন-“হে আদমের সন্তান! আমি অসুস্থ ছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে দেখতে আসোনি।” মানুষ বলবে-“হে প্রভু! আমি কেমন করে আপনাকে দেখতে যেতাম, যেখানে আপনি সমগ্র বিশ্বজগতের প্রভু?” আল্লাহ বলবেন-“তুমি কি জানো না, আমার অমুক অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল, কিন্তু তুমি তাদের দেখতে যাওনি? তুমি কি জানতে না, যদি তাদের দেখতে যেতে, তাহলে তার সাথে আমাকেও পেয়ে যেতে? হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাকে খাদ্য দাওনি।” মানুষ বলবে-
"আমি আপনাকে কীভাবে খাওয়াব, যেখানে আপনি সমগ্র বিশ্বজগতের প্রভু?" আল্লাহ বলবেন-“তুমি কি জানো না, আমার অমুক অমুক বান্দা তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে খাদ্য দাওনি? তুমি কি জানো না, যদি তাদের খাদ্য দিতে, তাহলে আমাকে সেখানে পেতে?” আল্লাহ বলবেন-“হে আদম সন্তান! আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে পানি দাওনি।” মানুষ বলবে-“আমি আপনাকে কীভাবে পানি দেবো, যেখানে আপনি সমগ্র বিশ্বজগতের প্রভু?” আল্লাহ বলবেন- “তুমি কি জানো না, আমার অমুক অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে পানি দাওনি? তুমি কি জানো না, যদি তাদের পানি দিতে, তাহলে আমাকে সেখানে পেতে?”
এই হাদিসে আল্লাহ আমাদের স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন-যখন আমরা সৃষ্টির সেবা করি, তখন মূলত আল্লাহরই সেবা করি।

জীবন নিস্তরঙ্গ নয়; বরং সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। কখনো আমরা ঢেউয়ের চূড়ায় উঠে যাই, কখনো-বা পড়ে যাই গভীর খাদে। কখনো আনন্দ ও প্রাপ্তি জীবনকে রাঙিয়ে দেয়, কখনো বিপদ ও হতাশা জীবনকে গ্রাস করে ফেলে। জীবনের অন্ধকার রাতগুলোতে যখন আমরা ভেঙে পড়ি, অসহায় বোধ করি, চাকরি হারাই, অর্থসংকটে পড়ি, ঋণগ্রস্ত হই বা চরম বিপদে নিপতিত হই, তখন জাকাত ও সাদাকা আমাদের জন্য নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করে। আমাদের ভাইদের প্রদত্ত জাকাত ও সাদাকা আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে, আমাদের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখে।
'কোন কাজ সর্বোত্তম? কোনো মানুষের হৃদয়কে খুশি করে দেওয়া, ক্ষুধার্তকে আহার করানো, দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করা, দুঃখী মানুষের দুঃখ লাঘব করা, আহতের কষ্ট দূর করা।'

টিকাঃ
১৪৫. আবু দাউদ
১৪৬. মুসলিম
১৪৭. তিরমিজি
১৪৮. বুখারি, মুসলিম
১৪৯. বুখারি
১৫০. তিরমিজি
১৫১. মুসলিম
১৫২. Safi, Omid. Radical Love: Teachings from the Islamic Mystical Tradition, Yale University Press, 2018
১৫৩. বুখারি
১৫৪. মুসলিম
১৫৫. বুখারি, মুসলিম
১৫৬. Bea, Scott. 'Why Giving Is Good for Your Health.' Health Essentials from Cleveland
১৫৭. Suttie, Jill, and Jason Marsh. '5 Ways Giving Is Good for You.' Greater Good, December 13, 2010
১৫৮. Swalin, Rachel. '4 Health Benefits of Being Generous.' Health.com, December 2. 2014
১৫৯. আল কুবরা, ইবনে আব্বাস
১৬০. বুখারি, মুসলিম
১৬১. হাদিসে কুদসি। হাদিসে কুদসি হলো এমন হাদিস-যার মূল কথাগুলো আল্লাহর, কিন্তু বর্ণিত হয়েছে রাসূল-এর ভাষায়।

📘 সিক্রেটস অব ডিভাইন লাভ > 📄 রমজান : আত্মশুদ্ধির মাস

📄 রমজান : আত্মশুদ্ধির মাস


রমজান মাসই হলো সে মাস, যাতে নাজিল হয়েছে কুরআন-যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সত্য পথের সুস্পষ্ট পথনির্দেশ। সূরা বাকারা : ১৮৫
রোজা আমাদের শরীরকে বেঁধে রাখে, যেন আমরা আত্মার চক্ষুকে উন্মুক্ত করতে পারি। -জালালুদ্দিন রুমি

পবিত্র কুরআন মুহাম্মাদ -এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল চন্দ্রবছরের রমজান মাসের রহস্যময় রাত লাইলাতুল কদরে; যে রাত সম্পর্কে বলা হয়েছে-এটি 'হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।' সূরা কদর: ৩
কুরআনের অলৌকিকত্বকে উদ্যাপন করার জন্য সমগ্র রমজান মাস ধরে মুসলিমরা দিনের বেলা পানাহার ও যৌনকর্ম থেকে বিরত থেকে আত্মশুদ্ধির চর্চা করে। একে রোজা বলা হয়। রোজার আরবি প্রতিশব্দ সাওম। এ শব্দটি যে মূলশব্দ থেকে এসেছে, তার অর্থ-আত্মসংযম। অর্থাৎ রোজা হলো নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রবৃত্তির তাড়নাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রশিক্ষণ। শরীরের ওজন কমানোর নাম রোজা নয়; বরং রোজা হলো পাপের ভার কমানোর নাম।

আমরা যখন রোজা রাখি, তখন শারীরিক নয়; বরং মানসিক শক্তির উৎস থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করি। যেমনটি জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন- 'পাকস্থলীর শূন্যতার ভেতর একটি গোপন মিষ্টতা রয়েছে... যদি আমাদের সাউন্ডবক্স পুরোপুরি ভরা থাকে, তাহলে তা আত্মার ভেতর কাঁপন সৃষ্টি করতে পারে না।'
রমজান মাসে আমাদের বেশি বেশি নামাজ পড়তে বলা হয়েছে, সৎকর্ম করতে বলা হয়েছে এবং দান করতে বলা হয়েছে। এমনটি করার মাধ্যমে আমরা সেই পর্দাকে অপসারণ করি, যা আল্লাহ ও আমাদের মাঝে স্থাপিত হয়েছে। রোজার উদ্দেশ্যই হলো সংযম অর্জন।
'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনভাবে তোমাদের আগের লোকদের প্রতি ফরজ করা হয়েছিল-যাতে তোমরা সংযমশীল (মুত্তাকি) হতে পারো।' সূরা বাকারা: ১৮৩

অসীম রহমতের মাস
রমজান হলো রহমত, দয়া, অনুগ্রহ ও ভালোবাসার মাস। মাসব্যাপী রোজা রাখার বিধান কাঠিন্য আরোপের জন্য দেওয়া হয়নি; বরং মুমিনের হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা ও শোকরের পরিচর্যার সুযোগ হিসেবে দান করা হয়েছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না; যাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ করো এবং তিনি তোমাদের যে হিদায়াত দান দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা করো এবং শোকর করো।' সূরা বাকারা: ১৮৫
এ মাসে রহমতের ফেরেশতাদের দুনিয়াতে পাঠানো হয় এবং আল্লাহর রহমতের বারিধারা আমাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বুখারি শরিফে বর্ণিত আছে- 'যখন রমজান মাস শুরু হয়, তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় আর জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।'

রমজান কেবল আত্মনিয়ন্ত্রণের নাম নয়; বরং আত্মার প্রশিক্ষণেরও নাম। প্রতিদিন রোজা রাখলে, দান করলে এবং কুরআন পড়লেই কারও রমজান সফল হয়েছে-এটি বলা যাবে না; বরং রমজানের সাফল্য নির্ভর করে রমজান মাস শেষ হওয়ার পরও এর শিক্ষাকে ধরে রাখার ওপর। সাময়িক সময়ের জন্য পাপ থেকে বিরত থাকার জন্য রোজা রাখতে বলা হয়নি; বরং হৃদয়ের ভেতর থেকে পাপের বীজ ও বদভ্যাসগুলোকে চিরতরে উপড়ে ফেলার প্রশিক্ষণ লাভের জন্য রোজা রাখতে বলা হয়েছে।
রোজা কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণা নিবারণ থেকে বিরত থাকার বিষয় নয়; বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহকে সামনে রাখার নাম রোজা। ইমাম গাজালি বলেছেন-
'ওষুধের তিতা স্বাদের ওপর যেমন এর কার্যকারিতা নির্ভর করে না, তেমনি রোজার ক্ষুধার ওপরই এর কার্যকারিতা নির্ভর করে না।'

আমাদের কারাগারে নিক্ষেপের জন্য কিংবা শৃঙ্খলাবদ্ধ করার জন্য রোজার বিধান দেওয়া হয়নি; বরং রোজা হলো আল্লাহর দেওয়া উপহার, যাতে আমরা নিজেদের বদলাতে পারি-কেবল এক মাসের জন্য নয়; বরং সমগ্র জীবনের জন্য। আমরা যখন কেবল আল্লাহর জন্যই রোজা রাখি, তখন মূলত এটিই প্রদর্শন করি-এ দুনিয়ার প্রতি আমাদের যতখানি ভালোবাসা আছে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা তার চেয়েও অনেক বেশি। রোজা রাখার সময় যদি আমরা কার জন্য রোজা রাখছি-সে ব্যাপারে সচেতন থাকি, তখন আমাদের ক্ষুধা ও তৃষ্ণাগুলো আল্লাহর জিকির ও ইবাদতে পরিণত হয়।
তিরমিজি শরিফে বর্ণিত আছে-
'ইফতারের সময় আল্লাহর কাছে যা প্রার্থনা করা হয়, আল্লাহ তা-ই মঞ্জুর করেন এবং তা কখনো প্রত্যাখ্যাত হয় না।'
এটির কারণ সম্ভবত এই যে, যখন আমরা আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করি, তখন আল্লাহর অসীম করুণা গ্রহণের জন্য উপযুক্ততা অর্জন করি। রমজান আমাদের শিক্ষা দেয়, শৃঙ্খলা ও সীমাবদ্ধতা আমাদের স্বাধীনতাকে খর্ব করে না; বরং সত্যিকারের স্বাধীনতার ভিত্তি গড়ে দেয়।
দুনিয়ার আসক্তি আমাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। প্রবৃত্তির তাড়না আমাদের গোলাম বানিয়ে দেয়। রোজার মাধ্যমে আমরা এ দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তিলাভ করি। রোজার মাধ্যমে আমরা আবিষ্কার করতে সক্ষম হই যে, দুনিয়ার মোহের কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার চাবি মূলত আমাদের হাতেই রয়েছে। আমরা যখন আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করি এবং নিজের আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করা থেকে বিরত থাকি, তখন আমরা আল্লাহর নির্দেশের ভেতর গভীর শান্তিময়তার সন্ধান পাই।

আল্লাহর পথনির্দেশনা প্রাপ্তির উপযুক্ততা অর্জন
মুহাম্মাদ যখন আলোর পাহাড়ে (জাবাল আন-নুর) গিয়ে থাকতেন, তখন তিনি দুনিয়ার আসক্তি থেকে রোজা করতেন। দুনিয়া থেকে রোজা রাখা হলো হৃদয় দিয়ে আল্লাহকে স্মরণ এবং আল্লাহকে বোঝার পর্বশর্ত। একটি গামলা তখনই ব্যবহার করা যায়, যখন এটি শূন্য থাকে। তেমনি আমাদের হৃদয় দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত হলেই কেবল সেটি আল্লাহর স্মরণ দিয়ে পূর্ণ করা যায়।
রোজা রাখার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর গুণাবলির প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ পাই। কারণ, আমরা যখন পানাহার ও যৌনকর্ম থেকে বিরত থাকি, তখন আমরা আমাদের মানবীয় দুর্বলতাগুলোকে অতিক্রম করার সক্ষমতা লাভ করি। রোজার মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'রোজা আমার জন্য এবং আমি নিজে এর পুরস্কার দেবো।'
রোজা শারীরিক চাহিদা পূরণ থেকে বিরত থাকার চাইতেও অনেক বেশি কিছু। রোজা বান্দাকে এমনভাবে সাজিয়ে দেয়-যাতে সে আল্লাহর সামনে সঠিকভাবে হাজির হতে পারে। মহানবি রোজা ও আল্লাহর সাথে একাত্ম হওয়ার বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন- 'রোজাদারের দুটি আনন্দ; ইফতারের সময়ের আনন্দ এবং আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আনন্দ।'
আমরা যদি প্রবৃত্তির কামনা চরিতার্থ করেই দিন অতিবাহিত করতে থাকি, তাহলে প্রবৃত্তি বিবেকের শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। অন্যদিকে আমরা যদি প্রবৃত্তির বিপরীতে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করি, তাহলে আমাদের বিবেক প্রবৃত্তিকে শাসন করতে শুরু করে। আর প্রবৃত্তিকে বশে আনার সবচেয়ে মোক্ষম উপায় হলো রোজা।

রোজার আধ্যাত্মিক স্তরসমূহ
রোজাকে বাহ্যিকভাবে মুসলিমের পরিচয় হিসেবে দেখা হলেও এটির অভ্যন্তরীণ তিনটি স্তর রয়েছে। এগুলো হলো-বাহ্যিক রোজা, অভ্যন্তরীণ রোজা ও হৃদয়কেন্দ্রিক রোজা। রোজা রাখতে হয় শরীর, মন ও আত্মা দিয়ে। কারণ, ইসলামে বস্তুজগৎ ও আধ্যাত্মিক জগৎ একে অপরের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত।
রোজার স্তরগুলো পরস্পরের থেকে পৃথক নয়; বরং পরিপূরক। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য এ তিনটি মাত্রাকে একত্রে চর্চা করতে হয়। যখন আমাদের বাহ্যিক কর্ম, মনের চিন্তা ও হৃদয়ের অবস্থান একত্রে আল্লাহর দিকে রুজু হয়, কেবল তখনই জীবনে শান্তির ঐকতান সৃষ্টি হয়।

অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বাহ্যিক রোজা
বাহ্যিক রোজা অভ্যন্তরীণ ও হৃদয়ের রোজার ভিত্তি গড়ে দেয়। এটি প্রবৃত্তির শক্তিকে দুর্বল করার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ও হৃদয়ের রোজা ধারণের জন্য স্থান তৈরি করে দেয়। বাহ্যিক বা শারীরিক রোজার মাধ্যমে আমরা রোজার ন্যূনতম বিধান মান্য করি-দিনের বেলায় পানাহার ও যৌনতা থেকে বিরত থাকি। যেমনটি সূরা বাকারার ১৮৭ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
'আহার ও পান করতে থাকো, যে পর্যন্ত তোমাদের জন্য কালো রেখা হতে উষাকালের সাদা রেখা প্রকাশ না পায়। তৎপর রাতের আগমন পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করো, আর মসজিদে এতেকাফ অবস্থায় তাদের সাথে সহবাস করো না। এসব আল্লাহর আইন, কাজেই এগুলোর নিকটবর্তী হয়ো না। আল্লাহ মানবজাতির জন্য নিজের আয়াতসমূহ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেন-যাতে তারা মুত্তাকি হতে পারে।'
তিরমিজিতে বর্ণিত আছে- 'আদম সন্তান পাকস্থলীর চেয়ে খারাপ কোনো পাত্র ভরতে পারে না।'
পাকস্থলী হলো শরীরের ফুয়েল ট্যাংকের মতো। যখন এটি পূর্ণ থাকে, তখন সে প্রবৃত্তিকে পুষ্টি জোগায়। ফলে হিংসা, ক্রোধ, কাম, লোভ, অহংকার ইত্যাদি শক্তিশালী হয়ে ওঠে; অথচ প্রবৃত্তির চাহিদা পূর্ণ করার মাধ্যমে কখনো আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা যায় না। আমরা যখন রোজা করি, তখন পুরো শরীরকে খানিকটা ধীর করে দিই, প্রবৃত্তিকে দুর্বল করি এবং প্রবৃত্তির ওপর বিবেকের শাসনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করি। রোজা আমাদের প্রবৃত্তিকে স্বৈরশাসক থেকে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পিত গোলামে পরিণত করে।
বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, যখন আমরা নিজেকে তৃপ্ত করাকে পিছিয়ে দেওয়ার অনুশীলন করি, তখন নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ লাভ করতে সক্ষম হই। রোজা আমাদের ইচ্ছাশক্তির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আনতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, রোজা আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে বিষমুক্ত (ডিটক্সিফাই) করে, প্রদাহ কমায়, মানসিক পরিচ্ছন্নতা আনে, কোষগুলোকে দ্রুত পরিশুদ্ধ করে এবং ক্যানসার, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, ডিপ্রেশনসহ আরও বহু রোগের ঝুঁকি কমায়।
আমরা যখন নিজের প্রবৃত্তিকে বশীভূত করি, তখন মূলত বিবেকের শক্তি বৃদ্ধির জন্য জায়গা করে দিই। ষষ্ঠ শতকে চীনা দার্শনিক লাওৎসি বলেছেন- 'যে অন্যান্যদের নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, সে হয়তো শক্তিশালী; কিন্তু যে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে, সে আরও বেশি শক্তিশালী।'
আমাদের কামনা-বাসনা থেকে দূরে রাখা রমজানের উদ্দেশ্য নয়; বরং রমজানের উদ্দেশ্য হলো-এগুলোর মধ্যে শৃঙ্খলা বিধান করা। এ কারণে আমরা রোজা ভাঙার পরও অতিরিক্ত আহার গ্রহণ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করি।
কম খাদ্য গ্রহণ, উদরপূর্তি করে খাওয়া থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে নিজের ওপর যে কর্তৃত্ব সৃষ্টি করা সম্ভব, অন্য কোনো উপায়ে তা সম্ভব নয়। জাপানকে বলা হয় দুনিয়ার সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান মানুষের দেশ। জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপের মানুষের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের সুস্বাস্থ্যের পেছনের গোপন রহস্য হলো-তারা পাকস্থলী শতকরা ৮০ ভাগ পূর্ণ হলেই খাওয়া বন্ধ করে দেয়। অর্থাৎ তাদের পাকস্থলী সব সময় কমপক্ষে শতকরা ২০ ভাগ খালি থাকে। এই জাপানি কৌশল মূলত মহানবি -এর প্রদর্শিত কৌশলেরই অনুরূপ। রাসূলুল্লাহ আহার গ্রহণের সময় 'পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য, এক-তৃতীয়াংশ পানি এবং এক-তৃতীয়াংশ ফাঁকা' রাখতে বলেছেন।
রমজান আমাদের মনে করিয়ে দেয়-খাদ্যের সাথে আমাদের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত। রমজান আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, প্রবৃত্তিকে তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে খাদ্য গ্রহণ করা উচিত নয়; বরং আল্লাহর ইবাদত করার জন্য শরীরকে সুস্থ রাখার স্বার্থে যতখানি প্রয়োজন, কেবল ততখানি খাদ্যই আমাদের গ্রহণ করা উচিত।

মনের অভ্যন্তরীণ রোজা
বাহ্যিক রোজা অভ্যন্তরীণ রোজার পথ নির্মাণ করে দেয়। অভ্যন্তরীণ রোজা তখন শুরু হয়, যখন আমরা আল্লাহর গুণাবলির নিজের জীবনে অনুশীলন শুরু করি। 'দারিমি শরিফ' আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত আছে-
'অনেক লোক রোজা রাখে, কিন্তু রোজা থেকে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছাড়া আর কোনো কিছুই অর্জন করে না।'
আমরা যখন পাকস্থলীকে শূণ্য করি, তখন মূলত মন থেকে সেই সব অনুভূতিকে সরিয়ে দিই, যেগুলো আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী হতে বাধা দেয়। আমাদের অনুভূতিগুলো জগতের সাথে আমাদের সংযুক্ততার নির্ণায়ক। আমরা যা দেখি, যা শুনি, যা বলি, যা স্পর্শ করি, তা থেকেই নির্ধারিত হয় আমরা কীভাবে চিন্তা করি, বিশ্বাস করি ও কর্মসম্পাদন করি। হৃদয় হলো শরীরের রাজধানী, যার চারদিকে রয়েছে সাতটি দরজা। এগুলো হলো পাকস্থলী, চোখ, কান, মুখ, পা, হাত ও যৌনাঙ্গ। হৃদয়ের ভেতর যেহেতু আল্লাহর স্মরণ বাস করে, সেহেতু মুমিনের দায়িত্ব হলো এই সাতটি দরজায় ছাঁকুনি স্থাপন করা, যাতে যা কিছু আল্লাহর ইচ্ছাবহির্ভূত-তা হৃদয়ে প্রবেশ করতে না পারে।
যদি আমাদের হৃদয়কে বদলাতে চাই, তাহলে এই সাতটি দরজা দিয়ে হৃদয়ে যা কিছু প্রবেশ করে, সেগুলোকে বদলাতে হবে। আমাদের কান যদি মন্দ কিছু শোনা থেকে বিরত না থাকে, চোখ মন্দ কিছু দেখা থেকে বিরত না থাকে, হাত-পা যদি মন্দ কিছু করা থেকে বিরত না থাকে, মন যদি কুচিন্তা করা থেকে বিরত না থাকে, তাহলে কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকলেই রোজা হয় না। মহানবি ﷺ বলেছেন-'যে ব্যক্তি রোজা রেখে মন্দ কাজ ও কথা থেকে বিরত থাকল না, তার পানাহার থেকে বিরত থাকায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।'
মূলত রোজা কেবল খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং রোজা হলো নিজের সবগুলো অনুভূতিকে মন্দ প্রবণতা থেকে পবিত্র রাখার নাম। এভাবে শরীর ও মন অর্থাৎ আমাদের সমগ্র সত্তা আল্লাহর দিকে রুজু হয়।

হৃদয়ের রোজা
যখন সূর্য অস্ত যায় এবং বাহ্যিক রোজার সময়কাল শেষ হয়, তখনও হৃদয়ের রোজা অব্যাহত থাকে; এটি কখনো শেষ হয় না। রোজার এ অবস্থানের কথা রাসূল ﷺ-এর কথায় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে- 'আমার চোখ ঘুমায়, কিন্তু আমার হৃদয় জাগ্রত থাকে।'
আমরা যখন সবকিছুর ভেতর আল্লাহর নিদর্শন দেখতে পাই, তখন আমাদের সব কাজই দুআয় পরিণত হয়, সবগুলো মুহূর্তই ইবাদতে পরিণত হয় এবং সব মানুষ, স্থান ও জিনিসই আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
আমরা যখন আল্লাহর সাথে একাত্ম হওয়ার অবস্থানে চলে যাই, তখন যদিও আমাদের পা এ দুনিয়াতে থাকে, কিন্তু আমাদের হৃদয় চলে যায় সর্বোচ্চ আসমানের ওপরে-যেখানে আল্লাহ রয়েছেন। আল্লাহ ছাড়া সবকিছু থেকে রোজা (বিরত) থাকার মানে হলো-সমগ্র সৃষ্টিজগৎ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। আমরা যখন খাদ্য, পানীয়, কুচিন্তা ও প্রবৃত্তির তাড়না থেকে নিজেকে মুক্ত করি, তখন নিজের ভেতর আল্লাহর ফুঁকে দেওয়া নিশ্বাসের স্বাদ অনুভব করতে পারি। এ অবস্থায় আমরা আল্লাহর খাঁটি আয়নায় পরিণত হই।
ইসলাম আল্লাহর সাথে আমাদের সংযুক্ততার সামনের বাধাগুলো অপসারণের পথ দেখায়। রমজান হলো 'মুরাকাবা' বা পর্যবেক্ষণের মাস। এ মাসে আল্লাহ আমাদের আত্মপর্যালোচনার সুযোগ দিয়ে থাকেন। আল্লাহকে অনুভব করার সামনে আমরা কতখানি পর্দা স্থাপন করেছি, তা অনুভব করা যায় এ মাসে।
রোজা আমাদের ভঙ্গুরতা ও অসহায়ত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। স্মরণ করিয়ে দেয়, আমাদের শরীর কত কম সময়ে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। আল্লাহ প্রতিনিয়ত যে রহমতগুলো দিয়ে আমাদের জীবন ধন্য করেছেন, সেগুলো আমাদের মানসপটে ভেসে আসে। রোজা দুঃখী মানুষের ক্ষুধাকে অনুভব করার সুযোগ এনে দেয়। তাই রোজার মাসে বেশি বেশি দান করার জন্য রাসূল আমাদের উৎসাহিত করেছেন। আলি বলেছেন-
'খাদ্য হলো শরীরের পরিচর্যা, অপরকে খাওয়ানো হলো আত্মার পরিচর্যা।'
অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে তার জন্য রোজা রাখা ফরজ নয়, তবে তাকে প্রতিটি রোজার জন্য গরিবদের খাওয়ানোর বিধান রয়েছে। এখানে বলা হয়েছে- কেউ যদি প্রদত্ত বিধানের চেয়ে বেশি কিছু করে, তাহলে তা তার জন্য আরও কল্যাণকর হবে। রাসূলুল্লাহ বলেছেন-
'যে অপরকে দয়া দেখায় না, সে নিজে দয়াপ্রাপ্ত হয় না।'
রাসূল মনে করিয়ে দিয়েছেন-আমরা আল্লাহর গুণাবলি যত বেশি অন্যদের প্রতি প্রয়োগ করব, আমাদের আত্মার ভেতর সেসব গুণ তত বেশি বিকশিত হবে।

লাইলাতুল কদর : মহিমান্বিত রজনি
রমজানের আধ্যাত্মিক শিখর হলো লাইলাতুল কদর বা মহিমান্বিত রজনি। এটি হলো কুরআন নাজিলের বছরপূর্তির রাত। যদিও কেউ জানে না রমজান মাসের নির্দিষ্ট কোন রাতটি লাইলাতুল কদর, তবুও মহানবি মুহাম্মাদ ﷺ বলেছেন-রমজানের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলোর একটি রাতই হলো লাইলাতুল কদর।
এই রাতে দুনিয়াতে আল্লাহর অসীম করুণাধারা বর্ষিত হয়, ক্ষমা প্রার্থনাকারীকে ক্ষমা করা হয় এবং মানুষ যা কিছু চায়, আল্লাহ তাকে তা প্রদান করেন। এ রাতে জিবরাইল আ. সহ আরও অনেক ফেরেশতা সর্বোচ্চ আসমান থেকে দুনিয়ার বুকে নেমে আসে এবং আল্লাহর নির্দেশসমূহ বাস্তবায়ন করে। মহানবি ﷺ বলেছেন- 'সত্যিই এ রাতে ততসংখ্যক ফেরেশতা নেমে আসে, যতসংখ্যক নুড়ি পাথর এ দুনিয়াতে রয়েছে।'
'নিশ্চয়ই আমি এটি নাজিল করেছি মহিমান্বিত রজনিতে। তুমি কি জানো, মহিমান্বিত রজনি কী? মহিমান্বিত রজনি হচ্ছে হাজার মাসের চাইতেও শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রুহ (জিবরাইল) তাঁদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করে। শান্তিময় সেই রাত, ফজরের সূচনা পর্যন্ত।' সূরা কদর: ১-৫
এই রাতে আল্লাহ তাঁর রহমতের দরজাগুলো সকল মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেন এবং মানুষের সৎকর্মগুলোকে বহুগুণ বর্ধিত করে দেন, যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'লাইলাতুল কদর হলো হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।' সূরা কদর : ৩
অন্যকথায় আল্লাহ এখানে বলেছেন-এ রাতের ইবাদত ৮০ বছরের ইবাদতের চাইতেও উত্তম, যা একজন স্বাভাবিক মানুষের সমগ্র জীবনকাল হিসেবে ধরা যেতে পারে। লাইলাতুল কদর হলো বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাত। কারণ, এ রাতে আল্লাহ আমাদের আমন্ত্রণ জানান আমরা যেন তাঁর কাছে ক্ষমা চাই, তাঁর কাছে মনের বাসনা ব্যক্ত করি। আল্লাহ এ রাতে তাঁর বান্দাদের ক্ষমা করার জন্য অপেক্ষমাণ থাকেন। সে-ই সৌভাগ্যবান, যে এ রাতে আল্লাহর ক্ষমা লাভ করে ধন্য হয়।

টিকাঃ
১৬৪. মুসলিম
১৬৬. Group, Dr. Edward. '20 Health Benefits of Fasting for Whole Body Wellness.' Dr. Group's Healthy Living Articles, Global Healing Center, Inc, June 13, 2017
১৬৭. Whiteman, Honor. 'Fasting: Health Benefits and Risks.' Medical News Today.
১৬৮. Stibich, Mark. 'Hara Hachi Bu: The Japanese Secret to Longevity.' Verywell Health, October 19, 2017
১৬৯. তিরমিজি
১৭০. বুখারি
১৭৩. বুখারি

📘 সিক্রেটস অব ডিভাইন লাভ > 📄 হজ : আল্লাহর দিকে যাত্রা

📄 হজ : আল্লাহর দিকে যাত্রা


আর তোমরা হজ ও উমরাহ পালন করো আল্লাহর উদ্দেশ্যে। সূরা বাকারা : ১৯৬
তুমি কি ভালোবাসার পথের হাজি হতে চাও? প্রথম শর্ত হলো – নিজেকে ধূলিকণা ও ছাইয়ের মতো তুচ্ছ বানিয়ে নাও। -জালালুদ্দিন রুমি

আল্লাহ শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান সব মুসলিমকে জীবনে কমপক্ষে একবার পবিত্র নগরী মক্কায় ভ্রমণ করার আহ্বান করেছেন, যা হজ নামে পরিচিত। যদিও বছরের যেকোনো সময় ছোটো হজ বা উমরাহ পালন করা যায়-যা ঐচ্ছিক, কিন্তু বাধ্যতামূলক হজ অনুষ্ঠিত হয় ইসলামি বর্ষপঞ্জির দ্বাদশ মাসের নির্দিষ্ট ছয়টি দিনে।

হজ হলো চেতনাগতভাবে আল্লাহর দিকে ফেরার জীবনব্যাপী ভ্রমণের নাম। আমরা যখন হজের জন্য প্রস্তুতি নিই, তখন যেন মৃত্যুর জন্যই প্রস্তুতি নিই। হজে গমনের পূর্বে আমরা সব দায়-দেনা পরিশোধ করি, অসিয়ত লিখি, পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করি এবং অতীতে কষ্ট দিয়ে থাকতে পারি এমন সকলের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই। হজের শারীরিক পরিশ্রমগুলো হলো আমাদের আত্মার পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়া। কারণ, আমাদের শরীর যতই দুর্বল হয়, প্রবৃত্তি ও বস্তুগত দুনিয়ার বাঁধন ততই আলগা হয়, ফলে চেতনা জাগ্রত হওয়ার জন্য আদর্শ অবস্থা তৈরি হয়।
হজের আনুষ্ঠানিকতাগুলো আমাদের আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে সাহায্য করে। বিশ শতকের স্কলার গাই ইটন হজ সম্পর্কে বলেছেন-
'হজ হলো শারীরিক ভ্রমণ, যা অভ্যন্তরীণ ভ্রমণেরই হুবহু রূপায়ণ। এটি প্রান্তিক এলাকা থেকে কেন্দ্র অভিমুখে ভ্রমণ, যেখানে ইসলামের আনুভূমিক ও উলম্ব উভয় দিক একটি স্থানে মিলিত হয়, যেখানে মানুষ আল্লাহর সাথে এক বিন্দুতে একাত্ম হয়।'
হজ পরোক্ষভাবে আল্লাহর ইবাদতের নাম নয়; বরং আল্লাহর ভালোবাসার ভেতর বিলীন হয়ে যাওয়ার নাম, যেভাবে সূর্যের আলোর স্পর্শে মেঘ বিলীন হয়ে যায়।

হজের আনুষ্ঠানিকতাগুলো একদিকে আমাদের প্রবৃত্তির তাড়নাগুলোকে সীমিত করে দেয়, অন্যদিকে আমাদের ভেতর তৈরি হওয়া বর্ণবাদকে মুছে দিয়ে সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলে। হজের এই দিকটি মানবাধিকারকর্মী ম্যালকম এক্সকে দারুণ প্রভাবিত করেছিল, যা তাঁর কথায় ফুটে উঠেছে-
'দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো হাজির আগমন ঘটেছে। এদের মধ্যে রয়েছে নীল চোখের স্বর্ণকেশী থেকে শুরু করে কালো চামড়ার আফ্রিকান পর্যন্ত নানা বর্ণের মানুষ। কিন্তু সবাই একই রকম আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করছে এবং একতা ভ্রাতৃত্ববোধের এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। এ দৃশ্য দেখে আমি এটি ভাবতে অনুপ্রাণিত হই যে, আমেরিকাতে সাদা ও অসাদার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা থাকা ঠিক না।'
আমরা হয়তো দেখতে ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু আল্লাহর যে ভালোবাসার জন্য আকাঙ্ক্ষিত, তা অভিন্ন। হজের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই, আল্লাহর দৃষ্টিতে সকল মানুষ সমান। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন-সমগ্র মানুষজাতি একটি আত্মা থেকে এসেছে, কাজেই গায়ের রং ও ভাষার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ রচনা করা ঠিক না; বরং এগুলোকে আল্লাহর অসীম সৃজনশীলতা হিসেবে দেখতে হবে।
'হে মানুষ! তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সে-ই অধিক সম্মানিত, যে অধিক মুত্তাকি। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সব খবর রাখেন।' সূরা হুজুরাত : ১৩
আমাদের বিভক্ত করার জন্য ইসলাম আসেনি; বরং ইসলাম এসেছে সেই সত্যকে আমাদের সামনে উন্মোচন করতে-যদিও আমরা ভিন্ন ভিন্ন ফল, কিন্তু আমরা সবাই একই বৃক্ষ থেকে উদ্গত। আল্লাহ আমাদের গায়ের রঙের মধ্যে ভিন্নতা দান করেছেন, কিন্তু আমাদের আত্মার রং একটিই। হজের সময় আমরা এক আত্মার অংশ হিসেবে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করি এবং এক আল্লাহর কাছেই ফিরে আসি। হজে সবাই এক হয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টার মাধ্যমে আমরা আমাদের ভেতরকার বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি ও আর্থসামাজিক ভিন্নতাকে অতিক্রম করার অসাধারণ শিক্ষা লাভ করে থাকি।

ইবরাহিম : একেশ্বরবাদীদের পিতা
হজ করতে গিয়ে হাজিরা হাজারো বছর আগে ইবরাহিম -এর সময়ে চলে যায়। ইবরাহিম হলেন দুনিয়ার প্রধান একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর মধ্যকার সংযোগসেতু। জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন-
'ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম-আমরা সবাই ইবরাহিম -এর প্রভুর কাছে মাথা নত করি।'
হজের একটি বড়ো আনুষ্ঠানিকতা হলো কুরবানি। ইবরাহিম যখন তাঁর প্রথম পুত্র ইসমাইল -কে কুরবানি করার নির্দেশ পেলেন, সে ঘটনাকে স্মরণ করেই মুসলিম উম্মাহ হজের সময় পশু কুরবানি করে থাকে। অনেকের মনে এ প্রশ্নের উদয় হয় যে, আল্লাহ কী করে একজন পিতাকে তাঁর সন্তানকে জবাই করার নির্দেশ দিতে পারেন?

ওই ঘটনাকে বুঝতে হলে ঘটনাটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। আল্লাহর দৃষ্টিতে মৃত্যু জীবনের সমাপ্তি নয়; বরং অন্তহীন জগতে প্রবেশের দরজা মাত্র। স্কলারগণ বলেছেন-আল্লাহ চাননি ইবরাহিম তাঁর সন্তানের কোনো ক্ষতি করুন; বরং তিনি চেয়েছিলেন, ইবরাহিম যেন আল্লাহ ছাড়া তাঁর ভালোবাসার অন্য সকল কিছুকে ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। আল্লাহ ইবরাহিম -কে এই কঠিন পরীক্ষায় আপতিত করার মাধ্যমে তাঁর হৃদয় থেকে আল্লাহ ছাড়া জগতের সবকিছুকে ঝেড়ে ফেলার প্রশিক্ষণ দান করলেন। আল্লাহ ইবরাহিম -কে শিক্ষা দিলেন-কী করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'র শিক্ষাকে হৃদয় ও আত্মার ভেতর সঠিকভাবে ধারণ করতে হবে। শৈশবকালে ইবরাহিম মূর্তিপূজার এতখানি বিরোধী ছিলেন যে, তিনি মন্দিরের ভেতর প্রবেশ করে তাঁর বাপ-দাদার আমলে স্থাপিত মূর্তিগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। বৃদ্ধ অবস্থায় ইবরাহিম -কে বলা হলো, তিনি যেন আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রমাণ করতে তাঁর ভালোবাসার বস্তু ইসমাইল -কে কুরবানি করে দেন।
এভাবে মহান আল্লাহ ইবরাহিম -কে শাস্তি দেননি; বরং মনে করিয়ে দিয়েছেন, তিনি যেন আল্লাহর দেওয়া উপহার পুত্র সন্তানকে এতখানি ভালো না বাসেন, যাতে তাঁর দৃষ্টি উপহারদাতার ওপর থেকে সরে যায়।

এ ঘটনার কেবল ইবরাহিম -এর ত্যাগ সম্পর্কিত নয়; বরং ইসমাইল এর ভূমিকাও এখানে উল্লেখযোগ্য। আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে ইবরাহিম পুত্র ইসমাইল-এর কাছে গিয়ে বললেন-
'বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি তোমাকে জবেহ করছি। এখন বলো, তোমার অভিমত কী?' সে বলল-'হে পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা-ই করুন, আল্লাহ চাইলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন।' সূরা সফফাত: ১০২
ইসমাইল খুব সুন্দরভাবে নজির স্থাপন করলেন-কী করে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়। এ ঘটনায় তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতার বিশাল দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইসমাইল যখন আল্লাহর নির্দেশ শুনলেন, তখন কোনো প্রশ্ন না করে তিনি নিজেকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করে দিলেন। কারণ, তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করতেন এবং জানতেন, তাঁর প্রভু তাঁকে যতখানি ভালোবাসেন, কোনো মানুষ এমনকী তাঁর পিতাও তাঁকে ততখানি ভালোবাসার সামর্থ্য রাখেন না।
এ দুনিয়ার ফুল ও ফলকে ভালোবাসতে বলা হয়েছে, কিন্তু আল্লাহ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, এ উপহারগুলো যেন আমাদের হাতেই থাকে; হৃদয়ের ভেতর প্রবেশ না করে। কেননা, প্রকৃত মুমিনের হৃদয়ে আল্লাহ ছাড়া আর কারও আবাস থাকতে পারে না। এক আল্লাহকে অনুভব করতে হলে আমাদের অবশ্যই হৃদয় থেকে দুনিয়াবি সকল জিনিসের প্রতি আকর্ষণকে সরিয়ে ফেলতে হবে। ইবরাহিম ও ইসমাইল তাঁদের ওপর আপতিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ তাঁদের মক্কায় অবস্থিত কাবা ঘর পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দিলেন।

কাবার তাৎপর্য
অনেক স্কলারের মতে, আদম ও মা হাওয়া যখন দুনিয়াতে পুনরায় একত্রিত হলেন, তখন তাঁরা মক্কা উপত্যকায় ফেরেশতাদের প্রদক্ষিণ করা বাইতুল মামুর -এর দৃশ্য দেখে আকৃষ্ট হলেন। স্কলারদের কেউ কেউ বলেন-বাইতুল মামুর হলো ফেরেশতাদের কাবা, যেটির অবস্থান আমাদের বস্তুজগতের বাইরে। কাবার ঠিক ওপরে সপ্তম আসমানে। কারও কারও মতে-মক্কায় অবস্থিত কাবা ঘরই বাইতুল মামুর। আদম ও মা হাওয়া -কে এখানেই কাবা ঘর নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এটিই এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য নির্মিত দুনিয়ার প্রথম ঘর।
'নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, সেটিই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্য হিদায়াত ও বরকতময়।' সূরা আলে ইমরান: ৯৬

অবশ্য কাবা আল্লাহর বস্তুগত ঘর নয়; বরং প্রতীকী অর্থে আল্লাহর ঘর। কেননা, আল্লাহর কোনো আকার নেই এবং তিনি স্থান ও সময়ের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। আমাদের একতাবদ্ধ করার লক্ষ্যেই সবাইকে একটি ভৌগোলিক কেন্দ্রের দিকে মুখ ফেরাতে বলা হয়েছে। যখন দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ একটি কেন্দ্রের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তে উদ্যত হয়, তখন পুরো দুনিয়া একটি জায়নামাজে পরিণত হয়।
ফেরেশতাদের যেভাবে আদম-এর পায়ে সিজদা করতে বলা হয়েছে, আমরা সেভাবে বস্তুগত কোনো কিছুর কাছে সিজদা করি না; আমরা সিজদা করি আল্লাহর মহত্ব ও হুকুমের কাছে। আমরা আল্লাহর নিশ্বাসের সুগন্ধের কাছে সিজদা করি, যার ছোঁয়ায় সবকিছু প্রাণ লাভ করে। কাবা মানুষের হৃদয়ের প্রতিনিধিত্ব করে। রাবেয়া বসরি বলেছেন-
'আমি হৃদয়ের সর্বজনীন মসজিদে হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করি, যে মসজিদের কোনো দেয়াল নেই।'
সময়ের পরিক্রমায় হাজার হাজার বছর পর কাবা ঘরের ধ্বংসাবশেষই কেবল অবশিষ্ট রয়ে যায় এবং ইবরাহিম ও পুত্র ইসমাইল এটির পুনর্নির্মাণ করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'স্মরণ করো, যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল কাবা গৃহের ভিত্তি স্থাপন করছিল। তাঁরা দুআ করছিল- “হে আমাদের রব! আমাদের কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।"' সূরা বাকারা: ১২৭
একসময় যে ঘর নির্মিত হয়েছিল একত্ববাদের ভিত্তির ওপর, কালের বিবর্তনে সেখানে ধীরে ধীরে মূর্তি প্রবেশ করানো হতে থাকে এবং একসময় মুশরিকদের কাছে এটি জনপ্রিয় স্থানে পরিণত হয়। মহানবি মুহাম্মাদ মক্কা বিজয়ের দিন কাবা ঘর থেকে সব মূর্তিকে অপসারণ করেন এবং এটিকে একত্ববাদের ওপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।

কাবা হলো আল্লাহর ঘর। কাবার স্থাপত্যশৈলী খুব সাধারণ হলেও এটির প্রতীকী রূপ অনেক সমৃদ্ধ। কাবা ঘরের অবকাঠামো ঘনক্ষেত্র (কিউব) আকৃতির। এটি নির্দিষ্ট একটি দিক নয়; বরং একই সঙ্গে পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, ঊর্ধ্ব ও নিচ দিকের প্রতি অভিমুখ করে স্থাপিত; যা ইঙ্গিত করে যে, আল্লাহ একই সাথে সবগুলো দিকের প্রতি অভিমুখী।
আজকের কাবা কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা, যা আল্লাহর অসীমত্বের প্রতীক বহন করে। অন্যান্য রঙের অনুপস্থিতির কারণে কালোর সৃষ্টি হয় না; বরং যখন সব রং প্রতিফলন ছাড়াই শোষিত হয়, তার পরিণতিতেই কালো বর্ণ অস্তিত্ব লাভ করে। একইভাবে জগতের সকল বৈচিত্র্য আল্লাহর এককত্বের কাছে এসে বিলীন হয়ে যায়। কাবার ভেতরটা পুরোপুরি শূন্য। এটির প্রতীকী অর্থ হলো- আল্লাহর কোনো আকৃতি নেই এবং তাঁকে দেখা যায় না, তাঁকে কোনো কিছু দিয়ে আবদ্ধ করা যায় না।
তবে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা কাবার ইবাদত করি না; বরং কাবার মালিক এক আল্লাহর ইবাদত করি। আমরা কাবার দিকে মুখ করে ইবাদত করি। এর মানে এই নয় যে, আল্লাহ শুধু কাবার দিকেই আছেন; বরং আমরা যেদিকেই ফিরি না কেন, সেদিকেই আল্লাহর নিদর্শন বিদ্যমান।
'সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে; বরং বড়ো সৎকর্ম হলো এই যে, যারা ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর, কিয়ামত দিবসের ওপর, ফেরেশতাদের ওপর এবং সমস্ত নবি-রাসূলগণের ওপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়স্বজন, ইয়াতিম-মিসকিন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্য। আর যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, জাকাত দান করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণকারী, তারাই হলো সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেজগার।' সূরা বাকারা: ১৭৭
কাবা ঘর এমন ঘর নয়, যেখানে আল্লাহ বসবাস করেন; বরং কাবা ঘর হলো বাইতুল মামুরের প্রতিফলন, যেখানে অগণিত ফেরেশতা বিরতিহীনভাবে প্রদক্ষিণ ও আল্লাহর ইবাদত করে চলেছে। আমরা যখন কাবাকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করি, তখন আল্লাহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়া সমগ্র সৃষ্টিজগতের সাথে যুক্ত হই। সমগ্র সৃষ্টিজগৎ আল্লাহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, কিন্তু আল্লাহর নড়াচড়ার প্রয়োজন নেই, তিনি সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে।
জগতের অস্তিত্বশীল সবকিছু আবর্তনশীল। অণুর ভেতর নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ইলেকট্রন আবর্তিত হয়। পৃথিবীকে কেন্দ্র করে চাঁদ আবর্তিত হয়, সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী আবর্তিত হয় এবং কৃষ্ণ গহ্বরকে কেন্দ্র করে সূর্য আবর্তিত হয়। কৃষ্ণ গহ্বর যেমন এর কক্ষপথের ভেতর সবকিছুকে মধ্যাকর্ষণ শক্তির মাধ্যমে আকর্ষণ করে, কাবাও তেমনি সব আত্মাকে আল্লাহর ভালোবাসার দিকে আকর্ষণ করে।

হজের আনুষ্ঠানিকতাগুলোর প্রতীকী অর্থ
হজের আনুষ্ঠানিকতাগুলো পালন করতে গিয়ে আমরা আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কগুলোকে পুনরায় ঝালাই করে নেওয়ার সুযোগ পাই। মরুভূমির আবহাওয়ায় লম্বা সময় ধরে ইবাদত করা, বিভিন্ন স্থানে কষ্টকর ভ্রমণ, হজের নির্দিষ্ট সাধারণ কাপড় পরিধান ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা আল্লাহর ওপর নিজের নির্ভরতার অনুশীলন করে থাকি।
হজ শব্দটি এসেছে --- মূলশব্দ থেকে, যার অর্থ-পূর্ণ সংকল্প (নিয়্যাত)। এর গূঢ় অর্থ হলো-কেবল এক আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার বাসনায় জগতের সবকিছুকে পরিত্যাগ করার দৃঢ় সংকল্প। যেমনটি জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন—
‘তোমার জীবনটাকে এমন একজনকে দিয়ে দাও, যিনি ইতোমধ্যেই তোমার নিশ্বাস ও তোমার সময়ের মালিক হয়ে আছেন।’
কাবা ঘরের সংস্পর্শে এসে হাজিরা সেই সংকল্পের কথাই উচ্চারণ করেন, যাকে তালবিয়া বলা হয়। এর অর্থ-
'আমি উপস্থিত হে আল্লাহ, আমি উপস্থিত! আপনার ডাকে সাড়া দিতে আমি উপস্থিত। আপনার কোনো অংশীদার নেই। নিঃসন্দেহে সমস্ত প্রশংসা ও সম্পদরাজি আপনার এবং একচ্ছত্র আধিপত্য আপনার। আপনার কোনো অংশীদার নেই।'
হজের সময় ইহরাম বাঁধতে হয়। পুরুষদের জন্য সেলাইবিহীন এক টুকরো সাধারণ সাদা কাপড় পরিধান করতে হয়। মহিলাদের জন্য যদিও নির্দিষ্ট কোনো পোশাকের বিধান নেই, তবুও তাদেরও সাধারণ ও ভদ্রোচিত পোশাক পরিধান করতে বলা হয়েছে। এ ধরনের পোশাকের মাধ্যমে মানুষকে একদিকে নিজের তুচ্ছতাকে উপলব্ধি করতে বলা হয়েছে, অন্যদিকে এটি অনুধাবন করতে প্রাণিত করা হয়েছে যে, আল্লাহর দৃষ্টিতে সকল মানুষ সমান; সম্পদ, প্রতিপত্তি, গায়ের রং ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষে মানুষে সৃষ্ট বিভেদ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

হজই একমাত্র স্থান, যেখানে একজন বাদশাহ ও একজন সাধারণ মানুষ একই পোশাক পরিধান করেন। কোটিপতি ও দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আল্লাহর ক্ষমা ভিক্ষা করেন। বিখ্যাত মুভিস্টার ও সাধারণ গ্রাম্য মানুষ এক তাঁবুতে ঘুমায়। নারী ও পুরুষরা যখন ইহরাম বাঁধে, তখন কিছু কাজ তাদের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায় : যৌন সম্পর্ক স্থাপন, শিকার করা, চুল কাটা ইত্যাদি। এসব কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে মানুষ তাদের প্রবৃত্তি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আল্লাহর জিকিরের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপের দিকে ধাবিত হয়। হজে এসে সকল 'আমি' 'আমরা'তে রূপান্তরিত হয়ে যায়। প্রতিটি মানুষ সাদা সমুদ্রের একেকটি জলকণায় পরিণত হয়। এখানে লিঙ্গ, বর্ণ, গোত্র, সম্পদ, প্রতিপত্তির ভিত্তিতে মানুষে মানুষের কোনো ভেদাভেদ থাকে না, সকল মানুষের সমান মর্যাদার এক অনুপম পরিবেশ তৈরি হয়।

হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাতবার দৌড়ানো। এর পেছনে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে। ইবরাহিম -কে আল্লাহ নির্দেশ দিলেন, তিনি যেন তাঁর পুত্র ইসমাইল ও পুত্রের মা হাজেরাকে মক্কার শুষ্ক ও নির্জন মরুভূমির মধ্যে সাফা ও মারওয়া নামক দুটি পাহাড়ের মাঝখানে রেখে যান। ইবরাহিম আল্লাহর নির্দেশ প্রতিপালন করলেন এবং তাঁদের সেখানে রেখে এলেন। তিনি আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের ওপর অনেক বেশি আস্থাশীল ছিলেন। তিনি জানতেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর স্বজনদের রক্ষা করবেন। মা হাজেরা তাঁর শিশুপুত্রের জন্য পানির সন্ধান করতে গিয়ে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাতবার ছুটে বেড়ান। এ ঘটনাকে স্মরণ করতে হাজিরা সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাতবার দৌড়ান। মা হাজেরা দৌড়ে বেরিয়েছিলেন পানির সন্ধানে, যেখানে হাজিরা দৌড়ে বেড়ান আল্লাহর দয়া, করুণা, ক্ষমা ও অনুগ্রহের সন্ধানে। অবশেষে পিপাসার্ত ও কান্নারত শিশু ইসমাইল-এর পদাঘাতে মরুভূমির বালু ফুঁড়ে একটি সুপেয় পানির ঝরনা বের হয়-যেটি জমজম নামে পরিচিত।
মহানবি মুহাম্মাদ-এর আগমনের বহু আগে থেকে পবিত্র জমজম কূপ থেকে হাজিরা পানি পান করে আসছে। এ ঘটনার শিক্ষা হলো-পিপাসার্ত শিশু ইসমাইল-এর পদতলেই যেমন আল্লাহ সুপেয় পানির ঝরনা বইয়ে দিয়েছেন, আমাদের ব্যথা-বেদনার খুব কাছেই তেমনি মহান আল্লাহ হৃদয় উপশমের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন- 'যেখানেই ব্যথা, সেখানেই রয়েছে উপশম; যেখানে দারিদ্র্য, সেখানেই প্রাচুর্য। যেখানেই কঠিন প্রশ্ন, সেখানেই রয়েছে এর উত্তর। যেখানেই জাহাজ, সেখানেই রয়েছে পানি। পানির জন্য হাহাকার করো না; তোমার পিপাসাকে বাড়াও, পানি তোমার সামনে এসে ধরা দেবে। একটি ছোট্ট শিশু জন্মগ্রহণ করার সাথে সাথে কে তার মায়ের বুকে দুধের সঞ্চার করে?'

হজের সবচেয়ে স্মরণীয় ও জীবন পরিবর্তনকারী অভিজ্ঞতা হলো-আরাফাতের মাঠে আল্লাহর কাছে দুআ করার ঘটনা। বলা হয়ে থাকে, আরাফাত হলো হজের শীর্ষবিন্দু। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাদা পোশাক (যেমন পোশাক হবে তার কাফনের পোশাক) পরিধান করে লাখো মানুষের এক মাঠে মিলিত হওয়ার এ দৃশ্য হলো পরকালের বিচার দিবসের একটি ড্রেস রিহার্সেলের মতো, যেখানে সব মানুষ আল্লাহর সামনে এমন অবস্থায় দাঁড়াবে-যখন তাদের সাথে ঈমান ও সৎকর্ম ছাড়ার আর কিছুই থাকবে না। আদম ও মা হাওয়া -কে দুনিয়ার ঠিক কোথায় প্রেরণ করা হয়েছিল-তা নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও কিছু স্কলার মনে করেন, জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নেমে আসার পর আরাফাতেই আদম ও মা হাওয়া একত্রিত হয়েছিলেন। কিছু স্কলারের মতে-আরাফাত হলো আল্লাহর অসীম ক্ষমার প্রতীক। কারণ, রহমতের পাহাড়ে (জাবালে রহমত) আদম ও মা হাওয়া নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন এবং আল্লাহ সেই দুআ কবুল করেছিলেন।
আরাফাত হলো মুমিনদের জন্য পাওয়ার হাউস। এখানে মুমিনরা আল্লাহর কাছে তাদের প্রতিজ্ঞাকে নবায়ন করে নেয় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।
মুসলিম শরিফে বর্ণিত আছে-
'আরাফাতের দিনে আল্লাহ যত বেশিসংখ্যক মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দান করেন, অন্য কোনো দিনে তা করেন না।'
রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন-'এই দিনের সবচেয়ে উত্তম দুআ হলো-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকালাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদির।' অর্থ হলো- 'আল্লাহ ছাড়া আর কারও উপাসনা পাওয়ার অধিকার নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, সকল প্রশংসার অধিকারী এবং সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।'

মিনায় শয়তানের ওপর পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে আমরা প্রতীকীভাবে আমাদের নিজেদের ভেতর গড়া মূর্তিগুলোকে ভেঙে থাকি। শয়তানের তিনটি পিলারে সাতবার করে নুড়ি পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে কেবল বাহ্যিক শয়তানকেই আমরা প্রত্যাখ্যান করি না; বরং আমাদের ভেতরের হিংসা, লোভ, অহংকার ইত্যাদি যেগুলো আমাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলে, সেগুলোকেও ঝেড়ে ফেলি।
আমাদের ভেতরের লোভ ও প্রবৃত্তির তাড়নাকে কুরবানি করার লক্ষ্যে আমরা হজে পশু কুরবানি দিই এবং এর গোশত বিলিয়ে দিই। ইবরাহিম যেভাবে আল্লাহর নির্দেশে তাঁর প্রিয়বস্তুকে ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন, সে ঘটনাকে স্মরণ করার জন্যই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে পশু কুরবানির এ বিধান চালু হয়েছে।
পশু কুরবানি ছাড়া হজের আর একটি বিধান হলো মাথার চুল ছাঁটা বা মাথা কামিয়ে ফেলা। চুল ছাঁটা বা কামিয়ে ফেলার মাধ্যমে আমরা আল্লাহকে এই বার্তা দিই যে-'আপনার ওপরে কোনো কিছুকেই আমি প্রাধান্য দিই না। আমি দুনিয়ার সকল কিছুর সাথে আমার সম্পৃক্ততাকে পরিত্যাগ করছি, আমার সুনাম, খ্যাতি ও দুনিয়াবি সকল চাওয়া-পাওয়াকে আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের কাছে তুচ্ছ ঘোষণা করছি।
হজ হলো আল্লাহর ক্ষমাপ্রাপ্তি ও নিজের ফিতরাতে ফিরে যাওয়ার একটি শর্টকাট উপায়। বুখারি শরিফে বর্ণিত আছে-
'যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করে এবং অশ্লীল ও গুনাহর কাজ থেকে বেঁচে থাকে, সে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়।'

টিকাঃ
১৭৫. সূরা আলে ইমরান: ৯৭
১৭৬. ইহুদি ও খ্রিষ্টান ধর্মের অনুসারীরা বিশ্বাস করে, ইবরাহিম তাঁর পুত্র ইসমাইল -কে নয়; বরং স্ত্রী সারার গর্ভে জন্ম নেওয়া পুত্র ইসহাক -কে কুরবানি করার আদেশ লাভ করেছিলেন।
১৭৭. সূরা আত-তুর: ৪
১৭৮. তিরমিজি

📘 সিক্রেটস অব ডিভাইন লাভ > 📄 মৃত্যুর আধ্যাত্মিক রহস্য

📄 মৃত্যুর আধ্যাত্মিক রহস্য


পার্থিব জীবন ছলনার বস্তু ছাড়া আর কিছুই নয়।' সূরা আলে ইমরান: ১৮৫
মৃত্যু হলো চিরস্থায়িত্বের সাথে বিবাহের মতো। -জালালুদ্দিন রুমি

মানুষের রুহ চিরন্তন, যা আল্লাহর ফুঁকে দেওয়া নিশ্বাস থেকে উদ্গত। আমাদের শরীর আমাদের মূল পরিচয় নয়; বরং শরীর হলো রুহের বাহন মাত্র। আমাদের শরীর কাদামাটি দিয়ে তৈরি এবং পৃথিবী হলো একটি চুল্লি, যেখানে আমাদের পুড়িয়ে মৃৎশিল্পের আকৃতি দেওয়া হয়। এ পৃথিবী আমাদের ঠিকানা নয়; বরং পৃথিবী হলো এমন এক খোলস-যেখানে আমরা সেই আকৃতি লাভ করি, যে আকৃতি আল্লাহ আমাদের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন。
মৃত্যুই জীবনের শেষ নয়; বরং মৃত্যু হলো রূপান্তরের একটি প্রক্রিয়ামাত্র, যেখানে আমরা আমাদের খোলসকে ঝেড়ে ফেলে রুহের প্রকৃত রূপে পরিণত হই। জীবন্ত সবকিছুরই যাত্রা শুরু হয় একটি মৃত্যু, একটি ক্ষতি বা একটি ত্যাগ থেকে। মৃত্যুর সার থেকেই জীবনের যাত্রা শুরু। একটি প্রজাপতিকে অস্তিত্ব লাভ করতে হলে তার খোলসকে ভেঙে বেরিয়ে আসতে হয়। একটি চারাগাছের বেড়ে উঠার পেছনে তার বীজ ফেটে যাওয়ার অতীত থাকে।
নতুন করে জেগে উঠার লক্ষ্যেই জীবন-মৃত্যুর সম্মুখীন হয়। মৃত্যু হলো এমন এক সেতু, যার অপর প্রান্তে রয়েছে চিরজীবনের শুরু। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আর অবশ্যই তোমার জন্য পরবর্তী সময় পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে উত্তম।' সূরা আদ-দোহা: ৪

মাতৃগর্ভের অন্ধকারে বাস করা কোনো শিশুকে আপনি যদি আলো ঝলমলে পাহাড়, সমুদ্র ও নক্ষত্রে ভরা দুনিয়ার জগতের কথা বলেন, তাহলে তার জন্য এটি বিশ্বাস করা হবে কঠিন। সেই শিশুর মতোই দুনিয়ার মাতৃগর্ভে বাস করা আমাদের পক্ষে চিরস্থায়ী বাস্তব জগৎ সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করা সম্ভব নয়। অথচ মাতৃগর্ভের শিশুর জন্য যেমন ভূমিষ্ঠ হওয়া অনিবার্য সত্য, আমাদেরও তেমনি পরকালের চিরন্তন জগতে প্রবেশ করা অনিবার্য সত্য। আমাদের শরীর অবশ্যই একদিন মারা যাবে, কিন্তু আমাদের রুহ কখনো মারা যাবে না; বেঁচে থাকবে চিরকাল। মৃত্যু শেষকথা নয়; বরং মৃত্যু হলো সেই আল্লাহর একটি নিদর্শন, যার কোনো শেষ বা মৃত্যু নেই।
দুনিয়াতে আমরা অনেক মৃত্যু অবলোকন করি, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দুনিয়াতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়; কেবল আল্লাহই চিরস্থায়ী। এখানকার সবকিছুই একদিন আল্লাহর কাছে ফিরে যাবে। দুনিয়ার জীবন একটি পরীক্ষাক্ষেত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ সূরা বাকারা: ১৫৫
মানুষের অবস্থা সমুদ্রসৈকতে নির্মিত বালুর ঘরের মতো, যেকোনো সময় সমুদ্রের ঢেউ এ ঘরকে তার কোলে টেনে নিয়ে যেতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
‘তিনিই রাত্রিকালে তোমাদের আত্মাকে নিয়ে নেন; আর দিনের বেলা যা তোমরা করো, তা তিনি জানেন। অতঃপর দিনের বেলা তিনি তোমাদের জাগিয়ে দেন, যাতে জীবনের নির্দিষ্টকাল পূর্ণ হয়। অতঃপর, তাঁর পানেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর তিনি তোমাদের নিকট বর্ণনা করে দেবেন—যা তোমরা করছিলে।’ সূরা আনআম: ৬০

জীবন কত তুচ্ছ
জীবনের প্রতি আকর্ষণের চাদর বাস্তবতার সূর্যকে ঢেকে রাখতে চায়। আমরা যখন সত্যিকার অর্থে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করতে শিখি এবং মৃত্যুকে সানন্দে বরণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যাই, তখনই কেবল জীবনের প্রকৃত রং আমাদের কাছে ধরা দেয়। বিশ্ববিখ্যাত বীর আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেটের মৃত্যুর ঘটনায় এটি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট যখন ভয়ানকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তখন তিনি দুনিয়ার সেরা ডাক্তার, কবিরাজ, হেকিমকে ডাকলেন এবং তার অর্জিত বিপুল ধন-সম্পদ দেওয়ার বিনিময়ে আরোগ্য লাভ করতে চাইলেন, কিন্তু কোনো চিকিৎসা দিয়েই কোনো কাজ হলো না। জগদ্বিখ্যাত বীর মৃত্যুশয্যায় কাতরাচ্ছেন; অথচ কেউ কিছু করতে পারছে না।
অবশেষে আলেকজান্ডার নিজ ভাগ্যকে মেনে নিলেন। তিনি আত্মীয়স্বজন ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডাকলেন এবং তার মৃত্যুর পর তিনটি ইচ্ছা বাস্তবায়ন করতে বললেন। প্রথমটি হলো, তার কফিন কবর পর্যন্ত বহন করবে ডাক্তারগণ। দ্বিতীয়টি হলো, তার কবর পর্যন্ত রাস্তাটি সাজানো হবে তার উপার্জিত বিপুল সম্পদরাজি দিয়ে। তৃতীয়টি হলো, তার হাত দুটি যেন তার কফিনের বাইরে ঝোলানো থাকে।
আলেকজান্ডার ব্যাখ্যা করলেন, ডাক্তারদের কফিন বহন করানোর মাধ্যমে তিনি পৃথিবীকে এই বার্তা দিতে চান-যখন মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, তখন দুনিয়ার কোনো চিকিৎসক মৃত্যুকে রুখতে পারে না। কবর পর্যন্ত রাস্তায় মণি-মুক্তো ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি এই বার্তা দিতে চান, বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজের জীবনের জন্য সামান্য সময়ও কিনে নিতে পারলেন না। হাত দুটি কফিনের বাইরে ঝুলিয়ে রাখার মাধ্যমে তিনি এটি বলতে চান যে, তিনি দুনিয়াতে এসেছিলেন খালি হাতে, ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে; দুনিয়ার কোনো সম্পদই তিনি সাথে নিয়ে যেতে পারেননি।
আলেকজান্ডার দেখলেন, তার সীমাহীন সম্পদ ও ঐতিহাসিক বিজয়গাথা তাকে মৃত্যু থেকে বাঁচাতে পারেনি। এ ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষা লাভ করতে পারি, দুনিয়ার অর্জিত সম্পদরাজি আমাদের কোনো কাজে আসবে না। সময় এত মূল্যবান যে, তা কখনো ফিরে পাওয়া যায় না। আমরা পাপ করলে ক্ষমা পেতে পারি, অসুস্থ হলে সুস্থতা পেতে পারি, নিঃস্ব হয়ে গেলে আবার প্রাচুর্য অর্জন করতে পারি, কিন্তু সময় চলে গেলে তা ফিরে আসে না। আমরা দান, ভালোবাসা, জ্ঞান ও সৎকর্মের যে চারা দুনিয়াতে রোপণ করব, কেবল তা-ই পরকালীন জীবনে বিশাল বৃক্ষ হয়ে দেখা দেবে। আমাদের কবরে আমাদের সাথে কিছুই যাবে না; যাবে কেবল আমাদের সৎকর্ম।
'ধন-সম্পদ আর সন্তানাদি পার্থিব জীবনের শোভা-সৌন্দর্য, আর স্থায়ী সৎ কাজ তোমার প্রতিপালকের নিকট প্রতিদানে উত্তম, প্রত্যাশাতেও উত্তম।' সূরা কাহাফ : ৪৬
আমাদের ভাগ্য, দুনিয়াবি সাফল্য, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব সবকিছুই পেছনে রয়ে যাবে। যেমনটি একজন সাধক বলেছেন- 'তুমি ভালোবাসো দুনিয়ার এমন সব মানুষকে, যারা হয় তোমাকে দাফন করবে, নয়তো তুমি তাদের দাফন করবে। এর অন্যথা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।'

পৃথিবী আমাদের প্রকৃত বাড়ি নয়
আমাদের শরীর একটি বাহন এবং এটি আল্লাহর দেওয়া ঋণ। এ দুনিয়া হলো আল্লাহর কাছ থেকে আল্লাহর দিকে যাওয়ার পথের একটি বাসস্টপ। নিচের ঘটনায় এটি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
এক ব্যক্তি আবু হুসেইন নামক এক সুফির সাথে দেখা করার জন্য কুফার পথে রওয়ানা হলো। লোকটি আবু হুসেইনের বাড়িতে প্রবেশ করে দেখতে পেল, বাড়ির ভেতর কোনো আসবাবপত্র নেই। লোকটি হতভম্ব হয়ে আবু হুসেইনকে জিজ্ঞেস করল-'আপনার বাড়িতে কোনো আসবাবপত্র দেখছি না, ব্যাপার কী?' আবু হুসেইন হেসে বললেন-'আচ্ছা তুমি আগে বলো, তুমি এত দূর এসেছ, সাথে কোনো আসবাবপত্র আনোনি কেন?' লোকটি জবাবে বলল- 'আমি তো কেবল পথিক মাত্র। আসবাবপত্র দিয়ে আমি কী করব?' এবার আবু হুসেইন জবাবে বললেন-'আমিও তো এ দুনিয়ায় কেবল একজন পথিক মাত্র। আমি খুব অল্প কয়েকদিনের জন্য এ দুনিয়াতে এসেছি, তারপর আমার আসল বাড়িতে ফিরে যাব। কাজেই আমার তো কোনো আসবাবপত্রের প্রয়োজন নেই।'
আমাদের আসল বাড়ি সেটা নয়, যেটা টাকা দিয়ে কেনা যায়; আমাদের আসল বাড়ি রয়েছে আল্লাহর কাছে। মহানবি বলেছেন-
'দুনিয়ার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আমার জন্য নয়। দুনিয়াতে আমি একজন পথিকের ন্যায়, যে একটি গাছের ছায়ায় বিশ্রাম গ্রহণ করে এবং তারপর তার নিজস্ব পথে চলে যায়।'
অনেক স্কলার মানুষের জীবনের সংক্ষিপ্ততার বর্ণনা এভাবে দিয়ে থাকেন-যখন মানবশিশু ভূমিষ্ঠ হয়, তখন তার কানে আজান দেওয়া হয়; কিন্তু কোনো নামাজ অনুষ্ঠিত হয় না। মানুষ যখন মারা যায়, তখন আজান দেওয়া হয় না, কিন্তু তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এর কারণ হলো এই যে, মানবশিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময়ে দেওয়া আজানের নামাজ অনুষ্ঠিত হয় তার মৃত্যুর সময়। কাজেই আজান ও নামাজের মধ্যকার সময় যত সংক্ষিপ্ত, আমাদের দুনিয়ার জীবনও ততই সংক্ষিপ্ত।
আমরা আমাদের বাড়ি, দেশ বা শরীরের বাসিন্দা নই; বরং আমরা হলাম পথিক মাত্র। কোনো পথিক যেমন তার হোটেলরুমকে সাজায় না। কারণ, সেখানে তার অবস্থানকাল হয় বড়োই সংক্ষিপ্ত, তেমনি কোনো মানুষেরও তার দুনিয়ার জীবনকে খুব বেশি সাজানো ঠিক না। কারণ, দুনিয়ার এ ঠিকানা বড়োই স্বল্প সময়ের জন্য; বরং আমাদের রুহকে সাজানো উচিত সৎকর্ম দিয়ে। কেননা, সৎকর্মই হলো একমাত্র মুদ্রা-যা সময় ও স্থানকে অতিক্রম করে পরকালে আমাদের সাথে গিয়ে মিলিত হবে। অতএব, নশ্বর দুনিয়ার জন্য নয়; বিনিয়োগ করতে হবে অবিনশ্বর পরকালের জন্য।

জীবনের অস্থায়িত্ব ও আল্লাহর করুণা
ইসলামে জীবনের অস্থায়িত্বকে শাস্তি হিসেবে দেখা হয় না; বরং আল্লাহর সমন্বিত করুণার একটি অংশ হিসেবেই দেখা হয়। জীবনের অস্থায়িত্ব ও সব নাটকীয়তা আমাদের কাছে আশা হিসেবে হাজির হয়, মৃত্যু আমাদের আল্লাহর করুণার কথাই মনে করিয়ে দেয়। কেননা, যদি সবকিছু অবিনশ্বর হতো, তাহলে আমাদের ব্যথা-বেদনা ও ক্ষতিগুলোও অবিনশ্বর থেকে যেত।
মৃত্যু আমাদের সব আনন্দ-সুখের ভেলাকে ভাসমান কোনো কিছুর কাছে নয়; বরং সেই আল্লাহর কাছে নোঙর করতে শেখায়, যার ভালোবাসা অসীম ও চিরস্থায়ী। মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়-কেবল একটি জিনিসই প্রকৃত ও অপরিবর্তিত, আর তা হলো আল্লাহ। জগতের অস্তিত্বশীল সবকিছু; তা ভালো হোক বা মন্দ-একদিন ধ্বংস হবেই।
আমরা যখন আমাদের প্রবৃত্তি ও মরণশীল শরীরের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আমাদের ভেতর ফুঁকে দেওয়া আল্লাহর নিশ্বাসের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করি, তখন মৃত্যুর ভয় তেমনিভাবে বাতাসে মিলিয়ে যায়; যেমনিভাবে রোদ উঠলে তুষারকণা মিলিয়ে যায়। আমাদের রুহের মৃত্যু নেই। রুহ দুনিয়ার সময়কে অতিক্রম করেও জীবিত থাকে। এই জগৎ কেবল আমাদের খোলসকে ভেঙে ফেলতে পারে, রুহের কোনো ক্ষতি করার সামর্থ্য এ জগতের কারও নেই।
মেঘ ছিন্নভিন্ন হয়ে বৃষ্টিতে পরিণত হয়, তবুও সে প্রকৃতির কাছে অভিযোগ দায়ের করে না। কারণ, বৃষ্টির মাধ্যমেই তো দুনিয়ার গাছপালা সজীব হয়ে থাকে। স্বর্ণ কখনো পোড়ানোর অভিযোগে আগুনকে অভিশাপ দেয় না। কারণ, আগুনই তো স্বর্ণকে বিশুদ্ধ করে তোলে। গর্ভফুল পড়ে যাওয়ার জন্য কোনো মা ব্যথিত হয় না। কারণ, বিনিময়ে সে একটি শিশুসন্তান লাভ করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'নিশ্চয়ই কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি।' সূরা ইনশিরাহ : ৫
যা কিছু আমরা হারাই, তার জন্য শোক প্রকাশ করতে হয় না। মহান আল্লাহ বলেন-
'আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তরে ভালো কিছু দেখেন, তাহলে তোমাদের কাছ থেকে যা নেওয়া হয়েছে, তা থেকে উত্তম কিছু তোমাদের দান করবেন আর তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।' সূরা আনফাল : ৭০
শীতকালে গাছের পাতা ঝরে পড়ে এ কারণে যে, বসন্তে সেখানে নতুন পাতা গজাবে। তেমনিভাবে আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে কিছু কেড়ে নেন কিছু দেওয়ার জন্যই। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুকেই শক্ত করে আঁকড়ে না ধরার মধ্যেই সত্যিকারের শান্তি লুকিয়ে আছে।
কবি আরু বারজাক বলেছেন-
'যদি হারানোর ব্যথা তোমাকে খুব তীব্রভাবে ভোগায়, তাহলে হারানোর মতো কিছুর প্রতি আর কখনো খুব বেশি সংযুক্ত হয়ো না।'
যা কিছু ধ্বংসশীল, তাকে ছেড়ে দিন এবং যা চিরস্থায়ী, তাকে আঁকড়ে ধরুন। প্রকৃতপক্ষে ধ্বংসশীল সবকিছুই ধ্বংসহীন আল্লাহর স্মরণের সামনে বাধাস্বরূপ। কাজেই দুনিয়াবি উপকরণের প্রতি ঝোঁক যত কমানো যাবে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ততই সহজ হবে।

মৃত্যু প্রকৃত সত্যকে উন্মোচন করে
একজন স্কলার বলেছেন-
'জীবন ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্নের মতো। যখন আমরা মারা যাই, তখন মূলত ঘুম থেকে জেগে উঠি এবং মেকআপ ছাড়া সত্যিকারের জগৎকে আবলোকন করি। মৃত্যু আমাদের মুখোশ খুলে দেয়। সমস্ত মিথ্যাকে মৃত্যু হত্যা করে। কেননা, মিথ্যাকে বিলুপ্ত করার জন্যই সত্যের আগমন ঘটে।' সূরা বনি ইসরাইল : ৮১
যে নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করে দেয়, সত্যের ভেতর বাস করে; জীবন তাকে যেখানেই নিয়ে যাক না কেন, সব সময় ভালোবাসাই রোপণ করে যায়। তার জন্য মৃত্যু কোনো ভয়ের ব্যাপার নয়। কেননা, মৃত্যু তো হলো ভালোবাসার আদি উৎস (আল ওয়াদুদ) আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ারই অপর নাম। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে গুনাহ করে আবার অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে, আশা করা যায়-মৃত্যুর সময় মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু যারা অপরের প্রতি জুলুম করে, অপরের অধিকারকে গ্রাস করে, ঘৃণার চর্চা করে, তাদের জন্য মৃত্যু হবে বেদনাদায়ক। মৃত্যু হলো বিচার দিবসে প্রবেশের দরজা, যে দিবসে আল্লাহ মানুষের সৎকর্ম ও অসৎকর্মকে দাঁড়িপাল্লায় মাপবেন।
আপনি যত ধনবান, বিখ্যাত বা সৌন্দর্যমণ্ডিতই হন না কেন, মৃত্যু থেকে পালানোর কোনো সুযোগ আপনার নেই। প্রত্যেককেই কবরের স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়-আমাদের সম্পদরাজি, আমাদের ভালোবাসার মানুষ বা আমাদের সন্তানাদি মৃত্যু থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে না। মৃত্যুর কাছে বয়স, বর্ণ, লিঙ্গ বা ধর্মের কোনো ভেদাভেদ নেই। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'কেউ জানে না কোন স্থানে সে মারা যাবে।' সূরা লোকমান: ৩৪
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন-
'অতঃপর নির্ধারিত সময়ে যখন তাদের মৃত্যু এসে যাবে, তখন এক মুহূর্তও বিলম্বিত কিংবা ত্বরান্বিত করতে পারবে না।' সূরা নাহল: ৬১
আমরা যখন মৃত্যু থেকে পালানোর চেষ্টা করি, তখন মূলত মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে যাই। মহান আল্লাহ বলেন-
'তোমরা যদি মৃত্যু বা হত্যা থেকে পলায়ন করো, তবে এ পলায়ন কোনো কাজে আসবে না।' সূরা আহজাব : ১৬
কারণ, 'তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের পেয়ে বসবেই।' সূরা নিসা : ৭৮

আপনি কেন মৃত্যুকে ভয় পাবেন
কেউ মৃত্যুকে ভয় পায় মানে হলো-সে আল্লাহ ছাড়া অন্য এমন কিছুকে আঁকড়ে ধরেছে, যার ভিত্তি বড়োই নড়বড়ে। আমাদের সুখ যদি এমন কিছুর ওপর নির্ভরশীল হয়-যার ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, তাহলে আমরা কখনোই সন্তোষ লাভ করতে পারব না। আমাদের শান্তি মূলত নির্ভর করে আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের ওপর। কারণ, আল্লাহ চিরস্থায়ী ও পরিবর্তনহীন।
ইসলামের মূল ভিত্তি হলো আত্মসমর্পণ। কারণ, কেবল দুনিয়ার মিথ্যা আকর্ষণগুলোকে সমর্পণ করার মাধ্যমেই আমরা সত্যিকারের স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে থাকি। এক দৃষ্টিতে, মৃত্যু আপনাকে হয় ভয় অথবা ঈমানের দিকে ঠেলে দেয়। যখন আমরা একবার ঠিকমতো বুঝে নিতে পারি যে, ভবিষ্যতের ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই এবং যখন আমরা আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা করতে সক্ষম হই, কেবল তখনই সত্যিকারের স্বাধীনতার সন্ধান পাই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর যে তার রবের প্রতি ঈমান আনে, তার কোনো ক্ষতি বা জুলুমের ভয় থাকবে না।' সূরা জিন : ১৩
কিন্তু আমরা যখন দুনিয়ার অজানা ভবিষ্যৎ গড়ার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করি, তখন দুশ্চিন্তা ও হতাশা আমাদের গ্রাস করে ফেলে। কেবল আল্লাহর অসীমত্বকে স্মরণ ও তাঁর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণই আমাদের প্রকৃত প্রশান্তি এনে দিতে পারে। মৃত্যুচিন্তা আমাদের সেই পথের দিকে এগিয়ে দেয়। মহানবি আমাদের সর্বদা মৃত্যুচিন্তা করতে বলেছেন এবং কবরস্থান পরিদর্শন করতে বলেছেন। কারণ, গোরস্থান এমন এক জায়গা, যেটি নীরব হলেও তার বার্তা নীরব নয়। আমরা মাটির ওপরের চেয়ে মাটির নিচে বেশি সময় অতিবাহিত করব।

আপনি একদিন মারা যাবেন
মৃত্যু হলো সবচেয়ে বড়ো শিক্ষক। কেননা, এটি আমাদের চিরস্থায়ী আল্লাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে শেখায়। মহান আল্লাহ বলেন-
'পৃথিবীপৃষ্ঠে যা আছে সবই ধ্বংসশীল, কিন্তু চিরস্থায়ী তোমার প্রতিপালকের চেহারা; যিনি মহীয়ান, গরীয়ান।' সূরা আর-রহমান : ২৬-২৭
আমরা যখন মৃত্যুকে স্মরণ করি, তখন আসলে জীবনের তুলনায় মৃত্যুকে বেশি গুরুত্ব দিই। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'প্রতিটি প্রাণ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।' সূরা আনকাবুত : ৫৭
কিন্তু প্রশ্ন হলো-কতজন মৃত্যুর মিষ্টতার স্বাদ আস্বাদন করবে?
যখন মৃত্যু সামনে এসে দাঁড়াবে, তখন অবহেলায় নষ্ট করা সময়গুলোর কথা আমাদের মনে পড়বে। মৃত্যুর সময় আমাদের সব গোপনীয়তা, সব গুনাহ ও দুর্বলতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। সেই সব বিষয় আমাদের মুখোমুখি এসে দাঁড়াবে, যা আমাদের করার কথা ছিল, কিন্তু করা হয়ে ওঠেনি।
'যতদিন পারো বেঁচে থাকো, কিন্তু জেনে রেখ, একদিন তুমি মারা যাবে। যাকে ইচ্ছা ভালোবাসো, কিন্তু জেনে রেখ, একদিন তুমি বিচ্ছেদের সম্মুখীন হবে। যা মনে চায় করো, কিন্তু জেনে রেখ, একদিন তোমাকে সবকিছুর জবাব দিতে হবে।'
মুত্যুর অনিবার্যতা আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে-আমরা কি এমনভাবে জীবনযাপন করছি যে, প্রতিটি দিনই হয়তো হতে পারে আমাদের শেষ দিন? মৃত্যু আমাদের ভাবতে শেখায়-আমরা কি অর্থবহ জীবনযাপন করছি, নাকি মূল্যবান সময়গুলো হেলায় কাটিয়ে চলেছি?
আলি বলেন-
'জীবনের জন্য এমনভাবে কাজ করবে, যেন তুমি চিরকাল বাঁচবে; পরকালের জন্য এমনভাবে কাজ করবে, যেন তুমি কালকেই মারা যাবে।'
মহানবি বলেছেন- 'মৃত্যুর কথা এমনভাবে স্মরণ করো, যেন তুমি দুনিয়ার সংক্ষিপ্ত সময় থেকে পূর্ণ সুবিধা নিতে পারো।'
মহান আল্লাহ বলেন- 'তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করতে পারেন-কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম। তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।' সূরা মুলক: ২
আমরা কোথায় ও কখন মারা যাব, তা ঠিক করার সুযোগ আমাদের হাতে নেই। তবে আমরা কীভাবে বেঁচে থাকব, তা ঠিক করার সুযোগ আমাদের হাতে রয়েছে। একবার এক ব্যক্তি মুহাম্মাদ-কে জিজ্ঞেস করলেন-'কবে বিচার দিবস অনুষ্ঠিত হবে?' রাসূলুল্লাহ জবাবে পালটা প্রশ্ন করলেন- 'তুমি তার জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ?' নবিজি মূলত আমাদের করণীয়র দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। অন্য একসময় রাসূল বলেছেন-
'যখন কিয়ামত এসে যাবে, তখন যদি তোমার কাছে খেজুর গাছের একটি চারাও থেকে যায় এবং সেটি রোপণ করা সম্ভব হয়, তাহলে তোমার উচিত চারাটি রোপণ করা।'
পবিত্র কুরআনে কিয়ামত দিবসের কথা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে-যেদিন সকল মানুষ পুনরুত্থিত হবে এবং আল্লাহর সামনে বিচারের মুখোমুখি হবে। সেদিন প্রত্যেককেই দুনিয়াতে তার কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। কুরআনের সেদিনের ভয়াবহতার বিবরণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উঠে এসেছে।
কুরআন বলেছে- 'পৃথিবী প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে।' সূরা জিলজাল : ১
'মানুষ হবে বিক্ষিপ্ত পতঙ্গের মতো। পর্বতগুলো হবে ধুনিত রঙিন পশমের ন্যায়।' সূরা কারিয়া: ৪-৫
'সমুদ্রগুলোকে অগ্নি-উত্তাল করা হবে।' সূরা আত-তাকভির: ৬
'তারকাগুলো তাদের উজ্জ্বলতা হারিয়ে খসে পড়বে।' সূরা আত-তাকভির: ২
'সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে।' সূরা কিয়ামাহ : ৯
'আকাশকে গুটিয়ে নেওয়া হবে, যেভাবে গুটিয়ে রাখা হয় দলিলপত্রাদি।' সূরা আম্বিয়া: ১০৪
'মৃতরা জীবন লাভ করবে এবং আল্লাহর দিকে ছুটে আসবে।' সূরা ইয়াসিন : ৫১
সেদিন সৃষ্টিজগতের সকল কিছু আল্লাহর সামনে মাথানত করে দাঁড়াবে। এদিন দুনিয়ার বিচারের অসম দাঁড়িপাল্লাকে আল্লাহর করুণা ও অনুগ্রহের সাহায্যে নিখুঁতভাবে সমান করে স্থাপন করা হবে।
কেউ জানে না, কবে সে মারা যাবে এবং কবে কিয়ামত সংঘটিত হবে। আমাদের হাতে কেবল সেই ক্ষমতা আছে-যা দিয়ে আমরা নিজের বর্তমান জীবনকে বদলাতে পারি। কাজেই মৃত্যু নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে আমাদের উচিত বর্তমানকে উন্নততর করার কাজে আত্মনিয়োগ করা। পারস্য কবি আবু সাইদ আবুল খাইর যথার্থই বলেছেন-
'যখন তুমি ভূমিষ্ঠ হয়েছ, তখন তুমি কেঁদেছ; কিন্তু সবাই হেসেছে। এমনভাবে তোমার জীবনটা গঠন করো, যেন মৃত্যুর সময় তুমি হাসবে, কিন্তু সবাই কাঁদবে।'
যদি কখনো আপনি জানতে পারেন যে আজ রাতেই আপনারা মৃত্যু হবে এবং আগামীকাল সকালে আপনি আর জেগে উঠবেন না, তখন আপনার মনে কী অনুভূতির সৃষ্টি হবে? আপনি কি মৃত্যুভয়ে ভীত হয়ে ভেঙে পড়বেন? নাকি আল্লাহর ক্ষমা ও করুণা পেতে তাঁর দরজায় ধরনা দেবেন? যেহেতু আমরা জানি না মৃত্যু কখন আমাদের কাছে এসে উপস্থিত হবে, সেহেতু আমাদের এমনভাবে জীবনযাপন করা উচিত, যেন আজ রাতই হতে যাচ্ছে আমার জীবনের শেষ রাত।

মৃত্যুর জন্য আমাদের সৃষ্টি হয়নি
আল্লাহ যদি কেবল জীবনের জন্য আমাদের সৃষ্টি করতেন, তাহলে মৃত্যু বলতে কোনো কিছু থাকত না। প্রকৃতপক্ষে মৃত্যু জীবনের বিপরীত কিছু নয়; বরং মৃত্যু হলো অস্তিত্বহীনতা। আমরা যে কেবল জীবনের জন্য সৃষ্টি হইনি, তার প্রমাণই হলো মৃত্যু। জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন-
'আমার আত্মা ভিন্ন কোথাও থেকে আগত-আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত। তাই অবশেষে সেখানেই আমার যাত্রা সমাপ্ত করব বলে ঠিক করেছি।'
মৃত্যু শূন্যতার জগতে প্রবেশের নাম নয়; বরং মৃত্যু হলো চিরন্তন জগতে নতুন করে জন্ম নেওয়ার দরজা মাত্র। চিরস্থায়ী জগতে জন্ম নেওয়ার জন্য এ পথ আমাদের পাড়ি দিতেই হবে। চোখ মেলে তাকিয়ে যেমন আমরা ঘুম থেকে জেগে উঠি, তেমনি মৃত্যুর মাধ্যমে আমরা নতুন জগতের জন্য জেগে উঠি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ প্রসঙ্গে চমৎকারভাবে বলেছেন-
'মৃত্যু মানে আলো নিভে যাওয়া নয়; বরং মৃত্যু হলো আলো নিভিয়ে দেওয়া। কেননা, ভোর চলে এসেছে।'
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'অতঃপর তোমরা ভূমিকে দেখ শুষ্ক, মৃত। অতঃপর আমি যখন তাতে পানি বর্ষণ করি, তখন তাতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়, তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়, আর তা উদ্‌গত করে সকল নয়নজুড়ানো (জোড়ায় জোড়ায়) উদ্ভিদ।' সূরা হজ: ৫
মৃত শীত যেমন জীবন্ত বসন্তের আগমন ঘটায়, তেমনি মৃত্যুও নতুন জীবনের আগমনি বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়। শাইখ সিদি মুহাম্মাদ আল জামাল সুন্দরভাবে বলেছেন-
'মৃত্যুর পদধ্বনি শোনো, যেটি আসলে পরকালীন জীবনেরই গান।'
দুনিয়াতে আপনি যা কিছু রেখে যাচ্ছেন, তার জন্য শোক করবেন না। কারণ, এই জগৎ কেবল পরবর্তী জগতেরই সুগন্ধ মাত্র।
'পরকালের তুলনায় দুনিয়ার জীবন হলো ততটুকু, সমুদ্রে একটি আঙুল ডুবিয়ে তুললে সেই আঙুলে যতটুকু পানি লেগে থাকে।'
মুমিনের জন্য মৃত্যু হলো ঘরে ফেরার আনন্দ উদ্যাপন। আল্লাহর স্মরণকে সাথে নিয়ে মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ ও আমাদের মধ্যকার পর্দা সরে যায় এবং আমরা আল্লাহর চেহারা ও সৌন্দর্য অবলোকনের সুযোগ পাই। মুমিনের কাছে মৃত্যু অপরিচিত কিছু নয়। কারণ, আমরা অপরিচিত কোথাও যাচ্ছি না; বরং আমরা আমাদের আদি উৎসের কাছে ফিরে যাচ্ছি।
‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাব।’ সূরা বাকারা: ১৫৬
আমরা যখন আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে সক্ষম হই, তখন আমাদের মৃত্যুর মানে দাঁড়ায় চূড়ান্ত স্বাধীনতা। মুমিনের মৃত্যু তো হলো প্রবৃত্তির খাঁচা ভেঙে চির মুক্তি লাভের অপর নাম। মৃত্যুর মাধ্যমে রুহ ডানা মেলে উড়ে যায় তার প্রভুর কাছে। মৃত্যু সমাপ্তি নয়; বরং চিরকালীন জীবনের শুরু মাত্র।

টিকাঃ
১৭৯. তিরমিজি
১৮০. Al-Ghazali, Abu Hamid. Dear Beloved Son-Ayyuhal Walad.
১৮১. তিরমিজি
১৮২. বুখারি
১৮৩. আলবানি
১৮৪. মুসলিম, আহমদ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00